মুহম্মদ জাফর ইকবালের ছোটগল্প 'চোখ'

চোখ মুহম্মদ জাফর ইকবাল

চোখ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
সোবহান মিয়া গোলাঘরের পাশে দাঁড়িয়ে এদিকে সেদিকে তাকালেন। আশপাশে কেউ নেই, শুধু আলাউদ্দিন কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সোবহান মিয়া নিচু গলায় বললেন, আলাউদ্দিন ঝাপিটা খোল।
আলাউদ্দিন ঝাঁপিটা খুলে সরে দাঁড়াল, সোবহান মিয়া ঢুকতে গিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী অবস্থা?
উনিশ বিশ হয় নাই চাচাজান। ঐ রকমই আছে।
ও।
ভেতরে দিনের বেলাতেই আবছা অন্ধকার। সোবহান মিয়া ভেতরে ঢুকতেই একটা সূক্ষ্ম পচা গন্ধ পেলেন। ভেতরে কোথায় জানি একটা ইঁদুর মরে আছে। আলাউদ্দিনকে বলতে হবে মরা ইঁদুরটাকে খুঁজে বের করতে।
ভেতরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেই অন্ধকারে চোখ সয়ে গেল। গোলার নিচে মশারি টানিয়ে বিছানা করা হয়েছে। সামনে কয়টা চাটাই আর ঝাঁপ রাখা হয়েছে হঠাৎ করে কেউ ঢুকে গেলে যেন কিছু বুঝতে না পারে। সোবহান মিয়া চাটাইটা সরাতেই বিছানা থেকে ছেলেটা বলল, কে?
গলার স্বর পরিষ্কার, পায়ে এত বড় জখম নিয়ে শুয়ে আছে বোঝার কোন উপায় নাই। সোবহান মিয়া নিচু গলায় বললেন, আমি।
ও। আসেন।
সোবহান মিয়া নিচু হয়ে মশারিটা তুলতেই নাকে পচা গন্ধটা ধক করে ধাক্কা দিল। ইঁদুর না, ছেলেটার পা—পচন ধরেছে।
কেমন আছ বাবা?
ভাল নাই।
সোবহান মিয়া গায়ে হাত দিলেন। জ্বরে শরীরটা পুড়ে যাচ্ছে। তিনি একটা নিশ্বাস ফেললেন। এত বড় একটা জখম নিয়ে ছেলেটা বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে, খোদার দরবারে কি এর বিচার নাই?
ছেলেটা ঘোলাটে চোখে সোবহান মিয়ার দিকে তাকাল, কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, এখনো আসে নাই কেউ?
না বাবা।
এত দেরি করছে কেন?
মিলিটারি ক্যাম্প করেছে থানায়। গ্রামের দশজনের মাঝে এখন আটজন রাজাকার। এর মাঝে তো আসা খুব মুশকিল।
ছেলেটা কোন কথা বলল না, ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে রইল।
সোবহান মিয়া নরম গলায় বললেন, এসে যাবে বাবা। চিন্তা করো না।
ছেলেটা এবারেও কোন কথা বলল না। চোখ দুটি বন্ধ করে ফেলল।
সোবহান মিয়া আস্তে আস্তে বললেন, পায়ের ব্যথাটা কেমন?
ব‍্যথা নাই।
নাই? সোবহান মিয়া অবাক হয়ে বললেন, ব্যথা নাই?
না। পা’টা কেমন জানি অসাড় হয়ে গেছে।
একটু দেখি—বলে সোবহান মিয়া কাঁথাটা তুলে পায়ের দিকে তাকিয়ে অনেক কষ্টে চেহারা স্বাভাবিক রাখলেন। ছেলেটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সোবহান মিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল, জিজ্ঞেস করল, কী রকম অবস্থা?
সোবহান মিয়া ঢোক গিলে বললেন, আগের মতোই আছে।
ছেলেটার ঠোঁটের কোণে হঠাৎ কেমন যেন একটু হাসির মতো ভাঁজ হয়ে গেল। বলল, না, আগের মতো নাই। গ্যাংগ্রিন হয়ে গেছে।
গ্যাংগ্রিন?
হ্যাঁ। পা কেটে ফেলতে হবে।
সোবহান মিয়া কোন কথা বললেন না।
ছেলেটা আবার চোখ বন্ধ করে ফেলল, সোবহান মিয়া চুপচাপ কাছে বসে রইল। কার না জানি বুকের ধন গুলি খেয়ে মাচার নিচে শুয়ে আছে। চিকিৎসা নাই, সেবা শুশ্রূষা নাই, কথা বলার একটা মানুষ নাই। খোদা কি সত্যিই পাষাণ হয়ে গেছে?
ছেলেটা আবার চোখ খুলল, সোবহান মিয়া বললেন, তোমার কী কিছু লাগবে বাবা?
না।
কিছু না?
ছেলেটা একটু ইতস্তত করে, সোবহান মিয়া বললেন, বল—
অন্ধকারটা খুব খারাপ লাগে।
কী করব বাবা, জানাজানি হলে তোমারও বিপদ আমারও বিপদ। একটু কষ্ট করো—
তা ঠিক।
তুমি বিশ্রাম করো। তোমার দলের ছেলেরা আসলেই তোমার খবর দিব।
ঠিক আছে।
সোবহান মিয়া মশারিটা গুঁজে দিয়ে বের হয়ে এলেন। খোলা ঝাঁপটার কাছে আলাউদ্দিন দাঁড়িয়ে ছিল, গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী অবস্থা চাচাজান?
ভাল না। পচন ধরেছে।
সোবহান আল্লাহ—
চিকিৎসা না হলে বাঁচানো যাবে না। একটা খবর কি দেয়া যায়?
আলাউদ্দিন কোন কথা না বলে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। সোবহান মিয়া একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, ইয়া মাবুদ। ইয়া পরওয়ারদিগার—
ফারুক চুপচাপ শুয়ে আছে। একটা চাটাই ভাঁজ করে তার ওপরে কয়েকটা কাঁথা বিছিয়ে তার বিছানা করা হয়েছে। গুলি খাওয়া পাটা রেখেছে তুষ বোঝাই একটা বস্তার উপরে। প্রথম কয়দিন অসহ্য যন্ত্রণা ছিল পায়ে, তারপর হঠাৎ করে যন্ত্রণা কমে গেছে। যেখানে একসময় প্রচণ্ড যন্ত্রণা ছিল সেখানে এখন এক ধরনের ভোঁতা অনুভূতি। পা-টা আছে কি নেই বোঝা যায় না। মাঝে মাঝে মনে হয় এই অসাড় অনুভূতি থেকে বুঝি যন্ত্রণার অনুভূতিটাই ভাল ছিল, অন্তত মনে হতো সে বেঁচে আছে। মনে হয় শরীরটা যুদ্ধ করছে। এখন মনে হচ্ছে সে-ই যুদ্ধে হেরে গেছে আর বুঝি কোন আশা নেই।
ফারুক চোখ খুলে তাকাল। দিনের বেলা আবছা একটা আলো থাকে। ফাঁকা ফুটো দিয়ে ছিটেফোঁটা আলো আসে। সেই আলোতে মশারির ভেতরটা ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। মনে হয় সে বুঝি চতুষ্কোণ একটা বাক্সের মাঝে শুয়ে আছে। শুয়ে শুয়ে সে মাঝে মাঝে মানুষজনের কথা শুনে, কেউ আসছে যাচ্ছে কথা বলছে। দেশকে, দেশের মানুষ গালি দিচ্ছে। রাত্রিবেলা ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে আসে, চোখ খুলে রাখলেও বোঝা যায় না সে চোখ খুলেছে কি না। চারদিকে নীরব হয়ে আসে। গোলাঘরে ইঁদুরের ছোটাছুটি রাত জাগা পাখির ডাক ছাড়া আর কোথাও কোন শব্দ নেই।
এর মাঝে ফারুক অজ্ঞানের মতো পড়ে থাকে। কখন জেগে আছে, কখন ঘুমিয়ে আছে বা কখন অচেতন হয়ে আছে সে আর আলাদা করে অনুভব করে না। সবকিছু এখন মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে।
ফারুক আবার চোখ খুলে তাকাল, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। মাতার কাছে জগে পানি রাখা আছে, কিন্তু আর হাত বাড়িয়ে পানিটুকু নেয়ার ইচ্ছে করছে না। ফারুক পানির জগটির দিকে তাকিয়ে রইল। ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসছে, একটু পরে সে আর কিছুই দেখতে পারে না।
খুট করে ঘরের মাঝে একটা শব্দ হলো, মনে হয় অনেক মানুষের পায়ের শব্দ। ফারুক ভয় পাওয়া গলায় বলল, কে?
প্রথমে কে যেন চাপা গলায় হেসে উঠল, তারপর বলল, আমরা।
আমরা কে?
মশারি তুলে ভেতরে একসাথে কয়েকজনের মাথা উঁকি দেয়। ইলিয়াছ, মজনু আর জয়নাল। পিছনে রশীদ।
ফারুক উত্তেজনায় উঠে বসার চেষ্টা করতে করতে বলল, তোরা! তোরা এসেছিস? তোরা—
ইলিয়াছ ফারুককে ধরে শুইয়ে দিল, উঠিস না, উঠিস না শুয়ে থাক।
ফারুক আবার শুয়ে পড়ল, বলল, তোরা তাহলে শেষ পর্যন্ত এসেছিস। আমি ভাবলাম আর আসবি না।
আসব না কেন, গাধা! তোকে ফেলে গেছি সেটা আমাদের মনে নেই?
মজনু কাঁথা সরিয়ে পায়ের দিকে তাকিয়ে মুখ বিকৃত করল, এ কী! তোর পায়ের এ কী অবস্থা!
গ্যাংগ্রিন হয়ে গেছে মনে হয়।
গ্যাংগ্রিন? তাহলে তো কেটে ফেলতে হবে।
হ্যাঁ। কেটে ফেলতে হবে। ফারুক মাথা নাড়ল, কেটে ফেলতে হবে।
ইলিয়াছ একটা ধমক দিল, থাক তোদের নিজেদের আর ডাক্তারি করতে হবে না।
স্ট্রেচারটা কোথায়?
এই যে।
নে সাবধানে তুলে নে দেখিস ব্যথা যেন না পায়।
ওরা ধরাধরি করে ফারুককে স্ট্রেচারে তুলে আনে। মাথার নিচে একটা বালিশ রেখে কাঁথাটা নিয়ে শরীর ঢেকে দেয়। পা-টা একটু উপরে রাখার জন্যে পায়ের নিচে আরেকটা বালিশ গুঁজে দিল।
ইলিয়াছ বলল, সাবধানে বাইরে নিয়ে আয়। দেখিস কেউ যেন হোঁচট খেয়ে পড়ে না যাস।
ঠিক আছে।
ফারুক ফিসফিস করে বলল, থানার কাছে মিলিটারি ক্যাম্প করেছে।
ধুর! মিলিটারি ক্যাম্প। আমরা কাল রাতে অপারেশন করলাম, শুনিসনি কিছু?
না। শুনিনি।
মড়ার মতো ঘুমালে শুনবি কেমন করে। মর্টার ছিল দুইটা। রকেট লঞ্চার চারটা সাথে চাইনিজ মেশিনগান। একেবারে ফাটাফাটি অবস্থা। সব মিলিটারি ভেগে গেছে।
গ্রামের মানুষ নাকি দশজনের মাঝে আটজন রাজাকার।
রাজাকার না হাতি। সব ভেগে গেছে। সারা গ্রাম এখন জয় বাংলা।
সত্যি?
সত্যি। আয় বাইরে গেলেই দেখবি।
স্ট্রেচারটা ধরে বাইরে আনতেই আলোতে ফারুকের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সে ফিস ফিস করে বলল, আহা কত আলো।
ইলিয়াছ বলল, জয়নাল, কাঁথা দিয়ে ফারুকের মুখটা ঢেকে দে দেখি।
না, না ঢাকিস না। কতদিন আলো দেখি না।
ইলিয়াছ ফারুকের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল, বলল, দেখ তাহলে কত দেখবি। আর তোকে অন্ধকারে থাকতে হবে না।
জয়নাল বলল, হ্যাঁ, ফারুক ভাই। নদীর ঘাটে স্পিডবোট বেঁধে রেখে এসেছি। আপনাকে তুলেই রওনা দিব।
হ্যাঁ। পা চালাও সবাই।
ফারুক স্ট্রেচারে শুয়ে তাকিয়ে রইল। মুখে রোদ পড়ছে। কী ভালই না লাগছে তার। সে মাথা ঘুরিয়ে সূর্যের দিকে তাকাল, কী তীব্র আলো সূর্যের! সে তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে সূর্যের দিকে তাকিয়ে রইল যেন তার সমস্ত আলো সে তার চোখ দিয়ে শুষে নেবে।
সোবহান মিয়া মশারি তুলে ফারুকের শোয়ার ভঙ্গিটি দেখেই কেমন যেন চমকে উঠল। হাত বাড়িয়ে ফারুকের কপাল স্পর্শ করে দেখল তার শরীর হিম শীতল। সাথে সাথে হাত সরিয়ে বিড় বিড় করে বললেন, ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন—
আলাউদ্দিন মৃদু গলায় বলল, মরে গেছে চাচাজান?
হ্যাঁ।
তাকিয়ে আছে কেমন করে।
চোখগুলো ঢেকে দাও আলাউদ্দিন। মরা মানুষের চোখ বন্ধ করে দিতে হয়।
আলাউদ্দিন চোখ দুটি ঢেকে দিতে গিয়ে থেমে গেল, দেখে মনে হচ্ছে ছেলেটা এই চোখ দুটি দিয়ে কিছু একটা কী অবাক হয়ে দেখছে।
[এই গল্পটি লেখার পর আবিষ্কার করেছি, এর মাঝে খুব একটি বিখ্যাত গল্পের ছায়া রয়েছে। প্রিয় লেখকেরা আমাকে কিভাবে অনুপ্রাণিত করেন এটি সম্ভবত তার উদাহরণ।—মু. জা. ই]
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

If Download link doesn't work then please comment below. Also You can follow us on Twitter, Facebook Page, join our Facebook Reading Group to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature. Also try our Phonetic Bangla typing: Avro.app
বইটি শেয়ার করুন :

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2018. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com