বিদেশে একবার জেলে যাবার উপক্রম হয়েছিল - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়


এ যেন বাড়িতে কারুকে খাবার নেমন্তন্ন করে ডেকে এনে হঠাৎ একসময় তাকে ঠেলে নবার করে দরজা বন্ধ করে দেওয়া। অনেকটা সেরকমই অভিজ্ঞতা হয়েছিল চেকোশ্লোভাকিয়ায়। অনেক দেশে সরকারি আমন্ত্রণে ঘুরেছি, কখনাে এমন নাটকীয় অবস্থার মধ্যে পড়িনি।

চেকোশ্লোভাকিয়া নামে এখন আর কোনাে দেশ নেই পৃথিবীর মানচিত্রে। চেক রিপাবলিক এবং শ্লোভাকিয়া নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্রে ভাগ হয়ে গেছে। ভাগ হয়ে যাবার মাত্র কিছুদিন আগেই আমরা গিয়েছিলাম সেখানে। ছ’জন ভারতীয় লেখক-লেখিকার একটি প্রতিনিধি দল।

ভারত সরকার আমাদের বিমান ভাড়া দেয়, ওদেশে পৌঁছােবার পর আতিথেয়তার সব ভার নেয় ওদেশের সরকার। তখনাে চেকোশ্লোভাকিয়ায় কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিক্ষোভ শুরু হয়নি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে চাপা উত্তেজনার ভাব রয়েছে, তা আমরা বুঝতে পারিনি প্রথমে। কিন্তু আতিথেয়তার মধ্যে যে আন্তরিকতা বা উষ্ণতার অভাব, তা আমরা অনুভব করেছিলাম। সরকারি কর্মচারিরা তাদের কর্তব্য সারে, আন্তরিক হতে যাবেই বা কেন, তবু একটা লােক-দেখানাে আন্তরিকতা তাে থাকেই, সেটারও যেন অভাব ছিল।

পৌঁছােলাম প্রাগ শহরে, যথারীতি আমাদের একটা মস্ত বড় হােটেলে তােলা হলাে। সব কমিউনিস্ট দেশের একই নিয়ম, পাসপাের্ট জমা রাখতে হয় হােটেলের কাউন্টারে। এসব দেশের ভিসাও অন্যরকম, পাসপাের্টে ছাপ দেয় না, অন্য একটি আলাদা ভিসা ফর্ম থাকে, তাতে ছবি সাঁটা থাকে, সেটা পাসপাের্টের মধ্যে রেখে দিতে হয়। আমি পােল্যাণ্ড, হাঙ্গেরি, রুমানিয়া, চীন, রাশিয়া ঘুরেছি, এসব নিয়ম আগে থেকেই জানি। কোনাে বিদেশির পক্ষে একা যেখানে সেখানে ঘােরাঘুরির নিয়ম নেই, সঙ্গে সব সময় একজন গাইড থাকে। সে দোভাষীর কাজও করে, আবার অতিথিদের গতিবিধির ওপর নজরও রাখে।

আমাদের গাইডের নাম আন্না। একজন মধ্যবয়স্কা মহিলা। খুবই শুকনাে পাকানাে চেহারা, স্তন আছে কিনা বােঝাই যায় না, দশ বারাে দিন তার মুখে কখনাে একটুও হাসির রেখা দেখিনি। তবে সে ইংরিজিটা জানে খুবই ভালাে। অন্য অনেক দেশে দোভাষীদের ইংরিজি নিয়ে মাঝে মাঝে থতােমতে খেতে দেখে মজা পেয়েছি। আন্নার সময়জ্ঞানও নিখুঁত, কোথাও বেরুবার জন্য আমাদের দু'এক মিনিট দেরি হলেই সে খুব তাড়া দেয়। তারপরেও দেরি হলে বিরক্ত হয়।

প্রত্যেকবারই লেখকের দলটিতে একজনকে নেতা বা নেত্রী হিসেবে ঠিক করা হয়। সেবার আমাদের দলে ছিলেন মালায়লম ভাষায় প্রখ্যাত লেখিকা সুগথা কুমারী। তিনি সমাজসেবীও বটে, বলা যেতে পারে তিনি কেরালার মহাশ্বেতা দেবী। তাঁকেই নেত্রী করা হলাে। সব ব্যাপারেই তার খুব কৌতুহল, তিনি অনেক প্রশ্ন করেন, তাঁর সেইসব প্রশ্ন ও উত্তর শুনে আমরা লাভবান হই ।

এই প্রাগ শহর (স্থানীয় নাম প্রাহা) এক সময় ছিল বােহেমিয়ার অন্তগর্ত। তবে বােহেমিয়ান শব্দটি এখনাে চালু থাকলেও সেই শব্দে যে ছবিটা ফুটে ওঠে, তার সঙ্গে এখানকার বর্তমান অধিবাসীদের কোনাে মিল নেই। সব কিছুই নিয়ম কানুনে বাঁধা, মানুষজনের চলাফেরাও যেন যান্ত্রিক। আমাদের জন্য সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঠাসা প্রােগ্রাম, কারখানা দেখতে যাওয়া, যৌথ খামার, বিশ্ববিদ্যালয়, লেখক সমিতি, প্রকাশক-সমিতি, শান্তি সমিতি ইত্যাদি নানান সমিতির সদস্যদের সঙ্গে আলােচনা, সে সব আলােচনাও নিছক দায়সারা। আসলে বেশির ভাগ সরকারি কর্মচারিই তখন সরকারের নীতির বিরুদ্ধে ফুসছে, পার্টির খবরদারি সহ্য করতে পারছে না। আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময় সেটাই প্রাণপণে গােপন করার চেষ্টা।

সবগুলাে জায়গায় আমাদের যাবার ইচ্ছে থাক বা না থাক, যেতেই হবে। সেটাই আন্নার দায়িত্ব। আমার অবশ্য পরপর দৃশ্য বদল পছন্দ হয় না, অনবরত নতুন নতুন গােষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলতেও ভালাে লাগে না। মাঝে মাঝেই আমি বলি, যাও। তােমরা কারখানা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় দেখে এসাে, আমি নদীর ধারে অপেক্ষা করছি।

প্রাগ শহরটির দুটি ভাগ। নতুন অংশটির বিশেষত্ব নেই, শুধু লম্বা লম্বা বাড়ি আর অফিস-আদালত, কিন্তু প্রাচীন অংশটি বড়ই দৃষ্টিনন্দন। পুরােনাে আমলের পাথরের বাড়ি, দূরে দেখা যায় যােড়শ শতাব্দীর রাজপ্রাসাদ। শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাচ্ছে নদী, সে নদীর নামটা উচ্চারণ করা শক্ত, স্লটাভা বলা যেতে পারে (Vlatava River) খুব চওড়া নয়। দু'পাশে সবুজ ঘাস, গালিচার মতন, সেখানে নানা রঙের পােশাক পরা ছেলেমেয়েরা রােদ পােহাচ্ছে শুয়েশুয়ে। জোড়ায় জোড়ায় ছেলেমেয়ে নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করছে, একটু একটু আদর, খুব বেশি লজ্জাহীন নয়। অনেকে আবার পাশাপাশি শুয়ে একই বই পড়ছে। আমি হাঁটতে হাঁটতে কৌতুহলী হয়ে লক্ষ করলাম, অনেকেই যেটা পড়ছে, তা ছাপা বই নয়, কোনাে বইয়ের জেরক্স কপি। ইংরিজি জানা ছেলেমেয়ে খুঁজে পাওয়া শক্ত, তবু বেশ কয়েকজনকে প্রশ্ন করার পর একজন বুঝতে পেরে বললাে, তারা পড়ছে ফ্রানৎস কাফকার বই!

এ বই কিনতে পাওয় যায় না?

-না।

-কেন?

-হারামজাদারা ফ্রানৎস কাফকার বই নিষিদ্ধ করেছে।

সে হারামজাদারই সমতুল্য একটা গালাগাল ব্যবহার করেছিল সরকারের বিরুদ্ধে।

এটা একটা মজার ব্যাপার। ফ্রানৎস কাফকার জন্ম-কর্ম এই শহরে। তার বাড়িটি এখনাে আছে, অনেকেই দেখতে যায়। এ দেশের শ্রেষ্ঠ লেখক, আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখকের রচনা তার জন্মভূমিতে নিষিদ্ধ কেন? তার লেখায় তাে রাজনীতি নেই। তিনি কমিউনিজমের বিরুদ্ধেও কিছু লেখেননি। তার লেখা অ্যাবস্ট্রাক্ট সমাজ বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে, শুধু সেই জন্য ?

প্রকাশক সমিতির সভাপতিকে আমি পরে জিগ্যেস করেছিলাম, আপনারা কাকার বাড়ি সাজিয়ে রেখেছেন অথচ তার রচনা নিষিদ্ধ করেছেন কেন?

- নিষিদ্ধ তাে নয়।

-তাঁর বই পাওয়া যায় ?

-হ্যাঁ, পাওয়া যাবে না কেন?

—আমি যে কয়েকজনের কাছে শুনলাম, তাঁর বই জোগাড় করা সম্ভব নয়।

-তাহলে বােধহয় এখন আউট অফ প্রিন্ট হয়ে আছে।

-সৰ বই আউট অফ প্রিন্ট? কতদিন ধরে আউট অফ প্রিন্ট বলতে পারেন? তিনি খানিকটা ইতস্তত করে, কাগজপত্র দেখে বললেন, কুড়ি বছর!

একজন বিশ্ববিখ্যাত লেখকের বই কুড়ি বছর ছাপা হয়নি, অথচ নিষিদ্ধ নয়, এর চেয়ে মিথ্যে কথা আর কী হতে পারে?

যারা পড়বার তারা কিন্তু ঠিকই পড়ছে। বই যে কখনাে নিষিদ্ধ করে রাখা যায় না, তা শাসক শ্রেণির গাড়লরা কোনাে দেশেই বােঝে না।

ভ্লাটাভা নদীর ওপর যে সেতু, সেটির কিন্তু ইংরিজি নাম চার্লস ব্রিজ। বারবার সেই সেতু পারাপার করতে করতে নদীর সঙ্গে পরিচয় হয়ে যায়। এক-একবার আমি ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে গিয়ে বসি, নদীর সঙ্গে বাংলায় কথা বলি। নদী বেশ বুঝতেও পারে মনে হয়।

চালর্স ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে একজন লােককে সেই নদীর বুকে পয়সা ছুঁড়ে দিতে দেখে আমার বেশ মজা লেগেছিল। আমাদের দেশে এরকম অনেক দেখেছি। গঙ্গানদী যে কত পয়সা খেয়েছে তার ঠিক নেই। এদেশেও সেরকম সংস্কার আছে নাকি? রােম শহরে একটা ঝর্ণায় পয়সা ফেলে অনেক লােককে মানত করতে দেখেছি বটে।

ভ্লাটাভা নদী তেমন গভীর নয় এখন। জলও খুব স্বচ্ছ। তলায় পয়সা পড়ে আছে, দেখা যায়।

কয়েকদিন পর আমাদের পাঠিয়ে দেওয়া হলাে স্লোভাকিয়ার দিকে। এখানকার রাজধানীর নাম বাতিশ্লাভা। যাবার আগে আন্নার কাছ থেকে বিদায় নিতে হলে প্রচুর ধন্যবাদ জানিয়ে। যদিও মনে মনে আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তার ব্যবহার ছিল কড়া হেডমাস্টারনীর মতন!

বাতিশ্লাভায় এসে বােঝা গেল, দু'অঞ্চলে অবস্থার তফাত কত প্রকট। একেবারে জরাজীর্ণ অবস্থা। এখানে চাপা দেবার চেষ্টাও নেই, সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যেই অভিযােগ জানায়, এমনকি আমাদের মতন বিদেশিদের কাছেও। এদের অভিযােগ দুরকম। স্থানীয় সরকারের বিরুদ্ধে এবং চেকদের দাদাগিরির বিরুদ্ধে। সেই জন্যই শ্লোভাকিয়া পরে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে, সে খবর শুনে আশ্চর্য হইনি! যেমন মুসলমান ধর্ম পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে এক রাখতে পারেনি। সেইরকম কমিউনিজমও চেক ও শ্লোভাকিয়ার মধ্যে ঐক্য ধরে রাখতে পারেনি।

এক জায়গায় আমরা কনসার্ট শুনতে গেছি। হঠাৎ বাজনা থামিয়ে তরুণ বেহালাবাদকটি বলতে শুরু করলাে, জানেন, সরকার আমাদের পয়সা দেয়? তাতে খাওয়া জোটে না। আমি বিদেশে যাবার আমন্ত্রণ পেয়েছি, তাও যেতে দেবে না শুয়ােরের বাচ্চারা !

এরকম আমি আর কোনাে দেশে শুনিনি।

বাতিশ্লাভার এক বৃদ্ধের মুখে একটা ব্যাপার শুনেও মজা লেগেছিল। শহরটির একপাশে পাহাড়। তার ওপাশেই অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহর। বৃদ্ধটি বললেন, আগে (অর্থাৎ সােভিয়েত ব্লকে যাবার আগে) আমরা যখন ইচ্ছে ঐ পাহাড় পেরিয়ে ভিয়েনার কোনাে রেস্তোরাঁয় চা খেতে যেতাম। এখন ওখানে যাওয়া নিষিদ্ধ। যদি বা যাওয়ার অনুমতি মেলে, তাহলেও পূর্ব জার্মানির মধ্য দিয়ে দেড় হাজার মাইল ঘুরে যেতে হয়। অথচ ঐ পাহাড়ে উঠলেই শহরটা দেখা যায়।

এটা মজার ঘটনা নয়, করুণ। বৃদ্ধাটি অবশ্য বলছিলেন হাসতে হাসতে।

একজন বৃদ্ধ বললেন, আমি এখনও কমিউনিষ্ট, এই আদর্শের জন্য লড়েছি। কিন্তু নেতাদের লােভ আর ক্ষমতা দখলের জেদাজেদি আর সাধারণ মানুষের ওপর অনর্থক কড়াকড়ির জন্য সে আদর্শ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অল্প বয়েসী ছেলেমেয়েরা যে এই আদর্শ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তার জন্য আমার মতন বুড়ােরাই দায়ী।

এবারে আসল ঘটনায় আসি।

বাতিশ্লাভায় আমাদের অন্য গাইড ছিল। সে আমাদের বিমানে তুলে দিল। প্ৰাগে এসে বিমান বদল করে আমাদের যেতে হবে দিল্লিতে।

প্ৰাগে পৌঁছে আমরা শুনলাম, আমাদের পরবর্তী বিমান ১৫ ঘণ্টা পরে আসবে কোনাে কারণে।

বিমান বন্দরে একজন সরকারি অফিসার উপস্থিত। সে আমাদের এই খবর জানিয়ে, করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে বললাে, আমি তা হলে চলি ?

আমরা এই পনেরাে ঘন্টা থাকবাে কোথায় ? অফিসারটি কঁধ ঝাকিয়ে বললাে, সে তাে আমি জানি না!

-আপনি জানেন না মানে?

--আজ রাত্রি আটটা পর্যন্ত আপনারা আমাদের অতিথি। তারপর তাে আমাদের আর কোনাে দায়িত্ব নেই।

–বিমান লেট হলে আমরা কী করতে পারি?

-তা তাে আমি জানি না!

—আমরা রাতটা কি তাহলে এয়ারপাের্টে কাটাবাে ?

-তা সম্ভব নয়। রাত এগারােটার পর কারুকেই এয়ারপাের্টে থাকতে দেওয়া হয় না।

-তাহলে কি আমাদের হােটেলে থাকতে হবে? সে খরচ দেবে কে?

--তা তাে আমি জানি না।

ভদ্রলােক বারবার তাতাে আমি জানি না, তাতাে আমি জানি না বলে সত্যি সত্যি বিদায় নিয়ে চলে গেল। আমরা যাকে বলে, অগাধ জলে ! কারুর কাছেই বিশেষ টাকাকড়ি নেই। কোন হােটেলে থাকবাে, কে পৌঁছে দেবে, কিছুরই ঠিক নেই। আগে যে-হােটেলে ছিলাম, সেটা বিরাট হােটেল, অনেক খরচ!

ভারতীয় দূতাবাসে ফোন করে যে সাহায্য চাইবাে, তারও উপায় নেই। কারণ সেটা শনিবারের রাত। শনিবার-রবিবার কারুকেই পাওয়া যাবে না।

এসব দেশের সব এয়ারপাের্টেই আর্মির লােক থাকে। সেরকম একজন জবরদস্ত পােশাক পরা লােককে আমাদের অবস্থা খুলে বললাম। যদি তিনি আমাদের এয়ারপাের্ট রাত কাটাবার অনুমতি অন্তত দেন।

আর্মি অফিসারটি সমবেদনার ভাব নিয়ে আমাদের কথা শুনলেন। তারপর মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন যে খুবই দুঃখের কথা। কিন্তু তার করণীয় কিছু নেই। এয়ারপাের্টে থাকতে দেবার অনুমতি তিনি দিতে পারেন না। আরও উঁচু জায়গা থেকে আদেশ আনতে হবে, সেটাও শনিবার রাতে সম্ভব নয়।

তিনি কাছাকাছি কয়েকটা শস্তা হােটেলের ঠিকানা বাৎলে দিলেন।

ছ’জন মিলে এক ট্যাক্সিতে যাওয়া যাবে না। এসব দেশে চারজনের বেশি কিছুতেই নেয় না। প্যারিসে দেখেছি, তিনজনের বেশি নেবে না। সামনের সিটে বসতে দেয় না কোনাে যাত্রীকে।

এখন সুগতকুমারীর অনুরােধে আমাকেই হােটেল খোঁজার দায়িত্ব নিতে হলাে।

সঙ্গে গাইড নেই, ট্যাক্সি ড্রাইভাররা ঘােরাপথে নিয়ে যাচ্ছে কিনা, কী করে বুঝবাে? অনেক দূরে দূরে এক একটা হােটেল, কোনাে হােটেলেই একসঙ্গে দু’জনের জায়গা নেই।

এই অবস্থায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে কেউ রাজি নয়। সবাই ভয় পাচ্ছে। এখানকার সরকারের ব্যবহারে আমাদের হতভম্ব অবস্থা। | হােটেল খুঁজতে গিয়ে ট্যাক্সি ভাড়ায় আমার নিজের অনেক পয়সা খরচ হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত আমি প্রস্তাব দিলাম, আমরা প্রথমবার এসে যে ইন্টারন্যাশনাল হােটেলে ছিলাম, সেখানেই যাওয়া যাক। সেটা তবু আমাদের চেনা। অতবড় হােটেলে, সেখানে একসঙ্গে দু’জনের ঘর পাওয়াও সম্ভব। | তাই হলাে। ইন্টারন্যাশনাল হােটেলে এসে আমরা আমাদের দুরাবস্থার কথা বুঝিয়ে বললাম। আগে ছিলাম সরকারি অতিথি, প্রত্যেকের আলাদা ঘর। যা খুশি খাবারের অর্ডার দিয়ে সই করে দিয়েছি। এখন থাকতে হবে নিজেদের পয়সায়। আমাদের খুব শস্তার ঘর চাই। | এসব কথা বুঝিয়ে বলতেও আমাদের কম ঝঞ্জাট হয়নি। প্রায় কেউই ইংরিজি বােঝে না। এ ওকে ডাকে, সে তাকে ডাকে। শেষ পর্যন্ত যে বুঝলাে, সেও কাঁধ ঝাকিয়ে বললাে, এ ব্যাপারে তার কিছু করার নেই। আমাদের পয়সা দিয়েই থাকতে হবে, খেতে হবে। তবে, একটা খুব বড় ঘর আছে। সেই এক ঘরে চারটি খাট, আর মেঝেতে বিছানা পেতেও শুতে পারে দু’জন। তাতে খরচ কম পড়বে।

অগত্যা আর উপায় কী! নারী-পুরুষ মিলে ছ’জন এক ঘরে। কেউ জোরে নাক ডাকে, কারুর পাতলা ঘুম। কারুর খালি গায়ে শােওয়া অভ্যেস, অথচ মহিলাদের সামনে জামা খােলা যায় না।

সব খাবারেরই বেশ দাম, তাই আমরা খেলাম শুধু সুপ আর পাঁউরুটি।

ঘর ভাড়া ছ’জন সমান ভাগ করে দেবে। আর কিছু বখশিস। আমার টাকাটা আমি রাত্রেই সুগতকুমারীর হাতে তুলে দিলাম, কারণ আমার সঙ্গে অন্য পাঁচজনের একটা তফাৎ আছে।

এই সব সরকারি প্রতিনিধি দলে যারা যায়, তারা সবাই রুটিন মতন ঘােরে ফেরে এবং নির্দিষ্ট দিনে দেশে ফিরে আসে। আমার মাথায় পােকা আছে, অত সহজে ফিরতে ইচ্ছে করে না। সেই জন্যই সরকারি খরচে কোনাে দেশে গেলেও, তার কাছাকাছি কোনাে দেশ আমার নিজের খরচে দেখে আসতে ইচ্ছে করে।

এবারেও ঠিক করেই এসেছিলাম, আমি দলের সঙ্গে ফিরবাে না। ইস্তানবুল শহরটি দেখে যাবাে। ইস্তানবুলের নাম এককালে ছিল কনস্টান্টিনোেপােল, ইতিহাসের দিক থেকে এরকম রােমঞ্চকর শহর আর দ্বিতীয় আছে কিনা সন্দেহ। এই শহরের অর্ধেকটা এশিয়ায়, অর্ধেকটা ইওরােপে। তুরস্ক থেকে আমন্ত্রণ পাবার আশা খুব কম। সেই জন্য আমি দিল্লি থেকে ভিসা নিয়েই এসেছি।

অন্য সকলের দেশে ফেরার প্লেন বেলা এগারােটায়, কিন্তু আমার ইস্তানবুলের ফ্লাইট ভােরবেলা। সুতরাং, অন্যদের ঘুম না ভাঙিয়েও আমাকে বেরিয়ে পড়তে হবে।

কী করে ভাের চারটেয় উঠবাে, সেই চিন্তায় আমার সারারাত ঘুমই এলাে না।

যথাসময়ে আমি নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলাম ঘর থেকে। হােটেলের কাউন্টারে যে লােকটির ডিউটি ছিল, তারও চোখ ভরা ঘুম। আমার পাসপাের্ট ফেরৎ চাইতে সে একগাদা পাসপাের্টের মধ্য থেকে সেটা বার করে দিল। আমার ছবি-সমেত ভিসা ফর্মটি অর্ধেক বেরিয়ে আছে। | হােটেলের দারােয়ানদের ট্যাক্সি ধরে দিতে বললাম। ট্যাক্সি আর আসেই না। দেরি করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। নিজেই সুটকেস হাতে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে ডেকে নিলাম একটা ট্যাক্সি।

এয়ারপাের্টে পৌঁছে একটা খবর জেনে খুব স্বস্তি হলাে, আমার ফ্লাইট ঠিক সময়ে আছে। আর কোনাে দেশে আমন্ত্রিত হয়ে এরকম নিজে ট্যাক্সি ডেকে একা একা এয়ারপাের্টে আসতে হয়নি। এখানে গতকাল রাত আটটায় আমাদের আতিথ্যের সীমা পেরিয়ে গেছে, তারপর অতিথিরা গােল্লায় যাক বা না যাক, তাতে এদেশের সরকারের কিছু আসে যায় না।

সুটকেস চেক-ইন করে, একটা সিগারেট ধরাবার পর খানিকটা সময় নিয়ে তারপর দাঁড়ালাম ইমিগ্রেশান কাউন্টারে। তেমন ভিড় নেই। একজন মহিলা পাসপাের্ট পরীক্ষা করছেন।

আমার পাসপাের্ট ও ভিসার কাগজটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরীক্ষা করলেন। তাঁর ভুরু কুঁচকে গেল একটু পরে পাসপাের্টটা আমার দিকে ঘুরিয়ে দেখিয়ে বললেন, এটা কি তােমার পাসপাের্ট ?

আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লাে। জীবনে কখনাে একসঙ্গে এমন বিস্ময় ও ভয় অনুভব করিনি।

বােমা ফাটার মতন শব্দ করে আমি বললাম, না !

পাসপাের্টের ছবিটা আমার নয়। ভিসার কাগজটা আমার। হােটেলের লােকটি অন্যলােকের পাসপাের্টে আমার ভিসার কাগজটা ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমিও ভিসার কাগজে আমার ছবিটা দেখেই নিয়ে চলে এসেছি। তাছাড়া, সেই সময় লােকটি আমি কেন পয়সা না দিয়ে চলে যাচ্ছি, আমার পয়সা কে দেবে, এই নিয়ে ঝামেলা বাধাবার তাল করে আমার মেজাজ বিগড়ে দিয়েছিল।

ভদ্রমহিলা উঠে গিয়ে একজন আর্মি অফিসারকে ডেকে আনলেন।। সেই লােকটি শুনলেন সব কথা। তারপর ঠাণ্ডা ভাবে বললেন, ভদ্র মহােদয়। নিয়ম অনুযায়ী আপনাকে এখনই আমার গ্রেফতার করা উচিত। কারণ আপনি অন্যের পাসপাের্ট নিয়ে এ দেশ ছেড়ে বেরুবার চেষ্টা করছিলেন। সেটা শাস্তিযােগ্য অপরাধ। তাতে আপনার কারাদণ্ড হতে পারে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, এটা একটা ভুলেরই ব্যাপার। আপনাকে গ্রেফতার করলাম না। এখন আপনি কী করবেন?

আমার এমনই হতভম্ভ অবস্থা যে মাথায় কিছু এলাে না।

এক ঘণ্টার মধ্যে ইস্তানবুলের প্লেন ছেড়ে যাবে। আমি জানি, পরের ফ্লাইট চারদিন পরে। সেই চারদিন আমার পক্ষে এখানে থেকে যাওয়া সম্ভব নয়। চেকোশ্লোভাকিয়ার ভিসা আমার সেদিনই শেষ, তা ছাড়া টাকা পয়সার প্রশ্ন তাে আছেই।

এখন হােটলে ফিরে গিয়ে পাসপাের্ট বদলে আনতে গেলে এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যাবে। আমার জন্য তাে আর ইস্তানবুলের ফ্লাইট দাঁড়িয়ে থাকবে না।

তা হলে কী উপায়?

ইমিগ্রেশানের ভদ্রমহিলা বেশ সহানুভূতিশীল। তিনি বললেন, এখন আমরা যদি আপনাকে ছেড়েও দিই, আপনি ইস্তানবুলে এই নকল পাসপাের্ট নিয়ে ঢুকতে পারবেন না। এমনকি আপনার নিজের দেশ ইন্ডিয়াতেও তত আপনাকে আটকে দেবে, সেখানে আপনাকে অন্য পাসপাের্ট নিয়ে ঢোকার চেষ্টা করার জন্য অ্যারেস্ট করবেই। তা ছাড়া, আপনি যার পাসপোের্ট নিয়ে চলে এসেছেন, সেও তাে বিপদে পড়বে একই রকম।

এই পাসপাের্টটা দেবরাল নামে একজন হিন্দি লেখকের। সে বেচারি বােধহয় এখনাে। ঘুমােচ্ছে, কিছুই জানে না।।

আর্মি অফিসারটি বললেন, আমরা কোনাে অ্যাকশান নিচ্ছি না। আপনি চেষ্টা করে দেখুন, নিজের পাসপাের্ট নিয়ে আসতে পারেন কিনা।

হােটেল থেকে এয়ারপাের্ট আসতে সময় লেগেছিল পয়তিরিশ মিনিট। ভােরবেলা রাস্তা একেবারে ফঁকা ছিল। এখন যদি আমি ট্যাক্সি নিয়ে হােটেলে যাই, এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসা অসম্ভব। ঠিক আছে, ইস্তানবুল না হয় বাদ দিলাম, পরের প্লেনে অন্যদের সঙ্গে দেশে ফিরবােই বা কী করে? সে ফ্লাইটে তাে আমার বুকিং নেই। এদিককার ফ্লাইটে তিন-চার মাস আগে বুক না করলে সিট পাওয়া যায় না।

এদিকে আমার সুটকেস চলে গেছে ইস্তানবুলের বিমানে।

ভাবছি, আর সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দলের কারুকে ফোন করে বলবাে, আমার পাসপোের্টটা এনে, অন্যটা নিয়ে যেতে! বুঝিয়ে বলবাে, জামা কাপড় পরে তৈরি হবে। কাউন্টারে এসে কথা বলবে, আমার পাসপাের্ট অন্য কারুকে দেবে কিনা....।

যাই হােক, আমি হােটেলে ফোন করলাম।

এই রে, এখন যে কাউন্টারে রয়েছে, সে একদম ইংরিজি জানে না। সে চেক ভাষায় আমায় কী সব বলে যাচ্ছে, আমিও তা বুঝছি না কিছুই। যত বলি, ইংরিজি জানা একজনকে ডাকো, তাও সে বােঝে না।

হঠাৎ দেখি, কিছুদূরে দাঁড়িয়ে আছে আন্না। এ যেন সমুদ্রে ডুবন্ত লােকের সামনে একটি কাষ্ঠখণ্ড। চোখাচোখি হতে আন্না এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বললাে, সুপ্রভাত। সব খবর ভাললা? আমি তােমাদেরই মতন আর একটি দেশের অতিথিদলকে নিতে এসেছি।

আমি তার হাত জড়িয়ে ধরে বললাম, আন্না, আমি খুব বিপদে পড়ে গেছি।

ঝড়ের বেগে ঘটনাটা বর্ণনা করতে হলাে আমাকে।

আন্নার মুখের রেখায় কোনাে ভাবান্তর হলাে না। নিরস গলায় বললাে, হােটেলের লােকেরা অন্যায় করেছে ঠিকই। অন্য পাসপাের্ট তােমার ভিসার ফর্ম ঢুকিয়ে দিয়েছে। তােমারও ত্রুটি হয়েছে। হােটেল ছাড়ার সময় নিজের পাসপাের্ট খুব ভালােভাবে দেখে নেওয়া উচিত। দেখা যাক, এখন কী করা যায়।

আমি বললাম, সময়টাই যে আসল। আর মাত্র পঞ্চাশ মিনিট, এদিকে আমার সুটকেস— | এসব কথায় ভ্রুক্ষেপ না করে সে টেলিফোন করলাে হােটেলে। ওদের ভাষায় কী বলতে লাগলাে, তা তাে আমার বােঝার উপায় নেই। কিন্তু আন্না রীতিমতন গলা চড়িয়ে ধমকাচ্ছে। মনে হলাে, সে তাহলে সাধারণ গাইড নয়, তার অন্য কোনাে সরকারি পরিচয় থাকতে পারে।

ফোন ছেড়ে দিয়ে আন্না বললাে, হােটেলের ওপর সব দোষ চাপিয়েছি। ওদের নামে নালিশ করার ভয় দেখিয়েছি। ওদের বলেছি, এক্ষুনি একটা ট্যাক্সি ড্রাইভারের হাত দিয়ে তােমার পাসপাের্ট পাঠিয়ে দিতে। অন্যটা সে-ই নিয়ে যাবে।

এরপর অধীর অপেক্ষা। ঘন ঘন সিগারেট টানা। এয়ারপাের্টে অনবরত ট্যাক্সি ঢুকছে। কোন ট্যাক্সিতে আমার পাসপাের্ট আসবে, বুঝবাে কী করে?

ঠিক পঁয়তিরিশের মাথায় দেখি, একজন ট্যাক্সি চালক একটা হাত জানলা দিয়ে বাইরে উচিয়ে রেখেছে। সেই হাতে একটা পাসপাের্ট।

এখনও বারাে মিনিট সময় আছে। দৌড়ে গেলে আমাকে ইস্তানবুলের ফ্লাইটে উঠতে দেবে। আন্নার অতিথিরা পৌঁছে গেছে। আফ্রিকার কোনাে দেশের, মালপত্রের জন্য অপেক্ষা করছে। আমি তাকালাম আন্নার দিকে। এই মুহুর্তে তাকে কী সুন্দরী মনে হলাে। আন্নার সাহায্য না পেলে, এভাবে, এই সময়ের মধ্যে পাসপাের্ট উদ্ধার করা আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হতাে না। আন্নাকে নিয়ে আড়ালে অনেক মস্করা করেছি, কিন্তু এদেশে সে-ই আমার সবচেয়ে উপকারি বন্ধু।

আমি তার কাছে গিয়ে বেশ আবেগের সঙ্গে বললাম, আন্না, তুমি আমার জন্য যা করলে—

আন্না বললাে, যাও। আর ভদ্রতা করতে হবে না। এরপর ফ্লাইট মিস করবে?

সে আমার গালে ঠোট ছোঁয়ালাে।

আমার মনে হলাে, এমন মধুর আদর জীবনে খুব কমই পেয়েছি।

ছুটে গিয়ে উঠে পড়লাম প্লেনে।

তারপর ইস্তানবুলে কয়েকদিন ঘুরে বেড়িয়েছি সম্পূর্ণ একা একা। কিন্তু সে তাে অন্য গল্প।
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

If Download link doesn't work then please comment below. Also You can follow us on Twitter, Facebook Page, join our Facebook Reading Group to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature. Also try our Phonetic Bangla typing: Avro.app
বইটি শেয়ার করুন :

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2018. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com