Pages

প্রান্তিক মানব (পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তুজীবনের কথা) - প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী

প্রান্তিক মানব (পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তুজীবনের কথা) - প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী
প্রান্তিক মানব
(পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তুজীবনের কথা)
প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী

১৯৯০ এ প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী ইংরেজিতে একটি বই লেখেন The Marginal Men ; The Refugees and the Left Political Syndrome in West Bengal নামে। ১৯৯৩-এ বইটি ‘রবীন্দ্র স্মৃতি’ পুরস্কার সহ দেশে ও বিদেশের পাঠকসমাজে বইটি রীতিমত আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। অনেক অনুরোধের পর প্রফুল্লকুমার বইটি বাংলা অনুবাদ করতে সম্মত হন। কারন এই বইয়ের যারা নায়ক-বিপুল উদ্বাস্তু জনসমষ্টি, ইংরেজিতে লেখা বইটি তাদের ধরাছোয়ার বাইরে ছিল। পরে তাঁর কৃতী ছাত্ৰ শ্ৰীমান কালীপদ সেনের সহায়তায় বইটির একটি বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে। বইটির নাম দেওয়া হয়; "প্রান্তিক মানব (পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তুজীবনের কথা)"। কিন্তু প্রশ্ন রয়েই যায় যে বই বাংলায় লেখাই স্বাভাবিক ছিল সেটি লেখক কেন ইংরেজিতে লিখলেন? জবাবে লেখক বলেছেন; "একটি বিশেষ কারণে বইটি ইংরেজি ভাষায় লেখার প্রয়োজন বোধ করেছিলাম। এই বই-এর উপাদান সংগ্রহের জন্য যখন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে উদ্বাস্তু ক্যাম্প ও কলোনি ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম তখন বাঙালি উদ্বাস্তুদের সম্পর্কে অ-বাঙালির এমনকী সম্পন্ন বাঙালিদের মুখেও এই ধরণের অবজ্ঞাভদ্রা উন্নাসিক উক্তি প্রায়ই শুনতে হত : কাদের নিয়ে বই লিখছেন আপনি! বাঙালি উদ্বাস্তুদের তো মানুষ বলেই মনে হয় না; এরা অলস, অকৰ্মণ্য, অপদার্থ। একবার পাঞ্জাবি উদ্ধাস্তুদের দিকে তাকিয়ে দেখুন। তাহলেই পার্থক্যটা বুঝতে পারবেন! ওরা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে। ওদের দেখে কে বলবে ওরা সব হারিয়ে পাকিস্তান থেকে চলে এসেছে। ওদের গা থেকে উদ্ধাস্তু গন্ধ মুছে গেছে। ওরা এখন এদেশের সন্ত্রান্ত, সম্পন্ন মানুষ। প্রতিবাদ করার মতো উপাদান তখনো আমার হাতে ছিল না। তখনো ক্যাম্পে কলোনিতে, দিল্লি ও কলকাতায় মহাফেজখানা ও গ্রন্থাগারে আমি উদ্ধাস্তুদের ইতিহাস রচনার উপাদান খুঁজছিলাম। যত দিন যেতে লাগল, যত বিভিন্ন তথা, দলিল ও কাগজপত্র আমাৰ হাতে আসতে লাগল ততই একটি সত্য ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠল : পূর্ববঙ্গের হিন্দুরা অলস, অকৰ্মণা বা অপদার্থ নয়। তারা কেন্দ্রীয সরকাবের নির্মম অবহেলার শিকার। এই অবহেলা এমনই পক্ষপাতদুষ্ট ও ভয়ানক যে মনে হয় কেন্দ্রীয় সরকার উদ্ধাস্তু বলতে পশ্চিম-পাকিস্তানি উদ্ধাস্তুদেব বুঝেছিল। পূর্ব-পাকিস্তানের উদ্ধাস্তুবা আসলে উদ্বাস্তুই নয়, তাদেব পুনর্বাসনের দায়িত্বও কেন্দ্রীয সবকারের নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের ঔদাসীন্য পূর্ববঙ্গের লক্ষ লক্ষ হৃতসর্বস্ব মানুষকে উদ্বৗস্তু আশ্রয় শিবিরে পশুর জীবন যাপন করতে বাধ্য করেছে। এদের পুনর্বািসন দেওয়া হবে কি না সে বিষযে মনস্থির করতে কেন্দ্রীয় সবকারের ১০ বছর সময় লেগেছিল। এই ১০ বছবে ক্যাম্পেব খাচায় আবদ্ধ মানুষগুলির মনুষ্যত্ব পুরোপুরি নিঃশেষিত হয়ে যায়। পশ্চিম-পাকিস্থানি উদ্বাস্তুদেব জন্য প্রায় সারা ভাবতের ঐশ্বর্য ঢেলে দেওয়া হযেছিল। তারা ক্ষতিপূরণ পেয়েছে, পাঞ্জাবের এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের দেশত্যাগী মুসলমানদের সম্পত্তি পেয়েছে। ভারত সরকার তাদের জন্য আধুনিক শিল্পনগরী নির্মাণ করে দিয়েছে। পশ্চিম-পাকিস্তানে তারা যা ফেলে এসেছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি তারা পেযেছে এই দেশে। পূর্ব-পাকিস্তানের উদ্বাস্তুরা পেয়েছে শুধু বঞ্চনা। তারা ক্ষতিপূরণ পায়নি. দেশত্যাগী মুসলমানদের সম্পত্তি পায়নি। ভারত সরকার কথা দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গেও উদ্বাস্তু শিল্পনগরী নির্মাণ করবে। সে কথা সে রাখেনি। চরম দুৰ্গতির মধ্যেও অনিঃশেষিত প্রাণশক্তিকে সম্বল করে তারা জোট বেঁধেছে। জবরদখল কলোনি গড়ে তুলেছে, বেঁচে থাকার জন্য আন্দোলন করেছে। এবং পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যানুসারী সমাজে ও রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এই গ্ৰন্থ রচনার সময় আমার মনে হয়েছিল যে এই সত্যটি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মানুষের কাছে উপস্থাপিত করা প্রয়োজন যাতে বাঙালি চরিত্রের বিরুদ্ধে দুরভিসন্ধিমূলক প্রচার বন্ধ হয়। যাতে বাঙালি চরিত্রের অন্তর্নিহিত সহনশীলতা, মৃদুতা, দৃঢ়তা এবং শক্তির পরিচয় মেলে। বইটি তাই ইংরেজিতে লিখেছিলাম।"

লেখক বইয়ের শুরুতে বলছেন, "দেশ বিভাজনের পর পূর্ব-পাকিস্তান থেকে হিন্দুদের ঘর ছেড়ে বাধ্যতামূলকভাবে চলে আসা সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাসমূহের অন্যতম। সুন্দরী জন্মভূমির সঙ্গে ভালোবাসার অচ্ছেদ্যবন্ধনে আবদ্ধ একটি জীবন্ত, জাগ্ৰত মনুষ্যগোষ্ঠীকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলে দেওয়ার এই কাহিনী। কিন্তু পাঞ্জাবে যা ঘটেছিল, পূর্ববাংলায় তা ঘটেনি। এক প্রচণ্ড বিধ্বংসী হত্যালীলা ও জনবিনিময়ের দ্বারা জন্মভূমি থেকে দুই বিপুল মনুষ্যগোষ্ঠীকে স্বল্পকালের মধ্যে উপড়ে ফেলার কাজ সম্পন্ন হয়েছিল পাঞ্জাবে। কিন্তু বিভক্ত বাংলায় হিন্দু-মুসলমান-এই দুই মনুষ্যগোষ্ঠীর বিনিময় হয়নি। পূর্ব-পাকিস্তান থেকে চলে আসতে হয়েছিল শুধু হিন্দুদের। কিন্তু মুসলমানদের পূর্ব-পাকিস্তানে চলে যেতে হয়নি। পাঞ্জাবের মতো কোনো মহাপ্ৰলয় হয়নি বাংলায়। পূর্ব-পাকিস্তানের সব হিন্দুদের একসঙ্গে একই সময়ে উপড়ে ভারতে ছুড়ে দেওয়া হয়নি। কিন্তু পূর্ব-পাকিস্তান থেকে বাঙালি হিন্দুদের উপড়ে ফেলাটা একটা দীর্ঘকালব্যাপী যন্ত্রণাময় প্রক্রিয়া। দেশ বিভাজনের পর বাঙালি হিন্দুদের অবস্থা হয়েছিল ফাদে-পড়া জন্তুর মতো। হিন্দুদের ধনসম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তাদের বিতাড়নের জন্য মাঝে মাঝে সরকারি আমলাতন্ত্র ও মুসলমান জনসাধারণের যোগসাজশে একতরফা দাঙ্গা হয়েছে। আর হৃতসর্বস্ব বিধ্বস্ত মানুষের তরঙ্গ এসে এপারে আছড়ে পড়েছে। কখনো এই জনস্রোত এসেছে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ উন্মত্ত তরঙ্গের মতো; কখনো এসেছে ক্ষীণ ধারায়। কিন্তু কখনো তা থেমে থাকেনি।"

বইটি অবশ্য পাঠ্য।