Pages

অনন্ত অম্বরে - হুমায়ূন আহমেদ

অনন্ত অম্বরে - হুমায়ূন আহমেদ
অনন্ত অম্বরে
হুমায়ূন আহমেদ
অনন্ত অম্বরে - হুমায়ূন আহমেদ
অয়ােময়ের জন্যে গান লিখতে গিয়ে লিখেছিলাম, “আমার মরণ চাঁদনি পহর রাইতে যেন হয়।” আজ মনে হচ্ছে ভুল গান লেখা হয়েছে, ভুল প্রার্থনা। চাঁদনি পহর রাতে আমি মরতে পারব না। নতুন গান লিখতে হবে। প্রার্থনা জানাতে হবে যেন ভরা জ্যোত্সায় সেই বিশেষ পাল্কি আমার দুয়ারে এসে না থামে।
একবার নর্থ ডাকোটা থেকে গাড়িতে করে সিয়াটল যাচ্ছি, পথে মন্টানায় রাত্রিযাপনের জন্য থামলাম। চারদিকে পাহাড়ঘেরা সমতলভূমি। বাচ্চাদের হােটেলে শুইয়ে বাইরে এসে দাঁড়াতেই প্রচণ্ড ধাক্কা খেলাম। রূপার থালার মত প্রকাণ্ড চাঁদ উঠেছে। অপূর্ব জ্যোৎস্না। জ্যোৎস্না ভেঙে আলাে-আঁধারের অপূর্ব নকশা তৈরি হয়েছে পাহাড়ের গায়ে। আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। মহান সৌন্দর্যের মুখােমুখি হলে এক ধরনের তীব্র হাহাকার মনের ভেতরে আপনা আপনি জন্মায় - সুন্দরের উৎস সন্ধানে ব্যাকুলতা জাগে।
সৌন্দর্য দেখে দেখে জীবন কাটিয়ে দিলাম, এই সুন্দরের জন্ম কোথায়, কোন দিন তার খোঁজ করলাম না। এই জীবনে সম্ভব হল না -- হায়! অন্য কোন জীবনও তাে নেই, থাকলে চেষ্টা করা যেত। | ছােটবেলায় আমাদের মীরাবাজারের বাসায় একজন হিন্দু ব্রাহ্মণ বেড়াতে আসতেন। আমার বাবা-মা দুঞ্জনই ছিলেন তাঁর ভক্ত। এই চিরকুমার মানুষটি না-কি মহাপুরুষ পর্যায়ের। ঘুরে বেড়াতেন খালি পায়ে, অতি তুচ্ছ বিষয়ে হা-হা করে হাসতেন। তখন আমার ধারণা হল – মহাপুরুষদের খালি পায়ে থাকতে হয়, অকারণে হাসতে হয়। এক সন্ধ্যার কথা তিনি বেড়াতে এসেছেন। মা বললেন, আপনি খুব ভালাে দিনে এসেছেন, আমার কাজলের জন্যে একটু প্রার্থনা করুন। আজ কাজলের জন্মদিন।
তিনি আমাকে টেনে কোলে তুলে বললেন – গা দিয়ে ঘামের গন্ধ বেরুচ্ছে, কি রে ব্যাটা, গায়ে ঘামের গন্ধ কেন? এই বলেই চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করলেন, পরম করুণাময়, এই ছেলের অন্তর থেকে কার দূর কর।
তাঁর প্রার্থনা ঈশ্বর গ্রহণ করেন নি। আমার অন্তরে এমন সব অন্ধকার আছে। যা দেখে আমি নিজেও মাঝে মাঝে ভয়ে চমকে উঠি। কাউকে সেই অন্ধকার দেখতে দেই না। আলােকিত অংশটাই দেখতে দেই, কারণ এই আঁধার আমার আপন আঁধার। আমার নিজস্ব অনন্ত অম্বর।

হুমায়ূন আহমেদ
১৩ই নভেম্বর ১৯৯১