সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর. Show all posts
Showing posts with label রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর. Show all posts

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে কল্পাতি গণপতি সুব্রহ্মণ্যন - অনুবাদ আশফাক স্বপন

amarboi
রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে
কল্পাতি গণপতি সুব্রহ্মণ্যন

গত পঞ্চাশ বছরে একাধিকবার আমাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রকর্ম সম্বন্ধে বক্তব্য রাখতে হয়েছে। সেই ১৯৬১ সালে কবিগুরুর জন্মশতবার্ষিকী থেকে এ-কাজ শুরু করি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠানে শিক্ষালাভ করেছি বলেই আমার ওপর এই দায়িত্ব বর্তেছে। অবশ্য আমি আগে থেকেই স্বীকার করে নিতে চাই যে, এই বহুমুখী প্রতিভা ও ব্যক্তিত্বের কোনো দিক সম্বন্ধেই আমার অধীত পা–ত্য নেই। তাঁর শিল্পসৃষ্টি সম্বন্ধে আমার জ্ঞান তুলনামূলকভাবে অল্প ও সীমিত। তবে এ-কথাও স্বীকার করতে হবে যে, এই স্বল্পপরিচিতি থেকেই আমি নানাভাবে লাভবান হয়েছি। এবং আমি জানি, এই কথা শুধু আমার একার জন্য প্রযোজ্য নয়। আমার পরিচিত অনেকেই বিভিন্ন সময়ে একই কথা বলেছেন। আমার মতো অনেকের মনের নানা চিমত্মার না-ফোটা মুকুল রবিরশ্মির প্রখর আলোয় উন্মোচিত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের চিত্র ও ড্রইংয়ের সমালোচনামূলক মূল্যায়নে গভীর ঝুঁকি রয়েছে। তাঁর সৃষ্টিশীলতার এই ধারাটির উন্মেষ তাঁর জীবনে বেশ দেরিতে ঘটে – তাঁর জীবনের শেষ ১৭ বছরে – এবং এই ধারাটি তাঁর সৃষ্টিশীলতার অন্যান্য ধারা থেকে বেশ আলাদা। সৃষ্টিশীলতার অন্যান্য ধারায় তিনি ছিলেন এক পরিশীলিত, আত্মসচেতন সৃষ্টিশীল মানুষ, যিনি এক পর্যায়ে তাঁর চেতনাকে দেখেছেন অন্তস্থ ‘জীবন-শক্তি’র (যাকে তিনি জীবনদেবতা বলেছেন) প্রতিচ্ছবি হিসেবে – এই শক্তি তাঁর সৃষ্টিশীল ক্ষমতায় প্রাণসঞ্চার করেছে, সেটাকে অর্থবহ ও সার্থক করে তুলেছে। কিন্তু ছবি আর ড্রইংয়ে তিনি নিজেকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, কাজ করেছেন কোনো পূর্বপরিকল্পিত ধ্যান-ধারণার তোয়াক্কা না করেই, যেন অজানা সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছেন। ১৯২৮ সালে তরুণ সুহৃৎ রাণী মহলানবীশকে এক চিঠিতে তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। চিত্রশিল্পসৃষ্টিতে পূর্বপরিকল্পনার বাইরে স্বতঃস্ফূর্ত সম্ভাবনার যে-ইঙ্গিত রয়েছে, এই দিকটি কবিকে খুব আকৃষ্ট করেছে, যার ফলে শেষ পর্যন্ত তিনি দৃশ্যমান বিশ্বে নানা অবয়বের বিপুল সম্ভার প্রত্যক্ষ করতে প্রয়াসী হয়েছেন।

ফলে এই কর্মধারা কবির মনোভাবে আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে – এই পরিবর্তন ‘পদ্ধতিগত’। শিল্পকৃতির আর – সকল শাখায় তাঁর সৃষ্টিশীলতার কর্মধারা বাস্তব থেকে তার প্রতিফলনের দিকে অগ্রসর হয়েছে। সেই প্রতিফলন প্রক্রিয়ার সময় তিনি বাস্তবকে বিশেস্নষণ, পুনর্নির্মাণ বা পুনর্মূল্যায়ন করেছেন (যেমনটি তিনি লেখার সময় করেছেন)। চিত্রশিল্পে কিন্তু এই প্রগমনের পরিবর্তে তিনি বিক্ষেপ্ত আঁকাআঁকির দৈবক্রমে লব্ধ সৃষ্টি থেকে বাস্তবতা সম্বন্ধে সচেতন হওয়ার মধ্যে দিয়ে তাঁর শিল্পসৃষ্টিকে এগিয়ে নিতে প্রয়াসী হয়েছেন। এই প্রক্রিয়া তাঁকে গভীরভাবে উৎসাহিত করেছে। এমনকি এই প্রক্রিয়ায় তিনি শিল্পচর্চার একটি নীতিধারা প্রত্যক্ষ করেছেন। পরের দিকে চিত্রশিল্পী যামিনী রায়কে লেখা এক চিঠিতে তিনি এর রূপরেখা তুলে ধরেন :

বেশির ভাগ মানুষ তাদের চোখ ব্যবহার করতে জানে না, তা কাজেও লাগায় না। তারা তাদের ক্ষুদ্র কাজ নিয়ে ব্যস্ত, কোনদিকে দৃষ্টি নেই, কিছুতেই মন নেই। দৃশ্যমান বাস্তব জগৎ সরাসরি প্রত্যক্ষ করার যে আনন্দ, চিত্রশিল্পীর কর্তব্য হলো সেটা অধিকাংশ অচেতন মানুষকে গ্রহণ করতে বাধ্য করা। চিত্রশিল্পী গানও গায় না, নীতিকথাও বলে না। সে তার নিজের শিল্পকর্মকেই তার নিজের কথা বলতে দেয়, আর সেই শিল্পকর্মের বার্তা হলো : ‘দেখ, এই হলাম আমি  – অহমহম ভো।’

ফলে তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে যেভাবে সে-কাজের উদ্দেশ্য ও পরিণতিলাভের নীতিধারা সম্বন্ধে আলোচনা ও মূল্যায়ন করা যায়, তাঁর চিত্রশিল্প নিয়ে সেটা করা সম্ভব নয়, কারণ এই ক্ষেত্রে তিনি উদ্দেশ্য অথবা পরিণতির নীতিধারার ব্যাপারে উদাসীন। আনাড়ি ‘শৌখিন’ (অর্থাৎ যিনি শুধু ভালোবাসেন বলেই কোনো সৃষ্টিশীল কাজে হাত দেন) ব্যক্তির কাজ বলে এসব শিল্পকর্ম উদ্দেশ্য বা পরিণতিলাভের নীতিধারার দায়মুক্ত, এমনই তাঁর দাবি, ফলে এসব শিল্পকর্ম সুসংবদ্ধ বিশেস্নষণ-বিবেচনার অতীত।

অবশ্য কেউ-কেউ বলেন, রবীন্দ্রনাথ জীবনের প্রথমদিকে বৃত্তি হিসেবে চিত্রশিল্প গ্রহণ করার কথা ভেবেছিলেন। তাঁর অন্তরঙ্গ অনুসারীদের মধ্যে অন্যতম ক্ষেতীশ রায় বলেছেন যে, তিনি রবীন্দ্রনাথের কিছু ড্রইং দেখেছেন যাতে এই মতের সমর্থন মেলে। ১৮৯৩ সালে তাঁর অল্পবয়স্কা ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে এক চিঠিতে তিনি এই আকাঙক্ষার কথা বলেন, তবে সেইসঙ্গে একথাও যোগ করেন যে, তখন তাঁর ৩২ বছর বয়স, সেটা চিত্রশিল্পী হওয়ার কাজে হাত দেওয়ার জন্য বড্ড বেশি বয়স। তবে তাঁর আকাঙক্ষার কারণ সহজেই অনুমেয়। সে-সময় ঠাকুরবাড়িতে শিল্প ও সাহিত্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার যজ্ঞ চলছে – বাড়ির কেউ-কেউ কবিতা বা নাটক লিখছেন, কেউবা গান গাইছেন, কেউ অভিনয় করছেন, কেউ ড্রইংয়ে হাত পাকাচ্ছেন, কেউ আঁকা শিখছেন, চিত্রশিল্প সংগ্রহ করছেন, অথবা শিল্পী বা শিল্পামোদীদের সহায়তা করছেন বা বাড়িতে ডেকে আনছেন, তাঁদের সঙ্গে শিল্প-সংস্কৃতির নানা প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করছেন। রবীন্দ্রনাথের বড়ো ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ (বয়সে তাঁর চাইতে ১৬ বছর বড়), যিনি তাঁর মানসিক পরিণতিলাভের প্রতি বিশেষ যত্নবান ছিলেন, তিনি নিজেই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। রেখাঙ্কনে অসামান্য দক্ষতা ছিল তাঁর, তাঁর আঁকা সূক্ষ্ম প্রতিকৃতিচিত্র তাঁর আশপাশে অনেককেই মুগ্ধ করেছিল, এমনকি লন্ডনে তাঁর কাজের সীমিত সংস্করণও প্রকাশিত হয়েছিল। সুতরাং এই পথটি রবীন্দ্রনাথের কাছে অনেক আগে থেকেই খোলা ছিল। কিন্তু তাঁর সাহিত্যিক যশ সবকিছু অতিক্রম করে যায়। তাঁর বয়স ত্রিশের কোঠায় থাকাকালেই তিনি বাংলা সাহিত্যজগতে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব হয়ে গেছেন। তাঁর সাহিত্যিক রচনাসম্ভারও বিপুলভাবে সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে। দেশের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের নানা বিষয়ে তাঁর সম্পৃক্ততাও উত্তরোত্তর বাড়ছে। এর পর ১৯১৩ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন – এশিয়া মহাদেশ থেকে তিনিই প্রথম এই সম্মাননা পেলেন। এতে সারাবিশ্বে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ল। তাঁর চেতনার পরিধিও আরো প্রসারিত হলো। তিনি বহু দেশ ভ্রমণ করলেন, নানা আন্তর্জাতিক বিষয়ে – বিশেষ করে ক্ষয়িষ্ণু মানবিকতাবোধে আক্রান্ত বিশ্বে মানবতার অসিত্মত্ব রক্ষার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এ ছাড়া যেখানেই গেছেন, সেখানেই তিনি এই প্রতীতির আলোকে মানবস্বভাবের মূল প্রকৃতি ও মানুষের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে নিজের মত প্রকাশ করেছেন, মানুষের নিয়তি এবং মানুষের পূর্ণাঙ্গ উত্তরণ ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত কী, সেই সম্বন্ধে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।

তবে ভারতের বর্ধিষ্ণু চিত্রশিল্পজগৎ সম্বন্ধে তাঁর আগ্রহ অব্যাহত ছিল। সেখানে তখন তাঁর দুই প্রতিভাধর ভাইপো (বয়সে তাঁর চাইতে মাত্র কয়েক বছরের ছোট) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাঁর আগ্রহ এত গভীর ছিল যে, ভাইপোরা কী করছে বা করছে না, তিনি তার পুঙ্খানুপুঙ্খ খোঁজ রাখতেন, তাঁদের কাজে কোথায় সার্থকতা, কোথায় গলদ, সেটা দেখিয়ে দিতেন, এমনকি বারবার তাঁদের আত্মতুষ্ট কূপম-ূক জগৎ থেকে বেরিয়ে বাইরের পৃথিবীর দিকে চোখ মেলে চেয়ে দেখার তাগাদা দিতেন। ১৯১৬ সালে জাপানে ভ্রমণের সময় তিনি জাপানের যেই বিষয়টি লক্ষ করে চমৎকৃত হন, তা হলো, একদিকে সেই দেশের প্রচলিত জাপানি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বব্যাপী নান্দনিক সচেতনতা, অন্যদিকে এই পরম্পরা থেকে উৎসারিত বলিষ্ঠ চিত্রশিল্প আন্দোলন যা আধুনিক সময়ের মেজাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে। তাঁর অভিমত ছিল এই যে, জাপানি চিত্রশিল্প-আন্দোলনের প্রাণশক্তি, মাত্রা ও শৈল্পিক গুণপনা থেকে তৎকালীন ভারতীয় চিত্রশিল্পীদের জন্য শিক্ষণীয় অনেক কিছু ছিল। তিনি জাপানি চিত্রশিল্পীদের উদাহরণ দিয়ে ভারতীয় শিল্পীদের আকুল চিঠি লিখেছেন; এমনকি জাপান থেকে তিনি কিছু ফরমায়েশি চিত্রকর্ম তৈরি করিয়ে উদাহরণ হিসেবে দেশে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর বক্তব্য ব্যাখ্যা করার জন্য (সেসব চিত্র এখন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহে রয়েছে।) এ ছাড়া তিনি জাপান থেকে একজন গুণী চিত্রশিল্পী সঙ্গে নিয়ে আসেন।

জাপানে যাওয়ার আগেই তিনি কলকাতায় তাঁর বাড়িতে একটি শিল্প-সাহিত্যের গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেন – তার নাম বিচিত্রা ক্লাব। তাঁর আশা ছিল এই গোষ্ঠী ভারতের সংস্কৃতিজগতের পুনর্জাগরণের একটি কর্মচঞ্চল প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠবে। এই ক্লাব আশানুরূপ বিকাশলাভে ব্যর্থ হয় এবং সেটা তাঁর জন্য গভীর মর্মপীড়ার কারণ হয়। তবে তিনি আশা ছাড়েননি। পরবর্তী চার বছরে তিনি ক্লাবের তরুণ চিত্রশিল্পী সহযোগীদের মধ্য থেকে কিছু ব্যক্তিকে শামিত্মনিকেতনে তাঁর অনন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসতে সমর্থ হন, এবং এঁদের এমন একটি নতুন ধরনের চিত্রশিল্প শিক্ষাক্রম চালু করতে উদ্বুদ্ধ করেন যেটা আয়তনে ও প্রভাবে আরো বড়ো হয়ে পরবর্তীকালে তাঁর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতীর শিক্ষাক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে।

এর থেকে বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথ তথাকথিত পেশাদারি চিত্রশিল্পজগতের প্রয়োজন ও আয়তন সম্বন্ধে বেশ সচেতন ছিলেন। তিনি মোটেও অশিক্ষেত-আনাড়ি ছিলেন না। বহুদেশ ভ্রমণ করেছেন, স্বনামধন্য বন্ধুদের নিয়ে তাঁর বিস্তৃত সুহৃদগোষ্ঠী ছিল। যেসব দেশে গেছেন, তার শিল্প-সংস্কৃতিজগৎ সম্বন্ধেও তিনি যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন। জীবনের ছয়টি বছর তিনি যেসব দেশ ভ্রমণ করেছেন, প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সভ্যজগতের একটা বড়ো অংশ জুড়ে তার বিস্তার। এসব স্থানে ভ্রমণের সময় তিনি সব জায়গা থেকে শিল্পগুণসম্পন্ন অমূল্য উপহার পেয়েছিলেন, এবং বইয়ের একটা বড়ো সংগ্রহও পেয়েছিলেন – যেসব বইয়ে বিশ্বব্যাপী চিত্রশিল্প ও সে-সম্বন্ধে চিমত্মাভাবনার সকল দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সে-সময়ে বিশ্ব যেসব প্রশ্ন নিয়ে বিশেষভাবে আন্দোলিত হচ্ছিল, তা নিয়ে তিনি নানা জায়গায় বক্তৃতা দিয়েছেন – এর মধ্যে বিশ্বায়িত পৃথিবীতে শৈল্পিক সৃষ্টিশীলতার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

গভীরভাবে পরিশীলিত এই লেখক ও চিমত্মাবিদ সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় কিছু-না-কিছু কাজ রেখে গেছেন। তাঁর দুই সহস্রাধিক গান বাংলা সংগীতে তাঁর জন্য চিরস্থায়ী আসন রচনা করেছে এবং সে-গানে মানুষের নিজেকে জানার ও প্রকৃতির নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার মর্মস্পর্শী বিবরণ বিধৃত। তিনি অত্যন্ত বাঙ্ময় সব নাটক লিখেছেন, যা শোষক ও অত্যাচারী শক্তির বিরুদ্ধে মানুষের মুক্তির সংগ্রামের কথা বলেছে, এবং সেসব নাটকের অভিনব মঞ্চায়ন করেছেন। এই সব ধরনের শিল্পচর্চায় এমন একজন মানুষকে আমরা পাই যিনি তাঁর অভীষ্টের ব্যাপারে নিশ্চিত, বিভিন্ন মাধ্যমের ওপর যাঁর বুদ্ধিদীপ্ত দখল রয়েছে, এবং যাঁর শিল্পবোধের আন্দাজ গভীর। এই মানুষ কেন তাঁর জীবনের শেষ ১৭ বছর কাটাকুটি-আঁকাআঁকির নেশায় বুঁদ হয়ে এতটা সময় অতিবাহিত করলেন? এ যে তাঁর নেশা ছিল সেটা তর্কাতীত; তিনি তাঁর খাতায়, তাঁর চিঠি লেখার প্যাডে, বাড়িতে লেখার ডেস্কে, জাহাজে ভ্রমণের সময় কেবিনের টেবিলে – সর্বত্র আঁকতেন। তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ একে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সঙ্গে তুলনা করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই কয়েক বছরে তিনি ২০০০-এর বেশি চিত্রকর্ম সৃষ্টি করেন। এ-কাজে তিনি নির্ভর করেন তাঁর সহজাত প্রবণতা ও শিল্পচেতনার ওপর – প্রয়োজনীয় অঙ্কনদক্ষতা অর্জনের কোনো সুসংবদ্ধ প্রচেষ্টা তিনি পরিহার করেছেন। স্থায়িত্ব সংশয়াতীত নয়, এমন কালি বা রং ব্যবহার করে নানা অপ্রচলিত মাধ্যমে এই যে তিনি নেশাগ্রসেত্মর মতো আঁকার কাজে মত্ত হলেন, এটাই তো আশ্চর্য ব্যাপার। কারণ চরিত্রগতভাবে তাঁর স্বভাব এমন ছিল যে, তিনি মুখভঙ্গি, কথাবার্তা, বাড়ির ভেতর-বাইরে চালচলন সকল ক্ষেত্রে নিয়ম ও পরিশীলিত রুচির খুব গুরুত্ব দিতেন। তাঁর হাতের লেখা তো প্রায় উচ্চাঙ্গের চারুলিপির সমপর্যায়ভুক্ত। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তাঁর বার্ধক্যের এই স্বভাববিরুদ্ধ শিল্পচর্চাও নিয়ম ও পরিশীলনের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে উৎসারিত।

১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথ পেরুর উদ্দেশে সমুদ্রপথে যাত্রা শুরু করেন, কিন্তু অসুস্থতার কারণে তাঁকে বুয়েনোস আয়রেসে (Buenos Aires) থামতে হয়। সেখানে তিনি তাঁর অনুরাগী আর্জেন্টিনার কবি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর আতিথ্য গ্রহণ করেন। সেখানে থাকাকালে তিনি একটি খাতায় একগুচ্ছ কবিতা নিয়ে কাজ করেন। (পরে সেসব কবিতা ‘পূরবী খাতা’ হিসেবে অভিহিত হয়, এবং সে-কবিতাগুলো ‘পূরবী’ নামে প্রকাশিত হয়।) এই খাতায় তিনি প্রাথমিক খসড়া রচনায় কিছু সংশোধন করেন, কিছু লাইন কেটে দেন, কোথাও-কোথাও নতুন সংযোজন করেন; তাঁর খুঁতখুঁতে স্বভাবের কারণে এই অবিন্যস্ত সংশোধন তাঁকে পীড়া দেয়। তখন তিনি আরো কিছু রেখার মায়াজালে সেই অবিন্যস্ত পাতাকে অলংকৃত করে তোলেন, ঠিক যেভাবে একজন সেলাইশিল্পী সেলাইয়ের কোনো অসুন্দর মেরামতি বা জোড়ার কাজ বাড়তি সূচিকর্ম দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করে। তাঁর নিজের ভাষায় খাতার এই প্রাথমিক সংশোধন ‘পাপীর উদ্ধারলাভের আকুতি নিয়ে আর্তনাদ করে ওঠে’ এবং তাঁকে সাড়া দিতে বাধ্য করে। তাঁর প্রচেষ্টার ফলে এসব অবিন্যস্ত সংশোধন-জড়ানো লতাপাতাসদৃশ গতিময় রৈখিক আনাগোনার রূপ নেয়; এর থেকে জন্ম নেয় অন্যান্য আকৃতির অবয়ব। এসব তাঁর ভাষায় ‘স্বাভাবিক রৈখিক বাছাই প্রক্রিয়া’ অনুসরণ করে নানা অবয়ব সৃষ্টি করেছে – পাখি, জন্তু-জানোয়ার, মানবদেহের শিল্পায়িত চিত্ররূপ, কিংবা এসবের সম্মিলিত চিত্র। এই কাজকে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর সহজাত ছন্দবোধের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। তিনি বলেছেন : ‘আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে লক্ষ্য করি আমার আঁকা রেখাগুলো নানা ছন্দঃস্পন্দে পরস্পর যুক্ত হয়ে প্রাণ পায়, তাদের স্বভাব তৈরি হয়, আর তারা নানা আকারে-ইঙ্গিতে পরস্পরের সাথে কথা বলে।’ এখান থেকে তিনি নতুন-নতুন আবিষ্কার আর সৃষ্টির দিকে অগ্রসর হয়েছেন, সেখান থেকে রাশি-রাশি মিশ্র রেখাচিত্রের সৃষ্টি হয়েছে, যার সঙ্গে আদিম নৃতাত্ত্বিক নিদর্শনের সাদৃশ্য রয়েছে। সেখানে জীবের সঙ্গে জড়ের যোগ ঘটেছে, মানবসদৃশ গুণাবলির সঙ্গে মিলেছে জান্তব গুণাবলি – পাত্র-পাখি, সারস-জলপাত্র, কচ্ছপ-চৌকি, সর্প-পানপাত্র, পাষাণ-মুখচ্ছবি, বীজ-মুখ, কাঠি-মূর্তি, প্রস্তর-মূর্তি, এ-ধরনের কত-না সৃষ্টি। কিন্তু এ তো সবে শুরু। তাঁর আঁকার বিষয়বস্ত্ত আরো বিস্তৃত হলো; তার কিছুটা তাঁর অবচেতন থেকে উৎসারিত, কোনোটার উৎস আগে-দেখা শৌখিন শিল্পসামগ্রীর ঝাপসা স্মৃতি। তাঁর পরিপার্শ্ব – বস্ত্ত, মানুষ, প্রাকৃতিক দৃশ্য – এসবের  পর্যবেক্ষণলব্ধ উপলব্ধি প্রতিক্ষেত্রে তাঁর পরিশীলিত বোধে সমৃদ্ধ হয়ে নবরূপে নতুন প্রাণশক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে, কখনো আলাদা-আলাদা চিত্রে, কখনো নজরকাড়া চিত্রগুচ্ছ হিসেবে। চিত্রশিল্পের ইতিহাসবিদ পৃথ্বীশ নিয়োগী রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকীর বছরে লন্ডনের গ্যানিমিড প্রেস (Ganymed Press) থেকে তাঁর চিত্রশিল্পের কোলোটাইপ মুদ্রণে ছাপা সংকলন প্রকাশনার তত্ত্বাবধান করেছিলেন। এ-কাজ করতে তাঁকে যে বিপুল পরিমাণ চিত্রকর্ম ঘাঁটতে হয়েছে তিনি তার এক বিশদ তালিকা দিয়েছেন। এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে প্রাণবন্ত রঙের ফিতা, ফুল-পাখির যুগ্মচিত্র, আদিম জীবজন্তু, শেস্নষময় দুষ্টুস্বভাবের চরিত্র, শারীরিক কসরতরত সরীসৃপ, বিশালাকৃতির যান, মায়াময় স্বপ্নিল বাড়ি, অতিকারুকার্যময় আসবাবে উপবিষ্ট অদ্ভুত নগ্নমূর্তি, চন্দ্রাকৃতি মুখম-লের মোহিনী চোখের মেয়ে, রুদ্র বা নিমগ্ন মেজাজের নাটকীয় দৃশ্যাবলি (এসব তাঁরই বর্ণনা) – এ এক অবিশ্বাস্য বিচিত্ররূপিণী মিছিল। এসব তাঁর চিত্রকে বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ করেছে বলে ধরে নেওয়া সমীচীন। একদিকে তাঁর অবচেতন থেকে ছবিগুলো উঠে এসেছে, অন্যদিকে নানা সাংস্কৃতিক পরিম-লের সঙ্গে তাঁর যে নিবিড় সান্নিধ্য ঘটেছিল, তাঁর নাটক-কবিতা থেকে যেসব বিষয়বস্ত্ত উঠে এসেছে, উপরন্তু তার আশপাশের যেসব নানা জিনিস তাঁর দৃষ্টিকে উজ্জীবিত করেছে, তাঁর চিত্র সেগুলোকেও ধারণ করেছে। ১৯২৪ সালের পর থেকে (অর্থাৎ যে-সময়ে তিনি প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায় অতিক্রম করে এসেছেন) ইত্যাকার গুণ তাঁর কাজের পাশাপাশি উপস্থিত। ১৯৩০ সালে প্যারিসের গ্যালারি পিগ্যালে তাঁর চিত্রকর্মের যে প্রথম বড়ো প্রদর্শনী হয় (এতে বিভিন্ন ধরন ও মাপের প্রায় ৪০০ চিত্রকর্ম স্থান পায়), তাতে এই বৈচিত্র্য পরিলক্ষেত হয়। তাঁর স্মৃতির বারান্দা দিয়ে যেন নানা রকমের অবয়ব ফল্গুধারার মতো বেরিয়ে এসেছিল, সেসবে সাড়া দিয়ে বা পরিবর্ধন করে তিনি যা সৃষ্টি করেছিলেন, তা-ই প্রদর্শনীতে উঠে এসেছে। এর সবটাই তাঁর অনন্য সৃষ্টি। ১৯২৪ সালে তিনি লিখেছিলেন : ‘অনেক কিছুর স্মৃতিই আমার চেতনার উপরিভাগ থেকে হারিয়ে যায়। ওরা যেন মূল মঞ্চ ছেড়ে নিচের গ্রীনরুমে চলে যায়, সেখানে তারা তাদের চরিত্র ও বেশভূষা ইচ্ছামতো পালটাতে পারে। আমার স্রষ্টা আমার মনটা রঙ্গমঞ্চ হিসেবেই বানিয়েছেন, জাদুঘর হিসেবে নয়।’ এখানে তিনি বলতে চেয়েছেন যে, মঞ্চের অভিনেতাদের মতো তাঁর চিত্রের উৎস যে-স্মৃতিমালা, তারও অনবরত ক্রমরূপান্তর ঘটছে। যত সময় গেছে রঙ্গমঞ্চের এই ধারণাটা আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিষয়টি আরেকটু ব্যাখ্যা করার জন্য আমার পূর্বোলিস্নখিত একটা নিবন্ধ থেকে খানিকটা উদ্ধৃতি দিচ্ছি :

শুরুতে তাঁর অঙ্কিত অধিকাংশ জীব-জন্তু যেন এক পাতাল জগতের বাসিন্দা। তাদের শরীরের নড়াচড়া ছিল অবিন্যস্ত, তাঁর পাখিরা যেন রুচি ও সৌষ্ঠবের খ-চিত্র, তাঁর আঁকা মানবমূর্তি নীরব অথচ চঞ্চল, বা যেন কোনো অজ্ঞাত মূকাভিনয়ে অংশ নিচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে তাঁর অঙ্কনশৈলীর বিকাশের সাথে সাথে এইসব রূপ নতুন মাত্রা নিচ্ছে, যেন নিজস্ব ভাষালাভ করছে, এবং বাস্তব বা কল্পিত জীবনের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করছে। জন্তুগুলি ডেকে উঠছে, হুড়োহুড়ি করছে বা দুষ্টুমি করছে; মানব চেহারাগুলো যেন নতুন, নিজস্ব চরিত্র গ্রহণ করছে। ওই মুখকালো করা ভাবনাজাগানো মুখটি কি নতুন বৌঠানের? ওই ভুতুড়ে চেহারার মুখগুলো কি রান্নাঘরের পাচকদের চেহারা, বা ওই বিষণ্ণ ভাবলেশহীন বিস্ফারিত-চক্ষু নারীমুখ কি অন্দরমহলের পরিচারিকাদের চিত্র? খোঁচা-খোঁচা দাড়িওয়ালা লোকগুলো বা গাঁট্টাগোঁট্টা নারী-পুরুষ, এরা কি তাঁর প্রাত্যহিক জীবনের আশেপাশের লোক? তাঁর চিত্রমালার মধ্যে একটি অপূর্ব স্কেচ রয়েছে – যাকে ঠাট্টা করে তিনি নাম দিয়েছেন ‘সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ’, সেখানে দুই শয়তানি-ভরা খিটখিটে বৃদ্ধা (মার-এর কন্যা?) মধ্যবর্তী এক নির্লিপ্ত (নাকি করুণ?) বুদ্ধমূর্তি নিয়ে বচসায় মত্ত; এখানে কি কোনো ব্যক্তিগত সংকটের আভাস দেওয়া হয়েছে? এসবই নিঃসন্দেহে আমাদের আন্দাজ। তবে তাঁর আঁকা মুখ ও দেহের চিত্রগুলোর যে সুস্পষ্ট নিজস্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সেকথা তর্কাতীত; সেটা কাকতালীয় না ইচ্ছাকৃত, তা আমরা জানি না।

এই ব্যাপারটাই আমাদের আকৃষ্ট করে, আমাদের সারাক্ষণ ধাঁধায় রাখে, তাঁর অঙ্কনশৈলীর সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমাদের মনোযোগ ধরে রাখে। এই ব্যাপারটি দেশের ভেতরে আর বাইরে অনেকের বেলায়ই ঘটেছে। এই প্রসঙ্গে গত আট দশকে তাঁর চিত্রশিল্পের প্রতি মানুষের প্রতিক্রিয়ার বিচিত্র ওঠানামা নিয়ে খানিকটা আলোচনা করা যাক।

তাঁর ছবির ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের নিজের প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম ছিল। প্রথম দিকে তিনি এ-বিষয়ে বেশ সংকোচ প্রকাশ করেছেন। অঙ্কনশিল্পে কখনোই তিনি কোনো দখল দাবি করেন নাই। একটা বিষয়েই তিনি নিজের কিছুটা দখল রয়েছে বলে দাবি করতে পারতেন – তা হলো কথা ও ধ্বনির ছন্দ সম্বন্ধে তাঁর একটি সহজাত, সূক্ষ্মবোধ। অর্থাৎ তিনি যে জনসাধারণকে তাঁর চিত্রকর্ম দেখাতে সাহসী হয়েছিলেন, সেই সাহস একজন আনাড়ি বা বেখেয়াল ব্যক্তির সাহস। পরে প্যারিসের গ্যালারি পিগ্যালে (Gallerie Pigalle) তাঁর চিত্রপ্রদর্শনী যখন বিপুলভাবে সংবর্ধিত হলো, তখন তিনি তাঁর পুত্রবধূ (এবং আরো অনেককে) লিখতে প্রবৃত্ত হলেন যে, কবি হিসেবে রবি যদি-বা খানিকটা মেঘাচ্ছন্ন, চিত্রশিল্পী হিসেবে সে দেদীপ্যমান। এর কিছুদিনের মধ্যেই জার্মানিতে তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শনী হলো ও ভূয়সী প্রশংসালাভ করল, তাতে তাঁর আত্মবিশ্বাস অনেকটা বেড়ে গেল, যার বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাই কিছুদিন পর তাঁর লন্ডনের ইন্ডিয়া সোসাইটিতে প্রদত্ত অভিভাষণে। মস্কোতে তাঁকে একজন বড়োমাপের চিত্রশিল্পী হিসেবে স্বাগত জানিয়ে তাঁর চিত্রকর্মকে যে-সংবর্ধনা দেওয়া হলো সেটা যখন এর আগের সব সংবর্ধনাকে ছাড়িয়ে গেল, তখন তিনি কিছুদিন পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে আর এ-কথা বলতে দ্বিধা করলেন না যে, সেখানে তিনি কবি বা দার্শনিক হিসেবে নয়, একজন চিত্রশিল্পী হিসেবেই এসেছেন। তাঁর আশা ছিল, যে-দেশের মানুষের চিমত্মাভাবনায় মনের উদারতার সুনাম রয়েছে সেখানে হয়তো তিনি খানিকটা আর্থিক সাফল্যও লাভ করতে পারবেন, তাতে তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্গতি লাঘব হবে, এমনকি দেশে ফিরে তিনি নিজের জন্য একটা ছবি আঁকার স্টুডিও তৈরি করতে পারবেন। কয়েক মাসেই তাঁর নিজের সম্বন্ধে ধারণা পালটে গেল – নিজেকে ভাবতেন ভীরু আনাড়ি, এখন হয়ে গেলেন এমন একজন আত্মবিশ্বাসী শিল্পী, যিনি বিশ্বের দরবারে অন্যদের সঙ্গে সমকক্ষ হিসেবে তাল রেখে চলতে পারেন। এই অবস্থায় তিনি দেশে দর্শকের মান সম্বন্ধে বিরূপ মন্তব্য করেন এবং দেশে ফিরে সেখানে তাঁর ছবি দেখানোর ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে তিনি আশানুরূপ সাড়া পেলেন না, আশা-আনন্দের যে রঙিন ফানুস গত পাঁচ মাসে ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল তা মুহূর্তেই চুপসে গেল। এরপর ১৯৩৮ সালে লন্ডন ছাড়া তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর চিত্রকর্ম আর পাশ্চাত্যে প্রদর্শিত হয়নি।

রবীন্দ্রনাথ কিন্তু জীবনের শেষাবধি ছবি এঁকে গেছেন। শুরুতে পশ্চিমের স্ত্ততি তাঁকে খানিকটা উৎসাহিত করে থাকলেও পরের দিককার উপেক্ষা বা বিরূপ সমালোচনা তাঁকে দমাতে বা থামাতে পারেনি। তাঁর ছবি আঁকার তাগিদ অটুট ছিল। তাঁর ছবি তাঁর সঙ্গে দৃশ্যমান জগতের সম্পর্ক রক্ষা করত, জগতের সজীবতা আর রহস্যময়তার জয়গান গাইত; ঠিক একই কাজ যেমন তিনি ভিন্ন মাত্রায় তাঁর কবিতা আর গানে করেছেন। রাণী চন্দকে তিনি বলেছেন :

আমি যখন ছবি আঁকতে শুরু করি তখন নিজের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। গাছ ও তার শাখা আর লতাপাতায় আমি নানারকমের অদ্ভুত জীব-জন্তুর মূর্তি দেখতে শুরু করলাম। এসব আমি আগে কখনো দেখিনি। আগে দেখতাম এই বসন্ত এল, শাখায়-শাখায় ফুল ফুটে উঠছে – এই ধরনের জিনিস। দৃশ্য জগতের এই ঐশ্বর্য মানুষের চারপাশে ছড়ান রয়েছে। যখন তুমি কিছু দেখে ‘বাহ’ বলে ওঠ তখন সেটা তার সৌন্দর্য দেখে নয়, চোখের সামনে তার দৃশ্যমান উপস্থিতিতে তোমার উল্লাস। এইসব আমাদের দৃষ্টির ভা-ার পূর্ণ করে। যা কখনো দেখিনি, সেটা যখন দেখি, তখন আমাদের মন বিস্ময়ে অভিভূত হয়। তাই তো কোনো কিছু দেখাতেই এত আনন্দ।

আগের একটা চিঠিতে তিনি বলেছেন যে, একেবারে শৈশব থেকেই দৃশ্যমান তথ্য তাঁকে মোহিত করত। তবে সেদিকে তিনি আর অগ্রসর হননি, কারণ তিনি যাকে ‘ভাবে ও কর্মে নিজেকে প্রকাশ করা’ বলে অভিহিত করেছেন, সেই কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। কিন্তু বয়সের ভার যখন বাড়ল আর জীবনীশক্তি হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে ‘ক্লামিত্মর ধূসর গোধূলি’ তাঁকে কাবু করে ফেলল, তখন তিনি ‘নিজেকে ছুটি দিতে চাইলেন’ :

ঠিক এই সময়ে আমার কর্মকা–র কোন এক ছিদ্রপথে আঁকা ও ড্রয়িং-এর প্রচ- নেশা প্রবেশ করলো – এইসব সৃষ্টি ভাল কি মন্দ সেটা অবান্তর। আসল কথা হলো এই সব বর্ণ আর রেখা থেকে কোন একটা অবয়ব সৃষ্টি হয়েছে। নাই-বা থাকলো তার কোন নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য। আমি বিন্দুমাত্র আশা করি না এইসব সৃষ্টি আমার জন্য কোন পুরস্কার বা যশ বয়ে আনবে – তবুও এই অবয়ব আবিষ্কারের খেলার যে নেশা, সেটা রয়েই যায়। আমার জীবন পুরো বৃত্ত ঘুরে আবার সেই বেপরোয়া বাল্যকালে চলে এসেছে যখন আমার চোখ অবয়বের জগতের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠতো, আর আমি, এক ছোট্ট বালক, নিজের খেলনার জগতে মশগুল হতাম।

তাঁর জীবনের পরের দিকে রবীন্দ্রনাথ নিজের মধ্যে এবং তাঁর পরিপার্শ্বে যে পরিবর্তন ঘটছিল সেই সম্বন্ধে গভীরভাবে সচেতন ছিলেন মনে হয়। সাহিত্য, সংগীত, চিত্রশিল্প – সৃষ্টিশীলতার বিভিন্ন রূপের মধ্যে কোনটা তুলনামূলকভাবে কতদিন টিকবে, সেটা নিয়ে তিনি জল্পনা-কল্পনা শুরু করলেন। সাহিত্যে নিজের অভিজ্ঞতা বিধৃত করতে গেলে একটা নির্দিষ্ট যুগের ভাষা ও ভাবনাচিমত্মার ওপর নির্ভর করতে হয় বলে সাহিত্য তাড়াতাড়ি সেকেলে হয়ে যায়; যতই সময় যায়, সাহিত্যসৃষ্টি অস্বচ্ছ ও দূরবর্তী হতে থাকে। গান আর সংগীত আমাদের শ্রম্নতির সহজাত অনুভূতির সঙ্গে জড়িত বলেই বোধহয় টেকেও বেশিদিন, আর অত সহজে সেকেলে হয় না। তবে দৃশ্যমান শিল্পকর্ম যেহেতু আমরা যা দেখি তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত বা তার কথা মনে করিয়ে দেয়, তাই সেই শিল্পের স্থায়িত্বের সম্ভাবনা তাঁর কাছে বেশি মনে হয়।

হয়তো এ-বিষয়ে তাঁর ভাবনা পুরোপুরি সঠিক ছিল না। সন্দেহ নেই, ভাষায় প্রকাশিত সৃষ্টি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে একধাপ দূরবর্তী এবং অনুবাদ করলে আরো দূরবর্তী হয়ে যায়, এবং ধ্বনি আর দৃষ্টি আরো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। কিন্তু পাঠক, শ্রোতা বা দর্শক কতটুকু রস গ্রহণ করতে পারবেন, সেটা নির্ভর করে তাঁর সহজাত বা চর্চিত বোধশক্তির ওপর, এবং ওই শিল্পসৃষ্টির সঙ্গে পরিচিতির মাত্রার ওপর। কাজেই ব্যাপারটা এত সরল নয়। তবে ১৯৪০-এর দিকে চিত্রশিল্প মহলে একটা ধারণা তৈরি হয় যে, আরো আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ফলে একটা প্রমিত বিশ্বজনীন (আজকের যুগে যাকে ‘আন্তর্জাতিক’ বলা হয়) চিত্রশিল্পের মান তৈরি হবে। রবীন্দ্রনাথ সারাবিশ্ব চষে বেড়িয়েছেন, সুতরাং এরকম ভাবনায় তাঁর প্রভাবিত হওয়ার কথা। সে যা-ই হোক, চিত্রশিল্পী হিসেবে তাঁর আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে থাকা অবস্থাতেও তিনি তাঁর ছবিকে তাঁর লেখা বা গানের সমান উচ্চাসনে বসাতে রাজি ছিলেন কি না সন্দেহ। বরঞ্চ যেটা আরো বিশ্বাস্য, তা হলো যে তাঁর ‘সৃষ্টিশীলতার ঐক্য’ তত্ত্বের অনুসরণে তিনি ঈশ্বরদত্ত সকল সুকুমারবৃত্তিসুলভ গুণ সাধ্যমতো পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত করতে প্রয়াসী হয়েছেন, এবং এর মধ্যে আঁকার আগ্রহও অন্তর্ভুক্ত।

জুলাই ১৯৩৯-এ তাই তাঁর রাণী চন্দকে বলার সৎসাহস ছিল : ‘তুমি জান আমি চিত্রশিল্পী নই। যাই আঁকি না জেনেশুনেই আঁকি। ভেবেচিমেত্ম আঁকা বা কোনো সুনির্দিষ্ট রূপ দেবার অভিপ্রায়ে সচেতনভাবে আঁকা আমার পক্ষে অসম্ভব। আমার কাজে নানা ইতস্তত আঁকাআঁকি থেকে কোনো এক পর্যায়ে একটা অবযব রূপ ধারণ করে। এমন লোককে কি শিল্পী বলা চলে?’ নিশ্চয়ই বলা চলে, যদি এই কথা আমরা মনে রাখি যে, এই শিল্পী সুসংবদ্ধ কোনোরকম ‘খোঁজ’ ছাড়াই ‘পাওয়ার’ আশায় আঁকেন, ফলে তাঁর প্রাপ্তিতে ভালোমন্দের বেশ বড়ো হেরফের রয়েছে।

পাশ্চাত্যে রবীন্দ্রনাথের ছবির প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল, সেটা তৎকালীন পাশ্চাত্যের চিত্রশিল্প মহলের পরিস্থিতির আলোকে বিচার করতে হবে। সেখানে তখন দস্ত্তরমতো একটা বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে। চিত্রশিল্পের প্রকৃতি কী – তার প্রেরণা, উদ্দেশ্য, এমনকি সেটা হৃদয়ঙ্গম করার প্রক্রিয়া – এই সবকিছুর প্রচলিত ধ্যান-ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছিল। বাস্তবতার প্রতি নিষ্ঠা আর প্রশ্নাতীত থাকল না। আবির্ভাব ঘটল নানা বিকল্প কল্পরূপের, যা শিল্পীর ব্যক্তিগত অনুভবজাত প্রবণতা থেকে উদ্ভূত বা বাস্তব জগতের প্রতি তাঁর নানা প্রতিক্রিয়া থেকে উৎসারিত। এর মধ্যে কিছু প্রবণতা, বিশেষ করে জার্মান এক্সপ্রেশনিস্টদের আবেগাশ্রয়ী শিল্পকর্মের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের স্বতঃস্ফূর্ত চিত্রশিল্পের মূল্যবোধের একটা যোগসূত্র ছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্পকর্ম তাঁদের শিল্পকৃতির যুক্তিধারা থেকে স্বতন্ত্র ছিল, রবীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্পের ভিত্তি আরো সরল ছিল – এই চিত্রশিল্পের উৎস জন্মসূত্রে পাওয়া এক অস্বচ্ছ আকুতি, সেটা কোনো প্রচলিত ধ্যান-ধারণা থেকে উঠে আসেনি। সমালোচকরা সবাই এ-কথা জানতেন; তাঁর চিত্রকর্মের তারিফ করার সময়ও তাঁরা দূরত্ব বজায় রেখেছেন – তাঁদের জোর দিয়েছেন একজন প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক ও চিমত্মাবিদের অন্য কোনো এক শিল্পে অসামান্য প্রতিভার ওপর, এবং সমসাময়িক কিছু চিত্রশিল্পীর কাজের সঙ্গে তাঁর কাজের সাদৃশ্যের ওপর। তবে তাঁদের প্রতিক্রিয়ার গুরুত্ব কতখানি, সে-কথা বলা শক্ত। ওঁর বার্লিনে প্রদর্শনী নিয়ে ব্যাপকভাবে পত্রিকায় লেখালিখি হয়েছিল। সেখানকার জাতীয় গ্যালারি তাঁর কিছু শিল্পকর্ম ক্রয় করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল, কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে পারেনি। ওদের আগ্রহ রবীন্দ্রনাথের হৃদয় স্পর্শ করে, তিনি সেসব চিত্রকর্ম গ্যালারিকে দান করেন। কিন্তু কিছুদিন আগে তার খোঁজ করেও কোনো হদিস পাওয়া যায়নি, এবং তাদের নথিপত্রে কোথাও রবীন্দ্রনাথের এই উপহারের কোনো উলেস্নখ পাওয়া যায় না। যুক্তরাষ্ট্রে রবীন্দ্রনাথের চিত্রপ্রদর্শনী উদ্বোধন করেন আনন্দ কুমারস্বামী ও স্টেলা ক্রামরিশ (Stella Kramrisch)। রবীন্দ্রনাথের খুব আশা ছিল, প্রদর্শনী ভালো সাড়া পাবে, কিন্তু সাড়া মোটেও ভালো ছিল না, অংশত দেশে জালিয়ানওয়ালাবাগে গণহত্যার বিপক্ষে তাঁর অনড় অবস্থানের জন্য। বিলেতে প্রতিক্রিয়া বরাবরই মিশ্র। ১৯৩০ সালে বার্মিংহামের চিত্রপ্রদর্শনী ইতিবাচক সাড়া পায়, কিন্তু একজন সমালোচক কেইন্স স্মিথ (Kaines Smith) লেখেন : ‘রবীন্দ্রনাথের ড্রয়িং-এর বিচারে চিত্রশিল্প সমালোচনার স্বাভাবিক মানদ- ব্যবহার করা অসম্ভব। এই ড্রয়িংগুচ্ছ দেখে ভারি আনন্দ হয়, তথাপি এ-কথাও সত্যি রূপসৃষ্টির যে-বীজ থেকে চিত্রশিল্পীর যাত্রা শুরু হয়েছে, সেটা নেহায়েতই কাকতালীয়ভাবে লব্ধ।’ বিলেতের চিত্রশিল্পামোদী মহল বরাবরই প্রচলিত ধ্যান-ধারণার প্রতি অনুগত এবং রৈখিক অঙ্কনশৈলীর ওপর খুব গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ইউরোপীয় মূল ভূখ–র সমসাময়িক চিত্রামোদীদের মতো ওরা অতটা গতানুগতিকতার বাইরে যেতে আগ্রহী ছিল না। ১৯৮৬ সালে যখন লন্ডনের টেগোর সোসাইটি স্থানীয় কিছু ভারতপ্রেমীর সহায়তায় রবীন্দ্রনাথের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন করে, তখন বার্বিকান (Barbican) গ্যালারিতে তাঁর চিত্রকর্মের এক বিশাল প্রদর্শনী আয়োজিত হয়। পত্রিকায় তার সমালোচনা বের হয়। সানডে টাইমস (Sunday Times) পত্রিকায় মারি ভেইজি (Marie Vaizey) লেখার সময় কবির সাহিত্যে অবদানের তারিফ করেন, যেখানে তাঁর লেখায় ফটোগ্রাফারের দৃষ্টির তীব্রতা রয়েছে, কবিতায় ‘মরমি সত্তা সম্বন্ধে একধরনের বিবরণ’ রয়েছে, কিন্তু তাঁর অতিসরল শিশুসুলভ ড্রইং আর চিত্রকর্ম সমালোচকের কাছে অসাধারণ মনে হয়েছে নিজগুণে ততটা নয়, যতটা না শিল্পীর চেতনার আয়না হিসেবে। স্পেক্টেটর (Spectator) পত্রিকায় লেখার সময় জাইলস অডি (Giles Audy) কবিগুরুর চিত্রশিল্পকর্মের সঙ্গে আলফ্রেড ওয়ালিস (Alfred Wallis), (কর্নিশ অঞ্চলের একজন প্রাকৃত শিল্পী) এডভার্ড মাঞ্চ (Edvard Munch), স্যামুয়েল পালমার (Samuel Palmer), এই ধরনের শিল্পীদের কাজের তুলনা করেন, কিন্তু এই সিদ্ধামেত্ম উপনীত হন : ‘একথা বলা বাঞ্ছনীয় যে গত শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্প ওঁর শিল্পচর্চায় বহুমুখী সৃষ্টিশীল প্রতিভার একটি লক্ষণীয় দিক, কিন্তু এর অবস্থান ঐ সৃষ্টিশীলতার প্রাণকেন্দ্রে নয়।’ মার্ক কারা (Mark Currah) ভিজুয়াল আর্টস (Visual Arts) সাময়িকীর এক নিবন্ধে তাঁকে চিরকালীন সর্বজনীন মানুষ বলে অভিহিত করেছেন, কিন্তু অক্সফোর্ডের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টে তাঁর চিত্রপ্রদর্শনীর ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন : ‘শিল্পী হিসেবে তিনি খুব গুণী নন – বড্ড বেশি ভাবলেশহীন মুখ, বড্ড বেশি অবিন্যস্ত অবয়ব, অতিকারুকার্যময় কালির কাজ – কাজ দেখে আগ্রহ জাগে, কিছু কাজ তো অসাধারণ। কিন্তু যেখানে গোটাছয়েক শিল্পকর্ম দিয়েই কাজ সারা যেত, সেখানে ১২৪টা শিল্পকর্ম দেখানোর কি দরকার ছিল?’ অবজারভার পত্রিকায় উইলিয়াম উইভার (William Weaver) শুরু করেন এভাবে :

স্ট্রিন্ডবার্গ (Strindberg) আর শ্যোনবার্গের (Schoneberg)  মতো রবীন্দ্রনাথও একজন বড়োমাপের শিল্পী ছিলেন, তাঁর প্রতিভার বহুমুখী ব্যাপ্তি চিত্রাঙ্কন ও ড্রয়িং অবধি স্পর্শ করেছিল। অনেক ভারতীয় চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথকে তাঁদের দেশের আধুনিক শিল্পীদের মধ্যে অগ্রগণ্য মনে করেন যিনি গতানুগতিকতা থেকে বেরিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত যোগসূত্রের মাধ্যমে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মধ্যে মেলবন্ধন রচনা করেছেন। চিমত্মাভাবনার আকর হিসেবে বা তাঁর রচনার সূত্র হিসেবে তাঁর চিত্র বাঙ্ময়, দ্যুতিময়। কিন্তু শুধু নিজগুণে বিচার্য হলে এই ছবি আরো গভীর পর্যবেক্ষণ দাবি করে। একের পর এক আম্রবর্ণের সূর্যাস্ত, একই ধরনের অভিব্যক্তিহীন মুখাবয়ব – এসব নকশা উদ্দেশ্যহীন আঁকাআঁকির বেশি কিছু মনে হয় না।

সবাইকে অবশ্য টেক্কা দিয়েছেন ব্রায়ান সুওয়েল (Brian Sewell)। তিনি স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকায় লেখেন, তাঁর চিত্রকর্ম দুর্বোধ্য, তা পরিশীলিত নয়। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথ এক বিরক্তি উদ্রেককারী বৃদ্ধ, তিনি সারা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছেন, এখানে-ওখানে নানা মানুষের চিত্র আর ড্রইং থেকে ভাব চুরি করে তাঁর বৃদ্ধবয়সে চর্বিতচর্বণ পরিবেশন করেছেন। ‘চর্বিতচর্বণ’ই বটে। (ছবিগুলো) অতি নিকৃষ্টমানের। কাটাকুটি, আঁচড়, কালির ছোপ দিয়ে যতটাই বা খাটাখাটুনি করা হয়েছে, সৃষ্টি তেমনি অকিঞ্চিৎকর।

অন্যত্র অবশ্য আরো ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। চিত্রশিল্পী ও চিত্রসমালোচক টিমোথি হাইম্যানের (Timothy Hyman) লেখায় আরো উন্নত বিবেচনা ও স্বীকৃতি রয়েছে। অ্যান্ড্রু রবিনসন রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম নিয়ে বই প্রকাশ করেন, তাঁর লেখায় আরো গভীর উপলব্ধির পরিচয় পাই।

এত কথা বলার উদ্দেশ্য একটাই – বিদেশি প্রতিক্রিয়া যে কী পরিমাণ দোদুল্যমান ছিল, এবং তা যে মোটেও নির্ভরযোগ্য ছিল না, সেই কথাটা পরিষ্কার করার জন্য। প্রথম দিকে খুব অল্প সময়ের জন্য রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্যের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় প্রীত হয়েছিলেন, এবং ঘনিষ্ঠজনকে একথাও বলেছিলেন যে, যা-কিছু তিনি লিখেছেন তা দেশের মানুষের জন্য, আর তাঁর চিত্রকর্ম বিদেশি দর্শকের জন্য। তবে দেশের ভেতর তাঁর চিত্রকর্মের এক বিশাল প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় ক্যালকাটা আর্ট স্কুলে ১৯৩২ সালে। স্কুলের অধ্যক্ষ মুকুল দে তাঁর চিত্রকর্মের একটি বৃহৎ পরিচিতিমূলক নিবন্ধ পাঠ করে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন, আর চিত্রশিল্পী মহলের মনোযোগী পর্যবেক্ষক ও.সি গাঙ্গুলি সেই সম্পর্কে মন্তব্য করেন। কিন্তু ভারতবর্ষে রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী প্রতিভা, চিমত্মাবিদ ও সাংসৃকতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে যে-খ্যাতি, তার ফলে তাঁর চিত্রশিল্পের প্রতি প্রতিক্রিয়া ম্রিয়মাণ হয়ে গিয়েছিল, ফলে তাঁর চিত্রকর্মের বিশেস্নষণ করার প্রয়াস খানিকটা দুর্বল ও উপরভাসা ছিল।

কেউ-কেউ তাঁর ছবি-আঁকার নেশার কারণ হিসেবে লেখনীর সাময়িক বন্ধ্যত্বকে দায়ী করেছেন। কেউ-বা তাঁর আঁকার নেশায় ভিন্ন দৃশ্যমান জগৎ আবিষ্কারের প্রয়াস লক্ষ করেছেন। তাঁদের মতে, তাঁর গীতিকাব্য সুশৃঙ্খল, রুচিস্মিত সৌন্দর্যের জয়গান গেয়েছে, তাঁর চিত্রকর্ম তাঁর মনের গহিন থেকে উৎসারিত রগরগে অস্থির ভুতুড়ে অবয়বকে রূপায়িত করেছে। এমনকি কেউ-কেউ তাঁর চিত্রকর্মের বিশিষ্টতার কারণ হিসেবে তাঁর দৃষ্টির অস্বাভাবিকতাকে চিহ্নিত করেছেন। ব্রিটিশ জার্নাল অব এস্থেটিক্স (খ- ২৭, সংখ্যা ১, শীত ১৯৮৭) আর.এন রিকফর্ড ও ডা. জে. বোস (রবীন্দ্রানুরাগী ভারতীয় চক্ষুবিশেষজ্ঞ) রচিত একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে। সেখানে লেখকরা এই সিদ্ধামেত্ম আসেন যে, রবীন্দ্রনাথ প্রোটানোপ (protanope) ছিলেন। (তিনি নীল আর বেগুনি রং দেখার সময়ে লাল রঙের সঙ্গে গাঢ় খয়েরি বা কালো রং গুলিয়ে ফেলতেন, এবং কমলা, হলুদ ও সবুজ রংকে একই বর্ণের ভিন্ন-ভিন্ন গাঢ়তায় দেখতেন) বছরছয়েক পরে স্বনামধন্যা বাঙালি কবি ও ঔপন্যাসিক কেতকী কুশারী ডাইসন ডা. অ্যাড্রিয়ান হিল (Adrian Hill) নামে একজন দৃষ্টি বিশেষজ্ঞের (optometrist) সহযোগে একই ধরনের গবেষণা করেন। ডবিস্নউ.বি আর্চার একসময়ে ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামের ভারতীয় সংগ্রহের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। তিনি আধুনিক চিত্রশিল্পের গভীর অনুরাগী ছিলেন। তিনি অমৃতা শেরগিল ও যামিনী রায়ের সঙ্গে-সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকেও আধুনিক ভারতীয় শিল্পকলার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি সম্ভবত ভারতীয় চিত্রশিল্পের অগ্রযাত্রায় তিনটি দিক চিহ্নিত করতে চেয়েছেন – একদিকে শিল্পী দেশের শৈল্পিক ঐতিহ্য অনুসরণে দেশের বাস্তবতাকে নতুনভাবে রূপায়িত করার প্রয়াস পেয়েছেন, আর একদিকে শিল্পী দেশের জনপ্রিয় শিল্পকলা থেকে শিল্পসৃষ্টির মাল-মশলা জোগাড় করেছেন, আবার আরেকদিকে শিল্পী তাঁর অবচেতন অনুভব থেকে শিল্পসৃষ্টির উপাদান সংগ্রহ করেছেন। অমৃতা শেরগিল আর যামিনী রায় প্রথমোক্ত দুই ধরনের প্রতিভূ, আর আর্চারের বিচারে রবীন্দ্রনাথ বিশেষ করে তাঁর প্রথমদিককার শিল্পকর্মে শেষোক্ত ধরনের অনুসারীর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। রবীন্দ্রনাথের পরের দিককার কাজ অবশ্য আর্চারকে হতাশ করেছিল। এমনকি আর্চার একথাও বলেছিলেন যে, বিদেশের প্রশসিত্ম রবীন্দ্রনাথকে বিভ্রান্ত করেছে, তাঁকে অতিসচেতন করে তাঁর আগেকার শিল্পসৃষ্টির উৎসমুখ অনেকটাই রুদ্ধ করে দেয়। রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, তাঁর পরের দিককার কিছু কাজ প্রথম দিকের কাজের মতোই আকৃষ্ট করার ক্ষমতা রাখে, এবং এতে আর্চারের যুক্তি যে দুর্বল, সেটা বোঝা যায়। তাছাড়া সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে শিল্পসৃষ্টির নানা মানসিক প্রক্রিয়ার ভেদাভেদ আর অতটা সুস্পষ্ট থাকে না। সব স্বাভাবিক মানুষের ক্ষেত্রেই এসব বিভিন্ন প্রক্রিয়া একে-অপরের ওপর প্রভাব বিস্তার করে, সেটা না-করলেই অস্বাভাবিকতার সূত্রপাত হয়।

পথিকৃৎ হোন বা না হোন, রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় চিত্রশিল্পীমহলে প্রভাব বিস্তার করেন। চিত্রশিল্পের প্রকৃতি কী – সে-বিষয়ে তাঁর অভিমত এবং বাইরের নানা সংস্কৃতির প্রভাব সম্বন্ধে উদারমনস্ক হওয়ার পক্ষে তাঁর ঘোষণা, বিশেষ করে তাঁর আশ্চর্য চিত্রশিল্পকর্মের জন্য তিনি শিল্পীমহলের তরুণ অংশের ওপর প্রভাব বিস্তার করেন। ১৯৩০ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে তাঁর চিত্রশিল্পের সঙ্গে ভারতীয় জনগণের মাত্র একটা ক্ষুদ্র অংশের পরিচিতি ছিল – সেই পরিচিতি ভারত ও বিদেশে যারা তাঁর আশপাশে ছিল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৪০ সালে বিশ্বভারতী প্রকাশনার ‘চিত্রলিপি’ নামে একটি ছোট্ট প্রকাশনা যখন পাশাপাশি তাঁর চিত্রকর্ম ও ছোট-ছোট কবিতা ছাপতে শুরু করে, তখন থেকেই তাঁর চিত্রকর্ম বৃহত্তর জনসাধারণের গোচরে আসে। ভারতের তরুণ চিত্রশিল্পীদের কাছে সেটা যেন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল। রীতিগত গোঁড়ামিতে রুদ্ধ জগতে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম নতুন করে তাদের সাংস্কৃতিক সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন করতে উদ্বুদ্ধ করল, তাদের আপন ক্ষমতা সম্বন্ধে উপলব্ধি করতে শেখাল। তাঁর চিত্রকর্মে কোনো শিক্ষাতাত্ত্বিক পা–ত্যের দাবি ছিল না, এবং তাঁর কাজ কোনো ওপর থেকে চাপানো শিল্পরীতির অনুশাসনেরও ধার ধারেনি। এই চিত্রাঙ্কন রীতিতে নেই কোনো অঙ্কনশালার ধরাবাঁধা নিয়ম। প্রথাগত সকল শিল্পরীতির নিগড়ের প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্য থেকে মুক্তি পেয়ে তরুণ প্রজন্মের ভারতীয় শিল্পীরা যেন অন্তরের ডাককেই প্রাধান্য দেওয়ার স্বাধীনতা লাভ করলেন। চিত্রশিল্পের ধারণা হয়ে গেল আরো উন্মুক্ত। বাস্তব আর কল্পনা, ধরা আর অধরা – এই নিয়ে নানা বিকল্প প্রকাশরীতি যে সম্ভব, সেটা প্রতীয়মান হলো। যে-সময়ে বিশ্বের নানা স্থানে চিত্রশিল্পীরা দৃশ্যমান বাস্তবের খ–ত অবরোহণের মাধ্যমে চিত্রের রূপায়ণে চিত্রাঙ্কনের গন্তব্যে পৌঁছানোর কথা ভেবেছেন, রবীন্দ্রনাথ চিত্রাঙ্কনকে দেখেছেন বিমূর্ত চিহ্ন থেকে জীবন্ত অবয়বে সমৃদ্ধতর উত্তরণের প্রক্রিয়া হিসেবে। চিত্রশিল্পের প্রকৃতি এবং ব্যক্তিমানসের বিকাশ সম্বন্ধে তাঁর ভাবনা চিত্রের প্রকৃতির উৎস এবং মানুষের চিত্তের বিকাশের পরিধি সম্বন্ধে তাঁর চিমত্মাভাবনার পরিপ্রেক্ষিত প্রশস্ত করেছে। তাঁর চিত্রকর্ম এবং এ-বিষয়ে তাঁর চিমত্মাভাবনার মধ্য দিয়ে এক অর্থে তিনি আমাদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছেন। তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে এক সুবেদী বক্তব্যে নন্দলাল বসু যথার্থই বলেছেন : যখন প্রচলিত প্রথার অতি-আত্মবিশ্বাসী, অতিহিসেবি প্রভাবে চিত্রশিল্প (এবং সাহিত্য) চর্চা কখনো-কখনো তার গতিশীলতা ও প্রাণস্ফূর্তি হারাতে বসে, তখন এ-ধরনের প্রথাজালছিন্নকারী নবপ্রাণসঞ্চার যেমন সময়োপযোগী, তেমনি প্রয়োজনীয়।

[ছায়ানট-আয়োজিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রকর্ম প্রদর্শনী উদ্বোধন উপলক্ষে ২১ জানুয়ারি, ২০১১ তারিখে ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবন, ঢাকায় প্রদত্ত বক্তৃতা।]

ভাষান্তর : আশফাক স্বপন

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

পল্লী উন্নয়নে রবীন্দ্রনাথ - ড. আনোয়ারুল করীম

amarboi
পল্লী উন্নয়নে রবীন্দ্রনাথ
ড. আনোয়ারুল করীম

প্রাক-কথন-৯
পটভূমি এবং প্রস্তাবনা-২১

প্রথম অধ্যায়
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লীউন্নয়ন ভাবনার চালচিত্র-২৬
রবীন্দ্রনাথের পল্লীউন্নয়ন বিষয়ক গ্রন্থাদির পর্যালােচনা-৭০
গ্রামবাংলার ঐতিহাসিক পটভূমি-৭৬
পূর্ববাংলায় ঠাকুর এস্টেটের জমিদারি ও রবীন্দ্রনাথ-৯৩
জমিদার রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর পল্লীউন্নয়ন ভাবনার সূচনা-৯৭
রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংস্কৃতি-১০৫
রবীন্দ্রনাথ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি-১০৯
গ্রাম সংগঠনের প্রয়ােজনীয়তা-১১৬

দ্বিতীয় অধ্যায়
শিলাইদহ পর্ব-১২৪
শিলাইদহের কুঠিবাড়ি-১৩২
রবীন্দ্রনাথের পল্লীউন্নয়ন কর্মসূচি : শিলাইদহ-১৪০

তৃতীয় অধ্যায়
সাজাদপুর পর্ব-১৯৯

চতুর্থ অধ্যায়
পতিসর পর্ব-২১২

পঞ্চম অধ্যায়
শ্রীনিকেতন পর্ব-২৩১
শ্রীনিকেতনের আদর্শ ও কর্মনীতি-২৪২

ষষ্ঠ অধ্যায়
শ্রীনিকেতনের ইতিহাস ও আদর্শ : রবীন্দ্রনাথের প্রতিক্রিয়া-২৫৯

ড. আনোয়ারুল করীম ১৯৩৮ সালের ২৩ অক্টোবর, বাংলা ৮ কার্তিক ১৩৪৫ যশোর জেলার মণিরামপুর উপজেলার লাউড়ি গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস কেশবপুর উপজেলার কড়িয়াখালি গ্রামে। পিতা মরহুম মৌঃ করীম বখশ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় শিক্ষাকাল, শৈশব ও কৈশোর কাটে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায়। যশোর জিলা স্কুল থেকে ১৯৫৫ সালে ম্যাট্রিক, কলেজের শিক্ষা কুষ্টিয়া এবং উচ্চ শিক্ষা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬২ সালে ইংরেজিতে এম.এ. এবং ১৯৭৭ সালে বাংলায় পিএইচ-ডি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনিই সর্বপ্রথম বাউল বিষয়ে পিএইচ-ডি লাভ করেন। তিনি কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দেন ১৯৬২ সালে। ১৯৭১ সালে ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে কুষ্টিয়ার স্বাধীন বাংলা সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন ও সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সালে ভারতে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন মাস অবধি ফোকলোর ও বাউল বিষয়ে বক্তৃতা প্রদান করেন। ১৯৮৫ সালে হার্ভার্ডে ভিজিটিং স্কলার হিসেবে যোগ দেন। সেখানে বিশ্বনন্দিত প্রফেসর এ্যানমেরি শিমেল-এর তত্ত্বাবধানে সুফি-বাউল এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে গবেষণা। এ সময়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোকলোর বিভাগে Shamanism in Bangladesh Ges Divinity School-এর Center for the Study of World Religion-এ রবীন্দ্রনাথও বাংলা বিষয়ে বক্তৃতা করেন। মিনদানাও স্টেটের গভর্নর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট তাঁর বক্তৃতাদানের জন্য তাকে সম্মানজনক সনদপত্র প্রদান করেন। ওই সালেই তিনি জাপানে ওকাইমা ফোকলোর সোসাইটির আমন্ত্রণে সেখানেও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাউল ও ফোকলোর বিষয়ে বক্তৃতা প্রদান করেন। সম্প্রতি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাউল বিষয়ে নতুন তত্ত্ব প্রদানের জন্য প্রশংসিত হয়েছেন। ড. আনোয়ারুল করীম ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ সরকারের সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির একজন সম্মানিত সদস্য ছিলেন। তিনি লালন একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং ফোকলোর রিচার্স ইনস্টিটিউট, কুষ্টিয়ার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি দীর্ঘ আট বছর আমেরিকাস্থ International Council for Traditional music-এর Liaison Officer হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে সম্মানিত হন। তিনি ১৯৯৬ সালে অধ্যক্ষ হিসেবে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে অবসরে যান এবং ১৯৯৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, ট্রেজারার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে কাজ করেছেন। প্রফেসর করীম ইংরেজি ও বাংলা বিষয়ে নানা গবেষণা গ্রন্থের প্রণেতা। তিনি বর্তমানে নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ খুলনা ক্যাম্পাসের ইন-চার্জ এবং ইংরেজি বিভাগের প্রধান।

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

বলেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ - শােভন সােম

বলেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ - শােভন সােম
বলেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ
শােভন সােম

সবীন্দ্রনাথের ভ্রাতপুত্র বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর [১৮৭০-৯৯] ছিলেন তরুণ রবীন্দ্রনাথের একলব্য শিষ্য, সাহিত্যচর্চায় সঙ্গী, সাধনা সম্পাদনায় সহায়ক, জমিদারি পরিভ্রমণে সহযাত্রী, ব্যবসায় অংশীদার এবং কবির জোড়াসাঁকো-শিলাইদহ জীবনে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অনুজ পরিকর। সাহিত্যচর্চায় পিতৃব্যের শিষ্য হলেও বালক বয়স থেকেই তাঁর সাহিত্যরচনায় নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বিভাসিত হয়েছিল। তাঁর
কর্মতৎপরতাও ছিল বিচিত্রমাত্রিক। পিতামহ দেবেন্দ্রনাথের অন্যতম আরব্ধ কাজ সম্পাদন করার উদ্দেশ্যে বলেন্দ্রনাথই শান্তিনিকেতন সাধনাশ্রমের ট্রাস্টডিড অনুসারে ব্রহ্ম-বিদ্যালয় স্থাপনে তৎপর হয়েছিলেন। আঠারােশাে নিরানব্বইতে শান্তিনিকেতন প্রাকুটিরে ব্রহ্ম-বিদ্যালয় উদ্বোধনের চার মাস আগেই বলেন্দ্রনাথ মাত্র ঊনত্রিশ বছর বয়সে অকাল প্রয়াত হন। তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতেই উনিশশাে এক সালে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম স্থাপন করেন। শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের সেই সলতে পাকানাের সম্পূর্ণ ইতিহাস এই গ্রন্থে উদঘাটিত হল। সমূহ উপাদান, চিঠিপত্র, স্মৃতিসাক্ষ্য এবং অগােচর তথ্য থেকে এই প্রথম বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে তাঁর মৃত্যুর শতবর্ষে একটি পূর্ণাঙ্গ বই প্রকাশিত হল। এই বিপুল পরিশ্রমসাধ্য তথ্যমূলক বইতে আমরা রবীন্দ্রজীবনের এক অনালােকিত দিক উদ্ভাসিত হতে দেখি। একই সঙ্গে বলেন্দ্রনাথকে আমরা পাই পূর্ণ অবয়বে। রবীন্দ্রচর্চায় এই বই অপরিহার্য।

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার এবং পুনরাবিষ্কার - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার এবং পুনরাবিষ্কার
রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার এবং পুনরাবিষ্কার
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ রয়েছে আমার যে সমস্ত গদ্য, কবিতা ও ছােটগল্পে, তার একটা সামগ্রিক সংকলন এই গ্রন্থটি। সারাজীবন ধরে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ভেবেছি। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বারবার বদলে গিয়েছে। যৌবনে রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করতেই চেয়েছিলাম। তখন মনে হয়েছিল, এই হিমালয় পর্বতকে অস্বীকার করতে না পারলে মৌলিক কোনাে পথের দিশা পাওয়া বােধহয় সম্ভব নয়। পরে ভেবেছি, রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কোনাে গতি নেই। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ নিজেই একটা ঐতিহ্য। তাকে পুনরাবিষ্কার না করে কোনাে। উত্তরাধিকারের কথা ভাবাই যায় না। উপন্যাসগুলােতেও তাকে নিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে গেছি। আমার জীবনে দীর্ঘকালের রবীন্দ্র-অভিজ্ঞতার স্মারকগ্রন্থ হয়ে রইল এই বই।

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

শেষের কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

শেষের কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শেষের কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


অমিত রায় ব্যারিস্টার। ইংরেজি ছাঁদে রায় পদবী "রয়" ও "রে" রূপান্তর যখন ধারণ করলে তখন তার শ্রী গেল ঘুচে কিন্তু সংখ্যা হল বৃদ্ধি। এই কারণে, নামের অসামান্যতা কামনা করে অমিত এমন একটি বানান বানালে যাতে ইংরেজ বন্ধু ও বন্ধুনীদের মুখে তার উচ্চারণ দাঁড়িয়ে গেল-- অমিট রায়ে।

অমিতর বাপ ছিলেন দিগ্‌বিজয়ী ব্যারিস্টার। যে পরিমাণ টাকা তিনি জমিয়ে গেছেন সেটা অধস্তন তিন পুরুষকে অধঃপাতে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু পৈতৃক সম্পত্তির সাংঘাতিক সংঘাতেও অমিত বিনা বিপত্তিতে এ যাত্রা টিঁকে গেল।

কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বি. এ.'র কোঠায় পা দেবার পূর্বেই অমিত অক্স্‌ফোর্ডে ভর্তি হয়; সেখানে পরীক্ষা দিতে দিতে এবং না দিতে দিতে ওর সাত বছর গেল কেটে। বুদ্ধি বেশি থাকাতে পড়াশুনো বেশি করে নি, অথচ বিদ্যেতে কমতি আছে বলে ঠাহর হয় না। ওর বাপ ওর কাছ থেকে অসাধারণ কিছু প্রত্যাশা করেন নি। তাঁর ইচ্ছে ছিল, তাঁর একমাত্র ছেলের মনে অক্স্‌ফোর্ডের রঙ এমন পাকা করে ধরে যাতে দেশে এসেও ধোপ সয়।

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

ছোটগল্প কি, কেন, ইত্যাদি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

amarboi

ছোটগল্প
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সাহিত্যে বড়ো গল্প ব'লে যে-সব প্রগল্‌ভ বাণীবাহন দেখা যায় তারা প্রাক্‌ভূতাত্ত্বিক যুগের প্রাণীদের মতো-- তাদের প্রাণের পরিমাণ যত দেহের পরিমাণ তার চার গুণ, তাদের লেজটা কলেবরের অত্যুক্তি।

অতিপরিমাণ ঘাসপাতা খেয়ে যাদের পেট মোটা তারা ভারবাহী জীব, স্তূপাকার মালের বস্তা টানা তাদের অদৃষ্টে। বড়ো গল্প সেই জাতের, মাল-বোঝাইওয়ালা। যে-সব প্রাণীর খোরাক স্বল্প এবং সারালো, জাওর কেটে কেটে তারা প্রলম্বিত করে না ভোজন-ব্যাপার অধ্যায়ের পর অধ্যায়ে। ছোটো গল্প সেই জাতের; বোঝা বইবার জন্যে সে নয়; একেবারে সে মার লাগায় মর্মে লঘু লম্ফে।

কিন্ত গল্পের ফরমাশ আসছে বড়ো বহরের। অনেকখানি মালকে মানুষ অনেকখানি দাম দিয়ে ঠকতেও রাজি হয়। ওটা তার আদিম দুর্নিবার প্রবৃত্তির দুর্বলতা। এটাই দেখতে পাওয়া যায় আমাদের দেশের বিয়ের ব্যাপারে। ইতরের মনভোলানো অতিপ্রাচুর্য এমনতরো রসাত্মক ক্রিয়াকর্মেও ভদ্রসমাজের বিনা প্রতিবাদে আজও চলে আসছে। আতিশয্যের ঢাকবাজানো পৌত্তলিকতা মানুষের প্রপৈত্রিক সংস্কার।

মানুষের জীবনটা বিপুল একটা বনস্পতির মতো। তার আয়তন তার আকৃতি সুঠাম নয়। দিনে দিনে চলছে তার মধ্যে এলোমেলো ডালপালার পুনরাবৃত্তি । এই স্তূপাকার একঘেয়েমির মধ্যে হঠাৎ একটি ফল ফ'লে ওঠে, সে নিটোল, সে সুডোল,বাইরে তার রঙ রাঙা কিংবা কালো, ভিতরে তার রস তীব্র কিংবা মধুর। সে সংক্ষিপ্ত, সে অনিবার্য, সে দৈবলব্ধ, সে ছোটো গল্প।

একটা দৃষ্টান্ত দেখানো যাক। রাজা এডওআর্ড ভ্রমণে বেরলেন দেশ-দেশান্তরে। মুগ্ধ স্তাবকদের ভিড় চলল সঙ্গে সঙ্গে, খবরের কাগজের প্যারাগ্রাফের ঠোঙাগুলো ঠেসে ভরে ভরে উঠল। এমন সময় যত-সব রাজদূত, রাষ্ট্রনায়ক, বণিকসম্রাট, লেখনীবজ্রপাণি সংবাদপাত্রিকের ঘেঁষাঘেঁষি ভিড়ের মধ্যে একটা কোন্‌ ছোটো রন্ধ্র দিয়ে রাজার চোখে পড়ল এক অকুলীন আমেরিকানী। শব্দভেদী সমারোহের স্বরবর্ষণ মুহূর্তে হয়ে গেল অবাস্তব, কালো পর্দা পড়ে গেল ইতিহাসের অসংখ্য দীপদীপ্ত রঙ্গমঞ্চের উপর। সমস্ত-কিছু বাদ দিয়ে জ্বল্‌জ্বল্‌ করে উঠল ছোটো গল্পটি-- দুর্লভ, দুর্মূল্য। গোলমালের ভিতরে অদৃশ্য আর্টিস্ট ছিলেন আড়ালে, তাকিয়ে ছিলেন ব্যক্তিগত জীবনসরোবরের গভীর অগোচরে। দেখছিলেন অতলসঞ্চারী অজানা মাছ কখন পড়ে তাঁরবঁড়শিতে গাঁথা, কখন চমক দিয়ে ওঠে তাঁর ছোটো গল্পটি নানাবর্ণচ্ছটাখচিত লেজ আছড়িয়ে।

পৌরাণিক যুগের একটি ছোটো গল্প মনে পড়ছে-- ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির আখ্যান। দুঃসাধ্য তাঁর তপস্যা। নিষ্কলঙ্ক ব্রহ্মচর্যের দুরূহ সাধনায়। অধিরোহণ করছিলেন বশিষ্ঠ-বিশ্বামিত্র-যাজ্ঞবল্ক্যের দুর্গম উচ্চতায়। হঠাৎ দেখা দিল সামান্য রমণী, সে শুচি নয়, সাধ্বী নয়, সে বহন করে নি তত্ত্ব বা মন্ত্র বা মুক্তি; এমন-কি, ইন্দ্রলোক থেকে পাঠানো অপ্সরীও সে নয়। সমস্ত যাগযজ্ঞ ধ্যানধারণা সমস্ত অতীত ভবিষ্যৎ আঁট বেঁধে গেল এক ছোটো গল্পে।

এই হল ভূমিকা। আমি হচ্ছি সেই মানুষ যার অদৃষ্ট ভীল-রমণীর মতো ঝুড়িতে প্রতিদিন সংগ্রহ করত কাঁচা পাকা বদরী ফল, একদিন হঠাৎ কুড়িয়ে পেয়েছিল গজমুক্তা, একটি ছোটো গল্প।

সাহস করে লিখে ফেলব। কাজটা কঠিন। এতে হয়তো স্বাদ কিছু বা পাওয়া যাবে কিন্তু পেটভরা ওজনের বস্তু মিলবে না।

প্রথম পর্ব

জীবনের প্রবহমান ঘোলা রঙের হ-য-ব-র-ল'র মধ্যে হঠাৎ যেখানে গল্পটা আপন রূপ ধ'রে সদ্য দেখা দেয়, তার অনেক পূর্ব থেকেই নায়ক-নায়িকারা আপন পরিচয়ের সূত্র গেঁথে আসে। গল্পের গোড়ায় প্রাক্‌গাল্পিক ইতিহাসের ধারা অনুসরণ করতেই হয়। তাতে কিছু সময় নেবে। আমি যে কে, সে কথাটা পরিষ্কার করে নিই।

কিন্তু নামধাম ভাঁড়াতে হবে। নইলে চেনাশোনার মহলে গল্পের যাথাযথ্যের জবাবদিহি সামলাতে পারব না। এ কথা সবাই বোঝে না যে ঠিকঠাক সত্য বলবার এক কায়দা, আর চেয়েও বেশি সত্য বলবার ভঙ্গি আলাদা।

কী নাম নেব তাই ভাবছি। রোম্যান্টিক নামকরণের দ্বারা গোড়া থেকে গল্পটাকে বসন্তরাগে পঞ্চমসুরে বাঁধতে চাই নে। নবীনমাধব নামটা বোধ হয় চলনসই। ওর শাম্‌লা রঙটা মেজে ফেলে গিল্‌টি লাগালে ওটা হতে পারত নবারুণ সেনগুপ্ত, কিন্তু খাঁটি শোনাত না।

আমি ছিলুম বাংলাদেশের বিপ্লবীদলের একজন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মহাকর্ষশক্তি আমাকে প্রায় টেনে নিয়ে গিয়েছিল আণ্ডামানের তীর-বরাবর। নানা বাঁকা পথে সি|আই|ডি|-র ফাঁস এড়িয়ে প্রথমে আফগানিস্থান, তার পরে জাপান, তার পরে আমেরিকায় গিয়ে পৌঁচেছিলুম জাহাজি গোরার নানা কাজ নিয়ে।

পূর্ববঙ্গীয় দুর্জয় জেদ ছিল মজ্জায়। একদিনও ভুলি নি যে ভারতবর্ষের হাতকড়ায় উখো ঘষতে হবে দিনরাত যতদিন বেঁসে থাকি। কিন্তু এই সমুদ্রপারের কর্মপেশল হাড়মোটা প্রাণঘন দেশে থাকতে থাকতে একটা কথা নিশ্চিত বুঝেছিলুম যে, আমরা যে প্রণালীতে বিপ্লবের পালা শুরু করেছিলুম সে যেন আতশবাজিতে পটকা ছেঁড়ার মতো। তাতে নিজেদের পোড়াকপাল আরো পুড়িয়েছে অনেকবার, কিন্তু ফুটো করতে পারে নি ব্রিটিশ রাজপতাকা। আগুনের উপর পতঙ্গের অন্ধ আসক্তি। যখন সদর্পে ঝাঁপ দিয়ে পড়ছিলুম, তখন বুঝতে পারি নি সেটাতে ইতিহাসের যজ্ঞানল জ্বালানো হচ্ছে না, জ্বালাচ্ছি নিজেদের খুব ছোটো ছোটো চিতানল।

তার পরে স্বচক্ষে দেখলুম য়ুরোপীয় মহাসমর। কী রকম টাকা ওড়াতে হয় ধুলোর মতো, আর প্রাণ উড়িয়ে দেয় ধোঁয়ার মতো দাবানলের। মরবার জন্যে তৈরি হতে হয় সমস্ত দেশ একজোট হয়ে, মারবার জন্যে তৈরি হতে হয় দীর্ঘকাল বিজ্ঞানের দুরূহ দীক্ষা নিয়ে। এই যুগান্তরসাধিনী সর্বনাশকে আমাদের খোড়ো ঘরের চণ্ডীমণ্ডপে প্রতিষ্ঠিত করব কোন্‌ দুরাশায়! যথোচিত সমারোহে বড়োরকমের আত্মহত্যা করবার আয়োজনও যে ঘরে নেই। ঠিক করলুম, ন্যাশনাল দুর্গের গোড়া পাকা করতে হবে, যত সময়ই লাগুক। বাঁচতে যদি চাই আদিম সৃষ্টির হাত দুখানায় গোটাদশেক নখ নিয়ে আঁচড় মেরে লড়াই করা চলবে না। এ যুগে যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্রের দিতে হবে পাল্লা। হাতাহাতি করার তালঠোকা পালোয়ানি সহজ, বিশ্বকর্মার চেলাগিরি সহজ নয়। পথ দীর্ঘ, সাধনা দুরূহ।

দীক্ষা নিলুম যন্ত্রবিদ্যায়। আমেরিকায় ডেট্রয়েটে ফোর্ডের মোটর-কারখানায় কোনোমতে ভর্তি হলুম। হাত পাকাচ্ছিলুম কিন্তু শিক্ষা এগচ্ছিল ব'লে মনে হয় নি। একদিন কী দুর্বুদ্ধি ঘটল, মনে হল ফোর্ডকে যদি একটুখানি আভাস দিতে যাই যে নিজের স্বার্থসিদ্ধি আমার উদ্দেশ্য নয়, আমি চাই দেশকে বাঁচাতে তা হলে ধনকুবের বুঝি বা খুশি হবে, এমন-কি, দেবে আমার রাস্তা প্রশস্ত ক'রে। অতি গম্ভীরমুখে ফোর্ড বললে, 'আমার নাম হেনরি ফোর্ড, পুরোনো পাকা ইংরেজি নাম। কিন্তু আমি জানি আমাদের ইংলণ্ডের মামাতো ভাইরা অকেজো, ইনএফিসিয়েন্ট। তাদের আমি কেজো ক'রে তুলব এই আমার সংকল্প।' অর্থাৎ অকেজো টাকাওয়ালাকে কেজো করবে কেজো টাকাওয়ালা স্বগোত্রের লাইন বাঁচিয়ে, আমরা থাকব চিরকাল কেজোদের হাতে কাদার পিণ্ড। তারা পুতুল বানাবে। এই দুঃখেই গিয়েছিলুম একদিন সোভিয়েটের দলে ভিড়তে। তারা আর যাই করুক কোনো নিরুপায় মানবজাতকে নিয়ে পুতুলনাচের অর্থকরী ব্যাবসা করে না।

কিছুদিন চাকা চালিয়ে শেষকালে বুঝলুম যন্ত্রবিদ্যাশিক্ষার আরো গোড়ায় যেতে হবে। শুরুতে দরকার যন্ত্রনির্মাণের মালমসলা জোগাড় করার বিদ্যে। কৃতকর্মাদের জন্যেই ধরণী দুর্গম পাতালপুরীতে জমা করে রেখেছেন কঠিন খনিজ পিণ্ড। সেইগুলো হস্তগত করে তারাই দিগ্‌বিজয় করেছে যারা বাহাদুর জাত। আর যাদের চিরকালই অদ্যভক্ষ্য ধনুর্গুণ তাদের জন্যেই বাঁধা বরাদ্দ উপরিস্তরের ফলাফসল শাকসব্‌জি; হাড় বেরিয়ে গেল পাঁজরের, পেটে পিঠে গেল এক হয়ে।

লেগে গেলুম খনিজবিদ্যায়। এ কথা ভুলি নি যে ফোর্ড বলেছেন ইংরেজ জাত অকেজো। তার প্রমাণ আছে ভারতবর্ষে। একদিন ওরা হাত লাগিয়েছিল নীলের চাষে, চায়ের চাষে আর-একদিন। সিভিলিয়ানদল দফতরখানায় 'ল অ্যাণ্ড অর্ডর' -এর জাঁতা চালিয়ে দেশের অস্থিমজ্জা ছাতু করে বানিয়ে তুলেছে বস্তাবন্দী ভালোমানুষি, অতি মোলায়েম। সামান্য কিছু কয়লার আকর ছাড়া ভারতের অন্তর্ভাণ্ডারের সম্পদ উদ্‌ঘাটিত করতে উপেক্ষা করেছে কিংবা অক্ষমতা দেখিয়েছে। নিংড়েছে বসে বসে পাটের চাষীর রক্ত। জামশেদজি টাটাকে সেলাম করেছি সমুদ্রের ওপার থেকে। ঠিক করেছি আমার কাজ পটকা ছোঁড়া নয়। সিঁধ কাটতে যাব পাতালপুরীর পাষাণ-প্রাচীরে। মায়ের আঁচলধরা খোকাদের দলে মিশে 'মা মা' ধ্বনিতে মন্তর আওড়াব না, আর দেশের যত অভুক্ত অক্ষম রুগ্‌ণ অশিক্ষিত, কাল্পনিক ভয়ে দিনরাত কম্পমান, দরিদ্রকে সহজ ভাষায় দরিদ্র বলেই জানব, দরিদ্রনারায়ণ ব'লে একটা বুলি বানিয়ে তাদের বিদ্রূপ করব না। প্রথম বয়সে একবার বচনের পুতুলগড়া খেলা অনেক খেলেছি। কবি-কারিগরদের কুমোরটুলিতে স্বদেশের যে সস্তা রাঙতা-লাগানো প্রতিমা গড়া হয় তার সামনে গদগদ ভাষায় অনেক অশ্রুজল ফেলেছি। লোকে তার খুব একটা চওড়া নাম দিয়েছিল দেশাত্মবোধ। কিন্তু আর নয়। আক্কেলদাঁত উঠেছে। এই জাগ্রত বুদ্ধির দেশে এসে বাস্তবকে বাস্তব ব'লে জেনেই শুকনো চোখে কোমর বেঁধে কাজ করতে শিখেছি। এবার দেশে ফিরে গিয়ে বেরিয়ে পড়বে এই বিজ্ঞানী বাঙাল কোদাল নিয়ে কুড়ুল নিয়ে হাতুড়ি নিয়ে দেশের গুপ্তধনের তল্লাসে। মেয়েলিগলার মিহিসুরের মহাকবি-বিশ্বকবিদের অশ্রুরুদ্ধকন্ঠ চেলারা এই অনুষ্ঠানকে তাদের দেশমাতৃকার পূজা বলে চিনতেই পারবে না।

ফোর্ডের কারখানা ছেড়ে তার পর ন' বছর কাটিয়েছি খনিবিদ্যা খনিজবিদ্যা শিখতে। য়ুরোপের নানা কর্মশালায় ফিরেছি, হাতে কলমে কাজ করেছি, দুই-একটা যন্ত্রকৌশল নিজেও বানিয়েছি, উৎসাহ পেয়েছি অধ্যাপকের কাছ থেকে, নিজের উপরে বিশ্বাস হয়েছে, ধিক্‌কার দিয়েছি ভূতপূর্ব মন্ত্রমুগ্ধ অকৃতার্থ নিজেকে।

পাশ্চাত্য মহাদেশে নারীসঙ্গলাভে বাধা দেবার কাঁটার বেড়া নেই। সেখানে দুর্যোগের আশঙ্কা ছিল। আমি যে সুপুরুষ, বঙ্গনারীর মুখের ভাষায় তার কোনো ভাষ্য পাই নি। তাই এ সংবাদটা আমার চেতনার বাইরেই ছিল । বিলেতে গিয়ে প্রথম আবিষ্কার করেছি যে সাধারণের চেয়ে আমার বুদ্ধি বেশি, তেমনি ধরা পড়েছে আমার চেহারা ভালো। আমার দেশের অর্ধাশনশীর্ণ পাঠকের মুখে জল আসবার মতো রসগর্ভ কাহিনীর সূচনা সেখানে মাঝে মাঝে হয়েছিল। সেয়ানারা অবিশ্বাসে চোখ টেপাটিপি করতে পারেন তবু জোর করেই বলব সে কাহিনী মিলনান্ত বা বিয়োগান্তের যবনিকাপতনে পৌঁছয় নি কেবল আমার জেদবশত। আমার স্বভাবটা কড়া, পাথুরে জমিতে জীবনের সংকল্প ছিল যক্ষের ধনের মতো পোঁতা, সেখানে চোরের শাবল ঠিকরে প'ড়ে ঠন্‌ করে ওঠে। তা ছাড়া আমি জাত-পাড়াগেঁয়ে, সাবেককেলে ভদ্রঘরে আমার জন্ম, মেয়েদের সম্বন্ধে আমার সংকোচ ঘুচতে চায় না।

আমার জর্মন ডিগ্রি উঁচুদরের ছিল। সেটা এখানে সরকারী কাজে বাতিল। তাই সুযোগ ক'রে ছোটোনাগপুরে চন্দ্রবংশীয় এক রাজার দরবারে কাজ নিয়েছি। সৌভাগ্যক্রমে তাঁর ছেলে দেবিকাপ্রসাদ কিছুদিন কেম্ব্রিজে পড়াশুনো করেছিলেন। দৈবাৎ জুরিকে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা। তাঁকে বুঝিয়েছিলুম আমার প্ল্যান। শুনে উৎসাহিত হয়ে তাঁদের স্টেটে আমাকে লাগিয়ে দিলেন জিয়লজিকাল সর্ভের কাজে খনি-আবিষ্কারের প্রত্যাশায়। এত বড়ো কাজের ভার আনাড়ি সিভিলিয়নকে না দেওয়াতে সেক্রেটেরিয়টের উপরিস্তরে বায়ুমণ্ডল বিক্ষুব্ধ হয়েছিল। দেবিকাপ্রসাদ শক্ত ধাতের লোক, বুড়ো রাজার মন টল্‌মল্‌ করা সত্ত্বেও টিঁকে গেলুম।

এখানে আসবার আগে মা বললেন, 'ভালো কাজ পেয়েছ, এবার বাব বিয়ে করো।' আমি বললুম, অর্থাৎ ভালো কাজ মাটি করো।তার পরে বোবা পাথরকে প্রশ্ন করে করে বেড়াচ্ছিলুম পাহাড়ে জঙ্গলে। সেসময়টাতে পলাশফুলের রাঙা রঙে বনে বনে নেশা লেগে গিয়েছে। শালগাছে অজস্র মঞ্জরী, মৌমাছিদের অনবরত গুঞ্জন। ব্যবসাদারেরা মৌ সংগ্রহে লেগেছে, কুলের পাতা থেকে জমা করছে তসর-রেশমের গুটি, সাঁওতালরা কুড়চ্ছে পাকা মহুয়া ফল। ঝির্‌ঝির শব্দে হালকা নাচের ওড়না ঘুরিয়ে চলেছিল একটি ছিপ্‌ছিপে নদী। শুনেছি এখানকার কোনো আধিবাসিনী তার নাম দিয়েছেন তনিকা। তাঁর কথা পরে হবে।

দিনে দিনে বুঝতে পারছি এ জায়গাটা ঝিমিয়ে-পড়া ঝাপসা চেতনার দেশ, এখানে একলা মনের সন্ধান পেলে প্রকৃতি মায়াবিনী তাকে নিয়ে রঙরেজিনীর কাজ করে, যেমন করে সে অস্তসূর্যের উত্তরীয়ে।

মনটাতে একটু আবেশের ঘোর লাগছিল। ক্ষণে ক্ষণে ঢিলে হয়ে আসছিল কাজের চাল। নিজের উপর বিরক্ত হচ্ছিলুম, ভিতর থেকে কষে জোর লাগাচ্ছিলুম দাঁড়ে। ভয় হচ্ছিল ট্রপিকাল মাকড়সার জালে জড়িয়ে পড়ছি বুঝি। শয়তান ট্রপিক্‌স্‌ জন্মকাল থেকে এদেশে হাতপাখার হাওয়ায় ডাইনে বাঁয়ে হারের মন্ত্র চালাচ্ছে আমাদের ললাটে, মনে মনে পণ করছি এর স্বেদসিক্ত জাদু এড়াতেই হবে।

বেলা পড়ে এল। এক জায়গায় মাঝখানে চর ফেলে নুড়ি পাথর ঠেলে ঠেলে দুই শাখায় ভাগ হয়ে চলে গিয়েছে নদী। সেই বালুর দ্বীপে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে সারি সারি বকের দল। দিনাবসানে তাদের এই ছুটির ছবি দেখে রোজ আমি চলে যাই আমার কাজের বাঁক ফেরাতে। ঝুলিতে মাটি পাথর অভ্রের টুকরো নিয়ে সেদিন ফিরছিলুম আমার বাংলাঘরে, ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার কাজে। অপরাহ্ন আর সন্ধ্যার মাঝখানে দিনের যে একটা ফালতো পোড়া সময় থাকে সেইখানটাতে একলা মানুষের মন এলিয়ে পড়ে। তাই আমি নিজেকে চেতিয়ে রাখবার জন্যে এই সময়টা লাগিয়েছি পরখ করার কাজে। ডাইনামো দিয়ে বিজলি বাতি জ্বালাই, কেমিক্যাল নিয়ে মাইক্রসকোপ নিয়ে নিক্তি নিয়ে বসি। এক-একদিন রাত দুপুর পেরিয়ে যায়।

আজ একটা পুরোনো পরিত্যক্ত তামার খনির খবর পেয়ে দ্রুত উৎসাহে তারই সন্ধানে চলেছিলুম। কাকগুলো মাথার উপর দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে চলেছে ফিকে আলোর আকাশে কা কা শব্দে। অদূরে একটা ঢিবির উপরে তাদের পঞ্চায়েত বসবার পড়েছে হাঁকডাক।

হঠাৎ বাধা পড়ল আমার কাজের রাস্তায়। পাঁচটা গাছের চক্রমণ্ডলী ছিল বনের পথের ধারে একটা উঁচু ডাঙার 'পরে। সেই বেষ্টনীর মধ্যে কেউ বসে থাকলে কেবলএকটিমাত্র অবকাশে তাকে দেখা যায়, হঠাৎ চোখ এড়িয়ে যাবারই কথা। সেদিন মেঘের মধ্যে দিয়ে একটি আশ্চর্য দীপ্তি বিচ্ছুরিত হয়েছিল। সেই গাছগুলোর ফাঁকটার ভিতর দিয়ে রাঙা আলোর ছোরা চিরে ফেলেছিল ভিতরকার ছায়াটাকে।

ঠিক সেই আলোর পথে বসে আছে মেয়েটি গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে, পা দুটি বুকের কাছে গুটিয়ে নিয়ে। পাশে ঘাসের উপর পড়ে আছে একখানা খাতা, বোধ হয় ডায়ারি।

বুকের মধ্যে ধক্‌ করে উঠল, থমকিয়ে গেলুম। দেখলুম যেন বিকেলের ম্লান রৌদ্রে গড়া একটি সোনার প্রতিমা। চেয়ে রইলুম গাছের গুঁড়ির আড়ালে দাঁড়িয়ে। অপূর্ব ছবি এক মুহূর্তে চিহ্নিত হয়ে গেল মনের চিরস্মরণীয়াগারে।

আমার বিস্তৃত অভিজ্ঞতার পথে অনেক অপ্রত্যাশিত মনোহরের দরজায় ঠেকেছে মন, পাশ কাটিয়ে চলে গেছি, আজ মনে হল জীবনের একটা কোন্‌ চরমের সংস্পর্শে এসে পৌঁছলুম। এমন করে ভাবা, এমন করে বলা আমার একেবারে অভ্যস্ত নয়। যে আঘাতে মানুষের নিজের অজানা একটা অপূর্ব স্বরূপ ছিটকিনি খুলে অবারিত হয়, সেই আঘাত আমাকে লাগল কী করে।

অত্যন্ত ইচ্ছা করছিল ওর কাছে গিয়ে কথার মতো কথা একটা-কিছু বলি। কিন্তু জানি নে কী কথা যে পরিচয়ের সর্বপ্রথম কথা, যে কথায় জানিয়ে দেবে খৃস্টীয় পুরাণের প্রথম সৃষ্টির বাণী-- আলো হোক, ব্যক্ত হোক যা অব্যক্ত।

আমি মনে মনে ওর নাম দিলুম-- অচিরা। তার মানে কী। তার মানে এক মুহূর্তেই যার প্রকাশ, বিদ্যুতের মতো।

একসময়ে মনে হল অচিরা যেন জানতে পেরেছে কে একজন দাঁড়িয়ে আছে আড়ালে। স্তব্ধ উপস্থিতির একটা নিঃশব্দ শব্দ আছে বুঝি।

একটূ তফাতে গিয়ে কোমরবন্ধ থেকে ভুজালি নিয়ে একান্ত মনোযোগের ভান করে মাটি খোঁচাতে লাগলুম। ঝুলিতে যা হয় কিছু দিলুম পুরে, গোটা কয়েক কাঁকরের ঢেলা। চলে গেলুম মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ে কী যেন সন্ধান করতে করতে। কিন্তু নিশ্চয় মনে জানি যাঁকে ভোলাতে চেয়েছিলুম তিনি ভোলেন নি। মুগ্ধ পুরুষচিত্তের বিহ্বলতার আরো অনেক দৃষ্টান্ত আরো অনেকবার তাঁর গোচর হয়েছে সন্দেহ নেই। আশা করলুম আমার বেলায় এটা তিনি উপভোগ করলেন, সকৌতুকে কিংবা সগর্বে, কিংবা হয়তো বা একটু মুগ্ধ মনে। কাছে যাবার বেড়া যদি আর-একটু ফাঁক করতুম তা হলে কী জানি কী হত। রাগ করতেন, না রাগের ভান করতেন?

অত্যন্ত চঞ্চল মনে চলেছি আমার বাংলাঘরের দিকে এমন সময় চোখে পড়ল দুইটুকরোয় ছিন্নকরা একখানা চিঠির খাম। তাতে নাম লেখা, ভবতোষ মজুমদার আই| সি| এস| ছাপরা। তার বিশেষত্ব এই যে, এতে টিকিট আছে, কিন্তু সে টিকিটে ডাকঘরের ছাপ নেই। বুঝতে পারলুম ছেঁড়া চিঠির খামের মধ্যে কেটা ট্র৻াজেডির ক্ষতচিহ্ন আছে। পৃথিবীর ছেঁড়া স্তর থেকে তার বিপ্লবের ইতিহাস বের করা আমার কাজ। সেইরকম কাজে লাগলুম ছেঁড়া খামটা নিয়ে।

ইতিমধ্যে ভাবনা ধরিয়ে দিয়েছে আমার নিজের অন্তঃকরণটা। নিজের অপ্রমত্ত কঠিন মনটাকে চিনে নিয়েছি ব'লে স্পষ্ট ধারণা ছিল। আজ এই প্রথম দেখলুম তার পাশের পাড়াতেই লুকিয়ে বসে আছে বুদ্ধিশাসনের বহির্ভূত একটা অবোধ।

নির্জন অরণ্যের সুগভীর কেন্দ্রস্থলে একটা সুনিবিড় সম্মোহন আছে যেখানে চলছে তার বুড়ো বুড়ো গাছপালার কানে কানে চক্রান্ত, যেখানে ভিতরে ভিতরে উচ্ছ্বসিত হচ্ছে সৃষ্টির আদিম প্রাণের মন্ত্রগুঞ্জরণ। দিনে দুপুরে ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে তার সুর উদাত্ত পর্দায়, রাতে দুপুরে তার মন্ত্রগম্ভীর ধ্বনি স্পন্দিত হতে থাকে জীবচেতনায়, বুদ্ধিকে দেয় আবিষ্ট করে। জিয়লজি-চর্চার ভিতরে ভিতরেই মনের আন্তর্ভৌম প্রদেশে ব্যাপ্ত হচ্ছিল এই আরণ্যক মায়ার কাজ। হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে উঠে সে এক মুহূর্তে আমার দেহমনকে আবিষ্ট করে দিল যখনই দেখলুম অচিরাকে কুসুমিত ছায়ালোকের পরিবেষ্টনে।

বাঙালি মেয়েকে ইতিপূর্বে দেখেছি সন্দেহ নেই। কিন্তু তাকে এমন বিশুদ্ধ স্বপ্রকাশ স্বাতন্ত্র৻ে দেখি নি। লোকালয়ে যদি এই মেয়েটিকে দেখতুম তা হলে যাকে দেখা যেত নানা লোকের সঙ্গে নানা সম্বন্ধে জড়িত বিমিশ্রিত এ মেয়ে সে নয়, এ দেখা দিল পরিবিস্তৃত নির্জন সবুজ নিবিড়তার পরিপ্রেক্ষিতে একান্ত স্বকীয়তায়। মনে হল না বেণী দুলিয়ে এ কোনো কালে ডায়োসিশনে পর্সেন্টেজ রাখতে গেছে, শাড়ির উপরে গাউনে ঝুলিয়ে ডিগ্রি নিতে গেছে কনভোকেশনে, বালিগঞ্জে টেনিস-পার্টিতে চা ঢালছে উচ্চ কলহাস্যে। অল্পবয়সে শুনেছি পুরোনো বাংলা গান-- 'মনে রইল সই মনের বেদনা'--তারই সরল সুরের সঙ্গে মিশিয়ে চিরকালের বাঙালি মেয়ের একটা করুণ চেহারা আমি দেখতে পেতুম, অচিরাকে দেখে মনে হল সেইরকম বারোয়াঁ গানে তৈরি বাণীমূর্তি, যে গান রেডিয়োতে বাজে না, গ্রামোফোনে পাড়া মুখর করে না। এদিকে আমার আপনার মধ্যে দেখলুম মনের নীচের তলাকার তপ্তবিগলিত একটা প্রদীপ্ত রহস্য হঠাৎ উপরের আলোতে উদ্‌গীর্ণ উঠেছে।

বুঝতে পারছি আমি যখন রোজ বিকেলে এই পথ দিয়ে কাজে ফিরেছি অচিরা আমাকে দেখেছে, অন্যমনস্ক আমি ওকে দেখি নি। নিজের চেহারা সম্বন্ধে যে বিশ্বাসএনেছি বিলেত থেকে, এই ঘটনা সম্পর্কে মনের মধ্যে তার প্রতিক্রিয়া যে হয় নি তা বলতে পারি নে। কিন্তু সন্দেহও ছিল। বিলেতফেরত কোনো কোনো বন্ধুর কাছে শুনেছি, বিলিতি মেয়ের রুচির সঙ্গে বাঙালি মেয়ের রুচি মেলে না। এরা পুরুষের রূপে খোঁজে মেয়েলি মোলায়েম ছাঁদ। বাঙালি কার্তিক আর যাই হোক কোনো কালে দেবসেনাপতি ছিল না। এটা বলতে হবে আমাকেও ময়ূরে চড়ালে মানাবে না। এতদিন এ-সব আলোচনা আমার মনের ধার দিয়েও যায় নি। কিন্তু কয়েকদিন ধরে আমাকে ভাবিয়েছে। রোদেপোড়া আমার রঙ, লম্বা আমার দেহ, শক্ত আমার বাহু, দ্রুত আমার চলন, নাক চিবুক কপাল নিয়ে খুব স্পষ্ট রেখায় আঁকা আমার চেহারা। আমি নবনীনিন্দিত কাষিতকাঞ্চনকান্তি বাঙালি মায়ের আদরের ধন নই।

আমার নিকটবর্তিনী বঙ্গনারীর সঙ্গে আমি মনে মনে ঝগড়া করেছি, একলা ঘরের কোণে বুক ফুলিয়ে বলেছি, 'তোমার পছন্দ পাই আর নাই পাই এ কথা নিশ্চয় জেনো তোমার দেশের চেয়ে বড়ো বড়ো দেশের স্বয়ংবরসভার বরমাল্য উপেক্ষা করে এসেছি।' এই বানানো ঝগড়ার উষ্মায় একদিন হেসে উঠেছি আপন ছেলেমানুষিতে। আবার এদিকে বিজ্ঞানীর যুক্তিও কাজ করেছে ভিতরে ভিতরে। আপন মনে তর্ক করেছি, একান্ত নিভৃতে থাকাই যদি ওর প্রার্থনীয় তা হলে বারবার আমার সুস্পষ্ট দৃষ্টিপাত এড়িয়ে এতদিনে ও তো ঠাঁই বদল করত। কাজ সেরে এ পথ দিয়ে আগে যেতুম একবার মাত্র, আজকাল যখন-তখন যাতায়াত করি, যেন এই জায়গাটাতেই সোনার খনির খবর পেয়েছি। কখনো স্পষ্ট যখন চোখোচোখি হয়েছে আমার বিশ্বাস সেটাকে চার চোখের অপঘাত ব'লে ওর ধারণা হয় নি। এক-একদিন হঠাৎ পিছন ফিরে দেখেছি আমার তিরোগমনের দিকে অচিরা তাকিয়ে আছে, ধরা পড়তেই দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

তথ্য সংগ্রহের কাজে লাগলুম। পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কেম্ব্রিজের সতীর্থ প্রোফেসর আছেন বঙ্কিম। তাঁকে চিঠি লিখলুম, 'তোমাদের বেহার সিভিল সার্ভিসে আছেন এক ভদ্রলোক, নাম ভবতোষ। আমার কোনো বন্ধু, তাঁর মেয়ের জন্যে লোকটিকে উদ্‌বাহবন্ধনে জড়াবার দুষ্কর্মে সাহায্য করতে আমাকে অনুরোধ করেছেন। জানতে চাই রাস্তা খোলসা কি না, আর লোকটার মতিগতি কী রকম।'

উত্তর এল, 'পাকা দেয়াল তোলা হয়ে গেছে, রাস্তা বন্ধ। তার পরেও লোকটার মতিগতি সম্বন্ধে যদি কৌতূহল থাকে তবে শোনো। এ দেশে থাকতে আমি যাঁর ছাত্র ছিলুম তাঁর নাম নাই জানলে। তিনি পরম পণ্ডিত আর ঋষিতুল্য লোক। তাঁর নাতনিটিকে যদি দেখ তা হলে জানবে সরস্বতী কেবল যে আবির্ভূত হয়েছেন অধ্যাপকের বিদ্যামন্দিরে তা নয় তিনি দেহ নিয়ে এসেছেন তাঁর কোলে। এমন বুদ্ধিতে উজ্জ্বল অপরূপ সুন্দর চেহারা কখনো দেখি নি।

'ভবতোষ ঢুকল শয়তান তাঁর স্বর্গলোকে। স্বল্পজল নদীর মতো বুদ্ধি তার অগভীর বলেই জ্বল্‌জ্বল্‌ করে আর সেইজন্যেই তার বচনের ধারা অনর্গল। ভুললেন অধ্যাপক, ভুললেন নাতনি। রকমসকম দেখে আমাদের তো হাত নিস্‌পিস্‌ করতে থাকত। কিছু বলবার পথ ছিল না-- বিবাহের সম্বন্ধ পাকাপাকি, বিলেত গিয়ে সিভিলিয়ান হয়ে আসবে তারই ছিল অপেক্ষা। তারও পাথেয় এবং খরচ জুগিয়েছেন কন্যার পিতা। লোকটার সর্দির ধাত, একান্ত মনে কামনা করেছিলুম ন্যুমোনিয়া হবে। হয় নি। পাস করলে পরীক্ষায়; দেশে ফেরবামাত্র বিয়ে করলে ইণ্ডিয়া গবর্মেন্টের উচ্চপদস্থ মুরব্বির মেয়েকে। লোকসমাজে নাতনির লজ্জা বাঁচাবার জন্যে মর্মাহত অধ্যাপক কোথায় অন্তর্ধান করেছেন জানি নে। অনতিকালের মধ্যে ভবতোষের অপ্রত্যাশিত পদোন্নতির সংবাদ এল। মস্ত একটা বিদায়ভোজের আয়োজন হল। শুনেছি খরচাটা দিয়েছে ভবতোষ গোপনে নিজের পকেট থেকে। আমরাও নিজের পকেট থেকেই খরচ দিয়ে গুণ্ডা লাগিয়ে ভোজটা দিলুম লণ্ডভণ্ড করে। কাগজে কংগ্রেসওয়ালাদের প্রতিই সন্দেহ প্রকাশ করেছিল ভবতোষেরই ইশারায়। আমি জানি এই সৎকার্যে তারা লিপ্ত ছিল না। যে নাগরা জুতো লেগেছিল পলায়মানের পিঠে, সেটা অধ্যাপকেরই এক প্রাক্তন ছাত্রের প্রশস্ত পায়ের মাপে। পুলিস এল গোলমালের অনেক পরে-- ইনস্পেক্টর আমার বন্ধু, লোকটা সহৃদয়।'

চিঠিখানা পড়লুম, প্রাক্তন ছাত্রটির প্রতি ঈর্ষা হল।

অচিরার সঙ্গে প্রথম কথাটি শুরু করাই সব চেয়ে কঠিন কাজ। আমি বাঙালি মেয়েকে ভয় করি। বোধ করি চেনা নেই বলেই। অথচ কাজে যোগ দেবার কিছু আগেই কলকাতায় কাটিয়ে এসেছি। সিনেমামঞ্চপথবর্তিনী বাঙালি মেয়ের নতুন চাষ করা ভ্রূবিলাস দেখে তো স্তম্ভিত হয়েছি-- তারা সব জাতবান্ধবী-- থাক্‌ তাদের কথা। কিন্তু অচিরাকে দেখলুম একালের ঠেলাঠেলি ভিড়ের বাইরে-- নির্মল আত্মমর্যাদায়, স্পর্শভীরু মেয়ে। আমি তাই ভাবছি প্রথম কথাটি শুরু করব কী করে।

জনরব এই যে কাছাকাছি ডাকাতি হয়ে গেছে। ভাবলুম, হিতৈষী হয়ে বলি 'রাজা-বাহাদুরকে ব'লে আপনার জন্যে পাহারার বন্দোবস্ত করে দিই।' ইংরেজ মেয়ে হলে হয়তো গায়েপড়া আনুকূল্য সইতে পারত না, মাথা বাঁকিয়ে বলত, 'সে ভাবনা আমার।' এই বাঙালি মেয়ে অচেনার কাছ থেকে কী ভাবে কথাটা নেবে আমার জানা নেই, হয়তো আমাকেই ডাকাত ব'লে সন্দেহ করবে।

ইতিমধ্যে একটা ঘটনা ঘটল সেটা উল্লেখযোগ্য।

দিনের আলো প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। অচিরার সময় হয়েছে ঘরে ফেরবার । এমন সময় একটা হিন্দুস্থানী গোঁয়ার এসে তার হাত থেকে তার খাতা আর থলিটা নিয়ে যখন ছুটেছে আমি তখনই বনের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বললুম, 'কোনো ভয় নেই আপনার'। এই বলে ছুটে সেই লোকটার ঘাড়ের উপর পড়তেই সে ব্যাগ খাতা ফেলে দৌড় মারলে। আমি লুঠের মাল নিয়ে এসে অচিরাকে দিলুম। অচিরা বললে, 'ভাগ্যিস আপনি--'

আমি বললেম, 'আমার কথা বলবেন না, ভাগ্যিস ঐ লোকটা এসেছিল।'

তার মানে তারই কৃপায় আপনার সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ হয়ে গেল।'

'অচিরা বিস্মিত হয়ে বললে, 'কিন্তু ও যে ডাকাত!'

'এমন অন্যায় অপবাদ দেবেন না। ও আমার বরকন্দাজ, রামশরণ।'

অচিরা মুখের উপর খয়েরি রঙের আঁচল টেনে নিয়ে খিল্‌খিল্‌ করে হেসে উঠল। হাসি থামতে চায় না। কী মিষ্টি তার ধ্বনি। যেন ঝর্‌নার নীচে নুড়িগুলো ঠুন্‌ঠুন্‌ করে উঠল সুরে সুরে। হাসি-অবসানে সে বলল, 'কিন্তু সত্যি হলে খুব মজা হত।'

'মজা কার পক্ষে?'

'যাকে নিয়ে ডাকাতি।'

'আর উদ্ধারকর্তার?'

'বাড়ি নিয়ে গিয়ে তাকে এক পেয়ালা চা খাইয়ে দিতুম আর গোটা দুয়েক স্বদেশী বিস্কুট।'

'আর এই ফাঁকি উদ্ধারকর্তার কী হবে।'

'যেরকম শোনা গেল তাঁর তো আর-কিছুতে দরকার নেই, কেবল প্রথম কথাটা।'

'ঐ প্রথম পদক্ষেপেই গণিতের অগ্রগতিটা কি বন্ধ হবে।'

'কেন হবে। ওকে চালাবার জন্যে বরকন্দাজের সাহায্য দরকার হবে না।'

বসলুম সেখানেই ঘাসের উপরে। একটা কাটা গাছের গুঁড়ির উপরে বসে ছিল অচিরা।

আমি জিজ্ঞাসা করলুম, 'আপনি হলে আমাকে প্রথম কথাটা কী বলতেন।'

'বলতুম, রাস্তায় ঘাটে ঢেলা কুড়িয়ে কুড়িয়ে করছেন কী। আপনার কি বয়স হয় নি।'

'বলেন নি কেন।'

'ভয় করেছিল।'

'আমাকে ভয় কিসের?'

'আপনি যে মস্ত লোক, দাদুর কাছে শুনেছি। তিনি আপনার লেখা প্রবন্ধ বিলিতি কাগজে পড়েছেন। তিনি যা পড়েন আমাকে শোনাতে চেষ্টা করেন।'

'এটাও কি করেছিলেন।'

'নিষ্ঠুর তিনি, করেছিলেন। লাটিন শব্দের ভিড় দেখে জোড়হাত করে তাঁকে বলেছিলুম, দাদু এটা থাক্‌। বরঞ্চ তোমার সেই কোয়ান্টাম থিয়োরির বইখানা খোলো।'

'সে থিয়োরিটা বুঝি আপনার জানা আছে?'

'কিছুমাত্র না। কিন্তু দাদুর দৃঢ় বিশ্বাস সবাই সব-কিছু বুঝতে পারে। আর তাঁর অদ্ভুত এই একটা ধারণা যে, মেয়েদের বুদ্ধি পুরুষদের বুদ্ধির চেয়ে বেশি তীক্ষ্ণ। তাই ভয়ে ভয়ে আছি অবিলম্বে আমাকে 'টাইম স্পেস'-এর জোড়মিলনের ব্যাখ্যা শুনতে হবে। দিদিমা যখন বেঁচে ছিলেন, দাদু বড়ো বড়ো কথা পাড়লেই তিনি মুখ বদ্ধ করে দিতেন; এটাই যে মেয়েদের বুদ্ধির প্রমাণ, দাদু কিন্তু সেটা বোঝেন নি।'

অচিরার দুই চোখ স্নেহে আর কৌতুকে ছল্‌ছল্‌ জ্বল্‌জ্বল্‌ করে উঠল।

দিনের আলো নিঃশেষ হয়ে এল। সন্ধ্যার প্রথম তারা জ্বলে উঠেছে একটা একলা তালগাছের মাথার উপরে। সাঁওতাল মেয়েরা ঘরে চলেছে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে, দূর থেকে শোনা যাচ্ছে তাদের গান।

এমন সময়ে বাইরে থেকে ডাক এল, 'কোথায় তুমি। অন্ধকার হয়ে এল যে! আজকাল সময় ভালো নয়।'

অচিরা উত্তর দিল, 'সে তো দেখতেই পাচ্ছি। তাই জন্যে একজন ভলন্টিয়র নিযুক্ত করেছি।'

আমি অধ্যাপকের পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করলুম। তিনি শশব্যস্ত হয়ে উঠলেন। আমি পরিচয় দিলুম, 'আমার নাম শ্রীনবীনমাধব সেনগুপ্ত।'

বৃদ্ধের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, 'বলেন কি! আপনিই ডাক্তার সেনগুপ্ত? কিন্তু আপনাকে যে বড়ো ছেলেমানুষ দেখাচ্ছে।'

আমি বললুম, 'ছেলেমানুষ না তো কী। আমার বয়স এই ছত্রিশের বেশি নয়-- সাঁইত্রিশে পড়ব।'

আবার অচিরার সেই কলমধুর কন্ঠের হাসি। আমার মনে যেন দুন লয়ের ঝংকারেসেতার বাজিয়ে দিল। বললে, 'দাদুর কাছে সবাই ছেলেমানুষ। আর উনি নিজে সব ছেলেমানুষের আগরওয়াল।'

অধ্যাপক হেসে বললেন, 'আগরওয়াল! ভাষায় নতুন শব্দের আমদানি।'

অচিরা বললে, 'মনে নেই, সেই যে তোমার মাড়োয়ারি ছাত্র কুন্দনলাল আগরওয়ালা, আমাকে এনে দিত বোতলে করে কাঁচা আমের চাট্‌নি। তাকে জিগ্‌গেসা করেছিলুম আগরওয়াল শব্দের অর্থ কী-- সে ফস্‌ করে বলে দিল পায়োনিয়র।'

অধ্যাপক বললেন, 'ডাক্তার সেনগুপ্ত, আপনার সঙ্গে আলাপ হল যদি আমাদের ওখানে খেতে যেতে হবে তো।'

'কিছু বলতে হবে না দাদু, যাবার জন্যে ওঁর মন লাফালাফি করছে। আমি যে এইমাত্র ওঁকে বলে দিয়েছি দেশকালের মিলনতত্ত্ব তুমি ব্যাখ্যা করবে।'

মনে মনে বললুম, 'বাস্‌ রে, কী দুষ্টুমি।'

অধ্যাপক উৎসাহিত হয়ে বলে উঠলেন, 'আপনার বুঝি 'টাইম-স্পেস'-এর--'

আমি ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলুম, 'কিছু জানা নেই-- বোঝাতে গেলে আপনার বৃথা সময় নষ্ট হবে।'

বৃদ্ধ ব্যগ্র হয়ে বলে উঠলেন, 'এখানে সময়ের অভাব কোথায়। আচ্ছা, এক কাজ করুন-না, আজই চলুন আমার ওখানে আহার করবেন।'

আমি লাফ দিয়ে বলতে যাচ্ছিলুম, 'এখ্‌খনি।' অচিরা বলে উঠল, 'দাদু, সাধে তোমাকে বলি ছেলেমানুষ। যখন খুশি নেমন্তন্ন করে ফেল, আমি পড়ি মুশকিলে। ওঁরা বিলেতের ডিনার-খাইয়ে সর্বগ্রাসী মানুষ, কেন তোমার নাতনির বদনাম করবে।'

অধ্যাপক ধমক-খাওয়া বালকের মতো বললেন, 'আচ্ছা, তবে আর কোন্‌ দিন আপনার সুবিধে হবে বলুন।'

'সুবিধে আমার কালই হতে পারবে কিন্তু অচিরাদেবীকে রসদ নিয়ে বিপন্ন করতে চাই নে। পাহাড়ে পর্বতে ঘুরি, সঙ্গে রাখি থলি ভরে চিঁড়ে, ছড়াকয়েক কলা, বিলিতি বেগুন, কাঁচা ছোলার শাক, চিনেবাদাম। আমিই বরঞ্চ সঙ্গে নিয়ে আসব ফলারের আয়োজন। অচিরাদেবী যদি স্বহস্তে দই দিয়ে মেখে দেন লজ্জা পাবে ফিরপোর দোকান।'

'দাদু, বিশ্বাস কোরো না এই-সব মুখমিষ্টি লোককে। উনি নিশ্চয় পড়েছেন তোমার সেই লেখাটা বাংলা কাগজে, সেই ভিটামিনের গুণপ্রচার। তাই তোমাকে খুশি করবার জন্যে শোনালেন চিঁড়েকলার ফর্দ।'

মুশকিলে ফেললে। বাংলা কাগজ পড়া তো আমার ঘটেই ওঠে না।

অধ্যাপক উৎফুল্ল হয়ে জিগ্‌গেসা করলেন, 'সেটা পড়েছেন বুঝি?'

অচিরার চোখের কোণে দেখতে পেলুম একটু হাসি। তাড়াতাড়ি শুরু করে দিলুম, 'পড়ি আর নাই পড়ি তাতে কিছু আসে যায় না, কিন্তু আসল কথাটা হচ্ছে' --আসল কথাটা আর হাতড়ে পাই নে।

অচিরা দয়া করে ধরিয়ে দিলে, 'আসল কথা উনি নিশ্চিত জানেন, কাল যদি তোমার ওখানে নেমন্তন্ন জোটে তা হলে ওঁর পাতে পশুপক্ষী স্থাবরজঙ্গম কিছুই বাদ যাবে না। তাই অত নিশ্চিন্ত মনে বিলিতি বেগুনের নামকীর্তন করলেন। দাদু, তুমি সবাইকে অত্যন্ত বেশি বিশ্বাস কর, এমন-কি, আমাকেও। সেইজন্যেই ঠাট্টা করে তোমাকে কিছু বলতে সাহস হয় না।'

কথা বলতে বলতে ধীরে ধীরে ওঁদের বাড়ির দিকে এগিয়ে চলেছি এমন সময় অচিরা হঠাৎ আমাকে বলে উঠল, 'বাস্‌ আর নয়--এইবার যান বাসায় ফিরে।'

আমি বললুম, 'দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেব।'

অচিরা বললে, 'সর্বনাশ, দরজা পেরলেই আলুথালু উচ্ছৃঙ্খলতা আমাদের দুজনের সম্মিলিত রচনা। আপনি অবজ্ঞা করে বলবেন বাঙালি মেয়েরা অগোছালো। একটু সময় দিন, কাল দেখলে মনে হবে শ্বেতদ্বীপের শ্বেতভুজার অপূর্ব কীর্তি, মেমসাহেবী সৃষ্টি।'

অধ্যাপক কিছু কুন্ঠিত হয়ে আমাকে বললেন, 'আপনি কিছু মনে করবেন না-- দিদি বড়ো বেশি কথা কচ্ছে। কিন্তু ওটা ওর স্বভাব নয় মোটে। এখানে অত্যন্ত নির্জন, তাই ও আমার মনের ফাঁক ভরে রেখে দেয় কথা কয়ে। সেটা ওর অভ্যেস হয়ে যাচ্ছে। ও যখন চুপ করে থাকে ঘরটা ছম্‌ছম্‌ করতে থাকে, আমার মনটাও। ও নিজে জানে না সে কথা। আমার ভয় হয় পাছে বাইরের লোকে ওকে ভুল বোঝে।'বুড়োর গলা জড়িয়ে ধরে অচিরা বললে, 'বুঝুক-না দাদু। অত্যন্ত অনিন্দনীয়া হতে চাই নে, সেটা অত্যন্ত আনইন্টারেস্টিঙ।'

অধ্যাপক সগর্বে বলে উঠলেন, 'আমার দিদি কিন্তু কথা বলতে জানে, অমন আর কাউকে দেখি নি।'

'তুমিও আমার মতো কাউকে দেখ নি, আমিও কাউকে দেখি নি তোমার মতো।'

আমি বললুম, 'আচার্যদেব, আজ বিদায় নেবার পূর্বে আমাকে একটা কথা দিতে হবে।'

'আচ্ছা বেশ।'

'আপনি যতবার আমাকে আপনি বলেন, আমি মনে মনে ততবার জিভ কাটি। আমাকে দয়া করে তুমি ব'লে যদি ডাকেন তা হলে সহজে সাড়া দেবে। আপনার নাতনিও সহকারিতা করবেন।'

অচিরা দুই হাত নেড়ে বললে, 'অসম্ভব, আরো কিছুদিন যাক। সর্বদা দেখাশুনো হতে হতে বড়োলোকের তিলকলাঞ্ছন যখন ঘষা পয়সার মতো পালিশ করা হয়ে যাবে তখন সবই সম্ভব হবে। দাদুর কথা স্বতন্ত্র। আমি বরঞ্চ ওঁকে পড়িয়ে নিই। বলো তো দাদু, তুমি কাল খেতে এসো। দিদি যদি মাছের ঝোলে নুন দিতে ভোলে মুখ না বেঁকিয়ে বোলো, কী চমৎকার। বোলো সবটা আমারই পাতে দেওয়া ভালো, অন্যরা এরকম রান্না তো প্রায়ই ভোগ করে থাকেন।'

অধ্যাপক সস্নেহে আমার কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, 'ভাই, তুমি বুঝতে পারবে না আসলে এই মেয়েটি লাজুক তাই যখন আলাপ করা কর্তব্য মনে করে তখন সংকোচ ঠেলে উঠতে গিয়ে কথা বেশি হয়ে পড়ে।'

'দেখেছেন ডক্টর সেনগুপ্ত, দাদু আমাকে কী রকম মধুর করে শাসন করেন। অনায়াসে বলতে পারতেন, তুমি বড়ো মুখরা, তোমার বকুনি অসহ্য। আপনি কিন্তু আমাকে ডিফেণ্ড করবেন। কী বলবেন বলুন তো।'

'আপনার মুখের সামনে বলব না।'

'বেশি কঠোর হবে?'

'আপনি মনে মনেই জানেন।'

'থাক্‌, থাক্‌, তা হলে বলে কাজ নাই। এখন বাড়ি যান।'

আমি বললুম, 'তার আগে সব কথাটা শেষ করে নিই। কাল আপনাদের ওখানে আমার নেমন্তন্নটা নামকর্তন-অনুষ্ঠানের। কাল থেকে নবীনমাধব নামটা থেকে কাটা পড়বে ডাক্তার সেনগুপ্ত। সূর্যের কাছাকাছি এলে ধূমকেতুর কেতুটা পায় লোপ, মুণ্ডুটা থাকে বাকি।'

এইখানে শেষ হল আমার বড়োদিন। দেখলুম বার্ধক্যের কী সৌম্যসুন্দর মূর্তি। পালিশ-করা লাঠি হাতে, গলায় শুভ্র পাটকরা, চাদর, ধুতি যত্নে কোঁচানো, গায়ে তসরের জামা, মাথায় শুভ্র চুল বিরল হয়ে এসেছে কিন্তু পরিপাটি করে আঁচড়ানো। স্পষ্ট বোঝা যায়, নাতনির হাতের শিল্পকার্য এঁর বেশভূষণে এঁর দিনযাত্রায়। অতিলালনের অত্যাচার ইনি সস্নেহে সহ্য করেন, খুশি রাখবার জন্যে নাতনিটিকে।

এই গল্পের পক্ষে অধ্যাপকের ব্যাবহারিক নাম অনিলকুমার সরকার। তিনি গতজেনেরেশনের কেম্ব্রিজের বড়ো পদবীধারী। মাস আষ্টেক আগে কোনো কলেজের অধ্যক্ষপদ ত্যাগ করে এখানকার এস্টেটের একটা পোড়ো বাড়ি ভাড়া নিয়ে নিজের খরচে সেটা বাসযোগ্য করেছেন।

অন্তপর্ব

আমার গল্পের আদিপর্ব হল শেষ। ছোটো গল্পের আদি ও অন্তের মাঝখানে বিশেষ একটা ছেদ থাকে না-- ওর আকৃতিটা গোল।

অচিরার সঙ্গে আমার অপরিচয়ের ব্যবধান ক্ষয় হয়ে আসছে। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে যেন পরিচয়টাই ব্যবধান। কাছাকাছি আসছি বটে কিন্তু তাতে একটা প্রতিঘাত জাগছে। কেন? অচিরার প্রতি আমার ভালোবাসা ওর কাছে স্পষ্ট হয়ে আসছে, অপরাধ কি তারই মধ্যে। কিংবা আমার দিকে ওর সৌহৃদ্য স্ফুটতর হয়ে উঠছে, সেইটেতেই ওর গ্লানি। কে জানে।

সেদিন চড়িভাতি তনিকা নদীর তীরে।

অচিরা ডাক দিলে, 'ডাক্তার সেনগুপ্ত।'

আমি বললুম, 'সেই প্রাণীটার কোনো ঠিকানা নেই, সুতরাং কোনো জবাব মিলবে না।'

'আচ্ছা, তা হলে নবীনবাবু।'

'সেও ভালো, যাকে বলে মন্দর ভালো।'

'কাণ্ডটা কী দেখলেন তো?'

আমি বললুম, 'আমার সামনে লক্ষ্য করবার বিষয় কেবল একটিমাত্রই ছিল, আর কিছুই ছিল না।'

এইটুকু ঠাট্টায় অচিরা সত্যই বিরক্ত হয়ে বললে, 'আপনার আলাপ ক্রমেই যদি অমন ইশারাওয়ালা হয়ে উঠতে থাকে তা হলে ফিরিয়ে আনব ডাক্তার সেনগুপ্তকে, তাঁর স্বভাব ছিল গম্ভীর।'

আমি বললুম, 'আচ্ছা তা হলে কাণ্ডটা কী হয়েছিল বলুন।'

'ঠাকুর যে ভাত রেঁধেছিল সে কড়্‌কড়ে, আদ্ধেক তার চাল। আমি বললুম, দাদু, এ তো তোমার চলবে না। দাদু অমনি ব'লে বসলেন, জান তো ভাই, খাবার জিনিস শক্ত হলে ভালো করে চিবোবার দরকার হয়, তাতেই হজমের সাহায্য করে। পাছে আমি দুঃখ করি দাদুর জেগে উঠল সায়েন্সের বিদ্যে। নিমকিতে নুনের বদলে যদি চিনি দিত তা হলে নিশ্চয় দাদু বলত, চিনিতে শরীরের এনার্জি বাড়িয়ে দেয়।'

'দাদু, ও দাদু, তুমি ওখানে বসে বসে কী পড়ছ। আমি যে এদিকে তোমার চরিত্রে অতিশয়োক্তি - অলংকার আরোপ করছি, আর নবীনবাবু সমস্তই বেদবাক্য ব'লে বিশ্বাস করে নিচ্ছেন।'

কিছু দূরে পোড়ো মন্দিরের সিঁড়ির উপরে বসে অধ্যাপক বিলিতি ত্রৈমাসিক পড়ছিলেন। অচিরার ডাক শুনে সেখান থেকে উঠে আমাদের কাছে বসলেন। ছেলেমানুষের মতো হঠাৎ আমাকে জিগ্‌গেসা করলেন, 'আচ্ছা নবীন, তোমার কি বিবাহ হয়েছে।'

কথাটা এতই সুস্পষ্ট ভাবব্যঞ্জক যে আর কেউ হলে বলত 'না', কিংবা ঘুরিয়ে বলত।

আমি আশাপ্রদ ভাষায় উত্তর দিলুম, 'না, এখনো হয় নি।'

অচিরার কাছে কোনো কথা এড়ায় না। সে বললে,'ঐ এখনো শব্দটা সংশয়গ্রস্ত কন্যাকর্তাদের মনকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে, ওর কোনো যথার্থ অর্থ নেই।'

'একেবারেই নেই নিশ্চিত ঠাওরলেন কী করে।'

'ওটা গণিতের প্রব্লেম, সেও হাইয়ার ম্যাথ্‌ম্যাটিক্‌স্‌ নয়। পূর্বেই শোনা গেছে আপনি ছত্রিশ বছরের ছেলেমানুষ। হিসেব করে দেখলুম এর মধ্যে আপনার মা অন্তত পাঁচসাতবার বলেছেন,'বাবা ঘরে বউ আনতে চাই। ' আপনি জবাব করেছেন, 'তার পূর্বে ব্যাঙ্কে টাকা আনতে চাই।' মা চোখের জল মুছে চুপ করে রইলেন, তার পরে মাঝখানে আপনার আর-সব ঘটেছিল কেবল ফাঁসি ছিল বাকি। শেষকালে এখানকার রাজসরকারের মোটা মাইনের কাজ জুটল। মা বললেন, 'এইবার বউ নিয়ে এসো ঘরে। বড়ো কাজ পেয়েছে।' আপনি বললেন, 'বিয়ে করে সে কাজ মাটি করতে পারব না।' আপনার ছত্রিশ বছরের গণিতফল গণনা করতে ভুল হয়েছে কি না বলুন।'

এ মেয়ের সঙ্গে অনবধানে কথা বলা নিরাপদ নয়। কিছুদিন আগেই আমার একটা পরীক্ষা হয়ে গেছে। কথায় কথায় অচিরা আমাকে বলেছিল, 'আমাদের দেশের মেয়েরা আপনাদের সংসারের সঙ্গিনী হতে পারে কিন্তু বিলেতে যারা জ্ঞানের তাপস তাদের তপস্যার সঙ্গিনী তো জোটে, যেমন ছিলেন অধ্যাপক কুরির সধর্মিণী মাদাম কুরি। আপনার কি তেমন কেউ জোটে নি।'

মনে পড়ে গেল ক্যাথারিনকে। সে একইকালে আমার বিজ্ঞানের এবং জীবনযাত্রার সাহচর্য করতে চেয়েছিল।

অচিরা জিগ্‌গেসা করলে, 'আপনি কেন তাঁকে বিয়ে করতে চাইলেন না।'

কী উত্তর দেব ভাবছিলুম, অচিরা বললে, 'আমি জানি কেন। আপনার সত্যভঙ্গহবে এই ভয় ছিল; নিজেকে আপনার মুক্ত রাখতেই হবে। আপনি যে সাধক। আপনি তাই নিষ্ঠুর, নিষ্ঠুর নিজের প্রতি, নিষ্ঠুর তার 'পরে যে আপনার পথের সামনে আসে। এই নিষ্ঠুরতায় আপনার বীরত্ব দৃঢ়প্রতিষ্ঠিত।'

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার সে বললে, 'বাংলাসাহিত্য বোধ হয় আপনি পড়েন না। কচ ও দেবযানী ব'লে একটা কবিতা আছে। তার শেষ কথাটা এই, মেয়েদের ব্রত পুরুষকে বাঁধা, আর পুরুষের ব্রত মেয়ের বাঁধন কাটায়ে স্বর্গলোকের রাস্তা বানানো। কচ বেরিয়ে পড়েছিল দেবযানীর অনুরোধ এড়িয়ে, আর আপনি মায়ের অনুনয়-- একই কথা।'

আমি বললুম, 'দেখুন, আমি হয়তো ভুল করেছিলুম। মেয়েদের নিয়ে পুরুষের কাজ যদি না চলে তা হলে মেয়েদের সৃষ্টি কেন।'

অচিরা বললে, 'বারো-আনার চলে, মেয়েরা তাদের জন্যেই। কিন্তু বাকি মাইনরিটি যারা সব-কিছু পেরিয়ে নতুন পথের সন্ধানে বেরিয়েছে তাদের চলে না। সব-পেরোবার মানুষকে মেয়েরা যেন চোখের জল ফেলে রাস্তা ছেড়ে দেয়। যে দুর্গম পথে মেয়েপুরুষের চিরকালের দ্বন্দ্ব সেখানে পুরুষেরা হোক জয়ী। যে মেয়েরা মেয়েলি, প্রকৃতির বিধানে তাদের সংখ্যা অনেক বেশি, তারা ছেলে মানুষ করে, সেবা করে ঘরের লোকের। যে পুরুষ যথার্থ পুরুষ, তাদের সংখ্যা খুব কম; তারা অভিব্যক্তির শেষ কোঠায়। মাথা তুলছে দুটি-একটি করে। মেয়েরা তাদের ভয় পায়, বুঝতে পারে না, টেনে আনতে চায় নিজের অধিকারের গণ্ডিতে । এই তত্ত্ব শুনেছি আমার দাদুর কাছে।'

'দাদু, তোমার পড়া রেখে আমার কথা শোনো। মনে আছে, তুমি একদিন বলেছিলে, পুরুষ যেখানে অসাধরণ সেখানে সে নিরতিশয় একলা, নিদারুণ তার নিঃসঙ্গতা, কেননা, তাকে যেতে হয় যেখানে কেউ পৌঁছয় নি। আমার ডায়ারিতে লেখা আছে।'

অধ্যাপক মনে করবার চেষ্টা করে বললেন, 'বলেছিলুম নাকি? হয়তো বলেছিলুম।'

অচিরা খুব বড়ো কথাও কয় হাসির ছলে, আজ সে অত্যন্ত গম্ভীর।

খানিক বাদে আবার সে বললে, 'দেবযানী কচকে কী অভিসম্পাত দিয়েছিল জানেন?'

'না।'

'বলেছিল, 'তোমার সাধনায় পাওয়া বিদ্যা তোমার নিজের ব্যবহারে লাগাতেপারবে না।' যদি এই অভিসম্পাত আজ দেবতা য়ুরোপকে, তা হলে য়ুরোপ বেঁচে যেত। বিশ্বের জিনিসকে নিজের মাপে ছোটো করেই ওখানকার মানুষ মরছে লোভের তাড়ায়। সত্যি কি না বলো দাদু।'

'খুব সত্যি, কিন্তু এত কথা কী করে ভাবলে।'

'নিজের বুদ্ধিতে না। একটা তোমার মহদ্‌গুণ আছে, কখন কাকে কী যে বল, ভোলানাথ তুমি সব ভুলে যাও। তাই চোরাই মালের উপর নিজের ছাপ লাগিয়ে দিতে ভাবনা থাকে না।'

আমি বললুম, 'নিজের ছাপ যদি লাগে তা হলেই অপরাধ খণ্ডন হয়।'

'জানেন, নবীনবাবু, ওঁর কত ছাত্র ওঁর কত মুখের কথা খাতায় টুকে নিয়ে বই লিখে নাম করেছে। উনি তাই পড়ে আশ্চর্য হয়ে প্রশংসা করেছেন, বুঝতেই পারেন নি নিজের প্রশংসা নিজেই করছেন। কোন্‌ কথা আমার কথা আর কোন্‌ কথা ওঁর নিজের সে ওঁর মনে থাকে না-- লোকের সামনে আমাকে বলে বসেন ওরিজিন্যাল, তখন সেটার প্রতিবাদ করার মতো মনের জোর পাওয়া যায় না। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি নবীনবাবুরও এ ভ্রম ঘটছে। কী করবো বলো, আমি তো কোটেশন মার্কা দিয়ে দিয়ে কথা বলতে পারি নে।'

'নবীনবাবুর এ ভ্রম কোনোদিন ঘুচবে না।'

অচিরা বললে, 'দাদু একদিন আমাদের কলেজ-ক্লাসে কচ ও দেবযানীর ব্যাখ্যা করছিলেন। কচ হচ্ছে পুরুষের প্রতীক, আর দেবযানী মেয়ের। সেই দিন নির্মম পুরুষের মহৎ গৌরব মনে মনে মেনেছি, মুখে কক্‌খনো স্বীকার করি নে।'

অধ্যাপক বললেন, 'কিন্তু দিদি, আমার কোনো কথায় মেয়েদের গৌরবের আমি কোনোদিন লাঘব করি নি।'

'তুমি আবার করবে। হায় রে। মেয়েদের তুমি যে অন্ধ ভক্ত। তোমার মুখের স্তবগান শুনে মনে মনে হাসি। মেয়েরা নির্লজ্জ হয়ে সব মেনে নেয়। তার উপরেও বুক ফুলিয়ে সতীসধ্বীগিরির বড়াই করে নিজের মুখে। সস্তায় প্রশংসা আত্মসাৎ করা ওদের অভ্যেস হয়ে গেছে।

অধ্যাপক বলেলেন, 'না দিদি, অবিচার কোরো না। অনেক কাল ওরা হীনতা সহ্য করেছে, হয়তো সেইজন্যেই নিজেদের শ্রেষ্ঠতা নিয়ে একটু বেশি জোর দিয়ে তর্ক করে।'

'না, দাদু, ও তোমার বাজে কথা। আসল হচ্ছে এটা স্ত্রীদেবতার দেশ-- এখানে পুরুষেরা, স্ত্রৈণ মেয়েরাও স্ত্রৈণ। এখানে পুরুষরা কেবলই 'মা মা' করছে, আর মেয়েরাচিরশিশুদের আশ্বাস দিচ্ছে যে তারা মায়ের জাত। আমার তো লজ্জা করে। পশু পক্ষীদের মধ্যেও মায়ের জাত নেই কোথায়?'

চিত্তচাঞ্চল্যে কাজের এত বাধা ঘটছে যে লজ্জা পাচ্ছি মনে মনে। সদরে বাজেটের মিটিঙে রিসর্চবিভাগে আরো কিছু দান মঞ্জুর করিয়ে নেবার প্রস্তাব ছিল। তার সমর্থক রিপোর্টখানা অর্ধেকের বেশি লেখাই হয় নি। অথচ এদিকে ক্রোচের এস্‌থেটিক্‌স্‌ নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা শুনে আসছি। অচিরা নিশ্চিত জানে বিষয়টা আমার উপলব্ধি ও উপভোগের সম্পূর্ণ বাইরে। তা হলেও চলত, কিন্তু আমার বিশ্বাস ব্যাপারটাকে সে ইচ্ছে করে শোচনীয় করে তুলেছে। ঠিক এই সময়টাতেই সাঁওতালদের পার্বণ। তারা পচাই মদ খাচ্ছে আর মাদল বাজিয়ে মেয়েপুরুষে নৃত্য করছে। অচিরা ওদের পরম বন্ধু। মদের পয়সা জোগায়, সালু কিনে দেয় সাঁওতাল ছেলেদের কোমরে বাঁধবার জন্যে, বাগান থেকে জবাফুলের জোগান দেয় সাঁওতাল মেয়েদের চুলে পরবার। ওকে না হলে তাদের চলেই না। অচিরা অধ্যাপককে বলেছে, ও তো এ কদিন থাকতে পারবে না অতএব এই সময়টাতে বিরলে আমাকে নিয়ে ক্রোচের রসতত্ত্ব যদি পড়ে শোনান তা হলে আমার সময় আনন্দে কাটবে। একবার সসংকোচে বলেছিলুম, 'সাঁওতালদের উৎসব দেখতে আমার বিশেষ কৌতূহল আছে।' স্বয়ং অধ্যাপক বললেন, না, সে আপনার ভালো লাগবে না। আমার ইনটেলেক্‌চুয়ল মনোবৃত্তির নির্জলা একান্ততার 'পরে তাঁর এত বিশ্বাস। মধ্যাহ্নভোজনের পরেই অধ্যাপক গুন গুন করে পড়ে চলেছেন। দূরে মাদলের আওয়াজ এক-একবার থামছে। পরক্ষণেই দ্বিগুণ জোরে বেজে উঠছে। কখনো বা পদশব্দ কল্পনা করছি, কখনো বা হতাশ হয়ে ভাবছি অসমাপ্ত রিপোর্টের কথা। সুবিধে এই অধ্যাপক জিগ্‌গেসাই করেন না কোথাও আমার ঠেকছে কিনা। তিনি ভাবেন সমস্তই জলের মতো সোজা। মাঝে মাঝে প্রতিবাদ উপলক্ষে প্রশ্ন করেন, আপনারও কি এই মনে হয় না। আমি খুব জোরের সঙ্গে বলি নিশ্চয়।

ইতিমধ্যে কিছুদূরে আমাদের অর্ধসমাপ্ত কয়লার খনিতে মজুরদের হল স্ট্রাইক। ঘটালেন যিনি, এই তাঁর ব্যাবসা, স্বভাব এবং অভাব বশত; সমস্ত কাজের মধ্যে এইটেই সব চেয়ে সহজ। কোনো কারণ ছিল না, কেননা আমি নিজে সোশালিস্ট, সেখানকার বিধিবিধান আমার নিজের হাতে বাঁধা, কারো সেখানে না ছিল লোকসান, না ছিল অসম্মান।

নূতন যন্ত্র এসেছে জর্মনি থেকে, তারই খাটাবার চেষ্টায় ব্যস্ত আছি। এমনসময় উত্তেজিত ভাবে এসে উপস্থিত অচিরা। বললে, 'আপনি মোটা মাইনে নিয়ে ধনিকের নায়েবি করছেন, এদিকে গরিবের দারিদ্র৻ের সুযোগটাকে নিয়ে আপনি--'

চন্‌ করে উঠল মাথা। বাধা দিয়ে বললুম,কাজ চালাবার দায়িত্ব এবং ক্ষমতা যাদের তারাই অন্যায়কারী, আর জগতে যারা কোনো কাজই করে না, করতে পারেও না, দয়ামায়া কেবল তাদেরই-- এই সহজ অহংকারের মত্ততায় সত্যমিথ্যার প্রমাণ নিতেও মন চায় না।'

অচিরা বললে, 'সত্য নয় বলতে চান?'

আমি বললুম, 'সত্য শব্দটা আপেক্ষিক। যা কিছু যত ভালোই হোক, তার চেয়ে আরো ভালো হতেও পারে। এই দেখুন-না আমার মোটা মাইনে বটে, তার থেকে মাকে পাঠাই পঞ্চাশ, নিজে রাখি ত্রিশ, আর বাকি-- সে হিসেবটা থাক্‌। কিন্তু মার জন্যে পনেরো নিজের জন্যে পাঁচ রাখলে আইডিয়ালের আরো কাছ ঘেঁষে যেত, কিন্তু একটা সীমা আছে তো।'

অচিরা বললে, 'সীমাটা কি নিজের ইচ্ছের উপরেই নির্ভর করে।'

আমি বললুম, 'না, অবস্থার উপরে। যে কথাটা উঠল সেটা একটু বিচার করে দেখুন। য়ুরোপে ইণ্ডস্ট্রীয়ালিজ্‌ম্‌ গড়ে উঠেছে দীর্ঘকাল ধরে। যাদের হাতে টাকা ছিল এবং টাকা করবার প্রতিভা ছিল তারাই এটা গড়েছে। গড়েছে নিছক টাকার লোভে, সেটা ভালো নয় তা মানি। কিন্তু ঐ ঘুষটুকু যদি না পেত তা হলে একেবারে গড়াই হত না, এতদিন পরে আজ ওখানে পড়েছে হিসেবনিকেশের তলব।'

অচিরা বললে, 'আপনি বলতে চান পায়ে তেল শুরুতে, কানমলা তার পরে?'

'নিশ্চয়। আমাদের দেশে ভিত-গাঁথা সবে আরম্ভ হয়েছে এখনই যদি মার লাগাই তা হলে শুরুতেই হবে শেষ, সুবিধে হবে বিদেশী বণিকদের। মানছি আজ আমি লোভীদের ঘুষ দেওয়ার কাজ নিয়েছি, টাকাওয়ালার নায়েবি আমি করি। আজ সেলাম করছি বাদশার দরবারে এসে, কাল ওদের সিংহাসনের পায়ায় লাগাব কুড়ুল। ইতিহাসে তো এই দেখা গেছে।

অচিরা বললে, 'সব বুঝলুম। কিন্তু আমি দিনের পর দিন অপেক্ষা করে আছি দেখতে, এই স্ট্রাইক মেটাতে আপনি নিজে কবে যাবেন। নিশ্চয়ই আপনাকে ডাকাও পড়েছিল। কিন্তু কেন যান নি?'

চাপা গলায় বলতে চেষ্টা করলুম, 'এখানে কাজ ছিল বিস্তর।' কিন্তু ফাঁকি দেব কী করে। আমার ব্যবহারে তো আমার কৈফিয়তের প্রমাণ হয় না।

কঠিন হাসি হেসে দ্রুতপদে চলে গেল অচিরা।

আর চলবে না। একটা শেষ নিষ্পত্তি করাই চাই। নইলে অপমানের অন্ত থাকবে না।

সাঁওতালী পার্বণ শেষ হয়েছে। সকালে বেড়াতে বেরিয়েছি। অচিরা সঙ্গে ছিল। উত্তরের দিকে একটা পাহাড় উঠেছে, আকাশের নীলের চেয়ে ঘন নীল। তার গায়ে গায়ে চারা শাল আর বৃদ্ধ শাল গাছে বন অন্ধকার। মাঝখান দিয়ে কাঠুরেদের পায়ে-চলার পথ। অধ্যাপক একটা অর্কিড ফুল বিশেষ করে পর্যবেক্ষণ করছেন, তাঁর পকেটে সর্বদা থাকে আতস কাচ।

গাছগুলোর মধ্যে অন্ধকার যেখানে ভ্রূকুটিল হয়ে উঠেছে আর ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে তীব্র আওয়াজে, অচিরা বসল একটা শেওলাঢাকা পাথরের উপর। পাশে ছিল মোটা জাতের বাঁশগাছ, তারই ছাঁটা কঞ্চির উপর আমি বসলুম। আজ সকাল থেকে অচিরার মুখে বেশি কথা ছিল না। সেইজন্যেই তার সঙ্গে আমার কথা কওয়া বাধা পাচ্ছিল।

সামনের দিকে তাকিয়ে এক সময় সে আস্তে আস্তে বলে উঠল, 'সমস্ত বনটা মিলে প্রকাণ্ড একটা বহুঅঙ্গওয়ালা প্রাণী। গুঁড়ি মেরে বসে আছে শিকারি জন্তুর মতো। যেন স্থলচর অক্টোপাশ, কালো চোখ দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার নিরন্তর হিপনটিজমে ক্রমে ক্রমে দিনে দিনে আমার মনের মধ্যে একটা ভয়ের বোঝা যেন নিরেট হয়ে উঠ্‌ছে।'

আমি বললুম, 'কতকটা এইরকম কথাই এই সেদিন আমার ডায়ারিতে লিখেছি।'

অচিরা বলে চলল, 'মনটা যেন পুরোনো ইমারত, সকল কাজের বার। নিষ্ঠুর অরণ্য যেখানে পেয়েছে তার ফাটল, চালিয়ে দিয়েছে শিকড়, সমস্ত ভিতরটাকে টানছে ভাঙনের দিকে। এই বোবা কালা মহাকায় জন্তু মনের ফাটল আবিষ্কার করতে মজবুত-- আমার ভয় বেড়ে চলেছে। দাদু বলেছিলেন, 'লোকালয় থেকে একান্ত দূরে থাকলে মানুষের মনঃপ্রকৃতি আসে অবশ হয়ে, প্রবল হয়ে ওঠে তার প্রাণপ্রকৃতি।' আমি জিগ্‌গেস করলুম, 'এর প্রতিকার কী।' তিনি বললেন, 'মানুষের মনের শক্তিকে আমরা সঙ্গে করে আনতে পারি, এই দেখো-না এনেছি তাকে আমার লাইব্রেরিতে। দাদুর উপযুক্ত এই উত্তর। কিন্তু আপনি কী বলেন।'

আমি বললুম, 'আমাদের মন খোঁজে এমন একজন মানুষের সঙ্গ যে আমাদের সমস্ত অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ জাগিয়ে রাখতে পারে, চেতনার বন্যা বইয়ে দেয় জনশূন্যতার মধ্যে। এ তো লাইব্রেরির সাধ্য নয়।'

অচিরা একটু অবজ্ঞা করে বললে, 'আপনি যার খোঁজ করছেন তেমন মানুষ পাওয়া যায় বৈকি, যদি বড্ড দরকার পড়ে। তারা চৈতন্যকে উসকিয়ে তোলে নিজের দিকেই, বন্যা বইয়ে দিয়ে সাধনার বাঁধ ভেঙে ফেলে। এ-সমস্তই কবিদের বানানো কথা, মোহরস দিয়ে জারানো। আপনাদের মতো বুকের-পাটাওয়ালা লোকের মুখে মানায় না। প্রথম যখন আপনাকে দেখেছিলুম, তখন দেখেছি আপনি রস খুঁজে বেড়ান নি, পথ খুঁড়ে বেড়িয়েছিলেন কড়া মাটি ভেঙে। দেখেছি আপনার নিরাসক্ত পৌরুষের মুর্তি-- সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে আপনাকে প্রণাম করেছি। আজ আপনি কথার পুতুল দিয়ে নিজেকে ভোলাতে বসেছেন। এ দশা ঘটালে কে। স্পষ্ট করেই জিজ্ঞাসা করি, এর কারণ কি আমি।'

আমি বললুম, 'তা হতে পারে। কিন্তু আপনি তো সাধারণ মেয়ে নন। পুরুষকে আপনি শক্তি দেবেন।'

'হাঁ, শক্তি দেব, যদি নিজেকেই মোহ জড়িয়ে না ধরে। আভাসে বুঝেছি আপনি আমার ইতিহাস কিছু কিছু সংগ্রহ করেছেন। আপনার কাছে কিছু ঢাকবার দরকার নেই॥ আপনি শুনেছেন আমি ভবতোষকে ভালোবেসেছিলুম।'

'হাঁ শুনেছি।'

'এও জানেন আমার ভালোবাসার অপমান ঘটেছে।'

'হাঁ জানি।'

'সেই অপমানিত ভালোবাসা অনেকদিন ধরে আমাকে আঁকড়ে ধরে দুর্বল করেছে। আমি জেদ করে বসেছিলুম তারই একনিষ্ঠ স্মৃতিকে জীবনের পূজামন্দিরে বসাব। চিরদিন একমনে সেই নিষ্ফল সাধনা করব মেয়েরা যাকে বলে সতীত্ব। নিজের ভালোবাসার অহংকারে সংসারকে ঠেলে ফেলে নির্জনে চলে এসেছি। কর্তব্যকে অবজ্ঞা করেছি নিজের দুঃখকে সম্মান করব ব'লে। আমার দাদুকে অনায়াসে সরিয়ে এনেছি তাঁর কাজের ক্ষেত্র থেকে। যেন এই মেয়েটার হৃদয়ের অহমিকা পৃথিবীর সব-কিছুর উপরে। মোহ, মোহ, অন্ধ মোহ।'

খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ সে বলে উঠল, 'জানেন আপনিই সেই মোহ ভাঙিয়ে দিয়েছেন।'

বিস্মিত হয়ে তার মুখের দিকে চেয়ে রইলুম। সে বললে, 'আপনিই এই আত্মাবমাননা থেকে ছিনিয়ে এনে আমাকে বাঁচালেন।'

স্তব্ধ রইলুম নিরুত্তর প্রশ্ন নিয়ে।

'আপনি তখনো আমাকে দেখেন নি। আমি আশ্চর্য হয়ে দেখেছি আপনার দুঃসাধ্য প্রয়াসের দিনগুলি-- সঙ্গ নেই, আরাম নেই, ক্লান্তি নেই, একটু কোথাও ছিদ্র নেই অধ্যবসায়ে। দেখেছি আপনার প্রশস্ত ললাট, আপনার চাপা ঠোঁটে অপরাজেয় ইচ্ছাশক্তির লক্ষণ, আর দেখেছি মানুষকে কী রকম অনায়াসে প্রভুত্বের জোরে চালনা করেন। দাদুর কাছে আমি মানুষ, আমি পুরুষের ভক্ত, যে পুরুষ সত্য যে পুরুষ তপস্বী। সেই পুরুষকেই দেখবার জন্যে আমার ভক্তিপিপাসু নারী ভিতরে ভিতরে অপেক্ষা করে ছিল নিজের অগোচরে। মাঝখানে এসেছিল অপদেবতা প্রবৃত্তির টানে। অবশেষে নিষ্কাম পুরুষের সুদৃঢ় শক্তিরূপ আপনিই আনলেন আমার চোখের সামনে।

আমি জিগ্‌গেসা করলুম, 'তার পর কি ভাবের পরিবর্তন হয়েছে।'

'হাঁ হয়েছে। আপনার বেদী থেকে নেমে এসেছেন প্রতিদিন। স্থানীয় কাগজে পড়লুম, দূরে অন্য-এক জায়গায় সন্ধানের কাজে আপনার ডাক পড়েছে। আপনি নড়লেন না, ভিতরে ভিতরে আত্মগ্লানি ভোগ করলেন। আপনার পথের সামনেকার ঢেলাখানার মতো আমাকে লাথি মেরে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন না কেন। কেন নিষ্ঠুর হতে পারলেন না। যদি পারতেন তবে আমি ধন্য হতুম। আমার ব্রতের পারণা হত আমার কান্না দিয়ে।'

মৃদুস্বরে বললুম, 'যাবার জন্যেই কাগজপত্তর গুছিয়ে নিচ্ছিলুম।'

'না, না, কখনোই না। মিথ্যে ছুতো করে নিজেকে ভোলাচ্ছিলেন। যতই দেখলুম আপনার দুর্বলতা, ভয় হতে লাগল আমার নিজেকে নিয়ে। ছি, ছি, কী পরাভবের বিষ এনেছি নারীর জীবনে, কেবল অন্যের জন্যে নয়, নিজের জন্যেও। ক্রমশই একটা চাঞ্চল্য আমাকে পেয়ে বসল, সে যেন এই বনের বিষনিশ্বাস থেকে । একদিন এখানকার পিশাচী রাত্রি এমন আমাকে আবিষ্ট করে ধরেছিল যে মনে হল যে এত বড়ো প্রবৃত্তি রাক্ষসীও আছে যে আমার দাদুর কাছ থেকেও আমাকে ছিনিয়ে নিতে পারে। তখনই সেই রাত্রেই ছুটে নদীর জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে ডুব দিয়ে দিয়ে স্নান করে এসেছি।

এই কথা বলতে বলতে অচিরা ডাক দিল, 'দাদু।'

অধ্যাপক গাছতলায় বসে পড়ছিলেন। উঠে এসে স্নেহের স্বরে বললেন, 'কী দিদি? দূর থেকে বসে বসে ভাবছিলুম, তোমার উপরে আজ বাণী ভর দিয়েছেন-- জ্বল জ্বল করছে তোমার চোখ দুটি।'

'আমার কথা থাক্‌, তুমি শোনো। তুমি সেদিন বলেছিলে মানুষের চরম অভিব্যক্তি তপস্যার মধ্য দিয়ে।'

'হাঁ, আমি তাই তো বলি। বর্বর মানুষ জন্তুর পর্যায়ে। কেবলমাত্র তপস্যার মধ্য দিয়ে সে হয়েছে জ্ঞানী মানুষ। আরো তপস্যা আছে সামনে, স্থূল আবরণ যুগে যুগে ত্যাগ করতে করতে সে হবে দেবতা। পুরাণে দেবতার কল্পনা আছে, কিন্তু দেবতা ছিলেন না অতীতে, দেবতা আছেন ভবিষ্যতে। মানুষের ইতিহাসের শেষ অধ্যায়ে।'

অচিরা বললে, 'দাদু, এইবার এসো, তোমার-আমার কথাটা আপসে চুকিয়ে দিই, কদিন থেকে মনের মধ্যে তোলপাড় করছে।'

আমি উঠে পড়লুম, বললুম, 'তা হলে যাই।'

'না, আপনি বসুন।-- দাদু, সেই যে কলেজের অধ্যক্ষপদটা তোমার ছিল, সেটা খালি হয়েছে। তোমাকে ডাক দিয়েছে ওরা।'

অধ্যাপক আশ্চর্য হয়ে বললেন, 'কী করে জানলে ভাই।'

'তোমার কাছে চিঠি এসেছে, সে আমি চুরি করেছি।'

'চুরি করেছ!'

'করব না! আমাকে সব চিঠিই দেখাও কেবল কলেজের ছাপ-মারা ঐ চিঠিটাই দেখালে না। তোমার দুরভিসন্ধি সন্দেহ করে চুরি করে দেখতে হল।'

অধ্যাপক অপরাধীর মতো ব্যস্ত হয়ে বললেন, 'আমারই অন্যায় হয়েছে।'

'কিছু অন্যায় হয় নি। আমাকে লুকোতে চেয়েছিলে যে আমার জীবনের অভিসম্পাত এখনো তুমি নিজের উপর টেনে নিয়ে চলবে। তোমার আপন আসন থেকে আমি যে নামিয়ে এনেছি তোমাকে। আমাদের তো ঐ কাজ।'

'কী বলছ দিদি।'

'সত্যি কথাই বলছি। তুমি শিক্ষাদানযজ্ঞের হোতা, এখানে এনে আমি তোমাকে করেছি শুধু গ্রন্থকীট। বিশ্বসৃষ্টি বাদ দিলে কী দশা হয় বিশ্বকর্তার। ছাত্র না থাকলে তোমার হয় ঠিক তেমনি। সত্যি কথা বলো।'

'বরাবর ইস্কুলমাস্টারি করে এসেছি কিনা।'

'তুমি আবার ইস্কুলমাস্টার! কী যে বল তুমি! তুমি যে স্বভাবতই আচার্য। দেখেন নি, নবীনবাবু, ওঁর মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে কি আর দয়ামায়া থাকে না। অমনি আমাকে নিয়ে পড়েন-- বারো-আনাই বুঝতেই পারি না। নইলে হাতড়িয়ে বের করেন এই নবীনবাবুকে, সে হয় আরো শোচনীয়। দাদু, ছাত্র তোমার নিতান্তই চাই জানি, কিন্তু বাছাই করে নিয়ো, রূপকথার রাজা সকালে ঘুম থেকে উঠেই যার মুখ দেখত তাকেই কন্যা দান করত। তোমার বিদ্যাদান অনেকটা সেই রকম।'

'না দিদি, আমাকে বাছাই করে নেয় যারা তারাই সাহায্য পায় আমার। এখনকার দিনে কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞাপন দিয়ে ছাত্র সংগ্রহ করে, আগেকার দিনে সন্ধান করে শিক্ষক লাভ করত শিক্ষার্থী।'

'আচ্ছা, সে কথা পরে হবে। এখনকার সিদ্ধান্ত এই যে, তোমাকে তোমার সেই কাজটা ফিরিয়ে নিতে হবে।'

অধ্যাপক হতবুদ্ধির মতো নাতনির মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। অচিরা বললে, 'তুমি ভাবছ, আমার গতি কী হবে। আমার গতি তুমি। আর আমাকে ছাড়লে তোমার কী গতি জানই তো। এখন যে তোমার পনেরোই আশ্বিনে পনেরোই অক্টোবরে এক হয়ে যায়, নিজের নূতন ছাতার সঙ্গে পরের পুরোনো ছাতার স্বত্বাধিকারে ভেদজ্ঞান থাকে না, গাড়ি চড়ে ড্রাইভারকে এমন ঠিকানা বাতলিয়ে দাও সেই ঠিকানায় আজ পর্যন্ত কোনো বাড়ি তৈরি হয় নি, আর চাকরের ঘুম ভাঙবার ভয়ে সাবধানে পা টিপে টিপে কলতলায় নিজে গিয়ে কুঁজোয় জল ভরে নিয়ে আস।'

অধ্যাপক আমার দিকে চেয়ে বললেন, 'কী তুমি বল, নবীন।'

কী জানি ওঁর হয়তো মনে হয়েছিল ওঁদের এই পারিবারিক প্রস্তাবে আমার ভোটেরও একটা মুল্য আছে।

আমি খানিকক্ষণ চুপ করে রইলুম, তার পরে বললুম 'অচিরাদেবীর চেয়ে সত্য পরামর্শ আপনাকে কেউ দিতে পারবে না।'

অচিরা তখনই উঠে দাঁড়িয়ে পা ছুঁয়ে আমাকে প্রণাম করলে। বোধ হল যেন চোখ থেকে জল পড়ল আমার পায়ে। আমি সংকুচিত হয়ে পিছু হটে গেলুম।

অচিরা বললে, 'সংকোচ করবেন না। আপনার তুলনায় আমি কিছুই নই সে কথা নিশ্চয় জানবেন। এই কিন্তু শেষ বিদায়, যাবার আগে আর দেখা হবে না।'

অধ্যাপক বিস্মিত হয়ে বললেন, 'সে কী কথা, দিদি।'

অচিরা বাষ্পগদগদ কন্ঠ সামলিয়ে হেসে বললে, 'দাদু, তুমি অনেক-কিছু জান, কিন্তু আরো-কিছু সম্বন্ধে আমার বুদ্ধি তোমার চেয়ে অনেক বেশি, এ কথাটা মেনে নিয়ো।'

এই বলে চলতে উদ্যত হল। আবার ফিরে এসে বললে, 'আমাকে ভুল বুঝবেন না-- আজ আমার তীব্র আনন্দ হচ্ছে যে আপনাকে মুক্তি দিলুম-- তার থেকে আমারও মুক্তি। আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছে-- লুকোব না, জল আরো পড়বে। নারীর চোখের জল তাঁরই সম্মানে যিনি সব বন্ধন কাটিয়ে জয়যাত্রায় বেরিয়েছেন।

দ্রুতপদে অচিরা চলে গেল।

আমি পদধূলি নিয়ে প্রণাম করলুম অধ্যাপককে। তিনি আমাকে বুকে চেপে ধরে বললেন, 'আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি তোমার সামনে কীর্তির পথ প্রশস্ত।'

ছোটো গল্প ফুরল। পরেকার কথাটা খনি-খোঁড়ার ব্যাপার নিয়ে। তারও পরে আরো বাকি আছে-- সে ইতিহাস নিরতিশয় একলার অভিযান, জনতার মাঝখান দিয়ে দুর্গম পথে রুদ্ধ দুর্গের দ্বার-অভিমুখে।

বাড়ি ফিরে গিয়ে যত আমার প্ল্যান আর নোট আর রেকর্ড উলটে পালটে নাড়াচাড়া করলুম। দেখলুম, সামনে দিগন্তবিস্তৃত কাজের ক্ষেত্র তাতেই আমার বৃহৎ ছুটি।

সন্ধেবেলায় বারান্দায় এসে বসলুম। খাঁচা ভেঙে গেছে। পাখির পায়ে আটকে রইল ছিন্ন শিকল। সেটা নড়তে চড়তে পায়ে বাজবে।


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

ঠাকুরবাড়ির বাহিরমহল - চিত্রা দেব

amarboi
ঠাকুরবাড়ির বাহিরমহল - চিত্রা দেব
দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৮২৩ নাগাদ বেলগাছিয়া ভিলা কেনেন। ১৮৩৫-এ তৈরি হয় তার দোতলা। এই প্রাসাদ আর তার বাগানে দেশি-বিদেশি অভিজাতদের আমন্ত্রণ করে যে সব উৎসবের আয়োজন করতেন দ্বারকানাথ, সমকালেই তা প্রবাদে পরিণত হয়েছিল। রূপচাঁদ পক্ষীর সেই বিখ্যাত গান তো এই বাড়ি নিয়েই, ‘বেলগাছিয়ার বাগানে হয় ছুরি কাঁটার ঝনঝনি...’। সে বাগান আজ আর নেই, বাড়িও বিলুপ্তির পথে । আবার পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুরদের তৈরি দমদম সাতপুকুরের বাগানবাড়ি ‘গুপ্ত বৃন্দাবন’ই বা কতটুকু পরিচিত? পাথুরিয়াঘাটায় যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের ‘প্রাসাদ’ এবং ‘টেগোর কাস্‌ল’, আর তাঁর বাগানবাড়ি ‘মরকত কুঞ্জ’ আজ শ্রীহীন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি তার সন্তানদের বিপুল সাংস্কৃতিক অর্জনের জন্যই আজ সংরক্ষণের সৌভাগ্য পেয়েছে। এই সব বাড়ির মানুষজনের ইতিহাসের মধ্যে ছড়িয়ে আছে আঠেরো শতকের শেষ থেকে উনিশ শতক জুড়ে বাংলা দেশের এক বিশিষ্ট পরিবারের কাহিনি— তার কিছুটা গল্প, কিছুটা তথ্য, তাও নানা বিবরণের জটিলতায় অস্পষ্ট। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত বলা যায়, এই ইতিহাস ছাড়া বাঙালির আধুনিক হয়ে ওঠার বৃত্তান্ত নিতান্তই অসম্পূর্ণ।

ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল (আনন্দ) লিখে চিত্রা দেব কয়েক দশক আগেই সে বৃত্তান্ত দুই মলাটে আনার কাজ শুরু করেছিলেন। প্রায় পঁচাত্তর ছুঁই ছুঁই বয়সে, অসুস্থ ও গৃহবন্দি অবস্থায় তিনি এ বারে লিখে ফেলেছেন ঠাকুরবাড়ির বাহিরমহল। ঠাকুর পরিবারের বিভিন্ন ব্যক্তিত্বই সুপরিচিত, তাঁদের সম্পর্কে লেখাও হয়েছে অনেক। তবু যেমন আড়ালে রয়ে গিয়েছেন এই পরিবারের বহু সদস্য, তেমনই পরিচিতদের নিয়েও তথ্য কি গল্প কোনওটাই এক জায়গায় করার চেষ্টা হয়নি। বহু দিনের পরিশ্রমে সেই ছবিটাই দাঁড় করাতে চেয়েছেন চিত্রা দেব। সম্মিলিত জীবনযাত্রা থেকে একাধিক পারিবারিক বৃত্তে ছড়িয়ে পড়া ‘ঠাকুরবাবু’দের সে ছবি নিছক বাবুয়ানির নয়, সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতির সঙ্গে সমাজকল্যাণ, আধুনিক চিন্তা ও মননের বিকাশ, জড়িয়ে আছে সবই।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

রসিকতা

amarboi
বইয়ের হাট ব্লগ
শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি

রসিকতা

চালু হয়েছে বইয়ের হাট ব্লগ। এখন থেকে এখানে প্রকাশিত হবে বাংলা সাহিত্যের নানা অনুষঙ্গের বাছাইকৃত অংশবিশেষ। দীর্ঘ লেখা নয়, মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিটে পড়ে ফেলা যায় এমন সব লেখা নিয়ে সাজানো হবে বইয়ের হাটের ব্লগ। লেখাগুলো আশাকরি পাঠকের পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে। আপনাদের সহযোগিতায় আমরা এগিয়ে চলেছি। পাশে থাকুন, আমাদের সমৃদ্ধ করুন, নিজেকে আলোকিত করুন। ধন্যবাদ।

পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিদ্যালয়ের এক পণ্ডিত একবার কতগুলি নিম্নমানের নীতিকথা জাতীয় কবিতা রচনা করে বিদ্যাসাগরকে দেখান। কবিতাগুলি পড়ে বিদ্যাসাগর বিরক্ত হন। কেমন লাগল কবিতাগুলি ? সেই পণ্ডিতের প্রশ্ন শুনে কবিতাগুলির শেষে রসিকতা করে বিদ্যাসাগর লিখে দিলেন,
“জেনে রেখে এ জগতে সকলেই গরু
যে যারে ঠেকাতে পারে সেই তার গুরু।”
এই দু লাইন পড়ে সেই পণ্ডিত বুঝে গেলেন কবিতাগুলি সম্পর্কে-বিদ্যাসাগরের মনোভাব।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন অত্যন্ত ভোজন রসিক। খেতে এবং খাওয়াতে তিনি
সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন। সংস্থার সভ্য ছিল তা প্ৰায় জনাদশেক। কী কাজ ছিল এই সংস্থার ? ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে হঠাৎ দল বেঁধে গিয়ে এই সংস্থার সভ্যরা খেতে চাইতেন। এদের এই সংস্থার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল ঘনিষ্ঠ মহলে। তাই প্রত্যেকেই সদা প্ৰস্তুত থাকতেন — এই বুঝি এল ভোজনসভার সভ্যরা!
একবার ঘটল এক কান্ড। কী কান্ড ? ভোজনসভার সভ্যরা দল বেঁধে এক বন্ধুর বাড়িতে বেশ ঘটা করে খাওয়া দাওয়া করলেন। খাওয়া-দাওয়ার পরের দিন সংস্থার এক সভ্যোর অসুখ হল। পেটের অসুখ। বেশ কয়েকদিন তার দেখা নেই। কিছুদিন পর সুস্থ হয়ে সভ্যটি এলেন ভোজনসভার বন্ধুদের কাছে। বন্ধুরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাসা করতে লাগলেন। তার উদ্দেশ্যে সবাই বললেন, এ বড়ো পেট-রোগা! ভোজনসভার সভ্য হওয়ার উপযুক্ত নয়। একে সংস্থা থেকে বাদ দেওয়া উচিত।
এতক্ষণ চুপ ছিলেন বিদ্যাসাগরমশাই। এবার তিনি মুখ খুললেন। হাসতে হাসতে বললেন, “না হে না, তোমরা ঠিক বলছো না, ওই তো আমাদের মধ্যে একমাত্র সভ্য যে আদর্শের জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে উদ্যত । ওকে ভোজনসভা থেকে কোনো মতেই বাদ দেওয়া যায় না।’
বিদ্যাসাগরের রসিকতা শুনে সবাই হাে-হাে করে হেসে উঠলেন।

সে সময় শান্তিনিকেতনের গ্রন্থাগারের দায়িত্বে ছিলেন রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখােপাধ্যায়। তিনি রাতে বাড়িতে গিয়ে পড়ার জন্য প্রতিদিন গ্রন্থাগার থেকে অনেকগুলাে বই বােঝাই করে নিয়ে ফিরতেন।
এমনই এক সন্ধ্যায় তিনি বেশকয়েকটা পছন্দের বই সঙ্গে নিয়ে গ্রন্থাগার থেকে বাড়ি ফিরছেন। এমন সময় রবীন্দ্রনাথ তাকে দেখতে পেয়ে ডাকলেন, 'ওহে বৈবাহিক, শুনে যাও দেখি একবার।
রবীন্দ্রনাথের মুখে এই কথা শুনে অবাক প্রভাতকুমার! কেন গুরুদেব এমন বললেন!-- এ কথা ভাবতে ভাবতে রবীন্দ্রনাথের সামনে এসে তিনি বললেন, ' গুরুদেব, আপনি আমাকে কেন বৈবাহিক বলছেন?’
রসিক রবীন্দ্রনাথ হেসে বললেন, “আরে, তুমি সেই বৈবাহিক নয়, তুমি বই বয়ে নিয়ে যাচ্ছে বলে আমি তােমাকে বই-বাহিক বলে ডাকছি। বুঝলে?”
এ কথা শুনে হেসে ফেললেন প্রভাতকুমার।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com