Pages

ভালবাসার নক্ষত্র - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

amarboi
ভালবাসার নক্ষত্র

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আজহার ভাই উঠে দাঁড়ালেন, মনে হয় একটা লেকচার ঝাড়বেন। এটা লেকচার ঝাড়ার সময় না আর লেকচার শোনার মতো কারোর মনের অবস্থাও নেই, কিন্তু তবু মনে হয় তিনি তার লেকচারটা ঝেড়ে দেবেন। কে জানে কতক্ষণ থেকে তিনি মনে মনে এটা ঝালাই করছেন। ফরিদ আজহার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে একটা হাই তুলল। এই মানুষটির কথাবার্তা হাবভাব এমনি বৈচিত্র্যহীন যে তাকে দেখলে এমনিতেই হাই উঠে যায়। ছোটখাটো একটা হাই উঠবে ভেবেছিল কিন্তু ফরিদ অবাক হয়ে দেখল সে বিকট একটা হাই তুলল। হাই তুলতে গিয়ে একবার নাকি কার চোয়াল আটকে গিয়েছিল, কিছুতেই আর মুখ বন্ধ হয় না। হাই তোলার সময় মাঝে মাঝেই ফরিদের এই গল্পটা মনে পড়ে, আজো পড়ল। কপাল ভাল তার মুখটা আটকে গেল না হাইটা বের করে দিয়ে সেটা আবার সহি সালামতে বন্ধ হয়ে গেল।

বন্ধুগণ। আজহার ভাই গলা কাঁপিয়ে বললেন, লাল সালাম।

ফরিদ আজহার ভাইয়ের দিকে তাকাল, লোকটার বুদ্ধিশুদ্ধি মনে হয় বেশি নেই। যা ছিল তাও মনে হয় মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিংয়ে একেবারে ধুয়ে-মুছে গেছে। তা না হলে অন্ধকার নদীর তীরে মাঝে দাঁড়িয়ে মশার কামড় খেতে খেতে কেউ কখনো লাল সালাম দেয়? লাল সালাম জিনিসটা কী? সালাম আবার লাল হয় কেমন করে?

বন্ধুগণ, আমাদের দীর্ঘ প্রস্তুতির আজ হবে অগ্নিপরীক্ষা।

লে শালার অগ্নিপরীক্ষা! মাথায় গুলির বাক্স নিয়ে এই যে জলিল খালি পায়ে আঠালো কাদার মাঝে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছে তাকে জিজ্ঞেস করে দেখো দেখি অগ্নিপরীক্ষা কথাটার মানে জানে কি না? একশো টাকা বাজি সে যদি ‘পরীক্ষা’ কথাটার মানে বলতে পারে, ‘অগ্নি’ তো ছেড়েই দিলাম। ফরিদের মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় জলিল এখনো জানে কি না যে সে কোন্ পক্ষে যুদ্ধ করছে, পাকিস্তানের নাকি স্বাধীন বাংলার।

মনে রেখো কমরেডরা, আমরা মরতে আসিনি—আজহার ভাই হুংকার দিলেন, আমরা মারতে এসেছি। শত্রুর বিষদাঁত ভেঙে দেব চিরদিনের মতো।

দাদ ও খুজলির মলম বিক্রি করার সুরে আজহার ভাইয়ের গলা ওঠানামা করতে থাকে। ফরিদ প্রথম খানিকক্ষণ মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করল কিন্তু লাভ হলো না, বক্তব্যটা ঠিক ধরা গেল না। আওয়ামী লীগ দেশের জন্যে কি একটা সাংঘাতিক জিনিস করছে এ ধরনের কথাবার্তা বলে মনে হয়। কিছুক্ষণ শুনে ফরিদ অন্যমনস্ক হয়ে যায় আর ঠিক তার দ্বিতীয়বার হাই উঠল, তার প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেটি আবার বিকট একটি হাইয়ে পরিণত হয়ে গেল। কিছু করার নেই, ফরিদ বুঝতে পারে এখন তার একটার পর একটা হাই উঠতে থাকবে। রাত প্রায় দুইটা বাজে, সারাদিন ঘুম নেই, কিন্তু সেজন্যে তার হাই উঠছে না। তার হাই উঠছে কারণ সে একটু একটু ভয় পাচ্ছে। সে যখন একটু একটু ভয় পায় কিন্তু কিছু করতে পারে না তখন তার এরকম একটার পর একটা হাই উঠতে থাকে। পরীক্ষার হলে প্রশ্ন পাবার ঠিক আগে তার এরকম হাই ওঠে, প্রথমবার গোপনে বিলকিসের সাথে দেখা করার জন্যে সে যখন লাইব্রেরির সামনে অপেক্ষা করছিল তার এরকম হাই উঠছিল। বিলকিস! এখন কোথায় আছে কে জানে? মনে হলেই বুকের ভেতর জানি কী রকম করে ওঠে।

ফরিদ বিরক্ত ভঙ্গিতে আজহার ভাইয়ের দিকে তাকাল। লোকটার আক্কেল বলে কিছু নেই, শুধু ইউনিভার্সিটিতে পড়ে বলে তাকে তাদের গ্রুপ কমান্ডার তৈরি করে দেয়া হয়েছে। লোকটার কী কমান্ডার হবার মতো কোন যোগ্যতা আছে? মুক্তিবাহিনীর একজন কমান্ডার কী ঠিক অপারেশনের আগে এরকম ঘ্যান ঘ্যান করে বইয়ের ভাষায় বক্তৃতা শুরু করে? ফরিদ আবার অন্যমনস্ক হয়ে যায়, আবছা অন্ধকারে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হয় সবকিছু একটা স্বপ্ন, এক্ষুনি তার ঘুম ভেঙে যাবে আর দেখবে সে তার পরিচিত বিছানায় শুয়ে আছে, মাথার কাছে টেবিলে খালি চায়ের কাপ, নিচে সমরেশ বসুর একটা আধখোলা উপন্যাস, জানালা দিয়ে রাতের আকাশ দেখা যাচ্ছে। কখনো কী সে কল্পনা করেছিল অন্য কিছু নয়, শুধু নিজের ঘরে বিছানায় আধশোয়া হয়ে একটা ঝাঁজালো উপন্যাস পড়ার মতো সহজ ব্যাপারটির জন্যে সে এরকম বুভুক্ষের মতো অপেক্ষা করবে? আবার কবে সে করতে পারবে সেটা? পারবে কি কোনদিন? ফরিদ একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

ঠিক তখন আজহার ভাইয়ের বক্তৃতা শেষ হলো, কারণ ফরিদ শুনল তিনি বিকট সুরে বললেন, ‘জয় বাংলা’। বেশি আবেগ দিয়ে বলেছেন বলেই হয়তো সেটা শোনাল ‘জেয় বাংলা’।

সাবই সমস্বরে উত্তর দিল ‘জয় বাংলা’। ভাগ্যিস আশেপাশে কোন বাড়িঘর নেই, থাকলে এই স্লোগান শুনে সবার পিলে চমকে উঠত তাতে কোন সন্দেহ নেই। জয় বাংলা স্লোগানটা এভাবে লেগে যাবে কে জানত, ভাল স্লোগানের নিয়মকানুনের কোনটাই এখানে ব্যবহার করা হয়নি। স্লোগান সব সময় হতে হয় দুই অংশ, একজন চিৎকার করে বলে প্রথম অংশ অন্যরা সবাই তখন বলে দ্বিতীয় অংশ। যেরকম পাকিস্তান-জিন্দাবাদ। একজন বলে পাকিস্তান অন্যেরা বলে জিন্দাবাদ। তাছাড়া ভাল স্লোগানে একটু ছন্দও থাকতে হয়, যেমন ‘টিক্কা খানের চামড়া’ ছিলে নিব আমরা’। জয় বাংলা স্লোগানে না আছে নিয়মকানুন না আছে ছন্দ, প্রথম পার্টি বলে ‘জয় বাংলা’ দ্বিতীয় পার্টিও বলে ‘জয় বাংলা’। এটা আবার কেমন ধরনের স্লোগান? কিন্তু কেমন লেগে গেছে দেখো! পৃথিবীতে আর কি একটি স্লোগানও আছে যেটি শুধু উচ্চারণ করার জন্যে মানুষকে গুলি করে মারা হয়? না বুঝে উচ্চারণ করলেও? পাঁচ বছরের শিশুকেও? আজ থেকে কুড়ি বছর পর কাউকে এটা বললে সে বিশ্বাস করবে যে পৃথিবীর সবচেয়ে নৃশংস জাতি হচ্ছে পাকিস্তান জাতি, শুধু জয় বাংলা স্লোগান দেয়ার জন্যে তারা পাঁচ বছরের শিশুকে গুলি করে মারে?

মনে হয় করবে না।

আজহার ভাই নিশ্চয়ই সবাইকে হাঁটতে বলেছেন, অন্যমনস্ক ছিল বলে ঠিক শুনতে পায়নি। সবাই হাঁটতে শুরু করেছে, ফরিদও তাদের সাথে হাঁটতে শুরু করে। ঘণ্টাখানেক আগে তাদের স্কাউট রাব্বানী মাস্টারকে পাঠানো হয়েছে। মুখে ছাগল দাড়ি আর চোখে সুরমা দেখে কে সন্দেহ করবে সে মুক্তিবাহিনীর ভেতরের লোক। রাস্তায় কোনরকম সমস্যা দেখলে সে ফিরে এসে তাদের থামাবে। সবকিছু ঠিকঠাক হলে থানা থেকে আধমাইল দূরে স্কুলঘরে তাদের সাথে দেখা করার কথা। অনেক ভেবেচিন্তে আজকের অপারেশনটা ঠিক করা হয়েছে। তাদের দলে এখন আটজন। এর মাঝে বেশির ভাগই নতুন। ফরিদ নিজে, আজহার ভাই আর লালু নামের গোমড়া মুখের ছেলেটা আগে ছোটখাটো অপারেশনে গিয়েছে। অন্যেরা আর কেউ কখনো যায়নি, সবেমাত্র ট্রেনিং শেষ করেছে। যারা নতুন তাদের জন্যেই এই সোজা অপারেশনটি বেছে নেয়া হয়েছে। জলাডিঙি থানায় গোটা ছয়েক রাজাকার আর কিছু স্থানীয় পুলিশ থাকে। খালি হাতে গিয়ে ধমকাধমকি করলেই তারা নাকি জামা-কাপড়ে পেচ্ছাব করে দেয়। নিশি রাতে হঠাৎ করে গিয়ে যদি তাদের কানের কাছে মেশিনগান দিয়ে ব্রাশ ফায়ার শুরু করা হয় তাদের বাপ বাপ বলে পালিয়ে যাবার কথা। তখন থানাটা দখল করে স্বাধীন বাংলার পতাকাটা তুলে দিয়ে সময় থাকতে থাকতে আবার সরে আসতে হবে। যারা নতুন তাদের একটু অভিজ্ঞতা হবে, সাহস বাড়বে পরের বার হয়তো আরো বড় কিছু করতে পারবে। পাশের থানায় নাকি পুরো এক কোম্পানি পাকিস্তানি মিলিটারি এসেছে। খবর পেলে তারা চলে আসতে পারে, তার আগেই সরে পড়ার কথা। এখনো তাদের পেশাদার মিলিটারির সাথে সামনাসামনি যুদ্ধ করার সময় হয়নি। সামনাসামনি যুদ্ধ করার জন্যে দরকার ভাল অস্ত্র। একটা চাইনিজ ভারী মেশিনগান, একটা রকেট লঞ্চার আর একটা তিন ইঞ্চি মর্টার থাকলে যুদ্ধের পুরো ব্যাপারটাই অন্যরকম হয়ে যায়। থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা যায়, কিন্তু সত্যিকার যুদ্ধের জন্যে দরকার সত্যিকার অস্ত্র। আটজনের এই দলটাতে রয়েছে মাত্র একটা হালকা মেশিনগান, একটা অটোমেটিক রাইফেল আর একটা স্টেনগান, বাকি সব থ্রি নট থ্রি রাইফেল। যেটুক গোলাগুলি বয়ে নিয়ে যাচ্ছে টেনেটুনে একঘণ্টার মতো চলবে কি না সন্দেহ। আজ অবিশ্যি সহজ অপারেশন, একঘণ্টা দূরে থাকুক মিনিট দশেকও লাগার কথা নয়।

জলিল একটু পিছিয়ে ফরিদের পাশে পাশে হাঁটতে থাকে। নির্বোধ এই মানুষটিকে কেউই কোনরকম গুরুত্ব দেয় না অথচ সেটা নিয়ে তার কোন রকম দুঃখ আছে বলে মনে হয় না। ফরিদ পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল, কষ্ট হচ্ছে বাই?

শব্দটি বাই নয়, শব্দটি ভাই—ফরিদ শুদ্ধ করে দিতে গিয়েও গেল না। লাইট মেশিনগানটা ঘাড় বদল করে বলল, না।

নাম লাইট, বাংলায় যেটার অর্থ হালকা, কিন্তু জিনিসটা কী ওজন! এটাকে কী ঠাট্টা করে এই নাম দেয়া হয়েছে? মনে হয় না, মিলিটারির লোকজনের রসবোধ খুব তীক্ষ্ণ হওয়ার কথা নয়। কে জানে মিলিটারিরা এত তাগড়া জোয়ান হয়ে যে তাদের কাছে হয়তো এটা হালকাই মনে হয়!

জলিল আলাপ চালিয়ে যাওয়ার জন্যে বলল, আপনাগো তো মাল টানাটানি করে অব্যাস নাই।

শব্দটি অব্যাস না, শব্দটি অভ্যাস। এখানেও ফরিদ শুদ্ধ করে দিল না। বলল, অভ্যাস না থাকলে কী হয়? শরীরের আরেক নাম মহাশয়, তাকে যা সহানো যায় তাই সয়।

হা হা হা—জলিল বিকট স্বরে হাসতে থাকে, কিছুতেই আর থামতে পারে না। কথাটি তার এত পছন্দ হয়ে যাবে কে জানত, জানলে ফরিদ বলত না, স্বল্পবুদ্ধির মানুষকে এভাবে উত্তেজিত করা ঠিক না। জলিল অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বলল, বাই, আপনি তো অনেক মজার কথা বলেন। শরীলের নাম মহাশয়—হা হা হা।

শব্দটা শরীল না শব্দটা শরীর। এবারেও ফরিদ শুদ্ধ করে দিল না। একে ঘাঁটিয়ে কাজ নেই, কিছু একটা বললে সেটা তাকে বোঝাতেই হয়তো আধঘণ্টা পার হয়ে যাবে। ফরিদের কাছে খুব বেশি উৎসাহ না পেয়ে জলিল এবারে পিছিয়ে আরেকজনের সঙ্গে আলাপ জমাল। ফরিদ শুনল সে বলছে, শুনছেন, ফরিদ বাই কী কইছেন শুনেছেন? কইছেন, শরীলের নাম মহাশয়, হা হা হা।

জলিলের মাথার ভেতরে গিয়ে একবার দেখতে পারলে হতো সেখানে কী আছে। সম্ভবত চায়ের চামচের দু’চামচ মস্তিষ্ক, এর বেশি হবার কথা নয়। ফরিদের মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে জলিলের মাথায় একটা ঠোকা দিয়ে দেখতে, সে মোটামুটি নিঃসন্দেহ যে তাহলে ভেতর থেকে একটা ফাঁপা আওয়াজ বের হবে!

হালকা মেশিনগানটা আবার ঘাড় বদল করে ফরিদ আকাশের দিকে তাকাল। ঝকঝকে পরিষ্কার একটা আকাশ, লক্ষ লক্ষ নক্ষত্র ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। ঐ যে চারটা তারা চতুর্ভুজের মতো সাজানো, ওটার কী নাম কে জানে? খগোল পরিচয় নামে একটা বই দেখেছিল সে, সবকিছু লেখা ছিল সেখানে, কোন নক্ষত্র কোথায় থাকে, কোনটার কী নাম। তখন কোনই কৌতূহল হয়নি। আজকাল দীর্ঘ রাত সে নক্ষত্রদের দেখে, কোন কোনটার সাথে তার গোপন ভালবাসার মতো রাত হয়ে গেছে। যুদ্ধ যদি শেষ হয় বইটা খুঁজে বের করে তার ভালবাসার নক্ষত্রগুলোর নাম জেনে নিতে হবে।

ফরিদ ভাই

নবাব সিরাজদ্দৌলা ফরিদের কাছে এসে গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করে, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?

করো।

এই চরিত্রটির নাম সিরাজ। ফরিদ মনে মনে তাকে নবাব সিরাজদ্দৌলা বলে ডাকে। তার কারণ তাদের পুরো দলে এর মতো শৌখিন মানুষ আর একটিও নেই, মুক্তিযুদ্ধের চালু ফ্যাশন হচ্ছে চুল দাড়ি গজিয়ে চে গুয়েভারার মতো হয়ে যাওয়া। তার মুখেও লম্বা দাড়ি, চুলও এখন প্রায় কাঁধ ছুঁই ছুঁই করছে। কিন্তু নবাব সিরাজদ্দৌলার লুঙ্গির গোঁজে একটা কৌটায় রয়েছে একটা কমেট ব্লেড, এক টুকরো সাবান আর শবনমের ছবিওয়ালা ছোট একটি গোল আয়না। যখনই সময় পায় মুখে সাবান ঘষে কমেট ব্লেডটি খালি হাতে ধরে সে দাড়ি কামিয়ে ফেলে। ব্যাপারটি বিস্ময়কর, পুরনো একটি ব্লেড দিয়ে কড় কড় শব্দ করে এত তাড়াতাড়ি যে দাড়ি কামিয়ে ফেলা যায় সেটি নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হওয়ার কথা না। শুধু যে দাড়ি কামায় তাই না, তারপর দুই হাঁটুতে ছোট আয়নাটা চেপে ধরে সে তার বগল কামানো শুরু করে দেয়। ভয়াবহ ব্যাপার, দেখে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার অবস্থা হয়। ফরিদ প্রায় নিশ্চিত যে এই চরিত্রটি তার শরীরের অন্যান্য অংশের রোমরাজিকেও সমপরিমাণ উৎসাহে নিয়মিতভাবে উৎপাটিত করে থাকে, তবে কপাল ভাল সেগুলো আর কাউকে দেখতে হয় না। এই যুদ্ধ শুরু না হলে সে ঘূণাক্ষরেও সন্দেহ করতে পারত না যে আপাত দর্শনে নেহায়েত একটি সাদামাটা মানুষের কত রকম বিচিত্র অভ্যাস থাকতে পারে।

নবাব সিরাজদ্দৌলা গলা নামিয়ে বলল, আপনি কি নিজের চোখে কখনো সিনেমার নায়িকা দেখেছেন?

নায়িকা?

হ্যাঁ। শবনম, সুচন্দা, না হয় কবরী?

না, দেখি নাই। কেন?

আমাদের গ্রামের একজন দেখেছে। সে বলেছে সিনেমার মাঝে দেখতে তাদের যত সুন্দর লাগে আসলে নাকি তারা তত সুন্দর না। গায়ের রং নাকি শ্যামলা।

তাই নাকি?

হুঁ। সেইটা কেমন করে হয় ফরিদ ভাই? সেইটা কী হতে পারে?

ফরিদ নবাব সিরাজদ্দৌলার সাথে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি নিয়ে আলাপ করার চেষ্টা করে আবিষ্কার করল, নবাব সিরাজদ্দৌলার তুলনায় চিত্র জগৎ সম্পর্কে তার জ্ঞান একেবারেই সীমিত। নবাব সিরাজদ্দৌলা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে চায়ের দোকানে বসে চিত্রালী গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে আসছে। চিত্র তারকাদের সম্পর্কে সে যেটুকু জানে চিত্র তারকারা নিজেরাও তাদের সম্পর্কে ততটুকু জানে কি না সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ শেষ করায় নবাব সিরাজদ্দৌলার ব্যক্তিগত আগ্রহ রয়েছে, সে আবার চায়ের দোকানে বসে নিরবচ্ছিন্ন শান্তিতে প্রতি সপ্তাহে চিত্রালী পড়া শুরু করতে চায়।

আগুন আছে কার কাছে? সালাম ভাই মুখে একটা সিগারেট চেপে ধরে দল থেকে বের হয়ে দাঁড়ালেন।

আমার কাছে আছে। ফরিদ পকেট থেকে ম্যাচটা বের করে দিল। সালাম ভাইয়ের সিগারেট খাওয়া দেখে তারও সিগারেট ধরানোর ইচ্ছে হলো, পকেট হাতড়ে প্যাকেটটি বের করছিল, সালাম ভাই তাকে থামিয়ে নিজের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে দিলেন। সিগারেট এখন দুষ্প্রাপ্য জিনিস, সবাই নিজের সঞ্চয় যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখে সালাম ভাই ছাড়া। লোকটি অসাধারণ, বলা যায় তাদের দলের একমাত্র খাঁটি ভদ্রলোক। তাদের সবার মাঝে সম্ভবত তার বয়স সবচেয়ে বেশি, বিয়ে করেছেন, দুইটা ছোট ছোট বাচ্চাও রয়েছে। কালীগঞ্জ বাজারের ছোট মনিহারী দোকান ছিল, মে মাসের গোড়ার দিকে মিলিটারির আগুনে পুরো বাজারের সাথে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তখন বউ বাচ্চাকে শ্বশুরবাড়িতে রেখে যুদ্ধে চলে এসেছেন। সালাম ভাই ফরিদকে সিগারেট দিচ্ছেন দেখে শাহজাহান এগিয়ে এসে হাত বের করে দিল। শাহজাহানের নামটি মোগল বাদশাহের হলেও তার স্বভাব চরিত্র ছোটলোকের। ফরিদ লক্ষ করে দেখেছে শাহজাহানের কড়ে আঙুলটি ছোট। কিরোর হাত দেখার বইয়ে পড়েছিল, কারো হাতের কড়ে আঙুল ছোট হলে সে পকেটমার হয়।

সালাম ভাই সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললেন, একটু জিরাতে পারলে হতো। মাজা ব্যথা হয়ে যাচ্ছে।

ফরিদ বলল, আজহার ভাইকে বলি?

না থাক। সালাম ভাই নির্মমভাবে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললেন, ইস্কুল তো এসেই যাচ্ছে, তখন জিরাবো। একটু থেমে যোগ করল, শালার উকুনের জ্বালায় আর পারি না।

ফরিদ হেসে বলল, কেন গালি দিচ্ছেন সালাম ভাই, কালকেই আপনাকে ফাস্ট প্রাইজ জোগাড় করে দিল।

সালাম ভাই উচ্চ স্বরে হেসে উঠল, চাপা গুমোট ভাবটা কেটে হঠাৎ করে পরিবেশটা তরল হয়ে যায়।

দলে সবার মাথায় উকুন হয়েছে। ফরিদ প্রথমবার যখন চিরুনিতে একটা নধর উকুন আবিষ্কার করেছিল তার বিস্ময়ের সীমা ছিল না। লজ্জার এই ব্যাপারটি সে গোপন রাখার চেষ্টা করছিল। কিন্তু দেখা গেল অন্যেরা উকুনের ব্যাপারটি বেশ স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে। সালাম ভাই রসিক ব্যক্তি, তিনি উকুন দিয়ে একটা খেলা আবিষ্কার করে ফেললেন। প্রথমে সবাই গোল হয়ে বসে নিজের মাথা আচড়ে উকুন বের করে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার, প্রথমবার ফরিদের মাথা থেকে মোট চৌদ্দটি নানা আকারের উকুন বের হয়েছিল। তারপর সবাই বেছে সবচেয়ে পুরুষ্ট উকুনটি নিয়ে সালাম ভাইয়ের কাছে আসে। সালাম ভাই তখন কাগজে একটি গোল বৃত্ত আঁকেন। সেটার নাম দেয়া হয় উকুন স্টেডিয়াম। স্টেডিয়ামের মাঝে তিনি সবগুলো উকুন ছেড়ে দেন। যার উকুন সবচেয়ে প্রথম বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসতে পারে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। খেলাটি দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে যাচ্ছে, কারণ অন্যান্য গ্রুপেও সেটি খেলা হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। কিছুদিনের ভেতরে বিভিন্ন মুক্তিবাহিনীর দলের ভেতরে একটা টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হবে বলে শোনা যাচ্ছে। আজহার ভাই আগে এইসব ছেলেমানুষী ব্যাপার থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতেন। ইদানীং তিনিও খেলায় যোগ দিচ্ছেন এবং অন্যদের মতো চিৎকার করে নিজের উকুনকে উৎসাহ দিচ্ছেন। জয়নালের সব ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করার অভ্যাস, সেদিন তার উকুন বিজয়ী হওয়ার পর কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উকুনটিকে আবার নিজের চুলের মাঝে ছেড়ে দিয়েছিল।

আজহার ভাই সবাইকে থামতে বললেন। সামনে স্কুলের দোচালা ঘরটা দেখা যাচ্ছে। ভেতরে রাব্বানী মাস্টার থাকার কথা। তিনি এগিয়ে গিয়ে চাপা গলায় ডাকলেন, রাব্বানী মাস্টার?

কোন উত্তর শোনা গেল না। অভ্যেসবশত সবাই একটু পিছিয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নেয়।

রাব্বানী মাস্টার? আজহার ভাই আবার ডাকলেন, আমি আজহার।

তখন সন্তর্পণে কয়েকজন বের হয়ে আসে। কাছে এলে দেখা গেল রাব্বানী মাস্টার আর তার সাথে আরো দুজন স্থানীয় লোক।

আজহার ভাই ওদের দিকে ঘুরে বললেন, সবাই বিশ্রাম নাও দশ মিনিট। সাথে সাথে যে যেখানে ছিল সেখানেই বসে পড়ল। শরীর এক আশ্চর্য জিনিস, প্রয়োজনে তাকে যা খুশি করিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু বিশ্রামের লোভ দেখালে চোখের পলকে সেটা লুফে নেয়।

থানাটি ঘিরে ওরা আটজন নিঃশব্দে পজিশন নিয়েছে। বেশিরভাগ জায়গায় থানার আশপাশে সব গাছপালা কেটেকুটে পরিষ্কার করে দেয়া হয়েছে। এখানে শুধু গোটা ছয়েক রাজাকার, পাকিস্তানি মিলিটারিরা এখনো আসেনি, এলে নিশ্চয়ই এর চেহারা পাল্টে যাবে। তখন দু-এক মাইলের ভেতরে পজিশন নেয়ার জায়গা থাকবে না।

ফরিদ সড়কটার পাশে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। হালকা মেশিনগানটা রাখার জন্যে একটা সমতোল জায়গা দরকার, কিন্তু সেরকম ভাল জায়গা পাওয়া গেল না। একবার গুলি করা শুরু হলে এটাকে চেপে ধরে রাখতে গিয়ে মনে হয় দম বের হয়ে যাবে। গুলির বেল্ট নিয়ে থাকবে জলিল। ফরিদের কপাল! সবচেয়ে নির্বোধ মানুষটিই সব সময় তার সঙ্গী। কিছু করার নেই, এই নির্বোধ মানুষটিকে মাথায় করে গুলির বাক্স টেনে আনা কিংবা মেশিনগানের গুলির বেল্ট ধরে রাখা এই ধরনের কাজ ছাড়া আর অন্য কোন রকম দায়িত্ব দেয়া যায় না। চেষ্টা করে দেখা হয়েছে, লাভ হয়নি।

ফরিদের ডান দিকে প্রায় ত্রিশ চল্লিশ ফুট দূরে থাকলেন আজহার ভাই, তার সাথে নবাব সিরাজদ্দৌলা। তাদের ডান দিকে সমান দূরত্বে শাহজাহান, তার সাথে লালু। আরো ডান দিকে সালাম ভাই আর জয়নাল। যতটুকু সম্ভব ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, কিন্তু মোটামুটি কাছাকাছি যেন প্রয়োজনে চিৎকার করে কথাবার্তা বলা যায়।

আজহার ভাই প্রথমে একটা গ্রেনেড ছুঁড়বেন, এখান থেকে সেটা থানা পর্যন্ত যাবে না, কিন্তু বিস্ফোরণের একটা প্রচণ্ড শব্দ হবে, সেটা দিয়েই শুরু হবে, সবাই তখন গুলি করা শুরু করবে। গুলি বেশি নেই, বাজে খরচ করা যাবে না, কিন্তু প্রথম কয়েক মিনিট তবুও তুমুল গুলিবর্ষণ করার কথা। একসাথে সবাই না করে, তাল রেখে একজনের পরে আরেকজন, ভেতরে যারা আছে হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে যেন ভয়ে কাপড় জামা নষ্ট করে ফেলে। পিছন দিয়ে পালিয়ে যাবার সুযোগ দেয়া হয়েছে, পাল্টা গোলাগুলি না করে পালিয়ে যাওয়ারই সম্ভাবনা বেশি, তখন থানায় ঢুকে পড়া যাবে। তাদের কিছু গ্রেনেডও আছে, একেবারে কাছাকাছি যেতে পারলে সেগুলো ব্যবহার করা যাবে তবে খুব সাবধানে, নিজেদের গ্রেনেডে নিজেদের আঘাত পাওয়া অনেকগুলো ঘটনা ঘটে গেছে কিছুদিন আগে।

ফরিদ নিঃশব্দে হালকা মেশিনগানটা ধরে শুয়ে থাকে। পেটের ভেতরে কেমন জানি পাক খাচ্ছে, প্রত্যেকবার অপারেশনের আগে আগে তার পেটের ভেতরে এরকম অস্বস্তিকর একটা অনুভূতি হতে থাকে। আকাশের দিকে তাকাল ফরিদ, মেঘ এসে তার প্রিয় নক্ষত্রগুলোকে ঢেকে দিচ্ছে, কে জানে বৃষ্টি হবে কি না।

জলিল ফিসফিস করে বলল, বাই।

কী হলো?

কেমুন একটা গন্ধ আসে না?

ফরিদ নাক টেনে একটা নিঃশ্বাস নিল। সত্যিই কেমন জানি একটা বাজে দুর্গন্ধ আসছে। বলল, হুঁ।

মনে হয় কোন হারামজাদা হেগে রেখেছে ধারে কাছে। কী বলেন?

নিশি রাতে একটি খণ্ড যুদ্ধ শুরু করার পূর্বমুহূর্তে আলাপ করার জন্যে এই নির্বোধ মানুষটি কি এর থেকে ভাল একটি বিষয় খুঁজে বের করতে পারত না?

ঠিক এই সময় বিকট আওয়াজ করে গ্রেনেডের বিস্ফোরণ হলো। রোগাপটকা আজহার ভাই গ্রেনেডটি ভালই ছুঁড়েছেন বলতে হবে। জলিল বলল, বিসমিল্লা, ফরিদ ভাই।

ফরিদ তার ট্রিগার টেনে ধরল। প্রচণ্ড আওয়াজ করে তার হালকা মেশিনগানটি থেকে ঝলকে ঝলকে গুলি বের হতে থাকে, বারুদের ঝাঁঝালো গন্ধ আর কানে তালা লাগানো শব্দে মুহূর্তে সাদামাটা এই গ্রাম্য অঞ্চলটি একটি নিষ্ঠুর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়ে যায়।

সাথে সাথেই থানার ভেতর থেকে মানুষজনের গলায় আওয়াজ শোনা গেল। চিৎকার চেঁচামেচি হৈ চৈ শুরু হয়েছে, এরকমই হওয়ার কথা, কিন্তু ফরিদ তবু একটু অবাক হলো। ভেতরে ছয় সাতজনের বেশি মানুষ থাকার কথা নয়, কিন্তু মনে হচ্ছে অনেক মানুষ। তাছাড়া যে জিনিসটি তাকে বেশি অস্বস্তির মাঝে ফেলে দিচ্ছে সেটি হলো ভেতরে মানুষজন যেন বিজাতীয় ভাষায় কথা বলছে। পাকিস্তানি মিলিটারিরা ঘাঁটি করে ফেলেনি তো? ফরিদ ট্রিগারটি ছেড়ে শোনার চেষ্টা করল আর কী আশ্চর্য, সত্যিই শুনতে পেল পাকিস্তানি সৈন্যরা উচ্চ স্বরে চিৎকার করে একজন আরেকজনের সাথে কথা বলছে। কী সর্বনাশ!

মাই গুডনেস! বেশি ভয় পেলে ফরিদ মাঝে মাঝে ইংরেজিতে একটা দুইটা কথা বলে ফেলে।

জলিল জিজ্ঞেস করল, কী হইছে বাই?

পাকিস্তানি মিলিটারি।

তয়?

তয়, কী কোন বাংলা শব্দ আছে? কিন্তু সেটা নিয়ে এখন মাথা ঘামানোর সময় নেই, আবছা অন্ধকারে থানার ভেতরে হঠাৎ হঠাৎ কাউকে ছুটে যেতে দেখা যাচ্ছে, কয়েকটাকে গুলি করে ফেলে দিতে পারলে হতো। ফরিদ মেশিনগানটা ঘুরিয়ে আবার গুলি করতে থাকে। মারতে কী পারবে কোন শুয়োরের বাচ্চাকে? গুলি করে কি চূর্ণ করে দিতে পারবে কোন শালার মাথা? ঘিলু কি ছিটকে বের করে ফেলে দিতে পারবে? শেষ করে দিতে পারবে হারামজাদার গুষ্টিকে? পারবে কী? চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে ফরিদের, বিজাতীয় একটা আক্রোশ এসে ভর করে ওর উপর। পাগলের মতো গুলি করতে থাকে। গুলির প্রচণ্ড শব্দ যেন আগুন ধরিয়ে দেয় স্নায়ুর ভেতরে। মার হারামজাদাদের—মার!

বাই। জলিল আবার ডাকল।

কী হলো?

মরছে কী একটা দুইটা?

জানি না।

মারেন বাই মারেন। খাঁটি পাঞ্জাবি শালাদের ছাইড়েন না।

ঠিক আছে।

কী কপাল আমাগো, খাঁটি পাঞ্জাবি পাইয়া গেলাম। জলিল অন্ধকারে দাঁত বের করে হাসল।

নির্বোধ হওয়ার অনেক সুবিধে। মোটামুটি একটা বিপর্যয়কেও মাথা মোটা মানুষটি ভাবছে একটা দুর্লভ সৌভাগ্য। কিছু ছেলেমানুষী অস্ত্র নিয়ে ভুল করে এক কোম্পানি পেশাদার মিলিটারিকে আক্রমণ করে ফেলাটা আর যাই হোক ভাল কপালের লক্ষণ হতে পারে না। এখান থেকে সময়মতো সবাই মিলে জান নিয়ে সরে যেতে পারলে বুঝতে হবে তাদের ওপর মা-বাপের দোয়া রয়েছে। তার সম্ভাবনা কম। একমাত্র ভরসার কথা যে যে শালারা জানে না তারা ভুল করে আক্রমণ করে ফেলেছে, নিশ্চয়ই ধরে নিয়েছে জেনে শুনেই এসেছে, সঙ্গে আছে অনেক লোকজন, অনেক রকম অস্ত্রপাতি। তবে পেশাদার মিলিটারি, বেশিক্ষণ ধোঁকা দিয়ে রাখা যাবে না, একটু পরে ঠিকই বুঝে ফেলবে। তাড়াতাড়ি কিছু একটা ঠিক করতে হবে। আজহার ভাই কী করবেন ঠিক করেছেন কি? মানুষটা কথাবার্তা বলতে পছন্দ করে, কিন্তু বিপদের সময় ঠাণ্ডা মাথায় ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কি?

ফরিদ আবার গুলি করতে থাকে। কোথায় পজিশন নেবে হারামজাদারা?

কোথা থেকে গুলি করবে? কতজন আছে কে জানে। না জানি কী রকম অস্ত্র আছে সাথে, ভাল হওয়ারই কথা। হেভি মেশিনগান কি আছে? রকেট লঞ্চার? যাই থাকুক একটানা গুলি করে যেতে হবে, শালারা যেন ভাল পজিশন নিতে না পারে। একবার ঠিক করে পজিন নিয়ে নিলেই সমস্যা, তখন পালানো ছাড়া উপায় নেই।

ওপাশ থেকে প্রথমে গুলি হলো ছাড়া ছাড়া ভাবে। এলোপাতাড়ি গুলি, মনে হচ্ছে রাইফেল। তারপর অটোমেটিক রাইফেলের শব্দ শুনতে পেল। সবশেষে ভারী মেশিনগান, ফরিদ শব্দটা চিনতে পারল, চাইনিজ মেশিনগান! কতদিন থেকে ওরা জোগাড় করার চেষ্টা করছে। কী চমৎকার জিনিস! শালারা গুছিয়ে নিয়েছে কত তাড়াতাড়ি। ফরিদের হিংসে হলো, তিন মাসের ট্রেনিং নিয়ে একটা রাইফেল হাতে বের হয়ে আসা এক কথা, আর দিনের পর দিন বছরের পর বছর মানুষ মারা শেখা অন্য কথা। মনে হচ্ছে বেশিক্ষণ আর এখানে থাকা যাবে না। আজহার ভাইয়ের সাথে একবার কথা বলতে পারলে হতো। ফরিদ গুলি করা থামিয়ে ডাকল, আজহার ভাই।

আজহার ভাই শুনতে পেলেন না। দু’পক্ষের গুলির শব্দে এখন কানে তালা লাগার অবস্থা। ফরিদ আবার গলা উঁচিয়ে ডাকল, আজহার ভাই—

কী হলো?

কী করবেন এখন?

আজহার ভাই শুনতে পেলেন না, বললেন, কী বলো?

ফরিদ আবার চিৎকার করে বলল, কী করবেন এখন?

আর ঠিক তখন ব্যাপারটি ঘটল।

গুলির আঘাত প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক বলে যে ধারণা রয়েছে সেটি সত্যি নয়। তবে সেটি শক্তিশালী, একটি ছোট বুলেটে যে এত শক্তি থাকতে পারে সেটি ফরিদের ধারণা ছিল না। প্রচণ্ড আঘাতে ছিটকে পড়ে গিয়েও বুঝতে পারেনি কী হয়েছে? তার কয়েক মুহূর্ত লাগল বুঝতে। যখন বুঝতে পারল সে গুলি খেয়েছে প্রচণ্ড আতঙ্কে সে উঠে বসার চেষ্টা করল আর হঠাৎ করে আবিষ্কার করল সে উঠতে পারছে না। প্রথমবার মৃত্যুভয় পেল সে, ভয়ংকর সেই ভয়। যন্ত্রণাটি এলো একটু পরে। প্রথমে এলো সূক্ষ্ম একটু যন্ত্রণা হিসেবে, ভোঁতা একটু যন্ত্রণা, বোঝা যায় না এরকম। তারপর সেটি বাড়তে শুরু করল। কিছু বোঝার আগে হঠাৎ অমানুষিক একটা যন্ত্রণা তার পুরো অনুভূতিকে গ্রাস করে নেয়। আকাশের দিকে মুখ করে সে নিঃশ্বাস নিতে চেষ্টা করে, কিন্তু কিছুতেই বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারে না। পৃথিবী থেকে কে যেন সমস্ত বাতাস শুষে নিয়েছে। আহ খোদা! তুমি কী করলে এটা? কী করলে?

জ্ঞান হারানোর আগে সে দেখতে পায় জলিল তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে ডাকছে, ফরিদ বাই বাই, ও বাই। আল্লাহর কসম ফরিদ বাই—আল্লাহর কসম—

জলিলের আর্ত চিৎকার, গুলির প্রচণ্ড শব্দ সবকিছু ধীরে ধীরে ধরে মিলিয়ে যাচ্ছে, প্রাণপণে তাকিয়ে থাকার চেষ্টা করে ফরিদ, কিন্তু সবকিছু ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে যায় তার সামনে। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেই চেতনা হারাল ফরিদ।

ফরিদের মনে হলো সে প্রায় একযুগ পরে চোখ খুলে তাকাল। এত অন্ধকার কেন চারদিকে? কোথায় সে? কিসের এত শব্দ চারিদিকে? হঠাৎ করে দুঃস্বপ্নের মতো সব মনে পড়ে গেল। চমকে উঠে বসার চেষ্টা করল সে সাথে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় সারা শরীর কেঁপে ওঠে তার। চেতনা হারিয়ে যাচ্ছিল তার, অনেক কষ্টে আবার অবচেতনার অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনল নিজেকে। মুখের উপর ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছে, প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় সারা শরীর শিউরে উঠছে তার। একটু উষ্ণতা কী পাওয়া যায় না কোথাও? কেউ কি আছে আশপাশে? মাথা ঘুরে তাকাল চারদিকে। না কেউ নেই। সবাই চলে গেছে। সবাই চলে গেছে? সবাই? তাকে ফেলে?

এক আশ্চর্য শূন্যতা গ্রাস করল তাকে। এই তাহলে শেষ? নিজের ঘরে নিজের বিছানায় শুয়ে আর সে কখনো আকাশের দিকে তাকাবে না। বিলকিসকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে কোনদিন সে তার ঠোঁট স্পর্শ করবে না? কোনদিন না? ঠিক জানে না কার উপর কিন্তু এক প্রচণ্ড অভিমানে তার চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে আসে। বুক ভেঙে যায় এক অসহনীয় দুঃখে। আস্তে আস্তে সে ডাকল, মা, মাগো—

গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু কেউ তার ডাকের উত্তর দিল না।

ফরিদ আবার তলিয়ে গেল বিস্মৃতির অন্ধকারে।

ফরিদ দেখল ওর মা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। ফিসফিস করে বললেন, খোকা তোকে বলেছিলাম না তুই যাসনে, তুই কেন গেলি? কেন গেলি?

মা তুমি বুঝবে না মা। তুমি বুঝবে না।

কেন গেলি তুই? কেন গেলি? বাবা আয় আমার বুকে আয়। আয়। মা হাত তুলে ওর দিকে এগিয়ে এলেন।

না না মা, তুমি যাও, ফরিদ চিৎকার করে বলল, তুমি যাও। তোমার কাপড়ে রক্ত লেগে যাবে, কত রক্ত দেখো। তুমি যাও।

আয় বাবা একবার আয় আমার কোলে আয়। একবার আয়। মাত্র একবার।

না না না। যাও মা, যাও। মিলিটারি এসে যাবে মা ভোর হলেই মিলিটারি আসবে, খুঁজে খুঁজে বের করবে আমাকে মা। তুমি যাও।

বাবা তুই কেন গেলি? কেন গেলি?

মিলিটারি এসে আমাকে গুলি করে মারবে এখন, তুমি যাও, তুমি সেটা দেখো না।

বাবা আমার সোনা আমার ধন আমার তুই কেন গেলি বাবা আমায় ছেড়ে। কেন গেলি?

তুমি বুঝবে না মা, তুমি বুঝবে না। যেতে হয়।

কেন যেতে হয়? কেন যেতে হয়? কেন? ফরিদ কথা বলো। ফরিদ। ফরিদ ফরিদ—

ফরিদ আবার চোখ খুলে তাকায়। কে ডাকছে তাকে?

ও ফরিদ। ফরিদ বাই।

সত্যিই কেউ ডাকছে তাকে। কে? এটা কি স্বপ্ন? না কি সত্যি? কে ডাকছে? তার মাথার কাছে বসে আছে কে?

জলিল! আজহার ভাই! পিছনে কে? গুলি মেরে এগিয়ে আসছে ওরা কারা? শাহজাহান? সিরাজ? লাল্লু? তাকে নিয়ে যেতে এসেছে? সত্যি তাকে নিয়ে যাবে?

গুলির শব্দ হচ্ছে, কী প্রচণ্ড গুলি বৃষ্টির মতো গুলি হচ্ছে, লক্ষ কালবোশেখী যেন একসাথে নেমে এসেছে ওদের মাথার ওপর। আহা! কী শব্দ! এত শব্দ কেন! সব শব্দ ঝাপসা হয়ে যায়, তারপর আবার নদীর স্রোতের মতো চেতনা ফিরে আসে তারপর আবার মিলিয়ে যায়। তার মাঝে আবার সে কথা শুনতে পারে, আজহার ভাই বলেছেন, না জলিল তুমি পারবে না।

পারুম বাই। আপনি আমারে দেন।

তুমি পারবে না।

পারুম বাই। বাংকার থাইকা হেভী মেশিনগান চালাইছে বাই, কুনোদিন ফরিদ বাইরে লইয়া যাইতে পারবেন না। আমারে দেন দুইটা গ্রেনেড একবারে কাছে গিয়া ভেতরে ফালাইয়া দিই। মিশিনগানটা বন্ধ কইরা আসি।

পাগল! তুমি মরবে!

না বাই এই সময়ে অফয়া কথা বইলেন না। থু থু থু। আমি মরমু না। পীর সাহেবের তাবিজ আছে আমার গলায়। এই দেহেন। দেন বাই দুইটা গ্রেনেড। পিনটা টাইনা বার করবার কতক্ষণ পরে যেন ফুটে?

আকাশ থেকে যেন বজ্র নেমে আসে পৃথিবীতে। ধ্বংস করে দেবে সৃষ্টি জগৎ। তার মাঝে সরীসৃপের মতো গুড়ি মেরে জলিল এগিয়ে যায় দুটি গ্রেনেড নিয়ে। পাথরের মতো মুখ করে অন্যেরা বসে আছে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে। বিস্ফোরণের শব্দের সাথে সাথে প্রচণ্ড গুলির বন্যায় ভাসিয়ে দিবে চারদিক, তার মাঝে টেনে সরিয়ে নেবে ফরিদকে, রাব্বানী মাস্টার গ্রামের লোকজন নিয়ে বসে আছে অদূরে। ফরিদকে নিয়ে ছুটে যেতে হবে ডাক্তারের কাছে, খবর চলে গেছে ডাক্তারের কাছে, চার গ্রামে একজন মাত্র ডাক্তার, কিন্তু তাতে কী? ঘুম ভেঙে উঠে এসেছে চার গ্রামের লোক, তারা কি এক নজর দেখতে পারবে বিদ্যুতের ঝলক এই তরুণদের? যারা পিশাচের জিব ছিঁড়ে আনে খালি হাতে?

আকাশে মেঘ কেটে আবার নক্ষত্র দেখা দিয়েছে। ঐতো ভালবাসার নক্ষত্র ফরিদের দিকে তাকিয়ে আছে জ্বল-জ্বল করে নিঃসঙ্গ নক্ষত্র, ভাল করে তাকিয়ে দেখো। আমি যদি না থাকি তোমায় পৃথিবীকে বলতে হবে এর ইতিহাস।

ছাই, চোখে পানি আসে কেন?

ঝাপসা হয়ে আসে ভালবাসার নক্ষত্র, কিন্তু ফরিদ জানে বিস্ময়াভিভূত এই নক্ষত্র মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!