সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label ছোটগল্প. Show all posts
Showing posts with label ছোটগল্প. Show all posts

শ্রেষ্ঠ বিদেশী গল্প - শেখর বসু সম্পাদিত

amarboi
শ্রেষ্ঠ বিদেশী গল্প - শেখর বসু সম্পাদিত
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

"সুনীলের গল্প"

সাধারণত সাহিত্যে কবিতা ও গদ্য-কাহিনির মধ্যে একটা স্পষ্ট বিভাজন রেখা থাকে। কবিরা এক ধরনের আভিজাত্য নিয়ে গল্প-উপন্যাসকে একটু নীচু স্থান দেন, ওসব নিয়ে সময় নষ্ট করেন না। আবার গল্প-উপন্যাসের মহারথীরা কবিতা রচনায় তাঁদের অক্ষমতার কথা জানিয়ে দেন। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, যেমন সর্বাগ্রে রবীন্দ্রনাথ। এবং বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র। জীবনানন্দ দাশ কবি হিসেবে মান্য হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন এবং মৃত্যুর পর সবিস্ময়ে জানা গেল, তিনি অনেকগুলি উপন্যাস, প্রচুর ছোটগল্পও লিখেছেন, সবগুলিই অপ্রকাশিত! সুনীল এঁদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। তাঁর ছোটগল্পের বই-ও বেরিয়েছে অনেকগুলি। ছোটগল্পের বইয়ের তেমন পুনর্মুদ্রণ হয় না। কিছুদিনের মধ্যেই হারিয়ে যায়। বইয়ের হাটে এখন থেকে আমরা 'সুনীলের গল্প' নামে তার প্রকাশিত/অপ্রকাশিত সব গল্পগুলি ধারাবাহিক ভাবে পোস্টের ব্যাবস্থা নিয়েছি। এখন প্রশ্ন জাগতেই পারে যে বই আকারে না দিয়ে পোস্ট আকারে দিচ্ছি কেন। কারনটা খুবই সাধারন, বই অনেকেই শুধু নামিয়ে রেখে দেন পড়া আর হয়ে উঠে না। পোস্ট আকারে গল্পগুলো দিলে অন্তত নানান কাজের ভিড়ে টুক করে হয়ত একটা দুইটা গল্প পড়া হয়ে যাবে। মন্দ কি! আমাদের আসল উদ্দেশ্য তো বই পড়ানো, বইয়ের ভাড়ে নিমজ্জিত করে রাখা নয়। তাই আসুন শুরু করি। সব গল্প নিশ্চয়ই সব পাঠকের মনঃপূত হবে না। অন্তত কিছু গল্পও যদি স্মরণীয় থেকে যায়, তাতেই আমরা ধন্য হব।

আজকের গল্প; ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী

একাহিনি অভিজিৎ সেনের। কিছুটা কিছুটা জেনেছি তাঁর ডায়েরি থেকে। আমি তাঁর মুখেই শুনেছি।
অনেক নাম এবং জায়গাগুলিও বদলাতে হবে। সংশ্লিষ্ট পাত্র-পাত্রীরা অনেকেই বেঁচে আছেন এখনও। অভিজিৎ সেন গোপনীয়তার তোয়াক্কা করতেন না। কিন্তু আমি কেন খামোকা ফ্যাসাদে পড়তে যাব।
অভিজিৎ সেন নিজেই আমাকে বলেছিলেন, যদি পারিস আমার জীবনের এই ঘটনাটা লিখিস। তাতে লোকশিক্ষা হবে।
কাহিনির শুরু বম্বে মেলের ফার্স্ট ক্লাসের কামরায়।
তার আগে বলে নিই, বিখ্যাত অভিজিৎ সেন আমাদের কাছে অভিদা। আমার চেয়ে বয়েসে অন্তত পনেরো বছরের বড়। বেশ সুঠাম, তেজি চেহারা। অনেকদিন পর্যন্ত যৌবন ধরে রেখেছিলেন।
আমার সঙ্গে পরিচয় পাড়ার ছেলে হওয়ার সুবাদে। তখন উত্তর কলকাতার রাজবল্লভ পাড়ায় থাকি। কিছু-কিছু বাড়ির সামনের রকে আড্ডার আসর বসাবার রেওয়াজ ছিল। এখন সেইসব আড্ডা রক ছেড়ে বৈঠকখানায় স্থানান্তরিত হয়েছে, রকগুলো ভেঙে হয়েছে দোকানঘর। কিন্তু রকের আড্ডা আর বৈঠকখানার আড্ডার চরিত্রের তফাত আছে। রকের আড্ডায় রাস্তা দিয়ে যেতে-যেতে যে-কোনও লোক ভিড়ে যেতে পারে। যার যখন ইচ্ছে উঠে গেল, আবার নতুন কেউ এসে বসল।
বিভিন্ন রকে বিভিন্ন বয়সিদের আড্ডা। কোনওটা বুড়োদের কোনওটা মাঝবয়েসিদের, আর কোনওটা ছেলে-ছোকরাদের।
কোনওটাতেই মেয়েদের যোগ দেওয়ার অধিকার ছিল না। ইংল্যান্ডে বা আমেরিকাতেও অনেক ক্লাবে মেয়েদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। আমাদের কলকাতাতেও এখনও অনেক ক্লাবে মেয়েরা মেম্বার হতে পারে না।
পাড়ার রকে গোঁফ গজাবার আগে কোনও ছেলে বসতে চাইলে তাকে ধমকে বিদায় করে দেওয়া হত। আমার তখন সদ্য গোঁফ গজিয়েছে।
প্রত্যেক পাড়াতেই গর্ব করার মতন কয়েকজন লোক থাকে। আমাদের ওই পাড়ায় যেমন নুটুদা আর অভিদা। নুটুদা ক্রিকেট খেলোয়াড়, রঞ্জি ট্রফিতে দুবার চান্স পেয়েছিল। ওয়ান ডে ক্রিকেট চালু হওয়ার আগে ক্রিকেট খেলোয়াড়দের এত রমরমা ছিল না, শীতকাল ছাড়া অন্যসময় তাদের নাম শোনা যেত না। কিন্তু অভিদার নাম প্রায় সারা বছরই দেখা যেত খবরের কাগজে। গায়ক হিসেবে নাম ছাড়াবার পর ততদিনে মুম্বই থেকে তাঁকে ডাকাডাকি করছে। নমিতা সিংহ নামে একজন ফিলমের অভিনেত্রীকেও এ-পাড়ার মেয়ে বলে গণ্য করা হত। যদিও নমিতা সিংহ মাত্র সাড়ে চার মাস একটা ভাড়া বাড়িতে ছিল, তারপর চলে যায় নিউ আলিপুরে। তবু রাজবল্লভ পাড়া তার ওপর দাবি ছাড়বে না।
এ-পাড়ায় অভিদাদের তিন পুরুষের পুরোনো বাড়ি। যৌথ পরিবার, অনেক নারী-পুরুষে জমজমাট। বাড়ির মধ্যে একটা ছোট মন্দির, তার মধ্যে রাধাকৃষ্ণের যুগল বিগ্রহ, সকাল-সন্ধে আরতি হত, সেই ঘণ্টাধ্বনি শুনে আমরা সময় বুঝে নিতাম। সন্ধ্যারতির সময়ই আমাদের আড্ডা ভেঙে বাড়িতে ফিরে পড়তে বসতে হত।
মুম্বই বাড়ি দেওয়ার পরেও অভিদা মাঝে-মাঝেই কলকাতায় আসতেন। তখন তিনি টালিগঞ্জে নিজস্ব একটা ফ্ল্যাট নিয়েছেন বটে, কিন্তু দু-চারদিন এ-পাড়ায় পৈতৃক বাড়িতে কাটিয়ে যেতেন। অন্তত যতদিন তাঁর মা বেঁচেছিলেন।
অত বিখ্যাত মানুষ, খবরের কাগজে ছবি বেরোয়, অথচ অহঙ্কার ছিল না একেবারে। ক্রিকেট খেলোয়াড় নুটুদা বরং কলার উচিয়ে গম্ভীরভাবে হেঁটে যেতেন রাস্তা দিয়ে, বিশেষ কাউকে পাত্তা দিতেন না। কিন্তু অভিদা মিশতেন সব বয়েসিদের সঙ্গে।
আমাদের রকের আড্ডায় সাহিত্য-শিল্প-সিনেমা-পরনিন্দা-পরচর্চা সবই চলে। কথায়-কথায় রাজা-উজির মারি। অল্প বয়েসে সব কিছুতেই আঘাত করার একটা প্রবণতা থাকে। আধুনিক গায়ক-গায়িকাদের আমরা নস্যাৎ করে দিতাম, অভিদাকেও বড় গায়ক মনে করতাম না। তবে গলার আওয়াজ জোরালো, আধুনিক গান না গেয়ে তাঁর ক্লাসিকাল গানে টিঁকে থাকা উচিত ছিল। আমরা মুগ্ধ ছিলাম অভিদার ব্যক্তিত্বে।
বয়েসের অনেক তফাত থাকলেও আমাদের মতন অর্বাচীনদের আড্ডায় তিনি এসে বসতেন মাঝে-মাঝে। অমন বিখ্যাত হয়েও পোশাকের কোনও আড়ম্বর ছিল না, পাজামা আর গেঞ্জি পরে রাস্তার ধারে বসতে দ্বিধা করতেন না। চওড়া বুক, ফরসা রং, তখনও পর্যন্ত একটাও চুল পাকেনি, চোখে পড়ার মতন চেহারা।
হাতে সবসময় সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার। অকৃপণ সিগারেট বিলোতেন। আমরা প্রথম-প্রথম সঙ্কোচ বোধ করতাম, তিনি হাসি মুখে বলতেন, নে, নে অত লজ্জা কীসের। আমি ষোলো বছর বয়েস থেকেই বিড়ি টানতে শিখেছি।
উলটোদিকে নিবারণদার চায়ের দোকান। অভিদা হাঁক দিয়ে বলতেন, নেবাদা, এখানে এক রাউন্ড চা দিয়ে যাও। ঠিক আধঘণ্টা অন্তর চা দিয়ে যাবে।
তারপর আমাদের জিগ্যেস করতেন, এ পাড়ার লেটেস্ট খবর কী বল! কেউ কারুর বউকে নিয়ে ভাগেনি? ওই কোণের বাড়িটায় নতুন ভাড়াটে এসেছে, দুটো ডবগা-ডবগা ছুঁড়িকে দেখলুম, তোরা কেউ প্রেম করিসনি?
উত্তর কলকাতায় সেসময়ে মুখের ভাষায়, শালা, মাগি বেজম্মা এইসব শব্দ অনায়াসে মিশে থাকত। কেউ খুব আদর করে তার বন্ধুকে ডাকত। এই শুয়োরের বাচ্চা এদিকে আয়।
একদিনের কথা মনে আছে। আমার বন্ধু মানস বরাবরই পেটরোগা। কথা বলতে-বলতে হঠাৎ বাথরুমের দিকে ছুটত। তার মা তারকেশ্বরে পুজো দিয়ে মন্ত্র পড়া ফুলপাতা মুড়ে একটা বড় রুপোর মাদুলি বানিয়ে দিয়েছিলেন। সেটা সবসময় তাকে গলায় পরে থাকতে হত। সেদিন রুপোর মাদুলিটা তার জামার বাইরে বেরিয়ে পড়েছে, সেটা দেখে অভিদা জিগ্যেস করলেন, এটা কী রে?
মানস তারকেশ্বর, মা, পেট খারাপ এইসব বলতেই অভিদা ঝুঁকে এসে হ্যাঁচকা টানে সেটা ছিঁড়ে নিলেন।
তারপর ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে-দেখতে বললেন, এতে সত্যি কাজ হয়?
মানস বলল, অনেকটা কমেছে।
অভিদা বললেন, ভালো কথা, আমাদের বাড়িতে নেপু নামে একটা বাচ্চা চাকর আছে, সেটা যখন-তখন পেটব্যথায় ছটপট করে। তাকে পরিয়ে দেব, যদি তার সারে...তোর মাকে বলিস তোর জন্য আর-একটা গড়িয়ে দিতে।
মানস কাঁচুমাচু হয়ে গেল। তাদের বাড়ির অবস্থা সচ্ছল, ওইটুকু রুপোর জন্য কিছু যায় আসে না, কিন্তু মন্ত্রঃপূত মাদুলি কি অন্যকে দেওয়া যায়? বাড়িতে খুব বকাবকি করবে।
অভিদা কিন্তু মাদুলিটা ফেরত দিলেন না। তাঁর এই ব্যবহারটা খুব অদ্ভুত লেগেছিল।
যাই হোক, এবার আসল গপ্পে আসা যাক।
সেদিন আমার বম্বে মেল ধরার কথা। হাওড়া ব্রিজে দারুণ জ্যাম, ট্যাক্সি আর নড়েচড়ে না। আমার কাছে শুধু একটা বড় ব্যাগ ছিল, একসময়ে ট্যাক্সি থেকে নেমে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দৌড়তে-দৌড়তে প্ল্যাটফর্মে যখন পৌঁছলাম, তখন ট্রেন নড়াচড়া শুরু করেছে।
হুড়মুড় করে উঠে পড়ে, আমার কিউবিকল খুঁজে ভেতরে ঢুকে দেখলাম, তলার একদিকের বাঙ্কে বসে আছে দুজন যাত্রী, অন্য বাঙ্কে পাতলা চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে আর-একজন।
সবে কলির সন্ধে, এসময় কারও শুয়ে থাকার কথা নয়। হয়তো লোকটি অসুস্থ, তাই ভালো করে লক্ষ করিনি। ব্যাগটা সিটের তলায় রেখে, অন্য দুজনের পাশে বসার পর দেখি, সেই শুয়ে থাকা ব্যক্তিটি আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মুখে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, মাথায় সামান্য টাক, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা।
সিগারেট দেশলাই পকেটে নেই, ব্যাগে ভরা আছে। আবার ব্যাগটা টেনে বার করে, সিগারেট দেশলাই নিয়ে একটা জ্বালাবার পর দেখি, তখনও শুয়ে থাকা যাত্রীটি চোখ ফেরায়নি। অন্য দুজন দক্ষিণ ভারতীয়, তারা গল্প করছে নিজেদের ভাষায়।
কয়েক মুহূর্ত পরে সেই লোকটি বলল, তুই সুনীল না?
সঙ্গে-সঙ্গে গলার আওয়াজে চেনা গেল। অভিদা।
আশ্চর্য, আমি অভিদাকে চিনতে পারিনি, আর উনি আমাকে মনে রেখেছেন?
এর মধ্যে কেটে গেছে প্রায় বছরদশেক। আমি রাজবল্লভ পাড়া ছেড়ে চলে গেছি দমদম। অভিদার ছবি নিয়মিত পত্রপত্রিকায় দেখি, অনেক খবর থাকে তাঁর সম্পর্কে। এখন তিনি আর শুধু গায়ক নন, অনেক হিন্দি ফিলমের সার্থক সুরকার।
আগে চশমা পরতেন না। মাথা ভরতি চুল ছিল। অভিজিৎ সেনের মতন একজন বিখ্যাত ব্যক্তি এরকম খোঁচা-খোঁচা দাড়ি নিয়ে ট্রেনে যাচ্ছেন, এটাও কি ভাবা যায়? সবাই খানিকটা সাজগোজ করে। আর ফিলম সংক্রান্ত লোকজনদের কিছুটা ঝলমলে উৎকট পোশাক পরাই রেওয়াজ।
অভিদা জনপ্রিয়তার শিখরে, তাঁর কথা তো আমি জানবই। কিন্তু আমার নামটা তিনি দশ বছর পরেও মনে রেখেছেন, স্মৃতিশক্তি খুব প্রখর, তা মানতেই হবে।
প্রাথমিক উচ্ছ্বাসের পর অভিদা জিগ্যেস করলেন, তুই এখন কী করছিস রে সুনীল? সাকসেসফুল হয়েছিস তো বোঝাই যাচ্ছে, ট্রেনে ফার্স্টক্লাসে ট্রাভল করছিস। চাকরি, না বিজনেস?
না, নিজের পয়সায় টিকিট কেটে ফার্স্টক্লাসে যাওয়ার মতন অবস্থা আমার হয়নি। তখন পর্যন্ত আমি শুধু কবিতাই লিখি। কবিতা লিখে কিছু নামটাম হলে টাকা পয়সার দিক থেকে কোনও সুবিধে হয় না বটে, তবে বিভিন্ন জায়গা থেকে কবি সম্মেলন বা সাহিত্যবাসরে আমন্ত্রণ পাওয়া যায়, গল্প-উপন্যাস লেখকরা বরং এদিক থেকে খানিকটা বঞ্চিত। আমি ভ্রমণ-ক্ষ্যাপা, দূরের কোনও জায়গা থেকে ডাক পেলেই ছুটে যাই।
আমার গন্তব্য মুম্বই নয়, আমেদাবাদ। একটি গুজরাতি প্রতিষ্ঠান আমন্ত্রণ পাঠিয়েছে। তারাই ফার্স্টক্লাসের টিকিট কেটে দিয়েছে। মুম্বইতে এক রাত্রি বাস করে পরদিন আমেদাবাদের ট্রেন ধরতে হবে।
একটু পরে জিগ্যেস করলাম, অভিদা, তোমার শরীর খারাপ নাকি? এখন থেকেই শুয়ে পড়েছ?
অভিদা বললেন, দুদিন ধরে গা-টা ম্যাজ-ম্যাজ করছে। তা ছাড়া পায়ের যা অবস্থা বসতে গেলে পা-টা একেবারে সোজা সামনে মেলে থাকতে হয়। সেটা ভালো দেখায় না।
তলার দিকে চাদরটা একটু সরালেন অভিদা। তাঁর একটা পায়ের অনেকখানি প্লাস্টার করা। খুব নতুন নয়, তার ওপরে কিছু মানুষের সই রয়েছে।
কোনও মানুষের পা ভাঙা দেখলেই কৌতূহল হয়, কী করে ভাঙল?
অভিদা হাসতে-হাসতে বললেন, ভগবান ভেঙে দিয়েছে।
সবসময় ঠাট্টা-মস্করা করা অভিদার স্বভাব। এটা কী ধরনের মস্করা? আমি বললাম, ভগবান নিজে এসে ভেঙে দিলেন? তুমি তাঁকে দেখতে পেয়েছিলে?
অভিদা বললেন, নারে, দেখতে পাইনি। পেছন দিকে ছিল। ওই যে কথা আছে না, 'ঠিক দুক্কুর বেলা, ভূতে মারে ঠেলা,' সেই রকমই। ভূতের বদলে ভগবান আমায় পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ফেলে দিল।
আমার চোখে তখনও কৌতূহল দেখে অভিদা বললেন, তোকে ব্যপারটা পরে বলব। এখন একটা কাজ কর তো, তোকে যখন পাওয়াই গেছে, একটু খাটিয়ে নিই। এই বাঙ্কটার তলায় দ্যাখ আমার বড় ব্যাগটার পাশে একটা শান্তিনিকেতনি ঝোলা আছে, সেটা ওপরে নিয়ে আয়।
সেই ঝোলাটার মধ্যে একটা স্কচ হুইস্কির বোতল। লুকোবার কোনও চেষ্টাই নেই, ওপরের দিকটা বেরিয়ে আছে। একটা জলের ফ্লাক্স, আর একটি কাচের গেলাস।
অভিজিৎ সেনের জীবনযাত্রার কাহিনিও সুবিদিত।
ইচ্ছে করলে হয়তো ফিলমের নায়কও হতে পারতেন। কিন্তু অত আলো ও ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বারবার এককথা বলা তাঁর পছন্দ নয় বলে, কয়েকজন পরিচালক আগ্রহ দেখালেও অভিদা রাজি হননি। কিন্তু তাঁর অনেক কীর্তি-কাহিনি অনেক নায়ক-নায়িকাকেও হার মানিয়ে দেয়।
মুম্বইতে পাকাপাকি যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর সঙ্গে এক উঠতি অভিনেত্রীর বিয়ে হয়। সে বিয়ে ভেঙেও যায় দেড় বছরের মধ্যে। তারপর আর বিয়ে করেননি, গুজব ছড়িয়েছে নানা রকম। কিছুদিন স্মিতা পাটিলের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়েছিল। কোনও একটা পার্টিতে মদ খেয়ে নাকি মারামারি করেছিলেন, রাজ বব্বরের সঙ্গে। এক গায়িকাকে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন ইউরোপ। এই তো কিছুদিন আগে মদ খেয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে পুণে শহরে এক ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে তাঁর ঝগড়া হয়, অভিদা মাথা গরম করে সেই পুলিশকে চড় মেরে বসেছিলেন। সেজন্য আদালতে গিয়ে তাঁকে জরিমানাও দিতে হয়েছে।
এসবই আমার কাগজে পড়া বা লোকমুখে শোনা। হয়তো এর বাইরেও আরও অনেক কিছু ঘটেছে। হিন্দি ফিলম আমি প্রায় দেখিই না। অভিদার গাওয়া বা সুর দেওয়া অনেক গানই আমার শোনা হয়নি। তবে পুজো প্যান্ডেলের অনেক গান বাধ্য হয়ে শুনতে হয়, হঠাৎ অভিদার গলায় আওয়াজ চিনতে পারলে মন দিই। মানুষটিকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি বলেই। অভিদা বাংলা গানও কিছু-কিছু রেকর্ড করেছে, সেগুলো বিশেষ সুবিধের না, অন্তত আমার রুচির সঙ্গে মেলে না। তবে, এরই মধ্যে একটা ভাটিয়ালি খুবই ভালো লেগেছিল। স্বীকার করতেই হবে, এরকম দরাজ গলা এখন আর কারও নেই।
অভিদা জিগ্যেস করলেন, তোর কাছে গেলাস আছে?
আমি বললাম, না তো।
—এই তো মুশকিলে ফেললি। মোটে একটা গেলাস এনেছি। ঠিক আছে, ফ্লাস্কের ঢাকনাটা ব্যবহার করা যাবে। এসব খাস-টাস তো?
—যদি একটু প্রসাদ দাও।
—প্রসাদ কণিকা মাত্র। একটুই পাবি, বেশি না। আগে আমারটা ঢাল। মুম্বইতে কোথায় রাত কাটাবি?
—দাদারে একটা ছোটখাটো হোটেল চিনি।
—মুম্বইতে যাচ্ছিস, আমার সঙ্গে যোগাযোগ করিসনি কেন?
—তুমি বিখ্যাত লোক, আমাদের ধরা-ছোঁওয়ার বাইরে। তা ছাড়া অনেকদিন যোগাযোগ নেই।
অভিদা অন্য সহযাত্রীদের দিকে গেলাস তুলে জিগ্যেস করলেন, ডু ইউ মাইন্ড?
দুজনেই ভদ্রতা করে বললেন, নো, নো নো।
অভিদা আবার বললেন, উড ইউ লাইক টু জয়েন আস?
দেখা গেল, দক্ষিণ ভারতীয় দুজনই সাত্বিক প্রকৃতির। মদ স্পর্শ করে না। তবে আমাদের ব্যাপারে আপত্তি নেই।
অভিদা আমাকে বাংলায় বললেন, এত লম্বা জার্নি, মদ না খেয়ে লোকে কী করে যায়, আমি বুঝতেই পারি না। তোর কাছে বোতল আছে?
—না।
—সঙ্গে রাখিস না? তার মানে এখনও নেশা ধরেনি।
—আমি শুধু অন্য কেউ খাওয়ালে খাই।
—ওইভাবেই শুরু হয়। নেশাখোর হবি কি না এখন থেকে ঠিক কর। যদি না হতে চাস, এখন থেকেই আর ছুঁবি না। আর নয় তো আমার মতন অবস্থা হবে।
—তুমি রোজ খাও?
—রোজ খাদ্য খেতে হয় না? আমার খাদ্যের সঙ্গে পানীয়ও লাগে। আগে মা-র কাছে গেলে খেতাম না। এবার মা-র কাছেও পারমিশান নিয়ে নিয়েছি। মুম্বইতে খুব কাজ ছিল, মাকে দেখতেই কলকাতায় এসেছিলাম তিন দিনের জন্য।
—তোমার মা...এখন ভালো আছেন?
—আমাকে দেখেই তো ভালো হয়ে গেলেন। প্লেনে এসেছিলাম, কিন্তু এই পা নিয়ে বেশিক্ষণ বসে থাকতে বেশ ব্যথা লাগে। তাই ফেরার সময় মনে হল, ট্রেনই ভালো।
—টিকিট পেলে কী করে? অনেকদিন আগে তো কাটতে হয়।
—কত দালাল আছে। আমার ভক্তও তো আছে রে। তারা জোগাড় করে দেয়। তুই আমার গান শুনিস?
—তেমন শোনা হয়নি। একটি ভাটিয়ালি খুব ভালো লেগেছিল। এইরকম গান আরও বেশি গাও না কেন?
—ওতে কি আর পয়সা আসে? এখন ফিলমে ঝিং চ্যাক ঝিং চ্যাক ছাড়া চলে না। ফাস্ট বিট। লাউড। সারা পৃথিবীতে প্রায় একরকম। আমার টাকার দরকার, তাই ওই সব চ্যাংড়া গান গাই। আমরা নাকি রাজা রাজবল্লভের বংশ, তুই জানিস?
—ও-পাড়ায় থাকতে শুনেছি।
—সত্যি কি না কে জানে! বাবা-টাবাদের কাছে শুনেছি। হয়তো লতায়-পাতায় কিছু একটা একটা সম্পর্ক ছিল। সে যাই হোক, সাহেবদের পা চেটে আমাদের কোনও পূর্বপুরুষ টাকা করেছিল অনেক। কলসির জল গড়াতে-গড়াতে শেষ হয়ে গেছে। এখন আর কিছু নেই। ওই যে অত বড় বাড়ি, তার চোদ্দোজন শরিক। তবু বনেদিয়ানাটা রয়ে গেছে। দেখিসনি, আমার বাবা-কাকারা কুচোনো ধুতি আর গিলে করা পাঞ্জাবি ছাড়া পরত না। সব ফোতো কাপ্তেন! পেটে ভাত নেই, মুখে পান। অল্প বয়েস থেকেই আমি বুঝেছিলুম, ওসব নকলিবাজি আমার দ্বারা পোষাবে না। আমার টাকা চাই, আমি ভোগী লোক, আমার অনেক টাকা দরকার। চাকরি-বাকরি করা আমার দ্বারা পোষাত না। নেহাত গলাটা আছে, তাই গান গেয়ে টাকা পাই।
—তুমি কারও কাছে গান শেখোনি?
—কার কাছে শিখব? ধৈর্য ছিল না। মহম্মদ রফি-কে নকল করতাম। রফি সাহেব আমার গুরু। দূর থেকে, মানে আমি একলব্য শিষ্য। দু-একটা পাড়ার জলসায় গান গেয়ে বেশ হাততালি পেতাম। ব্যস, বুঝে গেলুম, এই লাইনটাই ধরতে হবে। প্রথম দিকে স্রেফ বড়-বড় গায়কদের নকল করে পপুলার হয়েছি। মুম্বইতে আসার পর হেমন্তবাবু আমায় খুব সাহায্য করেছিলেন। উনিই প্রথম বলেছিলেন, যথেষ্ট হয়েছে, এবার নিজের গলাটা খোলো!
—তোমার গলাটা সত্যিই ভালো।
—তুই প্রশংসা করছিস? গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না। মুম্বইতে নাম করেছি বটে, কলকাতার লোক এখন আর আমায় তেমন পছন্দ করে না জানি! তুই কবিতা-টবিতা লিখিস বললি, আমি কিছুই পড়িনি। একসময় খুব পড়ার নেশা ছিল, এখন আর বিশেষ সময় পাই না। তুই গান লিখিস না? দে, দু-চারখানা গান লিখে দে। হিন্দিতে ট্রানস্লেট করে কোনও ফিলমে লাগিয়ে দেব। তুই কিছু পয়সা পাবি।
—না, অভিদা, গান লেখার ক্ষমতা আমার নেই। আমি দুর্বোধ্য আধুনিক কবিতা লিখি, যা অনেক লোকই বোঝে না।
—কেন, ওরকম লিখিস কেন?
—কেউ-কেউ তো খেয়াল তারানাও গায়, অনেকে বোঝে না।
—হুঁ!
এর মধ্যে আমাদের রাত্তিরের খাবার এসে গেল। আমি ঢাকনা খুলে হাত দেওয়ার আগেই অভিদা ধমক দিয়ে বললেন, রেখে দে। আগে মালের নেশা না জমলে কেউ খায় নাকি?
ফ্লাস্কের ঢাকনায় আমি একটুখানি নিয়ে বসে আছি, অভিদা প্রায় আধবোতল উড়িয়ে দিলেন। তাতেও কথা একটু জড়ায়নি, মাথা ঠিক আছে।
পায়ের ওপর থেকে চাদরটা সরে গেছে। ডান পায়ের গোড়ালি থেকে ঊরু পর্যন্ত মোটা প্লাস্টার। আমি ঝুঁকে পড়ে তার ওপর নাম সইগুলো পড়বার চেষ্টা করলাম। মাত্র তিন চারটে নামই চেনা, দিলীপকুমার, নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি, আশা ভোঁসলে আরও অনেক নাম আছে।
অভিদা বললেন, তুই বুঝি ভাবছিস, আমি ফাঁট দেখাবার জন্য ওই সব হিরো-হিরোইনদের নাম সই করিয়েছি? ক'দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল, তখন অনেকে দেখতে এসেছে, নিজেরাই সই করেছে। গুড উইশ করার মতন। সুরকারদের সবাই খাতির করে, গান হিট হওয়ার ওপর ছবি হিট হওয়া নির্ভর করে অনেকখানি। তবে এগুলো আমি মুছিনি ইচ্ছে করে, কলকাতায় আমার ভাইপো-ভাগ্নিরা দেখে মজা পাবে বলে। এখন মুছে ফেললেই হয়।
অভিদা হাতের গেলাস দিয়ে সেই নামগুলোর ওপর ঘষতে লাগলেন।
আমি আবার জিগ্যেস করলাম, তুমি সিঁড়ি দিয়ে পড়ে গিয়েছিলে?
অভিদা বললেন, হ্যাঁ, তবে মদ খেয়ে গড়াইনি। দিনের বেলা, সুস্থ অবস্থায়। তখন বললুম না, ভগবান আমায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। ভগবান সবসময় আমার পেছন-পেছন ঘোরে। হয়তো, এই কামরাতেও অদৃশ্য হয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে।
এটাকে মাতালের প্রলাপ মনে করে মুখ ফেরাতেই অভিদা হা-হা করে হেসে উঠলেন।
তারপর আমার একটা হাত ধরে টেনে বললেন, বিশ্বাস করলি না তো? আমি পাগল না, মাতালও হইনি। তবে শোন, তোকে গোড়া থেকে ঘটনাটা বলি। তবে, যতদিন না আমি অনুমতি দেব, তুই আর কারওকে বলতে পারবি না। তাতে রাজি আছিস?
আমি মাথা ঝোঁকালাম।
অভিদা এক বিচিত্র কাহিনি বলতে শুরু করলেন।
সেটা অভিদার জবানিতেই শোনা যাক।
অভিদার কথা

আমি জানি, আমার চরিত্রে একটা বৈপরীত্য আছে। ডুয়াল পার্সোনালিটি। তবে ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইডের মতন অতটা নয়। তবে কোনও খুনটুন করিনি। আমি ভালো লোক, আবার এই আমিই ঝোঁকের মাথায় এমন এক-একটা কাণ্ড করে ফেলি, যাতে আমার নিজেরই চরম ক্ষতি হবে, শেষ মুহূর্তে সেটা আমি বুঝি তবু জেদের বশে থামি না। কেন যে এরকম করি, তার যুক্তি খুঁজে পাই না। এক-একসময় স্বেচ্ছায় বিপদ ডেকে আনি, যেন এটা আমার খেলা। আমার এক বন্ধু ডাক্তার। সে বলে, আমার মধ্যে নাকি আত্মহত্যা করার প্রবণতা আছে। হঠাৎ এত নামডাক, আর টাকাপয়সা পাওয়া আমার সহ্য হচ্ছে না। কথাটা ঠিক বলে মনে হয় না। আমি কক্ষনও আত্মহত্যার চেষ্টা করিনি, সে চিন্তাও মাথায় আসে না। যা কিছু পেয়েছি, তা নিজের চেষ্টায় নিজের ক্ষমতার জোরে পেয়েছি, এ ব্যাপারে আমার কোনও হীনম্মন্যতাও নেই।
আমি হইচই ভালোবাসি, আবার নির্জনতাও ভালোবাসি। মুম্বইয়ের জীবন সবসময় উদ্দাম, বিশেষত আমাদের লাইনে। সবসময় সবাই ছুটছে, থামবার উপায় নেই। রাত দুটো-তিনটে পর্যন্ত জাগা, মদ্যপান, মেয়েদের নিয়ে হুল্লোড়, এসব তো লেগেই আছে। আমি খুব পছন্দ করি এইসব, লোকে জানে, আমি এক নম্বর হুল্লোড়বাজ।
আবার এক-একসময় এইসবে দারুণ বিতৃষ্ণা জন্মে যায়। টানা দশ-পনেরো দিন চেনা কোনও লোকের সঙ্গে কথা বলতেই ইচ্ছে করে না। টেলিফোনের আওয়াজে গায়ে যেন হুল ফোটে। ফিলম লাইনের সবাই জানে, আমি মাঝে-মাঝে রহস্যময়ভাবে উধাও হয়ে যাই কয়েকদিনের জন্য। কোথায় যাই, কেউ টের পায় না।
সেসব সময়ে আমি কোনও হোটেলেও উঠি না। আলাদা একটা বাড়ি ভাড়া করে থাকি। রান্নাবান্না, আর সব কিছুই নিজেরটা নিজে করে নিই। দাড়িও কামাই না সেই ক'দিন।
সে রকমই একবার গিয়েছিলুম এক জায়গায়, নাম বলছি না, ধরা যাক সে জায়গাটার নাম দুরানিগঞ্জ, মহারাষ্ট্রের মধ্যেই, নদীর ধারে ছোট শহর, চারপাশে ছোট-ছোট পাহাড়ঘেরা। শহর থেকে অনেকটা বাইরে, একটা পাহাড়ের গায়ে অনেকগুলো কটেজ বানিয়ে রাখা আছে, ভাড়া দেওয়ার জন্য। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে আমি বুক করেছিলাম সেরকম একটা কটেজ।
দুরানিগঞ্জের একমাত্র সিনেমা হলে তখন যে ছবিটা চলছে, সেটা আমরাই সুর দেওয়া। সুরকারদের ছবি তো পোস্টারে থাকে না, তাই আমাকে দেখে কেউ চিনবে না। শহরে আমি যেতামই না, একসঙ্গে অনেক খাবারদাবার কিনে এনে বাড়িতে বসে থাকতাম চুপচাপ।
পরিবেশটা ভারী সুন্দর। আমার কটেজটা পাহাড়ের মাঝামাঝি জায়গায়, বারান্দায় দাঁড়ালেই অনেক নীচে দেখা যায় নদীটাকে। প্রচুর গাছপালা। অনেক পাখি এসে বসে। কোনটা কোন পাখি তা চিনি না। এক-একটা পাখি দেখে মনে হয়, এরকম পাখি আগে কখনও দেখিনি। আমি শহরের মানুষ, পাখি আর দেখলাম কবে?
প্রথম দু-তিনদিন কানের মধ্যে যেন ঝনঝন শব্দ হত। মুম্বইয়ের জীবন, পার্টি, পঁয়ষট্টিটা ইনস্ট্রুমেন্ট নিয়ে মিউজিক, রেকর্ডিং, অনবরত গাড়ির আওয়াজ এসবের রেশ হয়ে গিয়েছিল। আস্তে-আস্তে সেগুলো কমে গেল, উপভোগ করতে লাগলুম নির্জনতার ঝঙ্কার।
এরকমভাবে চাঁদও তো দেখিনি কতদিন। পাহাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে আস্ত একখানা চাঁদ, দুধের মতন তার জ্যোৎস্না। এক-একসময় আবার মনে হত, একটা সাদা সিল্কের চাদরের মতন জ্যোৎস্না দুলছে। আমি কবিটবি নই, অন্যের লেখা কবিতায় সুর দিয়ে গান গাই। তবে মনে এমন-এমন সব ভাবনা আসত যে নিজেই অবাক হয়ে যেতুম। ধোঁওয়া নেই, ধুলো নেই, পরিষ্কার ঝকঝকে আকাশ। সত্যি কথা বলছি, সেই আকাশের তলায় বসে থাকতে আমার মদ খাওয়ার ইচ্ছেটাই যেন চলে গিয়েছিল। অভ্যেসবশত একটু-একটু খেতাম ঠিকই, আবার ভরতি গেলাস পড়েই থাকত, ছুঁতাম না।
এরকম চমৎকার জায়গায় একটাই শুধু অসুবিধে ছিল।
আমাদের দেশের অনেক পাহাড়ের চূড়াতেই একটা করে মন্দির থাকে। এ-পাহাড়টাতেও ছিল, ঠিক মন্দির নয়, একটা আখড়া। বিশেষ এক ধরনের বৈষ্ণব কাল্টের আখড়া, সর্বেশানন্দ নামে এক সাধু এর প্রতিষ্ঠাতা, তিনি বেঁচে নেই, তাঁর প্রধান শিষ্য প্রেমঘনানন্দ এই সম্প্রদায়ের গুরু, তাঁর বয়েস পঁচাশি। তিনি থাকেন ওই পাহাড়চূড়ায়।
আশ্রম বা আখড়া থাকে থাক, তাতে আমার কী! প্রত্যেকদিন সন্ধেবেলা ওখানে খোল-করতাল বাজিয়ে প্রায় ঘণ্টাদেড়েক ধরে কীর্তন বা প্রার্থনা-ট্রার্থনা হয়, অনেক লোক একসঙ্গে গান গায়। সেই আওয়াজ আমার বাড়ি পর্যন্ত আসে। সেই গানে আমার শান্তি ভঙ্গ হয়। বিরক্ত লাগে। সুরেলা গান হলেও তবু কথা ছিল, কিন্তু তা তো নয়, মাঝে-মাঝেই বেসুরো হয়ে যায়। আফটার অল আমি তো গানবাজনার লাইনের লোক, বেসুরো গান একেবারে সহ্য করতে পারি না।
কিন্তু কী আর করা যাবে! কারও বাড়িতে খুব বেশি চেঁচামেচি হলে অন্য কেউ নালিশ জানাতে পারে। কিন্তু ধর্মস্থানে যতই হল্লা হোক, কোনও আপত্তি করা চলবে না। সন্ধের সময় ওই দেড়ঘণ্টা আমি দরজা-জানলা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকতাম।
একদিন বিপদ যেন পায়ে হেঁটে উপস্থিত হল আমার কাছে। সে বিপদ এর নারীর বেশে।
আমার বাড়ির পাশ দিয়ে পাহাড়ের চূড়া থেকে নীচে নামবার পায়ে-হাঁটা রাস্তা, এ-আখড়ার লোকজনদের সেই রাস্তা দিয়ে ওঠা-নামা করতে দেখি। কারও সঙ্গে ডেকে কথা বলার প্রশ্নই ওঠে না।
তখন বেলা এগারোটা, আমি দাঁড়িয়ে আছি বারান্দায়। নীচে নদীটায় স্নান করতে যাব কি না ভাবছি। দুটি মেয়ে পাকদণ্ডী ছেড়ে আমার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। একজন গেরুয়া পরা, একজন সাদা শাড়ি, বোঝা গেল, ওই আখড়ার।
প্রথমে কয়েক মিনিট মনে হল, তারা আমার বাড়িটাই দেখছে। যদিও এমন কিছু দর্শনীয় নয়, ওখানকার সব বাড়িই এক রকম। কিছু বাড়ি ফাঁকাও পড়ে আছে।
আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতে একজন বলল, আমরা একটু ভেতরে আসতে পারি?
এখানে একটা কথা জানিয়ে রাখা দরকার। আমি বেশি বেশি নারী-চর্চা করি। এরকম একটা সুনাম বা দুর্নাম আমার আছে। কিন্তু আমি যখন এই ধরনের অজ্ঞাতবাসে যাই, তখন নারী-সঙ্গের কোনও অভাব বোধ আমার থাকে না। ইচ্ছে করলেই তো আমি মুম্বই থেকে যে-কোনও একটা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আসতে পারি। কিন্তু এই ধরনের লালসা পেছন ফেলে রেখে আসি আমি। একাকিত্বের অনুভবটাই আমাকে সবচেয়ে আনন্দ দেয়।
মেয়ে দুটিকে কোনও উত্তর না দিয়ে আমি ভেতরে চলে গেলেই ল্যাঠা চুকে যেত। ওরা আর ঢুকত না ভেতরে। অভদ্রতার মতন দেখালেও সেটাই আমার চরিত্রে মানায়। কিন্তু কোনও কারণে আমার মনটা তখন নরম ছিল। মনে হল, ওরা নিশ্চয়ই চাঁদা চাইতে এসেছে। কিছু দিয়ে দিলেই তো হয়।
বললুম, আসুন!
বাড়িটা দোতলা। বসবার ঘর একতলায়, খুব কাছেই সে পায়ে-চলা রাস্তা। দরকার হয়নি বলে, এ-ঘরটা আগে ব্যবহার করিনি। যদিও সোফাটোফা দিয়ে সাজানো আছে।
খুলে দিলাম সবক'টা জানলা। মেয়ে দুটি চৌকাঠের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। যে গেরুয়া শাড়ি পরা, তার বয়েস বছর তিরিশেক হবে। অন্যজন একটু ছোট মনে হয়।
আমি বললুম, ভেতরে এসে বসুন।
ওরা তবু দাঁড়িয়েই রইল। গেরুয়া পরা মেয়েটি বলল, কাল পূর্ণিমা, আমাদের আশ্রমে একটা উৎসব আছে। আপনাকে আমন্ত্রণ জানাতে এসেছি। আপনি একবার চরণধূলি দিলে আমরা ধন্য হব। গুরুদেব বলে দিয়েছেন, আপনি অনুগ্রহ করে ওখানেই প্রসাদ গ্রহণ করবেন।
বৈষ্ণব বিনয়! চাঁদা চাইতে আসেনি, বরং নেমন্তন্ন করে খাওয়াতে চায়। দু-চারজন শাঁসালো ভক্ত টাকা জোগায় বোধহয়।
আমি জিগ্যেস করলুম, আপনাদের ওখানে কীসের উৎসব?
সাদা-শাড়ি চঞ্চল চোখে নীরব, গেরুয়া মেয়েটি কথা বলছে। সে দু-হাত কপালে ঠেকিয়ে চক্ষু বুজে প্রণাম করে বলল, পরমগুরু সর্বেশানন্দজির কাল আবির্ভাব দিবস। দয়া করে আসবেন। বেশিক্ষণ লাগে না ওপরে উঠতে, বড়জোর দশ মিনিট। নামগান হবে, শুনেই চলে আসবেন।
জন্মদিনকে এরা বলে আবির্ভাব দিবস!
আমি ঠোঁট কাটা মানুষ, ফস করে বলে ফেললুম, নামগান হবে? কিছু মনে করবেন না। রোজ সন্ধেবেলা আপনাদের ওখানে কীর্তন-টির্তন হয়, এখান থেকেও শুনতে পাই। মাঝে-মাঝে বড্ড বেসুরো শোনায়!
মেয়েটির ওষ্ঠে এবার একটা পাতলা হাসির রেখা ফুটেই মিলিয়ে গেল। সে বলল, বেসুরো হয় বুঝি? তা হলে আপনিই সুর শিখিয়ে দিন না।
একটু হকচকিয়ে গিয়ে বললুম, আমি শেখাব? তার মানে আমি কে, তা কি আপনি জানেন?
মেয়েটি আবার একটু হাসি দিয়ে বলল, এখানে অনেকেই জেনে গেছে, আপনি গায়ক অভিজিৎ সেন।
কী করে যে খবর ছড়ায়! এখানে এসে কারও সঙ্গে কোনও কথা হয়নি, দেখা হয়নি, তবু...। যে কেয়ারটেকারটি প্রথম দিন চাবি এনে দরজা খুলে দিয়েছে, সে-ই বোধহয় নামটা বলে দিয়েছে অন্যদের।
এই গেরুয়া-নারী কি বাঙালি?
অবশ্যই। প্রথম থেকেই সে বাংলায় কথা বলছে আমার সঙ্গে। হয়তো মহারাষ্ট্রে জন্ম, কিন্তু বাংলা উচ্চারণ পরিষ্কার। কণ্ঠস্বর বেশ নরম, তার সঙ্গে বৈষ্ণব-বিনয় মিশে মধুর হয়েছে।
এরকম একটা অখ্যাত জায়গার আশ্রমে একটি বাঙালি তরুণী মেয়ে এল কী করে? কৌতূহল হবেই।
অন্য মেয়েটি বাঙালি নয়। সে এবার মারাঠি ভাষায় বলল, তাই, চল। এরপর ঘিয়ের দোকান বন্ধ হয়ে যাবে।
গেরুয়া মেয়েটি তাকে মারাঠি ভাষায় উত্তর দিল দাঁড়া, ইনি এখনও কথা দেননি!
আমি বললুম, আপনারা দাঁড়িয়ে কেন, বসুন না।
গেরুয়া মেয়েটি একটি সোফায় বসল। অন্য মেয়েটির অস্থির ভাব।
আমি জিগ্যেস করলুম, আপনাদের এই আশ্রমটি কত দিনের?
সে বলল, সত্তর বছর। তখন এখানে আর কোনও বাড়ি-ঘর ছিল না।
—আপনি কতদিন ধরে আছেন?
—সাড়ে চার বছর।
—এর মধ্যেই আপনাকে গেরুয়া দিয়েছে? আমি যতদূর জানি, এত তাড়াতাড়ি তো গেরুয়া দেওয়া হয় না।
—আমাদের এখানে অন্য নিয়ম।
অন্য মেয়েটি এবার বলল, ভাই, তুমি কথা বলো, আমি ততক্ষণে দৌড়ে ঘি কিনে আনি? না পেলে মুশকিল হবে। ফেরার সময় তোমাকে এখান থেকে ডেকে নেব?
গেরুয়া মেয়েটি বলল, না, চল, আমিও যাই তোর সঙ্গে।
তার পরই মত বদলে ফেলে বলল, আমি কি এখানে একটু বসতে পারি? আপনার অসুবিধে হবে? অনেকদিন বাংলা কথা বলিনি। এতদূরে তো বাঙালি বড় একটা আসে না।
—বসুন না। কোনও অসুবিধে নেই।
বোঝা গেল, সন্ন্যাসিনী হলেও মাতৃভাষার ওপর টান থাকে। বোঝা গেল, সন্ন্যাসিনী হলেও বিখ্যাত লোকদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার বাসনা থাকে।
আমি এবার আরাম করে পা ছড়িয়ে বসে একটা সিগারেট ধরালুম। মেয়েটি তেমন কিছু সুন্দরী নয়, কিন্তু সুশ্রী বলা যায়। ফিলম দুনিয়ায় অনেক ডাকসাইটে সুন্দরীদের সঙ্গে মেলামেশা করেছি। তারা সবসময় লিপস্টিক মেখে থাকে, ভুরু কামিয়ে আঁকে, আরও নানারকম প্রসাধন করে। শুধু ফিলমের মেয়ে কেন, সমাজের মাঝারি স্তরের মেয়েরাও এরকমভাবে আছে। ভুরু আঁকা, লিপস্টিক ছাড়া মেয়েদের অনেক বছর দেখিইনি বলা যায়। সেই তুলনায় এ যেন একটি মাটির মেয়ে। গায়ের রং মাজা-মাজা, কপালে আর নাকে চন্দনের রেখা, মুখের চামড়াও চোখের দৃষ্টিতে একটুও উগ্রতা নেই। বরং যেন একটা স্নিগ্ধতার আলো রয়েছে।
তিন-চারদিন আমি কারও সঙ্গে কথা বলিনি। কেয়ারটেকারটি দিনে একবার এসে আমার খোঁজ নিয়ে যায়। তাঁর সঙ্গে হুঁ- হা বললেই কাজ চলে যায়, কথা বলার প্রয়োজন হয় না।
লেখাপড়া শিখলে মানুষের মুখে একটা ছাপ পড়ে, এ-মেয়েটির মুখে সেই ছাপ আছে।
জিগ্যেস করলুম, আপনার নাম কী?
সে বলল, অনসূয়া। আমাকে সবাই অনু বলে ডাকে।
পদবি বলল না। বিবাহিতা কি না বোঝবার উপায় নেই। বৈষ্ণবীদের কণ্ঠী বদল করে বিয়ে হতে পারে কারও সঙ্গে, কিন্তু তার বোধহয় বাইরের কোনও চিহ্ন থাকে না।
আবার জিগ্যেস করলুম, আপনার এত কম বয়েস। এই জায়গাটার কথাও বেশি লোক জানে না, আপনি এখানে যোগ দিলেন কী করে?
অনুসূয়া মুখ নীচু করে বলল, মন টেনেছিল। আমাদের আর-একটি আশ্রম আছে কোলাপুরে, সেখানে একদিন গুরুজির ভাষণ শুনেছিলাম। তখনই মনে হয়েছিল, এটাই আমার পথ।
—আপনার বাড়ির লোক বাধা দেয়নি? বাবা-মা আছেন নিশ্চয়ই?
—পূর্বাশ্রমের কথা আমাদের বলতে নেই।
—আপনি সিনেমা দেখেন?
—না।
—লোকের মুখে শুনেছেন, আমি একজন গায়ক? নাকি, আপনি নিজে কখনও আমার গান শুনেছেন?
—এখানে আসবার আগে শুনেছি।
—দেখুন, হয়তো আমার বেশি কৌতূহল দেখানো হয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছে না করলে উত্তর দেবেন না। আপনার বয়েসি একটি মেয়ে, এখানে সারাজীবন থেকে যাবেন? কী পাবেন? কীসের আশায়...
—কিছু তো পেতে চাই না। এখানে আমি স্বামী-সেবা করি।
—স্বামী? ঠিক বুঝলাম না। আপনি বিবাহিতা?
—হ্যাঁ।
—স্বামী সেবার জন্য আশ্রমে থাকতে হবে কেন?
—আমার স্বামী বংশীধারী, ব্রজবিহারী প্রভু শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর বিগ্রহের সঙ্গে মালা বদল করে আমার বিবাহ হয়েছে। আমাদের আশ্রমে যে-কজন মেয়ে আছে, সকলের জন্যই এই নিয়ম।
—মীরাবাই? মীরাবাইয়ের তবু একজন জলজ্যান্ত স্বামী ছিল, শ্বশুর-শাশুড়ি-ননদিনী ছিল, সংসার ছিল। সেই সংসারজীবন অসহ্য বোধ হওয়ায় মীরাবাই কৃষ্ণের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। আপনার কি সেরকম কোনও অভিজ্ঞতা আছে?
—আমাদের এ সম্পর্ক জন্ম-জন্মান্তরের।
—তার মানে কি দেবদাসী?
—দাসী নই, আমি প্রভুর জীবনসঙ্গিনী।
একবার ইচ্ছে হল বাঁকা ভাবে জিগ্যেস করি, ওই প্রভুটি কে? শ্রীকৃষ্ণের বকলমে গুরুজিটি নাকি? অনেক সাধুরই এরকম লীলাসঙ্গিনী থাকে।
তার পরই মনে হল, প্রথম দিন কেয়ারটেকারটি এ-জায়গাটা সম্পর্কে হড়বড় করে অনেক কিছু শুনিয়েছিল। তখনই জেনেছি, পাহাড়ের ওপরের আখড়ায় গুরুজিটির বয়েস পঁচাশি। তবে আরও কমবয়েসি কয়েকজন চ্যালাট্যালাও থাকতে পারে। কিন্তু অনসূয়ার মুখের সারল্য দেখে ওই ধরনের কোনও সম্পর্কের কথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করল না।
খানিকটা সহানুভূতির সঙ্গেই বললুম, আপনার কথা শুনেই বোঝা যায়, আপনি কিছুটা লেখাপড়া শিখেছেন। আপনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন, একটা পাথরের বিগ্রহ কোনও জীবন্ত রমণীর স্বামী হতে পারে?
—প্রভু তো শুধু পাথরের বিগ্রহ নন। তিনি জীবন্ত।
—জীবন্ত? যে কথা বলে না, সাড়া দেয় না, যার চোখের পলকও পড়ে না, সে জীবন্ত হয় কী করে?
—আমার প্রভু আমার সঙ্গে কথা বলেন।
—কথা বলেন? দেখুন, আমি এটা জানতে চাই, সত্যিই কি তা সম্ভব? পাথরের মূর্তি...
প্রভু আমার সঙ্গে কথা বলেন স্বপ্নে। প্রত্যেক দিন। তিনি হাসেন, গল্প করেন...
এবার আমার হাসি পেয়ে গেল। বায়ুরোগ না থাকলে এরকম স্বপ্ন কেউ দেখে না। আর প্রত্যেকদিন একই স্বপ্ন দেখা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। অন্ধ বিশ্বাস ছাড়া এটা আর কিছুই নয়।
কেষ্টঠাকুরটিরও তো আল্হাদ কম নয়। দ্বাপর যুগে যে তিনটি বউ, শ্রীরাধার মতন পরকীয়া এবং আরও ষোলো হাজার গোপিনীর সঙ্গে লীলাখেলা করে গেছে। কলি যুগেও তার এমন দাপট? তার এমনই সেক্স অ্যাপিল যে অনসূয়ার মতন একটি সরল কমনীয় মেয়ে এই আশ্রমেরই আরও কয়েকটি মেয়ের সঙ্গে স্বামী হিসেবে তাকে ভাগ করে নিতেও রাজি?
এর পরেই আমি যে কাণ্ডটি করলুম, যার আপাত কোনও যুক্তি নেই। এটা আমার স্বভাবের সেই দিক, যা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
অনসূয়া বসেছিল দরজার ঠিক কাছের সোফায়। আমি খানিকটা দূরে। হঠাৎ আমি বাঘের মতন এক লাফ দিয়ে উঠে গিয়ে অনসূয়ার পিঠে একটা হাত জড়িয়ে, অন্য হাতে তার থুতনিটা উঁচু করে চুমু খেলুম। নিছক এক ঠোক্করের চুমু নয়, গভীর, গাঢ় চুমু। প্রথমে সে ঠোঁট খুলতে চায়নি, খানিকটা জোর করেই ঠোঁট ফাঁক করতে হল।
চুমু শেষ করে আমি দ্রুত ফিরে গেলুম নিজের জায়গায়।
ব্যাপারটা এমনই আকস্মিক এবং অচিন্ত্যনীয় যে অনুসূয়া আমাকে ঠিক মতন বাধা দিতেও পারেনি। তা ছাড়া আমার সঙ্গে গায়ের জোরে পারবে কেন? আমি ছেড়ে দিতেই সে প্রথমেই ত্রস্তে জানলার দিকে তাকাল। এটা মেয়েদের সাধারণ ইনস্টিংক্ট। জানলার পাশেই রাস্তা, মাঝে-মাঝে লোক চলাচল করে, কেউ-না-কেউ না দেখে ফেলতে পারত, দরজাও খোলা, ওর সঙ্গিনীও ফিরে আসতে পারে যে-কোনও মুহূর্তে।
আমার কৈশোর বয়েসে মাসতুতো বোনকে ছাদের সিঁড়িতে জোর করে জাপটে ধরে চুমু খেয়েছিলাম। সে মুখে না-না, এ কী-এ কী বললেও সেটাকে খুব একটা জোর জবরদস্তি বলা যায় না, তার ব্যবহারে যথেষ্ট ইঙ্গিত ছিল। এ ছাড়া আমার বাকি জীবনে আমি কখনও কোনও মেয়ের ওপর জোর করিনি। 'কবিতা বনিতা চৈব সুখদা স্বয়মাগতা।' কবিতা যেমন জোর করে লেখানো যায় না, সেরকম কোনও বনিতাও স্বয়মাগতা হলেই সুখপ্রদা হয়। সহবাস সম্মতি আইনে আমি একেবারে নির্দোষ।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে, অনসূয়ার প্রতি আমার এ ব্যবহার প্রায় বলাৎকারের পর্যায়েই পড়ে। আমি আগের মুহূর্তেও তাকে সিডিউস করার চেষ্টা করিনি। আমি যে পুরোপুরি দোষী, তা আমি স্বীকার করতে বাধ্য।
অনসূয়ার চোখ দিয়ে দর-দর করে জল বেরিয়ে আসতে লাগল। নিদারুণ আহত গলায় বলল, এ আপনি কী করলেন? এ আপনি কী করলেন?
সে থরথর করে কাঁপছে। তাকে দেখে আমার মায়া হল, খানিকটা অনুতাপও হয়েছিল কি? না, তা বোধহয় হয়নি। অনুতাপ করলে তো কবেই আমি শুদ্ধ সাত্বিক লোক হয়ে যেতুম।
আমি আবেগহীন গলায় বললুম, তোমাকে হঠাৎ আমার আদর করতে ইচ্ছে হল। হয়তো এটা অন্যায়। অনেকেই তাই মনে করবে। আমি এরকমই।
দুদিকে মাথা নেড়ে সে বলল, না, না, ছি-ছি। কী করলেন? আপনার যদি বিপদ হয়?
আমি বললুম, তুমি চেঁচিয়ে লোক ডাকতে পার। সবকথা বলে দিতে পারো। তোমার কথা সবাই বিশ্বাস করবে।
সে আরও জোরে-জোরে মাথা নাড়তে লাগল আর ফোঁপাতে লাগল।
আমি বললুম, লোকজন এসে যদি শাস্তি দেয়, তা আমি মাথা পেতে নিতে রাজি আছি।
অনসূয়া বলল, আপনার জন্য আমি প্রার্থনা করব।
আমি বুঝতে না পেরে জিগ্যেস করলুম, আমার জন্য প্রার্থনা করবে? কেন? কী প্রার্থনা করবে? আমি যাতে আজ রাত্তিরেই মরে যাই? যাতে কেউ কিছু জানতে না পারে?
অনসূয়ার সারা শরীরটাও আরও জোরে কেঁপে উঠল। সে বলল, না, না, প্রভু যদি রাগ করেন, আপনাকে শাস্তি দিতে চান, আমি ক্ষমা চাইব।
—প্রভু? মানে পাথরের বিগ্রহ?
আবার আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। একটা পাথরের মূর্তি আমার ওপর প্রতিশোধ নেবে? এটা আমাকে বিশ্বাস করতে হবে? দেখি তো তার কত ক্ষমতা! চ্যালেঞ্জ রইল।
পাপ যদি করে থাকি, তাহলে আর-একটু বেশিই করা যাক।
একইভাবে লাফিয়ে গিয়ে ফের জড়িয়ে ধরলুম অনসূয়াকে। পাগলের মতো আদর করতে-করতে বলতে লাগলুম, এত সুন্দর একটা মেয়ে, সে সারাজীবন শুধু একটা পাথরের সঙ্গে...সে আমার কিচ্ছু করতে পারবে না।
অনসূয়া ছটফট করলেও নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারেনি। এবারে শুধু চুমু নয়, আরও আদর দিলুম তার বুকে। তার নীচে আর নামিনি। একটু পরে ফিরে এলুম নিজের জায়গায়।
দরজা-জানলা সব খোলা। কোনও লোক দেখা যায়নি অবশ্য। অনসূয়া কোনও কথা বলছে না। মুখ ঢেকে কেঁদেই চলেছে।
এবারে আমার অপরাধবোধ অনেক কম। অনসূয়া বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে ঠিকই। কিন্তু তার শরীর যে উষ্ণ হয়ে উঠছিল তাও আমি টের পেয়েছি। শুধু উষ্ণতা নয়, তার বুকে যেন আগুনের হলকা। সাধারণ জৈবিক নিয়মেই তার শরীর সাড়া দিয়েছে। কোনও পাথর কি এই উষ্ণতা জাগাতে পারবে?
বাগানের লোহার গেটে ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হল। অন্য মেয়েটি ফিরে আসছে। অনসূয়াও শুনতে পেয়েছে। সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। চোখ-মুখ মুছে নিল ভালো করে। অন্য মেয়েটি বাগান পেরুবার আগেই অনসূয়া ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়ে একবার আমার দিকে সরাসরি চাইল। চক্ষু দুটি লাল, কান্নার ফলে মুখখানি ভাসাভাসা, ঠোট ফোলা। ধরা গলায় বলল, আপনার জন্য আমি প্রার্থনা করব প্রত্যেকদিন।
বলাই বাহুল্য, এরপর পাহাড় চূড়ায় সেই আখড়ার উৎসবে আমি যাইনি। ওখানে থেকে আর কেউ আসেনি আমার কাছে। অনসূয়াকে ওই রাস্তা দিয়ে যেতেই দেখিনি। দিনতিনেক পরে ফিরে এলুম কাজের জায়গায়।
শুধু কাজ তো নয়, আবার পার্টি, হইহল্লা, রাত্রি জাগরণ। প্রত্যেকটি দিনই উত্তেজনা ও অস্থিরতাময়। এর মধ্যে ওই নির্জন প্রবাসের স্মৃতি আস্তে-আস্তে ফিকে হয়ে আসে। মাঝে-মাঝে এক-এক ঝলক চোখে পড়ে, তারপর হারিয়ে যায়।
হারিয়ে গেল না অন্য একটি কারণে।
মুম্বই ফেরার ঠিক সাড়ে চার মাস পর আমার জন্ডিস হল। এমনই গুরুতর ধরনের যে ভরতি হতে হল নার্সিংহোমে।
আমাদের হাঁচি-কাশি হলেও কাগজে খবর বেরোয়। রেডিওতে বলে। অনেক ভক্তর চিঠি আসে। দেখতেও আসে অনেকে। আমার একজন সেক্রেটারি আছে বটে, চিঠি সব আমি নিজেই পড়ি। নার্সিংহোমে শুয়ে-শুয়েই অন্য অনেক চিঠির মধ্যে একখানা চিঠি দেখে চমকে উঠতে হল।
নাম সই নেই। গোটা-গোটা বাংলা অক্ষরে লেখা : আমি তিনদিন উপবাসে থেকে আপনার জন্য প্রার্থনা করছি। আপনি ভালো হয়ে উঠবেন। আপনি ক্ষমা পাবেন।
এ-চিঠি নিশ্চিত অনসূয়ার। যাচ্চলে! ওর ধারণা, ওর ভগবান রাগ করে আমাকে এই জন্ডিস রোগের শাস্তি দিয়েছে!
ভগবানগুলো খুব হিংসুটে হয় বটে। ওল্ড টেস্টামেন্টের ঈশ্বর তো নিজের মুখেই বলেছেন, আই অ্যাম অ জেলাস গড। গীতায় শ্রীকৃষ্ণও বলেছেন, মামেকং শরণং ব্রজ। একমাত্র আমাকেই শরণ করো। অন্যান্য ধর্মেরও ঈশ্বর বা অবতাররা বলেছেন, শুধু আমাকেই আশ্রয় করো, অন্য কোনও দিকে তাকাবে না! আরে বাপু, ভগবান হিসেবে যদি তোমার অতই গুণপনা ও আকর্ষণ থাকে, তা তোমাকে নিজের মুখে বলতে হবে কেন?
মুম্বইতে সেবার জন্ডিস প্রায় এপিডেমিকের আকার নিয়েছিল। আমার ওই নার্সিংহোমে প্রায় সব বেডেই জন্ডিসের রোগী। পটাপট করে কয়েকজন মরেও গেছে। তাহলে কি একা আমার অপরাধে অতগুলো লোককে ভগবান শাস্তি দিয়েছে? কিংবা ওই সবক'টা লোকই ভগবানের বউদের ধরে টানাটানি করেছে?
একমাত্র এই অপরাধ ছাড়া আর তো কোনও ব্যাপারে ভগবানের রাগারাগির চিহ্ন দেখি না। চতুর্দিকে জাল-জোচ্চুরি, কালোবাজার, নারীহরণ, নারী ধর্ষণ, নারী কেনা-বেচা, মাফিয়ারা থাকছে বুক ফুলিয়ে, রাজনৈতিক নেতাগুলো বদের ধাড়ি, দুকান কাটা, চুরি করছে কোটি-কোটি টাকা, কারুর কোনও শাস্তি হয়?
আমার পাশের বেডে রোগীটির বয়েস তেরো বছর, তার অবস্থা আমার চেয়েও সাংঘাতিক। সে কি অপরাধ বা পাপ করতে পারে?
অনুসূয়া বৈষ্ণব, ক্ষমাই তার ধর্ম। আমার ওই গা-জুয়ারি অপরাধ সে ক্ষমা করে দিয়েছে। কিন্তু তার যে আরাধ্য দেবতা, সে রাগে বা হিংসেয় আমার ওপর প্রতিশোধ নিতে পারে, এই তার বিশ্বাস।
নাসিংহোম থেকে ছাড়া পেয়ে আরও কিছুদিন আমায় শয্যাশায়ী থাকতে হয়। জন্ডিসের পর নিয়ম-কানুন মানতে হয় অনেক, ভাজাভুজি খাওয়া বারণ, মদ একেবারে নিষিদ্ধ। এ-রোগের ওষুধ বিশেষ নেই, সংযম আর বিশ্রামই আসল। মুম্বইয়ের দিকে যেসব মাছ পাওয়া যায়, সেগুলো ঝোলের বদলে ভাজা খেতেই ভালো লাগে। মাছ ছাড়া আমি ভাত খেতে পারি না। মাঝে-মাঝে মাছ ভাজা খেয়েছি, মদও দু-এক ঢোক খেয়েছি লুকিয়ে। তবু সেরে তো উঠলুম!
আবার গান রেকর্ডিং শুরু করার পর অনসূয়ার কাছ থেকে আর-একটা চিঠি এল। এবারও অস্বাক্ষরিত। 'আপনি সুস্থ হয়ে ওঠায় আমরা সবাই পুলকিত। আপনার নামে পূজা দিয়েছি। ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন।'
আমি নয়, আমরা? এটাই বৈষ্ণবদেবের ভাষা!
তাহলে আমার অসুখ সারল অনসূয়ার পূজা ও প্রার্থনার জন্য, না আমার মনের জোরে?
এর পরের বছরও আমার নির্জন বাসের দরকার হয়েছিল। দূরানিগঞ্জ যাইনি, গিয়েছিলুম মধ্যপ্রদেশের বস্তারে। সেখান থেকে ফেরার পর একদিন স্টুডিয়োতে একটি নতুন মেয়ের গান রেকর্ডিং করাবার সময় আমার রক্তবমি হল। বেশ অনেকখানি। প্রথমে ধারণা হয়েছিল, জন্ডিস ভালো করে সারেনি বলেই এই বিপত্তি। ডাক্তাররা জোর করে নার্সিংহোম শুইয়ে দিল। পরে ধরা পড়ল আলসার।
আমার খাওয়া-দাওয়ার কোনও ঠিক নেই, এক-একদিন সারাদিন কিছু খাওয়ার সময়ই পাই না, তারপর সন্ধের সময় প্রচুর ভাজাভুজি, চানাচুর, প্রচুর মদ্যপান, এত সিগারেট, ঘুম কম, আমার আলসার হবে না তো কার হবে?
এর মধ্যেই অনসূয়ার আর-একটা চিঠি চলে এল। ওই একই রকম বয়ান। সে আমার জন্য প্রার্থনা করছে। এই আলসারও ভগবানের রাগের প্রকাশ? এবারে মেরেই ফেলবে নাকি?
এমন কড়া জান, অত সহজে কি যায়? অপারেশন না করিয়েই সেরে উঠলুম। একেবারে ফিট। আবার অনসূয়ার চিঠি। যেন তার প্রার্থনাতেই আমি সেরে উঠেছি!
কি করে ও খবর পায়, কে জানে! মুম্বইয়ের বাঙালিদের মধ্যে-মধ্যে আভাসে-ইঙ্গিতে খোঁজ খবর নিয়েছি, তাদের পরিবারের কোনও মেয়ে বৈষ্ণবী হয়ে আখড়ায় যোগ দিয়েছে কি না। মুম্বইতে এত বাঙালি, ক'জনেই বা চিনি। কোনও সন্ধান পাইনি। অনসূয়া একবার কোলাপুরের নাম বলেছিল, হয়তো ও সেখানকারই মেয়ে। কিন্তু কোলাপুরে আর কে খোঁজ নিতে যায়? আমার অত সময়ই বা কোথায়?
মানুষের জীবনে মাঝে-মাঝে কিছু অসুখ-বিসুখ, কিছু দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে যেতেই হয়। বিশেষত আমাদের মতন যাদের বলগা ছাড়া জীবন, সবসময় অনিয়ম, আমাদের ঝুঁকি বেশি।
যখনই এরকম কিছু ঘটে, তখনই অনসূয়ার চিঠি আসে। সাধারণ জ্বর হলেও। যেন তার ভগবান কিছুতেই প্রতিশোধ নেওয়ার কথা ভুলতে পারছে না। আরে বাবা, তোমার শ্রীকৃষ্ণ সুদর্শন চক্র পাঠিয়ে আমার গলাটা কুচুৎ করে কেটে দিলেই তো পারে। সে চক্রখানা কি হারিয়ে গেছে?
একবার একটা দুর্ঘটনা হল ইউরোপে। রাইন নদীর একটা ফেরি পার হচ্ছিলাম। অতি সুদৃশ্য স্টিমার, দু-পাশের দৃশ্যও চমৎকার। বেশ শীত, আমার গায়ে ওভারকোট, দাঁড়িয়েছিলুম বাইরে রেলিং ধরে। হঠাৎ একটা বার্জ এসে স্টিমারটার উলটো দিকে ধাক্কা মারল। খুব জোর ধাক্কা। সেই ইমপ্যাক্ট সামলাতে না পেরে আমি, আরও দুজন ছিটকে পড়ে গেলুম নদীতে।
এটাকে বাংলায় যাকে বলে মস্ত বড় ফাঁড়া। একে তো জল একেবারে বরফের মতন ঠান্ডা, আমি সাঁতার জানলেও ওভারকোট সমেত অত জবরজং পোশাক নিয়ে সাঁতার কাটাও যায় না। আর স্টিমারের চাকার নীচে পড়ে যাওয়ার খুবই সম্ভবনা। আমি ছাড়া অন্য দুজন সাহেব, তাদের মধ্যে একজনকে গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল, পরে সে বেঁচেছে কি না জানি না। আমি উদ্ধার পেয়ে গেলুম অক্ষতভাবে।
কাগজে এই খবর ছাপা হয়েছিল। দেশে ফেরার পর দেখি, অনসূয়ার চিঠি আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে।
তার ভগবানের ক্রোধ আমাকে ইউরোপ পর্যন্ত তাড়া করে গেছে? কথায় বলে, রাখে কৃষ্ণ মারে কে? আর আমার বেলায় কৃষ্ণই বারবার আমাকে মারতে চেষ্টা করছে? আমি এটা ভাবতে চাই না। অনসূয়ার চিঠিই আমাকে মনে করিয়ে দেয়।
প্রত্যেকবার এরকম কিছু ঘটার পর আমি মনে-মনে তেজের সঙ্গে বলি, কই হে, ভগবান, আমার কিছু করতে পারলে? তোমার মুরোদ তো বোঝা যাচ্ছে। চালিয়ে যাও, চেষ্টা চালিয়ে যাও।
আমার ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই। তবু এরকম মনে হওয়াটাই তো এক হিসেবে আমার পরাজয়। ভূতে বিশ্বাস না করে ভূতে ভয় পাওয়ার মতন।
অনসূয়ার এবারের চিঠিটা একটু অন্যরকম। যেন তার ঈশ্বর, তার জীবন স্বামীর প্রতি এতদিনে খানিকটা অভিমান হয়েছে। কেন তিনি আমাকে ক্ষমা করতে পারছেন না? কেন তিনি প্রতিশোধস্পৃহা ভুলতে পারছেন না। সেইজন্য, সে নিজের কাঁধে সব দোষ নিয়েছে। শাস্তি হিসাবে মাথা ন্যাড়া করে ফেলেছে।
ইস, বড় সুন্দর চুল ছিল মেয়েটার। কিন্তু আমি কী করতে পারি? সে-ই তার ঈশ্বরকে বারবার দায়ী করছে, আমি তো করছি না? মানুষ কি জীবনে একবার-দুবার আছাড় খায় না? মানুষ তো অনেক সময় শুকনো জায়গাতেও আছাড় খায়। মদ্যপান করার পর আমি সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় খুব সাবধানে নামি। কখনও দুর্ঘটনা হয়নি। একবার পোর্টে একটা জাহাজে নেমন্তন্ন খেতে গিয়েছিলুম। প্রচণ্ড খাওয়ার পর দড়ির সিঁড়ি দিয়ে নামতে হয়েছিল। ঠিক পেরে গেছি!
ক'দিন আগে নিজের বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে দিনদুপুরে পা পিছলে পড়ে গেছি। কলার খোসা ছিল না, কিচ্ছু ছিল না। তবু এরকম হতেই পারে। হয়তো অন্যমনস্ক ছিলাম। একটা গানের সুর কিছুতেই মনের মতন হচ্ছিল না। পড়ে গিয়ে পা ভেঙেছি, ক'দিন বাদে সেরে তো যাবেই। তবু এরমধ্যে আবার অনসূয়ার সেই কাতর চিঠি। যেন এটাও তার ভগবানের কীর্তি।
ভগবানের কি খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই? বিশ্ব সংসার সামলাবার কথাও সে ভুলে গেছে? এ দেশে কত গরিব-দুঃখী, অনাথ-আতুর রয়েছে, তাদের জন্যও মাথাব্যথা নেই, শুধু ঘুরছে আমার পেছন-পেছন? মাত্র দু-খানা চুমুর জন্য এত?
ট্রেন প্রচুর লেট, ভিক্টোরিয়া টারমিনাসে পৌঁছল সন্ধেবেলা। অভিদা আগেই বলে রেখেছিলেন, আমার হোটেলে ওঠা চলবে না। ওঁর দুজন সহকারী গাড়ি নিয়ে স্টেশনে হাজির ছিল, অভিদার পায়ের অবস্থা বেশ খারাপ, ধরাধরি করে নিয়ে যেতে হল। মালাবার হিলসে একটা সতেরোতলা বাড়ি, তার সবচেয়ে উঁচু তলায় অভিদার ফ্ল্যাট। ঠিক সমুদ্রের দিকেই একটা চওড়া বারান্দা, সেখানে দাঁড়ালে চোখ জুড়িয়ে যায়। মুম্বইতে এলেই আমার মনে হয়, ইস কলকাতা শহরটা কেন যে সমুদ্রের ধারে হল না। তিন শয়নকক্ষের প্রশস্ত অ্যাপার্টমেন্ট, মস্ত বড় বসবার ঘর, একদিকে খাওয়ার জায়গা, দু-হাজার স্কোয়ারফুট তো হবেই। এখানে অভিদা একা থাকেন, একজন বাবুর্চি তাঁর রান্নাবান্না করে দেয়, রীতিমতন উর্দিপরা বাবুর্চি, মাথায় টুপি, ইংরিজিও বোঝে।
গায়ক ও সুরকারের বাড়িতে নানারকম গান-বাজনার যন্ত্র তো থাকবেই। অত্যাধুনিক মিউজিক সিস্টেম। কিন্তু বেশি চোখে পড়ে বই। একটা ঘরের তিনদিকের দেওয়াল জোড়া, বড়-বড় র‌্যাক ভরতি বই, যত্ন করে রাখা। বহুরকমের বই, সাহিত্য, ইতিহাস, ভ্রমণকাহিনি, ছাড়াও বিজ্ঞান, দর্শন ও অনেক রকমের ধর্মগ্রন্থ। ইস, এরকম একটা জায়গায় যদি আমি টানা একবছর থাকার সুযোগ পেতাম!
এইসব বাড়িতে সবাই লিফটে ওঠানামা করে। অভিদা তাহলে সিঁড়ি দিয়ে পড়ে গেলেন কী করে?
সেকথা জিগ্যেস করতেই তিনি বললেন, লিফটে উঠি ঠিকই, নামবার সময় হেঁটে নামি ইচ্ছে করে। এমনিতে তো ব্যায়াম-ট্যায়াম কিছু করি না, তবু নামবার সময় শরীরে কিছু নাড়াচাড়া হয়। এরকম দশবছর নামছি, হঠাৎ একদিন পা হড়কে গেছে। সেটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়।
—অভিদা, তোমাকে কি প্রত্যেকদিনই পার্টিতে যেতে হয়?
—নিজের কাজের জন্য যেতে হয় না, তবে, একটা-না-একটা ছবির মহরত তো লেগেই আছে, তারা ডাকে। কোনও ছবি দশসপ্তাহ চললেই শুরু হয়ে যায় সেলিব্রেশন। তা ছাড়া আজ এর জন্মদিন, কার ওর বিবাহ বার্ষিকী। তুই বিশ্বাস করবি না, এখানে কারও ডির্ভোস হলেও পার্টি হয়।
—তাহলে তুমি নিজের জন্য সময় পাও কখন?
—এরই মধ্যে সময় বার করে নিতে হয়। জীবনটা এরকমই চলছে, আর ফেরানো যাবে না। অনেক মানুষের জীবন মাটিতে আঁকা আলপনা, আর আমাদের মতন মানুষের জীবন হাউই কিংবা রকেট। আমাদের আয়ু কম হয়। কিন্তু আমাদের ছটা বেশি। যে যেটা বেছে নেয়! তবে যত রাতই হোক, আমি প্রত্যেকদিন ভোরবেলা উঠি। পরে দুপুরে খানিকটা ঘুমিয়ে-টুমিয়ে নিই, ভোরে ওঠা অভ্যেস হয়ে গেছে। তখন কিছুক্ষণ ধ্যান করি।
—ধ্যান করো? কীসের ধ্যান?
—যারা ধর্ম-টর্ম মানে, যাদের খুব ভক্তিভাব থাকে, তারা প্রত্যেকদিন পুজো-প্রার্থনা করে। নামাজ পড়ে। আমাদের ওসব ঝামেলা নেই। তবু আমাদেরও কিছু-না-কিছুর সাধনা করতে হয়। এটা আমি আমার এক জ্যাঠামশাইয়ের কাছে শিখেছি।
—চোখ বুজে ধ্যান করো? তখন কীসের কথা ভাবো? কী দ্যাখো?
—রবীন্দ্রনাথ, রামমোহন, গান্ধীজি, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, আবদুল করিম খাঁ, এঁদের ছবি মনের চোখে ভেসে ওঠে। এঁরাই তো এ-যুগের দেবতা। ছেলেবেলায় গান শিখিনি তেমন, এখন গলা সাধি, কঠিন-কঠিন রাগ গলায় তোলার চেষ্টা করি। তাতেই সকালবেলা মনটা ভালো হয়ে যায়। আর হ্যাঁ, লিভার ভালো রাখার জন্য নিমপাতার রস খাই। রবীন্দ্রনাথ মদ খেতেন না, তবু নিমপাতার রস খেতেন।
আটটা বাজতে-না-বাজতেই অভিদা বললেন, অনেকক্ষণ সন্ধে হয়ে গেছে, এখন আহ্নিক শুরু করতে হবে যে! গেলাস, সোডা আর বরফ দিতে বল। ওই কাবার্ডে বোতল আছে অনেক রকম, তোর যেটা ইচ্ছে নিয়ে আয়। সুনীল, তুই আমেদাবাদ গিয়ে কী করবি? এখানেই থাক না ক'দিন।
আমি বললাম, ওদের কথা দেওয়া আছে যে! স্টেশনে অপেক্ষা করবে।
—কথা দিয়ে সব কথা রাখিস বুঝি? বেশ-বেশ, অভ্যেসটা ভালো। আমার অবশ্য ধাতে নেই। তুই কবিতা-টবিতা তো লিখিস বুঝলাম, আর কিছু করিস?
—একটা খবরের কাগজে...
—সেই টিপিক্যাল ব্যাপার। সাহিত্য করতে গেলেই হয় খবরের কাগজে, আর নয় তো ইস্কুল-কলেজে মাস্টারি। সব জায়গায় এরকমই দেখি। অথচ যারা সাহিত্য রচনা করবে, তাদের সারা দেশ, এমনকি সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ানো দরকার, মানুষকে চেনা দরকার। ছোট একটা গণ্ডির মধ্যে থেকে...
—ওসবের জন্য অনেক টাকা লাগে, অভিদা।
—টাকা রোজগার করলেই পারিস। বড়-বড় উর্দু কবিরা এখানকার সিনেমার জন্য গান লিখে অনেক টাকা রোজগার করে। আবার নিজস্ব কবিতাও লেখে। তোরা বাঙালিরা পারিস না কেন?
—বাংলা সিনেমায় তো স্কোপ নেই।
—এখানে চলে আয়! তোর বয়েস এখনও কম, জীবনটা নিয়ে কী করবি ঠিক করেছিস? একটা কিছু জীবনদর্শন তো থাকা দরকার।
—সত্যি কথা বলছি, অভিদা সেরকম কিছু ঠিক করিনি। খানিকটা কনফিউজড অবস্থা বলতে পারো।
—তোকে আমার গল্পটা শোনাবার আগে জিগ্যেস করা হয়নি, তুই ধর্ম-টর্ম মানিস?
—তেমনভাবে মানি না, আবার উড়িয়েও দিতে পারি না। মন্দিরে-টন্দিরে মাথা ঠুকি না। কিন্তু সরস্বতী মূর্তি দেখতে ভালো লাগে।
—সেটা অন্য ব্যাপার। লিবিডোর ব্যাপার।
—আচ্ছা অভিদা, উত্তর কলকাতায় তোমাদের বাড়িতে নিত্য তিরিশ দিন রাধাগোবিন্দর পুজো হতে দেখেছি। ছেলেবেলায় আমরা প্রসাদও খেয়েছি। সেই বাড়ির ছেলে হয়ে তুমি নাস্তিক হলে কী করে?
—ওই মন্দিরটাই আসল কারণ। তুই জগদীশ্বর সেন-এর নাম শুনেছিস?
—জগদীশ্বর সেন...মানে যিনি ইতিহাসের বই লিখেছেন?
—হ্যাঁ।
—বেশ কয়েকটা বই লিখেছেন, তার মধ্যে একটা আমার দারুণ লেগেছে, 'টোটেম অ্যান্ড রিচুয়ালস,' এ-বইটার বাংলা অনুবাদ হওয়া উচিত।
—ওই জগদীশ সেন আমার জ্যাঠামশাই। কলকাতা ইউনিভার্সিটির কারমাইকেল অধ্যাপক ছিলেন। আমার বাবারা সাত ভাই, চার বোন। জ্যাঠামশাই সবচেয়ে বড়। বাড়ির তিনি একজন প্রধান শরিক। অন্য ভাইদের সঙ্গে তাঁর গণ্ডগোল লেগেছিল ওই রাধাগোবিন্দ মন্দিরের নিত্যপূজা নিয়ে। পড়ন্ত অবস্থায় বেশিরভাগ শরিকের কোনও রোজগার নেই। মন্দিরে প্রতিদিন দু-বেলা পুজো চালাতে তো খরচ আছে, কে দেবে। এ ওকে ঠেলাঠেলি করে। একদিন বড় জ্যাঠামশাই সবার সঙ্গে এক সঙ্গে খেতে বসেছেন, হঠাৎ প্রস্তাব দিলেন, 'মন্দিরের পুজো বন্ধ করে দাও। পঞ্চ ধাতুর বিগ্রহটা পুরোনো, ওটা দান করে দেওয়া হোক মিউজিয়ামে। মন্দিরটা অনেকখানি জায়গা জুড়ে আছে। এখন আমাদেরই ঘরে কুলোচ্ছে না, মন্দিরটা ভেঙে ওখানে অনায়াসে একটা তিনতলা বাড়ি উঠতে পারে। কিছু ভাড়া দিলে রোজগারও হবে।'
খাবার টেবিলে যেন একটা বাজ পড়ল। কতদিনের পারিবারিক ঐতিহ্য, সেই পুজো বন্ধ করার কেউ প্রস্তাব দিতে পারে? তার ওপর মন্দির ভাঙার কথা? এ যেন কানে শোনাও পাপ।
শুরু হয়ে গেল চিৎকার-চেঁচামেচি, বড় জ্যাঠামশাই আবার দৃঢ় গলায় বললেন, 'আগে যখন জমিদারি ছিল, তখনই এসব মন্দির গড়া হত। সব জমিদারই মন্দির বানিয়েছে, মন্দিরের খরচ চলত প্রজাদের শোষণ করা টাকায়। এখন জমিদারি উচ্ছন্নে গেছে, এখন আর নিজেদের মন্দির রেখে লাভ কী? বাইরে তো কত বারোয়ারি মন্দির আছেই।'
আমার ঠাকুমা তখন বেঁচেছিলেন। ঠাকুমা দারুণ ইন্টারেস্টিং ক্যারাকটার। তাঁর কথা তোকে পরে একদিন বলব। বড় জ্যাঠামশাইয়ের ওই কথা শুনে ঠাকুমা বললেন, 'জগু, তুই যদি আর-একবার ওইরকম কথা উচ্চারণ করিস, তাহলে আমি গলায় কাটারি দেব। আমি যতদিন বেঁচে আছি...'
বড় জ্যাঠামশাই বললেন, 'সে তুমি যাই বলো মা, এটাই আমার কথা। তোমরা যদি না মানো, আমি আমার বাড়ির অংশ বেচে দিয়ে চলে যাব।'
আমার তখন সতেরো-আঠরো বছর বয়েস। ওই যে তুই বললি না, কনফিউজড অবস্থা, আমারও সেই রকম। বড় জ্যাঠামশাইকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করতাম, কিন্তু তিনি এটা কী বললেন? অন্যরা যে বলছে, মন্দির ভাঙলে বংশনাশ হবে?
বড় জ্যাঠামশাই থাকতেন বাড়ির ডান দিকের তিনতলার অংশে। বড় জ্যাঠাইমা মারা গেছেন দু-বছর আগে, ওঁদের একটিমাত্র মেয়ে, আমাদের যমুনাদি, বিয়ের পর থাকে আলজিরিয়ায়। জ্যাঠামশাই একা হয়ে গেছেন। আমি দেখা করতে গেলাম তাঁর সঙ্গে।
বাড়ির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বড় জ্যাঠামশাইয়ের বিশেষ ভাব ছিল না। এতগুলো ছেলেমেয়ে, সবার নামও জানতেন না বোধহয়। আমার মুখ চিনলেন অবশ্য। প্রথমে আমার দু-একটা প্রশ্ন শুনে উনি ঠিক পাত্তা দিলেন না, গম্ভীরভাবে বললেন, 'আমি যা বলব, তা তোমাকে মানতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। তুমি যুক্তি দিয়ে বুঝতে শেখো।'
আমি খুব আন্তরিকভাবে জিগ্যেস করলুম, 'বড় জ্যাঠামশাই একটা ব্যাপার কিছুতেই বুঝতে পারি না। যুক্তি গুলিয়ে যায়। আপনি একটু বুঝিয়ে বলুন তো। ঈশ্বর বলে সত্যিই কি কেউ আছে না নেই?'
জ্যাঠামশাই আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। মানুষটা বেশ লম্বা। ধারালো নাক, বয়েস হলেও মাথায় চুল কমেনি, চুল কপালের ওপর এসে পড়ে, তিনি কথা বলতে-বলতে চুল সরান। তীব্রভাবে তাকিয়ে থেকে বললেন, 'হ্যাঁ আছেন। কোটি-কোটি মানুষ যাঁকে বিশ্বাস করে, তাঁকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।'
উনি আবার বললেন, 'তবে ঈশ্বর মোটেই একজন নয়, কয়েকজন। এক-এক ধর্মের এক-এক ঈশ্বর। প্রত্যেক ধর্মের লোকই মনে করে, তাদের ঈশ্বর শক্তিমান। তিনিই বিশ্ব জগতের স্রষ্টা। চার-পাঁচজন সর্বশক্তিমান আর স্রষ্টা হয় কী করে। সুতরাং এই ঈশ্বরের কোনও বাস্তব অস্তিত্ব নেই। বিশ্বাসের ওপর যুক্তি চলে না।'
—হয়তো, একজনই আছে। বিভিন্ন ধর্মে তাঁকে আলাদা করে দেখা হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ যেমন বলেছেন, যত মত তত পথ।
—ওটা কথার কথা। শ্রীরামকৃষ্ণ একজন সাধক, সমস্ত হিন্দুর ধর্মগুরু নন। অধিকাংশ হিন্দুই তাঁর এই কথা মানে না। তাঁকে অন্য ধর্মের লোকরা তো একেবারেই মানে না। তারা মনে করে, মতটাই ঠিক পথ ও একমাত্র পথ। অন্য ধর্মের লোকরা কুসংস্কারাচ্ছন্ন। সারা পৃথিবীতে এখনও এরকম ধর্মীয় ভেদাভেদই চলছে।
—কিন্তু সব ধর্মেই তো কিছু মানুষ ঈশ্বর উপলব্ধির কথা বলেন। তাঁরা কি মিথ্যে কথা বলেছেন?
—তাদের সম্পর্কে আমি কিছু বলতে চাই না। বলবে মনস্তাত্বিক বা ডাক্তাররা। ধরে নেওয়া যাক, সত্যিই একজন ঈশ্বর আছেন। থাকলেই বা কী? মানুষের ভালো বা মন্দ, কিছু করার ক্ষমতাই তাঁর নেই। কলাগাছে মূলো ফলাবার ক্ষমতা তাঁর নেই। এইসব গাছপালা, জীবজগৎ তিনি সৃষ্টি করেননি, এর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে।
—বিজ্ঞান কি একেবারে শেষ কথা বলে দিতে পারে? বড় জ্যাঠামশাই, অনেক বৈজ্ঞানিকেরও ঈশ্বরে বিশ্বাস আছে, আমরা পড়েছি।
—বিজ্ঞান কখনও শেষ কথা বলতে পারে না। অনন্ত জিজ্ঞাসার নামই বিজ্ঞান। এখনও অনেক কিছু অজানা রয়ে গেছে মানুষের। হয়তো এরপর এমন কিছু আবিষ্কার হবে, যাতে এখনকার সব ধারণা আবার বদলে যাবে। ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণিত হতেও পারে। হোক না! একটা ব্যাপার এর মধ্যে অবধারিতভাবে প্রমাণিত হয়ে গেছে। একজন মানুষ যদি সারাজীবনেও কোনও ধর্মের আওতায় না থাকে, কোনও রকম আচার-অনুষ্ঠান না মানে, ঈশ্বর আছেন কি নেই, তা নিয়ে মাথাও না ঘামায়, তা হলেও সে সুস্থ, স্বাভাবিকক জীবনযাপন করতে পারে। অর্থাৎ ঈশ্বরকে তার জীবনে প্রয়োজন নেই, ঈশ্বরও তাকে ঘাঁটায় না। পৃথিবীতে এই ধরনের মানুষের সংখ্যা অনেক বাড়ছে। লোকে এদের বলে নাস্তিক। কথাটা ঠিক নয়। ঈশ্বর নিয়ে যে মাথাই ঘামায় না, তার চিন্তা নেগেটিভ হবে কেন, সেটা পজিটিভ।
আর বৈজ্ঞানিকদের কথা বলছিস? বিজ্ঞান নিয়ে যারা চর্চা করে, বিজ্ঞান যাদের পেশা, তারা সবাই বৈজ্ঞানিক নয়। অনেকের অনেক সংস্কার যায় না। কেউ-কেউ প্রকাশ্যে অস্বীকার করতে এখনও ভয় পায়। জিয়োর্দানো ব্রুনো, কোপারনিকাস, গ্যালিলিও এঁদের কী অবস্থা হয়েছিল মনে নেই? আইনস্টাইন খুব চালাক। তাঁকে একবার জিগ্যেস করা হয়েছিল, আপনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন কি না বলুন। আইনস্টাইন কায়দা করে বলেছিলেন, আমি স্পিনোজার ঈশ্বরকে মানি (স্পিনোজা না স্পিনোৎসা, কী উচ্চারণ হবে কে জানে?)। দার্শনিক স্পিনোজা বলেছিলেন, এই যে প্রকৃতির এত বিচিত্র সৃষ্টি, এই সৃষ্টির এমন নিয়মশৃঙ্খলা, এটাই ঈশ্বর, এর বাইরে আকাশে ঈশ্বর খোঁজার দরকার কী?
অভিদা একটুখানি থামলেন। মাছ ভাজা খেতে-খেতে আমরা অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলাম। আমার মাথায় অনসূয়ার কাহিনিটা ঘুরছে। ওই কাহিনির মধ্যে এখনও যেন অনেক না বলা কথা রয়ে গেছে।
একসময় আমি জিগ্যেস করলাম, অভিদা, অনসূয়া তোমাকে যে চিঠিগুলো লিখেছে, তা আমাকে দেখাতে পারো? যদি তোমার আপত্তি না থাকে।
অভিদা বললেন, 'আপত্তির কী আছে? প্রথম দুটো চিঠি আমি রাখিনি, মুড়ে ফেলে দিয়েছিলাম। পরেরগুলো রেখে দিয়েছি। কেন ফেলিনি কে জানে? তুই পাশের লাইব্রেরি ঘরে গিয়ে দ্যাখ, টেবিলের ডান দিকের দেরাজে, একটা হলদে খামের মধ্যে।'
একটা টেলিফোন এল, অভিদা কথা বলতে লাগলেন, আমি পড়তে লাগলাম চিঠিগুলো। পরিষ্কার সাদা কাগজে লেখা। চিঠিগুলো ক্রমশ বড় হয়েছে, তাও বেশি বড় নয়, প্রথমটা তিন লাইন, শেষতমটি দশ লাইন। শেষের দিকে ব্যাকুলতা যেন বেড়েছে, অভিদার বিপদের চিন্তায় মেয়েটি খুব কাতর।
টেলিফোন করা শেষ হলে অমি জিগ্যেস করলাম, অভিদা, তুমি এই চিঠির কখনও উত্তর দিয়েছ?
অভিদা বললেন, উত্তর দেওয়ার তো কোনও প্রশ্নই ওঠে না। চিঠিতে নাম নেই। তা ছাড়া আশ্রমে চিঠি পাওয়ার কোনও নিয়ম আছে কি না, তাই বা কে জানে!'
—এগুলো পড়লে মনে হয়, মেয়েটি তোমাকে আসলে ভালোবেসে ফেলেছে। তুমি তা বোঝোনি?
—সেটা বুঝব না, আমি কি এতই গবেট? তুই কবিতা লিখিস বলে সব বুঝে ফেলবি? প্রেম বা এক ধরনের আকর্ষণ ওর হয়েছে তা ঠিকই। কিন্তু ও নিজে কি তা বোঝে? বোঝে না। ওর ধারণা, ও ক্ষমার আদর্শ প্রচারের জন্য প্রাণপাত করে যাচ্ছে।
—তুমি কী করে জানলে যে ও বোঝে না? ওর সঙ্গে তোমার আর দেখা হয়েছে?
—হ্যাঁ, হয়েছে আর-একবার।
—আরে সেই কথাটাই বলোনি এতক্ষণ? কবে দেখা হল, কোথায়?
—দাঁড়া, কেন দেখা হল, সেটা আগে বুঝিয়ে বলা দরকার।
গেলাস শেষ করে অভিদা আবার ঢাললেন। সিগারেট ধরিয়ে ছড়িয়ে দিলেন ভাঙা পা-টা তারপর বলতে শুরু করলেন।
আমার যে মাঝে-মাঝে অসুখ হয়েছে কিংবা একটা-দুটো দুর্ঘটনায় পড়েছি, এগুলো একেবারে স্বাভাবিক ব্যাপার, আমি জানি। মানুষের জীবন বদলাবার কোনও ক্ষমতা যে ঈশ্বরের নেই, তার আমি মর্মে-মর্মে প্রমাণ পেয়েছি অনেক ঘটনায়। সেসব আমি ডায়েরিতে লিখে এক সময় পড়তে দেব। ধর, গরিব বিধবার একমাত্র ছেলেটি যদি বিনা দোষে পুলিশের গুলিতে মারা যায়, তখন মনে হয় না, ঈশ্বরকে ঈশ্বরত্ব থেকে বরখাস্ত করা উচিত? কর্তব্যে চরম অবহেলা? অনেক ধর্মভীরু এই ঘটনার পরেও বলে কি জানিস, ওই বিধবার নিশ্চয়ই পূর্বজন্মে পাপ ছিল, তাই এ-জন্মে শাস্তি পাচ্ছে। প্রথমত পূর্ব জন্মটাই একটা ভুল ধারণা, আর সেই পাপে এ-জন্মে শাস্তি? যত্তসব গাঁজাখুরি ব্যাপার।
আমি ভুলে থাকতে চাইলেও আমার কিছু একটা ঘটলেই যে অনসূয়ার চিঠি আসে, সেটাও এক হিসেবে বিরক্তিকর। কেন আমি ওর জীবনবল্লভকে নিয়ে মাথা ঘামাতে যাব?
সে যাই হোক, গত বছর অন্যরকম একটা ব্যাপার হল। আমি বাচ্চাদের খুব ভালোবাসি। আমি আর বিয়ে করব না, আমার ছেলেপুলে হবে না, কোথাও আমার অবৈধ সন্তানও নেই, এটা বিশ্বাস করতে পারিস। কিন্তু বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটাতে আমার খুব ভালো লাগে।
আমার মিউজিক হ্যান্ডসদের মধ্যে একজনের নাম রামরতন ঝাঁ। সে হারমোনিয়াম বাজায়। এখনকার অনেক গানেই তো আর হারমোনিয়াম লাগে না। সিন্থেসাইজারে কাজ চলে যায়। সেইজন্য বেচারির অবস্থা ভালো নয়। অনেক দিনের পরিচয়, এদের বাড়িতে মাঝে-মাঝেই যাই। রামরতনের মেয়ে সবিতা, তাকেও ছোট অবস্থায় দেখেছি, বড় হয়ে গেল, বিয়ে করল। বিয়ের ঠিক সাড়ে তিন বছরের মাথায় তার স্বামী মারা যায় রাস্তায় ট্রাক চাপা পড়ে। সাইকেলে সে বাড়ি ফিরছিল, মাথাটা এমনভাবে পিষে যায় যে চিনতেও কষ্ট হয়েছে। সবিতা দু-বছরের একটা ছেলেকে নিয়ে ফিরে এল বাবার কাছে। ছেলেটার নাম পিন্টো, কী সুন্দর, লাভলি বাচ্চা, একদম কাঁদে না। সবসময় হাসে, চেনা-অচেনা নেই। আমার সঙ্গে খুব ভাব হয়ে গেল, গেলেই আংকেল-আংকেল বলে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে। আমারও এমন মায়া পড়ে গেল যে প্রত্যেকদিন ওকে দেখার জন্য মনটা কেমন করে। যতই কাজ থাক, দিনে একবার ওর কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ খেলা করে আসি। সেই পিন্টোর হল টাইফয়েড, প্রচণ্ড জ্বর। অমন হাসিখুশি বাচ্চাটা বিছানায় শুয়ে কষ্টে ছটফট করে, সে দৃশ্য সহ্য করা যায় না। এখন টাইফয়েড এমন কিছু শক্ত অসুখ নয়। ঠিক করলুম, যেমনভাবে হোক, ওকে বাঁচাতেই হবে, রামরতন যেন টাকার জন্য চিন্তা না করে।
আমি গিয়ে ওর শিয়রের কাছে বসে থাকতুম। তবু পিন্টোর অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে লাগল। হঠাৎ একসময় আমার কী মনে হল জানিস। মানুষের সংস্কার কী সাংঘাতিক প্রবল। আমার মনে হল, আমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য অনসূয়ার হিংসুটে ভগবান এই বাচ্চাটাকে মারতে চাইছে না তো? ঈশ্বরের অস্তিত্বে বদ্ধমূল অবিশ্বাস। তবু এরকম চিন্তা মাথায় আসে?
এমনকি, এ কথাও মনে হল, আমার অসুখের সময় অনসূয়া প্রার্থনা করে। অনসূয়া তো পিন্টোর অসুখের কথা জানে না। অনসূয়া প্রার্থনা করলে পিন্টোও সেরে উঠতে পারে? একবার অনসূয়াকে গিয়ে বলব?
আমারই যদি সব যুক্তি চলে যায়, তাহলে আমার চেয়ে যারা দুর্বল, তারা তো বারবার হার মানবেই। তোকে সত্যি কথা বলছি সুনীল, ওই সময়টায় আমার বারবার মনে পড়ত অনসূয়ার কথা। খুব ইচ্ছে করত, তার কাছে ছুটে যাই।
যাওয়া হয়নি। বলতে গেলে, আমার কোলে মাথা রেখেই পেন্টা মারা গেল। এমন ফুটফুটে সুন্দর মুখটা কী শুকনো, বিবর্ণ হয়ে গেল আমার চোখের সামনে। আমি কাঁদিনি, আমার রাগে ফেটে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। ডাক্তারদের ওপর ভরসা না রেখে শেষপর্যন্ত সবিতা কোন মন্দিরে যেন মাথা ঠুকতে গিয়েছিল। আমার ইচ্ছে করছিল, কালাপাহাড়ের মতন সবক'টা মন্দির ভেঙে দিই। পরের দিন সবটা রাগ পড়ল অনসূয়ার ওপর। তার ভগবান আমাকে মারতে না পেরে ওইটুকু শিশুকে মেরে প্রতিশোধ নিল, সে এত কাপুরুষ? অনসূয়া জানুক, বৈষ্ণবদের আরাধ্য ঈশ্বরও কত হৃদয়হীন হতে পারে।
অভিদাকে বাধা দিয়ে আমি বললাম, কিন্তু পৃথিবীতে অনেক শিশুই যে এভাবে মরে। আমাদের ব্যক্তিগত শোক হয় ঠিকই। কিন্তু চিকিৎসা সত্বেও কে বাঁচবে আর কে বাঁচবে না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তুমিই তো বলেছ, ভগবান বলে কেউ থাকলেও মানুষের মঙ্গল বা অমঙ্গলের ব্যাপারে তার কোনও ভূমিকা নেই।
অভিদা বললেন, তা ঠিকই কিন্তু ওই যে বললুম, পিন্টোর অসুখের সময় আমি এমনই কাতর হয়ে পড়েছিলুম যে যুক্তি-টুক্তি সব চলে গিয়েছিল। আমার ভেতরটা দাউদাউ করে জ্বলছিল। আমি আবার ছুটে গেলাম দুরানিগঞ্জে। কিছু-কিছু বাড়ি ওখানে খালিই থাকে। আগের বাড়িটা পাওয়া গেল না, অন্য একটা বাড়িতে উঠলুম, সেটা পাহাড়ের একটু নীচে দিকে। নদীটা স্পষ্ট দেখা যায়।
অনুসূয়াদের আশ্রমে গিয়ে যে লণ্ডভণ্ড করা চলে না, এমনকি সেখানে অনসূয়ার সঙ্গে কথা বলাটাও ঠিক নয়, সেটুকু কাণ্ডজ্ঞান আমার ছিল। কিন্তু অনসূয়ার সঙ্গে দেখা করতেই হবে। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকি, দ্বিতীয় দিনে অনসূয়াকে দেখাও গেল, সঙ্গে আরও তিনটি মেয়ে, গান গাইতে-গাইতে যাচ্ছে। অনসূয়া এক পলক আমার দিকে তাকাল, যেন আমাকে চেনেই না।
তুই বললি, অনসূয়া আমার প্রেমে পড়েছে, এটা কী ধরনের প্রেম? একটা পাথরের মূর্তির গলায় মালা পরাবে, আমাকে দেখলে না-চেনার ভান করবে, আর দূর থেকে প্রেমপত্র লিখবে? সে রাত্রে আমার ঘুমই এল না, বিছানায় ছটফট করলাম সারারাত।
পরদিন দুপুরবেলা রাস্তায় ওদের দলটাকে দেখতে পেয়েই আমি বাড়ি থেকে ছুটতে-ছুটতে চলে এলুম। হাঁটতে লাগলুম ওদের পাশে-পাশে। রাস্তা দিয়ে তো যে-কোনও লোক যেতেই পারে। কথা বলায়ও দোষ নেই। আমি আগে অন্য দু-একটি মেয়েকে নিরীহ কৌতূহলের সুরে জিগ্যেস করলুম, আপনারা কোন আশ্রমে থাকেন? আপনাদের উদ্দেশ্য কী? আপনারা কি গরবি-দুঃখীদের সেবা করেন? এইসব। ওরা উত্তরও দিয়েছিল। তারপর একসময় অনসূয়ার পেছন-পেছন গিয়ে, চাপা গলায় বাংলায় বললুম, অনসূয়া তোমার সঙ্গে আমার দেখা করার বিশেষ দরকার। তুমি যদি আমার বাড়িতে আসতে না চাও, নদীর ধারে বড় বটগাছটার তলায় এসো, বিকেল বা সন্ধের সময়...
বিকেল হতে-না-হতেই আমি গিয়ে বসে রইলুম নদীর ধারে। এই নদীতে সকালের দিকে অনেকে স্নান করতে আসে। বিকেলের দিকে মানুষজন বেশি থাকে না, তা ছাড়া একটু-একটু শীত পড়েছে। সেদিনটা আবার আকাশ মেঘলা হয়ে গেল। শীতকালেও তো মাঝে-মাঝে বৃষ্টি হয়। কী মুশকিল, বৃষ্টি হলে অনসূয়া আসবে কী করে?
ওই দিকটায় ওপর থেকে নামবার জন্য আর একটা সরু পাকদণ্ডি পথ আছে। আমি হাঁ করে সেই দিকে চেয়ে বসে রইলুম। একটার-পর-একটা সিগারেট পোড়াচ্ছি, কারুর জন্য এরকমভাবে অপেক্ষা করে থেকেছিস কখনও? থিয়োরি অব রিলেটিভিটির স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। পাঁচ মিনিটকে মনে হয় এক ঘণ্টা। ঘনঘন ঘড়ি দেখছি। আমি জীবনে কক্ষনও কোনও মেয়ের জন্য ওরকমভাবে প্রতীক্ষা করিনি। আমার একটা অহমিকা আছে, আমি মেয়েদের কাছে যাই না, তারা আমার কাছে আসে। অথচ সেই আমিই...
তা ছাড়াও, মনে হচ্ছিল, অনসূয়া আসবে তো? সে তো হ্যাঁ কিংবা না কিছু বলেনি। আশ্রম থেকে একা আসার অসুবিধে থাকতে পারে। যে-কোনও মুহূর্তে বৃষ্টি নামবে। এর মধ্যে কী অজুহাতে সে বেরুবে আশ্রম থেকে? কিংবা সে হয়তো আমার সঙ্গে আর দেখা করতেই চায় না। তাহলে আমি কী করব?
কতক্ষণ কেটে গেছে জানি না। আকাশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। তারই মধ্যে হঠাৎ এক সময় দেখি, ওপর দিকের রাস্তায় কী যেন একটা উড়ছে। অনেকক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি তো, দৃষ্টি বিভ্রম হতে পারে। সত্যিই মনে হল, একটা পাখি যেন নেমে আসছে। পাখি নয়, সে অনসূয়া নামছে দৌড়ে-দৌড়ে। আমার অত কবিত্ব নেই। তবু অনসূয়াকে পাখি বলেই মনে হতে লাগল। শীতের জন্য সে একটা চাদর জড়িয়েছে, সেই চাদরটা উড়ছে ডানার মতন। আমার মনে হল, এমন সুন্দর দৃশ্য আমি আগে কখনও দেখিনি!
আমার শরীর থেকে সমস্ত রাগ চলে গেল। আমি একদৃষ্টে দেখছি সেই মেয়েটিকে।
অনসূয়া কাছে এসে ঝপ করে বসে পড়ে ব্যাকুলভাবে বলল, আপনার কী হয়েছে? কী হয়েছে বলুন? আমি প্রার্থনা করব, আমি আমার আয়ু দিয়েও...
অনসূয়া ভেবেছে, আমার শক্ত কোনও অসুখ হয়েছে, তাই আমি জীবন বাঁচাবার জন্য ওর কাছে প্রাণভিক্ষা করতে এসেছি।
আবার আমার রাগে জ্বলে ওঠা উচিত ছিল। তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গবিদ্রুপে ওকে বিঁধতে পারতুম। প্রাণভিক্ষে করব আমি? অভিজিৎ সেন? ওর ভগবানের কাছে? তার আগে আমি থুতু ফেলে ডুবে মরব!
কিন্তু রাগ হল না, ওরকম কথাও এল না। একটি মেয়ে আমাকে তার আয়ু দিতে চায়। আমি ফস করে বলে ফেললুম, 'আমার সে সব কিছু হয়নি অনসূয়া, আমি এসেছি তোমাকে একটা বিশেষ কথা বলতে। তোমার মতন একটা নিষ্পাপ সরল মেয়ে, তাকে আমি জোর করে ছুঁয়েছি, এটা আমার অন্যায় হয়েছে। তুমি কী জন্য ঘর-বাড়ি ছেড়ে আশ্রমে যোগ দিয়েছ জানি না, তোমার আগের জীবনে কী ছিল জানি না। আমি বলতে এসেছি, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই!'
বিশ্বাস করো সুনীল, এটা বলে ফেলার আগের মুহূর্তেও আমি এটা ভাবিনি। জীবনে আর কখনও বিয়ে করব না, এরকম আমার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ছিল। কিন্তু অনসূয়াকে দেখে কী যেন হয়ে গেল, আমি বদলে গেলুম, আমি ওর হাত চেপে ধরে বললুম, অনসূয়া, আমি তোমাকে চাই। আমি তোমাকে যথাসাধ্য সুখী করার চেষ্টা করব। অন্যরকম জীবনযাপন করব, তুমি যদি মুম্বই শহরে না থাকতে চাও...
অনসূয়ার মুখখানা রক্তশূন্য বিবর্ণ হয়ে গেল। আস্তে-আস্তে বলল, 'এ কী বলছেন আপনি? আমার তো বিয়ে হয়ে গেছে।'
আমি বললুম, 'পাথরের মূর্তির সঙ্গে সত্যি কারুর বিয়ে হতে পারে? ওর কোনও মূল্য নেই! অনেক সন্ন্যাসীও তো সংসার জীবনে ফিরে আসে। তুমি ফিরে এসো!'
অনসূয়া বলল, 'তা কখনও হয়? তাতে আপনার বিপদ বাড়বে। না, না এমন কথা উচ্চারণও করবেন না। ছিছি-ছিছি। আমি যাই, চলে যাই!'
অনসূয়ার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বললুম, 'তুমি আমার বিপদের কথা ভাবছ? অনসূয়া তোমার ঠাকুর আমাদের কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। তুমি আমার ওপর বিশ্বাস রাখো। এভাবে তোমার জীবনটা নষ্ট করার কোনও মানে হয় না। তোমাকে পেলে আমার জীবনটাও সুন্দর হবে।'
অনসূয়া কোনও কথাই শুনতে চায় না, সে আবার কান্না শুরু করল। চলে যেতে চায়, আমার হাত ছাড়িয়ে যেতে পারছে না। একসময় আমাকে হাল ছেড়ে দিতে হল, কিন্তু তখনও ওকে পাওয়ার ইচ্ছে আমার মধ্যে তীব্র। আমি ইচ্ছে করলে, সেইখানে ওকে জড়িয়ে ধরে ওকে ভোগ করতে পারতুম। আমি জানি, অনসূয়ার ইচ্ছে থাক বা না থাক, ও চিৎকার করে লোক জড়ো করত না। আমাকে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করত না।
ওকে জোর করে বুকে টেনে আনতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে সংযত হয়েছি। সেটুকু বিবেক আমার এখনও অবশিষ্ট আছে। শরীর সম্ভোগকে আমি পাপ মনে করি না, কিন্তু ও করে। কেন ওকে কষ্ট দেব? ও আমাকে ওর আয়ু দিতে চায়, কিন্তু জীবনসঙ্গিনী হতে চায় না। এ কী ধরনের ভালোবাসা?
সুযোগ থাকা সত্বেও যে আমি সেদিন ওকে ভোগ করিনি, সেজন্য কেউ কি আমাকে প্রশংসা করবে? আমি একটা অন্যায় করলে আমাকে ছিছি করার লোক অনেক আছে। কিন্তু সেই নির্জন নদীর ধারে আমি যে অন্যায় ইচ্ছেটা দমন করতে পেরেছিলাম, সেজন্য কেউ আমাকে সাধুবাদ দেবে না।''

শেষের কথা

অভিদার সঙ্গে এর পর থেকে মাঝে-মাঝে আমার যোগাযোগ হত। কলকাতায় এলে আমাকে খবর দিতেন। অনসূয়ার সম্পর্কে আমার কৌতূহল যায়নি, কিন্তু ও প্রসঙ্গ তুললেই বলতেন, দূর-দূর ওর কথা আমি মন থেকে মুছে ফেলেছি।
অভিদার ক্যানসার। একজন গায়কের পক্ষে এর চেয়ে মর্মান্তিক আর কী হতে পারে?
খবরটা পড়েই আমি কেঁপে উঠেছিলাম। এই কি তবে অনসূয়ার ভগবানের চরম প্রতিশোধ? এবারে আর নিষ্কৃতি নেই!
পরক্ষণেই মনে হয়েছিল, আমারও সংস্কার যায়নি? ক্যানসার তো কত লোকেরই হয়। সেটাকে আমি ভগবানের অভিশাপ ভাবছি কেন? শ্রীরামকৃষ্ণেরও গলায় ক্যানসার হয়েছিল, তাঁকে কে অভিশাপ দেবে? জন্ম-মৃত্যুরই মতন রোগভোগ প্রাকৃতিক ব্যাপার।
সেবার অভিদা যখন কলকাতায় এলেন, তাঁকে দেখে খুবই কষ্ট হল। এর মধ্যেই রোগা হতে শুরু করেছেন, গলার আওয়াজ ফ্যাসফেসে। কিন্তু তেজ যায়নি। হাসতে-হাসতে বলেছিলেন, 'সে মেয়েটা আবার চিঠি লিখেছে জানিস তো? না খেয়ে-দেয়ে প্রার্থনা করছে। এবার আর ওসবে কিছু হবে না। কাকতালীয়ও হবে না। সিগারেট, বুঝলি, সিগারেটই দায়ী।'
তারপর বললেন, 'জেনিভা যাচ্ছি, বুঝলি। অপারেশন করাব। টাকাপয়সা অনেক খরচ হবে, আমি আর টাকা নিয়ে কী করব? গলাটা না থাকলে বাঁচারই কোনও মানে হয় না। ডাক্তাররা বলছে ফিফটি-ফিফটি চান্স। হয় বাঁচব, গলা ঠিক হয়ে যাবে, নয়তো অপারেশন টেবিলেই ফুটে যাব! তোকে আমার ডায়েরিগুলো আর চিঠিপত্র পাঠিয়ে দেব। যদি কখনও সুযোগ হয়, লিখবে আমার কথা। আমি জীবন কাটিয়েছি নিজের ইচ্ছেমতন, ভগবান-টগবানের তোয়াক্কা করিনি। জীবনের প্রতি আমার বিশ্বাস পজিটিভ। আমি মরতেও যাচ্ছি স্বেচ্ছায়!'
বলতে গেলে একটা মিরাকলই ঘটিয়ে দিলেন অভিদা। জেনিভা থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে এলেন। অপারেশন সাকসেসফুল। ছ'মাস বাদে আবার রেকর্ড করালেন নতুন গান। গলা নষ্ট হয়নি।
এত বড় জয়ের পরও কিন্তু বেশিদিন বাঁচেননি অভিদা।
নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার আনন্দে আবার শুরু করেছিলেন উদ্দাম উৎসব। আবার আগের মতন মদ্যপান ও পার্টি। একটা পার্টিতে কোনও একটি অভিনেত্রীকে অপমান করার খবরও কাগজে ছাপা হয়েছিল। আমার ধারণা, জীবনে অনেক কিছু পেয়েছেন অভিদা, কিন্তু অনসূয়া-প্রত্যাখ্যান তিনি সহ্য করতে পারেননি। পাথরের বিগ্রহের প্রতি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে জিতেছেন বারবার, তবু তার কাছ থেকে ছিনিয়ে আনতে পারেননি অনসূয়াকে।
মুম্বই শহর থেকে খানিকটা দূরে পানবেল নামে একটা জায়গায় একজন প্রোডিউসারের বাগানবাড়িতে মস্ত বড় পার্টি ছিল। সেখানেই আকণ্ঠ মদ্যপান করে মধ্যরাত্রের পর একা গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। গৃহস্বামী অনেক অনুরোধ করেছিল সেখানেই থেকে যেতে। কিন্তু ওই যে অভিদার জেদ? তাকে কে আটকাতে পারে!
এক জায়গায় রাস্তা সারাবার জন্য খানিকটা ঘেরা ছিল। সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল একটা রোড রোলার। অভিদা অন্ধকারে দেখতে না পেয়ে সোজাসুজি ধাক্কা মারেন। গাড়ি বেশ স্পিডে ছিল, হেড অন কলিশন যাকে বলে। বেশি যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়নি, সঙ্গে-সঙ্গে মৃত্যু।
অভিদা বলেছিলেন, মাটিতে আঁকা আলপনার মতো নয়, তাঁর জীবন উল্কার মতন। সেরকম জীবনের এরকম পরিণতিই তো স্বাভাবিক!
এটাও কি প্রতিশোধ? অনসূয়ার বিশ্বাসের ভগবান কখনও-কখনও বামন অবতার, কখনও নৃসিংহ অবতার হয়ে দুষ্টের দমন করেছেন। তিনি রোড রোলারের রূপও ধারণ করতে পারেন কি না জানি না!
অনসূয়ার সঙ্গে একবার দেখা করার খুব ইচ্ছে হয়েছিল। অভিদা যে-বারে জার্মানিতে স্টিমার থেকে বরফগলা নদীতে পড়ে গিয়েছিলেন, সে-বার তার মাথার চুল সব কেটে ফেলেছিল। এবারে অভিদার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে সে কী করেছে?
যাইনি। গিয়ে কী হবে? সে তো আমার প্রেমিকা নয়। আমাকে সে চিনতেই পারবে না।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

[ছোট্টগল্প] সেক্সবয় - তসলিমা নাসরিন

সেক্সবয় - তসলিমা নাসরিন

ছোটগল্প

সেক্সবয়

তসলিমা নাসরিন
সেক্সবয় - তসলিমা নাসরিন
চৈতালি অপেক্ষা করছে সেক্সবয়ের জন্য। সন্ধেও নামবে, সেক্সবয়ও নামবে কলকাতায়। অন্ধকার সরিয়ে সরিয়ে দক্ষিণ কলকাতার এই গলিতে ঢুকবে বিমানবন্দর থেকে আসা সেক্সবয়ের ট্যাক্সি। বোম্বে থেকে আসছে সে। চৈতালির ফ্ল্যাটেই উঠবে। দু’জনের গত ছ’মাস যাবৎ প্রায় সব হয়েছে, শুধু সামনাসামনি দেখাটাই হয়নি। ফেসবুকে প্রথম কথা হয়, মূলত সেক্সের কথা। চৈতালিকে আকৃষ্ট করেছিল সেক্সবয় নামটি। প্রোফাইলের ছবিটি উলঙ্গ পুরুষের। এর সঙ্গে সেক্স ছাড়া আর কী বিষয়ে কথা বলা যায়! চৈতালি সেক্স নিয়ে কথা বলতেই সেক্সবয়কে বন্ধু হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। নিজের যৌনসম্পর্কহীন জীবন বড় দুঃসহ হয়ে উঠেছিল। শহরে এত যুবকের ভিড়, আর চৈতালির মতো সুন্দরী বিদুষী মেয়ের জন্য কোনো প্রেমিক জোটে না! সত্যিই জোটে না। যে লোকটির সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার, সেটিও হয়েছিল বাবার ঠিক করে দেওয়া পাত্র। অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে সুব্রতকে ডিভোর্স করেছে চৈতালি। এরপর একেবারেই যে কারও সঙ্গে কিছূই ঘটেনি তা নয়। দশ বছরের ছোট এক কলিগ অশোকের সঙ্গে প্রায় একমাস মতো একটা সম্পর্ক ছিল চৈতালির। কিন্তু অশোকের বিয়ের পর ওই সম্পর্কটা ভেঙে ফেলতে বাধ্য হয় সে। চৈতালি চায়নি ঘরে তরুণী স্ত্রী রেখে তার সঙ্গে গোপনে শুতে আসুক অশোক। একটি ইংরেজি দৈনিকে চাকরি করে চৈতালি। অনেকদিনের চাকরি। অনেক দায়িত্ব। কিন্তু কোনো অফিসের কোনো বোঝা চৈতালি বাড়ি বয়ে আনতে চায় না। বাড়িতে থাকতে চায় সে ভাবনাহীন। সামান্য কিছুক্ষণ সময় নিজের জন্য রাখতেই তো হয়, কিছুক্ষণই তো সময়! ওদিকে মেয়ে পড়ছে দিল্লিতে। ওর খোঁজখবরও করতে হয়। আজকাল মোবাইল যুগে খোঁজ খবরের ব্যাপারগুলো জলের মতো সোজা। অফিস তো অফিস, চৈতালি না থাকলেও অফিস থাকবে। মেয়ের জীবনও মেয়ের জীবন। চৈতালি মরে গেলেও মেয়ে দিব্যি মানিয়ে নেবে। চৈতালির বাবা ও মা মারা গেছেন। চৈতালিই ছিল একমাত্র সন্তান। মা-বাবার কথা তার এখন খুব মনেও পড়ে না। অফিস থেকে ফিরে চৈতালি আগে একটা বই নিয়ে বসতো পড়তে। এখন ফেসবুক নিয়ে বসে। ফেসবুক যে কী ভয়ঙ্কর এক নেশার মতো! আসলে, ফেসবুক নয়, সেক্সবয় প্রতিদিন যে বলছে চৈতালির সঙ্গে বিছানায় সে কী কী করবে, কী করে চৈতালির সারা শরীরে চুমু খাবে, কী করে ঠোঁটে, বুকে আদর করবে, কী করে চৈতালির স্বাদ নেবে, আর তাকে ঘন ঘন শীর্ষসুখ দেবে… সেসব পড়ার নেশা। এই নেশাটা তাকে প্রচুর অস্থিরতা থেকে মুক্তি দিয়েছে। এখন সে রাস্তাঘাটে বা অফিসের যুবকগুলোর দিকে আগের মতো চাই চাই চোখে তাকায় না। সেক্সবয় চৈতালির দৈনন্দিন জীবনকে অনেক পূর্ণ এবং তৃপ্ত করেছে। মনে মনে সে কৃতজ্ঞ সেক্সবয়ের কাছে। ফেসবুকে সম্পর্কটা এখন আটকে নেই। দু’মাস যাবৎ প্রায় প্রতিদিন কথা হচ্ছে ফোনে, আর শেষ কয়েকদিন স্কাইপেতে দু’জনের সেক্সও ঘটেছে। সেক্সবয়ের আসল নাম বিজয়, মারাঠী, আর্কিটেক্ট, বয়স পঁয়ত্রিশ। এর চেয়ে চমৎকার জুটি আর কী হতে পারে! বোম্বে থেকে কলকাতায় উড়ে এসে চৈতালির সঙ্গে সত্যিকার সেক্সের প্রস্তাবটি চৈতালিই দিয়েছিল বিজয়কে। শুধু তাই নয়, বোম্বে কলকাতা আসা যাওয়ার টিকিটও ইমেইল করেছিল। টিকিট পেয়ে ‘লেটস ফাক হোল উইক’ বলে লাফিয়ে উঠেছিল বিজয়। বিজয়কে ছুঁয়ে দেখতে চায় চৈতালি। সত্যিকার মৈথুন চাই, হস্তমৈথুন শরীর আর নিতে চায় না।

সেক্সবয় প্রতিদিন যে বলছে চৈতালির সঙ্গে বিছানায় সে কী কী করবে, কী করে চৈতালির সারা শরীরে চুমু খাবে, কী করে ঠোঁটে, বুকে আদর করবে, কী করে চৈতালির স্বাদ নেবে, আর তাকে ঘন ঘন শীর্ষসুখ দেবে… সেসব পড়ার নেশা। এই নেশাটা তাকে প্রচুর অস্থিরতা থেকে মুক্তি দিয়েছে।

সাতদিনের ছুটি নিয়েছে চৈতালি, আজ বিকেলেই অশোক জিজ্ঞেস করেছে, ‘হঠাৎ এতদিনের ছুটি কেন? কোথাও যাচ্ছো?’ চৈতালি হেসে বলেছে, ‘ক্লাউড নাইনে’ যাওয়ার ফ্লাইট বুক করেছি। যাবি? ‘বিয়েটা না করলে ঠিক ঠিকই যেতাম। চৈতালির ঠোঁটে একচিলতে হাসি। অশোকের জন্য সেই আকর্ষণ আর নেই চৈতালির, বিজয় এসে অশোকের জায়গা, চৈতালি জানে না, কবেই দখল করে নিয়েছে। অশোকের বিয়ের পর বিজয়ের মতো একজন পুরুষেরই দরকার ছিল তার জীবনে, এরকম বানের জলের মতো কেউ, পুরানো সব স্মৃতি ভাসিয়ে নেবে, øিগ্ধ শীতল নতুনতা ছড়িয়ে তাকে আরও উজ্জ্বল করবে, যেন সে জন্ম নিল এইমাত্র, অতীত বলে কিছু ছিল না কখনও তার। অশোক অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেছে, ‘কী কারও প্রেমে পড়েছ নাকি, দেখতে আরও উজ্জ্বল হয়েছ।’ মিষ্টি হেসে চৈতালি বলেছে, ‘এই, মুনা কেমন আছ? চলছে তো সব ঠিকঠাক? বলে, অশোকের উত্তরের জন্য না অপেক্ষা করেই অফিস থেকে বেরিয়ে গেছে চৈতালি। প্রতিদিন যখন বেরোয় তার চেয়ে খানিক আগেই বেরিয়েছে। শরীর জুড়ে বিজয় তার। সকাল থেকেই শরীরে বান ডাকছে।

বাড়িতে এসে গান গাইতে গাইতে øান করেছে। এত সময় নিয়ে চৈতালি øান করে না খুব। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ সেজেছে। পারফিউম মেখেছে। শোবার ঘরটা সাজিয়েছে। নতুন চাদর বিছিয়েছে বিছানায়। দুটো শুধু বালিশ ছিল, নতুন দুটো বালিশ যোগ করেছে। বড় ফ্ল্যাট চৈতালির। তিনটে শোবার ঘর। একটায় চৈতালি থাকে। আরেকটা অতিথির জন্য। আরেকটায় থাকে শকুন্তলা। শকুন্তলা পুরানো কাজের লোক। শকুন্তলা জিজ্ঞেস করেছে, ‘আজ অশোক বাবু আসছে নাকি চৈতি, এত সাজগোজ করছ যে?’ শুনে বিরক্ত কণ্ঠে চৈতালি বলেছে, ‘তুমি যে দিদি কী আবোলতাবোল বকো, অশোক বউ নিয়ে সুখের সংসার করছে, ও আসবে কেন?’

‘তাহলে, নতুন ভাগ্যবানটা কে শুনি?’

চৈতালি হেসে বলেছে, ‘এলেই দেখতে পাবে।’

শকুন্তলা প্রচুর রান্না করেছে আজ। বিজয় আর চৈতালি ক্যান্ডেল-লাইট ডিনার করবে। তারপর শোবার ঘরে চলে যাবে, দরজা বন্ধ করে দেবে ঘরের। জানালার পর্দাটা সরিয়ে দেওয়া। বিছানা থেকেই জানালার ওপারের চাঁদটা দেখতে পাবে। জ্যোৎøায় ঘর ভরে যাবে, আর ওই আলোয় তারা শরীরে শরীর ডুবিয়ে øান করবে সারা রাত। শোবার ঘরটায় চৈতালি জুঁইয়ের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে রাখে। নিজের গায়েও সুগন্ধী। বাড়িটায় যেন ফুলের উৎসব হচ্ছে। কণিকার রবীন্দ্রসঙ্গীতের সিডি চালিয়ে দেয়। ‘হৃদয়বাসনা পূর্ণ হলো’ গানটি বাজতে থাকে। চৈতালি গাইতে থাকে কণিকার সঙ্গে। কখনই খুব ভালো গাইতে জানে না চৈতালি। কিন্তু গান ভালোবাসতে ভালো জানে। চৈতালি একটা নীল রঙের শাড়ি পরেছে। ইচ্ছে করেই খুব বড় গলার ব্লাউজ পরেছে। স্তনজোড়া উঁকি দিচ্ছে, দিক। লরিয়েলের কালো রঙ চৈতালির চুলে। সামান্যই পেকেছে যদিও, চৈতালি মুছে ফেলেছে সাদার চিহ্ন। চল্লিশের টান টান শরীর, কিন্তু চুলে পাকন, ঠিক মেলে না। এমনিতে কালো সাদায় তার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু সেক্সবয়ের সঙ্গে সাতটা দিন ঘনিষ্ঠ সময় কাটাবে, বয়সের চিহ্নটিহ্ন এসে না হয় এই সাতটা দিন না জ্বালাক।

বিজয় ফোন করেছে দমদমে নেমেই। রেড লেবেলের একটা বোতল আর দুটো গ্লাস এনে শোবার ঘরের খাটের পাশের টেবিলে রাখে চৈতালি। এরকম অ্যাডভেঞ্চার আগে কখনও করেনি সে। একটা অচেনা মানুষের সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হলো, তার সঙ্গে যৌনসম্পর্কে যাওয়ার জন্যই সব আয়োজন দু’জন করছে, কোনো প্রেম হলো না, কেউ কারও জন্য ভালোবাসি শব্দটা উচ্চারণ করলো না, যৌনতা ছাড়া জগতের অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা হলো না! দু’জনের কিন্তু কারওরই মনে হচ্ছে না খুব বিচ্ছিরি কোনো কাজ তারা করছে। দু’জনই প্রাপ্তবয়স্ক। দু’জনই একা থাকে। কোনো স্বামী বা কোনো স্ত্রীকে ঠকিয়ে কিছু করছে না তারা। শরীর চাইলে শরীর তারা তবে কেন মেলাবে না!

সকাল থেকেই শরীরে বান ডাকছে। চৈতালীর মনে হতে থাকে সে নিতান্তই ষোলো বছর বয়সী এক কিশোরী। না হয় সে ষোলো বছর বয়সীই। ষোলো বছর যখন বয়স, তখন সে কঠিন কঠিন বই পড়ে। কাটিয়েছে, চল্লিশ বা পঞ্চাশ বয়সীরা যা করে। সেই ষোলোটা ফেরত পাওয়ার যদি সুযোগ হয়, তবে ফেরত সে নেবে না কেন! কাউকে তো দিব্যি দেয়নি যে ফেলে আসা কোনো বয়স সে কোনোদিন ফেরত নেবে না।

চৈতালির কাছে বিজয় সম্ভবত আস্ত একটি পুরুষাঙ্গ ছাড়া আর কিছু নয়। সে বলে-কয়েই সাতদিন শুতে আসছে চৈতালির সঙ্গে। শুধু শরীরের আকর্ষণকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে একটা সম্পর্ক। চৈতালি ভাবে, সবসময় যে আগে মন, পরে শরীর হতে হবে তারইবা কী মানে, শরীর আগে, মন পরে হওয়াটাই বরং বেশি যৌক্তিক। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই নিশ্চয়ই বিজয় ওকে জড়িয়ে ধরে গভীর করে চুমু খাবে। তারপর সোজা শোবার ঘরে। দৃশ্যগুলো কল্পনা করে চৈতালি। আবেগে চোখ বোজে। শরীরে নিভৃতে গর্জন করে সুখের স্রোত। শকুন্তলাকে বলে রেখেছে, ঘরের দরজা বন্ধ করে যেন সে শুয়ে থাকে, দরকার হলে ডাকবে। কেবল খাবার সময় শকুন্তলার ডাক পড়ে। শকুন্তলা জানে নিয়মগুলো। অশোকের সময় এরকমই ঘটতো। চৈতালির ডিভোর্সের পর শকুন্তলা বলেছে অনেকবার, ‘এবার একটা বিয়ে করো চৈতি’। বিয়ে করব না করব না বলে কয়েক বছর পার করেছে। তারপর অশোকের সঙ্গে যখন প্রেম করছে চৈতালী, শকুন্তলা বলেছে, ‘তাহলে একজন বন্ধুকেই পার্মান্যান্ট করে নাও। কাউকে যে ইচ্ছে করলেই কিছু করে নেওয়া যায় না, তা শকুন্তলাকে শত বলেও বোঝাতে পারে না চৈতালি। শকুন্তলা চৈতালির জন্মের সময় থেকে এই বাড়িতে আছে। বিয়ে করেনি। অথচ চৈতালির বিয়ে না করা আর স্থায়ী সঙ্গী না নেওয়া নিয়ে তার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। নিজের চেয়ে মনিবের পরিবারকে আপন করে দেখলে বুঝি এই হয়।

ফেসবুকে সেক্সবয় নামের আড়ালে বিজয়ের চরিত্র কেন তার ফেসবুকের বাইরের বিজয়ের চরিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত? জিজ্ঞেস করেনি, অনুমান করে নিয়েছে, মায়ের মৃত্যুর কারণে যে ভীষণ গ্লানি আর শোকে ভুগছে বিজয়, তা থেকে মুক্তি পেতেই আশ্রয় নিয়েছে ফেসবুকে, ভিন্ন চরিত্রে। চৈতালি কেন আশ্রয় নিয়েছে ফেসবুকে! তার তো কোনো গ্লানি নেই, শোক নেই!

২.

বিজয় এল। ফোটো দেখে বা স্কাইপেতে দেখে যেমন অনুমান করেছিল, তার চেয়ে অন্যরকম, যতটুকু লম্বা ভেবেছিল, তার চেয়ে বরং খানিকটা বেশি, যতটা মোটা লাগছিল, তার চেয়েও স্লিম, যতটা সুদর্শন ভেবেছিল, তার চেয়েও বেশি সুদর্শন বিজয়। দু’জন হাই বিজয়, হাই চৈতালি বলে হাত মেলাল। শোবার ঘরে নেওয়ার বদলে চৈতালি বসার ঘরে নিয়ে এল বিজয়কে। দু’সোফায় মুখোমুখি বসল দু’জন। একটুখানি দৃষ্টি বিনিময়। একটুখানি হাসি দু’জনের ঠোঁটে। চৈতালি বসে আছে বিজয় উঠে এসে ঠিক স্কাইপেতে যেমন বলত, ‘ইউ লুক সো হট হানি। কাম অন, লেটস হ্যাব সেক্স’ বলে কিনা। বিজয় নিজেই কাপড় খুলে ফেলত, ক্যামেরাকে নামিয়ে দিত উরুসন্ধির দিকে, আর চৈতালিও খুলত বুকের কাপড়। দুটো যৌনকাতর নারী-পুরুষ আজ মুখোমুখি বসে আছে। দু’টো শরীরের বাসনা আজ পূর্ণ হতে যাচ্ছে। তবে দু’জনের কথোপকথনে যৌনতার তিলমাত্র কিছু নেই।

একটু জল খাবো।

- আই অ্যাম সরি। জল আগেই দেওয়া উচিত ছিল। চা বা কফি কিছু খাবে?

না। আমি খাই না ওসব।

- তবে কি, হুইস্কি খাবে?

- হুইস্কি তো আমি খাই-ই না।

- ও

ক’টার সময় রাতের খাবার খাও?

ঠিক নেই। বেশ সুন্দর সাজানো ফ্ল্যাট। এত বই কার? সব তোমার?

হ্যাঁ আমার।

বিজয় উঠে বইয়ের তাকগুলোর দিকে যায়, মগ্ন হয়ে বই দেখতে থাকে। অনেকক্ষণ কেটে যায় এভাবে। চৈতালি জল এনে দিলে বই দেখতে দেখতেই জল খায়।

ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, আমি কি কিছু বই বের করতে পারি এখান থেকে?

হ্যাঁ নিশ্চয়ই, গো এহেড।

বিজয় তিনটে বই নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল। সোফায় এসে বলল, তুমিও দেখছি রডি ডয়েলের বই পছন্দ কর। দ্য ডেড রিপাবলিক পড়েছ?

চৈতালি হেসে বলল, ওর শুধু তিনটে পড়েছি, প্যাডি ক্লার্ক হাহাহা, এ স্টার কল্ড হেনরি আর দ্য গাটস।

- তোমার অসাধারণ কালেকশন।

- ক্লাসিকস বেশ কিছু আছে।

- ক্লাসিকসের কথা বাদ দাও। ওগুলো ছোটবেলায় পড়েছি। ইদানীং বিল ব্রাইসন থাকলে আমার আর কিচ্ছু চাই না।

- আছে বিল ব্রাইসন বেশ কটা।

চোখেমুখে খুশি উপচে ওঠে বিজয়ের।

- তুমি বিল ব্রাইসনও পছন্দ কর? বাহ! কোনগুলো আছে বল না। শেষটা আমার এখনও পড়া হয়নি।

আমার সবচেয়ে পছন্দ এ সর্ট হিস্টরি অব নিয়ারলি এভরিথিং।

ও বইটার তুলনা হয় না।

- আমার কাছে আছে আই অ্যাম এ স্ট্রেঞ্জার হেয়ার মাইসেল্ফ, অ্যট হোম, নাইদার হেয়ার নর দেয়ার…

- ওয়ান সামারটা তো এখনও বেরোয়নি বোধহয়।

- এই অক্টোবরে বেরোবে।

বিজয়ের মধ্যে একটা কিশোর বাস করে। দেখে ভালো লাগে চৈতালির। চৈতালির মতোই সে উজ্জ্বল উচ্ছ্বল হয়ে ওঠে সময় সময়। বইয়ের গল্পে মেতে ওঠে বিজয়। যেন দু’জনে কোনো বুক ক্লাবের মেম্বার। বইয়ের পছন্দে এত মিল আর কারও সঙ্গে নেই চৈতালির। তারপর কথায় কথায় বেড়ানোর কথা উঠল, ভারতের কোথায় কোথায় কে গেছে। তাতেও মিল, দু’জনে বর্ণনা করতে থাকে দু’জনের পছন্দের জায়গাগুলোয় নিজেদের অভিজ্ঞতা। এক সময় খাবারের প্রসঙ্গ ওঠে, ওতেও মিল। দু’জনই বাঙালি খাবার পছন্দ করে।

দশটা বেজে যায় গল্প করতে করতে। জল ছাড়া কেউ আর কিছু পান করে না। ফলের রসও, বিজয় বলেছে, খাবে না। শকুন্তলাকে ডাকে চৈতালি। শকুন্তলা টেবিলে খাবার সাজিয়ে দেয়। না, মোমবাতি জ্বালানোর প্রয়োজন মনে করে না চৈতালি। খেতে খেতে বিজয় বলে, ‘বাহ, বেশ কম তেলে কম মশলায় রান্না তো। আমার মা’র রান্নার মতো। ‘শকুন্তলা ভালো রাঁধে। শকুন্তলার বেশ প্রশংসা করল। বিজয়। চৈতালির থালায় নিজে খাবার বেড়ে দিল। খাওয়া শেষ হলে রান্নাঘরে গিয়ে নিজের থালা নিজেই ধুয়ে রেখে এল। পরিপূর্ণ ভদ্রলোক। দেখে বেশ ভালো লাগে চৈতালির। কলকাতায় আজ অবধি এমন ভদ্রলোক সে দেখেনি। খেয়ে ওঠার পর বিজয় বলল চৈতালিকে কাল ডিনারে নিয়ে যাবে সে, কলকাতার সবচেয়ে ভালো বাঙালি খাবারের রেস্টুরেন্টে। শকুন্তলা জিজ্ঞেস করল, বিজয়ের মা কী কী রাঁধেন, শুধু মারাঠী রান্না, নাকি বাঙালি রান্নাও? বিজয় অনেকক্ষণ চুপ হয়ে থেকে বলে যে তার মা মারা গেছেন এক বছর হলো। সড়ক দুর্ঘটনায়। বিজয় মায়ের সঙ্গেই থাকত। বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছে দাদা। গাড়িটা সেদিন চালাচ্ছিল বিজয় নিজে। দাদার বাড়ি থেকে ডিনার খেয়ে ফিরছিল বান্দ্রায় নিজের বাড়িতে। মদ্যপান করেছিল। বোমার মতো একটা ট্রাক ছুটে আসছিল তার গাড়ির দিকে, দেখতে পায়নি। ট্রাক এসে ধাক্কা মারল, আর গাড়িটা গড়াতে গড়াতে খাদে পড়ে গেল। ওখানেই মারা যায় মা। বিজয় চোট পেয়েছিল, তবে হাসপাতালে দুদিন থাকার পর তা সেরে যায়। সেদিনের পর থেকে বিজয় আর মদ ছোঁয়নি। মায়ের কথায় মায়ের কথা আসে। শকুন্তলাও মায়ের গল্পে যোগ দেয়। চৈতালি অনেকদিন ভুলে ছিল নিজের মাকে। আজ যেন মা তার সামনে এসে বসেছে। স্মৃতির ঝাঁপি সকলেই খুলে বসে। সকলের চোখ ভিজে ওঠে। বিজয় তার মায়ের প্রসঙ্গ না তুললে সম্ভবত এভাবেই চৈতালি ভুলে থাকত মাকে। বারোটা বেজে যায়। বিজয় বলে, ‘আমি কোথায় ঘুমোব?’

চৈতালি কিছুক্ষণ ভাবে। তারপর হেসে বলে শকুন্তলাকে, ‘তুমি দিদিসোনা গেস্টরুমের বিছানাটা ঠিক করে দাও। চাদরটা চেঞ্জ করে দিও। আমার ঘরে এক্সট্রা বালিশ আছে, নিয়ে যেও।’

বিজয় আগে কখনও কলকাতায় আসেনি। চৈতালি বলে, কাল তোমাকে ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে নিয়ে যাব। আর মার্বেল প্যালেসে। তোমার ভালো লাগবে।

বিজয় ‘অ্যাট হোম’ বইটি হাতে নিয়ে মিষ্টি হেসে বলে, ‘এই বইটা কি রাতে পড়ার জন্য নিতে পারি? এটা আমার পড়া হয়নি।’

বিজয় অনেকক্ষণ চুপ হয়ে থেকে বলে যে তার মা মারা গেছেন এক বছর হলো। সড়ক দুর্ঘটনায়। বিজয় মায়ের সঙ্গেই থাকত। বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছে দাদা। গাড়িটা সেদিন চালাচ্ছিল বিজয় নিজে। দাদার বাড়ি থেকে ডিনার খেয়ে ফিরছিল বান্দ্রায় নিজের বাড়িতে। মদ্যপান করেছিল। বোমার মতো একটা ট্রাক ছুটে আসছিল তার গাড়ির দিকে, দেখতে পায়নি।

৩.

যে কটা দিন ছিল বিজয়, কিশোর-কিশোরীর মতো চৈতালি আর বিজয় কলকাতার রাস্তায় টই টই করে ঘূরেছে, রাস্তার কিনারের তেলেভাজা থেকে ভজহরি মান্নার খাবার কিছু বাদ দেয়নি। হাতেটানা রিকশায় চড়েছে গঙ্গায় নৌকো চড়েছে, যেদিকে খুশি সেদিকে চলে গেছে। চৈতালি ভুলে গেছে তার চাকরিবাকরি, তার কন্যা, তার অতীত ভবিষ্যৎ। যেন সে পৃথিবী থেকে অনেক দূরে, সবার নাগালের বাইরে, কোনো অচেনা আকাশে উড়েছে। সত্যিকার ‘ক্লাইড নাইন’ বোধহয় একেই বলে। শকুন্তলাকে বিজয় উপহার দিয়েছে দু’টো চমৎকার শাড়ি, এত ভালো শাড়ি নাকি শকুন্তলা ইহজন্মে পরেনি। চৈতালির জন্য গনেশ পাইনের একটা পেইন্টিং। প্রথম একজন মানুষের সঙ্গে দেখা হলো, যার সঙ্গে ভাবনা চিন্তার প্রায় সম্পূর্ণই মিল পেল চৈতালি। জীবনের অনেক কথা বলেছে সে বিজয়কে। স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্সের কথা, মেয়ের মেয়ের কথা, অশোকের কথা, একরাশ দুঃখসুখের কথা। সব মন দিয়ে শুনেছে বিজয়। বিজয়ও বলেছে, তবে বলার চেয়ে বিজয় শুনতেই বেশি পছন্দ করেছে। মাত্র ক’টা দিনে কী অসম্ভব আপন হয়ে উঠেছে বিজয়। যেন বিজয় তার ছোটবেলার কোনো বন্ধু। যেন বিজয়ের সঙ্গে শৈশব-কৈশোর জুড়ে চৈতালি এক্কাদোক্কা খেলেছে, মার্বেল লাটিম খেলেছে, পুকুরে মাছ ধরেছে। মাঝে মধ্যে অতীতের কোনো ঘটনা বলতে গিয়ে চৈতালির চোখে জল এসেছে। আলতো করে বুকে টেনে তাকে শান্ত করেছে বিজয়। বিজয়ের ওটুকু স্পর্শই পেয়েছে চৈতালি গোটা সাতদিনে। চুমু খেতে একবার দু’বার চেয়েছিল, কিন্তু বারণ করেছে নিজেকে। ভেবেছে, বিজয় বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছু ভাবছে না।

বিজয় চলে যায়, চৈতালিকে দিয়ে যায় চৈতালির শ্রেষ্ঠ সময়। চৈতালির আর জিজ্ঞেস করা হয়নি, ফেসবুকে সেক্সবয় নামের আড়ালে বিজয়ের চরিত্র কেন তার ফেসবুকের বাইরের বিজয়ের চরিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত? জিজ্ঞেস করেনি, অনুমান করে নিয়েছে, মায়ের মৃত্যুর কারণে যে ভীষণ গ্লানি আর শোকে ভুগছে বিজয়, তা থেকে মুক্তি পেতেই আশ্রয় নিয়েছে ফেসবুকে, ভিন্ন চরিত্রে। চৈতালি কেন আশ্রয় নিয়েছে ফেসবুকে! তার তো কোনো গ্লানি নেই, শোক নেই! কিছু হয়ত চৈতালির ভেতরেও আছে, চৈতালি জানে না। বিজয় জানে কি? জিজ্ঞেস করা হয়নি বিজয় জানে কি না। এ ক’দিনে একবারও চৈতালির শরীরে বান ডাকেনি। শুধু মনেই ঝরেছে ঝড়বৃষ্টি। চৈতালির ফেসবুকের চরিত্রটা কি চৈতালির সত্যিকারের চরিত্র নয়! চৈতালি ভাবে, কোন বিজয় সত্যিকারের বিজয়! যে বিজয়ের সঙ্গে নেটে দেখা হয়, নাকি যে রক্তমাংসের বিজয়ের সঙ্গে কলকাতায় দেখা হলো! রক্তমাংসের বিজয়ই তো ফেসবুকের সেক্সবয়, যার সঙ্গে রাতে রাতে তার শরীরের উৎসব হয়। কত যে রহস্য একজন মানুষের ভেতর। সম্ভবত কয়েকজন মানুষ একসঙ্গে বাস করে একজন মানুষের মধ্যে। একজন আরেকজনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।

বিজয়কে এয়ারপোর্টে সি অফ করে যখন বাড়ি ফিরছিল, উদাস তাকিয়েছিল গাড়ির জানালায়, তখন এসএমএস আসে।

বিজয় লিখেছে, আই লাভ ইউ।

বুক কাঁপে চৈতালির। তীব্র ভালো লাগা মন থেকে শরীরে ছড়িয়ে যায়।

চৈতালি লিখল, মি টু।

ঘরে ফিরে দেখে সেই যে কণিকার সিডিটা বাজছিল, সেটা বেজেই চলেছে, কণিকার কণ্ঠে তখন, ‘চিরসখা হে ছেড়ো না মোরে…’

সঙ্গে সঙ্গে গায় চৈতালি, ‘চিরসখা হে ছেড়ো না মোরে…’।




বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

পৌরানিক গল্প - হরিশংকর জলদাস

amarboi
পৌরানিক গল্প - হরিশংকর জলদাস
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

দুই দশকের দেশ গল্প সংকলন (১৯৮৩ - ২০০৩)

amarboi
দুই দশকের দেশ গল্প সংকলন (১৯৮৩ - ২০০৩)
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

ফরগেট মি নট - সত্যজিৎ রায় [Netflix Ray Episode 1 - Forget Me Not by Satyajit Ray]

amarboi
বিপিন চৌধুরীর স্মৃতিভ্রম
সত্যজিৎ রায়

নিউ মার্কেটের কালীচরণের দোকান থেকে প্রতি সোমবার আপিস-ফেরতা বই কিনে বাড়ি ফেরেন বিপিন চৌধুরী। যতরাজ্যের ডিটেকটিভ বই, রহস্যের বই আর ভূতের গল্প। একসঙ্গে অন্তত খান পাঁচেক বই না কিনলে তাঁর এক সপ্তাহের খোরাক হয় না। বাড়িতে তিনি একা মানুষ। লোকের সঙ্গে মেলামেশা তাঁর ধাতে আসে না, আড্ডার বাতিক নেই, বন্ধুপরিজনের সংখ্যাও কম। সন্ধ্যায় তাঁর বাড়িতে যেসব কাজের লোক আসেন, তাঁরা কাজের কথা সেরে উঠে চলে যান। যাঁরা ওঠেন না বা উঠতে চান না, বিপিনবাবু তাঁদের সোয়া আটটা বাজলেই বলেন— ‘আমার ডাক্তারের আদেশ আছে— সাড়ে আটটায় খাওয়া সারতে হবে। কিছু মনে করবেন না…’। খাওয়ার পর আধঘণ্টা বিশ্রাম, তারপর গল্পের বই হাতে নিয়ে সোজা বিছানায়। এই নিয়ম যে কতদিন ধরে চলেছে বিপিনবাবুর নিজেরই তার হিসেব নেই।
আজ কালীচরণের দোকানে বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে বিপিনবাবুর খেয়াল হল আরেকটি লোক যেন তাঁর পাশে কিছুক্ষণ থেকে দাঁড়িয়ে আছে। বিপিনবাবু মুখ তুলে দেখেন একটি গোলগাল অমায়িক চেহারার ভদ্রলোক তাঁরই দিকে চেয়ে হাসছেন।
‘আমায় চিনতে পারছেন না বোধহয়?’
বিপিনবাবু কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত বোধ করলেন। কই, এর সঙ্গে তো কোনদিন আলাপ হয়েছে বলে তাঁর মনে পড়ে না। এমন মুখও তো কোন মনে পড়ছে না তাঁর।
‘অবিশ্যি আপনি কাজের মানুষ। অনেক রকম লোকের সঙ্গে দেখা হয় তো রোজ—তাই বোধহয়…’
‘আমার কি আপনার সঙ্গে আলাপ হয়েছে এর আগে?’ বিপিনবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
ভদ্রলোক যেন এবার একটু অবাক হয়েই বললেন, ‘আজ্ঞে সাতদিন দু’বেলা সমানে দেখা হয়েছে। আমি গাড়ির ব্যবস্থা করে দিলুম—সেই গাড়িতে আপনি হুড্রু ফল্‌স দেখতে গেলেন। সেই নাইনটিন ফিফটি-এইটে—রাঁচিতে! আমার নাম পরিমল ঘোষ।’
‘রাঁচি?’ বিপিনবাবু এবার বুঝলেন যে ভুল তাঁর হয় নি, হয়েছে এই লোকটিরই। কারণ বিপিনবাবু কোনদিন রাঁচি যান নি। যাবার কথা হয়েছে অনেকবার, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়ে ওঠে নি। এবার বিপিনবাবু একটু হেসে বললেন, ‘আমি কে তা আপনি জানেন কি?’
ভদ্রলোক চোখ কপালে তুলে জিভ কেটে বললেন, ‘আপনি কে তা জানব না? বলেন কী? বিপিন চৌধুরীকে কে না জানে?’
বিপিনবাবু এবার বইয়ের দিকে দৃষ্টি দিয়ে মৃদুস্বরে বললেন, ‘কিন্তু তাও আপনার ভুল হয়েছে। ওরকম হয় মাঝে মাঝে। আমি রাঁচি যাই নি কখনো।’
ভদ্রলোক এবার বেশ জোরে হেসে উঠলেন।
‘কী বলছেন মিস্টার চৌধুরী? ঝরনা দেখতে গিয়ে পাথরে হোঁচট খেয়ে আপনার হাঁটু ছড়ে গেল। আমিই শেষটায় আয়োডিন এনে দিলুম। পরদিন নেতারহাট যাবার জন্যে আমি গাড়ি ঠিক করেছিলুম—আপনি পায়ের ব্যথার জন্যে যেতে পারলেন না। কিচ্ছু মনে পড়ছে না? আপনার চেনা আরেকজন লোকও তো গেস্‌লেন সেবার—দীনেশ মুখুজ্যে। আপনি ছিলেন একটা বাংলো ভাড়া করে—বললেন হোটেলের খাবার আপনার ভালো লাগে না—তার চেয়ে বাবুর্চি দিয়ে রান্না করিয়ে নেওয়া ভালো। দীনেশ মুখুজ্যে ছিলেন তাঁর বোনের বাড়িতে। আপনাদের দুজনের সেই তর্ক লেগেছিল একদিন চাঁদে যাওয়ার ব্যাপার নিয়ে—মনে নেই? সব ভুলে গেলেন? আরো বলছি—আপনার কাঁধে একটা ঝোলানো ব্যাগ ছিল—তাতে গল্পের বই থাকত। বাইরে গেলে নিয়ে যেতেন। কেমন—ঠিক কিনা?’
বিপিনবাবু এবার গম্ভীর সংযত গলায় বললেন, ‘আপনি ফিফ্‌টি-এইটের কোন্‌ মাসের কথা বলছেন বলুন তো?
ভদ্রলোক বললেন, ‘মহালয়ার ঠিক পরেই। হয় আশ্বিন, নয় কার্তিক।’
বিপিনবাবু বললেন, ‘আজ্ঞে না। পুজোয় সে বছর আমি ছিলুম কানপুরে আমার এক বন্ধুর বাড়িতে। আপনি ভুল করলেন। নমস্কার।’
কিন্তু ভদ্রলোক গেলেন না। অবাক অপলক দৃষ্টিতে বিপিনবাবুর দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে বলে যেতে লাগলেন, ‘কী আশ্চর্য! একদিন সন্ধ্যাবেলা আপনার বাংলোর দাওয়ায় বসে চা খেলুম। আপনি আপনার ফ্যামিলির কথা বললেন-বললেন, আপনার ছেলেপিলে নেই, আপনার স্ত্রী বারো তেরো বছর আগে মারা গেছেন। একমাত্র ভাই পাগল ছিলেন, তাই আপনি পাগলা গারদ দেখতে যেতে চাইলেন না। বললেন, ভাইয়ের কথা মনে পড়ে যায়…’
বিপিনবাবু যখন বইয়ের দামটা দিয়ে দোকান থেকে বেরোচ্ছেন তখনও ভদ্রলোক তাঁর দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছেন।
বারট্রাম স্ট্রীটে লাইটহাউস সিনেমার গায়ে বিপিন চৌধুরীর বুইক গাড়িটা লাগানো ছিল। তিনি গাড়িতে পৌঁছে ড্রাইভারকে বললেন, ‘একটু গঙ্গার ধারটায় ঘুরে চলো তো সীতারাম।’
চলন্ত গাড়িতে বসে মাথাটা একটু ঠাণ্ডা হতেই বিপিনবাবুর আপসোস হল। বাজে ভণ্ড লোকটাকে এতটা সময় কেন মিছিমিছি দিলেন তিনি! রাঁচি তো তিনি যান নি, কখনই যেতে পারেন না। মাত্র ছ’ সাত বছর আগেকার স্মৃতি মানুষে অত সহজে ভুলতে পারে না, এক যদি না—
বিপিনবাবুর মাথা হঠাৎ বন্ করে ঘুরে গেল।
এক যদি না তাঁর মাথা খারাপ হয়ে গিয়ে থাকে।
কিন্তু তাই বা হয় কী করে? তিনি তো দিব্যি আপিসে কাজ করে যাচ্ছেন। এত বিরাট আপিস—এত দায়িত্বপূর্ণ কাজ। কোথাও তো কোন ত্রুটি হচ্ছে বলে তিনি জানেন না। আজও তো একটা জরুরী মিটিং-এ আধ ঘণ্টার বক্তৃতা দিয়েছেন তিনি। আশ্চর্য! অথচ—
অথচ লোকটা তাঁর এত খবর রাখল কী করে? এ যে একেবারে নাড়ী-নক্ষত্র জেনে বসে আছে। বইয়ের ব্যাগ, স্ত্রীর মৃত্যু, ভাইয়ের মাথা খারাপ! ভুল করেছে কেবল ওই রাঁচির ব্যাপারে। ভুল কেন—জেনেশুনে মিথ্যে বলছে। আটান্ন সালের পুজোয় তিনি রাঁচি যান নি; গিয়েছিলেন কানপুরে, তাঁর বন্ধু হরিদাস বাগচির বাড়িতে। হরিদাসকে লিখলেই—নাঃ, হরিদাসকে লেখার উপায় নেই।
বিপিনবাবুর হঠাৎ খেয়াল হল হরিদাস বাগচি আজ মাসখানেক হল সস্ত্রীক জাপানে গেছেন তাঁর ব্যবসার ব্যাপারে। জাপানের ঠিকানা বিপিনবাবু জানেন না। কাজেই চিঠি লিখে প্রমাণ আনানোর রাস্তা বন্ধ।
কিন্তু প্রমাণের প্রয়োজনটাই বা কোথায়। এমন যদি হত যে উনিশ শ’ আটান্ন সালের আশ্বিন মাসে রাঁচিতে কোন খুনের জন্য পুলিশ তাঁকে দায়ী করার চেষ্টা করছে, তখনই তাঁর চিঠির প্রয়োজন হত হরিদাস বাগচির কাছ থেকে। এখন তো প্রমাণের কোন দরকার নেই। তিনি নিজে জানেন তিনি রাঁচি যান নি। ব্যস্‌, ল্যাঠা চুকে গেল।
গঙ্গার হাওয়াতে বিপিন চৌধুরীর মাথা অনেক ঠাণ্ডা হলেও, মনের মধ্যে একটা খটকা, একটা অসোয়াস্তিবোধ যেন থেকেই গেল!
হেস্‌টিংস-এর কাছাকাছি এসে বিপিনবাবু তাঁর প্যান্টের কাপড়টা গুটিয়ে উপরে তুলে দেখলেন যে ডান হাঁটুতে একটা এক ইঞ্চি লম্বা কাটা দাগ রয়েছে। সেটা কবেকার দাগ তা বোঝবার কোন উপায় নেই। ছেলেবেলা কি কখনও হোঁচট খেয়ে হাঁটু ছড়ে নি বিপিনবাবুর? অনেক চেষ্টা করেও সেটা তিনি মনে করতে পারলেন না।
চড়কডাঙার মোড়ের কাছাকাছি এসে তাঁর দীনেশ মুখুজ্যের কথাটা মনে পড়ল। লোকটা বলছিল দীনেশ মুখুজ্যে ছিল রাঁচিতে ওই একই সময়ে। তাহলে দীনেশকে জিজ্ঞেস করলেই তো হয়। সে থাকে কাছেই—বেণীনন্দন স্ট্রীট। এখনই যাবেন কি তার কাছে? কিন্তু যদি রাঁচি যাওয়ার ব্যাপারটা মিথ্যেই হয়—তাহলে দীনেশকে সে সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞেস করতে গেলে তো সে বিপিনবাবুকে পাগল ঠাওরাবে। না না—এ ছেলেমানুষি তাঁর পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। নিজেকে সেধে সেধে এইভাবে বোকা বানানো কোনমতেই চলতে পারে না। আর দীনেশের বিদ্রূপ যে কত নির্মম হতে পারে তার অভিজ্ঞতা বিপিনবাবুর আছে।…
বাড়ি এসে ঠাণ্ডা ঘরে বসে ঠাণ্ডা শরবত খেয়ে বিপিনবাবুর উদ্বেগটা অনেক কম বলে মনে হল। যত সব বাউন্ডুলের দল! নিজেদের কাজকর্ম নেই, তাই কাজের লোকদের ধরে ধরে বিব্রত করা।
রাত্রে খাওয়াদাওয়া সেরে বিছানায় শুয়ে নতুন বইটা পড়তে পড়তে বিপিনবাবু নিউ মার্কেটের ভদ্রলোকটির কথা ভুলেই গেলেন।
পরদিন আপিসে কাজ করতে করতে বিপিনবাবু লক্ষ করলেন যে, যতই সময় যাচ্ছে ততই যেন গতকালের ঘটনাটা তাঁর স্মৃতিতে আরো বেশি স্পষ্ট হয়ে আসছে। সেই গোলগাল মুখ, সেই ঢুলুঢুলু অমায়িক চাহনি, আর সেই হাসি। তাঁর এত ভেতরের খবরই যদি লোকটা নির্ভুল জেনে থাকে, তবে রাঁচির ব্যাপারটায় সে এত ভুল করল কী করে?
লাঞ্চের ঠিক আগে—অর্থাৎ একটা বাজতে পাঁচ মিনিটের সময়—বিপিনবাবু আর থাকতে না পেরে টেলিফোনের ডিরেক্টরিটা খুলে বসলেন। দীনেশ মুখুজ্যেকে ফোন করতে হবে একটা। ফোনই ভালো। অপ্রস্তুত হবার সম্ভাবনাটা কম।
টু-থ্রি-ফাইভ-সিক্স-ওয়ান-সিক্স।
বিপিনবাবু ডায়াল করলেন।
‘হ্যালো।’
‘কে, দীনেশ? আমি বিপিন কথা বলছি।’
‘কী খবর?’
‘ইয়ে ফিফ্‌টি এইটের একটা ঘটনা তোমার মনে আছে কিনা জানবার জন্য ফোন করছি।’
‘ফিফটি এইট? কী ঘটনা?’
‘সে বছরটা কি তুমি কলকাতাতেই ছিলে? আগে সেইটে আমার জানা দরকার।’
‘দাঁড়াও দাঁড়াও। ফিফটি এইট—আটান্ন…দাঁড়াও, আমার ডায়েরি দেখি। একটু ধরো।’
একটুক্ষণ চুপচাপ। বিপিনবাবু তাঁর বুকের ভেতরে একটা দুরুদুরু কাঁপুনি অনুভব করলেন। প্রায় এক মিনিট পরে আবার দীনেশ মুখুজ্যের গলা পাওয়া গেল।
‘হ্যাঁ, পেয়েছি। আমি বাইরে গেস্‌লাম—দু’বার।’
‘কোথায়?’
‘একবার গেলাম ফেব্রুয়ারিতে কাছেই—কেষ্টনগর—আমার এক ভাগনের বিয়েতে। আরেকবার—ও, এটা তো তুমি জানই। সেই রাঁচি। সেই যে যেবার তুমিও গেলে। ব্যস্‌। কিন্তু কেন বলো তো?’
‘না। একটা দরকার ছিল। ঠিক আছে। থ্যাঙ্ক ইউ…’
বিপিনবাবু টেলিফোনটা রেখে দিয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। তাঁর কান ভোঁ ভোঁ করছে, হাত পা যেন সব কেমন ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। সঙ্গে টিফিনের বাক্সে স্যান্ডউইচ ছিল, সেটা আর তিনি খেলেন না। খাবার কোন ইচ্ছেই হল না। তাঁর খিদে চলে গেছে।
লাঞ্চ টাইম শেষ হয়ে যাবার পর বিপিনবাবু বুঝতে পারলেন, এ অবস্থায় তাঁর পক্ষে আপিসে বসে কাজ করা অসম্ভব। তাঁর পঁচিশ বছরের কর্মজীবনে এর আগে এরকম কখনো হয় নি। নিরলস কর্মী বলে বিপিনবাবুর একটা খ্যাতি ছিল। কর্মচারীরা তাঁকে বাঘের মতো ভয় করত। যত বিপদই আসুক, যত বড় সমস্যারই সামনে পড়তে হোক, বিপিনবাবুর কোনদিন মতিভ্রম হয় নি। মাথা ঠাণ্ডা করে কাজ করে সব সময়ে সব বিপদ কাটিয়ে উঠেছেন তিনি।
আজ কিন্তু তাঁর সমস্ত গোলমাল হয়ে গেছে!
আড়াইটের সময় বাড়ি ফিরে, শোবার ঘরের সমস্ত দরজা জানালা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে মনটাকে প্রকৃতিস্থ করে, কী করা উচিত সেটা ভাববার চেষ্টা করলেন বিপিনবাবু। মানুষ মাথায় চোট খেয়ে বা অন্য কোনরকম অ্যাকসিডেন্টের ফলে মাঝে মাঝে পূর্বস্মৃতি হারিয়ে ফেলে। কিন্তু আর সব মনে আছে, শুধু একটা বিশেষ ঘটনা মনে নেই—এর কোন উদাহরণ তিনি আর কখনও পাননি। রাঁচি যাবার ইচ্ছে তাঁর অনেকদিন থেকেই ছিল। সেই রাঁচিই গেছেন, অথচ গিয়ে ভুলে গেলেন, এ একেবারে অসম্ভব।
বাইরে কোথাও গেলে বিপিনবাবু তাঁর বেয়ারাকে সঙ্গে নিয়ে যান। কিন্তু এখন যে বেয়ারাটা আছে সে নতুন লোক। সাত বছর আগে তাঁর বেয়ারা ছিল রামস্বরূপ। তিনি রাঁচি গিয়ে থাকলে সেও নিশ্চয়ই যেত, কিন্তু এখন সে আর নেই, তিন বছর হল নেই।
সন্ধ্যা পর্যন্ত বিপিনবাবু একাই কাটালেন তাঁর ঘরে। মনে মনে স্থির করলেন আজ কেউ এলেও তাঁর সঙ্গে দেখা করবেন না।
সাতটা নাগাদ চাকর এসে খবর দিল তাঁর সঙ্গে ধনী ব্যবসায়ী শেঠ গিরিধারিপ্রসাদ দেখা করতে এসেছেন। জাঁদরেল লোক গিরিধারিপ্রসাদ। কিন্তু বিপিনবাবুর মানসিক অবস্থা তখন এমনই যে তিনি বাধ্য হয়ে চাকরকে বলে দিলেন যে, তাঁর পক্ষে নীচে নামা সম্ভব নয়। চুলোয় যাক গিরিধারিপ্রসাদ!
সাড়ে সাতটায় আবার চাকরের আগমন। বিপিনবাবুর তখন সবে একটু তন্দ্রার ভাব এসেছে, একটা দুঃস্বপ্নের গোড়াটা শুরু হয়েছে, এমন সময় চাকরের ডাকে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। আবার কে এল? চাকর বলল, চুনিবাবু! বলছে ভীষণ জরুরী দরকার।
দরকার যে কী তা বিপিনবাবু জানেন। চুনি তাঁর স্কুলের সহপাঠী। সম্প্রতি দুরবস্থায় পড়েছে, কদিন থেকেই তাঁর কাছে আসছে একটা কোন চাকরির আশায়। বিপিনবাবুর পক্ষে তার জন্যে কিছু করা সম্ভব নয়, তাই প্রতিবারই তিনি তাকে না বলে দিয়েছেন, আচ্ছা নাছোড়বান্দা লোক তো চুনি!
বিপিনবাবু অত্যন্ত বিরক্তভাবে চাকরটাকে দিয়ে বলে পাঠালেন যে, শুধু আজ নয়—বেশ কিছুদিন তাঁর পক্ষে চুনির সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হবে না।
চাকর ঘর থেকে চলে যেতেই বিপিনবাবুর খেয়াল হল যে চুনির হয়তো আটান্নর ঘটনা কিছুটা মনে থাকতে পারে। তাকে একবার জিজ্ঞেস করাতে দোষ কী?
বিপিনবাবু তরতরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে বৈঠকখানায় হাজির হলেন। চুনি যাবার জন্য উঠে পড়েছিল, বিপিনবাবুকে নেমে আসতে দেখে সে যেন একটু আশান্বিত হয়েই ঘুরে দাঁড়াল।
বিপিনবাবু ভণিতা না করেই বললেন, ‘শোনো চুনি, তোমার কাছে একটা—মানে, একটু বেখাপ্পা প্রশ্ন আছে। তোমার তো স্মরণশক্তি বেশ ভালো ছিল বলে জানি—আর আমার বাড়িতে তো তুমি অনেক বছর ধরেই মাঝে মাঝে যাতায়াত করছ। ভেবে দেখো তো মনে পড়ে কিনা—আমি কি আটান্ন সালে রাঁচি গিয়েছিলাম?
চুনি বলল, ‘আটান্ন? আটান্নই তো হবে। নাকি উনষাট?’
‘রাঁচি যাওয়াটা নিয়ে তোমার কোন সন্দেহ নেই?’
চুনি এবার রীতিমত অবাক হয়ে গেল।
‘তোমার কি যাওয়ার ব্যাপারটা নিয়েই সন্দেহ হচ্ছে?’
‘আমি গিয়েছিলাম? তোমার ঠিক মনে আছে?’
চুনি সোফা থেকে উঠেছিল, সেটাতেই আবার বসে পড়ল। তারপর সে বিপিন চৌধুরীর দিকে কিছুক্ষণ তীক্ষ দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বলল, ‘বিপিন, তুমি কি নেশাটেশা ধরেছ নাকি আজকাল? এদিকে তো তোমার কোন বদনাম ছিল না! তুমি কড়া মেজাজের লোক, পুরোনো বন্ধুদের প্রতি তোমার সহানুভূতি নেই—এসবই তো জানতুম! কিন্তু তোমার তো মাথাটা পরিষ্কার ছিল; অন্তত কিছুদিন আগে অবধি ছিল!’
বিপিনবাবু কম্পিতস্বরে বললেন, ‘তোমার মনে আছে আমার যাবার কথা?’
চুনি এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে একটা পালটা প্রশ্ন করে বসল। সে বলল—
‘আমার শেষ চাকরি কী ছিল মনে আছে তোমার?’
‘বিলক্ষণ। তুমি হাওড়া স্টেশনে বুকিং ক্লার্ক ছিলে।’
‘তোমার সেটা মনে আছে, আর আমিই যে তোমার রাঁচির বুকিং করে দিলাম সেটা মনে নেই? তোমার যাবার দিন তোমার কামরায় গিয়ে দেখা করলাম, ডাইনিং কারে বলে তোমার খাবারের ব্যবস্থা করে দিলাম, তোমার কামরায় পাখা চলছিল না—সেটা লোক ডেকে চালু করে দিলাম—এসব তুমি ভুলে গেছ? তোমার হয়েছে কী?’
বিপিনবাবু একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন।
চুনি বলল, ‘তোমার কি অসুখ করেছে? তোমার চেহারাটা তো ভালো দেখছি না।’
বিপিনবাবু বললেন, ‘তাই মনে হচ্ছে। ক’দিন কাজের চাপটা একটু বেশি পড়েছিল। দেখি একটা স্পেশালিস্ট-টেশালিস্ট…’
বিপিনবাবুর অবস্থা দেখেই বোধহয় চুনি আর চাকরির উল্লেখ না করে আস্তে আস্তে বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে গেল।
পরেশ চন্দ্রকে ইয়াং ডাক্তার বলা চলে, চল্লিশের নীচে বয়স, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। বিপিনবাবুর ব্যাপার শুনে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। বিপিনবাবু তাঁকে মরিয়া হয়ে বললেন, ‘দেখুন ডক্টর চন্দ্র, আমার এ ব্যারাম আপনাকে সারিয়ে দিতেই হবে। আপিস কামাই করার ফলে যে কী ক্ষতি হচ্ছে আমার ব্যবসার তা আমি বোঝাতে পারব না। আজকাল তো অনেক ওষুধ বেরিয়েছে। আমার এ ব্যারামের জন্য কি কিছুই নেই? আমি যত টাকা লাগে দেব। যদি বিদেশ থেকে আনাবার দরকার হয় তারও ব্যবস্থা করব। কিন্তু এ রোগ আপনাকে সারাতেই হবে।’
ডাক্তার একটু ভেবেচিন্তে মাথা নেড়ে বললেন, ‘ব্যাপারটা কী জানেন মিস্টার চৌধুরী? আমার কাছে এ রোগ একেবারে নতুন জিনিস; আমার অভিজ্ঞতার একেবারে বাইরে। তবে একটা মাত্র উপায় আমি বলতে পারি। ফল হবে কিনা জানি না, কিন্তু চেষ্টা করে দেখতে পারেন। ক্ষতির কোন আশঙ্কা নেই।’
বিপিনবাবু উদ্‌গ্রীব হয়ে কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে বসলেন।
ডাক্তার বললেন, ‘আমার যতদূর মনে হচ্ছে—এবং আমার বিশ্বাস আপনারও এখন তাই ধারণা—যে আপনি সত্যিই রাঁচি গিয়েছিলেন, কিন্তু যে কোন কারণেই হোক, এই যাওয়ার ব্যাপারটা আপনি বেমালুম ভুলে গেছেন। আমি সাজেস্ট করছি যে আপনি আরেকবার রাঁচি যান। তাহলে হয়তো জায়গাটা দেখে আপনার আগের ট্রিপ-এর কথাটা মনে পড়ে যাবে। এটা অসম্ভব নয়। আজ এই মুহূর্তে তো বেশি কিছু করা সম্ভব নয়। আমি আপনাকে একটি বড়ি লিখে দিচ্ছি—সেটা খেলে হয়তো ঘুমটা হবে। ঘুমটা দরকার, তা নাহলে আপনার অশান্তি এবং তার সঙ্গে সঙ্গে আপনার অসুখও বেড়ে যাবে। আপনি একটা কাগজ দিন, আমি ওষুধটা লিখে দিচ্ছি।’
বড়ির জন্যেই হোক, বা ডাক্তারের পরামর্শের জন্যেই হোক, বিপিনবাবু পরদিন সকালে অপেক্ষাকৃত সুস্থ বোধ করলেন।
প্রাতঃকালীন জলযোগ সেরে আপিসে টেলিফোন করে কিছু ইন্‌স্ট্রাকশন দিয়ে সেইদিনই রাত্রের জন্য রাঁচির টিকিট কিনলেন।
পরদিন রাঁচি স্টেশনে নেমেই তিনি বুঝলেন এ জায়গায় তিনি কস্মিনকালেও আসেন নি।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা গাড়ি করে এদিক ওদিক খানিকটা ঘুরে বুঝলেন যে এখানের রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, প্রাকৃতিক দৃশ্য, মোরাবাদি পাহাড়, হোটেল, বাংলো, কোনটার সঙ্গেই তাঁর বিন্দুমাত্র পরিচয় নেই। হুড্রু ফল্‌স কি তিনি চিনতে পারবেন? জলপ্রপাতের দৃশ্য দেখলেই কি তাঁর পুরোনো কথা সব মনে পড়ে যাবে?
নিজে সে কথা বিশ্বাস না করলেও, পাছে কলকাতায় ফিরে অনুতাপ হয় তাই একটি গাড়ির ব্যবস্থা করে দুপুরের দিকে হুড্রুর দিকে রওনা দিলেন।
সেইদিনই বিকেল পাঁচটার সময় হুড্রুতে একটি পিকনিকের দলের দুটি গুজরাটি ভদ্রলোক বিপিনবাবুকে অজ্ঞান অবস্থায় একটি পাথরের ঢিপির পাশে আবিষ্কার করল। এই দুই ভদ্রলোকের শুশ্রূষার ফলে জ্ঞান ফিরে পেতেই বিপিনবাবু প্রথম কথা বললেন—‘আমি রাঁচি আসি নি। আমার সব গেল! আর কোন আশা নেই…’
পরদিন সকালে বিপিন চৌধুরী কলকাতায় ফিরে এলেন। তিনি বুঝেছিলেন যে যদি না তিনি এই রহস্যের উদ্ঘাটন করতে পারেন, তবে তাঁর আর সত্যই কোন আশা নেই। তাঁর কর্মক্ষমতা, তাঁর আত্মবিশ্বাস, তাঁর উৎসাহ বুদ্ধি বিবেচনা সবই তিনি ক্রমে ক্রমে হারাবেন। শেষে কি তাহলে তাঁকে সেই রাঁচির…?
এর পরে আর বিপিনবাবু ভাবতে পারেন না, ভাবতে চান না।…
বাড়ি ফিরে কোনরকমে স্নান করে মাথায় বরফের থলি চাপা দিয়ে বিপিন চৌধুরী শয্যা নিলেন। চাকরকে বললেন ডাক্তার চন্দ্রকে ডেকে নিয়ে আসতে। চাকর যাবার আগে তাঁর হাতে একটি চিঠি দিয়ে বলল, কে জানি ডাকবাক্সে ফেলে দিয়ে গেছে। সবুজ খাম, তার উপর লাল কালিতে লেখা—‘শ্রীবিপিনবিহারী চৌধুরী। জরুরী, একান্ত ব্যক্তিগত।’
অসুস্থতা সত্ত্বেও বিপিনবাবুর কেন জানি মনে হল যে চিঠিটা তাঁর পড়া দরকার। খাম খুলে দেখেন এই চিঠি—
‘প্রিয় বিপিন,
হঠাৎ বড়লোক হওয়ার কুফল যে তোমার মধ্যে এভাবে দেখতে পাব তা আশা করি নি। একজন দুঃস্থ বাল্যবন্ধুর জন্য একটা উপায় করে দেওয়া কি সত্যিই তোমার পক্ষে এত অসম্ভব ছিল? আমার টাকা নেই, তাই ক্ষমতা সামান্যই। যে জিনিসটা আছে আমার সেটা হল কল্পনাশক্তি। তারই সামান্য কিছুটা খরচ করে তোমার উপর সামান্য প্রতিশোধ নিলাম। নিউ মার্কেটের সেই ভদ্রলোকটি আমার প্রতিবেশী; বেশ ভালো অভিনেতা। দীনেশ মুখুজ্যে তোমার প্রতি সদয় নন, তাই তাকে হাত করতে কোন অসুবিধা হয় নি। হাঁটুর দাগটার কথা নিশ্চয়ই মনে আছে—সেই চাঁদপাল ঘাটে আছাড় খাওয়া—উনিশ শ’ ছত্রিশ সনে?…
আর কী? এবার সেরে উঠবে। আমার একটি উপন্যাস এক প্রকাশকের পছন্দ হয়েছে। কয়েকটা মাস তাতেই কোনরকমে চালিয়ে নেব। ইতি
তোমার বন্ধু চুনিলাল’
ডাক্তার চন্দ্র আসতেই বিপিনবাবু বললেন, ‘ভালো আছি। রাঁচি স্টেশনে নেমেই সব মনে পড়ে গেল।’
ডাক্তার বললেন, ‘ভেরি স্ট্রেঞ্জ! আপনার কেসটা একটা ডাক্তারি জার্নালে ছাপিয়ে দেব ভাবছি।’
বিপিনবাবু বললেন, ‘আপনাকে যেই জন্য ডাকা—দেখুন তো, আমার কোমরের হাড়টাড় ভাঙল কিনা। রাঁচিতে হোঁচট খেয়েছিলাম। টনটন করছে।’


বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com