তালাশ - শাহীন আখতার

তালাশ - শাহীন আখতার তালাশ - শাহীন আখতার

২০০৪ সালের একুশে বইমেলায় তালাশ উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয়। শুরুতে বইটি ছোট পরিসরে হলেও পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে। এর কারণ হয়তো বইয়ের বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’। তা ছাড়া দুই লাখ নির্যাতিত নারীর কথা যে আমরা শুনি, তাঁদেরই একজন উপন্যাসের মূল চরিত্র—মরিয়ম। তাকে ঘিরে উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে যুদ্ধোত্তর আরও তিন দশকজুড়ে। এ কথা সত্য যে, যুদ্ধ ধর্ষণের শিকার নারীর জীবনটা পুরোদমে পিষে ফেলে, তার ভোগান্তি যুদ্ধকালেই শেষ হয়ে যায় না, চলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। তাতে মহত্ত্বের ছোঁয়া থাকে না। বরং বিষয়টা ধামাচাপা দেওয়ারই পাঁয়তারা চলে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের এ আড়াল করা অধ্যায়টি জানার কৌতূহল আমার মতো নিশ্চয়ই আরও অনেকের ছিল। আমার মনে আছে, মেলা চলাকালেই নিউএজ পত্রিকায় তালাশ-এর দীর্ঘ আলোচনা ছাপা হয়েছিল। এর পরে বাংলাদেশের কম দৈনিক বা সাপ্তাহিক আছে, যেখানে এর আলোচনা-সমালোচনা ছাপা হয় নাই। কোনো কোনো কাগজে একাধিকবারও হয়েছে। ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই’ পুরস্কারের কারণে সাহিত্যের ধরাবাঁধা পাঠকের বাইরেও পাঠক পেতে সক্ষম হয় বইটি। এ পর্বে মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে পাকেচক্রে জড়িত ভুক্তভোগী নারী-পুরুষের কাছ থেকে এমন সব মর্মস্পর্শী কাহিনি শুনেছি, তালাশ-এর মতো শ খানেক বই লিখলেও যা ফুরাবে না। তখন আবারও মনে হয়েছিল যুদ্ধের ক্ষত কত গভীর, ব্যাপক!
অথচ তালাশ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা লেখা হয়নি। যুদ্ধের ক্ষত মুখগুলোই খুলে দেওয়া হয়েছে। যে মেয়েটি পাকিস্তানি শিবিরে আটক ছিল, স্বাধীন দেশও যখন তার জন্য কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের শামিল, তখন কিন্তু স্বজাতির দিকেই তর্জনীটা ঘুরে যায়। চেতনা নিয়ে গর্ব করার জায়গাটা আর প্রশ্নাতীত থাকে না। তাতে কারও কারও উষ্মা প্রকাশ পেলেও, যাঁরা আয়নায় মুখ দেখার কসরত করেছেন, তাঁদের সাধুবাদ জানাই।
তালাশ-এর প্রচার ও প্রসারে একজনের নাম না বললেই নয়, তিনি শিক্ষক-লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তাঁর সুবাদে এমন সব খুদে পাঠক পেয়েছি, আমি স্বপ্নেও ভাবিনি এরা আমার বই পড়তে পারে। হাঁটি হাঁটি পা পা অটোগ্রাফ শিকারিও সেই দলে ছিল। কলকাতায় তালাশ-এর বেশ কিছু পাঠক পাই লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের কল্যাণে। লেখায়, সাক্ষাৎকারে, আড্ডায় তিনি বইটা জিন্দা রেখেছিলেন, ২০০৫-এর নভেম্বরে নিজের প্রয়াণ পর্যন্ত। আমার জানা নেই এসব ঋণ কীভাবে শোধ করা সম্ভব।
আমার জানামতে, প্রথম বাংলাভাষী পাঠকের বাইরে তালাশ উপন্যাসের খানিকটা পরিচয় তুলে ধরেছেন বাংলাদেশি-ইংরেজি লেখক মাহমুদ রহমান। মাহমুদ ২০০৬ সালে টেক্সাসের এক সম্মেলনে এ উপন্যাসের একটি অধ্যায়ের ইংরেজি তর্জমা পড়ে শোনান। অংশটি ছিল: ‘যুদ্ধ শেষে দেশ স্বাধীন হয়েছে। মরিয়ম পুরোনো মানুষ-জায়গা পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছে। কেউ কেউ হারিয়ে গেছে। যারা আছে তারা বদলে গেছে চিরতরে। সে নিজেও আশ্রয়হীন...’ ইত্যাদি। এ যুদ্ধের পুরোনো এক চিরাচরিত ছবি, তবু তা এখনো কবিতা লিখতে উদ্বুদ্ধ করে মানুষকে। মাহমুদের অনুবাদ শুনে যে প্রবাসী কবি-মেয়েটি বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কবিতা লিখতে শুরু করে, তার সঙ্গে কদিন আগেই দেখা হলো, কবিতা শোনা হলো। গোটা অভিজ্ঞতাটা গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতোই।
স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পরে হলেও মুক্তিযুদ্ধে নারীর আত্মত্যাগ, তাঁদের বঞ্চনাময় জীবনগাথা তালাশ তর্জমার মাধ্যমে বাইরের পাঠক জানার সুযোগ পাবে—এটা একটা বড় প্রাপ্তি বলে মনে করি।

Download and Comments/Join our Facebook Group

If Download link doesn't work then please comment below. Also You can follow us on Twitter, Facebook Page, join our Facebook Reading Group to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature. Also try our Phonetic Bangla typing: Avro.app
বইটি শেয়ার করুন :

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2018. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com