আবারও বুদ্ধদেব বসু কিছু প্রসঙ্গ, কিছু প্রশ্ন - আজফার হোসেন

amarboi
আবারও বুদ্ধদেব বসু কিছু প্রসঙ্গ, কিছু প্রশ্ন

আজফার হোসেন

জ্বলজ্বল করতে থাকে নিটোল অক্ষর। হস্তাক্ষর। তার ওপর গিয়ে পড়ে কবির চোখ। চিকচিক করে ওঠে সেই চোখ। আর ওই চোখের দ্যুতিতে লেখা হয়ে যায় আনন্দ ও আগ্রহ। কার চোখ? কার হস্তাক্ষর? আমি এখানে বুদ্ধদেব বসুর চোখ আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হস্তাক্ষরের কথা বলছি। পুত্র যেন পিতার চিঠিতে চোখ রেখেছে। পিতার অক্ষর আর পুত্রের চোখ একই জায়গায় এসে মিলেছে। তখন ১৯৩৫ সাল। সেই ১৯৩৫ সালেই বুদ্ধদেব প্রকাশ করেছেন সেই বিখ্যাত কবিতা। পত্রিকার প্রথম সংখ্যা, যে পত্রিকাটি ১৯৬১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর ধরে নির্মাণ করে গেছে এমন এক কাব্য সংস্কৃতি, যাকে আমরা আধুনিকতাবাদী' বলে থাকি। পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যা বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধদেব একটি কপি পাঠিয়ে দেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। তিনি দ্রুত পড়ে ফেলেন পত্রিকাটি। একটা চিঠিও পাঠান বুদ্ধদেবকে। চিঠিটার মূল সুরের একটা সংক্ষিপ্ত চরিত্রায়ণ এভাবে দাঁড় করানো যায় সাবাশ, পুত্র! পিতার চিঠি পেয়ে পুত্র অবশ্যই আনন্দিত হয়। মাঝে মাঝে এমনকি নিজেকে বৈধ করার জন্য বা নিজের কথা বলার জন্যই অবাধ্য বা বিদ্রোহী পুত্ররাও পুরুষতন্ত্রের পেশি ফুলিয়ে পিতাকে নিয়ে অহংকার করে থাকে। বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রনাথ নিয়ে একাধিকবার অহংকার করেছেন; আবার রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতাও করেছেন। কিন্তু এই চিঠি প্রসঙ্গে বুদ্ধদেবের দৃষ্টি কেড়েছে রবীন্দ্রনাথের হস্তাক্ষর। বুদ্ধদেব তার প্রতিক্রিয়া জানান দেন এভাবে : মস্ত একখানা তুলোট কাগজের এপিঠ-ওপিঠ ভর্তি সেই অনিন্দ্যসুন্দর হস্তাক্ষর, যার তুলনা আমি দেখেছিলাম বহুকাল পরে অক্সফোর্ডের এক প্রদর্শনীতে টেনিসন ও রবার্ট ব্রিজেসের পাণ্ডুলিপিতে।'

তার হস্তাক্ষর-খুগ্ধতার বয়ান উপস্থিত করার জন্য বুদ্ধদেবকে অপেক্ষা করতে হয়েছে অক্সফোর্ডের ওই প্রদর্শনীর জন্য, যেখানে তিনি আবিষ্কার করেন এমন এক তুলনা যার অভিমুখ পশ্চিম। সেখানে থাকেন টেনিসন ও ব্রিজেসের মতো ইংল্যান্ড-মুগ্ধ ইংরেজ কবিরা। বুদ্ধদেব বসু নিজেই প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উভয়ভাবেই তুলনামূলক সাহিত্য-সমালোচনার চর্চা করেছেন। তুলনা করা তার অভ্যাস বটে। মাঝে মাঝে তিনি হুটহাট করে এর সঙ্গে ওর তুলনাও করেন। তুলনামূলক সাহিত্যে বেশ সময় ধরে প্রশিক্ষিত হওয়ার সুবাদে আমি নিজেই টের পেয়ে যাই যে, গেটের পথ ধরে এগোনো তুলনামূলক সাহিত্য চেহারায় ও চরিত্রে ইউরোপকেন্দ্রিক আর বুদ্ধদেব বসুরা তুলনামূলক সাহিত্যের যে ধারা তৈরি করেছিলেন তা প্রায় সর্বাংশেই পশ্চিমাকেন্দ্রিক, যে কেন্দ্রিকতার পেছনে কাজ করেছে এক ভুয়ো আন্তর্জাতিকতাবাদের দোহাই আর যে-আন্তর্জাতিকতাবাদ স্বভাবতই উপনিবেশবাদের যুগে জাতীয় সংস্কৃতির নির্মাণের প্রয়োজনীয়তাকে প্রায় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে।

চামড়ার রং বাদামি, কিন্তু সাদা মুখোশ পরা চাই’- এমনই এক তাগিদই তো রবীন্দ্রনাথকে হুট করে টেনিসনের আর ব্রিজেসের কাতারে আনতে চায়। এতে রবীন্দ্রনাথ জাতে ওঠেন? নাকি এর নাম বিশ্বভ্রাতৃত্ব? নাকি এর নাম আত্মনিরাপত্তাহীনতা? আর বিশ্ব মানেই কি পৃথিবীর এক ক্ষুদ্র অংশ, যার নাম ইউরোপ? প্রশ্নগুলোতে আমরা পরে ফিরে যাব। কিন্তু তার আগে এখানে এও বলে নেয়া প্রয়োজন যে, তুলনামূলক সাহিত্যের এলাকা নিঃসন্দেহে বুদ্ধদেব বসুর কাজের সমগ্রের একটি ক্ষুদ্র অংশমাত্র এবং এই অংশের নিরিখে বুদ্ধদেবের সামগ্রিক মূল্যায়নও আমার উদ্দেশ্য নয় মমাটেই। তবে লালন ফকিরের গান থেকে বের করে আনা একটা ইঙ্গিতও মনে ধরে কোনো তুচ্ছ অংশেও সমগ্রের ইশারা বা আভাস পাওয়া যেতে পারে। হুট করে মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া কোনো খণ্ড উচ্চারণ কিংবা কোনো ছোট বা ছেড়া চিরকুটে লেখা মন্তব্য কিংবা কারও সম্পর্কে কোনো তাৎক্ষণিক ধারণাও এমন কিছু বয়ান বা জ্ঞানভাষ্য তৈরি করতে পারে, যেখানে একজন লেখকের মনোগঠনের আঁকিবুকি খানিকটা পড়া যেতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই আমি বর্তমান রচনায় বুদ্ধদেব বসুর সমালোচনামূলক কাজের কয়েকটি দিক নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা হাজির করতে চাই।

২.

আমার নির্দিষ্ট কিছু জিজ্ঞাসাসহ কয়েকটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ হাজির করার আগে বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যিক ও নান্দনিক তৎপরতা এবং অবদান নিয়ে কিছু কথা বলে নিতে চাই। প্রথমত, বুদ্ধদেব বসু যথার্থই একজন সব্যসাচী লেখক। বলা যাবে, সব্যসাচী লেখক হয়ে ওঠার জন্য তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করে গেছেন আজীবন। পিতার অনুকরণেই কিন্তু পিতার সঙ্গে পাল্লা দিয়েই যেন পুত্র এগিয়ে যেতে চেয়েছেন। আমি পিতা বলতে রবীন্দ্রনাথকে বোঝাচ্ছি; পুত্র তো বুদ্ধদেব বসু নিজেই। পিতা-পুত্রের টানাপোড়েন, সংঘর্ষ ও ঐক্যের প্রসঙ্গগুলোকে নিদেনপক্ষে রূপকার্থে চাল করার ভেতর দিয়ে আমি অবশ্য বুদ্ধদেবের অপরীক্ষিত আধুনিকতাবাদের পুরুষতান্ত্রিক চেহারাটাও খানিকটা দেখে নেয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু, না, বিস্তারের দিক থেকে পুত্র পিতাকে টপকাতে পারেননি।

তারপরও বুদ্ধদেবের সাহিত্যিক বিস্তারের কথা অবশ্যই বলতে হয় : কবিতা লিখেছেন, গল্প লিখেছেন, উপন্যাস লিখেছেন, নাটকও লিখেছেন, সমালোচনাও হাজির করেছেন, নিবন্ধ লিখেছেন, চিঠিও লিখেছেন প্রচুর, রম্যরচনাও পাওয়া গেছে তার কাছ থেকে। এছাড়া তো রয়েছে বিদেশি সাহিত্য, বিশেষ করে ইউরোপীয় সাহিত্য থেকে তার সাড়াজাগানো প্রভাবশালী অনুবাদ। সংস্কৃত সাহিত্য থেকেও অনুবাদ করেছেন তিনি; বিশেষভাবে উল্লেখ করা যাবে কালীদাসের মেঘদূত-এর কথা। তুলনামূলক সাহিত্যের এলাকাতেও তার কাজ আছে, যে কথা আগেই বলেছি। আমার এই সংক্ষিপ্ত বয়ানেই পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, বুদ্ধদেব একজন সব্যসাচী লেখক। এও বলা দরকার, কেবল ১৯৩০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যেই বুদ্ধদেব লিখেছেন নিদেনপক্ষে ৮৫টি বই এবং ১৯৫১ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে বেরিয়েছে আরও ৬৫টি বই। ১৯৭৪ সালে তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত বইগুলো না হয় বাদই দিলাম। এভাবে তিনি একজন সব্যসাচী লেখক হিসেবে তার তৎপরতা অব্যাহত রেখেছিলেন তো বটেই, তিনি আবার একজন বহুপ্রজ লেখকও বটে।

কিন্তু সব্যসাচী ও বহুপ্রজ লেখক হিসেবে বুদ্ধদেব বসুর তৎপরতার কথা বলাটাই যথেষ্ট নয়। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যা ভীষণভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে, সেই বিষয়টিকেও সামনে আনতে হয়। তা হচ্ছে বুদ্ধদেব বসুর প্রভাবশালী সাহিত্যিক-সাংগঠনিক তৎপরতা, যার অনুপস্থিতিতে বোধকরি বাংলা কবিতার চেহারা ও চরিত্র অন্যরকম হতে পারত। হ্যা, বিশের দশকে ঢাকা থেকেই শুরু হয়েছে তার সাংগঠনিক তৎপরতা। এই তৎপরতার আবার তিনটি মাত্রা অনায়াসেই শনাক্ত করা যায় : সম্পাদনা, সমালোচনা ও প্রকাশনা। ঢাকায় থাকাকালীন বুদ্ধদেব বসু সম্পাদনা করেছিলেন দুটি পত্রিকা। ১৯২২ সালে প্রকাশিত জগন্নাথ হলের বার্ষিকী বাসন্তিকা এবং ১৯২৭ সালে কবি অজিত দত্তের সঙ্গে তার যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা প্রগতি। এরপর কলকাতায় ১৯৩৫ সাল থেকে শুরু হয় বুদ্ধদেব বসুর বিখ্যাত ত্রৈমাসিক কবিতার ভীষণ প্রভাবশালী বাক-চিহ্নিত অভিযাত্রা, যার সমান্তরাল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেই অনুপস্থিত। ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়ের বুরদা যাকে বলেছিলেন বিপণনের প্রতীকী লজিক,' যা নিমিষেই নান্দনিকতার ঝলমলে পোশাক পরে নিতে পারে, তাই যেন ঠিকঠাক বুঝে গিয়েছিলেন কবিতা পত্রিকার এই সম্পাদক, যিনি বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন এ কথাটা লেখাটাই যথেষ্ট নয়; দরকার তার বৈধতা ও ক্ষমতা। এক অর্থে আধুনিকতাবাদকে বৈধ ও ক্ষমতাশালী করার ক্ষেত্রে কবিতা পত্রিকাটির ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ওই কবিতা পত্রিকা সম্পাদনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় যারা বুদ্ধদেব বসুকে সহায়তা করেছিলেন, তারা হলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, নরেশ গুহ, প্রতিভা বসু এবং এমনকি কৰি সমর সেন। ওই কবিতা পত্রিকা ছাড়াও ১৯৩৮ সালে বুদ্ধদেব বসু আবার হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে যৌথভাবে বের করেছিলেন চতুরঙ্গ নামের একটি পত্রিকা। পরে অবশ্য বুদ্ধদেব বসু ওই পত্রিকা থেকে সরে এসেছিলেন।

এবার কবিতা পত্রিকা নিয়ে দু-একটা কথা বলা যাক। এই পত্রিকার ভেতর দিয়েই বুদ্ধদেব বসু বিভিন্ন সৃজনশীল লেখকের শুধু তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিকে আরও তৃষ্ণার্তই করেননি, তিনি একধরনের মতাদর্শিক আধিপত্যও তৈরি করেছিলেন বটে। এই পত্রিকার পাতাতেই বুদ্ধদেব রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্য নিয়ে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়েই সমালোচনা করেছিলেন; যেমন তিনি লিখেছিলেন জীবনানন্দ দাশ, সুধীন দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী প্রমুখ সমকালীন কবিদের নিয়েও। তুলনামূলকভাবে কম শক্তিশালী কবি হিসেবেও যাদের চিহ্নিত করা হয়, যেমন প্রেমেন্দ্র মিত্র, অজিত দত্ত, নিশিকান্ত প্রমুখ। তাদের নিয়েও লিখেছিলেন বুদ্ধদেব বসু। যতীন্দ্রনাথ ও নজরুল তত রয়েছেনই। এমনকি বামপন্থী কবি হিসেবে পরিচিত সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সমর সেনকে নিয়েও লিখেছিলেন তিনি, যেমন লিখেছিলেন তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়েও। এভাবে কবিতা প্রকাশ করার পাশাপাশি বুদ্ধদেব বসু নিজেই সাহিত্য সমালোচনার একটি চেহারা ও চরিত্র দাঁড় করিয়েছিলেন।

এও লক্ষ করা দরকার যে, ১৯৩৫ সালে শুরু হয় কবিতা পত্রিকাটির অভিযাত্রা। ওই একই সালে ইউরোপের সাহিত্যেও বেশ চাঞ্চল্য লক্ষ করা যায়, কেননা ওই সালেই বের হয় ইয়েটসের বিখ্যাত এ ফুল মুন ইন মার্চ, এলিয়টের নাটক মার্ডার ইন ক্যাথিড্রেল, দুই মার্কিন আধুনিকতাবাদী কবি ওয়ালেস স্টিডেন্স এবং উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের কাব্যগ্রন্থ যথাক্রমে আইডিয়াস অব অর্ডার এবং অ্যান আর্লি মারটার অ্যান্ড আদার পোয়মস। এ ছাড়া দু'জন গ্রিক কবি কনস্তানতিন কাভাষি ও গিয়োগোস সেফেরিস-এর কাব্যগ্রন্থ যথাক্রমে টেল অব লেজেন্ডস এবং পোয়মস অব সি, পি কাভাফি প্রকাশিত হয় ১৯৩৫ সালেই। আরও যুক্ত হয় নিরীক্ষাধর্মী নকশা-মকশো করা, ক্রীড়াপ্রবণ, মার্কিন লিরিক কবি ই, ই, কামিংস-এর নো থ্যাঙ্কস। এখানে এও উল্লেখ করা দরকার যে, ১৯৩৩ সালে স্পেন ঘুরে এসে স্পেন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই ১৯৩৫ সালে কবি আল্লামা একবাল বের করেন। তার কাব্যগ্রন্থ বাল-ই-জিব্রিল; আর অন্যদিকে স্পেনের কবি লোরক ওই একই সালে প্রকাশ করেন তার বিখ্যাত সিক্সগ্যালিশিয়ান পোয়মস। এভাবে ১৯৩৫ সাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে। কিন্তু কবিতা পত্রিকার ভেতর দিয়ে কী ধরনের সাহিত্য-সমালোচনা দাড় করালেন বুদ্ধদেব বসু? প্রথমত বলে নেয়া দরকার যে, একজন কবির বা কথাসাহিত্যিকের ক্ষমতা ও খানিকটা কারিগরি দক্ষতাকে দ্রুত শনাক্ত করতে পারতেন বুদ্ধদেব বসু; এর প্রমাণ হিসেবে হাজির করা যাবে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে তার সমালোচনার কাজকে যেমন, তেমনি নজরুল, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী ও বিদেশিদের মধ্যে বিশেষ করে বোদলেয়ারকে নিয়ে তার কাজকেও সামনে আনা যাবে, যদিও নজরুলের এবং বোদলেয়ারের স্বভাব ও চেহারাকে একাধিক পরিসরে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন বুদ্ধদেব বসু। এমনকি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে প্রচুর লেখা উপহার দেয়া সত্ত্বেও তিনি পুতুপুতু রাবীন্দ্রিকতাকে যতটা গুরুত্ব দিয়েছেন, প্রায় ততটাই তিনি এড়িয়ে গেছেন সেই রবীন্দ্রনাথকে যিনি ইতিহাসে মানুষের স্থান, ঐতিহাসিকতার সঙ্গে সামাজিকতার সম্পর্ক, পুবের সঙ্গে পশ্চিমের সম্পর্ক, শিক্ষার অর্থ ও স্বরূপ, সংস্কৃতি ও পরিবেশ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে একধরনের চিন্তার লিপ্ততার প্রমাণ রেখেছেন। এসব প্রসঙ্গে পরে ফেরা যাবে। তবে বুদ্ধদেবীয় সমালোচনার ধরন নিয়ে দু-একটা পর্যবেক্ষণ হাজির করা যাক।

হ্যা, কোনো একজন লেখককে নিয়ে যখন বুদ্ধদেব বসু আলোচনা করেন, তখন একজন লেখকের কাজকে যতটা তিনি ভাষিক ঘটনা হিসেবে দেখেন, ততটা তিনি তাকে জাগতিক ঘটনা হিসেবে দেখেন না। এতে মনে হয় যে, ভাষা যেন উড়াল দিয়ে বইয়ের পাতার হরফে হাজির হয়েছে। জগতের সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক নিয়ে কিংবা ভাষার জাগতিকতা ও জগতের ভাষিকতা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় ছিল না বুদ্ধদেব বসুর। কিন্তু আবার ভাষিক ঘটনা হিসেবে একটি সাহিত্যিক কাজকে যখন তিনি বিবেচনায় রাখেন, তখন আবার ভাষার ঘনিষ্ঠ পাঠের দিকেও যে তিনি অগ্রসর হয়েছেন তা বলা যাবে না। বরং একটি কাজ নিয়ে বা তার ভাষা নিয়ে বুদ্ধদেব বসু তার অনুভব ও অভিজ্ঞতাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন এবং তাদের পক্ষে উদাহরণও জড়ো করেছেন। আবার সাহিত্যের বা ভাষার ইতিহাসকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পাঠ করার ভেতর দিয়ে কোনো একটি সৃজনশীল কাজের স্বরূপ উমাটনেও বুদ্ধদেবের আগ্রহ প্রায় শূন্য ছিল বললেই চলে।

অন্য কথায়, বুদ্ধদেব ইঙ্গ-মার্কিন “নিউ ক্রিটিসিজম’-এর সমাজ রাজনীতি-ইতিহাস-বিমুখতাকে সঙ্গে নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তার বিশ্লেষণী পদ্ধতিকে নয়। আবার কোন গভীর সংশ্লেষণের দিকে যে তিনি অগ্রসর হয়েছেন, তাও বলা যাবে না। তিনি বিশ্লেষণীও নন, সংশ্লেষণীও নন। বরং তিনি খানিকটা যুক্তির চালেই নির্ভর করেছেন ‘ইম্প্রেশান'-এর ওপর। তার সমালোচনামূলক কাজে এই ‘ইম্প্রেশান’-এর বিস্তারই লক্ষ করা যায়, যদিও তিনি থেকে থেকে নিজের মতো করেই উদাহরণ জড়ো করতে ভুলেন না। এভাবে এও ধরা পড়ে যে, পশ্চিমা মুলুকের ‘বেল-লেত্রিস্ত ঐতিহ্যের একটা বড় আসর পড়েছিল বুদ্ধদেব বসুর ওপর। অর্থাৎ পাশ্চাত্যমুখী বুদ্ধদেব বসু পশ্চিমা মুলুকের ‘নিউ ক্রিটিসিজম'-এর সঙ্গে পুরোপুরি তাল মিলাতে সক্ষম না হলেও তাকে খানিকটা। আঁকড়ে ধরে ওই “নিউ ক্রিটিসিজম'-এরও আগের যুগে ফিরে যেতে চেয়েছেন।

আর এভাবেই বুদ্ধদেব বসু তার গদ্যও তৈরি করেছিলেন। এমন এক গদ্য যা নিঃসন্দেহে বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের জন্য দারুণভাবে পাঠযোগ্য হয়ে উঠেছে, যে গদ্য তরতর করে বয়ে চলে, যাকে আবার কেউ কেউ মিষ্টি গদ্যও বলেছেন বটে। তার রম্যরচনার গদ্যের সঙ্গে আসলেই তার সমালোচনার গদ্যের তেমন পার্থক্য চোখে পড়ে না। সত্য, এই গদ্য দিয়ে একাধিক কাজ করা। সম্ভব বটে। তা করেছেনও বুদ্ধদেব বসু। কিন্তু এ গদ্যে চিন্তার প্রখর্য কিংবা বিশ্লেষণের তীব্রতা বা প্রশ্নের রাজনৈতিকতা জমে ওঠে না। সেগুলো অবশ্য বুদ্ধদেবের অভীষ্ট ছিল না। কিন্তু তিনি যা করেছেন তাতে আমরা আয়েশি গদাদা এমন একজন সমালোচককে পাই, যিনি আমাদের চিন্তাকে ঘুম পাড়াতেই ব্যস্ত, জাগাতে নয়।

সমালোচনার ইহজাগতিক উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রশ্ন তোলার ভেতর দিয়ে কিংবা অপরীক্ষিত বা উপেক্ষিত অঞ্চলকে দৃষ্টির সামনে তুলে ধরে বিরাজমান ব্যবস্থা বা ক্ষমতা সম্পর্ককে ধরিয়ে দেয়া এবং ধাক্কা। দেয়া বা তাকে এমনকি ভেঙে ফেলার জন্য স্পেসও তৈরি করা। আবার সমালোচনা বলতে কেবল মূল্যায়ন বা বিশ্লেষণই বোঝায় সমালোচনা হচ্ছে চিন্তাশীল সাংস্কৃতিক অনুশীলন, যা বিরাজমান অসম ক্ষমতা সম্পর্কের আধিপত্যবাদী কাঠামোর সঙ্গে বিভিন্নভাবেই বিরোধে জড়িয়ে থাকে। বলা বাহুল্য, ‘বেল-লেন্তি' ঐতিহ্যের অনুসরণেই এবং নান্দনিকতার এক বিশেষ মতাদর্শিক টানেই বুদ্ধদেব বসু সমালোচনাকে প্রকৃত অর্থে বাংলার উপনিবেশপীড়িত জীবনের ছন্দম্পন্দে জারিত করে তাকে চিন্তার ঘাম ঝরানোর এবং রক্তপাতের ভেতর দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি।

সত্য, সাহিত্যের বিভিন্ন এলাকায় ও মাধ্যমে তিনি প্রায় স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেছেন, যে কথাটা আগেই বলেছি। কবিতা ও সমালোচনা ছাড়া তিনি লিখেছেন ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, ভ্রমণকাহিনী ও শিশুকিশোর সাহিত্য। এসব সত্ত্বেও বুদ্ধদেব বসু সমালোচনার এলাকায় এসে বেশ সীমিত হয়ে পড়েন। কারণ জীবন মানেই কেবল নান্দনিকতা, ডাষিকতা ও ব্যক্তিকতা নয়। বুদ্ধদেব বসুর সমালোচনামূলক কাজ নিয়ে আরও কয়েকটি কথা বলে নেয়া দরকার। এখানে তাহলে নজরুলকে নিয়ে বুদ্ধদেব বসুর। সেই বিখ্যাত আলোচনার প্রসঙ্গটাই চলে আসে। অস্বীকার করার জো নেই যে, বেশ গুরুত্বসহকারেই নজরুলের কবিতাকে সামনে এনেছিলেন বুদ্ধদেব বসু, চিহ্নিত করছিলেন নজরুলের কাব্যশক্তি। বুদ্ধদেব বসু বলেন, বাংলা কাব্যের ইতিহাসে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পর সবচেয়ে যে বড় কবিত্বশক্তি নজরুল ইসলামের। তবে বুদ্ধদেব বসকে জুড়ে দিতে হল ওই সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কথাও এবং তার। তর্জনী-নির্দেশে একধরনের হায়ারার্কিও নির্দিষ্ট হল। কিন্তু কেন এই হায়ারার্কি? এই প্রশ্নের উত্তর দিতেও রাজি নন বুদ্ধদেব বসু।

এরপর বুদ্ধদেব বসু নজরুলের কবিতায় ‘হৈ চৈ'-কে অনান্দনিক ঠাওরিয়ে নজরুলের গদ্যে তার অতি মুখর মনের অসংযত বিশৃঙ্খলা চিহ্নিত করে শরণাপন্ন হন ইংরেজ ‘রোমান্টিক কবি বায়রনের। হুট করেই যেন নজরুলের সঙ্গে বায়রনের তুলনা করে বসেন বুদ্ধদেব বসু। তিনি মোটেই বিবেচনায় রাখেন না যে, বায়রন একজন ইংরেজ অভিজাত, বিদ্রুপপ্রবণ, সনাতন সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়া কৰি আর অনাদিকে নজরুল একেবারে গ্রামীণ প্রোলেতারিয়েত থেকে উঠে আসা একজন বিদ্রোহী এবং বিপ্লবী কবি, যার গায়ে লেগে থাকে বাংলার মাটি-কাদা-জলের চিহ্ন ও গন্ধ, যা থেকে অবশ্য বুদ্ধদেব বসু সরিয়ে রাখেন তার নান্দনিক ইন্দ্রিয়। কিন্তু বায়রনের সঙ্গে নজরুলের তুলনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেন না বুদ্ধদেব বসু। গেটের বাত দিয়ে আবার এও বোঝান যে, চিন্তা করতে গিয়ে নজরুলের অবস্থা হয় একজন শিশুর মতো। (যেমন গেটের বিবেচনায় ওই একই অবস্থা হয় বায়রনেরও)।

এখানে বুদ্ধদেব বসুর নিজস্ব তুলনামূলক চিন্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠে বটে। তবে তুলনার জন্য বা নান্দনিক উৎকর্ষের মাপকাঠির জন্য পশ্চিমা দুনিয়ার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উদযাপিত লেখকদের দ্বারস্থ হওয়াটা বুদ্ধদেব বসুর পক্ষে স্বাভাবিকই বটে, কেননা যে বিদেশি সাহিত্যে ও সাহিত্য সমালোচনায় বুদ্ধদেব বসু প্রশ্নহীনভাবে বিচরণ করেছেন সেগুলো ছিল তুমুলভাবে ইউরোপকেন্দ্রিক। আর শিশু বলতে বুদ্ধদেব বসু কী বুঝিয়েছেন, তার কোনো ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় না তার কাছ থেকে। অন্যদিকে আবার ‘পরিপক্কতা' বা 'প্রগতি' আসলেই কী বস্তু, তার ওপর কোনো আলো ফেললেন না তিনি। তাহলে কি অন্তত ধরে নেব যে, পরিপক্কতা কিংবা সাবালকত্ব মানে ‘হৈ চৈ না করা? বা তার মানে কি বুদ্ধদেব বসুর মতো পশ্চিমা উপনিবেশবাদ নিয়ে কোনো প্রশ্ন না তুলে বরং লেপের নিচে বৃষ্টির রাতে আরাম করে পড়া যায় এমন এক মিষ্টি গদ্যে বা কবিতায় অনুভব ও অভিজ্ঞতাকে বাজিয়ে নেয়া?

নজরুলকে নিয়ে বুদ্ধদেব বসুর আলোচনায় এও লক্ষ না করে উপায় নেই যে, তিনি নজরুলের চরিত্রায়ণে 'শিশু' দিয়ে শুরু করে 'বালক’-এ উপস্থিত হয়েছেন। নজরুলকে নিয়ে বুদ্ধদেব বসুর সেই পুরনো উক্তিটিকে সামনে আনতে বাধ্য হচ্ছি। বুদ্ধদেব বলছেন, ‘পঁচিশ বছর ধরে প্রতিভাবান বালকের মতো লিখেছেন তিনি, কখনও বাড়েননি, বয়স্ক হননি, পর পর তার বইগুলোয় কোনো পরিণতির ইতিহাস পাওয়া যায় না, কুড়ি বছরের লেখা আর চল্লিশ বছরের লেখা একই রকম।' একেবারেই একই রকম? আঙ্গিক থেকে বিষয়বস্তু পর্যন্ত সবই একই রকম? বিদ্রোহী কবিতার চেহারা ও চরিত্রের সঙ্গে তার বিভিন্ন ধরনের কবিতার চেহারাকে এক করে দেখা যায়? বাড়েনি' কথাটিরই বা অর্থ কী? এসব প্রশ্ন আজও প্রশ্ন থেকে যায়, কেননা প্রশ্নগুলোর কোনো মীমাংসা নেই বুদ্ধদেবের ওই আপাত আগ্রহতাড়িত আলোচনায়। এও লক্ষ করা দরকার যে, নজরুলের পুরো কাব্যকর্মের ওপর-প্রায় পঁচিশ বছরের কাজের ওপর বুদ্ধদেব বসু এক চূড়ান্ত ফতোয়া জারি করেছেন, যাকে বর্তমান সময়ের নিরিখে আবারও খতিয়ে দেখা দরকার। জানি, নজরুলকে নিয়ে বুদ্ধদেব বসুর আলোচনাকে বাঙালি, শিক্ষিত মধ্যবিত্তের অনেকেই বাহবা দিয়েছেন। এও জানি, নজরুলের প্রতি বুদ্ধদেব বসুর একটা বিশেষ টানও ছিল; নজরুলকে নিয়ে তিনি বিশেষ সংখ্যাও করেছেন বটে। কিন্তু ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত বুদ্ধদেব বসুর নজরুল ইসলাম' শীর্ষক সমালোচনামূলক রচনাটি খেয়াল করে পাঠ করলে ধরা পড়ে যে, রচনাটি আসলে ব্যাজস্তুতির একটি বিশেষ ঐতিহাসিক নমুনা। আর এই ‘ব্যাজস্তুতি' হচ্ছে প্রশংসাচ্ছলে নিন্দা।

আবারও ফেরা যাক বুদ্ধদেব চিহ্নিত নজরুলের ‘হৈ চৈ' প্রসঙ্গে। তার সঙ্গে রুচির প্রশ্নেও, যে প্রশ্নটি নিয়ে বুদ্ধদেব বসু বেশ ভাবিত। লক্ষ করা যাক বুদ্ধদেব বসুর এই মন্তব্যটি : নজরুল চড়া গলার কবি, তার কাব্যে হৈ চৈ অত্যন্ত বেশি এবং এই কারণেই তিনি লোকপ্রিয়। যেখানে তিনি ভালো লিখেছেন, সেখানে তিনি হৈ চৈটাকেই কবিত্বমণ্ডিত করেছেন : তার শ্রেষ্ঠ রচনায় দেখা যায়, কিপলিংয়ের মতো, তিনি কোলাহলকে গানে বেঁধেছেন। এই সংক্ষিপ্ত বয়ানটির একটি মানোযোগী পাঠে বেশ কয়েকটি বিষয় বেরিয়ে আসে। প্রথমেই প্রশ্ন জাগে : নজরুল কি কেবলই চড়া গলার কবি? এছাড়া গলা চড়ানোর বিষয়টি যে ইতিহাসের একটি বিশেষ পর্বে সাংস্কৃতিকভাবেই অনিবার্য হয়ে ওঠে, যখন নান্দনিকতার প্রশ্নটিও ঐতিহাসিকতার উত্তাপে গলে যায় রাজনীতিতেই, সেই বিষয়টি বুঝিয়ে বলাটা বুদ্ধদেবের পক্ষে একেবারেই সম্ভব হয়নি। এভাবে বিদ্রোহী এবং বিপ্লবী নজরুলকে তিনি একেবারেই চিনতে পারেননি।

বুদ্ধদেবের আলোচনায় নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা নিয়ে অবশ্য খানিকটা প্রশংসামূলক মন্তব্য পাওয়া যায়। কিন্তু ওই কবিতায় নজরুল কী বলতে চাচ্ছেন এবং কেন তার কণ্ঠস্বর সেখানে উচ্চকিত হচ্ছে, সেসব প্রশ্নকে একেবারেই এড়িয়ে গিয়ে নজরুলের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক এবং সাহিত্যিক তাৎপর্যকে ধরতে বার্থ হয়েছেন বুদ্ধদেব বসু। এবার আসা যাক দ্বিতীয় বিষয়টিতে। উদ্ধৃত মন্তব্যটি বলে দেয় যে, হৈ চৈ’-এর কারণে, বা ‘হৈ চৈ’-কে কবিত্বমণ্ডিত না করার কারণে নজরুলের অধিকাংশ রচনা একদিকে যেমন কাব্যের পর্যায়ে উন্নীত হয় না, অন্যদিকে তেমনি আবার তা লোকপ্রিয় হয়। অর্থাৎ বুদ্ধদেবের কাছ থেকে এমনি একটা ইঙ্গিত বেরিয়ে আসে : সর্বসাধারণ হৈ চৈ বোঝে কিন্তু কাব্য বোঝ না। হ্যা, সত্য, বুদ্ধদেব বসুদের কাব্য আসলেই জনগণের জন্য নয় (কেননা জনগণ অশিক্ষিত, অনান্দনিক’)। তৃতীয়ত, বুদ্ধদেব বসু নজরুলের শ্রেষ্ঠ রচনার কথাও বলেন, যেখানে ওই ‘হৈ চৈ কৰিমণ্ডিত। কিন্তু নজরুলের শ্রেষ্ঠ রচনার কথা বলতে গিয়ে বুদ্ধদেব বসু টেনে আনেন কিপলিংকে। কবি আর পেলেন না বুদ্ধদেব বসু!

নজরুলের শ্রেষ্ঠত্বকে বোঝাতে গিয়ে বুদ্ধদেব বসু একেবারেই ভিন্ন মতাদর্শের ও স্বভাবের সাদা কবি কিপলিংকে টেনে আনলেন, যে কিপলিংকে সাদা লেখক ও সমালোচকদের মধ্যেই যারা প্রগতিশীল, তাদের কেউ কেউ আগেই সমালোচনা করেছিলেন, যেমন এমনকি জর্জ অরওয়েল নিজেই কিপলিংকে বলেছিলেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের 'পয়গম্বর’! আমরা এও জানি, এই কিপলিংই তার চূড়ান্ত বর্ণবাদী অবস্থান থেকে নিজেই বলেছিলেন 'সাদা মানুষের বার্ডেন'-এর কথা। এও বলা দরকার, নজরুল নিজেই তার বর্তমান বিশ্বসাহিত্য' নামের প্রবন্ধে কিপলিংকে মোটেই আত্মীয় হিসেবে ভাবেননি, আসলে সেরকম ভাবার কোনো প্রশ্নই আসে না, বরং তার প্রবন্ধে নজরুল বলেছিলেন, ‘দেখি তালে তালে পা ফেলে আসছে সাম্রাজ্যবাদী-ফ্যাসিস্ট সেনা। তাদের অগ্রভাগে ইতালির দি অননৎসিও, কিপলিং প্রভৃতি। অথচ এই কিপলিংয়ের সঙ্গেই নজরুলকে হুট করে তুলনা করে বসলেন বুদ্ধদেব বসু। তুলনাটাকে আসলেই হাস্যকর মনে হয়। শুধু হাস্যকরই নয়, এই তুলনা মোটেই নিরীহ নয়। উদ্ধৃত মন্তব্যসহ বুদ্ধদেব বসুর সব আলোচনাটা বিবেচনায় রাখলে ধরা পড়ে যে, একটি উপনিবেশায়িত মন নিয়েই বুদ্ধদেব বসু নজরুলের মতো একটি তীব্র উপনিবেশবাদবিরোধী কবির পঁচিশ বছরের কাজকে বিচার করতে বসেছেন। স্বাভাবিকভাবেই তখন বুদ্ধদেবের মাথায় কেবল ঘুরঘুর করছে গেটে-বায়রন-কিপলিং।

এবার আসি 'রুচি’ প্রসঙ্গে। নজরুলের বিরুদ্ধে তার গানের প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসু সরাসরি রুচিহীনতার অভিযোগ তোলেন। তবে এও সত্য যে, নজরুলের গানের বেশ প্রশংসা করেছেন বুদ্ধদেব বসু। তিনি বলেন, 'গানের ক্ষেত্রে নজরুল নিজেকে সবচেয়ে সার্থকভাবে দান করেছেন। তার সমগ্র রচনাবলির মধ্যে স্থায়িত্বের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি তার গানের। কিন্তু এ মন্তব্যের কিছু পরে বুদ্ধদেব বসু এও বলেন, কিছু কিছু রচনা পাওয়া যাবে, যাকে অনিন্দ্য বললে অত্যন্ত বেশি বলা হয় না। আরও বেশি গান যে অনিন্দ্য হয়নি, তার কারণ নজরুলের দুরতিক্রম্য রুচির দোষ। কত গান সুন্দর আরম্ভ হয়েছে, সুন্দর চলে এসেছে, কিন্তু শেষ স্তবকে কোনো একটা অমার্জিত শব্দ প্রয়োগে সব জিনিসটিই গেছে নষ্ট হয়ে। এই মন্তব্য থেকে ভুরভুর করে বেরিয়ে আসে বুদ্ধদেব বসুর ‘এলিটিজম'। আর উদাহরণ ব্যতিরেকে যখন বুদ্ধদেব বসু এই ভাষায় কথা বলতে থাকেন, তখন মনে হয় যে, তিনি রুচির একচ্ছত্র এজেন্সি নিয়েছেন। আর এই রুচি’ বিষয়টি বা কী? কে ঠিক করে দেবে কোটি রুচিশীল আর কোনটি নয়? ‘অমার্জিত শব্দ বলতেই বা কী বোঝায়?

এসব প্রশ্ন কেবল আমার নয়। প্রশ্নগুলো অন্য পরিসরে তুলেছেন বুদ্ধদেব বসুরই সমসাময়িক তৃতীয় বিশ্ব’-এর একদল কবি। বিশেষভাবে উল্লেখ করা যাবে চিলির কবি পাবলো নেরুদা, ক্যারিবীয় কবি এমে সেজেয়ার আর আফ্রিকি-মার্কিন কবি (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর গড়ে ওঠা তৃতীয় বিশ্বের কবি) ল্যাংস্টন হিউসের কথা। বলা দরকার, নেরুদা তার ‘টোয়ার্ড অ্যান ইমপিউর পোয়েট্রি' নামের এক ইশতেহারধর্মী রচনায় যেন ভসনা করছেন তাদেরই, যারা কথায় কথায় “রুচি’, ‘অমার্জিত, স্কুল’, ‘অসংস্কৃত ইত্যাদি চিহ্নায়কগুলো ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু এসব কবির সঙ্গে বোধগম্য কারণেই বুদ্ধদেব বসুর কোনো আত্মীয়তা হয়নি; বরং তার আত্মীয়তা স্থাপিত হয়েছে সাদা কবিদের সঙ্গে যাদের বিবেচনার নিরিখে বা মানদণ্ডে বুদ্ধদেব বসু ঠিক করে দেন কোনটি মার্জিত আর কোনটি ‘অমার্জিত’, কোনটি কাব্যিক আর কোনটি “অকাব্যিক’? অবশ্যই বলা যাবে যে, উপনিবেশবাদের সুবাদে আসা তিরিশি আধুনিকতাবাদ যে নান্দনিক উপনিবেশায়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল জোরেশোরে, সেখানে বুদ্ধদেব বসুর ভূমিকাই থাকে প্রধান।

এখানে বন্ধনীতে বুদ্ধদেবের উপনিবেশবাদী আধুনিকতাবাদ নিয়ে কয়েকটি কথা বলে নেয়া দরকার। সত্য, তিনি শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্তকে আধুনিকতাবাদী ইউরোপের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এখানে তার ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার অনুবাদের কথা সঙ্গত কারণেই চলে আসে, যেমন আসে তার বোদলেয়ার পাঠের কথাও। কিন্তু কোন বোদলেয়ার? সত্যি কথা বলতে কি, জর্মান সংস্কৃতিতাত্ত্বিক ওয়াল্টার বেনজামিনের বিখ্যাত বোদলেয়ার পাঠের পাশে যখন বুদ্ধদেবের বোদলেয়ারকে রাখি, তখন অনায়াসেই ধরা পড়ে বুদ্ধদেবীয় আধুনিকতাবাদের পশ্চিমা উপনিবেশবাদ-প্রভাবিত চেহারাটা। অবশ্যই বুদ্ধদেবের বোদলেয়ার এবং মার্কসবাদী বেনজামিনের বোদলেয়ার একই সঙ্গে না যাওয়ারই কথা। তাদের সঙ্গতিপূর্ণ যোগাযোগ আমি আশা করি না। তবে তাদের পার্থক্যটা তাৎপর্যপূর্ণ বটে। যেখানে বুদ্ধদেবের কাছে বোদলেয়ার হয়ে ওঠেন বস্তুজগৎবিচ্ছিন্ন শব্দ ত্রার ধাক্কা দেয়া চিত্রকল্পের কবি, সেখানে বেনজামিনের রাজনৈতিক-অর্থনীতি প্রভাবিত সাংস্কৃতিক নান্দনিক বিবেচনায় বোদলেয়ার হচ্ছেন দারুণভাবে জমে ওঠা পুঁজিবাদের একজন গুরুত্বপূর্ণ লিরিক কবি, মেট্রোপলিসের কবি, যিনি আধুনিকতা যে শক-ওয়েভ' তৈরি করেছিল, তার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন, তবে ওই পুঁজিবাদের সঙ্গে তার নিজস্ব কায়দায় বিরোধে জড়িয়ে থেকেই।

কিন্তু এও জোর দিয়েই বলা দরকার যে, বেনজামিনের বিবেচনায় বোদলেয়ারের কবিতা সরাসরি উনিশ শতকের পণ্য-সংস্কৃতির একটি বিশেষ পর্যায়কে তুলে ধরে এবং এ কারণেই ওই পণ্য সংস্কৃতির আলোচনা ব্যতিরেকে বোদলেয়ারের কবিতার আলোচনা অপর্যাপ্ত থেকে যেতে বাধ্য। সেখানেই শেষ নয়। বেনজামিনের আলোচনায় ধরা পড়ে যে, বোদলেয়ারের কবিতা পাঠের ভেতর দিয়েই দেখা সম্ভব কী করে অ্যালেগরি' ও পণ্য-রূপের মধ্যে একধরনের আত্মীয়তা তৈরি হয়। তবে এটি আরেক প্রসঙ্গ। কিন্তু বেনজামিনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তত্ত্বায়ন নিজেই বুদ্ধদেবের বোদলেয়ারকে পশ্চিমা উপনিবেশবাদের সাংস্কৃতিক পণ্য হিসেবে চিহ্নায়িত করতে সাহায্য করে, যে পণ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদী সাংস্কৃতিক উদযাপন আমরা লক্ষ করি বুদ্ধদেবের কাজে। এর একটা ফল দাড়াল এই যে, বুদ্ধদেব-প্রভাবিত সাহিত্যিক আধুনিকতাবাদ বিভিন্নভাবেই এক ধরনের নান্দনিক উপনিবেশয়ান প্রক্রিয়া চালু রাখল।

এবার বুদ্ধদেব বসুদের প্রসঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনা দরকার। ইউরোপীয় বিশ, ত্রিরিশ ও চল্লিশের দশকের অনেক সাদা লেখকের কাজে বুদ্ধদেব বসু এবং তার সমসাময়িকদের মধ্যে বিশেষ করে সুধীন দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী এবং বিষ্ণু দে’র তুমুল আগ্রহ ছিল বটে। ইউরোপীয় সাহিত্যে এদের জ্ঞান-গরিমা নিয়ে শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্তের অনেকেই এখনও অহংকার করে থাকেন, যেমন ইংরেজি জানা পণ্ডিতদের নিয়ে বাঙালি মধ্যবিত্তের অনেকেই সেই কাজটা করেন। কিন্তু ওই দশকগুলোতে মূলধারার সাদা আধুনিকতাবাদের বিপরীতে উপনিবেশবাদবিরোধী বিকল্প আধুনিকতাবাদের যে সংস্করণ তৈরি হচ্ছিল ওই পশ্চিমা মুলুকেই, তাতে বুদ্ধদেব বসু বা সুধীন দত্তের কোনো আগ্রহ ছিল না বললেই চলে। এখানে দুটি আন্দোলনের কথা অনায়াসেই উল্লেখ করা যায় : একটি হল হারলেম রেনেস' আন্দোলন আর অপরটি ‘নেগ্রিচিউড’ বা ‘নিগ্রোবাদ’ আন্দোলন।

ওই হারলেম রেনেসাঁস'-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কালো, অর্থাৎ আফ্রিকান-আমেরিকান, লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা, যেমন— কৰি ল্যাংস্টন হিউজ, কথাসাহিত্যিক যোরা নীল হারস্টন, কবি ক্লড ম্যাকে, কবি ও উপন্যাসিক কাউন্টি কালেন, কবি জেমস ওয়েলডন জনসন প্রমুখ। অন্যদিকে নেগ্রিচিউড’ বা ‘নিগ্রোবাদ আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের তিন কালো কবি-তাত্ত্বিক-বুদ্ধিজীবী ক্যারিবীয় কবি এমে সেজেয়ার, সেনেগালের কবি লেপল্ড সেভার সেংঘর এবং ফরাসি গুইয়ানার কবি লিওঁ দামা। এই দুই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের কাজগুলো যে বুদ্ধদেব বসুদের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল তা বলা যাবে না মোেটই। কিন্তু না, ল্যাংস্টন হিউজ বা লেপ সেডার সেংঘরের মতো একজন কালো কবি বুদ্ধদেব বসুদের টানেনি মোটেই, কেননা রাজনীতিবিমুখ হয়েও ইউরোপীয় বা সাদা সাহিত্য নিয়ে তাদের একচ্ছত্র মোহ ওই রাজনৈতিক মতাদর্শিক জায়গাতেই ঠায় দাঁড়িয়েছিল, যার সঙ্গে বিভিন্নভাবেই সম্পর্কিত থাকে যাকে আমরা বলি তিরিশী’ আধুনিকতাবাদ। আর এই প্রসঙ্গে ইতালীয় মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ও রাজনীতিক আন্তনিও গ্রামসির ওই মোদ্দাকথাটাও ফিরে আসে : আমরা কাকে উহ্য রাখি আর কাকে উক্ত রাখি, আমরা কোন বিষয়ের ওপর জোর দিই আর কোন বিষয়ের ওপর জোর দিই না, সেগুলো মোটেই রাজনৈতিক বা মতাদর্শিকভাবে নিরীহ কিংবা নিরপেক্ষ নয়।

৩.

তাহলে ফেরা যাক নজরুলকে নিয়ে বুদ্ধদেব বসুর আলোচনা প্রসঙ্গে। হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে নজরুলকে নিয়ে বুদ্ধদেবের আলোচনা প্রসঙ্গে এতটা সময় খরচ করা হল কেন? বুদ্ধদেব বসু আমাদের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ রচনা উপহার দিয়েছেন বটে, কিন্তু কেবল নজরুল-সংক্রান্ত আলোচনা দিয়েই কি বুদ্ধদেবকে বোঝার উপায় আছে? আগেই বলেছি, বুদ্ধদেব বসুর সামগ্রিক মূল্যায়ন আমার এই রচনার উদ্দেশ্য নয়; সেটি বর্তমান রচনার পরিসরে সম্ভবও নয়। তবে নজরুলকে নিয়ে বুদ্ধদেবের আলোচনাকে গুরুত্ব দেয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, মতাদর্শিক দিক থেকে নজরুল ইসলাম বুদ্ধদেব বসুর একজন বিশেষ অপর'। দ্বিতীয়ত, এই অপরকে দেখার ক্ষেত্রে সবসময়ই একটা চ্যালেঞ্জ কার্যকর থাকে, যে চ্যালেঞ্জের পরিপ্রেক্ষিতে একজন আলোচকের ধ্যানধারণা বা চিন্তাভাবনা একটি বিশেষ মতাদর্শিক অবয়ব লাভ করে, যার দিকে তাকিয়ে ওই আলোচকের চেহারা ও চরিত্র খানিকটা চিনে নেয়া যায়। তৃতীয়, বুদ্ধদেব বসু নজরুল ইসলামকে নিয়ে কথা বলেছেন এমন একসময়, যখন বুদ্ধদেব বসুর একটি নান্দনিক মতাদর্শিক ফ্রেমওয়ার্ক বেশ দাঁড়িয়ে গেছে। বিখ্যাত কালো তাত্ত্বিক ডারিউইবি ডুবয়েসের একটা কথা মনে আসে, ‘একজন শাদা ব্যক্তি যখন আরেক শাদার সঙ্গে কথা বলে, সেখানে তাকে যতটা না চেনা যায়, তার চেয়ে বেশি তাকে চেনা যায় যখন সে তার অপর একজন কালো ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে।' ডুবয়েসের উক্তিটা বিবেচনায় রেখেই আমার কাছে বুদ্ধদেব বসুর নজরুলবিষয়ক আলোচনাকে একটি উপসর্গিক গঠনের জুতসই টেক্সট মনে হয়েছে।

কিন্তু আমি বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক নিয়েও কিছুটা কথা বলেছি। আরও দু-একটা কথা বলা দরকার। এ প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসুর কবিতার প্রসঙ্গটা হাজির হয়, যদিও বর্তমান ব্লচনার বিষয়বস্তু কবিতার আলোচনা নয় মোটেই। তবে বলা যাবে যে, প্রথম কাব্যগ্রন্থ বন্দির বন্দনা থেকে সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ স্বাগত বিদায় পর্যন্ত যে অভিযাত্রা অব্যাহত রেখেছিলেন বুদ্ধদেব বসু, সেখানে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তার টানাপোড়েনের বিভিন্ন চিহ্ন পাঠ করা সম্ভব। এবং এও বলা সম্ভব যে, তার কবিতায় রবীন্দ্রবিরোধিতা যেমন আছে, আছে তেমনি তার প্রভাবের আঁকিবুকি, কিন্তু কবিতায় বুদ্ধদেব বসু যে লিরিক ব্যক্তিকে হাজির করেন এবং চালু রাখেন, সেই ‘লিরিক ব্যক্তি নজরুলের যেমন অচেনা, রবীন্দ্রনাথেরও তেমনি। এই ব্যক্তির বিশেষ ব্যক্তিকতার জন্ম আসলে নগরায়িত ইউরোপের ঔরসেই। এই ব্যক্তি আলোড়িত হয়, অযৌক্তিকতায় ভােগে, কার্য-কারণ সম্পর্ককে তোয়াক্কা করে না, নগরের ঝকমকে তকতকে পরিসরে ঘুরঘুর করে, বিয়ার খায় (পারলে মার্কিন হ্যামবারগারও), মগজে ঠাসা পাটিগণিতও বোঝে, নির্মল নীল আকাশ কিংবা অসহ্য সুন্দর দেখে, রান্নাঘরের ধােয়ায় হাঁসফাস করে, শ্বেতাঙ্গিনীর সঙ্গে বিছানায়ও যেতে চায়। এই ব্যক্তি এমনকি দেখে নেয় কীভাবে উজ্জ্বল আঙুর পৃথিবীর মাটিকে মদির করে চুমো খায়।

বুদ্ধদেব বসুর এই ব্যক্তি নিজেকেই খেয়ে সে বেঁচে থাকে।' এই ব্যক্তি যতটা না প্রেমে পড়ে, তার চেয়ে, প্রেম' নামের এক ধারণার সঙ্গে সে প্রেম করে। কিন্তু তারপরও এই ব্যক্তি স্পর্শের লাল ফুলের উন্মীলন’-এ বিহ্বল হয়ে ভাষার প্রান্তে উপস্থিত হয়। এই ব্যক্তি ‘ডিমের মতো রোদুরও দেখে। এই ব্যক্তি সংরাগ বোঝে, এমনকি রাগও, কিন্তু এই ব্যক্তি যা বোঝে না তা হল তার ঐতিহাসিকতা, যে ঐতিহাসিক জনপদ-আচ্ছন্ন করা কাব্যের, গানের সুরের, ভাবের, দুর্যোগের, বিদ্রোহের। অবশ্যই বলা যাবে যে, বুদ্ধদেব বসু তার কবিতায় যে ব্যক্তি হাজির করেন, তা একাধারে ইউয়োপায়িত, বিচ্ছিন্ন, অনৈতিহাসিক। এই ব্যক্তিই কথা বলে ওঠে বুদ্ধদেব বসুর কবিতায় এভাবে : শুধু তাই পবিত্র, যা ব্যক্তিগত।’

ওই ব্যক্তি এও বলতে দ্বিধাবোধ করে না : তাই বলি, জগতেরে ছেড়ে দাও, থাক্‌ সে যেখানে যাবে,/হও ক্ষীণ, অলক্ষ্য, দুর্গম আর পুলকে বধির। যে সব খবর নিয়ে সেবকেরা উৎসাহে ধীৱধি ঘণ্টা নারীর আলস্যে তার ঢের বেশি পাবে।' এই ব্যক্তি সেই ব্যক্তি যে ভূমি থেকে উৎপাটিত করার উপনিবেশবাদী প্রক্রিয়াকে প্রশ্নহীনভাবে উদ্যাপন করে। এই ব্যক্তির দেহ ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, এই ব্যক্তির ভাষাও ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। অন্য কথায়, এই ব্যক্তির দেহ সংরক্ত হয়ে বস্তুক আয়তন ও অবয়ব লাভ করলেও তা শেষ পর্যন্ত ভূতুড়েই বটে।

বুদ্ধদেব বসুকে নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে পবিত্র সরকার একটা কথা বলেছিলেন এভাবে : যে কবি বাস্তববাদী নয়, সে মৃত। কিন্তু যে কবি শুধুই বাস্তববাদী, সেও মৃত। বাক্যের অদলবদল করে এও বলা যাবে যে কবি শুধুই বাস্তববাদী, সে মৃত। কিন্তু যে কবি বাস্তববাদী নয়, সেও মৃত। কিন্তু বৃদ্ধদেবকে বাঙালি মধ্যবিত্তই বাঁচিয়ে রেখেছে। তিনি আছেন তার একাধিক অবদানের কারণেই। সব্যসাচী লেখকদের জন্য তিনি নিঃসন্দেহে এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা। আর কবিতার নতুন নির্মাণের স্বার্থেই বারবারই বুদ্ধদেব বসুকে স্মরণ করতে হয়; দেখে নিতে হয় তার প্রভাব কতটা গভীর ও কেন।

প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় যুগান্তর ঈদসংখ্যা ২০১৯

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

If Download link doesn't work then please comment below. Also You can follow us on Twitter, Facebook Page, join our Facebook Reading Group to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature. Also try our Phonetic Bangla typing: Avro.app
বইটি শেয়ার করুন :

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2018. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com