Pages

হুমায়ূন আহমেদ - আয়েশা ফয়েজ

হুমায়ূন আহমেদ - আয়েশা ফয়েজজন্ম থেকেই আমার সন্তানরা প্রতিভাবান : আয়েশা ফয়েজ
নিজের জন্য নয়, ঠিক ছোট সংসারের জন্যও নয়- প্রকাণ্ড বড় একটা বিমিশ্র সংসারের জন্য কঠিন ব্রত পালন করেছেন শহীদজায়া আয়েশা ফয়েজ। আমাদের সবার প্রিয় খালাম্মা। সংসারের হাল ধরতে গিয়ে সাধারণ জননী থেকে অসাধারণ এক জননীতে পরিণত হয়েছেন তিনি। ছয়টি সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে তাঁকে কত চোখের জল ফেলতে হয়েছে, কত অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়েছে, জননী হৃদয়ের ওই গভীরতর ব্যথা নিকটজন ছাড়া বোঝার নয়। মাঝেমধ্যে এসব কথা তিনি বলেছেন নিকটজনদের। খানিকটা লিখেছেন তাঁর আত্মকথা 'জীবন যে রকম' বইয়ে। লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সূত্রে অনেকবার তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। প্রতিবার সস্নেহে ডেকে নিয়েছেন কাছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বলেছেন। পরিবার, নিজের সন্তান, তাঁর স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা, ছেলেবেলা নিয়ে বলেছেন। সর্বশেষ গত রবিবার ১৪ জুলাই পল্লবীর বাসায় সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কথা হয়। সেদিন অনেক কথা বলেছেন তিনি। এর কিছু অংশ পরিবেশিত হলো প্রশ্নর পাঠকদের জন্য। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নওশাদ জামিল

প্রশ্ন : খালাম্মা, আপনার শৈশবের কথা জানতে চাচ্ছি। আপনার বেড়ে ওঠা, ভাইবোনদের কথা বলবেন কি? কয় ভাইবোন ছিলেন আপনারা?
আয়েশা ফয়েজ : আমাদের বাড়ি ছিল মোহনগঞ্জে। নেত্রকোনায়। বাড়িটাকে সবাই বলত 'শেখবাড়ি'। আমার বাবা আবুল হোসেন শেখ, মা খায়রুন্নেসা শেখ। আমরা ৯ ভাইবোন। ছয় ভাই, তিন বোন। পরিবারের প্রথম সন্তান ছিলাম। এ কারণে একটু বাড়াবাড়ি রকমের যত্ন-আদর ছিল। অত্যন্ত সুখের ছিল শৈশবের দিনগুলো।
প্রশ্ন : আপনার ছেলেবেলা ছিল ত্রিশের দশকে। সেই সময়ের দিনগুলো মনে পড়ে কি? তখনকার পরিবেশ কেমন ছিল?
আয়েশা ফয়েজ : সব কথা তো মনে নেই, বাবা। বয়সের কাছে হারিয়ে গেছে অনেক কথা। ৮৩ বছর বয়স এখন। আবছা আবছা লাগে স্মৃতিগুলো। ছোটবেলার কিছু স্মৃতি ভুলতে পারি না। আমরা ভাইবোনরা হৈচৈ করতাম, অনেক আনন্দ করতাম। আমাদের বাড়ি সারাক্ষণ যেন লোকজনে ভর্তি থাকত। চাচাতো ভাই, ফুফাতো ভাইবোন মিলে আনন্দ করতাম। চাচা, ফুফুরা আমাকে খুব আদর করতেন। ছোটবেলায় ঈদ এলে খুব একটা হৈচৈয়ের ব্যাপার হয়ে যেত। অনেক মানুষ আসত বাড়িতে। এটাই আমাদের কাছে আনন্দের ছিল। তখন সামান্য কিছুতেই অনেক আনন্দ ছিল।
প্রশ্ন : পর্দা প্রথা কি খুব কড়াকড়ি ছিল? আপনারা কি ঘরের বাইরে যেতে পারতেন?
আয়েশা ফয়েজ : সে সময় পর্দা প্রথার কড়াকড়ি ছিল, এর পরও বাবা আমাদের নানা জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যেতেন। পর্দার বেশি কড়াকড়ি ছিল আমার নানাবাড়িতে। আমাদের বাড়িতে এটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ের ছিল না। নানাবাড়িতে খুব পর্দাটর্দা থাকত। তারা বলত, মেয়েদের এত বেড়ানো ভালো নয়। তবে আমার মা-বাবা এসব নিয়ে কখনো বাড়াবাড়ি করেননি।
প্রশ্ন : আপনার বাবার কথা বলুন। তিনি কী করতেন?
আয়েশা ফয়েজ : বাবা রাজনীতি করতেন। মুসলিম লীগ করতেন। বিস্তর পণ্ডিত মানুষ ছিলেন তিনি। খুব বইটই পড়তেন। আমাদেরও পড়াতেন। পরিবারে পড়াশোনার ব্যাপারটা ছিল বরাবরই। পড়াশোনা নিয়ে বাবাও খুব আগ্রহী ছিলেন। তখন বাবা পত্রিকা আনতেন এবং সেটা আমরা পড়েছি কি না, খোঁজ নিতেন। আম্মাও খোঁজ নিতেন।
প্রশ্ন : আপনার মায়ের কথা জানতে চাচ্ছি।
আয়েশা ফয়েজ : আমার মা পড়াশোনা করতেন। স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। পড়াশোনার বিষয়ে আম্মাও খুব উৎসাহ দিতেন। আমাদের বাসায় প্রাইভেট মাস্টার ছিল, আর তখন জায়গির শিক্ষকের প্রচলন ছিল। একজন শিক্ষক, একজন ছাত্র বাধ্যতামূলক ছিল, সবার বাসায়ই। আমাদের পড়াশোনা শুরু হয় বাড়িতেই। আম্মা তা দেখভাল করতেন, তদারকি করতেন।
প্রশ্ন : আপনার আত্মকথা 'জীবন যে রকম' পড়ে জানতে পারি, আপনার বিয়ে হয় ১৯৪৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। বিয়ের প্রথম দিকের কথা, আপনার শ্বশুর-শাশুড়ি সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
আয়েশা ফয়েজ : বাবার পছন্দেই হুট করে আমার বিয়ে হয়ে যায়।
আমার বাবা হুমায়ূনের বাবাকে দেখেই পছন্দ করেন। বিয়ের পর মানুষটাকে ধীরে ধীরে জানতে পারি। অসম্ভব ভালো মানুষ হুমায়ূনের বাবা। মানুষটার কথা মনে হলেই বুকটা হাহাকার করে। এখন হুমায়ূনের জন্যও ওই শূন্যতা অনুভব করি (কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বারবার চোখ মোছেন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদেন)। চোখ মুছতে মুছতে বলেন, হুমায়ূনের বাবার শোক কাটিয়ে উঠেছিলাম। এখন ছেলে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারব না।
প্রশ্ন : (খালাম্মার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় ধরি) খালাম্মা, আল্লাহর কথা ভাবেন। আল্লাহ আপনার পাশেই থাকবেন (এরপর ধীরে ধীরে চোখ মোছেন তিনি)। খালাম্মা, এখন এসব কথা নয়। আপনার বিয়ের কথা বলছিলেন।
আয়েশা ফয়েজ : একেবারে বিয়ের প্রথম দিকের কথা বলি। প্রথম শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি। বউ ওঠানো হয়েছে, আত্মীয়স্বজনে ঘর ভরে গেছে। আমি তো এর আগে হুমায়ূনের বাবার কণ্ঠ শুনিনি। কিন্তু অনেক রাগারাগি হচ্ছে শুনতে পাচ্ছি। তখন ওই বাড়িতে নিয়ম ছিল, নতুন বউ এলে বউকে পান্তা ভাত আর শাড়ি দিয়ে বলবে, এই তোমাকে ভাত-কাপড় দিলাম। এটা বউ ঘরে তোলার একটা রীতি। কিন্তু হুমায়ূনের বাবা এটা মানবেই না। শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি।
প্রশ্ন : আপনাদের প্রথম সন্তান হুমায়ূন আহমেদ। প্রথম মা হওয়ার অনুভূতি প্রত্যেক জননীর জন্য এক স্বর্গীয় অনুভূতি। আপনার ওই স্মৃতি কি বলবেন?
আয়েশা ফয়েজ : প্রথম মা হওয়ার অনুভূতি বড় আনন্দের। সেসব কথা আর কী বলব! আমার বইটাতে লিখেছি। আমার চাচা ছিলেন হুমায়ূনের বাবার বন্ধু। তিনি এসে সিলেট থেকে আমাকে নিয়ে গেলেন। সবাই তো তখন অসম্ভব রকমের খুশি। আমার বাবার ছিল তিন ভাই। প্রত্যেকে আলাদাভাবে মিষ্টি নিয়ে এলেন। খুব খাওয়াদাওয়া, আনন্দ-অনুষ্ঠান হলো। তারপর আমি আবার সিলেটে এলাম। সিলেট থেকে পরে আবার গেলাম বাবার বাড়িতে। সেখানেই হুমায়ূনের জন্ম। ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর রাত ৯টার দিকে জন্ম হয় হুমায়ূনের।
প্রশ্ন : সন্তানের প্রথম মুখ দেখার অনুভূতি বলুন।
আয়েশা ফয়েজ : আমার বুকের ভেতর নড়েচড়ে গিয়েছিল আমার প্রথম সন্তানের মুখ দেখে। মাথা ভরা চুল, টকটকে ফরসা গায়ের রং, চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। তখন বুঝিনি, আমার এই ছেলেই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। তখন বুঝিনি, ছেলে আমার আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে (কথাটা বলেই দীর্ঘশ্বাস ফেলেন খালাম্মা। কিছুক্ষণ আনমনা হয়ে ডুবে যান স্মৃতির অতলে। চোখ তখন ছলছল করছিল। তারপর দীর্ঘ নীরবতা। অনেকক্ষণ পরে আবার বলা শুরু করেন)।
প্রশ্ন : হুমায়ূন আহমেদের নাম রাখা হয়েছিল কাজল। কাজল নামটা বুঝি আপনার প্রিয় ছিল?
আয়েশা ফয়েজ : কাজল নামটা রেখেছিল ওরা বাবা। নামটা ওর বাবার খুব পছন্দের ছিল। আমার কাছেও খারাপ লাগত না নামটা। কিন্তু এই নামও পরে আর টেকেনি।
প্রশ্ন : এরপর কি নাম রাখা হয় শামসুর রহমান?
আয়েশা ফয়েজ : আমার বাবা আর শ্বশুরের মধ্যে খুব ভাব ছিল। খাতির ছিল। তাঁরা দুজন মিলে রাখলেন শামসুর রহমান। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আমাকে শামসুর মা বলেই ডাকত। আমার শাশুড়ি কখনো হুমায়ূন আহমেদ নামটা গ্রহণ করেননি। শেষদিন পর্যন্ত তিনি আমাকে শামসুর মা বলে ডেকেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত হুমায়ূন আহমেদ নামটা স্থায়ী হয়েছিল।
প্রশ্ন : ছোটবেলায় হুমায়ূন আহমেদ নাকি খুব দুষ্টু ছিলেন? অনেক খামখেয়ালি আচরণ করতেন?
আয়েশা ফয়েজ : দুষ্টু হলেও বুদ্ধিমান ছিল। ওর বাবা বলত, ছেলের প্রতিটা কাজেই নাকি বুদ্ধির ছাপ ছিল। আবার মাঝেমধ্যে খামখেয়ালি আচরণ করত। কেমন যেন একটা পাগলামি করত। হঠাৎ করে হুলস্থুল-চিৎকার করত। তার বাবাকে এ কথা বললে বলতেন, ওর মধ্যে আলাদা একটা কিছু আছে। আবার বলতেন, প্রমথনাথ বিশি এমন ছিল। কোথায় কোথায় ঘুরতে যেত তার ঠিক নেই। কোনো খোঁজখবর নেই। একবার দেশে খুব দুর্ভিক্ষ হলো। সরকারিভাবে লঙ্গরখানা খুলে দেওয়া হলো। হুমায়ূন ওই লঙ্গরখানায় গিয়ে খেয়ে আসত। আমি খুব রেগে গেলাম। বললাম, লঙ্গরখানায় যদি খাওয়া লাগে, তাহলে বাসায় এসেছিস কেন? লঙ্গরখানাতেই যা। খুব রাগারাগি করলাম আমি। ওর বাবা শুনে বললেন, ওর মধ্যে বিশেষ কিছু আছে, যেটা অন্যদের মধ্যে নেই। হুমায়ূনের বাবা ছেলের সব কিছু সম্পর্কে একটা ভালো ব্যাখ্যা করতেন। আরেক দিনের ঘটনা, এক ফকিরকে ভাত খেতে দেওয়া হলো। সেই ফকির তার বিশাল এক টিনের থালায় ডাল দিয়ে খাচ্ছে, তা দেখে হুমায়ূনের খুব ভালো লাগল। এখন সেও সেভাবে ভাত খাবে, না হলে খাবে না। কী যে পাগলামি তার মাথার মধ্যে ঢুকত! পরে তাকে সেভাবে খেতে দেওয়া হলো। এ রকম পাগলামি তার ভেতরে ছিল। যেটা অন্যরা করত না, সেটা সে করবেই।
প্রশ্ন : ছেলেমেয়েরা নাকি ছোটবেলা থেকেই আঁকিবুকি করতেন। তাঁরা কি ছবি আঁকা কোথাও শিখেছিলেন?
আয়েশা ফয়েজ : আমার পরিবারের সবাই ছবি আঁকতে পারে। সব ছেলেমেয়ে আঁকতে পারে। কিভাবে ছবি আঁকা শিখল, সেটা আমার কাছেও বিস্ময়। হুমায়ূন খুব সুন্দর ছবি আঁকত। ইকবাল, শাহীন (আহসান হাবীব)- ওরা তো আঁকেই। ইকবাল তো কার্টুন এঁকে পড়ার খরচও চালাত। এখন জানতে চাইলে বলে যে বড় মামার কাছে শিখেছে। কিন্তু ওদের বড় মামা যে ছবি আঁকতে জানে, সেটা তো আমরাই জানতাম না। জন্ম থেকেই আমার সন্তানরা প্রতিভাবান। ওদের প্রতিভা বিকাশে আমার কোনো হাত নেই। কিভাবে যেন ওরা সব করেছে। হয়তো আল্লাহর অশেষ রহমত এটা।
প্রশ্ন : খালাম্মা, এবার আপনার সন্তানদের লেখালেখি প্রসঙ্গে আসি। আপনার তিন ছেলে দেশের শিল্প-সাহিত্য-শিক্ষা-সংস্কৃতিজগতের তিন নক্ষত্র। হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও আহসান হাবীব। কখনো কি ভেবেছিলেন, আপনার ছেলেরা লেখক হবেন?
আয়েশা ফয়েজ : সত্যি কথা, আমি ভাবিনি ওরা এত বড় লেখক হবে। কিন্তু ওদের বাবা ভাবতেন। তিনি বলতেন, দেখো, তোমার ছেলেরা বিখ্যাত হবে। ওদের বাবার কথা সত্যি হয়েছে। লেখালেখি, সাহিত্যচর্চা তো ওদের রক্তেই আছে। আমাদের পরিবারেও আছে। ওদের বাবা লিখতেন, পড়তে ভালোবাসতেন। তাঁর এই গুণটা ওরা পেয়েছে। ছোটবেলা থেকেই ওরা আঁকত। বই পড়ত।
প্রশ্ন : আপনি নিজেও পড়তে ভালোবাসেন। লেখালেখি পছন্দ করেন। পড়াশোনার প্রতি এই ভালোবাসা সন্তানদের মধ্যে আপনি কিভাবে সঞ্চারিত করেছিলেন?
আয়েশা ফয়েজ : আসলে আমি তেমন কিছু করিনি। কিভাবে যেন ওদের মধ্যে বইপড়ার একটা নেশা ঢুকে গিয়েছিল। ইকবালের প্রিয় লেখক ছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। একদিন বাসায় এসে বলল, মানিকসমগ্র বের হয়েছে। কিনতে ৩০০ টাকা লাগবে। কিনতে পারবে না বলে ওর মন খারাপ। আমি ইকবালকে টাকা দিলাম। বাসায় মানিকসমগ্র আসার পর অন্য রকম এক আবহ। তখন সবাই মানিকের বই পড়ছি। হুমায়ূনও পড়ত। আঁকত। আমি কখনো ভাবিনি, ওরা লেখক হবে। তবে ওদের বাবা ভাবতেন। আঁচ করতে পেরেছিলেন, ছেলেরা লেখক হবে। ওদের বাবা পুলিশ অফিসার হলেও খুব রসিক ছিলেন। তিনিও লেখালেখি করতেন। জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস করতেন। আমরা, বিশেষ করে আমি বিশ্বাস করতাম না। পরে দেখলাম, যা যা বলছেন তার অনেক কিছু সত্যি হয়েছে। হুমায়ূন সম্পর্কে বলতেন, 'অনেক বিখ্যাত হবে তোমার ছেলে! জানো, রানি এলিজাবেথের ছেলে আর তোমার ছেলের জন্ম একই দিনে, একই লগ্নে।' আমি বলতাম, কই রানি এলিজাবেথ, আর কই আমি! তিনি বলতেন, 'রানির ছেলে বিখ্যাত হবে তার মা-বাবার নামে। আমার ছেলে হবে নিজের যোগ্যতায়।' হুমায়ূনের যেকোনো দুষ্টুমির মধ্যেও বিশেষ কারণ খুঁজে পেতেন ওর বাবা। হুমায়ূন সারা দিন কই কই ঘুরত। আমি কিছু বললে ওর বাবা বলতেন, 'প্রমথনাথ বিশি এ রকম ছিলেন, কাজলের ভেতরে অন্য রকম কিছু আছে।' 'নন্দিত নরকে'র পাণ্ডুলিপি ওর আব্বাও পড়েছিলেন। দেখে বলেছেন, 'তোর হবে'।
প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন আপনার স্বামী ফয়জুর রহমান। পরবর্তী সময়ে ছয় সন্তান নিয়ে আপনাকে ভীষণ কষ্ট করতে হয়েছে। তখন আপনি সাহসের সঙ্গে হাল ধরেছিলেন সংসারের। পরে অমিত সাহস আর ধৈর্যের সঙ্গে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দিয়েছেন সন্তানদের। পেছনে তাকালে এখন কী মনে হয়?
আয়েশা ফয়েজ : টাকা-পয়সার জন্য, একটু মাথা গোঁজার জন্য অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। সন্তানরা তা জানে। যদিও কখনো ছেলেমেয়েদের কষ্টের কথা বলিনি। শেয়ার করিনি। কিন্তু ওরা ঠিকই বুঝত। আল্লাহর রহমতে অনেকে আমাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। ছেলেমেয়েদের বলি, তোমরাও মানুষকে বিপদ-আপদে সাহায্য করবে। সন্তানরা আমার কাছে উপদেশ চাইল, আমাদের জন্য আপনার কোনো উপদেশ আছে? আমি বলেছিলাম, উপদেশ নয়, একটি আদেশ আছে। আদেশটি হচ্ছে- কেউ যদি কখনো তোমাদের কাছে টাকা ধার চায় তোমরা 'না' বলবে না। আমাকে অসংখ্যবার মানুষের কাছে ধারের জন্য হাত পাততে হয়েছে। ধার চাওয়ার লজ্জা ও অপমান আমি জানি। আল্লাহর রহমতে, আমার সন্তানরা মানুষের বিপদে-আপদে সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করে। এই মাটি, এই মানুষকে ওরা অনেক ভালোবাসে। হুমায়ূনের বিদেশ ভালো লাগত না, ইকবালেরও তাই। ছোট ছেলে বিদেশে যেতেই চায় না।
প্রশ্ন : আপনার জীবনে অনেক সুখের ও আনন্দের স্মৃতি রয়েছে। দুঃখের কোনো স্মৃতি নয়, আপনার কি কোনো আনন্দময় স্মৃতির কথা মনে হয়?
আয়েশা ফয়েজ : এখন আর কোনো সুখের স্মৃতি মনে পড়ে না, দুঃখের স্মৃতি মনে পড়ে বেশি। একাত্তরের পর জীবনের ওপর দিয়ে কেমন ঝড় গেছে, অনেকের তা বোঝা সম্ভব নয়। তার পরও বিশ্বাস ছিল পারব। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানি। কথায় বলে না, 'এতিমের সংসার আল্লাহ চালায়।' আল্লাহর অশেষ কৃপায় সংসারের হাল ধরেছিলাম। আল্লাহর রহমত ছিল। কিভাবে ছেলেমেয়েরা এত বড় হলো, মানুষ হলো, আমি নিজেও এখন ভাবি। আর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলে আল্লাহ শোনেন। তাদের বাবা খুব সৎ মানুষ ছিলেন। ওদের বাবার দোয়া আছে। মানুষটার অছিলায় এই ছেলেগুলো মানুষ হয়েছে। ভাবতাম, বাচ্চাগুলোর কী হবে? আমার দোয়া আল্লাহ কবুল করেছেন।
প্রশ্ন : খালাম্মা, আমরা শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। হুমায়ূন আহমেদের ভক্ত, পাঠক, অনুরাগীদের উদ্দেশে আপনার কি কিছু বলার আছে?
আয়েশা ফয়েজ : হুমায়ূন তার কথা বইয়ে লিখে গেছে। আমাদের কথা লিখে গেছে। নতুন আর কী বলব! পাঠকরা তার জন্য, আমাদের পরিবারের জন্য যে দরদ দেখিয়েছেন, তার কোনো তুলনা নেই। আমার পরিবারের জন্য অনেকে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ছাড়া আর কী করতে পারি। আল্লাহ সবাইকে রহমত দেবেন- এ দোয়া করি।