Pages

সোনার পুতলা - আয়েশা ফয়েজ

সোনার পুতলা - আয়েশা ফয়েজকাজল, সবাই যাকে হুমায়ূন আহমেদ নামে জানে, আমার প্রথম সন্তান। আমার সোনার পুতলা ওর জন্মের সময় আমি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ি। ডাক্তার পর্যন্ত ডাকতে হয়েছিল। অবশ্য ডাক্তার আসার আগেই ওর জন্ম হয়। সুস্থ-সুন্দর সন্তানের মুখ দেখে সমস্ত যন্ত্রণা মুহূর্তেই উবে গিয়েছিল। সবাই খুব খুশি। আমার বাবা ছিলেন পরিবারের প্রথম সন্তান, আমিও আমার বাবার প্রথম মেয়ে, কাকতালীয়ভাবে আমার শ্বশুর ও স্বামীও ছিলেন পরিবারের প্রথম সন্তান। সে কারণেই আমাদের প্রথম সন্তান যখন ভূমিষ্ঠ হয়, তখন আনন্দটা একটু বেশিই ছিল।
'আমার ছেলেবেলা' গ্রন্থের এক জায়গায় হুমায়ূন লিখেছে : 'নভেম্বর মাসের দুর্দান্ত শীত গাড়ো পাহাড় থেকে উড়ে আসছে অসম্ভব শীতল হাওয়া। মাটির মালসায় আগুন করে নানিজান সেঁক দিয়ে আমাকে গরম করার চেষ্টা করছেন। আশপাশের বৌ-ঝিরা একের পর এক আসছে এবং আমাকে দেখে মুগ্ধ গলায় বলছে_ 'সোনার পুতলা'।
এতক্ষণ যা লিখলাম সবই শোনা কথা। মার কাছ থেকে শোনা। কিন্তু আমার কাছে খুব বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। কারণ আমি ঘোর কৃষ্ণবর্ণের মানুষ।'
হুমায়ূন বিশ্বাস না করুক, কিন্তু ছেলেবেলায় ও আসলেই টুকটুকে ফর্সা ছিল। এতটাই ফর্সা ছিল যে, ওর ফুফু-খালারা ওকে 'সোনার পুতলা' বলে ডাকত। কেন যে দিন দিন কালো হয়ে গেল ঠিক বুঝলাম না।
এদিকে সবাই ছেলে সন্তান হওয়ায় অনেক বেশি খুশি হলেও আমার স্বামীর প্রত্যাশা ছিল কন্যা সন্তানের। উনি ধরেই নিয়েছিলেন যে, আমাদের মেয়ে হবে। সে জন্য কন্যা সন্তানের জন্য জামা-কাপড়ও কিনেছিলেন। হুমায়ূনের অনেক ছেলেদের পোশাক থাকলেও ওর বাবা ওকে মেয়েদের পোশাক পরাতে বেশি পছন্দ করতেন। মেয়েদের পোশাকে ওর ছেলেবেলার অনেক ছবিও ছিল।
আরেকটি কথা, হুমায়ূনের বাবা কিন্তু জ্যোতিষ চর্চাও করতেন। তিনি জন্মের পরপরই ছেলেকে দেখে বলেছিলেন_ এই ছেলে অনেক বড় মাপের কেউ হবে।
হুমায়ূন আর প্রিন্স চার্লসের জন্ম একই দিনে। একদিন ওর বাবা আমাকে বললেন, দেখ আমাদের ছেলে একদিন চার্লসের মতোই বিখ্যাত হবে। আমি হেসে বললাম, কোথায় রানীর ছেলে আর কোথায় আমার ছেলে! উনি ভীষণ রেগে গেলেন। আমাকে বললেন, তুমি হাসলে কেন রানীর ছেলে বিখ্যাত হবে পারিবারিক কারণে আর আমার ছেলে বিখ্যাত হবে তার নিজের যোগ্যতায়। তখন তো তাঁর কথা হেসে উড়িয়ে দিয়েছি। কিন্তু পরে দেখেছি তাঁর প্রতিটি কথাই হুমায়ূন যে অনেক বড় মাপের লেখক হবে_ এটিও উনি বলেছিলেন। মনে পড়ে, হুমায়ূনের লেখা প্রথম উপন্যাস 'শঙ্খনীল কারাগার'-এর পাণ্ডুলিপি পড়ে উনি খুব উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, 'তুমি তো অনেক বড় লেখকের মা হতে যাচ্ছ। দ্যাখো ছেলের লেখা পড়ে দ্যাখো। কত চমৎকার লিখেছে! আমাদের ছেলে অবশ্যই একদিন অনেক বড় মাপের লেখক হবে। উনার নিজেরও সাহিত্যের প্রতি অনেক ঝোঁক ছিল। তার লেখা একটি বইও প্রকাশিত হয়েছিল। আরও বেশ কয়েকটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি ছিল। যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আগুনে সব পুড়ে গেছে।
লেখালেখির বিষয়টি যেমন হুমায়ূন ওর বাবার কাছ থেকে পেয়েছে, স্বভাবও অনেকটা ওর বাবার মতো। তিনিও ছিলেন অন্য ধরনের মানুষ। যেমন একদিন রাতে আমি এবং হুমায়ূনের বাবা সিনেমা দেখে ফিরছিলাম। রিকশাটা একটা দীঘির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার ওই দীঘিতে গোসল করার ইচ্ছা হয়েছিল। কেননা দীঘির পানি খুবই চমৎকার ছিল। চাঁদের আলোয় পানিটা একদম টলমল করছিল। দেখেই গোসল করতে ইচ্ছা হয়। তো আমি বললাম, ইস! আমি যদি এখন ওই পানিতে নামতে পারতাম! কথাটা বলতেই উনি বললেন, মানুষের জীবন খুবই সামান্য সময়ের। এসব ছোটখাটো ইচ্ছা অপূর্ণ রাখতে নেই। আমি বাধা দিয়ে বললাম, কী পাগলামি করছ? উনি বললেন, কোনো অসুবিধা নেই। চলো তো। পরে রিকশাওয়ালাকে দাঁড় করিয়ে রেখেই দু'জনে মিলে নেমে পড়লাম পানিতে। হুমায়ূনের একটা স্বভাব ছিল_ মানুষকে চমকে দিয়ে আনন্দ দিতে পছন্দ করত খুব। ওর বাবারও তো এই স্বভাবটা ছিল। বলা যায়, মানুুুুুষকে হঠাৎ ভয় দেখানো, নানারকম মজা করা, অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা করে সবাইকে চমকে দেওয়া_ এই অভ্যাসটা বাবা-ছেলে দু'জনের মধ্যেই প্রবল মাত্রায় ছিল।
হুমায়ূন ছোটবেলায় ভীষণ দুষ্টু ছিল। অদ্ভুত কাণ্ডকারখানায় মেতে থাকত সারাক্ষণ। আর এসব কিছুতে ওর বাবা বাধা তো দিতেনই না বরং সব সময় উৎসাহ দিতেন। একবার হুমায়ূনের কী এক অদ্ভুত খেয়াল হলো, গাছের কাঁঠাল সব পেড়ে ফেলবে। কাঁঠাল পেড়ে ফেললে নাকি লিচু হয়। আমি ওর বাবাকে বললাম সব। তখন উনি আমকে বললেন, তুমি বোঝ না কেন? নিশ্চয়ই এর ভেতর ওর অন্য ধরনের একটা চিন্তা আছে। আবার একবার ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে খেতে গেল লঙ্গরখানায়। পুলিশের ছেলেমেয়ে হিসেবে তখনকার কেউ একজন চিনতে পেরে ওদের বাসায় নিয়ে আসে। আমি তো সব কথা শুনে দু'জনকে অনেক বকাঝকা করলাম। ওদের বাবাকে কথাটা বললে সব কথা শুনে খানিকক্ষণ হাসলেন। বললেন, লঙ্গরখানায় যারা খায় তারাও মানুষ। তাদের সঙ্গে খেয়েছে বলে রাগ করার কিছু নেই। আমি তখন রাগ করে হুমায়ূনকে বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে, বাইরের খাবার যদি এতই ভালো লাগে তাহলে বের হয়েই যা। লঙ্গরখানাতেই খা। তখন উনি বললেন, তুমি এভাবে চিন্তা করো কেন? বিষয়টি অন্যভাবে চিন্তা করো। এরপর হুমায়ূনকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন লঙ্গরখানায় কেন খেতে গিয়েছিল। তখন হুমায়ূন বলল, কলাপাতায় যখন খাবার দেয়, খাবারটা অনেকখানি ছড়িয়ে যায়। দেখতে তখন বেশ লাগে। খেতেও ভালো লাগে। তখন ওর বাবা আমাকে বললেন, দেখেছ অন্যরা শুধু খেয়েই গেছে। কিন্তু সেটার মাঝে যে একটা সৌন্দর্য আছে, সেটা কেউ বোঝেনি। তোমার ছেলে সেটা বুঝেছে, ওর মধ্যে আলাদা একটা জিনিস আছে। ও অন্যরকম একটা কিছু করলেই তুমি রাগ করো না।
কেউ কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, কোনো অলৌখিক শক্তি বা কোনো রহস্যময় বিষয় কি হুমায়ূনের মধ্যে ছিল? আলাদা একটা শক্তি যে ছিল, তা আমি বিশ্বাস করি। ছোটবেলায় একবার আমাদের দেশের বাড়িতে রাতে উঠে একবার বলছে_ আম্মা আমি গরুর কথা বুঝতে পারছি। তখন আামি ওকে ধমক দিয়ে বললাম, গরুর কথা আবার মানুষ বোঝে কী করে? এখন ঘুমাও। তখন আমার ভাই বলল, পাশেই গরুর ঘর আছে। ওর ভুলটা ভাঙ্গিয়ে নিয়ে আসি। গরু পাহারা দেওয়ার জন্য ওখানে তো মানুষ ঘুমায়। ওকে দেখিয়ে নিয়ে আসি। হুমায়ূনকে কোলে করে নিয়ে আমার ভাই গরু ঘরের দিকে গেল। গিয়ে দেখি ওই ঘরে যে থাকে সে নেই। ফাঁকি দিয়ে সে রাতে যাত্রা দেখতে চলে গেছে। অর্থাৎ গরুর ঘরে গরুই আছে, পাহারা দেওয়ার মানুষ নেই। যা হোক, হুমায়ূন বরাবরই বলত, আমি গরুর কথা বুঝি। তখন আমি জিজ্ঞেস করতাম, আচ্ছা তুই কী বুঝিস, বল। ও বলত, আমি বলতে পারব না। তবে আমি গরুর কথা বুঝি। আমার একটা ধারণা ছিল যে, আল্লাহ একটা বিশেষ শক্তি ওকে দিয়েছেন। ও আসলেই কিছু একটা বুঝতে পেরেছিল। ওর যে বিশেষ একটা শক্তি ছিল, এটা আমি বিশ্বাস করি।

মনে পড়ছে, একটা সময় আমিও মানুষের ভবিষ্যৎ বলতে পারতাম। ওই সময়ে আমি স্বপ্নে যা দেখতাম, সেটা সত্যি হয়ে যেত। কিছু একটা মনে মনে চিন্তা করলে দেখা যেত সেটাও সত্যি হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে এ বিষয়গুলো আর ঘটে না।
হুমায়ূনের বাবার মৃত্যু প্রসঙ্গ যখন এলোই, এ সম্পর্কে কিছু বলি। যুদ্ধের সময় উনি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। তিনি তখন মহকুমা শহরে দায়িত্ব পালন করতেন। উনি সবাইকে বোঝালেন, মিলিটারিরা জেলা শহরগুলো পর্যন্তই আসবে। মহকুমা শহরে তারা আসবে না। পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা ছয় মাসের অগ্রিম বেতন উঠানোর সিদ্ধান্ত নিল। উনি সবাইকে কাজটি না করার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু কেউ তাঁর কথা শুনল না। এদিকে উনার স্বাক্ষর ছাড়া বেতন ওঠানো তো সম্ভব নয়। উনি বাধ্য হয়েই স্বাক্ষর করলেন। এরপর সবাই মিলে সেখানকার ট্রেজারি লুট করার সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি সবাইকে বোঝালেন, ট্রেজারি জ্বালিয়ে দিলে মিলিটারি এখানে আসবেই। তোমরা এ কাজটি করো না। তাঁর কথা কেউ শোনেনি। ট্রেজারি লুট হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেখানে মিলিটারি আসে। তখন আমরা বাবলা নামে একটি জায়গায় ছিলাম। তিনি যখন মিলিটারিদের সঙ্গে দেখা করার জন্য যেতে চাইলেন, আমি তাঁকে যেতে নিষেধ করেছিলাম। তিনি বললেন, পুলিশ কখনও পালিয়ে থাকতে পারে না। যেভাবেই হোক তারা আমাকে খুঁজে বের করবেই। আর যেহেতু আমার তিন ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সে কারণে আমাকে একটি বেশিই খোঁজ করবে। এরপর তাঁকে কোর্টে নিয়ে
উনাকেও নদীর পাড়ে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে। লাশ ভাসিয়ে দেয় নদীতে। ওই সময় তহশিলদারকেও ধরে নেওয়া হয়েছিল হত্যা করার জন্য। কিন্তু শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আফজাল হোসেনের পরামর্শে তাকে মিলিটারিরা বাঁচিয়ে রাখে। কারণ তাকে হত্যা করলে অর্থের হিসাবটা ঠিকমতো পাওয়া যাবে না। মৃত্যুর আগে তিনি নাকি বলেছিলেন, আমার ছেলে হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে পড়ে। তাঁকে তোমরা বলো তার বাবাকে অন্যায়ভাবে মিলিটারিরা হত্যা করেছে। তহশিলদার এ কথাটা শুনেছিল। তার এক ভাগ্নে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। তার মাধ্যমেই খবরটা পেয়েছিলাম। তাঁকে হত্যা করার পর কেউ কেউ বলত যে, তাঁকে ধরে নিয়ে গেছে, আবার কেউ কেউ বলত তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। ওই সময় আফজাল সাহেবের সঙ্গে দেখা করলে তিনিও বলেন, তোমার স্বামী বেঁচে আছে। তিনি যে মারা গেছেন এ কথা আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইতাম না। আমার মেজ ছেলে ইকবাল আমাকে বোঝাত_ দেখো, তুমি যদি এভাবে ভেঙে পড় আমাদের কী হবে? যুদ্ধে অনেকের বাবা মারা গেছেন। আমাদের বাবাও বেঁচে নেই। তুমি কারও কথা বিশ্বাস করো না। এর বেশ কিছু দিন পর তাঁকে যারা নদী থেকে তুলে কবর দিয়েছিল তাদের কাছে সংরক্ষিত থাকা উনার কিছু জিনিসপত্র দেখে তারপর কথাটি বিশ্বাস করি।
হুমায়ূনকেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। ওকে অনেক অত্যাচারও করেছিল। অনেকদিন আগের কথা তো। পুরোটা মনে নেই। সেই সময়ে হুমায়ূন হলে থাকত। একজন শিক্ষক আর ৫-৬ জন ছাত্রের সঙ্গে তাকেও ধরে নিয়ে গিয়েছিল। পরে তারা কীভাবে যেন জানতে পেরেছিল যে, ওর বাবাকেও আর্মিরা ধরে নিয়ে গেছে। বাবাকে আর্মিরা ধরে নিয়ে যাওয়ার পরও ছেলে হলে রয়েছে জেনে তার ওপর ভালোই অত্যাচার করে তারা। ওই সময়ে আমার দূরসম্পর্কের এক ভাই আর্মিতে চাকরি করতেন। তারই অনুরোধে খুব সম্ভবত হুমায়ূনকে ছেড়ে দেয়।
এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই। আমি বই পড়তে ভীষণ পছন্দ করি। আমার স্বামীর বই পড়ার প্রতি ঝোঁক রয়েছে শুনে আমার বাবা আমাকে রবীন্দ্রনাথের নৌকাডুবি উপন্যাসটা কিনে দিয়েছিলেন বিয়ের আগে। আর আমি নৌকাডুবি উপন্যাস পড়েছি জেনে আমার স্বামী অবাক হয়ে গিয়েছিলেন।
ছেলের লেখা প্রতিটি বইই আমার অনেক প্রিয়। এমনকি যেসব বই সম্পর্কে অনেকে বলে যে, বইটি ভালো হয়নি, সেসব বইও আমার অনেক ভালো লাগে। হুমায়ূন লেখা শুরু করার আগে আমি ভারতীয় লেখকদের লেখা অনেক পড়তাম। কোনো বই না পাওয়া গেলে ভারত থেকে আনিয়ে নিতাম। কিন্তু ছেলে লেখা শুরু করার পর অন্য কারও লেখা পড়ার আর প্রয়োজন পড়েনি। ছেলের লেখা প্রতিটি উপন্যাসই আমার খুবই প্রিয়। আমি ওকে একদিন বললাম, কী চিকন চিকন বই লিখিস! অল্প সময়েই শেষ হয়ে যায়। মোটা বই লিখতে পারিস না, যাতে অনেকদিন ধরে পড়তে পারি?
এবার হুমায়ূনের স্কুল প্রতিষ্ঠার কথা বলি। ... হুমায়ূনের বাবা মানুষের বাড়িতে জায়গির থেকে পড়ালেখা করেছিলেন। তো আমি ওকে বলেছিলাম, আল্লাহ তো তোকে অনেক কিছুই দিয়েছে। তোর বাবা অনেক কষ্ট করে পড়ালেখা শিখেছে। তুই এই এলাকার ছেলেমেয়েদের কষ্ট দূর করার জন্য একটা স্কুল করে দে। এর পরই ও নেত্রকোনায় 'শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ' নামে একটি বিদালয় গড়ে তোলে।
হুমায়ূন বিদেশ পছন্দ করত না, হাসপাতাল পছন্দ করত না। ডাক্তার পছন্দ করত না। আমি হাসপাতালে গেলে একমাত্র আমাকে দেখতে হাসপাতালে যেত। এমনকি হাসপাতালে যাওয়ার ভয়ে নিজের অসুখ-বিসুখও চাপা দিয়ে রাখত। বিদেশে ও যখন পিএইচডি করতে যায় প্রায়ই বলত, আমি আর পড়ব না। দেশে ফিরে আসব। যে দেশের মানুষ ঠিকমতো খেতে পায় না, সে দেশের মানুষের এত পড়ে কী হবে? তখন আমি অনেক বোঝাতাম।
হুমায়ূন দেশকে ভালোবাসত, দেশের মানুষকে ভালোবাসত। দেশের মানুষও যে ওকে কত পছন্দ করে, কত ভালোবাসে ওকে_ এটা শহীদ মিনারেই দেখলাম; নুহাশ পল্লীতে ওকে কবর দেওয়ার সময়ও দেখেছি। কিন্তু এ দৃশ্য আমি কখনোই দেখতে চাইনি। এর চেয়ে অনেক বেশি আনন্দের হতো আমার কবরের মাটি যদি আমার ছেলে দিয়ে যেতে পারত। সন্তানের লাশের সামনে বসে থাকার চেয়ে বড় কোনো কষ্ট একজন মায়ের হতে পারে না।
এখন হুমায়ূন নুহাশ পল্লীর লিচুতলায় শুয়ে আছে। জন্মের পর কয়েক বছর ও আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। নানার বাড়িতে নানির কাছে মানুষ হয়েছে। কেননা আমি তখন অসুস্থ ছিলাম। সুস্থ হওয়ার পর যখন আমার বুকের মানিককে কাছে পেলাম, তখন ওকে জড়িয়ে ধরে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলাম_ বাকি জীবন যেন আমার ছেলেকে তিনি সুখে রাখেন; শান্তিতে রাখেন। তা হয়নি। হুমায়ূন সুখ পায়নি; শান্তি পায়নি। তাই পরম করুণাময়ের কাছে আমার প্রার্থনা: ইহলোকে ওকে শান্তি না দিলেও পরলোকে তুমি শান্তি দাও। ওর আত্মা শান্তি পাক।