বাক্‌ স্বাধীনতা - আহমদ শরীফ

amarboi বাক্‌ স্বাধীনতা
আহমদ শরীফ

মানুষ সবকিছু সহ্য করে বা সহ্য করতে রাজি, কেবল নতুন কথা তার দুই চোখের বিষ, তার দুই কানের শূল, তার প্রাণের বৈরী। সে তার চারপাশের চোর, ডাকাত, বদমায়েশ, লম্পট, মিথ্যাবাদী, জালিম প্রভৃতি সবাইকে ক্ষমা করতে সদা সম্মত, কিন্তু কথাওয়ালা ব্যক্তিকে নয়। চোর, জুয়াড়ি, লম্পট ও জালিমকে সে একটু নিন্দা, একটু বিরক্তি, একটু ক্ষোভ প্রকাশ করেই ক্ষমা করতে প্রস্তুত—কিন্তু নাস্তিক বা অবিশ্বাসীকে সে কখনো মাফ করতে জানে না–তার প্রাণান্ত ঘটিয়ে তবে সে স্বস্তি পায়। যে পুরোনো সমাজ ও ধর্মের রীতিনীতি ও আচার-সংস্কারের বিরুদ্ধে বলে, সেই নাস্তিক, সেই অবিশ্বাসী, সেই বেইমান। অথচ এই নতুন কথাওয়ালা তথা নাস্তিক ব্যক্তিটি কারো কোন বৈষয়িক ক্ষতি করে না। কেবল মুখে আস্তিক্য প্রকাশ করে অর্থাৎ পুরোনো রীতিনীতি নীরবে মেনে নেয়ার ভান করেই যে-কোনো চরিত্রহীন দুরাচারী সমাজে সাদরে ঠাই পায়। যদিও এরাই সামাজিক জীবনে যন্ত্রণা সৃষ্টির জন্যে দায়ী। যেমন আমার পাড়ায় চোর থাকলে আমার রাতের স্বস্তি লোপ পায়, লম্পট থাকলে সে আমার দিবারাত্রির উদ্বেগ, জালিম থাকলে সে আমার সর্বক্ষণের ত্রাস, এবং অসাধু বেনে আমার প্রাত্যহিক ক্ষতির কারণ। নিষ্ঠাহীন আস্তিক হচ্ছে মক্কর ও মোনাফেক। তার থেকে নৈতিক, সামাজিক ও বৈষয়িক জীবনে সমূহ ক্ষতি হয়। কিন্তু নাস্তিকেরা সাধারণত বিবেকবান, বুদ্ধিজীবী, যুক্তিবাদী, কল্যাণকামী ও নৈতিক সাহসে ঋদ্ধ। এজন্যে নাস্তিক থেকে নৈতিক বা বৈষয়িক ক্ষতির কোনো আশঙ্কা থাকে না। তবু তাকে লোক প্রমূর্ত উপদ্রব বলেই মনে করে। তাই নাস্তিকের বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ সংগ্রামে সবাই সর্বক্ষণ প্রস্তুত ।
নাস্তিক হওয়া সহজ নয়। এ এক অনন্য শক্তিরই অভিব্যক্তি। কেননা বিশেষ জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা ও মনোবল না থাকলে নাস্তিক হওয়া যায় না। আশৈশব লালিত বিশ্বাস-সংস্কার, আচারআচরণ, রীতিনীতি পরিহার করা সাধারণের পক্ষে সম্ভব নয়, কেবল অসামান্য নৈতিকশক্তিধর যুক্তিবাদী পুরুষের পক্ষেই তা সহজ।
তাই প্রাচীন ও আধুনিক দুনিয়ার প্রায় প্রত্যেক প্রখ্যাত নাস্তিকই সুজন, সুনাগরিক ও মনীষী। মানুষ হিসেবে এদের সামাজিক দায়িত্বজ্ঞান, কর্তব্যবোধ ও কল্যাণবুদ্ধি অপরের চাইতে তীক্ষ ও তীব্র । কিন্তু বাধাপথের যাত্রীদের চোখে এদের এ চেহারা ধরা পড়ে না।
পুরোনো নিয়মনীতির অনুগতরা যাদেরকে নাস্তিক বলে, তারা আসলে Nonconformist বা প্রতিবাদী-দ্রোহী। ওদের রীতিনীতি মানে না বলেই ওদের চোখে এরা নাস্তিক। দ্রোহীরা চিরকালই সনাতনীদের হাতে লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত হয়েছে। মুসা-ঈসা-মুহম্মদ, সক্রেটিসকোপারনিকাস-গ্যালিলিও-ব্রোনো, যোয়ান অব আর্ক, শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়াদী ও প্রভৃতি কত কত মানুষ যুগে যুগে দেশে দেশে ধর্ম, সমাজ, বিদ্যা, জ্ঞান ও চিন্তার ক্ষেত্রে নতুন কথা উচ্চারণ করে নিপীড়িত ও নিহত হয়েছে তার হিসেব নেই।
মনুষ্যসমাজে প্রাচীনে নবীনে দ্বন্দু চিরকালীন। প্রকৃতির জগতে কিন্তু নতুন পুরানে কোনো সংঘর্ষ নেই। গাছ যে বৃদ্ধি পায় সে তো নতুন পাতাকে ঠাই ছেড়ে দিয়ে পুরোনো পাতা ঝরে পড়ে বলেই। মনুষ্যসমাজে প্রাচীনে নবীনে দ্বন্দু সংঘর্ষ বাধে বটে, কিন্তু পরিণামে জয় নতুনেরই হয়। তবু মানুষ চিরকাল ইতিহাসের এই সাক্ষ্য অগ্রাহ্য করেছে। প্রকৃতির এই নির্দেশ না মানার ফল ভালো হয়নি। রক্তে আগুনে পৃথিবী কেবল বারংবার বিপর্যন্ত হয়েছে। প্রাণঘাতী সংঘর্যে মানুষ কেবল অশান্তি ও অমঙ্গলই ছড়িয়েছে। মানুষের ইতিহাস এই বৈনাশিক কোন্দলেরই ইতিকথা। কিন্তু প্রশ্ন জাগে কেন এমন হয়। চলমান জীবনে চলা মানেই সুমুখে এগিয়ে যাওয়া। আর এগুতে গেলেই স্থান ও কালকে পেছনে ছেড়ে যেতে হয়। কাজেই পুরোনোকে বর্জন ও নতুনকে গ্রহণের নামই হচ্ছে প্রগতি। আর কে না জানে যে গতিতেই জীবন, স্থিতিতে মৃত্যু। গতি মানেই স্বাভাবিক অগ্রগতি । পুরাতন হচ্ছে অতীত, আর নতুন মাত্রই ভবিষ্যতের প্রতীক। নতুনের প্রতি আসলে মানুষের কোনো অনীহা নেই। বরং প্রবল আগ্রহ রয়েছে। ব্যবহারিক ও বৈষয়িক জীবনে মানুষ নতুনকে বরণ করবার জন্যে সদা ব্যাকুল। কিন্তু মানসক্ষেত্রে অর্থাৎ ভাব-চিন্তা-অনুভবের ব্যাপারে জীবনে আচরণীয় নিয়ম-নীতি, বিশ্বাস-সংস্কারের যে-তৈরি ইমারত সে রিক্থ হিসেবে পায়, তার থেকে বেরিয়ে অনিশ্চিতের পথে পা বাড়াতে সে নারাজ। এ ব্যাপারে সে নিজে চিন্তা করবার গরজ বোধ করে না। এ বিষয়ে সে পরচিম্ভাজীবী, গুরুবাদী। কুলগুরুর দীক্ষা সে কবজ হিসেবে মনে-মস্তিষ্কে সংলগ্ন করে ভবনদীতে নিশ্চিন্তে পাড়ি জমায় ঐহিক ও পারত্রিক প্রাপ্তির আশায় ও আশ্বাসে। তাই মানুষ সনাতনী এবং নতুনদ্বেষী। তার পুরাতন প্রাতী ও নতুন ভীতির রহস্য এখানেই নিহিত।
এ ক্ষতিটা করেছেন মহাপুরুষেরা। যদিও তারা নিজেরাই পিতৃধৰ্ম ও সমাজদ্রোহী এবং নীতি-সত্যের চিরন্তনতায় আস্থাহীন, এবং নতুনের যুক্তিবাদী বিবেকবান প্রবক্তা ও প্রবর্তক, আর স্বকালের বিশৃঙ্খল ও বিভ্রান্ত মানুষকে পথের দিশা ও আলোর মশাল দিয়ে মানুষের অশেষ কল্যাণ সাধন করেন; তবু লোকস্মৃতিতে অমরত্বের মোহে পড়ে তারা তাদের উদ্ভাবিত মত ও পথের উপযোগের চিরন্তনত্ব দাবি করে বিশ্বমানবের স্থায়ী ক্ষতির পথ ও কোন্দলের কারণ সৃষ্টি করে রেখেছেন। নিজেরা জীবনে মানবকল্যাণে নতুন মত-পথ ও রীতিনীতি তৈরি করে গেছেন পুরাতন সবকিছু অকেজো বলে বর্জন করে, আর মনে কামনা করেছেন নিজেদের বাণী, প্রবর্তিত মতাদর্শ ও নিয়মনীতি চিরকাল সর্বমানবের জীবন-নিয়ামক হিসেবে পুরাতন ও সনাতন হয়ে টিকে থাক। এভাবে চিরন্তনতার বিরোধী চিরন্তনতারই শিকার হন। নশ্বরতার প্রতি বীতরাগ এবং অবিনশ্বরতা ও অমরত্বের প্রতি আকর্ষণ একটি মানবিক দুর্বলতা। এই দুর্বলতার ছিদ্রপথেই সমকালীন মানবপ্রেমিক গণহিতকামী ও প্রজ্ঞাবান পুরুষ নিজের অজ্ঞাতেই অমঙ্গলের নিমিত্ত হয়ে ওঠেন। অমরত্বের আকাজক্ষাতেই এর উৎপত্তি। তারা অনুগত মানুষের মন-বুদ্ধি বন্ধ্যা করে দেন। ভক্ত মানুষেরা পুরুষানুক্রমে পিতৃধনের মতো এই পৈতৃক মতাদর্শ ও রীতিনীতি অনুসরণ করে নিশ্চিত জীবনযাপন করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাই নতুন মহাপুরুষ যখন সমকালের সামাজিক ও নৈতিক সমস্যার সমাধান মানসে নতুন কথা উচ্চারণ করেন, তখন তাকে সত্য ও শান্তি ভঙ্গের অপরাধে লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত হতে হয়। মানব কল্যাণে যুগের যন্ত্রণার নিরসন করতে গিয়ে মানবরক্তে মাটি সিক্ত করতে হয়। তাই পৃথিবীতে আজো নতুন যুগ সৃষ্টি হয় রক্তমানের মাধ্যমেই। অতএব, সমাজবিপ্লবে মানুষের সর্বদুঃখের আকর হচ্ছে এই সনাতনপ্রীতি বা রক্ষণশীলতা—যা মানুষকে গ্রহণ বর্জনের ঝামেলা এড়িয়ে স্থিতিকামী করে রাখে। কিন্তু পিতৃধনই যার সম্পদ, সে সম্পদের ক্ষয় আছে, বৃদ্ধি নেই।
প্রাকৃতিক নিয়মেই যা-কিছু পুরাতন হয়, তাকে জড়তা ও জীর্ণতা গ্রাস করে। বিনাশের বীজ তার মর্মে প্রবিষ্ট । কাজেই নতুনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দিতা করে জড় ও জীর্ণ প্রাচীন বেশিদিন টেকে না। নতুনের অমোঘ প্রতিষ্ঠা ও প্রসার একসময় অনিবার্য হয়ে ওঠে।
একালেও ইতিহাস-জানা বিদ্বান-বুদ্ধিমান লোকও নতুনের প্রতি বিরূপ এবং নতুনের প্রতিরোধে সমভাবেই উৎসাহী। সমাজতত্ত্ববিদরা একে কায়েমী স্বার্থ রক্ষণবাদীর প্রতিক্রিয়াশীলতা বলে অভিহিত করেন। তাদের মতে কোনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবেশে যে-শ্রেণীর লোক বিশেষ সুযোগ সুবিধা ভোগ করে, সে-শ্রেণীর লোক পরিবর্তিত পরিবেশে নিজেদের বিপর্যয়ের আশঙ্কাতেই পুরোনো ব্যবস্থার স্থায়িত্ব কামনা করে এবং নতুনের বিরোধিতা করে ।
এ তত্ত্ব স্বীকার করেও বলতে হয় তাদের মধ্যে এ-যুগের তথ্য-চেতনা থাকা বাঞ্ছনীয়। বৈজ্ঞানিক আবিক্রিয়ার ফলে পৃথিবীব্যাপী এখন যন্ত্রযুগ চলেছে। যন্ত্রের বদৌলত পৃথিবী আর বিশাল ও বিপুল নয়, এর দুরবিসার কোনো স্থিতি নেই। সংহত পৃথিবী এখন বড়জোর একটি বড় শহর মাত্র। ইচ্ছে করলেই অল্প সময়ের মধ্যে ঘুরে আসা যায়, আর যন্ত্ৰযোগে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ আলাপ করা চলে। কাজেই এ-যুগে দেশ দুনিয়ার যেকোনো প্রান্তে প্রচার-উদ্দেশ্যে উচ্চারিত একটি ক্ষীণ ধ্বনিও লুকোবার উপায় নেই। আগেকার দিনেও তা অশ্রুত অবস্থায় লুপ্ত হত না—তবে ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগত। যিশুর রক্ত রক্তবীজ সৃষ্টি করে গেছে। দুনিয়া যিশুপন্থী লোকে পূর্ণ। সক্রেটিস কিংবা শিহাবুদিন সোহরাওয়াদীর । মরতে হয়েছে। কিন্তু তাদের বাণীর ধারক-বাহকের অভাব ঘটেনি বিশ্বে।
বলছিলাম পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তে উচ্চারিত নতুন ভাব, চিন্তা, অনুভূতি বিশ্বময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। চাদ-সূর্যের রশ্মির মতোই তা অপ্রতিরোধ্য, বাতাসের মতোই তার অবাধগতি । এ শুধু কানের ভিতর দিয়ে মর্মে পশে না, প্রশ্বাসের সঙ্গে প্রবেশ করে মর্মমূলে বাসা বাধে—আসন পাতে। পৃথিবীর সর্বত্রই এখন মানুষের মিলন-ময়দান তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রসমূহের রাজধানীগুলো যেন এক-একটি বাজার, এখানে বিশ্বের সবজাতের ও মতের লোকের মিলন হয়। তাছাড়া রেডিও-টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকা, চিত্র ও গ্রন্থাদির মারফত সারা দুনিয়ার ঘরের ও ঘাটের, হাটের ও মাঠের সব খবরই কানে আসে, যার যে- সংবাদে আগ্রহ সে তা-ই গ্রহণ করে। অতএব ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষার নিরাপত্তার নামে রাষ্ট্রের সরকারেরা বৃথাই চিন্তাবিদদের কণ্ঠরোধ করতে সচেষ্ট থাকে। শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সমাজতান্ত্রিক, ঐতিহাসিক, দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ধর্মতত্ত্ববিদ সবাই কথা বলেন বটে, কিন্তু নতুন কথা বলেন কয়জনে? এক দেশে এক যুগে কয়টা কষ্ঠ নতুন চিন্তা, নতুন তথ্য, নতুন মত, নতুন আদর্শ উচ্চারণ করে! যাদের বলবার মতো নিজস্ব কোনো কথা নেই, তারা পুরোনো কথার রোমন্থন করে কথার আবর্জনা বৃদ্ধি করেন মাত্র। কেননা তাতে শেখবার,জানবার, বুঝবার কিছু থাকে না। তাদের কথায় সমাজ-সংসারের কিংবা ধর্ম ও রাষ্ট্রের কোনো সেবা হয় না। ক্ষতি করার সাধ্য তো নেই। যে দু-একজন দুর্লভ প্রতিভা ও মনীষাসম্পন্ন ব্যক্তি মানবকল্যাণে দেশ-কালের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন তত্ত্ব ও তথ্য উৎঘাটন করেন, কিংবা ক্রটি-বিচূতি দেখিয়ে দেন এবং সমস্যার সমাধান ও ক্রটি নিরসন ব্যাপারে তার মত দান করেন বা মত প্রকাশ করতে চান; তাদের প্রতি রক্তচক্ষু তুলে তাকানো কিংবা পীড়নের হস্ত প্রসারিত করা ব্যক্তির মানবিক অধিকারে হস্তক্ষেপের শামিল তো বটেই, তার চেয়েও বেশি। এতে বিশ্বমানবের কল্যাণ ও প্রগতির পথ রুদ্ধ করাও হয়। কারণ আপাত তিক্ত প্রতীয়মান হলেও নতুন চিন্তা বা মতবাদ পরিণামে বিশ্বমানবের কল্যাণই করে। তাদের সমাজ, নীতিবোধ, সংস্কৃতি, সভ্যতা, মানবিক ভাব-চিন্তা-অনুভূতি ও মানবতা এই নতুন চিন্তা ও মতবাদ অবলম্বন করেই বিকশিত হয়!
যুগে-যুগে দেশে-দেশে এমন কত দুর্লভ কণ্ঠ রাজশক্তি স্তব্ধ করে দিয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। এতে মনুষ্যসভ্যতা ও মানবতার বিকাশ মন্থর হয়েছে মাত্র। দ্রুতবিকাশের প্রসাদ থেকে বিশ্বমানব বঞ্চিত হয়েছে কেবল। তবু নিভীক কণ্ঠ রোধ করা যায়নি, প্রাণের বিনিময়ে তারা বিবেক নির্দেশিত বাণী উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করে মানবিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করেছেন। এতে মানবনির্মিত সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবন-চেতনা, মানবিক দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যবুদ্ধি পরিত্রুতি পেয়েছে। তা ছাড়া গড্ডলিকার মতো একভাবে যান্ত্রিক জীবনযাপনের যন্ত্রণা থেকে মানুষ পেয়েছে নিস্কৃতি। একই ধর্মের বিভিন্ন মতবাদী শাখা, কিংবা বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক ধর্ম, দাদাবাদ, অস্তিত্ববাদ অবধি দুনিয়ার অসংখ্য দার্শনিক মত, বিবর্তনবাদাদি বৈজ্ঞানিক মতবাদ, গণতন্ত্র, রাজতন্ত্র, নায়কতন্ত্র প্রভৃতি সমাজতাত্ত্বিক মতবাদ মানুষকে স্ব-স্ব রুচি অনুযায়ী জীবন দর্শন অনুসরণ করে জীবন অনুভব ও উপভোগ করার এবং জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রিত করার অবাধ সুযোগ দেয়। জীবন যে বৈচিত্র্য চায়, মন যে বেবাম সমুদ্রে অবগাহন করে তৃপ্ত হতে চায়—এটা যে জৈবিক তথা প্রাকৃতিক তৃষ্ণা সে-কথাও মনে রাখা দরকার। মতবাদীর পারস্পরিক বা সম্প্রদায়গত দ্বন্দু-কোন্দল তো মানুষের হিংস্র-প্রবৃত্তির ও অসহিষ্ণুতার ফল। কোনো মতবাদই মানুষের অমঙ্গল কাজক্ষায় ঘোষিত হয়নি। প্রতিটি মতাদর্শই কল্যাণবুদ্ধির প্রসূন এবং মানব-মনীষার শ্রেষ্ঠ ফসল। কাজেই কোনো মতবাদই বৈনাশিক বীজ বহন করে না, দ্বেষ-দ্বন্দু শেখায় না। প্রকৃতির জগতে যেমন আমরা বৈচিত্র্যের মধ্যেও ঐক্য প্রত্যক্ষ করি, যত মন তত মত থাকা সত্ত্বেও মানুষের জীবনের লক্ষ্য এক ও অভিন্ন।
কিন্তু সবাই নিভীক হয়ে মনের কথা স্পষ্ট করে উচ্চারণ করতে পারে না। প্রাণের মমতা থাকা, জীবনকে, মাটিকে ও আকাশকে ভালোবাসা নিন্দনীয় নয়। তাই সক্রেটিসের মতো সবাই স্বেচ্ছায় হেমলক পান করতে পারে না কিংবা ক্যাটোর মতো জেনে বুঝে বিষপানে রাজি হয় না। শুনেছি ইমাম গাজ্জালী প্রথমে ধর্মদ্রোহী ছিলেন এবং পরে প্রাণভয়েই আপস করেছিলেন। শেখ সাদী রাজরোষ এড়ানোর জন্যে পালিয়েছিলেন। কত নাম করব! মধ্যযুগের এশিয়াযুরোপে মুসলিম ও খ্রিস্টান সমাজে অসংখ্য গুণী-জ্ঞানী-ধাৰ্মিক স্বমত ব্যক্ত করে নিহত, নির্যাতিত হয়েছেন। আজো কি তার অবসান হয়েছে? কিন্তু তবু তাদের উচ্চারিত বাণী বিলুপ্ত করে রেখেছে। অতএব চিন্তাবিদের মৃত্যু আছে—চিন্তার মৃত্যু নেই। মতবাদীকে হত্যা করা সহজ, কিন্তু মতবাদ নির্মুল করা অসম্ভব। বিশেষ করে এ-যুগে বিশ্বের যে-কোনো প্রান্তে উদ্ভূত নতুন মতবাদ বায়ুবাহনে নিৰ্ভত গৃহকোণেও মানুষের কর্ণকুহরে অবাধে প্রবেশ করবার বৈজ্ঞানিক অধিকার লাভ করেছে যখন, তখন একটি রাষ্ট্র-ক্ষমতা হস্তগত রাখার অপপ্রয়াসে দুর্লভ মনীষার অবদান থেকে দেশের শাসনপাত্রদেরকে বঞ্চিত রাখার চেষ্টা বৃথা। এ-যুগে ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রের অভিভাবকদেরকে নিন্দার কথা, ক্রটির কথা, সত্য কথা এবং নতুন কথা শুনবার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এই জন্য তাদেরকে সহিষ্ণু, বিবেচক ও বিজ্ঞ হতে হবে। নইলে কায়েমী স্বার্থ ও সরকারি ক্ষমতা বারবার বিপন্নই হবে আর দুর্যোগ-দুদিন নেমে আসবে গণমানবের জীবনে এবং এর সবটাই অনভিপ্রেত ও অনর্থক ।
কিন্তু কে কার কথা শোনে! আজো দুনিয়ার প্রায় সব রাষ্ট্রেই তথাকথিত কবি-শিল্পীসাহিত্যিক, লেখক, ভাবুক, তাত্ত্বিক, দার্শনিক অবাঞ্ছিত বক্তব্যের জন্যে ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রের অভিভাবকদের রোষাগ্নিতে পুড়ে মরছে। অথবা মনের কথা মনে চেপে রাখবার চেষ্টায়, বদ্ধ বেদনায়, বিবেকের দংশন-যন্ত্রণায় ছটফট করেছে। এক্ষেত্রে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগ নেই। এখানে কাল স্তব্ধ, তাই কালান্তর নেই।
এভাবে কত না-বলা ভাব, চিন্তা, তত্ত্ব হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাতেও বোধ হয়, সামগ্রিক হিসেবে বিশ্বমানবের কোনো সম্পদ হানি হয় না। হরণে-পূরণে পুষিয়ে যায়। যেমন কোনো কোনো দেশে কমু্যনিজম-বিরুদ্ধ কোনো কথা বলা চলে না, কোনো কোনো দেশে কেবল ধর্মশাস্ত্রানুগ কথাই বৈধ, কোনো কোনো দেশে কেবল পুঁজিবাদের মহিমাই কীর্তন করতে হয়, কোথাও জাতীয়তা, কোথাও আন্তর্জাতিকতা, কোথাও ভাববাদ, কোথাও নাস্তিক্যবাদ, কোথাও অস্তিত্ববাদ, কোথাও মানববাদ উৎসাহ পায়। কাজেই আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে মানুষের মানস-প্রয়োজন মিটে যায়।
কিন্তু বিড়ম্বিত হয় ব্যক্তি-মানুষ। যার বক্তব্য আছে, অথচ নির্যাতন সহ্য করবার সাহস নেই, সে হতভাগ্য অপ্রকাশের যন্ত্রণায় জ্বলে মরে । অসাফল্যের বেদনায় ভোগে, বিবেকের তাড়নায় অস্বস্তিবোধ করে। উপলব্ধ সত্য প্রকাশের যে আনন্দ, তার প্রসাদ থেকে বঞ্চিত হয়ে সে বিঘ্নিত জীবনকে বৃথা ও ব্যৰ্থ বলে মানে। কী অসহ্য বিড়ম্বনা; বোধবুদ্ধির কী অমার্জনীয় অপচয় ।
সব লেখক-ভাবুক-তাত্ত্বিকের স্বোপলব্ধ বক্তব্য থাকে না, তারা ধার-করা পুরোনো বুলির জাবর কাটে মাত্র। যে দু’একজন লোক দেশে নতুন কথা বলতে চায়, তাদেরকে বলার স্বাধীনতা দিলে দেশের ভাষা শিল্পে-সাহিত্যে-দর্শনে সমৃদ্ধ হয় এবং দেশের মানুষও মানবিকবোধে, রুচি ও সংস্কৃতিতে উন্নত হয়। নতুন ভাবচিন্তা-অনুভবের উদ্ভব ও লালন ব্যতীত মনুষ্যত্ব ও মনুষ্যসভ্যতা বৃদ্ধি পায় না। আর এভাবে মনের ভুবন প্রসারিত না হলে ব্যক্তিক ও সামাজিক জীবনে সুষ্ঠ স্বাচ্ছন্দ্য ও আনন্দ থাকে অনায়ত্ত, অনাস্বাদিত। কেননা জীবনে উপভোগ তো দৈহিক নয়— মানসিক ।

Comments/Join our Facebook Group
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

If Download link doesn't work then please comment below. Also You can follow us on Twitter, Facebook Page, join our Facebook Reading Group to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature. Also try our Phonetic Bangla typing: Avro.app
বইটি শেয়ার করুন :

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2018. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com