সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় - দুই বিখ্যাত বন্ধুর বিচ্ছেদ কাহিনি

amarboi.com


দুই বিখ্যাত বন্ধুর বিচ্ছেদ কাহিনি
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের চমৎকার বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল অনেক দিন। শেষের দিকে তা একেবারে বিষিয়ে যায়। এই বন্ধুবিচ্ছেদের কথা অনেকে জানে। কিন্তু প্রথম দিকের অনেক ঘটনা, যাতে দেখা যায় দু’জন বড় লেখকের মধ্যে গভীর হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে ওঠার কাহিনি, তা অনুধাবন করলে এই প্রশ্ন জাগবেই, কেন সে সুসম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেল, কেন এমন একটা অত্যন্ত কুরুচিকর কাণ্ড ঘটল? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর সম্ভবত আজও পাওয়া যায়নি। এর কারণ কি শুধু ঈর্ষা? দু’জন সমসাময়িক লেখকের মধ্যে বন্ধুত্ব যেমন হয়, তেমনই ঈর্ষার সম্পর্কও স্থাপিত হতে পারে। সেটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। লেখকরা স্পর্শকাতর প্রাণী। যে কোনও শিল্পীই তাই। প্রায় একই বয়সী অন্য কোনও লেখকের সার্থকতা এবং খ্যাতি বেশি হয়ে যাচ্ছে দেখে আর এক জন লেখকের মন ঈর্ষায় জ্বলে, কিন্তু তিনি সেই জ্বালা মনে মনেই চেপে রাখেন। এমনকী সেই ঈর্ষার জ্বালায় তাঁর সৃষ্টি আরও বিকশিত হতে পারে। কিন্তু প্রকাশ্যে সেই ঈর্ষার নগ্নরূপ দেখানো কি কোনও লেখককে মানায়? আপাতদৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথকে ঈর্ষা করার কোনও কারণই নেই দ্বিজেন্দ্রলালের। তাঁর জীবদ্দশায় রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পাননি। তাঁর সুনাম বাংলার বাইরে ছড়ায়নি। দু’জনেই কবি। দু’জনেই গান সৃষ্টি করেন। রবীন্দ্রনাথও নাটক লেখেন, কিন্তু নাট্যকার হিসাবে দ্বিজেন্দ্রলাল অনেক বেশি জনপ্রিয়। দু’জনেই অভিজাত পরিবারের সন্তান। রবীন্দ্রনাথের দিক থেকে ঈর্ষা বা বিদ্বেষের সামান্যতম উপাদানও খুঁজে পাওয়ার উপায় নেই। সারা জীবনে রবীন্দ্রনাথ কখনও নিন্দুকদের সঙ্গে পাল্লা দিতে যাননি। কোনও আক্রমণেরই তিনি প্রতি আক্রমণ-অস্ত্র শানাননি। তা বলে কি তিনি আঘাত পেতেন না? সামান্যতম আক্রমণেই তিনি আহত হতেন। তিনি লিখেছেন, কটাক্ষ যতই ক্ষুদ্র হউক, তাহারও বিদ্ধ করিবার ক্ষমতা আছে, কিন্তু সেই সব আঘাতের কথা তিনি অতি সন্তর্পণে গোপন রেখেছেন। দ্বিজেন্দ্রলাল যখন থেকে রবীন্দ্র-বিদ্বেষী হয়ে ওঠেন, তখনও একাধিক বার রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রশংসা করেছেন। প্রথম জীবনে ঠাকুরবাড়ির অনেকের সঙ্গেই দ্বিজেন্দ্রলালের বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনি বিলেত থেকে ফিরে আসার পর দ্বিজেন্দ্রলাল (তখন তিনি পরিচিত ছিলেন দ্বিজুবাবু হিসাবে, যেমন রবিবাবু)। কিছু দিন আবগারি বিভাগের পরিদর্শকের কাজ করেছেন। সেই সুবাদে তাঁর একটি বজরা ছিল। রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহের বজরায় গিয়ে অনেক সময় কাটিয়েছেন। এ বজরাটি একেবারে কলকাতার গঙ্গায়। দ্বিজুবাবু প্রায়ই কয়েক জন বন্ধু নিয়ে এই বজরায় সান্ধ্য বিহার করতেন। সেই আড্ডায় প্রায়ই উপস্থিত থাকতেন রবিবাবু। দু’জনেই পর পর গান গাইতেন। রবীন্দ্রনাথ নিজে দ্বিজেন্দ্রনাথের একাধিক গ্রন্থের সমালোচনা করেছেন। তার মধ্যে ‘মন্দ্র’ নামে কাব্য গ্রন্থটির এত প্রশংসা করেছেন, যাকে বলা যায় অতিশয়োক্তির চূড়ান্ত। দ্বিজেন্দ্রনাথের কবিতা তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। দ্বিজেন্দ্রনাথের লেখা পাঠ্যপুস্তক শান্তিনিকেতনে পড়াবার জন্য সুপারিশ করেছেন। এ সবের উত্তরে দ্বিজেন্দ্রলাল শুরু করছেন প্রকাশ্যে বিষোদ্গার। একাধিক প্রবন্ধে দ্বিজেন্দ্রলাল রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রতি যে দুটি অভিযোগ এনেছেন, তা হল দুর্বোধ্যতা এবং অশ্লীলতা। দ্বিজেন্দ্রলালের মতে, রবীন্দ্রনাথের কবিতা অস্পষ্ট এবং অস্বচ্ছ। তাই তার মধ্যে চিন্তার গভীরতা নেই। আর তাঁর কবিতার নীতিহীনতা দিয়ে তিনি কলুষিত করছেন এই সমাজকে। দুই কবির মধ্যে নীতিগত বিরুদ্ধ মত থাকতেই পারে। কিন্তু দ্বিজেন্দ্রলালের সেই প্রতিবাদের ভাষাই যে কুৎসিত। “তাঁহার ‘তুমি যেও না এখনই’ ‘কেন যামিনী না যেতে জাগালে না’ ইত্যাদি গান লম্পট বা অভিসারিকার গান।” সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর মাঝে মাঝে ছোট ভাইয়ের কবিতা আবৃত্তি করেন, সেটা নাকি তিনি ভাইয়ের কবিতা অ্যাডভার্টাইজ করার ভার নিয়েছেন বলে। ঠাকুরবাড়িতে যে নাটকের অভিনয় হয়, সেগুলোও নাকি আত্মবিজ্ঞাপন ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কবিতার দ্বিজেন্দ্র-কৃত যে সমালোচনা তা বাংলা সাহিত্যে একটি শ্রেষ্ঠ হাউলারের মতন। এই কবিতা একেবারে অর্থশূন্য ও স্ববিরোধী তো বটেই, এটা যে কত অবাস্তব তার প্রমাণ “কৃষক আউস ধান কাটিতেছেন বর্ষাকালে, শ্রাবণ মাসে। বর্ষাকালে ধান কেহই কাটে না, বর্ষাকালে ধান্য রোপণ করে। ধান তিন প্রকার, ১) হৈমন্তিক, তাহাই কৃষকের আসল ধান্য কাটে হেমন্তকালে, অগ্রহায়ণ মাসে; ২) আউস (নিজে খাইবার জন্যই প্রায় করে) কাটে শরৎকালে, ভাদ্র মাসে; ৩) বোরো (উড়িষ্যা অঞ্চলেই অধিক হয়) কাটে গ্রীষ্মকালে, বৈশাখ মাসে।... ক্ষেত্রখানি তবে একটি দ্বীপ। তবে এ চর জমি। এ রূপ জমিতে ধান করে না। এ সব জমি শ্রাবণ ভাদ্র মাসে ডুবিয়া থাকে...। এ সমালোচনায় দ্বিজেন্দ্রলালকে একজন কৃষি বিশেষক হিসাবে অবশ্যই গণ্য করা যায়। কাব্য বোদ্ধা হিসাবে বোধহয় ততটা যায় না। মনুষ্য চরিত্রে এ রকম একটি দিক আছে যে, তোমাকে যদি কেউ অনবরত আঘাত করে, বিদ্রুপ ও গঞ্জনা দেয়, তুমি যদি তার প্রতিবাদ না কর, চুপ করে সব সহ্য করে যাও, তা হলে আঘাতকারীর রাগ ক্রমশ বাড়তে থাকে, সে একটা কিছু চরম আঘাত হানতে চায়। দ্বিজেন্দ্রলালের ক্ষেত্রেও তাই হল, তিনি তাঁর প্রাক্তন বন্ধুর বিরুদ্ধে আরও কুৎসিত ইঙ্গিত দিয়ে একটি নাটিকা লিখে ফেললেন এবং স্টার থিয়েটারে সেটি অভিনয়েরও ব্যবস্থা হল। (‘আনন্দ বিদায়’ নামে সেই প্রহসনটি আমি পড়িনি। পড়ে দেখার খুবই ইচ্ছে আছে। তবে এখন খুবই দুর্লভ।) সেটা ১৯১২ সালের নভেম্বর মাস, তখন রবীন্দ্রনাথের তুলনায় দ্বিজেন্দ্রলালের খ্যাতি, অর্থ-উপার্জন কিছুই কম ছিল না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে তখন গড়ে উঠেছিল বেশ বড় একটি অনুরাগীমণ্ডলী। দ্বিজেন্দ্রলালের তেমন ভক্তমণ্ডলী ছিল না। এক একজন লেখককে ঘিরেই এ সব হয়। সব লেখকের ক্ষেত্রে হয় না। দ্বিজেন্দ্রলালের পক্ষেও কিছু মানুষ ছিলেন অবশ্যই, তবে তাঁরা যতটা রবীন্দ্রবিরোধী তার চেয়ে বেশি দ্বিজেন্দ্রভক্ত কি না তাতে সন্দেহ আছে। ‘আনন্দ বিদায়’-এর প্রথম রাত্রির অভিনয় তো বন্ধ করে দিতে হয়ই, নাট্যকারকে স্টার কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার খাতিরে পিছনের দরজা দিয়ে বার করে দিতে বাধ্য হন। সে নাটক আর দ্বিতীয় বার মঞ্চস্থ হয়নি। দ্বিজেন্দ্রলালের এই রুচিহীন কাজের জন্য তাঁর বেশ অপযশ হয়। এমনকী দ্বিজেন্দ্রলালের জীবনীকারও এর জন্য তাঁকে নিন্দে করেছেন। দ্বিজেন্দ্রলালের ছেলে দিলীপকুমার যাঁকে রবীন্দ্রনাথ খুবই স্নেহ করতেন, তিনিও বাবার এই কাজকে সমর্থন করতে পারেননি পরবর্তী কালে। দ্বিজেন্দ্রলাল যিনি এক এক সময় রবীন্দ্রনাথকে বঙ্গের শ্রেষ্ঠ কবি বলে মেনে নিয়েছেন, আবার তাঁরই ওপর বার বার কেন এমন আঘাত হানতে উদ্যত হয়েছেন, তা যেন এক মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার মতন। ‘আনন্দ বিদায়’-এর পর দ্বিজেন্দ্রলাল সম্ভবত অনুতপ্ত হয়েছিলেন। তিনি খুব বিমর্ষ হয়ে থাকতেন। যদিও লিখিত ভাবে কিছু জানাননি। মাত্র এক বছর পরেই এই শক্তিশালী নাট্যকার ও সঙ্গীতস্রষ্টার অকালপ্রয়াণ ঘটে। এখানে একটা অত্যন্ত কৌতূহলজনক ঘটনারও উল্লেখ করা যেতে পারে। দ্বিজেন্দ্রলালের মাথায় নাকি বাজ পড়েছিল একদিন। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন যে, দ্বিজেন্দ্রলাল একদিন রবীন্দ্রনাথের প্রতি একটি চিঠি লেখায় ব্যস্ত ছিলেন, একটু পরেই তাঁর মাথায় বজ্রাঘাত হয়। স্ত্রীলোকেরা তাঁর মাথায় ঘড়া ঘড়া জল ঢালতে থাকেন, তাতে সব কাগজপত্র ভিজে যায়। একটি চিঠিতে শুধু রবীন্দ্রনাথের নামটি পড়া যাচ্ছিল। তাতেই অনুমান করা যায় যে, দ্বিজেন্দ্রলাল সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সব বিবাদ মিটিয়ে আবার পুনর্মিলনের আশাই ব্যক্ত করেছিলেন। এত দিন পর আমরা এই সব ঘটনাকেই ইতিহাসের অন্তর্গত করে দিয়ে দু’জনেরই গুণমুগ্ধ হতে পারি। রবীন্দ্রনাথের এত বড় প্রতিভার পাশেও কী অনবদ্য সব গান সৃষ্টি করে গেছেন দ্বিজেন্দ্রলাল। তাতে তাঁর নিজস্বতা স্পষ্ট। তাঁর ‘সাজাহান’ নাটক তো আজও অভিনীত হয়। আর দু’বছর পর তাঁরও জন্মের দেড়শো বছর পূর্ণ হবে। তখন যেন সেই উপলক্ষটি আমরা সমারোহে উদ্যাপন করতে ভুলে না যাই। যৌবন বয়সে যখন দু’জনের মধ্যে খুবই সৌহার্দ্য ছিল, তখন দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর কোনও পরিচিত ব্যক্তির জন্য চাকরির উমেদারি করে একটি কৌতুকপূর্ণ চিঠি লিখেছিলেন। তখনকার দিনে অনেক এ ধরনের চিঠিই কবিতায় লেখা হত। চিঠিটি এ রকম: শুনছি নাকি মশায়ের কাছে অনেক চাকরি খালি আছে দশ-বিশ টাকা মাত্র মাইনে দু’একটা কি আমরা পাইনে? ইন্দ্রভূষণ সান্যাল নাম আগ্রাকুন্তা গ্রাম ধাম চাপড়া গ্রামের অপর পাড়ে এক্কেবারে নদীর ধারে। নাইবা থাকুক টাকা কৌড়ি চেহারাটা লম্বা চৌড়ি কুলীন ব্রাহ্মণ, মোটা পৈতে ইংরাজিটাও পারেন কৈতে... তথ্যসূত্র: তাপস ভৌমিক সম্পাদিত ‘রবীন্দ্রনাথ ও বিভিন্ন ভারতীয় ব্যক্তিত্ব’ নামে সংকলন গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত স্মৃতিকণা চক্রবর্তী রচিত নিবন্ধ।
Download Bangla books in pdf form mediafire.com and also read it online. Read it from iPad, iPhone. Rabindranath and Dijendralal, bangla ebooks, free download , mediafire , humayun ahmed , zafar iqbal , sunil gangopadhaya , suchitra , bengali ebooks, free bangla books online, ebooks bangla, bangla pdf, bangla books, boi, bangla boi, amarboi.
নতুন বই ইমেইলে পেতে হলে

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

If Download link doesn't work then please comment below. Also You can follow us on Twitter, Facebook Page, join our Facebook Reading Group to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature. Also try our Phonetic Bangla typing: Avro.app
বইটি শেয়ার করুন :

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2018. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com