দ্বিতীয় দিনের কাহিনি - সৈয়দ শামসুল হক

দ্বিতীয় দিনের কাহিনি — সৈয়দ শামসুল হক
দ্বিতীয় দিনের কাহিনি — সৈয়দ শামসুল হক

বই আলোচনাঃ
যুদ্ধোত্তর বাস্তবতার স্থির-বয়ান
মোজাফ্ফর হোসেন


দ্বিতীয় দিনের কাহিনি (১৯৮৪)—সৈয়দ শামসুল হকের ক্ষীণদেহী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসটির প্রথমা সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭-এর অক্টোবরে। এ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট যুদ্ধোত্তর জলেশ্বরী। জলেশ্বরী সৈয়দ শামসুল হক-সৃষ্ট কল্পশহর। আর কে নারায়ণের মালগুডি, উইলিয়াম ফকনারের ইয়াকনাপাতউফা, স্টিফেন কিংয়ের কাসল রক, কুর্ট ভনেগার্টের ইলুয়াম এবং জন গ্রিশামের ক্লান্টন মিসিসিপি শহরের মতো জলেশ্বরীও আজ সাহিত্য-মানচিত্রে ভীষণ বাস্তব। সৈয়দ হক এই কল্পনার ভূগোলজগৎটি তৈরি করা শুরু করেন ১৯৭৪ সালে, যখন তিনি আলোচ্য উপন্যাসটি লেখা শুরু করেছেন। এরপর তিনি জলেশ্বরীর প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়কে উপজীব্য করে লেখেন নিষিদ্ধ লোবান (১৯৯০) উপন্যাসটি।Ñঘটনার কালক্রমের দিক দিয়ে যাকে দ্বিতীয় দিনের কাহিনির প্রিক্যুয়াল হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। দুটি উপন্যাসে ঘটনাপ্রবাহ ও বর্ণনা-স্বরের দিক থেকেও বেশ কিছু অভিন্নতা চোখে পড়ে।

সৈয়দ হক অল্প কটি চরিত্র দ্বারা স্বল্পায়তনের এই উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের নৈরাশ্যজনক চিত্র তুলে এনেছেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অন্যান্য উপন্যাসের সঙ্গে এর মূল পার্থক্যটা নির্মিতি অংশে। টানা গদ্যে গল্পটা বলে গেছেন সৈয়দ হক। কোথাও কোথাও চরিত্রের স্বগতোক্তির ভেতর দিয়ে এগিয়েছে কাহিনি। আপাত-একরৈখিক গল্পকে লেখক তাঁর প্রকাশভঙ্গি, বর্ণনা-ঢং আর শব্দচয়নের মধ্য দিয়ে করে তুলেছেন নাটকীয়। পুরো উপন্যাসে আছে হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র সংলাপ। আবার উপন্যাসের একটি বিরাট অংশজুড়ে আছে নীরবতা। অর্থাৎ অনুচ্চারিত স্বর থেকেই সবচেয়ে বেশি বলা হয়েছে। গোটা উপন্যাসটি স্থির দৃশ্যের মতো থমকে থাকে। আখ্যান যেন এক জায়গাতেই ঘুরপাক খায়। তৈরি হয় অস্ফুট এক অন্তর্বয়ান। সৈয়দ হকের এই শক্তিশালী-আবেশি গদ্যের নমুনা তাঁর শেষদিকের রচনায় তেমন একটা ধরা পড়েনি।

এর শুরুটা হয়েছে নিস্তব্ধতা দিয়ে। কেন্দ্রীয় চরিত্র তাহেরের মনে হয়, লোকজন ‘বাতি নিভিয়ে নিশ্বাস বন্ধ করে তারা পড়ে আছে অন্ধকারের ভেতরে গহ্বর সৃষ্টি করে।’ খুপরির ভেতর-বাইরের অন্ধকারকে গল্পকথক যেমন বলছেন, ‘যতিহীন বিহ্বলতার জন্ম হয় গোটা অস্তিত্ব জুড়ে’, কথাটি পুরো উপন্যাসের ক্ষেত্রেও খাটে। জলেশ্বরী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের চাকরি নিয়ে শহরটিতে পা রাখে তাহের উদ্দিন খন্দকার। আলো-আঁধারির ভেতর থেকে সন্দেহের দৃষ্টি ধেয়ে আসে তার দিকে। মানুষগুলো মনে করে সে বিহারি; ছদ্মবেশে সম্পত্তি পুনরুদ্ধারে এসেছে। এরপর তার পরিচয় উন্মোচিত হলে তারা তাকে অস্থায়ী একটা আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যায়। তাহের এগিয়ে যায় নিস্তব্ধতার ভয়াবহ শব্দের ভেতর দিয়ে।

শহরটিতে এই ভয়াবহ নিস্তব্ধতা ও অবিশ্বাসের দীর্ঘশ্বাস নেমে এসেছে ভয়ংকর এক যুদ্ধ থেকে। যুদ্ধ-পরবর্তীকালে এসে গোরস্থানের নগরী হয়ে ওঠে জলেশ্বরী। তাহের তার স্মৃতিতে যে জলেশ্বরীকে সম্বল করে আসে, সেই জলেশ্বরী একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সর্বস্বান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ধ্বংসের সাক্ষী হয়ে। চারদিকে ক্ষয় আর মৃত্যুর চিহ্ন। একসময়ের নামহীন সড়কগুলো এখন হয়ে উঠেছে শহীদ বরকতউল্লাহ রোড, শহীদ আনোয়ার রোড, শহীদ গেদু মিয়া লেন, চাঁদবিবির পুকুর ও শহীদ সিরাজ আলী রোড। সাক্ষাতে শহরের লোকজন কেবল মৃতদের গল্প শোনায়।

অতীত থেকে বিযুক্ত হতে আসা তাহেরকে সবাই যেন আঙুল দিয়ে অতীতে পাকাপাকিভাবে আবাস গড়ে নিতে ইন্ধন জোগায়। ফলে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট হলেও চরিত্রদের বক্তব্য ও জীবনযাপনের ভেতর দিয়ে যুদ্ধসময়ের নিষ্ঠুর বয়ান অহরহ চলে আসে। যুদ্ধ মিশে যায় যুদ্ধোত্তর সময়ের সঙ্গে।

তাহের রাজধানীর অপেক্ষাকৃত ঝঞ্ঝাটমুক্ত জীবন ফেলে জলেশ্বরী এসেছে পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু এখানে এসে সে নির্মিতির চেয়ে ভাঙনটা দেখতে পায় স্পষ্টভাবে। মুক্তিযুদ্ধের পর ব্যক্তি থেকে সমষ্টি গড়ে ওঠার পরিবর্তে এখানে ব্যক্তিবোধ আরও সংকীর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে জলেশ্বরী সংস্কারে এসে নিজেকে প্রতারিত মনে হয় তাহেরের। তবে অন্যদিক থেকে তাকে শক্তি জোগায় ক্যাপ্টেন নামের পরিচিত মুক্তিযোদ্ধা মজহার। মধ্যরাতে ক্যাপ্টেনের এ-এ-রে-এ-এ হাঁক তাহেরকে আশাবাদী করে তোলে। ক্যাপ্টেনের সঙ্গে একাত্মবোধ করে সে। ক্যাপ্টেন আর তখন একক কোনো ব্যক্তি থাকে না, উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের শক্তি হিসেবে।

উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী পরিবর্তিত আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্বস্ত বয়ানের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য এর নির্মাণশৈলীর অভিনবত্বের কারণেও। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন গদ্যের কারুকার্যময় শিল্পিত উপন্যাস খুব বেশি লেখা হয়নি। ফলে সমসাময়িক পাঠকদের জন্য উপন্যাসটির সঙ্গে বাড়তি গুরুত্ব যুক্ত হতে পারে এর সাহিত্যমূল্যের দিকটি। তাহের চিহ্নিত হতে পারে ‘আউটসাইডার-আর্কিটাইপ’ চরিত্র হিসেবে। আখ্যানভুক্ত সমাজের বাইরের মানুষ সে। তার চরিত্রের এই বহিরাগত পরিস্থিতি মারসোর (আলবেয়ার কামু রচিত আউটসাইডার উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র) মতো স্ব-আরোপকৃত নয়, সমাজকৃত আরোপ। আখ্যানের সঙ্গে নিজের অস্তিত্বের যৌক্তিকতার যে হেতু সে খুঁজে ফেরে, তা কালের অবক্ষয়ে মানবিকবোধ সম্পন্ন প্রতিটি আধুনিক মানুষের পরিণতি বলে চিহ্নিত হতে পারে।

আলোচনাটি প্রথম প্রকাশিত হয় দৈনিক প্রথম আলো ৫ই জানুয়ারি ২০১৮। লিঙ্ক

বইটি পড়ার লিঙ্ক নিচেঃ





If Download link doesn't work then please comment below. Also You can follow us on Twitter, Facebook Page, join our Facebook Reading Group to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature. Also try our Phonetic Bangla typing: Avro.app
বইটি শেয়ার করুন :

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2018. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com