Ticker

6/recent/ticker-posts

Header Widget

গল্পটা মহিউদ্দিনের নাসিমা আনিস

amarboi.com
গল্পটা মহিউদ্দিনের
নাসিমা আনিস

মহিউদ্দিনকে আমরা প্রথম দেখি আমাদের সাহিত্য আসর প্রতীতিতে। চোখে পড়ার মতো চেহারা না মোটেই। অতি নিরীহ চেহারা। সম্ভবত বেশ কিছুদিন আসরে আসার পর তিনি খুব সংকোচের সঙ্গে নিজের লেখক পরিচয়টা আমাদের দিয়েছিলেন। আরও কিছুদিন পর তিনি আসরে গল্প পড়ে শোনাতে শুরু করেন। গল্পে গল্প আছে, মজাও আছে। মজার সঙ্গে না চাইলেও শ্রোতারা পায় বেশি আদিরস। ফলে তিনি গল্প পড়া শুরু করলে অনেকেই বেশ বিব্রত হন। প্রথমে দু'একটা গল্প সয়ে নেওয়া হয়েছিল নবাগত হিসাবে। আসরে নানা বয়সী ও নানা পেশার লোকের সমাগম। সাহিত্য তারা ভালোবাসেন সত্যি, কিন্তু ছেলে বয়সী ছাত্রদের সামনে বসে এই ধরনের গল্প শুনতে বেশিরভাগেরই ছিল ঘোর আপত্তি। সঞ্চালক দু'একদিন তার গল্প পাঠ থামিয়েও দিয়েছিলেন। আমরা ভাবতাম, এরপর হয়তো তিনি আর আসবেন না। আসর শেষে অনেকে এই ধরনের গল্প পাঠে রুচির প্রশ্নও তোলেন। কিন্তু তিনি আসেন, গল্প পাঠে আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং বেশিরভাগ সময় প্রত্যাখ্যাত হন। সেই সময় তিনি আমাদের অনেকের হাতে নিজের লেখা একটা গল্পের বই দেন। বাজে বাইন্ডিংয়ে 'বেহুলা' নামের বইটা আমরা পড়ি এবং খবরের কাগজের সঙ্গে বিনে পয়সায় বিক্রির জন্য রেখে দিই। পড়ে বিশেষ কেউ মন্তব্য করি না 'রুচির' প্রশ্নে। সব গল্পে প্রেম ও দেহ যূথবদ্ধ, সে যেভাবেই হোক। হয়তো গ্রাম্য পলিটিক্স নিয়ে জমিয়ে একটা গল্প বলছেন। গল্পে আশ্চর্য চিত্রকল্প, কোথাও কোথাও ডিটেইল মুগ্ধ করার মতো, কিন্তু হঠাৎ একটা রেপ সিন, সবিস্তারে। কখনও-বা রেপ, যদিও তিনি দেখাচ্ছেন মেয়েটিও আকুল হয়ে তাতে অংশগ্রহণ করছে। বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে, কী আর করা! জাতীয় পত্রিকায় যার গল্প ছাপা হয়নি উপরন্তু কোনো পত্রিকার সঙ্গে জড়িত নন অথবা নিদেনপক্ষে একটা কলেজের শিক্ষকও নন; আবার লেখা দিয়েও এখন পর্যন্ত শ্রোতাদের মুগ্ধ করা দূরে থাক স্বস্তিতে রাখতে পারেননি, এমন লেখককে খুব একটা পাত্তা দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা আমাদের ছিল না। পাত্তা না পেয়ে আসা কমিয়েছিলেন। এলেও পেছনে থাকতেন চুপচাপ। তিনি এলে আমরা আশঙ্কাগ্রস্ত হতাম_ তিনি কি আবার সেই ধরনের গল্প পড়তে শুরু করবেন, আর সঞ্চালক তাকে থামিয়ে দিয়ে আসরের পরিবেশটা থমথমে করে তুলবেন! আর না এলে সত্যি সত্যি তার জন্য একটু বেদনাবোধ করতাম। এর বছরখানেক পর তিনি আমাদের পড়তে দেন 'কামুক'। বই হাতে নিয়ে নাম দেখে বাস্তবিকই আমরা ভ্যাবাচ্যাকা খাই। লোকটার কি মাথা খারাপ? এর মাসখানেক পর থেকে আমরা আর তাকে আসরে দেখি না। আমার মতো অনেকেরই ধারণা, কেউ তাকে আসরে আসতে বারণ করেছেন। এমন নিরীহ চেহারার একটা লোক এমন অশল্গীল যৌন কাহিনী লিখেই চলেছেন! যা হোক, এটি সেই মহিউদ্দিনের গল্প।
অধ্যক্ষের রুমে ঢুকে কী বলবেন ঠিক বুঝতে পারেন না মহিউদ্দিন। এই রকম ব্যাপার নিয়ে বাবা হয়ে মেয়ের সম্পর্কে বলা খুবই দুরূহ। অন্য কেউ হলে হয়তো আরও লজ্জা পেতেন, তুলনায় মহিউদ্দিন কমই লজ্জা পাচ্ছেন। আবার হয়তো আরও অনেকের চেয়ে বেশিই লজ্জা পাচ্ছেন। আজ এই জটিল বিপদে অধ্যক্ষকে দিয়ে কিছুই করাতে পারবেন না মহিউদ্দিন_ তাও মেনে নিতে পারেন না। শোনা যায়, কলেজের অধ্যক্ষগিরি করতে হলে লোকাল লোকের, বিশেষ করে ছাত্রনেতাদের সঙ্গেও বেশ একটা নিবিড় যোগাযোগ রাখতে হয়। সে হিসেবে হয়ত মেয়ের একটা খোঁজ করে মেয়েকে ফিরিয়ে দেয়ারও ব্যবস্থা করতে পারেন অধ্যক্ষ। এমনকি চাইলে বদমাশটাকে জেলের ভাতও খাওয়াতে পারেন। কিন্তু সংশয় এখানেও, কোন বদমাশটা যে মেয়েকে ভাগিয়ে নিল, কিংবা মেয়েই তাকে ভাগিয়ে নিল সে ব্যাপারেও তো মহিউদ্দিন নিশ্চিত নন! গোপন খোঁজ নিয়ে তিনি জেনেছেন নানা ধরনের ছেলের সঙ্গে তার মেলামেশা। মহিউদ্দিন শুনেছেন, কিছুদিন আগে হোস্টেলের এক মেয়ে প্রাইভেট পড়তে গিয়ে বিরাট বিপদে পড়েছিল। অধ্যক্ষই উদ্ধার করেন। মেয়েটা কলেজের ব্যাচেলর অ্যাকাউন্ট্যান্টের কাছে অ্যাকাউন্টিং পড়তে যেত। কলেজে এত শিক্ষক থাকতে ব্যাচেলর অ্যাকাউন্ট্যান্টের কাছে কেন অ্যাকাউন্টিং পড়তে যাবে, সে ব্যাপারে বরং আমরা কথা না বলি। পাড়ার এক দল বখাটে তক্কে তক্কে ছিল, যেমন তারা থাকে আর কি। সুযোগমতো সেখানে গিয়ে মেয়েটিকে অ্যাকাউন্ট্যান্টের সঙ্গে বসিয়ে বুকে মাথা রেখে জোর করে কিছু আপত্তিকর ছবি তুলে নেয়। এটি অবশ্য আজকাল খুবই মামুলি সংবাদ। এই কিছু দিন আগে এই শহরেই হাউজিংয়ের এক মেয়েকে বখাটেরা তুলে নিয়ে জোর করে বিয়ে করে এবং দু'দিন পর আবার বাসায় পেঁৗছে দেয়। তার পরদিন শহরের বোরখার দোকানের বোরখা সব বিক্রি হয়ে যায়। বোরখার ব্যাপারে ধীরেসুস্থে ডিসিশন নেওয়া অভিভাবকরা বাজারে রেডিমেড বোরখা না পেয়ে দর্জির দোকানে হুমড়ি খেয়ে পড়েন। আর বোরখা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত শহরের গার্লস স্কুলের ছাত্রীরা, এমনকি কিছু কলেজের ছাত্রীরাও বাসায় বন্দি রইল। যাদের তাড়া ছিল তারা ঢাকা থেকে আনিয়ে নিল। যা হোক, অ্যাকাউন্ট্যান্ট গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরায় পালায়। আর বখাটেরা মেয়েকে হুমকি দেয়, ত্রিশ হাজার টাকা দাও, নইলে সব ছবি পত্রিকায় দেব। মেয়েটি জন্মগতভাবে সাহসী ছিল। সাহস করে অধ্যক্ষকে বলায় সে যাত্রা পুলিশ আর স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় ছবি উদ্ধার হয়। আর বখাটেদের সামান্য জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া হয়। সাপ মরল, লাঠিও অক্ষত থাকল। পুরো ব্যাপারটাই অধ্যক্ষ অত্যন্ত গোপনীয়তা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিচালনা করলেন। পুলিশ বিষয়টা নিয়ে দু'পক্ষের পয়সা খাওয়ার একেবারে চেষ্টা চালায়নি, তা নয়। খানেক শিক্ষকতা, খানেক কূটচালে অধ্যক্ষ পুলিশকে বলেন, 'ধরুন মেয়েটি আপনার কিংবা আমার। আপনি তাহলে কী করবেন?' এ জাতীয় কথা বলে পুলিশি হয়রানি এবং টাকা খরচের হাত থেকে বাঁচা যায় না। পুলিশ এত বোকা না। কিন্তু মেয়েটি বাঁচল। এমন একটা কঠিন সমস্যা যিনি সামলে নিয়েছেন দক্ষতার সঙ্গে, তিনি কি মহিউদ্দিনের ব্যাপারটা পারবেন না! এর আগে মেয়েকে বিশেষ ব্যবস্থায় হোস্টেলের সিট করিয়ে দিয়েছেন অধ্যক্ষ। বাতিলও হয়েছিল মোবাইল ফোন ব্যবহার করার অপরাধে [মোবাইলটি মহিউদ্দিন কিনে দেননি]। তারপর মুচলেকা দিয়ে আবার হোস্টেলের সিট হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মেয়ের মতিগতি আর হোস্টেল সুপারের ভবিষ্যদ্বাণীতে ভয় পেয়ে মেয়েকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়েছেন।
চারদিকের কোলাহল, মেয়ে আর অভিভাবকদের ব্যস্ততা ক্রমশ কমে আসছে। অথচ মহিউদ্দিন যেন মরুভূমির উত্তপ্ত বালুর উপর দাঁড়িয়ে। নিজেকেই যেন গোপনে ফিসফিস করে বলেন, কী দিয়ে তুমি মেয়েকে উদ্ধার করতে চাইছ! না তোমার কিছু নৈতিকতা আছে, না তোমার মেয়ের কিছু সততা আছে।
এর আগে বহুদিন তিনি অধ্যক্ষের কাছে নানা কাজ নিয়ে এসেছেন, কিন্তু আজ তিনি ঢুকে কী বলবেন? বলবেন, আমার এত পরিশ্রম, এত চেষ্টা সব পণ্ড হয়ে গেল স্যার! আমি মেয়েটাকে মানুষ করতে চেয়েছিলাম, পারলাম না। এসব ভাবতে ভাবতে মহিউদ্দিন মানসিকভাবে খানিকটা ভেঙে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর মনে হলো, একটা সুযোগ নেয়া যেতে পারে এই বলে যে, আমার মেয়ে ফরম ফিলাপ করতে এসেছিল কিন্তু আর বাসায় ফিরে যায়নি। ভাবনা অল্পক্ষণের জন্য, বিষয়টা যে এত সরল না_ মহিউদ্দিন তা জানেন। অধ্যক্ষ তদন্ত করলে দারোয়ানের কাছ থেকে জেনেই যাবেন যে আমি মেয়েকে ঢুকিয়ে গেটের কাছ থেকে সরি নাই। মেয়ের সঙ্গে ঢুকতে চাইলে মেয়ে বলে, আব্বু এটা সামান্য কাজ, তোমার দরকার নাই। আমি ঢুকব আর বেরুব, আধ ঘণ্টা।
সাহিত্য আসরে যখন যেতেন মহিউদ্দিন তখন গ্রাম্য ডাক্তার। আর অধ্যক্ষ তখন একটা কলেজের সহযোগী অধ্যাপক। মহিউদ্দিনের 'কামুক' উপহার অধ্যাপকও পেয়েছিলেন। বইটা হাতে নিয়ে নাড়তে কিছু রগরগে প্রেমের ডায়লগ চোখে পড়লে অধ্যাপক পুরো উপন্যাসটা পড়ে ফেলেছিলেন। পড়া শেষে দেখলেন এটা পর্নোগ্রাফির চেয়ে সামান্য উন্নত কিছু বস্তু। কয়েক দিন পর বই নিয়ে যখন মহিউদ্দিন সাধারণ প্রশ্ন করলেন, কেমন লাগল, লিখতে থাকলে ভালো কিছু লিখতে পারব কিনা ইত্যাদি। অধ্যাপক সরলভাবেই বললেন, লেখার হাতটা আপনার ভালো, কিন্তু অন্য ধরনের কিছু চেষ্টা করে দেখতে পারেন। এইটুকু কথাই ছিল মহিউদ্দিনের জন্য মহার্ঘ্য। অধ্যাপক কিছুই জোর করেননি। পৃথিবীরই হয়তো নিয়ম, কোথাও সুযোগ পেলে ভুলগুলো অন্যকে বলে ফেলা, কিংবা বাধ্য হয়েই ভুল করেছি বলে আত্মপক্ষ সমর্থন করা। মহিউদ্দিন স্বীকার করলেন, প্রথম যৌবনে তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছেন পর্নোগ্রাফির স্টোরি লিখে। প্রায় দশ বছর তিনি একটা পত্রিকার মূল স্টোরি রাইটার ছিলেন। অধ্যাপক বিস্ময় গোপন করলে মহিউদ্দিন অকপটে বলে গেলেন।
_স্কুলে পড়ার সময় জমিদারদের আমবাগানে আধবস্তা কাগজ কুড়িয়ে পাই। জমিদাররা তখন দেশ ছেড়ে চলে গেছে। মুসলমান নায়েবরা সে সব বাড়িঘর দখল নিয়েছে, পরে তো সে সব তাদেরই হয়ে যায়। তারা কেন এসব ছিঁড়ে বা পুড়িয়ে না ফেলে বাগানে ফেলে রাখল তা জানি না। আমরা তখন এইটে পড়ি। বন্ধুরা পুকুরে ভিজানো চালের পুটলি নিয়ে দুপুরের খাবার সারতে এসেছিলাম আমবাগানে। ভিজানো চাল গুড় আর লবণ দিয়ে মাখিয়ে মুঠিমুঠি খেতে খেতে আমরা খুঁজে পাই সে সব কাগজ। হলুদ হয়ে যাওয়া সেই কাগজ পড়ে আমরা যৌবনপ্রাপ্ত হই। বন্ধুরা সবাই একসঙ্গে আমবাগানেই গোল হয়ে বসে এ সব নিয়ে নাড়াচাড়া করি। আমরা বুঝতে পারি এ সব রায়দের সম্পদ। জমিদারির সঙ্গে এ সবও ফেলে গেছে। তবে একটা কথা স্যার, কিছু পাণ্ডুলিপি ছিল অতি উচ্চমানের, ভাষায় আর বর্ণনায়। আমি বহু দিন সে সব রেখে দিয়েছিলাম যত্নে। তো দেশ স্বাধীনের পর মেট্রিক পাস করে জেলা শহরে কলেজে ভর্তি হই। তখন বন্ধুদের এ সব পড়তে দেই। ভেবেছিলাম, বন্ধুরা পড়ে আমাকে খুব বাহবা দেবে। কিন্তু তার বদলে তারা বলল, বাজারে নাকি প্রচুর এ সব বই আছে, দামও খুব কম। চার আনা-আট আনা। এই সময় বাবা কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। পড়ার টাকা দিতে পারবেন না বলে জানিয়ে দিলেন। উপরন্তু আমি যাতে বাড়ি গিয়ে সংসারের হাল ধরি সে তাগাদা আসতে লাগল ঘন ঘন। হোস্টেল ছেড়ে এক বাড়িতে লজিং থাকলাম। সে বাড়ির মেয়েটি সুন্দর আর খুব লাজুক। কিন্তু সে তো আমার ছাত্রী, আমার আদেশ সে ফেলতে পারল না। সেখানে থেকেই আমার আসঙ্গ লিপ্সা জাগল। আবার টাকা রোজগারের রাস্তাটা খুঁজে পেলাম। খুঁজে পেলাম মানে, এটাও একটা গল্প। কোটপাড়া স্টেশনের পাশে পুরনো বইয়ের দোকানে গল্পের বই কিনতে গেলে দোকানি আমাকে দুইটা চটি বই দেয়। আমি বলি, এত চিকন গল্পের বই কেন কিনব! মোটা মোটা বই দেন। দোকানদার বলে, এই বই নেওয়ার জন্যি আমার কাছে রাতদিন গ্রাহক আসে। আর আপনি কচ্ছেন চটি বই পড়ি না! শুনে আমি দোকানদারের দিকে ভালো করে তাকাই। তার ঠোঁটের কোণে অশ্লীল হাসি, দেহভঙ্গিও অদ্ভুত। আমাকে একটা গালি দেয়। তারপর সেই বই দুটো আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বলে, পইড়ে কাইল নিয়ে আসপেন, টাকা লাগবে না। কৌতূহলবশত অথবা আমার ধারণাও হয়, এ জাতীয় কোনো বই হতে পারে। বাড়ি এনে দেখি ঠিক যা ভেবেছিলাম তাই। দুদিন পর বই ফিরিয়ে দিতে গিয়ে জিজ্ঞাসা করি, এসব বই কারা ছাপে, আপনারা কেমন করে জোগাড় করেন? সে ভেবেছে, আমি আরও পড়ার জন্য উতলা হয়ে আছি। সে বলে, অপেক্ষা করেন, সামনের সপ্তাহে ইন্ডিয়া থেকে এনে দেব। লজিং বাসায় কিংবা গড়াই নদীর পাড়ে বসে তিন-চার দিন এই বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করতে থাকি। নদীতে হেঁটে হেঁটে মাঝখানে গিয়ে বসে থাকতাম সারা বিকাল। শীতের বিকাল, পকেট শূন্য, ছেঁড়া স্যান্ডেল। বিশাল নদীর মাঝখানে ছোট্ট খেয়া। খেয়ার দিকে তাকিয়ে মনে হলো, জগতে কে কার খোঁজ রাখে? আমাকে বাঁচতে হবে, মা-বাবাকে বাঁচাতে হবে। এদিকে বাবার চিঠি_ ফিরে আয়, সংসার চলে না ইত্যাদি। শিগগিরই বাবাকে আয় করে দেখাতে হবে। ভাগ্য এক আশ্চর্য বস্তু স্যার। পরের সপ্তাহে আমি স্টেশনের সেই দোকানে যাই। মনে আছে, হাড়কাঁপানো শীতের সন্ধ্যা। মানুষ চলাচল নেই বললেই চলে। দেখি গায়ে দুনিয়ার কাপড় চাপিয়ে এক বৃদ্ধ এক গাট্টি বই দোকানিকে দিচ্ছে খুব সতর্কতার সঙ্গে। তাকে দেখলে যে কেউ মনে করবে সে একটা অন্যায় করছে। সে ফিরে যাবার সময় রেললাইনের উপর তার পথ আগলে দাঁড়াই। বৃদ্ধ প্রথমে কিছুই স্বীকার করে না কিন্তু যখন আমি বললাম, আমার কাছে অনেক ভালো পাণ্ডুলিপি আছে, তখন সে আমার দিকে মনোযোগ দেয়। আমি কোথা থেকে পেয়েছি সে সবও বলি। সে বলে, আগে দেখাও। আমি বলি, দেখাব না। আমি এ সব বিক্রি করতে চাই। এর পর সত্তর টাকায় আমি সে সব বিক্রি করি। আমার কাছে তখন এই টাকা অনেক টাকা। পঞ্চাশ টাকা বাড়িতে পাঠাই। বাবা জানে, আমি ছাত্র পড়াই। তারপর প্রতি মাসে, কখনও সপ্তাহে আমি পাণ্ডুলিপি দিই। প্রতি পাণ্ডুলিপিতে বিশ টাকা করে দেয়। বিশ টাকা অনেক টাকা। কোনো কোনো মাসে দেড়শ' দু'শ' টাকাও কামাই। শুনে অবাক হবেন, আমি তখন বাবাকে রীতিমতো টাকা পাঠাতে লাগলাম। এভাবেই চলল দশ-বারো বছর। কিন্তু লেখাপড়াটা হলো না। ঠকাইনি স্যার কাউকে। লজিং বাড়ির সেই মেয়েটাকেই বিয়ে করি ওর বাবার অমতে আটাত্তর সালে। পরে অবশ্য সব মিটে গেছে।
_আপনার স্ত্রী আপনার এসব মেনে নিলেন?
মহিউদ্দিন এবার মাথা নত করলেন। অনেক দিন জানত না। জানত আমি পত্রিকায় কলাম লিখি আর ছাত্র পড়াই। তারপর একদিন জেনে গেল। কিন্তু তখন বাসা ভাড়া দিয়ে সংসার চালানোর এই একটাই গতি ছিল। ওর জানার পরও তিন বছর কাজটা করেছি। কিন্তু এক সময় দেখলাম ও বিষয়টাকে সহজভাবে নিচ্ছে না। তারপর অন্য পেশার দিকে ঝুঁকলাম। তবে স্যার, প্রচুর পয়সা সেখানে। ততদিনে এপার- ওপার দুপারেই এর ব্যবসা জমজমাট। ওপাড়েও দু'-একটা পত্রিকায় লেখা দিয়ে আসতাম। ওরাও ভালো পয়সা দিত। কিন্তু কত আর একই জিনিস লেখা যায়! আমিও শেষের দিকে এ সব লিখে লিখে হাঁপিয়ে উঠছিলাম। ওরা বহু দিন আমার পিছনে লেগে ছিল। ছাড়ি ছাড়ি করেও তিন বছর কেটে গেল। সত্যি কথা, আমার নিজেরই যখন পত্রিকা হলো তখনই বউ ভয়াবহভাবে বেঁকে বসল। খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে প্রায়ই আত্মহত্যার হুমকি দিত। মেয়ের বয়স তখন কয়েক মাস।
মহিউদ্দিন বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন অধ্যক্ষের দরজার বাইরে। ফরম ফিলাপ শেষ হয়ে এসেছে। করিডোরে আর ছাত্রী নেই বললেই চলে। অন্য সময় হলে কার কাছে এসেছেন_ তার উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে যেতেন। ঘণ্টাখানেক বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে ক্লান্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন মহিউদ্দিন। মেয়ে ঢুকেছে ন'টায়, এখন আড়াইটা। দারোয়ান পাকা ভ্রু কুঁচকে একবার তাকিয়েই চোখ ঘুরিয়ে নিল। মহিউদ্দিনের মনে হলো ভঙ্গিটা এমন_ এবার কোনো প্রশ্ন করামাত্র এমন মোক্ষম অস্ত্র ছুড়বে যেন ব্যাটা আর জীবনেও মেয়ের ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন না করে!
সকালে মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন মহিউদ্দিন মোটরসাইকেল করে। গত দুই মাস ধরে তাই করেন। মেয়েকে ভিতরে দিয়ে একটু দূরে চায়ের দোকানে বসে থাকেন সতর্ক দৃষ্টি মেলে। ক্লাস শেষ হলে আবার একুশ কিলোমিটার মানে চৌদ্দ মাইল মোটরসাইকেল চালিয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। আজ তার ফরম ফিলাপ। তিন হাজার টাকাসহ মেয়েকে ভেতরে পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন গেটে। নিশ্চিন্ত বললেও ততটা নিশ্চিন্ত না। এতগুলো টাকা হাতে; মেয়ে কোনো কেলেঙ্কারি করবে না_ তিনি ততটা নিশ্চিন্ত বাবা নন। ফরম ফিলাপ শেষ হবে, দুই/তিন মাস পর আর তো শুধু পরীক্ষা কয়টা। কোনো রকম এইচএসসিটা পাস করলে ঢাকায় পাঠিয়ে দেবেন। মেয়ের মাথাটা ভালো। মেয়ে বড় শহরে গেলে জগত দেখবে, বড় হতে চাইবে_ এমন বিশ্বাস নিয়েই সময় গুনছিলেন।
দেখতে দেখতে বিকেলটাও ফুরিয়ে আসতে লাগল। গেটের উল্টোদিকে রাস্তায় মোটরসাইকেলটা ধরে বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। ক্ষুধা-তৃষ্ণা দুশ্চিন্তায় পাগলপ্রায়। হলুদ কলেজ, কলেজের বেশির ভাগই ঢেকে রেখেছে বিশাল বিশাল মেহগনির গাঢ় সবুজ পাতা। মহিউদ্দিনের মনে হলো পাতাগুলো সবুজ না, গাঢ় বেগুনি। গাছে সন্ধ্যার ছায়া, সূর্য উল্টোদিকে ঢলে পড়ছে। মনে হলো এক্ষুণি ঝুপ করে অন্ধকার হয়ে যাবে। যদিও ঘড়িতে নভেম্বর মাসের বিকাল চারটা। সন্ধ্যা হোক অন্ধকার হোক, ফিরে যাওয়া যাবে না। মেয়েটা ফিরে এসে বাবাকে না পেলে কেমন অস্থির হয়ে যাবে! হঠাৎ মেয়ের এক বন্ধুকে দেখে ছুটে গেলেন গেটের কাছে। ফরম ফিলাপ হয়েছে সকাল কিংবা দুপুরে। এখন মেয়েটিকে তিনি কী জিজ্ঞাসা করবেন? হোস্টেলের মেয়ে, হয়তো প্রাইভেট পড়তে যাচ্ছে। মহিউদ্দিন জ্ঞানহীন হলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, পিয়ার এত দেরি কেন? সকালে ঢুকেছে, এখনও বেরুচ্ছে না! বন্ধুটা আশ্চর্য কথা শোনায়। বলে, আংকেল, পিয়াকে না দেখে আমরা সকালে ফোন করেছিলাম। আমাদের একসঙ্গে ফরম ফিলাপ করার কথা। কিন্তু পিয়া বলে, আমাকে বাবা বাসায় আটকে রেখেছে, আমার পরীক্ষা দেওয়া হবে না। দু'পক্ষই বুঝতে পারে পিয়া পালিয়েছে। কিন্তু মহিউদ্দিন তো আজ গেটেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। আজ তো চায়ের দোকানেও যাননি। কলেজের একটা গেট, কীভাবে ফাঁকি দিল!
অধ্যক্ষকে তিনি কী বলবেন? বলবেন, স্যার, মেয়েটাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতাম আপনার কথামতোই। কখনও কখনও সন্তানকে মানুষ করা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন পাথরটা চিবিয়ে খাওয়া_ আপনি বলেছিলেন। আমিও চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আমি কিছুই করতে পারিনি। আপনি কি বুঝতে পেরেছিলেন যে, আসলেই আমি পারব না! তা না হলে সেদিন এ কথা বলেছিলেন কেন_ মহিউদ্দিন সাহেব, আপনি চেষ্টা করে যান। কিন্তু এটা সত্যি, আমরা তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করার চেষ্টা করতে পারি, নেওয়া না নেওয়া অনেকটা তাদের ব্যাপার। সন্তান বড় হয়ে গেলে বাবা-মায়ের বেশি কিছু করার থাকে না। তারা আমাদের দয়া করতেও পারে, নাও পারে।
স্যার, মেয়ে আমায় দয়া করেনি। একমাত্র সন্তান আমার। আমি সারাটা কলেজ তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি, কোথাও নেই। খুব সম্ভব এবার স্ত্রীও আমায় দয়া করবে না। ইতিমধ্যে সে বলেও ফেলেছে, মেয়ের ভাব ভালো না। এসব তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত। তুমি যেমন তোমার বাবাকে ফাঁকি দিয়েছ, তোমার মেয়েও তেমনি তোমাকে ফাঁকি দেবে। আমি জানি না স্যার, আমি এখন কী করব!
মহিউদ্দিনের সামনে দিয়েই পালিয়েছে পিয়া। বাবা তার দিকে তাকিয়েও ছিল। কিন্তু কীভাবে বুঝবেন পিয়া তার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে! ও তো আর বোরখা পরে তার সঙ্গে আসেনি। নেকাব পরা কোনো মেয়ের মুখ খুলে নিজের মেয়ে চিনে নেয়ার কি সুযোগ আছে?

আপনাদের সহযোগীতা না পেলে এই সাইট সামনের দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। তাই যদি বইটি ভালো লেগে থাকে তাহলে দুচার লাইন লিখে আপনার অভিব্যাক্তিগুলো জানিয়ে রাখুন আমাদের কমেন্টস বক্সগুলোতে। আর শুধু মাত্র তাহলে আমরা আরও অনেক বই নিয়ে আপনাদের সামনে আসতে পারবো। ধন্যবাদ।

নতুন বই ইমেইলে পেতে হলে