Ticker

6/recent/ticker-posts

Header Widget

রীতিবাদ

amarboi
রীতিবাদ

ভারতীয় অলঙ্কারশাস্ত্রে রীতিবাদের অন্যতম প্রবক্তা আচার্য বামন। অষ্টম শতাব্দীর আলঙ্কারিক বামন রীতি-র সার্থক সংজ্ঞা নিরূপণ করেছেন, কাব্যের আত্মারূপে রীতিকে প্রাধান্য দিয়ে রীতিপ্রস্থানকে একটি সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করেছেন সবই সত্য কিন্তু এই মতবাদের প্রথম প্রবক্তার গৌরব তাকে দেওয়া যাবে না। তার কিছু আগেই আনুমানিক সপ্তম অষ্টম শতাব্দীতে আচার্য ভামহ তাঁর কাব্যালঙ্কার গ্রন্থে সর্বপ্রথম রীতির উল্লেখ করেছেন। ভামহর আলােচনা থেকে একথাও স্পষ্ট যে তারও আগে রীতির ধারণাটি অন্তত আলঙ্কারিকদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। বস্তুত নাট্যশাস্ত্রের রচয়িতা ভরত (আনুমানিক কালসীমা খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় তৃতীয় শতক) রসনিষ্পত্তি আলােচনাকালে যে দশটি গুণের উল্লেখ করেছিলেন তার ভেতরেই নিহিত ছিল রীতি প্রস্থানের বীজ।

সংস্কৃত কাব্যতত্ত্বে বিভিন্ন মতবাদের উদ্ভব এক অর্থে এক ধারাবাহিক প্রশ্নোত্তর পর্ব। সাহিত্যালােচনায় যাঁরা নৈরাত্মবাদী চার্বাকপন্থী তারা কেবলমাত্র শব্দ, অর্থ ও তাদের অলঙ্কারের সমষ্টি ছাড়া কাব্যের আর কোনাে পৃথক উপাদান স্বীকার করেন না। তাদের বক্তব্য কাব্য থেকে শব্দ, অর্থ, অলঙ্কার প্রভৃতিকে পরস্পর বিশ্লিষ্ট করে নিলে আর কি উপাদান অবশিষ্ট থাকতে পারে যাকে তার আত্মা বলে নির্দেশ করা যায়? এর উত্তরে একদল আলঙ্কারিক বলেন যে সৌন্দর্য আছে বলেই কাব্য সহৃদয়ের উপাদেয়। এই সৌন্দর্যের উপাদান অলঙ্কার-যমক, অনুপ্রাস, উপমা, রূপক প্রভৃতি শত শত ভণিতি বৈচিত্র্য যা শব্দ ও অর্থকে বিশিষ্টতা দান করে। সুতরাং কাব্যের শােভাহেতু অলঙ্কারকেই তার আত্মা বলে গ্রহণ করা উচিত। এই মতবাদের প্রধান প্রবক্তা আচার্য ভামহ (সময়কাল আনুমানিক সপ্তম, অষ্টম শতক)। তার মতে অলঙ্কারের অপর নাম ‘বক্রোক্তি’ আবার সমস্ত বক্রোক্তির মূলে আছে অতিশয়ােক্তি। সুতরাং অতিশয়ােক্তিই কাব্যের প্রাণ যাকে বাদ দিয়ে কোনাে অলঙ্কার আত্মলাভ করতে পারে না। প্রসঙ্গক্রমে কাব্যের উৎকর্ষ বিচারে বাচ্যরীতি এবং ভাবগত নির্বাচনের বৈচক্ষণ্যকে প্রাধান্য দিলেও রীতির কাব্যমূল্যকে ভামহ আদৌ গুরুত্ব দেন নি, রীতির নামকরণও সমর্থন করেন নি। তার মতে রীতির নানারকম নাম কেবল মূর্খেরাই দিয়ে থাকেন এবং তা গতানুগতিকতা ছাড়া আর কিছুই নয় (গতানুগতিকন্যায়াৎ নানাখ্যেয়মমেধসা)।

ভামহর এই অলঙ্কার প্রস্থানের বিরুদ্ধে দণ্ডী তার মতবাদ প্রচার করেন। অলঙ্কারকে কাব্যের শােভাহেতু রূপে স্বীকার করে নিলেও দণ্ডী মনে করেন কাব্যে তার থেকেও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বর্তমান এবং তা হল গুণ। গুণ বলতে তিনি বােঝেন বর্ণনাভঙ্গির সৌকর্য সঞ্জাত বাগভঙ্গি বা বাক্‌পদ্ধতিকে যা এক অর্থে রীতিরই নামান্তর। অবশ্য দণ্ডী ‘রীতি’ শব্দটি ব্যবহার করেন নি। তাঁর ব্যবহৃত শব্দটি হল ‘মার্গ’ এবং গুণ এই মার্গের প্রাণস্বরূপ। গুণের উপস্থিতি বা অভাবের কারণেই গড়ে ওঠে বিশিষ্ট বাক্‌পদ্ধতি। নাট্যাচার্য ভরতের মতাে দণ্ডীও শ্লেষ, প্রসাদ, সমতা, সমাধি, মাধুর্য, ওজঃ, পদসৌকুমার্য, অর্থব্যক্তি, উদারতা ও কান্তি প্রভৃতি দশটি গুণের কথা স্বীকার করেছেন এবং কাব্যের প্রাণস্বরূপ দশটি গুণ বর্তমান বলে বৈদভী মার্গকেই শ্রেষ্ঠ বলে মনে করেছেন (এতে বৈদমার্গস্য প্রাণা দশগুণা স্মৃতাঃ)। কালিদাসের কাব্য বৈদভী মার্গের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

দণ্ডীর পর আনুমানিক অষ্টম শতাব্দীতে আবির্ভূত হলেন আলঙ্কারিক বামন। কাশ্মীররাজ জয়াপীড়ের সভামন্ত্রী আচার্য বামন দণ্ডী উল্লিখিত দশটি গুণ স্বীকার করলেও তাকে কাব্যের আত্মা বলে মেনে নিলেন না। কাব্যালঙ্কার-সূত্র-বৃত্তি গ্রন্থে অদ্ব্যর্থভাষায় রীতিকেই তিনি কাব্যের আত্মা বলে ঘােষণা করলেন। তার মতে রীতিরাত্মা কাব্যস্য। বিশিষ্টা পদরচনা রীতিঃ। বিশেষাে গুণাত্মা। রীতি বলতে বামন একটি বিশিষ্ট পদরচনাকে বুঝেছেন। অর্থাৎ এমনভাবে শব্দ ও অর্থ সন্নিবেশ বা রচনা করতে হবে যাতে শ্লেষ, প্রসাদ প্রভৃতি দশটি গুণ স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হতে পারে। বলাবাহুল্য এইরকম রচনারীতিই কাব্যের আত্মা। বামনাচার্য কাব্যের প্রাণস্বরূপ এই রীতির তিনটি ভেদ স্বীকার করেছেন—বৈদভী, গৌড়ী ও পাঞ্চালী। এর মধ্যে সমগ্ৰগুণােপেতা’ বৈদর্ভী ও ওজঃকান্তিমতী’ গৌড়ী রীতির কথা দণ্ডীই বলেছেন। মাধুর্য সৌকুমাৰ্যোপপন্না’ পাঞ্চালী রীতি বামনের নিজস্ব সংযােজন। পাঞ্চালী রীতির বৈশিষ্ট্য শব্দ ও অর্থের তুল্য গৌরব-শব্দার্থয়ােঃ সমগুঃ পাঞ্চালীরীতিরিষ্যতে। কিন্তু নতুন রীতির কথা বললেও পূর্বাচার্যদের মতাে বামনও বৈদভী রীতিকেই শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচনা করেছেন।

আচার্য বামনের পর আনুমানিক নবম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ধ্বন্যালােক প্রণেতা আনন্দবর্ধনের আবির্ভাব সংস্কৃত কাব্যতত্ত্বালােচনার জগতে নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও একথা স্বীকার করতে বাধা নেই যে আনন্দবর্ধন রীতিকে সরাসরি অপ্রয়ােজনীয় বলে মনে করেছেন এবং রসধ্বনি সৃষ্টিকেই কাব্যের একমাত্র উদ্দেশ্য বলে বর্ণনা করেছেন। অবশ্য আনুমানিক নবম দশম শতকের অপর এক আলঙ্কারিক কাব্যালঙ্কার রচয়িতা রুদ্রট, বামন কথিত তিনটি রীতির পাশাপাশি লাটী’ নামে চতুর্থ একটি রীতির আলােচনা করেছেন। নবম শতকের শেষভাগে রচিত অগ্নিপুরাণ-এও রীতির প্রসঙ্গ আছে এবং দেশভেদে রীতিভেদকে স্বীকার করেও সেখানে বৈদভী, গৌড়ী, লাটী ও পাঞ্চালী এই চারটি রীতির কথা আলােচিত হয়েছে। সাধারণভাবে স্থানভেদে অলঙ্কারের আধিক্য, স্বল্পতা এবং কোমলতার মাত্রাকে আশ্রয় করে রীতির চরিত্র নিরূপণ করা হলেও রীতিবিচারের ক্ষেত্রে রুদ্রট-ই প্রথম শব্দ বা বাক্যসংগঠনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরােপ করেছেন। গৌড়ী, বৈদভী, পাঞ্চালী ও লাটী রীতির দেশজ চরিত্রকে মেনে নিলেও রুদ্রট কোথাও গুণের উল্লেখ করেননি। মূলত বাক্যসন্নিবেশের ওপরেই রুদ্রটের রীতিবাদ প্রতিষ্ঠিত। নবম দশম শতকের আলঙ্কারিক রাজশেখর-এর কাব্যমীমাংসাতেও রীতিবাদের গুরুত্ব স্বীকৃত হয়েছে।

বক্রোক্তিজীবিতর রচয়িতা কুক-এর কথা উল্লেখ না করলে অবশ্য রীতিবাদের আলােচনা সম্পূর্ণ হয় না। তার বক্রোক্তিবাদ-এ কুন্তক শব্দার্থবাদীদের বক্তব্যের যুক্তিপূর্ণ উপস্থাপনা করলেও প্রাচীন রীতিনির্ণয় পদ্ধতিকে স্পষ্টতই অস্বীকার করেছেন। তার মতে কোনাে দেশবিশেষের নামে রীতির নামকরণ করা যায় না কারণ রীতি দেশবিশেষের ধর্ম নয়, কবিরই ব্যক্তিগত স্বভাবধর্ম। দেশে দেশে নয়, কবির স্বভাবভেদেই তার ভিন্নতা। প্রসঙ্গত কুন্তক তিনটি মার্গ-এর উল্লেখ করেছেন-সুকুমার মার্গ, বিচিত্র মার্গ ও তদুভয়াত্মক মিশ্র মার্গ। তার মতে এই মার্গগুলি কেবলমাত্র শব্দ ও অর্থের কতকগুলি বহিরঙ্গ ধর্মের সমাবেশে গড়ে ওঠে না কবিস্বভাবের প্রেরণাতেই ব্যুৎপত্তি ও অভ্যাসের সহকারিতায় জন্ম লাভ করে। সুতরাং উত্তম কবিদের প্রত্যেকের মার্গই সমানভাবে রমণীয়-উৎকৰ্ষাপকর্য বিচার এখানে সম্ভবপর নয়। শ্রেষ্ঠ কাব্যের লক্ষণস্বরূপ কুন্তক আভিজাত্য, মাধুর্য, লাবণ্য ও প্রসাদ প্রভৃতি চারটি গুণের কথা বলেছেন। তার মতে যেহেতু বিভিন্ন মার্গের মধ্যে উত্তম অধম ভেদ সম্ভব নয় সুতরাং উক্ত চারটি গুণ তিনটি মার্গেই বর্তমান কেবলমাত্র ভিন্ন ভিন্ন মার্গে তাদের আলাদা আলাদা তাৎপর্য।

এইভাবে প্রাচীন আলঙ্কারিকদের রীতিবিষয়ক ধারণা ক্রমশ দেশ বা অঞ্চল বিশেষের ভৌগােলিক অভিজ্ঞান পরিত্যাগ করে কবিস্বভাবের নিজস্বতা অন্বেষণে অগ্রসর হয়েছে। কিন্তু প্রসঙ্গত মনে রাখা ভাল যে ইউরােপীয় সাহিত্যতত্ত্বজ্ঞরা ব্যক্তি ও স্টাইলকে যেমন অভিন্নভাবে নিতে পেরেছিলেন ভারতীয় আলঙ্কারিকরা তা পারেন নি এবং সর্বদাই রীতির সঙ্গে গুণের একটি অদ্বৈত সম্পর্ক স্থাপন করতে চেয়েছেন। তাই যদিও আমরা বলি যে ভাব ইন্দ্রিয়গােচর হয়ে ওঠে রূপের মধ্যস্থতায় এবং রূপ বিশিষ্টতা লাভ করে সাহিত্যিকের রচনা কৌশলে এবং এই কৌশলেরই সাহিত্যিক নাম রীতি তথাপি ‘রীতি’ ও ‘স্টাইল’ কখনােই এক নয়।
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!