সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label ছন্দ. Show all posts
Showing posts with label ছন্দ. Show all posts

মিত্রাক্ষর - মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান

মিত্রাক্ষর - মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
মিত্রাক্ষর - মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান

অমিত্রাক্ষর ছন্দ বা পরবর্তীকালে ফ্রি ভার্স বা মুক্তছন্দের আবির্ভাব বাংলা কাব্যসাহিত্যে নিশ্চিতই এক বৈপ্লবিক ঘটনা। কবিতার ছন্দমুক্তি এ ক্ষেত্রে নতুন এক জোয়ার আনলেও মিত্রাক্ষর ছন্দের কবিতা বা কাব্যকলার কি বিলুপ্তি ঘটেছে? ঘটেনি। ঘটার আশঙ্কাও নেই। রবীন্দ্রনাথ তো যথার্থই বলেছেন, ‘মিলটা মনের ওপর ঘা দেয়, তাহাকে বাজাইয়া তোলে, একটা শব্দের পরে ঠিক তাহার অনুরূপ আর একটা শব্দ পড়িলে সচকিত মনোযোগে ঝংকৃত হইয়া উঠে...।’
এবং সত্যি বলতে কী রবীন্দ্রনাথের উল্লিখিত উদ্ধৃতির অনুসরণে যখন অন্ত্যমিলের এই শব্দকোষ মিত্রাক্ষর আদ্যন্তপাঠে মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করি, তখন রীতিমতো ঘোরের দশায় আক্রান্ত হই। বাংলা ভাষা যে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও শক্তিশালী ভাষাগুলোর একটি, একজন কৌতূহলী অগবেষক পাঠকও এই কোষগ্রন্থের পাঠ শেষে সহজেই তা অনুধাবন করতে পারবেন। এই সংকলন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, বাংলা ভাষার শব্দ বা শব্দবন্ধের ভান্ডার আকাশচুম্বী হতে পারার ক্ষমতাধর। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান কৃত মিত্রাক্ষর শব্দের প্রায় সার্বিক পরিচয়বাহী এই কোষগ্রন্থ বা অভিধানের বৈশিষ্ট্য এখানেই যে, যে বিশেষ প্রকরণে তিনি অভিধানটির সংকলন বা সম্পাদনার কাজ শেষ করেছেন, তা রীতিমতো বিস্ময়-জাগানিয়া। বস্তুত অন্যান্য ভাষায় এ জাতীয় অভিধানের অস্তিত্ব থাকলেও, আমাদের ভাষায় এত দিন তা ছিল না। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সদ্যই প্রথম সে কাজটি সম্পন্ন করে আবার অগ্রচারীর মর্যাদার অধিকারী হলেন, যেমনটা হয়েছিলেন বাংলা ভাষায় প্রথম সমার্থ শব্দকোষ প্রণয়ন করে।

প্রশ্ন তো উঠতেই পারে, লেখকও প্রশ্ন তুলেছেন, এ অভিধান কীভাবে কার কাজে লাগবে? এর জবাবে সোজাসাপটা বলা যায়, অভিনিবেশসহকারে যাঁরা বাংলা ভাষা চর্চায় নিরত, তাঁদের প্রত্যেকের কাজে লাগবে এই শব্দকোষ বা অভিধান। যেমন অন্ত্যমিল রয়েছে, এমন শব্দের একটি গুচ্ছের সন্ধান যদি আমরা সাধারণ বাংলা অভিধানে খুঁজতে যাই, তাহলে পাতার পর পাতা উল্টাতে রীতিমতো গলদঘর্ম হতে হবে। কিন্তু এই শব্দকোষ বা অভিধানে আমরা অন্ত্যমিলের একগুচ্ছ শব্দ ঠিক জায়গামতো বিন্যাসিত দশায় পেয়ে যাচ্ছি। যেমন: আবর্ত আম্রাবর্ত আর্যাবর্ত ইলাবর্ত উদরাবর্ত কৈবর্ত ঘূর্ণাবর্ত জলাবর্ত ঝটিকাবর্ত কঙ্কাবর্ত তৃণাবর্ত দক্ষিণাবর্ত পরিবর্ত প্রত্যাবর্ত বর্ত্ম বাতাবর্ত বাত্যাবর্ত বামাবর্ত ব্রহ্মাবর্ত সংবর্ত সূর্যাবর্ত। অভিধানজুড়ে এমন শব্দগুচ্ছের ছড়াছড়ি। বস্তুত এটি অন্ত্যমিলের বা মিত্রাক্ষরের শব্দকোষ হলেও, অভিধান যাঁরা ঘাঁটেন, তাঁরাই দেখবেন, অন্ত্যমিলযুক্ত উল্লিখিত শব্দগুলো কত বিচিত্র ভাবপ্রকাশী! কেউ যদি এসব শব্দ থেকে বাছাই করে সমিল বা অনুপ্রাসঋদ্ধ কবিতা বা গদ্য বাক্যবন্ধ রচনা করতে চান, অনায়াসে তা করতে পারেন; কেউ যদি চান, বাংলা শব্দভান্ডারে একই ধাঁচের কত শব্দ আছে, তার হদিস করতে চাইলেও তিনি তা করতে পারেন। কিংবা একই অন্ত্যমিলের দুই বা তিনটি শব্দ বাছাই করে দেখতে পারেন—তিনটি শব্দই কত বিচিত্র ভাবপ্রকাশক। কোনোটির সঙ্গে পুরাণ জড়িত, কোনোটির সঙ্গে সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাস, কোনোটি নিছক ভাব বা ভাবনাগত অর্থের দ্যোতক।

এই শব্দকোষের ব্যবহারবিধিও নির্দেশ করেছেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। তাতে আগ্রহী পাঠক ও গবেষক মাত্রেই সহজেই বুঝে যাবেন, কীভাবে অগ্রসর হতে হবে এই শব্দকোষে আহূত ও বিন্যাসিত শব্দ বা শব্দগুচ্ছের পাঠে।

এই আলোচনার শুরুতে রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতির উল্লেখ করেছিলাম এ কারণে যে এই অন্ত্যমিল শব্দকোষ সত্যিই প্রমাণ করবে যে মিত্রাক্ষর বা অন্ত্যমিলের ব্যবহার আমাদের প্রাত্যহিক জীবন ও সাহিত্যের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ বা উপজীব্য বলে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান প্রণীত এই অভিধান আমাদের ভাষা-গবেষণার ক্ষেত্রে একটা মাইলফলকস্বরূপ ঘটনা হয়ে উঠেছে এবং এই উচ্চারণে বাহুল্যের অবকাশ নেই।

গবেষক মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন এ রকমের একটি বিরল অথচ পরিশ্রমসাধ্য কাজ এই বয়সে এসে সমাধা করার জন্য।





This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

আধুনিক বাংলা ছন্দ (১ম, ২য় খণ্ড) নীলরতন সেন

আধুনিক বাংলা ছন্দ (১ম, ২য় খণ্ড)
নীলরতন সেন
আধুনিক বাংলা ছন্দ (১ম, ২য় খণ্ড)
নীলরতন সেন

নিবেদন
‘আধুনিক বাংলা ছন্দ' গ্রন্থটির পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণের (১৯৭৯-৮০) পাঠ অক্ষুন্ন রেখে, দে’জ এর প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হল। প্রথম সংস্করণে (১৯৬২) খ্র: ১৮৫৮ থেকে ১৯৫৮ - এই একশ’ বছরের বাংলা ছন্দের ইতিহাস আলােচিত হয়েছিল। দ্বিতীয় সংস্করণে এই কালসীমা খ্রী ১৮৩১ থেকে ১৯৭৮ পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়েছে। ইচ্ছা ছিল, বর্তমান সংস্করণে দুই বাংলার সাম্প্রতিক কবিদের (১৯৫০-১৯৯০) সম্পর্কে আরও একটু বিশদ করে দুটি প্রবন্ধ লিখে, যােগ করব। কিন্তু লিখতে বসে মনে হল, এ-কালের ছন্দমনস্ক বিশিষ্ট কবিদের প্রতি সুবিচার করতে হলে দুটির বেশি প্রবন্ধ লেখা প্রয়ােজন। সুতরাং এঁদের সম্পর্কে গ্রন্থের তৃতীয় পর্ব রূপে আর একটি গ্রন্থ রচনার প্রয়ােজন রয়েছে। তাছাড়া, দীর্ঘদিন ধরেই রবীন্দ্র-ছন্দ সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনারও পরিকল্পনা রয়েছে। বস্তুতঃ, এ-দুটি গ্রন্থ রচিত হবার পরই আধুনিক বাংলা ছন্দের ইতিহাস রচনা-পর্ব সম্পূর্ণ হবে।
পূর্ববর্তী দ্বিতীয় সংস্করণের ন্যায়, এবারেও গ্রন্থের প্রথম পর্বের প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়ে যথাক্রমে ‘বাংলা ছন্দের রীতি ও রূপ’ এবং বাংলা ছন্দের ক্রমবিকাশ’ সংক্ষেপে সূত্রাকারে আলােচনা করে পরবর্তী তিনটি অধ্যায়ে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের যুগ (১৮৩১. ১৮৫৮) থেকে হেমচন্দ্ৰ নবীনচন্দ্রের যুগ (১৮৭৩-১৮৯০) আলােচিত হয়েছে। গ্রন্থের দ্বিতীয় পর্বে রবীন্দ্রযুগ-আদিপর্ব (১৮৯০-১৯০০) থেকে সাম্প্রতিক যুগ (১৯৫৮১৯৭৮) পর্যন্ত পাঁচটি অধ্যায়ের পর একটি সংক্ষিপ্ত অধ্যায়ে (ষষ্ঠ অধ্যায়ে) বাংলা কাব্যছন্দের বিবর্তন ও ভাবী সম্ভাবনা আলােচিত হয়েছে।
এবারে বইটি প্রকাশ করতে গিয়ে, কয়েক বছর পূর্বে প্রয়াত আমার ছন্দশিক্ষার গুরু ছন্দাচার্য প্রবােধচন্দ্র সেনের (১৮৯৭-১৯৮৬) অভাব মর্মে মর্মে অনুভব করছি। পূর্ববর্তী দুটি সংস্করণের সর্ববিধ পরিকল্পনায় তার সস্নেহ উপদেশ লাভ করেছি। এবারে সেই দুর্লভ সুযােগ থেকে বঞ্চিত হতে হল। এই সংস্করণেও তারই প্রবর্তিত সর্বাধুনিক ছন্দ-পরিভাষা ব্যবহার করা গেল। যাঁরা এককালে তারই দ্বারা প্রবর্তিত এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত, বাংলা ছন্দরীতির মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত এবং স্বরবৃত্ত – এই তিন নামের সঙ্গে পরিচিত, তারা ওই তিন নামের পরিবর্তে যথাক্রমে কলাবৃত্ত, মিশ্রবৃত্ত, এবং দলবৃত্ত নাম তিনটি মনে রাখলেই এ-গ্রন্থ পাঠে অসুবিধা বােধ করবেন না। প্রসঙ্গত উল্লেখ করি গ্রন্থটির বর্তমান দে’জ-সংস্করণ প্রকাশে শ্রীসুধাংশুশেখর দে আন্তরিক আগ্রহ না দেখালে, বইটির এত তাড়াতাড়ি পুনঃপ্রকাশ সম্ভব হত না।
আগস্ট ৪, ১৯৯৫
নীলরতন সেন

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

কবিতার ক্লাস - নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

কবিতার ক্লাস - নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
কবিতার ক্লাস - নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

এই বইয়ের নাম দিয়েছি ‘কবিতা ক্লাস’। এতে চমকাবার কিছু নেই। অনেকে মনে করেন যে, কবিতা একটি অপার্থিব দিব্য বস্তু, এবং তাকে আয়ত্ব করবার জন্যে, মুনিঋষিদের মতো, নির্জন পাহাড়ে-পর্বতে কিংবা বনে-জঙ্গলে গিয়ে তপস্যা করতে হয়। আমি তা মনে করি না। আমার বিশ্বাস, জাতে যদিও আলাদা, তবু কবিতা-ও সাংসারিক বিষয় ছাড়া আর-কিছুই নয়, আমাদের এই সাংসারিক জীবনের মধ্যেই তার বিস্তর উপাদান ছড়িয়ে পড়ে আছে, এবং ইস্কুল খুলে, ক্লাস নিয়ে, রুটিনমাফিক আমরা যেভাবে ইতিহাস কি ধারাপাত কি অঙ্ক শেখাই, ঠিক তেমনি করেই কবিতা লেখার কায়দাগুলো শিখিয়া দেওয়া যায়। ‘কায়দা’ না-বলে অনেকে বলবেন ‘কলাকৌশল’, তা বলুন, কথাটা তার ফলে আর-একটু সম্ভ্রান্ত শোনাবে ঠিকই, কিন্তু মূল বক্তব্যের কোন ইতরবিশেষ হবে না। বিশ্বাস করুন চাই না-করুন, কবিতা লেখা সত্যিই খুব কঠিন কাণ্ড নয়।

সেই তুলনায় পদ্য লেখা আরও সহজ। শুধু কায়দাগুলো রপ্ত করা চাই, ঘাঁতঘোঁত জেনে নেওয়া চাই। কবিতা আর পদ্যের তফাত কোথায়, এক্ষুনি সেই তর্কে ঢুকে ব্যাপারটালে ঘোরালো করে তুলতে চাই না। তার চাইতে বরং জিজ্ঞেস করি, আপনার বয়স যখন অল্প ছিল, তখন ছোটপিসি কি ন-মাসি কি সেজদির বিয়ের সময়ে কি আপনার একখানা উপহার লিখবার ইচ্ছে হয়নি? হয়তো হয়েছিল। হয়তো ভেবেছিলেন, “বাঃ কী মজা, বাঃ কী মজা, খাব লুচি মন্ডা গজা” ইত্যাদি সব উপাদেয় খাবারদাবারের কথা দিয়ে লাইন-কয় লিখে তারপর “বিভুপদে এ-মিনতি—“ জানবেন যে, নবদম্পতি যেন চিরকাল সুখে থাকে।

কিন্তু হায়, শেষ পর্যন্ত আর হয়তো লেখা হয়নি। হবে কী করে? ‘মজা’র সঙ্গে ‘গজা’র মিলটাই তখন মনে পড়েনি যে। আর তাই, কড়িকাঠের দিকে ঘণ্টাখানেক তাকিয়ে থেকে, এবং নতুন-কেনা মেড-ইন-ব্যাভেরিয়া পেনসিলের গোড়াটাকে চিবিয়ে ছাতু করে, শেষপর্যন্ত হয়তো ‘ধুত্তোর’ বলে আপনি উঠে পড়েছিলেন। মনে-মনে খুব সম্ভব বলেছিলেন, “ওসব উপহার-টুপহার লেখার চাইতে বরং মুদির দোকানের খাতা লেখা অনেক সহজ।”
মুদির দোকানের প্রসঙ্গে একটা পুরোনো কথা মনে পড়ল। বছর পঞ্চাশেক আগেকার ঘটনা। আমার বয়স তখন বছর-দশেক। সেইসময়ে আঁক কষতে-কষতে শেলেটের উপরে আমি একটা পদ্য লিখেছিলুম। তার আরম্ভটা এইরকম—
আজ বড়ো আনন্দ হইয়াছে।
দেখিয়াছি, রান্নাঘরে কই আছে।
অর্থাৎ আমি বলতে চেয়েছিলুম যে, মা যখন কইমাছ রান্না করছেন, তখন দুপুরের ভোজনপর্বটা বেশ জমাট হবে, সুতরাং আজ আমার বড়োই আনন্দের দিন। আনন্দ অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হল না; এক জ্যাঠতুতো দাদা এসে চুলের মুঠি ধরে আমাকে শূন্যে তুলে ফেললেন, তারপর বাঁ হাতে আমাকে শূন্যে ঝুলিয়ে রেখে ডান হাতে একটা চড় কষালেন, তারপর বললেন, “হতচ্ছাড়া, তোমাকে আঁক কষতে দেওয়া হয়েছে, আর তুমি কিনা বসে-বসে কাব্যি করছ? এই আমি বলে রাখলুম, পরে তোমাকে মুদির দোকানের খাতা লিখে পেট চালাতে হবে।”

বাজে কথা। যে-ছেলে আঁক কষতে ভয় পায়, তার পক্ষে মুদির দোকানের খাতা লেখা সম্ভব নয়। চাল-ডাল-গোলমরিচ-জিরে-হলুদ-পাঁচফোড়নের হিসেব রাখা কি চাট্টিখানি ব্যাপার? সে-কাজ সকলে পারে না। তার জন্যে সাফ মাথা চাই। সেই তুলনায় বরং কবিতা লেখা অনেক সহজ। কবিতা লেখবার জন্যে, আর যা-কিছুরই দরকার থাক, মাথাটাকে সাফ রাখবার কোনও দরকার নেই। বরং, সত্যি বলতে কী, মাথার মধ্যে একটু গোলমাল থাকলেই ভালো। কিন্তু না, মাথার প্রসঙ্গ এইখানেই ছেদ টানা যাক, কেন-না বিশুদ্ধ আগমার্কা কবিরা হয়তো এইটুকু শুনেই চোখ রাঙাতে শুরু করেছেন, বাকিটুকু শুনলে তাঁরা আমাকে আস্ত রাখবেন না। তার চাইতে বরং যে-কথা বলছিলুম, তা-ই বলি।

আমার বলবার কথাটা এই যে, অল্প একটু চেষ্টা করলে যে-কেউ কবিতা লিখতে পারে। আমার মাসতুতো ভাইয়ের ছোটছেলেটির কথাই ধরুন। গুণধর ছেলে। টুললিফাই করেছে, পরীক্ষার হলে বোমা ফাটিয়েছে, গার্ডকে ‘জান খেয়ে নেব’ বলে শাসিয়েছে, উপরন্তু চাঁদা তুলে, মাইক বাজিয়ে সরস্বতী পুজো করে বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবীকে তুষ্ট করেছে, তবু—এতরকম কাণ্ড করেও—স্কুল-ফাইনালের পাঁচিলটা সে টপকাতে পারেনি, তিন বার পরীক্ষা দিয়েছিল। তিন বারই ফেল। এখন সে আমাদের হাটবাজার করে দেয়, হরিণঘাটার ডিপো থেকে দুধ আনে, পঞ্চাশ রকমের ফাইফরমাশ খাটে, এখানে-ওখানে ভুল-ইংরেজিতে চাকরির দরখাস্ত পাঠায়, এবং—
এবং কবিতা লেখে। তা সে-ও যদি কবি হতে পারে, তবে আপনি পারবেন না কেন?
আমার গিন্নির খুড়তুতো ভাই এক সওদাগরি আপিসের বড়োবাবু। আগে সে-ও কবিতা লিখত, কিন্তু আপিসে তাই নিয়ে হাসাহাসি হওয়ায় এবং বড়োসাহেব তাকে একদিন চোখ পাকিয়া “হোয়াট্‌’স দিস্‌ আয়া’ম্‌ হিয়ারিং অ্যাবাউট ইউ” বলায়, কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়ে সে এখন গোয়েন্দা-গল্পের ভক্ত হয়েছে। তার কাছে সেদিন একটা ইংরেজি বই দেখলুম। বইয়ের নামে বুচার্‌ বেকার্‌ মার্ডার মেকার্‌। অর্থ অতি পরিষ্কার। যে-কেউ খুন করতে পারে। নৃশংস কসাইও পারে, আবার নিরীহ রুটিওয়ালাও পারে। খুন করবার জন্যে যে একটা আলাদা রকমের লোক হওয়া চাই, তা নয়।
তুলনাটা হয়তো একটু অস্বস্তিকর হয়ে যাচ্ছে, তবু বলি কবিতার ব্যাপারেও তা-ই। কবিতা লিখবার জন্যে আলাদা রকমের মানুষ হবার দরকার নেই। রামা শ্যামা যদু মধু প্রত্যেকেই (ইচ্ছে করলে এবং কায়দাগুলোকে একটু খেটেখুটে রপ্ত করে নিলে) ছন্দ ঠিক রেখে, লাইনের পর লাইন মিলিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে পারে।

তা জন্যে, বলাই বাহুল্য, কিছু জিনিস চাই, এবং কিছু জিনিস চাই না।
আগে বলি কী কী চাই না—
১) কবি হবার জন্যে লম্বা-লম্বা চুল রাখবার দরকার নেই। ওটা হিপি হবার শর্ত হতে পারে, কিন্তু কবি হবার শর্ত নয়। পরীক্ষা করে দেখে গেছে, চুল খুব ছোটো করে ছেঁটেও কিংবা মাথা একেবারে ন্যাড়া করে ফেলেও কবিতা লেখা যায়। চুলের সঙ্গে বিদ্যুতের সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে, কবিতার নেই।
২) সর্বক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবার দরকার নেই। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, মাটির দিকে তাকিয়েও কবিতা লেখা যায়। সবচাইতে ভালো হয়, যদি অন্য কোনও দিকে না তাকিয়ে শুধু খাতার দিকে চোখ রাখেন।
৩) কখন চাঁদ উঠবে, কিংবা মলয় সমীর বইবে, তার প্রতীক্ষায় থাকবার দরকার নেই। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, অমাবস্যার রাত্রেও কবিতা লেখা যায়, এবং মলয় সমীরের বদলে ফ্যানের হাওয়ায় কবিতা লিখলে তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হয় না।
৪) ঢোলা-হাতা পাঞ্জাবি পরবার দরকার নেই। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, স্যানডো গেঞ্জি গায়ে দিয়েও, কিংবা একেবারে আদুর গায়েও, কবিতা লেখা সম্ভব।
এইবার বলি, কবিতা লিখতে হলে কী কী চাই।
বিশেষ-কিছু চাই না। দরকার শুধু—
১) কিছু কাগজ (লাইন-টানা হলেও চলে, না-হলেও চলে)।
২) একটি কলম (যে-কোনও শস্তা কলম হলেও চলবে) অথবা একটি পেনসিল এবং–
৩) কিছু সময়।
কিন্তু এতসব কথা আমি বলছি কেন? কবিতার কৌশলগুলিকে সর্বজনের হাতের মুঠোয় এনে না-দিয়ে কি আমার তৃপ্তি নেই? সত্যিই নেই। ইংরেজিতে ‘পোয়্‌ট্রি ফর দি কমন ম্যান’ বলে একটা কথা আছে। আমার ইচ্ছে, কমন ম্যানদেরও আমি পোয়্‌ট বানিয়ে ছাড়ব। পরশুরামের কথা মনে পড়ছে। তাঁর প্রতিজ্ঞা ছিল, পৃথিবীকে একেবারে নিঃক্ষত্রিয় করে ছাড়বেন। কিন্ত, না-পারবার হেতুটা যা-ই হোক, কাজটা তিনি পারতে-পারতেও পারেননি। বিশ্বসংসারকে যাঁরা নিষ্কবি করে ছাড়তে চান (অনেকেই চান), তাঁরাও সম্ভবত শেষ পর্যন্ত পেরে উঠবেন না।

আমার প্রতিজ্ঞাটা অন্য রকমের। আমি ঠিক করেছি, বাংলা দেশে সব্বাইকে আমি কবি বানাব। দেখি পারি কি না।
কবিতা লিখবার জন্যে কী কী চাই, তা তো একটু আগেই বলেছি। চাই কাগজ, চাই কলম (কিংবা পেনসিল), চাই সময়। তা আশা করি কাগজ-কলম আপনারা জোগাড় করতে পেরেছেন। বাকি রইল সময়। তা-ও নিশ্চয়ই আপনাদের আছে। রেশনের দোকানে লাইন না-লাগিয়ে, এই যে আপনারা গুটিগুটি ‘কবিতার ক্লাস’-এ এসে হাজির হয়েছেন, এতেই বুঝতে পারছি যে, সময়ের বিশেষ অভাব আপনাদের নেই।
সুতরাং ‘দুর্গা দুর্গা’ বলে শুরু করা যাক। অয়মারম্ভঃ শুভায় ভবতু।

আগেই বলি, কবিতার মধ্যে তিনটি জিনিস থাকা চাই। কাব্যগুণ, ছন্দ, মিল।
বিনা ডিমে যেমন ওমলেট হয় না, তেমনই কাব্যগুণ না থাকলে কবিতা হয় না। তার প্রমাণ হিসেবে আসুন, আমার সেই মাসতুতো ভাইয়ের ছোটোছেলের লেখা চারটে লাইন শোনাই:
সূর্য ব্যাটা বুর্জোয়া যে,
দুর্যোধনের ভাই।
গর্জনে তার তুর্য বাজে,
তর্জনে ভয় পাই।
বলা বাহুল্য, এটা কবিতা হয়নি। তার কারণ, ছন্দ আর মিলের দিকটা ঠিকঠাক আছে বটে, কিন্তু কাব্যগুণ এখানে আদপেই নেই। এবং কাব্যগুণ না-থাকায় দেখা যাচ্ছে ব্যাপারটা নেহাতই বাক্যের ব্যায়াম হয়ে উঠেছে।

এবারে মিলের কথায় আসা যাক। মিল না-রেখে যে কবিতা লেখা যায় না, তা অবশ্য নয়, তবু যে আমি মিলের উপর এত জোর দিচ্ছি তার কারণ:
১) প্রথমেই যদি আপনি মিল-ছাড়া কবিতা লিখতে শুরু করেন, তাহলে অনেকেই সন্দেহ করবে যে, মিল-এ সুবিধে হয়নি বলেই আপনি অ-মিলের লাইনে এসেছেন। সেটা খুব অপমানের ব্যাপার।
২) মিল জিনিসটাকে প্রথম অবস্থায় বেশ ভালো করে দখল করা চাই। তবেই সেটাকে ছেড়ে দিয়েও পরে ভালো কবিতা লেখা সম্ভব হবে। যেমন বড়ো-বড়ো লিখিয়েদের মধ্যে অনেকেই অনেকসময়ে ব্যাকরণের গণ্ডির বাইরে পা বাড়িয়ে চমৎকার লেখেন, এ-ও ঠিক তেমনই। ব্যাকরণ বস্তুটাকে প্রথমে বেশ ভালো করে মান্য করা চাই, তবেই পরে সেটাকে দরকারমতো অমান্য করা যায়। ঠিক তেমনি, পরে যাতে মিলের বেড়া ভাঙা সহজ হয়, তারই জন্যে প্রথম দিকে মিলটাকে বেশ আচ্ছা করে রপ্ত করতে হবে।

ছন্দ কিন্তু সবসময়ই চাই। আগেও চাই, পরেও চাই। আসলে আমার ক্লাসে আমি ছন্দের কথাই বলব। সেই বিচারে ‘কবিতার ক্লাস’ না-বলে একে ‘ছন্দের ক্লাস’ও বলা যেতে পারত। তাতে কিছু ক্ষতি ছিল না।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

ছন্দোগুরু রবীন্দ্রনাথ

CHHANDOGURU RABINDRANATH ছন্দোগুরু রবীন্দ্রনাথ
CHHANDOGURU RABINDRANATH ছন্দোগুরু রবীন্দ্রনাথ
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

ছন্দ - আব্দুল মান্নান সৈয়দ

ছন্দ - আব্দুল মান্নান সৈয়দ
ছন্দ - আব্দুল মান্নান সৈয়দ
বইটি সম্পর্কে লেখকের নিজের বক্তব্যটিই এখানে তুলে ধরা হলো।
যথাসাধ্য সহজ ও স্বচ্ছভাবে বাংলা ছন্দের মতো দুরূহ বিষয়কে উপস্থিত করবার চেষ্টা করেছি। পাদটীকা যথাসম্ভব বর্জন করেছি। পারিভাষিক কুহেলি ও জটিলতা যথাসাধ্য পরিহার করেছি। মূল জিনিশটি ধরে দেবার চেষ্টা করেছি। ছন্দাচার্য প্রবোধচন্দ্র সেনের আপত্তি সত্ত্বেও অক্ষরবৃত্ত, স্বরবৃত্তের মতো সর্বাধিক পরিচিত শব্দগুলিই ব্যবহার করেছি। এক্ষেত্রে আমি আব্দুল কাদির, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও শঙ্খ ঘোষের মতোই এই সর্বাধিক পরিচিত শব্দগুলি ছাড়তে রাজি নই। তেমনি ‘অক্ষর’, ‘দল’ প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার না- করে ‘সিলেবল’ ব্যবহার করেছি।
সর্বত্রই আমার লক্ষ্য ছন্দ বিষয়টিকে অজটিল সহজভাবে উপস্থাপন বলেই, তা করেছি।



This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com