Pages

জীবনানন্দ ও কল্লোল যুগ - ক্লিনটন বুথ সিলি


কবি জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে মার্কিন লেখক ক্লিনটন বুথ সিলি লিখেছিলেন আ পোয়েট অ্যাপার্ট। বইটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আ পোয়েট অ্যাপার্ট-এর নির্বাচিত একটা অংশ এখানে ছাপা হলো। অনুবাদ করেছেন ফারুক মঈনউদ্দীন।
লেখাটি প্রথম আলো থেকে সংগ্রহিত।
কল্লোল-এ জীবনানন্দের প্রথম কবিতা ‘নীলিমা’ যখন ছাপা হয় তখন পত্রিকাটির তৃতীয় বর্ষ চলছিল।
‘নীলিমা’ কবিতাটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এবং কল্পনাশক্তির মিশ্রণে জীবনানন্দের পারঙ্গমতা প্রদর্শন করে। এখানে তিনি ভোরবেলায় একটা নগর এবং আকাশকে দেখে অনুভব করেন। পরবর্তীকালে তিনি সূর্যোদয়ের মতো প্রাকৃতিক বিষয়ের ঘ্রাণ, আস্বাদ এবং শ্রবণ লাভ করবেন। তাঁর কল্পনাপ্রবণ চোখ আরও এজাতীয় জিনিস দেখবে রেশমগুটির অন্ধকারে আবৃত কীটসদৃশ পৃথিবীর মতো, আকাশে তারা উঠলে ফেটে যাবে তা।কবিতাটিতে ধানখেত আর তালগাছে ঘেরা ছোট শহরের মফস্বলের মানুষ জীবনানন্দের নগরের প্রতি বিরাগ স্পষ্ট। ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে তিনি থাকতেন ‘নিঃসহায় নগরের কারাগার-প্রাচীরের পারে’! বাংলার রাজধানী এবং সম্রাজ্যের দ্বিতীয় নগর কলকাতা যেসব কারণে উন্মত্ত জনতাকে প্রলুব্ধ করত, তার মধ্যে একটা বড় শহরের কর্মসংস্থানের সুযোগও আছে। সেখানে, ‘অগনন যাত্রিকের প্রাণ/ খুঁজে মরে অনিবার, পায়নাকো পথের সন্ধান;/ চরণে জড়ায়ে গেছে শাসনের কঠিন শৃঙ্খল,—/ নিষ্করুণ এই রাজপথ/লক্ষকোটি মুমূর্ষুর এই কারাগার,...’।
জীবনানন্দ শহরকে দেখান অনাকর্ষণীয় ধোঁয়ায় ঢাকা হিসেবে। যাঁরা কলকাতায় থেকেছেন তাঁরা জানেন, ঘরের রান্নার জন্য কাঠকয়লা আর পাথুরে কয়লার ধোঁয়া সম্পর্কে, যা প্রায়ই জ্বালানো হয় শুকনো গোবরের ঘুঁটে দিয়ে। সকালে একবার আর সন্ধ্যাবেলা, দিনে দুইবার পানির বালতির আকারের এই চুলাগুলো জ্বালিয়ে রান্নাঘরকে অনিবার্য ধোঁয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বাইরে বসানো হয়। ‘—উদ্বেলিছে হেথা গাঢ় ধূম্রের কুণ্ডলী, উগ্র চুল্লিবহ্নি হেথা অনিবার উঠিতেছে জ্বলি’, একবার ভোরে আরেকবার রাতের বেলায় ‘ধূম্রগর্ভ বিস্মৃত আঁধার’ আকাশে মিলিয়ে যায়।
প্রকৃতির সেই দান আকাশকে নগরবাসীর কাছ থেকে স্থগিত করে রাখা হয়নি, নগরের কয়েদিদের জন্যও দেয় নিষ্কৃতি। ‘হে নীলিমা নিষ্পলক, লক্ষ বিধিবিধানের এই কারাতল/ তোমার ও মায়াদণ্ডে ভেঙেছ মায়াবী।’
এরপরের পঙিক্তগুলোতে ধরা আছে জীবনানন্দের সারকথা: ‘জনতার কোলাহলে একা বসে ভাবি।/ কোন্ দূর জাদুপুর—রহস্যের ইন্দ্রজাল মাখি/ বাস্তবের রক্ততটে আসিলে একাকী!/ স্ফটিক আলোকে তব বিথারিয়া নীলাম্বরখানা/ মৌন স্বপ্ন ময়ূরের ডানা!’
জীবনের বেশির ভাগ সময় শারীরিকভাবে না হলেও আবেগের সঙ্গে একাকী বসে থেকেছেন তিনি, এবং চিন্তা করেছেন সবচাইতে চমকপ্রদ উপায়ে।
১৯২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে কল্লোলে যখন ‘নীলিমা’ ছাপা হয়, তখন সঠিক কবিতাটি স্পষ্টতই সঠিক ক্ষেত্র পেয়েছিল। কারণ লেখাটা বহু তরুণ কবির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর স্মৃতিকথা কল্লোল যুগ-এ বলেন যে কবিতাটা পড়ে তিনি এতই চমৎকৃত হন যে তিনি তৎক্ষণাৎ অপরিচিত এই কবির সঙ্গে পরিচিত হতে চলে যান। সে সময় জীবনানন্দ হ্যারিসন রোডের (বর্তমানে মহাত্মা গান্ধী রোড) সামান্য পরে প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ে থাকতেন। সেখান থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং তাঁর কর্মক্ষেত্র সিটি কলেজ ছিল সহজ হাঁটা-দূরত্বে। ১৯৪৯ সালে কল্লোল যুগ বের হওয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে জীবনানন্দ অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তকে লিখেছিলেন, ‘তুমি Presidency Boarding-এ প্রায়ই আসতে বেড়াতে বেরুতাম তারপর চৌরঙ্গীর দিকে প্রায়ই। অনেক কথা মনে পড়ছে অনেক অনবলীন দিন মাস মুহূর্তের।’
কয়েকজন তরুণ লেখক, প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং বুদ্ধদেব বসু স্মরণ করেন, জীবনানন্দের প্রথম যে কবিতাটি তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সেটি হচ্ছে ‘নীলিমা’। এই দুজনকে দুটো আলাদা পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তাঁদের সতীর্থ এই কবির সমর্থনে অনেক কিছু করতে হয়েছে। সে বছরই প্রেমেন্দ্র মিত্র আরও দুজনের সঙ্গে কলকাতা থেকে নতুনধারার সাহিত্যের দ্বিতীয় প্রধান কাগজ কালি কলম প্রকাশ করেন। এই কাগজে জীবনানন্দের বহু কবিতা ছাপা হয়। তার এক বছর পর বুদ্ধদেব বসু এবং অজিত দত্ত ঢাকা থেকে বের করেন তরুণ লেখকদের তৃতীয় কণ্ঠস্বর প্রগতি। যদিও এই তিনটি কাগজ কোনোভাবেই ১৯২০-এর দশকের অগ্রসর লেখকদের সৃষ্টির একমাত্র প্রদর্শনী ছিল না। তবে এগুলো ছিল তাঁদের মূল মাধ্যম, যা কল্লোল যুগ নামে পরিচিত আন্দোলনের ধারাটি রচনা করেছিল।
জীবনানন্দের ‘নীলিমা’ যখন বের হয়, তখন মাত্র ১৭ বছরের বুদ্ধদেব ঢাকার একটা কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। কিন্তু বুদ্ধদেবই সাহিত্য সমালোচক হিসেবে তাঁর চেয়ে ১০ বছরের বড় অপরিচিত কবি জীবনানন্দকে আবিষ্কার করে সামনের সারিতে নিয়ে আসেন। কল্লোল জীবনানন্দের কবিতা ছাপলেও কাগজটির লোকজন অজিত দত্তের মতো সত্যিকারভাবে জীবনানন্দের কবিতার মুগ্ধ পাঠক ছিলেন না। ‘বিশেষত ওর বড় বড় কবিতাগুলি ছাপবার মতো অতটা স্থান দিতেও বোধহয় কল্লোল কর্তৃপক্ষের আপত্তি ছিল। কিন্তু প্রগতিতে ওর দীর্ঘ কবিতাগুলি আমরা খুশি হয়ে সমাদরে ছাপতাম।’ প্রগতি কেবল জীবনানন্দের কবিতা ছাপেনি, বুদ্ধদেব নিজে দায়িত্ব নিয়েছিলেন জীবনানন্দের ওপর দুটো সম্পাদকীয় লেখার, যা ছিল তাঁর ওপর লেখা প্রথম আলোচনা।
প্রগতি প্রকাশিত হতে শুরু করে ১৯২৭ সালে। সে বছরের আগস্টে একটা দুর্দান্ত কাগজের পুনরাবির্ভাব ঘটে। শনিবারের চিঠি এবং তার চালিকাশক্তি সজনীকান্ত দাস নান্দনিক শয়তানের ওকালতি ভূমিকা গ্রহণ করেন। শনিবারের চিঠি ১৯২০ ও ৩০-এর দশকের সাহিত্যিকদের লেখার প্যারোডি লিখে তখনকার অগ্রসর ধারাকে সুনামহানির প্রচেষ্টায় খুব কম লেখককেই ছাড় দিয়েছে। একজন সাহিত্য-ইতিহাসবিদ লেখেন:
‘নজরুলকে আক্রমণ করিয়া সজনীকান্তের সাহিত্যজীবনের সূচনা ঘটে। ক্রমে প্রায় প্রত্যেক খ্যাতিমান লেখক তাঁহার সমালোচনায় এভাবে আক্রান্ত হইতে থাকেন যে তাঁহার বা শনিবারের চিঠির আক্রমণের লক্ষ্য হওয়া সাহিত্যে প্রতিষ্ঠার পরিচায়ক হইতে দাঁড়ায়।’
আগে থেকেই যেমন বোঝা গেছে, জীবনানন্দ সজনীকান্তের বহু কণ্টকাকীর্ণ গোলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন।
জীবনানন্দের প্রথম বই ঝরা পালক বের হয় ১৯২৭-এর শরৎকালে। এটাতে ছিল ৩৫টা কবিতা, যার কয়েকটা প্রথম প্রকাশিত হয় কল্লোল ও কালি কলম-এ, আর একটা ছাপা হয়েছিল প্রগতিতে। তিনি পরবর্তীকালে বইটির কবিতাগুলো প্রত্যাহার করেন। আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাস লিখতে চাইছিলেন, এমন একজনের কাছে তিনি ১৯৪৬ সালের ২ জুলাই তারিখের এক চিঠিতে লেখেন: ‘প্রথম কবিতার বইটি পাঠাব কিনা ভাবছি, সে বইয়ের বিশেষ কোনো importance আছে বলে মনে হয় না।’ এ সত্ত্বেও এই ৩৫টির মধ্যে তিনটি, মাত্র তিনটি কবিতা ১৯৫৪ সালে তাঁর জীবনের শেষ দিকে এসে প্রকাশিত জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতার অন্তর্ভুক্ত করতে দিয়েছিলেন তিনি। এই তিনটি ছিল ‘নীলিমা’, ‘পিরামিড’ ও ‘সেদিন এধরনীর’—যে কবিতাগুলো জীবনানন্দের ভবিষ্যৎ কাব্যিক ভাবনা এবং বিষয়বস্তু সম্পর্কে পূর্বাভাস দেয়।
সম্ভবত ভারতের মনোযোগ তুরস্কের এবং মেলামেশার সুবাদে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরে গিয়েছিল। সে কারণে জীবনানন্দের কাব্যদৃষ্টি ভারতের পশ্চিমের দেশগুলোর ওপর পড়ে। তবে নজরুলের সমসাময়িক বিষয়াবলির ওপর আলোকপাত করার বিপরীতে জীবনানন্দের আগ্রহ ছিল মিসর ও ব্যাবিলনের প্রাচীন সভ্যতার ওপর। মিসরের ফারাও এবং সম্রাজ্ঞীরা, সে দেশের পিরামিড এবং মমি—এসবের ওপর সারা জীবন, বিশেষ করে তাঁর কবিজীবনের প্রথম দিকে ছিল বিশেষ আকর্ষণ। এমনকি তাঁর ঝরা পালক গ্রন্থের একটা কবিতার নাম ‘মিশর’। এর প্রথম চার লাইনের মধ্যেই মমি, স্ফিংকস এবং পিরামিড—এসব শব্দ উদারভাবে ছড়ানো। যেকোনো কবিতায় পিরামিডের উল্লেখ থাকলে সেটাতে চমকপ্রদ এক স্বাদ পাওয়া যেত। উপরন্তু এসব সময়োত্তীর্ণ স্থাপনা এবং বিষয়ের কারণে কলমের এক আঁচড়ে কবি অনন্তের মধ্য দিয়ে চলে যেতে পারতেন। আর জীবনানন্দ বছর কিংবা জীবনকালের বদলে ভাবতেন অনন্তকাল নিয়ে।
নামেই যে কবিতাটিকে তাৎক্ষণিকভাবে স্থাপন করে মধ্যপ্রাচ্যে, সেই ‘পিরামিড’ কবিতায় সময়, মৃত্যু ও অমরত্বকে ঘনিষ্ঠভাবে অবলোকন করা হয়েছে। ‘বেলা বয়ে যায়!/ গোধূলির মেঘ সীমানায়/ ধূম্র মৌন সাঁঝে/ নিত্য নব দিবসের মৃত্যুঘণ্টা বাজে!/ শতাব্দীর শবদেহে শ্মশানের ভস্মবহ্নি জ্বলে!’
কথক মৃত্যু আর প্রাচীনতার প্রতীকের কথা বলে: ‘কার লাগি হে সমাধি তুমি একা বসে আছো আজ/ কী এক বিক্ষুব্ধ প্রেতকায়ার মতন!’
এমনকি জীবনানন্দ যখন ইতিপূর্বে দেখা বর্তমানের ওপর ভাবছেন, তাঁর চিত্রকল্পগুলো তখনো অতীতাশ্রয়ী হয়, যেমন তিনি ভোরকে আহ্বান করার জন্য তলব করছেন প্রাচীন মিসরের মেম্ন্নন নামের প্রকাণ্ড মূর্তিদ্বয়কে। ‘জ্বলিয়া যেতেছে নিত্য নিশি-অবসানে/ নূতন ভাস্কর!/ বেজে ওঠে অনাহত মেম্ননের স্বর/ নবোদিত অরুণের সনে/ কোন আশা-দুরাশার ক্ষণস্থায়ী অঙুলি-তাড়নে!’
সময় ও মহাশূন্যের এমন বিস্মৃতি জীবনানন্দের বহু কবিতায় স্বাতন্ত্র্যের ছাপ রেখে যায়। তিনি বাস করতেন তাঁর নিজের অদ্ভুত কল্পনার জগতে, যার অভিজ্ঞতা তিনি সঞ্চয় করেছেন কিছুটা উর্বর, অতি-আবেগাক্রান্ত কল্পনাশক্তির মাধ্যমে বোধকে তীব্রতর করে, এবং যা মানুষের একান্তভাবে শারীরিক বোধের ওপর নির্ভরতার কিছু সীমাবদ্ধতার অভিজ্ঞতার কথা জানত। বহু পরে জীবনানন্দ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে সত্যিকার সমসাময়িক বাস্তবতার দিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন, তবে তাঁর সাফল্য ছিল সীমিত। তিনি উজ্জ্ব্বল থাকেন যখন প্রাকৃতিক মহাশূন্য এবং সময় থাকে উদ্দীপিত, গণ্ডিবদ্ধ নয়।
তাঁর বহু কবিতায় মৃত্যু পরিব্যাপ্ত থাকলেও জীবনানন্দের কাব্যিক ভুবন স্পন্দমানভাবে জীবন্ত। ‘সেদিন এ ধরণীর’ কবিতায় তিনি প্রকৃতির ওপর এমন মানবীয় গুণাবলি আরোপ করেন যে ভোর, তারকামণ্ডলী, হাওয়া, ঘাস এমনকি বিশ্বমাতা নিজেই জীবনের অলংকার পরে নেন। “চকিতে ছিঁড়িয়া গেল ধরণীর নাড়ীর বন্ধন—/ শুনেছিনু কান পেতে জননীর স্থবির ক্রন্দন,/ মোর তরে পিছু ডাক মাটি-মা তোমার!/ ডেকেছিল ভিজে ঘাস—হেমন্তের হিম মাস, জোনাকির ঝাড়!/ আমারে ডাকিয়াছিল আলেয়ার লাল মাঠ—শ্মশানের খেয়াঘাট আসি!’
অবশ্য বিশ্বকে, ভারত কিংবা বাংলাদেশকে মায়ের ভূমিকায় দেখার চেয়ে প্রকৃতিকে ব্যক্তিকরণ নতুন কিছু নয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস আনন্দমঠ (১৮৮২) দেখায়, বিপ্লবীরা স্লোগান দিচ্ছে ‘বন্দে মাতরম’, যার মাধ্যমে মাতৃভূমি অথবা ভারতমাতাকে সম্ভাষণ জানানো হয়। (এই স্লোগান পরবর্তীকালে সত্যিকার বাঙালি বিপ্লবীরা গ্রহণ করেছিল, এবং আজ অবধি শোনা যায় দ্বিতীয় জাতীয় সংগীতের মতো)। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করে। বিমানবিক পরিবেশের মাধ্যমে জীবনকে জীবিত বা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টায় জীবনানন্দ যে তীব্রতায় বাংলাতে প্রাণসঞ্চার করবেন সেটা লক্ষণীয়।
ঝরা পালক কোনো অর্থেই খুব বেশি সাফল্য পায়নি। কল্লোল বইটির প্রকাশনার খবর দিয়ে জীবনানন্দের কবিতা সম্পর্কে সাধারণ কিছু আলোচনা করে নিয়ম রক্ষা করেছিল।
জীবনানন্দ বৈদ্য জাতের পদবি দাশগুপ্ত নামে লেখা শুরু করেছিলেন, যেটা তাঁর ঠাকুরদা ব্রাহ্মসমাজে যোগ দেওয়ার পর ছেঁটে দাশ করে দিয়েছিলেন। তাঁর বাবা ও ঠাকুরদার মতো তিনিও ‘গুপ্ত’ বাদ দিয়ে দেন। বইটির প্রচ্ছদ এবং ভূমিকা দুই জায়গাতেই কবির নাম ছিল জীবনানন্দ দাশ। কল্লোল অবশ্য তখনো তাঁকে দাশগুপ্ত হিসেবেই জানে।
আরেকটা আলোচনা লেখা হয়েছিল, কিন্তু সেটা কখনোই ছাপা হয়নি। সিটি কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক এবং ব্রাহ্ম সরোজেন্দ্রনাথ রায়কে এক কপি জীবনানন্দের বই উপহার দেওয়া হয়েছিল। তিনি নিয়মিতভাবে বাংলা এবং ইংরেজি প্রবন্ধ লিখে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে পাঠাতেন, সেগুলো ছাপা হতো হয় মডার্ন রিভিউ অথবা প্রবাসীতে। এই সময় ঝরা পালক-এর ওপর তার লেখা আলোচনা ছাপা হয়নি। রামানন্দ পরবর্তীকালে সরোজেন্দ্রনাথের কাছে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, লেখাটা তিনি ছাপতে চেয়েছিলেন, তবে সহসম্পাদকদের একজন আপত্তি তুলেছিলেন। সে সময় প্রবাসীর সহসম্পাদক ছিলেন সজনীকান্ত। জীবনানন্দের পাঠানো ঝরা পালক পেয়ে রবীন্দ্রনাথ একটা জবাব দিয়েছিলেন, অবশ্য সেটা কখনোই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। বহু বছর পর জীবনানন্দ এই শ্রদ্ধেয় কবির কাছে লিখেছিলেন, ‘প্রায় নয় বছর আগে আমি আমার প্রথম কবিতার বই একখানা আপনাকে পাঠিয়েছিলুম। সেই বই পেয়ে আপনি আমাকে চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিখানা আমার মূল্যবান সম্পদের মধ্যে একটি।’
সজনীকান্ত দাস এবং তাঁর শনিবারের চিঠি শুধু জীবনানন্দ নয়, ১৯২০-এর দশকের সব অগ্রসর লেখককে বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই অদ্ভুত স্বভাবের লোকটি নতুন ধরনের সাহিত্যকে আরও স্পষ্টভাবে বোঝার সুযোগ করে দিয়েছিলেন বিরোধিতার মাধ্যমে। উপরন্তু ‘সাহিত্যের গুন্ডা’ নামে পরিচিত পত্রিকাটি যদিও সমসাময়িক বাঙালি লেখকদের ওপর আক্রমণ চালিয়েই উন্নতি লাভ করেছিল, তবু পত্রিকাটির সঙ্গে জড়িত একজন লেখক, মোহিতলাল মজুমদার কিছু গঠনমূলক সমালোচনা লিখেছিলেন। সত্যসুন্দর দাস ছদ্মনামে লিখে মোহিতলাল শনিবারের চিঠির প্রধান তাত্ত্বিক হিসেবে পরিগণিত ছিলেন।
১৯২০ সালের শেষভাগে কল্লোলের লেখকেরা যখন সাহিত্যের পরিচয়যোগ্য শক্তি হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হন, তাঁদের এ রকম বিরোধিতার মোকাবিলা করতে হয়েছিল। শব্দটির সবচেয়ে পরিশীলিত অর্থে তাঁদের লেখার পঙ্কিলতা তাঁদেরই অসন্তুষ্ট করেছে যাঁরা (যেমন ধরুন মোহিতলাল) মনে করেন, সাহিত্যকে মানবতার একটা বেদির ওপর রেখে দিতে হবে, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম হেঁটে যাওয়ার সময় দেখতে পায়। শিল্পের অমর কাজগুলো স্থানীয় মাটি থেকে করা নয়, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সম্মানজনক দূরত্বের খাঁটি মর্মর পাথর তুলে এনে তৈরি করতে হবে। মানুষের মহত্তম চরিত্রের মূল বিষয় হচ্ছে মন, দেহ নয়—যাকে এই জাদুঘরে রাখার সামগ্রীগুলোর সঙ্গে সম্মান করা উচিত। বেদির ওপর তাদের অবস্থানের সঙ্গে সংগতি রেখে অমর মানুষেরা কথা বলবে উচ্চকণ্ঠে, আবর্জনাতুল্য সাধারণ মানুষের মতো বিড়বিড় করে নয়।
সজনীকান্ত গং কাব্যশৈলীর অবক্ষয়ে এত বিরক্ত হন যে গদ্যের মতো মনে হওয়া এসব কাব্যচর্চাকে ব্যঙ্গ করার জন্য দুটো শব্দ মিলিয়ে তাঁরা একটা নতুন শব্দ আবিষ্কার করেন—‘গবিতা’, গদ্যের ‘গ’ এবং কবিতার ‘বিতা’ নিয়ে তৈরি শব্দটি ছিল একই রকম ইংরেজি শব্দ ‘Proetry’র একটা কাঁচা অনুবাদ। সজনীকান্তর এই শব্দটি মূলত ১৯৩০-এর দশকে কী ঘটবে তারই পূর্বাভাস ছিল, কারণ জীবনানন্দসহ আরও অনেকে এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তখন গদ্য কবিতা লিখছিলেন। ‘গবিতা’ শব্দটি দিয়ে কল্লোল যুগের কবিদের কবিতার অবমূল্যায়ন করার চেষ্টা করছিলেন সজনীকান্ত।