সাম্প্রতিক বইসমূহ

সলিল চৌধুরী রচনাসংগ্রহ: প্রথম খণ্ড, গান

সলিল চৌধুরী রচনাসংগ্রহ: প্রথম খণ্ড, গান
সংকলন ও সম্পাদনা: সবিতা চৌধুরী, অন্তরা চৌধুরী, রণবীর নিয়োগী


সলিল চৌধুরীর সাংগীতিক প্রতিভা বা বহুমুখিতা এ আলোচনার পরিসরের বাইরে, তা নিয়ে কথা বলার জন্যও অর্জন করতে হয় অধিকার। এক পাঠক ও রসিক শ্রোতার দৃষ্টিতে যদি দেখা যায়, সলিল চৌধুরীর এই রচনাসংগ্রহের সূচনা জরুরি এক পদক্ষেপ, কারণ ভারতীয় ও বাংলা সংগীতের ইতিহাসে তাঁর স্থান যে অত্যন্ত উঁচুতে, সে নিয়ে সংশয় নেই কারও, তাই এহেন শিল্পীর যাবতীয় রচনা গ্রন্থ-আকারেও প্রকাশিত হওয়া উচিত, যেমন পাশ্চাত্য সংগীতের ক্ষেত্রে বেটোভেন বা মোজ়ার্ট-এর চিঠিপত্রও গ্রন্থিত হয় অতি যত্নে, নির্মিত হয় ‘দ্য বাখ রিডার’, আধুনিক শিল্পীদের মধ্যেও পাওয়া যায় সের্গেই প্রোকোফিয়েভ, এরিক সাতি, দারিউস মিলো, চার্লস আইভ্জ় প্রমুখর ডায়েরি, চিঠি, বিভিন্ন লেখাপত্র। এরকম উদাহরণ আরও অনেক রয়েছে, পাশ্চাত্য সংগীতের মায়েস্ত্রো-দের নিয়ে লেখা হয় কত না বই!

বিশিষ্ট গীত-রচয়িতা, বৈশিষ্ট্য-সম্পন্ন সুর-রচয়িতা, স্বকীয়তা-প্রতিষ্ঠ সংগীত-পরিচালক সলিল চৌধুরীর রচনাসংগ্রহ এক জরুরি পদক্ষেপ।
বাংলায় এ ধারাটি ক্ষীণ, যেসব বই আছে, তা অধিকাংশই দুষ্প্রাপ্য। অন্য ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত কিছু স্মৃতিচারণ বা ভাবনার বাইরে সংগীত-ইতিহাসের তেমন কিছু পাওয়া যায় না, তাই সলিল চৌধুরীর এই সংগ্রহ বাংলা সংগীতের দলিল হিসেবেও প্রয়োজনীয় বই কী! শুধু একটিই কথা- ‘এখানে থেমো না’! প্রথম খণ্ডে যা সংকলিত হয়েছে, তার বাইরেও সলিল চৌধুরী লিখেছেন অনেক, রয়েছে কবিতা, গল্প, আত্মকথা, নানা সাক্ষাত্‌কার ইত্যাদি। অবশ্য ‘সংকলকের পূর্বভাষ’-এ দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশের উল্লেখ করেছেন রণবীর নিয়োগী। আপাতত প্রথম খণ্ডের অন্তরে প্রবেশ করা যাক।


গানই রয়েছে বইয়ের মুখ্য ভাগ জুড়ে, সেইসঙ্গে সলিল চৌধুরীর লেখা চারটি প্রবন্ধও এখানে সংকলিত হয়েছে, যা অবশ্যই তাঁর রাজনৈতিক পরিবেশ সচেতন জাগরূক মন ও গভীর ব্যাপ্ত সংগীতবোধের পরিচায়ক। ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ অংশে নামের তালিকা দীর্ঘ- ইংরেজি, বাংলা, এমনকী হিন্দিতে লেখার কয়েকটি নিশ্চয়ই রচিত হয়েছে এই ‘রচনাসংগ্রহ’কে কেন্দ্র করে, যেমন অনুপ ঘোষাল, অভিজিত্‌ বন্দ্যোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, মান্না দে প্রমুখর রচনা, কয়েকটি অন্যান্য গ্রন্থ বা পত্রপত্রিকা থেকে নেওয়া, কিছু লেখা ‘সিলভার জুবিলি সেলিব্রেশনস: মিউজিক অফ সলিল চৌধুরী’ (১৯৭৬) স্মরণিকা থেকে সংগৃহীত। সে-তালিকায় রয়েছে আশা ভোঁসলে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মুকেশ, নৌসাদ, রাইচাঁদ বড়াল এবং পঙ্কজকুমার মল্লিকের নাম, যদিও শেষোক্ত ব্যক্তির লেখাটি এখানে অনুপস্থিত। অবশ্য আলোকচিত্রে পঙ্কজ মল্লিকের হাতে লেখা একটি চিঠির প্রতিলিপি মুদ্রিত হয়েছে। ‘যশস্বী ও জনপ্রিয়’ সলিল চৌধুরীকে তিনি লিখেছিলেন, ‘সঙ্গীত-শিল্পকলাক্ষেত্রে আপনি ত্রিশক্তিসমৃদ্ধ এক প্রখ্যাত ও কীর্তিমান পুরুষ। আপনি কাব্যলেখকরূপে বিশিষ্ট গীত-রচয়িতা, আপনি বৈশিষ্ট্য-সম্পন্ন সুর-রচয়িতা, আপনি স্বকীয়তা-প্রতিষ্ঠ সঙ্গীত-পরিচালক।’

কথা ও সুর সলিল চৌধুরী, এমন গান তো সংকলিত হয়েছেই, যেখানে শুধু সুর সলিল চৌধুরীর, সেগুলিও রেখেছেন সংকলক ‘পরিশিষ্ট’ অংশে। গানগুলির উল্লেখ অপ্রয়োজনীয়, তাঁর ভক্ত শ্রোতামাত্রেই জানেন ‘রেখো মা দাসেরে মনে’, ‘পালকির গান’, ‘রানার’ বা ‘উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা’-র কথা। অন্য বিভাগগুলি হল ‘গণ সংগীত ও গণ-চেতনার গান’, ‘আধুনিক গান’, ‘ছায়াছবির গান’ এবং ‘ছোটদের গান’।
গানের পরিচিতির পক্ষে এই ধরনের বিভাজনের হয়তো প্রয়োজন আছে, কিন্তু স্রষ্টা সলিল চৌধুরীর সামগ্রিক এক সত্তা ধরা পড়ে সব ধরনের গানেই। ঠিক এখানেই তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বজনীন শিল্পী, এক লহমায় উডি গাথরি, পিট সিগার-এর মতো মানুষের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া যায় আমাদের সলিল চৌধুরী বা হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে। এই বাঁধনটি অবশ্যই ধরা রয়েছে গানের কথায় বা লিরিকে। দু’-একটি উদাহরণ বক্তব্য স্পষ্ট করতে সহায়ক হবে।

সলিল চৌধুরীর লেজেন্ডারি গণসংগীতগুলি ‘ঘুম ভাঙার গান’ নামে সংকলিত হয়েছিল আশির দশকে। ‘ঢেউ উঠছে, কারা টুটছে’, ‘মানব না এ বন্ধনে’, ‘আমাদের নানান মতে নানান দলে দলাদলি’, ‘বিচারপতি তোমার বিচার’ বা ‘ও আলোর পথযাত্রী’র মতো গানগুলি চার-পাঁচের দশকে যেমন, এখনও ততখানিই জনপ্রিয় ও প্রাসঙ্গিক। সেই ‘ঘুম ভাঙার গান’-এর রেকর্ড কভারে সলিল চৌধুরী লিখেছিলেন, ‘বিভিন্ন সামাজিক অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক পটভূমিতে রচিত হলেও এই গানগুলির মূল উত্‌স এবং প্রেরণা হোল সব রকম দাসত্ব বন্ধন পীড়ন এবং শোষণ থেকে মুক্তির জন্য মানুষের সেই চিরন্তন প্রয়াস যা যুগ-যুগান্ত ধরে তাকে বুলেট ও ফাঁসির মুখোমুখি হতে সাহস জুগিয়েছে - সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের জন্ম দিয়েছে এবং পৃথিবীর এক বৃহদাংশে তার প্রয়োগ এবং প্রতিষ্ঠা সম্ভব করে তুলেছে।’ ‘প্রয়োগ এবং প্রতিষ্ঠা’ আজ ব্যর্থ, মানবিকতার অংশটুকু নয়। এই মানবিকতাই সলিল চৌধুরী (১৯২৫-১৯৯৫) ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন তাঁর যাবতীয় শিল্পকর্মে। তাই ‘এই সারাটা দেশ জুড়ে আমার ঘরবাড়ি’ মূলত ছোটদের জন্য লেখা গান হয়েও বৃহত্‌ এক পরিসর পেয়ে যায়, কিংবা কিশোরী-কণ্ঠেই শোনা যায়, ‘মন্ত্রীর কান, আনতে গেলে দিল্লি যেতে হবে!/... বলল কেঁদে নিন ফিরিয়ে আপনার টাকাটা-/ দিল্লি গিয়ে দেখি, ওদের সবার দু’কান কাটা!’


এবার যদি তাকানো যায় অন্য এক দেশে, আমরা দেখতে পাব ‘দিস ল্যান্ড ইজ় ইয়োর ল্যান্ড’-এর মতো অসাধারণ গানের স্রষ্টা উডি গাথরি (১৯১২-১৯৬৭) সেই তথাকথিত ছোটদের গান-এ ‘Why can’t a bird eat an elephant?/ Why, oh why, oh why?/ ’Cause an elephant’s got a pretty hard skin./ Goodby goodbye goodbye’-এর মতো নিপাট মজার লাইনের সঙ্গেই দিব্যি জুড়ে দিচ্ছেন, ‘What make the landlord take money?/ Why, oh why, oh why?/ I don’t know that one myself./ Good-bye goodbye goodbye’। সলিল চৌধুরী বহন করেছেন এই লিগ্যাসি, পাশ্চাত্যের ক্লাসিক্যাল, ফোক, জ্যাজ় প্রভৃতি ধারার সংগীতের উপর তাঁর যে যথেষ্ট দখল এবং জ্ঞান ছিল, সেটি স্পষ্ট হয় প্রবন্ধগুলি থেকে। তাই আলোচ্য গ্রন্থে সংযোজিত ‘সুর সৃষ্টি সম্পর্কে’, ‘আধুনিক ভারতীয় সংগীতে বিবর্তন’, ‘বিষয় : গণসংগীত’, ‘সমকালীন বাংলা তথা ভারতীয় সংগীতে পাশ্চাত্য সংগীত পদ্ধতির প্রভাব’ লেখাগুলি যেন হয়ে ওঠে সলিল চৌধুরীর গানেরই অবিচ্ছেদ্য করোলারি।


তাঁর গানে অর্কেস্ট্রেশন, মেলডি ও হারমনির প্রয়োগ, নানা বাদ্যযন্ত্রের বৈচিত্রপূর্ণ ব্যবহার থেকে সলিল চৌধুরীর উপর সমগ্র বিশ্বের সংগীতের প্রভাব লক্ষ করা যায়, একইসঙ্গে তা থেকে যায় ‘বিশিষ্ট’। এই শব্দটির উপর বিশেষ জোর দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, ভাষার মতো শব্দ এবং স্বরসমষ্টিও নির্ভর করে ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রতিবেশের উপর। সে কারণেই ভারতীয় সংগীত ইউরোপীয় সংগীতের চেয়ে বিশিষ্ট, এমনকী আরও সীমায়িত করা যায় এই সংজ্ঞা। অঞ্চল ভেদেও বদলে যায় সুরের আঙ্গিক।


সংগীত সম্পর্কে তাত্ত্বিক আলোচনা নিশ্চয়ই প্রয়োজন, কিন্তু শেষমেশ শ্রাব্য সংগীতই শেষকথা বলে, যেমন ভাবতেন সলিল চৌধুরী নিজেই- ‘সুরসৃষ্টি করা সম্পর্কে প্রবন্ধ লেখার চেয়ে সুরসৃষ্টি করা ঢের বেশি আনন্দদায়ক’।


লতা মঙ্গেশকর-এর ভূমিকায় সমৃদ্ধ এই গ্রন্থ। এর এক অন্যরকম আকর্ষণ থাকবে পাঠকের কাছে। গ্রন্থে ব্যবহৃত হয়েছে অনেক আলোকচিত্র। কত গুণী মানুষ যে জড়িয়ে ছিলেন সলিল চৌধুরীর জীবনে, এই ছবিগুলি তার প্রমাণ। আরও একটি বাড়তি পাওনা, সলিল চৌধুরীর নিজের আঁকা তিনটি চমত্‌কার পেন্টিং। এক পূর্ণ শিল্পীসত্তার সন্ধান দেয় এই গ্রন্থ।



সলিল চৌধুরী রচনাসংগ্রহ: প্রথম খণ্ড, গান
সংকলন ও সম্পাদনা: সবিতা চৌধুরী, অন্তরা চৌধুরী, রণবীর নিয়োগী
দে’জ পাবলিশিং
কল-৭৩ ।
আলোচ্য লেখাটি দেশ পত্রিকা থেকে সংকলিত
ছবিঃ আলোচ্য বইটি থেকে সংগ্রহিত।
বইটির কিছু পাতা পড়া যাচ্ছে না, এই জন্য আমরা আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।

কালি ও কলম - ছোটগল্প সংখ্যা

amarboi
কালি ও কলম - ছোটগল্প সংখ্যা
চতুর্দশ বর্ষ . পঞ্চম - ষষ্ঠ সংখ্যা . আষাঢ়-শ্রাবণ ১৪২৪

সূচনাকাল থেকেই বাংলা ছোটগল্প জীবনের বহুকৌণিক দিকের উন্মোচন করে চলেছে। বিসত্মৃত পরিসর ও পটভূমি নিয়ে জীবনের নানা অনুষঙ্গ ছোটগল্পে প্রতিফলিত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর রচিত ছোটগল্পে মননধর্মিতার সঙ্গে সাধারণ লোকজীবন-উপলব্ধিকে যে প্রসারিত চেতনায় বিসত্মৃত করেছিলেন, তা বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে। তিনি বাংলা ছোটগল্পে প্রকরণ ও শৈলী নির্মাণেরও প্রধান পুরুষ। তাঁর মতো করে জীবনের বহু দিক তাঁর সমসাময়িকদের আর কেউ প্রতিফলিত করতে পারেননি। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের চেতনাধারায় স্নাত হয়ে গল্পের ভুবন আরো সমৃদ্ধ ও বিচিত্র বৈভবে ঋদ্ধ হয়ে উঠেছিল। এই সময়ে মার্কসবাদী কয়েকজন গল্পকার এমনসব গল্প লিখেছিলেন যা ছিল জীবনচেতনার দিক থেকে অতল এবং নবীন জিজ্ঞাসার বিচ্ছুরণে দীপ্ত।

গত শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে বাংলাদেশের ছোটগল্পও নানাভাবে সমৃদ্ধ হতে থাকে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বাংলাদেশে যেসব ছোটগল্প রচিত হয়েছিল তা ছিল জীবনের উত্তাপলগ্ন। এসব গল্পের মধ্যে গ্রামীণ ও নাগরিক মানুষের বৃহত্তর জীবনসংগ্রাম ও বেঁচে থাকার আর্তি প্রতিফলিত হয়েছিল। প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন নানা দৃষ্টিকোণ থেকে উঠে এসেছিল। এই সময়ে জীবনের নানা অনুষঙ্গকে ধারণ করে গল্পকারগণ এক সমৃদ্ধ ভুবন নির্মাণে ব্রতী হয়েছিলেন। সামরিক শাসন, প্রথার কর্তৃত্ব এবং বৈরী রাজনৈতিক বাস্তবতা কথাসাহিত্যের সৃজনধারাকে ব্যাহত করতে পারেনি। এ-অঞ্চলের নদী, মাটি ও মানুষের সঙ্গে ছোটগল্পকারদের নিবিড় সংযোগের ফলে এবং বোধ ও বুদ্ধির প্রয়োগে ছোটগল্প তার বৈশিষ্ট্য নিয়ে উজ্জ্বল হতে থাকে।

চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশক থেকে এক অঙ্গীকার নিয়ে প্রাস্তিক ও ব্রাত্য মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং বেঁচে থাকার অধিকার ও আর্তি নবীন মাত্রা অর্জন করে। পাশাপাশি, ছোটগল্পে মানবমনের অবচেতন দিকগুলোও উন্মোচিত হতে থাকে। অবচেতন মনের জটিল অলিগলির প্রতিফলন পাঠককে দেয় নতুন ভুবনের সন্ধান, জীবন-উপলব্ধির ক্ষেত্রে অভিনব জিজ্ঞাসারও জন্ম দেয়। বাংলা সাহিত্যে এ হয়ে ওঠে নতুন এক সৌধ।

ষাটের দশকে এই অঞ্চলের বাঙালির সংগ্রামী চেতনা ও বাঙালিত্বের সাধনা যখন স্বদেশনির্মাণের আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেল, তখন থেকে ছোটগল্পের স্বরূপও পালটাতে থাকে। রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও জীবনের নানা সূক্ষ্ম সংবেদনশীল দিকের উন্মোচন পাঠকের অভিজ্ঞতার দিগন্তকে বিসত্মৃত করে। মনন ও শিল্পের দিক থেকে নতুন বেগ সঞ্চারিত হয় ছোটগল্পে। ছোটগল্পের সৃজনভূমি হয়ে ওঠে জীবন-অভিজ্ঞতার মনোগ্রাহী দলিল।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাংলাদেশের ছোটগল্পকারদের মানসভুবনকেও নানা দিক থেকে সমৃদ্ধ করে। মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে ছোটগল্প রচিত হয়।

বাংলাদেশের ছোটগল্পের ভুবনে বর্তমানে নবীন বেশ কয়েকজন গল্পকারের আবির্ভাব আমাদের আশান্বিত করে। সমকালীন জীবনচেতনা ও সংগ্রামও প্রতিফলিত হচ্ছে তাঁদের সৃষ্টিতে।

কালি ও কলম জন্মলগ্ন থেকে যত্নের সঙ্গে নানা ধারার ছোটগল্পের পরিচর্যা করে আসছে। দেখা যায়, বাংলাদেশের নবীন গল্পকারদের রচনায় জীবনের নানাদিক রূপায়ণের প্রয়াস ছোটগল্পের সম্ভাবনাকেই তুলে ধরছে। কালি ও কলম প্রবর্তন করেছে নবীন কবি ও লেখক পুরস্কার। নবীনদের সৃজন উৎকর্ষে ও সৃজনে এই পুরস্কার প্রভাব ফেলেছে; আমরা ভালো বোধ করেছি এদেশের ছোটগল্পে একই সঙ্গে উজ্জ্বল শিল্পচৈতন্যের বিকাশ দেখে। এ-সংখ্যায় আমরা বাংলাদেশের ছোটগল্পের সেই চর্চা ও সম্ভাবনাকে ধরে রাখতে চেয়েছি। আমরা চেষ্টা করেছি সংখ্যাটিকে সমৃদ্ধ করতে। বিশেষ গুরুত্ব ও প্রাধান্য দিয়েছি নবীন ছোটগল্পকারদের রচনার প্রতি। তাঁদের মধ্যে যে-প্রাণশক্তি, বিশ্বস্ত জীবনচেতনা, সমাজ-অঙ্গীকার ও প্রতিকূলতাকে অতিক্রমণের ঐকাস্তিক প্রয়াস আমরা প্রত্যক্ষ করছি তা ভাবী গল্পের ভুবনকে সমৃদ্ধ করবে - এ-ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত।

এই সংখ্যাটি পঞ্চম-ষষ্ঠ যুগ্ম সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হলো।

দাস্তাম্বু : সিপাহি বিদ্রোহের রোজনামচা জাফর আলম (অনুবাদ) , মির্জা গালিব

amarboi দাস্তাম্বু : সিপাহি বিদ্রোহের রোজনামচা জাফর আলম (অনুবাদ) , মির্জা গালিব

সিপাহি বিদ্রোহ মির্জা গালিবের জীবন তছনছ করে দেয়। এই বিদ্রোহের অভিঘাত-সৃষ্ট রাজনৈতিক আলোড়ন নানাভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি। সেই সব দিনের ধারাবাহিক বিবরণ বিধৃত হয়েছে তাঁর এই রোজনামচায়। একই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর দুঃসহ জীবনেরও দিনপঞ্জি।
Download and Comments/Join our Facebook Group

কারাগারের রোজানামচা - শেখ মুজিবুর রহমান

কারাগারের রোজানামচা - শেখ মুজিবুর রহমান
কারাগারের রোজানামচা - শেখ মুজিবুর রহমান

কারাগারের জীবন

ভাষা আন্দোলন বঙ্গবন্ধু শুরু করেন ১৯৪৮ সালে । ১১ই মার্চ বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন এবং গ্রেফতার হন । ১৫ই মার্চ তিনি মুক্তি পান। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সমগ্ৰ দেশ সফর শুরু করেন। জনমত সৃষ্টি করতে থাকেন। প্রতি জেলায় সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলেন । ১৯৪৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর তৎকালীন সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ফরিদপুরে গ্রেফতার করে। ১৯৪৯ সালের ২১শে জানুয়ারি মুক্তি পান। মুক্তি পেয়েই আবার দেশব্যাপী জনমত সৃষ্টির জন্য সফর শুরু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাবির প্রতি তিনি সমর্থন জানান এবং তাদের ন্যায্য দাবির পক্ষে আন্দোলনে অংশ নেন । সরকার ১৯৪৯ সালের ১৯শে এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে । জুলাই মাসে তিনি মুক্তি পান । এইভাবে কয়েক দফা গ্রেফতার ও মুক্তির পর ১৯৪৯ সালের ১৪ই অক্টোবর আর্মানিটােলা ময়দানে জনসভা শেষে ভুখা মিছিল বের করেন। দরিদ্র মানুষের খাদ্যের দাবিতে ভুখা মিছিল করতে গেলে আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন ।

এবারে তাকে প্রায় দু’বছর পাঁচ মাস জেলে আটক রাখা হয়। ১৯৫২ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর জেল থেকে মুক্তি লাভ করেন ।

১৯৫৪ সালের ৩০শে মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে করাচি থেকে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করে গ্রেফতার হন এবং ২৩শে ডিসেম্বর মুক্তি লাভ করেন।

১৯৫৮ সালের ১২ই অক্টোবর তৎকালীন সামরিক সরকার কর্তৃক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয় । এবারে প্রায় চৌদ্দ মাস জেলখানায় বন্দি থাকার পর তাকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় জেল গোটেই গ্রেফতার করা হয় । ১৯৬০ সালের ৭ই ডিসেম্বর হাইকোর্টে রিট আবেদন করে মুক্তি লাভ করেন।

১৯৬২ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি আবার জননিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হয়ে তিনি ১৮ই জুন মুক্তি লাভ করেন ।
১৯৬৪ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ১৪ দিন পূর্বে তিনি আবার গ্রেফতার হন ।

১৯৬৫ সালে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও আপত্তিকর বক্তব্য প্রদানের অভিযোগে মামলা দায়ের করে তাকে এক বছরের কারাদণ্ড প্ৰদান করা হয় । পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টের নির্দেশে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান ।

১৯৬৬ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলসমূহের জাতীয় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি পেশ করেন । ১লা মার্চ তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন ।
তিনি যে ছয় দফা দাবি পেশ করেন তা বাংলার মানুষের বাঁচার দাবি হিসেবে করেন, সেখানে স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপন করেন যার অন্তর্নিহিত লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ।

একের পর এক দাবি নিয়ে জনগণের অধিকারের কথা বলার কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের প্রথম তিন মাসে ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোহর, ময়মনসিংহ, সিলেট, খুলনা, পাবনা, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন শহরে আটবার গ্রেফতার হন ও জামিন পান । নারায়ণগঞ্জে সর্বশেষ মিটিং করে ঢাকায় ফিরে এসেই ৮ই মে মধ্য রাতে গ্রেফতার হন । তাঁকে কারাগারের অন্ধকার কুঠুরিতে জীবন কাটাতে হয়। শোষকগোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়েছেন, বাংলাদেশের মানুষের ন্যায্য দাবি তুলে ধরেছেন। ফলে যখনই জনসভায় বক্তৃতা করেছেন তখনই তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে গ্রেফতার করেছে সরকার ।

১৯৬৮ সালের ৩রা জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এক নম্বর আসামি করে মোট ৩৫ জন বাঙালি সেনা ও সিএসপি অফিসারের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ এনে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে ।

১৮ই জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে জেলগেট থেকে পুনরায় গ্রেফতার করে তাকে ঢাকা সেনানিবাসে কঠোর নিরাপত্তায় বন্দি করে রাখে |

পাঁচমাস পর ১৯শে জুন ঢাকা সেনানিবাসে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামিদের বিচার কাজ শুরু হয় । ১৯৬৯ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি জনগণের অব্যাহত প্রবল চাপের মুখে কেন্দ্রীয় সরকার আগরতলা মুক্তিদানে বাধ্য হয়। কারণ, পূর্ববাংলার জনগণের সর্বাত্মক আন্দোলন এতই উত্তাল হয়ে উঠে যে, তাতে শুধু বিশাল গণঅভ্যুত্থানই না স্বৈরসামরিক শাসক আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন বাংলার জনগণের আপোষহীন অকুতোভয় নেতা ।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে সমগ্ৰ পাকিস্তানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিপুল জয় লাভ করে মেজরিটি পায় । কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক শাসক সরকার গঠন করতে দেয় না । ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন এবং বাংলার মানুষ তার কথায় সাড়া দেয় । তার নির্দেশেই এ দেশ পরিচালিত হতে থাকে । ৭ই মার্চ তিনি রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্ৰাম’ । হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্ৰ গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়ার আহবান জানান। সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ মানসিকভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হয় । ২৫শে মার্চ কালরাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সশস্ত্ৰ আক্রমণ চালায় এবং গণহত্যা শুরু করে ।

২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাবার আহবান জানান । এই ঘোষণার সাথে সাথেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাকে ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায় এবং কারাগারে বন্দি করে রাখে । সমগ্র বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় । হানাদার বাহিনীর এই দমন পীড়ন ও পোড়ামাটি নীতি এবং গণহত্যা চালিয়ে বাঙালি জাতিকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে । এরই একটি পর্যায়ে আমরা এক মাসে ১৯ বার জায়গা বদল করেও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পাই নাই, আমরা ধরা পড়ে গেলাম ।

আমার মা বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিব, আমার ভাই লে. শেখ জামাল, বোন শেখ রেহানা, ছোট ভাই শেখ রাসেল, আমি ও আমার স্বামী ড. ওয়াজেদকে ধানমন্ডি ১৮ নম্বর সড়কে একটি একতলা বাড়িতে বন্দি করে রাখা হলো ।

এক সময়ে পাকিস্তানি হানাদার শাসকগোষ্ঠী তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে সবকিছু স্বাভাবিক চলছে ঘোষণা দিল । স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালত সবই ঠিকঠাক আছে । সমগ্ৰ বিশ্বকেই তারা দেখাতে চাইল যে এই ভূখণ্ডে ‘মিসক্রিয়োনট’দের তারা দমন করে ফেলেছে আর কোনো সমস্যা নাই, পাকিস্তান ‘খতরা’ থেকে বের হয়ে এসেছে, আল্লাহ্ পাকিস্তানকে রক্ষা করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেখাতে চেষ্টা করে বাংলাদেশের সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণে এসে গেছে।

১ম বার খাতাগুলি উদ্ধার

এই সময়ে এক মেজর সাহেব এসে বলল, “বাচ্চা লোগ ‘সুকুল’ মে যাও” (বাচ্চারা স্কুলে যাও) । ড. ওয়াজেদ পাকিস্তান অ্যাটমিক এনার্জিতে চাকরি করতেন বলে তিনি নিয়মিত অফিসে যেতে পারতেন । ফলে বাইরে যাবার কিছু সুযোগ ছিল এবং যেহেতু এটা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের সাথে সম্পৃক্ত তাই যুদ্ধের সময়ও কিছু ছাড় পেতো। তাকে নিয়মিত অফিসে যেতে হতো আর সময়মতো ফিরতে হতো। তবে হানাদার বাহিনী সব সময় নজরদারিতে রাখত ।

যাহোক স্কুলে যাবে বাচ্চারা, জামাল, রেহানা আর রাসেল। আমি বললাম বই খাতা কিছুই তো নাই, কী নিয়ে স্কুলে যাবে আর যাবেই বা কীভাবে? জিজ্ঞেস করল বই কোথায়? বললাম, আমাদের বাসায়, আর সে বাসা তো আপনাদের দখলে আছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে বাসা ।

বলল, “ঠিক হ্যায় হাম লে যায়গে; তোম লোগ কিতাব লে আনা ।”
ওরা ঠিক করল জামাল, রেহানা, রাসেলকে নিয়ে যাবে যার যার বই আনতে । আমি বললাম, আমি সাথে যাব। কারণ একা ওদের সাথে আমি আমার ভাইবোনদের ছাড়তে পারি না । তারা রাজি হলো ।

আমার মা আমাকে বললেন, “একবার যেতে পারলে আর কিছু না হোক তোর আকবার লেখা খাতাগুলো যেভাবে পারিস নিয়ে আসিস ।” খাতাগুলো মার ঘরে কোথায় রাখা আছে তাও বলে দিলেন । আমাদের সাথে মিলিটারির দুইটা গাড়ি ও ভারী অস্ত্ৰসহ পাহারাদার গেল ।

২৫শে মার্চের পর এই প্রথম বাসায় ঢুকতে পারলাম। সমস্ত বাড়িতে লুটপাটের চিহ্ন, সব আলমারি খোলা, জিনিসপত্র ছড়ানো ছিটানো । বাথরুমের বেসিন ভাঙী, কাচের টুকরা ছড়ানো, বীভৎস দৃশ্য!

অথবা লুট হয়েছে। কিছু তো নিতেই হবে। আমরা এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যাই, পাকিস্তান মিলিটারি আমাদের সাথে সাথে যায়। ভাইবোনদের বললাম, যা পাও বইপত্র হাতে হাতে নিয়ে নেও ।

আমি মায়ের কথামতো জায়গায় গেলাম । ড্রেসিং রুমের আলমারির উপর ডান দিকে আব্বার খাতাগুলি রাখা ছিল, খাতা পেলাম। কিন্তু সাথে মিলিটারির লোক, কী করি? যদি দেখার নাম করে নিয়ে নেয়। সেই ভয় হলো । যাহােক অন্য বই খাতা কিছু হাতে নিয়ে ঘুরে ঘুরে একখানা গায়ে দেবার কাঁথা পড়ে থাকতে দেখলাম, সেই কাঁথাখানা হাতে নিলাম, তারপর এক ফাঁকে খাতাগুলি ঐ কাথায় মুড়িয়ে নিলাম। সাথে দুই একটা বই ম্যাগাজিন পড়েছিল তাও নিলাম ।

আমার মায়ের হাতে সাজানো বাড়ির ধ্বংসস্তুপ দেখে বার বার চোখে পানি আসছিল। কিন্তু নিজেকে শক্ত করলাম। খাতাগুলি পেয়েছি। এইটুকু বড় সাস্তুনা । অনেক স্মৃতি মনে আসছিল।
যখন ফিরলাম মায়ের হাতে খাতাগুলি তুলে দিলাম। পাকিস্তানি সেনারা সমস্ত বাড়ি লুটপাট করেছে, তবে রুলটানা এই খাতাগুলিকে গুরুত্ব দেয় নাই বলেই খাতাগুলি পড়েছিল ।

আব্বার লেখা এই খাতার উদ্ধার আমার মায়ের প্রেরণা ও অনুরোধের ফসল। আমার আব্বা যতবার জেলে যেতেন মা খাতা, কলম দিতেন লেখার জন্য । বার বার তাগাদা দিতেন । আমার আব্বা যখন জেল থেকে মুক্তি পেতেন মা সোজা জেল গেটে যেতেন আকবাকে আনতে আর আকবার লেখাগুলি যেন আসে তা নিশ্চিত করতেন । সেগুলি অতি যত্নে সংরক্ষণ করতেন ।

খাতাগুলি তো পেলাম, কিন্তু কোথায় কীভাবে রাখব?

ঢাকার আরামবাগে আমার ফুফাতো বোন মাখন আপা থাকতেন। তার স্বামী মীর আশরাফ আলী, আব্বার সঙ্গে কোলকাতা থেকেই রাজনীতি করতেন, যেভাবেই হোক তার কাছেই পাঠাবো সিদ্ধান্ত নিলাম । অবশেষে অনেক কষ্ট করে তার কাছে পাঠালাম । আমার বিশ্বাস তিনি যত্ন করে রাখবেন । কীভাবে যে পাঠিয়েছি সে কথা লিখতে গেলে আর এক ইতিহাস হয়ে যাবে, এ বিষয়ে পরে লিখব ।

আমার ফুফাতো বোন পলিথিন ও ছালার চট দিয়ে খাতাগুলো বেঁধে তার মুরগির ঘরের ভিতরে চালের সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে বুলিয়ে রেখেছিলেন, যাতে কখনও কেউ বুঝতে না পারে। কারণ পাকিস্তানি আর্মি সব সময় হঠাৎ হঠাৎ যে কোনো বাড়ি সার্চ করত। তবে ঐ বাড়ির সুবিধা ছিল যে আরামবাগ গলির ভিতর গাড়ি ঢুকতে পারত না ।

স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের পর সেই খাতাগুলি আমার বোন ও দুলাভাই মায়ের হাতে পৌছে দেন। বৃষ্টির পানিতে কিছু নষ্ট হলেও মূল খাতাগুলি মােটামুটি ঠিক ছিল।

২য় বার খাতা উদ্ধার

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয় | জীবিত কোনো সদস্য ছিল না। সকল সদস্যকেই এই বাড়িতে হত্যা করা হয়েছিল। আমার মা বেগম ফজিলাতুননেছা, ও লে. শেখ জামাল, ছোট ভাই শেখ রাসেল, কামাল ও জামালের নব পরিণীতা স্ত্রী সুলতানা ও রোজী, বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব কর্নেল জামিল, পুলিশের দু’জন উধ্বতন কর্মকর্তাসহ ১৮ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে । এর পর থেকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িটি সরকারি দখলে থাকে ।

আমি ও আমার ছোটবোন রেহানা দেশের বাইরে ছিলাম । ৬ বছর বাংলাদেশে ফিরতে পারি নাই । ১৯৮১ সালে যখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আমাকে সভাপতি নির্বাচিত করে আমি অনেক বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে দেশে ফিরে আসি ।

দেশে আসার পর আমাকে বিএনপি সরকার আমাদের এই বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি । বাড়ির গেটের সামনে রাস্তার উপর বসে মিলাদ পড়ি ।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর বাড়িঘর লুটপাট করে সেনাসদস্যরা। কী দুর্ভাগ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সেনারা জাতির পিতাকে হত্যা করে । তিনি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি । আর জাতির পিতা ও রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় তাঁকে মৃত্যুবরণ করতে হলো ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে ।

জেনারেল জিয়াউর রহমান তখন ক্ষমতা দখল করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। মে মাসের ৩০ তারিখ জিয়ার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর ১২ই জুন বাড়িটা আমার হাতে হস্তান্তর করে। প্রথমে ঢুকতে পা থেমে গিয়েছিল । জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম ।

যখন হুঁশ হয়, আমাকে দিয়ে অনেকগুলি কাগজ সই করায় । কী দিয়েছে জানি না। যখন আমার পুরোপুরি জ্ঞান ফিরে আসে তখন আমার মনে পড়ে আব্বার লেখা খাতার কথা, আমি হেঁটে আব্বার শোবার ঘরে ঢুকি | ড্রেসিং রুমে রাখা আলমারির দক্ষিণ দিকে হাত বাড়াই। ধূলিধূসর বাড়ি। মাকড়সার জলে ভরা তার মাঝেই খুঁজে পাই অনেক আকাঙ্ক্ষিত রুলটানা খাতাগুলি ।

আমি শুধু খাতাগুলি হাতে তুলে নিই। আব্বার লেখা ডায়েরি, মায়ের বাজার ও সংসার খরচের হিসাবের খাতা ।

আব্বার লেখাগুলি পেয়েছিলাম। এটাই আমার সব থেকে বড় পাওয়া, সব হারাবার ব্যথা বুকে নিয়ে এই বাড়িতে একমাত্র পাওয়া ছিল এই খাতাগুলি । খুলনায় চাচির বাসায় খাতাগুলি রেখে আসি, চাচির ভাই রবি মামাকে দায়িত্ব দেই, কারণ ঢাকায় আমার কোনো থাকার জায়গা ছিল না, কখনো ছোট ফুফুর বাসা, কখনো মেজো ফুফুর বাসায় থাকতাম ।

লেখাগুলি প্ৰকাশ করার কাজ শুরু

খাতাগুলি প্রকাশ করার উদ্যোগ নিই। ড. এনায়েতুর রহিমের সঙ্গে আমি ও বেবী বই নিয়ে কাজ করতে শুরু করি, তিনি আমেরিকার জর্জ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর । তার পরামর্শমতো কাজ করি ।

খাতাগুলি জেরোক্স কপি করে ও ফটোকপি করে একসেট রেহানার কাছে রাখি । বেবী টাইপ করানোর দায়িত্ব নেয়।

ড. এনায়েতুর রহিম ও তাঁর স্ত্রী জয়েস রহিম অনুবাদ করতে শুরু করেন। তিনি সবগুলি খাতা অনুবাদ করে দেন ।

কিন্তু ২০০২ সালে তিনি হঠাৎ করে মৃত্যুবরণ করেন। আমাদের কাজ থেমে যায়।

এরপর ঐতিহাসিক প্রফেসর সালাহউদ্দীন সাহেবের পরামর্শে কাজ শুরু করি ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর সামসুল হুদা হারুন, বাংলা একাডেমির শামসুজ্জামান খান, বেবী মওদুদ ও আমি বসে কাজ শুরু করি। নিনু বাংলায় কম্পিউটার টাইপ করে দেয়, রহমান (রমা) কে দিয়ে ফটোকপি করার কাজ করি । বাড়িতেই আলাদা ফটোকপি মেশিন ক্রয় করি ।

২০০৭ সালে বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা দেয়া হয় এবং আমাকে গ্রেফতার করে কারাগারে বন্দি করে । ২০০৮ পর্যন্ত বন্দি ছিলাম । আমি বন্দি থাকা অবস্থায় প্রফেসর ড. হারুন মৃত্যুবরণ করেন । এই খবর পেয়ে আমি খুব দুঃখ পাই এবং চিন্তায় পড়ে যাই যে কীভাবে আব্বার বইগুলো শেষ করব । জেলখানায় বসেই আমি অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ভূমিকাটা লিখে রাখি। ২০০৮ সালে মুক্তি পেয়ে আবার আমরা বই প্রকাশের কাজে মনোনিবেশ করি ।

এই খাতাগুলির মধ্য থেকে ইতিমধ্যে অসমাপ্ত আত্মজীবনী প্ৰকাশ করা হয়েছে। সেই খাতাগুলি ফেরত পাবার ঘটনা আমি ঐ বইয়ের ভূমিকায় লিখেছি।

এরপর আমরা আব্বার ডায়েরি, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, স্মৃতিকথা এবং চীন ভ্ৰমণ নিয়ে কাজ শুরু করি । আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার উপর প্রফেসর এনায়েতুর রহিম সাহেব বেশ কিছু গবেষণা করে যান এবং সেটাও প্রকাশের জন্য আমরা কাজ করতে থাকি ।

অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, ২০১৩ সালে বেবী মওদুদ মৃত্যুবরণ করেন। আমি বড় একা হয়ে যাই । যাহোক বেবী বেঁচে থাকতেই আমরা অসমাপ্ত আত্মজীবনী যেটা ড. ফকরুল ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিয়েছেন সেটা আমরা প্রকাশ করেছি। যা ইতোমধ্যে বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। আমরা ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত লেখা ডায়েরি বই আকারে প্রকাশ করবার প্রস্তুতি নিয়েছি। অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রতিটি লেখা বারবার পড়ে সংশোধন করে দিয়েছেন ।

কারাগারের রোজানামচা

বর্তমান বইটার নাম ছোট বোন রেহানা রেখেছে-‘কারাগারের রোজনামচা’ । এতটা বছর বুকে আগলে রেখেছি যে অমূল্য সম্পদ-আজ তা তুলে দিলাম বাংলার জনগণের হাতে ।

ড. ফকরুল আলমের অনুবাদ করে দেওয়া ইংরেজি সংস্করণের কাজ এখনও চলছে।

১৯৬৬ সালে ৬ দফা দেবার পর বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা গ্রেফতার হন । ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত বন্দি থাকেন । সেই সময়ে কারাগারে প্রতিদিনের ডায়েরি লেখা শুরু করেন । ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত লেখাগুলি এই বইয়ে প্ৰকাশ করা হলো ।

একই সাথে আর একটি খাতা খুঁজে পাই-তারও ইতিহাস রয়েছে। ১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর আইয়ুব খান মার্শল ল' জারি করে ১২ই অক্টোবর আব্বাকে গ্রেফতার এবং তার রাজনীতি নিষিদ্ধ করে দেয় । এরপর ১৯৬০ সালের ডিসেম্বর মাসে যখন কারাগার থেকে মুক্তি পান তখন তাঁর লেখা খাতাগুলির মধ্যে দুইখানা খাতা সরকার বাজেয়াপ্ত করে । এই খাতাটা তার মধ্যে একখানা, যা আমি ২০১৪ সালে খুঁজে পেয়েছি। SB'র কাছ থেকে পাওয়া এই খাতাটা । S. B. (Special Branch) এর অফিসাররা খুবই কষ্ট করে খাতাখানা খুঁজে দিয়েছেন, তাই তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এই খাতাটা আরও আগের লেখা । সেই বন্দি থাকা অবস্থায় এই খাতাটায় তিনি জেলখানার ভিতরে অনেক কথা লিখেছিলেন । এই লেখার একটা নামও তিনি দিয়েছিলেন :

থালা বাটি কম্বল
জেলখানার সম্বল ।

এই লেখার মধ্য দিয়ে কারাগারের রোজনামচা পড়ার সময় জেলখানা সম্পর্কে পাঠকের একটা ধারণা হবে । আর এই লেখা থেকে জেলের জীবনযাপন এবং কয়েদিদের অনেক অজানা কথা, অপরাধীদের কথা, কেন তারা এই অপরাধ জগতে পা দিয়েছিল সেসব কথা জানা যাবে ।

জেলখানায় সেই যুগে অনেক শব্দ ব্যবহার হতো। এখন অবশ্য সেসব অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। তারপরও মানুষ জানতে পারবে বহু অজানা কাহিনি ।

৬ দফা দাবি পেশ করে যে প্রচার কাজ তিনি শুরু করেছিলেন। সেই সময় তাকে গ্রেফতার করা হয় ।

তাঁর গ্রেফতারের পর তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি, পত্র-পত্রিকার অবস্থা, শাসকদের নির্যাতন, ৬ দফা বাদ দিয়ে মানুষের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা ইত্যাদি বিষয় তিনি তুলে ধরেছেন। মানুষের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন ও সংগ্রাম তিনি করেছেন যার অন্তর্নিহিত লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতা অর্জন |

বাংলার মানুষ যে স্বাধীন হবে এ আত্মবিশ্বাস বার বার তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে। এত আত্মপ্রত্যয় নিয়ে পৃথিবীর আর কোনো নেতা ভবিষ্যদবাণী করতে পেরেছেন কিনা আমি জানি না ।

ধাপে ধাপে মানুষকে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করেছেন। উজীবিত করেছেন।

৬ দফা ছিল সেই মুক্তি সনদ, সংগ্রামের পথ বেয়ে যা এক দফায় পরিণত হয়েছিল, সেই এক দফা স্বাধীনতা । অত্যন্ত সুচারুরূপে পরিকল্পনা করে প্রতিটি পদক্ষেপ তিনি গ্ৰহণ করেছিলেন। সামরিক শাসকগোষ্ঠী হয়তো কিছুটা ধারণা হার মানতে বাধ্য হয়েছিল ।

৬ দফাকে বাদ দিয়ে কারা ৮ দফা করে আন্দোলন ভিন্নখাতে নিয়ে যাবার চেষ্টা হয়েছিল, সে কাহিনিও এই লেখায় পাওয়া যাবে।

দীর্ঘ কারাবাসের ফলে তাঁর শরীর যে মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে যেত। তিনি সে কথা আমাদের কখনো জানতে দেন নাই। আমি এই ডায়েরিটা পড়বার পর অনেক অজানা কথা জানার সুযোগ পেয়েছি। ভীষণ কষ্ট হয় যখন দেখি অসুস্থ-সেবা করার কেউ নেই, কারাগারে একাকী বন্দি অর্থাৎ Solitary confinement. কখনো কোনো বন্দিকে এক সপ্তাহের বেশি একাকী রাখতে পারে না । যদি কেউ কোনো শাস্তি পায়, সেই শাস্তি হিসেবে এই এক সপ্তাহ রাখতে পারে। কিন্তু বিনা বিচারেই তাকে একাকী কারাগারে বন্দি করে রেখেছিল । তার অপরাধ ছিল তিনি বাংলার মানুষের অধিকারের কথা বার বার বলেছেন ।

বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চেয়েছেন; ক্ষুধা, দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছেন । বাংলার শোষিত বঞ্চিত মানুষকে শোষণের হাত থেকে মুক্তি দিয়ে উন্নত জীবন দিতে চেয়েছেন ।

গাছপালা, পশু-পাখি, জেলখানায় যারা অবাধে বিচরণ করতে পারত। তারাই ছিল একমাত্র সাথি । এক জোড়া হলুদ পাখির কথা কী সুন্দরভাবে তাঁর লেখনীতে ফুটে উঠেছে তা আমি ভাষায় বর্ণনা করতে পারব না। একটা মুরগি পালতেন, সেই মুরগিটা সম্পর্কে চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। ঐ মুরগিটার মৃত্যু তাকে কতটা ব্যথিত করেছে সেটাও তিনি তুলে ধরেছেন অতি চমৎকারভাবে ।
কারাগারে আওয়ামী লীগের নেতা-কমীদের দুঃখ দুৰ্দশা নিয়ে তাঁর উদ্বেগ-দলের প্রতিটি সদস্যকে তিনি কতটা ভালোবাসতেন, তাদের কল্যাণে কত চিন্তিত থাকতেন সেকথাও অকাতরে বলেছেন । তিনি নিজের কষ্টের কথা সেখানে বলেন নাই। শুধু একাকী থাকার কথা বার বার উল্লেখ করেছেন ।

জেলখানায় পাগলা গারদ আছে তার কাছেরই সেলে তাকে বন্দি রাখা হয়েছিল । সেই পাগলদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না তাদের আচার-আচরণ অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে তিনি তুলে ধরেছেন । এদের কারণে রাতের পর রাত ঘুমাতে পারতেন না । কষ্ট হতো। কিন্তু নিজের কথা না বলে তাদের দুঃখের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। মানবদরদি নেতা ছাড়া বোধহয় এই বর্ণনা দেওয়া আর কারো পক্ষে সম্ভব নয় ।

কী অস্বাভাবিক অবস্থার মধ্য দিয়ে আমাদের জীবন চলত তা তিনি বুঝতেন, কিন্তু আমার মায়ের ওপর ছিল অগাধ বিশ্বাস । আমার দাদা-দাদি সময় সময় ছেলেকে উৎসাহ দিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন । বাবা-মায়ের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ এই লেখায় পাওয়া যায়। যত বয়সই হোক আর যত বড় নেতাই তিনি হন, তিনি যে বাবা মায়ের আদরের ‘খোকা’ সে কথাটা আমরা উপলব্ধি করি যখন তিনি বাবা মায়ের কথা লিখেছেন । গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পিতা-মাতার প্রতি প্ৰদৰ্শন খুব কম লোক দেখাতে পারেন। তার উপর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে জেল থেকে বের হয়ে বাবা মাকে দেখতে পারবেন। কিনা, কারণ তাদের বয়স হয়েছে। সবকিছু ছাপিয়ে দেশ ও দেশের মানুষ ছিল সর্বোচ্চ স্থানে। আর এই দায়িত্ব পালনে পরিবারের সমর্থন সবসময় তিনি পেয়েছেন। এত আত্মত্যাগ করেছেন বলেই তাে আজ পৃথিবীর বুকে বাঙালি জাতি একটা রাষ্ট্র পেয়েছে। এই তুলনাহীন অর্জনের জন্যেই তিনি আজ এই জাতির পিতা । জাতি হিসেবে আতপরিচয় পেয়েছে । বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেয়েছে।

১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসের ১৮ তারিখ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়। একাকী একটা ঘরে দীর্ঘদিন বন্দি থাকেন। একটা ঘর গাঢ় লাল রঙের মোটা পর্দা, কাচে লাল রং করা, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লাইট চব্বিশ ঘণ্টা জ্বালানো থাকা অবস্থায় দীর্ঘদিন বন্দি থাকতে হয়েছে। এটাও চরম অত্যাচার, যা দিনের পর দিন তার উপর করা হয়েছিল।

পাঁচ মাস পর একখানা খাতা পান লেখার জন্য । তিনি সেখানে উল্লেখ করেছেন যে তাকে এমনভাবে একটি ঘরে বন্দি করে রেখেছিল যে রাত কি দিন তাও বুঝতে পারতেন না ও দিন তারিখ ঠিক করতে পারতেন না । তাই এই খাতায় কোনো দিন তারিখ দিয়ে তিনি লেখেননি । ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কুর্মিটোলা নিয়ে যাবার বর্ণনা । বন্দিখানার কিছু কথা তিনি লিখেছেন, বিশেষ করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িত করা হয়েছিল যে মামলায় অভিযোগ ছিল তিনি সশস্ত্ৰ বিপ্লব করে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিলেন-এতে আরও ৩৪ জন সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তাকেও জড়িত করা হয়েছিল ।
সেই সময় বন্দি অবস্থায় যে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো অর্থাৎ ইন্টারোগেশন করা হতো সে কথাও লিখেছেন । এই কষ্টের জীবন বেছে নিয়েছিলেন বাংলার সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য । জনগণের জন্যই সারা জীবন সংগ্ৰাম করেছেন, কষ্ট করেছেন । মনের জোর ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণেই তাকে এত কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা আল্লাহ দিয়েছিলেন ।

প্রথম খাতাটা ১৯৬৬ সালে লেখা । আর দ্বিতীয়টা ১৯৬৭ সালে লেখা । এই সাথে আর কয়েকটি খাতায় ঐ সময়ের কথা লেখা ছিল সেগুলি সব ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শুরু হওয়ার পর ঘরের বাইরে কোর্টে নিয়ে যেত । কাঠগড়ায় সকল আসামিকে দেখতে পেয়েছিলেন । সকলের আইনজীবী ও পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত থাকতে পারতেন । পরিবারের সদস্য কতজন যেতে পারবে সে সংখ্যা নির্দিষ্ট করে পাশ দেয়া হতো । যারা পাশ পেতো তারাই ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে কোর্টে যেতে পারতো । কারণ কোর্ট ক্যান্টনমেন্টের ভিতরেই বসতো ।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যে খাতা দেওয়া হতো তার পাতাগুলি গুনে নাম্বার লিখে দিতো। প্রতিটি খাতা সেন্সর করে কর্তৃপক্ষের সাই ও সিল দিয়ে দিত।

এই লেখাগুলি ছাপানোর জন্য প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে শামসুজ্জামান খান, বাংলা একাডেমির ডিজি সাৰ্ব্বক্ষণিক কষ্ট করেছেন । বার বার লেখাগুলো পড়ে প্রুফ দেখে দিয়েছেন বার বার সংশোধন করে দিয়েছেন। তাঁর প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। তার পরামর্শ আমার জন্য অতি মূল্যবান ছিল । তার সহযোগিতা ছাড়া কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না । বাংলা একাডেমিকেই বইটি ছাপানোর জন্য দেয়া হয়েছে। সেলিমা, শাকিল, অভি। সর্বক্ষণ সহায়তা করেছে। তাদের সহযোগিতায় কাজটা দ্রুত সম্পন্ন করতে পেরেছি। তাদের সকলকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এই বইয়ের মূল প্রুফ দেখা থেকে শুরু করে ছাপানো পর্যন্ত যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তাদেরকেও আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। পাঠকদের হাতে বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই ডায়েরির লেখাগুলি যে তুলে দিতে পেরেছি। তার জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি । অসমাপ্ত আত্মজীবনী বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের সংগ্রামের পথপ্রদর্শক । ভাষা আন্দোলন থেকে ধাপে ধাপে স্বাধীনতা অর্জনের সোপানগুলি যে কত বন্ধুর পথ অতিক্রম করে এগুতে হয়েছে তার কিছুটা এই কারাগারের রোজনামচা বই থেকে পাওয়া যাবে । স্বাধীন বাংলাদেশ ও স্বাধীন জাতি হিসেবে মর্যাদা বাঙালি পেয়েছে যে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, সেই সংগ্রামে অনেক ব্যথা বেদনা, অশ্রু ও রক্তের ইতিহাস রয়েছে। মহান ত্যাগের মধ্য দিয়ে মহৎ অর্জন করে দিয়ে গেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । এই ডায়েরি পড়ার সময় চোখের পানি বাধ মানে না । রেহানা, বেবী ও আমি চোখের পানিতে ভেসে কাজ করেছি। আজ বেবী নেই তার কথা বার বার মনে পড়ছে। বাংলা কম্পিউটার টাইপ করে নিনু আমার কাজটা সহজ করে দিয়েছে। অক্লান্ত পরিশ্রম করে সে কাজ করেছে তার আন্তরিকতা ও একাগ্ৰতা আমার কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছে, তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। নিনু যখন টাইপ করেছে তারও চোখের পানি সে ধরে রাখতে পারেনি । অনেকসময় কম্পিউটারের কী বোর্ড তার চোখের পানিতে সিক্ত হয়েছে। আমরা যারাই কাজ করেছি। কেউ আমরা চোখের পানি না ফেলে পারিনি ।

তার জীবনের এত কষ্ট ও ত্যাগের ফসল আজ স্বাধীন বাংলাদেশ । এ ডায়েরি পড়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ তাদের স্বাধীনতার উৎস খুঁজে পাবে।

আমার মায়ের প্রেরণা ও অনুরোধে আব্বা লিখতে শুরু করেন । যতবার জেলে গেছেন আমার মা খাতা কিনে জেলে পৌঁছে দিতেন, আবার যখন মুক্তি পেতেন তখন খাতাগুলি সংগ্রহ করে নিজে সযত্নে রেখে দিতেন। তাঁর এই দূরদর্শী চিন্তা যদি না থাকত তাহলে এই মূল্যবান লেখা আমরা জাতির কাছে তুলে দিতে পারতাম না । বার বার মায়ের কথাই মনে পড়ছে।

শেখ হাসিনা
২৫শে জানুয়ারি ২০১৭


প্রকাশকঃ বাংলা একাডেমি

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2016. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com