খেলারাম খেলে যা - সৈয়দ শামসুল হক

Khelaram Khele Ja - Syed Shamsul Haq
খেলারাম খেলে যা - সৈয়দ শামসুল হক

প্রায় ৪০ বছর পার হতে চলল 'খেলারাম খেলে যা'র। উপন্যাসটি এখনো পাঠকের আগ্রহ ধরে রেখেছে। এটি একটি বিশেষ ধরনের জনপ্রিয়তা এবং বলতে কী এটিই সত্যিকারের জনপ্রিয়তা। তথাকথিত জনপ্রিয় উপন্যাস (আদতে সেসব তো উপন্যাস পদবাচ্যই নয়) পড়েই ভুলে যান পাঠক। পড়ার কিছুদিন পর লেখকের নামটা হয়তো মনে থাকে, কিন্তু দেখা যায় উপন্যাসের নামটাই ভুলে গেছেন। ওই বই পড়ে তিনি সেই আগের মানুষটিই রয়ে যান।
সত্যিকারের সাহিত্য মানুষকে স্থানচ্যুত করে_সৈয়দ হক নানা সময়ে কথাটি বলেছেন। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ_তাঁর প্রায় সব লেখা পাঠের পর রুচির নতুন নির্মাণ ঘটে। বোধের জগৎ আলোড়িত হয়। জন্ম নেয় নানা জিজ্ঞাসা।
কে কত বড় পুরুষ, এর পরিমাপ তার শিশ্নের মাপেও হয় না, হয় না কত নারীতে সে গমন করছে তার বিচারেও। তাহলে রন জেরেমি বা জন হোমসরা, তথা পৃথিবীর তাবৎ নীল ছবির নায়করা হতেন সর্বকালের সেরা পৌরুষদীপ্ত পুরুষ। জন আপডাইকের একটি গল্পে তাঁর একটি চরিত্র নীল ছবির নায়কদের বিশেষ অর্থে পৌরুষহীন, নপুংসক এবং
ম্যাদামারা পুরুষ বলেই মনে করে। সৈয়দ হক 'খেলারাম খেলে যা'তে বাবরের মাধ্যমে যে যৌন পরিস্থিতির নির্মাণ করেন, তাতে শেষ পর্যন্ত মূলত এক ধরনের অপ্রেম আর বিবমিষারই প্রমাণ মেলে। 'খেলারাম' বলতে আমরা কি রতিদক্ষ পুরুষকে বুঝব, তাকে কি প্লেবয় বলব? উপন্যাসটি নিবিড় পাঠের পর এর নায়ককে কি আর তা মনে হয়?
কারণ তার চেয়ে বড় এক খেলা কালের করাল আঙুলের সুতোর টানে চলতে থাকে। ব্যক্তির লোভ-রিরংসার বিস্তৃত প্রকাশ ঘটে সমাজ ও রাজনীতির হাত ধরে। তারও আগে দেশভাগ হয়। আপন পর হয়। ভারতবর্ষের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে হেরে গিয়ে পালিয়ে আসে আত্দোদরপরায়ণ মানুষ। বাবর তাদেরই প্রতিনিধি। বাবর আমাদের স্বার্থসচেতনতার গভীরে থাকা 'পাশবিক আমি'র প্রতিনিধি, যার অন্য পিঠে আছে মানবিক মানুষ হতে না পারার আর্তি ও দহন, ক্ষয় ও ক্ষরণ।
রাজনীতি, ইতিহাসের মার খাওয়া বাবরের পিঠ। এ পিঠ তার অতীতের পিঠ। তার ব্যর্থতা ও কাপুরুষতার পিঠ। সেই মারের দাগ তৈরি করেছে অমোচনীয় এক কালশিটে দাগ।
দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িকতার গ্লানি, রক্তপাত কেবল সেই সময়টার ভেতরে সেঁধিয়ে যায়নি, সময়ের সীমা ছেড়ে তা বেরিয়ে পড়েছে, জন্ম দিয়েছে দাঙ্গার মতো আরো কাপুরুষোচিত ঘটনার। নিজের বোন হাসনুকে দাঙ্গাকারীদের হাত থেকে বাঁচাতে পারেননি বাবর। সেই স্মৃতি তার পিছু ছাড়ে না। উপন্যাসের শেষে ধর্ষণকারীদের হাত থেকে জাহেদাকে বাঁচাতে চেয়েছে বাবর। সেখানেই তার প্রকৃত পৌরুষের প্রথম ও শেষ পরিচয় পাওয়া যায়।
টেলিভিশনের জনপ্রিয় উপস্থাপক বাবর আলী খান। আমরা তাকে আপাতদৃষ্টিতে লম্পট হিসেবেই দেখি। সে অবিবাহিত কিন্তু বয়স্ক পুরুষ। কিন্তু 'খেলারাম খেলে যা' কি অল্পবয়সী মেয়েদের সঙ্গে বাবরের শরীরিক সম্পর্কের ধারাবাহিক কাহিনী? লতিফা, মিসেস নাফিস, বাবলি, জাহেদার মতো নারীর কাছে বাবর আলী খান কেন যায়? কিসের জন্য যায়? শুধু কামনা নয়, তার পেছনে থাকে আত্দক্ষরণের সেই ইতিকথা, যা গোটা 'খেলারাম খেলা যা' উপন্যাসটিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে গহিন গোপনভাবে। নারী শরীরের উত্তাপে নিজেকে শীতল করে করে বেঁচে থাকার সত্যিকারে দহন সে মিটিয়ে নিতে চায়। কিন্তু কতটা পারে? এ উপন্যাসে মূল স্রোতটিকে এতটা সার্থকভাবে সৈয়দ হক আড়ালে রেখেছেন যে অপরিণত পাঠকের কাছে সেটি ধরা পড়বে না। তাদের কাছে 'খেলারাম খেলে যা' মানে বাবরের যৌন-অভিযান। তাই পাঠক পরিণত কী অপরিণত এ উপন্যাসে পাঠে এর পরীক্ষাটি সম্পন্ন হয়।
অথচ 'খেলারাম খেলে যা' একটি অস্বস্তিকর উপন্যাস। এক তীব্র-তীক্ষ্ন বেদনা এর ভেতরে কিছুক্ষণ পরপর শিস দিয়ে যায়। অপরিণত পাঠকের কান সেই শব্দ শোনার মতো তৈরি নয়। হেনরি মিলারের উপন্যাসের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটে থাকে। ঘটেছিল সেই মার্কুয়েস দ্য সাদের উপন্যাসের ক্ষেত্রেও। যৌনতার ভেতর দিয়ে জীবনের গভীরতর দর্শন ও প্রতিবাদ সাদকে অমর করে দিয়েছে। মিলারের 'ট্রপিক অব ক্যান্সার' বা 'ট্রপিক অব ক্যাপ্রিকর্ন' বা তার 'দ্য রোজি ক্রুসিফিকেশন ট্রিলজি'র 'সেক্সাস', 'প্লেক্সাস' ও 'নেক্সাস'-এ অপরিণত পাঠকের নায়কের যৌন-অভিযানকে বড় করে দেখে; কিন্তু তার প্রত্যাখ্যান ও তীব্র ক্রোধী দৃষ্টির ওপর চোখ রাখতে পারে না। একই ঘটনা ঘটতে পারে ফিলিপ রথের 'পোর্টনয়েস কমপ্লেইন্ট' বা 'দ্য প্রফেসর অব ডিজায়ার'-এ পাঠের সময়। 'খেলারাম খেলে যা'র ক্ষেত্রে প্রায় সেই ঘটনাই ঘটেছে। সৈয়দ হকের এ উপন্যাসটিকে হাসান আজিজুল হক বলেছিলেন 'রাগী উপন্যাস' (কথাসাহিত্যের কথকতা, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪, সাহিত্য প্রকাশ, পৃ. ২৩)। গুন্টার গ্রাসের 'দ্য টিন ড্রাম' উপন্যাসটির নানা অংশ কম যৌন-উদ্দীপক নয়। যৌন-উদ্দীপক তকমা সাঁটানো আছে জেমস জয়েসের 'ইউলিসিসে'র গায়েও। কোথাও কোথাও তার রগরগে পর্যায়ে গেলেও এর শৈল্পিকদীপ্তি ততটাই অটুট থেকেছে। 'ললিটা'তে ভ্লাদিমির নবকভ কি শুধু যৌনতাকে এঁকেছিলেন? যৌনতা বারবার জন আপডাইকের মতো কত লেখকের লেখার অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।
কুন্দেরার প্রায় সব উপন্যাসই কমবেশি যৌনতার মিশেলে নির্মিত।
সেদিক থেকে বাংলা উপন্যাসে যৌন বিষয়গুলো তুলে আনতে লেখকদের সংকোচ কোনোকালেই কাটেনি। অমিয়ভূষণ তো বলেছিলেন, এটা গাইনোকলজির বিষয়, লেখকের কারবার একে ঘিরে হতে পারে না। তাকেও 'বিশ্ব মিত্তিরের পৃথিবী' লিখতে হয়েছে। সমরেশ বসুর 'বিবর' ও 'প্রজাপতি' তো তা নিয়ে বাংলা সাহিত্যকে ঝাঁকিয়ে গেছে।
পরবর্তীকালে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এতে এনেছেন অস্তিত্বের নতুন দীপ্তি ও দ্বিধা। তার পরও বাংলা সহিত্যে যৌন বিষয়-আশয়ের উপস্থিতি স্বস্তিকর হিসেবে কেউ দেখেন না।
সন্দীপন তো বলেই ফেলেছেন, 'খুন পৃথিবীর নির্বোধতম অপরাধ। খুনের অনুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে লেখা হয় ক্রাইম স্টোরি। কেউ বাধা দেয় না। উল্টোদিকে, যৌনতা অপরাধ তো নয়ই, জীবনের অপরিহার্য আনন্দের বিষয়। অথচ শুধু যৌনতা নিয়ে বই লিখলেই মহাভারত পাপবিদ্ধ হয়।' (গদ্যসংগ্রহ ১, মার্চ ২০০৩, প্রতিভাস, পৃ. ২২৪)। এমন অনেক
উপন্যাসের গায়ে এ রকম তকমা লাগানো যেগুলো পরবর্তরর্্ীকালে সাহিত্যে ক্ল্যাসিক হিসেবে টিকে আছে।
'খেলারাম খেলে যা' তো কেবল যৌনতা নিয়ে লেখা উপন্যাস নয়। যৌনতাকে সৈয়দ হক উপন্যাসের 'টুলস' হিসেবে স্রেফ ব্যবহার করেছেন। কারণ যৌনতা সেখানে একটা অনুুষঙ্গ মাত্র, এর মূলে আছে সেই মানব পরিস্থিতি, যেখানে সে ইতিহাস-রাজনীতির কূটকৌশলের হাতে মানুষ প্রচণ্ড পীড়নের শিকার। আলবার্তো মোরাভিয়ার উপন্যাসগুলো কি পরবর্তীকালে কুন্দেরার 'দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিং'-এর মতো উপন্যাসগুলো সেই ধরনের 'দেয়াল লিখনে'র মতোই, যাতে মানুষের তীব্র ক্রোধ যৌনতার মাধ্যমে, স্ল্যাংয়ের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, যাকে আমরা গ্রাফিত্তি বলে থাকি। তবে তা কেবল স্ল্যাং-নির্ভরই নয়, এতে থাকে জীবনের চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য; কেবল যিনি লেখেন তিনি তাঁর নামটা এর তলে যোগ করে দেন না। এ যেন নিজেকে আড়াল করে সত্য বলার একটা পদ্ধতি। তার সে গ্রাফিত্তি পড়ে অনেকেই মনে মনে
বলেন, এ তো দেখি আমরাই নিজের কথা। 'খেলারাম খেলে যা'র একটি অংশে সৈয়দ হক এরই পরিচয় দিয়েছেন এবং সেখান থেকেই 'খেলারাম খেলে যা' নামটি এ উপন্যাসের শিরোনাম হয়ে ওঠে। কারণ তাঁর মনে হয়েছে মানবের এ পরিস্থিতিকে এর চেয়ে জুতসই নামে অভিহিত করা যায় না।
''বাবর কিছুতেই মনে করতে পারল না সেই ভদ্রলোকের নাম, যিনি লন্ডনের বিভিন্ন শৌচাগার আর দেয়ালের ছবি তুলে 'দেয়াল লিখন' নামের একটা অ্যালবাম বের করেছিলেন। তাতে কত রকম মন্তব্য! রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত, দাম্পত্য, যৌন-বিকার সম্পর্কিত কিই-বা বাদ গেছে। ও রকম একাকী জায়গায় মানুষ তার ভেতরের সত্তাটিকে বের করে আনে। গা শির শির করে। হাত নিশপিশ করে। লেখা হয়ে গেলে এমন একটা তৃপ্তি হয় যেন পরম আকাঙ্ক্ষিত কোনো গন্তব্যে পেঁৗছানো গেছে।
বাবর নিজেও তো এ রকম করেছে। দেয়ালে লিখেছে। একবার সেক্রেটারিয়েটের বাথরুমে গিয়ে দেখে 'বাঞ্চোৎ' লেখা। সিগারেট টানছিল বাবর। প্রথমে সিগারেটের ছাই দিয়ে চেষ্টা করল, কিন্তু লেখা গেল না। তখন চাবি দিয়ে সে 'বাঞ্চোৎ'-এর পাশে একটা বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন আঁকল। নিচে লিখল_কে তুমি, না তোমার বাবা? আরেকবার এয়ারপোর্টের বাথরুমের দিকে কে যেন লিখে রেখেছে লাল পেনসিল দিয়ে বড় বড় হরফে_'খেলারাম খেলে যা'।
বাক্যটা আজ পর্যন্ত ভুলতে পারেনি বাবর। যে লিখেছে জগত সে চেনে। যে লিখেছে সে নিজে প্রতারিত। পৃথিবী সম্পর্কে তার একটি মন্তব্য বাথরুমের দেয়ালে সে উৎকীর্ণ করে রেখেছে_খেলারাম খেলে যা।
কতদিন বাবর কানে স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে কথাটা।'' (খেলারাম খেলে যা, অক্টোবর ১৯৭৩, সন্ধানী প্রকাশনী, পৃ. ৭৮-৭৯)যখন মানুষ নিজেকে খুঁজে পায় তখন এটা ঘটতে পারে, আর ঘটতে পারে তার নিঃসঙ্গতা থেকে। আমাদের অনেকেরই জানা, যেকোনো মানমানুষের একাকিত্বের অসহায়ত্বই নাকি তার ঈশ্বর, সাহিত্যও তাই। সাহিত্য মানুষের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ বৃত্তির নাম। গ্রাফিত্তি যাঁরা লেখেন তাঁরা সাহিত্যিক নন। কিন্তু এর সঙ্গে নাগরিক তথাকথিত নিচুতলার
অভদ্র জীবনের নানা মাত্রা উঠে আসে। পাওয়া যায় সমকালের পাঠ, যা অনেক সময় ঢাউস বই পড়েও গড়ে ওঠে না।
গ্রাফিত্তিরই বড় আকারে প্রকাশ হয়ে দেখা দেয় তেমনি প্রতিবাদী উপন্যাসে। জে পি ডনলেভির 'দ্য জিনজার ম্যান' বা হুবার্ট সেলবি জেআরের 'লাস্ট এক্সিট টু ব্রুকলিন'-এর কথাও আমরা স্মরণ করতে পারি। রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত, দাম্পত্য, যৌন-বিকার সম্পর্কিত বিষয়গুলো মিলেমিশে ওই উপন্যাসগুলোকে সমকালে জনপ্রিয় করে তোলে।
বিতর্কিত কম করে না। কিন্তু এগুলো চিরকালের হয়ে ওঠে এর অন্তর্গত বিষাদ, ক্ষয় ও ক্ষরণের দলিল হিসেবে। 'খেলারাম খেলে যা'র ক্ষেত্রেও ঠিক একই বিষয় ঘটেছে। এ উপন্যাস নিয়েও বিতর্ক কম নেই। তবু এখনো নিষিদ্ধ পাঠের মতো দুর্মর আকর্ষণে পূর্ণ এর প্রতিটি পৃষ্ঠা। যৌনতা একে জনপ্রিয় করেছে, কিন্তু এর বিষাদ-ক্রোধ-অস্তিত্বের অসহায়ত্বের বয়ান এঁকে দিয়েছে সময়কে উতরে গিয়ে টিকে থাকার সামর্থ্য।
অনেকেই একমত হবেন, এখনো যৌনতাকে শিল্পের পর্যায়ে নিতে যে দক্ষতা ও সাহস নিয়ে অনেক লেখকের সংশয় দেখা যায়, প্রায় ৪০ বছর আগে সৈয়দ হক তা কেচে দিয়ে গেছেন। কী আধুনিকতায়, কী আবেদনে তাঁর এ লেখা তাঁকে তথাকথিত জনপ্রিয়তার গণ্ডি ছাড়িয়ে সত্যিকারের জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে।

Download
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

If Download link doesn't work then please comment below. Also You can follow us on Twitter, Facebook Page, join our Facebook Reading Group to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature. Also try our Phonetic Bangla typing: Avro.app
বইটি শেয়ার করুন :

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2018. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com