হুমায়ূন আহমেদের প্রভাব - ইমদাদুল হক মিলন

হুমায়ূন আহমেদের প্রভাব - ইমদাদুল হক মিলনএকটি টিভি চ্যানেল নতুন লেখকদের গল্প থেকে ঈদের নাটক তৈরির আয়োজন করেছে। সহযোগিতায় আছে দেশের বড় একটি মাল্টিন্যাশনাল কম্পানি। দুই বছর ধরে চলছে এই আয়োজন। নতুন লেখকরা গল্প লিখে পাঠাবেন, সেই গল্প থেকে বাছাই করে পাঁচটি গল্পের নাট্যরূপ দেওয়া হবে। ঈদে ওই চ্যানেল নাটক পাঁচটি প্রচার করবে।
বেশ কয়েক মাস ধরে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। ফলে সারা দেশ থেকে বহু গল্প আসে। প্রাথমিক বাছাইয়ের পর ত্রিশটি গল্প নির্বাচন করা হয়। সেই ত্রিশটি গল্প থেকে বাছাই করা হয় পাঁচটি গল্প। তিনজন বিচারক কাজটি করেন। সৌভাগ্যক্রমে সেই তিনজনের একজন আমি। ত্রিশটি গল্প পড়ে নিজের মতামত দিই।
দুই বছরে ষাটটি গল্প পড়া হলো। গল্প পড়তে পড়তে আমি বিস্মিত। নানা রকম বিষয় নিয়ে লেখা। প্রেম, ভূত, হাসি, সামাজিক ঘটনা-দুর্ঘটনা, বাস্তব-অতিবাস্তব- বিষয়ের অন্ত নেই। আমার বিস্ময়ের কারণ বেশির ভাগ গল্পই হুমায়ূন আহমেদের ভঙ্গিতে লেখা। তাঁর মতো ভাষা, শব্দ প্রয়োগ, হিউমার, চরিত্রচিত্রণ, সংলাপ এবং গল্প তৈরির কৌশল পর্যন্ত।
কোনো কোনো গল্প পড়ে আমি বিরক্ত হয়েছি। মনে হয়েছে, হুমায়ূন আহমেদের লেখা সামনে রেখে লিখে গেছেন নতুন লেখক বন্ধুটি। তারপর চমকে উঠেছি হুমায়ূন আহমেদের কথা ভেবে। কী ব্যাপক প্রভাব তিনি বিস্তার করেছেন হবু লেখকদের মধ্যে! এ রকম প্রভাব বিস্তারকারী লেখক বাংলা ভাষায় খুব কমই জন্মেছেন।
একসময় রবীন্দ্রনাথের মতো কবিতা লিখতেন তাঁর সময়কার এবং পরবর্তীকালের বাঙালি কবিরা, নজরুলকে অনুসরণ করতেন অনেকে, শরৎচন্দ্রের মতো লেখার চেষ্টা করেছেন কোনো কোনো লেখক, সমরেশ বসু ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো লেখার চেষ্টা করেছেন; আর জীবনানন্দের প্রভাব তো তরুণ কবিদের মধ্যে পড়েছিল ব্যাপকভাবে। বাংলা সাহিত্যের এই বড় লেখক-কবিদের মতো প্রভাব বিস্তারকারী লেখক হুমায়ূন আহমেদ।
হুমায়ূন আহমেদের ভঙ্গিতে টিভি নাটক লেখার চেষ্টা করেছেন অনেক তরুণ নাট্যকার। এখনো সমানে করছেন। সংলাপ, অভিনয়ভঙ্গিমা, চরিত্র- সব ফলো করছেন। হুমায়ূন আহমেদের 'কোথাও কেউ নেই' নাটকের বিখ্যাত অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ আসাদুজ্জামান নূরকে এখনো অনেকে নাটকের চরিত্রের নামে ডাকে 'বাকের ভাই'। এই সরকারের আগের সরকারের আমলে রাস্তায় আন্দোলন করার সময় পুলিশ আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীর ওপর লাঠিচার্জ করলেও নূর ভাইয়ের ওপর কখনো করেনি। তাঁর চেহারা দেখেই বলত- আরে, ইনি তো বাকের ভাই। লাঠি তোলা হাত থেমে যেত।
হুমায়ূন ভাইয়ের দখিন হাওয়ার ফ্ল্যাটে নূর ভাই এই ঘটনা একদিন বলেছিলেন।
সবচেয়ে মজার ঘটনা হলো, হুমায়ূন ভাইয়ের নাটকে নিয়মিত অভিনয় করা দুজন অভিনেতা ব্যক্তিজীবনেও হুমায়ূন ভাইয়ের নাটকের চরিত্রের ভঙ্গিতে কথা বলেন। তাঁদের মৌলিক ভঙ্গিটাই এখন আর নেই। কথা শুনলেই মনে হবে নাটকের চরিত্র দুটো কথা বলছে। তাঁদের হাঁটাচলা, কথা বলা, আচার-আচরণ- সব হয়ে গেছে হুমায়ূন আহমেদের নাটকের চরিত্রের মতো।
কতটা ক্ষমতাবান হলে একজন লেখক এই স্তরে পৌঁছান।
হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী চরিত্র হিমু। এই চরিত্রটি দেশের হাজার হাজার তরুণকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। হিমুর মতো হলুদ পাঞ্জাবি পরে বহু যুবককে আমি ঢাকায় এবং মফস্বল শহরে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। ও রকম হলুদ পাঞ্জাবি, হাঁটাচলা, উদাস নির্বিকার এলোমেলো যুবক এখনো চারপাশে একটু খেয়াল করে তাকালেই দেখা যাবে। কলেজ ইউনিভার্সিটি চায়ের দোকান বইপাড়া আর যুবক-যুবতীদের আড্ডায় জায়গা ভর্তি হিমু।
সিলেটে একবার একটি মেয়ে এলো আমার সঙ্গে দেখা করতে। অনেকক্ষণ সাহিত্য সিনেমা গল্প নাটক নিয়ে কথা বলার পর বলল, 'আমি একজন মহিলা হিমু।'
হিমুর যে মহিলা সংস্করণও আছে সেদিনই আমি প্রথম জানলাম।
হুমায়ূন ভাইয়ের একটি নারী চরিত্র আছে- রূপা। রূপার মতো চরিত্রের সঙ্গেও আমার দেখা হয়েছে। কিন্তু মিসির আলীর মতো কারো সঙ্গে দেখা হয়নি। কারণ মিসির আলী অতি শিক্ষিত যুক্তিবাদী ও তীক্ষ্নবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। এ রকম মানুষ খুঁজে পাওয়া অতি দুরূহ।
মিসির আলীকে খুঁজে পাইনি বা তাঁর মতো কারো সঙ্গে দেখা হয়নি কথাটা সত্য নয়। একজন মিসির আলীর সঙ্গে আমার বত্রিশ বছরের পরিচয় ছিল। বহু আনন্দ-বেদনার দিন, সুখ-দুঃখের দিন আমরা একসঙ্গে কাটিয়েছি। সেই মিসির আলীর ভেতরটা আমি অনুপুঙ্খ দেখার চেষ্টা করেছি, বোঝার চেষ্টা করেছি। বাইরে থেকে হাসি-আনন্দে মেতে থাকা, শিল্প সৃষ্টির কষ্ট-আনন্দে মেতে থাকা মানুষটির নিঃসঙ্গতা দেখেছি, বেদনার দিনগুলো দেখেছি, সংসার এবং সন্তানবাৎসল্য দেখেছি, পরিবারের প্রতি টান ভালোবাসা মমতা দেখেছি, প্রেম দেখেছি, বন্ধুত্ব দেখেছি, তাঁর মেধা-মনন পড়াশোনা আর জীবনের খুঁটিনাটি বহু বিষয়ে উৎসাহ দেখেছি। তাঁর সম্রাটের মতো বেঁচে থাকা দেখেছি, হার্টের অসুখ, ডায়াবেটিস আর শেষ পর্যন্ত ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েও সব ভুলে নিজের মতো জীবন যাপন করতে দেখেছি। সেই মিসির আলীর নাম হুমায়ূন আহমেদ। নিজের আদলে, হয়তো বা নিজের অজান্তেই মিসির আলীর মতো রহস্যময় এবং বাংলা সাহিত্যের বিস্ময়কর চরিত্র মিসির আলীকে তিনি তৈরি করেছিলেন।
এক হুমায়ূন আহমেদের ভেতর বেশ কয়েকজন হুমায়ূন আহমেদ বাস করতেন। একসময় তিনি মিসির আলী, আরেক সময় হিমু। একসময় অতি যুক্তিবাদী কঠোর কঠিন একজন মানুষ, আরেক সময় অতি নির্বিকার নির্লোভ উদাস ভবঘুরে যুবক। একসময় প্রকৃতির রূপে মুগ্ধ, চাঁদপাগল জোছনাপাগল মানুষ, আরেক সময় সম্পূর্ণ মালিন্যমুক্ত দেবতার মতো নির্দোষ চরিত্র শুভ্র।
একজন লেখক কত রকম দৃষ্টিকোণ থেকে জীবন ও জগৎ দেখেছেন, কত রকমভাবে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন প্রকৃতির অপার রহস্য, ভূত ও বিজ্ঞান একাকার করেছেন, ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করছেন তো করছেনই। মোগল আমল নিয়ে পড়ছেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পড়ছেন, ঊনসত্তর নিয়ে পড়ছেন, পঁচাত্তর নিয়ে পড়ছেন, দূর আর নিকট অতীত একাকার করছেন লেখায়।
এ রকম জাদুকরী কলম বাংলা সাহিত্যের কজন লেখকের হাতে ছিল!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

If Download link doesn't work then please comment below. Also You can follow us on Twitter, Facebook Page, join our Facebook Reading Group to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature. Also try our Phonetic Bangla typing: Avro.app
বইটি শেয়ার করুন :

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2018. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com