চা - মুহম্মদ জাফর ইকবাল [ছোটগল্প]

amarboi
চা

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

শিরীন গত তিন মাসে এক কাপ চাও খায়নি। দেশ স্বাধীন হবার পর বাজার থেকে যেসব জিনিস উধাও হয়ে গেছে ভাল চা তার মাঝে একটা। কিন্তু শিরীনের চা না খাওয়ার কারণ সেটা নয়। শিরীনের বাবার অনেক মানুষের সাথে পরিচয়, তিনি খোঁজখবর করে ভাল এক প্যাকেট চা জোগাড় করে এনেছেন। শরীন ইচ্ছে করলেই খেতে পারে, কিন্তু শিরীন তবু খায় না। সে খায় না তার কারণ সে খেতে পারে না। অনেকবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সে একেবারেই খেতে পারে না। ব্যাপারটা এখনো বাসার কেউ লক্ষ করেনি, শিরীন ইচ্ছে করেই সেটা গোপন রাখছে। সকাল বিকাল সে সবার সাথে চা নিয়ে বসে, মাঝে মাঝে চুমুক দেবার চেষ্টা করে। একসময় কাপে চা ঠাণ্ডা হয়ে আসে, তখন সে কাউকে না দেখিয়ে চা টা কোথাও ঢেলে ফেলে দেয়। এভাবেই চলে আসছে, শিরীনের ধারণা এভাবেই চলবে—সে আর কোনদিন চা খেতে পারবে না।

ব্যাপারটি বেশ গুরুতর। যারা শিরীনকে জানে শুধু তারাই এর গুরুত্ব বুঝতে পারবে। শিরীন চা খেয়ে আসছে সেই চার বছর বয়স থেকে। প্রথম খেত বাবার কাপের তলানিটুকু। বাবা ইচ্ছে করে একটু বেশি রেখে দিতেন তার জন্যে। দুষ্টুমি না করে ভাল হয়ে থাকলে মাঝে মাঝে বাসার বাচ্চাদের আধকাপ করে দুধবহুল এক ধরনের চা দেয়া হতো। শিরীন শুধু চায়ের লোভে বরাবর ভাল মেয়ে হয়ে থেকে এসেছে। তার বড় হওয়ার প্রধান আকর্ষণ ছিল যে সে নিজের ইচ্ছে মতো চা খেতে পাবে। বড় হয়ে সত্যি সত্যি সে চা খাওয়ার ব্যাপারটাকে মোটামুটি উপাসনার পর্যায়ে তুলে এনেছিল। অন্য কারো হাতে তৈরি চা সে খেতে পারত না, চা তৈরি করার ব্যাপারটা তার কাছে ছিল প্রিয় শিল্পকলার মতো। চা খাবার আগে সবার আগে সে টিপটটি ধুয়ে টেবিলে রাখত। তারপর কেতলিতে মেপে পানি দিয়ে চুলার উপরে বসিয়ে দিত। কখনোই সে কেতলিতে পানিকে বেশিক্ষণ ফুটতে দিত না, এতে নাকি পানির ভেতরকার দ্রবীভূত বাতাসটুকু বের হয়ে পানি বিস্বাদ হয়ে যায়। যখন কেতলিতে পানি গরম হচ্ছে তখন সে টিপটে চায়ের চামুচে মেপে চায়ের পাতা ঢালত। তার প্রিয় চা ছিল দার্জিলিং এর সাথে সমান সমান সিলেটের চায়ের পাতা। দার্জিলিং চা দিত সুঘ্রাণ, সিলেটের চা থেকে আসত রং। পানি ফুটে গেলে সে সাবধানে ফুটন্ত পানি ঢালত টিপটে। তারপর চায়ের চামচে একটু চিনি নিয়ে সে টিপটের ফুটন্ত পানিটাকে ভাল করে একবার নেড়ে দিত। পানিতে একটু চিনি থাকলে চায়ের লিকারটি ভাল বের হয়—দুধ থাকলে হয় তার উল্টো, মোটে লিকার বের হতে চায় না। সব শেষ করে টিপটটি টিকুজি দিয়ে ঢেকে দিয়ে শিরীন ঘড়ি ধরে দুই মিনিট অপেক্ষা করত। দুই মিনিট পর যখন চায়ের কাপে চা ঢালা হতো সব সময় সারা ঘর চায়ের মিষ্টি গন্ধে ভরে যেত। চায়ের জন্যে সে দুধও আগে তৈরি করে রাখত। জ্বাল দিয়ে ঘন করে রাখা দুধ। গাঢ় লাল রঙের চায়ের মাঝে দু’চামচ দুধ দিয়ে নেড়ে দিতেই চায়ের একটা কোমল রং ফুটে উঠত সব সময়! তার মাঝে তখন সে দিত এক চামচ চিনি, বাজারের মোটা দানার ময়লা চিনি নয়, অনেক খুঁজে বের করা সূক্ষ্ম দানার ধবেধবে সাদা চিনি। শিরীন চা খেত কারুকাজ করা পাতলা পোর্সেলিনের কাপে, অনেক সখ করে পয়সা জমিয়ে কিনেছিল সেই চায়ের কাপ। দুধের মতো সাদা কাপে হালকা নীল রঙের নক্সা। শিরীন বসে বসে একেবারে দুই থেকে তিন কাপ চা খেত, সাথে আর যারা থাকে তারাও, এত ভাল চা এত সুন্দর করে আর কে খেতে দেবে?

সেই শিরীন চা খেতে পারছে না ব্যাপারটা গুরুতর সন্দেহ কী, কিন্তু কিছু করার নেই। সে চায়ের কাপ হাতে নিলেই দেখতে পায় আঠারো কুড়ি বছরের একটি ছেলে মাছের মতো নিষ্পলক চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টির সামনে তার সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়, সে চায়ের কাপ মুখে তুলতে পারে না। চেষ্টা করে দেখেছে কোন লাভ হয়নি, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে তার, হঠাৎ করে মাথার মাঝে কেমন জানি করে ওঠে। এত যন্ত্রণা সহ্য করার কোন মানে নেই, শিরীন আজকাল আর চেষ্টাও করে না। ছেলে-মেয়ে দুটিকে নিয়ে ভুলে থাকতে চেষ্টা করে।

ছেলেটা বড়, বয়স পাঁচ, ছোটটার বয়স তিন। ছোটটা মেয়ে যদিও তার মেয়েসুলভ কোন হাবভাব নেই। সে বড় ভাইকে অন্ধের মতো অনুকরণ করে এবং দিনের বেশির ভাগ সময় একটা খেলনা বন্দুক নিয়ে অনুগত ভৃত্যের মতো তার পিছনে পিছনে ঘুরতে থাকে। তাদের খেলার বিষয়বস্তু বিশেষ সরল, একটা কোল বালিশকে লাথি মেরে মেরে ঘরের এক কোনা থেকে আরেক কোনায় নিয়ে যাওয়া। আপাতদৃষ্টিতে বালিশটিকে বৈশিষ্ট্যহীন মনে হলেও তাদের কাছে সেটি হচ্ছে বদরবাহিনী। কাজেই খেলার শেষে সব সময়েই এই দুর্ভাগা বালিশটি দু’জনের হাতে শোচনীয়ভাবে প্রাণ ত্যাগ করে। সম্ভবত এই বয়সী বাচ্চাদের জন্যে এটি সঠিক খেলা নয়, কিন্তু কিছু করার নেই। যুদ্ধের সময় প্রতিদিন মানুষ মারার কথাবার্তা শুনে শুনে এরা খুন খারাপির ব্যাপারটি বেশ সহজভাবে নিচ্ছে। শিরীন আশা করে আছে কয়দিন পর এই খেলায় আকর্ষণ কমে আসবে, এক খেলা মানুষ আর কয়দিন খেলতে পারে?

বেলা তিনটার দিকে পিয়ন চিঠি নিয়ে আসে। বাসায় এতগুলো মানুষ, রোজই কারো না কারো জন্যে কিছু একটা থাকে। আজকাল শিরীনও চিঠির জন্যে অপেক্ষা করে, বিভিন্ন জায়গায় চাকরির জন্যে লেখালেখি শুরু করেছে কোন উত্তর আসছে কি না দেখতে চায়। বাসার সবাই তার চাকরির চেষ্টাটাকে একটা কৌতুক হিসেবে নিচ্ছে। পরিচিত মানুষকে ধরাধরি না করে শুধু চিঠি লিখে যে চাকরি পাওয়া যায় না এই সহজ জিনিসটা শিরীন এখনো স্বীকার করে নেয়নি, কৌতুকটা সেখানে। তাছাড়াও বাবার বাসায় উঠে আসার ব্যাপারটাকে শিরীন সহজভাবে না নিয়ে চাকরির চেষ্টা করছে, সেটাও সবার জন্যে খানিকটা মনোকষ্টের কারণ। সেটাকেও কৌতুকের ভান করে নিজেদের মাঝে আড়াল করে রাখা হয়।

শিরীন যখন তার চিঠি পড়া শুরু করেছে তখন তার ছেলে টোপন এবং পিছনে পিছনে অনুগত ভৃত্যের মতো তার মেয়ে শাওন এসে হাজির হলো। টোপন বলল, আম্মা, বড় মামা বলেছে তোমার মাথা খারাপ।

টোপন যেটা বলে শাওনও সব সময় সেটা বলে, কাজেই সেও বলল, তোমার মাথা খারাপ, আম্মু।

শিরীন চিঠি থেকে চোখ না তুলে বলল, ঠিক আছে।

এরকম বড় একটা জিনিস এত সহজে মেনে নিলে ব্যাপারটার মজা নষ্ট হয়ে যায়। টোপন তাই আবার চেষ্টা করল, তোমার কেন মাথা খারাপ আম্মা?

শাওন কৌতূহলী হয়ে বলল, দেখি আম্মা তোমার মাথা, দেখি—

শিরীন বলল, এখন জ্বালাতন করো না। যাও। দেখছ না, আমি চিঠি পড়ছি?

টোপন এবারে অন্যভাবে চেষ্টা করল, বলল, বড় মামা বলেছে কোনদিন তোমার চিঠি আসবে না।

শাওন মাথা নেড়ে যোগ করল, আসবে না, কখনো আসবে না।

শিরীন বলল, ঠিক আছে এখন ভাগ এখান থেকে।

টোপন তবুও শিরীনের কাছাকাছি ঘুরঘুর করতে থাকে। একটু পর ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, আম্মা, তুমি কেন চাকরি করতে চাও? আম্মারা তো কখনো চাকরি করে না।

শাওন এই প্রসঙ্গে বিশেষ উত্তেজিত হয়ে ওঠে, গলা উঁচিয়ে ঝাঁকিয়ে বলল, কখনো করে না কখনো করে না।

শিরীন আড়চোখে দুজনকে একটু দেখে বলল, তোর আব্বা বলেছে আমার চাকরি করতে হবে। মনে আছে?

টোপন প্রতিবাদ করে কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল। আব্বার কথার উপরে কোন কথা হয় না। আব্বা যদি বলে থাকে আম্মার চাকরি করতে হবে তাহলে তো করতেই হবে। টোপন তার মুখে বয়সের তুলনায় বেমানান একটা গাম্ভীর্য এনে বলল, শাওন।

কী?

আব্বা বলেছে আম্মার চাকরি করতেই হবে।

কিন্তু বড় মামা বলেছে আম্মার মাথা খারাপ।

শিরীন হাসি গোপন করে বলল, আমার তো শুধু মাতা খারাপ, তোর বড় মামার কি খারাপ জানিস?

কী?

তোর বড় মামার চোখ খারাপ, নাক খারাপ, গলা খারাপ, পেট খারাপ—সবকিছু খারাপ।

কথাটি এমন কিছু হাসির কথা নয়, কিন্তু বাচ্চা দুটি এটি শুনে হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে থাকে। কোন্ কথায় কতটুক হাসা যায় সে ব্যাপারে ছোটদের এবং বড়দের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই আলাদা। অনেক কষ্ট করে হাসি থামিয়ে শাওন শিরীনের কাছে এসে বলল, আম্মু, আবার বলো দেখি বড় মামার কী খারাপ—

শিরীন আবার অঙ্গভঙ্গি করে বলল, বড় মামার চোখ খারাপ, নাক খারাপ, গলা খারাপ, পেট খারাপ—সবকিছু খারাপ!

আবার দু’জনে হাসতে হাসতে লুটোপুটি খেতে থাকে। ব্যাপারটি শিরীনের বড় ভাই রাজুর জন্যে ভাল হলো না। এখন থেকে কে জানে কতদিন পর্যন্ত তাকে একটু পরে পরে এই অর্থহীন হাস্যকর কথাটি শুনে যেতে হবে।

টোপন শাওনকে নিয়ে বড় মামার খোঁজে চলে যাবার পর শিরীন চিঠিটা আরেকবার পড়ল। চিঠিতে উৎসাহব্যঞ্জক বিশেষ কিছু নেই। কে জানে হয়তো বাবার অন্য সবার কথাই ঠিক সত্যিই হতো ধরাধরি না করে চাকরি পাওয়া যায় না। সে অবশ্যি এত সহজে হাল ছেড়ে দেবে না, টোপন শাওনের বাবা ধরাধরি জিনিসটা দু’চোখে দেখতে পারত না।

শিরীন খাবার টেবিলে কাগজ-কলম নিয়ে চিঠির উত্তর লিখতে বসল। খানিকটা লিখেছে তখন মা এসে জিজ্ঞেস করলেন, চা খাবি এক কাপ?

শিরীন অন্যমনস্কভাবে বলল, না।

মা বলল, আজকাল দেখি একেবারে চা খেতে চাস না।

শিরীন মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ইচ্ছে করে না মা।

গলার স্বরে কিছু একটা ছিল, মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সরে গেলেন।

সারাদিন কোন না কোনভাবে কেটে যায়, কিন্তু রাতটা আর কাটতে চায় না। সন্ধ্যে হবার পরই কেমন জানি মনটা বিষণ্ন হয়ে যায়। বাসার সবাই চেষ্টা করে তাকে হাসিখুশি রাখতে। বাচ্চা দুটিকে নিয়ে নতুন নতুন খেলা আবিষ্কার করা হয়, সবাই মিলে বই দেখে রান্না করা হয়, বাবা কখনো কখনো ‘বরযাত্রী’ পড়ে শোনান। সবার সাথে যতক্ষণ থাকে শিরীন চেষ্টা করে হাসিখুশি থাকতে, কিন্তু যখন নিজের ঘরে বাচ্চা দুটিকে নিয়ে শুতে আসে মনে হয় বুকটা বুঝি ভেঙে যাবে। দশ বছর ঘর করেছিল মানুষটার সাথে, সেই মানুষটা আর কখনো ফিরে আসবে না, শিরীন কেমন করে সেটা মেনে নেয়?

শাওন সারাদিন হৈ চৈ করে এত ক্লান্ত হয়ে থাকে যে বিছানায় শোওয়ানোর পর ‘আমি এখন ঘুমাব না—ঘুমাব না’, —বলে বার কয়েক মাছের মতো লাফ দিয়ে প্রায় সাথে সাথেই ঘুমিয়ে যায়। টোপন বড় হয়েছে সে অপেক্ষা করে শিরীনের জন্য। কেমন করে জানি বুঝতে পারে মায়ের মন খারাপ, চেষ্টা করে ভুলিয়ে রাখতে। মায়ের মন ভাল করার জন্যে পৃথিবীর এমন কোন প্রসঙ্গ নেই যা নিয়ে কথা বলে না, শুধু ভুলেও কখনো বাবার কথা তোলে না। ছোট বাচ্চারা এত বুঝতে পারে কেমন করে কে জানে?

টোপনকে বিছানায় শুইয়ে শিরীন চিরুনি নিয়ে চুল ঠিক করছিল। দীর্ঘদিনের অভ্যাস, ঘুমানোর আগে চুল শক্ত করে না বেঁধে শুতে পারে না। সেই ছেলেবেলায় মা বলেছিলেন ঘুমানোর সময় শক্ত করে চুল বেঁধে শুলে চুল বড় হয়, সেই থেকে তাই করে আসছে। টোপন আর শাওনকে দুই কোলে নিয়ে নুরুল তার চুল ঠিক করা নিয়ে কতই না হাসাহাসি করত! মানুষটার কথা মনে পড়ে আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল শিরীন। মানুষ মরে গেলে কী হয় কেউ কি বলতে পারে? কিছু কি হয় সত্যি?

মা এক কাপ চা নিয়ে ঢুকলেন, টেবিলে রেখে বললেন, শিরীন খেয়ে দেখ তো চা টা কেমন। রাজু এনেছে, দার্জিলিং চা নাকি।

শিরীন বলল, টেবিলে রেখে দাও মা, খাব।

টোপন মশারির ভেতর থেকে বলল, নানু, বড় মামা চা এনেছে?

হ্যাঁ।

নানু তাহলে তো এই চা খাওয়া যাবে না।

কেন গো সোনা।

তুমি জানো না, বড় মামার চোখ খারাপ, নাক খারাপ, পেট খারাপ—সবকিছু খারাপ। কথা শেষ করার আগেই টোপন অট্টহাসি দিয়ে বিছানায় গড়াগড়ি দিতে থাকে। আজ সারাদিনে বাসার সবাই অজস্রবার দু’জনের মুখ থেকে এই অর্থহীন কথাটি শুনে এসেছে, কিন্তু তবুও মা টোপনের সাথে হাসিতে যোগ না দিয়ে পারলেন না। যদি সুচিন্তিত অর্থবহ কথাতেই মানুষকে হাসতে হবে তাহলে হাসির জিনিস তার কয়টা থাকবে পৃথিবীতে?

মা চায়ের কাপ টেবিলে রেখে চলে গেলেন। কাপে চা ঠাণ্ডা হতে থাকে। শিরীন একদৃষ্টে চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে থাকে, আবার পুরো ব্যাপারটা মনে পড়ে যায়। ডিসেম্বরের বারো তারিখ ছিল সেদিন। রাত দশটার মতো বাজে, বাচ্চারা, সকাল সকাল ঘুমিয়ে গেছে তাই বসে চা খাচ্ছিল ওরা। দরজায় শব্দ হলো তখন। নুরুল খুলে দেখে তার এক ছাত্র। অবাক হয়ে বলল, বারেক! কী ব্যাপার?

ছেলেটার গায়ে চাদর জড়ানো, মুখে হালকা দাড়ি। চোখের দৃষ্টি মাছের মতো নিষ্পলক। সালাম দিয়ে বলল, স্যার আপনি একটু আসতে পারবেন।

কোথায়?

আমার সাথে।

কেন?

ছেলেটা একটু ইতস্তত করে বলল, কয়েকজন মানুষকে আইডেন্টিফিকেশন করার জন্যে।

নুরুল কেমন জানি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে গেল। চারদিকে নানারকম গুজব, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার প্রফেসারদেরকে জামায়াতে ইসলামীর লোকজন, আল-বদরেরা নাকি ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এও কি তাদের দলের কেউ? ছেলেটা হেসে বলল, বেশিক্ষণ লাগবে না স্যার, মাত্র আধাঘণ্টা।

ঠিক আছে চলো।

শিরীন বলল, চা-টা শেষ করে যাও। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি খাবেন এক কাপ?

ছেলেটার মাছের মতো চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। শিরীন দেখল চোখে হালকা সুরমা দিয়েছে এই ছেলে। হাত ঘষে বলল, দেন একটু। বাইরে যা ঠাণ্ডা।

শিরীন টিপট থেকে এক কাপ চা ঢেলে দিল ছেলেটাকে।

ছেলেটার সাথে নুরুল বের হয়ে যাবার পর দরজা বন্ধ করে চায়ের কাপগুলো তুলতে গিয়ে শিরীন দেখল ছেলেটা তার চা স্পর্শ করেনি, কাপে পুরো চা রয়ে গেছে। কী কারণ কে জানে, হঠাৎ করে বুকটা ধক্ করে ওঠে শিরীনের।

ষোলো তারিখ মিলিটারিরা সারেন্ডার করল রেসকোর্সে। নুরুলকে পাওয়া গেল আঠারো তারিখ রায়ের বাজারের বিলে। হাত পিছনে বাঁধা, মাথায় আর বুকে গুলি। প্রফেসর রায়হানও ছিলেন সেখানে, ডক্টর ইদ্রিসও। আরো অনেকে। সবাইকে শিরীন চেনে না। নুরুলকে তুলে এনে কবর দিল বাসার লোকজন, শিরীনকে দেখতে দিল না। কতদিন পড়েছিল বিলে কে জানে, সুপুরুষ একটা মানুষ মরে গেলে কত তাড়াতাড়ি না বিকৃত হয়ে যায়।

শিরীন লক্ষ করল তার শরীর অল্প অল্প কাঁপছে। কষ্ট করে নিজেকে শান্ত করে সে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বাথরুমের বেসিনে পুরোটা ঢেলে ফেলে দিল। খালি কাপ নিয়ে শোওয়ার ঘরে ফিরে আসতেই মশারির ভেতর থেকে টোপন ডাকলো, আম্মা।

কী বাবা?

তুমি সব সময় চা না খেয়ে ফেলে দাও কেন?

শিরীন ছেলের দিকে তাকাল। আর কেউ ধরতে পারেনি, কিন্তু এইটুকু ছেলে ঠিক ধরে ফেলেছে। কী উত্তর দেবে শিরীন?

কেন ফেলে দাও?

নুরুল সব সময় বলতো বাচ্চাদের কখনো মিথ্যে কথা বলবে না। লোকটা মরে গেছে, তার কথা রাখবে শিরীন, টোপনকে সত্যি কথাই বলবে। বিছানায় উঠে গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে বলল, আমার আর চা খেতে ভাল লাগে না।

কেন?

তোর আব্বুকে যে লোকটা নিয়ে মেরে ফেলেছিল তাকে আমি এক কাপ চা দিয়েছিলাম। লোকটা সে চা-টা খায়নি। সেই থেকে চা দেখলেই আমার সেই লোকটার কথা মনে পড়ে। আমি আর চা খেতে পারি না।

টোপন দীর্ঘসময় চুপ করে থেকে বড় মানুষের মতো বলল, ও।

শিরীন টের পাচ্ছিল তার চোখে পানি এসে যাচ্ছে, অনেক কষ্ট করে আটকে রাখল সে। টোপনের সামনে কাঁদতে চায় না কিছুতেই। খানিকক্ষণ দুজন চুপ করে বসে রইল, তারপর টোপন আস্তে আস্তে বলল, আম্মা।

কী বাবা।

আব্বু তোমাকে যেভাবে ধরে রাখত আমি সেভাবে তোমাকে ধরে রাখব?

রাখ বাবা।

টোপন দুই হাত দিয়ে শক্ত করে শিরীনকে জড়িয়ে ধরে।

হে ঈশ্বর, পৃথিবীর মানুষের জন্যে তুমি এত দুঃখ কেন তৈরি করেছিলে?

বেড সুইচ টিপে আলো নিভিয়ে দিতেই মেঝেতে এক ঝলক চাঁদের আলো এসে পড়ল। জোছনার কোমল আলো এমনিতে চোখ পড়ে না, সেটা চোখে পড়ে যখন সব আলো নিভে যায় তখন।
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

If Download link doesn't work then please comment below. Also You can follow us on Twitter, Facebook Page, join our Facebook Reading Group to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature. Also try our Phonetic Bangla typing: Avro.app
বইটি শেয়ার করুন :

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2018. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com