Pages

জেনারেল ও নারীরা - আনিসুল হক

জেনারেল ও নারীরা - আনিসুল হক (বইমেলা ২০১৬) জেনারেল ও নারীরা - আনিসুল হক

রাষ্ট্রপতিতালয়, পিন্ডি, ১৯৭১
পিন্ডির রাষ্ট্রপতিতালয়, যেখানে পতিতাগণের অবাধ আসা-যাওয়া, সেখানে ড্রেন দিয়ে পানি প্রবাহিত হয় না, বয়ে চলে মদের ধারা। সারাক্ষণ ভুরভুর করে মদের গন্ধ বেরোচ্ছে ড্রেন থেকে, ঘর থেকে, টেবিল থেকে, বেশ্যাদের মুখ থেকে, রাষ্ট্রপতিতের মুখ থেকে, মেহমানদের মুখ থেকে। ড্রেনে এত মদ বয়ে যায় যে, ওখানকার ড্রেনের পোকাগুলো পর্যন্ত হাটতে পারে না, টলমল করে তাদের পা, মাছিরা উড়তে পারে না, মদালস পাখা কীভাবেই বা মেলবে তারা। সুবিস্তৃত বাগান আছে রাষ্ট্রপতিতালয়ের সামনে-পেছনে, সেখানে ফুলের গন্ধ নাই, আছে তামাকের ধোয়া। যৌনকর্মীরা সারাক্ষণ আসছে, যাচ্ছে; তাদের গা থেকে বেরোচ্ছে হালাল সুগন্ধি, যারা সারাক্ষণ ডুবে আছে মদে আর তামাকের ধোয়ায়, সুগন্ধিতে মদ থাকলে তাদের আবার চলে না, কারণ তারা হারাম পারফিউম গায়ে মাখতে পারে না, তারা ব্যবহার করে হালাল আতর। ফাকিস্তানের রাজধানী পিন্ডি। রাষ্ট্রপতিত থাকেন রাষ্ট্রপতিতালয়ে।
ইয়াহিয়া এখন তার কক্ষে। সেগুন কাঠের কারুকার্যময় দরজা ভেতর থেকে আটকানো। বাইরে অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন রাষ্ট্রপতিতালয়ের কর্মকর্তারা ।
সুলতান শাহরিয়ার বললেন, ‘তোমাকে বারবার করে ফাকিস্তান, বাকিস্তান, রাষ্ট্রপতিতালয় বলতে হবে না। তুমি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে যাও। তুমি পাকিস্তান বললেও আমরা বুঝব তুমি ফাকিস্তানের কথাই বলছ। তুমি প্রেসিডেন্ট বললেও আমরা বুঝব তুমি বোঝাচ্ছ রাষ্ট্রপতিত। হা হা হা ।
শাহেরজাদি তার গল্প বলে চলেছে :
ক্রিং ক্রিং। ফোন বাজছে।
সামরিক সচিব জেনারেল ইসহাক ফোন ধরলেন, ‘এমএস বলছি।
‘প্রেসিডেন্ট কি বেরিয়েছেন? শাহ এখনি বেরোবেন । তাকে ফেয়ারওয়েল দিতে হবে । অলরেডি আমরা লেট ।'
‘প্রেসিডেন্ট বের হননি।'
"কখন বের হবেন?"
বলা মুশকিল। তিনি তার ঘরে। তিনি ঘর থেকে বের হচ্ছেন না।
‘এগিয়ে যান। তাকে ডাকুন। এটা রাষ্ট্ৰীয় প্রোগ্রাম। ইরানের শাহর ফ্লাইট ছেড়ে দেবার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট কখন আসবেন আর কখনই বা ইরানের শাহকে বিদায় জানাবেন?
“কিন্তু আমরা কী করব? প্রেসিডেন্টের ঘরে তার অতিথি আছেন।"
‘প্রেসিডেন্টের ঘরের দরজা কি ভেতর থেকে বন্ধ?
'তা তো জানি না।"
গিয়ে ধাক্কা মারুন।'
"সেটা তো সম্ভব না।"
ক্রিং ক্রিং।
‘প্রেসিডেন্ট কি বেরিয়েছেন?
ক্রিং ক্রিং। "প্রেসিডেন্ট কি বেরিয়েছেন?"
ক্রিং। ক্রিং।
ক্রিং ক্রিং। প্রেসিডেন্ট কি বের হয়েছেন?
ক্রিং ক্রিং। জি না, বের হননি। জি, আমি দেখছি কী করা যায়?
প্রেসিডেন্টের সামরিক সচিব জেনারেল ইসহাক কী করতে পারেন?
কিন্তু এতবার ফোন আসছে। পররাষ্ট্রবিষয়ক কর্তারা এত অস্থির হয়ে গেছেন—তার একটা কিছু করা দরকার।
প্রেসিডেন্টকে ডিস্টার্ব করা যাচ্ছে না, কারণ তার কক্ষে নুরজাহান। পাকিস্তানের মালিকা ই তারানুম। প্রেসিডেন্ট যাকে আদর করে ডাকেন নুরি। গায়িকা এবং নায়িকা।
জেনারেল ইসহাক মুশকিলে পড়লেন। একটা উপায় হলো প্রেসিডেন্টের ফোনে কল দেওয়া। কিন্তু দেবেটা কে? কার ঘাড়ে দুইটা মাথা ।
উপায় নাই। জেনারেল ইসহাক তার টেবিলের ওপরের লাল রঙের ফোনটা তুললেন। নম্বরে আঙুল দিয়ে ডায়াল ঘোরালেন। রিং হচ্ছে। কেউ ধরছে না।
জেনারেল ইসহাক বিপন্ন। প্রেসিডেন্ট হাউসের স্টাফরা সবাই দাড়িয়ে আছে, কিংকর্তব্যবিমূঢ় ।
মহা কেলেঙ্কারি হতে যাচ্ছে। পিআইএর বিমানটা পিন্ডি এয়ারপোর্টে প্রস্তুত। ইরানের শাহ তার লটবহর নিয়ে তৈরি হয়ে বসে আছেন। এখন প্রেসিডেন্ট যদি না বেরোন, তাহলে সারা পৃথিবীকে মুখ দেখানোর উপায় থাকবে না ।
হঠাৎ জেনারেল ইসহাকের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তার মনে একটা আশার সঞ্চার হয়েছে। তিনি একটা আলোর রেখা দেখতে পেলেন। একমাত্র জেনারেল রানি পারেন তাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে।
রানির বালামখানা খুব দূরে নয়। জেনারেল ইসহাক মোটরগাড়িতে ছুটলেন সেই বালামখানার দিকে। দ্রুত ঢুকে গেলেন বাড়িতে। বাড়ির বাইরে পুলিশ প্রহরীরা জেনারেলের গাড়ি দেখে তাকে ঢুকতে দিল বিনা বাক্যব্যয়ে। এই প্রমোদকুঞ্জেও নানা জাতের জেনারেলরা সব সময়ই আসা-যাওয়া করেন। তাদের ঢুকতে দেওয়াই দস্তর।
জেনারেল ইসহাক বললেন, মাতাজি, আপনাকে এক্ষুনি আমার সঙ্গে যেতে হবে।'
তাকে ডাকা হয় জেনারেল রানি বলে। রানি পরে আছেন একটা আঁটসাট কামিজ, নিচের দিকে ঢোলা ওপরের দিকে চিপা একটা সালোয়ার। তার ওড়না হাতে, ওড়নার দুই প্রান্ত পায়ের দিকে গড়াচ্ছে। তার ঠোট লাল, তার হাত ভরা সোনার বালা ।
রানি বললেন, তবিয়ত ঠিক আছে?
জি?’ জেনারেল ইসহাক চমকে উঠলেন।
শরীর ঠিক আছে?"