সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label Pratibha Basu. Show all posts
Showing posts with label Pratibha Basu. Show all posts

মহাভারতের মহারণ্যে - প্রতিভা বসু [১৬]

amarboi
মহাভারতের মহারণ্যে
প্রতিভা বসু

১৬

অগত্যা যেতেই হলো বিদুরকে। ইন্দ্রপ্রস্থে পৌঁছে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, ‘ধৃতরাষ্ট্র পাশাক্রীড়াচারীদের সম্মেলন ডেকেছেন। তুমি সেই ধূর্ত পাশাক্রীড়াচারীদের দেখবে। আমি ধৃতরাষ্ট্রের আজ্ঞাবাহী হয়েই এসেছি। নিবৃত্ত করতে অনেক চেষ্টা করেছিলাম। তত্রাচ আমাকে এখানে পাঠানো হয়েছে। এখন তুমি যা শ্রেয়স্কর মনে করো, তাই করো।’

যুধিষ্ঠির বললেন, ‘দুর্যোধন ব্যতীত আর কোন কোন অক্ষবিদ সেখানে আছেন বলুন, আমি তাদের শতবার পরাজিত করবো।’

বিদুর বললেন, ‘অক্ষনিপুণ পাকাহাত শকুনি, বিবিংশতি, চিত্রসেন, রাজা সত্যব্রত, জয়, এঁরা সব সেখানে উপস্থিত হয়েছেন।’

বিদুরের অনিচ্ছা বুঝেও যুধিষ্ঠির যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন। দ্রৌপদী প্রভৃতি স্ত্রীগণসহ, ভ্রাতাগণসহ, অনুচরসহচরবর্গভিব্যাহারে বেশ জাঁকজমক করেই হস্তিনাপুরে এলেন। সেই রাত্রি সুখে যাপন করে পরের দিন সভামণ্ডপে প্রবেশ করলে শকুনি বললেন, ‘এই সভামধ্যে সকলেই তোমার প্রতীক্ষা করছেন। দ্যূতক্রীড়া আরম্ভ করা যাক।’

যুধিষ্ঠির আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বললেন, ‘দ্যাখো, কপট দ্যূতক্রীড়া অতি পাপজনক। এতে অণুমাত্র ক্ষাত্রপরাক্রম নেই। তুমি কী কারণে পাশাক্রীড়ার প্রশংসা করছো?’ একথা শুনে শকুনি অবশ্যই অবাক হয়েছিলেন। কেননা তিনি তো পাশাক্রীড়ার প্রশংসা করেননি। কিন্তু কিছু জবাব দেবার পূর্বেই যুধিষ্ঠির পুনরায় বললেন, ‘ধূর্ত কপটাচারীকে কেউ বিশ্বাস করে না।’ শকুনি কবে তাঁর সঙ্গে পাশা খেলেছেন যে ধূর্তকপটাচার করবেন? তারপরেই বললেন, ‘তুমি যেন নৃশংসের মতো অসৎপথ অবলম্বন করে আমাদের পরাজিত করো না।’

সভাগৃহে প্রবেশ করেই যুধিষ্ঠির অকারণে অভদ্রের মতো কেন এই কর্কশ উক্তিগুলো প্রায় মুখস্থের মতো বলে যাচ্ছিলেন কারোই সেটা বোধগম্য হচ্ছিলো না। দুর্যোধন কেবলমাত্র শ্রুতিগোচরে বিদুরের কথাই শুনছিলেন। যেমন জতুগৃহ তৈরি হলে তা কী কারণে বহ্নিযোগ্য গৃহে প্রবিষ্ট হয়েই ভীমকে বলেছিলেন, এই বক্তৃতাও অনেকটা সেই রকম। আবার বললেন, ‘আর্যলোকেরা মুখে ম্লেচ্ছভাষা ব্যবহার ও কপটাচার প্রদর্শন করেন না।’ যদিও সেই সভায় এ পর্যন্ত কোনো রাজাই কোনো কথা বলেননি। তদ্ব্যতীত, ম্লেচ্ছভাষা যুধিষ্ঠির ব্যতীত আর কোনো ক্ষত্রিয় অবগতও নন। রাজসূয় যজ্ঞ করে সম্রাট হয়ে তিনি কি ভারসাম্য হারিয়েছেন? যুধিষ্ঠির বলেই যাচ্ছিলেন, কোনো জবাবের সময়ও দিচ্ছিলেন না, ‘শোনো, অপকট যুদ্ধই সৎপুরুষের লক্ষণ। আমি শঠতা করে সুখ ও ধনপ্রাপ্তির ইচ্ছা করি না।’ অর্থাৎ যা করে তিনি রাজসূয় যজ্ঞ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছেন।

আশ্চর্য! এই তো কদিন পূর্বে তিনিই তাঁর ভ্রাতাদের এবং কৃষ্ণকে জরাসন্ধের অন্তঃপুরে পাঠিয়ে কোনো পূজানিবন্ধনে উপবাসী, অসতর্ক জরাসন্ধকে অসহায় পেয়ে কপটযুদ্ধে খুন করালেন! এসব বলতে তাঁর কি একটু লজ্জাও হলো না? তিনি তাঁর স্বীয় লোভ চরিতার্থ করতে ভ্রাতাদের দিয়ে একটি ঘটনাও কি সৎভাবে সম্পন্ন করেছেন? জরাসন্ধকে গভীর রাত্রে একা পেয়ে এভাবে হত্যা করার প্রস্তাবটা অবশ্য কৃষ্ণই দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে তিনি সম্মতি দিলেন কেন? ব্রাহ্মণ সেজে যাওয়াতে জরাসন্ধর নিকট তাঁরা অতি সাদর সম্ভাষণ ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তিনি কল্পনাও করেননি নিতান্ত অধঃপতিত ইতর ব্যক্তি ব্যতীত কোনো ক্ষত্রিয় সন্তান এরকম কাপুরুষসুলভ কপটাচার করতে পারে। আর কীভাবে শিশুপালকে খুন করা হলো! সেটা ভাবতেও দেহ কণ্টকিত হয়।

শকুনি দুর্যোধনের মাতুল, গান্ধারীর ভ্রাতা। সেকালের নিয়ম অনুযায়ী তিনি কুটুম্বিতা সূত্রে যুধিষ্ঠিরের মাতুল। যদি কোনো বক্তব্য তাঁর থেকেই থাকে, মাতুলজ্ঞানে তাঁকে প্রথমে সম্ভাষণ জানিয়ে, অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের যথোপযুক্ত সম্ভাষণ জানিয়ে, বলতে পারতেন। মনে হচ্ছিলো, কারোকে যেন তিনি তাঁর উচ্চাসন থেকে দেখতেই পাচ্ছিলেন না। তাঁর ব্যবহারে স্পর্ধিত গর্ব যেন স্ফুলিঙ্গের মতো ছিটকে ছিটকে বেরিয়ে পড়ছিলো।

সব শুনে শকুনি বললেন, ‘তুমি যদি আমাকে ধূর্ত বলেই স্থির করে থাকো, যদি দ্যূতক্রীড়ায় ভীত হয়ে থাকো, তা হলে দ্যূতক্রীড়া থেকে বিরত হওয়াই ভালো।’

যুধিষ্ঠির বিরত হলেন না। শুরু হলো খেলা এবং একটু বাদেই বোঝা গেলো শকুনি প্রকৃতই দক্ষ খেলোয়াড়। কিন্তু যেহেতু যুধিষ্ঠির সমানেই হারতে লাগলেন, মহাভারতের ভাষ্যে শকুনি সর্বদাই ‘‘শঠতা’’ করে তাঁকে হারালেন। যুধিষ্ঠিরের মতো অক্ষবিদ্যায় অনিপুণ ব্যক্তিকে সৌবলের মতো সর্বজনস্বীকৃত দক্ষ এবং অভিজ্ঞ খেলোয়াড় শঠতা বা ধূর্ততা করে কেন হারাবেন? এখানেও সেই প্রচারের মহিমা। রচয়িতা বলেই খালাস, ‘শকুনি শঠতা অবলম্বন করে পাশা খেলে বললেন, ‘‘এই জিতলাম’’।’ আর তার সঙ্গে শুরু হলো বিদুরের অকথ্য ভাষায় দুর্যোধনকে আক্রমণ। তিনি পুনরায় বললেন, ‘পূর্বে যে পাপাত্মা জাতমাত্রই গোমায়ুর মতো বিকৃতস্বরে রোদন করেছিলো, সেই কুলান্তক দুর্যোধন সকলের বিনাশের কারণ তাতে সন্দেহ নেই।’

এখানে একটা কথা বিশেষভাবে অনুধাবনযোগ্য, দুর্যোধনের জন্য হস্তিনাপুরীর কোনো বিনাশই হয়নি। হবেও না। দুর্যোধন না বাঁচলে ধৃতরাষ্ট্রকে হত্যা করতে এদের সময় লাগতো না। যার জন্য এই বিনাশের আশঙ্কা, তিনি যুধিষ্ঠির। দুর্যোধন সাগরাম্বরা পৃথিবীর একজন অদ্বিতীয় শাসক বলে স্বীকৃত। রাজা হয়ে তো তিনি পিতৃরাজ্য আলোকিত করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, বিনাশের কারণ যুধিষ্ঠিরও নয়, বিদুর নিজে, এবং তাকে প্রলম্বিত করে ধ্বংসের মুখে নিয়ে গেছেন তাঁর পিতা দ্বৈপায়ন। সবই অবশ্য ওই একমাত্র যুধিষ্ঠিরের জন্যই। এখন সত্যবতীর কৃপায় সবাই দ্বৈপায়নের পুত্র পৌত্র। কিন্তু ক্ষেত্রজ পুত্র পৌত্র নয়, যারা অবৈধ তারাই প্রধান ভূমিকায়। এখন আর আর্য অনার্যের প্রশ্ন নেই, সবার জন্মই অনার্য, মিশ্রিত রক্তে। এখন শুধু বৈধ-অবৈধের বিবাদ। বিদুর বললেন, ‘দুরাত্মা দুর্যোধন দ্যূতমদে মত্ত হয়েছে (যদিও দুর্যোধন খেলছিলেন না)। মহারাজা, পাণ্ডবদের সঙ্গে শত্রুতা করে অচিরাৎ আপনার পুত্রের পতন হবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। মহারাজ! আপনি আদেশ দিন, সব্যসাচী অর্জুন দুর্যোধনকে বধ করবেন। এই পাপী নিহত হলে কৌরবগণ সুখী হবে। কাকশৃগালতুল্য দুর্যোধনের পরিবর্তে ময়ূরশার্দুল সদৃশ পাণ্ডবদের ক্রয় করুন।’

সমস্ত জীবন ধরে এই একই বাক্য দুর্যোধন শুনে এসেছেন বিদুরের মুখে। জ্ঞানোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখে আসছেন তাঁর জন্মদাতা পিতা এর বিরুদ্ধে একটি বাক্যও উচ্চারণ করেননি। আজ হঠাৎ দুর্যোধনের সমস্ত দুঃখবেদনা ক্রোধ অপমান অসম্মান আগুনের মতো জ্বলে উঠলো রক্তের মধ্যে। অত্যন্ত কষ্টে সংযত হয়ে বললেন, ‘হে ক্ষত্ত! সব সময়ে আমাকে অবমাননা করো কেন? তার কারণ, যারা আমাদের শত্রু তুমি তাদের প্রতি অনুরক্ত। তুমি কি ভাবো যে আমি কিছুই বুঝি না? তোমার বাক্যই কৌরবদের প্রতি তোমার মনের প্রতিফলন। তুমি আমাদের আশ্রিত হয়েও কী কারণে উক্ত বিষয়ের বিরুদ্ধ আচরণে প্রবৃত্ত হয়েছো? তুমি আমাদের তিরস্কার করতে চাও করো, কিন্তু আর তুমি এভাবে আমাকে অপমান কোরো না। আমি তোমার মন বুঝেছি, শত্রুকার্যে ব্যাপৃত থেকো না। আমি তো তোমার কাছে আমার হিত জিজ্ঞাসা করি না। তুমি আমার শাস্তা নও। শাস্তা শুধু একজনই। আমি তাঁর শাসনানুসারেই কার্য করে থাকি। তিনি মস্তক দ্বারা শৈলও ভেদ করতে পারেন, গর্ভস্থ শিশুকেও শাসন করতে পারেন। তুমি কেন বলপূর্বক আমাকে অনুশাসন করো?’

বিদুর যে তাঁদের কতো বড়ো শত্রু সেকথা ধৃতরাষ্ট্রের জ্ঞানের মধ্যে কেন যে প্রবিষ্ট হয় না ভেবে পাওয়া যায় না। স্বীয় সন্তান সম্পর্কে অবিশ্রান্ত এসব শুনতে শুনতে কখনো এক পলকের জন্যও কি তাঁর পুত্রের জন্য বিন্দুমাত্র বেদনার সঞ্চার হয় না? পাণ্ডবরা যে গোপনে গোপনে গিয়ে দ্রুপদের সঙ্গে এই সম্পর্ক পাতালো, পাঁচজনে মিলে একটি মেয়েকে বিবাহ করে ভরতকুলকে কলঙ্কিত করলো, কৌরবদের কারোকে কিছু জানালো না, মাত্রই কয়েক দিনের জন্য বারণাবতে গিয়ে এক বছরের মধ্যেও ফিরে এলো না, এ সব নিয়ে তিনি কি কিছুই চিন্তা করেন না? রাজত্বের চাকা ভীষ্মর জন্যই ঘুরছে, আর তাঁর মনের চাকা ঘোরাচ্ছেন বিদুর। তিনি বিদুরের কথারই প্রতিধ্বনি করে যখন বলেন, তিনি পাণ্ডবদের কিঞ্চিৎমাত্র কোনো দোষ দেখতে পান না, যতো দোষ ঐ দুর্যোধনের—তখন মনে হয় এইরকম একজন মূঢ়মতি মানুষ কী করে রাজার সিংহাসনে বসে আছেন। মানুষটির তো কাণ্ডজ্ঞান বলে সত্যিই কিছু নেই। পাণ্ডবরা যে তাঁকে বিচ্যুত করে ঐ সিংহাসনটিতে বসবার জন্যই এতো কাণ্ড করে বেড়াচ্ছে, এবং দুর্যোধন জীবিত আছেন বলেই যে আজও তিনি টিকে আছেন, সে কথা তাঁকে কে বোঝাবে? দুর্যোধনের যোগ্যতাতেই যেমন রাজত্বের পরিধি বেড়েছে, তেমন প্রজারাও দুর্যোধনের জন্যই সুখে আছে, শান্তিতে আছে, বিদ্রোহ নেই, এসবও কি তিনি দেখছেন না? বুঝতে পারছেন না? কোথা থেকে কোন পাঁচটি মানুষ পর্বত থেকে নেমে এসে পাণ্ডুর পুত্র সেজে তৎক্ষণাৎই ধৃতরাষ্ট্রকে উচ্ছিন্ন করতে চাইলে বিদুরের কাছে অবশ্যই দুর্যোধন প্রতিবন্ধক। অবশ্যই দুর্যোধনের মৃত্যু চান তিনি, কিন্তু ধৃতরাষ্ট্রেরও তো স্বীয় বুদ্ধিতে কিছু বোঝা উচিত ছিলো।

খেলার প্রারম্ভ থেকেই বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে এমন সব অসম্মানজনক উক্তিতে জর্জরিত করছিলেন, ধৃতরাষ্ট্র যে অতবড়ো সাম্রাজ্যের একজন অধিকমান্য মহারাজা, বিদুরের জ্যেষ্ঠ, এবং বিদুর তাঁর অর্থবহ, সে কথা মনে হচ্ছিলো না। ধৃতরাষ্ট্র তথাপি বিদুরের এই ব্যবহারে কিঞ্চিৎমাত্রও অসম্মান বোধ করছিলেন না।

খেলতে খেলতে যুধিষ্ঠির যখন সর্বস্বই হারালেন, শকুনি বললেন, ‘দ্যূতক্রীড়ায় পাণ্ডবদের সবই তুমি নষ্ট করলে। আর তোমার অপরাজিত ধন কী আছে বলো।’

যুধিষ্ঠির দাম্ভিক কণ্ঠে বললেন, ‘আমার অসংখ্য ধন আছে। ধনের কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করছো কেন? আমি অযুত পদ্ম খর্ব অর্বুদ শঙ্খ মহাপদ্ম নিখর্ব কোটি মধ্য ও পরার্ধসংখ্যক ধনদ্বারা এ সমস্ত জনসমক্ষে তোমার সঙ্গে ক্রীড়া করবো।’

আবার শুরু হলো খেলা। হিতৈষীরা বারণ করেছিলেন, যুধিষ্ঠির শোনেননি। অনুপার্জিত ধনদৌলতের গরম যুধিষ্ঠিরকে তখনো গরম করে রেখেছে। খেললে তিনি আরো যাঁরা খেলতে এসেছিলেন তাঁদের সঙ্গেও খেলতে পারতেন, কিন্তু সেখানে তাঁর দম্ভে আঘাত লাগছিলো। তাঁর জেদ তিনি শকুনির সঙ্গেই খেলবেন। সুতরাং তাঁর সঙ্গেই খেললেন এবং অবধারিতভাবে পুনরায় হেরে গেলেন। হারতে হারতে যখন নিষ্কপর্দক হলেন, তখন একজন একজন করে প্রত্যেকটি ভাইকেও বাজি রেখে হারলেন। শেষে নিজেকেও পণ রাখলেন। তাতেও যখন হারলেন, তখন দ্রৌপদীকে পণ রাখলেন। সকলে হায় হায় করে উঠলো। সমস্ত সভা তাঁর এই অধঃপতিত কর্মে অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ হলো। বৃদ্ধগণ ধিক্কার দিতে লাগলেন। তিনি কিছুই গ্রাহ্য করলেন না। এতোক্ষণ পঞ্চভ্রাতা দুর্যোধনাদিদের দাস ছিলেন এখন তাঁদের পত্নীও তাঁদের দাসী হলেন। বিদুর জন্মাবধি দুর্যোধনকে যতো অপমান করেছেন, তাঁর পুত্র হয়তো সেই ঋণ এইভাবে শোধ করলেন।

কেবলমাত্র পুত্র যুধিষ্ঠিরই তো নন, সেই সঙ্গে অন্য চারটি পাণ্ডবভ্রাতার সাহায্যে বিদুর সমস্ত রাজ্য সর্বতোভাবে গ্রাস করবার লোভে এতোদিন যাবৎ যতো মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে, একমাত্র বাধাস্বরূপ দুর্যোধনকে আর তার বন্ধু কর্ণকে যতো ভাবে আঘাত করেছেন, এইভাবেই সেই অন্যায়ের প্রতিবিধানের কাছে মাথা নত করতে হলো।

ঠিক সেই নিয়মেই, সেদিন ধনসম্পদে মত্ত হয়ে দুর্যোধনকে দ্রৌপদী এবং কৃষ্ণসহ সর্বজন যেভাবে উপহাস করে যতো আমোদিত বোধ করেছিলেন, দ্রৌপদীকে সভার মধ্যে আনয়ন করে ‘দাসী’ ‘দাসী’ বলে তার শোধ নিলেন দুর্যোধন। কর্ণ উপভোগ করলেন। কিন্তু এই ব্যবহার অবশ্যই দুর্যোধনের পক্ষে অতিশয় অশালীন। এই প্রতিশোধের মধ্যে কোনো সভ্যতা ছিলো না। দ্রৌপদীকে দুঃশাসন চুলের বেণী ধরে সভার মধ্যে আনয়ন করে অতি অভদ্রভাবে অতো সব মাননীয় ব্যক্তিদের সম্মুখে শাড়ি ধরে টানাটানি করলো, এটা অবশ্যই অমার্জনীয় অপরাধ। পাণ্ডবরা সবাই যার যার উত্তরীয় ছুঁড়ে দিলেন তাঁর দিকে। কর্ণকে তাঁর যোগ্যতার মূল্য না দিয়ে, পিতাভ্রাতার প্রতিজ্ঞা না মেনে জাত তুলে প্রত্যাখ্যান করে, স্বয়ংবর সভায় দ্রৌপদী যতো অপমান করেছিলেন, অথবা যজ্ঞের দিন ময়দানবের তৈরি অপূর্ব সভাটিতে পুনঃপুন দুর্যোধনকে বিভ্রান্ত করে সদলবলে যেভাবে উপহাস করেছিলেন, সেটাও মার্জনাযোগ্য নয়। কিন্তু এখানে একজন মহিলাকে নিয়ে এই ব্যবহার, বলা যায় সভ্যতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ক্রোধে অগ্নিমূর্তি হয়ে ভীম বললেন, ‘হে যুধিষ্ঠির! দ্যূতপ্রিয় ব্যক্তিরা স্বগৃহস্থিত বেশ্যাগণকেও পণ রেখে খেলে না। তাঁরা তাদের প্রতিও কিঞ্চিৎ দয়া প্রকাশ করে থাকেন।’ বলতে বলতে তাঁর সারা দেহ থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছিটকোতে লাগলো। দ্রৌপদী একটা তর্ক তুললেন, যুধিষ্ঠির কার অধীশ্বর হয়ে তাকে দ্যূতে সমর্পণ করেছেন? অগ্রে নিজেকে অথবা পূর্বে দৌপ্রদীকে দুরোদর মুখে বিসর্জন করেছেন?

দুঃশাসনও ‘দাসী’ ‘দাসী’ বলে উচ্চৈঃস্বরে হাসছিলেন। এমনই হাসির রোল যেদিন দুর্যোধনকে ব্যথিত করেছিলো, নিজেকে সেদিন নিশ্চয়ই অতি অসহায় এবং দীন বলে মনে হয়েছিলো তাঁর। আজ দ্রৌপদীকে এই হাসির রোল নিশ্চয়ই তেমনি ব্যথিত ও দীনভাবাপন্ন করে তুলছিলো। কৌরবদের আজকের নির্দয় অভদ্র ব্যবহারের পেছনে মূল কথাটা প্রতিশোধস্পৃহা।

তবু দ্রৌপদী স্ত্রীলোক, তারা পুরুষ। তদ্ব্যতীত, দুঃশাসন যেভাবে তাঁকে সভার মধ্যে নিয়ে এসেছে বা যেভাবে তাঁর বস্ত্র ধরে টানাটানি করছিলো, সেটা অতীব অভব্য ব্যবহার। খুব আশ্চর্য, কেউ তা নিয়ে একটা কথাও বলছিলেন না। দ্রৌপদী ক্রন্দন করতে করতে বললেন, ‘হায়, ভরতবংশীয়গণের ধর্মে ধিক্। ক্ষাত্রধর্মজ্ঞগণের চরিত্র নষ্ট হয়ে গিয়েছে। সভাস্থ সমস্ত কুরুগণ স্বচক্ষে কুরুকর্মের ব্যতিক্রম নিরীক্ষণ করছেন, কিন্তু কেউ এদের নিন্দা করছেন না। বোধহয় এদেরও এই কর্মে অনুমোদন আছে। দ্রোণ ভীষ্ম বিদুর, এঁদের কিছুমাত্র সত্ত্ব নাই। প্রধান প্রধান কুরুবংশীয় বৃদ্ধগণও দুর্যোধনের এই অধর্মানুষ্ঠান অনায়াসে উপেক্ষা করছেন।’

ভীষ্ম বললেন, ‘হে সুভগে! একদিকে পরবশ ব্যক্তি পরের ধন পণ রাখতে পারেন না, অন্যদিকে স্ত্রী স্বামীর অধীন, এই উভয়পক্ষই তুল্যবল বোধ হওয়াতে তোমার প্রশ্নের যথার্থ উত্তর বিবেচনায় আমরা অসমর্থ। বিশেষত যুধিষ্ঠির আপনার মুখে স্বীকার করেছেন, ‘‘আমি পরাজিত হয়েছি’’। শকুনি দ্যূতক্রিয়ায় অদ্বিতীয়। যুধিষ্ঠির স্বয়ং তার সঙ্গে ক্রীড়া করতে অভিলাষী। তিনি স্বয়ং তোমার এই অবমাননা উপেক্ষা করছেন। আমরা কী করে তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি?’

এই জবাবটা ভীষ্মের উপযুক্ত হলো না। এটা কোনো জবাবই নয়। গৃহবধূকে এভাবে টেনে সভার মধ্যে অপমান করা যে অন্যায়, সে কথাটাই তাঁর বলা উচিত ছিলো। যুধিষ্ঠির তাঁকে পণ্য করে যতো অসম্মানই করে থাকুন, সেটা আলাদা। কিন্তু বিনিময়ে যেভাবে এঁরা আক্রোশ মেটাচ্ছেন, তার প্রতিবাদ করা গুরুজনদের কেবলমাত্র উচিতই নয়, কর্তব্য। কিন্তু তা কেউ করেননি। কেন করেননি? তার মানে কি এটাই ধরে নেবো যে দ্রৌপদী স্ত্রী কিংবা পুরুষ এটা নিয়ে কারো মাথাব্যথা ছিলো না। স্ত্রীলোকের প্রতি আলাদা কোনো সম্মানের প্রশ্ন নেই। যদি তা থাকতো তাহলে দ্রৌপদীকে সভায় এনে সকলের সম্মুখে, বিশেষত যেখানে ভীষ্ম দ্রোণ বিদুর ধৃতরাষ্ট্র প্রভৃতি গুরুজনেরা সকলেই উপস্থিত, সেখানে এই অশালীন আচরণ করার সাহস তাদের কখনোই হতো না। সেকালের সমাজে মাননীয় অতিথি এলে অন্যান্য দ্রব্যের সঙ্গে একজন স্ত্রীলোককেও উপঢৌকন দেওয়া হতো। সেই মনোভাব থেকেই কি দ্রৌপদীকে এভাবে সভার মধ্যে টেনে অানায় তাঁরা কোনো অন্যায় দেখতে পাননি?

আরো একটা কথা ভীষ্ম বললেন, ‘পরবশ ব্যক্তি পরের ধন পণ রাখতে পারেন না, অন্যদিকে স্ত্রী স্বামীর অধীন। এই উভয় পক্ষই তুল্যবল বোধ হওয়াতে তোমার প্রশ্নের যথার্থ উত্তর বিবেচনায় আমরা অসমর্থ।’ তাই যদি হয়, তা হলে যুধিষ্ঠিরই তো দ্রৌপদীর একমাত্র স্বামী নন, আরো তো চারজন স্বামী আছেন, তাঁরা কেন কোনো প্রতিবাদ করলেন না? অন্যের স্ত্রীকে পণ রাখার অধিকার যুধিষ্ঠির কোথায় পেলেন? পুরাকালের নিয়ম অনুসারে কনিষ্ঠ ভ্রাতা জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার অধীন, কিন্তু তাদের স্ত্রীরা নিশ্চয় তাদের স্বামীর অধীন। তাহলে সেই স্বামীরা নিঃশব্দ রইলেন কেন? তাঁরা তো দ্রৌপদীকে পণ রাখেননি। তাঁরা কেন কোনো প্রতিবাদ করলেন না? শেষ পর্যন্ত এটাই মনে হয়, প্রতিবাদ যখন কেউ করলেন না, গুরুজনেরাও নন, সভাস্থ অন্যান্য জনেরাও নন, স্বামীরাও নন, তবে হয়তো দ্রৌপদীর কারো কাছেই মহিলা বলে আলাদা সম্মান পাবার কোনো প্রশ্ন ছিলো না। অথবা জুয়াখেলার নিয়ম অনুসারে, অনুক্ষণ অপমানিত দুর্যোধন আর কর্ণ যা করছিলেন, সেটা কিছু অন্যায় নয়। দুর্যোধনের কোনো এক ভ্রাতাই একমাত্র ব্যক্তি যার মুখে একটি প্রতিবাদ উচ্চারিত হলো। বিকর্ণ বললেন, ‘যুধিষ্ঠির ব্যসনাসক্ত হয়ে দ্রৌপদীকে পণ রেখেছেন, অধিকন্তু পণ রাখবার পূর্বে তিনি স্বয়ং পরাজিত হয়েছেন, তাতে তিনি স্বত্ববর্জিত হয়েছেন। এসব বিবেচনা করে আমি দ্রৌপদীকে জয়লব্ধ বলে স্বীকার করতে পারি না।’

বিকর্ণর একথা শুনে কর্ণ ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, ‘দেবতারা স্ত্রীলোকদের এক ভর্তাই বিধান করেছেন। দ্রৌপদী সেই বিধি লঙ্ঘন করে যখন অনেক ভর্তার বশবর্তিনী হয়েছেন, তখন ইনি বারস্ত্রী। সুতরাং সভামধ্যে আনয়ন, বা বিবসনা করা, মোটেই আশ্চর্যের বিষয় নয়।’

দুর্যোধন যুধিষ্ঠিরকে বললেন, ‘হে নৃপতে। ভীম অর্জুন নকুল সহদেব তোমার বশীভূত, দ্রৌপদী পরাজিত কিনা তুমিই বলো না।’ হাসতে হাসতে বসন সরিয়ে ঊরুতে চাপড় দিলেন। বলাই বাহুল্য, ব্যবহারটা অশালীন।

কিন্তু আশৈশব তিনি বিদুরের বাক্যদংশনে যে জ্বালায় জ্বলেছেন, বিদুরের পরামর্শে পাণ্ডব নামধারী পঞ্চভ্রাতার সঙ্গে যে বৈরীভাব সৃষ্টি হয়েছে, নিঃশব্দে যে গ্লানি, অপমান, অসম্মান, সতত সহ্য করেছেন, এতোদিনে সেই সব অপমানের প্রতিশোধ নিতে পেরে দুর্যোধনের মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেলা আশ্চর্য নয়। বিশেষত, মহিলারা যে সমাজে ভোগের সামগ্রী ব্যতীত আর কিছু নয়। বিশেষত, যে স্ত্রী পঞ্চপতিগামিনী।

তদ্ব্যতীত, দ্রৌপদী এখন কুরুকুলবধূ বলে নিজেকে জাহির করলেও, যজ্ঞের দিন যে চাপল্য প্রকাশ করেছিলেন সেই ব্যবহারটা বিন্দুমাত্র সুষ্ঠু ছিলো না। অন্যকে অসম্মান অপমান করলে, পরিবর্তে অসম্মানিত অপমানিত হবার ঝঁুকি থাকে বৈকি। স্বয়ংবর সভায় জাত তুলে অতি অন্যায়ভাবে কর্ণকে অপমান করেছিলেন দ্রৌপদী, তার মধ্যে কোনো শালীনতা ছিলো না। অতঃপর একজনের গলায় বরমাল্য দিয়ে বিবাহের পরেও তিনি তাঁর বরণীয় পতির জ্যেষ্ঠ কনিষ্ঠ সকল ভ্রাতার সঙ্গেই বা কী করে বিবাহিত হলেন? কর্ণকে প্রত্যাখ্যান করবার সময়ে তাঁর কণ্ঠে যে জোর ছিলো, বিবাহের সময়ে কেন তেজস্বিনী দ্রৌপদীর কণ্ঠ নিঃশব্দ রইলো?

যুধিষ্ঠিরের মান সম্মান ঐশ্বর্য কিছুই তাঁর স্বোপার্জিত নয়। পত্নীটিও নয়। অনুপার্জিত সমস্ত কিছুই তিনি তাঁর জুয়ার নেশায় সমর্পণ করে ভ্রাতাগণসহ দ্রৌপদীকে নিয়ে কুরুদের দাস হলেন।

দুরোদর রাজাদের বিবিধ ব্যসনের মধ্যে একটা। খেলার জন্য সকল রাজাই সকলকে ডাকতে পারেন—সেটাই নিয়ম। সেটা একটা সম্মানের ব্যাপার। এই খেলার আয়োজন যে কোনো রাজা যে কোনোদিন করতে পারেন, খেলতেও পারেন। যুধিষ্ঠিরকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ডাকলেও একা তাঁকেই ডাকা হয়নি; অন্যান্য কীর্তিমান রাজারাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। যুধিষ্ঠির নিজেই শকুনির সঙ্গে খেলতে অভিলাষী হলেন। কেন অভিলাষী হলেন তার মধ্যে যে একটা গূঢ় অভিসন্ধি ছিলো সেটা কেউ ধরতে পারেননি। তিনি নিজেই প্রকাশ করেছিলেন সে কথা। সরবে সদরে নয়, দ্রৌপদীর বাক্যবাণে জর্জরিত হয়ে তাঁকে বলেছিলেন যে তাঁর মনে হয়েছিলো খেলতে খেলতে একবার না একবার তিনি জিতবেনই, এবং তখন দুর্যোধনের সমস্ত ঐশ্বর্য তাঁর ক্ষমতার অধীন হবে। একথা যে তিনি শুধু স্ত্রীকেই বলেছিলেন তা-ই নয়, ক্রুদ্ধ ভ্রাতা ভীমকেও বলেছিলেন। নচেৎ, এ খেলাটা যদি তিনি অন্য কারো সঙ্গে খেলতেন, হয়তো জিতেও যেতে পারতেন। কিন্তু দুর্যোধনকে না হারাতে পারলে সুখ কোথায়? এই খেলা যে সবাই পণ নিয়ে খেলেন তা নয়। দুর্যোধনও পণের কথা বলেননি, বলেছিলেন যুধিষ্ঠির নিজেই। তিনি জানতেন তাঁর যতো ঐশ্বর্য আছে, তার সঙ্গে এঁরা কোনোরকমেই পাল্লা দিয়ে উঠতে পারবে না, অতএব এক সময় ধরা দিতেই হবে। দুর্ভাগ্যক্রমে সেই বাসনা তাঁর মিটলো না। বিদুরের মতো তাঁরও শান্তনুর সিংহাসনটি শেষ লক্ষ্য।

হিতৈষীরা তাঁকে শকুনির সঙ্গে খেলতে বারণ করেছিলেন, তিনি শোনেননি। কুরুরা একটা অভিসন্ধি নিয়ে খেলার আয়োজন করলেও, ফলাফল বিষয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন না। কেননা যুধিষ্ঠির যে সৌবলের সঙ্গেই খেলবেন এমন তো কোনো কথা নেই। যুধিষ্ঠিরের মনে অথচ সেই নিশ্চয়তা ছিলো। ধনদৌলতের আধিক্যে তিনি যে এঁদের অপেক্ষা অনেক বেশি ঐশ্বর্যবান, সে বিষয়ে তিনি নিঃসন্দেহে ছিলেন। সেজন্যই গৌরব করে বলেছিলেন, ‘পণ-পূর্বক খেলো, দেখি তোমাদের কী আছে।’ কিন্তু মজাটা এই যে সারা রাজ্যেই রটে গেলো দুর্যোধনের ঈর্ষাতেই যুধিষ্ঠিরের এতো বড় একটা ক্ষতি হলো। যুধিষ্ঠির খেললেন, যুধিষ্ঠির হারলেন, অতি নিন্দিত জুয়াড়িদের চাইতেও অধিক নিন্দিত জুয়াড়ি হয়ে স্বীয় পত্নীকেও পণ রাখলেন; তথাপি যুধিষ্ঠির সৎ, যুধিষ্ঠির নির্দোষ, যুধিষ্ঠির সরল, আর তাঁর সব মন্দকর্মের দায় নিতে হলো দুর্যোধনকে। অবশ্য কর্ণ সৌবল্য বাদ গেলেন না।

এরমধ্যে যেটা উল্লেখযোগ্য তা ভীষ্ম এবং দ্রোণের চুপ করে থাকা। তার অর্থ সম্ভবত এটাই যে তাঁরা সেখানে দুর্যোধনের দোষ দেখতে পাননি। সহসা বিদুর তাঁর পক্ষে যতোটা সম্ভব ভদ্রভাষায় বললেন, ‘হে ধৃতরাষ্ট্রতনয়গণ, তোমরা অন্যায় দ্যূতক্রীড়া করেছো। যেহেতু সভামধ্যে স্ত্রী নিয়ে বিবাদ করছো, তোমাদের রাজ্যের কল্যাণ বলে আর কিছুই রইলো না। তোমরা সকলেই কুমন্ত্রণা-পরতন্ত্র হয়েছো। সভামধ্যে অধর্মানুষ্ঠান হলে সমুদয় দূষিত হয়। এখন আমার ধর্মবাক্য শ্রবণ করো। দ্যাখো, যদ্যপি যুধিষ্ঠির আত্মপরাজয়ের পূর্বে দ্রৌপদীকে পণ রেখে ক্রীড়া করতেন, তা হলে উনি যথার্থ ঈশ্বর হতেন। কিন্তু অনীশ্বরের নিকট বিজিত ধন, আমার মতে স্বপ্নার্জিত ধনের ন্যায়। অতএব হে কৌরবগণ! তোমরা গান্ধাররাজের বাক্য শ্রবণে বিমূঢ় হয়ে ধর্মচ্যুত হয়ো না।’

দুর্যোধন দ্রৌপদীকে সম্বোধন করে বললেন, ‘হে যাজ্ঞসেনী! ভীম অর্জুন নকুল সহদেবের মতই আমার মত। যদি তাঁরা যুধিষ্ঠিরকে অধীশ্বর বলেন, তাহলে তোমার দাসীত্ব মোচন হবে।’

হঠাৎ ধৃতরাষ্ট্র দুর্যোধনকে বলতে লাগলেন, ‘আরে দুর্বিনীত দুর্যোধন। তুই একেবারে উৎসন্ন হলি। যেহেতু কুরুকুলকামিনী, বিশেষত পাণ্ডবগণের ধর্মপত্নী দ্রৌপদীকে সভামধ্যে সম্বোধন করলি।’

বিদুর বলেছেন, অতএব ধৃতরাষ্ট্রকে ছেলের বিরুদ্ধে কিছু তো বলতেই হবে। এই প্রৌঢ় রাজাটির অবিবেচনা যতো গভীর, দুর্যোধনের দুর্ভাগ্য ততোধিক। দুর্যোধন তাঁর বয়স্ক পুত্র; স্বাবলম্বী, প্রজাবৎসল বলে খ্যাত একজন রাজা। সভার মধ্যে সকলের সম্মুখে পিতাই যদি তাঁর নিন্দায় মুখর হন, এভাবে অসম্মান করেন, তাহলে অন্যেরা বলবে না কেন? পরিজনদের মধ্যে এমনিতেই বিদুর তাঁকে যে চিত্রে চিত্রিত করে রেখেছেন, সেই চিত্র তবে আর কেমন করে মুছে যাবে? প্রচারের সাহায্যে বিদুর তাঁকে যে পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন, তাতে উত্ত্যক্ত হয়ে দুর্যোধন আজ যদি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠে মাত্রাজ্ঞান হারান, খুব কি দোষের সেটা?

বিদুর ধর্ম! বিদুর মিথ্যা বলতে জানেন না। বিদুর সততার প্রতীক। বিদুর বিবেকের প্রতীক। আর স্বীয় পিতা ধৃতরাষ্ট্র তার ছায়া। দুর্যোধনের জীবনের গভীরতম কষ্টের জায়গা সেটাই।

তারপরেই ধৃতরাষ্ট্র দ্রৌপদীকে তার স্বামীদের সহ সমুদয় ধনসম্পত্তিও ফেরৎ দিলেন। কর্ণ বললেন, ‘অসামান্য রূপবতী স্ত্রী দ্রৌপদীর মতো কোনো স্ত্রীলোকের এতাদৃশ কর্ম কর্ণগোচর হয়নি। পাণ্ডবগণ দুস্তর জলপ্লাবনে নিমগ্ন হয়েছিলেন, পাঞ্চালী তরণী হয়ে পার করে দিলেন।’

কর্ণের কথা শুনে অসিহষ্ণু ভীম দন্তে দন্ত ঘর্ষণ করে বললেন, ‘হা! স্ত্রী পাণ্ডবগণের গতি হলো?’

অতঃপর ধৃতরাষ্ট্রের অনুজ্ঞাত হয়ে ধনসম্পত্তি সহকারে পাণ্ডবগণ যখন চলে গেলেন, তার অনতিবিলম্বেই নিজ সহোদর সমন্ত্রী দুর্যোধনের নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, ‘আমরা অতীব ক্লেশে যে সমুদয় দ্রব্য সঞ্চয় করেছি, বৃদ্ধ রাজা সমুদয় নষ্ট করছেন। অধিকাংশই পুনরায় শত্রুদিগের হস্তগত হয়েছে। এখন ভালোমন্দ যা হয় তোমরা বিবেচনা করো।’

এ কথা কর্ণগোচর হওয়ায় দুর্যোধন বিস্মিতও হলেন, শঙ্কিতও হলেন। এখন পাণ্ডবরা যে রকম ক্ষিপ্ত অবস্থায় রাজ্যে প্রত্যাবর্তন করেছেন, সেই ক্রোধ থেকে নিস্তার পাবার কী উপায় সেটাই চিন্তার বিষয়। ওদের সহায় সম্বল প্রবল, আর তিনি নিজে এ মুহূর্তে একান্তই অপ্রস্তুত। প্রাণ সংহারোদ্যত এই ক্রুদ্ধ ভুজঙ্গদিগকে কণ্ঠলগ্ন করে কে থাকবে? সমস্ত উপায় দ্বারাই এখন তাঁদের দমন করা কর্তব্য। আজ হোক কাল হোক, যুদ্ধ এঁরা করবেনই। অস্থিরমতি ধৃতরাষ্ট্রকে সিংহাসনচ্যুত করে অবিভক্ত রাজত্ব না পাওয়া পর্যন্ত এঁরা শান্ত হবেন না। বিদুরও হবেন না। আর এখন তো একটা বড়ো কারণই পেয়ে গেলেন। প্রকৃতপক্ষে, দ্রৌপদীকে সভায় এনে অসম্মান করাটা তাদের পক্ষেও যেমন একটা অতি অশোভন কার্য হয়ে গিয়েছিলো, সেই অসম্মান পঞ্চপাণ্ডবকে তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষিপ্ত করেছে। ভীম প্রতিজ্ঞা করেছেন দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ করবেন, আর দুঃশাসনের রক্তপান করবেন।

অবিলম্বেই সকলে মিলে ধৃতরাষ্ট্রের কাছে গিয়ে উপস্থিত হলেন। বললেন এসব কথা। তারপর বললেন, ‘হে মহারাজ! আমরা বনবাস পণ করে পুনরায় পাণ্ডবদের সঙ্গে পাশাক্রীড়া করবো। তারা বা আমরাই হই, দ্যূতনির্জিত হলে বল্কলাজিন পরিধান করে দ্বাদশ বৎসরের জন্য বনপ্রবেশ করবো। এক বৎসর তারাই হোক বা আমরাই হই, পরিবারসহ অরণ্যে বাস করবো। আপনি অনুমতি করুন, আমরা পুনরায় পাশাক্রীড়া করি।’

ধৃতরাষ্ট্র তৎক্ষণাৎ অস্তির হয়ে পাণ্ডবদের ডেকে পাঠালেন। পরিজনসহ সকলেই পুনরায় ফিরে এলেন। দুর্যোধন যুধিষ্ঠিরকে বললেন, ‘হে যুধিষ্ঠির! এই সভায় বহুবিধ লোকের সমাগম হয়েছে। এসো আমরা পুনরায় অক্ষ নিক্ষেপ পূর্বক দ্যূতারম্ভ করি।’

সৌবল বললেন, ‘বৃদ্ধ রাজা আপনাদের যে অর্থ প্রত্যর্পণ করেছেন, সেটা ভালোই করেছেন। কিন্তু এবার আমরা যারাই হারবো, তারাই মহারণ্যে প্রবেশ করে একবৎসর অজ্ঞাত ও দ্বাদশ বৎসর জ্ঞাত, এই ত্রয়োদশ বৎসর অরণ্যে বাস করবো।’

উন্মত্ত জুয়াড়ি যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃগণের সঙ্গে মৌনভাব অবলম্বন করে এতো কাণ্ডের পরেও তৎক্ষণাৎ পুনরায় ফিরে গেলেন খেলতে। কারো কোনো বাধাই মানলেন না। কারো দিকে তাকালেনও না। যথারীতি পুনরায় হেরে গিয়ে পুনরায় নিঃস্ব হলেন। অতঃপর শুরু হয়ে গেলো বনবাসপর্ব।

পাণ্ডবগণ প্রব্রজ্যাশ্রম অবলম্বন করেছেন শুনে অনেকেই তাঁদের সঙ্গে দেখা করবার জন্য মহাবনে যাত্রা করলেন। কৃষ্ণও এলেন। তাঁকে দেখে দ্রৌপদী বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন ‘হে কৃষ্ণ! আমার বোধ হচ্ছে আমি পতিপুত্রবিহীনা, আমার বন্ধু নাই, ভ্রাতা নাই, পিতা নাই, তুমিও আমার নাই।’ করতলে মুখ ঢাকলেন তিনি। মুখমণ্ডল আচ্ছাদিত করে রোদন করতে লাগলেন। অজস্র অশ্রুবিন্দুতে তাঁর বক্ষস্থল অভিষিক্ত হতে লাগলো। অসামান্য সুন্দরী সখীর এই বিগলিত বাক্যে কৃষ্ণও যে বিগলিত হবেন তাতে আর সন্দেহ কী? তিনিও বিগলিত কণ্ঠে ‘হে ভাবিনী’ সম্বোধন করে অনেক সান্ত্বনা দিলেন। এই বনবাস পর্বেই যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীকে যা বলেছিলেন, পরে সে কথা তিনি ভীমকেও বলেন, ‘ভ্রাতঃ! আমার অন্যায়াচরণেই তোমরা বিষাদসাগরে পতিত হয়েছো, তাতে সন্দেহ নাই। আমি দুর্যোধনের রাজ্যহরণে ইচ্ছুক হয়ে অক্ষ গ্রহণ করেছিলাম।’

এইখানে কি আমরা এই প্রশ্ন করতে পারি না, কেন তিনি দুর্যোধনের রাজ্যে লোভ করতে গিয়েছিলেন? তিনি কি তখন অগাধ ঐশ্বর্যের অধিকারী হননি? পাণ্ডুর অর্ধাংশ পাননি? কীসের অভাব ছিলো তাঁর? আসলে যতোক্ষণ না শান্তনুর সিংহাসনটি সর্বতোভাবে গ্রাস করতে পারেন, ততোক্ষণ বিদুরেরও যেমন শান্তি ছিলো না, তাঁরও ছিলো না। দুর্যোধন এঁদের বিষয়ে এই সব কথাই তাঁর রাজোচিত বুদ্ধিতে অনুমান করতে পেরেছিলেন এবং এঁরা পাণ্ডুর ক্ষেত্রজ কিনা সে বিষয়েও তাঁর মনে সন্দেহ ছিলো। এছাড়া, যে কারণেই হোক, এর সঙ্গে যে বিদুর সম্পৃক্ত, সে বিষয়েও তাঁর সন্দেহ ছিল না। অন্য কোনো বলবান রাজার সহযোগ পাবার জন্যই যে তাঁরা হস্তিনাপুরীতে আর প্রত্যাবৃত্ত হননি, নিজেদের পরিচয় গোপন করতে ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলেন, এসব কথা অন্তত দুর্যোধনের কাছে গোপন নেই। যদিও বিদুর সকলকে এ কথাই বুঝিয়েছেন যে দুর্যোধনের অসূয়া থেকে মুক্তি পেতে প্রাণভয়েই পাণ্ডবরা পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন।

পাণ্ডবদের উদ্দেশ্য সফলও হয়েছিলো। বিশেষভাবে কৃষ্ণের সহায়তা পেয়ে, বলা যায় সবই প্রায় হাতের মুঠোয় এসে পৌঁছেছিলো। রাজসূয় যজ্ঞের দিন তাঁরা যদি অকারণে দুর্যোধনকে এভাবে অপমান না করতেন, ভৃত্যভৃত্যাদের সম্মুখে স্ত্রীপুরুষ সবাই ওরকম অশালীন অভব্য আচরণ না করতেন, তা হলে তথাকথিত জ্ঞাতিদের বৈভব দেখে দুর্যোধনের মন যতোই কলুষিত হোক না কেন, এই প্রতিশোধের ঘটনা কখনোই ঘটতো না। পাণ্ডবরা নিজেদের যদি কুরুকুলের সন্তান ভাবতেন, আর কিছু না হোক, কুরুকুলের মানসম্মানের দায়েও এটা করতে পারতেন না। এর পরে যে কোনো আত্মসম্মানজ্ঞানসম্পন্ন মানুষই যেভাবে পারে সেভাবেই এর প্রতিশোধ না নিয়ে পারে না। সেখানে দুর্যোধনের তো বহু বছরের জমা রাগ এদের ওপরে। ছেড়ে দেবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কুলে, মানে ধনে জনে দুর্যোধন নিশ্চয়ই একজন অতি বিশিষ্ট ব্যক্তি, সমকক্ষ ক্ষত্রিয় রাজা, তিনি কেন সহ্য করবেন অপমান? সহ্য করলে আমরা পাঠকরাই তাঁকে কাপুরুষ বলে অশ্রদ্ধা করতাম। আত্মসম্মানের প্রতি যাঁদের দৃষ্টি নেই, তাঁরা মানুষ হলেও মানুষ নয়। আত্মসম্মান প্রাণীকুলে একমাত্র মনুষ্য জাতির মধ্যেই বর্তমান।

যখন পাণ্ডবরা দ্রৌপদীসহ বনবাসে যাচ্ছিলেন দুঃশাসন বলেছিলেন, ‘যে পাণ্ডবরা ধনমদে মত্ত হয়ে ধার্তরাষ্ট্রদের উপহাস করছিলো, এক্ষণে তারাই নির্জিত ও হৃতসর্বস্ব হয়ে বনপ্রবেশে যাচ্ছে।’

যাবার সময়, তাঁরা ফিরে এসে যে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হবেন তা জোর গলায় বলে গিয়েছিলেন পাণ্ডবরা।

চলবে...
বাকি পর্বগুলো পড়ুন এই লিঙ্কেঃ https://www.amarboi.com/search/label/mahabharatera-maharanye


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

মহাভারতের মহারণ্যে - প্রতিভা বসু [১৫]

amarboi
মহাভারতের মহারণ্যে
প্রতিভা বসু

১৫

ফিরে এসে ধৃতরাষ্ট্রকে দুর্যোধন জানালেন সেকথা। ধৃতরাষ্ট্রের তাতে কোনো চৈতন্য উদয় হয়েছে বলে মনে হলো না। তাঁর ধারণায় উৎকৃষ্ট অন্নভোজন আর উৎকৃষ্ট বস্ত্রপরিধানই সব। তিনি জানেন না, কাপুরুষেরাই অশনে বসনে পরিতৃপ্ত হয়ে থাকে, অধর্মপুরুষেরাই অমর্ষশূন্য হয়। দুর্যোধন যাঁদের এতো বড় শত্রু, তাঁরাই বা দুর্যোধনের কাছে মিত্র হবেন কেমন করে? তাঁদের তিনি বিনষ্ট করতে কেন বদ্ধপরিকর হবেন না? যুধিষ্ঠিরের দীপ্যমান রাজলক্ষ্মী, যার গর্বে গর্বিত হয়ে সবাই মিলে তাঁকে এতোখানি যন্ত্রণায়, লজ্জায়, অপমানে দগ্ধ করেছে, সেই রাজলক্ষ্মীকেই বা কেন তিনি কেড়ে নেবেন না? ওরা তাঁর বীরত্ব দেখুক একবার। দুর্যোধন লুকিয়ে হত্যা করতে অক্ষম, সেটা তাঁর ক্ষত্রিয় ধর্মের বিপরীত পন্থা। কিন্তু যোদ্ধা হিশেবে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতে জানেন তিনি। সভাচত্বরে জলভ্রমে পরিচ্ছদ উৎক্ষিপ্ত করলে, ওরা তাঁকে শত্রুসম্পত্তি দর্শনে বিভ্রান্ত ও রত্নানভিজ্ঞ মনে করে উপহাস করেছিলো। সেই উপহাসের শাস্তি তাদের দিতেই হবে। এজন্যই, অভ্যুদয় কালেই শত্রুদের উপেক্ষা না করে, পরিবর্ধিত ব্যাধির ন্যায় মূলোচ্ছেদ করা উচিত। সামান্য কণ্টকও কালক্রমে ব্রণকারণ হয়ে ওঠে।

মাতুল পূর্বেই বলেছিলেন, ধৃতরাষ্ট্র যুদ্ধে কিছুতেই রাজি হবেন না, বিদুরই দেবেন না সেটা, কেননা এখনো ওরা প্রস্তুত হতে পারেনি।

ঠিকই বলেছিলেন। সব শুনে পিতা বললেন, ‘হে পুত্র! যুদ্ধ করা আমার অভিপ্রেত নয়।’

এরপরে ধৃতরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে আরো নানা বিষয় পর্যালোচনার পরে সৌবল নির্জনে বললেন, ‘একটা উপায় আছে যা তোমাকে তোমার মনোমতো স্থানে হয়তো পৌঁছে দিতে পারে। সেটা কোনো গোপন ষড়যন্ত্র নয়, ছদ্মবেশে কারো অন্তঃপুরে প্রবিষ্ট হয়ে কারোকে নিধন করাও নয়, কোনো কাপুরুষের নীতিও নয়। রাজাদের একটা ব্যসন মাত্র। আমি অক্ষবিদ্যায় অভিজ্ঞ, মর্মজ্ঞ, বিশেষজ্ঞ। যুধিষ্ঠির দ্যূতপ্রিয়, কিন্তু তদ্বিষয়ে তাঁর নিপুণতা নেই। ক্ষত্রিয় রীতি অনুসারে দ্যূতের নিমিত্ত আহ্বান করলে তিনি আসবেন, এবং আমি অতি সহজেই তাঁকে পরাস্ত করবো।’

কথাটা দুর্যোধন খুব পছন্দ না করলেও মন্দের ভালো এটাই ভেবে নিলেন। তাঁর ইচ্ছা করছিলো মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই অসম্মানের ভালো জবাব দেন। শিশুপাল কৃষ্ণের শত্রু আর দুর্যোধন পাণ্ডবদের শত্রু। শিশুপালকে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়ে যেভাবে যথেষ্ট পরিমাণে অপমান করা হয়েছিলো এবং বধ করা হয়েছিলো, সেটা মেনে নেওয়া সহজ নয়। আর নিধন না করলেও চূড়ান্ত অপমান তাঁকেও করা হয়েছে। দুর্যোধন এবং পাণ্ডবগণ একই কুরুবংশের সন্তান হিশাবে গণ্য, পরন্তু যার যার পিতার অংশ তারা তারাই সঠিকভাবে ভোগ করছে। উপরন্তু, এই মুহূর্তে রাজসূয় যজ্ঞ করে পাণ্ডবরা যেখানে পৌঁছেছেন, তাঁদের ব্যবহার সেই মর্যাদার উপযুক্ত শালীনতার গণ্ডিতে পড়ে না, সদ্বংশের গণ্ডিতে পড়ে না। কিন্তু ধৃতরাষ্ট্রকে কে বোঝাবে সে কথা?

ধৃতরাষ্ট্র বললেন, ‘বিদুর আমাদের মন্ত্রী, বিদুর আমাকে যে মন্ত্রণা দেবেন, আমি তাই শুনবো। বিদুর দূরদর্শিতা প্রভাবে উভয় পক্ষের মঙ্গল ও ধর্মানুসারে মন্ত্রণা দেবেন।’ বলাই বাহুল্য, বিদুর সব শুনে দুর্যোধনের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করলেন।

মহাভারত নামের পুস্তকটিতে যেমন ধর্ম বলতে বিদুরকে বোঝায়, সত্যবাদী বলতে যুধিষ্ঠিরকে বোঝায়, পুত্রস্নেহে অন্ধ বলতে বোঝায় ধৃতরাষ্ট্রকে। এই সব ক’টি প্রবাদই নিতান্ত অসত্য। বিদুরের মতো অধার্মিক যেমন সচরাচর দেখা যায় না, দু’একটা অনৃতভাষণ এই পুস্তকে যাঁর মুখ থেকে নিঃসৃত হয়েছে তাঁর নামই যেমন যুধিষ্ঠির, স্বীয় পুত্রকে মরার বাড়া গাল দিয়েও যাঁর হৃদয়ে বিন্দুমাত্র কষ্টের সঞ্চার হয় না, তিনিই হচ্ছেন ধৃতরাষ্ট্র।

ধৃতরাষ্ট্র বিদুরের পরামর্শ নিয়ে বললেন, ‘বিদুর যখন অক্ষবেদনে অনুমোদন করছেন না, তা হলে এসবে প্রয়োজন নেই। তোমার কী অভাব? তুমি রাজপদে প্রতিষ্ঠিত, পৈতৃক রাজ্য বর্ধিত করেছো, প্রতিনিয়ত আজ্ঞাপ্রচার করে দেবেশ্বরের ন্যায় দীপ্তি পাচ্ছো, তবে তোমার দুঃখের বিষয় কী বলো?’

দুঃখের বিষয়টা যে কী সেটা কি দুর্যোধন বলেননি? পুত্রের সেই অসম্মানে পিতা হয়ে তাঁর হৃদয়ে কি কোনো প্রতিক্রিয়া হয়েছে? বেদনার সঞ্চার? অপমানবোধ? কী ভাবে সবাই মিলে তাঁকে উপহাস করলো! দ্রৌপদী পর্যন্ত! তার প্রতিও দুর্যোধনের কি কিছু কম প্রতিশোধস্পৃহা জন্মেছে? প্রতিশোধস্পৃহা কর্ণেরও কিছু আছে বৈকি! কী ভাবে স্বয়ংবর সভায় জাত তুলে কর্ণকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন দ্রৌপদী, তা কি ভোলা সম্ভব? আর তারপরে কী হলো? যে কন্যা উদ্ধত প্রতিবাদে কর্ণকে প্রত্যাখ্যান করে অজুর্নকে বরমাল্য দিলেন, তাঁকে বিয়ে করতে হলো পাঁচজনকে। পাঁচজনকে বিয়ে করা মেয়ের পক্ষেই বুঝি নববধূ হয়েও ওরকম নির্লজ্জ হাসি শোভা পায়। যে নারী পাঁচজনের সঙ্গে বিবাহে সম্মতি দেয়, তোকে সমাজ এবং অন্যান্য পুরুষ সম্ভ্রমের চোখে দেখে না। সুযোগ পেলে দুর্যোধন তাঁকে ছেড়ে দেবেন না। পিতাকে বোঝানো অসম্ভব, কে শত্রু কে মিত্র এটা কারো শরীরে লেখা থাকে না। সেরকম কোনো সাংকেতিক শব্দও নেই। যে যাকে সন্তাপিত করে শুধু সে-ই জানে কে কার শত্রু।

এর পরে আর পিতার সঙ্গে কোনো বিতর্কে গেলেন না দুর্যোধন, কিন্তু নিজের সংকল্প থেকেও চ্যুত হলেন না। জীবনে এই প্রথম উপলব্ধি করলেন দুষ্টু লোকের মিথ্যা প্রচারে স্বীয় সম্মানকে পদাহত হতে দেওয়াও একধরনের কাপুরুষতা। ক্ষতি যা করবার বিদুর সেটা ষোলো আনার স্থলে আঠারো আনাতেই পৌঁছে দিয়েছেন। এইবার একটা হেস্তনেস্ত হওয়া একান্ত প্রয়োজন। এমন কোন দুর্নাম আর তাঁর বাকি আছে যা মুখে মুখে বিদুর মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে রটিয়ে বেড়াননি? ধৃতরাষ্ট্র না জানুন, দুর্যোধন জানেন বিদুর যতোটাই পাণ্ডবগণের হিতৈষী, ততোটাই ধার্তরাষ্ট্রদের অহিতাকাঙ্ক্ষী। স্থির করলেন, হয় অক্ষবেদনে যুধিষ্ঠিরকে আমন্ত্রণ জানাবেন, নচেৎ যুদ্ধে নিহত হবেন। তিনি জানেন, পৌরুষশালী ব্যক্তি পরমার্থের সাপেক্ষ হয়ে স্বকার্য সাধনে প্রবৃত্ত হয় না। কর্তব্যানুষ্ঠান বিষয়ে দুইজনের মত সমান হওয়া নিতান্ত দুর্ঘট। কী ব্যাধি কী মৃত্যু কেউ শ্রেয় প্রাপ্তির জন্য প্রতীক্ষা করে না। অতএব ভবিষ্যৎ কালের অপেক্ষা না করে শ্রেয়স্কর কর্মের অনুষ্ঠান করাই কর্তব্য। দুর্যোধন দৃঢ়ভাবে বললেন, ‘হয় পাণ্ডবলক্ষ্মী লাভ করবো, নতুবা আমার প্রাণধারণের আবশ্যকতা নেই।’ পুত্রের এই দৃঢ় কণ্ঠ শ্রবণে ধৃতরাষ্ট্র ভৃত্যগণকে আদেশ করলেন, ‘তোমরা সহস্রস্তম্ভশোভিত হেমবৈদুর্যখচিত শতদ্বারবিশিষ্ট ক্রোশায়ত তোরণস্ফটিক নামে এক মহতী সভা শীঘ্র নির্মাণ করো।’

তাই হলো। সুনিপুণ শিল্পীগণ শীঘ্র সভা নির্মাণ করে সমুচিত দ্রব্যসামগ্রীতে সুশোভিত করে স্বল্পকাল মধ্যেই বহুরত্নে খচিত ও বিচিত্র হেমাসনে শোভিত করলেন। সভা সুসম্পন্ন হলো। তারপরেই ধৃতরাষ্ট্র বিদুরকে বললেন, ‘তুমি ইন্দ্রপ্রস্থ গিয়ে যুধিষ্ঠিরকে নিয়ে এসো।’

সঙ্গে সঙ্গে বিদুর বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আপনার এই ইচ্ছে আমি কোনোরকমেই সমর্থন করতে পারছি না। আপনি আমাকে এই অনুমতি দেবেন না। এতে সুহৃদভেদ হয়।’

কথাটা অযৌক্তিক নয়। কিন্তু সুহৃদভেদ হয়েছে বলেই যে এই আয়োজন তা-ও বিদুর জানেন। রাজত্ব পেয়েও তাঁদের মন থেকে যে দুর্যোধনের প্রতি এক কণা বিদ্বেষও প্রতিহত হয়নি, সেটা অকাট্য সত্য। অতি প্রতাপশালী একজন রাজা, যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী, সৈন্যস্থাপনে সুযোগ্য, তাঁর পক্ষে ভীষ্ম আছেন, দ্রোণাচার্য আছেন, অশ্বত্থামা আছেন, আছেন কর্ণ। সুস্থির হয়ে বসে তবে তো পাণ্ডবরা এদিকে মন দেবেন? সুতরাং দুর্যোধনকে তো তাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বীর দৃষ্টিতেই দেখবেন। এ অবস্থায় যুধিষ্ঠির যদি জুয়াখেলায় মত্ত হয়ে উঠে হেরে যান, তবে তো সব গেলো। এই ভীতিতেই বিদুর কিছুতেই মত দিতে পারেন না।

কিন্তু ধৃতরাষ্ট্র বললেন, ‘দৈব প্রতিকূল না হলে কলহ আমাদের পরিতাপিত করতে পারবে না। তুমি কুন্তীপুত্রকে গিয়ে নিয়ে এসো।’

চলবে...
বাকি পর্বগুলো পড়ুন এই লিঙ্কেঃ https://www.amarboi.com/search/label/mahabharatera-maharanye


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

মহাভারতের মহারণ্যে - প্রতিভা বসু [১৪]

amarboi
মহাভারতের মহারণ্যে
প্রতিভা বসু

১৪

তদনন্তর যজ্ঞশেষে একে একে সকলেই বিদায় নিলেন। দুর্যোধন আর তাঁর মাতুল সৌবল ময়দানবের তৈরি অভূতপূর্ব সভাটিতে বসেছিলেন। অন্যান্য অতিথি ও নৃপতিবৃন্দ ইত্যাদিরা বিদায় নিলে দুর্যোধন সভাকক্ষটি পর্যবেক্ষণ শুরু করে অবাক হয়ে গেলেন। দুর্যোধন সভামধ্যে একটি স্ফটিকময় স্থলে এসে ভীষণ লজ্জিত হলেন। তিনি সত্যি জলভ্রমে বসন উত্তোলিত করেছিলেন। পুনরায় অন্যত্র, স্থলভ্রমে জলের মধ্যে পড়ে গেলেন। একটু দূরে দাঁড়িয়ে দুর্যোধনকে সে অবস্থায় দেখে ভীম তাঁর কিঙ্করগণের সঙ্গে অতি উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। পরে যুধিষ্ঠিরের আজ্ঞানুসারে উত্তম শুষ্ক বস্ত্র এনে দিলেন। দুর্যোধন তার পরেও পুনরায় পূর্বের মতো স্থলভাগে জলের আশঙ্কা আর জলে স্থলের আশঙ্কা করে কেবলই ভুল করছেন দেখে ভীম অর্জুন নকুল সহদেব সকলেই উপহাস করতে লাগলেন। দুর্যোধনের পক্ষে এই উপহাস অসহ্য বোধ হচ্ছিলো, কিন্তু করবার কিছু ছিলো না। তার ওপরে সাজানো সভার কৌশলে নানাবিধ প্রতরণার সম্মুখীন হয়ে তাঁদের নিকট আরো হাস্যাস্পদ হলেন। এমনকি কৃষ্ণ পার্থ দ্রৌপদী এবং অনেক মহিলারা পর্যন্ত এমন হাস্যতরঙ্গ তুললেন যে বেদনা অপমান সব মিলিয়ে দুর্যোধন যেন আর দুর্যোধনের মধ্যে রইলেন না।

পাণ্ডবরা যদি তাঁকে নিজেদের ভ্রাতা বলেই গণ্য করতেন তবে কি তাঁরা তাঁকে এমন মর্মান্তিকভাবে উপহাস করতে পারতেন? এমনকি নববধূ দ্রৌপদী পর্যন্ত কী অশালীন ব্যবহার করলেন! দুর্যোধন একজন বিশ্ববরেণ্য রাজা, সেই সম্মানটাও তাঁকে দিলেন না ওঁরা। আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসার উদ্দেশ্য কি তবে এভাবে নিজেদের ঐশ্বর্য দেখিয়ে অপমান করা? তাচ্ছিল্য দেখিয়ে হাস্যাস্পদ করা? দুর্যোধন তাঁদের কী ক্ষতি করেছেন? তাঁদেরও নয়, আর কারোরই নয়। পাণ্ডুরা ক্ষেত্রজ হিশাবে ক্ষত্রিয় হয়ে যে সব অন্যায় কর্ম অবলীলাক্রমে করে চলেছেন, তেমন একটি কর্মও দুর্যোধনের দ্বারা সাধিত হয়নি। জতুগৃহ দাহ করে, অতগুলো লোককে পুড়িয়ে মেরে, তাঁর নামে দোষ চাপিয়ে, ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে নিজেদের প্রচ্ছন্ন রেখে, দ্রুপদরাজার কন্যা দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় গিয়ে উপস্থিত! সবই যে বিদুর আর ব্যাসদেবের সাহায্যে হচ্ছে সেটা বোঝবার জন্য খুব বেশি বুদ্ধি খরচ করতে হয় না।

প্রত্যাবর্তনকালে দুর্যোধন নিতান্তই বিমর্ষ ছিলেন, অন্যমনষ্ক ছিলেন, তাঁর মাতুল তাঁকে চিন্তাকুলচিত্তে গমন করতে দেখে বললেন, ‘দুর্যোধন, তোমার কী হয়েছে? এরকম বিষণ্ণ মনে গমন করছো কেন?’

দুর্যোধন বললেন, ‘আমার এমন অন্তর্দাহ হচ্ছে যে আর বেঁচে থাকার বাসনা অনুভব করছি না। একটা প্রতিশোধস্পৃহায় আমি দহ্যমান হচ্ছি। পাণ্ডবরা নিজেদের জয়ী করবার জন্য কৃষ্ণের পরামর্শে এমন কোনো পাপ কিংবা দুষ্কর্ম নেই যা করতে পরাঙমুখ হয়েছে। সবাই জানে আমি তাদের ভ্রাতা। কিন্তু তারা কি জানে? ওদের সভা যে-ভাবে নির্মিত হয়েছে তাতে যে ভ্রম অনিবার্য, জলকে স্থল ভাবা, স্থলকে জল ভাবা বা বহির্গত হবার জন্য স্ফটিকভিত্তিকে দ্বার বিবেচনা করে অগ্রসর হওয়ামাত্র মস্তকে আঘাত প্রাপ্ত হয়ে ফিরে আসা, বা অন্য কোনো প্রতারক-দ্বারে ধাক্কা দিয়ে পতিত হওয়া, এইসব হবে জেনেই তারা অপেক্ষা করছিলো সকলের সম্মুখে আমাকে হাস্যাস্পদ করবার জন্য। এইসব হঠকারিতা আমাকে নিঃশব্দে সহ্য করতে হয়েছে। হে মাতুল! শিশুপালকে ওরা যেভাবে হত্যা করলো তা দেখে সমস্ত নৃপতিকুলই স্তম্ভিত হয়ে যেমন নিঃশব্দে ছিলেন, আমাকেও সেইরূপ নিঃশব্দেই ফিরে আসতে হয়েছে। ক্ষত্রিয়দিগের কোনো ধর্মই ওরা পালন করে না। ক্ষত্রিয়দের সম্মুখযুদ্ধই ধর্ম। যেভাবে অন্তঃপুরে ঢুকে ওরা জরাসন্ধকে মেরেছে, যেভাবে শিশুপালকে মেরেছে, সেটার নাম কি বীরত্ব? যুদ্ধ? এই অসীম ধনরাশির অধিকারী হয়েও তাদের চিত্তশুদ্ধি হলো না। হে মাতুল! কারো মর্মপীড়াই কেউ বোঝে না। একমাত্র সে নিজেই জানে সেই অপমান কী অকথ্য বেদনাবোধে একটা মানুষকে মৃত্যুর সীমানায় নিয়ে যায়। আমার বেদনা আমি আর যার হৃদয়েরই সংক্রামিত করতে পারি, আমার পিতৃহৃদয়ে যে পারবো না, তা আমি জানি। তিনি বিদুরের আনুগত্যে আচ্ছন্ন। বিদুর তাঁকে আমার প্রতিও অবিশ্বাসে বিমোহিত করে রেখেছেন। শুধুমাত্র পিতার প্রতিই বা কেন, পিতামহ ভীষ্ম, গুরুদেব দ্রোণ সকলেই বিশ্বাস করেছেন বিদুরের বাক্য। পিতা ধৃতরাষ্ট্র প্রতিপদেই পথভ্রষ্ট হচ্ছেন। পরিণত প্রাজ্ঞ হয়েও স্বীয় কার্যসাধনে যত্নবান নন। তিনি কখনো একথা ভাবছেন না, রাজাদের সর্বদাই অপ্রমত্তচিত্তে স্বীয় স্বার্থচিন্তা করাই কর্তব্য। গূঢ় কিংবা বাহ্য উপায়ে, যার দ্বারাই হোক, শত্রুকে যাতে চিহ্নিত করা যায় সেই উপায়ই গ্রহণ করা উচিত। সেই উপায়ই শস্ত্রধারীদের শস্ত্র স্বরূপ। কেউ আমার পক্ষে থাকুক বা না থাকুক, আমি আমার একার ক্ষমতা বলেই যুদ্ধ করবো। তথাপি আমি আমার সম্মান আর এভাবে আহত হতে দেবো না।’

শকুনি বললেন, ‘একথা বলছো কেন? তোমার পক্ষে আমরা সবাই আছি। তোমার ভ্রাতারা, আমি, তোমার সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু কর্ণ, তোমাদের অর্থবহ ভীষ্ম দ্রোণ সবাই। কিন্তু সেটা কথা নয়। তোমার পিতাই তোমার বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন। অবশ্যই বিদুরই তাঁকে মত দেবেন না। পাণ্ডবরা এখনো তো ঠিকমতো গুছিয়ে বসতে পারেননি। সবে তো যজ্ঞ শেষ হলো।’

পিতার কথা দুর্যোধন জানেন। খুব ভালোই জানেন। যে বিদুর তাঁর আসল শত্রু, তাঁকেই তিনি সর্বোৎকৃষ্ট মিত্র বলে হৃদয়ে সবচেয়ে বড়ো আসন পেতে বসিয়ে রেখেছেন। সেই আসনে দুর্যোধনের ঠাঁই নেই। সেখানে দুর্যোধনের কোনো কথার কোনো মূল্য নেই। দুর্যোধনের নামে মিথ্যা অপবাদের কোনো শেষ রাখেননি বিদুর। জতুগৃহ যে যুধিষ্ঠিরই পাঁচটি পুত্রসহ একটি নিরাপরাধ মাতাকে এবং পুরোচনকে দগ্ধ করে, নিজেরা নিরাপদে সেখানে থেকে পাতাল পথে নেমে অন্যপথে নিরুদ্দেশ হয়েছেন, তা কি বিদুর জানেন না? নিরুদ্দেশ হয়ে কীভাবে নদী অতিক্রম করে ব্যাসদেবের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন তা-ও তিনি জানেন। সবই তো তাঁর কীর্তি। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ীই সব হয়েছে। কিন্তু সে কথা কি কারোকে বলেছেন তিনি? সকলকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানানোই তাঁর কাজ। রাজা প্রজা সবার কাছে বদনাম রটাচ্ছেন দুর্যোধনের। এটা নিশ্চয়ই সৎকর্ম বা সত্য কথা নয়। কিন্তু যেহেতু বিদুর স্বয়ং ধর্ম, সেহেতু তাঁকে সকলেই বিশ্বাস করেন, তাঁর কথাই একমাত্র বলে মেনে নেন। প্রতিবাদ করে লাভ নেই। নিঃসন্দেহে বিদুরের পাঠানো লোক দিয়েই মাটির তলার পথ তৈরি হয়েছে। সেখান থেকে অন্যদিকের যে পথে পাণ্ডবরা উঠে এসেছেন আকাশের তলায়, সেখানে বিদুরের পাঠানো পথপ্রদর্শকই অপেক্ষা করছিলো। বিদুরের পাঠানো যন্ত্রযুক্ত নৌকোর কাছে সেই পথপ্রদর্শকই নিয়ে এসেছিলো তাঁদের। সেই নৌকাতেই তাঁরা অপর তীরে অবরোহণ করে, বিদুরেরই মানচিত্র অনুযায়ী পথ চলে পথের সীমানায় মিলিত হয়েছিলেন দ্বৈপায়নের সঙ্গে। সমস্ত ব্যাপারটাই ঘটেছিলো তাঁর চক্রান্তে। কণামাত্রও কি তিনি জানতে দিয়েছিলেন কাউকে? বলেছেন সবই দুর্যোধনের কর্ম। এই মহাগ্রন্থে অধার্মিকের অবতারই ধার্মিকের মুখোশ পরে এইসব অপকর্ম করে বাহবা পেয়েছেন। ধৃতরাষ্ট্রের অতিশয় পুত্রবাৎসল্যের জন্যই যে এতো সব দুর্ঘটনা ঘটতে পেরেছে সে বিষয়ে কারো মনেই কোনো সন্দেহের অবকাশ রাখেননি বিদুর। অথচ ভীষ্ম-দ্রোণ-ধৃতরাষ্ট্র প্রত্যেকেই বিশ্বাস করেছেন, সব কুকর্মের জন্য দুর্যোধনই দায়ী। তথাকথিত ‘পুত্রবৎসল পিতা’ সততই ছেলের বিপক্ষে। ধৃতরাষ্ট্র যা-ই বুঝুন বা না বুঝুন, দুর্যোধন ঠিকই বুঝেছেন হস্তিনাপুরের সিংহাসনটিই পাণ্ডবদের আসল লক্ষ্য; এই লক্ষ্যপূরণের জন্যই তাঁকে হেয় করতে উঠে পড়ে লেগেছেন বিদুর এবং পাণ্ডবরা। শত্রু তাঁদের ধৃতরাষ্ট্র নন, দুর্যোধন। ক্ষমতা তাঁরা কম সংগ্রহ করেননি। বিপুল ঐশ্বর্যেরও অধিকারী হয়েছেন। আকস্মিকভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে ধৃতরাষ্ট্রকে সিংহাসনচ্যুত করা আদৌ কঠিন নয়। কঠিন দুর্যোধনকে স্ববশে আনা। নিজের ক্ষমতায় অনেক উঁচুতে তিনি উঠে গেছেন। শিশুপাল বলেছিলেন, ‘এই সাগরাম্বরা পৃথিবীতে যিনি অদ্বিতীয় সেই রাজেন্দ্র দুর্যোধন তো এখানে উপস্থিত, তাঁকে স্তুতি করতে ইচ্ছা হয় না তোমার?’ এই বাক্য নিশ্চয়ই তাঁদের বুকে শেল বিদ্ধ করেছিলো। হয়তো সেই ক্রোধই এইভাবে তাচ্ছিল্যের দ্বারা কিঞ্চিৎ প্রশমিত হলো। জানিয়ে দিলো, তোমাকে আমরা ভয় পাই না, তুচ্ছজ্ঞান করি। কিন্তু সত্যিই কি তাই?

পিতা ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবদের জন্য যখন যা করেছেন দুর্যোধন কখনো সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি বা বাধা দেননি। এই যে ধৃতরাষ্ট্র কতো সমাদর করে, কতো যৌতুক পাঠিয়ে, দৌপদীকে কুলবধূর সম্মান দিয়ে গ্রহণ করলেন, সেটা তাঁর ঔদার্যেরই পরিচয় বহন করে। পাণ্ডবরা তো তাঁকে তাঁদের বিবাহের সময়ও ডাকেননি। পাঁচজন পুরুষ একটিমাত্র মেয়েকে বিবাহ করে আর্য ও ক্ষত্রিয় সমাজের যে বিরুদ্ধাচার করলো, সেজন্যও বিন্দুমাত্র তিরস্কার করেননি। বরং তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন, গোলমালের দরকার নেই। যেমন পাঁচটি বহিরাগত কিশোরকে কুন্তীর বাক্যানুযায়ী পাণ্ডুর ক্ষেত্রজ বলেই গ্রহণ করে সব সমস্যার নিরসন করেছিলেন, এখানেও সেটাই করলেন। এবং পাণ্ডুর ক্ষেত্রজ হিশাবেই রাজ্যের অর্ধাংশ দিলেন। তা নিয়েও দুর্যোধন একটি বাক্যও উচ্চারণ করেননি। তথাপি তাঁর প্রতি এঁদের এই আক্রোশ কেন?

কেন, সেটা কেউ বলে না দিলেও বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না। সম্পূর্ণ রাজত্বের দখল নেবার একমাত্র অন্তরায় হবেন যিনি, তাঁর নাম দুর্যোধন। দুর্যোধন বেঁচে থাকলে যুদ্ধ বিনা সাম্রাজ্য দখলের অন্য কোনো পথ নেই। অতএব, এই লোকটিকে যদি ধৃতরাষ্ট্রকে দিয়ে ত্যাজ্যপুত্র করানো যায়, বা কোনো না কোনোভাবে নিধন করানো যায়, তা হলে চোখের পলকে সরিয়ে দেওয়া যাবে ধৃতরাষ্ট্রকে। যুদ্ধকে যতোই এড়িয়ে চলা যায়, ততোই মঙ্গল। ভীষ্ম কর্ণ দ্রোণ অশ্বত্থামা যেদিকে একত্রিত হবেন, সেখানে জয়ী হওয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার। কিন্তু পিতাকে সেটা বলা না বলা দুই-ই সমান। পিতার নিকট তাঁর পুত্র দুর্যোধন যা বলবেন, তদপেক্ষা বিদুর যা বলবেন তার মূল্য অনেক বেশি। পরন্তু, পিতার নিকট দুর্যোধন যা বলেছেন তা-ও বলে দেবেন। বিদুর নিত্য পিতার নিকট বসে তাঁর পুত্রের মৃত্যুকামনা করছেন, পিতা নিঃসাড়। এক নৌকার সঙ্গে বদ্ধ অন্য নৌকার মতো তিনি বিদুর যেভাবে চালাচ্ছেন চলছেন। বিদুরই তাঁর অনুশাসক। ধৃতরাষ্ট্রের জানা উচিত, জন্মের পর থেকে ক্রমশ যেমন শরীরের বৃদ্ধি হয়, সেই রকম যে রাজা সম্পদের ক্রমিক বৃদ্ধি আকাঙ্ক্ষা করেন, তিনিই জ্ঞাতিগণের মধ্যে সমৃদ্ধ হন। পরাক্রমই তৎকালীন উন্নতির উপায়স্বরূপ। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, পাণ্ডবেরা নানা দেশের নৃপতির সঙ্গে বন্ধুতা করে, কৃষ্ণের সহায়তা লাভ করে, জরাসন্ধ আর শিশুপালকে নিধন করে, অতিশয় বলশালী হয়েছেন। উদ্বেগহীনও হয়েছেন। এখন শুধু একটু গুছিয়ে বসা। তার পরের কর্মই হবে ধৃতরাষ্ট্রকে উচ্ছিন্ন করে সম্পূর্ণ অধিকারের জন্য এই রাজ্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া। তারপর অখণ্ড রাজ্যের রাজ্যেশ্বর হয়ে সিংহাসনে উপবেশন। পাণ্ডব এবং কুরু এই দুটি নাম কার রচনা সেটা না জানলেও সম্পর্কের মধ্যে এই যে একটা শুষ্ক মরুভূমি তৈরি হয়েছে এটা বিদুরেরই অবদান। সম্পর্কের কথা বাদ দিয়েও, দুর্যোধনের মতো একজন দেশবরেণ্য রাজা যদি এই অপমান সহ্য করে, চোরের মতো ফিরে এসে চুপিচুপি বসে থাকেন, তদপেক্ষা বেশি পরাজয় আর কী হতে পারে? সেই পরাজয় আর মৃত্যু দুই-ই সমান। এর যদি কোনো প্রতিবাদ না করেন তবে তো ওরা তাঁকে সময় সুযোগ মতো সর্বদাই এভাবে তাচ্ছিল্য করবে। অপমান করবে। সুযোগ পেলে চক্রান্ত করে নিধনও করতে পারে। এরা তো কৃষ্ণের পরামর্শে সম্মুখ যুদ্ধের অপেক্ষা অন্যায় হত্যার রাজনীতিই অনুসরণ করছে। যদি সুযোগ না থাকে, সুযোগ তৈরি করে নিতে কতোক্ষণ? এই অসম্মানের জবাব তাঁকে দিতেই হবে, সেটা যে উপায়েই হোক।

চলবে...
বাকি পর্বগুলো পড়ুন এই লিঙ্কেঃ https://www.amarboi.com/search/label/mahabharatera-maharanye


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

মহাভারতের মহারণ্যে - প্রতিভা বসু [১৩]

amarboi
মহাভারতের মহারণ্যে
প্রতিভা বসু

১৩

মহর্ষি শৌনকের আশ্রমে পুরাণ-কথক সৌতি যেদিন এসে উপস্থিত হলেন, তাঁর মুখ থেকেই ঋষিরা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসকৃত মহাভারত কথা শ্রবণ করলেন। এই গ্রন্থ ব্যাসদেবেরই ‘মনঃসাগর-সম্ভূত-অমৃত-নির্বিশেষ–গ্রন্থ’, যে গ্রন্থ ইতিহাস পুরাণের অনুসরণ ও ভূত ভবিষ্যৎ বতর্মান কালত্রয়ের সম্যক নিরুপণ, এবং জরা মৃত্যু ভয় ব্যাধি ভাব অভাব শুধু নয়, ইতিহাস ভূগোল দশর্ন পুরাণ, এমনকি যুদ্ধকৌশল ভূতত্ত্ব নৃতত্ত্ব ইত্যাদি সকল বিষয়ের বিবরণে সমৃদ্ধ।

তবে দ্বৈপায়ন কিন্তু মূলত একটি বিশেষ রাজত্বের বিশেষ বংশ নিয়েই উপাখ্যানটি রচনা করেছেন। সেই বংশের নাম ভরতবংশ। যে ভরতবংশের ইতিহাস তিনি আমাদের গোচরীভূত করেছেন, তার স্থাপয়িত্রী শকুন্তলা। শকুন্তলা আশ্রমনিবাসিনী ছিলেন। পুণ্যতোয়া মালিনী নদী বেষ্টিত, বহু বৃক্ষ সমাকীর্ণ আশ্রমটি ব্যতীত কিছুই তিনি দেখেননি। তিনি কণ্বমুনির পালিতা অতি সরলা এক কন্যা। রাজা দুষ্মন্ত শিকারে এসে অতি রমণীয় একটি বনে উপস্থিত হলেন। অনেক পশু বধ করে একাই ঘুরতে ঘুরতে সেখানে এসে পড়েছিলেন। এই রমণীয় বনের মধ্যেই তিনি অতি মনোরম আশ্রমটি দেখতে পেলেন। আশ্রমটি দেখতে পেয়ে তিনি সেখানে প্রবিষ্ট হলেন এবং কুটিরটির নিকটে এসে উচ্চস্বরে ডেকে বললেন, ‘এখানে কে আছেন?’

লক্ষ্মীর মতো এক সুন্দরী কন্যা বেরিয়ে এসে রাজা দুষ্মন্তকে স্বাগত জানিয়ে অভ্যর্থনা করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী প্রয়োজন বলুন, আমার পিতা কণ্বমুনি ফল আহরণ করতে গেছেন, একটু অপেক্ষা করলেই তিনি এসে যাবেন।’ রাজা দুষ্মন্ত বললেন, ‘আপনি কণ্বমুনির দুহিতা? কিন্তু তিনি তো ঊর্ধ্বরেতা তপস্বী।’ শকুন্তলা তখন তাঁকে তাঁর জন্মবৃত্তান্ত বললেন। তারপর বললেন, ‘শরীরদাতা, প্রাণদাতা, অন্নদাতাকে শাস্ত্রমতে পিতা বলা হয়। মহারাজ! আমাকে কণ্বমুনির দুহিতা বলেই জানবেন।’ শকুন্তলা যখন কুটির থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন কোনো কথাবার্তা বলার পূর্বেই তাঁকে দেখে তৎক্ষণাৎ দুষ্মন্তের কামস্পৃহা প্রজ্বলিত হুতাশনের মতো লেলিহান হয়ে উঠেছিলো। তিনি বললেন, ‘তোমার লাবণ্যসলিলে আমি আকণ্ঠ মগ্ন। তোমার শরীরের উপর তোমার কর্তৃত্ব, তাই তুমি আত্মসমর্পণ না করলে তোমাকে পেতে পারছি না, তুমি প্রার্থনা পূরণ করো।’ তখন শকুন্তলার মতো একটি সরল মধুর অপাপবিদ্ধ আশ্রমকন্যার পক্ষে যা নিতান্তই অস্বাভাবিক, দেহ সমর্পণ করার পূর্বে তিনি কিন্তু সেই রকমই একটি প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিলেন দুষ্মন্তকে দিয়ে। ঠিক সত্যবতীর মতো বললেন, ‘আপনার ঔরসে আমার গর্ভে যে পুত্র জন্মাবে, আপনি বিদ্যমানে সে যুবরাজ হবে এবং অবিদ্যমানে রাজা হবে।’

দুষ্মন্ত বললেন, ‘নিশ্চয়, নিশ্চয়।’ তারপরই গন্ধর্ব মতে বিবাহ করে শকুন্তলার সমর্পিত দেহ নিয়ে সঙ্গমক্রীড়া সম্পন্ন করে চলে গেলেন। বলে গেলেন, ‘আমি তোমাকে যোগ্য সমাদরে নিয়ে যাবার জন্য চতুরঙ্গিণী সেনা পাঠাবো, রানীর সম্মানে তুমি রাজভবনে প্রবিষ্ট হবে।’ ব্যাস, সেই যে গেলেন আর কোনো খবর নেই।

ইতিমধ্যে যথাসময়ে শকুন্তলার মহাপরাক্রান্ত, মহাবল, অলৌকিক গুণসম্পন্ন এক পুত্রের জন্ম হলো। এর পরের ঘটনায় আসবার পূর্বে একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করতে বলি। মহাভারতের সমস্ত বিখ্যাত কন্যার জন্মই রূপকথার আচ্ছাদনে আবৃত। ইন্দ্রের নির্দেশে বিশ্বামিত্রের তপোভঙ্গ করে তাঁর সঙ্গে সঙ্গমজাত কন্যাকে জন্মানো মাত্রই তার মাতা অপ্সরা মেনকা মালিনী নদীর তীরে হিংস্র জন্তু সমাকীর্ণ নির্জন বনে নিক্ষেপ করে চলে গেলেন। কণ্বমুনি নদীতে স্নান করতে গিয়ে দেখলেন পক্ষীরা একটি সদ্যোজাত শিশুকে জন্তু জানোয়ারের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ঘিরে বসে আছে। মুনি দয়াপরবশ হয়ে কন্যাটিকে এনে স্বীয় আশ্রমে স্বীয় কন্যার মতো পালন করতে লাগলেন। সত্যবতীর জন্মবৃত্তান্ত আরো অদ্ভুত। তিনি জন্মান মাছের পেটে। গল্পটা এই, রাজা উপরিচর বসুর মৃগয়ায় গিয়ে বসন্তের শোভা নিরীক্ষণ করতে করতে স্ত্রীর জন্য কামনার উদ্রেক হয়। এবং সেই কারণে তাঁর শুক্র স্খলিত হয়। সেই শুক্র গ্রহণ করে এক মৎসীরূপী অপ্সরা গর্ভবতী হয়। কন্যা জাত হবার পর সেই অপ্সরা শাপমুক্ত হয়ে আকাশপথে চলে গেলে মৎসীর গর্ভজাত কন্যাকে পালন করেন এক ধীবর। সেই থেকে ধীবরকন্যা রূপেই সত্যবতীর পরিচয়। পঞ্চপাণ্ডববধূ দ্রৌপদী যজ্ঞবেদী থেকে উত্থিতা। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন এই সব কন্যাদের জন্মবৃত্তান্ত কেন রহস্যাবৃত করেছিলেন, তখনকার সমাজে এই সব কন্যাদের প্রকৃত জন্মবৃত্তান্ত বলায় বাধা ছিলো বলেই কি তিনি অলৌকিকের আশ্রয় নিয়েছিলেন, সে কৌতূহল থেকেই যায়।

শকুন্তলার পুত্রের ছয় বৎসর বয়স হয়ে গেলেও যখন তার পিতা দুষ্মন্ত পত্নীকে সাড়ম্বরে নিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, কোনো খোঁজই আর নিলেন না, তখন কণ্বমুনি সপুত্র শকুন্তলাকে পতিগৃহে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু রাজা তাঁর পত্নী ও পুত্রকে গ্রহণ করলেন না। কটু ভর্ৎসনা করে সম্পর্ক অস্বীকার করলেন। তাঁকে বললেন, ‘স্ত্রীলোকেরা প্রায়ই মিথ্যেকথা বলে। কে তুমি দুষ্ট তাপসী? আমি তোমাকে চিনি না।’

সভাসদস্যদের সম্মুখে স্বামীর এই উক্তিতে শকুন্তলা প্রথমে স্তম্ভিত হলেও, পরে অপমানে লজ্জায় দুঃখে বিদীর্ণ হয়ে রোষকষায়িত রক্তচক্ষুর দ্বারা অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করে বললেন, ‘জেনেশুনেও কেন অসংকোচে প্রাকৃতজনের মতো কথা বলছো জানি না। আমি যা বলেছি তা সত্য কি সত্য নয় সে বিষয়ে তোমার অন্তঃকরণই সাক্ষী।’ দুষ্মন্ত তখন শকুন্তলার মাতাকে অসতী এবং পিতাকে কামুক বলায় শকুন্তলা জ্বলে উঠে বললেন, ‘জন্মের বিচারে আমি তোমার চাইতে অনেক উৎকৃষ্ট। শূকর যেমন মিষ্টান্ন ত্যাগ করে পুরীষ গ্রহণ করে, ইতরজন তেমনই সত্যকে ত্যাগ করে মিথ্যার আশ্রয় নেয়। তোমার সহায়তা ছাড়াই আমার পুত্র পৃথিবীর সম্রাট হবে।’

এই সময়ে স্বর্গ থেকে দৈববাণী হলো (যা মহাভারতে সর্ব সময়েই হয়ে থাকে এবং লোকেরা সুবিধেমতো গ্রহণ করে বা করে না), ‘শকুন্তলাকে অপমান করো না, তাঁর সব কথাই সত্য। তাঁর গর্ভজাত স্বীয় পুত্রকে তুমি প্রতিপালন করো। এবং যেহেতু আমাদের অনুরোধে এই পুত্রকে ভরণ করা হলো, তার নাম হোক ভরত।’ এই নাম থেকে ভরতবংশের উৎপত্তি। এই বংশ নিয়েই মহাভারত রচয়িতা সমস্ত আখ্যানটি রচনা করেছেন। দৈববাণী শুনে অমনি দুষ্মন্ত বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, সে তো আমি জানি। কিন্তু হঠাৎ তোমাকে গ্রহণ করলে লোকে আমাকে কী বলতো? এইজন্য এতোক্ষণ বিতণ্ডা করছিলাম তোমার সঙ্গে।’

আসলে শকুন্তলার অনবনত তেজ দেখে দুষ্মন্ত ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। তদ্ব্যতীত, শকুন্তলা বলেছিলেন, ‘আমার পিতা কণ্বমুনি এসব কথা জানতে পারলে তোমার মস্তক বিদীর্ণ হবে।’ এ কথাও বুঝতে পেরেছিলেন, এই মেয়ে কলঙ্কের ভয়ে বা লজ্জায় পিছিয়ে যাবার পাত্রী নয়। এ তাঁকে সহজে ছেড়ে দেবে না। কিন্তু শকুন্তলা যদি আশ্রমকন্যা না হতেন তবে কক্ষনো রাজাকে এ ভাবে শঙ্কিত করতে সাহস পেতেন না। যে বিবাহ দুষ্মন্ত কামবশত সকলের অজ্ঞাতে করে এসে মুখ মুছে বসেছিলেন, সেই বিবাহ কিছুতেই মেনে নিতেন না। কিন্তু শকুন্তলা আশ্রমের স্বাধীনতায় বর্ধিত বলেই আহত হলে আঘাত ফিরিয়ে দেবার মনের জোর তাঁর ছিলো। তাই রাজসভায় দাঁড়িয়ে সভাসদদের সামনে একাধারে স্বামী এবং ওরকম এক পরাক্রান্ত রাজাকে এভাবে স্পষ্ট বাক্যে মিথ্যাবাদী দুরাচারী পাপিষ্ঠ থেকে শুরু করে তাঁর মিথ্যাচারকে শূকরের বিষ্ঠাভক্ষণের সঙ্গে পর্যন্ত তুলনা করে তিরস্কার করতে পেরেছিলেন।

চলবে...
বাকি পর্বগুলো পড়ুন এই লিঙ্কেঃ https://www.amarboi.com/search/label/mahabharatera-maharanye
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

মহাভারতের মহারণ্যে - প্রতিভা বসু [১২]

amarboi
মহাভারতের মহারণ্যে
প্রতিভা বসু

১২
পরামর্শের পরে কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জুন ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে মগধপুরে গমন করলেন। পথে যেতে যেতে নানাবিধ অন্যায় কর্মে নিরত করলেন নিজেদের। সারি সারি সব দোকান শূন্য করে ফেলে দিলেন, কাউকে কুবাক্য বললেন, তারপর দ্বারদেশে এসে নগরচৈত্যের সম্মুখে উপস্থিত হলেন।

জরাসন্ধ বৃষরূপধারী দৈত্যকে সংহার করে তার চর্ম দিয়ে তিনটি ভেরী প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। সেই ভেরীতে একবার আঘাত করলে একমাসব্যাপী গম্ভীর ধ্বনি অনুরণিত হতো। মহারাজা নিজপুরীতে সেই ভেরী তিনটি রেখেছিলেন। ভেরীগুলো এঁরা ভেঙে ফেললেন। তারপর নিজেদের অস্ত্র-শস্ত্র পরিত্যাগ করে জরাসন্ধের সঙ্গে বাহুযুদ্ধ করবার জন্য পুরপ্রবেশ করে জরাসন্ধের নিকট সমুপস্থিত হলেন।

মহারাজা জরাসন্ধ তাঁদের দেখে ব্রাহ্মণ ভেবে সত্বর গাত্রোত্থান করে, মধুপর্ক ইত্যাদি দ্বারা পাদ্য পূজা করে, স্বাগত প্রশ্ন করলেন। ভীম অার অর্জুন চুপ করে রইলেন। কৃষ্ণ বললেন, ‘হে রাজেন্দ্র! এঁরা নিয়মস্থ। এঁরা এখন কথা বলবেন না। এঁরা পূর্বরাত্রি অতীত হলে আপনার সঙ্গে আলাপ করবেন।’ ভেবে দেখুন কী সহজে মিথ্যে কথা বলতে পারেন কৃষ্ণ!

সেদিন কোনো পূজা নিবন্ধন মহারাজা জরাসন্ধ উপবাসী ছিলেন। একথা শুনে তাঁদের যজ্ঞাগারে রেখে স্বীয় গৃহাভ্যন্তরে প্রবিষ্ট হলেন। কিন্তু কোনো স্নাতকব্রাহ্মণ অর্ধরাত্র সময়ে উপস্থিত হলে তিনি তৎক্ষণাৎ গমন করলেও প্রত্যুদ্গমন করতেন। অর্ধরাত্রে এসে পুনরায় তিনি তিনজনের সমীপে উপস্থিত হয়েই পূজা করলেন। একটু আশ্চর্য হয়ে বললেন, ‘হে বিপ্রগণ! আমি জানি স্নাতকব্রহ্মচারী ব্রাহ্মণগণ সভাগমন ব্যতীত কখনো মাল্য বা চন্দন ধারণ করেন না। আপনারা কে?’

কৃষ্ণ বললেন, ‘হে বৃহদ্রথনন্দন! ধীর ব্যক্তিগণ শত্রুগৃহে অপ্রকাশ্যভাবেই প্রবেশ করে। আমরা স্বকার্য সাধনার্থে শত্রুগৃহে প্রবেশ করেছি।’

জরাসন্ধ বললেন, ‘হে বিপ্রগণ! আমি কখন আপনাদের শক্রতা করেছি? কী নিমিত্ত আমাকে শত্রু বলে স্থির করলেন? আমি সতত স্বধর্ম সাধনে নিয়ত থাকি। প্রজাদের ব্যথিত করি না। নিশ্চয়ই আপনাদের কোনো প্রমাদ ঘটেছে।’

গভীর রাত্রির নির্জন মুহূর্তে দুটি বলবান যোদ্ধার আশ্রয়ে সাহসী হয়ে উঠে কৃষ্ণ স্বমূর্তি ধারণ করে বললেন, ‘তোমাকে কপট সংহার করতেই আমরা এখানে এসেছি। আমরা ব্রাহ্মণ নই। আমি বসুদেবনন্দন কৃষ্ণ, এঁরা দুজন পাণ্ডুতনয়।’

এরপর ভীমের সঙ্গে জরাসন্ধের প্রবল যুদ্ধ শুরু হলো। চতুর্দশ দিবসে ধূর্ত কৃষ্ণ ক্লান্ত মগধরাজকে কীভাবে হত করা যাবে জানাতে ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে ভীমের দিকে তাকালেন, বললেন, ‘হে ভীম! তোমার যে দৈববল ও বাহুবল আছে, আশু সেটা জরাসন্ধকে প্রদর্শন করাও।’ বলামাত্র ভীম অব্যবস্থিত, ক্লান্ত, উপবাসী, অসতর্ক, জরাসন্ধকে তাঁর দানবীয় শক্তি দিয়ে উৎক্ষিপ্ত করে ঘূর্ণিত করতে লাগলেন। তারপর হাঁটু দিয়ে চেপে বসে তাঁর পৃষ্ঠদেশ ভগ্ন ও নিষ্পেষণ করে তাঁর পদদ্বয় দুহাতে ধরে দ্বিধা-বিভক্ত করলেন। কৃষ্ণ এবং অর্জুন বসে বসে সেই নারকীয় দৃশ্য উপভোগ করলেন।

অবশ্য আমি যতো সহজে যুদ্ধের শেষ দৃশ্যে এনে ফেলেছি এতো সহজে ভীম এখানে এসে পৌঁছতে পারেননি। কিন্তু সেই বর্ণনায় গিয়ে লাভ নেই। প্রকৃত পক্ষে, কৃষ্ণের লুকিয়ে পালিয়ে থাকা জীবন থেকে এতোদিন মুক্তি ঘটলো। এই কারণেই, এতোকাল পরে, নব পরিচিত এই যুবকদের সঙ্গে তাঁর বাড়াবাড়ি বন্ধুতার কার্যকারণটাও বুঝতে অসুবিধে হলো না। জরাসন্ধকে হত্যা করে এসে তিনি হাঁপ ছাড়লেন। এবং দেশে দেশে রটে গেলো পুরষোত্তম কৃষ্ণ, মহাবল ভীম, অজেয় যোদ্ধা অর্জুন, জরাসন্ধকে নিহত করেছেন।

পাণ্ডবরা যা করেছেন সবই ক্ষাত্রধর্ম বিরুদ্ধ। এভাবে গোপনে কারো অন্তঃপুরে প্রবেশ করে অসতর্ক গৃহস্থকে হত্যা করা, কেবলমাত্র ক্ষত্রিয়ই নয়, যে কোনো মনুষ্যের পক্ষেই অতিশয় গূঢ় অপরাধ বলে গণ্য। প্রথম দিন থেকে শেষদিন পর্যন্ত পাণ্ডবরা এই কর্মই করে গেছেন। কিন্তু তাতে তাঁদের কোনো নিন্দা নেই মহাভারতে। আইনত ফাঁসির যোগ্য অপরাধও বীরত্ব বলে ঘোষিত হয়েছে। আমরা পাঠকরা সেটা মেনে নিতে পারি না। যা অন্যায় তা অন্যায়ই, সেটা যিনিই করুন।

চলবে...
বাকি পর্বগুলো পড়ুন এই লিঙ্কেঃ https://www.amarboi.com/search/label/mahabharatera-maharanye

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

মহাভারতের মহারণ্যে - প্রতিভা বসু [১১]

amarboi
মহাভারতের মহারণ্যে
প্রতিভা বসু

১১
খাণ্ডবদাহন পর্বাধ্যায়ে কৃষ্ণ এবং অর্জুন শিল্পকর্ম বিশারদ ময়দানবের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। একদিন ময়দানব এসে তাঁর কৃতজ্ঞতা জানাতে যুধিষ্ঠিরের জন্য একটি উৎকৃষ্ট সভা নির্মাণ করে দেবার অভিলাষ জানালো। এ কথায় দুজনেই প্রীত হয়ে সম্মতি জানালে, ময়দানব বহু পরিশ্রম করে এমন একটি সভাস্থল নির্মাণ করলো যে-সভা ভূমণ্ডলে আর কারো নেই। নিজের কোনো যোগ্যতা না থাকলেও, ঈশ্বর যাকে সমস্ত রকম সুখ সম্মান আহ্লাদ দিতে ইচ্ছে করেন, সে অবশ্যই ভাগ্যবান। তার আর কোনো পুরস্কারের প্রয়োজন হয় না। অবিশ্রান্ত ভাগ্যই তাকে সমস্তরকম সুখ স্বাচ্ছন্দ্য দিয়ে ঘিরে রাখে। যুধিষ্ঠির সেই অলৌকিক অসাধারণ ভাগ্য নিয়েই জন্মেছিলেন। ভ্রাতাদের প্রসাদেই তিনি সব কিছুর অধিকর্তা। অতএব ময়দানবের তৈরি তুলনাহীন সভাটিতেও তিনিই বসবার অধিকারী হলেন। বিদুরের বুদ্ধিতে পা ফেলে ফেলে চলে, ব্যাসদেবের সহায়তায়, অর্জুনের বীরত্বে, ভীমের বলে, আজ তিনি অদ্বিতীয়া রূপবতী পত্নীর পতি হয়ে যেন যাদুবলে এমন একটি রাজ্যের এমন এক আশ্চর্য সভার সর্বাধিপতি। অথচ এতো কিছু পাবার জন্য একটি আঙুলও তাঁকে নাড়তে হয়নি।

অনুপার্জিত ক্ষমতায় পার্থিব সুখসমৃদ্ধির তুঙ্গে উঠে যুধিষ্ঠিরের লোভ আরো উর্ধ্বগামী হলো। মনে মনে তাঁর সম্রাট হবার বাসনা উদিত হলো। ক্রমে ক্রমে সেই ইচ্ছা তাঁকে অস্থির করে তুললো। রাজসূয় যজ্ঞ করবার বাসনায় তিনি যৎপরোনাস্তি ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। মন্ত্রিগণ ও অনুজদের আহ্বান করে বললেন সেকথা। পরামর্শ করবার জন্য কৃষ্ণকেও দূত পাঠিয়ে আনয়ন করলেন। কৃষ্ণ যথাসম্ভব শীঘ্র এসে উপস্থিত হলেন। যখন শুনলেন যুধিষ্ঠির রাজসূর যজ্ঞ করবার জন্য লালায়িত হয়েছেন, ভিতরে ভিতরে সম্ভবত তাঁর মন আনন্দে কম্পমান হলো। বোধহয় তৎক্ষণাৎ তাঁর মনে হলো যা তিনি চেয়েছেন এঁদের সঙ্গে বন্ধুতার বিনিময়ে, সেই সুযোগ সমুপস্থিত। বললেন, ‘একটা কথা, যজ্ঞ যদি নির্বিঘ্নে সমাপন করতে চান, তা হলে আপনার প্রথম কর্তব্য হবে জরাসন্ধকে নিধন করা।’

যুধিষ্ঠির অনুজদের দিকে তাকালেন। সাধ-আকাঙ্ক্ষা যুধিষ্ঠিরের, যাঁরা মেটাবেন তাঁরা ভ্রাতারাই। তিনি যে অযোগ্য তা তিনি জানেন। এ পর্যন্ত যা হয়েছে বা যা হতে পেরেছে সব কিছুর জন্য তো ভ্রাতাদের অনুকম্পাই তাঁর সম্বল। ভ্রাতারা কৃষ্ণের দিকে তাকালেন। কৃষ্ণ বললেন, ‘মহীপতি জরাসন্ধ স্বীয় বাহুবলে সমস্ত ভূপতিগণকে পরাজিত করে, তাদের দ্বারা পূজিত হয়ে, অখণ্ড ভূমন্ডলে একাধিপত্য স্থাপন করেছে। তাকে পরাজিত করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।’

তৎক্ষণাৎ যুধিষ্ঠির ভয় পেলেন। বললেন, ‘হায় হায়! আমি তো তোমারই বাহুবল আশ্রয় করে আছি। যখন তুমিই জরাসন্ধকে ভয় করো, তখন আমি নিজেকে কী করে বলবান মনে করবো?’ এই পঞ্চভ্রাতা এতোদিন বিদুরের চাতুর্যে ও ব্যাসদেবের সহায়তায় এইখানে এসে পৌঁছেছেন। এর মধ্যে জতুগৃহে অগ্নি প্রজ্বলিত করে কতোগুলো ঘুমন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারা ব্যতীত তাঁদের নিজেদের অন্য কোনো কৃতিত্ব মাহাত্ম্য বা বীরত্বের কোনো প্রমাণ ছিলো না। একমাত্র অর্জুনের লক্ষ্যভেদটাই উল্লেখযোগ্য। সেখানেও তিনি অদ্বিতীয় নন। অর্জুনের পূর্বে সেটা কর্ণই করেছিলেন।

যুধিষ্ঠিরের ভীতি দেখে কৃষ্ণ যে বিষয়ে অতি দক্ষ, নিভৃতে সেই পরামর্শটি দিলেন। বললেন, ‘একটা উপায় আছে, যদি আজ্ঞা করেন তো বলি।’

যুধিষ্ঠির উৎসুক হলেন। কৃষ্ণ বললেন, ‘দেখুন, আমি নীতিজ্ঞ, ভীমসেন বলবান, এবং অর্জুন আমাদের রক্ষক। অতএব, তিন অগ্নি একত্র হয়ে যেমন যজ্ঞ সম্পন্ন করে, তেমনই আমরা তিনজন একত্র হয়ে জরাসন্ধের বধসাধন করবো। আমরা তিনজন নির্জনে আক্রমণ করলে জরাসন্ধ নিশ্চয়ই একজনের সঙ্গে সংগ্রাম করবে। সে অবমাননা, লোভ ও বাহুবীর্যে উত্তেজিত হয়ে ভীমের সঙ্গে যুদ্ধ করবে সন্দেহ নেই। তখনি ভীমসেন তাকে সংহার করতে পারবে।’

কী অন্যায়! এর নাম কি বীরত্ব? কিন্তু এঁরাই মহাভারতের শ্রেষ্ঠ বীর বলে বর্ণিত। কোনো রাজা বা রাজপুত্র কখনো এভাবে শত্রুসংহার করে না, তাতে তাঁদের অপমান হয়। এবং কৃষ্ণও জানেন জরাসন্ধও করবেন না। ধর্মত দুর্যোধনও এই ধরনের কর্ম কখনও ভাবতে পারবেন না। কিন্তু যিনি মহাত্মা ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির, তিনি এই প্রস্তাবে ভীষণ খুশি হলেন। লুকিয়ে কোনো অন্তঃপুরে ঢুকে, তাঁর আতিথ্যে সমাদৃত হয়ে, সহসা সেই মানুষকে তাঁর অসতর্ক মুহূর্তে খুন করার মধ্যে যে যথেষ্ট পরাজয় আছে, অন্যায় আছে, অধর্ম আছে, একবার‍ও সেকথা তাঁর মনে হলো না। যে কোনো বীরের পক্ষে সেই অপমান মৃত্যুর অধিক। মহাত্মা যুধিষ্ঠিরের মন কিন্তু এই প্রস্তাব অসততার চূড়ান্ত বলে বর্জন করলো না।

আর এদিকে অর্জুনের মতো একজন মহাবীরের কাছেও সেই প্রস্তাব কাপুরুষতার নামান্তর হিশেবে গণ্য হলো না। ইতিহাস যাঁকে ধর্মের ধ্বজা বলে চিহ্নিত করেছে এবং যাঁকে বীরত্বের শেষ সীমা বলে প্রচার করেছে, তাঁদের দুজনের একজনও এই বুদ্ধিকে কুবুদ্ধি বলে বর্জন করলেন না। বীরশ্রেষ্ঠ অর্জুন ও মহাবীর ভীম চুপ করে রইলেন, শ্রেষ্ঠ ধার্মিক যুধিষ্ঠির বললেন, ‘তুমি প্রজ্ঞা নীতি বল ক্রিয়া ও উপায় সম্পন্ন। অতএব ভীম ও অর্জুন কার্যসিদ্ধির জন্য তোমাকেই অনুসরণ করুন।’

যিনি প্রকৃত বীর তিনি যে কখনোই বীরত্বকে অবমাননা করেন না, কৃষ্ণ সেটা জানেন। সেটা তাঁদের পক্ষে অপমান, অমর্যাদা, এবং অধর্ম। নচেৎ, কীরূপে জ্ঞাত হলেন যে নিরুপায় লোকটিকে তিনজনে আক্রমণ করলেও তিনি সর্বাপেক্ষা যিনি বলবান তাঁর সঙ্গেই যুদ্ধ করবেন? একজন বীরশ্রেষ্ঠর পক্ষে সেটাই তাঁর যোগ্যতার সম্মান এবং প্রমাণ। সারা মহাভারত ভর্তি কোটি কোটি অক্ষরের প্রকাশে যাঁকে সর্বশ্রেষ্ঠ বীর হিশেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সেই অর্জুন কিন্তু যুদ্ধের সময় প্রকৃতপক্ষে কোনো বড়ো যোদ্ধার সঙ্গেই শঠতা ব্যতীত বীরত্বের প্রমাণ দেননি। আর যিনি ধর্মাত্ম মহাত্মা সত্যবাদী যুধিষ্ঠির, তিনি নিজে অক্ষম হয়েও, অপরের পারঙ্গমতার সাহায্যে তাঁর নিজের লোভ চরিতার্থের জন্য যে কোনো পাপকর্মে অন্যদের লিপ্ত হতে দিতে মুহূর্তমাত্র দ্বিধা করেননি। যে কর্ম করতে কর্ণ এবং দুর্যোধন ঘৃণা বোধ করতেন, লজ্জা বোধ করতেন, এঁরা সেটা অনায়াসে করেন।

চলবে...
বাকি পর্বগুলো পড়ুন এই লিঙ্কেঃ https://www.amarboi.com/search/label/mahabharatera-maharanye


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

মহাভারতের মহারণ্যে - প্রতিভা বসু [১০]

amarboi
মহাভারতের মহারণ্যে
প্রতিভা বসু

১০

এর পরবর্তী আখ্যানটি আরম্ভ করতে হচ্ছে অতি ক্ষমতাশীল রাজা দ্রুপদের অন্তঃপুর থেকে, যে অন্তঃপুরে তিনি যজ্ঞ থেকে উত্থিতা একমাত্র কন্যাকে পাঁচটি ভ্রাতার পাণিস্থ করেছেন এবং ভেবেছেন আমার তুল্য বলশালী রাজা আর কেউ থাকলো না এ জগতে। সেই সময়ে একটি পত্নী নিয়ে পাঁচটি ভ্রাতাও দ্রুপদের অন্তঃপুরে যথেষ্ট আহ্লাদের সঙ্গে দিনযাপন করছিলেন। তবে তাঁদের পত্নীর মন সেই আহ্লাদের সঙ্গে কতোটা যুক্ত ছিল সে কথা কেউ ভাবেননি। তাঁর নিজের প্রেমিক, যাঁকে সত্যিই তিনি নিজের নির্বাচিত স্বামী হিশেবে গ্রহণ করেছিলেন, সেই অর্জুনকে তখনো পাননি তিনি, তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাই ভোগ করছিলেন কনিষ্ঠ ভ্রাতৃবধূকে। যার যার স্বার্থসিদ্ধির কারণে সকলেই তাঁকে বলিদানের পাঁঠা হিশেবে ব্যবহার করছিলেন। স্বয়ং ব্যাসদেবই যুধিষ্ঠিরের জন্য সমাজবিরোধী এই কর্মটি করতে নানান ছলে বলে কৌশলে দ্রুপদরাজা আর তার পুত্রকে প্রভাবিত করলেন। অর্জুনকে মাল্যদান করবেন বলেই, পিতা-ভ্রাতার প্রতিজ্ঞা লঙ্ঘন করে দ্রৌপদী চেঁচিয়ে উঠেছিলেন, ‘আমি সূতপুত্রকে বিবাহ করবো না।’ অর্জুন বিষয়ে দ্রৌপদীর মনে নিশ্চয়ই অনেক স্বপ্ন ছিলো, পিতা-ভ্রাতার ঘোষণা লঙ্ঘন করে বরণও করলেন তাঁকে, কিন্তু রাজনীতির যূপকাষ্ঠে সেইসব স্বপ্নের কোনো ঠাঁই নেই। যে পিতা-ভ্রাতা তাঁদের আদেশ লঙ্ঘন করে কর্ণকে অসম্মান করার জন্য বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না, যেহেতু তাঁদের নির্বাচিত জামাতা অজুর্নই ছিলেন, সেই পিতা-ভ্রাতাই ব্যাসদেবের পরামর্শে যে আজ্ঞা পালনে বাধ্য করলেন কন্যাকে, সেই বাধ্যতা রক্ষা করা আর মৃত্যু, দুই-ই হয়তো তখন সমতুল্য মনে হয়েছিলো দ্রৌপদীর। তাঁর শ্বশ্রূমাতা কুন্তী স্বেচ্ছায় পাঁচটি পুরুষের অঙ্কশায়িনী হয়েছিলেন। কিন্তু দ্রৌপদীর মতো একটি অনাহত শুদ্ধ চরিত্রের কন্যা পতি হিশাবে অর্জুনকে মাল্যদান করে তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার শয্যায় যেতে যে নিজেকে অতিমাত্রায় কলুষিত লাঞ্ছিত বঞ্চিত মনে করেননি তা কি হতে পারে? কুন্তী তাঁকে পদার্থ বললেও সত্যি তো তিনি পদার্থ নন। অর্জুন বস্তুতই আকর্ষণীয় পুরুষ। বীরত্বেও কর্ণ ব্যতীত আর কেউ তাঁর সমতুল্য আছেন কিনা সন্দেহ। সেই ইপ্সিত প্রেম ও বাসনা নিয়ে যখন তাঁর হৃদয় থরোথরো তখনই যেতে হলো অর্জুনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা যুধিষ্ঠিরের শয্যায়। স্বীয় উপভোগান্তে যুধিষ্ঠির সেই ‘পদার্থ’ নামের দেহটা পাঠিয়ে দিলেন ভীমের শয্যায়। ইতিমধ্যে অর্জুনের নির্বাসনও হয়ে গেল বারো বছরের জন্য, যেহেতু, যুধিষ্ঠির যখন দ্রৌপদীর সঙ্গে ছিলেন তখন নিয়মবিরুদ্ধভাবে কোনো অনিবার্য কারণে অর্জুনকে সেই ঘরে ঢুকতে হয়েছিলো। কে জানে কতো নিঝুম রাতের অন্ধকারে চোখের জলে ভেসে গেছে দ্রৌপদীর হৃদয়ের সব স্বপ্ন।

তার উপরে অর্জুনকে এই নির্বাসন! এই নির্বাসন মেনে নিতে অর্জুনেরও কি কোনো কষ্ট হয়নি? হয়েছে। তিনি ইচ্ছাক্রমে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার ঘরে যাননি। কোনো মানবিক কারণে একজনকে রক্ষা করা নিতান্তই প্রয়োজন ছিলো বলে গিয়েছিলেন। অবশ্য অর্জুনের নির্বাসন বা দ্রৌপদীর অর্জুনকে না পাওয়া নিয়ে ব্যাসদেব একটি লাইনও লিখে সময় নষ্ট করেননি। এটা ধরেই নিতে বলেছেন, কুন্তীর আদেশ পূর্ণ না করলে কুন্তীকে অনৃতভাষণের দায়ে পড়তে হয়, এবং পূর্বজন্মে দ্রৌপদী পাঁচবার বর চেয়ে এ জন্মে পঞ্চপতির পত্নী হয়েছেন।

এদিকে বিদুর যেই জানলেন দুর্যোধন আর কর্ণ সেই স্বয়ংবর সভা থেকে হতদর্প হয়ে প্রত্যাবৃত হয়েছেন, আনন্দ আর ধরে না। ধৃতরাষ্ট্রকে দুঃখ ও হতাশায় জর্জরিত করতে তখুনি ছুটলেন খবর দিতে। গিয়ে ভালোমানুষের মতো বললেন, ‘মহারাজ! ভাগ্যবলে কৌরবেরাই জয়ী হয়ে ফিরেছেন।’ সংবাদ শুনে ধৃতরাষ্ট্র পরম সন্তুষ্ট হয়ে বলতে লাগলেন, ‘বিদুর, তুমি আজ আমাকে কী শুভ সমাচারই না প্রদান করলে।’ আসলে বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে অতিমাত্রায় জব্দ করবার মানসেই ‘কৌরবেরা’ বলেছিলেন। বিদুরের জালে মাছের মতো আবদ্ধ ধৃতরাষ্ট্র সেই ‘কৌরবেরা’ শুনে মনে করলেন তাঁর পুত্র দুর্যোধনই জয়ী হয়েছে। চতুর বিদুর এই অন্ধ অনুগত রাজাটিকে নিয়ে কতো খেলাই না করেছেন। ধৃতরাষ্ট্র উৎসাহিত এবং উত্তেজিত হয়ে আজ্ঞা প্রদান করলেন, যেন দুর্যোধন দ্রৌপদীকে বহুবিধ ভূষণে ভূষিত করে তাঁর সম্মুখে আনয়ন করেন।

অর্থাৎ ধৃতরাষ্ট্র বিদুরের জালে ধরা দিলেন। ছটফটে মাছের মতোই আনন্দ ও উত্তেজনায় অস্থির হয়ে গেলেন। এই সময় বিদুর বললেন, ‘মহারাজ! বরমাল্য পাণ্ডবেরাই প্রাপ্ত হয়েছেন।’ ভয় দেখাবার জন্য বললেন, ‘সেই স্বয়ংবর প্রদেশে তুল্যবলশালী অনেকানেক বন্ধুবান্ধব এসে তাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন।’

ধৃতরাষ্ট্র যতোটা ভেঙে পড়বেন বলে ভেবেছিলেন, ঠিক সেই রকম কোনো প্রতিক্রিয়া তাঁর হলো না। বরং বললেন, ‘দ্রুপদের সঙ্গে মিত্রতা করে কোন ক্ষত্রিয় কৃতকার্য হতে বাসনা করে না? আমার বিলক্ষণ প্রতীতি হচ্ছে যে আমার দুরাত্মা পুত্রদিগের আর নিস্তার নেই।’

অনন্তর, দুর্যোধন এবং কর্ণ ধৃতরাষ্ট্রের নিকট আগমনপূর্বক নিবেদন করলেন, ‘তাত, বিদুরের সন্নিধানে আমরা কোনো প্রকার দোষ কীর্তন করতে পারবো না, এ আপনার কীদৃশ ইচ্ছা? বিপক্ষের বুদ্ধি আপন বুদ্ধি বলে মনে করছেন। বিদুরের নিকট সপত্নদের স্তুতিবাদ করছেন। এবং কর্তব্য কর্মে মনোযোগ দিচ্ছেন না। হে তাত! শত্রুদিগের বল বিঘাত করা সর্বতোভাবে কর্তব্য হয়েছে। এখন আমাদের এমন একটি মন্ত্রণা করা আবশ্যক যাতে তারা আমাদের সর্বস্ব গ্রাস করতে না পারে। যেন আপনাকে উচ্ছেদ না করে।’

এরপরে একটি মন্ত্রণা সভা বসলো। ভীষ্ম দ্রোণ ইত্যাদির সমতুল্য বোধে ধৃতরাষ্ট্র সেই মন্ত্রণা সভায় বিদুরকেও আমন্ত্রণ না করে পারলেন না। ভীষ্ম দুর্যোধনকে বললেন, ‘পাণ্ডবদের সঙ্গে যুদ্ধ করা আমার অনভিমত। যেমন তুমি ধর্মত রাজ্যলাভ করেছো, তাঁরাও ইতিপূর্বে সে রকম রাজ্যাধিকার প্রাপ্ত হয়েছিলেন। অতএব বিবাদে প্রয়োজন নেই, সৌহার্দ্যপূর্বক তাদের রাজ্যার্ধ প্রদান করলেই উভয়পক্ষের মঙ্গল।’

বিদুর বললেন, ‘মহারাজ! পাণ্ডব-জ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরকে রণে সহ্য করে এমন লোক ত্রিজগতে লক্ষ্য হয় না। যে মহতী অকীর্তি লোকবিদিত হয়েছে, সেটা স্খলন করুন। আমি তো আপনাকে পূর্বেই বলেছি দুর্যোধনের অপরাধে এই সুবিস্তীর্ণ রাজবংশ উচ্ছিন্ন হবে।’

আমরা পাঠকরা এ-কথাটা অবশ্যই বলতে পারি, দুর্যোধনের জন্যই বিদুর নামক পাপিষ্ঠটি অন্ধ দুর্বল ধৃতরাষ্ট্র নামের রাজাটিকে, এবং তাঁর রাজ্যটিকে, খুব সহজে গ্রাস করতে পারছিলেন না। কেননা রাজা হিশাবে দুর্যোধন প্রকৃতই একজন শ্রেষ্ঠ পুরুষ। তাঁকে হটানো যে সহজ নয় সে বুদ্ধিটুকু বিদুরের ছিলো। প্রকৃতপক্ষে, দুর্যোধন তাঁর রাজ্য স্বীয় বুদ্ধিতে স্বীয় চেষ্টায় অনেক বাড়িয়ে ফেলেছিলেন। রাজন্যবর্গের মধ্যে তিনি অত্যন্ত সম্মানিত রাজা। বিদুরের জীবনে দুর্যোধন এজন্যই সবচেয়ে বড় শত্রু। এই শত্রুর জন্যই তিনি যা চান সেটা সহজে করতে পারেন না। সেই কারণেই দুর্যোধনের প্রতি তাঁর ক্রোধ তাঁকে মুহূর্তের জন্যও শান্তিতে জীবনধারণ করতে দিচ্ছিলো না। বিদুরকে সবাই ধর্ম বলে জানে, বিদুর যখন যা বলেন এবং করেন সেটা ন্যায্য বলে সকলে ভাবতে অভ্যস্ত। মাঝখান থেকে এই দুর্যোধনই তাঁকে চুড়ান্ত অবিশ্বাসী জেনে অত্যন্ত সন্দেহের চোখে দেখেন।

শেষ সিদ্ধান্তে ভীষ্মও যা বললেন, দ্রোণও তাই বললেন। ধৃতরাষ্ট্র বললেন, ‘হে বিদুর। তা হলে তুমি যাও। সৎকার প্রদর্শন পূর্বক কুন্তী ও দ্রৌপদী সমভিব্যাহারে পাণ্ডবদের আনয়ন করো।’

সবচেয়ে আশ্চর্য, এই সভায় কিন্তু এরকম কোনো কথাই কেউ বললেন না, যে এক কন্যাকে পাঁচটি পুরুষ যেখানে বিবাহ করেছে, সেই বিবাহ সঙ্গত বলে আমরা মানি না। অন্তত ভীষ্মের বলা উচিত ছিলো। তিনি তো ভয় পাবার পাত্র নন। দ্রুপদরাজ যতোই বলশালী রাজা হোন না কেন, ভীষ্ম যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলে সে বল নিমেষেই দুর্বল হয়ে যাবে। এই ভীষ্মই পাণ্ডুকে দ্বিতীয়বার বিবাহ দিয়েছিলেন, যেহেতু তিনি স্বয়ংবর সভায় কুন্তীর মাল্যদান গ্রহণ করে বিবাহিত হয়ে এসেছিলেন। ভীষ্মের বংশ এই বিবাহকে শুদ্ধ বিবাহ বলে গণ্য করে না। কন্যাকে স্বভবনে এনে অনুষ্ঠান করতে হয়। বংশের মাত্র এইটুকু নিয়মের ব্যতিক্রমেই যিনি অতো বিচলিত হয়েছিলেন, এই বিবাহ তো তাঁর বিবাহ বলেই বোধ হওয়া সম্ভব নয়। তাঁদের পূর্বপুরুষেরা কখনো এক কন্যার পঞ্চপতি ধর্মসংগত বিবাহ হিশেবে ধার্য করেছেন তার কোনো নজির নেই। কিন্তু ঐ সভায় এ বিষয়ে কোনো কথাই উঠলো না। কেন? কুন্তীর মুখনিঃসৃত অনুদেশ নেহাৎ ভুল বোঝাবুঝির ফল। তাকে ‘বেদবাক্য’ মানবারও কারণ বোঝা যায় না। ব্যাসদেব পাণ্ডবদের বিষয়ে এমন কোনো কথা কোথাও লেখেননি যেটা তাদের বিরুদ্ধে যায়। এই ‘নিষ্কাম’ ব্রহ্মচারীটি শুধু যে নিষ্কাম ছিলেন না তাই নয়, নিস্পৃহও ছিলেন না। পাণ্ডবরা কে, কার দ্বারা জন্মগ্রহণ করেছে, সত্যিই পাণ্ডুর ক্ষেত্রজ কিনা, সবই জানতেন খুব ভালোভাবে। গোপনীয়তার আশ্রয় নিতেও দ্বিধা করতেন না। বলেও ছিলেন, ‘তোমাদের অধিক স্নেহ করি। তোমরা যা চাও তাই হবে।’

বিদুর ধৃতরাষ্ট্রের আদেশানুক্রমে বিবিধ রত্ন ধনসম্পত্তি নিয়ে দ্রুপদ ও পাণ্ডবদিগের সন্নিধানে উপনীত হলেন। দ্রুপদও বিদুরকে সাদর সম্ভাষণপূর্বক আদর অর্ভ্যথনা করলেন। বিদুর পাণ্ডবদের স্নেহভরে আলিঙ্গন করলেন। অতঃপর তিনি তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য জানালেন।

দ্রুপদরাজ খুশি হয়েই কন্যাকে তার শ্বশুরালয়ে পাঠাতে রাজি হলেন। বললেন, ‘কৌরবগণের সঙ্গে বৈবাহিক সম্বন্ধ হওয়াতে আমার যথেষ্ট পরিতোষ জন্মেছে। পাণ্ডবগণের স্বদেশগমন করাই আমার মতে উচিত। কিন্তু আমি স্বয়ং এঁদের এ স্থান থেকে বিদায় করতে পারি না। এদের পরম প্রিয়কারী বাসুদেব যদি সম্মত থাকেন তা হলে এঁরা স্বরাজ্যে গমন করুন। আমার কোনো আপত্তি নেই।’

এইসব কথাবার্তার পরে কৃষ্ণা-কুন্তীকে নিয়ে পাণ্ডবগণ হস্তিনাপুরে এলেন। গুরুজনদের পাদবন্দনার পরে ধৃতরাষ্ট্র সস্নেহে তাঁদের বিশ্রাম করতে বললেন। কিয়ৎক্ষণ বিশ্রামের পরে ধৃতরাষ্ট্র ও ভীষ্ম তাঁদের আহ্বান করলেন। ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরকে বললেন, ‘বৎস! তুমি ভ্রাতৃগণের সঙ্গে আমার বাক্য শ্রবণ করো। তোমরা রাজ্যের অর্ধাংশ গ্রহণ করে খাণ্ডবপ্রস্থে গিয়ে বাস করো। তাহলে দুর্যোধনাদির সঙ্গে তোমাদের পুনরায় বিবাদ হবার আর সম্ভাবনা থাকে না।’

পিতৃব্যের আজ্ঞানুসারে পাণ্ডবগণ তাই করলেন। সঙ্গে কৃষ্ণও ছিলেন। খাণ্ডবপ্রস্থে এসে নগরের সৌন্দর্যে তাঁরা মোহিত হয়ে গেলেন। নগরটি অতি সুরক্ষিত। সমুদ্রসদৃশ পরিখা দ্বারা অলংকৃত। গগনস্পর্শী প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। অস্ত্রশস্ত্রে সুরক্ষিত ও সুশোভিত। এই পরম রমণীয় প্রদেশে কুবের গৃহতুল্য ধনসম্পন্ন কৌরবগৃহ বিরাজিত।

পাণ্ডবগণ এই অপূর্ব নগরীটি দেখে অতিমাত্রায় পুলকিত হলেন, এবং অত্যন্ত সুখে বাস করতে লাগলেন। কৃষ্ণ কিছুদিন তাঁদের সঙ্গে বাস করে স্বগৃহে ফিরে গেলেন। যুধিষ্ঠির অনায়াসে ভ্রাতাদের বীরত্বে সমস্তই, এমন কি দ্রৌপদীর মতো পত্নীটিকে পর্যন্ত পেয়ে, মহা আনন্দে রাজা হয়ে সিংহাসনে অধিরূঢ় হলেন। দিন সুখেই কাটতে লাগলো।

চলবে...
বাকি পর্বগুলো পড়ুন এই লিঙ্কেঃ https://www.amarboi.com/search/label/mahabharatera-maharanye


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

মহাভারতের মহারণ্যে - প্রতিভা বসু [০৯]

amarboi
মহাভারতের মহারণ্যে
প্রতিভা বসু



আমরা জানি দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় দুর্যোধন এবং কর্ণ দুজনেই উপস্থিত ছিলেন। দ্রুপদ রাজা ঘোষণা করেছিলেন, যে ব্যক্তি ‘সজ্যশরাসনে’ শরসন্ধানপূর্বক যন্ত্র অতিক্রম করে লক্ষ্যবিদ্ধ করতে পারবেন, দ্রৌপদী তাঁরই কণ্ঠে মাল্যদান করবেন। এই ঘোষণা তিনি একাধিকবার করেছিলেন।

ধৃষ্টদ্যুম্নও ভগ্নী বিষয়ে ঐ একই ঘোষণা একাধিকবার করেছিলেন। অর্থাৎ তাঁরা ক্ষত্রিয় বললেন না, ভূপতি বললেন না, কোনো জাতিগত প্রথার উপরেই জোর দিলেন না, জোর দিলেন কেবলমাত্র বীরত্বের দিকে।

এই ঘোষণার নিহিত নিগূঢ় অর্থটি যে কী সেই মুহূর্তে না বুঝলেও পরের মুহূর্তেই স্বচ্ছ আর্শির মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো। সবই ব্যাসদেবের মন্ত্রণা। যুধিষ্ঠিররা ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে উপস্থিত থাকবেন সেখানে, সেজন্যই এ ঘোষণা। তিনি পূর্বেই বলে এসেছিলেন, দ্রৌপদীকে তোমরাই লাভ করবে। অর্থাৎ, যাতে তাঁরাই লাভ করতে পারেন, সেই বন্দোবস্ত করে এসেছিলেন বলেই এই বাক্য এতো সহজে তিনি বলতে পারলেন তাঁদের। সমস্তটাই সাজানো নাটক।

এই স্বয়ংবর সভায় যাদব বংশীয়রাও এসেছিলেন। কৃষ্ণও এসেছিলেন। অন্যান্য বিখ্যাত এবং বিশিষ্ট রাজা মহারাজারা তো বটেই। দ্রৌপদীর সৌন্দর্যের খ্যাতি ছিলো। যদিও তিনি কাঞ্চনবর্ণা নন। শ্যামাঙ্গিনী।

ধৃষ্টদ্যুম্ন নির্দিষ্ট সময়ে ভগিনীকে নিয়ে ধীরে ধীরে রঙ্গমঞ্চে উপস্থিত হলেন। এবং ভগিনীকে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন রাজাদের বিষয় অবহিত করে দিলেন। বললেন, ‘যিনি এই লক্ষ্য বিদ্ধ করতে পারবেন, তুমি তাঁর গলদেশেই বরমাল্য প্রদান করো।’

কিন্তু সকলেই সেই ভীষণ শরাসনে জ্যা সংযুক্ত করা দূরে থাক, ধনু স্পর্শমাত্র আহত ও ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হতে লাগলেন। এভাবে সকল ধনুর্দ্ধরপ্রবর যখন হতোদ্যম হয়ে পড়লেন, সেই সময় কর্ণ সত্বর ধনু উত্তোলনপূর্বক তাতে জ্যা সংযুক্ত করে শরসন্ধান করলেন। দ্রৌপদীকে দেখে পাণ্ডবরাও কন্দর্পবাণে অভিভূত হয়েছিলেন। কর্ণকে জ্যা সংযুক্ত করে শরসন্ধান করতে দেখে যুধিষ্টির ভাবলেন, কর্ণই এ কন্যারত্ন লাভ করবেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু দ্রৌপদী কর্ণের এ কর্ম দর্শনে বেশ জোরের সঙ্গেই বলে উঠলেন, ‘আমি সূতপুত্রকে বরণ করবো না।’ কর্ণের অসম্মানটা ভেবে দেখুন। এ স্বয়ংবর সভাতে তো কোনো জাতিগত শর্ত ছিলো না। তথাপি দ্রৌপদী এরকম একটা জাত তুলে অভদ্র উক্তি করলেন কেন? শ্রবণমাত্র কর্ণ সক্রোধ হাস্যে শরাসন পরিত্যাগ করলেন। তাঁর মুখমণ্ডল বর্ষার কোমল পদ্মফুলের মতো বেদনায় সজল হয়ে উঠলো।

হিশাবে একটু ভুল হয়ে গিয়েছিলো ব্যাসদেবের। কর্ণের কথা তাঁর মনে ছিলো না। অর্জুনকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভেবেছিলেন। কন্যা স্বয়ং রক্ষা করলেন তাঁকে। এইরকম একটি বিশিষ্ট সমাবেশে দ্রৌপদী যে তাঁর পিতা ও ভ্রাতার ঘোষণাকে এইভাবে উপেক্ষা করে জাত তুলে কথা বললেন, তাতে তাঁর পিতা ও ভ্রাতা কিন্তু একটু বিচলিত হলেন না। দ্রৌপদীর পিতা ও ভ্রাতা যেমন জানতেন দ্রৌপদী কার কণ্ঠে মাল্যদান করবেন, দ্রৌপদী নিজেও জানতেন। ছদ্মবেশে এলেও, যেমন দ্রুপদ রাজাও জানতেন কোন যুবা তাঁর জামাতা হবেন, তেমনি দ্রৌপদীও সে বিষয়ে অবজ্ঞাত ছিলেন। অর্জুনকে চিনতে দ্রৌপদীর অসুবিধে হয়নি। হয়তো কোনো সংকেতও ছিলো। তবে কর্ণকে ‘সূতপত্র’ হিশেবে তিনি জানলেন কী করে, সে প্রশ্ন থেকে যায়। কর্ণ সেখানে অঙ্গদেশের রাজা হিশেবেই এসেছিলেন, অার তাঁর চেহারায় সূতপুত্রজনিত কোনো লক্ষণ প্রকট ছিলো না।

এবার এঁদের কার্যকলাপের ধারাবাহিকতাটা কীভাবে এগিয়ে চলেছে সেটা বোধহয় অনুধাবনযোগ্য। প্রথমত, বিদুর একটি সদ্যোজাত শিশুকে, যে-শিশু রাজবাড়ির প্রথম সুস্থ বংশধর, তার পিতা রাজা ধৃতরাষ্ট্রের দ্বারা নিহত করাবার আপ্রাণ প্রচেষ্টা করেছেন। তারপরেই পাণ্ডু এবং তার কনিষ্ঠা পত্নীর নিঃশব্দ নির্জন সাক্ষীহীন মৃত্যু। তিন নম্বর, ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র জন্মানো মাত্র, ঠিক মেপে মেপে পাণ্ডুরও ক্ষেত্রজ গ্রহণ এবং জ্যেষ্ঠটিকে, অর্থাৎ যুধিষ্ঠিরকে দুর্যোধনের চেয়ে এক বৎসরের বড় বলে দাবি। চতুর্থ, জতুগৃহদাহ। জতুগৃহে অগ্নি প্রদানের পূর্বে বিদুরের পাঠানো একজন কৃতবিদ্য প্রযুক্তিবিদের দ্বারা পাতালপথ নির্মাণ। পাতালপথ থেকে বেরিয়ে আকাশের তলায় এসে পাণ্ডবরা যেখানে দাঁড়ালেন, সেখানেই একজন পথপ্রদর্শকের দাঁড়িয়ে থাকা। এইসব সাজানো ঘটনাবলী সবই সাম্রাজ্য দখলের ভূমিকা ব্যতীত আর কী ভাবা যায়? ধৃতরাষ্ট্র বেঁচে আছেন, যিনি এঁদের পিতৃব্য। অন্তত তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে এঁরা, অর্থাৎ বিদুর রাজি নন। এঁদের ষড়যন্ত্রের কাছে, যে ষড়যন্ত্র কেবলমাত্র খুনের রক্তেই রঞ্জিত নয়, আরো বহুদূর অগ্রসর, দুর্যোধনের দৌরাত্ম্য নেহাৎ শিশুসুলভ হম্বিতম্বি। যে বিদুরকে মহাভারত পাঠকদের নিকট ‘ধর্ম’ বলে ধার্য করে দিয়েছে, সেই ধর্ম নামক ব্যক্তিটির অধার্মিক আচরণ দ্বিতীয়রহিত।

দ্রৌপদীর স্বয়ংবরসভায় যেহেতু বৃষ্ণিবংশীয় যদুশ্রেষ্ঠগণও উপস্থিত ছিলেন, এই সময় থেকে কুরুদের বিপক্ষদলে আরো একজন যিনি যুক্ত হলেন তাঁর নাম কৃষ্ণ। কৃষ্ণের পিতা বসুদেব কুন্তীর ভ্রাতা, অতএব কুন্তী কৃষ্ণের পিতৃস্বসা, সম্পর্ক নিকট। কৃষ্ণও কিন্তু জানতেন না এই পুত্ররা পাণ্ডুর ক্ষেত্রজ। এই সভাতেই প্রথম দর্শন। বড়ো বড়ো পাঁচটি বহিরাগত যুবককে দেখে তিনি বিস্মিত হলেন, শেষ পর্যন্ত তাঁদের বলবিক্রম দেখে উল্লসিত হলেন। যখন থেকে এঁরা পাণ্ডুর ক্ষেত্রজ হিশেবে হস্তিনাপুরে এসেছেন, তখন থেকে এঁদের নামে তিনি অনেক গুজব শুনেছেন। কৌতূহল ছিলো। এখন বীরত্ব দেখে মুগ্ধ হলেন এবং বন্ধুতা হতে দেরি হলো না।

মহাভারত নামের গ্রন্থটির সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী কিঞ্চিৎ অবহিত হয়ে পাঠ করলে সহজেই বোঝা যায় সবাই কোনো না কোনো উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্ত কর্ম করে যাচ্ছেন। সত্যবতী থেকে তার শুরু। এখন কৃষ্ণতে এসে শেষ হলো। অর্থাৎ সাতটি নদী কৃষ্ণরূপ সমুদ্রে এসে মিলিত হলো। সেই নদী ক’টি সবই অনার্য অবৈধ পুত্রের সমষ্টি। প্রথমে সত্যবতীর পুত্র ব্যাসদেব, তারপর তাঁর অবৈধ পুত্র বিদুর, বিদুরের অবৈধ পুত্র যুধিষ্টির, আর চারটি ভ্রাতা ভীম অর্জুন নকুল সহদেব, যাদেরও কোনো পিতৃপরিচয় নেই।

দ্রুপদ রাজাও যে আর্য হয়ে অনার্য রীতি মেনে নিয়ে কন্যাকে পাঁচটি ভ্রাতার হস্তে পাণিরত করলেন, তা-ও নিজেকে আরো শক্তিশালী করে অন্য কোনো আক্রমণ স্তব্ধ করার উদ্দেশ্যে। পাণ্ডুরাজার ক্ষেত্রজ নাম দিয়ে যে পাঁচটি পাণ্ডব এসে উপস্থিত হলো, তা-ও রাজ্যপ্রাপ্তির আশায়। আর কৃষ্ণ এলেন জরাসন্ধের ভয়ে দ্বারকাপুরীতে লুকিয়ে পালিয়ে থাকা জীবন থেকে এদের সাহায্যে বেরিয়ে আসতে। কৃষ্ণ দুটি মানুষকে ভয় পেতেন, একজন জরাসন্ধ, একজন শিশুপাল। এই দুজন শক্তিশালী রাজা তাঁর বুজরুকিতে বিশ্বাস করতেন না।

স্বীয় উদ্দেশ্যসাধন হলেও, সত্যবতী শান্তনুনন্দন দেবব্রতকে সোজাসুজিই তাঁর শর্ত পালনে সম্মত করিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু বাকি অন্যান্যদের ভূমিকার মধ্যে পাঁচটি বহিরাগত পুত্র, তাদের মাতা কুন্তী, এবং যুধিষ্ঠিরের পিতা বিদুর, রাজত্ব পাবার আশায় এমন কোনো গূঢ় অপরাধ নেই জগতে, যা তাঁরা করতে বিন্দুমাত্র কুন্ঠিত হয়েছেন। তারপরে যে অন্যায় এবং নৃশংসতার লীলা শুরু হলো সেটা যুদ্ধের শেষদিন পর্যন্ত অদমিত রইলো।

প্রথম লীলাটি হলো দ্রৌপদীর প্রকৃত স্বামী অর্জুন হলেও তাঁকে বিবাহ করতে হলো পাঁচজনকেই। স্বয়ংবর সভায় মাল্যদান মানেই বিবাহ। পাণিপ্রার্থীদের মধ্যে পাত্রী যাঁকে মাল্যদান করবেন তিনিই হবেন তাঁর পতি। মাল্যদান করেই শকুন্তলা দুষ্মন্তকে বিবাহ করেছিলেন। মাল্যদান করেই কুন্তী পাণ্ডুর পত্নী হয়েছিলেন। বেচারা দ্রৌপদী! যাঁকে মাল্যদান করলেন, তাঁর জ্যেষ্ঠভ্রাতাও যে একজন মস্ত দাবিদার হয়ে তাঁর শয্যায় এসে উপস্থিত হবেন, তা কি তিনি স্বপ্নেও ভেবেছিলেন কখনো! আর্যকুলের বিবাহে এই রীতি কখনই সম্ভব নয়।

দ্রৌপদীকে জয় করে, যেখানে পাণ্ডবরা আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন সেখানে উপস্থিত হয়ে আনন্দিত স্বরে বললেন, ‘মাতঃ, অদ্য এক রমণীয় পদার্থ ভিক্ষালব্ধ হইয়াছে।’

কুন্তী গৃহাভ্যন্তরে ছিলেন, বললেন, ‘সকলে সমবেত হয়ে ভোগ করো।’ তারপরই দ্রৌপদীকে নিরীক্ষণ করে বললেন, ‘এ আমি কী বললাম!’ ধর্মভয়ে যেন কতো চিন্তাকুল এমন ভাব করে দ্রৌপদীর হস্তধারণপূর্বক যুধিষ্ঠিরের নিকট গমন করে বললেন, ‘পুত্র, তোমার অনুজরা দ্রুপদনন্দিনীকে এনে ভিক্ষা বলে আমার নিকট উপস্থিত করলো, আমিও অনবধানতা-প্রযুক্ত হয়ে বললাম, ‘‘তোমরা সকলে সমবেত হয়ে ভোগ করো।’’ এখন তুমি দ্যাখো, আমার বাক্য যেন মিথ্যা না হয়।’

এসব কথার সমস্তটাই কৃত্রিম, সমস্তটাই বানানো। তা ব্যতীত, মুখনিঃসৃত সমস্ত ভাষ্যই বাণী নয়। যাকে প্রকৃত অনৃতভাষণ বলে, কুন্তীর এই অন্যমনস্ক অনুমতি তার মধ্যে পড়ে না। তাছাড়া, কুন্তী কোনো মহর্ষি মহাযোগীও নন যে মুখের কথা ফেরৎ নিতে পারেন না।

পুত্রগণ বলেছেন, ‘এক রমণীয় পদার্থ এনেছি’। মানুষ কখনো পদার্থ হয় না। যারা অমানুষ তাদের অপদার্থ বলা গেলেও মানুষকে কোনো অর্থে পদার্থ হিশেবে ধরা হয় না। পদার্থের অর্থ দ্রব্য, বস্তু, জিনিশ। দ্রৌপদী যখন একজন মানুষ, তিনি নিশ্চয়ই দ্রব্য, বস্তু, জিনিশ নন সেক্ষেত্রে যখন কুন্তী ‘পদার্থ’ কে ভোগ করতে বলেছেন, এবং পরে একজন মানুষকে দেখেছেন, সেখানে তো তাঁর এই বাক্যকে কোনো অর্থেই অনৃতভাষণ বলা যায় না। বলা যায় ‘আমি ভেবেছিলাম কোনো ভালো জিনিশ পেয়েছো।’ পরন্তু, তিনি কী করে জানলেন এই কন্যা দ্রুপদনন্দিনী? যুধিষ্ঠিরকে বলছেন, ‘পুত্র, ইনি রাজা দ্রুপদের নন্দিনী। কিন্তু আমি বলেছি তোমরা সকলে মিলে ভোগ করো। অতএব, হে কুরুশ্রেষ্ঠ! এখানে যাতে আমার বাক্য মিথ্যা না হয় এবং অধর্ম দ্রুপদকুমারীকে স্পর্শ না করে এমন উপায় বিধান করো।’

কুন্তী খুব ভালোভাবেই জানতেন তাঁর পুত্রগণ ব্যাসদেবের নির্দেশে দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় গিয়েছেন। যদি কিছু নিয়ে আসেন তবে যে দ্রৌপদীকে জয় করেই ফিরবেন, তা-ও তাঁর অজ্ঞাত ছিলো না। সত্যরক্ষার দোহাই তা-ও তাঁর অজ্ঞাত ছিলো না। সত্যরক্ষার দোহাই দিয়ে কুন্তী যা করতে চাইছেন তার অর্থটা পরমুহূর্তেই বোধগম্য হলো। যে বীরত্বের শর্তে মহারাজা দ্রুপদকন্যাকে সম্প্রদান করবেন, সে বীরত্ব কার আছে তা-ও তিনি জানেন। এবং দ্রুপদরাজা যে অর্জুনকে জামাতারূপে পেতে উৎসুক তা-ও জানেন। কিন্তু অর্জুনকে জামাতা করলে তো হবে না, যুধিষ্ঠিরকেই করতে হবে। যুধিষ্ঠিরের জন্যই তো এতো কাণ্ড। কোনো শক্তিশালী রাজার সাহায্য পাবার জন্যই তো অজ্ঞাতবাসের আয়োজন। সুতরাং জামাতা হতে গেলে যুধিষ্ঠিরকেই হতে হবে। যুধিষ্ঠির সিহাংসনে বসবেন, সেটাই বিদুর, কুন্তী এবং দ্বৈপায়নের একমাত্র উদ্দেশ্য। আসলে তিনি এতোক্ষণ অবশ্যই অতি উৎকণ্ঠিত চিত্তে অপেক্ষা করছিলেন খবরটির জন্য। তারপর, যেন না জেনেই ছেলেদের উপভোগ করতে বলেছেন বলে অচিন্তনীয় চিন্তায় একেবারে অথৈ পাথারে পড়ে গেলেন। অস্থির না হলে তাঁর বাক্যের সত্যতা নিয়ে লড়াই করবেন কি উপায়ে?

কিন্তু এক কন্যাকে পাঁচজন পুরুষ কী করে ভোগ করবেন, গণ্ডগোল বাধলো সেটা নিয়েই। দ্রৌপদীর পিতা হতবাক হলেন। তিনি বলেছিলেন ‘অদ্য শুভ দিবস, অতএব অর্জুন আভ্যুদয়িক ক্রিয়ান্তে দ্রৌপদীর পাণিগ্রহণ করুন।’

উত্তরে যুধিষ্ঠির বললেন, ‘রাজন! আমারও দারসম্বন্ধ কর্তব্য হইয়াছে। পূর্বে জননী অনুমতি করিয়াছেন যে দ্রৌপদী আমাদিগের সকলেরই মহিষী হইবেন। আমি অদ্যাপি দারপরিগ্রহ করি নাই এবং ভীমও অকৃতবিবাহ। অর্জুন আপনার কন্যারত্ন জয় করিয়াছেন বটে, কিন্তু আমাদিগের ভ্রাতৃগণের মধ্যে নিয়ম আছে যে, যে কোনো উৎকৃষ্ট বস্তু প্রাপ্ত হইলে আমরা তাহা সকলে একত্র ভোগ করিয়া থাকি।’

দ্রৌপদী কি সত্যিই বস্তু? তাঁর কি মন প্রাণ বলে কিছু নেই? তিনি কি মানবকন্যা নন? ইচ্ছে হোক না হোক, শ্রদ্ধা করুন বা না-ই করুন, ভালোবাসুন আর না-ই বাসুন, যে কোনো পুরুষের শয্যাসঙ্গিনী হতে পারেন তিনি? তাঁর মতামতের কি মূল্য নেই? তিনি যাঁকে মনোনীত করেছেন, তাঁর গলদেশেই মাল্যদান করেছেন। পূর্বকালের নিয়মমতো সেটাই বিবাহ। যজ্ঞসেন বিস্ময়ে তাকিয়ে যুধিষ্ঠিরের বাক্য শ্রুতিগোচর করছিলেন। যুধিষ্ঠির গোঁ ধরে তাঁর বাক্য সমাপন করলেন, ‘অতএব আমরা কোনোক্রমেই চির-আচরিত নিয়ম লঙ্ঘন করতে পারবো না। অগ্নিসাক্ষী করে আমাদের সঙ্গে জ্যেষ্ঠাদিক্রমে তনয়ার পরিণয় ক্রিয়া সম্পাদিত করুন।’

যজ্ঞসেন বিস্ময়ের সীমান্তে পৌঁছে বললেন, ‘এক পুরুষের বহুপত্নী বিহিত আছে বটে, কিন্তু এক স্ত্রীর অনেক পতি এ তো আমি কখনই শুনিনি। আপনার এ রকম কথা বলা অনুচিত।’

প্রত্যুত্তরে যুধিষ্ঠির বললেন, ‘পূর্বপুরুষদিগের আচরিত পদ্ধতিক্রমেই আমরা চলে থাকি।’

যুধিষ্ঠিরের এই বাক্য যদি সত্য হয়, তবে তো তিনি পাণ্ডুরাজের ক্ষেত্রজ হতেই পারেন না। রাজা শান্তনুর কোনো বংশধরই এই আদিম নিয়মের অধীন নয়। যেহেতু পাণ্ডু স্বয়ংবর সভায় গিয়ে কুন্তীকে বিবাহ করেছিলেন, ভীষ্ম সেই বিবাহও তাঁদের বংশের নিয়ম অনুযায়ী হয়নি বলে আবার বিবাহ দিলেন মাদ্রীর সঙ্গে। তাঁদের নিয়ম কন্যাকে স্বীয়গৃহে আনয়ন করে বিবাহ দেওয়া। এখানে অর্জুন অবশ্য কন্যাকে স্বীয় গৃহেই আনয়ন করেছিলেন, এবং দ্রৌপদী তাঁর কণ্ঠেই মাল্যদান করেছিলেন। এখন কেবল অনুষ্ঠানটাই বাকি। অর্জুন যুধিষ্ঠিরের বয়োকনিষ্ঠ ভ্রাতা, তাঁর স্ত্রীকে তিনি কী হিশেবে বিবাহ করবেন? তাঁর সঙ্গে তো সম্পর্ক স্থাপিতই হয়ে গেছে। ধৃতরাষ্ট্র কখনো কুন্তীকে বিবাহের কথা ভাবতে পারতেন, যখন পাণ্ডুকে মাল্যদান করে কুন্তী কুরুগৃহে প্রবেশ করলেন? দ্রুপদ রাজার পুত্র ধৃষ্টদ্যুম্নও ঠিক তাই বললেন, ‘জ্যেষ্ঠ, সুশীল ও সদাচারসম্পন্ন হয়ে কনিষ্ঠ ভ্রাতার ভার্যায় কেমন করে গমন করবেন? ধর্ম অতি সূক্ষ্ম পদার্থ। ধর্মের গতি আমরা কিছু জানি না। সুতরাং ধর্মাধর্মের নিশ্চয় করা আমাদের অসাধ্য। অতএব কৃষ্ণা যে পঞ্চস্বামীর মহিষী হবে সেটা আমরা কখনই ধর্মত অনুমোদন করতে পারি না।’

এই সময়ে যথানিয়মে ব্যাসদেবের আগমন। তাঁকে দেখে দ্রুপদ বললেন ‘একা দ্রৌপদী কী করে অনেকের ধর্মপত্নী হবে, অথচ সঙ্কর হবে না, এটা কেমন করে ঘটতে পারে? হে দ্বিজোত্তম! এক স্ত্রী বহু পুরুষের পত্নী, এ তো কখনো দেখিনি। এমন কী মহাত্মা প্রাচীন পুরুষদিগেরও আচরিত ধর্ম নয়।’

ব্যাসদেব বললেন, ‘হে পাঞ্চাল! আমি এর নিগূঢ় তত্ত্ব সর্বসমক্ষে ব্যক্ত করবো না।’ এ বলে তিনি গাত্রোত্থান করে দ্রুপদের করগ্রহণপূর্বক রাজভবনে প্রবেশ করলেন। তারপরে প্রকাশ্যে কয়েকটা রূপকথা শোনালেন। যা মহাভারতের, তথা ব্যাসদেবের, স্বার্থসিদ্ধির একমাত্র অস্ত্র ও উপায়। তা থেকে জানা গেল, পূর্বজন্মে দ্রৌপদী মহাদেবের (এখানে আবার একজন মহাদেবের সৃষ্টি করেছেন, যিনি একমাত্র অনার্যদেরই তৈরি করা অারাধ্য দেবতা) নিকট নাকি পাঁচবার একই বর প্রার্থনা করেছিলেন, তিনি যেন সর্বগুণসম্পন্ন পতি লাভ করেন। তখন মহাদেব তাঁকে অভিলষিত বরদানপূর্বক বললেন, ‘ভদ্রে! তোমার পাঁচজন স্বামী হবেন।’ পূর্বজন্মে দ্রৌপদী ঋষিকন্যা ছিলেন, সেই ঋষিকন্যা বলেন, ‘আমি এক পতি প্রার্থনা করি।’ মহাদেব বললেন, ‘তুমি উপর্যুপরি পাঁচবার পতি প্রার্থনা করেছ। অতএব জন্মান্তরে তোমার পঞ্চস্বামী হবে।’

রূপকথা শেষ করে ব্যাসদেব বললেন, ‘দ্রৌপদী স্বর্গলক্ষ্মী, পাণ্ডবগণের নিমিত্ত আপনার যজ্ঞে সমুৎপন্ন হয়েছেন। এই সর্বাঙ্গসুন্দরী দেবদুর্লভা দেবী স্বকীয় কর্মফলে পঞ্চপাণ্ডবের সহধর্মিণী হবেন।’ প্রথমে রাজঅন্তঃপুরে প্রবিষ্ট হয়ে ব্যাসদেব দ্রুপদকে কী নিগূঢ় তত্ত্ব গোপনে বুঝিয়েছিলেন জানি না, পরে পূর্বজন্মের এই রূপকথাটি বলে শেষ করলেন বাক্য।

কিন্তু দ্রৌপদী? দ্রৌপদী কী করে রাজি হলেন? অত বড় একটা মহতী জনসভায় যিনি উচ্চকণ্ঠে বলে উঠতে পারলেন, ‘সূতপুত্রকে আমি বিবাহ করবো না’, যেখানে তাঁর পিতা ভ্রাতা দুজনেই পুনঃপুন ঘোষণা করেছেন এই স্বয়ংবর সভায় জাতমানকুল কিছু নেই, বীরত্বই প্রধান, যেখানে বিদ্যায় বুদ্ধিতে রূপে গুণে শ্রেষ্ঠ এক বীরকে তিনি পিতা ভ্রাতার প্রতিজ্ঞা লঙ্ঘন করে, অসম্মান করে, ধুলোয় লুটিয়ে দিলেন, এবং অন্য এক বীরকে স্বামীরূপে নির্বাচিত করে মাল্যদান করলেন, সেখানে কী করে তিনি তাঁর স্বামীর জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠের শয্যাসঙ্গিনী হতে রাজি হলেন? কী করে সেটা সম্ভব হলো? বিবাহের আসরে বসে পরপর পাঁচজন ভ্রাতাকেই স্বামীরূপে গ্রহণ করতে তাঁর মনে কি কোনো বেদনা জাগলো না? অসম্মান জাগলো না? লজ্জাবোধ এলো না? তাঁর বিবেকের কাছে কি তাঁর কোনো কৈফিয়ৎ নেই? মহাভারত বলে তিনি অতি তেজস্বিনী নারী, সেই তেজ তখন তাঁর কোথায় গেলো? তিনি কি জানেন না স্বয়ংবর সভায় কন্যা যাঁর কণ্ঠে মাল্যদান করেন শুধু তিনিই হন তাঁর পতি? কেন তিনি অন্য পুরুষ গ্রহণ করতে কোনো প্রতিবাদ জানালেন না? আর তাঁর নির্বাচিত পতিকে তিনি কবে পেলেন? যখন তাঁর প্রেম এক বছর ধরে তাঁর স্বামীর জ্যেষ্ঠভ্রাতা যুধিষ্ঠিরই ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছেন। তারপর ভীমের কাছে গেছে সেই দেহ। নারীদেহ তো নয়, যেন খেলার বল। একের কাছ থেকে অপরের কাছে। তার মধ্যে অর্জুনের বারো বছরের জন্য নির্বাসনও হয়ে গেলো।

এই উপাখ্যান এখন যেখানে এসে পৌঁছেছে সেখান থেকে যুদ্ধের ময়দান খুব দূরে নয়। কিন্তু কেন এতদূর এলো? কে তার জন্য দায়ী? এই বহিরাগত পঞ্চপাণ্ডব নামধারী মানুষ ক’টি পাণ্ডুর ক্ষেত্রজ হিশেবেই গণ্য হয়ে, রাজপুত্রদের সঙ্গেই শিক্ষাদীক্ষা সহবতে মিলিত হয়েছিলো। তার মধ্যে যদি বিদুরের প্রবেশ না ঘটতো, তা হলে হয়তো বা তারা কুরুকুলের ভ্রাতা হয়েই মিলেমিশে থাকতে পারতো। যার মনে যে সন্দেহই থাক, আস্তে আস্তে মুছে যেতো সেটা। বিদুর তো সেজন্য তাদের নিয়ে আসেননি এখানে। এনেছেন পুত্রকে একচ্ছত্র সাম্রাজের অধিপতি করতে। প্রথমেই ঘোষণা করলেন দুর্যোধন সাম্রাজ্যের ভাগ দেবার ভয়ে ওদের সঙ্গে শত্রুতা করছে। একজন প্রতিপক্ষ দাঁড় করাতে না পারলে বৈপরীত্যের সৃষ্টি হয় না। যেখানে বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে ব্যাপার, সেখানে দুর্যোধনকে সহজেই শত্রুপক্ষ হিশাবে বিশ্বাস করানো, এক্ষেত্রে, এই পরিবেশে, খুবই সহজ। সুতরাং, অপপ্রচার জনগণের মনে ধরানোর কার্যটি বিদুর খুব ভালোভাবেই সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন। তথাপি, পুরবাসীদের অনেকের মনই কুন্তীর এই পঞ্চপুত্র বিষয়ে নিঃসংশয় ছিলো না। তার পরিচয় পাওয়া গেলো কৃত্রিম যুদ্ধের দিন, যখন দুর্যোধন বললেন, ‘তোমাদের কী ভাবে জন্ম তা-ও কিন্তু আমরা জানি।’ তখন কেউ তার জবাব দিতে সক্ষম হলেন না। পঞ্চভ্রাতাও নয়, বিদুরও নন, গুরুজনেরাও নিঃশব্দ।

ঘটনাগুলো অনুধাবন করলে এখানেও অনেকগুলো বিষয়, যেমন, মহারাজা শান্তনুর মৃত্যুর পরে বিমাতার প্রতি দেবব্রতের কার্যকারণহীন আনুগত্য, দ্বৈপায়নের দ্বারা দাসীর গর্ভে বিদুরের জন্ম, দুর্যোধন জন্মানোমাত্রই বিদুরের তাকে হত্যা করবার প্রয়াস, স্বীয় অবৈধ পুত্র যুধিষ্ঠিরকে পাণ্ডুর ক্ষেত্রজ প্রমাণ করবার জন্য কুন্তীর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে পাণ্ডুকে ও মাদ্রীকে নিহত করা, পুত্রদের অজ্ঞাতবাসে পাঠিয়ে কোনো ক্ষমতাশালী নির্দিষ্ট রাজার সঙ্গে সম্পর্ক পাতাবার চেষ্টা, বারণাবতে নিজেরা আগুন লাগিয়ে অতোগুলো মানুষকে পুড়িয়ে ধৃতরাষ্ট্র আর তাঁর পুত্র দুর্যোধনের নামে চালাবার মিথ্যাচার, একজন কৃতবিদ্য প্রযুক্তিবিদ পাঠিয়ে বিদুরের পাতাল পথ রচনা, সেই পথে হেঁটে দূরবর্তী অন্য এক লোকালয়ে গিয়ে উঠে মাতাসহ পঞ্চপাণ্ডবের আকাশের তলায় দাঁড়ানো এবং অপেক্ষমান পথপ্রদর্শকের সঙ্গে গিয়ে বিদুরের পাঠানো যন্ত্রযুক্ত নৌকায় আরোহণ, অপর তীরে অবরোহণ করে আবার নির্দিষ্টভাবে দক্ষিণ দিকে গমন, চলতে চলতে নির্দিষ্ট স্থানে ব্যাসদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ, ব্যাসদেবের নির্দেশে প্রথম একমাস একচক্রা নগরে-অবস্থান, তারপরে পুনরায় একমাস পরে ব্যাসদেবের আগমন এবং পাঞ্চাল নগরে ব্রাহ্মণের বেশে দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় গিয়ে অর্জুনের বীরত্বে দ্রৌপদী লাভ, কুন্তীর চালাকিতে যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে বিবাহ দেবার ধূর্ততা—ষড়যন্ত্র এবং হঠকারিতার নিদর্শন ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু এতোগুলো হঠকারিতার মধ্যে দুর্যোধন কোথায়? অথচ বিবিধ অসাধু কর্মের দায় দুর্যোধনের নামেই চালানো হলো। পড়তে পড়তে দুর্যোধনের জন্য বেদনা অনুভব করাই তো স্বাভাবিক। দুর্যোধনের মুখনিঃসৃত যে দুটি বাক্য লিখিত হয়েছে, তা ঐ কৃত্রিম যুদ্ধের আসরে। ভীমের নিম্নশ্রেণীর কলহদীর্ণ ভাষার জবাবে জানানো, ‘হে ভীম! কর্ণকে এভাবে বলা তোমার উচিত নয়।’ আর বিদুরের প্রচারে যুধিষ্ঠির একেবারে ক্ষমতার তুঙ্গে উঠে তাদের পরাজিত করে সিংহাসন দখল করবার মতো ক্ষমতাশীল হয়ে উঠেছেন শুনে ভীত হয়ে পিতাকে বলা, ‘ওদের যদি কিছুদিনের জন্য অন্যত্র কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে ঐ সময়ের মধ্যে আসন্ন বিপদের হাত থেকে উদ্ধার পাবার একটা ব্যবস্থা করা যেতে পারে।’ বিদুর-কুন্তীসহ এই পাঁচটি ভ্রাতার বিবেকহীন, অসাধু এবং লুব্ধ ব্যবহারের পরিবর্তে দুর্যোধনের সৌজন্য এবং ধৈর্য বরং অনুকরণযোগ্য বলেই মনে হওয়া উচিত।

সত্যবতী যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই প্রাসাদের সর্বময়ী কর্ত্রী হয়ে প্রবিষ্ট হয়েছিলেন, এবং যে উদ্দেশ্য সাধন করতে শান্তনুর একমাত্র পুত্র দেবব্রতকে চিরকুমার ব্রহ্মচারী থাকতে বাধ্য করেছিলেন, সেই সংকল্প সাধন করলেন তাঁর নিজের পুত্র বিচিত্রবীর্যের বিধবা পত্নীদ্বয়ের গর্ভে তাঁর অবিবাহিত কালের সন্তান দ্বৈপায়নের দ্বারা সন্তান উৎপাদন করিয়ে। তদ্ব্যতীত, বিদুরকে পর্যাপ্ত প্রশ্রয় দিয়ে এমন একটা স্তরে উত্তোলিত করে রেখে বনগমন করলেন যেখান থেকে তাঁর স্খলনের আর কোন সম্ভাবনা রইলো না। আর বিদুরপুত্র যুধিষ্ঠিরের অনার্য অবৈধ রক্ত এতো পরিশ্রুত হলো যে শান্তনুর আদি বংশের ক্ষত্রিয় রক্ত আর এক কণাও অবশিষ্ট থাকলো না। বৈরানল তখনি প্রজ্বলিত হলো। যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো। এই যুদ্ধও সত্যবতীরই অবদান। শান্তনুর প্রাসাদে দ্বৈপায়নের প্রবেশ না ঘটলে বিদুর জন্মাতো না, বিদুর না জন্মালে যুধিষ্ঠিরও জন্মাতো না, যুধিষ্ঠির না জন্মালে রাজত্ব নিয়ে এই প্রমাদও উপস্থিত হতো না।

চলবে...

বাকি পর্বগুলো পড়ুন এই লিঙ্কেঃ https://www.amarboi.com/search/label/mahabharatera-maharanye


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

মহাভারতের মহারণ্যে - প্রতিভা বসু [০৮]

amarboi
মহাভারতের মহারণ্যে
প্রতিভা বসু



পাণ্ডবদের বিষয়ে দুর্যোধন এই প্রথম মুখ খুললেন, পিতাকে বললেন, ‘হে পিতঃ! পৌরগণ নাকি আপনাকে পরিত্যাগ করে যুধিষ্ঠিরকেই রাজা করতে চাইছে? এই অশ্রদ্ধেয় বাক্য শুনে আমার অত্যন্ত মনোবেদনা হচ্ছে। শেষে কি আমরা রাজবংশে থেকে জনগণের মধ্যে হীন ও অবজ্ঞাত হয়ে থাকবো? পরপিণ্ডোপযোগী লোকেরা নরকভোগ করে। অতএব, হে রাজন! যাতে আমরা ঐ নরক থেকে মুক্ত হতে পারি, এরকম কোনো পরামর্শ করুন।’

বর্ধনশীল যুধিষ্ঠিরকে কীভাবে রোধ করা যায়, কী করলে ধৃতরাষ্ট্র জীবিত থাকতেই প্রজাবিদ্রোহ না ঘটে, সে বিষয়ে পিতা-পুত্র আপাতত রক্ষা পাবার মতো একটা সিদ্ধান্তে এসে উপনীত হলেন।

যেখানে রাজত্ব নিয়ে পিতাপুত্রেই সংঘর্ষ হয়, যেখানে কুন্তী-বিদুর মিলে হয়তো বা পাণ্ডু-মাদ্রীকে হত্যা করতে পারেন, যেখানে কয়েকজন পর্বতনিবাসী যারা সত্যিই পাণ্ডুর ক্ষেত্রজ কিনা এবং প্রকৃতই যুধিষ্ঠির দুর্যোধন অপেক্ষা এক বৎসরের বড়ো কিনা সেটা প্রমাণিত তথ্য নয়, সেখানে সাবধান হওয়াটাই বা নিন্দনীয় হবে কেন?

দুর্যোধন বললেন, ‘কিছুদিনের জন্য পাণ্ডবরা সপরিবারে যদি অন্যত্র কোথাও গিয়ে কাটিয়ে আসেন, তাহলে আমি বিদ্রোহীদের ধন ও সমুচিত সম্মান প্রদর্শন করে তাদের পরিতুষ্ট করবো। আপনি যদি কোনোভাবে ওদের বারণাবতে পাঠিয়ে দিতে পারেন, তবে সেই সময়ের মধ্যেই আমরা সমুদয় কার্য শেষ করে নিতে পারবো। সেখানে এই সময়টাতে খুব সুন্দর একটা মেলা হয়।’

প্রকৃতই বারণাবতে সেই সময়ে একটা উৎসব হয়। সভায় বসে সকলের মুখে বারণাবতের প্রশংসা শুনে পাণ্ডবরা সেখানে যাবার জন্য বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করলেন। প্রশংসাটা অবশ্য উদ্দেশ্যমূলকভাবেই করা হচ্ছিলো। পাণ্ডবদের আগ্রহ দেখে ধৃতরাষ্ট্র বললেন, ‘বেশ তো, কিছুদিন না হয় সবান্ধবে ও সপরিবারে গমন করে পরম সুখে কাটিয়ে পুনরায় হস্তিনানগরে প্রত্যাগমন করো।’ ধৃতরাষ্ট্রর এই কথার মধ্যে এমন কিছু ছিলো না যাকে ভয় দেখিয়ে পাঠানো বা জবরদস্তি বলা যেতে পারে। তদ্ব্যতীত, তিনি তাদের ‘আমোদ আহ্লাদ করে কিছুদিনের মধ্যেই ফিরে এসো’ এ কথাও বলে দিয়েছিলেন কিন্তু তারা ফিরে আসেননি। ফিরে আসার জন্যও যাননি।

বিদুর তাঁদের অজ্ঞাতবাসে পাঠাবার জন্য সব ব্যবস্থাই পূর্ব থেকে করে রেখে যে সুযোগ খুঁজছিলেন সেটা পেয়ে গেলেন। পরে এ কথা তো রটনা করতে হবে যে ভাগ দেবার ভয়ে দুর্যোধনই কোথাও জীবনের মতো সরিয়ে দিয়েছেন পাণ্ডবদের। কুরুকুলকলঙ্কী মন্দবুদ্ধি ধৃতরাষ্ট্র কী করে এমন একটা অধর্মানুষ্ঠান করতে উদ্যত হলেন? মহাত্মা ভীষ্মই বা কেমন করে এরকম একটা একান্ত অশ্রদ্ধেয় বিষয় অনুমোদন করলেন? যুধিষ্ঠির ব্যতীত অন্য ভ্রাতারা এটাকে একটা আমোদপ্রমোদের ভ্রমণ বলেই মনে করলেন, কিন্তু বিদুরের ষড়যন্ত্রে ও পরামর্শে যুধিষ্ঠির জানতেন কোনটার পরে কোনটা করতে হবে এবং কোন পথে পা ফেলতে হবে। বিদুরও যাবার মুহূর্তে ম্লেচ্ছ ভাষায় সেই ষড়যন্ত্রের বিষয়টি পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিলেন। যুধিষ্ঠিরও বললেন, ‘বুঝেছি।’

ইতিমধ্যে বিদুর হস্তিনাপুরবাসীদের নিকট এটা খুব ভালোভাবেই প্রচার করে দিলেন, ধার্তরাষ্ট্ররা ওদের পুড়িয়ে মারবার জন্যই ওখানে পাঠালেন। ধর্মের মুখোশ পরে বিদুর স্বীয় স্বার্থ সম্পাদনার্থে সততই অধর্মের কূপে নিমজ্জিত করে রাখলেন নিজেকে। এবং তাঁর পিতা দ্বৈপায়ন আমৃত্যু তাঁকে প্রশ্রয় দিয়ে গেলেন।

বারণাবতে যাওয়া মানেই নির্বাসনে যাওয়া এ কথাটা মহাভারত কী অর্থে ব্যবহার করেছে তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। অথচ বারণাবত প্রকৃতই একটি অতি সুন্দর নগর। ভ্রমণের পক্ষে অতি উৎকৃষ্ট স্থান। দেশের লোকেদের নিকট বিদুর যদিও বারণাবতে পাঠিয়ে ধার্তরাষ্ট্ররা পাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারবে বলে অনেক কুম্ভীরাশ্রু নির্গলিত করেছেন, ভিতরে যে কতো উল্লসিত হয়েছেন তার কোনো সীমা নেই। এটাই চেয়েছিলেন তিনি। যে নৌকাটি প্রস্তুত করে রেখেছিলেন সেটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তৈরি, যন্ত্রযুক্ত এবং বায়ুবেগ সহনক্ষম। সমুদ্রতরঙ্গও এই নৌকাকে সহসা মগ্ন করতে পারে না। কুন্তীসহ পুত্রদের অজ্ঞাতবাসে পাঠাবার জন্য ঋজুপথ, বক্রপথ সমস্ত পথই তিনি সাজিয়ে ফেলেছিলেন। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ তিনি তাঁর মনের দর্পণে প্রতিফলিত দেখতে পেয়ে যুধিষ্ঠিরের হস্তে সেই মানচিত্রটিই ধরিয়ে দিলেন যাবার সময়ে।

পাঁচটি পর্বতনিবাসী পুত্র এবং কুন্তীকে নিয়ে বিদুর যা করছেন সেটা হয়তো দুর্যোধনের মতোই তখন অনেকের কাছেই বাড়াবাড়ি মনে হয়েছিলো। ব্যাসদেবের এই ইতিহাসে তাদের কোনো নাম নেই। দ্বৈপায়ন নিজেও এদের কোনো অন্যায় দেখেও দেখেননি, শুনেও শোনেননি, কৌশলে এড়িয়ে গেছেন। তিনি এড়িয়ে গেলেও অনেক মানুষের চিত্ত বিদুরের প্রচারে যে সায় দেয়নি সেটা যুদ্ধের সময়ে খুব ভালোভাবেই বোঝা গিয়েছিলো।

ভীষ্ম তখন অনাদৃত। ভালো মন্দ কোনোদিকেই আর মনোযোগ বা নিবিষ্টতা খরচ করেন না তিনি। ধৃতরাষ্ট্র একান্তভাবেই বিদুরের দ্বারা মোহাচ্ছন্ন। দুর্যোধন একা কী করতে পারেন? তবে এতোদিনে দুর্যোধন আরো একটি কথা পিতার শ্রবণে প্রবিষ্ট করাতে সক্ষম হলেন যে বিদুর তাঁর পিতার অর্থবহ হয়েও প্রতিকূল ব্যবহার করছেন। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, ঐ পাঁচটি ভ্রাতা ধার্তরাষ্ট্রদের প্রতি নিষ্ঠুর হলে নিন্দে নেই, কুরুকুলের ভ্রাতা সেজে এসে কুরুকুলের শত্রু হলে নিন্দে নেই, যতোদিন দুর্যোধন না জন্মালেন ততোদিন পর্যন্ত পাণ্ডু কেন ক্ষেত্রজ পুত্র গ্রহণ করেননি তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, অতোবড়ো সাম্রাজ্যের প্রাক্তন অধিপতি কী ভাবে মৃত্যুমুখে পতিত হলেন তা নিয়ে কোনো তদন্ত নেই, রাজ্যে খবর পাঠিয়ে মৃত পাণ্ডুকে কেন রাজার মতো সমারোহ করে আনা হলো না তা নিয়ে কোনো বিকার নেই, কেন এই পুত্রগণ পিতার মৃত্যুকালে উপস্থিত হয়নি এবং কুরুরাজ্যে এসে একদিনের জন্যও পিতার নাম উচ্চারণ করেনি বা পিতৃশোকে কাতর হয়নি তা নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই, কেনই বা তাদের মাতা কুন্তী অতি নিভৃতে অতি নিঃশব্দে সেই মৃত্যু গোপন রাখলেন, মাদ্রীই বা কী ভাবে মৃত হলেন, এবং মাদ্রীর পুত্ররা মাতৃশোকে এক বিন্দুও বিচলিত নয় কেন তা নিয়েও কোনো জিজ্ঞাসা নেই, কেন শববাহকরা সে বাটীতে একবিন্দু জলস্পর্শ পর্যন্ত করলেন না তা নিয়েও কোনো বিতর্ক নেই। যা আছে তা শুধু দাবি। পাণ্ডব নামধারী পাঁচটি পার্বত্য তরুণ যা করবে তার নামই বীরত্ব। একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ কেটে অর্জুনকে সর্বাপেক্ষা বড়ো তীরন্দাজ হিশেবে গণ্য করার নামও বীরত্ব, কর্ণের নিকট অর্জুন দ্বন্দ্বযুদ্ধে হেরে যাবেন ভয়ে জন্মবৃত্তান্তের দোহাই দিয়ে কর্ণকে ঠেকিয়ে রাখার নামও বীরত্ব। আর যে মানুষটি লোভে কামে অক্ষমতায় সাধারণের অপেক্ষাও সাধারণ, তিনি মহাত্মা। সমস্ত মহাভারতে একমাত্র যিনি একবার হোক, দুবার হোক, স্বীয় স্বার্থে অনৃতভাষণের দোষে দুষ্ট, তিনিই সত্যবাদী যুধিষ্ঠির।

পাণ্ডবরা বারণাবতে গিয়ে দেখলেন প্রকৃতই একটি জনাকীর্ণ মনোরম নগর। সবাই যখন সেখানে পুরঃপ্রবেশ করলেন, তখন সেখানকার অধিবাসীরা তাঁদের যথেষ্ট সমাদরে গ্রহণ করলেন। পুরবাসীদের আদর আপ্যায়ন সম্মান ইত্যাদি সাঙ্গ হলে তাঁরা যখন তাঁদের জন্য রক্ষিত সুরম্য হর্ম্যে প্রবিষ্ট হলেন, দেখা গেলো পুরোচন অত্যুৎকৃষ্ট ভক্ষ্য পেয় আসন ও শয্যা সমুদয় রাজভোগ্য দ্রব্যও প্রস্তুত করেছে। এ সব ধৃতরাষ্ট্রের আদেশেই হয়েছে। সুব্যবস্থার কোনো ত্রুটি নেই। পরম আনন্দে, পরম বিলাসিতায়, দশ দিন তাঁরা সেই হর্ম্যেই বাস করলেন। দশ দিন পরে তাঁরা তাঁদের জন্য নির্মিত ‘শিব’ নামক গৃহে—যেটাকে জতুগৃহ বলা হয়েছে, সেখানে বাস করতে এলেন।

পুত্রগণসহ কুন্তী এবং তাঁদের দেখাশুনো করবার জন্য পুরোচন একসঙ্গে গিয়েই বারণাবতে পৌঁছেছিলেন। পাণ্ডবগণ গিয়েছিলেন বায়ুবেগগামী সদশ্বযুক্ত রথে আর পুরোচন গিয়েছিলেন দ্রুতগামী অশ্বতরযোজিত রথে। ধৃতরাষ্ট্রকে সরিয়ে দুর্যোধনের ন্যায্য অধিকার অস্বীকার করে, যুধিষ্ঠিরকে কুরুরাজ্যের ভূপতির আসনে বসাবার জন্য বিদুরের মন যতোটা একাগ্র ছিলো, তাঁর পিতা দ্বৈপায়নের মনও ততোটাই। সেই মন ছাপিয়ে যতোটুকু উদ্বৃত্ত তথ্য তিনি পরিবেশিত করেছেন তা হতে পারে জনমতের চাপে, অথবা তাঁর নীতিবোধ অন্যরকম ছিলো, অথবা তা পরবর্তীকালের বিভিন্ন রচয়িতার অবদান। সেই কারণেই, সহস্র সহস্র বৎসর অতিক্রান্ত হবার পরেও, ঐ পারিবারিক এবং সামাজিক ইতিহাস মানুষের মনকে উদ্ভ্রান্ত করে, চিন্তিত করে, উত্তেজিত করে, ক্রুদ্ধ করে এবং ব্যক্তিগত বোধ বুদ্ধি নীতি অনুযায়ী সত্য উদ্ঘাটনে প্ররোচিত করে। বিদুরের প্রতি বাৎসল্যবশতই দ্বৈপায়ন হঠাৎ হঠাৎ এসে পুত্রের অভিপ্রায় পূর্ণ করে যান। উল্লেখ না থাকলেও অনুভবে বাধা হয় না, বিদুরও প্রায়শই পিতার নিকট গিয়ে তাঁর সান্নিধ্যলাভে সমাদৃত হন। বিদুরের পুত্র যুধিষ্ঠিরের প্রতি দ্বৈপায়নের স্নেহ অন্যান্য পিতামহের মতোই প্রবল।

দশ দিন পরে তাঁদের জন্য নির্মিত গৃহে প্রবিষ্ট হয়েই যুধিষ্টির ভীমকে বললেন, ‘দেখ ভাই, এ গৃহ ঘৃত লাক্ষা ও বসা প্রভৃতি দাহ্য পদার্থ দিয়ে তৈরি। ওরা আমাদের পুড়িয়ে মারতে চায়।’ ভ্রাতারা কিছু অনুভব না করলেও যুধিষ্ঠির প্রায় মুখস্থের মতো বলে গেলেন সেই সব পদার্থের নাম। জতুগৃহ নামের বাড়িটি নিয়ে যে ঘটনা ঘটেছে তা প্রায় পৃথিবীর সকল গোয়েন্দা গল্পের মধ্যে একটি শ্রেষ্ঠ গল্প বলা যেতে পারে। দাহ্য পদার্থ দিয়ে কে যে ঐ বাড়িটির নির্মাতা তার ঠিকানা কেউ সঠিক জানে না, যদিও বলে দেওয়া নামটা সেই হতভাগ্য দুর্যোধনের। হস্তিনাপুরে থাকাকালীন যুধিষ্ঠিরের মুখনিঃসৃত একটি বাণীও কারো শ্রুতিগোচর হয়নি। যৌবরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হবার পরেও তাঁর মুখে কোনো বক্তব্যই কেউ শোনেনি। যা বলবার, বলেছেন বিদুর। কিন্তু হস্তিনাপুর থেকে বেরিয়েই তিনি অন্য মানুষ।

এখানে কয়েকটি বিষয় একটু খতিয়ে দেখা যাক। প্রথম কথা, পাণ্ডবদের জন্য মাত্র দশ দিনে ঐ রকম একটি চতুঃশাল গৃহ নির্মাণ করা যেমন কঠিন, তেমনি কঠিন গৃহে শণ ও সর্জরস প্রভৃতি যাবতীয় বহ্নিযোগ্য দ্রব্য প্রদান করা, মৃত্তিকাতে প্রচুর পরিমাণে ঘৃত তৈল বসা ও লাক্ষাদি মিশিয়ে তা দিয়ে ঐ গৃহের প্রাচীর লেপন করা। তাছাড়া, এসব কাজ কখনো যাদের পুড়িয়ে মারবার হেতু করা তাদের সাক্ষাতে কেউ করে না। আর সাক্ষাতে না করলে যুধিষ্ঠির জানলেন কী করে? গন্ধে এতো কিছু আন্দাজ করা সম্ভব নয়। যা যা দিয়ে দেয়াল প্রলেপিত হয়েছে, তার প্রত্যেকটির নাম জানাও সম্ভব নয়। তদুপরি, এতো কিছু জেনে সে বাড়িতে যাওয়াও সম্ভব নয়। হস্তিনাপুর থেকে বেরিয়ে যদিও তাঁর কণ্ঠস্বরে যথেষ্ট জোর বেড়েছে, কিন্তু বুদ্ধিটা ততো খোলেনি। এখানে আসবার মুহূর্তে সে সব কথা পিতার ম্লেচ্ছ ভাষার সাহায্যে শুনেই জেনেছেন। এবং এটা একদিনের শ্রাব্য কথা নয়, অনেক দিনেরই শিক্ষা। সেই শিক্ষাটাই বাড়ি থেকে বেরোবার পূর্ব মুহূর্তে ঝালিয়ে দেওয়া হয়েছিলো।

ভীম এদিক ওদিক তাকিয়ে গন্ধ নেবার চেষ্টা করলেন বটে, কিন্তু কিছু বুঝতে পারলেন না। পরে বললেন, ‘যদি মনে করেন এখানে অগ্নিভয় আছে, তবে চলুন আমরা পূর্ব বাসস্থানেই ফিরে যাই।’ যুধিষ্ঠির রাজি হলেন না। কেন হলেন না? তাঁরা না এলে পুরোচন কি তাঁদের জোর করে নিয়ে যেতে পারতো? এতো ভয় কেন? তাঁরা রাজা, তাঁদের তা অনিরাপদে থাকার কথা নয়। দেশবাসীরা সবাই তাঁদের রাজসম্মানেই গ্রহণ করেছে, শ্রদ্ধা করেছে, চাইলে তাঁরা সকলেই সসম্মানে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দিয়ে নিজেদের কৃতার্থ মনে করতো। তদ্ব্যতীত, ধৃতরাষ্ট্র তো তাঁদের সেখানে আজীবন থাকার কথা বলেননি, জোর করেও পাঠাননি। তাঁরা যেতে চাইলে বলেছেন, কয়েকদিন আমোদ আহ্লাদ করে ফিরে এসো। কেন তাঁরা প্রত্যাবৃত্ত হলেন না? যুধিষ্ঠির এক অবিশ্বাস্য যুক্তি দিয়ে বললেন, ‘শোনো, আমরা একথা বুঝতে পেরেছি জানলে আমাদের পুরোচন বলপ্রয়োগ করে দগ্ধ করবে।’

যদি পুরোচন তাঁদের বলপ্রয়োগেই দগ্ধ করতে সক্ষম, তবে কষ্ট করে এতো বড়ো বাড়িটা তৈরি করবার কী প্রয়োজন ছিলো? তাঁরা তো এখানে থাকতে আসেননি, এসেছেন বেড়াতে। দাহ্য পদার্থ দিয়ে গৃহ তৈরি না করলেও কি কোনো গৃহ অগ্নিদগ্ধ হয় না? অগ্নি সর্বভুক। সুযুপ্ত অবস্থায় রাজা মহারাজাই হোন, বা ফকির ভিখারিই হোন, তার নিকট সকলেই সমান ভক্ষ্য। ইচ্ছে করলে সেটা তো হস্তিনাপুরেও হতে পারতো। তবু যদি ধরা যায় স্বশাসিত নগরে এমন অপকর্ম করায় ধৃতরাষ্ট্র বা দুর্যোধনের আপত্তি ছিলো, দুর্নামের ভয় ছিলো, তথাপি এ প্রশ্ন থেকেই যায়, যাঁরা মাত্র কয়েকদিনের জন্যই বেড়াতে এসেছেন, তাঁরা নিজেদের রাজত্ব ছেড়ে সম্পূর্ণ একটি বৎসর কেন সেখানে অবস্থান করলেন? আর সেই গৃহে পা দেওয়া মাত্রই কেন বিদুর তৎক্ষণাৎ একটি খনক পাঠিয়ে দিলেন? এবং সেই খনক যেমন তেমন খনক নয়। একজন অতিশয় কৃতবিদ্য প্রযুক্তিবিদ। অতো দূরে বসে বিদুর কী করে তাদের অনুকোটি চৌষট্টি খবর রেখেছেন, যদি না চর-অনুচরের যাতায়াত অব্যাহত থাকে?

যুধিষ্ঠির ভীমকে এ কথাও বললেন, ‘দ্যাখো, শত্রু নির্মিত এই জতুগৃহ দগ্ধ হলে পর পিতামহ ভীষ্ম ও অন্যান্য কুরুবংশীয় মহাত্মারা অতিশয় ক্রোধান্বিত হবেন। বলবেন, ‘‘কে এই অধার্মিক কর্ম করালো’’?’ এই বাক্য ক’টি যুধিষ্ঠির এমন নিশ্চিত ভঙ্গিতে উচ্চারণ করলেন যা থেকে খুব স্পষ্ট ভাবেই বোঝা যায় তিনি জানতেন পুড়ে যাঁরা মরবেন তাঁরা আর যেই হোন, কুন্তীর পঞ্চ পুত্র নন। যাঁরা অগ্নি প্রদানে সেই গৃহ প্রজ্বলিত করবেন, তাঁরাও ধার্তরাষ্ট্রদের কেউ নন। যদি সেই ভয়ই তাঁর থাকতো তবে জেনেশুনে কী করে একথা বললেন, ‘জতুগৃহ দগ্ধ হলে পিতামহ ভীষ্ম ও অন্যান্য কুরুবংশীয় মহাত্মারা অতিশয় ক্রোধান্বিত হবেন।’ তাঁরা যদি দগ্ধই হন, তবে কে কী বললো আর না বললো কী এসে যায় তাতে? তদ্ব্যতীত, তাঁদের দগ্ধ করবার জন্যই যদি দাহ্য পদার্থ দিয়ে বাড়িটি তৈরি হয়, পুরোচনের জন্য যে বাড়ি সে বাড়ি তো অমন দাহ্য পদার্থ দিয়ে তৈরি করবার কোনো প্রশ্ন ছিলো না। যিনি তাদের পোড়াবেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনিও কি নিজেকে পুড়িয়ে মারবেন? সহমরণ?

পিতামহ কৃষ্ণদ্বৈপায়নের রচনার চাতুর্য, পিতা বিদুরের কাপট্য আর মাতা কুন্তীর হৃদয়হীনতা, এই তিনটি পাথেয় নিয়েই যুধিষ্ঠির চালিত হচ্ছিলেন কুরুরাজ্য দখলের জন্য। আর এঁদের সকলের দুষ্কর্মের বোঝা বহন করছিলেন হতভাগ্য দুর্যোধন। পুড়ে মরবার জন্যই কি সম্পূর্ণ এক বৎসর ভ্রাতাগণ আর তাদের মাতাকে অপেক্ষা করতে হলো সেখানে? এটা কি সম্ভব? যে করেই হোক নিশ্চয়ই তাঁরা বেরিয়ে পড়তেন সে বাড়ি থেকে। একটা পাতালপথ তৈরি হওয়া তো সহজ ঘটনা নয়, দু-একদিনের ব্যাপারও নয়, দু-একজন মানুষের কর্মও নয়। প্রযুক্তিবিদ্যার উৎকৃষ্ট নির্দশন এই সুড়ঙ্গ পথ তৈরি হতে সময় লাগলো সম্পূর্ণ একটি বৎসর। এই এক বছর কেন পুরোচন নিশ্চেষ্ট অবস্থায় বসে রইলেন? দাহ্য পদার্থে তৈরি তাঁর বাড়ির ওপর এতোদিন ধরে কী কাজকর্ম হচ্ছে সেটা জানবারও কৌতূহল কি তাঁর হলো না? তাছাড়া, যে মানুষ এতোগুলো বিশেষ লোককে পুড়িয়ে মারবার মতো একটা নৃশংস, গূঢ় অভিসন্ধি নিয়ে একটা বিশেষ হর্ম্য তৈরি করেছেন, তিনি নিশ্চয়ই সদাসতর্ক থাকবেন, অশান্ত থাকবেন, এবং অনুক্ষণই উদ্দেশ্য সাধনের সুযোগ খুঁজে বেড়াবেন। উপরন্তু, দশদিনে তৈরি বাড়ির ওপর দিয়ে এতোগুলো ঋতুই বা বয়ে যেতে দেবেন কেন? দাহ্য পদার্থ তো অনন্তকাল ধরে প্রলেপিত থাকতে পারে না? কখনো তা গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে দগ্ধ হবে, কখনো বর্ষার অবিরল বারিপাতে ধৌত হবে। পাণ্ডবরা না হয় পালাবার রাস্তা তৈরি না হলে লুকিয়ে বেরোতে পারছিলেন না। কিন্তু পুরোচনের তো সে ভাবনা নেই, সে অযথা সময় নষ্ট করবে কেন? রাত কি কখনো গভীর হয়নি? পাণ্ডবরা কি ক্লান্ত দেহে নিদ্রাচ্ছন্ন হননি কখনো? অাসলে এ বাড়ি আদপেই পুরোচনের তৈরি নয়। অন্তত দাহ্য পদার্থের ব্যবহার তিনি কখনোই করেননি।

যেদিন পাতালপথ সম্পূর্ণ হলো, এবং যুধিষ্ঠির মনে করলেন সময় উপস্থিত হয়েছে, সেদিন চারিদিক নিঃঝুম হলে তিনি বললেন, ‘এবার আগুন দাও। প্রথমে পুরোচনের গৃহ ভস্ম করো, তারপর আরো ছয়জনকে এখানে রেখে পুড়িয়ে আমরা অলক্ষিতে পলায়ন করবো।’

ছয়জন সেখানে কারা থাকবেন? দয়ার অবতার মহাত্মা যুধিষ্ঠির আর যুধিষ্ঠিরের দয়ার্দ্রচিত্ত মাতা কুন্তী সে ব্যবস্থাও ঠিক করে রেখেছেন। কুন্তী চালাকি করে সেদিন সন্ধ্যায় কয়েকজন ব্রাহ্মণব্রাহ্মণীকে নিমন্ত্রণ খাওয়ালেন। তারা চলে যাবার পর একজন ক্ষুধার্ত নিষাদ মাতাকে তার পাঁচপুত্রসহ এতো অধিক পরিমাণে পান ভোজন করালেন যে তারা হতজ্ঞান ও মৃতকল্প হয়ে সেখানে পড়ে রইলো। জ্যেষ্ঠের আদেশে ভীম প্রথমেই পুরোচনের গৃহে (এখানেই প্রমাণিত হলো পুরোচনের গৃহ আলাদা ছিলো এবং দাহ্যপদার্থে প্রলেপিত ছিলো) আগুন দিলেন, পরে জতুগৃহের চারিদিকে অগ্নিপ্রদান করে যখন দেখলেন অগ্নি সর্বত্র প্রজ্বলিত হয়েছে, তখন মাতা ও ভ্রাতৃগণসহ সেই পাতাল পথে নিষ্ক্রান্ত হলেন।

ভেবে দেখুন কতদূর লোভী হলে, পাপিষ্ঠ হলে মানুষ এভাবে একটি নির্দোষ দুঃখী রমণীকে তার পাঁচ পাঁচটি পুত্রসহ পুড়িয়ে মারতে পারে। অন্যের রাজ্য কেড়ে নেবার লোভে যদি যুধিষ্ঠির এই ভয়ঙ্কর কর্মে প্রবৃত্ত হন, তবে দুর্যোধন তাঁর পিতাকে উচ্ছিন্ন করে, তাঁকে বঞ্চিত করে যারা সেই সিংহাসনের দখল চায়, তাদের প্রতিবন্ধক হলে তাঁর অপরাধটা কোথায়? তিনি নিশ্চয়ই তাঁর পিতাকে রক্ষা করবেন, নিজের স্বার্থ দেখবেন। সেটাই তো তাঁর ধর্ম, তাঁর কর্তব্য। যদিও দুর্যোধন তাঁর সারাজীবনে কখনো ততোটা নীচে নামবার কথা ভাবেননি, যতোটা নীচে পাণ্ডব নামধারী যুবক ক’টিকে বিদুর এবং দ্বৈপায়ন নামাতে পেরেছেন। এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সমাপ্ত করতে কুন্তীর চোখের পাতাটি নড়লো না। পাঁচটি পুত্রেরও একবিন্দু বিবেক দংশন হলো না।

আর একদিকে হুতাশনের অগ্নিতাপ যখন প্রবল আকার ধারণ করলো, বিদুরের কৃপায় সমস্ত পুরবাসীগণ অতিশয় দুঃখিত হয়ে বলতে লাগলেন, ‘দ্যাখো, দুরাত্মা পুরোচন পাণ্ডবদ্বেষী কুরুকলঙ্ক পাপাত্মা দুর্যোধনের আদেশানুসারে, নিরপরাধ সুবিশ্বস্ত সমাতৃক পাণ্ডবগণকে দগ্ধ করবার জন্য যে গৃহ নির্মাণ করেছিলো, এখন তাতে অগ্নিপ্রদান করে স্বীয় মনস্কামনা সিদ্ধ করলো। ধর্মের কি অনির্বচনীয় মহিমা! দুরাত্মা নিজেও এই প্রদীপ্ত হুতাশনে দগ্ধ হলো। দুরাত্মা ধৃতরাষ্ট্রকে ধিক্, কী দুর্বুদ্ধি! ঐ দুরাত্মা পরমাত্মীয় ভ্রাতুষ্পুত্রগণকে শত্রুর মতো অনায়াসে দগ্ধ করলো।’ যে কথা যুধিষ্ঠির তাঁর ভ্রাতাদের পূর্বে বলেছিলেন ঠিক তাই হলো। কিন্তু এরা এটা জানলো কী করে যে ধৃতরাষ্ট্র এদের পুড়িয়ে মারবার জন্যই এখানে পাঠিয়ে দিয়েছেন? এটা তো এই দেশবাসীদের জানবার বা ভাববার প্রশ্নই নেই। বিদুরের প্রচারমহিমা এখানেও কার্যকরী হলো।

মাতৃসমবেত পাণ্ডবেরা যখন পাতাল পথ দিয়ে দ্রুতবেগে চলতে লাগলেন, মহাভারতের বর্ণনা অনুসারে ‘ভীম ব্যতীত সকলেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তখন ভীম মাতাকে স্কন্ধদেশে, নকুল ও সহদেবকে কোলে নিলেন এবং যুধিষ্ঠির ও অর্জুনের দুই হাত ধরে বায়ুবেগে চলতে লাগলেন। ভীমের বক্ষের আঘাতে বনরাজি ও তরুসকল ভগ্ন, ও পদাঘাতে ধরাতল বিদীর্ণ হতে লাগলো।’ শুধু তাই নয় ‘গমনকালে তার ঊরুবেগে বনস্থ বৃক্ষ সকল’ শাখা প্রশাখার সঙ্গে থরথর করে কাঁপতে থাকলো। তার ‘জঙ্ঘাপবনে পার্শ্বস্থ বৃক্ষ ও লতা সব ভূতলশায়ী’ হলো। তা হলেই ভেবে দেখুন, দুর্যোধনের উপর যখন ভীম খেলাচ্ছলে আক্রমণ করতেন, তখন সেই আক্রমণ কী ভয়ঙ্কর হতো! দিনের পর দিন তাঁরা কী কষ্ট সহ্য করেছেন! কিন্তু সেটা নিয়ে কোনো কথা নেই, ব্যথা নেই, শাসন নেই, নিন্দে নেই। অথচ অতিষ্ঠ হয়ে দুর্যোধনরা যখন তাঁকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে, লতা দিয়ে বেঁধে ফেলে এলেন জলের ধারে, তা নিয়ে দুর্যোধনের প্রতি অকথ্য নিন্দায়, বিদুরের অপপ্রচারে, পুরবাসীগণ মুখর হয়ে উঠলো। আসল কারণটা কেউ দেখলো না, ভাবতে লাগলো, সত্যই রাজত্বের ভাগ না দেবার জন্য বিষ খাইয়েছে দুর্যোধন। ভীমকে মেরে সে উদ্দেশ্য সাধিত হওয়া যে নেহাৎ অসম্ভব সেটা দুর্যোধন নিশ্চয়ই বুঝতেন।

পাতালপথ শেষ হলে যুধিষ্ঠির ভ্রাতাদের, এবং মাতাকে নিয়ে অন্য একটা জায়গায় এসে আকাশের তলায় দাঁড়াবেন। নিকটেই নদী। পথ প্রদর্শক সেখানেই অপেক্ষা করছিলো। সকলকে নিয়ে নদীতীরে এলেন। সেখানে জলযান অপেক্ষাই করছিলো তাঁদের জন্য। আরোহণ করলে চালক বললো, ‘মহাত্মা বিদুর আপনাদের তাঁর আলিঙ্গন জানিয়ে বলে দিয়েছেন যে আপনারা অবশ্যই কর্ণ দুর্যোধন ও শকুনিকে সংগ্রামে পরাজিত করবেন। এই তরঙ্গসহা সুগামিনী তরণীতে আপনারা নিঃসন্দেহে সমস্ত দেশ অতিক্রম করতে পারবেন।’ এখানে সংগ্রামের কথা উঠলো কেন, যদি না গোপনে গোপনে অন্য কোনো রাজার সঙ্গে ষড়যন্ত্র না করে থাকেন? তা ব্যতীত, তাঁরা যে পুড়ে মরেননি, সে কথাই বা বিদুর জানলেন কী করে সমস্ত ঘটনাটা যদি পূর্বপরিকল্পিত না থাকতো?

নৌকোয় উঠলেন তাঁরা, গঙ্গা পার হয়ে অপরতীরে অবতরণ করলেন। অবতরণ করে এদিক ওদিক তাকালেন না, নির্দিষ্ট ভাবে দক্ষিণ দিকে যেতে লাগলেন। কী ভাবে কোন পথে গমন করলে কী হবে, কুন্তী আর যুধিষ্ঠিরের জানাই ছিলো। বনপথে কিছুদূর যেতেই অপেক্ষমান ব্যাসদেবের সাক্ষাৎ মিললো। তিনি বললেন, ‘আমি সব জানি, পরিণামে তোমরা সুখী হবে। ধার্তরাষ্ট্রগণ ও তোমরা আমার পক্ষে উভয়েই সমান, কিন্তু আমি ধৃতরাষ্ট্রের সন্তানগণ অপেক্ষা তোমাদের অধিক ভালোবাসি। অধিক স্নেহ করি।’ যে ব্যাসদেবকে আমরা নিষ্কাম নির্মোহ ব্রহ্মচারী ঋষি বলে জানি তিনি নিজ মুখেই এ কথা বলছেন। তারপর বললেন, ‘আমি স্নেহবশে তোমাদের হিতসাধনে উদ্যত।’ এই বলে তাঁদের নিয়ে একচক্রা নগরীতে এলেন, এসে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, ‘মাতৃ-ভ্রাতৃ সমভিব্যাহারে একমাস এখানে পরম সুখে অবস্থান করো। মাস পূর্ণ হলে আমি আবার আসবো।’

এটাই হলো যুদ্ধ করে ধৃতরাষ্ট্রকে সিংহাসনচ্যুত করবার এবং যুধিষ্ঠিরকে সেই সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করবার প্রধান পদক্ষেপ। এখন যে যার মনে ভাবতে থাকুন, এই জতুগৃহ নামে গোয়েন্দা গল্পটির আসল ষড়যন্ত্রীটি কে? পূর্বাপর পরিকল্পনাই বা কার? অত দাহ্য পদার্থ দিয়ে বাড়িটি বানিয়ে, পাণ্ডবদের পুড়িয়ে না মেরে, কেনই বা সম্পূর্ণ একটি বৎসর পুরোচন রাতের পর রাত কেবল ঘুমিয়েই কাটালো? অার যিনি মহাত্মা, যিনি দয়ার অবতার, তিনি রাজ্যের লোভে কী সুন্দর আগুন জ্বালিয়ে মাতাসহ পাঁচটি পুত্রকে দগ্ধ করে, সেবক পুরোচনকে পুড়িয়ে, দিব্যি গিয়ে পিতামহ দ্বৈপায়নের সঙ্গে মিলিত হলেন। আর দুর্যোধন কিছু না জেনে না বুঝে ওদের পঞ্চভ্রাতা ও মাতার সব পাপের বোঝা বহন করে পাপাত্মা হলেন। স্বীয় পিতা পর্যন্ত জানলেন এই কীর্তি তাঁর পুত্রের। পিতামহ ভীষ্ম দুঃখে পরিপূর্ণ হলেন। লজ্জায় কাউকে মুখ দেখাতে পারলেন না। নগরবাসীরা ছি ছি করতে লাগলো। ধৃতরাষ্ট্রকেই দোষী সাব্যস্ত করা হলো, যেহেতু তিনি অতিশয় পুত্রবৎসল, নচেৎ ঐ দুরাত্মা পুত্রের কথা শুনে এই ভয়ঙ্কর কলঙ্কিত ও নিষ্ঠুর কার্যে কী করে সম্মতি জানালেন?

আর এই রটনার যিনি নায়ক, যিনি প্রত্যেকের মনে কুরুদের এই সব অধার্মিক অধম অসাধু কর্মের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সফল হলেন, তাঁর বিরুদ্ধে দুর্যোধন সব জেনে-বুঝেও কোনো প্রতিবাদ করতে পারলেন না। বিদুরের কূটনৈতিক চাল এবং অনৃতভাষণের ক্ষমতার কাছে তাঁকে পরাজিত হতেই হলো, কেননা এ বিদ্যায় একেবারেই তিনি পারদর্শী নন। বিদুরের তুলনায় তিনি নেহাৎ শিশু।

একমাস পূর্ণ হলে দ্বৈপায়ন পুনরায় একচক্রা নগরীতে এলেন। তিনি তাদের এবার পাঞ্চাল নগরীতে যেতে বললেন। তারপর সেখান থেকে ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে দৌপদীর স্বয়ংবর সভায় যাবার নির্দেশ দিলেন। বিদুর দ্বৈপায়নকে এটা বোঝাতে পেরেছিলেন যে ধৃতরাষ্ট্র যতোদিন বেঁচে আছেন ততোদিন সম্পূর্ণভাবে সমস্ত সাম্রাজ্য দখল করা সম্ভাবনার পরপারে। সুতরাং যে ভূপতি সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাশালী এবং পরিচিত, অর্জুনের বীরত্ব সম্পর্কে অবহিত, ঠিক তাঁকেই ভেবে বার করেছেন। ইনি যদি পাণ্ডবদের সহায় হন, তাহলে কুরুবংশ ধ্বংস করা অনেকটা সহজ হয়ে আসবে। বিদুর এবং দ্বৈপায়ন সেই কর্মেই প্রবৃত্ত হয়ে এক পা দুই পা করে যুদ্ধের দিকে অগ্রসর হলেন।

সাধারণভাবে এটাই সত্য যে বিদুর যখন দুই পক্ষেরই কেউ নন, তাঁর নিকট কুরুরাও যা পাণ্ডবরাও তাই, অতএব তিনি তৃতীয়পক্ষ। এবং তৃতীয় পক্ষের নিরপেক্ষ হওয়াই স্বাভাবিক, পক্ষপাতদুষ্ট নয়। সুতরাং পাণ্ডবরাই রাজা হোন, বা কুরুরাই রাজা হোন, তাতে তাঁর নিশ্চয়ই কিছু যায় আসে না। বরং ধৃতরাষ্ট্রের রাজবাটীতে তাঁর সম্মান অনাহত। স্বয়ং রাজা তো তাঁর হস্তধারণ করেই হাঁটছেন, তাঁর অদর্শনে রাজা অন্ধকার চোখে আরো অন্ধকার দেখছেন। অথচ পাণ্ডবদের জন্য বিদুরের কীসের এতো মাথা ব্যথা সেটাই দুর্যোধন বুঝে উঠতে পারেন না। কর্ণও তাঁর বন্ধুর মতো একই কথা ভেবে অবাক হন। বিদুরের যে পাণ্ডবদের প্রতি একটা আসক্তি এবং উদগ্র পক্ষপাত আছে সেটা এতোই প্রত্যক্ষ যে কারো চোখেই না পড়ার মতো নয়। ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ হলেও নির্বোধ তো নন। সমস্তক্ষণই তো বিদুর তাঁর কাছে পাণ্ডবদের স্তুতি গাইছেন, আর দুর্যোধনের মস্তকচর্বণ করছেন। তা নিয়ে কখনো কি তাঁর মনে কোনো বিকার হয় না? মনে হয় না, পাণ্ডবদের নিয়ে বিদুর এতো বাড়াবাড়ি করছেন কেন? কতোটুকু চেনেন তাঁদের। দেখলেন তো এই প্রথম। বিদুরের প্রতি ধৃতরাষ্ট্রের এই অদ্ভুত নির্ভরতা, আপাতভাবে যার কোনো যুক্তি নেই। ভীষ্ম এখন সর্বত্রই অনুপস্থিত। ধৃতরাষ্ট্র তাঁর সঙ্গে কোনো পরামর্শই করেন না। তিনিও অযাচিতভাবে দেন না। এই রাজন্যবর্গের মধ্যে পিতামহ ভীষ্ম আর কর্ণই শুদ্ধ আর্য। সম্ভবত সে জন্যই তাঁরা বর্জিত, দ্বৈপায়ন দ্বারা উপেক্ষিত।

চলবে...


বাকি পর্বগুলো পড়ুন এই লিঙ্কেঃ https://www.amarboi.com/search/label/mahabharatera-maharanye


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com