অশ্বচরিত - অমর মিত্র

amarboi
অশ্বচরিত - অমর মিত্র

অমর মিত্র ১৯৯৯ সালে লেখেন ‘অশ্বচরিত’। ২০০১ সালে এই উপন্যাসটি বঙ্কিম পুরস্কার লাভ করে।

উপন্যাসের শুরুটা এরকম...

ভানুচরণ মানুষটি বড়ো অদ্ভুত। আসতে আসতে কী মনে হল ভেড়িবাঁধ থেকে নেমে ঝাউবনের দিকে চলে গেল, যেন ঝাউবনে তার কন্থক রয়েছে। ছিল পক্ষীরাজ, হয়ে গেল কন্থক। ছিল ভানুচরণ, ভানু দাস হয়ে গেল ছন্দক। ঘোড়া হারিয়ে আরও উদাস হয়ে গেছে। না হলে ঘোড়াটাকে খুঁজতে বেরিয়ে আপন মনে অন্য দিকে চলে যায়! বলে কিনা, ‘ওই দিকে যাই, আপনি বাবু দেখে আসুন লায়কানখাস।’ সেই থেকে শ্রীপতি একা। একেবারে একা।
ভেড়িবাঁধের বাঁদিকে ঝাউবন। ঝাউবনের ওপারে সিংহসমুদ্র। হাজার সিংহ একসঙ্গে গজরাচ্ছে। সিংহর কথা বলেছিল কে? ফরাসি সায়েব ফ্রেদরিক। লায়ন লায়ন! শ্রীপতিরও তাই মনে হয়। সিংহই বটে। তবে গর্জন যখন থাকে না, শুধু ঢেউ ভাঙে অন্ধকারে, পাড়ের কাছে সফেন সমুদ্র বার বার মাথা কোটে, তখন মনে হয় সিংহ নয়, ও তার কেশর ফোলানো সাদা পক্ষীরাজ। পালাতে গিয়ে সাগরে গিয়ে পড়েছে। বার বার মাথা তুলছে নোনা জলের বিপুলতা থেকে। ঘোড়াটা কাঁদছে।
হ্যাঁ, এই স্বপ্ন দেখেছে শ্রীপতি ক–দিন আগে। ইদানীং কতরকম স্বপ্ন যে দ্যাখে হারানো ঘোড়া নিয়ে! ভারতীকে নিয়ে। তার বউ মধুমিতা আর ভারতীকে নিয়ে। আবার ওই পক্ষীরাজকে নিয়ে। সব দুঃস্বপ্ন। দেখতে দেখতে গলা শুকিয়ে আসে। মনে হয় নোনাজলে ডুবে যাচ্ছে সে। নোনাজলের নীলে শুধু তার পক্ষীরাজের কেশর দেখা যাচ্ছে। সমুদ্র কাঁদছে সারারাত।
শ্রীপতি ঘাড় ঘুরোয়। রাতভর যে সমুদ্রের কান্না শোনা যায়, সেই সমুদ্র আর এই নীল জলধি এক নয়। মাটিতে আছড়ে মাটি যেন খেয়ে ফেলতে চাইছে বঙ্গোপসাগর। ভেড়িবাঁধের দক্ষিণ দিকে অনেক নীচুতে ধানি জমি, মাঠ। মাঠ আর মাঠ, তারপর এগিয়ে গাছগাছালির ছায়া। নুনমারাদের গ্রাম। নুনের খালারিগুলোকে পিছনে ফেলে এসেছে শ্রীপতি। এখন বিকেল, রোদ পড়ে গেছে। আর একটা দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। শ্রীপতি দেখছে তাকে ঘিরে ছায়া নামার আয়োজন।
ভানু কোথায় গেল কে জানে? ঘোড়া খুঁজেই বেড়াচ্ছে। খুঁজছে কিন্তু পাচ্ছে না। তবু যাচ্ছে। ঘোড়াটা যেন ভানুর। ভানুই যেন ওই ঘোড়ার মালিক, এমনই তার উদ্বেগ। মনে পড়ে শ্রীপতির, লোকটা যেদিন কাজ নিল তার হোটেলে, মানে তার পোষ্য হল, তার আশ্রিত হল, ঘোড়া দেখে বলল, ঘোড়ার কাজ কত কাল ধরে করে, ঘোড়া চেনে সে নিজেকে চেনার মতো করে, ‘শুনুন বাবু, আমি যদি হই ছন্দক, ও হল কানহা, কন্থক।’
তারা কারা? শ্রীপতি অবাক হয়েছিল।
‘মনে নেই বাবু, কে রাজপুত্রকে পৌঁছে দিল তপোবন ধারে? রাজপুত্র সাধু হয়ে গেল, রাজপুত্র হল ভগবান বুদ্ধ, তার ঘোড়া আর সারথি মাথা হেঁট করে ফিরল, সেই ঘোড়া হল আপনার ঘোড়া।’
হলে ক্ষতি কী শ্রীপতির? তবে কিনা পক্ষীরাজটি বোঝা যায়, কন্থক নাম শুনে সবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। এ কেমন নাম? আর ভানু দাস যে কখন কী বলে, সংস্কৃত ভাষা বলে, ভূগোল বলে, ইতিহাস বলে, বলে কপিলাবস্তুর রাজপুত্রের কথা! তার কতটা সত্যি, কতটা মিথ্যে, কতটা বানানো তা কে ধরবে?
গায়ের ঘাম শুকোনোর মুখে। দক্ষিণের নোনা বাতাস হুড়মুড় করে আছড়ে পড়ছে শ্রীপতির গায়ে। আজ জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা। জ্যৈষ্ঠ মাসটিও শেষ হতে গেল প্রায়। আকাশে মেঘ আসছে আর যাচ্ছে। রোদের তাত কমছে না। জ্যোৎস্নাও যেন গরম হয়ে উঠেছে, প্রকৃতি এমনই। এখন মেঘের ভিতরে চাঁদ এবং সমুদ্র একসঙ্গে জেগে উঠেছে উন্মাদের মতো। হাওয়ায় হাওয়ায় যেন টাল খাচ্ছে চাঁদও। ঠিক একটি মাস ভানুচরণের কন্থক—শ্রীপতির ঘোড়া পক্ষীরাজ নিরুদ্দেশ। এ বড়ো আশ্চর্য ঘটনা। তার হোটেল থেকে বোশেখি পূর্ণিমার রাতেই পালিয়ে গেছে ঘোড়াটা। সেই ঘোড়া খুঁজতে সে দুপুর দুপুর বেরিয়েছিল লায়কানখাসের দিকে। সেখানে নাকি একটা ঘোড়াকে চরতে দেখা গেছে গত পরশু। দেখেছিল অনন্ত সার। সে ওই লায়কানখাসে নুনের খালারি করেছে। সেখানে তার বউ মেয়ে সারাদিন খাটে। অনন্ত লবণ নিয়ে আসে দীঘায়। এখানে পাইকার থাকে, কিনে নেয়। দরকারে সেও কাগজ পেতে বসে পড়ে। মোটা দানা লালচে নুন বেড়াতে আসা টুরিস্টদের জন্য নয়। আশপাশের গাঁয়ের গরিব লোক এসে কিনে নিয়ে যায়।
অনন্ত সার দেখেছিল লায়কানখাসে একটি ঘোড়া চরছে। দেখেইছিল শুধু, এর বেশি কিছু নয়। ঘোড়ায় তার কোনো কৌতূহল নেই। ঘোড়া থাকে তাদের যারা ঘোড়ায় চাপতে পারে। বড়ো মানুষের বাহন ওটি। কিন্তু তাকে যখন জিজ্ঞেস করছিল ঘোড়ার রক্ষক ভানু, সে অবাক। ঘোড়া তো দেখেছে লায়কানখাসে।
‘দেখেছ, সত্যি দেখেছ, বাবুর অশ্ব, আমার কানহা?’ ভানু প্রায় উদবাহু হয়ে ছুটে এসেছিল শ্রীপতির কাছে, পাওয়া গেল, ঘোড়া আছে।
গেল পাওয়া? শ্রীপতি তখন হোটেলের ঠাকুরের কাছে খোঁজ নিচ্ছিল তার বউ মধুমিতা এসে কোনো খোঁজ নিয়ে গেছে কিনা ঠাকুরের কাছে। নার্স ভারতী চৌধুরি নিয়ে কতটা, কীরকম খোঁজখবর করেছে, আর কী জবাব দিয়েছে ঠাকুর। ভানুর কথা শুনে সে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেছিল তাতে উত্তেজনায় দপ দপ করছে ভানুর সর্ব অঙ্গ।
‘আজ্ঞে লায়কানখাসে নাকি একটা ঘোড়া...।’ ভানু কথা শেষ করেনি।
‘কোন ঘোড়া, আমার পক্ষীরাজ?’
‘আজ্ঞে ঘোড়া একটা, কন্থক হতে পারে, নাও হতে পারে।’
‘ফের কন্থক, ওটি আমার পক্ষীরাজ।’
‘আপনার নাম আপনার থাকুক, আসলে তো অন্য ব্যাপার, শুনুন বাবু, খবরটা দিল নুনমারা অনন্ত, একটা ঘোড়া চরতে দেখেছে সে লায়কানখাসে।’
‘ডাক অনন্তকে।’
‘আজ্ঞে, সে আর কোথায়, বলে চলে গেছে, ঘোড়াটা নিয়ে আসুন আপনি।’
‘তুমি যাবে না ছন্দকমশায়?’
‘আমি! আমি তো অন্য দিকে যাব, সব দিকে তো খোঁজ করতে হবে।’
‘যদি লায়কানখাসে মেলে তো অন্য দিকে যাবে কেন?’
‘তা ঠিক।’ ভানু মাথা চুলকেছে, ‘যদি না হয় বাবু, সে তো কতদিন রয়েছে আমার সঙ্গে, পালিয়ে এত কাছে কি থাকবে?’
‘তাহলে আমি যাব না?’
‘তা কেন, খবর যখন মিলেছে, যেতে আপনাকে হবেই।’
খবর দিয়ে ভানু চলে গিয়েছিল। ঠাকুর আটকে ছিল শ্রীপতিকে, ‘বিশ্রাম নিয়ে যান বাবু, ঘোড়া যদি থাকে, ঠিক পাবেন, ভালো ঘাস পেলে ওরা নড়ে না, কিন্তু লায়কানখাসে কি ভালো ঘাস হয়, ও তো বালি জমি, ওখানে ঘোড়া যাবে কেন?’
‘তাহলে যাব না?’ শ্রীপতি দ্বিধায় পড়েছিল।
‘না আজ্ঞে, যেতে তো হবেই। খবর যখন এয়েচে, ঘোড়া বলে কথা, ঘোড়া হারালে মানুষের যে কী হয়, তা যার হয় সে জানে।’
একটু বাদে বেরিয়েছিল শ্রীপতি। বেরিয়ে পুরোনো কাফেটেরিয়ার কাছে ভানুর সঙ্গে দেখা। ছুটে এসেছিল সে, ‘বাবু আমি কি যাব, যাই কিছুটা, আপনাকে এগিয়ে দিই, হ্যাঁ, অনন্ত সার বলল একখান অশ্ব দেখেছিল লায়কানখাসের বালির ওধারে যে চরজমি ঘাসের, সেখানে, ঘাস খাচ্ছে, আমার অবশ্য কেমন লাগল শুনে।’
‘কী রং সে ঘোড়ার?’
ভানু থমকায়, তারপর বলেছে, ‘আজ্ঞে ওই কথাই তো আমি জিজ্ঞেস করলাম অনন্ত সারকে, ঠিক আপনি যেমন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এক্কেবারে এক কথা।’
.....
এভাবেই এগিয়ে চলেছে অমর মিত্রের উপন্যাস অশ্বচরিত
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

If Download link doesn't work then please comment below. Also You can follow us on Twitter, Facebook Page, join our Facebook Reading Group to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature. Also try our Phonetic Bangla typing: Avro.app
বইটি শেয়ার করুন :

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2018. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com