সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label কলাম. Show all posts
Showing posts with label কলাম. Show all posts

সুপার হিরো - হুমায়ূন আহমেদ

super-hero-humayun-ahmed
সুপার হিরো - হুমায়ূন আহমেদ


হিরো একটি পশ্চিমা কনসেপ্ট। এদের কমিক বইয়ে হিরো আছে (ব্যাটম্যান, স্পাইডারম্যান, সুপারম্যান), বাস্তবেও আছে।
আমাদের তেমন কিছু নেই। মাঝেমধ্যে এক-আধজনকে পাওয়া যায়— ভাঙা রেললাইনের সামনে গামছা নিয়ে দাঁড়িয়ে ট্রেন থামায়। অনেকের জীবন রক্ষা করে। আমরা কিছুদিন তাকে নিয়ে হইচই করে ব্যাক টু দ্যা প্যাভিলিয়ন। উল্টো ব্যাপারও আছে, পুরো ট্রেন জ্বালিয়ে দেওয়া।
পশ্চিমা একজন হিরোর গল্প দিয়ে আজকের লেখা শুরু করছি। তার নাম টেরি ফক্স। কানাডার এক যুবক। মাত্র বাইশ বছর বয়সে ভয়াবহ ক্যানসার (osteosarcoma) তাকে আক্রমণ করল। তার একটি পা কেটে ফেলে দিতে হলো। টেরি ফক্স হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ভাবলেন, ক্যানসার গবেষণার জন্যে আরও অর্থ প্রয়োজন। তিনি ঘোষণা করলেন, এক পা নিয়েই তিনি কানাডার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত দৌড়ে ক্যানসারের জন্যে অর্থ সংগ্রহ করবেন।
আটলান্টিক সমুদ্রে পা ডুবিয়ে তিনি দৌড় শুরু করলেন। তত দিনে একটা নকল পা লাগানো হয়েছে। এক শ তেতাল্লিশ দিন পর্যন্ত তিনি নকল পায়ে দৌড়ালেন। ৩,৩৩১ মাইল অতিক্রম করে তাকে থামতে হলো। কারণ ক্যানসার তখন ফুসফুস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। মাত্র তেইশ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। তিনি ক্যানসার রিসার্চের জন্যে রেখে গেলেন সংগ্রহ করা এক শ মিলিয়ন ডলার। এখন সংগ্রহ পাঁচ শ মিলিয়ন ছেড়ে গেছে।
ক্যানসার রিসার্চের অর্থ সংগ্রহের জন্যে বিশ্বজুড়েই টেরি ফক্স ম্যারাথন হয়। পঁচিশতম ম্যারাথনে পৃথিবীর তিন মিলিয়ন মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল। আমার যতদূর মনে পড়ে, বাংলাদেশেও এই ম্যারাথন হয়েছে।
ক্যানসার হাসপাতাল ও গবেষণাকেন্দ্রের জন্যে আমরা অর্থ সংগ্রহে নামতে যাচ্ছি। আমাদের গুরু অবশ্যই টেরি ফক্স।
আমি টেকনাফে বঙ্গোপসাগরে পা ডুবিয়ে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত যাব। আমার পক্ষে দৌড়ানো সম্ভব না। কারণ শিশুপুত্র আমার দুই পা চেপে ধরে থাকবে। এরা পা চেপে ধরায় ওস্তাদ। আমি পরিবার ছাড়া এক দিনও একা থাকতে পারি না। আমার সঙ্গে আমার দুই শিশুপুত্র এবং তাদের মা থাকবে। আমরা প্রতীকী অর্থে মাঝে মাঝে দৌড়াব। বাকিটা গাড়িতে। এই আনন্দযাত্রায় সবাইকে আমন্ত্রণ।
ক্যানসার ইনস্টিটিউটের জন্যে আমি যে সাড়া পেয়েছি তাতে আমার মনে হয়েছে আমার মানবজীবন ধন্য। কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।
অভিনেতা রহমত (নয় নম্বর বিপদ সংকেত) আমাকে জানিয়েছেন রাজশাহীতে তাঁর পাঁচ বিঘা জমি দিতে চান। যদি ক্যানসার ইনস্টিটিউট ঢাকায় হয় তাহলে তিনি তাঁর সঞ্চিত পাঁচ লাখ টাকা দিতে চান। এর বেশি তাঁর আর নেই। থাকলে তাও দিতেন।
নিউইয়র্কের বাঙালি ডাক্তার নাহরিন মামুন জানিয়েছেন ঢাকায় তাঁর জমি আছে। পুরোটাই তিনি ক্যানসার ইনস্টিটিউটকে দিয়ে দিতে চান। আমি যখন বলব তখন।
জেনেভা থেকে আনজু ফেরদৌসী জানিয়েছেন, তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সঞ্চয় ১০ হাজার ডলার শুরুতে দিতে চান। এক্ষুনি দিতে চান। পরে যদি কিছু খরচ হয়ে যায়।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, আমেরিকার প্রধান প্রধান হাসপাতালে বাংলাদেশের ডাক্তার সন্তানরা প্রবল প্রতাপে রাজত্ব করে যাচ্ছেন।
পৃথিবীর সেরা অনকোলজিস্টের অনেকেই বাংলাদেশি। একজন অনকোলজিস্ট রথীন্দ্রনাথ বসু ওভারিয়ান ক্যানসারে যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছেন।
এঁরা সবাই বাংলাদেশের ক্যানসার ইনস্টিটিউটের জন্যে যা করণীয় তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
অনলাইনে দেখলাম, ২৫০ জন নিজেদের ভিক্ষুক ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁরা অর্থ সংগ্রহের জন্যে ভিক্ষার থালা নিয়ে পথে বের হবেন।
আর হিমুর দল তো হলুদ পাঞ্জাবি পরে তৈরি হয়েই আছে। তারা নাচুনি বুড়ি। ঢোলের বাদ্যের অপেক্ষা।
কনফুসিয়াসের বিখ্যাত বাণী সবাইকে মনে করিয়ে দেই। ‘আ জার্নি অব আ থাউজ্যান্ড মাইলস বিগিনস উইথ আ সিংগল স্টেপ’। আমরা কিন্তু প্রথম ‘স্টেপ’ নিয়ে নিয়েছি।
আল্লাহপাক বলেছেন, তোমরা বেহেশতে প্রবেশ করবে হিংসামুক্ত অবস্থায়।
আমাদের ক্যানসার হাসপাতালে একই অবস্থা। তবে হিংসা না, সবাইকে প্রবেশ করতে হবে রাজনীতিমুক্ত অবস্থায়। ডাক্তাররা আওয়ামী লীগ, বিএনপি করবেন, ইলেকশন হবে, মারামারি হবে—তা কখনো না।
পৃথিবীর কোথাও আমি ছাত্রদের এবং শিক্ষকদের রাজনৈতিক দল করতে দেখিনি। এই অর্থহীন মূর্খামি বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যাপার। এই মূর্খদের মধ্যে আমিও ছিলাম। ড. আহমদ শরীফ এবং অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অতি শ্রদ্ধেয় দুজন। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সাদা দলে ইলেকশন করেছি। এখন নিজেকে ক্ষুদ্র মনে হয়। মূর্খ মনে হয়। আমাদের ক্যানসার ইনস্টিটিউটে মূর্খদের প্রবেশাধিকার নেই।
বিশ্বমানের গবেষণা শুরুতেই আমাদের ইনস্টিটিউটের পক্ষে সম্ভব হবে বলে আমার মনে হচ্ছে না। তবে সারা বিশ্বের ক্যানসারের ওপর গবেষণার ফলাফল তারা ব্যবহার করতে পারবেন।
বিদেশি ডাক্তারদের প্রতি আমাদের এক ধরনের মোহ আছে। মোহভঙ্গের সময় এসেছে। বাংলাদেশের সেরা অনকোলজিস্টরা ইনস্টিটিউট চালাবেন। একটি আমেরিকান হাসপাতালে সর্বাধুনিক যেসব যন্ত্রপাতি থাকবে তার সবই থাকবে আমাদের ইনস্টিটিউটে। যন্ত্রপাতি দেখাশোনা এবং পরিচালনার জন্যে দক্ষ শক্তিশালী টিম থাকবে। বর্তমান চিকিৎসা অতিমাত্রায় যন্ত্রনির্ভর।
দামি যন্ত্রপাতি কেনার বাংলাদেশি স্টাইলে আমরা যাব না। কোনো টেন্ডার না। ইনস্টিটিউট ঠিক করবে তার কী যন্ত্র দরকার। তারা সরাসরি কিনবে।
বাংলাদেশি স্টাইল হলো—প্রথমে টেন্ডার ডাকা হবে। ক্ষমতাসীন দল এবং তাদের পোষা ছাত্র দল ঝাঁপিয়ে পড়বে। টেন্ডার হয়ে যাবে। এখন বিদেশ ভ্রমণ পালা। নানান টিম আলাদা আলাদাভাবে যন্ত্র কেনা এবং তার প্রয়োগ জানতে বিদেশ ভ্রমণ করবে। সবশেষে যাবেন মন্ত্রী মহোদয় (স্ত্রী এবং শ্যালিকাসহ)।
যন্ত্র কেনার পর সবার আগ্রহ শেষ হয়ে যাবে। চট্টগ্রাম বন্দরে যন্ত্র পড়ে থাকবে দিনের পর দিন। কেউ ছুটিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করবে না। ছুটানোর দায়িত্ব কার এই নিয়ে জটিলতা। যন্ত্র ছোটানোতে আর মালকড়ি পাওয়ার সম্ভাবনা নাই।
এক সময় যন্ত্র ছাড় করা হবে। যন্ত্র বসাতে লাগবে প্রায় এক বছর। তত দিনে যন্ত্র বেঁকে বসেছে। এটা একটা সুসংবাদ, কারণ যন্ত্র কেন কাজ করছে না এটা জানার জন্যে বেশ কিছু দল আবার বিদেশ সফর করবে। স্ত্রী-শ্যালিকাসহ মন্ত্রী মহোদয় আবারও যাবেন।
পাদটীকা
বাংলাদেশের একজন রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্যে আমেরিকায় এসেছেন। নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি সেরা ডাক্তারকে দিয়ে চিকিৎসা করাবেন। তাঁর রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং বিভাগীয় প্রধান রোগী দেখতে এসে বললেন, আপনার কী কী সমস্যা আমাকে বলবেন?
রোগী চোখ কপালে তুলে বললেন, আপনি বাংলাদেশি নাকি?
হ্যাঁ। আমার বাড়ি চিটাগাং।
রোগী থমথমে গলায় বললেন, এত টাকা-পয়সা খরচ করে আমেরিকায় এসে আমি বাংলাদেশি ডাক্তারের চিকিৎসা নিব না। আমেরিকান ডাক্তার লাগবে। বাংলাদেশি দিয়ে চলবে না।


একটা ব্যাপার আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা যখন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়েছি, তখন পশ্চিমারা বাঁদরের চেয়ে সামান্য ওপরে অবস্থান করছিল।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের শুরুটা আমরা করেছি। চৈনিক ও আরবদের অবস্থান আমাদের নিচে। পাঁচ হাজার বছর আগে আমাদের সার্জনরা প্লাস্টিক সার্জারি করতেন।
কর্কট রোগ (ক্যানসার) সম্পর্কে পাঁচ হাজার বছর আগের ভারতীয় চিকিৎসকেরা নিদান দিয়ে গেছেন। শূন্য এবং অসীম—এই দুই সংখ্যা আমাদের আবিষ্কার।
আমাদের সবার উচিত শৈশবের একটি কবিতা নতুন করে পড়া—
‘আমরা যদি না জাগি মা
কেমনে সকাল হবে?’

You can follow us on Twitter or join our Facebook fanpage to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature.
Download Bangla books in pdf form mediafire.com and also read it online. Read it from iPad, iPhone. Put book name and author, bangla ebooks, free download , mediafire , humayun ahmed , zafar iqbal , sunil gangopadhaya , suchitra , bengali ebooks, free bangla books online, ebooks bangla, bangla pdf, bangla books, boi, bangla boi, amarboi.
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

amarboi.com
বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড - মুহম্মদ জাফর ইকবাল


বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

কিছুদিন আগে আমি হিসাব করে দেখলাম, আমাদের দেশে এখন অনেক অলিম্পিয়াড শুরু হয়েছে। গণিত অলিম্পিয়াড দিয়ে শুরু। তারপর দেখতে দেখতে বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড, রসায়ন অলিম্পিয়াড, প্রাণরসায়ন অলিম্পিয়াড, অ্যাস্ট্রোনমি অলিম্পিয়াড, ভাষা অলিম্পিয়াড এবং এমনকি একেবারে শেষ সংযোজন দাবা অলিম্পিয়াড! সবটা যে একই রকম ও
আকারে হচ্ছে, তা নয়। কিন্তু শুরু যে হয়েছে_ সেটাই সবচেয়ে বড় কথা। আন্তর্জাতিক গণিত আর ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড থেকে আমাদের ছেলেমেয়েরা এর মধ্যে রীতিমতো মেডেল নিয়ে এসেছে। অন্য কয়েকটাতে পৃথিবীর আসরে বাংলাদেশের নাম সম্মানসূচকভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। আমাদের বড় বড় মানুষ, বড় বড় খেলোয়াড়রা যা পারেননি, বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়ে সেটা করে ফেলছে। কী চমৎকার একটা ব্যাপার!
এই চমৎকার ব্যাপারটার মাঝেও কিন্তু আমাদের খানিকটা ক্ষোভ রয়ে গেছে। বড় মানুষেরা যেটা দেশের জন্য করতে পারেননি, ছোট বাচ্চারা সেটা করে ফেলছে। তারপরও এই বিষয়গুলোতে কেন জানি সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়া যায় না। সরকারের কথা ছেড়েই দিলাম, সামরিক বাহিনীর জন্য সরকারের বিশাল বাজেট। এবার মনে হয় সেটা আরও বেড়ে গেছে। আমাদের কোনো আপত্তি থাকত না, যদি দেখতাম আমাদের শিক্ষা খাতেও বাজেট একইভাবে বাড়ছে। কিন্তু আসলে সেটি ঘটেনি, শিক্ষা খাতে বাজেট কমেছে। একটি ছাত্র যদি একটু কিছু শেখে, সঙ্গে সঙ্গে দেশ আরও একটু সম্পদশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু তারপরও শিক্ষার বাজেট কমতে থাকে! আর শিক্ষার পাশাপাশি এই কার্যক্রমগুলো? সেগুলোর জন্য কোথাও কোনো অর্থ নেই! এক গণিত অলিম্পিয়াড ছাড়া অন্য কোনো অলিম্পিয়াডের ভদ্র কোনো বাজেট আছে বলে আমার জানা নেই। কেউ যদি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন, তাহলে তারা অবাক হয়ে দেখবেন, অনেক ক্ষেত্রেই একেবারে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিছু মানুষের অর্থ সাহায্যে এগুলো টিকে আছে! আমার কাছে ব্যাপারটা রহস্যের মতো মনে হয়_ শিশুদের জন্য টাকা খরচ করতে সবার এত কার্পণ্য কেন? একটি ব্যান্ড শো বা একটি ক্রিকেট খেলার জন্য আক্ষরিক অর্থে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়। কিন্তু শিশুদের কার্যক্রম চালাতে উৎসাহী মানুষেরা বড় বড় কোম্পানি, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের দ্বারে ঘুরতে থাকেন, কিন্তু কেউ ফিরেও তাকায় না। এই দেশের হর্তা-কর্তা-বিধাতারা এত শিশুবিদ্বেষী কেন? আমি তার অর্থ খুঁজে বের করতে পারি না! কেউ কি কখনও লক্ষ্য করেছেন ঈদে প্রায় কয়েকশ' নাটক দেখানো হয়, তার মধ্যে বাচ্চাদের নাটক বলতে গেলে একটিও নেই! যদিও এ দেশে শুধু স্কুলের বাচ্চার সংখ্যাই তিন কোটি! ছোট বাচ্চাদের বিনোদনের কোনো সুযোগ নেই, তাদের জন্য আলাদা কোনো সিনেমা তৈরি হয় না, বই লেখা হয় না। কী আশ্চর্য!
তারপরও আমাদের দেশের বাচ্চারা হচ্ছে আমাদের অনুপ্রেরণার সবচেয়ে বড় উৎস। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে বই পড়ার একটা বিশাল কর্মযজ্ঞ চালানো হয়। যারা সেই কর্মযজ্ঞের সঙ্গে জড়িত, তারা জানেন সেখানে ছেলেমেয়েরা কী ম্যাজিক করে ফেলছে! বিভিন্ন অলিম্পিয়াডে যারা গিয়েছে, সেখানে বাচ্চাদের যারা একনজর দেখেছে, শুধু তারাই এ দেশের জন্য নতুন করে স্বপ্ন দেখতে পারবে।
আজ বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের জাতীয় অনুষ্ঠানটি উদযাপিত হতে যাচ্ছে। সারাদেশ থেকে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে বিভাগীয় প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে এখানে অংশ নেবে। যারা সেই অলিম্পিয়াডে অংশ নেয়, সেই শিশুরা বেশি আনন্দ পায়, নাকি আমরা যারা সেই শিশুদের দেখি তারা বেশি আনন্দ পাই_ সে ব্যাপারটি এখনও পরিষ্কার হয়নি! দেশ নিয়ে, পৃথিবী নিয়ে কতজনের কত অভিযোগ। কিন্তু এ রকম একটি অলিম্পিয়াডে এসে এই বাচ্চাদের একনজর দেখলে হঠাৎ মনে হয়_ কিসের দুঃখ, কিসের কষ্ট? যে দেশে এ রকম উৎসাহী শিশুরা এত আগ্রহ নিয়ে বিজ্ঞানচর্চা করে, সেই দেশ যদি মাথা তুলে না দাঁড়ায়, তাহলে কোন দেশ মাথা তুলে দাঁড়াবে?
বাংলাদেশ একাডেমী অব সায়েন্সের প্রতি কৃতজ্ঞতা এ রকম একটি অলিম্পিয়াড আয়োজন করার জন্য। সমকালের প্রতি কৃতজ্ঞতা এতে সঙ্গী হয়ে এগিয়ে আসার জন্য। আর দেশের শিশুদের কাছে কৃতজ্ঞতা আমাদের দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।

You can follow us on Twitter or join our Facebook fanpage to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature.
Download Bangla books in pdf form mediafire.com and also read it online. Read it from iPad, iPhone. Put book name and author, bangla ebooks, free download , mediafire , humayun ahmed , zafar iqbal , sunil gangopadhaya , suchitra , bengali ebooks, free bangla books online, ebooks bangla, bangla pdf, bangla books, boi, bangla boi, amarboi.
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

বাতেনি চিকিৎসক আব্দুস সোবাহান হুমায়ূন আহমেদ

Bateni-Chikitshok-Humayun-Ahmed
বাতেনি চিকিৎসক আব্দুস সোবাহান
হুমায়ূন আহমেদ

Click Here to get a free 2GB Dropbox Account for Download Books.
সাইনবোর্ডে লেখা, 'এইডস, ক্যান্সারসহ যাবতীয় রোগ-ব্যাধি গেরেন্টিসহ চিকিৎসা করা হয়। প্যাকেজ ডিল, বিফলে মূল্য ফেরত। গালে চড়।'
মগবাজারে যাবার পথে গাড়ি থেকে কয়েকবার এই সাইনবোর্ড চোখে পড়েছে। 'গালে চড়' লেখা পড়ে মজা পেয়েছি কিন্তু কখনো এইডস-ক্যান্সারের চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা হয় নি। ঢাকা শহরভর্তি এই ধরনের ধন্বন্তরি চিকিৎসক। তাদের বেশির ভাগই ডাবল গোল্ডমেডালিস্ট এবং গ্যারান্টিসহ ক্যান্সারের মতো দুরন্ত ব্যাধি আরোগ্য করে থাকেন।
এই ধরনের চিকিৎসকদের নিয়ে একটি গল্প লিখব বলে কয়েক বছর ধরেই ভাবছি। লেখা হয় নি। কারণ তাদের কারোর সঙ্গেই আমার দেখা হয় নি। তাদের সঙ্গে পরিচয় সাইনবোর্ডের মাধ্যমে।
গত ঈদে বড় ধরনের ঝামেলায় পড়লাম লেখা নিয়ে। বেশ কিছু লেখা লিখতে হবে, বিষয়বস্তু খুঁজে পাচ্ছি না। শুধু হিমু আর মিসির আলি লিখলে চলবে না, এর বাইরেও কিছু লিখতে হবে। হঠাৎ মনে হলো, ধন্বন্তরি সাইনবোর্ড চিকিৎসক নিয়ে একটা বড় গল্প লেখা যেতে পারে।
বাংলাদেশে প্রকাশিত অনেক পত্রিকার ঈদের আবদার মিটাতে পারি। ঈদ এলেই পত্রিকা সম্পাদক সস্তা জনপ্রিয় লেখকদের লেখার জন্য মহাব্যস্ত হয়ে পড়েন। ঈদের ঝামেলা শেষ হলে তাদের পত্রিকাতেই সস্তা বাজারি লেখকরা সাহিত্যের কী ক্ষতি করছেন তা বেশ আয়োজন করেই লেখা। অন্য বাজারি লেখকদের বিষয়ে আমি জানি না, নিজের কথা বলতে পারি_ আমি এই ধরনের লেখা পড়ে কি জানি কেন, যথেষ্ট মজা পাই।
নুহাশপল্লীর ম্যানেজারকে সঙ্গে নিয়ে বিফলে মূল্য ফেরত, গালে চড় চিকিৎসকের কাছে এক সন্ধ্যাবেলায় উপস্থিত হলাম।
দুই কামরার অফিস। একটিতে চিকিৎসকের অ্যাসিস্ট্যান্ট বসে আছেন। অন্যটিতে চিকিৎসক। মাঝখানে ট্রান্সলুসেন্ট গ্গ্নাসের দরজা। এই ধরনের গ্গ্নাসের ভেতর দিয়ে পরিষ্কার কিছু দেখা যায় না, নড়াচড়া চোখে পড়ে। আমি গেছি গল্পের সন্ধানে, আমাকে সবকিছু খুঁটিয়ে দেখতে হবে। চিকিৎসকের অ্যাসিস্ট্যান্টকে দেখে অবাক হলাম, মধ্যবয়স্ক হিজাব পরা একজন মহিলা কুস্তিগীর। বিশাল শরীর, গাবদা গাবদা হাত। সাহিত্যের ভাষায় সমীহ জাগানিয়া দেহ।
মহিলা বললেন, নাম রেজিস্ট্রি করতে হবে। রোগী কে?
আমি ম্যানেজারকে দেখিয়ে দিলাম। মহিলা ম্যানেজারের দিকে এক পাতার ফরম এগিয়ে দিলেন। ফরম ফিলাপ করতে হবে। আমি ফরমে চোখ বুলালাম। গল্প লেখার জন্য ফরমের একটা নমুনা আমার প্রয়োজন। ফরমটা এ রকম_
রেজিস্ট্রেশন নং :
(অফিস পূরণ করিবে)
নাম : (পূর্ণ নাম)
ঠিকানা : (মোবাইল নংসহ)
বয়স :
ওজন :
উচ্চতা :
গাত্র বর্ণ : (ফর্সা/শ্যামলা/কৃষ্ণ)
(টিক মার্ক দিন)
পছন্দের স্বাদ : মিষ্টি/তিতা/টক
(টিক মার্ক দিন)
ধূমপান : হ্যাঁ/না
(টিক মার্ক দিন)
পানে জর্দা : হ্যাঁ/না
(টিক মার্ক দিন)
পছন্দের আবহাওয়া : শীত/উষ্ণ
(টিক মার্ক দিন)
পছন্দের খাবার : মাছ/মাংস/সবজি
(টিক মার্ক দিন)
ব্যাধির চিকিৎসায় গাত্র বর্ণ লাগছে, পছন্দের খাবার লাগছে, পছন্দের আবহাওয়া লাগছে দেখে মনে হচ্ছে চিকিৎসা পদ্ধতি হোমিওপ্যাথি।
আমার বাবা এক সময় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতিতে কিছুদিনের জন্য ঝুঁকেছিলেন। তিনি মাত্র বারোটা ওষুধে চিকিৎসা করতেন। প্রায়ই আমাদের জিভে এক ফোঁটা ওষুধ দিতেন এবং সাগুদানার মতো (মিষ্টি) চার-পাঁচটা করে বড়ি খেতে হতো। বারো ওষুধের এই চিকিৎসা পদ্ধতি হোমিওপ্যাথির এক উপশাখা। নাম খুব সম্ভব বায়োকেমিক চিকিৎসা। এই চিকিৎসা শাস্ত্রের জনকের নাম_ 'সুসলার'।
ম্যানেজার চিন্তিত মুখে ফরম ফিলাপ করছে। জরুরি কোনো ফরম (যেমন আমেরিকান ভিসা বা ডিভি ফরম) ফিলাপ করার সময় চেহারা যেমন হয়, তার চেহারা সে রকম।
মহিলা অ্যাসিস্ট্যান্ট আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, স্যার, আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি। আমি আপনার নাটক দেখেছি।
আমি মনে মনে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললাম। পত্রপত্রিকা, টেলিভিশনের কারণে নিজেকে আড়াল করা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা সময় ছিল যখন কেউ আমাকে চিনে ফেললে ভালো লাগত। আগ্রহ, আনন্দ (কিছু অহঙ্কার) নিয়ে আলাপ করতাম। এখন অসহ্য লাগে।
মহিলা অ্যাসিস্ট্যান্ট বললেন, ডাক্তার সাহেব ধ্যানে বসেছেন। একটু দেরি হবে। এই ফাঁকে এক কাপ চা খান স্যার।
আমি অবাক হয়ে বললাম, উনি ধ্যান করেন নাকি?
জি। অনেক সংবাদ তিনি ধ্যানের মাধ্যমে পান।
কী ধরনের সংবাদ?
এই যেমন আপনারা এসেছেন, আপনাদের কার কী রোগ উনি ধ্যানের মাধ্যমে পেয়ে যাবেন।
আমি বললাম, ভালো তো। বর্তমানের চিকিৎসকরা নানা যন্ত্রপাতি দিয়ে রোগ নির্ণয় করেন। ধ্যান লাইনে চিকিৎসার কথা তেমন শোনা যায় না।
আমাকে রঙ চা দেওয়া হয়েছে। লেবুর গন্ধ, চা পাতার গন্ধ মিলে চা-টা খেতে ভালো হয়েছে। শুধু ভালো বললে কম বলা হয়। যথেষ্টই ভালো।
ম্যানেজারের ফরম ফিলাপ শেষ হয়েছে। মহিলা অ্যাসিস্ট্যান্ট বলল, রেজিস্ট্রেশন ফি দিন। নাম রেজিস্ট্রি হবে। সব তথ্য কম্পিউটারে চলে যাবে। বিশ বছর পরে এলেও সব তথ্য পাবেন।
এই প্রথম লক্ষ করলাম, মহিলা অ্যাসিস্ট্যান্টের সাইড টেবিলে একটা ল্যাপটপ আছে। যে চিকিৎসক ধ্যানের মাধ্যমে চিকিৎসা করেন, তিনি আবার ল্যাপটপও ব্যবহার করেন দেখে আনন্দ পেলাম।
ম্যানেজার বলল, রেজিস্ট্রেশন ফি কত?
মহিলা বললেন, নরম্যাল এক শ' টাকা, সেমি আর্জেন্ট দুই শ' টাকা, আর্জেন্ট পাঁচ শ' টাকা।
ম্যানেজার আমার দিকে তাকাল। আমি বললাম, পাঁচ শ' টাকা দিয়ে দাও। আর্জেন্টই ভালো।
মহিলা ল্যাপটপে টিপাটিপি করতে করতে আমাকে বললেন, স্যার আপনার নাটকে অনেক ভুলভ্রান্তি থাকে। এটা ঠিক না।
আমি বললাম, অবশ্যই ঠিক না।
আপনার একটা নাটক চ্যানেল আই-এ প্রায়ই দেখায়। নাটকটা ভুলে ভর্তি। এটার প্রচার বন্ধ হওয়া দরকার।
আমি বললাম, কোন নাটক?
নাটকের নাম 'পাপ'। সেখানে একজন পাকিস্তানি সোলজার পাঞ্জাবি ভাষায় কথা বলে। ভুল পাঞ্জাবি।
আমি বললাম, আপনি পাঞ্জাবি জানেন?
মহিলা বলল, আমি জানি না তবে যিনি আমাকে ভুলের কথা বলেছেন তিনি পাঞ্জাবি জানেন। অনেকদিন পাঞ্জাবে ছিলেন।
নাটক নিয়ে হয়তো আরও আলোচনা হতো তার আগেই চিকিৎসকের ঘরে আমাদের ডাক পড়ল। মহিলা অ্যাসিস্ট্যান্ট বললেন, স্যার, আপনারা জুতা এই ঘরে রেখে খালি পায়ে ঢুকবেন। উনার ঘরে জুতা পায়ে ঢোকা নিষেধ।
আমরা খালি পায়ে ঘরে ঢুকলাম। এখন চিকিৎসকের বর্ণনা দেই। চেহারা অনেকখানি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আব্রাহম লিংকনের মতো। দাড়ি কেটে ফেলার পর। গাল ভাঙা। নাক থেকে ঠোঁটের দূরত্ব অনেকখানি। মাথার সব চুল এবং ভুরু পাকা। বয়স নিশ্চয়ই ষাট থেকে সত্তরের মধ্যে। তাঁর গা থেকে পাকা তেঁতুলের টক গন্ধ আসছে। টক গন্ধি মানুষ আমি জীবনে প্রথম দেখলাম।
ঘরে চেয়ার-টেবিল নেই, কার্পেট পাতা। কার্পেটের ওপর শাদা রঙের একটা উলের আসনে চিকিৎসক পদ্মাসনের ভঙিতে বসা। তার পরনে শাদা লুঙ্গি, শাদা ফতুয়া। কাঁধে সিল্কের একটা উড়নির মতো ঝুলছে। উড়নির রঙও শাদা। চিকিৎসক এই উড়নি দিয়ে কিছুক্ষণ পরপর নাক-মুখ চেপে ধরেছেন। কেন এটা করছেন তা বুঝা যাচ্ছে না। চিকিৎসক চাপা গলায় বললেন, ধ্যানের মাধ্যমে পেয়েছি আপনারা ক্যান্সার ব্যাধির তদবিরে এসেছেন। ঠিক আছে?
ম্যানেজার আমার দিকে তাকাল। আমরা কোনো ব্যাধির তদবিরেই আসি নি। গল্পের ব্যাকগ্রাউন্ডের সন্ধানে এসেছি। যাই হোক, আমি বললাম, জি জনাব। আপনার অনুমান সঠিক।
চিকিৎসক নাক-মুখ থেকে সাদা উড়নি নামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি আপনাদের চিনেছি। আপনার নাম মোঃ হুমায়ূন কবীর। ঠিক হয়েছে?
পুরোপুরি ঠিক বলা চলে না। আমার নামের আগে মোহাম্মদ নেই, শেষেও কবীর নেই। তার পরেও ঝামেলা এড়ানোর জন্য বললাম, জি। এইবারও আপনার অনুমান সঠিক।
চিকিৎসক বললেন, আপনি নাটক লেখেন, নাটকে অনেক ভুল-ভ্রান্তি থাকে। আমি অবশ্যি দেখি না। আমার মেয়ে আমাকে বলেছে। মেয়ের সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে। সে-ই আমার অ্যাসিস্টেন্ট।
আমি বললাম, ভালো তো।
চিকিৎসক বললেন, চিকিৎসা শুরু করার আগে ক্যান্সার ব্যাধি বিষয়ে জানা দরকার। আপনারা কি জানেন?
আমি বললাম, কিছুটা জানি। সাধারণ জীবকোষ যখন মিউটেট করে তখনই ব্যাধির শুরু।
চিকিৎসক বললেন, আপনি যা জানেন তা হলো জাহেরি জানা। এই জ্ঞানে কিছু সত্য আছে তবে মূল সত্য নাই। মূল সত্য আছে বাতেনি জ্ঞানে। বাতেনি হলো অপ্রকাশ্য। বাতেনি জ্ঞান, অপ্রকাশ্য জ্ঞান। বুঝলেন?
আমি এবং ম্যানেজার দু'জনই হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লাম।
চিকিৎসক উড়নি দিয়ে নাক ঘষতে ঘষতে বললেন, বাতেনি জ্ঞান বলে ক্যান্সার ব্যাধির সৃষ্টিকর্তা হলো খারাপ ধরনের কিছু জি্বন। এরা জি্বন সমাজেও অভিশপ্ত বলে মানুষের শরীরের ভেতর লুকিয়ে থাকে। কেউ লিভারে বসে থাকে, কেউ ফুসফুসে বসে থাকে। আমাদের সবার শরীরে এ রকম একাধিক জি্বন বাস করে।
ম্যানেজার আঁতকে উঠে বলল, বলেন কী হুজুর!
চিকিৎসক বিরক্ত গলায় বললেন, আমাকে হুজুর বলবেন না। আমি হুজুর না। আমার গালভর্তি দাড়ি নাই, মাথায় পাগড়িও নাই। আমি চিকিৎসক।
ম্যানেজার বলল, সরি।
চিকিৎসক বললেন, সরি হবার কিছু নাই। অনেকেই এই ভুল করে। যাই হোক যে কথা বলছিলাম, দুষ্ট এই জি্বন শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বসে থাকলেও আমাদের কোনো ক্ষতি হয় না। যখন এই সব পুরুষ জি্বনের সঙ্গে মেয়ে জি্বন শরীরে ঢুকে তখনই সমস্যা।
আমি বললাম, কী রকম সমস্যা?
চিকিৎসক বললেন, মনে করেন একটা দুষ্ট জি্বন আপনার ফুসফুসে বাস করে। একা একা থাকে। হঠাৎ সেখানে একটা মেয়ে জি্বন এসে গেল। তখন তারা ঘর বানিয়ে সংসার পাতে। জাহেরি জ্ঞানে এই ঘরকেই বলে টিউমার। পুরুষ এবং নারী জি্বন একসময় সন্তান সৃষ্টি করতে থাকে। সন্তানরা হয় অনেক। ঘরে তাদের জায়গা হয় না। তারা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। আলাদা বাসা বানায়। জাহেরি জ্ঞানে একে বলে মেটাসটেসিস। বুঝলেন?
আমি বললাম, বুঝার চেষ্টা করছি।
চিকিৎসক বললেন, আপনার শরীরে দুষ্ট জি্বন তার সঙ্গিনী পেয়েছে, তারা ঘর বানানো শুরু করেছে তবে এখনো সন্তান উৎপাদন শুরু করে নাই।
আমি একবার ভাবলাম বলি, রোগী আমি না। আমার ম্যানেজার। তার নামই রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। তারপর ভাবলাম কথা বাড়িয়ে লাভ কী। এই ভদ্রলোকের সঙ্গে আজই প্রথম দেখা, আজই শেষ। আমার প্রয়োজন গল্প। গল্প পেয়ে গেছি।
চিকিৎসক বললেন, আমার প্রধান কাজ হবে জি্বন-দম্পতির সন্তান উৎপাদন বন্ধ করা।
আমি বললাম, জি্বনের ফ্যামিলি প্ল্যানিং করাবেন? চিকিৎসক আহত গলায় বললেন, আপনি লেখক মানুষ বলেই বাতেনি কিছু কথা আপনাকে বললাম, এই নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করবেন না। আপনি আগামী সোমবার থেকে রোজ সন্ধ্যায় আসবেন চিকিৎসা শুরু হবে। মেয়ে জি্বনটাকে তাড়ালেই হবে।
আমি বললাম, আপনার অশেষ মেহেরবানি।
গল্প কি এখানে শেষ হয়?
শেষ হয় না। কিছু বাকি থাকে। সেই বাকিটা কী তা ধরতে পারছি, কিন্তু লেখায় আনতে পারছি না বলে ঈদসংখ্যায় কোনো পত্রিকাতেই এই গল্প ছাপা হল না।
ঈদের লেখালেখির ক্লান্তি দূর করতে বেড়াতে গেলাম সিঙ্গাপুর। মাউন্ট এলিজাবেথ হসপিটালে হার্টের রুটিন চেকআপ করতে গিয়ে ধরা পড়ল ক্যান্সার। সেই ক্যান্সারও নাকি থেমে নেই। ছড়িয়ে পড়েছে শরীরে। আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় মেটাসথিসিস।
বাতেনি চিকিৎসকের ভাষায় জি্বনের সন্তান-সন্ততিরা ছড়িয়ে পড়েছে।
আমি আধুনিক মানুষ। ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য পৃথিবীর সেরা আমেরিকার ক্যান্সার গবেষণা কেন্দ্র মোমেরিয়েলস্লোন ক্যাটারিং-এ নাম লেখালাম।
আমার আমেরিকান চিকিৎসক পৃথিবীর সেরা ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের একজন।
তিনি জাহেরি অর্থাৎ জাগতিক চিকিৎসক।
আরেকজন আছেন বাতেনি চিকিৎসক। তাঁর নাম আব্দুস সোবাহান। ইনি চিকিৎসা করেন ধ্যানের মাধ্যমে।
আমি যতবার আমার অনকলজিস্টের সঙ্গে কথা বলি, ততবারই পরোক্ষভাবে বাতেনি চিকিৎসকও উপস্থিত থাকেন।
একবার আমি ড. স্টিফান ভিচকে (ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, আমার চিকিৎসক।) বললাম, ক্যান্সার বিষয়ে আমরা কি সবকিছু জানি?
ডাক্তার ভিচ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, না।
আমি বললাম, আমাদের শরীরের সাধারণ কোষের মতো ক্যান্সার কোষও যে জীবন্ত তা জানি। আচ্ছা এমন কী হতে পারে যে এদের চিন্তা করার ক্ষমতা আছে? এরা আলাদা একা প্রাণ!
ডাক্তার ভিচ ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, এদের ভাব-ভঙ্গি সে রকমই।
কিছুক্ষণের জন্য মনে হলো ডা. ভিচের চেহারাটা বাতেনি চিকিৎসক আব্দুস সোবাহানের মতো হয়ে গেল।
তোমার চারপাশে যা ঘটছে সবসময় তার ব্যাখ্যা চাইবে না। সব ব্যাখ্যা যার কাছে আছে তিনি কখনো তা প্রকাশ করেন না। তিনি নিজেকে লুকিয়ে রাখেন বলে সব ব্যাখ্যা লুকানো।

প্রাচীন চৈনিক দার্শনিক_ 'লি সুন'।

You can follow us on Twitter or join our Facebook fanpage to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature.
Download Bangla books in pdf form mediafire.com and also read it online. Read it from iPad, iPhone. Bateni-Chikitshok-Humayun-Ahmed, bangla ebooks, free download , mediafire , humayun ahmed , zafar iqbal , sunil gangopadhaya , suchitra , bengali ebooks, free bangla books online, ebooks bangla, bangla pdf, bangla books, boi, bangla boi, amarboi.
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সত্যজিৎ রায়ের বিষয় চলচ্চিত্র

amarboi.com
--> সত্যজিৎ রায়ের বিষয় চলচ্চিত্র
Download
সত্যজিৎ রায়ের জন্ম কলকাতায়। ২ মে ১৯২১। পিতা সুকুমার রায়। মাতা সুপ্রভা দেবী। কথা প্রসঙ্গে সত্যজিৎ একবার বলেছিলেন, "প্রতিভা সর্বকালে সর্বদেশে বিরল"। সেই বিরল প্রতিভার অধিকারী তিনি স্বয়ং। প্রবাদ প্রতিম এই স্রষ্টা নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। চলচ্চিত্র ছাড়াও আরও বহ্য বিষয়ে তিনি অবিস্মরনীয় শিল্পী। বলা যায়, আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল অধ্যায়ের নাম সত্যজিৎ রায়। 
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

হুমায়ূন আছেন হুমায়ূনের মতোই - বেলাল বেগ

Humayun-Achhen-Humayuner-Motoi


হুমায়ূন আছেন হুমায়ূনের মতোই - বেলাল বেগ


হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার যখনই দেখা হয়, কথাবার্তা শুরু হয় আগের দেখায় যেখানে শেষ হয়েছিল, সেখান থেকে। দুঃখের বিষয়, তাঁর দেখা পাওয়াটাই সংখ্যাতত্ত্বের ‘সম্ভাব্যতা’ অধ্যায়ের একটি খ্যাপা অঙ্ক। ওই অঙ্ক মেলাতে না পেরে তাঁর মায়ের স্বপ্ন ‘শহীদ স্মৃতি বিদ্যায়তন’ বীজতলায় ফেলেই আমি আমেরিকায় স্বনির্বাসনে এসেছি এক যুগ আগে। কয়েক বছর আগে নিউইয়র্কে শেষবার যখন দেখা হয়েছিল, কুশলাদির পর জানতে চাইলেন কী করছি। বললাম, নাতি-নাতনির বেবি-সিটিং করছি। উত্তরে খুশি হলেন না। সদাবিনয়ী মানুষটি অনেকটা ধমকের সুরে বললেন, ‘ওটা আপনার কাজ নয়, আপনি ফিরে চলুন, স্কুলটা চালু করুন। আমি গিয়ে সব ব্যবস্থা করব, আপনাকে চিঠি পাঠাব।’
স্কুলটার জন্য বিশেষ করে হুমায়ূনের মায়ের ইচ্ছাটা পূরণের জন্য সব সময় মন কাঁদত। হুমায়ূন জমি কিনলেন, স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে ঢাকা থেকে যাওয়া একঝাঁক সাহিত্য-সংস্কৃতিকর্মী, গায়ক-বাদক, অভিনেতা-অভিনেত্রী নেত্রকোনার ছোট্ট গ্রাম কুতুবপুরে এলে আশপাশের গ্রাম থেকে লোক ভেঙে পড়ে। উৎসবের আনন্দ হঠাৎ শুরু হওয়া ঝড়-বৃষ্টিকেও উড়িয়ে নিয়ে গেল। হুমায়ূন আহমেদের গ্রাম কুতুবপুরে স্কুল হবে—এই সংবাদে গোটা এলাকা জেগে উঠল। গ্রামে যাওয়ার রাস্তা ছিল না। রাতারাতি রাস্তা হলো। বহু যুগের অন্ধকার তাড়িয়ে বিদ্যুতের আলো এল ঝলমলিয়ে। কাছাকাছি বসে যায় বিরাট বিপণিকেন্দ্র। সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা হাত বাড়াতেই পাওয়া গেছে। কারণ কী? শত সমস্যায় জর্জরিত, শত বছরের শোষণ-বঞ্চনায় নিষ্পেষিত সাধারণ বাঙালির ভেতরে যে অদম্য ও আনন্দপ্রিয় বাঙালিটি লুকিয়ে আছেন, তাঁকে প্রকাশ্য আলোকে মেলে ধরে মহিমান্বিত করেছেন যে মানুষটি, তাঁর জন্ম হয়েছিল ওই গ্রামে। সেবার যতক্ষণ হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে ছিলাম, ততক্ষণ দেশে ফিরে গিয়ে আবারও স্কুলটার দায়িত্ব নিতে ইচ্ছা করছিল। হুমায়ূনের মনের গভীরতম দেশে তুচ্ছ কিংবা অতিমূল্যবান যেকোনো ইচ্ছা-অনিচ্ছার জন্ম-মৃত্যু ফুটন্ত জলের মতো নাচে। মনে মনে ভাবলাম ডাক এলে যাব, না এলে খুশি হব; এ জন্য যে ‘পুরোনো মনটাতে আর সয় না কোনো নতুন জ্বালাতন’।
দিন যায়। একদিন পত্রিকায় পড়লাম হুমায়ূন অসুস্থ, তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, তাঁকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়েছে। সদাপ্রফুল্ল, সদাজাগ্রত, কৌতুকপ্রিয়, গভীর আনন্দপিয়াসী, সব মুহূর্তে অনুসন্ধিৎসু এই মানুষটির হার্ট অ্যাটাক হতে পারে না। কিন্তু হয়েছিল। পত্রিকার ছবিতে হার্ট অ্যাটাকে বাঁকা তাঁর মুখ যমুনাতটে তাজমহল হেলে পড়ার মতো মর্মান্তিক মনে হয়েছিল। তার পরের খবর হুমায়ূনের যেকোনো নাটকের চেয়ে নাটকীয় এবং অকল্পনীয় মর্মন্তুদ—হুমায়ূন আহমেদ সপরিবারে নিউইয়র্কে আছেন, তাঁর ক্যানসার হয়েছে। শুনলাম, হুমায়ূন এখন কারও সঙ্গে দেখা করবেন না। মনে হলো, আমি মুষড়ে পড়ব। যে হুমায়ূন শিক্ষক বেলাল বেগকে নিজের একটি গল্পের বই উৎসর্গ করেছেন, রাতে আড্ডা শেষে যিনি আমাকে একা বাসায় ফিরতে দিতেন না, নিজহাতে টেবিলে খাবার সাজাতেন, নিজহাতে আমার বিছানা করেছেন, মশারি টানিয়েছেন, জগভর্তি পানি ও গ্লাস এনে শিয়রে রেখেছেন, যে হুমায়ূনের সঙ্গে আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের কটা দিন কেটেছে, হাতের এত কাছে পেয়েও তাঁকে যদি দেখতে না পাই।
পত্রিকায় তাঁর স্বাস্থ্য বুলেটিন একটাও বাদ দিই না। দ্বিতীয় কেমো নেওয়ার পর একদিন হঠাৎ করেই আমার টেলিফোন রিসিভার আমাকেই হতবাক করে দিল। ওই দিনই সন্ধ্যা ছয়টায় আমি হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে দেখা করতে পারব। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে সাবওয়ের ট্রেনগুলোর সংখ্যা কম থাকে, আসে-যায়ও আয়েশিভাবে। তিনটি ট্রেন বদলিয়ে যেতে হবে নিউইয়র্কে হুমায়ূন আহমেদের বর্তমান নিবাসে। ট্রেন থেকে নেমে কয়েক মিনিটের পথ। পথে নামতেই হার্ট অ্যাটাকে বিপর্যস্থ, ভগ্নস্বাস্থ্য; কেমোথেরাপি নেওয়া, চুল পড়া, কঙ্কালসার হুমায়ূনের মুখের অস্থি-কোঠরের ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়া রক্তাক্ত দুটি চোখ ভূতের মতো আমার ওপর আছর করে বসল। এখনো অদেখা ওই ভয়ংকর দৃশ্য আমি কিছুতেই মাথা থেকে নামাতে পারি না। একসময় বাড়ি খুঁজে পেয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে গেলাম। ঢুকতেই রান্নাঘর, হুমায়ূনের নিকট আত্মীয়া জলি রান্না করছিল। ওই সময় চুলো ছেড়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। বললাম, আমি যে খালি হাতে এলাম। ছুটির দিন, আমাদের ওদিকে বড় দোকানগুলো বন্ধ। এদিকে এসে দেখলাম, কোথাও বড় দোকান নেই। কোনো কিছু চাইবা মাত্র ১০টা এসে পড়ে। বললাম, অন্তত ফুল তো আনতে পারতাম। ‘ওটা আপনি সবচেয়ে ভালো করেছেন, ডাক্তারের হুকুম, ফুল তাঁর ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে পারবে না।’ ওদিকে বুকের ভেতর টিপটিপ করছে, একটু পরেই তো বাংলাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত ক্যানসার রোগী বেরিয়ে আসবেন—একটা জীবন্ত কঙ্কাল, ভাঙা স্বরে, ক্যানক্যানে গলা, বিস্মিত চোখে মৃত্যুভয়—ভাবতে চাইলাম না। জলিকে জিজ্ঞাসা করতেও জোর পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ জলির গলার স্বরের কথা মনে এল, তার গলায় তো আতঙ্ক নেই। মনে একটু জোর পেলাম। হুমায়ূনের বড় ছেলে তিন পেরোনো নিষাদ জলির কাছে এসে আমাকে শান্ত মনে দেখে গেল। ছোট ভাই বছর পেরোনো নিনাতও বেডরুম থেকে বেরিয়ে এল তার গাড়ি হাতে নিয়ে। বড় শান্ত দুটি ছেলে। নিজেদের নিয়ে তারা ব্যস্ত হয়ে পড়ল। জলির রান্না শেষ হয়ে এসেছিল। একেবারেই তাজা আমেরিকান রুইয়ের দেশি রান্না। স্বাদ না হলে ভাই খাবেন না, জলি বলল। তাজা নয় বলে দেশি মাছ খান না। একেক দিন একেক জিনিস খেতে চান—ভুনা গরুর গোশত, কালিজিরা ভর্তা, কচুর লতি, চিংড়ি মাছ। কম খান কিন্তু খাওয়া উপভোগ করেন। মনের আনন্দে ভাইকে নিজের হাতে রেঁধে খাওয়াতে জলির রয়েছে মহা সুবিধা। তার সংগীতশিল্পী স্বামী আবেদিন স্বল্প নোটিশে বাঘের চোখও জোগাড় করে ফেলতে পারে। একসময় জলি সন্তর্পণে বেডরুমে যায়। ফিরে এসে বলল, ভাই, এখনই আসবেন। হুমায়ূনের দর্শন-ধাক্কা সামাল দিতে চোয়াল শক্ত করে বসলাম। কয়েক মুহূর্ত পর হুমায়ূন এলেন। এ কি হুমায়ূন! না কোনো অভিনেতা প্যান্ট-শার্ট পরা, ছোট কালো চুল, বয়স না বাড়া, আত্মসম্মানে আত্মস্থিত চিরকালের হুমায়ূন। শরীরে বা চেহারায় হার্ট অ্যাটাক বা ক্যানসারের যাতনার কোনো চিহ্ন নেই। সেই অতি পরিচিত সংযত হাসি, একাগ্র সম্বোধন। মুহূর্তে ফিরে গেলাম এক যুগ আগে তাঁর ধানমন্ডির বাসায় কিংবা অন্য কোনো বন্ধুর বাসার আড্ডায়। হুমায়ূনও ক্লিক করে তাঁর স্মৃতিতে আমার ফাইল খুললেন। কেমন আছি, কী করছি-জাতীয় কথার ফাঁকেই জলিকে নির্দেশ দিলেন শাওনকে যেন টেলিফোনে জানায় বেলাল ভাই এসেছেন, সে যেন এখনই চলে আসে। বললাম, আপনি আসার পর থেকেই আপনাকে একনজর দেখার জন্য খুব অধীর ছিলাম কিন্তু আপনার নিষেধ থাকায় ওই চেষ্টা থেকে বিরত থাকি। হুমায়ূন বললেন, শুরুর দিকে শরীরটা তেমন ভালো যাচ্ছিল না। শরীরে জুড়ে দেওয়া বিতিকিচ্ছি ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দিনরাত ওষুধ ঢুকছে, তার ওপর লোকজনের ভিড় বিরক্তিকরই লাগছিল। লোকজনে আমার কখনো আপত্তি নেই। কিন্তু ওরা এসে এমন আচরণ ও কথাবার্তা বলতে থাকে, যেন এটাই আমাকে তাদের শেষ দেখা। রোজ রোজ মৃত্যুর কথা শুনতে কি ভালো লাগে? দৃপ্ত কণ্ঠে বললেন হুমায়ূন। মৃত্যুর প্রসঙ্গ আমি বহু আগেই ভেবে শেষ করে রেখেছি। মৃত্যুচিন্তা আমার মাথায়ই আসে না, অথচ প্রতিদিন কেউ না কেউ এসে আমাকে মরার কথা একবার মনে করিয়ে দিচ্ছে। আমাদের চা খাওয়ার সময় আরও একবার শাওন আসতে দেরি কেন করছে জানতে চাইলেন। আমি ভেবে বের করার চেষ্টা করছিলাম, আমার সঙ্গে শাওনের দেখা হওয়াটাকে এত গুরুত্ব দিচ্ছিলেন কেন হুমায়ূন। তবে কি শাওনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার দিনগুলোর কোনো ঘটনার কোনো তথ্যের শূন্যস্থান পূরণ? চা তখনো শেষ হয়নি, একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মহিলা দক্ষিণের কোনো স্টেটে পড়ুয়া তাঁর বেশ সপ্রতিভ ও সুন্দর মেয়েটিকে নিয়ে সরাসরি ঘরে ঢুকে গেলেন। মা বললেন, মেয়েটি কালই চলে যাবে, তার আকুল আগ্রহের কারণেই এই হুট করে আসা। স্বভাবসিদ্ধ বিনয়ের সঙ্গে হুমায়ূন মেয়েটির সঙ্গে আলাপ শুরু করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই জানা গেল, মেয়েটির সংগ্রহে হুমায়ূন আহমেদের সব বই আছে। সে তাঁর সঙ্গে একটি ছবি না তুলে নিউইয়র্ক থেকে যাবে না। ছবি তুলতে তুলতেই শাওন এসে গেল। সঙ্গে সঙ্গেই হুমায়ূন বললেন, বেলাল ভাইকে স্কুলের ছবিগুলো দেখাও। এবার আমার বিস্ময়ের পালা। স্কুল কখন তৈরি হয়েছে, কখন চালু হয়েছে আমি কিছুই জানি না। হুমায়ূন স্কুলের একটা নাতিদীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরলেন। কেমন করে এটি তিলে তিলে তৈরি হয়েছে, কেমন করে একটি একটি করে ক্লাস বেড়ে দশম শ্রেণী পর্যন্ত হয়েছে। সবচেয়ে আনন্দ লাগল পড়াশোনার ক্ষেত্রে স্কুলটির সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে দেখে। হুমায়ূন নিজেই বললেন, ওই স্কুলটি ইতিমধ্যেই শিক্ষামোদীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। শাওন ল্যাপটপে অনেক খোঁজাখুঁজি করে স্কুলের বিল্ডিং থেকে আরম্ভ করে ক্লাসরুম, মাঠে ছাত্রছাত্রীদের অ্যাসেম্বলি ইত্যাদি বহু ছবি দেখাল আমার ছানাবড়া চোখ ও হাঁ করা মুখের ওপর। স্কুল ভবনটি দেখে আমি মুগ্ধ ও যারপরনাই বিস্মিত হলাম। জিজ্ঞেস করলাম, এটার স্থপতি কে? শাওন একগাল হেসে বলল, আপনি কি জানতেন না আমি একজন স্থপতি?
নিজে ব্যর্থ হওয়ায় আমি স্কুলটিকে মন থেকে মুছেই ফেলেছিলাম। কিন্তু হুমায়ূন মোছেননি। স্কুলটি একটি অসাধারণ প্রেমের গল্প, এটা মোছা যায় না। একাত্তরে শহীদ স্বামীর স্মৃতি চিরজাগরুক রাখার জন্য একজন নারী তাঁর সন্তানকে অনুরোধ করেন। ওই সন্তান একাত্তরকে আরও অনেক তীব্রভাবে দেখেছেন। মাকে মুখের ওপর বলেছিলেন, ‘একাত্তরে আমার বাবা একা শহীদ হননি। দেশের বহু মানুষ শহীদ হয়েছেন। একজনের নয়, সব শহীদের স্মৃতি রাখতে হবে।’ শহীদ স্মৃতি বিদ্যায়তনের কৃতিত্ব ও গৌরবের মধ্য দিয়ে বাংলার একজন নারী তাঁর স্বামীকে এবং সেই সঙ্গে ৩০ লাখ শহীদকে মৃত্যুঞ্জয়ী করতে চান। শহীদ স্মৃতি বিদ্যায়তন বাঙালি জাতির গৌরব ও অহংকারের একটি মহীরুহ হোক।
আমি একজন ক্যানসার রোগী দেখতে এসেছিলাম। তাঁর দেখা পেলাম না। তবে সৌভাগ্যবশত দেখা হয়ে গেল আমাদের কালে অবিরাম সৃষ্টিশীল, জীবনে জীবন যোগ করার মহান কারিগর হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে। বিদায়ের সময় শেষ চমকও দিলেন হুমায়ূন। বললেন, স্কুল যাঁরা গড়ে তুলেছেন, তাঁদের নাম খচিত করা হয়েছে একটি স্মরণ বোর্ডে। সবার ওপরের নামটি বেলাল বেগ। মানুষকে এত সম্মান যিনি দিতে পারেন, পৃথিবীর রোগ-শোক-জরা-মৃত্যু তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। হুমায়ূন আছেন এবং থাকবেন।

You can follow us on Twitter or join our Facebook fanpage to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature.
Download Bangla books in pdf form mediafire.com and also read it online. Read it from iPad, iPhone. Humayun-Achhen-Humayuner-Motoi-Belal-Beg, bangla ebooks, free download , mediafire , humayun ahmed , zafar iqbal , sunil gangopadhaya , suchitra , bengali ebooks, free bangla books online, ebooks bangla, bangla pdf, bangla books, boi, bangla boi, amarboi.
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস - মুহম্মদ জাফর ইকবাল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জীবনে এক মহত্তম ঘটনা। অসীম সাহসিকতা, বীরত্ব, আত্মত্যাগ, আর অবর্ণনীয় দুঃখকষ্ট উৎরে যাওয়ার এক বড় ক্যানভাস এই মুক্তিযুদ্ধ। সেই বিশাল ক্যানভাসকে এক মমত্বময়, উদ্দীপনাঘেরা, ইতিহাসমনস্ক ঋদ্ধতায় তুলে ধরেছেন

মুহম্মদ জাফর ইকবাল তরুণ প্রজন্মের জন্য। ‘প্রতীতি’র উদ্যোগে ইতোপূর্বে এটি প্রকাশিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতেই লেখাটি পুনর্মুদ্রিত হলো

দেশ

মানুষের যতগুলো অনুভূতি আছে তার মাঝে সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি হচ্ছে ভালোবাসা। আর এই পৃথিবীতে যা কিছুকে ভালোবাসা সম্ভব তার মাঝে সবচেয়ে তীব্র ভালোবাসাটুকু হতে পারে শুধুমাত্র মাতৃভূমির জন্যে। যারা কখনো নিজের মাতৃভূমির জন্যে ভালোবাসাটুকু অনুভব করেনি তাদের মতো দুর্ভাগা আর কেউনেই। আমাদের খুব সৌভাগ্য আমাদের মাতৃভূমির জন্যে যে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছিল তার ইতিহাস হচ্ছে গভীর আত্মত্যাগের ইতিহাস, অবিশ্বাস্য সাহস ও বীরত্বের ইতিহাস এবং বিশাল এক অর্জনের ইতিহাস। যখন কেউ এই আত্মত্যাগ, বীরত্ব আর অর্জনের ইতিহাস জানবে, তখন সে যে শুধুমাত্র দেশের জন্যে একটি গভীরভালোবাসা আর মমতা অনুভব করবে তা নয়, এই দেশ, এই মানুষের কথা ভেবে গর্বে তার বুক ফুলে উঠবে।

পূর্ব ইতিহাস

যেকোনো কিছু বর্ণনা করতে হলে সেটি একটু আগে থেকে বলতে হয়, তাই বাংলাদেশের ইতিহাস জানার জন্যেও একটু আগে গিয়ে ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করা যেতে পারে। ব্রিটিশরা এই অঞ্চলটিকে প্রায় দুইশ’ বছর শাসন-শোষণ করেছে। তাদের হাত থেকে স্বাধীনতার জন্যে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ দিয়েছে, জেলখেটেছে, দ্বীপান্তরে গিয়েছে। ১৯৪০ সালে ‘লাহোর প্রস্তাব’১-এ ঠিক করা হয়েছিল ভারতবর্ষের যে অঞ্চলগুলোতে মুসলমান বেশি, সে রকম দুটি  অঞ্চলকে নিয়ে  দুটি দেশ এবং বাকি অঞ্চলটিকে নিয়ে আর একটি দেশ তৈরি করা হবে। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট যে এলাকা দুটিতে মুসলমানরা বেশি সেই এলাকা দুটিনিয়ে দুটি ভিন্ন দেশ না হয়ে পাকিস্তান নামে একটি দেশ এবং ১৫ আগস্ট বাকি অঞ্চলটিকে ভারত নামে অন্য একটি দেশে ভাগ করে দেয়া হলো। পাকিস্তান নামে পৃথিবীতে তখন অত্যন্ত বিচিত্র একটি দেশের জন্ম হলো, যে দেশের দুটি অংশ দুই জায়গায়। এখন যেটি পাকিস্তান সেটির নাম পশ্চিম পাকিস্তান এবং এখন যেটিবাংলাদেশ তার নাম পূর্ব পাকিস্তান। মাঝখানে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্ব, এবং সেখানে রয়েছে ভিন্ন একটি দেশ- ভারত!

বিভেদ, বৈষম্য, শোষণ আর ষড়যন্ত্র

পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে শুধু যে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্ব তা নয়, মানুষগুলোর ভেতরেও ছিল বিশাল দূরত্ব। তাদের চেহারা, ভাষা, খাবার, পোশাক, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সবকিছু ছিল ভিন্ন, শুধু একটি বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষগুলোর মাঝে মিল ছিল- সেটি হচ্ছে ধর্ম। এ রকম বিচিত্র একটি দেশ হলে সেটিটিকিয়ে রাখার জন্যে আলাদাভাবে একটু বেশি চেষ্টা করার কথা, কিন্তু পাকিস্তানের শাসকেরা সেই চেষ্টা করল না। দেশভাগের সময় পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল দুই কোটি, পূর্ব পাকিস্তানের ছিল চার কোটি, কাজেই সহজ হিসেবে বলা যায় শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, পুলিশ-মিলিটারি, সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাসবকিছুতেই যদি একজন পশ্চিম পাকিস্তানের লোক থাকে, তাহলে সেখানে দুইজন পূর্ব পাকিস্তানের লোক থাকা উচিত। বাস্তবে হলো ঠিক তার উলটো, সবকিছুতেই পশ্চিম পাকিস্তানের ভাগ ছিল শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ। বাজেটের ৭৫% ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানে, ২৫% ব্যয় হতো পূর্ব পাকিস্তানে, যদিও পূর্বপাকিস্তান থেকে রাজস্ব আয় ছিল বেশি, শতকরা ৬২ ভাগ। সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল সেনাবাহিনীর সংখ্যা, পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানের সৈন্যের সংখ্যা ছিল ২৫ গুণ বেশি!২

ভাষা আন্দোলন

অর্থনৈতিক নিপীড়ন থেকে অনেক বড়ো নিপীড়ন হচ্ছে একটি জাতির ভাষা, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের ওপর নিপীড়ন, আর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ঠিক সেটিই  শুরু করেছিল। পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৭ সালে আর ঠিক ১৯৪৮ সালেই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা এসে ঘোষণাকরলেন উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।৩ সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা তার প্রতিবাদ করে বিক্ষোভ শুরু করে দিল। আন্দোলন তীব্রতর হয়ে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি সারা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার এবং আরোঅনেকে। তারপরেও সেই আন্দোলনকে থামানো যায়নি, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীকে শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে হয়েছিল।৪ যেখানে আমাদের ভাষা শহীদরা প্রাণ দিয়েছিলেন, সেখানে এখন আমাদের প্রিয় শহীদ মিনার, আর ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখটি শুধু বাংলাদেশের জন্যে নয়, এখনসারা পৃথিবীর মানুষের জন্যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

সামরিক শাসন

একেবারে গোড়া থেকেই পাকিস্তানে শাসনের নামে এক ধরনের ষড়যন্ত্র হতে থাকে, আর সেই ষড়যন্ত্রের সবচেয়ে বড়ো খেলোয়াড় ছিল সেনাবাহিনী। দেশের বাজেটের ৬০% ব্যয় করা হতো সেনাবাহিনীর পিছনে,৫ তাই তারা তাদের অর্থ, বিত্ত, ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধার লোভনীয় জীবন বেসামরিক মানুষের হাতে ছেড়ে দিতেপ্রস্তুত ছিল না। নানারকম টালবাহানা করে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের সেনাপতি আইয়ুব খান পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করে নেন। সেই ক্ষমতায় তিনি একদিন দুইদিন ছিলেন না, ছিলেন টানা এগারো বৎসর। সামরিক শাসন কখনো কোথাও শুভ কিছু আনতে পারে না- সারা পৃথিবীতেএকটিও উদাহরণ নেই যেখানে সামরিক শাসন একটি দেশকে এগিয়ে নিতে পেরেছে- আইয়ুব খানও পারেনি।

ছয় দফা

দেশে সামরিক শাসন, তার ওপর পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ওপর এতরকম বঞ্চনা, কাজেই বাঙালিরা সেটি খুব সহজে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। বাঙালিদের সবচেয়ে বড়ো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের তেজস্বী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জন্যে স্বায়ত্তশাসন দাবি করে ১৯৬৬ সালে ৬দফা৬ ঘোষণা করলেন। ছয় দফা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের সবরকম অর্থনৈতিক শোষণ, বঞ্চনা আর নিপীড়ন থেকে মুক্তির এক অসাধারণ দলিল।৭ তখন পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের ওপর যে রকম অত্যাচার-নির্যাতন চলছিল, তার মাঝে ছয় দফা দিয়ে স্বায়ত্তশাসনের মতো একটি দাবি তোলায় খুবসাহসের প্রয়োজন। ছয় দফার দাবি করার সাথে সাথেই আওয়ামী লীগের ছোট বড়ো সব নেতাকে গ্রেপ্তার করে জেলে পুরে দেয়া হলো। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে একটি কঠিন শাস্তি দেয়ার জন্যে তাঁকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে দেশদ্রোহিতার একটি মামলার প্রধান আসামি করে দেয়া হলো।৮

পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা কিছুতেই এটা মেনে নিল না এবং সারাদেশে আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। জেল-জুলুম, পুলিশ, ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস)-এর গুলি, কিছুই বাকি থাকল না, কিন্তু সেই আন্দোলনকে থামিয়ে রাখা গেল না। আন্দোলনের নেতৃত্ব দিল ছাত্রেরা, তাদের ছিল এগারো দফা৯ দাবি। মওলানাআবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন জেলের বাইরে, তিনিও এগিয়ে এলেন। দেখতে দেখতে সেই আন্দোলন একটি গণবিস্ফোরণে রূপ নিল- কার সাধ্যি তাকে থামায়? ’৬৯-এর গণআন্দোলনে প্রাণ দিয়েছিল ফুটফুটে কিশোর মতিউর, প্রাণ দিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদ- যার নামে আইয়ুব গেটের নাম হয়েছিলআসাদ গেট। পাকিস্তান সরকার শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব নেতাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলো। শুধু তাই নয়, প্রবল পরাক্রমশালী প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে ক্ষমতা দিয়ে বিদায় নিল।

তারিখটি ছিল ১৯৬৯-এর ২৫ মার্চ, কেউ তখন জানত না ঠিক দুই বছর পর একই দিনে এই দেশের মাটিতে পৃথিবীর জঘন্যতম একটি গণহত্যা শুরু হবে।

পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন

জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসেই পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচন দেবার কথা ঘোষণা করে, তারিখটি শেষ পর্যন্ত ঠিক করা হয় ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর। নির্বাচনের কিছুদিন আগে ১২ নভেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের উপকূল এলাকায় পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে গেল- একপ্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় দশ লক্ষ লোক মারা গেল। এত বড়ো একটি ঘটনার পর পাকিস্তান সরকারের যেভাবে সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত ছিল, তারা মোটেও সেভাবে এগিয়ে এল না। ঘূর্ণিঝড়ের পরেও যারা কোনোভাবে বেঁচে ছিল তাদের অনেকে মারা গেল খাবার আর পানির অভাবে।১০ ঘূর্ণিঝড়ে কষ্টপাওয়া মানুষগুলোর প্রতি এ রকম অবহেলা আর নিষ্ঠুরতা দেখে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সরকারের প্রতি বিতৃষ্ণা আর ঘৃণায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। প্রচ  ক্ষোভে মওলানা ভাসানী একটি প্রকাশ্য সভায় স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান দাবি করে একটি ঘোষণা দিয়ে দিলেন।১১

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে সারা পাকিস্তানে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বড়ো বড়ো জেনারেলের রাজনৈতিক নেতাদের জন্যে কোনো শ্রদ্ধাবোধ ছিল না। তারা ধরেই নিয়েছিল, নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না, তাই দলগুলো নিজেদেরভেতর ঝগড়াঝাটি আর কোন্দল করতে থাকবে আর সেটিকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতায় থেকে দেশটাকে লুটেপুটে খাবে।১২ কাজেই নির্বাচনের ফলাফল দেখে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল, ফলাফলটি ছিল অবিশ্বাস্য- পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২ আসনের ভেতরে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগবিপুল ভোটের ব্যবধানে ১৬০টি আসন পেয়েছে। যখন সকল আসনে নির্বাচন শেষ হলো তখন দেখা গেল, মনোনীত মহিলা আসনসহ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ৩১৩টি আসনের মাঝে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি, পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর দল পিপলস পার্টি ৮৮টি এবং অন্য সব দল মিলেপেয়েছে বাকি ৫৮টি আসন।

সোজা হিসেবে এই প্রথম পাকিস্তান শাসন করবে পূর্ব পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ। বঙ্গবন্ধু পরিষ্কার করে বলে দিলেন, তিনি ছয় দফার কথা বলে জনগণের ভোট পেয়েছেন এবং তিনি শাসনতন্ত্র রচনা করবেন ছয় দফার ভিত্তিতে, দেশ শাসিত হবে ছয় দফার ভিত্তিতে।

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, কোনোভাবেই বাঙালিদের হাতে পাকিস্তানের শাসনভার তুলে দেয়া যাবে না। নিজের অজান্তেই জেনারেল ইয়াহিয়া খান আর তার দলবল ‘বাংলাদেশ’ নামে নতুন একটি রাষ্ট্র জন্ম দেবার প্রক্রিয়া শুরু করে দিল।

ষড়যন্ত্র

জেনারেলদের ষড়যন্ত্রে সবচেয়ে বড়ো সাহায্যকারী ছিল সেনাশাসক আইয়ুব খানের এক সময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পশ্চিম পাকিস্তানের পিপলস পার্টির সভাপতি জুলফিকার আলী ভুট্টো। হঠাৎ করে জুলফিকার আলী ভুট্টো জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে লারকানায় ‘পাখি শিকার’ করতে আমন্ত্রণ জানাল। ‘পাখি শিকার’ করতেজেনারেল ইয়াহিয়া খানের সাথে যোগ দিল পাকিস্তানের বাঘা বাঘা জেনারেল। বাঙালিদের হাতে কেমন করে ক্ষমতা না দেয়া যায় সেই ষড়যন্ত্রের নীল নকশা সম্ভবত সেখানেই তৈরি হয়েছিল।১৩

ভেতরে ভেতরে ষড়যন্ত্র চলতে থাকলেও জেনারেল ইয়াহিয়া খান সেটি বাইরে বোঝাতে চাইল না। তাই সে ১৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করল ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হবে। সবাই তখন গভীর আগ্রহে সেই দিনটির জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে।

এর মাঝে ১৯৭১ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বাঙালিদের ভালোবাসা এবং মমতার শহীদ দিবস উদ্‌যাপিত হলো অন্য এক ধরনের উন্মাদনায়। শহীদ মিনারে সেদিন মানুষের ঢল নেমেছে, তাদের বুকের ভেতর এর মাঝেই জন্ম নিতে শুরু করেছে স্বাধীনতার স্বপ্ন। ২১শে ফেব্রুয়ারিতে বাঙালিদের সেই উন্মাদনা দেখে পাকিস্তানসেনাশাসকদের মনের ভেতরে যেটুকু দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল সেটিও দূর হয়ে গেল। জুলফিকার আলী ভুট্টো ছিল সংখ্যালঘু দলে, তার ক্ষমতার অংশ পাবার কথা নয়, কিন্তু সে ক্ষমতার জন্যে বেপরোয়া হয়ে উঠল। জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের ঠিক দুই দিন আগে ১ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতকরে দিল। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের বুকের ভেতর ক্ষোভের যে বারুদ জমা হয়ে ছিল, সেখানে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ স্পর্শ করল। সারাদেশে বিক্ষোভের যে বিস্ফোরণ ঘটল তার কোনো তুলনা নেই।

উত্তাল মার্চ

জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হয়ে গেছে, এ ঘোষণাটি যখন রেডিওতে প্রচার করা হয়েছে, তখন ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের সাথে কমনওয়েলথ একাদশের খেলা চলছে। মুহূর্তের মাঝে জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, ঢাকা স্টেডিয়াম হয়ে ওঠে একটি যুদ্ধক্ষেত্র। স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, দোকানপাট সবকিছু বন্ধহয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ মানুষ পথে নেমে আসে, পুরো ঢাকা শহর দেখতে দেখতে একটি মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়ে যায়। মানুষের মুখে তখন উচ্চারিত হতে থাকে স্বাধীনতার স্লোগান : ‘জয় বাংলা’, ‘বীর বাঙালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’

বঙ্গবন্ধু ঢাকা এবং সারাদেশে মিলিয়ে ৫ দিনের জন্যে হরতাল ও অনির্দিষ্টকালের জন্যে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। সেই অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান সরকারকে কোনোভাবে সাহায্য না করার কথা বলেছিলেন এবং তাঁর মুখের একটি কথায় সারা পূর্ব পাকিস্তান অচল হয়ে গেল। অবস্থা আয়ত্তেআনার জন্যে কারফিউ দেয়া হলো- ছাত্র জনতা সেই কারফিউ ভেঙে পথে নেমে এল। চারিদিকে মিছিল, স্লোগান আর বিক্ষোভ, সেনাবাহিনীর গুলিতে মানুষ মারা যাচ্ছে, তারপরেও কেউ থেমে রইল না, দলে দলে সবাই পথে নেমে এল।

২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলার পতাকা তোলা হলো। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের জনসভায় জাতীয় সংগীত হিসেবে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি নির্বাচন করা হলো।১৪

পাঁচদিন হরতালের পর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভাষণ দিতে এলেন। ততদিনে পুরো পূর্ব পাকিস্তান চলছে বঙ্গবন্ধুর কথায়। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁর ভাষণ শুনতে এসেছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আক্ষরিক অর্থে একটি জনসমুদ্র। বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদেরমুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’১৫ পৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম ভাষণ খুব বেশি দেয়া হয়নি। এই ভাষণটি সেদিন দেশের সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় অকাতরে প্রাণ দিয়ে দেশকে স্বাধীন করার শক্তি যুগিয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর ডাকে একদিকে যখন সারাদেশে অসহযোগ আন্দোলন চলছে- অন্যদিকে প্রতিদিন দেশের আনাচে কানাচে পাকিস্তান মিলিটারির গুলিতে শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে। পাকিস্তান মিলিটারির গতিবিধি থামানোর জন্যে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা পথে পথে ব্যারিকেড গড়ে তুলছে। সারাদেশে ঘরে ঘরে কালো পতাকার সাথেস্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। দেশের ছাত্র-জনতা স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্যে ট্রেনিং নিচ্ছে। মওলানা ভাসানী ৯ মার্চ পল্টন ময়দানের জনসভায় পরিষ্কার ঘোষণা দিয়ে বলে দিলেন, পশ্চিম পাকিস্তানিরা যেন আলাদা করে তাদের শাসনতন্ত্র তৈরি করে, কারণ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ একটি স্বাধীন দেশের জন্ম দিয়েনিজেদের শাসনতন্ত্র নিজেরাই তৈরি করে নেবে।১৬

ঠিক এই সময়ে জেনারেল ইয়াহিয়া খান গণহত্যার প্রস্তুতি শুরু করে দিল। বেলুচিস্তানের কসাই নামে পরিচিত জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর করে পাঠাল, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের কোনো বিচারপতি তাকে গভর্নর হিসেবে শপথ করাতে রাজি হলেন না। ইয়াহিয়া খান নিজে মার্চের ১৫ তারিখ ঢাকায় এসেবঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনার ভান করতে থাকে, এর মাঝে প্রত্যেক দিন বিমানে করে ঢাকায় সৈন্য আনা হতে থাকে। যুদ্ধজাহাজে করে অস্ত্র এসে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করে, কিন্তু জনগণের বাধার কারণে সেই অস্ত্র তারা নামাতে পারছিল না। ২১ মার্চ এই যড়যন্ত্রে ভুট্টো যোগ দিল, সদলবলে ঢাকা পৌঁছে সে আলোচনারভান করতে থাকে।

১৯ মার্চ জয়দেবপুরে বাঙালি সেনারা বিদ্রোহ করে বসে। তাদের থামানোর জন্যে ঢাকা থেকে যে সেনাবাহিনী পাঠানো হয় তাদের সাথে সাধারণ জনগণের সংঘর্ষে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারায়। ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তান দিবস কিন্তু সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্ট আর গভর্নমেন্ট হাউজ ছাড়া সারা বাংলাদেশে কোথাও পাকিস্তানেরপতাকা খুঁজে পাওয়া গেল না।১৭ ধানম-িতে বঙ্গবন্ধুর বাসাতেও সেদিন ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের সাথে সাথে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তোলা হলো।১৮

পরদিন ২৪ মার্চ, সারাদেশে একটি থমথমে পরিবেশ- মনে হয় এই দেশের মাটি, আকাশ, বাতাস আগেই গণহত্যার খবরটি জেনে গিয়ে গভীর আশঙ্কায় রুদ্ধ নিঃশ্বাসে অপেক্ষা করে ছিল।

গণহত্যার শুরু : অপারেশন সার্চলাইট

গণহত্যার জন্যে জেনারেল ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ তারিখটা বেছে নিয়েছিল কারণ সে বিশ্বাস করত এটা তার জন্যে একটি শুভদিন। দুই বছর আগে এই দিনে সে আইয়ুব খানের কাছ থেকে ক্ষমতা পেয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়েছিল। ২৫ মার্চ রাতে বাংলাদেশের ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম গণহত্যার আদেশ দিয়ে সে সন্ধেবেলাপশ্চিম পাকিস্তানে যাত্রা শুরু করে দিল। জেনারেল ইয়াহিয়া খান সেনাবাহিনীকে বলেছিল, তিরিশ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা কর, তখন দেখবে তারা আমাদের হাত চেটে খাবে!১৯ গণহত্যার নিখুঁত পরিকল্পনা অনেক আগে থেকে করা আছে সেই নীল নকশার নাম অপারেশন সার্চলাইট,২০ সেখানে স্পষ্ট করে লেখা আছে কেমনকরে আলাপ আলোচনার ভান করে কালক্ষেপণ করা হবে, কীভাবে বাঙালি সৈন্যদের নিশ্চিহ্ন করা হবে, কীভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণ করা হবে, সোজা কথায়, কীভাবে একটি জাতিকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।

শহরের প্রতিটি রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে রাখা হয়েছে, লক্ষ্যস্থলে পৌঁছাতে দেরি হবে তাই নির্দিষ্ট সময়ের আগেই রাত সাড়ে এগারোটায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের কাজ শুরু করে দিল। শুরু হলো পৃথিবীর জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ, এই হত্যাযজ্ঞের যেন কোনো সাক্ষী না থাকে সেজন্যে সকল বিদেশী সাংবাদিককেদেশ থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। তারপরেও সাইমন ড্রিং নামে একজন অত্যন্ত দুঃসাহসী সাংবাদিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা শহরে লুকিয়ে এই ভয়াবহ গণহত্যার খবর ওয়াশিংটন পোস্টের মাধ্যমে সারা পৃথিবীকে জানিয়েছিলেন।২১

ঢাকা শহরের নিরীহ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে পাকিস্তান মিলিটারি সব বাঙালি অফিসারকে হয় হত্যা না হয় গ্রেপ্তার করে নেয়, সাধারণ সৈন্যদের নিরস্ত্র করে রাখে। পিলখানায় ই.পি.আরদেরকে নিরস্ত্র করা হয়েছিল, তারপরেও তাদের যেটুকু সামর্থ্য ছিল সেটি নিয়ে সারারাত যুদ্ধ করেছে। রাজারবাগ পুলিশলাইনে পুলিশদের নিরস্ত্র করা সম্ভব হয়নি এবং এই পুলিশবাহিনীই সবার আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে সত্যিকার একটি যুদ্ধ শুরু করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী অনেক ক্ষতি স্বীকার করে পিছিয়ে গিয়ে ট্যাংক, মর্টার, ভারি অস্ত্র, মেশিনগান নিয়ে পালটা আক্রমণ করে শেষ পর্যন্ত রাজারবাগ পুলিশ লাইনের নিয়ন্ত্রণ নেয়।২২

২৫ মার্চের বিভীষিকার কোনো শেষ নেই। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এসে ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) আর জগন্নাথ হলের সব ছাত্রকে হত্যা করল। হত্যার আগে তাদের দিয়েই জগন্নাথ হলের সামনে একটি গর্ত করা হয়, যেখানে তাদের মৃতদেহকে মাটি চাপা দেয়াহয়। এই নিষ্ঠুর হত্যাকা-ের দৃশ্যটি বুয়েটের প্রফেসর নুরুল উলা তাঁর বাসা থেকে যে ভিডিও করতে পেরেছিলেন, সেটি এখন ইন্টারনেটে মুক্তিযুদ্ধের আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে, পৃথিবীর মানুষ চাইলেই নিজের চোখে সেটি দেখতে পারে।২৩ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু ছাত্রদের নয়- সাধারণ কর্মচারী এমনকি শিক্ষকদেরকেওতারা হত্যা করে। আশেপাশে যে বস্তিগুলো ছিল সেগুলো জ্বালিয়ে দিয়ে মেশিনগানের গুলিতে অসহায় মানুষগুলোকে হত্যা করে। এরপর তারা পুরানো ঢাকার হিন্দুপ্রধান এলাকাগুলো আক্রমণ করে, মন্দিরগুলো গুঁড়িয়ে দেয়, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। যারা পালানোর চেষ্টা করেছে সবাইকে পাকিস্তান মিলিটারি গুলি করে হত্যাকরেছে। ২৫ মার্চ ঢাকা শহর ছিল নরকের মতো, যেদিকে তাকানো যায় সেদিকে আগুন আর আগুন, গোলাগুলির শব্দ আর মানুষের আর্তচিৎকার।

অপারেশন সার্চলাইটের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি কমান্ডো দল এসে তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেল। আগেই খবর পেয়ে তিনি তাঁর দলের সব নেতাকে সরে যাবার নির্দেশ দিয়ে নিজে বসে রইলেন নিশ্চিত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্যে।

স্বাধীন বাংলাদেশ

কমান্ডো বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে ধরে নিয়ে যাবার আগে তিনি বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে ঘোষণা করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাত থেকে দেশকে মুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে গেলেন। তাঁর ঘোষণাটি তৎকালীন ই.পি.আর-এর ট্রান্সমিটারে করে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ল।২৪ যখন ঘোষণাটিপ্রচারিত হয় তখন মধ্যরাত পার হয়ে ২৬ মার্চ হয়ে গেছে, তাই আমাদের স্বাধীনতা দিবস হচ্ছে ২৬ মার্চ।
পূর্ব পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি পৃথিবীর মানচিত্র থেকে চিরদিনের জন্যে মুছে গেল, জন্ম নিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। কিন্তু সেই বাংলাদেশ তখনো ব্যথাতুর, যন্ত্রণাকাতর। তার মাটিতে তখনো রয়ে গেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুর দানবেরা।

প্রতিরোধ আর প্রতিরোধ

ঢাকা শহরে পৃথিবীর একটি নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ২৭ মার্চ সকাল আটটা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করা হলে শহরের ভয়ার্ত নারী-পুরুষ-শিশু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্যে গ্রামের দিকে ছুটে যেতে লাগল। জেনারেল টিক্কা খান ভেবেছিল সে যেভাবে ঢাকা শহরকে দখল করেছে, এভাবে সারা বাংলাদেশকেএপ্রিলের দশ তারিখের মাঝে দখল করে নেবে। কিন্তু বাস্তবে সেটি হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন- বিভিন্ন এলাকা থেকে পালিয়ে আসা বাঙালি সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা, এই দেশের ছাত্র-জনতা সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল তার কোনো তুলনা নেই।

চট্টগ্রামে বাঙালি সেনাবাহিনী এবং ই.পি.আর বিদ্রোহ করে শহরের বড়ো অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবার স্বাধীনতার ঘোষণাটি পড়ে শোনান।২৫ এই ঘোষণাটি সেই সময় বাংলাদেশের সবার ভেতরে নূতন একটিঅনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছিল। চট্টগ্রাম শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে যুদ্ধজাহাজ থেকে গোলাবর্ষণ করতে হয় এবং বিমান আক্রমণ চালাতে হয়। বাঙালি যোদ্ধাদের হাত থেকে চট্টগ্রাম শহরকে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এপ্রিল মাসের ১০ তারিখ হয়ে যায়। পাকিস্তানসেনাবাহিনী কুষ্টিয়া এবং পাবনা শহর প্রথমে দখল করে নিলেও বাঙালি সৈন্যরা তাদের সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে শহরগুলো পুনর্দখল করে এপ্রিলের মাঝামাঝি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। বগুড়া দিনাজপুরেও একই ঘটনা ঘটে- বাঙালি সৈন্যরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাত থেকে শহরগুলোকে পুনর্দখল করে নেয়। যশোরে বাঙালিসৈন্যদের নিরস্ত্র করার চেষ্টা করার সময় তারা বিদ্রোহ করে, প্রায় অর্ধেক সৈন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে প্রাণ হারালেও বাকিরা ক্যান্টনমেন্ট থেকে মুক্ত হয়ে আসতে পারে। কুমিল্লা, খুলনা ও সিলেট শহর পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিজেদের দখলে রাখলেও বাঙালি সৈন্যরা তাদের আক্রমণ করে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে।২৬

পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই সময়ে পাকিস্তান থেকে দুইটি ডিভিশন বাংলাদেশে নিয়ে আসে। এ ছাড়াও পরবর্তী সময়ে অসংখ্য মিলিশিয়া বাহিনী আনা হয়, তার সাথে সাথে যুদ্ধজাহাজে করে অস্ত্র আর গোলা-বারুদ। বিশাল অস্ত্রসম্ভার এবং বিমানবাহিনীর সাহায্য নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশের ভেতরে ছড়িয়ে পড়তেথাকে। মে মাসের মাঝামাঝি তারা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বড়ো বড়ো শহর নিজেদের দখলে নিয়ে আসতে পারে। ২৭

পাকিস্তান সরকার ১১ এপ্রিল টিক্কা খানের পরিবর্তে জেনারেল এ.এ.কে. নিয়াজীকে সশস্ত্রবাহিনীর দায়িত্ব দিয়ে পাঠায়। মুক্তিযোদ্ধারা তখন যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করার জন্যে গেরিলা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।

শরণার্থী

২৫ মার্চের গণহত্যা শুরু করার পর বাংলাদেশে কেউই নিরাপদ ছিল না তবে আওয়ামী লীগের কর্মী বা সমর্থক আর হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রাগ ছিল সবচেয়ে বেশি। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারে এ রকম তরুণেরাও সেনাবাহিনীর লক্ষ্যবস্তু ছিল। সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের মাঝে ছিল কমবয়সী মেয়েরা।সেনাবাহিনীর সাথে সাথে বাংলাদেশের বিহারি জনগোষ্ঠীও বাঙালি নিধনে যোগ দিয়েছিল এবং তাদের ভয়ংকর অত্যাচারে এই দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠী পাশের দেশ ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। জাতিসংঘ কিংবা নিউজ উইকের হিসেবে মোট শরণার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় এক কোটি। সে সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যাইছিল মাত্র সাত কোটি- যার অর্থ দেশের প্রতি সাতজন মানুষের মাঝে একজনকেই নিজের দেশ ও বাড়িঘর ছেড়ে শরণার্থী হিসেবে পাশের দেশে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।২৮

ভারত এই বিশাল জনসংখ্যাকে আশ্রয় দিয়েছিল কিন্তু তাদের ভরণপোষণ করতে গিয়ে প্রচ- চাপের মাঝে পড়েছিল। শুনে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু আগরতলায় মোট অধিবাসী থেকে শরণার্থীর সংখ্যা ছিল বেশি। শরণার্থীদের জীবন ছিল খুবই কষ্টের, খাবার অভাব, থাকার জায়গা নেই, রোগে শোকে জর্জরিত, কলেরা ডায়রিয়া এ রকম রোগে অনেক মানুষ মারা যায়। ছোট শিশু এবং বৃদ্ধদের সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছিল। দেখা গিয়েছিল, যুদ্ধ শেষে কোনো কোনো শরণার্থী ক্যাম্পে একটি শিশুও আর বেঁচে নেই!

বাংলাদেশ সরকার

একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের আকাঙ্ক্ষা এই দেশের মানুষের বুকের মাঝে জাগিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে যে মানুষটি এই সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তিনি হচ্ছেন তাজউদ্দীন আহমদ। তিনি তাঁর পরিবারেরসবাইকে তাঁদের নিজেদের ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে ৩০ মার্চ সীমান্ত পাড়ি দেন। তখন তাঁর সাথে অন্য কোনো নেতাই ছিলেন না, পরে তিনি তাঁদের সবার সাথে যোগাযোগ করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করেন। এপ্রিলের ১০ তারিখ মুজিবনগর থেকে ঐতিহাসিক স্বাধীনতার সনদ ঘোষণা করা হয়। এই সনদটিদিয়েই বাংলাদেশ নৈতিক এবং আইনগতভাবে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। এই নূতন রাষ্ট্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপতি ও বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে (মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা) বাংলাদেশের প্রথম সরকার দেশী বিদেশী সাংবাদিকদের সামনে শপথ গ্রহণ করে তাদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে।২৯ তাদের প্রথম দায়িত্ব বাংলাদেশের মাটিতে রয়ে যাওয়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করা।

পালটা আঘাত

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ের যুদ্ধগুলো ছিল পরিকল্পনাহীন এবং অপ্রস্তুত। ধীরে ধীরে মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের সংগঠিত করে পালটা আঘাত হানতে শুরু করে। বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফের দায়িত্ব দেয়া হয় কর্নেল (অব.) এম. আতাউল গণি ওসমানীকে, চিফ অফ স্টাফ করা হয় লে. কর্নেল আবদুর রবকেএবং ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকারকে। পুরো বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। ১নং সেক্টরের (চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম) কমান্ডার ছিলেন প্রথমে মেজর জিয়াউর রহমান, পরে মেজর রফিকুল ইসলাম। ২নং সেক্টরের (নোয়াখালী, কুমিল্লা, দক্ষিণ ঢাকা, আংশিক ফরিদপুর) কমান্ডারপ্রথমে ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ, তারপর ক্যাপ্টেন আব্দুস সালেক চৌধুরী এবং সবশেষে ক্যাপ্টেন এ. টি. এম. হায়দার। ৩নং সেক্টরের (উত্তর ঢাকা, সিলেট ও ময়মনসিংহের অংশবিশেষ) কমান্ডার প্রথমে ছিলেন মেজর কে. এম শফিউল্লাহ্‌ এবং তারপর মেজর এ. এন. এম. নূরুজ্জামান। ৪, ৫ এবং ৬নং সেক্টরের(যথাক্রমে দক্ষিণ সিলেট, উত্তর সিলেট এবং রংপুর, দিনাজপুর) কমান্ডার ছিলেন যথাক্রমে মেজর সি.আর.দত্ত, মেজর মীর শওকত আলী এবং উইং কমান্ডার এম. কে. বাশার। ৭নং সেক্টরের (রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা) কমান্ডার ছিলেন মেজর নাজমুল হক, একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর পর মেজর কাজী নুরুজ্জামানসেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব নেন। ৮নং সেক্টরের (কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর) কমান্ডার প্রথমে ছিলেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী, এবং তারপর মেজর এম. এ. মনজুর। ৯নং সেক্টরের (খুলনা, বরিশাল) কমান্ডার ছিলেন মেজর এম. এ. জলিল। ১০নং সেক্টর ছিল নৌ-অঞ্চলের জন্যে, সেটি ছিল সরাসরি কমান্ডার ইন চিফেরঅধীনে। কোনো অফিসার ছিল না বলে এই সেক্টরের কোনো কমান্ডার ছিল না, নৌ-কমান্ডোরা যখন যে সেক্টরে তাদের অভিযান চালাতেন, তখন সেই সেক্টর কমান্ডারের অধীনে কাজ করতেন। এই নৌ-কমান্ডোরা অপারেশন জ্যাকপটের অধীনে একটি অবিশ্বাস্য দুঃসাহসিক অভিযানে অংশ নিয়ে আগস্টের ১৫ তারিখেচট্টগ্রামে অনেকগুলো জাহাজ মাইন দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।৩০ ১১নং সেক্টরের (টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ) কমান্ডার ছিলেন মেজর এম. আবু তাহের, নভেম্বরে একটি সম্মুখযুদ্ধে আহত হওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি এর দায়িত্ব পালন করেন।

 এই এগারোটি সেক্টর ছাড়াও জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ এবং শফিউল্লাহ্‌র নেতৃত্বে তাঁদের ইংরেজি নামের অদ্যাক্ষর ব্যবহার করে জেড ফোর্স, কে ফোর্স এবং এস ফোর্স নামে তিনটি ব্রিগেড তৈরি করা হয়। এছাড়াও টাঙ্গাইলে আব্দুল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে একটি অঞ্চলভিত্তিক বাহিনী ছিল। তাঁর অসাধারণনৈপুণ্যে তিনি যে শুধু কাদেরিয়া বাহিনী নামে একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত বাহিনী গড়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেছিলেন তা নয়, এই বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীও গড়ে তুলেছিলেন।৩১ যুদ্ধের শেষের দিকে সশস্ত্রবাহিনীর সাথে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীও যোগ দিয়েছিল এবং এই যুদ্ধেপ্রথম বিমান আক্রমণের কৃতিত্বও ছিল বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর।৩২

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান মিলিটারির নাকের ডগায় ঢাকা শহরে দুঃসাহসিক গেরিলা অপারেশন করে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল ক্র্যাক প্লাটুন নামে দুঃসাহসী তরুণ গেরিলাযোদ্ধার একটি দল।৩৩

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল সত্যিকার অর্থে একটি জনযুদ্ধ। এই দেশের অসংখ্য ছাত্র-জনতা-কৃষক-শ্রমিক যুদ্ধে যোগ দেয়। তাদের পায়ে জুতো কিংবা গায়ে কাপড় ছিল না, প্রয়োজনীয় অস্ত্র ছিল না- এমনকি যুদ্ধ করার জন্যে প্রশিক্ষণ নেবার সময় পর্যন্ত ছিল না। খালেদ মোশাররফের ভাষায়, যুদ্ধক্ষেত্রেই তাদেরপ্রশিক্ষণ নিতে হয়েছিল। তাদের বুকের ভেতরে ছিল সীমাহীন সাহস আর মাতৃভূমির জন্যে গভীর মমতা। বাংলাদেশের নিয়মিত বাহিনী যখন প্রচলিত পদ্ধতিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেছে, তখন এই গেরিলাবাহিনী দেশের ভেতরে থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আঘাতে আঘাতে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে- তাদেরকে বাধ্য করেছে তাদের গতিবিধি নিজেদের ঘাঁটির মাঝে সীমাবদ্ধ রাখতে।

এই মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা বলে কখনো শেষ করা যাবে না। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসারের নিজেদের লেখা বইয়ে একটি ছোট কাহিনী এ রকম : ১৯৭১ সালের জুন মাসে রাজশাহীর রোহনপুর এলাকায় একজন মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে। শত অত্যাচারেও সে মুখ খুলছে না। তখনপাকিস্তানি মেজর তাঁর বুকে স্টেনগান ধরে বলল, আমাদের প্রশ্নের উত্তর দাও, তা না হলে তোমাকে আমি গুলি করে মেরে ফেলব। নির্ভীক সেই তরুণ মুক্তিযোদ্ধা নিচু হয়ে মাতৃভূমির মাটিকে শেষবারের মতো চুমু খেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত। আমার রক্ত আমার প্রিয় দেশটাকে স্বাধীন করবে।৩৪এই হচ্ছে দেশপ্রেম, এই হচ্ছে বীরত্ব এবং এই হচ্ছে সাহস। এঁদের দেখেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী জানত এই দেশটিকে তারা কখনোই পরাজিত করতে পারবে না, আগে হোক পরে হোক, পরাজয় স্বীকার করে তাদের এই দেশ ছেড়ে যেতেই হবে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেনি কিন্তু প্রকৃত যোদ্ধাদের মতোই অবদান রেখেছিল, সে রকম প্রতিষ্ঠানটির নাম হচ্ছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। আমাদের কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের সাহায্যে এই বেতার কেন্দ্র বাংলাদেশের অবরুদ্ধ জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস আর অনুপ্রেরণাযুগিয়েছে। সেই সময়ের অনেক দেশের গান এখনো বাংলাদেশের মানুষকে উজ্জীবিত করে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদানের কথা আলাদা করে না বললে ইতিহাসটি অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। তাঁদের সাহায্য সহযোগিতার জন্যেই মুক্তিযোদ্ধারা দেশের অভ্যন্তরে নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে যুদ্ধ করতে পেরেছেন। সাংস্কৃতিক কর্মকা ের মাধ্যমে নারীরা মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন, যুদ্ধাহতদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন এমনকি অস্ত্র হাতে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বীরোচিত ভূমিকা রেখেছেন।

দেশদ্রোহীর দল

বাংলাদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কোনো বন্ধু ছিল না, তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল কিছু দেশদ্রোহী। বাংলাদেশের মানুষ এদের সবাইকে নির্বাচনে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছিল, সেই দেশদ্রোহী মানুষগুলো ছিল কাউন্সিল মুসলিম লীগের খাজা খয়েরউদ্দিন, কনভেনশন মুসলিম লীগের ফজলুল কাদেরচৌধুরী, কাইয়ুম মুসলিম লীগের খান এ সবুর খান, জামায়াতে ইসলামীর গোলাম আযম এবং নেজামে ইসলামীর মৌলভী ফরিদ আহমেদ।৩৫ এদের মাঝে জামায়াতে ইসলামী নামের রাজনৈতিক দলটির কথা আলাদা করে বলতে হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সাহায্য করার জন্যে দেশদ্রোহী বিশ্বাসঘাতকদের নিয়েরাজাকারবাহিনী তৈরি করা হয়েছিল- সেটি ছিল মূলত জামায়াতে ইসলামীরই সশস্ত্র একটি দল। সেপ্টেম্বর মাসে পশ্চিম পাকিস্তানের একটি রাজনৈতিক প্রতিনিধি দল জেনারেল নিয়াজীর কাছে এটা নিয়ে অভিযোগ করলে জেনারেল নিয়াজী তার অধস্তন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয় তখন থেকে রাজাকারদের আলবদর এবংআলশামস বলে ডাকাতে!৩৬ এই রাজাকার কিংবা আলবদর ও আলশামসের মুক্তিযোদ্ধাদের মুখোমুখি হওয়ার ক্ষমতা বা সাহস কোনোটাই ছিল না৩৭, কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পদলেহী হিসেবে থেকে এরা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ওপর যে অত্যাচার এবং নির্যাতন করেছে তার অন্য কোনো নজির নেই। পাকিস্তানসেনাবাহিনী এই দেশের মানুষকে চিনত না- আলবদর, আলশামস প্রকৃত অর্থ যাই হোক না কেন, বাংলাদেশের মানুষের কাছে এর চাইতে ঘৃণিত কোনো শব্দ নেই, কখনো ছিল না, কখনো থাকবে না।

দেশের বাইরে মুক্তিযুদ্ধ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় প্রবাসী অনেক বাঙালি মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য করেছেন। তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশ সরকারের জন্যে টাকা তুলেছেন, পাকিস্তানের গণহত্যার কথা পৃথিবীকে জানিয়েছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে জনমত তৈরি করেছেন। যাঁদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করাযায়, তাঁরা হচ্ছেন জাস্টিস আবু সায়ীদ চৌধুরী, স্থপতি এফ. আর. খান, প্রফেসর মুহম্মদ ইউনূস এবং প্রফেসর রেহমান সোবহান। শুধু যে বাংলাদেশের মানুষই এগিয়ে এসেছিলেন তা নয়, আগস্টের ১ তারিখ নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে রবিশংকর, জর্জ হ্যারিসনসহ অসংখ্য শিল্পীকে নিয়ে স্মরণাতীত কালের বৃহত্তম একটিকনসার্ট সারা পৃথিবীর বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কবি অ্যালেন গিনসবার্গ শরণার্থীদের কষ্ট নিয়ে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ নামে যে অসাধারণ কবিতাটি রচনা করেন, সেটি এখনো মানুষের বুকে শিহরণের সৃষ্টি করে।৩৮

পক্ষের দেশ বিপক্ষের দেশ

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার কথা পৃথিবীতে প্রচার হওয়ার পর পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেরই সমবেদনা বাংলাদেশের পক্ষে ছিল, তবে দুটি খুব গুরুত্বপূর্ণ দেশ- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন পাকিস্তানের পক্ষে থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। একাত্তরে যদিও ইসলামের নামে বাংলাদেশেরবেশিরভাগ মুসলমানকেই হত্যা করা হচ্ছিল, তার পরেও পৃথিবীর প্রায় সকল মুসলিম দেশও পাকিস্তানের পক্ষে থেকে আমাদের মুক্তিসংগ্রামের বিরোধিতা করেছে। যদিও রাজনৈতিক কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার পাকিস্তানের পক্ষে ছিল কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। পাকিস্তানসেনাবাহিনীর গণহত্যার দৃশ্য দেখে সে সময়কার মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্চার কে. ব্লাড ক্ষুব্ধ হয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্টে যে টেলিগ্রামটি পাঠিয়েছিলেন সেটি কূটনৈতিক জগতে সবচেয়ে কঠিন ভাষায় লেখা চিঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

স্বাধীনতা সংগ্রামের একেবারে শেষের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সপ্তম নৌবহরের যুদ্ধজাহাজ বঙ্গোপসাগরে পাঠিয়ে দিয়েছিল এবং সোভিয়েত ইউনিয়নও নিউক্লিয়ার ক্ষমতাধারী যুদ্ধজাহাজ এই এলাকায় রওনা করিয়ে দিয়েছিল। শুনে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটি সত্যি যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে উপলক্ষ করে বিশ্বেরদুই পরাশক্তি নিউক্লিয়ার অস্ত্র নিয়ে পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছিল।৩৯ স্বাধীনতা যুদ্ধের একেবারে শেষ মুহূর্তে যখন বাংলাদেশ এবং ভারতের যৌথবাহিনীর জয় একেবারে সুনিশ্চিত তখন সেই বিজয়ের মুহূর্তটিকে থামিয়ে দেবার জন্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বারবার জাতিসংঘের সিকিউরিটি কাউন্সিলে যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব দিয়েএসেছিল এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো দিয়ে এ প্রস্তাবকে নাকচ করে দিয়ে আমাদের বিজয়ের পথ সুনিশ্চিত করেছিল। তবে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে দেশটির ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি, সেই দেশ হচ্ছে ভারত। এই দেশটি প্রায় এক কোটি শরণার্থীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিয়েছিল, আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ আর আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেছিল। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার পর ভারত মুক্তিবাহিনীর সাথে মিত্রবাহিনী হিসেবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেয়। এই যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রায় দেড় হাজার সৈনিক প্রাণ দিয়েছিল।৪০

যৌথবাহিনী

জুলাই মাসের দিকে নূতন করে যুদ্ধ শুরু করে অক্টোবর মাসের ভেতর বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী দেখতে দেখতে শক্তিশালী আর আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল। তাঁরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্ডার আউটপোস্টগুলো নিয়মিতভাবে আক্রমণ করে দখল করে নিতে শুরু করে। গেরিলাবাহিনীর আক্রমণও অনেক বেশি দুঃসাহসী হয়েউঠতে থাকে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই আক্রমণের জবাব দিতে রাজাকারদের নিয়ে গ্রামের মানুষের বাড়িঘর পুড়িয়ে আর স্থানীয় মানুষদের হত্যা করে। ততদিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে, তারা আর সহজে তাদের ঘাঁটির বাইরে যেতে চাইত না।৪১

বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অবস্থা দেখতে দেখতে এত খারাপ হয়ে গেল যে পাকিস্তান তার সমাধান খুঁজে না পেয়ে ডিসেম্বরের তিন তারিখ ভারত আক্রমণ করে বসে। পাকিস্তানের উদ্দেশ্য ছিল হঠাৎ আক্রমণ করে ভারতের বিমানবাহিনীকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেবে কিন্তু সেটি করতে পারল না। ভারত সাথে সাথেপাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর সাথে যৌথভাবে বাংলাদেশে তার সেনাবাহিনী নিয়ে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের  ভেতর তখন পাকিস্তানের পাঁচটি পদাতিক ডিভিশন। যুদ্ধের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী আক্রমণের জন্য তিনগুণ বেশি অর্থাৎ ১৫ ডিভিশন সৈন্য নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু ভারতীয়রা মাত্র আট ডিভিশন সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ শুরু করার সাহস পেয়েছিল। ৪২ কারণ তাদের সাথে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের বাহিনী। সেই মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে এর মাঝেই পুরোপুরি অচল করে রাখতে পেরেছিল। শুধু যে মুক্তিযোদ্ধারা ছিল তা নয়- এই যুদ্ধে দেশের সাধারণ মানুষও ছিল যৌথবাহিনীরসাথে।

যুদ্ধ শুরু হবার পর সেটি চলেছে মাত্র তেরো দিন। একেবারে প্রথম দিকেই বোমা মেরে এয়ারপোর্টগুলো অচল করে দেবার পর পাকিস্তান এয়ারফোর্সের সব পাইলট পালিয়ে গেল পাকিস্তানে। সমুদ্রে যে কয়টি পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ ছিল সেগুলো ডুবিয়ে দেবার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাকি রইল শুধু তার স্থলবাহিনী- নিরীহজনসাধারণ হত্যা করতে তারা অসাধারণ পারদর্শী কিন্তু সত্যিকার যুদ্ধে কেমন করে, সেটি দেখার জন্যে মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতীয় বাহিনী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর একটি একটি করে পাকিস্তানের ঘাঁটির পতন হতে থাকল- তারা কোনোমতে প্রাণ নিয়ে অল্পকিছু জায়গায় মাটি কামড়ে পড়ে রইল। ভারতীয় বাহিনী আর মুক্তিবাহিনী তাদেরকে পাশ কাটিয়ে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ঢাকার কাছাকাছি এসে হাজির হয়ে যায়। মেঘনা নদীতে কোনো ব্রিজ ছিল না, সাধারণমানুষ তাদের নৌকা দিয়ে সেনাবাহিনীকে তাদের ভারী অস্ত্রসহ পার করিয়ে আনল!৪৩

ঢাকায়  জেনারেল নিয়াজী এবং তার জেনারেলরা বাংলাদেশের যুদ্ধে টিকে থাকার জন্যে যে দুটি বিষয়ের ওপর ভরসা করছিল, সেগুলো ছিল অত্যন্ত বিচিত্র। প্রথমত, তারা বিশ্বাস করত পশ্চিম পাকিস্তানের যুদ্ধে তারা ভারতকে এমনভাবে পর্যুদস্ত করবে যে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় বাহিনীর সরে যাওয়া ছাড়া কোনোগতি থাকবে না। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধে তাদের সাহায্য করার জন্য উত্তর দিক থেকে আসবে চীনা সৈন্য আর দক্ষিণ দিক থেকে আসবে আমেরিকান সৈন্য। কিন্তু দেখা গেল, তাদের দুটি ধারণাই ছিল পুরোপুরি ভুল। পশ্চিম পাকিস্তান সীমান্তে পাকিস্তানিরাই চরমভাবে পর্যুদস্ত হলো আর কোনো চীনা বা আমেরিকান সৈন্য তাদেরসাহায্যের  জন্যে এগিয়ে এল না।৪৪

আত্মসমর্পণ

মুক্তিযোদ্ধা আর ভারতীয় সৈন্যরা ঢাকা ঘেরাও করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণ করার জন্যে আহ্বান করল। গভর্নর হাউসে বোমা ফেলার কারণে তখন গভর্নর মালেক আর তার মন্ত্রীরা পদত্যাগ করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে (বর্তমান শেরাটনে)  আশ্রয় নিয়েছে। ভারতীয় বিমানবাহিনী ঢাকার সেনাবাহিনীরউদ্দেশ্যে লক্ষ লক্ষ লিফলেট ফেলেছে, সেখানে লেখা ‘মুক্তিবাহিনীর হাতে ধরা পড়ার আগে আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করো।’৪৫

ঢাকার ‘পরম পরাক্রমশালী’ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তখন আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নিল। আত্মসমর্পণের দলিলে বাংলাদেশ এবং ভারতের যৌথ নেতৃত্বের কাছ আত্মসমর্পণ করার কথাটি দেখে একজন পাকিস্তানি জেনারেল দুর্বলভাবে একবার সেখান থেকে বাংলাদেশের নামটি সরানোর প্রস্তাব করেছিল কিন্তু কেউ তারকথাকে গুরুত্ব দিল না, ইতিহাসে সত্যকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।৪৬

১৬ ডিসেম্বর বিকেল বেলা রেসকোর্স ময়দানে হাজার হাজার মানুষের সামনে জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি থেকে মাথা নিচু করে বিদায় নেয়ার দলিলে স্বাক্ষর করল। যে বিজয়ের জন্যে এই দেশের মানুষ সুদীর্ঘ নয় মাস অপেক্ষা করছিল সেই বিজয়টি এই দেশের স্বজন হারানো সাত কোটিমানুষের হাতে এসে ধরা দিল।

বাংলাদেশের অন্যান্য জায়গায় পাকিস্তানের সব সৈন্য আত্মসমর্পণ করে শেষ করতে করতে ডিসেম্বরের ২২ তারিখ হয়ে গেল।


বিজয়ের আনন্দে দুঃখের হাহাকার

পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করার পর বিজয়ের অবিশ্বাস্য আনন্দ উপভোগ করার আগেই একটি ভয়ংকর তথ্য বাংলাদেশের সকলকে স্তম্ভিত করে দিল। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে যখন সবাই বুঝে গেছে এই যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরাজয় অবশ্যম্ভাবী, সত্যি সত্যি বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবেপৃথিবীর মানচিত্রে নিজের স্থান করে নিচ্ছে, তখন এই দেশের বিশ্বাসঘাতকের দল আলবদর বাহিনী দেশের প্রায় তিন শত শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক, শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানীকে ধরে নিয়ে যায়। তাঁদের উদ্ধার করার জন্যে দেশের মানুষ যখন পাগলের মতো হন্যে হয়ে খুঁজছে তখন তাদের ক্ষতবিক্ষতমৃতদেহ রায়ের বাজার বধ্যভূমি এবং অন্যান্য জায়গায় খুঁজে পাওয়া যেতে থাকল। দেশটি যদি সত্যি সত্যি স্বাধীন হয়ে যায় তারপরেও যেন কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, সেই ব্যাপারটি এই বিশ্বাসঘাতকের দল নিশ্চিত করে যাওয়ার জন্য এই দেশের সোনার সন্তানদের ঠা-া মাথায় হত্যা করেছে।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ে  জড়িত আলবদর বাহিনীতে ছিল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য চৌধুরী মইনুদ্দিন, আশরাফুজ্জামান খান,৪৭ মতিউর রহমান নিজামী (পূর্ব পাকিস্তান আলবদর বাহিনীর সর্বাধিনায়ক)৪৮ এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ (পূর্ব পাকিস্তানআলবদর বাহিনীর কেন্দ্রীয় সংগঠক)। ৪৯

আমাদের অহংকার

আমাদের মাতৃভূমির যে মাটিতে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, ওপরে তাকালে যে আকাশ আমরা দেখতে পাই কিংবা নিঃশ্বাসে যে বাতাস আমরা বুকের ভেতর টেনে নেই, তার সবকিছুর জন্যেই আমরা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ঋণী। সেই ঋণ বাঙালি জাতি কখনোই শোধ করতে পারবে না, বাঙালি কেবল তাঁদের প্রতিকৃতজ্ঞতাটুকু প্রকাশ করার একটুখানি সুযোগ পেয়েছে তাঁদেরকে বীরত্বসূচক পদক দিয়ে সম্মানিত করে। পুরস্কারপ্রাপ্তদের মাঝে সাতজন হচ্ছেন মরণোত্তর সবচেয়ে বড়ো পদকপ্রাপ্ত বীরশ্রেষ্ঠ। তাঁরা হচ্ছেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর, হামিদুর রহমান, মোস্তফা কামাল, রুহুল আমীন, মতিউর রহমান, মুন্সী আব্দুর রউফ এবং নূরমোহাম্মদ শেখ। এঁদের মাঝে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের দেহাবশেষ ছিল পাকিস্তানে এবং বীরশ্রেষ্ঠ হামিদূর রহমানের দেহাবশেষ ছিল ভারতে। তাঁদের দু’জনের দেহাবশেষই এখন বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। অন্য বীরশ্রেষ্ঠ এবং অসংখ্য শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সাথে সাথে তাঁদের দু’জনকেও এখন গভীর মমতায় আলিঙ্গনকরে আছে আমাদের মাতৃভূমির মাটি।

১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বসূচক অবদান রাখার জন্যে যাঁদের বীরত্বসূচক পদক দেয়া হয়, তাঁদের মাঝে নারী মুক্তিযোদ্ধারাও আছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই দেশের নারীরা শুধু যে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন, সাহায্য সহায়তা করেছেন তা নয়, অস্ত্র হাতে পুরুষদের পাশাপাশি তাঁরা যুদ্ধও করেছেন। ৫০

যুদ্ধের গ্লানি

যেকোনো যুদ্ধই হচ্ছে মানবতার বিরুদ্ধে এক ধরনের নিষ্ঠুরতা- যুদ্ধের সাথে কোনোভাবে সম্পর্ক না থাকার পরও যুদ্ধের সময় অসংখ্য নিরপরাধ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়- আমাদের দেশেও সে ধরনের ঘটনা ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে বসবাসকারী বিহারিরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে থেকে এক ধরনেরঅমানুষিক নৃশংসতায় বাঙালিদের নির্যাতন, নিপীড়ন আর হত্যাকা ে অংশ নিয়েছিল। তাদের নৃশংসতার জবাবে মুক্তিযুদ্ধের আগে, পরে এবং চলাকালে অনেক বিহারিকে হত্যা করা হয়, যার ভেতরে অনেকেই ছিল নারী, শিশু কিংবা নিরপরাধ। বিহারিদের প্রায় সবাই পাকিস্তানে ফেরত যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করলেওপাকিস্তান সরকার তাদের নিজের দেশে নিতে আগ্রহী নয় বলে এই হতভাগ্য সমপ্রদায় দীর্ঘদিন থেকে জেনেভা ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করে আসছে।

গণহত্যার পরিসংখ্যান

স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৮০ হাজার, মিলিশিয়া বাহিনী ছিল আরো ২৫ হাজার, বেসামরিক বাহিনী প্রায় ২৫ হাজার, রাজাকার, আলবদর, আলশামস আরো ৫০ হাজার। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল প্রায় এক লক্ষ পঁচাত্তর হাজার। যুদ্ধের শেষপর্যায়ে দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার ভারতীয় সেনা মিত্রবাহিনী হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগ দেয়। যুদ্ধ শেষে আত্মসমর্পণের পর প্রায় একানব্বই হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি ভারতে স্থানান্তর করা হয়।৫১ যুদ্ধ চলাকালে প্রায় আড়াই লক্ষ নারী পাকিস্তান সেনাবাহিনী আর তাদের পদলেহী বিশ্বাসঘাতক দেশদ্রোহীদের নির্যাতনেরশিকার হয়েছিল। যুদ্ধের সময় প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে দেশ ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল- অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি, এই এক কোটি মানুষ দেশত্যাগ না করলে তাদের প্রত্যেককেই হয়ত এই দেশে হত্যা করা হতো।

মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা চলাকালে কতজন মানুষ মারা গিয়েছে সে সম্পর্কে গণমাধ্যমে বেশ কয়েক ধরনের সংখ্যা রয়েছে। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড আলমানাকে সংখ্যাটি ১০ লক্ষ, আর. জে. রুমেলের ভাষ্য অনুযায়ী ১৫ লক্ষ, কম্পটন’স এনসাইক্লোপিডিয়া এবং এনসাইক্লোপিডিয়া আমেরিকানা অনুযায়ী সংখ্যাটি ৩০লক্ষ।৫২ প্রকৃত সংখ্যাটি কত, সেটি সম্ভবত কখনোই জানা যাবে না। বাংলাদেশে বর্তমানে এই সংখ্যাটি ত্রিশ লক্ষ বলে অনুমান।
Download
Join our Facebook Group

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

শিশুসাহিত্যের নায়ক - লুৎফর রহমান রিটন

amarboi.com


শিশুসাহিত্যের নায়ক
লুৎফর রহমান রিটন


কী বিপদেই না ফেলেছিলেন আমাকে মুহম্মদ জাফর ইকবাল!
আশির দশকের সূচনার দিকে সাপ্তাহিক কিশোর বাংলায় মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপন্যাস দীপু নাম্বার টু প্রকাশিত হলো। হৃদয়ছোঁয়া সেই উপন্যাসটি জয় করে নিলো শিশু-কিশোরদের মন। আমি তখন ওয়ারীতে থাকি। আমার কাছে এই উপন্যাসের বিস্তর প্রশংসা শুনে উপন্যাসটি পড়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমাদের হেয়ার স্ট্রিটের বাড়িতে এসে হাজির হলো আমার বন্ধু সদ্য কৈশোর পেরোনো ছড়াকার তুহীন রহমান। নিচতলায় এক রুমের একটি কক্ষে আমি থাকি। কিছু খানাখাদ্যসমেত তুহীনকে ঘরবন্দি করে আমি ওপরতলায় চলে গেলাম। ঘরটায় তালা ঝুলিয়ে ওকে সময় দিলাম দুই ঘণ্টা। দুই ঘণ্টা পর তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে দেখি আমার খুদে লেখার টেবিলটায় মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে তুহীন! আমাকে দেখতে পেয়ে ওর কান্নার গতি এবং শব্দ মুহূর্তেই বিপদসীমা অতিক্রম করল। সর্বনাশ! বাইরে থেকে লোকজন ভাববে আমি ওকে ধোলাই করছি! নানান কায়দায় বুঝিয়ে-শুনিয়ে ওর কান্নাকে সামাল দিলাম। চোখ মুছতে মুছতে অদ্ভুত এক বায়না ধরল তুহীন। বায়নাটা অভাবিত, বাংলা চলচ্চিত্র প্রভাবিত। তুহীন যা বলল তার সারাংশটি এ রকম : উপন্যাসটি পড়ে ওর বুক ভেঙে গেছে! এখন কষ্টের সমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়া তুহীনকে ভয়াবহ এই বেদনার ভার থেকে মুক্ত হতে হবে বাংলা সেবন করে! মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপন্যাসের পঞ্চমুখ প্রশংসা করে এ কি মুশকিলে পড়লাম! জীবনে প্রথম বাংলা শিশুসাহিত্যের সেবা করতে গিয়ে বাংলা সেবনের দায় কাঁধে নিতে হলো! তুহীনের বাসনাটিকে বাস্তবতায় রূপ দিতে গিয়ে ভীষণ একটা ঝুঁকি নিলাম। জানাজানি হলে কেলেঙ্কারি হবে, তবুও। বনগ্রামের ছেলে তুহীন ঠাঁটারিবাজারের গোপন আস্তানা থেকে মাঝারি একটা বোতল নিয়ে এলো। সঙ্গে একমুঠো কাঁচালঙ্কা। তুহীনের দুঃখমোচন এবং ওর বাংলা সেবনকে নিরুপদ্রব ও নিষ্কণ্টক রাখতে বাইরে থেকে তালা মারাটা বিপজ্জনক ভেবে আমি ভেতরেই অবস্থান নিলাম। কাঁচালঙ্কার ঝাল আর নির্ভেজাল বাংলার মিথস্ক্রিয়ায় নাকের পানি চোখের পানিতে সয়লাব হতে হতে তুহীন স্বগতোক্তি করল বারংবার_ শালায় এইটা কী লিখল!!!!
'শালা' গালিটার এত মমতাপূর্ণ, এত ভালোবাসাপূর্ণ প্রয়োগ সেই প্রথম আমি প্রত্যক্ষ করেছিলাম! 
আমাদের শিশুসাহিত্যের নায়ক 
কপোট্রনিক সুখদুঃখ, হাতকাটা রবীন, দীপু নাম্বার টু, মহাকাশে মহাত্রাস, দুষ্টু ছেলের দল, ট্রাইটন একটি গ্রহের নাম, বিজ্ঞানী সফদর আলীর মহা মহা আবিষ্কার, আমড়া ও ক্র্যাব নেবুলা, জলমানব এবং আমার বন্ধু রাশেদ-এর মতো গল্প-উপন্যাস লিখে আমাদের শিশুসাহিত্যের পাঠকদের বিপুল আদর কেড়েছেন তিনি। পাঠকপ্রিয়তার বিবেচনায় এই মুহূর্তে বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখকের নাম মুহম্মদ জাফর ইকবাল। স্বাধীনতা-পরবর্তী আমাদের শিশুসাহিত্যের সমসাময়িক সব লেখককে পেছনে ফেলে একজন মুহম্মদ জাফর ইকবাল পেঁৗছে গেছেন খ্যাতির সর্বোচ্চ শিখরে। জাদুর কলম হাতে এসেছেন তিনি। তাঁর জাদুস্পর্শে বর্ণাঢ্য পুষ্প-পত্র-পল্লবে অনিন্দ্যসুন্দর হয়ে উঠেছে আমাদের শিশুসাহিত্যের ভুবনটি। 
দৈনিক গণকণ্ঠে 'ইকবাল' নামের একজন কার্টুনিস্ট ছিল 
স্বাধীনতার পরপর গণকণ্ঠ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা বিপুল পাঠকনন্দিত হয়েছিল। ওয়ারীর রাংকিন স্ট্রিট থেকে বের হতো পত্রিকাটি। কিশোর আমি প্রতিদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠেই হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম গণকণ্ঠ অফিসে। গণকণ্ঠ অফিসের দেয়ালে ভোরবেলায় লেই দিয়ে সেদিনের সদ্য প্রকাশিত পত্রিকার পাতাগুলো সাঁটিয়ে রাখা হতো। মর্নিং ওয়াকে বেরোনো একদল মানুষ মিনি মাগনায় পত্রিকাটি পড়ার জন্যে ভিড় জমাত। ভিড় ঠেলে আমিও প্রতিদিন পত্রিকাটি পড়তে যেতাম। আমার তখন কার্টুন জমানোর হবি ছিল। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত কার্টুন কেটে কেটে সেগুলো একটা খাতায় আঠা দিয়ে সেঁটে রাখতাম আমি। গণকণ্ঠে 'ইকবাল' নামে একজন কার্টুন আঁকতেন নিয়মিত। ১৯৭৩ সালের পহেলা জানুয়ারি ঢাকার তোপখানা রোডের আমেরিকান কালচারাল সেন্টার ইউসিস-এর সামনে ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারাল মতিউলসহ (দ্বিতীয়জনের নামটা মনে পড়ছে না, সম্ভবত কাদের) দুই তরুণ। আমার মনে আছে, পরদিন গণকণ্ঠের প্রথম পাতায় ছাপা হওয়া ইকবালের আঁকা একটা কার্টুনের কথা। সেই কার্টুনে একটা ডালের ওপর দুটি শকুন বসা। একটি আরেকটিকে বলছে_ 'বছরের শুরুতেই নরমাংসের গন্ধ পাওয়া গেল। বছরটা ভালোভাবেই যাবে বলে মনে হচ্ছে...।' 
কার্টুনিস্ট সেই 'ইকবাল'ই আজকের নন্দিত লেখক এবং পাঠকপ্রিয় কলামিস্ট মুহম্মদ জাফর ইকবাল।
বিটিভির ছোটদের ধারাবাহিক নাটকে দীপু নাম্বার টু
এককালে বাংলাদেশ টেলিভিশন ছিল আমার সকল ধ্যান-জ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু। রাতদিন আমি পড়ে থাকতাম বিটিভি ভবনে। প্রচুর অনুষ্ঠান করতাম। উপস্থাপনা করা, স্ক্রিপ্ট লেখা এবং নির্দেশনা দেওয়া ছিল আমার অলিখিত পেশা। বিটিভির কর্মী বা চাকুরে ছিলাম না আমি, কিন্ত প্রতিদিন নিয়মিত আরও আট-দশজন স্টাফের মতো আমি ওখানে যেতাম। বিভিন্ন ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে আমার লেখা খুদে খুদে নাট্যাংশ বা স্কিড দেখে প্রযোজক কাজী কাইয়ূম একদিন বললেন ছোটদের জন্য একটা ধারাবাহিক নাটক লিখতে। লিখলাম ঝন্টুপন্টু। ঝন্টুপন্টু নামের সেই ধারাবাহিক নাটকটি ছোটদের বিপুল ভালোবাসা পেল। কিছুদিন বিরতি দিয়ে বিটিভি আবারও আরেকটি ছোটদের ধারাবাহিক নাটক রচনা ও পরিচালনার জন্যে বললে আমি শুরু করলাম 'হইচই'। নিজের গল্প বা কাহিনী নিয়ে সিরিজ লেখার সুযোগ না নিয়ে আমি চাইলাম আমাদের শিশুসাহিত্যের চমৎকার সব গল্প আর উপন্যাসের নাট্যরূপ দিতে। কাইয়ূম ভাইয়ের মাধ্যমে বিটিভিকে এর প্রয়োজনীয়তাটুকুও বোঝাতে সক্ষম হলাম। মোহাম্মদ নাসির আলীর লেবু মামার সপ্তকাণ্ড , রাহাত খানের দিলুর গল্প, রাবেয়া খাতুনের লাল সবুজ পাথরের মানুষ, আলী ইমামের বনকুসুমপুর রহস্য, ফরিদুর রেজা সাগরের পিংকুইগ্রামসহ বেশ কিছু গল্প-উপন্যাসের নাট্যরূপ প্রচারিত হয়েছিল ছোটদের ধারাবাহিক সিরিজ নাটক 'হইচই'-এ। এই হইচই সিরিজে চার পর্বে প্রচারিত হয়েছিল মুহম্মদ জাফর ইকবালের 'দীপু নাম্বার টু'। নাটকে দীপু চরিত্রে অঞ্জন, দীপুর বাবা আর মায়ের ভূমিকায় খায়রুল আলম সবুজ এবং শিরীন বকুল অভিনয় করেছিলেন। বিটিভির খুদে দর্শকদের বিপুল ভালোবাসা পেয়েছিল সিরিজটি। বিশেষ করে 'দীপু নাম্বার টু'র জনপ্রিয়তা ছিল প্রত্যাশার সীমানা ছাড়ানো। এই সিরিজ নাটকের শুরুতে আমি নিজেই পর্দায় হাজির হতাম। কাহিনীর লেখক সম্পর্কে তথ্য দিতাম। সেই লেখকের উল্লেখযোগ্য রচনাসমূহের পরিচিতি তুলে ধরতাম। লেখক কোথায় আছেন, কী করছেন, কী লিখছেন ইত্যাদি তথ্য দিতাম। এসব কথাবার্তার ফাঁকে ফাঁকে লেখকের বেশ কিছু স্টিল ছবি প্রদর্শিত হতো পর্দায়। মুহম্মদ জাফর ইকবাল সম্পর্কে সাম্প্রতিক তথ্য এবং প্রয়োজনীয় স্টিল ছবি সংগ্রহ করতে এক বিকেলে আমি ইকবালের অগ্রজ আরেক প্রখ্যাত লেখক হুমায়ূন আহমেদের বাড়িতে গেলাম। হুমায়ূন আহমেদ তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্ট। হুমায়ূন ভাই পরম যত্নে অনেক আগ্রহভরে আমাকে তাদের পারিবারিক অ্যালবাম থেকে অনেকগুলো ছবি দিলেন। মুহম্মদ জাফর ইকবাল তখন পিএইচডি করছেন আমেরিকায়। লেখকের পক্ষে অনুমতিটাও হুমায়ূন ভাইই দিলেন। আমার একটা গোপন ইচ্ছে ছিল ভবিষ্যতে দীপু নাম্বার টু নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের। কিন্তু আমার আগেই আমার চেয়ে মেধাবী, আমার চেয়ে অ্যাকটিভ, আমার চেয়ে যোগ্য মোরশেদুল ইসলাম ঘটনাটি ঘটিয়ে ফেলেছেন! মোরশেদুলের পরিচালনায় চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেলে আমি আমার সম্পাদিত ছোটদের কাগজ পত্রিকার কভার স্টোরি করেছিলাম আমার স্বপ্নের ছবি দীপু নাম্বার টু-কে নিয়ে। 
নতুন প্রজন্মের হিরো 
শিশুসাহিত্যে এ বছর সিটি আনন্দআলো সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল। মার্চের প্রথম সপ্তাহে, ৫ মার্চ দুপুরে চ্যানেল আই স্টুডিও থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছিল পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানটি। আমি ছিলাম অনুষ্ঠানের উপস্থাপক। অনুষ্ঠান শেষে দুপুরে ইকবাল সস্ত্রীক আমাদের সঙ্গে লাঞ্চ করলেন। ক'দিন পরেই আমার ফিরতি ফ্লাইট কানাডার উদ্দেশে। আমার কন্যা নদী বলে দিয়েছিল তার প্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের অটোগ্রাফসহ কয়েকটা বই যেন নিয়ে যাই কানাডায়। বইমেলায় নানা ব্যস্ততায় কাজটা করা হয়নি। খেতে খেতেই ঘটনাটা বললাম। আমীরুল সমাধান দিল, এক্ষুণি চ্যানেল আইয়ের একজন সহযোগীকে পাঠিয়ে বেইলি রোডের সাগর পাবলিশার্স থেকে ইকবাল ভাইয়ের কয়েকটা বই আনিয়ে নিলেই তো হয়। ইকবাল ভাই আরেকটি অনুষ্ঠান রেকর্ডিংয়ের প্রয়োজনে বিকেল পর্যন্ত চ্যানেল আইয়েই তো আছেন। আমাকে উদ্যোগী হতে দেখে ইকবাল ভাই নিরস্ত করলেন_ অত ঝামেলার কী দরকার। আমার বাসায় অনেক বই আছে। রাতে বাসায় চলে আসুন। চা-ও হবে, নদীর জন্য অটোগ্রাফটাও হবে। রাতে আমি আর আহমাদ মাযহার গেলাম উত্তরায় তাঁর বাসায়। ইকবাল ভাই একের পর এক বইয়ে নদীর জন্য অটোগ্রাফ দিচ্ছেন। আমি মুঠোফোনে কানাডায় কল দিলাম। আমার স্ত্রী শার্লি জানাল নদী এখন ইউনিভার্সিটিতে। ইকবাল ভাইয়ের সঙ্গে আজকের ঘটনার বিবরণ শুনে ফোনের অন্যপ্রান্তে আমার স্ত্রীও উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল_ আরে! শুধু নদীকে অটোগ্রাফ দিলেই হবে? আমার জন্যও নিয়ে আয় কয়েকটা। আমিও তো ইকবাল ভাইয়ের ভক্ত পাঠক! তুই ফোনটা ইকবাল ভাইকে দে, আমিই বলি। শার্লির সঙ্গে কথা বলে ইকবাল ভাই হাসি হাসি মুখ করে আমার স্ত্রী শার্লির নামেও সই করে বই উপহার দিলেন। ইকবাল ভাই বোধহয় ভাবছিলেন এরপর আমিও তাঁর অটোগ্রাফ চেয়ে বসব। আড়চোখে বার কয়েক আমার দিকে তাকালেনও! নেহাত ইকবাল ভাইয়ের ক্লান্তির কথা ভেবে আমি সেইবেলা বিরত থাকলাম। আহারে! অটোগ্রাফ দিতে দিতে ক্লান্ত বেচারা!
কিন্তু অটোগ্রাফ দিতে গিয়ে ইকবাল কখনোই ক্লান্ত হন না। প্রতিবছর একুশের বইমেলায় বাংলা একাডেমীর নজরুল মঞ্চের পেছনের সিঁড়িতে বা গোলচত্বরে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অটোগ্রাফ দেন তিনি। কিশোর-তরুণরা সুদীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তাঁর অটোগ্রাফ নেয়। ইকবাল ভাইয়ের সাধ্য নেই একটু হেঁটে বইমেলাটা দেখার। হাঁটতে গেলেই তাঁর পেছনে মৌচাকের মতো ভিড় জমাট বেঁধে থাকে। অথচ এককালে ঘটনা বা পরিস্থিতি এ রকম ছিল না। আমার মনে আছে, পনেরো-কুড়ি বছর আগে এই বাংলা একাডেমীর বইমেলাতেই মুহম্মদ জাফর ইকবাল হাঁটছিলেন একা একা। এই স্টল সেই স্টল ঘুরে ঘুরে বই দেখছেন। তখনও এ দেশের পাঠকরা তাঁর চেহারা চেনে না। তখন প্রতীক প্রকাশিত তাঁর 'সায়েন্সফিকশনসমগ্র' ছাড়া অন্য কোনো বইয়ের ফ্ল্যাপে বোধহয় তাঁর কোনো ছবিও ছাপা নেই (আমি কি ঠিক বললাম?)। একলা একা হাঁটছেন এ রকম একজন গুণী লেখক, তাঁকে সঙ্গ দেওয়া দরকার ভেবে আমি এগিয়ে গিয়েছিলাম। কুশল বিনিময়ের পর এটা-সেটা নানা কথার এক পর্যায়ে বললাম, এত পাঠকপ্রিয় লেখক আপনি অথচ কী আশ্চর্য পাঠক আপনাকে চিনতে পারছে না! তিনি বললেন, এই যে একলা একা নিজের ইচ্ছামতো হাঁটছি আমি বইমেলায়, কেউ আমাকে চিনতে পারছে না, এটা আমি এনজয় করছি। বললেন, হুমায়ূন আহমেদের সেই কপাল নাই। একটা স্টলে এসে বসেন। ব্যস। নট নড়ন চড়ন অবস্থা। ওই যে দেখেন বড় ভাইজানের কী হাল! সেই বিকেলে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা নিয়তি আমাদের কথোপকথন শুনে মুখটিপে খুব একপ্রস্থ হেসেছিল বোধকরি। কারণ এখন বইমেলায় মুহম্মদ জাফর ইকবালেরও নট নড়ন চড়ন অবস্থা। শুধু বইয়ের পাঠক নয়, মিডিয়ার কল্যাণে সারাদেশের মানুষই তাঁর চেহারা চেনে এখন। এখন তিনি স্টারের ওপর স্টার। সুপারস্টার।
অভিনন্দন মুহম্মদ জাফর ইকবাল! 
হাস্যোজ্জ্বল নিপাট ভদ্রলোক, নিরহঙ্কার, সরল, সাদাসিধে (সাদাসিধে নামে একটা কলামের বই আছে তাঁর, ধ্রুবর করা প্রচ্ছদ, ফ্রিহ্যান্ড লেটারিংটা আমার ছিল!), দেশপ্রেমীক, কমিটেড এবং বিরল রকমের ভালো মানুষ মুহম্মদ জাফর ইকবাল। সৎ-নির্লোভ-দায়িত্বশীল-বিজ্ঞানমনস্ক-দেশপ্রেমিক একটি প্রজন্মের স্বপ্ন দেখেন তিনি। এ দেশের তরুণ প্রজন্ম তাঁকে ভালোবাসে। শ্রদ্ধা করে। বিশ্বাস করে। তরুণদের বিশ্বাসের মূল্যও তিনি দেন। আর তাই তো কোনো প্রলোভন কিংবা চোখ রাঙানিতে একটুও বিচলিত হন না মুহম্মদ জাফর ইকবাল। একাত্তরের পরাজিত শক্তি ঘাতক দালাল রাজাকার-আলবদরদের বিরুদ্ধে তাঁর ভূমিকা সুস্পষ্ট এবং কার্যকর। তাঁর শক্তিশালী কলমটিকে (বলেছিলেন, এখনও হাতেই লেখেন কাগজে-কলমে, কম্পিউটারে লেখেন না!) আমার অভিবাদন। ঘাতক-যুদ্ধাপরাধী নরপশুদের অমানবিক হিংস্রতা আর নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আর ঘৃণার অগি্নমন্ত্র রচিত হয় এই কলমেই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা, আমাদের স্বাধীনতার আনন্দ-বেদনা, আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার অপরূপ প্রতিচ্ছবি মূর্ত হয়ে ওঠে এই কলমেই। অভিনন্দন সাহসী কলমযোদ্ধা মুহম্মদ জাফর ইকবাল। 
ছোটদের আদর আর বড়দের সমীহ পাওয়া খুব সহজ ব্যাপার নয়। কিন্তু এক জীবনে মুহম্মদ জাফর ইকবাল এ দুটোই অর্জন করেছেন ঈর্ষণীয় দক্ষতায়!

You can follow us on Twitter or join our Facebook fanpage to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature.
Download Bangla books in pdf form mediafire.com and also read it online. Read it from iPad, iPhone. Muhammad-Zafar-Iqbal-Lutfar-Rahman-Riton, bangla ebooks, free download , mediafire , humayun ahmed , zafar iqbal , sunil gangopadhaya , suchitra , bengali ebooks, free bangla books online, ebooks bangla, bangla pdf, bangla books, boi, bangla boi, amarboi.
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com