সাম্প্রতিক বইসমূহ

দোজখনামা - রবিশংকর বল

দোজখনামা - রবিশংকর বল
দোজখনামা - রবিশংকর বল

‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর ‘রোববার’ ক্রোড়পত্রিকায় ২০০৯ সালে এক বছর ধরে প্রকাশিত হয়েছিল এই উপন্যাস । উপন্যাসটি প্রকাশের বিষয়ে সম্পাদক শ্রীঋতুপর্ণ ঘোষ যে-আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, সেজন্য তাঁর কাছে আমি কৃতজ্ঞ । প্রকাশনার নানা পর্বে সাহায্য করেছেন ক্রোড়পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক শ্রীঅনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় ও তরুণ সহকর্মী শ্রীভাস্কর লেট । ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর সম্পাদক শ্রীসৃঞ্জয় বোস নানা বিষয়ে আমাকে উৎসাহ দিয়ে থাকেন; এই উপন্যাস প্রকাশের ক্ষেত্রেও তাঁর কাছ থেকে উৎসাহ পেয়েছি । বন্ধু শ্রীদেবাশিস বিশ্বাস প্রয়োজনীয় সংশোধনের কাজ করে দিয়েছেন ।
এবার শুধু আপনাদের পৃষ্ঠা ওল্টানোর অপেক্ষা । পাঠিকা/পাঠক আমার নমস্কার গ্রহণ করুন ।

রবিশংকর বল
শ্রাবণ ১৪১৭

সমর সেনঃ কবির জীবন ও কবিতায় জীবন - বৃন্দাবন কর্মকার

সমর সেনঃ কবির জীবন ও কবিতায় জীবন - বৃন্দাবন কর্মকার
সমর সেনঃ কবির জীবন ও কবিতায় জীবন - বৃন্দাবন কর্মকার

“জানি, এরা নয় বৈশ্য সভ্যতার জারজ সস্তান
গলিত ধনতন্ত্রের চতুর বিভীষণ,
তাই সক্রিয় আশা মৃত্যুহীন জাগে অনেকের মনে;
অপরের শস্যালোভী পরজীবী পঙ্গপাল
পিষ্ট হবে হাতুড়িতে, ছিন্ন হবে কাস্তেতে।”

বুদ্ধদেব বসুর হাত ধরেই কবিতার জগতে প্রবেশ করেছিলেন সমর সেন। আমার যৌবনে বুদ্ধদেব জানিয়েছেন, ‘এক গ্রীষ্মের সকালে আমার ঘরে একটি ক্ষীণাঙ্গ ছেলে-প্রায় বালক, সবে পা দিয়েছে যৌবনে – গায়ের রং হলদে-ঘেঁষা ফর্সা, ঠোঁটে গোঁফের ছায়া, চোখে চশমা, গালে একটি ব্রণের ওপর এক ফোঁটা চুন লাগানো। কিছুমাত্র ভূমিকা না করে বলল, আমি আপনার ‘শাপভ্রষ্ট’ কবিতার একটি ইংরেজি করেছি। – আপনি দেখবেন?’ এভাবেই দুজনের মধ্যে পরিচয়ের সূত্রপাত, যা পরবর্তীকালে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। অন্যদিকে সমর সেনও এই ঘটনা সম্পর্কে লিখেছেন – ‘১৯৩৪-এ গ্রীষ্মকালে দারুণ মর্মবেদনা থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য একবার সাহস করে গেলাম বুদ্ধদেব বসুর বাড়িতে, ভবানীপুরে। ‘বন্দীর বন্দনা’র কয়েকটি কবিতার ইংরেজি অনুবাদ পড়ে খুশি হয়ে জিজ্ঞেস করলেন আমি কবিতা লিখি কিনা। কয়েকটা লেখা দিনকয়েক পরে দেখাতে, বললেন নিয়মিত ছন্দের চেষ্টা ছেড়ে গদ্যছন্দে যেতে।’ পরবর্তীকালে সমকালীন অগ্রজ কবি বিষ্ণু দে-কে লিখে জানিয়েছিলেন ‘গদ্য কবিতা কেন, কোনো কবিতা সম্পর্কেই এখন আর উৎসাহ নেই।’
ইংরেজী সাহিত্যের দুর্ধর্ষ ছাত্র সমর সেন তার কাব্যজীবনের শুরুতেই পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রশংসা আর বুদ্ধদেব বসুর নির্ভরযোগ্য প্রশ্রয়। রবীন্দ্রনাথ সমর সেনের কবিতায় দেখেছেন-‘গদ্যের রূঢ়তার ভিতর দিয়ে কাব্যের লাবণ্য প্রকাশ।’
আধুনিক বাংলা কবিতার কোনো কোনো গবেষক-সমালোচক তাদের কাব্যালোচনার পরিধিতে কবি সমর সেনকে উপেক্ষা করলেও যুদ্ধোত্তর বাংলা কাব্যসংসারে কবি সমর সেনের প্রতিভাকে অস্বীকার করার উপায় ও অবসর নেই। কারণ তার মননঋদ্ধ কবিতাগুলিতে সেই সময়কার যুগযন্ত্রণা যেভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, তাতেই তিনি কবি হিসাবে অনিবাৰ্য হয়ে উঠেছিলেন। তাছাড়া, আধুনিকতার যুগলক্ষণগুলির মধ্যে প্রধান কয়েকটি, যেমন নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার অভিঘাত, জীবনে ক্লাস্তি ও নৈরাশ্যবোধ, অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের দ্বন্দ্ব, আত্মবিরোধ ও শিকড়হীনতার যন্ত্রণা, শরীরী সন্তাপের দ্বিধাহীন প্রকাশ, ছন্দে গদ্যরীতির ব্যবহার, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপাত্মক মনোভঙ্গি প্রভৃতি একদিকে যেমন কবি সমর সেনের কবিতার অঙ্গরাগ সৃষ্টি করেছিল, তেমনি অন্যদিকে প্রাণরস সিঞ্চন করেছিল-তার নগরজীবনের প্লানিময় অভিজ্ঞতা, যুগোচিত একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতা, বিষাদ-বিষন্নতা, শ্রেণীবৈষম্য, যুদ্ধোত্তর সমাজ-পরিবেশে হা-অন্নের ছবি; সর্বোপরি তার সুগভীর সমাজচেতনা ও তীব্র মানবতাবোধ। তাই কবি সমর সেনকে উপেক্ষা করে সমকালীন কাব্যালোচনা সম্পূর্ণ হতে পারে না।
১৯৩৫/৩৬ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত ধারাবাহিক কাব্যচর্চায় ছেদ টেনে তিনি কাব্যজগৎ থেকে স্বেচ্ছায় বিদায় নিয়েছিলেন এবং সংবাদপত্রের জগতে নিজেকে সপে দিয়েছিলেন। এর বছর দশেক বাদে আরো কয়েকটি কবিতা লিখলেও সেই ধারাবাহিকতা আর ছিল না। তার কবিতার বইয়ের সংখ্যাও খুব বেশি নয়। তার ক্ষীণকায় কবিতার বইগুলির নাম—‘কয়েকটি কবিতা’, ‘গ্রহণ’, ‘নানাকথা’, ‘খোলাচিঠি’ ও ‘তিনপুরুষ’। তবু আধুনিক বাংলা কবিতায় তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয়।
বহুল তথ্য, উদাহরণ ও পাদটীকা সহযোগে সাতটি অধ্যায়ে সমর সেনের জীবনকথা ও কাব্য ভাবনার বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন বৃন্দাবন কর্মকার। সমর সেনকে বুঝতে বইটি অবশ্য পাঠ্য।

"সমর সেনঃ কবির জীবন ও কবিতায় জীবন - বৃন্দাবন কর্মকার"

কথা ও সুর - ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

কথা ও সুর - ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
কথা ও সুর - ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ‘সংগীত’ নিয়ে যারা আলোচনায় তথা বিতর্কে যোগ দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ধূর্জটিপ্ৰসাদ মুখোপাধ্যায় তার দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্ত্র্যে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তার আধিপত্য সর্বজনস্বীকৃত। শিল্প সাহিত্য সংগীতের সমালোচনার আসরেও তিনি এক অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব। ‘সুর ও সংগীত’ যারা পড়েছেন তারা জানেন, সেখানে রবীন্দ্রনাথ ও ধূর্জটিপ্ৰসাদের পত্রালাপের কথা বলা হলেও শুধু রবীন্দ্রনাথের পত্রগুলিই মুদ্রিত হয়েছে, ধূর্জটিপ্ৰসাদের প্রশ্ন বা বক্তব্যের আভাস যাদের মধ্য থেকে মেলে। তার থেকেই বুঝতে পারি ১৯৩২ -এর আগস্ট থেকে ১৯৩৫-এর জুলাই অবধি কালপর্বে তাদের উভয়ের মধ্যে হিন্দুস্থানী সংগীত ও বাংলার গান নিয়ে আলোচনা চলেছিল। তারপর ১৯৩৮ সালে ‘কথা ও সুর’ প্ৰকাশিত হয়। ‘উপক্ৰমণিকা’ এবং ‘নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা’ ছাড়া বইটিতে সংগীত সম্পর্কে পাঁচটি রচনা স্থান পেয়েছে যার অন্যতম হল ‘কথা ও সুর’ । ঐ নামেই বইটির নামকরণ।
ভারতীয় সংগীত, বাংলার গান ও রবীন্দ্ৰ-সংগীত সম্পর্কে জিজ্ঞাসুকে আজও এই বইটির তাৎপৰ্যপূর্ণ বক্তব্য পরিতৃপ্ত করবে। অনুরূপ ভাবে ‘নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা’ রচনাটির বিশেষ মূল্য রয়েছে। ১৯৩৬ সালে কবি তাঁর যৌবন-পর্বে রচিত ‘চিত্রাঙ্গদা’র নৃত্যনাট্যরূপ দান করেন এবং অভিনয় করান। একদা তার পরম সুহৃং ‘সাহিত্যের সাত সমুদ্রের নাবিক’ প্রিয়নাথ সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের আক্রমণের বিরুদ্ধে দাড়িয়ে ‘চিত্রাঙ্গদা’র অনবদ্য ব্যাখ্যা রচনা করেছিলেন । আর ধূর্জটিপ্ৰসাদ ‘নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা’র যে-রসাত্মক সমালোচনা লিপিবদ্ধ করেন তার মূল্য অন্যাবধি বিন্দুমাত্র কমেনি। বরঞ্চ ক্ৰমশঃ বেড়েছে।

প্রান্তিক মানব (পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তুজীবনের কথা) - প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী

প্রান্তিক মানব (পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তুজীবনের কথা) - প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী
প্রান্তিক মানব
(পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তুজীবনের কথা)
প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী

১৯৯০ এ প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী ইংরেজিতে একটি বই লেখেন The Marginal Men ; The Refugees and the Left Political Syndrome in West Bengal নামে। ১৯৯৩-এ বইটি ‘রবীন্দ্র স্মৃতি’ পুরস্কার সহ দেশে ও বিদেশের পাঠকসমাজে বইটি রীতিমত আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। অনেক অনুরোধের পর প্রফুল্লকুমার বইটি বাংলা অনুবাদ করতে সম্মত হন। কারন এই বইয়ের যারা নায়ক-বিপুল উদ্বাস্তু জনসমষ্টি, ইংরেজিতে লেখা বইটি তাদের ধরাছোয়ার বাইরে ছিল। পরে তাঁর কৃতী ছাত্ৰ শ্ৰীমান কালীপদ সেনের সহায়তায় বইটির একটি বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে। বইটির নাম দেওয়া হয়; "প্রান্তিক মানব (পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তুজীবনের কথা)"। কিন্তু প্রশ্ন রয়েই যায় যে বই বাংলায় লেখাই স্বাভাবিক ছিল সেটি লেখক কেন ইংরেজিতে লিখলেন? জবাবে লেখক বলেছেন; "একটি বিশেষ কারণে বইটি ইংরেজি ভাষায় লেখার প্রয়োজন বোধ করেছিলাম। এই বই-এর উপাদান সংগ্রহের জন্য যখন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে উদ্বাস্তু ক্যাম্প ও কলোনি ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম তখন বাঙালি উদ্বাস্তুদের সম্পর্কে অ-বাঙালির এমনকী সম্পন্ন বাঙালিদের মুখেও এই ধরণের অবজ্ঞাভদ্রা উন্নাসিক উক্তি প্রায়ই শুনতে হত : কাদের নিয়ে বই লিখছেন আপনি! বাঙালি উদ্বাস্তুদের তো মানুষ বলেই মনে হয় না; এরা অলস, অকৰ্মণ্য, অপদার্থ। একবার পাঞ্জাবি উদ্ধাস্তুদের দিকে তাকিয়ে দেখুন। তাহলেই পার্থক্যটা বুঝতে পারবেন! ওরা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে। ওদের দেখে কে বলবে ওরা সব হারিয়ে পাকিস্তান থেকে চলে এসেছে। ওদের গা থেকে উদ্ধাস্তু গন্ধ মুছে গেছে। ওরা এখন এদেশের সন্ত্রান্ত, সম্পন্ন মানুষ। প্রতিবাদ করার মতো উপাদান তখনো আমার হাতে ছিল না। তখনো ক্যাম্পে কলোনিতে, দিল্লি ও কলকাতায় মহাফেজখানা ও গ্রন্থাগারে আমি উদ্ধাস্তুদের ইতিহাস রচনার উপাদান খুঁজছিলাম। যত দিন যেতে লাগল, যত বিভিন্ন তথা, দলিল ও কাগজপত্র আমাৰ হাতে আসতে লাগল ততই একটি সত্য ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠল : পূর্ববঙ্গের হিন্দুরা অলস, অকৰ্মণা বা অপদার্থ নয়। তারা কেন্দ্রীয সরকাবের নির্মম অবহেলার শিকার। এই অবহেলা এমনই পক্ষপাতদুষ্ট ও ভয়ানক যে মনে হয় কেন্দ্রীয় সরকার উদ্ধাস্তু বলতে পশ্চিম-পাকিস্তানি উদ্ধাস্তুদেব বুঝেছিল। পূর্ব-পাকিস্তানের উদ্ধাস্তুবা আসলে উদ্বাস্তুই নয়, তাদেব পুনর্বাসনের দায়িত্বও কেন্দ্রীয সবকারের নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের ঔদাসীন্য পূর্ববঙ্গের লক্ষ লক্ষ হৃতসর্বস্ব মানুষকে উদ্বৗস্তু আশ্রয় শিবিরে পশুর জীবন যাপন করতে বাধ্য করেছে। এদের পুনর্বািসন দেওয়া হবে কি না সে বিষযে মনস্থির করতে কেন্দ্রীয় সবকারের ১০ বছর সময় লেগেছিল। এই ১০ বছবে ক্যাম্পেব খাচায় আবদ্ধ মানুষগুলির মনুষ্যত্ব পুরোপুরি নিঃশেষিত হয়ে যায়। পশ্চিম-পাকিস্থানি উদ্বাস্তুদেব জন্য প্রায় সারা ভাবতের ঐশ্বর্য ঢেলে দেওয়া হযেছিল। তারা ক্ষতিপূরণ পেয়েছে, পাঞ্জাবের এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের দেশত্যাগী মুসলমানদের সম্পত্তি পেয়েছে। ভারত সরকার তাদের জন্য আধুনিক শিল্পনগরী নির্মাণ করে দিয়েছে। পশ্চিম-পাকিস্তানে তারা যা ফেলে এসেছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি তারা পেযেছে এই দেশে। পূর্ব-পাকিস্তানের উদ্বাস্তুরা পেয়েছে শুধু বঞ্চনা। তারা ক্ষতিপূরণ পায়নি. দেশত্যাগী মুসলমানদের সম্পত্তি পায়নি। ভারত সরকার কথা দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গেও উদ্বাস্তু শিল্পনগরী নির্মাণ করবে। সে কথা সে রাখেনি। চরম দুৰ্গতির মধ্যেও অনিঃশেষিত প্রাণশক্তিকে সম্বল করে তারা জোট বেঁধেছে। জবরদখল কলোনি গড়ে তুলেছে, বেঁচে থাকার জন্য আন্দোলন করেছে। এবং পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যানুসারী সমাজে ও রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এই গ্ৰন্থ রচনার সময় আমার মনে হয়েছিল যে এই সত্যটি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মানুষের কাছে উপস্থাপিত করা প্রয়োজন যাতে বাঙালি চরিত্রের বিরুদ্ধে দুরভিসন্ধিমূলক প্রচার বন্ধ হয়। যাতে বাঙালি চরিত্রের অন্তর্নিহিত সহনশীলতা, মৃদুতা, দৃঢ়তা এবং শক্তির পরিচয় মেলে। বইটি তাই ইংরেজিতে লিখেছিলাম।"

লেখক বইয়ের শুরুতে বলছেন, "দেশ বিভাজনের পর পূর্ব-পাকিস্তান থেকে হিন্দুদের ঘর ছেড়ে বাধ্যতামূলকভাবে চলে আসা সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাসমূহের অন্যতম। সুন্দরী জন্মভূমির সঙ্গে ভালোবাসার অচ্ছেদ্যবন্ধনে আবদ্ধ একটি জীবন্ত, জাগ্ৰত মনুষ্যগোষ্ঠীকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলে দেওয়ার এই কাহিনী। কিন্তু পাঞ্জাবে যা ঘটেছিল, পূর্ববাংলায় তা ঘটেনি। এক প্রচণ্ড বিধ্বংসী হত্যালীলা ও জনবিনিময়ের দ্বারা জন্মভূমি থেকে দুই বিপুল মনুষ্যগোষ্ঠীকে স্বল্পকালের মধ্যে উপড়ে ফেলার কাজ সম্পন্ন হয়েছিল পাঞ্জাবে। কিন্তু বিভক্ত বাংলায় হিন্দু-মুসলমান-এই দুই মনুষ্যগোষ্ঠীর বিনিময় হয়নি। পূর্ব-পাকিস্তান থেকে চলে আসতে হয়েছিল শুধু হিন্দুদের। কিন্তু মুসলমানদের পূর্ব-পাকিস্তানে চলে যেতে হয়নি। পাঞ্জাবের মতো কোনো মহাপ্ৰলয় হয়নি বাংলায়। পূর্ব-পাকিস্তানের সব হিন্দুদের একসঙ্গে একই সময়ে উপড়ে ভারতে ছুড়ে দেওয়া হয়নি। কিন্তু পূর্ব-পাকিস্তান থেকে বাঙালি হিন্দুদের উপড়ে ফেলাটা একটা দীর্ঘকালব্যাপী যন্ত্রণাময় প্রক্রিয়া। দেশ বিভাজনের পর বাঙালি হিন্দুদের অবস্থা হয়েছিল ফাদে-পড়া জন্তুর মতো। হিন্দুদের ধনসম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তাদের বিতাড়নের জন্য মাঝে মাঝে সরকারি আমলাতন্ত্র ও মুসলমান জনসাধারণের যোগসাজশে একতরফা দাঙ্গা হয়েছে। আর হৃতসর্বস্ব বিধ্বস্ত মানুষের তরঙ্গ এসে এপারে আছড়ে পড়েছে। কখনো এই জনস্রোত এসেছে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ উন্মত্ত তরঙ্গের মতো; কখনো এসেছে ক্ষীণ ধারায়। কিন্তু কখনো তা থেমে থাকেনি।"

বইটি অবশ্য পাঠ্য।
 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2016. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com