সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label সরদার ফজলুল করিম. Show all posts
Showing posts with label সরদার ফজলুল করিম. Show all posts

জীবন জয়ী হবে - শান্তনু মজুমদার

জীবন জয়ী হবে - শান্তনু মজুমদার জীবন জয়ী হবে - শান্তনু মজুমদার

সরদার ফজলুল করিম শান্তনু মজুমদারদের ক্লাসে তাদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ''প্লেটোকে বুঝতে গেলে অন্য যে-গ্রন্থ পড়তে হবে তার নাম 'জীবন', আর লেখকের নাম 'জীবন দত্ত'।'' গুরুর সাক্ষাৎকার যখন শিষ্য নিচ্ছেন তখন সেই গ্রন্থের নাম হচ্ছে 'জীবন জয়ী হবে'। সরদার ফজলুল করিম জীবনবাদী, সরল অর্থে আশাবাদী; এক রাশ হতাশার চিত্রপট তার সামনে মেলে ধরলেও, তিনি সেগুলোকে এক ঝটকায় গুছিয়ে-উল্টে রেখে ঘোষণা দিয়ে বলেন, 'জীবন জয়ী হবে'। 'জীবন জয়ী হবে' গ্রন্থটির সঙ্গে 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ' গ্রন্থটির খানিকটা মিল আছে। মিলটা কেবল এই কারণে নয় যে দুই গ্রন্থেই সরদার ফজলুল করিম আছেন, বরং গ্রন্থ দুইটির ফরম্যাটেও সাদৃশ্য রয়েছে। দুটি গ্রন্থেই দেখা গেছে কথোপকথনের প্রসঙ্গানুসারে আলোচনাকে কয়েকটি চ্যাপ্টারে বিভক্ত করে তার একটি শিরোনাম দেয়া হয়েছে। সঙ্গে ঐদিনের তারিখ, যেদিন ঐ চ্যাপ্টারের অংশটি নিয়ে গুরু-শিষ্য আলোচনায় বসেছিলেন। আর দুই গ্রন্থেই প্রশ্ন লিখে কোলন দিয়ে এবং উত্তর লিখে কোলন দিয়ে উপস্থাপনের প্রথাগত মেকানিকাল কায়দাকে এড়িয়ে বর্ণনাধর্মী কেতাকে গ্রহণ করা হয়েছে। কখনো কখনো কোন একটি নির্দিষ্ট দিনের আলোচনা শুরুর আগে একটি ছোট্ট ভূমিকা বা ঐদিনের প্রসঙ্গের প্রেক্ষাপট বর্ণনার মাধ্যমে আলোচনা শুরু করা হয়েছে। গুরুর (সাক্ষাৎকারপ্রদানকারীর) উত্তর পাবার পরে আবার বর্ণনার ঢঙে কিছু বলে নতুন প্রশ্নে যাওয়ার মাধ্যমে সাক্ষাৎকারের কাঠামোকে ভেঙ্গে মনোগ্রাহী করে তোলার প্রচেষ্টা দুই গ্রন্থেই দেখা যায়। শান্তনু কী জিজ্ঞেস করলেন আর সরদার সেপ্রসঙ্গে কী বললেন? শিরোনামগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় 'প্লেটো আর মার্কসে দ্বন্দ্ব নেই', 'ব্যক্তির হতাশা থেকে হতাশার মহামারি হয়', 'তোমরা কি পাকিস্তানিজমকে পরিত্যাগ করেছো!', 'বুশ অপরাজেয় নয়', 'শুধু বাপের ঋণ শোধ করতে চাই', 'আমি মৃত্যুর জিকির করি না' ইত্যাদি চমকপ্রদ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরদার বলেছেন। আরও বলেছেন শৈশবের কথা, ঢাকায় আসা, কমিউনিস্ট হওয়া, জেল খাটা, যুদ্ধের সময়েও বাংলা একাডেমীর চাকরি চালিয়ে যাওয়াসহ নানা প্রসঙ্গ। শান্তনু একটি কৌতূহলোদ্দীপক প্রসঙ্গে স্যারকে ধরেন: আপনি আন্ডারগ্রাউন্ড কমিউনিস্ট, আবার আপনি প্লেটো নিয়ে মাতামাতি করছেন। শান্তনুর প্রশ্ন: "প্লেটো যেখানে সামাজিক বিভক্তি টিকিয়ে রাখতে চান, মার্কস সেখানে বিভক্তি দেয়াল তুলে ফেলে শ্রেণীহীন শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেন। এ দুটো সম্পূর্ণ বিপরীত মতাদর্শকে আপনি কীভাবে নিজের মধ্যে লালন করেন?" স্যার বলেন: "প্লেটোর এত সরল পাঠ করেছো দেখে অবাক হচ্ছি। বর্বরকে আমি কেমন করে প্লেটো বোঝাবো?" আক্রমণের মাধ্যমে সরদার প্রসঙ্গ এড়াতে চান। কিন্তু শান্তনু ছাড়েন না: "বর্বরকে আপনিই জ্ঞানদান করুন"। চাপাচাপিতে সরদার ঝেড়ে কাশেন: "আমি মনে করি যে প্লেটো আর মার্কসের মধ্যে কোনো কন্ট্রাডিকশন নেই। একটা সাধারণ কন্ট্রাডিকশন আছে। তা হলো প্লেটো আইডিয়ালিস্ট আর মার্কস হচ্ছেন রিয়ালিস্ট। ... মার্কস প্লেটোকে পৃথিবীর সবচেয়ে আইডিয়ালিস্ট ফিলোসফার মনে করেন। ... দু'জনের মধ্যে সময়গত ব্যবধানটা খেয়াল রেখো। ... প্লেটো যখন বলেন যে যার যা করা উচিত তা করাই হচ্ছে জাস্টিস -- এগুলোতো মহা অমূল্য কথা। এগুলো আর কোথায় পাবা! মার্কসীয় দর্শনে আকৃষ্ট একজন লোক হয়েও এগুলোকে ধারণ করায় আমার কোনো অসুবিধা হয় না। ... একটা বিষয়কে অন্যটি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখাটা মার্কসিজম আমাকে শেখায় নাই। ফাইটটা হচ্ছে আইডিয়ালিজম এবং মেটেরিয়ালিজমের মধ্যে। ... অ্যারিস্টটল এ দু'য়ের মধ্যে একটা মিক্স-আপ করার চেষ্টা করেছেন।" (পৃ ৪৫-৪৬) শান্তনু এই উত্তরে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হন না, হওয়া একটু কঠিনও বটে। যাক, সরদার দুই মনীষীকে একইসঙ্গে ধারণ করতে পেরেছেন, মতাদর্শিক সমস্যা থাকলেও, দু'জনেই গ্রেট। দু'জনকেই লালন করে সরদারও গ্রেট হয়েছেন, বুদ্ধির আকালে সরদার তো আমাদের কাছে গ্রেটই। কমিউনিজমের দুষ্কালে কমিউনিজম সম্পর্কে সরদার যা বলছেন তাও গ্রেট উক্তি: "কতকগুলো পার্টি গড়ে উঠলো বা ভেঙ্গে পড়লো তার সাথে কমিউনিস্ট থাকা না-থাকার ব্যাপারটা জড়িত থাকতে পারে বলে আমি মনে করি না। একজন কমিউনিস্ট তার বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গীর ভিত্তিতেই কমিউনিস্ট। অর্গানাইজেশন নিশ্চয় সাহায্য করে। যাদের মধ্যে খানিক আগ্রহ আছে, পার্টি তাদেরকে আরো বেশি আগ্রহী করে তুলতে পারে। ... ডাকাত জীবন নেয় আর ডাক্তার জীবন রা করে। ডাক্তার ব্যর্থ হতে পারে তাই বলে তাকে ফাঁসি দেয়া হয় না।" (পৃ ৪৭-৪৮) সরদারের আশাবাদিতা দেখলে অবাক হতে হয়। যখন বুশের বাহিনী ইরাকে সাধারণ মানুষ হত্যা করছে আর সন্ত্রাসীদের হাতে মরছে বাংলাদেশের নাগরিক তখনও সরদার বলেন: "কোথায় মৃত্যু দেখলে? আমি তো জীবন ছাড়া আর কিছু দেখি না। গোর্কির কথাই আমাদের জীবন দর্শন হোক -- 'মানুষ ছাড়া আর কোনো দেবতা নাই'। ... আমরা তো রোজই মরছি। কিন্তু বুশ একথাটা বুঝতে চাচ্ছে না যে আমাদেরকে মেরে শেষ করতে পারবে না। ব্যক্তি মানুষকে মারতে পারে, কিন্তু প্রজাতি মানুষকে কি মেরে শেষ করতে পারবে?'' শান্তনুকে বরং তিনি উল্টো বকে দেন: "কোনো দায়িত্ব নেবো না, কেবল আমি ভোগই করবো, সারাক্ষণ খালি অন্যকে দোষী করবো এবং চারিদিকে আশা ছড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও হতাশায় ভেসে যাবে -- এটা হয় না। ... বুশকে ধন্যবাদ এজন্য যে সে সারা পৃথিবীকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে, একটা তার ভাগ একটা আমার ভাগ। আমি নিশ্চিত যে তার ভাগের তুলনায় আমার ভাগ অনেক বেশি শক্তিশালী। এই মূর্খ তা বুঝতে পারছে বলেই ভয় পাচ্ছে।" (পৃ ৫০-৫১) জীবন জয়ী হবে: সরদার ফজলুল করিমের সাথে কথোপকথন। শান্তনু মজুমদার।
Download and Join our Facebook Group
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

আমার স্মৃতিতে অজিতদা সরদার ফজলুল করিম

amarboi.com


আমার স্মৃতিতে অজিতদা
সরদার ফজলুল করিম




উনিশশো বায়ান্ন সাল। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের দোতলায় ভাষা আন্দোলনের আমরা কতিপয় বন্দি দীর্ঘ কারাবাসের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। মাস কটি মনে নেই, সম্ভবত হেমন্তের শুরু। শীতের একটু ছোঁয়া লাগছিল, একটু মনে পড়ে। আমাদের ওয়ার্ড অনেকটা ফাঁকা অনেকেই ছাড়া পেয়েছেন। বৈকালিক চায়ের পর্ব শেষে ওয়ার্ডের সামনে প্রশস্ত মাঠে সবাই পায়চারি করছিলাম। হঠাৎ দেখা গেল, রাজবন্দিদের কাজে নিয়োজিত সিপাই কাদের কিছু বই ও অন্যান্য জিনিসপত্র বগলদাবা করে আমাদের ওয়ার্ডের দিকে আসছে। আহাদ ভাই (অলি আহাদ) ও চা (নারায়ণগঞ্জের খান সাহেব ওসমান আলী, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য) এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কাদের, কে আসছেন?” কাদের জানাল যে, দিনাজপুর জেল থেকে তিনজন রাজবন্দি এসেছে। কারা এসেছেন, তা বলার প্রয়োজন হলো না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের প্রবেশদ্বার পার হয়ে ওঁরা ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে আসতে লাগলেন। সকলেরই পরনে জেলখানার দেয়া কোরা কাপড়ের পাজামা ও হাফ শার্ট এবং বেঢপ স্যান্ডেল। যিনি সকলের আগে রয়েছেন, তাঁর গায়ে একখানা হালকা গরম চাদর আলতোভাবে জড়ানো। ফরসা, সুন্দর চেহারা, নিটোল গড়ন। বাকি দুজন বেশ স্বাস্থ্যবান, একজন উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, অপরজন কালো। পরিচিতদের সঙ্গে করর্মদন ও কুশল বিনিময় হলো। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে এঁদের সবাইকে দেখছিলাম। অধ্যাপক অজিত কুমার গুহ, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরীর নাম আগেই শুনেছি, দেখিনি কখনো। তাই অনেকটা কৌতূহল নিয়ে তাঁদের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই ছটার ঘণ্টা বাজল। লক-আপের সময় হয়েছে। আমরা সবাই সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম। দরজায় তালা পড়ল। পরদিন ভোর ছটায় খোলা হবে। 
খোন্দকার মোশতাক আহমদ (সাবেক রাষ্ট্রপতি), খান ওসমান আলী, টাঙ্গাইলের জনাব শামসুল হক (পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক), জনাব মোহাম্মদ তোয়াহা, জনাব অলি আহাদ, জনাব হাশিমুদ্দীন, জনাব কাজী গোলাম মাহবুব এবং জনাব আবদুল মতিনসহ আমরা আটজন তখন পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। আমাদের সঙ্গে আরো তিনজন এসে যোগ দিলেন। বাকি দিনগুলো ভালোই কাটবে মনে হলো। রাতে অজিতবাবু একবার আমার পরিচয় জেনে নিলেন। বললাম, আমি ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র। 
সে রাতে আমার ভালো ঘুম হয়নি। মনে একটা মস্ত বড় আশার আলো ঝিলিক দিল। সামনের মার্চ মাসে ফাইনাল পরীক্ষা। আমার কাছে তেমন কোনো বইপত্র নেই এবং পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে কলেজে আমার ভালো পরিচয়ও হয়নি। আমার পাঠ্যতালিকার অনেক বইয়ের চেহারা আমি তখন পর্যন্ত দেখিনি। কাজেই জেলে এসে শিক্ষাজীবনের একটি বছর যে নির্ঘাত এমনিতেই খসে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে প্রায় নিশ্চিত। নোয়াখালী জেলায় চৌমুহনী কলেজে আইএ পড়া অবস্থায় ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছি। পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলাম এবং একটি বামপন্থি দলের (আরএসপি) সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলাম। নোয়াখালী জেলে তিন মাস আটক রাখার পর আমাকে ঢাকা জেলে স্থানান্তর করা হয়। আমাকে বইপত্র জোগাড় করে দেয়ার মতো এই শহরে তেমন কেউ ছিলেন না। জেলে পড়াবার মতো কোনো শিক্ষকও ছিলেন না। বাইরে থাকতে ক্লাস তো তেমন একটা করতাম না। তাছাড়া কলেজে ভর্তি হয়েছি অনেক দেরিতে। মাস তিনেক ক্লাস করার পরই ভাষা আন্দোলন  শুরু হয়।
পরদিন ভোরে চা-নাশতার পর্ব শেষে অজিতবাবু এসে আমার খাটে বসলেন। আমার আর আহাদ ভাইয়ের খাট ছিল পাশাপাশি। নিয়ম ছিল প্রতিটি জানালার কাছে লম্বালম্বিভাবে দুখানা করে খাট পাততে হবে। অবশ্য লোক বেশি হলে মাঝখানেও খাট পড়ত  হাসপাতালে যেমনটি হয়। অজিতবাবু জানতে চাইলেন, আমার পড়াশোনার কি অবস্থা, পরীক্ষার প্রস্তুতি কদ্দূর ইত্যাদি। সব বললাম। আমার কথা ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। সব শুনে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। এরপর জানতে চাইলেন আমার সাবজেক্ট। বাংলা বিশেষ পত্র নিয়েছি শুনে অত্যন্ত খুশি হলেন। রুটিন তৈরি করলেন। তিনি বাংলা এবং লজিক পড়াবেন, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ইংরেজি এবং অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী সিভিক্স।   ইকনম্কিস পড়াবেন তোয়াহা ভাই ও আহাদ ভাই। জেল থেকে পরীক্ষা দেয়ার অনুমতি চেয়ে আমাকে দিয়ে দরখান্ত লিখিয়ে পরীক্ষাসমূহের কন্ট্রোলারের কাছে পাঠালেন। ঢাকা  শহরে তাঁর সহকর্মীদের কাছে আমার পাঠ্যবইয়ের তালিকা পাঠালেন। তাঁদের বললেন, ওই বইগুলো কিনে জেল গেটে তাঁর নামে জমা দিতে। নিজের টাকায় অনেক এক্সারসাইজ খাতা আমার জন্য কিনলেন। আমার খাট সরিয়ে আলাদা করে দিলেন। একটা জালানার ধারে আমি একা  পড়াশোনায় যেন ব্যাঘাত না হয়। নিজের খাট পাতলেন পাঁচ-ছয় হাত দূরে, এক কোণে। সর্বক্ষণ যেন আমার ওপর নজর রাখতে পারেন, সে ব্যবস্থা হলো। পড়ার সময়সূচি তৈরি হলো। সকালে নাশতার পর বেলা সাড়ে বারোটা পর্যন্ত অজিত-দা পড়াবেন। মধ্যাহ্নভোজের পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম। তারপর এক ঘণ্টা মোজাফফর স্যার সিভিক্স পড়াবেন, এক ঘণ্টা মুনীর ভাই ইংরেজি সাহিত্য পড়াবেন। রাতে আমি নিজে পড়ব। রাত দশটায় অবশ্যই বিছানায় যেতে হবে। 
অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের সুদীর্ঘ আড্ডার অবসান ঘটল। এতদিন আমাদের জীবনযাত্রা ছিল অন্যরকম। সকালে নাশতার পরে তাস, ক্যারম বোর্ড অথবা দাবা নিয়ে বসে পড়তাম। আমাদের আড্ডাবাজি দেখে মওলানা সাহেবও (মওলানা ভাসানী) একদিন বিরক্ত হয়ে আমাকে লক্ষ্য করে জোর বকুনি দিয়েছিলেন, “লেখা নাই, পড়া নাই, সারাদিন আড্ডা। পরীক্ষায় ফেল মারবা শেষে বাপমায় দোষ দিব মওলানা ভাসানীর।” কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের ওয়ার্ড ক্লাসরুমে পরিণত হলো। সবাই বই নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেন। মুশতাক ভাই আইন পরীক্ষা দেবেন। তিনি মোজাফফর স্যারের কাছে রোমান ল পড়তে আরম্ভ করলেন। হ্যারল্ড লাসকির অ এৎধসসধৎ ড়ভ ঢ়ড়ষরঃরপং নিয়ে আহাদ ভাই তাতে ডুবে গেলেন, মাঝে মাঝে মোজাফফর স্যারের সঙ্গে এ নিয়ে বসেন। মাহবুব ভাইও বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে কিছু বই নিয়ে পড়তে লাগলেন। মুনীর ভাই বাংলায় এমএ পরীক্ষা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অজিত  দা এর মধ্যে সময় করে আবার মুনীর ভাইকেও পড়াশোনায় সাহায্য করেন। মুনীর ভাইকে বাংলায় এমএ পরীক্ষা দেয়ার জন্য অজিত-দাই উৎসাহিত করেছেন। দিনাজপুর জেলে থাকার সময়ে এ ব্যাপারে মুনীর ভাই মনস্থির করে প্রাথমিক প্রস্তুতি নেন। ঢাকা জেলে ফিরে আসার পর বইপত্র জোগাড় করে পূর্ণোদ্যমে পড়াশোনা শুরু করেন। নিজের পড়াশোনার মাঝে আমার জন্য এক ঘণ্টা ব্যয় করতেন। আবার রাতে আহাদ ভাই ও মতিন ভাইকে মাঝে মাঝে শেক্সপীয়র পড়ে শোনাতেন।
অজিত-দা ভোর চারটায় বিছানা ছেড়ে উঠে পড়তেন। এ সময়টা তিনি পড়াশোনা করতেন। তিনি বলতেন, ওই সময় একবার যা পড়েন, তা সহজেই মনে থাকে। পরবর্তী জীবনেও আমি দেখেছি, তিনি এই অভ্যাস ত্যাগ করেননি।
আমাকে পড়ানো এবং আমার পড়ার তদারকি ছাড়াও আমাদের সকলের খাওয়া-দাওয়ার তদারকির ভার তিনিই নিলেন। আমাদের ওয়ার্ডে একটা স্টোভ আনিয়ে নিলেন। রান্না হতো অনেক দূরে যেখানে আমাদের কারো যাওয়া সম্ভব ছিল না এবং অনুমতিও ছিল না। কিন্তু প্রতিদিন বাজার এলেই আমাদের ওয়ার্ডের একজন ফালতু (জেলখানায় ফাইফরমাস খাটার জন্য নিযুক্ত কয়েদি) রান্নাঘরে গিয়ে খবর নিয়ে আসত কি বাজার এসেছে। ভালো মাছ বা মুরগি হলে অজিত-দা তা ওয়ার্ডে আনিয়ে দিয়ে নিজেই রান্না করতেন। এজন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত মসলাপাতি নিজের টাকায় কিনতেন। নিজের টাকায় ঘি, ময়দা, ডিম, মাংস ইত্যাদি কিনে এনে ওয়ার্ডে পরোটা, মাংস, সিঙ্গাড়া ইত্যাদি তৈরি করে সবাইকে খাওয়াতেন। কারো হয়ত পেটের অসুখ(জেলখানায় অধিকাংশ রাজবন্দিই এই অসুখে ভুগতেন) করেছে। তার জন্য আলাদা রান্না করতেন নিজ হাতে। এ ধরনের রোগীর জন্য তিনি সাধারণত পেঁপের স্টু রান্না করতেন। তা এতই সুস্বাদু ও মুখরোচক হতো যে অন্যেরা নিজেদের ভালো ভালো খাবার ফেলে রোগীর খাবারের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়তেন।
সকালেই এই পেটের ক্ষুধা মিটানো ছাড়াও প্রতিদিন আমার জন্য আলাদা মুখরোচক গুলি তৈরি করতেন। সেটা ছিল আমার পরীক্ষার ক্ষুধা মিটানোর  জন্য। মাস চারেক সময় আছে। দু’বছরের সকল পড়া এই অল্প সময়ে পড়িয়ে একজনকে পরীক্ষার জন্য তৈরি করে দেয়া রীতিমতো দুঃসাধ্য কাজ। সেই দুঃসাধ্য তিনি সাধন করলেন। জেলখানায় অফুরন্ত সময়। তার প্রায় সবটাই ব্যয় করতেন আমার পেছনে-যতদিন আমি ছিলাম। সাহিত্য পড়াতে গিয়ে নানা উদ্ধৃতি দিতেন। রবীন্দ্রনাথের মানসী আমাদের পাঠ্য ছিল। ‘মেঘদূত’ কবিতা পড়াবার সময়ে এমন তন্ময় হয়ে যেতেন, মনে হতো, মেঘের পাখায় ভর করে পাঠক-শ্রোতা উভয়েই উড়ে চলেছেন। উজ্জয়িনী, শিপ্রা নদী, সানুমান আম্রকুট, বিন্ধ্যপদমূলের রেবা নদী, দশার্ণ গ্রাম ইত্যাদির যে কাব্যিক বর্ণনা দিতেন তা শুনতে শুনতে এক সময়ে নিজেরই অজান্তে মন উড়ে যেত অলকায়। ‘মেঘদূত’ কবিতা পড়াতে গিয়ে তিনি প্রায়ই কালিদাস থেকে উদ্ধৃতি দিতেন ‘কশ্চিৎ 
কান্তাবিরহগুরুণা স্বাধিকারপ্রমত্ত....।’ ‘মন্দাক্রান্ত ছন্দ’ বোঝাতেন। আবার সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের অনুবাদও মাঝে মাঝে আবৃত্তি করতেন :
পিঙ্গল বিহ্বল ব্যথিত নভতল, কই গো কই মেঘ উদয় হও,
সন্ধ্যার তন্দ্রার মুরতি ধরি আজ মন্দ্র-মন্থর রচন কও।
কালিদাস ছিলেন তাঁর অত্যন্ত প্রিয় কবি। পরবর্তীকালে তিনি ফয়জুন্নেসা বেগমের সঙ্গে কালিদাসের ‘মেঘদূত’  এর যৌথ অনুবাদ প্রকাশ করেন।
একদিন ছোটগল্প সম্পর্কে আমাকে নোট দিচ্ছেন। এক জায়গায় এসে রবীন্দ্রনাথের ‘দুরাশা’ গল্প থেকে একটা উদ্ধৃতি দিলেন। ভুটিয়া পল্লীতে ভুটিয়া স্ত্রী ও পৌত্রপৌত্রী নিয়ে শস্যসংগ্রহরত কেশরলালকে দেখে বদ্রাওনের নবাবপুত্রীর আক্ষেপ, “হায় ব্রাহ্মণ, তুমি তো আমার তোমার এক অভ্যাসের পরিবর্তে আর এক অভ্যাস লাভ করিয়াছ, আমি আমার এক যৌবন এক জীবনের পরিবর্তে আর এক জীবন যৌবন কোথাও ফিরিয়া পাইব” এ গল্পটি তখন পর্যন্ত আমার পড়া ছিল না। সে রাতেই ‘দুরাশা’ গল্পটি আমি বিছানায় শুয়ে পড়তে শুরু করি। অজিত-দা রাত জাগতেন না। দশটায় শুয়ে পড়তেন। দাদা আমাকে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। আমি বিছানার কাছাকাছি টেবিলে হ্যারিকেন রেখে অজিত-দা যে দিকটায় থাকতেন সে দিকটা বইখাতা দিয়ে আড়াল করে দিই। তারপর কাগজ দিয়ে একটা চোঙ বানিয়ে মশারির ভেতর আলো ফেলে অনেকটা প্রজেক্টরের আলো প্রক্ষেপণের মতো ব্যবস্থা করে গোপনে রাত জেগে গল্পটা পড়ে নিলাম। ভাবলাম অজিত-দা ঘুমিয়ে পড়েছেন   কাজেই চিন্তার কোনো কারণ নেই। পরদিন সকালবেলা যথারীতি প্রাতঃরাশ সেরে দাদার খাটের কাছে চেয়ার টেনে পড়তে বসলাম। দাদা কোনো কথা বলছেন না মুখ ভার। আমি মাথা নিচু করে বসে আছি। জিজ্ঞেস করলেন, “কাল কত রাত অবধি জেগেছো?” আমি বললাম, “বেশি না, আপনি ঘুমানোর কিছুক্ষণ পরই ঘুমিয়ে পড়েছি।” “মিথ্যা বলছো কেন, আমি মশারির ভেতর থেকে সব দেখেছি। তুমি মশারির ভেতর আলো ফেলে অনেক রাত অবধি বই পড়েছো। এখন যদি রাত জেগে শরীর খারাপ করো, পরীক্ষা দেবে কেমন করে?” কিছুক্ষণ বকাঝকা করে তারপর শুরু হলো পড়াশোনা।

You can follow us on Twitter or join our Facebook fanpage to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature.
Download Bangla books in pdf form mediafire.com and also read it online. Read it from iPad, iPhone. Ajit Da - Sardar Fajlul Karim, bangla ebooks, free download , mediafire , humayun ahmed , zafar iqbal , sunil gangopadhaya , suchitra , bengali ebooks, free bangla books online, ebooks bangla, bangla pdf, bangla books, boi, bangla boi, amarboi.
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com