Pages

করোনাভাইরাস

amarboi
বিদায়বেলার ঘণ্টা
সুমিত মিত্র

শেক্সপিয়রের প্রায় সমসাময়িক মেটাফিজিক্যাল কবি জুন ডান-কে পাঁচশাে বছর ধরে সাহিত্যরসিকরা মনে রেখেছেন তাঁর অমর কাব্যপ্রতিভার জন্য। তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় উদ্ধৃতি-টি কিন্তু একটি গদ্যরচনা থেকে নেওয়া। ১৬২৪ সাল। ডান তখন ছিলেন লন্ডনের সেন্ট পলস গির্জার ডিন। ভূগছিলেন বসন্তজ্বরে। লিখলেন “...any man's death diminishes me, because I am involved in mankind, and therefore never send to know for whom the bell tolls; it tolls for thee".

For whom the bell tolls। বাক্যটি সাহিত্যে অমলিন হয়ে রয়েছে দেশকালের সীমানা ছাড়িয়ে। ওটি স্পেনের গৃহযুদ্ধের উপর হেমিংওয়ের একটি বিখ্যাত উপন্যাসের নাম। লাইনগুলি লেখার সময়ে ভান অবশ্যই মৃত্যুর কথা ভাবছিলেন, যেন গির্জা থেকে বাজল কারও বিদায়ঘণ্টা। লেখক জানাচ্ছিলেন, ঠিক কে বিদায় নিল তার খোঁজ করার প্রয়ােজন। নেই। কারণ, যে-ই যাক, ক্ষয় হল মানবজাতিরই। সুতরাং ঘন্টা বাজল। তােমার জন্য ।

আশ্চর্য ব্যাপার, লাইনটি পুনর্বার ফিরে এসেছে চিনের উহান শহরে, যেটি বর্তমানে প্রলয়ংকরী করোনাভাইরাস মড়কের উৎসস্থল। গত সপ্তাহে নিবন্ধটি লেখার সময়ে এই মারাত্মক রােগে ৬৫০-এর ওপর প্রাণহানি হয়েছে। এখন। সেই সংখ্যা দু’হাজার ছাড়িয়ে গেলেও অবাক হব না। উহানের এক তরুণ চক্ষুচিকিৎসক লি ওয়েনলিয়াং, গত বছরের শেষদিকে স্থাবেই প্রদেশের রাজধানী উহান শহরে করােনাভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাটি সম্পর্কে প্রথম সতর্কবাণী দেন। তবে এর সংক্রমণের তীব্র বেগ লক্ষিত হলেও, শি জিনফিং-এর নেতৃত্বাধীন চিন সরকার ও তাদের কমিউনিট পাটি চায়নি খবরটি চাউর হােক। তখন চিন বনাম আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধ তুঙ্গে। ভাইরাস সংক্রমণ ও তজ্জনিত মৃত্যুর কারণে মান খােয়াতে শি ও তাঁর দলবল কখনই রাজি নন।

চিন সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা আছে এরকম পাঠকও জানলেন, কমিউনিস্ট পার্টি অনুমােদন করে না এমন কোনও তথ্য বা অভিমত চিনের সাধারণ মানুষ খােলাখুলি আলােচনা করা তো দূরের কথা, স্বপ্নে দেখে ফেললেও ভয়ে কাঁপতে থাকে। কিন্তু ৩৪ বছরের ভার লি এই করােনাভাইরাস মহামারীর আশঙ্কা প্রকাশ করে তাঁর মেডিক্যাল কলেজের বন্ধুদের কাছে কী ঘটছে এবং ডাক্তারদের কী কর্তব্য তাই নিয়ে বিশদ নােট পাঠাতে শুরু করেন। সবই চিনের সামাজিক মিডিয়া ওআইব-র মাধ্যমে, যার প্রতিটি বর্ণের প্রতিলিপি পৌঁছয় নেতাদের টেবিলে, প্রায় লেখার মুহূর্তেই।

লি-এর বিবরণ অনুযায়ী, জানুয়ারির শেষেই উহানে ‘শয়ে শয়ে’ রােগী ও হাসপাতাল কর্মী আক্রান্ত। ওদিকে তখন বেজিং কর্তৃপক্ষ মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে খবর চেপে রাখতে। তখনও করোনাভাইরাসের স্ক্রিনের আকৃতিটি চেনা যায়নি। কিন্তু ডাক্তার লি লিখেছিলেন, ওটি এ দু'দশক আগের Severe Acute Respiratory Syndrome (সার্স), যার প্রকোপে চিনের এক অংশ উজাড় হয়ে গিয়েছিল, তার সমগােত্রীয়। তিনি খুঁটিয়ে বর্ণনা করেন রােগের উপসর্গ এবং সংক্রমণের প্রকৃতি। উহান হল মেডিক্যাল কলেজের কে। অনেক কষ্টে এখানে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্রল্লা কলেজ ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না। কিন্তু লি-র আবিস্কৃত খবরের সম্মুখীন হয়ে, তারা প্রাণ হাতে নিয়ে উহান ছেড়ে পালাতে শুরু করে।

শি জিনফিং আর সত্যকে চাপে রাখতে পারলেন না। অবশেষে লির বাড়িতে পুলিশ হাজির হল। জোরপূর্বক লিকে দিয়ে লেখানাে হল, “যা লিখেছি তা আইনবিরােধী। কিন্তু তা লিখলেও লি ততদিনে তাঁর বিপুল সংখ্যক পাঠককে সতর্ক করে দিয়েছেন, বলেছেন সরকারের কর্তব্য মহামারীর কথা প্রকাশ করা। নইলে সর্বনাশ হবে।

সর্বনাশ হল তাঁর নিজেরও। কারণ, ওই মারণ ভাইরাসের ছোঁয়াচ লেগে লি মারা গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে চিনের মানুষের অবরুদ্ধ অভিযােগ বাঁধভাঙা জলের মতাে। ছড়িয়ে পড়ল লি-কে কেন্দ্র করে। হাসপাতালের গেটে তাঁর গুণমুগ্ধরা আনল ফুলের মালা। তারা পােস্ট করল: For whom the bell tolls?

চিন অবশ্য স্বৈরতান্ত্রিক দেশ। ভারতের মতো তার গণতন্ত্রের বড়াই নেই। কিন্তু নিজেকে পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র বলে বুক ঠুকে, ভারত এখন ক্রমশ চিনের মতো অস্বচ্ছ ও স্বাধিকারপ্রমত্ত হয়ে পড়ছে। সংসদে সংখ্যার জােরে শাসকলল এমন আইন পাশ করাচ্ছে, যা সংবিধানবিরােধী। আর তার প্রতিবাদ যে করছে তাকে স্বয়ং মন্ত্রী বলছেন, “গােলি মারাে।” এতে কিছু হচ্ছে না মন্ত্রীর। কাশ্মীরের সাংবিধানিক অবস্থান ইচ্ছেমতাে পালটিয়ে তার নির্বাচিত নেতাদের বিনা বিচারে বন্দিদশায় রাখা হচ্ছে মাসের পর মাস। প্রতিবাদ যে করবে সে-ই দেশদ্রোহী। ভারতের নেতারাও কিন্তু বুঝছেন না যে, গির্জার ঘণ্টা ধ্বনিত হচ্ছে তাঁদেরও জন্য।