ঘেটুপুত্র কমলা - রেজানুর রহমান

amarboi.com
ঘেটুপুত্র কমলা - রেজানুর রহমান



মুখে মুখে ঘেটুপুত্র কমলার কথা শুনে একটু শংকিত হয়ে পড়েছিলাম। শংকার কারণ ঘেটুপুত্র একজন কিশোর। ছবিতে বিকারগ্রস্ত এক সমাজপতির ভোগ-লালসার থাবায় বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে সে। হুমায়ূন আহমেদ শিশুদের বড়ই ভালোবাসেন। এই ছবি শিশু-কিশোরদের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে না তো? এ ধরনের কত ভাবনাই না পেয়ে বসল আমার মধ্যে।

হুমায়ূন আহমেদ তখন সুস্থ। মরণব্যাধি কোলন ক্যান্সারের আতংক তখনো দেখা দেয়নি। ঘেটুপুত্র কমলার কাজ নিয়ে দারুণ ব্যস্ত তিনি। আনন্দ আলোর একটি বিশেষ সংখ্যার লেখা নিব বলেই ধানমন্ডিতে তাঁর বাসায় হাজির হয়েছি। যথারীতি বাসার দরোজা খোলাই ছিল। তবুও কলিংবেল টিপলাম। কাজের ছেলেটি বাসার ভেতর থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। সে বোধকরি আমাকে চেনে। মাঝে মাঝে স্যারের কাছে আসি। স্যারের পরিচিত লোক। আচার-আচরণে এই সার্টিফিকেট তার কাছে পাওয়া গেল। ড্রয়িংরুমের সোফায় বসতে যাব হঠাৎ ভেতরের ঘর থেকে হুমায়ূন আহমেদ ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। হাতে টাইপ করা একটা গল্পের পাণ্ডুলিপি। আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, আমি খুব ব্যস্ত। আজ আর তোমাকে সময় দিতে পারব না।

না-না ঠিক আছে। বলেই চলে আসব ভাবছি। হুমায়ূন আহমেদ ডাক দিলেন। তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?

ফিরে তাকিয়ে বললাম- হ্যাঁ।

হুমায়ূন আহমেদ ব্যস্ততা দেখিয়েই সোফার ওপর বসতে বসতে বললেন, বসো, দশমিনিট তোমার জন্য বরাদ্দ। চা খাবে? বলেই আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে বাসার ভেতরে শোনা যায়- এভাবেই চায়ের কথা বললেন।

সুযোগ পেয়ে ঘেটুপুত্র কমলার কথা তুললাম।

স্যার, ঘেটুপুত্র কমলা নিয়ে কিছু শুনতে চাই।

বলো কী শুনতে চাও।

এর কাহিনি, শুটিং, পাত্র-পাত্রী...

হুমায়ূন আহমেদ ব্যস্ত ভঙ্গিতেই বললেন, কাহিনি নিয়ে এই মুহূর্তে তোমাকে কিছু বলব না। তবে শুটিং স্পটের কথা একটু বলি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর থানায় হাওর অঞ্চলে হরিপুর জমিদার বাড়িতে ছবির শুটিং হবে। ভরা বর্ষায় শুটিং। আবার হাওর শুকিয়ে যাওয়ার সময়ও শুটিং হবে। অর্থাৎ কাহিনি শুরু হবে ভরা বর্ষায়। তারপর কাহিনির সাথেই তাল মিলিয়ে বর্ষা থাকবে। আস্তে আস্তে হাওরের পানি শুকিয়ে যাবে। সময়ের সাথে তাল রেখে ছবির শুটিং চলবে। এই পর্যন্ত বলে হুমায়ূন আহমেদ থামলেন। ততক্ষণে আমার জন্য চা এসে গেছে। চা খাওয়ার তাড়া দিয়ে সোফা থেকে উঠে চলে গেলেন ভেতরের ঘরে।

ছবির কাহিনি নিয়ে প্রশ্ন করা হলো না। ইতিমধ্যে নানাজনের নানা কথা শুনে আমার ভেতরের অস্থিরতা ক্রমশই বাড়তে থাকল। তবে একটা চমক দেখলাম চ্যানেল আই-এর ছাদ বারান্দায় ঘেটুপুত্র কমলার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার দিন। আনুষ্ঠানিক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করেছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম। এক কিশোরীকে হাজির করা হলো সবার সামনে। এটাই ঘেটুপুত্র। সাংবাদিক সম্মেলনে সকলে অবাক। এটা তো মেয়ে। সে ঘেটুপুত্র হয় কী করে? হতে পারে ঘেটুকন্যা। পরে বোঝা গেল একজন কিশোর অভিনেতাকে এভাবে সাজানো হয়েছে। সে-ই ছবির মূল অভিনেতা। বোঝার উপায় নেই সে আসলে ছেলে। সাংবাদিক সম্মেলনেই ঘেটুপুত্র ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিল।

এরপর সময়ের প্রবহমান ধারায় হরিপুর জমিদার বাড়িতে ঘেটুপুত্র কমলার শুটিং হয়েছে। মাঝপথে অসুস্থ হয়ে পড়েন হুমায়ূন আহমেদ। চিকিৎসার জন্য বিদেশে চলে যান। পোস্ট প্রডাকশনের কিছু কাজ শেষ করে ছবিটি সেন্সর বোর্ডে জমা দেয়া হয়। বোর্ডের একজন সদস্যের কথায় রীতিমত ভড়কে যাই আমি। তার নামটা প্রকাশ করতে চাই না। কঠিন ভাষায় সমালোচকের দৃষ্টিতে একটা মন্তব্য করলেন তিনি -এটা হুমায়ূন আহমেদের ছবি বলেই আমরা শেষ পর্যন্ত সেন্সর সার্টিফিকেট দিয়েছি। কিন্তু আমরা হুমায়ূন আহমেদের কাছ থেকে এ ধরনের ছবি আশা করিনি। ইমপ্রেসইবা এই ছবি প্রযোজনা করল কেন? তার কথা শুনে টেনশন বাড়লো। হুমায়ূন আহমেদ তখন চিকিৎসার জন্য বিদেশে। চিকিৎসার মাঝখানে দেশে ফিরেছেন। আনন্দ আলোর পক্ষ থেকে একটা সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম ধানমন্ডিতে তার বাসায়। সেদিন অনেক কথা বললেন। ঘেটুপুত্র কমলার প্রসঙ্গ তুলতেই বললেন, ছবি বানানোর সময় আমি ঘোরের ভেতর থাকি। ছবিটা শেষ করার পর আমার আর কোনো আগ্রহ থাকে না। সেরকমই ঘটেছে ঘেটুপুত্র কমলার বেলায়ও। ছবি বানিয়েছি। এবার জাজ করবেন দর্শক। তবে হ্যাঁ, ঘেটুপুত্র কমলা খুবই ভালো ছবি হয়েছে। দর্শকের পছন্দ হবে। ঘেটুপুত্র নিয়ে সেদিন এটুকুই কথা হলো তাঁর সাথে।

কিন্তু উচ্ছ্বাস দেখলাম স্টার সিনেপ্লেক্সে ঘেটুপুত্র কমলার একটি বিশেষ প্রদর্শনীর দিন। হুমায়ূন আহমেদ চিকিৎসার জন্য বিদেশে ফিরে যাবেন আবার। সেকারণে ইমপ্রেস কর্তৃপক্ষ ঘরোয়া পরিবেশে ছবিটির বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করে। কিন্তু মুখে মুখে প্রচার হয়ে যায় সংবাদটি। শুভাকাঙিক্ষদের ভিড়ের কারণে স্টার সিনেপ্লেক্সের ৩টি হলেই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। মমতাময়ী মা, স্ত্রী-পুত্রদের সাথে নিয়ে ঘেটুপুত্র কমলা দেখতে আসেন বাংলা সাহিত্যের সম্রাট হুমায়ূন আহমেদ। ছবি প্রদর্শনীর আগে আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায় তিনি এতটাই প্রাণবন্ত ছিলেন যে, মনেই হচ্ছিল না তার শরীরে মরণব্যাধি ক্যান্সার বাসা বেধেছে। বরং অন্যান্য অনুষ্ঠানের তুলনায় সেদিন তিনি ছিলেন অত্যন্ত হাসিখুশি। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরকে নিয়ে তিনি ছবির কলাকুশলীদের সাথে প্রাণবন্ত সময় কাটান এবং দর্শকসারিতে বসে ঘেটুপুত্র কমলার প্রথম প্রদর্শনী উপভোগ করেন। তখন একে একে দেখা দেয় বিস্ময়ের পালা।

স্টার সিনেপ্লেক্সের ৩টি হলেই ঘেটুপুত্র কমলার বিশেষ প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। ৩টি হলেই তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ছবির শুরুতেই চমক। বিশিষ্ট সিনেমাটোগ্রাফার মাহফুজুর রহমানের ক্যামেরায় বিশাল হাওরের উত্তাল জলরাশি আটকে ফেলল দর্শকের চোখ। শুরুতেই দর্শক নড়েচড়ে বসলেন। তারপর পুরো ছবির সময় জুড়ে শুধুই কেটেছে কখনো শ্বাসরুদ্ধকর কখনোবা অনাবিল আনন্দময় পরিবেশ। সিনেমার পর্দায় এত বাস্তব কাহিনি! কে যেন বলেছিল হুমায়ূন আহমেদের এই ছবি শিশুদের দেখা উচিত নয়। কে ছড়িয়েছিল নানা কথা? চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছিল তারা এসে দেখুক এত মানবিক আবেদনপূর্ণ ছবি আর কী হয়? একটি স্পর্শকাতর বিষয়কে কেন্দ্র করে ছবিটি বানিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ। কাহিনি বর্ণনায় তাঁর পরিমিতিবোধ দর্শকের হৃদয় ছুঁয়েছে বারবার। অবশেষে ছবি শেষ হয়। মিলনায়তনে পিনপতন নীরবতা তখনো। কাঁদছেন অনেকে। কার জন্য? ঘেটুপুত্র কমলার জন্য। একসময় হল জুড়ে মুহুর্মুহু করতালি ভেসে ওঠে। তখনো কাঁদছেন অনেকে। তালি দিচ্ছেন আর চোখ মুছছেন। একফাঁকে হুমায়ূন আহমেদের দিকে তাকালাম। পরিচালক নিজেও কাঁদছেন ঘেটুপুত্র কমলার জন্য!  

উল্লেখ্য ৭ সেপ্টেম্বর ২০১২ ঢাকায় মুক্তিপাবে ছবিটি। স্পন্সর করেছে প্রাণ গ্র“প।

পর্দার ওপাশে

কাহিনি, সংলাপ, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা

হুমায়ূন আহমেদ

নির্বাহী প্রযোজক

ফরিদুর রেজা সাগর

ইবনে হাসান খান

অভিনয়

তারিক আনাম খান, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, মুনমুন আহমেদ, আগুন, প্রাণ রায়, আব্দুল্লাহ রানা, শামীমা নাজনীন, তমালিকা কর্মকার, প্রাপ্তি, মাসুদ আখন্দ, রহমত আলী, এহসানুর রহমান, জুয়েল রানা, রুশো, সালেহ সোহেল, শাহানা রহমান গীতা, পুতুল, প্রান্তি, কুদ্দুস বয়াতী, ইসলাম উদ্দিন বয়াতী ও তাদের দল এবং কমলার চরিত্রে মামুন, জেড এইচ সামির, যুথি, রাজু, পুষ্প, আয়না, রানী, জরিনা বেগম, আব্দুর রাজ্জাক, কামরুল।

চিত্রগ্রহণ

মাহফুজুর রহমান খান

ধারা বর্ণনা

আসাদুজ্জামান নূর

কোরিওগ্রাফি

শাওন

কণ্ঠশিল্পী

ফজলুর রহমান বাবু, শফি মন্ডল, প্রান্তি

গীতিকার

হুমায়ূন আহমেদ (বাজে বংশী), শিতালং শাহ (শুয়া উড়িল), সংগ্রহ (সাবান আইনা, যমুনার জল)

সুরকার

মকসুদ জামিল মিন্টু (বাজে বংশী), রাম কানাই দাস (শুয়া উড়িল), সংগ্রহ (সাবান আইনা, যমুনার জল)

সঙ্গীত পরিচালক

মকসুদ জামিল মিন্টু, এস আই টুটুল (শুয়া উড়িল)

আবহ সঙ্গীত

ইমন সাহা

শিল্প নির্দেশক ও টাইটেল

মাসুম রহমান

প্রধান সহকারী পরিচালক

জুয়েল রানা

সহকারী পরিচালক

মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চন্দন খান

রূপসজ্জা

খলিলুর রহমান

পোশাক সরবরাহ

অঞ্জনস

পোস্ট প্রোডাকশন

মাহফুজুর রহমান খান, জুয়েল রানা

পরিস্ফুটন, মুদ্রণ এবং কালার এনালিস্ট

সিয়াম ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কো. ডল. ব্যাংকক, থাইল্যান্ড

শব্দগ্রহণ ও পুন:শব্দ সংযোজন

ধ্বনিচিত্র লি.

সম্পাদনা

লীলাচিত্র

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

ফারুক আহমেদ, প্রজ্ঞা ঐশ্বরিয়া

নৃত্য প্রশিক্ষক

আব্দুর রহিম রয়

প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান

ইমপ্রেস টেলিফিল্ম

হাসপাতালের বেডে শুয়েও জানতে চাইতেন ‘ঘেটুপুত্র’র খবর কী?

-মেহের আফরোজ শাওন

ছাই রঙের একটা গেঞ্জি গায়ে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে একা হাঁটাহাঁটি করছিল একটি মেয়ে। দূর থেকে মেয়েটিকে দেখে হুমায়ূন আহমেদ অবাক। এত সকালে কে এই মেয়ে? একটু এগিয়ে যেতেই অবাক হলেন। প্রিয়তমা স্ত্রী শাওন ৪৩ দিন বয়সী শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে একা হাঁটাহাঁটি করছেন। অবাক হয়ে স্ত্রীকে প্রশ্ন করলেন তিনি- তুমি এখানে? এত সকালে? এসেছ কীভাবে?

শাওন কান্নাভেজা কষ্টে বর্ণনা করছিলেন সেদিনের সেই গল্প। কথা বলতে পারছিলেন না তিনি। প্রিয়জন হারানোর কষ্ঠ আর আবেগ চেপে রাখতে পারছিলেন না। ঘেটুপুত্র কমলার শুভমুক্তি উপলক্ষে তাঁর অনুভূতি জানতেই ফোন করেছিলাম আমরা। একটু যেন ভাবলেন। তারপর আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। কাঁদলেন কিছুক্ষণ। তারপর স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে বললেন- হুমায়ূন আহমেদ যখন ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ শুরু করেন তখন থেকেই কেন যেন বলতে শুরু করেছিলেন এটাই তার শেষ ছবি। কখনো বলেননি সম্ভবত এটাই তার শেষ ছবি। আমরা ভাবতাম ছবি বানানোর কষ্ট আর ঝক্কি-ঝামেলার জন্যই বোধকরি তিনি এভাবে বলছেন। তাই আমি, জুয়েল রানা, ইব্রাহিম তিনজনে মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম এরপর থেকে হুমায়ূন আহমেদ ছবি বানানোর আগে সবকিছু এমনভাবে গুছিয়ে দেব যাতে তিনি ভবিষ্যতে বলতে না পারেন আমি আর ছবি বানাব না। কিন্তু নিয়তি আমাদের আর সে সুযোগ দেয়নি। হুমায়ূন আহমেদের কথামতোই ঘেটুপুত্র কমলাই হয়েছে তার শেষ ছবি।

আজ অনেক কথা মনে পড়ছে। আগুনের পরশমণি ছাড়া হুমায়ূন আহমেদের বাকি সব ছবি নির্মাণের সাথেই আমি জড়িত ছিলাম। ঘেটুপুত্র কমলার যেদিন প্রথম শুটিং শুরু হয় সেদিন আমার ছোট ছেলের বয়স সম্ভবত ৪৩ দিন ছিল। শুটিং-এ যাবার সময় হুমায়ূন আহমেদের মন খুব খারাপ ছিল। শুধুই বলছিলেন নতুন ছবির শুটিং শুরু হবে অথচ তুমি থাকব না। ব্যাপারটা ভালো লাগছে না। মন খারাপ করেই শুটিং-এ গেলেন। এদিকে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিলাম না। সিদ্ধান্ত নিলাম হোক ৪৩ দিনের শিশু পুত্র, তাকে নিয়েই শুটিং স্পটে চলে যাব। শুটিং-এর প্রথম দিন হুমায়ূন আহমেদের পাশে থাকতেই হবে। খুব ভোরে ঢাকা থেকে গাড়িতে ৪৩ দিনের শিশু পুত্রকে নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে যাত্রা করলাম। শুটিং শুরুর আগেই পৌঁছে গেলাম শুটিং স্পট জমিদার বাড়িতে। তারপর পুরো শুটিং-এর সময় তার পাশেই ছিলাম।

ঘেটুপুত্র কমলার ব্যাপারে হুমায়ূন আহমেদ খুব খুশি ছিলেন। বলতেন- দেখো, ছবিটি দর্শকদের অনেক পছন্দ হবে। নিউইয়র্কে দ্বিতীয়বার যখন তার অপারেশন হয় তখনো বারবার জানতে চাইতেন- ঘেটুপুত্রের খবর কী? ছবিটা কখন মুক্তি পাবে। আমরা যখন তাকে বলতাম- তুমি ছবি নিয়ে এখন ভাববে না তো। আগে সুস্থ হও। তারপর দেখা যাবে... তবুও হঠাৎ ঘেটুপুত্রের কথা জিজ্ঞেস করতেন।

ছবিটি মুক্তি পাচ্ছে। এজন্য খুব ভালো লাগছে। একটাই সান্ত¡না হুমায়ূন আহমেদ তার শেষ ছবিটা হলে বসে পূর্ণাঙ্গ দেখে যেতে পেরেছেন।

দুঃখ একটাই বাধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস স্যার দেখতে পারলেন না

-তারিক আনাম খান

মিডিয়ার নানা শাখায় দীর্ঘ সময় কাজ করছি। সব কাজ তো আর ভালো হয় না। অনেক কাজের জন্য প্রশংসা পেয়েছি আবার অনেক কাজে সমালোচিত হয়েছি। তবে প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের সর্বশেষ চলচ্চিত্র ঘেটুপুত্র কমলাতে কাজ করে বেশ মজা পেয়েছি। অনেক আনন্দ নিয়ে আমরা শুটিং শুরু করতাম। পুরো টিমের মধ্যে এক ধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। ছবিতে আমি জমিদার চরিত্রে অভিনয় করেছি। গল্পের মধ্যে বৈচিত্র্য ছিল। ভোগ-বিলাসী জমিদার। চরিত্রটি নেগেটিভ হলেও অতিমানবীয় কিছু বিষয়ও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে গল্পের মাধ্যমে। হুমায়ূন স্যার আজ নেই। কিন্তু তার কাজ তাকে বছরের পর বছর বাঁচিয়ে রাখবে। এখন খুব মনে পড়ে। ঘেটুপুত্র কমলা ছবির শুটিং চলাকালীন সময়ে স্যার অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্যার তখন কাজের ফাঁকে বলতেন এটাই হয়তো আমার শেষ কাজ। তার কথাই আজ সত্যি। আমি বিশ্বাস করি ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর দর্শক হুমড়ি খেয়ে হলে যাবেন ছবি দেখার জন্য। দুঃখ একটাই এই বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস স্যার দেখে যেতে পারলেন না।

আমি বেশ আশাবাদী ছবিটি নিয়ে

-মাহফুজুর রহমান খান

হুমায়ূন আহমেদের পরিচালনায় পাঁচটি চলচ্চিত্রের সবকয়টির সঙ্গে আমি ছিলাম। শুধু তাই নয়, তাঁর লেখা নন্দিত নরকে ছবিরও ক্যামেরার কাজ আমি করেছি। আসলে তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেকদিনের। একসঙ্গে আড্ডা দিতাম। গল্প করতাম। যার কারণে তার সকল বিষয়ে আমি বুঝে ফেলতাম। বিশেষ করে লোকেশন, লাইট, সেট সবকিছু। ঘেটুপুত্র কমলা তার অনেক পছন্দের ছবি, স্বপ্নের ছবি। গল্পের কারণে দীর্ঘ সময় নিয়ে ছবির শুটিং করতে হয়েছে। বারবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাওর অঞ্চলে লোকেশনে গিয়েছেন স্যার। এমনও হয়েছে একটি ভালো শটের জন্য কয়েকদিন অপেক্ষা করেছেন তিনি। কাজের শেষের দিকে স্যার অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছবির পোস্ট প্রোডাকশনের কাজে আমিও থাইল্যান্ড গিয়েছি। ডাবিং করেছি। এই ছবির মিউজিক হয়েছে অসাধারণ। সবকিছু স্যারের মতো হওয়ার পরই চূড়ান্ত প্রিন্ট বের হয়েছে। ছবিটির পোস্ট প্রডাকশন থেকে শুরু করে সার্বিক ক্ষেত্রে মেহের আফরোজ শাওনের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। কাজের ব্যাপারে সার্বক্ষণিকভাবে প্রযোজক ফরিদুর রেজা সাগর ভাই ও ইবনে হাসান খান আমাদের সহযোগিতা করেছেন। আমি খুবই আশাবাদী ঘেটুপুত্র কমলা ছবি নিয়ে। দর্শক খুব আনন্দ নিয়েই ছবিটি দেখবেন।

সত্যি তো এটাই তার শেষ ছবি

-তমালিকা কর্মকার

হুমায়ূন স্যারের সাথে আমার কাজ করা শুরু ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের মাধ্যমে। তারপর কয়েকটি নাটক-টেলিফিল্মে কাজ করা হয়। মাঝে অনেকদিনের একটা গ্যাপ পড়ে যায়। ঘেটুপুত্র কমলা করার আগে আমি অরুণ চৌধুরীর লীলাবতি নাটকে অভিনয় করছিলাম। একদিন শাওন ফোন করে জানায় লীলাবতি নাটক দেখে হুমায়ূন স্যার তার ছবির জন্য আমাকে নিতে চায়। তারপর ঘেটুপুত্র কমলার গল্প নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলল। শুটিংও শুরু হলো। এ ছবিতে দুটি বিষয় আমাকে খুব করে টেনেছে। একটি হলো হুমায়ূন স্যার আর অন্যটি ছবির গল্পের সাবজেক্ট। অসাধারণ একটি বিষয় নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। যা সত্যিই সাহসের ব্যাপার। আমি দুটি সিক্যুয়েন্সে কাজ করেছি। প্রথম দিন কাজ করতে গিয়ে খুব বকা খেয়েছিলাম। কোন বিষয়ে আমি বকা খেলাম বুঝলাম না। কারণ আমি সেটে ঠিক সময়ে উপস্থিত হই। তারপরও কেন জানি বকা খেলাম। এরপর মন খারাপ নিয়ে শট দিলাম। টেক হলো। পরবর্তীতে জানতে পারলাম অন্য একটি বিষয়ে স্যারের মেজাজ খারাপ থাকার ফলে আমাকে বকেছিলেন। এমনকি তিনি বলেছিলেন, মেয়েটাকে এত বকলাম কিছুই না বলে খুব সুন্দর অভিনয় করল। এরপর আরেকটি সিক্যুয়েন্স করতে গিয়ে মনে আছে সেটের সবাই কেঁদেছিল। তিনি নিজেও মনিটরের সামনে বসে কেঁদেছিলেন। তিনি অন্য মাপের একজন মানুষ ছিলেন। অহমিকা বলতে তার মধ্যে কিছুই ছিল না। সেটে একসাথে সবার সাথে বসে খেতেন। মনে আছে মহরতে তিনি বলেছিলেন এটা আমার শেষ ছবি। এখনো মাঝে মাঝে ভাবি এত কনফিডেন্টলি একজন মানুষ কি করে কথা বলেন। সত্যিই তো তাঁর শেষ ছবি এটা!

আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া

-আগুন

হুমায়ূন আহমেদের মতো বড় মাপের একজন নির্মাতার সাথে কাজ করতে পেরেছি এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় একটা পাওয়া। তার চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে পারাটা সৌভাগ্যের ব্যাপার। সবার ভাগ্যে এটা জোটে না। সব আর্টিস্টেরই একটা স্বপ্ন থাকে, ইচ্ছে থাকে ভালো ফিল্মে অভিনয় করার। ভেতরে ভেতরে আমারও একটা ইচ্ছা ছিল একটা স্বপ্ন ছিল ভালো একটা ফিল্মে অভিনয় করার। অবশেষে হুমায়ূন আহমেদের ‘ঘেটুপুত্র কমলা’য় অভিনয় করতে পেরে আমার স্বপ্নটা পূরণ হয়েছে। হুমায়ূন স্যার এখন নেই। আল্লাহ তাঁকে বেহেস্ত নসিব করুক। এ ছবিতে অভিনয় করতে গিয়ে আমার একটা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। সেটা হলো হুমায়ূন স্যারের ছবিতে আমার অভিনয় করার কথা ছিল না। কোনো কারণে আর্টিস্ট ফেল করেছে। তার লোকজন হুমায়ূন স্যারকে বোঝালেন এই চরিত্রটা আগুনকে দিয়ে করালে ভালো হয়। হুমায়ূন স্যার বললেন, তাহলে আগুনকে খবর দাও। খবরটা পেয়ে তাৎক্ষণিক হাজির হলাম। তিনি আমাকে বললেন, তুমি ছবিতে অভিনয় করবে? আমি বললাম, করব না মানে? একশোবার করব। আপনার ছবিতে অভিনয় করব এটা তো সৌভাগ্যের ব্যাপার। অনেক আগে থেকেই আমার একটা স্বপ্ন ছিল হুমায়ূন আহমেদের ছবিতে অভিনয় করার। শেষমেষ স্বপ্নটা সফল হলো।

সেদিন বুঝিনি কতবড় সুযোগ আমি পেয়েছি

-মামুন

যেদিন হুমায়ূন স্যার মারা গেলেন খবরটা শুনে কান্না থামাতে পারছিলাম না। কয়েকদিনেও আমার কান্না শেষ হয়নি। স্যার মারা যাওয়ার পর পুরো দেশ যেভাবে শোকাভিভূত হয়েছিল তখন বুঝেছি আমি কত বড় একজন মানুষের ছবিতে কাজ করেছি। সবাই আমাকে বলেন, আমি ভাগ্যবান যে তার পরিচালনায় শেষ ছবি ‘ঘেটুপুত্র কমলা’য় কাজ করেছি। কাজ করতে গিয়ে দেখেছি উনি কত ভালো একজন মানুষ। একবার শুটিং করার সময় আমার খুব জ্বর হয়েছিল। তখন স্যার নিজে এসে আমাকে ওষুধ খাওয়ানো থেকে শুরু করে অনেক সেবা করেছিলেন। এখনো মনে পড়ে স্যার আমাকে ছাদে হাঁটানো থেকে শুরু করে অনেক ভালো ভালো শট নিয়েছিলেন। আমি তখন বুঝিনি ঐ ছবির গল্পই যে আমাকে নিয়ে হয়েছিল। এখন সবার কাছ থেকে শুনে খুব ভালো লাগছে। ছবিটি ৭ তারিখে মুক্তি পাওয়ার কথা শুনে ভালো লাগছে। ইচ্ছা আছে আমার বাবাসহ হলে গিয়ে ছবিটি দেখব।

হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিসমূহ দর্শকদের কাছে তুলে ধরতে আমাদের অনেক পরিকল্পনা আছে

-মো: আলী হাসান, ক্যাটাগরি ম্যানেজার, প্রাণ

নন্দিত কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, চলচ্চিত্র পরিচালক হুমায়ূন আহমেদের শেষ ছবি ‘ঘেটুপুত্র কমলা’র সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে প্রাণ গ্রুপ। এ ব্যাপারে প্রাণ-এর ক্যাটাগরি ম্যানেজার আলী হাসান আনন্দ আলো’র মুখোমুখি হন...

আনন্দ আলো: এই চলচ্চিত্রের সাথে আপনাদের সংশ্লিষ্টতা কীভাবে হলো?

আলী হাসান: আমরা এর আগেও বিভিন্ন চলচ্চিত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়েছি। যেমন ‘ডুবসাঁতার’। সেখানে আমরা দর্শকদের কাছ থেকে অনেক সাড়া পেয়েছি। সেই থেকেই আমরা এই সিনেমার সাথে সংশ্লিষ্ট হবার চিন্তা-ভাবনা করেছি। এই সিনেমায় কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বাংলার কিছু লুক্কায়িত ইতিহাস সেলুলয়েডে বন্দি করে দর্শকদের জন্য উপস্থাপন করেছেন। আর হুমায়ূন আহমেদের যেকোনো নাটক-সিনেমার প্রতি দর্শকদের একটা আলাদা আগ্রহ থাকে। দেশের জনপ্রিয় এই লেখকের কাজের প্রতি সম্মান জানাতে আমরা এই চলচ্চিত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়েছি।

আনন্দ আলো: আপনার কোন ব্র্যান্ড এই সিনেমার স্পন্সর করছে?

আলী হাসান: প্রাণ-এর অনেকগুলো ব্র্যান্ড রয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রাণ ঝালমুড়ি একটি নতুন ব্র্যান্ড। এর স্বাদও মজাদার। আমরা আশা করব দর্শকরা প্রাণ ঝালমুড়ির নতুন স্বাদের সাথে ছবিটি উপভোগ করবে। আনন্দ আলো: হুমায়ূন আহমেদের অন্যান্য চলচ্চিত্র সম্পর্কে আপনাদের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে?

আলী হাসান: আসলে হুমায়ূন আহমেদ শুধু একটি নাম নয় একটি ব্র্যান্ড বটে। তার বিভিন্ন কাজের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলার সহজ সরল মানুষের জীবন-যাপনের বিভিন্ন দিকগুলো সহজ সরলভাবে তুলে ধরেছেন। আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে তার বিভিন্ন কাজের সাথে সম্পৃক্ত হতে। জনপ্রিয় এই কথাসাহিত্যিকের কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ দর্শকদের কাছে তুলে ধরতে আমাদের অনেক পরিকল্পনা রয়েছে।

আনন্দ আলো: বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে আপনাদের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কী?

আলী হাসান: পুরো চলচ্চিত্র শিল্প সম্পর্কে মন্তব্য করা আসলে অত্যন্ত দুরূহ একটি বিষয়। কারণ আমরা চলচ্চিত্র বিশ্লেষক নই। তবে আমরা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার রিপোর্টে দেখে থাকি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এখন কঠিন সময় অতিবাহিত করছে। পাশাপাশি অনেক ভালো নির্মাতা আছেন এবং তারা তাদের কর্মে প্রতিভার ছাপ রেখে চলেছেন এবং সেগুলো অনেক প্রশংসিতও হচ্ছে। আমরা আশা করি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র দ্রুত বিকাশ লাভ করবে।

আনন্দ আলো: ঘেটুপুত্র কমলা’র খবর দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আপনারা কী কী করছেন?

আলী হাসান: এই ছবির খবর দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিতে আমরা আমাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, রেডিও স্টেশন এবং সংবাদপত্রে আমরা এই ছবির প্রচারকার্য চালাব। আমরা ছবিটির একটি প্রিমিয়ার শোর আয়োজন করেছি।

Chrome Extension for Amarboi, Add it Now You can follow us on Twitter or join our Facebook fanpage or even follow our Google+ Page to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature.
Download Bangla books in pdf form amarboi.com and also read it online. 'bangla-boi, boimela, humayun ahmed, bangla boi, ebook, bangla-ebook, bangla-pdf, bangla book, bangla pdf, zafar iqbal, boi, bengali books download'
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

If Download link doesn't work then please comment below. Also You can follow us on Twitter, Facebook Page, join our Facebook Reading Group to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature. Also try our Phonetic Bangla typing: Avro.app
বইটি শেয়ার করুন :

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2018. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com