Pages

প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ - ইমদাদুল হক মিলন [বইমেলা ২০১৩]

Prio Humayun Ahmed by Imdadul Haq Milanহুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে যেদিন পরিচয় হলো সেদিন আমার
মাথা ন্যাড়া। জীবনে দুবার ন্যাড়া হওয়ার কথা আমার মনে আছে। একবার একাত্তরের মাঝামাঝি, আরেকবার তিরাশির শুরুর দিকে। দুবারই মন ভালো ছিল না। একাত্তরে আমি এসএসসি ক্যান্ডিডেট। আমাদের বয়সী ছেলেরাও মুক্তিযুদ্ধে যাচ্ছে। এ কারণে বাবা আমাকে বাড়ি থেকে বেরোতে নিষেধ করে দিলেন। দুঃখে আমি ন্যাড়া হয়ে গেলাম। ন্যাড়া মাথা নিয়ে রাস্তায় বেরোতে লজ্জা করবে, ফলে বাড়ি থেকে বেরোনো হবে না।
সত্যি তা-ই হয়েছিল। ন্যাড়া মাথার কারণে একাত্তরের সময় অনেক দিন আমি বাড়ি থেকেই বেরোইনি। তিরাশি সালে সেই স্মৃতি মনে করেই ন্যাড়া হয়েছিলাম। আমার তখন রুজি-রোজগার নেই। একাশির অক্টোবরে জার্মানি থেকে ফিরে 'রোববার' পত্রিকায় জয়েন করেছি। ইত্তেফাকের সামনে দিন-দুপুরে ট্রাকের তলায় এক পথচারীকে থেঁতলে যেতে দেখে রোববারে একটা রিপোর্ট লিখলাম, সেই রিপোর্টে বিশেষ একটি মন্তব্য করায় চাকরি চলে গেল। তারপর বন্ধুদের সঙ্গে 'দোয়েল' নামে একটা অ্যাডফার্ম করলাম। এক-দেড় বছরের মাথায় সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। তত দিনে বিয়ে করে ফেলেছি। কিন্তু পকেটে দশটি টাকাও নেই। এ অবস্থায় সিদ্ধান্ত নিলাম, সমরেশ বসু হয়ে যাব। লিখে জীবন ধারণ করব। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশে সে যে কী কঠিন কাজ, আজকের কোনো তরুণ লেখক ভাবতেই পারবেন না। তখন একটা গল্প লিখে পঞ্চাশ-এক শ টাকা পাই। ঈদ সংখ্যার উপন্যাসের জন্য পাঁচ শ-এক হাজার। তাও পেতে সময় লাগে তিন-চার মাস। লেখার জায়গায়ও কম। এত পত্রপত্রিকা তখন ছিল না। দৈনিক পত্রিকায় উপন্যাস ছাপার নিয়ম ছিল না। কঠিন সময়। দু-চারটা বই তত দিনে বেরিয়েছে, সেগুলোর অবস্থাও ভালো না। পাবলিশাররা টাকাই দিতে চায় না। একটা বিখ্যাত প্রকাশন সংস্থা তো অভাবী লেখক দেখে ষোলো শ টাকায় আমার দুটি বইয়ের গ্রন্থস্বত্বই কিনে নিয়েছিল। প্রথম প্রকাশিত বইয়ের জন্য আমি কোনো টাকাই পাইনি। এ অবস্থায় লিখে জীবন ধারণ! সত্যি, সাহস ছিল আমার! সেই সব দিনের কথা ভাবলে এখনো বুক কাঁপে।
যা হোক, লিখে জীবন ধারণ মানে প্রতিদিন দিস্তা দিস্তা লেখা। লেখার জন্য সময় দেওয়া এবং ঘরে থাকা। কিন্তু সারা দিন ঘরে আমার মন বসবে কেমন করে! যখন-তখন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা না দিলে আমার পেটের ভাত হজম হয় না। তখনই একাত্তরের ন্যাড়া হওয়ার স্মৃতি মনে এসেছিল। ন্যাড়া হয়ে গেলাম। ন্যাড়া মাথা নিয়ে সারা দিন ঘরে বসে উন্মাদের মতো লিখি। লেখার কষ্ট দেখে জ্যোৎস্না একদিন আমার ন্যাড়া মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলেছিল, সাধ্য থাকলে তোমার লেখাগুলো আমি লিখে দিতাম।
সেবারের বাংলা একাডেমী বইমেলায় তিন-চারটা বই বেরোল। 'কালোঘোড়া', 'তাহারা' ইত্যাদি। বইয়ের বিক্রি বাড়াবার জন্য লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে ন্যাড়া মাথা নিয়েই মেলায় যাই। আমার অবস্থা যে বেশ ভালো তা বোঝাবার জন্য জার্মানি থেকে আনা জিনস-কেডস আর একেক দিন একেকটা শার্ট পরি। জ্যোৎস্নার মোটা ধরনের একটা সোনার চেইন পরে রাখি গলায়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমার অবস্থা তখন 'উপরে ফিটফাট, ভিতরে সদরঘাট'।
প্পরিয়কেটে সিগ্রেট খাওয়ার পয়সা পর্যন্ত থাকে না।
বইমেলায় এক বিকেলে নওরোজ কিতাবিস্তানে বসে আছি, প্রতিষ্ঠানটি তখনো ভাগ হয়নি, আমার 'তাহারা' বইটি হাতে নিয়ে চশমা পরা, রোগা, দেখলেই মেধাবী এবং তীক্ষ্ন বুদ্ধিসম্পন্ন মনে হয়, এমন একজন মানুষ সামনে এসে দাঁড়ালেন। অটোগ্রাফ। মুখের দিকে তাকিয়ে দিশেহারা হয়ে গেলাম। নিজের অজান্তে উঠে দাঁড়ালাম। মুখটি আমার চেনা। ছবি দেখেছি। হুমায়ূন আহমেদ। তখন পর্যন্ত খান ব্রাদার্স থেকে তাঁর তিনটি বই বেরিয়েছে। 'নন্দিত নরকে', 'শঙ্খনীল কারাগার' আর বাংলাদেশের প্রথম সায়েন্স ফিকশন 'তোমাদের জন্য ভালবাসা'।
তিনটি বইয়ের কোনো একটির ব্যাক কাভারে পাসপোর্ট সাইজের ছবিও আছে। আর কে না জানে, স্বাধীনতার পর পর 'নন্দিত নরকে' বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাস। আহমদ শরীফ, শওকত আলী, আহমদ ছফা_এই সব শ্রদ্ধেয় মানুষ উপন্যাসটির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সনাতন পাঠক ছদ্মনামের আড়ালে বসে তখনই বিখ্যাত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় 'দেশ' পত্রিকায় 'নন্দিত নরকে'র উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন।

Prio Humayun Ahmed by Imdadul Haq Milan [Amarboi.com]
পাঠক বইটি পড়বে এটাই আমাদের মৌলিক উদ্দেশ্য। আমরা চাই পাঠক বইটি পড়ুক, আলোচনা, সমালোচনা করুক, তাহলেই আমাদের সার্থকতা। নইলে এতো কষ্ট বৃথা, তাই আপনাদের মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম। আর্থিক ভাবে আমাদের সহায়তা করবার জন্য, অনুরোধ রইলো আমারবই.কম এর প্রিমিয়াম সদস্য হবার। বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন