সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label muhammad zafar iqbal. Show all posts
Showing posts with label muhammad zafar iqbal. Show all posts

সাস্টে ২২ বছর - ইয়াসমীন হক অনুবাদ মুহম্মদ জাফর ইকবাল

সাস্টে ২২ বছর - ইয়াসমীন হক


সাস্টে ২২ বছর - ইয়াসমীন হক
অনুবাদ মুহম্মদ জাফর ইকবাল


“...ভোরবেলার শিফটে যে পুলিশেরা ছিল, তারা ডিউটি শেষ করে চলে গেছে এবং পরের শিফট তখনো আসেনি। এই সময় তিনজন তরুণ আমাদের বিল্ডিংয়ের দিকে ছুটে আসে, গার্ড ভয় পেয়ে গেটে তালা মেরে উপরে উঠে গেল। কাজেই তারা আর বাসার ভিতরে ঢুকতে পারল না । বাইরে থেকে আমাদের বিল্ডিংয়ের সামনের জানালাতে বোমা ছুড়ে মারল ।

আমরা বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দে ঘুম থেকে জেগে৷ উঠেছি। একটা ভয়াবহ আতঙ্কের পরিবেশ । মনে আছে নাবিল আর ইয়েশিম তখন চিৎকার করছে । ইয়েশিম কাঁদতে কাঁদতে বলছে, “আব্বু তুমি লুকিয়ে যাও! প্লিজ লুকিয়ে যাও..."

এই বইটি হচ্ছে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প-কথা, শুধু যে লেখাপড়া এবং গবেষণার গল্প তা নয় একই সাথে এটি আন্তরিকতা, ত্যাগ, পরিশ্রম, দুঃখ, সন্ত্রাস, অসততা, প্রতারণা, ক্রোধ এবং সবার উপরে ব্যক্তিগত সাহসের গল্প । তরুণ শিক্ষকেরা কীভাবে এই ক্যাম্পাসটিকে প্ৰাণোচ্ছল করে রেখেছে। তার গল্প । বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বিচিত্ৰ ঘটনার ভেতর কেমন করে ছাত্রছাত্রীদের অকুণ্ঠ ভালোবাসায় এই বিশ্ববিদ্যালয়টি গড়ে উঠেছে তার গল্প ।

প্রচ্ছদ আলোকচিত্ৰ : অনি ইসলাম

আলোকচিত্রঃ তানভীর আলীম

সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতিঃ

ইয়াসমীন হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি শেষ করে ১৯৭৬ সালে পি.এইচ.ডি করার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন । ১৯৮৪ সালে ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনে পি.এইচ.ডি. শেষ করে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট ডক্টরাল কাজ শুরু করেন ।

ইয়াসমীন হক ১৯৭৮ সালে তার সহপাঠি মুহম্মদ জাফর ইকবালকে বিয়ে করেন । তাদের দুই সন্তান, নাবিল ইকবাল ও ইয়েশিম ইকবাল । তার পুত্ৰ সন্তানের জন্মের পরপরই তিনি পোস্ট ডক্টরাল কাজ বন্ধ করে দেন । তার শিশু সন্তানেরা স্কুলে যাওয়ার উপযোগী না হওয়া পর্যন্ত বহু বছর তিনি তার সন্তানদের বড় করে তোলেন । (ছেলে নাবিল এম.আই.টি থেকে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে পি.এইচ.ডি. করে এখন ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ডরহামে শিক্ষকতা করছে। মেয়ে ইয়েশিম ইকবাল নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে সাইকোলজিতে পি.এইচ.ডি. সমাপ্ত করছে।)

ইয়াসমীন হক ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে ফিরে এসে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন । তখন থেকে তিনি এখানেই আছেন, ছাত্রছাত্রীদের সময় দেয়ার পাশাপাশি গবেষণার জন্যে একটি প্রথম শ্রেণীর ‘নন-লিনিয়ার অপটিক্স ল্যাবরেটরি’ গড়ে তুলছেন ।

ভূমিকা

আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে কেন আমি এই বইটি লিখেছি আমার মনে হয় না। আমি সহজ কোনো উত্তর দিতে পারব! কোনো একটা কারণে আমার দিন তারিখ মনে থাকে, শুধুমাত্র এই কারণে জাফর ইকবাল বহুদিন থেকে আমাকে বলে আসছে সাস্টের সুদীর্ঘ ২২ বছর সময়ে আমি এখানে যা যা ঘটতে দেখেছি সেগুলো যেন লিখে রাখি । তবে সত্যি সত্যি লেখালেখির কাজটি শুরু করেছি আমাদের সাপ্তাহিক মঙ্গলবারের আড্ডার সদস্যদের আগ্ৰহ আর উৎসাহের কারণে ।

আমার এই লেখায় সাস্টের প্রকৃত ঘটনা প্রবাহের কিছুই ফুটিয়ে তােলা সম্ভব নয়, আমি শুধুমাত্র একটুখানি তুলে ধরেছি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস জীবন উত্তেজনাপূর্ণ এবং প্রায় সময়ে বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে যেতে হয় । এই ঘটনাগুলোর মাঝে ভালো ঘটনা যেরকম আছে ঠিক সেরকম খারাপ ঘটনাও আছে। তরুণ শিক্ষকেরা যেরকম জীবনকে আনন্দময় করে তুলতে পারে ঠিক সেভাবে রাজনীতিতে ঝুকে জীবনকে যন্ত্রণাময় করে তুলতে পারে।

লেখার সময় যখন নেতিবাচক কোনো ঘটনাকে বর্ণনা করতে হয়েছে তখন চেষ্টা করেছি ঘটনার পাত্ৰপাত্রীদের নামটি গোপন রাখতে । দুর্ভাগ্যক্রমে ভাইসচ্যান্সেলরদের সময় এই নিয়মটা মানা সম্ভব হয়নি তাদের নামগুলো এতো স্পষ্ট যে সেগুলো গোপন রাখার কোনো উপায়ও নেই ।

সাস্টে আমাদের জীবনটি কেমন ছিল সেটি কোনোভাবেই আমার পক্ষে পুরোপুরি ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। যখন আমি এটা লিখেছিলাম তখন মাঝে মাঝেই কোনো কোনো ঘটনা লিখতে গিয়ে আমি আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছিলাম। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাই এখানে আমাদের জীবনকে পূর্ণতা দিয়েছে এবং শুধুমাত্র তাদের জন্যেই এখানে আমি বছরের পর বছর কাটিয়ে দিয়েছি। এই ছাত্রছাত্রীরাই আমাদের জীবনকে অর্থপূর্ণ করেছে এবং উজীবিত করেছে।

আমি কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীনের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ আমার এই পাণ্ডুলিপিিটকে চূড়ান্তরূপ দেয়ার ব্যাপারে কম্পোজ এবং টাইপ করায় সাহায্য করার জন্যে । পুরানো ছবিগুলো খুঁজে বের করে দেওয়ার জন্যে আমি আমার সহকর্মী বন্ধুবান্ধব এবং ছাত্রছাত্রীদের ধন্যবাদ জানাতে চাই ।

আমি আলাদাভাবে আমার দুই সন্তান এবং জাফর ইকবালকে ধন্যবাদ জানাতে চাই তাদের অসংখ্য পরামর্শ এবং প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্যে । শুধুমাত্র তাদের উৎসাহ আর অনুপ্রেরণার জন্যেই এই বইটি লেখা সম্ভব হয়েছে!

ইয়াসমীন হক
সিলেট, ১০ জানুয়ারী ২০১৭
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সহজ ক্যালকুলাস - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

সহজ ক্যালকুলাস - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
সহজ ক্যালকুলাস
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
ভূমিকা
ক্যালকুলাস বিষয়টা আমার কাছে সব সময়েই প্রায় ম্যাজিকের মতাে মনে হয়েছে! যারা বিজ্ঞান কিংবা প্রযুক্তি নিয়ে লেখাপড়া করে তাদের সবাইকেই আগে হােক কিংবা পরে হােক এটা শিখতে হয়। কিন্তু অনেক সময়েই দেখেছি ছেলেমেয়েরা ক্যালকুলাস ব্যবহার করার কিছু নিয়ম শিখেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তার ভেতরকার সৌন্দর্যটা নিয়ে আগ্রহী হচ্ছে না, তাই আমি এই ছােট বইটা লিখেছি ছেলেমেয়েদের ভেতর ক্যালকুলাসের জন্যে আগ্রহ জন্মানাের জন্যে! তবে সবাইকে আমি মনে করিয়ে দিই, গণিতের একটা বই লেখার জন্যে যে রকম নিয়ম মেনে চলতে হয়, এই বইয়ে সেটা কিন্তু মেনে চলা হয়নি। যেমন অন্তত একটি জায়গায় সত্যিকারের ফাংশন নয় সেরকম একটি উদাহরণেও ক্যালকুলাস ব্যবহার করা হয়েছে (দেখি কে সেটা বের করতে পারে!) তাই কেউ যদি এই বই পড়েই থেমে যায় তাহলে হবে না, এটা পড়া শেষ করে তাকে সত্যিকারের ক্যালকুলাস বই পড়তে হবে। আরও একটা বিষয় মনে করিয়ে দেয়া যায় মানুষ যেভাবে বিছানায় শুয়ে কিংবা গালে হাত দিয়ে গল্পের বই পড়ে সেভাবে এই বইটি পড়লে হবে না। চেয়ার-টেবিলে বসে খাতা এবং কলম হাতে নিয়ে এটি পড়তে হবে, উদাহরণগুলাে বুঝতে হবে, অনুশীলনীগুলাে সমাধান করতে হবে। তা না হলে কিন্তু ক্যালকুলাস শেখা হবে না!
৯.৬.২০১৬
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

কোয়ান্টাম মেকানিক্স - মুহাম্মদ জাফার ইকবাল

কোয়ান্টাম মেকানিক্স - মুহাম্মদ জাফার ইকবাল
কোয়ান্টাম মেকানিক্স - মুহাম্মদ জাফার ইকবাল



This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

ব্ল্যাক হোলের বাচ্চা - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ব্ল্যাক হোলের বাচ্চা - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
ব্ল্যাক হোলের বাচ্চা - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
কাজেই দেখাই যাচ্ছে এখন আমাদের স্কুলের কোনো নাম ডাক না থাকতে পারে কিন্তু আজ থেকে পনেরো কিংবা বিশ বছর পরে আমাদের স্কুল থেকে অনেক বিখ্যাত (কিংবা কুখ্যাত) মানুষ বের হবে। ফুটবল প্লেয়ার, দার্শনিক, সিরিয়াল কিলার, মাদক সম্রাজ্ঞী, নায়কা, পীর, শীর্ষ সন্ত্রাসী, সাহিত্যিক কিংবা নেতা এরকম অনেক কিছু তৈরী হলেও এই স্কুল থেকে কোনো বৈজ্ঞানিক বের হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করে দেখা গেল আমাদের হাজী মহব্বতজান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে একজন খাঁটি বৈজ্ঞানিক বের হওয়ারও একটা বিশাল সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। তবে এটাকে সম্ভাবনা বলব না আশংকা বলব সেটাও অবশ্যি আমরা এখনো ঠিক জানি না।

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

একজন দুর্বল মানুষ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

একজন দুর্বল মানুষ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
একজন দুর্বল মানুষ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল




Read Now and Comments/Join our Facebook Group
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

ঢাকা নামের শহর ও অন্যান্য - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ঢাকা নামের শহর ও অন্যান্য - মুহম্মদ জাফর ইকবাল ঢাকা নামের শহর ও অন্যান্য - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

তুমুল জনপ্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। অন্যায় আর অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার তাঁর কলম। সাধাসিধে ভাষায় মেরুদন্ড টানটান করে কথা বলেন তিনি। সম্প্রতি লিখেছেন ডিজিটাল টাইম, শিক্ষ্যানীতি, ক্রসফায়ার, ঢাকা শহরের যানজট,পিলখানা ট্রাজেডি ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে। প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত সেসব লেখা নিয়ে বেরোল এ বই।


Download and Comments/Join our Facebook Group
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

আবারো টুনটুনি ও আবারো ছোটাচ্চু - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আবারো টুনটুনি ও আবারো ছোটাচ্চু - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
আবারো টুনটুনি ও আবারো ছোটাচ্চু - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

দূর থেকে টুম্পা আর মুনিয়াকে দেখা যাচ্ছে ছোটাছুটি করে বই কিনছে। বইয়ের বোঝা আর টেনে নিতে পারছে না- কী আনন্দ! টুনি আশেপাশে তাকাল, বাবা মায়েরা তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে হাঁটছে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা হাত ধরাধরি করে হাঁটছে। চশমা পরা খ্যাপা ধরনের একটা মেয়ে হেঁটে গেল, বাতাসে চুল উড়ছে, কী সুন্দর লাগছে দেখতে। শাড়ি পরা দুজন মেয়ে হাসতে হাসতে কথা বলতে বলতে হেঁটে যাচ্ছে কী সুন্দর কপালে লাল-সবুজ টিপ দিয়েছে। দেখতে কী ভালো লাগছে।
টুনি বসে বসে দেখে। তারপর মনে হয়, আহা বেঁচে থাকাটা কী আনন্দের!

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

যখন জাগিবে তুমি - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

Jokhoni Jagibe Tumi - Muhammad Zafar Iqbal
যখন জাগিবে তুমি - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

নূরুল ও তার নোট বই - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

নূরুল ও তার নোট বই - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
নূরুল ও তার নোট বই
মুহম্মদ জাফর ইকবাল


ঢাকায় এসে আমি একেবারে বেকুব হয়ে গেলাম। কোথাও মিলিটারির কোন চিহ্ন নাই, দোকানপাট খোলা, গাড়ি চলছে, বাস চলছে, রাস্তাঘাটে মানুষজনের ভিড়। ছোট ছোট বাচ্চারা গল্প করতে করতে স্কুলে যাচ্ছে, দেখে কে বলবে দেশে একটা যুদ্ধ চলছে। অথচ ঢাকার বাইরে কী অবস্থা! ট্রেনে এসেছি আজ, ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা আসতে লেগেছে এগারো ঘণ্টা, গৌরীপুরে চার ঘণ্টা ট্রেন দাঁড় করিয়ে রাখল। শুধু কি তাই? মাঝখানে হঠাৎ এক জায়গায় থামিয়ে দুইজন মিলিটারি চারজন মানুষকে টেনে বাঁশঝাড়ের পিছনে নিয়ে গেল। গুলির শব্দ হলো কয়েকটা—তারপর মিলিটারিগুলো সিগারেট টানতে টানতে ফিরে এলো। সত্যি কথা বলতে কী সবার সামনে গুলি করে বসেনি বলে আমার মিলিটারিগুলোর প্রতি এক ধরনের কৃতজ্ঞতা বোধের জন্ম হয়ে গেল। ভয় যে হচ্ছিল না তা নয়। বেশি ভয় পেলে আমার আবার বাথরুম চেপে যায়, ট্রেনের বাথরুমের যা অবস্থা যাওয়ার উপায় নাই, চেপে বসে রইলাম। মনে হতে লাগল কেন খামাখা বের হতে গেলাম, বাড়িতে থাকাই তো ভাল ছিল।
কিন্তু বাড়িতে থাকি কেমন করে? প্রথম প্রথম এক দুইদিন একটু পিকনিক পিকনিক মনে হয়। তারপর মহা যন্ত্রণা। ভাল সিগারেট নাই। চা পাওয়া যায় না, যদি বা চা জোগাড় করা যায় খেতে হয় গুড় দিয়ে। টানা পায়খানায় পুকুর থেকে পিতলের বদনা ভরে নিয়ে যেতে হয়—মহা যন্ত্রণার ব্যাপার। আশপাশে যত মানুষ আছে সবাই দেখে অমুক পায়খানা করতে যাচ্ছে। গোদের উপর আবার বিষফোঁড়া, গ্রামের পাশে একদিন মিলিটারি ক্যাম্প করে ফেলল। তারপর যা একটা অবস্থা হলো সেটা আর বলার মতো নয়। দাড়ি শেভ না করে একটু চাপ দাড়ির মতো করে ফেললাম। হাজী সাহেবের সাথে বাবার খাতির আছে বলে রক্ষা, না হলে তো আমার অবস্থা গোপালের মতো হতো, মাথার পিছনে ফুটো নিয়ে নীল গাঙে ভেসে বেড়াতাম, শোল মাছ খাবলে খাবলে শরীরের গোস্ত খেয়ে পরিষ্কার করে ফেলত। হাজী সাহেবই বাবাকে বললেন আমাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিতে। ইউনিভার্সিটি খুলে গেছে এখন গ্রামে পড়ে থাকা ঠিক নয়। হাজী সাহেব শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান, তার কথা ফেলা যায় না। যন্ত্রণার উপর যন্ত্রণা মুক্তিবাহিনীর একটা দল ক্যাম্পে এসে হামলা করে বসল। তারপর তো আমার গ্রামে থাকার আর কোন উপায় নাই। মিলিটারি বাড়িঘর জ্বালিয়ে মানুষ মেরে একটা বিশ্রী অবস্থা করে ফেলল। অবস্থা দেখে মনে হলো যখন সুযোগ ছিল তখন সাহস করে মুক্তিবাহিনীতে চলে গেলেই হতো। কোথায় থাকব, কী খাব, কী করব—এইসব ভেবে তখন গেলাম না। আবার ভয়ও লাগে যুদ্ধ-টুদ্ধ করে যদি মরেই গেলাম তাহলে দেশ স্বাধীন হলেই কী আর না হলেই কী?
বাবা তখন ঢাকা যাওয়ার একটা ব্যবস্থা করে দিলেন। পাশের গ্রামের ক্বারী সাহেব ঢাকা যাচ্ছেন তার সাথে চলে যাব। ক্বারী সাহেব সাতচল্লিশ সনে এ দেশে এসেছেন। আগে বিহারি ছিলেন এখন দুই দুইটা বাঙালি বিয়ে করে পুরোপুরি বাঙালি হয়ে গেছেন, তবে উর্দুটা মনে আছে। এখন হঠাৎ করে সেটা খুব কাজে আসছে। বাবাকে বললেন, কুই ডর নেহি, হাম লে যায়গা—আগে হলে বাংলায় বলতেন, আজকাল কথায় কথায় তার উর্দু বের হয়ে আসে।
ঢাকা আসতে অনেক যন্ত্রণা হলো, রাস্তাঘাট বন্ধ, অনেক হেঁটে এসে ট্রেনে উঠতে হলো। গ্রামের পর গ্রাম পুড়ে ছাই। মানুষ মরছে। যখন তখন ট্রেন থামিয়ে রেখে দেয়। সবাইকে দিয়ে গুলির বাক্স টেনে নামাল একবার। মনে হচ্ছিল আর বুঝি ঢাকা পৌঁছাব না—কিন্তু শেষ পর্যন্ত পৌঁছালাম।
পৌঁছে অবশ্য মনে হলো ব্যাপারটা খারাপ হলো না। আরামে থাকার জন্যে সারা দেশে এর থেকে ভাল আর কোন জায়গা নাই। ইদরিস সাহেবের বাসায় এক রাত থেকে আমি হলে চলে গেলাম। জিন্নাহ হল—মাঝখানে সূর্যসেন হল হয়েছিল, এখন আবার জিন্নাহ হল। ইদরিস সাহেব আরো কয়েকদিন থাকতে বলেছিলেন, কিন্তু আমি থাকলাম না। আমাকে দেখে এমনি ভাবভঙ্গি করতে লাগলেন যে আমার মেজাজটা খুব গরম হয়ে গেল। তার কথাবার্তা শুনে মনে হতে লাগল আমার বয়সী একজন মানুষ মুক্তিবাহিনীতে যোগ না দিয়ে যেন মহা অন্যায় করে ফেলেছি। সবাই যদি মুক্তিবাহিনীতে যায় তাহলে দেশটা স্বাধীন করবে কাদের জন্যে?
প্রথম দিন ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে অনেকের সাথে দেখা হলো। রাশেদ, আতাউর, জালাল, টিপু এমনকি দেখি কয়েকজন মেয়েও এসে হাজির। স্যারেরাও আছেন, ক্লাস নিবেন নিবেন করছেন এখনো শুরু করেননি। আমরা ক্যান্টিনে চা খেয়ে আড্ডা মারলাম, কথা বলার সময় অবশ্যি খুব সাবধান। এদিক সেদিক দেখে কথা বলি। কখন কার সামনে কী বলব তারপর মহা ঝামেলায় ফেঁসে যাব।
নূরুল হাজির হলো একদিন। আমাদের মাঝে নূরুল হচ্ছে সোজা ধরনের। ঢাকাতেই থাকে কিন্তু কথাবার্তা চালচলন মফস্বলের ছেলেদের মতো। জিজ্ঞেস করলাম, কি রে মুক্তিবাহিনীতে গেলি না?
খুব সহজেই সে বলতে পারত তুই গেলি না? কিন্তু তা না বলে এদিক-সেদিক তাকিয়ে বলল, যেতে তো চাই। কিন্তু কেমন করে যাই বল দেখি? দেশের এই অবস্থায় আমরা যদি না যাই—
তাহলে বসে আছিস কেন?
কেমন করে যাব?
বর্ডার পার হয়ে চলে যাবি।
কেমন করে পার হব? কোন্‌ দিক দিয়ে?
আমি ঠিক উত্তর দিতে পারি না তাই দাঁত বের করে হেসে বললাম, যা পর্যটন অফিসে গিয়ে খোঁজ নে!
সারাদিন ইউনিভার্সিটিতে বসে থাকি, চা-সিগারেট খাই। সন্ধেবেলা হলে ফিরে গিয়ে আবার আড্ডা মারি। বড় বড় জিনিস নিয়ে কথা বলি। পড়াশোনা নাই, অফুরন্ত অবসর। বই পড়ার অভ্যাস নাই, ফুটপাত থেকে হালকা ম্যাগাজিন নিয়ে এসে বসে বসে পড়ি। যখন অল্প কয়েকজন থাকি তখন বড় বড় নিশ্বাস ফেলে বলি, আর তো থাকা যায় না। মুক্তিবাহিনীতে যেতেই হয়। সবাই ঘন ঘন মাথা নাড়ি, কিন্তু কেউ আসলে যাই না। একটু ভয় ভয় করে কোথায় যাব, কী খাব, কোথায় থাকব!
এর মাঝে নূরুল একদিন একটা ছোট নোট বই নিয়ে এলো। আমাকে বলল, দেখো।
কী?
মিলিটারি নিয়ে জোক।
মিলিটারি নিয়ে?
হ্যাঁ। ঠিক করেছি মিলিটারি নিয়ে যত জোক বের হয়েছে সেগুলোর একটা কালেকশন বের করব। নাম দেব মিলিটারি কৌতুক; না হয় পাকিস্তানি কৌতুক। কি বলিস?
আমি কিছু না বলে মাথা নাড়লাম।
ভাল না আইডিয়াটা?
ভাল। কয়টা হয়েছে এই পর্যন্ত?
সাঁইত্রিশটা। এই দেখো।
আমি দেখলাম, গোটা গোটা হাতের লেখায় সাঁইত্রিশটা জোক। প্রত্যেকের উপরে হেডিং। প্রথমটার “মিলিটারি ও দর্জি।” পড়তে গিয়ে আমি হোঁচট খেলাম, কারণ সাধু ভাষায় লেখা। আমি জানতাম সাধু ভাষায় লেখালেখি উঠে গেছে, কিন্তু নূরুলের লেখা পড়ে তা মনে হলো না। সে লিখেছে :
“একদিন জনৈক দর্জি কাপড় কাটিতেছিল। একজন পাঞ্জাবি মিলিটারি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, দর্জি, তুমি কি করিতেছ? দর্জি বলিল, আমি পাঞ্জাবি কাটিতেছি। পাঞ্জাবি মিলিটারি তখন তাহাকে বেদম উত্তম-মধ্যম প্রদান করিল। কারণ নির্বোধ পাঞ্জাবি মিলিটারি বুঝিতে পারে নাই যে পাঞ্জাবি বলিতে দর্জি পরিধান করিবার পাঞ্জাবি বা কুর্তা বুঝাইয়াছিল।”
বেশির ভাগ জোকেরই এই অবস্থা। শুধু যে সাধু ভাষায় লেখা তই নয়, জোকটা বোঝানোর জন্যে বাড়তি অনেক ধরনের ব্যাখ্যা। কৌতুক আর কৌতুক নেই, বিশাল গদ্যে পরিণত হয়েছে। গোপাল ভাঁড়, বীরবল, নাসিরুদ্দিন হোজ্জা এবং শিখদের বোকামি নিয়ে যত গল্প আছে সবগুলোকে পাকিস্তানি মিলিটারি চরিত্রে রূপ দিয়ে সে কৌতুকগুলো লিখে রেখেছে। আমি যতক্ষণ নোট বইটা পড়ছিলাম নূরুল খুব আগ্রহ নিয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। পড়া শেষ হবার পর বলল, কেমন হয়েছে?
ভাল।
তাহলে হাসলি না যে?
জানা জোক তাই।
ও। নূরুল সাবধানে নোট বইটা শার্টের নিচে প্যান্টের মাঝে গুঁজে রেখে বলল, কী মনে হয় তোর? দেশ যখন স্বাধীন হবে তখন এরকম একটা বই দারুণ হিট হবে না?
তা হবে।
তুই যদি আর কোন জোক শুনিস বলিস আমাকে।
বলব।
কিছুদিনের মাঝেই সবাই জেনে গেল নূরুল পাকিস্তানি মিলিটারি নিয়ে জোক সংগ্রহ করছে। আমাদের কারো কারো কাজ নেই, কাজেই সবাই এই কাজে বেশ মন দিলাম। বেশ আগ্রহ নিয়েই নূরুলের জন্যে কৌতুক খুঁজতে থাকি। এর মাঝে টিপু একটা ভাল জোক নিয়ে এলো। জোকটা এ রকম :
একজন মিলিটারি গিয়েছে মুরগি হাটে। মুরগিওয়ালাকে জিজ্ঞেস করল, মুরগিকে তুমি কী খাওয়াও?
মুরগিওয়ালা বলল, চাউল খাওয়াই।
শুনে মিলিটারির কী রাগ। রাইফেলের বাঁট দিয়ে দুই ঘা দিয়ে বলল, শালা গাদ্দার। হামকো ইস্ট পাকিস্তানি ভাইয়েরা চাউল খায়—তার খাবার তুমি মুরগিকে দাও?
কয়দিন পর আরেক দল মিলিটারি এসে মুরগিওয়ালাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কী খাওয়াও মুরগিকে?
মুরগিওয়ালা এবার চাউলের কথা মুখে আনল না। বলল, গম খাওয়াই।
শুনে মিলিটারির আবার কী রাগ। রাইফেলের বাঁট দিয়ে কয়েক ঘা মেরে বলল, শালা বেহেনচোত হাম লোগ কা খাবার তুমি মুরগি কা দেতা হায়। আমার খাবার তুমি মুরগিকে খাওয়াও, তোমার এত বড় সাহস?
তার কয়দিন পর আবার কিছু মিলিটারি এল মুরগি হাটে। মুরগিওয়ালাকে জিজ্ঞেস করল, মুরগিকে কী খাওয়াও তুমি?
মুরগিওয়ালা এবারে সাবধানে বলল, আমি তো জানি না স্যার। সকালবেলা সবার হাতে একটা করে সিকি ধরিয়ে দিই। তারা বাজারে গিয়ে যার যেটা ইচ্ছা কিনে খায়।
শুনে পাকিস্তানি মিলিটারি মুরগিওয়ালার পিঠে থাবা দিয়ে বলল, বহুত আচ্ছা! বহুত আচ্ছা! তোম সাঁচ্চা পাকিস্তানি।
টিপু বলল, খুব সুন্দর করে, শুনে আমরা সবাই হেসে গড়াগড়ি খেলাম, নূরুল ছাড়া। সে গম্ভীর হয়ে জোকটা তার নোট বইয়ে টুকে রাখতে শুরু করল। সাধু ভাষায় টানা হাতে দুই পৃষ্ঠা, ব্যাপারটা বোঝানোর জন্যে নানা রকম ব্যাখ্যা, নানারকম পাদটীকা কার সাধ্যি আছে এটা পড়ে। নূরুলের হাতে পড়ে এই সুন্দর জোকটার এই অবস্থা হবে কে জানত।
কৌতুকের যে অবস্থাই হোক নূরুলের খাতা কিন্তু ভর্তি হতে শুরু করল। অক্টোবর মাসে তার খাতায় একশো এগারোটা জোক লেখা হয়েছে জানতে পারলাম। একদিন আমার সাথে দেখা হতেই জ্বলজ্বলে চোখে বলল, পুরান ঢাকায় নাকি দারুণ কিছু জোক বের হয়েছে।
কী জোক?
আমি তো জানি না। বিশ্বাসী লোক না হলে বলে না।
তাই নাকি?
হ্যাঁ।
ঢাকাইয়ারা খুব রসিক জানিস তো?
জানি।
তোর পরিচিত আছে কেউ ঢাকাইয়া?
আমি মাথা নাড়লাম, নাই। আর থাকলেই এখন আমার কাজ নাই তোকে নিযে পুরান ঢাকায় রওনা দেব? দেশে একটা যুদ্ধ চলছে জানিস?
তা তো বটেই। নূরুল মাথা নাড়ে।
গত রাত এগারোটার সময় কী একটা এক্সপ্লোশন হলো। তারপর কারেন্ট চলে গিয়ে চারদিকে অন্ধকার। গেরিলা অপারেশন শুরু হয়ে গেছে।
তা ঠিক।
তোর বয়সী মানুষেরা এখন হাতে স্টেনগান গ্রেনেড নিয়ে যুদ্ধ করছে আর তুই নোট বইয়ে জোক লিখে বেড়াচ্ছিস, লজ্জা করে না?
ধমক খেয়ে নূরুল একটু মনমরা হয়ে গেল। ব্যাটার মাথায় ঘিলু বলে কোন পদার্থ নেই। মুক্তিযুদ্ধে যায়নি বলে তাকে আর যেই গালিগালাজ করুক, আমার করার কথা নয়। কিন্তু সেটাও সে ধরতে পারে না।
খুব আস্তে আস্তে ঢাকা শহর পাল্টাতে শুরু করেছে। রাস্তাঘাটে মিলিটারি অনেক বেশি। হঠাৎ হঠাৎ ভয়ংকর দর্শন ট্রাক বড় রাস্তা দিয়ে যেতে থাকে, পিছনে পাথরের মতো মুখ করে মিলিটারিরা বসে আছে, হাতে চকচকে রাইফেল। কোন দূর দেশে নিজের ছেলে-মেয়ে ফেলে রেখে এসে এখানে কী অবলীলায় অন্যের ছেলেমেয়েকে মেরে ফেলছে। ইউনিভার্সিটি এলাকাতেও আর বেশি যাই না। ইসলামী ছাত্রসংঘের ছেলেরা নাকি বদর বাহিনী না কী একটা তৈরি করেছে। যখন খুশি তখন যাকে খুশি তুলে নিয়ে যাচ্ছে। গুজব শোনা যাচ্ছে নাৎসিরা পোল্যান্ডে যেভাবে শিক্ষিত মানুষকে মেরে ফেলেছিল এরাও নাকি সেভাবে সব প্রফেসর ইঞ্জিনিয়ার ডাক্তারদের মেরে ফেলবে। কত রকম গুজব যে বের হয়, তার সবগুলোতে কান দিলে তা আর বেঁচে থাকা যাবে না। আমি অবশ্যি আজকাল আর বেশি বের হই না, দরকার কী খামাখা ঝামেলার মাঝে গিয়ে?
এর মাঝে আবার একদিন নূরুলের সাথে দেখা হলো। আমাকে দেখে এক গাল হেসে বলল, একটা আইডিয়া হয়েছে।
কী আইডিয়া?
একটা বই পেয়েছি—ফুটপাতে বিক্রি হচ্ছিল। ওয়ান থাউজেন্ট ডার্টি জোক।
ডার্টি জোক?
হ্যাঁ। নূরুল দুলে দুলে হাসে। সেখান থেকে বেছে বেছে কিছু মিলিটারি জোক হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছি? শুনবি?
অশ্লীল কৌতুকে আমার উৎসাহের কোন অভাব নেই। বললাম, শোনা দেখি।
নূরুল উৎসাহ নিয়ে তার নোট বই খুলে পড়তে শুরু করে। “জনৈক পাকিস্তানি মিলিটারি ব্যারাক হইতে ফিরিয়া খবর পাইল তাহার অনুপস্থিতির সুযোগে তাহার স্ত্রী অর্থের বিনিময়ে তাহার এক বন্ধুকে দেহদান করিয়াছে। শুনিয়া সে অট্টহাস্য করিয়া বলিল, আমার বন্ধু বাস্তবিকই স্বল্পবুদ্ধিসম্পন্ন। ঐ কাজের জন্যে আমি তো কখনোই আমার স্ত্রীকে অর্থ প্রদান করি নাই।”
নূরুলের সাধু ভাষার অত্যাচারের পরও জোকটা শুনে আমি হাসি থামাতে পারি না, তাই দেখে নূরুলের উৎসাহ বেড়ে যায়। বলে এটা শোন তাহলে, এটা শোন।
অশ্লীল কৌতুক শুনতে আমার বেশ ভাল লাগে। আমি বেশ আগ্রহ নিয়ে বসে সব জোক শুনলাম। পড়া শেষ হলে বেশ বিজয়ীর মতো ভঙ্গি করে বললাম, কেমন হয়েছে?
ভাল।
বইটা যখন বের হবে একটা হিট হবে না?
যদি বের হয়।
নূরুল যত্ন করে তার নোট বইটা শার্ট তুলে পেটের কাছাকাছি প্যান্টের মাঝে গুঁজে রাখল। এটা নিয়ে সব সময়েই তার অতিরিক্ত সাবধানতা। আমি বললাম, আজকাল আর এই নোট বই নিয়ে বের হোস না।
না, বের হব না।
যদি মিলিটারি জানে নোট বইয়ে কী লিখেছিস তোর আর বেঁচে থাকতে হবে না।
তা ঠিক।
মরতেই যদি চাস ভাল একটা কিছু করে মর। মিলিটারির উপর জোক লিখে মরে গেলে ব্যাপারটা হাসির একটা ব্যাপার হয়ে যাবে।
তা ঠিক। নূরুল জোরে জোরে মাথা নাড়ে।
নূরুল বের হচ্ছিল, আমি বললাম, কোন্‌ দিকে যাবি?
টি.এন্ড.টি. থেকে একটা ফোন করব বাসায়।
দাঁড়া, আমিও যাব।
রিকশা করে টি.এন্ড.টি.-তে এসে ভেতরে ঢোকার সময় হঠাৎ আবিষ্কার করলাম গেটে কালো কাপড় পরা দুজন মিলিশিয়া দাঁড়িয়ে আছে। দেখে আমাদের জান শুকিয়ে গেল—আগে জানলে কি আর এখানে পা দিই? ইচ্ছে হলো ফিরে যাই কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। হঠাৎ করে এখন ঘুরে গেলে আরো বেশি সন্দেহ করবে।
গলা নামিয়ে বললাম, অবস্থা কেরোসিন।
নূরুল শুকনো গলায় বলল, কী করি এখন?
কী আবার করবি ভেতরে ঢোক।
নূরুল কী একটা বলতে যাচ্ছিল ততক্ষণে একজন মিলিশিয়া এসে নূরুলকে সার্চ করতে শুরু করেছে। পেটে হাত দিতেই নোট বইটা লেগেছে, ভেবেছে রিভলবার, বোমা বা সেরকম কিছু সাথে সাথে ভয়ংকর একটা ব্যাপার ঘটল। মিলিশিয়াটি একটি চিৎকার করে হাতের অটোমেটিক রাইফেলটা নূরুলের গলায় ধরে এক ধাক্কায় তাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। আমি দেখলাম রক্তশূন্য মুখে নূরুল খাবি খেয়ে নিশ্বাস নেবার চেষ্টা করছে—দুই হাত উঠে গেছে উপরে। ভয়ংকর মুখে মিলিশিয়াটি তাকিয়ে আছে নূরুলের দিকে, মনে হয় গুলি করে দেবে এখনই। ভয়ে আমার কাপড় নষ্ট হওয়ার মতো অবস্থা।
মিলিশিয়াটি নূরুলের শার্ট তুলে সাবধানে পেটে গুঁজে রাখা জিনিসটা দেখল। রিভলবার বোমা সেরকম কিছু নয় সাধারণ একটি নোট বই, মিলিশিয়াটি সহজ হলো একটু। নোট বইটা টেনে বের করে বলল, ইয়ে কেয়া হ্যায়? এটা কী?
নূরুল কথা বলতে পারছে না। প্রাণপণে চেষ্টা করে শুকনো গলায় বলল, নো-নো নোটবুক।
মিলিশিয়াটি নোট বইটি উল্টেপাল্টে দেখে। আমি দাঁড়িয়ে ঘামতে থাকি, যদি কোনভাবে পড়তে পারে, তাহলে কী অবস্থা হবে আমাদের?
মিলিশিয়াটি আবার হড়বড় করে কী বলল, ভাল বুঝতে পারলাম না। মনে হয় জিজ্ঞেস করল, নোট বই পেটের মাঝে লুকিয়ে রেখেছ কেন?
নূরুল প্রাণপণে কিছু একটা উত্তর দেবার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু তার মুখ থেকে কোন শব্দ বের হয় না। আমার দিকে তাকাল নূরুল—আমি ঢোক গিলে বললাম, সাইজটা বড় পকেটে আটে না বলে ওখানে রাখা। বললাম উর্দুতে—অন্তত আমি যেটাকে উর্দু জানি সেই ভাষায়।
মিলিশিয়াটি তখন লেখাটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে, একসময় মুখ তুলে জিজ্ঞেস করল কী লেখা আছে এখানে?
নূরুল ততক্ষণে খানিকটা জোর ফিরে পেয়েছে। তোতলাতে তোতলাতে বলল, ক্লাস নোট।
কিসের ক্লাস নোট?
ইসলামিক হিস্ট্রি। মোগল ডাইনাস্টি।
মিলিশিয়াটি নূরুলের হাতে নোট বইটা ফেরত দিতে গিয়ে হঠাৎ থেমে যায়। নূরুলের প্যান্টের দিকে তাকায়, তারপর হঠাৎ উচ্চ স্বরে হেসে ওঠে তার সঙ্গীকে ডাকে। তার সঙ্গীটির সঙ্গে প্যান্টের দিক আমিও দেখলাম, ভয়ে নূরুল কাপড়ে পেশাব করে দিয়েছে। প্যান্ট ভিজে চুইয়ে সেই পেশাব আর পায়ের কাছে এসে জমা হচ্ছে।
আমি আর নূরুল রিকশা করে ফিরে যাচ্ছিলাম। কেউ কোন কথা বলছি না। নীলক্ষেতের মোড়ে রিকশাটা ঘুরে যাবার সময় পথে একটা ডাস্টবিন পড়ল, নূরুল নোট বইটি ছুঁড়ে ফেলে দিল ডাস্টবিনে।
আমি না দেখার ভান করে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

একজন দুর্বল মানুষ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল (ছোটগল্প)

একজন দুর্বল মানুষ (ছোটগল্প)

বিকট একটা চিৎকার দিয়ে আমি উঠে বসলাম, বুকের ভেতর ঢাকের মতো শব্দ হচ্ছে, সারা শরীর ঘামে ভেজা, গলা শুকিয়ে কাঠ। কয়েক মুহূর্ত লাগল বুঝতে আমি কোথায়—নিজের ঘরে বিছানার উপর বসে আছি জানার পরও আমার শরীর কাঁপতে থাকে। মাথার কাছে গ্লাসে পানি রাখা থাকে, হাত বাড়িয়ে সেটা নিয়ে ঢক ঢক করে এক নিঃশ্বাসে শেষ করে দিলাম। খানিকক্ষণ লাগল আমার ধাতস্থ হতে। আবছা অন্ধকার চারদিকে, ভোর হতে এখনো বেশ দেরি আছে। আমি বিছানায় হাঁটু ভাঁজ করে বসে নিজের হৃৎস্পন্দন শুনতে থাকি। ইশ—কী একটা স্বপ্ন!
এই একটা নতুন ঝামেলা শুরু হয়েছে—প্রায় প্রতি রাতেই একই ব্যাপার, ঘুরে ফিরে এই একই প্রশ্ন। আমি টেবিলের উপর হাত বিছিয়ে বসে আছি, আর একটা ন্যাংটা মানুষ—তার সারা শরীর লোম দিয়ে ঢাকা, একটা হাতুড়ি নিয়ে চিৎকার করে আমার হাতের আঙুলগুলো একটা একটা করে থেঁতলে দিচ্ছে, প্রচণ্ড আঘাতে আমার আঙুল থেকে নখ ছিটকে বের হয়ে আসছে আর আমি চেঁচাচ্ছি। কী ভয়ানক ব্যাপার! কেন আমি এরকম একটা জিনিস দেখছি? মিলিটারি আমাকে ধরে নিয়ে দুই মাস আটকে রেখেছিল সত্যি, কিন্তু আমার উপর সে রকম কোন অত্যাচার তো করেনি। দেশ স্বাধীন হবার পর গলায় ফুলের মালা দিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের করে আনা হলো আমাদের। গলা কাঁপিয়ে আমি একটা ছোটখাটো বক্তৃতাও দিয়েছিলাম মনে আছে। কিন্তু এখন একি ব্যাপার? যত দিন যাচ্ছে ততই খারাপ হচ্ছে অবস্থা, আগে মাসে এক-দুই দিন দেখতাম স্বপ্নটা, তারপর সপ্তাহে এক-দুই দিন আজকাল প্রায় প্রতি রাতেই দেখি। এমন অবস্থা হয়েছে যে ইদানীং তো ঘুমোতে যেতেই ভয় করে।
বালিশের তলা থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে একটা সিগারেট ধরালাম, মাত্র দুটি সিগারেট রয়েছে, রাতে নতুন একটা প্যাকেট খুলেছি এর মাঝেই সবশেষ। এত সিগারেট খেলে তো এমনিতেই যক্ষ্মা-টক্ষ্মা কিছু একটা হয়ে যাবে।
সিগারেটে দুটি টান দিয়ে মাথাটা একটু ঠাণ্ডা হলো। স্বপ্ন তো স্বপ্নই, এটা নিয়ে মাথা গরম করে কী হবে? বেঁচে ফিরে এসেছি সেটাই বড় কথা, সেটা নিয়েই তো খুশি থাকা উচিত। কয়জন আর মিলিটারির হাত থেকে জ্যান্ত ফিরে এসেছে।
সিগারেটটা ঠোঁটে চেপে ধরে আমি বিছানা থেকে নেমে জানালার কাছে এসে দাঁড়ালাম, আজ মনে হয় আর ঘুম আসবে না। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই মনটা ভাল হয়ে গেল, ভোরের প্রথম আলোতে সবকিছু এত সুন্দর দেখায় কেন? বাইরের এই হতশ্রী জায়গাটাও এখন কী মায়াময় লাগছে, সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ আমার মনে পড়ল আজ এপ্রিলের চার তারিখ, আমার মায়ের মৃত্যু দিবস। প্রথম মৃত্যু দিবস। কী আশ্চর্য দেখতে দেখতে এক বছর হয়ে গেল?
আজকাল মারা যাওয়ার ব্যাপারটি কেমন জানি সহজ হয়ে গেছে। যখন ক্লাস এইটে পড়ি তখন মায়ের একবার অসুখ হয়েছিল, খারাপ রকমের নিমোনিয়া। কী ভয়টাই না পেয়েছিলাম, মনে হতো যদি মরে যান তখন কী হবে? ভয়ের চোটে একবারে সত্যি সত্যি পেট নেমে গিয়েছিল আমার। মা যখন সত্যি সত্যি মারা গেলেন তখন কিন্তু ঠিক করে কেমন জানি সব কিছু বুঝতে পারলাম না, দুঃখ টুঃখ বেশি হলো না, মনে হলো এরকমই তো হবে। তখন অবিশ্যি একটা ঘোরের মাঝে ছিলাম, মিলিটারির ভয়ে আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে দুদিন থেকে হাঁটছি, মার জ্বর, ভাল হাঁটতে পারেন না, ধরে ধরে কোনভাবে নিয়ে যাই। বিকেলের দিকে রাস্তার পাশে বসে বমি করলেন, সন্ধের দিকে বললেন, আমি আর পারি না, তোরা যা। শুনে দুঃখ নয়, হতাশা নয়, সবাই কেমন জানি মায়ের উপর রেগে উঠল। একবছর পর এখন সেই ঘটনা মনে পড়ে আমার এত লজ্জা লাগতে লাগল যে বলার নয়। আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের শূয়োরের বাচ্চা মিলিটারিরা কী রকম হৃদয়হীন অমানুষ করে দিয়েছিল!
মা মারা গেলেন এপ্রিলের চার তারিখ, রোববার। তারিখটা বের করেছিলাম পরে, তখন দিন তারিখের কথা মনে ছিল না। একটা অচেনা গ্রামে অপরিচিত একজন মানুষের বাড়ির বারান্দায় শুয়ে আমার মা, যিনি সেই যুগে বাংলায় এমএ পাস করেছিলেন চুপচাপ মারা গেলেন। মোটামুটি যান্ত্রিক দক্ষতায় তাকে একটা পুকুর পাড়ে কবর দেয়া হয়েছিল। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আমার পুরো ঘটনাটি মনে পড়ে গেল, আর কেন জানি বেশ একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো। আঁখু মে লোহু ছবিতে এরকম একটা সিনেমার নায়ক ঠিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল।
আজকে ভাল একটা কিছু করতে হবে মায়ের জন্য। মোটামুটি দুর্বল চরিত্রের মানুষ আমি, ভাল কিংবা খারাপ কোনকিছুই করতে পারি না। তবুও আমার এমএ পাসের মায়ের জন্য—যিনি আকারে ছোটখাটো এবং কোমল স্বভাবের ছিলেন, যাকে দাফন করে আমরা প্রচণ্ড খিদে নিয়ে গুড় দিয়ে পেট ভরে রুটি খেয়েছিলাম—তাঁর জন্য আমার কিছু একটা করার ইচ্ছে হলো। বেঁচে থাকলে কী করলে মা সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন? আজ সেটাই করব আমি।
মা ধার্মিক মহিলা ছিলেন। মার্চ মাসের গোড়ার দিকে যখন অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলো তখন মা বঙ্গবন্ধুর নামে খতমে ইউনুস পড়া শুরু করলেন, তার ধারণা হলো বঙ্গবন্ধুর উপর অনেক বড় বিপদ। এক লক্ষ চব্বিশ হাজার বার পড়বেন, লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ জুয়ালেমিন, যার অর্থ মনে হয় ‘হে খোদা এই জালিমের হাত থেকে তুমি রক্ষা করো’। কে জানে আমার মায়ের দোয়ার জোরেই বঙ্গবন্ধু বেঁচে ফিরে এসেছে কি না। আমার মায়ের জন্যে কেউ খতমে ইউনুস পড়েনি, তাই মা আর বাঁচতে পারলেন না। জালিমের হাত থেকে পালাতে গিয়ে একজনের বারান্দায় শুয়ে মারা পড়লেন।
মায়ের জন্যে কী একটা খতমে ইউনুস পড়ব? নাহ! যে মারা গেছে তাকে জালিমদের হাত থেকে রক্ষা করে কী হবে? তাহলে কী নামাজ পড়া শুরু করব? মা সবসময় বলতেন, নামাজ পড়, নামাজ পড় অন্তত জুমার নামাজটা পড়। আর কী একবার নামাজ পড়ে দেখব? মা বেঁচে থাকলে তো খুবই খুশি হতেন, অজু করে কি বসে যাব ফজরের নামাজে? আইডিয়াটা খারাপ না, শুধু একটা সমস্যা, আত্তাহিয়াতু ভুলে গেছি। সেই কবে ছেলেবেলায় শিখেছিলাম, এতদিন পরে কি মনে থাকে? তবু বার কয়েক চেষ্টা করে দেখলাম পুরোটা মনে করতে পারলাম না।
নাহ্‌ অন্য একটা কিছু করতে হবে।
সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিলে কেমন হয়? বুকের ভেতরে হঠাৎ আমার আবেগের মতো একটা জিনিসের সৃষ্টি হলো। মা দু চোখে দেখতে পারতেন না সিগারেট, ইউনিভার্সিটিতে ঢুকে যখন চেষ্টা চরিত্র করে সিগারেট খাওয়া শিখে ফেললাম মা যে কী বিরক্ত হয়েছিলেন তা আর বলার নয়, কিন্তু বলতেও পারতেন না, আবার না বলেও থাকতে পারতেন না। সেই সময়ের কথা মনে করে আজ মায়ের মৃত্যু দিবসে আমি সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেবার প্রতিজ্ঞা করে ফেললাম। বালিশের তলা থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে গভীর আবেগের সাথে বললাম, মা তোমার কথা মনে করে আজ থেকে আমি সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিলাম। এই দেখো—বলে আমি অবশিষ্ট সিগারেটটিকে ছিঁড়ে দুই টুকরো করে ফেলে বললাম, আজ থেকে সিগারেট খাই তো গু খাই।
মায়ের মৃত্যুদিবসে এরকম একটা প্রতিজ্ঞা করে আমার ভেতরে একটা গভীর ভাবের সৃষ্টি হলো, সেই ভাবটা টাটকা টাটকা থাকতেই সাত সকালে গোসল করে ফেললাম। নাশতা করা পর্যন্ত ঠিক ছিল, কিন্তু চায়ে চুমুক দিয়েই বুঝতে পারলাম হঠাৎ সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেয়াটা ঠিক বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি। গত দুই বছর থেকে আমি সকালে চায়ের সাথে একটা করে সিগারেট খেয়ে আসছি, শরীর প্রাত্যহিক নিকোটিনের এই ডোজে এত অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে আমার নিজের মায়ের পুণ্য স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের যত ইচ্ছেই থাকুক আমার বুক একটু সিগারেটের ধোঁয়ার জন্যে প্রায় খেপে গেল। আমি নেহায়েতই দুর্বল চরিত্রের মানুষ, কাজেই একটু পরেই সকালে ভেঙ্গে দুই টুকরো করে রাখা সিগারেটটা খুঁজে বের করে ধরাতে বাধ্য হলাম। মা তুমি আমাকে মাপ করে দিও, আজ আমি তোমার জন্যে অন্য একটা কিছু করব।
সকাল সাড়ে আটটায় একটা ক্লাস আছে। এত সকালে ক্লাসে আমি কখনো যাই না, শামীমের সাথে ঠিক করা আছে, সে আমার হয়ে প্রক্‌সি দিয়ে দেয়। আজ যখন এত ভোরে উঠে গেছি, ক্লাসটাতে হাজির হলে কেমন হয়? ব্যাপারটি চিন্তা করে আহ্লাদিত হওয়ার কোন কারণ নেই। কিন্তু আমার ভেতরে আবার আবেগের মতো সেই জিনিসটার জন্ম নিল। মায়ের মৃত্যুদিবসে আজ আমি সৎভাবে থাকব, কেউ আমার ক্লাসে প্রক্‌সি দেবে না, আমি কারো ক্লাসে প্রক্‌সি দেব না, সারাদিন মিথ্যা কথা বলব না, মেয়েদের শরীরের দিকে লোভীর মতো তাকিয়ে থাকব না, গর্দান মোটা আজিজের ঘাড় ভেঙ্গে চা সিগারেট খাব না, ফাইফ ফিফটি ফাইভের লোভে আরশাদের মোটা মোটা রসিকথায় হেসে গড়িয়ে পড়ব না।
ব্যাপারটা সিগারেট ছেড়ে দেবার মতো এত কঠিন হবার কথা নয়, তা ছাড়া সারা জীবনের জন্যে তো প্রতিজ্ঞা করছি না, করছি শুধু একদিনের জন্য। আমার ভাল মানুষ মায়ের কথা মনে করে একদিন একটা খাঁটি মানুষের মতো থাকার চেষ্টা করে দেখলে ক্ষতি কী? আমি, জাফর ইকবাল, উনিশশ বাহাত্তুর সালের চৌঠা এপ্রিল সকাল সাতটা আটচল্লিশ মিনিটে চব্বিশ ঘণ্টার জন্যে একটা খাঁটি মানুষের মতো থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।
অভ্যাসের অভাবে সকাল সাড়ে আটটার ক্লাসে নয়টা বাজার আগেই গভীর ঘুমে আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। আমি প্রাণপণে চেষ্টা করে আমার চোখ খুলে রাখার চেষ্টা করতে থাকলাম, সকালে এত বড় একটা প্রতিজ্ঞা করে ক্লাসে ঘুমিয়ে যাওয়া ঠিক নয়। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ক্লাস শেষ হতে মনে হলো এক যুগ লেগে গেল। ক্লাস থেকে বের হতেই শফিক আমার কাছে এসে গলা নামিয়ে বলল, ইকবাল, এদিকে আয়, তোর সাথে কথা আছে।
শফিক একটা রাজনৈতিক চরিত্র। ময়লা শার্ট, মোটা গলা এবং ভারী চশমা নিয়ে সে সহজ-সরল বিষয়কে ঘোরালো করে তার ভেতর থেকে একটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বের করে ফেলে। ক্লাসের বেশির ভাগ মেয়েরা ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়ে ফেলায় শফিকের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা আর ছেলেদের মাঝে বেশি সুবিধা করতে পারছে না। মিলিটারি আমাকে ধরে প্রায় দুই মাস আটকে রেখেছিল বলে আমার প্রতি শফিকের একটা শ্রদ্ধা মেশানো বিশ্বাস রয়েছে এবং প্রয়োজনে সে আমার সাথে কথা বলে থাকে। আজও গলা নামিয়ে বলল, ইকবাল, ব্যাপার বেশি সুবিধের না।
কেন কী হয়েছে।
খোরশেদ শালা বিট্রে করেছে।
তাই নাকি।
হ্যাঁ। এরপর আমাকে শফিকের মুখ থেকে খোরশেদ নামে আরো একজন রাজনৈতিক চরিত্রের কার্যকলাপের বিশদ বর্ণনা শুনতে হলো।
আমি আমার মুখে বিষয়টির উপযোগী গাম্ভীর্য ধরে রেখে বললাম, হুঁ। কেস সিরিয়াস। এখন কী করা যায়? শফিক গলা নামিয়ে বলল, তোকে ঐ শালা এখনো নিউট্রাল লোক মনে করে। তুই যদি শালাকে একটু বুজিয়ে সুঝিয়ে বলিস। এরপর শফিক আমাকে বলে দিল খোরশেদ নামক ছেলেটিকে, যাকে শফিক শ্যালক বলে সম্বোধন করছে, তাকে কী কী বানানো কথা বলতে হবে।
বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আমি আগেও বিভিন্ন জায়গায় নানারকম বানানো কথা বলেছি, আমার বিবেক কখনো সেকারণে আমাকে যন্ত্রণা দেয়নি। তাছাড়া শফিককে হাতে রাখাটা খারাপ নয়, তার অনেক বিশ্বস্ত চামচা রয়েছে। আমি বললাম, ঠিক আছে, আমি বলে দেব।
বলেই আমার মনে পড়ল আজ আমার খাঁটি মানুষের মতো থাকার কথা, আজ সকল রকম মিথ্যাচার বন্ধ। সাথে সাথে আমি মুখটি গম্ভীর করে বললাম, শফিক—
কী? দোস্ত, আজ হবে না। আজ আমি কারো সাথে মিথ্যে কথা বলতে পারব না।
কী করতে পারবি না?
মিথ্যা কথা বলতে পারব না।
শফিক প্রথমে ভাবল এটি কোন এক ধরনের রসিকথা, তাই সে টেনে টেনে খানিকক্ষণ হাসল, কিন্তু আমি তবু মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইলাম দেখে সে খানিকক্ষণ আমার দিকে সরু চোখে তাকিয়ে রইল, তারপর আর একটি কথাও না বলে চলে গেল। ব্যাপারটি ভাল হলো না। ময়লা শার্ট, মোটা গলা এবং ভারী চশমার শফিককে চটানো ঠিক নয়, তার সাথে সব মাস্তানদের খাতির। আমি নিজে দেখেছি তার এক বিশ্বস্ত চামচা শার্টের নিচে একটা জং ধরা পিস্তল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
ক্যান্টিনে আজিজকে পাওয়া গেল। তার দু’পাশে দুজন বসে আছে, সব সময় তার সাথে কেউ না কেউ বসে থাকে। আজিজ মালদার পার্টি, আমাদের ক্লাসে যে দুজন ছেলে গাড়ি হাঁকিয়ে আসে তার একজন হচ্ছে আজিজ, তার বাবার বিস্কুটের ফ্যাক্টরি রয়েছে, কাজেই তার ঘাড় ভেঙ্গে খাওয়া নতুন কোন ব্যাপার নয়। আজিজের বুকে আড়াআড়িভাবে বসানো আছে একটা মস্ত হৃদয়, এই হৃদয়ের কোন অবসর নেই। সব সময়েই সেটা কোন না কোন মেয়ের জন্যে নিবেদিত, যদিও সেই মেয়েটি কখনোই তার খবর পায় না। আজিজের সুবিশাল হৃদয় তৈরি করতে গিয়ে যেসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গে টান পড়েছে তার একটি হচ্ছে মস্তিষ্ক। আমার ধারণা তার খুলি খুলে দেখলে সেখানে কাঁটালের বিচির মতো ছোট একটা মস্তিষ্ক পাওয়া যাবে। তার কাছে বসে গল্প-গুজব করা কোন সুখকর ব্যাপার নয়। কিন্তু আমাকে হাত নেড়ে ডাকায় তার কাছে গিয়ে বসতে হলো। আজিজের সাথে বসে আছে ফখরুল আর সুমন। সুমন ছেলেটির চেহারা ভাল বলেই কি না জানি না মেয়েরা তাকে খুব লাই দেয়। এই শালা মেয়েদের সাথে অবলীলায় তুই তুই করে কথা বলে এবং মেয়েরাও তাকে বলে ‘দেব একটা থাপ্পড়’ বা ‘দেব একটা চড়’। শুনে সেও দেখি হি হি করে হাসে। সুমন ব্যাটা বজ্জাত কম না, সেদিন দেখি কয়জন মেয়ে সিঁড়ির উপরে বসে আছে। এই শালা ঠেলেঠুলে তাদের মাঝখানে জায়গা করে বসে পড়ল। কি যেন একটা মজার ব্যাপার আর মেয়েদের কী খিল খিল হাসি! শুনেই আমার গা জ্বলে যায়। মেয়েসংক্রান্ত ব্যাপারে উপদেশের প্রয়োজন হলে আজিজ সব সময়ই এই অভিজ্ঞ মানুষটির শরণাপন্ন হয়, কে জানে আজকেও তাই হচ্ছে কি না।
সুমন আমার দিকে চোখ টিপে বলল, দোস্ত, অবস্থা খুব সিরিয়াস।
আমি বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে?
আজিজের সাথে ফোরটি থ্রির লদকা লদকি।
আজিজ একটু লজ্জা পেয়ে বলল, যা শালা বাজে কথা বলিস না।
রোল নাম্বার পোরটি থ্রি ক্লাসের সুন্দরী মেয়েগুলোর একজন, অনেকেই লদকা লদকির জন্যে ঘুরোঘুরি করছে এদের মাঝে আজিজের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে তার কোন সম্ভাবনা নেই। বিড়াল যে রকম ইঁদুরের বাচ্চাকে নিয়ে খেলে সুমন আর ফখরুলও এই গর্দভকে নিয়ে সেভাবে খেলছে। আমি বসতেই সুমন গলা নামিয়ে ষড়যন্ত্রীদের মতো কথা বলতে শুরু করল, কথার বিষয়বস্তু হলো লাইব্রেরিতে বই নিতে রোল নাম্বার ফোরটি থ্রির সাথে আজিজের কী কী কথা হয়েছে এবং সেটার প্রকৃত অর্থ কী। অন্যদিন হলে আমিও এটাতে যোগ দিয়ে প্রমাণ করে ছেড়ে দিতাম যে পুরো ব্যাপারটি আজিজের প্রতি রোল নাম্বার ফোরটি থ্রির গোপন অনুরাগের একটি বহিঃপ্রকাশ। এখন আজিজের কী করা উচিত সেটা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা শুরু করে দেয়া হতো। আজ অন্য ব্যাপার, ঠিক করে রেখেছি যে খাঁটি মানুষের মতো থাকব। কাজেই এই ছেলেমানুষী এবং সম্ভবত হৃদয়হীন ব্যাপারে যোগ দেয়া গেল না। সুমন আরেকবার ব্যাপারটির অন্য একটি দৃষ্টি থেকে বিশ্লেষণ শুরু করতেই আমি মেঘ স্বরে বললাম, সুমন।
সুমন ভ্যাবাচেকা খেয়ে হাতের আধ খাওয়া ফাইভ ফিফটি ফাইভটা আমার দিকে এগিয়ে দিল, এটা নিশ্চিতভাবে আজিজের প্যাকেট থেকে নেয়া। আমি অভ্যাসবশত প্রায় নিয়েই নিচ্ছিলাম। হঠাৎ করে প্রতিজ্ঞার কথা মনে পড়ে গেল, আজ আর কোন রকম দীনতা নয়। তাছাড়া শালা সুমনের ঠোঁটে বিশ্রী রকমের একটা ঘা দেখা যাচ্ছে। কে জানে সেটা ছোঁয়াচে কি না। হাত নেড়ে ফিফটি ফাইভকে উপেক্ষা করে আজিজকে বললাম, আজিজ তোর মাথায় কী ঘিলু বলে কিছু নেই।
‘কানাকে কানা বলিতে হয় না’, ‘খোঁড়াকে খোঁড়া বলিতে হয় না’, সেরকম মনে হয় ‘বোকাকেও বোকা বলিতে হয় না’, কারণ আমার প্রশ্ন শুনে আজিজ একেবারে ঘ্যাঁক করে ক্ষেপে উঠল, চোখ লাল করে বলল, কী বললি? কী বললি তুই?
কিছু বলিনি, জিজ্ঞেস করেছি। তোর মাথায় কি ঘিলু বলে কিছু আছে?
মুখ কালো করে আজিজ বলল, কেন কী হয়েছে?
এই শালারা তোর সাথে রং-তামাশা করে ইয়ারকি মারে আর তুই ভাবিস দুনিয়া জাহানের সব মেয়ের সাথে তোর প্রেম? প্রেম এত সোজা? তাও তোর মতো গর্দভের সাথে? শালা গরু কোথাকার।
আজিজ একবারে ফ্যাকাসে মেরে গেল। সুমন আর ফখরুল আমার কাছ থেকে এরকম একটা জিনিস আশা করেনি, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে অপ্রস্তুতের মতো কী একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ থেমে গেল, কারণ আমি দেখতে পেলাম শফিকের সাথে তার দলের একজন বড় চাঁই এবং কয়েকজন চামচা আমাদের দিকে আসছে, তার মাঝে একজন হচ্ছে শফিকের বিশেষ বিশ্বস্ত যে কোমরে একটা জং ধরা রিভলবার নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সেরেছে!
দলের বড় চাঁইয়ের সাইজ বেশ ছোট। উঁচু জুতা এবং কোকড়া চুলকে ঝাউগাছের মতো উপরে তুলে দিয়েও সর্বোচ্চ উচ্চতা মনে হয় চার ফিট তিন থেকে এক আঙুল বেশি হবে না। চাঁইটা আমাদের কাছে এসে সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মধুরভাবে হাসল।
উত্তরে আমি আমার শুকনো ঠোঁটকে জিব দিয়ে ভিজিয়ে মধুরভাবে হাসার চেষ্টা করলাম। চাঁই আমার পাশে এসে বসল এবং সাথে সাথে আজিজ এবং তার সাথে ফখরুল আর সুমন চলে যাবার জন্য উঠে দাঁড়াল, এই ক্ষুদ্রাকৃতির চরিত্রটি এই এলাকায় বাটু গুণ্ডা নামে পরিচিত।
বাটু গুণ্ডা আমার ঊরুতে একটা থাবা দিয়ে বলল, কী?
এটি ঠিক প্রশ্ন হতে পারে না, তাই আমি উত্তর না দিয়ে আবার একটু হাসার মতো ভান করলাম।
কী শুনি?
এটা একটি প্রশ্ন, উত্তর দেয়া প্রয়োজন। মুখে অবিচলিত ভাব ধরে রাখার জন্যে সময় নিয়ে ধীরে ধীরে একটা সিগারেট ধরালাম, লম্বা একটা টান দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী শুনেন?
তুমি নাকি ভোল পাল্টাচ্ছ? শার্ট খুলে নাকি পেটিকোট?
ইঙ্গিতটি স্পষ্ট, শফিকের দল ছেড়ে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিচ্ছি কি না জিজ্ঞেস করছে। আমি তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মুখে একটা বাঁকা হাসি টেনে এনে বাম হাতের বুড়া আঙুলি দিয়ে খুব তাচ্ছিল্যের সাথে শফিককে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার শোনার যন্ত্র কি একটাই, না আরো আছে?
ঠিক বুঝতে পারলাম না কেন বাটু গুণ্ডা এটাকে খুব উঁচু দরের রসিকথা হিসেবে ধরে নিল। সে হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ করে দুলে দুলে হাসতে শুরু করে। বেশির ভাগ মানুষকে হাসলে ভাল দেখায়, এর বেলায় সেটি সত্যি নয়। এর মাড়ি কৃষ্ণবর্ণ এবং হাসার সময় হায়েনার মতো মাড়ি বের হয়ে আসে। আমি কখনো হায়েনা দেখিনি, কিন্তু আমি নিশ্চিত হায়েনা দেখতে অনেকটা এরকম। বাটু গুণ্ডা যেভাবে হঠাৎ হাসি শুরু করেছিল ঠিক সেভাবে হঠাৎ করে হাসি থামিয়ে জিজ্ঞেস করল, কাচু ভাই কেমন আছেন?
আমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম, কয়েক মুহূর্ত লাগল বুঝতে যে সে আমার বাবার কথা বলছে। আমার বাবার ডাক নাম কাচু, এখন শুধু আমাদের গ্রামের বাড়ির কিছু বয়স্ক লোকেরা তাকে কাচু নামে ডাকে। আমি শুনেছিলাম এই বাটু গুণ্ডা আমাদের গ্রামের বাড়ির এলাকা থেকে এসেছে। এর আগে কখনো সে সেই সম্পর্কটা ব্যবহার করেনি, আজ করল। আমি বললাম, ভাল আছেন।
বাটু গুণ্ডা একটি ছোট কিন্তু দর্শনীয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ভাল আর কিভাবে থাকবেন। ভাবীকে ছাড়া—ওফ! সে গভীর একটা দুঃখের ভান করে মাথা নাড়তে থাকে।
আমি টের পেতে থাকি যে আমার মেজাজ আস্তে আস্তে খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
কয়দিন আগে দেখা হয়েছিল কাচু ভাইয়ের সাথে, ইশ, চেনা যায় না দেখে। বাটু গুণ্ডা মুখ দিয়ে চুকচুক শব্দ করে বলল, মানুষের মন ভেঙে গেলে আর কিছুই ঠিক থাকে না। কী চেহারা ছিল কাচু ভাই এর। আর এখন।
বাবা ভালই আছেন।
বাটু গুণ্ডা আমার কথায় একটু অসন্তুষ্ট হলো বলে মনে হলো। একটু রেগে বলল, এরকম অবস্থায় মানুষ ভাল থাকে কেমন করে?
আমার কী হলো জানি না এক গাল হেসে বললাম, বাবা আবার বিয়ে করেছেন।
বাটু গুণ্ডা অবিশ্বাসের দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল, ঠিক বুঝতে পারছিল না আমি ঠাট্টা করছি কি না। আমতা আমতা করে বলল, কাচু ভাই? কাচু ভাই?
হ্যাঁ। বিয়ে করেছেন।
কা-কাকে?
একটা মেয়েকে। আমাদের আত্মীয় হয়, মেয়ের বাবাকে মিলিটারিরা মেরে ফেলেছে, তাই বাবা পরিবারটিকে একটু উপকার করার চেষ্টা করছেন। আমি এবারে দাঁত বের বরে একটু হাসার মতো ভঙ্গি করলাম।
উপস্থিত অন্যদের এই প্রথমবার একটু কৌতূহলী হতে দেখা গেল। একজন জিজ্ঞেস করল, আপনার বাবার বয়স কত?
পঞ্চাশ।
মেয়ের?
কুড়ি বাইশ। একেবারে থৈ থৈ যৌবন। বলব না বলব না করেও বলে ফেললাম, দেখলে মুখে পানি এসে যায়।
বাটু গুণ্ডা বিস্ফারিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। নিজের কথা শুনে আমি নিজেও একটু অবাক হয়ে গেলাম, এই প্রথমবার বুঝতে পারলাম বাবা নামক চরিত্রটির উপর আমি কী পরিমাণ ক্ষেপে আছি।
ব্যাপারটি শুরু হয়েছে সূক্ষ্মভাবে। একদিন সকালে দেখলাম বাবা গোঁফ কামিয়ে ফেলেছেন, জন্মের পর থেকে দেখে আসছি তার নবাব সিরাজদ্দৌলার মতো গোঁফ, হঠাৎ করে সেটা কামিয়ে ফেলায় তাকে একটা মেয়ে মানুষের মতো দেখাতে লাগল। গোঁফ কামানোর রহস্যটা তখন বুঝতে পারিনি। কিন্তু কয়দিন পর যখন তার কাস্টমসের এক বন্ধু তাকে এক বোতল বিলিতি কলপ দিয়ে গেল তখন সেটা পরিষ্কার হলো। পাকা চুল কলপ দিয়ে কালো করা যত সোজা পাকা গোঁফকে কালো করা তত সোজা নয়। একটা দুইটা হলে টেনে তুলে ফেলা যায়, কিন্তু অর্ধেক পেকে গেলে কামিয়ে ফেলা ছাড়া গতি নেই। বিলিতি কলপের কী কেরামতি, রাতারাতি না হয়ে আস্তে আস্তে করে চুল কালো হতে শুরু করল, মাসখানেক পরে দেখি বাবাকে আর চেনা যায় না, বয়স চোখ বুজে কুড়ি বছর কমিয়ে ফেলেছেন!
এরপর বাবা যে খেল দেখালেন তার কোন তুলনা নেই। একদিন বললেন, ঘর বাড়ি অনেকদিন থেকে চুনকাম করা হয়নি, তাই ঘর চুনকাম করা হবে। দেওয়াল থেকে সব ছবি নামিয়ে ঘর চুনকাম করা হলো, তারপর আবার সব ছবি টাঙানো হলো—দুটি ছবি ছাড়া। মায়ের একটা বড় ছবি আর বাবার আর মায়ের বিয়ের ছবি। খবরের কাগজে মুড়িয়ে অনেকদিন সে দুটি স্টোর রুমে ফেলে রাখা হয়েছিল, পুরোপুরি গায়েব হবার আগেই আমি মায়ের ছবিটা আমার ঘরে সরিয়ে এনেছি।
আমার ভবিষ্যৎ মা কয়েকবার তার ভাইদের সাথে আমাদের বাসায় বেড়াতে এসেছেন, বাবা ছোক ছোক করে তার আশেপাশে ঘুরে বেড়ান আর তিনি একেবারে কাঠ হয়ে বসে থাকেন। অপদার্থ ভাইগুলো জোর করে এই কমবয়সী কপাল খারাপ মেয়েটিকে বাবার মতো একজন বুড়োর গলায় ঝুলিয়ে দিচ্ছে।
বাবার খবরটি দেবার পর বাটু গুণ্ডার উচ্ছ্বাসে একটু ভাটা পড়ে গেল। খানিকক্ষণ বসে থেকে উঠে পড়ে বলল, আমি উঠি। একটু থেমে যোগ করল, তাহলে সেটাই ঠিক থাকল।
কী বলতে চাইছে পরিষ্কার বুঝতে পেরেও আমি না বোঝার ভান করলাম, কী ঠিক থাকল?
শফিক তোমাকে যেটা বলেছে।
আমি মাথা নেড়ে গম্ভীর গলায় বললাম, আমি মিথ্যা কথা বলতে পারব না।
কবে থেকে পীর হয়ে গেলে?
আজ থেকে।
বাটু গুণ্ডার মুখ লাল হয়ে ওঠে। এই ধরনের চরিত্রগুলো রেগে গেলে বিপদ, এরা ধরাকে সরা জ্ঞান করে, লোকজনের সামনে একটা কিছু অপমান করে ফেলতে পারে। আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকি। সাথের দুই চামচা একটু এগিয়ে আসছিল, বাটু গুণ্ডা তাদের থামিয়ে বলল, এতদিন কোন ঝামেলা টের পাও নাই, কারণ সবাইকে বলেছি তুমি আমাদের দিকে আছ। যদি না থাক ক্ষতি নাই, কিন্তু যদি বিট্রে করো, বলে রাখলাম বড় ঝামেলা হবে।
বাটু গুণ্ডা, তার পিছনে শফিক এবং সবার পিছনে দুই চামচা হেঁটে হেঁটে বের হয়ে গেল। ক্যান্টিনের সবাই মাথা ঘুরিয়ে প্রথমে তাদের এবং তারপর আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল, মা, তোমার মৃত্যুবার্ষিকীতে সত্যি কথা বলার প্রতিজ্ঞা করে দেখো কী রকম ঝামেলায় ফেঁসে যাচ্ছি।
আমি খানিকক্ষণ চুপ করে ক্যান্টিনে বসে রইলাম, সত্যি কথা বলতে কী পুরো ব্যাপারটা চিন্তা করে আমার বেশ ভালই লাগল, কে জানে আমার চরিত্রটা হয়তো যতটা দুর্বল ভেবেছিলাম ততটা দুর্বল নয়, বাটু গুণ্ডার মুখের উপর ওরকম কথা কয়জন বলতে পারে?
আজ পর পর বেশ কয়েকটা ক্লাস, কোনটা ফাঁকি না দিয়ে একটার পর আরেকটা চালিয়ে গেলাম। অন্যদিনের মতো ফোরটি থ্রির শরীরের দিকে না তাকিয়ে স্যারেরা কী বলছেন বোঝার চেষ্টা করলাম। দীর্ঘদিনের অনভ্যাসে মস্তিষ্ক কাজ করতে চায় না, পড়াশুনা করি না, ক্লাস বহুদূর এগিয়ে গেছে সেটাও আরেকটা সমস্যা। অনার্সের আগে তিন মাস দরজা বন্ধ করে পড়ে পড়ে সব সামাল দিতে হবে, এখন দিতে পারলে হয়!
তিনটার দিকে সব ক্লাস শেষ করে আমরা কয়জন বারান্দায় বসে আড্ডা মারছিলাম। রসালো বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, কার ঘর থেকে কার জানালার ভেতর দিয়ে শোয়ার ঘরে কী দেখা যায় এসব। আমি জোর করে নিজেকে সরিয়ে রেখেছি, আজকের দিনটাতে অন্তত একটা দৃঢ় চরিত্র দেখাতে হবে। ঠিক এরকম সময়ে সামনে লাল রঙের ভারী সুন্দর একটি গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নামল একটা মেয়ে, দেখতে একেবারে যাকে বলে আগুনের মতো সুন্দরী। কয়েক পুরুষ ধরে বড়লোক হলেই মনে হয় মানুষের ভেতর ফিল্টার করে করে এরকম সৌন্দর্য এসে জমা হয়। আমাদের ভেতর একটা চাপ উচ্ছ্বাসের বিদ্যুৎ বয়ে গেল। এতগুলো ছেলে মেয়েটার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে, তবু মেয়েটিকে খুব একটা বিব্রত হতে দেখা গেল না, বেশ সপ্রতিভভাবে হেঁটে আমাদের দিকে এগিয়ে এলো। কাছে এসে একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, আপনারা কী ফিজিক্‌স ডিপার্টমেন্টের ছাত্র?
সুমন বলল, হ্যাঁ, আমরা সবাই কপাল পোড়া।
মেয়েটি একটু ভদ্রতার হাসি হেসে বলল, থার্ড ইয়ারের কী কেউ আছেন?
সুমন একগাল হেসে বলল, আপনার কপাল খুবই ভাল, সবাই আমরা থার্ড ইয়ারের।
আপনারা কী জাফর ইকবাল নামে কাউকে চেনেন?
সবাই ঘুরে আমার দিকে তাকাল, ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না, এরকম সুন্দরী একটা মেয়ে আমাকে খোঁজ করতে পারে।
আমি ঢোক গিলে বললাম, আমি জাফর ইকবাল।
মেয়েটি কয়েক মুহূর্ত আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, আমার ভুলও হতে পারে। কিন্তু মনে হলো একটু যেন হতাশ হলো। শালার চেহারাটা এরকম যে যেই দেখে কেমন জানি সন্দেহের চোখে দেখে। মেয়েটি ইতস্তত করে বলল, আপনার সাথে একটা কথা বলতে পারি?
আমি উত্তেজনায় প্রায় দাঁড়িয়ে গেলাম, হ্যাঁ, হ্যাঁ, শিওর।
মেয়েটি একটু এগিয়ে গেল। আমি উপস্থিত সবার ঈর্ষার পাত্র হয়ে পিছু পিছু এগিয়ে গেলাম, সুমন সবাইকে শুনিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, এমন একটা বেহায়া ছেলে।
আমার নাম রুখসানা। রুখসানা হাসান।
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
আমি শুনেছি যুদ্ধের সময় আপনাকে মিলিটারিরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল।
আমি মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ দু’মাস আমি ক্যান্টনমেন্টে আটক ছিলাম। মুখে আমি ক্যান্টনমেন্টে আটকা থাকার দুঃসহ জীবনের উপযোগী একটি ভাব আনার চেষ্টা করতে থাকি।
যখন ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন তখন কি আপনি শওকত নামে কাউকে দেখেছিলেন?
শওকত?
হ্যাঁ, আমার ছোট ভাই। মিলিটারিরা অক্টোবর মাসে ধরেছিল। দেখেছিলেন?
হায় খোদা! এ শওকতের বোন? আমার চোখের সামনে হঠাৎ দৃশ্যটি ভেসে ওঠে। শওকতের হাতটি চেপে ধরে রেখেছে একজন আর আরেকজন একটা হাতুড়ি দিয়ে প্রচণ্ড আঘাতে তার আঙুল থেঁতলে দিচ্ছে, হাতের নখ ছিটকে ছিটকে বের হয়ে আসছে আর চিৎকার করছে শওকত। চিৎকার—চিৎকার—চিৎকার!
অক্টোবর মাসে ধরেছিল ডেমরার কাছে, পাওয়ার স্টেশনে একটা অপারেশান করতে যাচ্ছিল, আপনার মতোনই লম্বা, গায়ের রঙ ফর্সা, কালো ফ্রেমের চশমা। দেখেছিলেন তাকে? দেখেছিলেন?
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি, মেয়েটির চোখের দিকে তাকাতে পারছি না। কী বলি এখন?
দেখেছিলেন তাকে? খুব আমাদের জানার ইচ্ছে তার জীবনের শেষ সময়টা কিভাবে কেটেছিল। জানেন আপনি?
হায় খোদা কী বলি এখন মেয়েটাকে? কী বলি?
জানেন তার কথা?
আমি আস্তে আস্তে মাথা নাড়লাম, জানি।
মেয়েটি অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল, একটি কথাও না বলে। তারপর খুব আস্তে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আপনি কি আমাদের বাসায় যাবেন একবার? আমার মায়ের সাথে একটু কথা বলবেন? খুব তার জানার ইচ্ছে কী হয়েছিল।
আমি আমার শুকনো ঠোঁট দুটি জিব দিয়ে ভিজিয়ে বললাম, যাব।
গাড়িতে ওঠার সময় শুনলাম সুমন উচ্চ স্বরে একটি হিন্দি গান গাইতে শুরু করেছে বাংলায় যেটার অর্থ, প্রথমবার দেখেই তোমাকে আমার হৃদয় সঁপে দিয়েছি। এখন হৃদয় ছাড়া এই দীর্ঘ রজনী কেমন করে কাটাব? আমি না শোনার ভান করলাম। মেয়েটিকে দেখে বোঝা গেল না সে সুমনের গান শুনেছে কি না, সুন্দরী মেয়েদের এসব নিশ্চয়ই গা সওয়াও, কখন শুনতে হয় কখন না শুনতে হয় ওদের নিশ্চয় অনেক ভাল করে জানা। শালা সুমন, ফিরে এসে আমি যদি তোর দাঁত খুলে না নিই।
মেয়েটির চেহারা দেখেই বুঝেছিলাম যে এরা কয়েক পুরুষ ধরে বড়লোক, বাসাটি দেখে বুঝলাম আমার ধারণা সত্যি। এরকম বাসায় এলসোসিয়ান কুকুর থাকে, বাইরের কেউ এলেই সেই কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে শুরু করে। এসব বাসায় অনাহূতভাবে কখনো আসতে হয় না, তাতে ভারী বিড়ম্বনা হয়। আজ অবিশ্যি আমার কোন ভয় নেই। এই বাসার মেয়ের সাথে এক গাড়িতে এসেছি, পিছনের সিটে প্রায় গায়ের সাথে পা লাগিয়ে। তাছাড়া মনে হচ্ছে এ বাসায় কোন কুকুর নেই, গাড়ি থেকে নেমে সোজা বসার ঘরে চলে এলাম। কোন কুকুর তো ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে এলো না।
বসার ঘরটি মনে হয় খুব সুন্দর করে সাজানো। আমার রুচিজ্ঞান খুব সুবিধের নয়, গলায় কাগজের ফুল দেয়া রবীন্দ্রনাথের ছবি দেখলেই আমি কাত হয়ে যাই, সে তুলনায় এই বাসাতো একেবারে আর্ট মিউজিয়াম। দেয়ালে বড় বড় সুর্বোধ্য তেলরঙের ছবি, এক কোনায় আধা ন্যাংটা মেয়ের মূর্তি। কালো পাথরের টেবিল ল্যাম্প, মখমলের সোফা! কী নেই এই ঘরটাতে, কোথাও বড় করে একটা শওকতের ছবি থাকবে ভেবেছিলাম, সেটা নেই। কেন কে জানে। বড়লোক বন্ধু-বান্ধবের বাসায় গেলে বাসার কাজের লোক দিয়ে অনেকবার ভেতরে খবর আদান-প্রদান করাতে হয়, দেখা করার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এখানে এসেও নিজের অজান্তেই তার জন্যে প্রস্তুত হয়ে গেলাম, কিন্তু মেয়েটি প্রায সাথে সাথেই একটা গ্লাসে ঠাণ্ডা একটু সরবত নিয়ে ঢুকল। তার পিছনে একজন মহিলা, ঠিক যেরকম হবে ভেবেছিলাম সেরকম। দেখে বোঝার উপায় নেই যে তিনি এই মেয়ের মা, মনে হয় বড় বোন, কপালের উপর ইন্দিরা গান্ধীর মতো এক গোছা পাকা চুল ছাড়া চেহারায় বয়সের কোন ছাপ নেই।
আমি উঠে দাঁড়ালাম, সালাম টালাম কিছু একটা দেব কি না চিন্তা করছিলাম। ভদ্রমহিলা তার সুযোগ দিলেন না, জিজ্ঞেস করলেন, রুখসানা তোমাকে জোর করে ধরে নিয়ে আসেনি তো বাবা?
আমি একটু হাসার ভঙ্গি করে বললাম, না না কী যে বলেন।
তুমি এসেছ খুব ভাল হয়েছে, না হয় আমি নিজেই যেতাম।
আমি কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে রইলাম। ভদ্রমহিলা আরো কিছুক্ষণ হালকা কথাবার্তা বলে আসল বক্তব্যে চলে এলেন। শান্ত গলায় বললেন, রুখসানা বলেছে তুমি নাকি শওকতকে ক্যান্টনমেন্টে দেখেছিলে।
আমি মাথা নাড়লাম।
আমি ওর জীবনের শেষ সময়টার কথা তোমার কাছে শুনতে চাই।
আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারি না, তাই কি বলব মনে মনে ঠিক করে নিয়ে প্রায় মুখস্থ বলার মতো করে বললাম, আমাকে আর শওকতকে যারা ধরে নিয়েছিল তারা ছিল মোটামুটি অমানুষ, তারা আমাদের কী করেছে সেটা শুনতে আপনার ভাল লাগবে না।
ভদ্রমহিলা নিঃশ্বাস আটকে রেখে বললেন, আমি তবু শুনতে চাই।
বিশ্বাস করেন শুনে আপনার আরো কষ্ট হবে।
হোক। আমি তবু শুনতে চাই।
কেন?
ভদ্রমহিলা থেমে থেমে প্রত্যেকটা শব্দে জোর দিয়ে বললেন, কারণ শওকত আমার ছেলে, তাকে আমি এইটুকু থেকে আস্তে আস্তে বড় করেছি। তার কাছে দেশ কেমন করে আমার থেকে বড় হয় সেটা আমি বুঝতে পারি না। আমি বুঝতে চাই।
কিন্তু আপনি তো বুঝতে পারবেন না।
ভদ্রমহিলা অসহিষ্ণুর মতো বললেন, না বুঝলে নাই, কিন্তু আমি তবু শুনতে চাই।
ঠিক আছে।
তুমি কোন কিছু গোপন করবে না, সব বলবে।
ঠিক আছে।
আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলে কথা বলতে শুরু করলাম।
প্রথমে বললাম তাকে কিভাবে ধরে নিয়ে এলো তার কথা, চোখ কেমন করে কাল কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল, হাত দুটি কেমন করে শরীরের পিছন দিকে বাঁধা ছিল সেইসব। হাত খুলে ধাক্কা দিয়ে তাকে ভেতরে ফেলে দিয়ে চলে যাওয়ার পর শওকত কী কী করল আমি সেগুলোও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বললাম। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল না সে ভয় পেয়েছে, সম্ভবত তখনো সে একটা ঘোরের মাঝে ছিল। আমাদের কয়েকজন তার সাথে কথা বলতে চাইলে সে বেশি উৎসাহ দেখায়নি। ডান হাতে কোন রকমের আঘাত লেগেছিল, ঠিক কতটা গুরুতর বোঝা যাচ্ছিল না। ঘণ্টাখানেক আমাদের কয়েকজনকে পাশের ঘরে নিয়ে গেল জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে। প্রায় প্রতিদিনই নেয়, ঘুরে ফিরে একই প্রশ্ন করে, প্রয়োজনে একটু মারপিট করে। আজ সেখানে একজন মিলিটারি অফিসার বসে ছিল, সে শওকতকে দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল। জিজ্ঞেস করল তার অন্য মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুরা কোথায়? আমি এইটুকু বলে থামলাম।
ভদ্রমহিলা সাথে সাথে বললেন, তারপর কী হলো?
আমি একটু মাথা নিচু করলাম। এখন আমি কেমন করে বলি যে শওকত যখন বলল সে জানে না, সাথে সাথে ঠাণ্ডা মাথায় তার উপর অত্যাচার শুরু হলো। কেমন করে বলি যে একজন শওকতের হাত দুটি টেবিলের উপর চেপে ধরল আর একজন একটা হাতুড়ি নিয়ে একটা একটা আঙুল থেঁতলে দিতে শুরু করল? আমি কেমন করে বলি যে প্রচণ্ড আঘাতে হাতের নখ উড়ে যেতে শুরু করল? শওকত গরুর মতো চিৎকার করতে লাগল—হায় খোদা, এসব আমি এখন কেমন করে বলি?
ভদ্রমহিলার চোখ দুটি তীক্ষ্ণ হয়ে গেল, ভাঙ্গা গলায় বললেন, বলো।
রুখসানা একটু এগিয়ে এসে তার মায়ের হাত দুটি ধরল অনেকটা সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে।
আমি আমার শুকনো ঠোঁট দুটি জিব দিয়ে একটু ভিজিয়ে নিলাম, হায় খোদা, আমাকে তুমি এ কী বিপদে ফেলেছ?
বলো কী হলো তারপর। ভদ্রমহিলার গলার স্বর ভেঙ্গে গেল হঠাৎ।
আপনি কেন শুনতে চাইছেন? আমি বলছি আপনার শুনতে ভাল লাগবে না।
তবু বলো। তবু আমি শুনতে চাই।
আমি এক মুহূর্তের জন্যে চোখ বন্ধ করলাম, মা তোমার মৃত্যুদিবসে মিথ্যা কথা বলব না প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আর পারলাম না। আমাকে তুমি মাফ করে দিও। আমি এদের সত্যি কথা বলতে পারব না, তোমার মতো আরেকজন মায়ের হৃৎপিণ্ড হাত দিয়ে টেনে আমি ছিঁড়তে পারব না।
বলো।
বলছি। আমি কল্পনা করে নিলাম শওকত সুদর্শন অফিসারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অফিসারটি জিজ্ঞেস করছে তোমার মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুরা কই? শওকত উত্তরে কিছু একটা বলবে, কী বলবে? একটু ভেবে আবার শুরু করলাম আমি, বললাম, অফিসারটি শওকতকে জিজ্ঞেস করেছে উর্দুতে। বাংলাদেশের এমন কোন মানুষ নেই যে অল্প বিস্তর উর্দু জানে না, সবাই জানে, আমিও জানি, অন্তত কথা বোঝার মতো জানি। শওকত নিশ্চয়ই জানে, কিন্তু সে বলল, আমি উর্দু বুঝি না। বল ইংরেজিতে। কী সাহস! মিলিটারি অফিসারটি প্রথম কিছুক্ষণ কোন কথা বলল না, তারপর আবার জিজ্ঞেস করল, এবারেও উর্দুতে। শওকত আবার বলল, আমি উর্দু জানি না। তখন পাশে দাঁড়ানো লোকটি এসে ওকে মারল, প্রচণ্ড জোরে, এত জোরে যে শওকত ঘুরে পড়ে গেল নিচে।
ভদ্রমহিলা মখমলের সোফা তার নখ দিয়ে আকড়ে ধরলেন, মুখ রক্তশূন্য, রুখসানা মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, তার অপূর্ব সুন্দর মুখ পাথরের মতো ভাবলেশহীন। মিথ্যা বলতে হয় সত্যির খুব কাছাকাছি করে, না হয় সেটা বিশ্বাসযোগ্য হয় না। কতবার কত জায়গায় মিথ্যা বলেছি আমি, আমার মতো মিথ্যা কে বলতে পারে? আমি আবার শুরু করলাম, শওকত আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল, দেখলাম তার ঠোঁট কেটে গেছে। হাত দিয়ে ঠোঁট মুছে সে উঠে দাঁড়াল, চোখ দুটি জ্বলজ্বল করছে, অফিসারটির দিকে তাকিয়ে যেটা বলল আমি নিজের কানে না শুনলে সেটা কখনো বিশ্বাস করতাম না। সে বলল, যে হাত দিয়ে তোমরা আমাকে মারছ, আমি বলে রাখলাম শুনে রাখ, একদিন সেই হাত জোড় করে তোমরা আমাদের কাছে প্রাণ ভিক্ষা করবে।
ভদ্রমহিলা নিঃশ্বাস আটকে রেখে বললেন, তাই বলল? তাই বলল শওকত?
হ্যাঁ, আমরা ভয়ে পাথর হয়ে গেলাম তার সাহস দেখে। পাশে দাঁড়ানো মিলিটারিটা বুকের কাপড় ধরে টেনে আনল তার কাছে, তারপর হাত তুলল মারার জন্যে, ঠিক যখন মারবে অফিসারটি তাকে থামাল। থামিয়ে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল, ছেলে, তোমার ভয় করে না?
শওকত বলল, করে।
অফিসারটি বলল, তোমাকে দেখে তো মনে হয় না, তুমি ভয় পেয়েছ।
শওকত তখন একটু হাসল, কী আশ্চর্য ব্যাপার, এরকম অবস্থায় কোনদিন কোন মানুষ হাসতে পারে? হেসে বলল, পৃথিবীতে কোন মানুষ নেই যে মৃত্যুকে ভয় পায় না। তুমি যদি মানুষ হতে তাহলে তুমিও বুঝতে আমি কত ভয় পেয়েছি। কিন্তু তোমরা তো মানুষ নও, তোমরা পশু তাই তোমরা বুঝতে পার না। তোমার সামনে আমি আমার ভয় দেখাব না। কিছুতেই না।
আমরা ভেবেছিলাম শওকতের কথা শুনে অফিসারটি রেগে ফেটে পড়বে, কিন্তু সে রাগল না। ঠাণ্ডা চোখে তার দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে রইল।
তারপর? তারপর কী হলো?
আমি আবার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। চোখের সামনে ভেসে উঠল শওকতের চেহারা, প্রচণ্ড মার খেয়ে সারা মুখ রক্তে প্রায় মাখামাখি, বাম চোখটা ফুলে প্রায় বুজে আছে, আঙুল সব কয়টি থেঁতলে দিয়েছে, তাকানো যায় না সেদিকে। তার মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুরা কোথায় বলতে পারছে না দেখে এবারে এক বালতি পানি নিয়ে এসেছে একজন। অফিসারটি ইঙ্গিত দিতেই একজন তার মাথার পিছনে চুলের ঝুটি ধরে তার মাথা বালতির পানিতে ডুবিয়ে ধরল, ছটফট করছে শওকত, নিঃশ্বাস নিতে পারছে না আর জোর করে ধরে রেখেছে দুজন।
অফিসারটি সময় নিয়ে আস্তে আস্তে একটা সিগারেট ধরাল, তারপর সেটাতে একটা লম্বা টান দিল। কাটা মুরগির মতো ছটফট করতে করতে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে শওকত। আমি আর দেখতে পারছি না। চোখ বন্ধ করে বলছি, খোদা একটু দয়া কর, একটু দয়া কর, মেরে ফেল ছেলেটিকে, মেরে ফেল আর কষ্ট দিও না। ঠিক তখন অফিসারটি ইঙ্গিত করল তাকে তুলে ধরতে। মাথা টেনে তুলল পানি থেকে, খোদা আমার কথা শুনেনি, এখনো বেঁচে আছে শওকত। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল বুভুক্ষের মতো; একবার, দুইবার, তৃতীয়বার নেবার আগেই আবার তার মাতা চেপে ধরল পানিতে! হায় খোদা আবার কেন আমার মনে করিয়ে দিলে সেই সব? কতবার তাকে এভাবে পানিতে চেপে ধরে রেখেছিল? কতবার? মানুষ হয়ে কেমন করে মানুষকে এত কষ্ট দিতে পারে? কেমন করে?
ভদ্রমহিলা তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকে, কাঁপা গলায় বললেন, বল তারপর।
আমি জোর করে সরিয়ে দিলাম দৃশ্যটি। চোখের সামনে এসে দাঁড়াল শওকত, কী দৃপ্ত চেহারা তার! সামনে অফিসারটিকে লাগছে একজন ভেঙে পড়া অপরাধী মানুষের মতো। আবার বলতে শুরু করলাম আমি, অফিসারটি তখন শওকতকে বলল, আমি তোমার সাহস দেখে মুগ্ধ হয়েছি ছেলে। আমার নিজের উপর থাকলে আমি তোমাকে ছেড়ে দিতাম। এই পৃথিবী সাহসী মানুষের জন্য, কাপুরুষের জন্যে নয়। কিন্তু আমার উপর আদেশ আছে তোমাকে মেরে ফেলার। তার আগে যেভাবে সম্ভব তোমার মুখ থেকে কয়টা কথা বের করতে হবে। যেভাবে সম্ভব। তোমরা যুদ্ধবন্দি নও, জেনেভা কনভেনশন তোমাদের বেলায় খাটে না। যেভাবে খুশি আমরা তোমাদের উপর অত্যাচার করতে পারি, কিন্তু আমি তোমার উপরে কোন অত্যাচার করব না, তোমাকে আমি সম্মান নিয়ে মরতে দেব। তুমি কী প্রস্তুত আছ মরার জন্যে?
ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে গেল শওকতের মুখ, মৃত্যুর মুখোমুখি কি কোন মানুষ এত সহজে দাঁড়াতে পারে? আমি দেখলাম খুব চেষ্টা করে ধীরে ধীরে সে নিজেকে শান্ত করল, তারপর বলল, আমি প্রস্তুত। তারপর আস্তে আস্তে ঘুরে আমাদের দিকে তাকাল, তাকিয়ে বলল, আমার নাম শওকত হাসান, যদি আপনাদের কেউ বেঁচে থাকেন খোঁজ করে আমার মায়ের সাথে দেখা করবেন। প্লিজ, দেখা করে বলবেন—
আমি থেমে গেলাম। কোন কথা না বলে মা আর মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, চোখ থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে দুজনের। সুন্দর একটা কথা বলতে হবে এখন। কী বলা যায়? এক মুহূর্তে ভেবে বললাম, খুব সুন্দর একটা কথা বলেছিল ইংরেজিতে, কথাটা বাংলায় অনেকটা এরকম, জীবনকে তার দৈর্ঘ্য দিয়ে বিচার করো না, বিচার করো সেটা কত তীব্র ছিল সেটা দিয়ে।
কথা বলতে বলতে হঠাৎ আমার মনে হতে থাকে সত্যিই বুঝি দৈর্ঘ্য নয় তীব্রতাই হচ্ছে জীবনের সবকিছু। ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকা নয়, প্রচণ্ড উত্তাপে ছারখার করে দেয়া হচ্ছে জীবন, শত্রুর মার খাওয়া নয়, অস্ত্র হাতে তার হৃৎপিণ্ড ছিন্নভিন্ন করে দেয়া হচ্ছে জীবন। মনে হতে থাকে পিশাচের দল যে শওকতকে টেনে-হিঁচড়ে বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়েছিল সে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত পঙ্গু নয়, সে ছিল জীবনের ঐশ্বর্যে উজ্জ্বল। মনে হতে থাকে আমি যা বলেছি সব সত্যি, শওকত নামের উনিশ বছরের একটা ছেলে সত্যি সত্যি মৃত্যুর মুখোমুখি এসেও প্রচণ্ড অহংকারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল, কী অসহ্য দীপ্তি ছিল তার চোখে, কী ভয়ংকর পৌরুষত্ব তার মুখে, কী আশ্চর্য সৌন্দর্য তার চেহারায়—আমার চোখে হঠাৎ পানি এসে গেল, ঠোঁট কামড়ে প্রাণপণে চেষ্টা করলাম আটকাতে, পারলাম না। একুশ বৎসরের ধাড়ি একটা মানুষের চোখ দিয়ে পানি বের হওয়ার থেকে অশালীন আর কিছু হতে পারে না। জেনেও আমি কিছু করতে পারলাম না, বসে ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেললাম ওদের সামনে।
এত দুর্বল আমি কেমন করে হলাম? মা, তুমি কেমন করে আমার মতো এমন একটা দুর্বল ছেলের জন্ম দিলে?
কেমন করে দিলে?
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

রিটিন - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

রিটিন - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
রিটিন - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

বিশাল হলঘরের মাঝখানে একটা গ্রানাইটের টেবিল। টেবিলের অন্যপাশে সোনালি চুলের মাঝবয়সী একজন মহিলা বসে তীক্ষ চােখে রিটিনের দিকে তাকিয়ে আছে। রিটিন খুব মনোযোগ দিয়ে তার হাতের নখগুলো পরীক্ষা করছে, তাকে দেখলে মনে হবে এই মুহূর্তে তার হাতের নখগুলো দেখা খুবই জরুরি।
সোনালি চুলের মহিলা জোর করে মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে বলল, “তুমি কী করতে চাও?”
রিটিন বলল, “আমি তোমাকে বলেছি। আমি লেখাপড়া করতে চাই। লেখাপড়া করে গবেষণা করতে চাই।”
সোনালি চুলের মহিলা বলল, “আমি ঠিক বুঝতে পারছি না তুমি কেন আমাকে এটা বলছ! তুমি খুব ভালো করে জান কে কী করবে: সেটি পূর্ব নির্ধারিত। গত একশ বছর থেকে মানুষকে জেনেটিক উপায়ে ডিজাইন করা হয়। যারা লেখাপড়া করবে তাদের সেভাবে ডিজাইন করতে হয় | তোমাকে করা হয়নি।”
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

স’তে সেন্টু মুহম্মদ জাফর ইকবাল

স’তে সেন্টু - মুহম্মদ জাফর ইকবাল স’তে সেন্টু
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

পরের দিন ক্লাসে গিয়ে ডেস্কে ব্যাগটা রেখে যখন বের হয়ে আসছি তখন হঠাৎ লক্ষ্য করলাম একটা ছেলে হুইল চেয়ারে করে আমাদের ক্লাশে ঢুকছে। হুইল চেয়ারটা এমনভাবে চালিয়ে আনছে যে দেখে আমার মনে হতে থাকে যে হাটা এক ধরনের ঝামেলা এবং হুইল চেয়ারে চলাফেরা করার কাজটা বুঝি খুবই সহজ। ক্লাশরুমের মাঝখানে এসে সে থেমে গেল এবং আমরা সবাই তখন তাকে ঘিরে দাড়ালাম। আমি ভেবেছিলাম দেখব ছেলেটার পা নেই কিন্তু দেখলাম তার দুটো পাই বেশ ভালোমতন আছে। সেই পায়ে সে রীতিমত চকচকে জুতো-মোজা পরে আছে। পা থাকার পরও সে কেন হাটতে পারে না, তাকে কেন হুইল চেয়ারে চলাফেরা করতে হয় আমি বুঝতে পারলাম না।
বইটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

কলাম সমগ্র - মুহাম্মদ জাফর ইকবাল

কলাম সমগ্র - মুহাম্মদ জাফর ইকবাল কলাম সমগ্র
মুহাম্মদ জাফর ইকবাল

১৯৭১ সালের মে মাসের ৫ তারিখ বিকালবেলা পিরোজপুরের বলেশ্বরী নদীর ঘাটে পাকিস্তান মিলিটারি আমার বাবাকে গুলি করে হত্যা করেছিল। পুলিশ প্রশাসনের সবচেয়ে বড় কর্মকর্তা হিসেবে শুধু আমার বাবাকেই নয়, প্রশাসন এবং বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় কর্মকর্তা হিসেবে জনাব আব্দুর রাজ্জাক এবং জনাব মীজানুর রহমানকেও একই সঙ্গে গুলি করে তাঁদের সবার মৃতদেহ বলেশ্বরী নদীতে ফেলে দিয়েছিল।

পিরোজপুরের নদীতে জোয়ার-ভাটা হয় তাই এই তিনজন তেভাগ্য মানুষের মৃতদেহ দিনে দুইবার জোয়ারের পানিতে উত্তরে এবং ভাটার পানিতে দক্ষিণে নেমে আসছিল। তিন দিন পর আমার বাবার মৃতদেহ কাছাকাছি একটা গ্রামের নদীতীরে এসে আটকে গিয়েছিল। গ্রামের মানুষরা আমার বাবাকে চিনত, তাদের মনে হলো, ‘আহা, এই মৃতদেহটি মাটি চাইছে।’ তাই তাঁরা ধরাধরি করে আমার বাবার মৃতদেহটি তুলে নদীতীরে কবর দিয়েছিল। অন্য দু’জনের সেই সৌভাগ্য (!) হয়নি এবং তাঁদের মৃতদেহ শেষ পর্যন্ত নদীতে ভেসে হারিয়ে গিয়েছিল।

১৯৭১ সালে সেটি এমন কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা নয়, পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঘাঁটি গেড়েছে এরকম যে কোনো জায়গার আশপাশে যে কোনো নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকলেই দেখা যেত নদীতে অসংখ্য মানুষের মৃতদেহ ভেসে যাচ্ছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি মিলিটারি এই দেশের মানুষকে নির্বিচারে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করেছে। মানুষ হয়ে মানুষকে এত অবলীলায় এবং এত নিষ্ঠুরতায় হত্যা করা যায় সেটি আমরা আগে কখনো কল্পনা পর্যন্ত করতে পারিনি। একজন মানুষ যখন ঘর থেকে বের হতো সে আবার ঘরে ফিরে আসবে কি না সেই বিষয়টি নিয়ে তার আপনজনরা কখনো নিশ্চিত হতে পারত না।

মহাত্মা গান্ধি থেকে শুরু করে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সবাই মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখতে বলেছেন। তাঁরা যদি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে থাকতেন তাহলে এত আত্মবিশ্বাস নিয়ে মানুষকে বিশ্বাস করার কথা বলতে পারতেন কিনা আমি নিশ্চিত নই। ১৯৭১ সালে এই দেশে পাকিস্তানি মিলিটারি যে ভয়ঙ্কর তাণ্ডব এবং হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল সেটি দেখে আমাদের প্রজন্ম পাকিস্তান নামক দেশটির মানুষ নামক প্রজাতির ওপর বিশ্বাস চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলেছিল। অন্যদের কথা জানি না, এতদিন পরও আমি এখনো একজন পাকিস্তানের মানুষকে দেখলে তার ভেতরে এক ধরনের দানবকে খুঁজে পাই।

পবিত্র কোরআন শরিফে লেখা আছে, মানুষ যখন বেহেশত পাবে তখন তার বুকের ভেতর থেকে সব প্রতিহিংসা সরিয়ে দেওয়া হবে। কথাটি অন্যভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়, এই পৃথিবীতেই যদি একজন মানুষ তার বুকের ভেতর থেকে সব প্রতিহিংসা দূর করতে পারে তাহলে পৃথিবীটাই তার কাছে বেহেশত হয়ে যেতে পারে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি আমাদের দেশে যে ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ড এবং নির্যাতন চালিয়েছে সেটি আমি নিজের চোখে দেখেছি এবং সে কারণে আমার বুকের ভেতর এই রাষ্ট্রটির জন্য যে তীব্র ঘৃণা এবং প্রতিহিংসার জন্ম হয়েছে আমি কোনোদিন তার থেকে মুক্তি পাব না। এই রক্তলোলুপ ভয়ঙ্কর দানবদের কারণে পৃথিবীটা আমার জন্য কখনো বেহেশত হতে পারবে না। সব সময়ই এই দেশ এবং এই দেশের দানবদের জন্য আমার বুকে ঘৃণা এবং প্রতিহিংসার আগুন ধিকিধিকি করে জ্বলতে থাকবে।

অথচ, পাকিস্তান নামক দেশটি রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে জানিয়েছে, ১৯৭১ সালে তারা আমাদের দেশে কোনো গণহত্যা করেনি, এই দেশের মানুষের ওপর কোনো নির্যাতন করেনি। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ নামে দুজন যুদ্ধাপরাধীর পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে তারা এই বিচিত্র ঘোষণাটি দিয়েছে। আমরা যতটুকু জানি, তারা এর চেয়েও অনেক বেশি জানে যে, ১৯৭১ সালে তারা এই দেশে একটা ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল।

আমি বেশ কয়েক বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নামে ছোট একটি পুস্তিকা লিখেছিলাম। এই পুস্তিকার তথ্যসূত্রগুলোর বেশিরভাগ দিয়েছিলাম পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের লেখা বই থেকে। তারা নিজেরাই সেখানে স্বীকার করেছে, এই দেশে তারা ভয়ঙ্কর গণহত্যা করেছে, তারপরও যখন পাকিস্তান সরকার এখনো ‘জানে না’ যে ১৯৭১ সালে এই দেশে ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যাটি হয়েছিল তখন বুঝেই নিতে হবে ‘ডাল মে কুচ কালা হায়।’ এই দেশের অনেক মানুষ পাকিস্তানের এই নির্জলা মিথ্যা কথা শুনে ভয়ঙ্কর ক্রুব্ধ হয়ে উঠেছে, আমি ক্রুব্ধ হইনি এবং অবাকও হইনি। আমরা যারা আমাদের জীবনের একটা অংশ পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে কাটিয়েছি এবং নিজের চোখে ১৯৭১ দেখেছি তারা খুব ভালো করে জানি এটি হচ্ছে আদি ও অকৃত্রিম পাকিস্তানি কর্মকাণ্ড। যেখানে সত্য ভাষণ করা হলে লাভ হয়। সেখানেও এই রাষ্ট্রটি মিথ্যাচার করে। এই দেশের ইতিহাস হচ্ছে মিলিটারি জেনারেলদের ইতিহাস। এই দেশের সবচেয়ে সম্মানী মানুষ সেই দেশের নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানী আব্দুল কাদির খান পৃথিবীর চোখে একজন আন্তর্জাতিক অপরাধী। এই দেশে মেয়েরা লেখাপড়া করতে চাইলে তাদের মাথায় গুলি করা হয়। এই দেশটির জন্য যার বুকের ভেতরেই যতটুকু ভালবাসা থাকুক না কেন, আমার বুকের ভেতর বিন্দুমাত্র ভালবাসা কিংবা সম্মানবোধ নেই। বিদেশে যাওয়ার সময় প্লেন যখন পাকিস্তানের ওপর দিয়ে উড়ে যায় আমি তখন অশুচি অনুভব করি।

২.
১৯৭১ সালে জীবন বাঁচানোর জন্য আমাকে দেশের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে। আমার বয়সি কিংবা আমার চেয়ে ছোট কিশোর তরুণরাও মুক্তিযোদ্ধা হয়ে পাকিস্তানি মিলিটারির সঙ্গে বীরের মতো যুদ্ধ করেছে। আমাদের মতো মানুষরা যারা অবরুদ্ধ পাকিস্তানে আটকা পড়েছিলাম তাদের পাকিস্তানি মিলিটারির সব রকম পৈশাচিক নির্মমতা নিজের চোখে দেখতে হয়েছে।

মনে আছে একদিন গ্রামের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি হঠাৎ করে একদল পাকিস্তানি মিলিটারির মুখোমুখি হয়ে গেলাম। আমার চোখের সামনে তারা একটা বাড়িতে ঢুকে পড়ল। বাড়ির ভেতর থেকে পুরুষ মানুষটি কোনোভাবে প্রাণ নিয়ে বের হয়ে এসে আমার সামনে থরথর করে কাঁপতে থাকল এবং আমি বাড়ির ভেতর থেকে নারী কণ্ঠের আর্তনাদ শুনতে পেলাম। যখন নিজের স্ত্রীকে একদল পাকিস্তানি মিলিশিয়া ধর্ষণ করতে থাকে তখন সেই স্ত্রীর আর্তনাদ শুনতে থাকা স্বামীর চোখে যে ভয়াবহ শূন্য এক ধরনের দৃষ্টি থাকে সেটি যারা দেখেছে তারা কখনো ভুলতে পারবে না। আমিও পারিনি, কখনো পারব না।

এই অসহায় স্ত্রীটির মতো বাংলাদেশে আরও তিন থেকে চার লাখ মহিলা এই পাশবিক নির্যাতন সহ্য করেছে। ‘দ্যা রেপ অফ নানকিং’ নামে আইরিশ চ্যাং-এর লেখা একটি অসাধারণ বই আছে, যে বইটিতে নানকিংয়ের আদিবাসীদের ওপর জাপানিদের অমানুষিক নির্যাতনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এই বইটিকে একটা ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই বইয়ের শুরুতে আইরিশ চ্যাং লিখেছেন, নানকিংয়ে নারী ধর্ষণের যে ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটেছিল তার সঙ্গে তুলনা হতে পারে শুধু ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি মিলিটারিদের দিয়ে বাংলাদেশের নারীদের ধর্ষণ।

সারা পৃথিবীর ইতিহাসে পাকিস্তানি মিলিটারির এই ভয়ঙ্কর নির্যাতনের একটি জ্বলন্ত ইতিহাস থাকার পরও পাকিস্তান সরকারের সাহস আছে সেই সত্যটিকে অস্বীকার করার। এই রাষ্ট্রটিকে যদি আমরা ঘৃণা না করি তাহলে আমরা কাকে ঘৃণা করব?

৩.
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি দানবদের হাতে যারা আমার মতো আপনজনদের হারিয়েছেন তাদের বুকের ক্ষত কখনো শুকিয়ে যাবে না। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী কিংবা আলী আহসান মুজাহিদের মতো যুদ্ধাপরাধীর বিচার করে তাদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ কার্যকর করার পর শহীদদের আপনজনরা হয়তো খানিকটা হলেও শান্তি পাবেন। ফাঁসির রায় কার্যকর করার পর এই দেশের কোনো মানুষের মুখ থেকে এতটুকু সমবেদনার কথা শোনা যায়নি। কিন্তু পাকিস্তানের মানুষদের হাহাকার শুরু হয়ে গিয়েছিল। যারা একাত্তর দেখেনি কিংবা যাদের ভেতরে যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল পাকিস্তানের হাহাকার শুনে তাদের সব সন্দেহ দূর হয়ে গিয়েছে। আসমা জাহাঙ্গীর খুব সঠিকভাবেই বলেছেন, সৌদি আরবে যখন প্রায় রুটিনমাফিক পাকিস্তানি অপরাধীদের মাথা কেটে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় তখন একটি রায়ও পাকিস্তান সরকার সেসব হতভাগ্যদের জন্য বিন্দুমাত্র দরদ দেখায় না। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় নিয়ে বিচার করে যখন বাংলাদেশি যুদ্ধাপরাধীর বিচার করা হয় তখন হঠাৎ করে তাদের দরদ উথলে পড়ে!

১৯৭১ সালে পাকিস্তান এই দেশে কোনো গণহত্যা ঘটায়নি বা কোনো যুদ্ধাপরাধী করেনি। এই নির্জলা মিথ্যা কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে ‘ভাই’ এবং ‘বন্ধুর’ মতো সুসম্পর্ক তৈরি করা নিয়ে অনেক ভালো ভালো কথা বলেছে। দুই দেশের জনগণ পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করে দুই ভাইয়ের মতো ভবিষ্যৎ সম্পর্ক গড়ে তুলবে এ রকম আশা প্রকাশ করেছে।

বিষয়টি মোটেও সে রকম নয়। বাংলাদেশের মানুষের পাকিস্তান নামক দেশটির জন্য কোনো ভালবাসা থাকার কথা নয়। তারা বড়জোর এই দেশটিকে সহ্য করবে যদি তারা নতজানু হয়ে তাদের সব অপরাধের কথা স্বীকার করে ক্ষমাভিক্ষা চায়। যেহেতু তাদের ভেতরে আমরা সে রকম কিছু দেখতে পাচ্ছি না তাহলে পাকিস্তান নামক এই রাষ্ট্রটির সাথে কোনো ধরনের সম্পর্ক রাখার প্রয়োজনীয়তাটুকু কী? চল্লিশ বছর পরে হলেও আমরা আমাদের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে দেশকে গ্লানিমুক্ত করার চেষ্টা করছি। এ জন্য এই সরকারের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আরও পরিষ্কার করে বলতে হলে বলব, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব এবং সাহসের জন্য তাঁর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। চল্লিশ বছর পরে হলেও আমরা যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পারি তাহলে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির কৃতকর্মের জন্য তাদের বিচার কেন করতে পারি না? এই দেশের সঙ্গেই আমাদের কোনো একটা সম্পর্ক রাখার প্রয়োজন কোথায়?

মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ফোরাম যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবিটিকে নতুন করে উজ্জীবিত করেছিলেন। (তাঁরা যখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের কথা বলতে এসেছিলেন তখন একটা চত্বরে প্রত্যেক সেক্টর কমান্ডার হাতে একটা করে গাছ লাগিয়েছিলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই চত্বরটির নাম সেক্টর কমান্ডার চত্বর।) সেক্টর কমান্ডার ফোরামের সদস্যরা এখন নূতন করে একটা দাবি করেছেন। তাঁরা বলেছেন পাকিস্তানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে! আমার মনে হয় এটি একটি অত্যন্ত যৌক্তিক দাবি। ১৯৭১ সালে আমরা যারা পাকিস্তান মিলিটারির হাতে আমাদের আপনজনকে হারিয়ে ছিলাম আমাদের ক্ষোভ একশ গুণ বেড়ে যায় যখন আমরা দেখি সেই হত্যাকারী দেশ আস্ফোলন করে ঘোষণা করে তারা কোনো দোষ করেনি। আমাদের আপনজনেরা তাহলে খুন হন কেমন করে নদীর পানিতে তাদের মৃতদেহ ভেসে বেড়াল কেমন করে?

পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির সাথে আমি কখনো সরাসরি কথা বলতে পারব না। যদি পারতাম তাহলে আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলতাম, ১৯৭১ সালে এই দেশের মানুষের উপর যে নৃশংস তাণ্ডব চালিয়ে গণহত্যা করেছ সেই অপরাধের জন্যে আমরা তোমাকে কখনো ক্ষমা করিনি। তোমাদের এতো বড় দুঃসাহস, এতো দিন পর তোমরা সেটি অস্বীকার কর?

আমাদের বুকের ভেতর যে ঘৃণার আগুন জ্বলছে তোমরা তার তাপ সহ্য করতে পারবে না। ১৯৭১ সালে আমরা তোমাদের দূর করে দিয়েছি।

তোমরা দূরেই থেকো, আমাদের কাছে এসে না।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল
২.১২.২০১৫

Comments/Join our Facebook Group
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

তিতুনি এবং তিতুনি - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

তিতুনি এবং তিতুনি - মুহম্মদ জাফর ইকবাল তিতুনি এবং তিতুনি - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

তিতুনির খুব মন খারাপ। তিতুনির যখন মন খারাপ হয় তখন সে তাদের বাসার ছাদে উঠে রেলিংয়ের উপর মুখ রেখে গালে হাত দিয়ে দূরে তাকিয়ে থাকে। তাদের বাসার পিছনে অনেক বড় বড় গাছ, সেই গাছের ফাক দিয়ে তাকালে দূরে ধান ক্ষেত চোখে পড়ে। আরো দূরে তাকালে কিন্নরী নদীটার পানিকে চিকচিক করতে দেখা যায়। একটু উপরে তাকালে দেখা যায় নীল আকাশে সাদা সাদা মেঘ। আরো ভালো করে তাকালে দেখা যায় মেঘের ভেতর থেকে বাকে বাকে পাখি বের হয়ে উড়ে উড়ে যাচ্ছে।
দূরে তাকিয়ে থেকে তিতুনী বাতাসে গাছের পাতার শব্দ শুনে, তখন খুব ধীরে ধীরে তার মনটা একটু শান্ত হয়। মনটা শান্ত হলেও তার ছোট বুকটা ভার হয়ে থাকে, মনে হয় সে সবকিছু ছেড়েছুড়ে একদিন দূরে কোথাও চলে যাবে। সেখানে আবু আর আম্মু তাকে খুঁজে পাবে না, তার ভাই টোটনও তাকে আর জ্বালাতন করতে পারবে না।
তিতুনির বয়স বারো, তার বড় ভাই টোটনের বয়স চৌদ্দ। তিতুনির মনে হয় টোটনের জন্মের পর নিশ্চয়ই তার মুখে কেউ মধু দেয়নি, কিংবা কে জানে হয়তো মধু মনে করে ভিনেগার ঢেলে দিয়েছিল। তাই টোটন সব সময় চ্যাটাং চ্যাটাং করে কথা বলে। তিতুনির সাথে কথা বলার সময় শুধু যে চ্যাটাং চ্যাটাং করে কথা বলে তা নয়, একটানা তিতুনিকে টিটকারি করতে থাকে। কোনো কারণ থাকুক আর না-ই থাকুক সারাক্ষণ তিতুনিকে বকাবকি করতে থাকে। কিছু একটা হলেই আবু-আম্মুর কাছে নালিশ করে দেয়।
বইটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

ক্রেনিয়াল - মুহম্মদ যাফর ইকবাল (বইমেলা ২০১৬)

ক্রেনিয়াল - মুহম্মদ যাফর ইকবাল (বইমেলা ২০১৬) ক্রেনিয়াল - মুহম্মদ যাফর ইকবাল (বইমেলা ২০১৬)

কোয়ান্টাম কম্পিউটার যুগে মানবসভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেছে আত্মঘাতী নিউক্লিয়ার বিস্ফোরণে। বেঁচে আছে অল্পসংখ্যক মানষ। সেই ধ্বংসস্তুপে তাদের হাত ধরেই শুরু হল সভ্যতার নতুন যন্ত্রসর্বস্ব এক অমানবিক জীবনধারা। সেখানে মানুষের মাথায় লাগিয়ে দেওয়া হয় ক্রেনিয়াল। কিন্তু সে কেবলই বাধ্য ও অনুগতদের জন্য, যদি ডিটিউন করে তার মস্তিষ্ককে অচল করে দেওয়া হয়। মস্তিষ্কহীন যন্ত্রচালিত এই পৃথিবীতে অবাধ্যতার ঢেউ তুলে এগিয়ে এল এক কিশোরী আর এক কিশোর। টিশ আর রিহি। ধুধু মরুপ্রান্তরে শুরু হল তাদের বিপজ্জনক অভিযাত্রা। এই বইটি সেই অভিযাত্রারই রুদ্ধশ্বাস উপাখ্যান। অনাগত ভবিষ্যৎকে নিয়ে এ এক অসাধারণ কল্পকথা।

বইটি পাওয়া যাচ্ছে বইমেলায়।

বইটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সায়েন্স ফিকশন সমগ্র ০২ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

amarboi সায়েন্স ফিকশন সমগ্র ০২ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
সূচিপত্র
নিঃসঙ্গ গ্রহচারী
*ক্রোমিয়াম অরণ্য
*ত্রিনিত্রি রাশিমালা
*অনুরন গোলক
*নয় নয় শূন্য তিন
*পৃ
*রবোনগরী
*টুকি এবং ঝায়ের (প্রায়) দুঃসাহসিক অভিযান

Download and Join our Facebook Group
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সায়েন্স ফিকশন সমগ্র ০১ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

Science Fiction Samagra 01 - Muhammad Zafar Iqbal সায়েন্স ফিকশন সমগ্র ০১ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
সূচিপত্র
*কপোট্রনিক সুখদুঃখ
*মহাকাশে মহাত্রাস
*ক্রুগো
*ট্রাইটন একটি গ্রহের নাম
*বিজ্ঞানী সফদর আলীর মহা মহা আবিষ্কার
*ওমিক্রনিক রূপান্তর
*টুকুনজিল
*যারা বায়োবট

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

আরো টুনটুনি ও আরো ছোটাচ্চু - মুহম্মদ জাফর ইকবাল (বইমেলা ২০১৫)

আরো টুনটুনি ও আরো ছোটাচ্চু - মুহম্মদ জাফর ইকবাল আরো টুনটুনি ও আরো ছোটাচ্চু - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
আরো টুনটুনি ও আরো ছোটাচ্চু। লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। টুনটুনি আর ছোটাচ্চুকে নিয়ে এর আগে একটা বই বেরিয়েছিল। সে বইতে যাদের মন ভরেনি, তাদের কথা মাথায় রেখেই 'আরো টুনটুনি ও আরো ছোটাচ্চু'। বইটি প্রকাশ করেছে পার্ল পাবলিকেশন্স। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ সাদাতউদ্দীন আহমেদ এমিল।
Download and Join our Facebook Group
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী সেরিনা - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

amarboi বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী সেরিনা - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

Download and Join our Facebook Group
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

গ্রামের নাম কাঁকনডুবি - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

Gramer Nam Kakondubi by Muhammed zafar Iqbal গ্রামের নাম কাঁকনডুবি - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
অমর একুশে গ্রন্থমেলায় এল জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও বিজ্ঞান লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা বই ‘গ্রামের নাম কাঁকনডুবি‘। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত শিশুতোষ বই এই ”গ্রামের নাম কাঁকনডুবি’।

Download and Join our Facebook Group
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com