সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label সুকুমারী ভট্টাচার্য. Show all posts
Showing posts with label সুকুমারী ভট্টাচার্য. Show all posts

প্রবন্ধসংগ্রহ ০১ - সুকুমারী ভট্টাচার্য

amarboi
প্রবন্ধসংগ্রহ ০১
সুকুমারী ভট্টাচার্য

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

বেদের যুগে স্ত্রীশিক্ষা - সুকুমারী ভট্টাচার্য

amarboi
বেদের যুগে স্ত্রীশিক্ষা

সুকুমারী ভট্টাচার্য

সাধারণভাবে আমাদের ধারণা যে বৈদিক যুগে নারীর শিক্ষায় কোনো অধিকার ছিল না। এ ধারণা এক অর্থে সত্যও বটে কারণ সে যুগে বিদ্যাশিক্ষা শুরু হবার আগেই ছিল উপনয়ন, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য পুরুষ সন্তানের। কাজেই স্বভাবতই নারী বাদ ছিল; এবং উপনয়ন না হলে বিদ্যাশিক্ষা শুরুই হত না। কিন্তু এ হল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, সমাজ যা অনুমোদন করত এবং রাজা অর্থ ও সহায়তা দিয়ে যে ব্যবস্থার আনুকূল্য করতেন।

এর বাইরেও শিক্ষা ছিল তা প্রাতিষ্ঠানিক নয়, বরং খানিকটা ব্যতিক্রমী। কী করে জানা যায়? প্রথমত, বেদরচয়িতাদের মধ্যে বেশ কিছু ঋষিকার ও নারী-ঋষির নাম পাই— রোমশা, লোপামুদ্রা, অদিতি, বিশ্ববারা, শাশ্বতী, অপালা, সিকতা, নীবাবরী, ঘোষা, অগস্ত্ব্যস্বশা, সূর্যা, ইন্দ্রাণী, উর্বশী, দক্ষিণা, সরমা, জুহু, বাচ, রাত্রি, গোধা, শ্রদ্ধা, শচী, সর্পরাজ্ঞী, বসুক্রপত্নী, শ্রী, লাক্ষী, মেধা ইত্যাদি। এঁরা সকলেই নারী ছিলেন, জীবজন্তুর নামে পরিচিত নারী নয়, এমন কথাই বা বলা যাবে কী করে? তবে একটা কথা বোঝা যায় যে, বেশ কিছু নারী বেদের অংশবিশেষ রচনা করেছিলেন এবং তাঁদের রচনা বেদে সংকলিত হওয়া মানে বৈদিক ঋষিমণ্ডলীতে স্বীকৃতিও পেয়েছিলেন।

তবে কি বেদের যুগে নারী শিক্ষিত হতে পারত? তাই বা কেমন করে বলি। সে যুগে পাঠ্য বলতে একমাত্র বেদ এবং বেদপাঠের যোগ্যতা ছিল উপনয়নে, আর নারীর ক্ষেত্রে উপনয়ন ছিল নিষিদ্ধ। তা হলে যাঁদের নাম পেলাম, তাঁরা বেদপাঠেই শুধু নয়, বেদ রচনাতেও অধিকারিণী ছিলেন এবং তাঁদের রচনা তৎকালীন ঋষিমণ্ডলীও গ্রহণ করতেন।

মেয়েদের উপনয়ন ছিল না, মনু বলেছেন নারীর পক্ষে বিবাহই উপনয়ন। তা হলে উপনয়ন না হলে বেদশিক্ষাই তো নিষিদ্ধ ছিল। তবু ঋগ্বেদে এতগুলি ঋষিকার নাম পাই, উপনিষদে গার্গী, আত্রেয়ী, মৈত্রেয়ী এবং আরো দু-একজনের নাম পাই যাঁরা বেদজ্ঞ বলেই বেদ নিয়ে আলোচনা করতেন। এ অধিকার তাঁরা পেলেন কোথায়?

এইখানে একটা সহজ বুদ্ধির সমাধান কাজে লাগে। সব সমাজেই বরাবরই একটা অলিখিত আইন ছিল। যেমন মনুর মতে নারীর পক্ষে বিবাহই বেদপাঠ তেমনই উলটোদিকে কিছু নারীর পক্ষে বেদপাঠই ছিল বিবাহ। এঁরা কারা? একটু ইঙ্গিত পাই কয়েকটি নামে গোধা (নিশ্চয়ই কুদর্শনা, ফলে বিবাহ হয়নি), হয়তো সর্পরাজ্ঞীও অমনই কেউ, রাত্রি (হয়তো কৃষ্ণবর্ণা, আর্যসমাজে উপেক্ষিত) দু-একজন কোনো কোনো পুরুষের নামেই পরিচিত যেমন বসুক্রপত্নী বা অগস্ত্ব্যস্বশা।

কল্পনা করা যায় কোনো মেয়ের শরীরে বিকৃতি আছে বিয়ের বাজারে অচল, পিতা আচার্য করুণাভরে মেয়েটিকে উপনয়ন দিলেন এবং ছাত্রদের পাশে বসিয়ে বিদ্যাদানও করলেন। কালে এ মেয়ে তো বেদজ্ঞ হল, হয়তো পরে বেদমন্ত্র রচনা করল, যেগুলি স্থান পেল সংহিতায়। কেউ বা অন্ধ, খঞ্জ, বিকৃতাঙ্গ, পঙ্গু হত, কেউ বা দুর্গন্ধযুক্ত বা বেশহীনা হত, ফলে সমাজে স্বাভাবিকভাবেই তাদের বিয়ে হত না। এমন মেয়েরা কী করবে? মনে হয় অনেক সময়েই তাদের পিতা তাদের শিক্ষায় অর্থাৎ বেদপাঠে অধিকার দিতেন। এঁদের মধ্যে যাঁরা বুদ্ধিমতী তাঁরা নিজেদের জ্ঞানবুদ্ধির স্বীকৃতি পেয়ে সমাজে মর্যাদা পেতেন।

গার্গী যাজ্ঞবল্ক্যের সঙ্গে যখন বেদবিষয়ে তর্কে যাজ্ঞবল্ক্যকে প্রায় কোণঠাসা করেছেন তখন ক্রুদ্ধ যাজ্ঞবল্ক্য তাঁকে শাপ দিলেন 'তোমার মাথা খসে পড়বে।' অর্থাৎ যাজ্ঞবল্ক্যকে তর্কে বিপর্যস্ত করার মতো বিদ্যা ও বুদ্ধি গার্গীর ছিল। এমন আরো বেশ কিছু মেয়ে নিশ্চয়ই ছিল যারা শিক্ষার অধিকার পেয়ে, চর্চা করে বেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন।

ক্রমে ক্রমে অন্যান্য নানা বিদ্যা সমাজে দেখা দিল এবং কিছু কিছু নারীও সে বিদ্যায় দক্ষ হয়ে কোনো কোনো পুরুষকে তর্কে পরাস্ত করেছেন।

এঁরা সংখ্যায় কম, অতএব ব্যতিক্রমী; কিন্তু এঁরা ছিলেন। মনে হয় অধিকাংশ স্থলে এঁদের শারীরিক ত্রুটি বা মানসিক বিকৃতির জন্যে এবং কখনো-বা বালবিধবা হওয়ার জন্য এঁরা এঁদের পিতার কাছে করুণার পাত্রী হয়ে, সমাজে অস্বীকৃত অধিকার পেয়েছিলেন।

প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে শিক্ষার কোনো পথই খোলা ছিল না এঁদের জন্য। পুরুষ যেমন উপনয়নের বেদাদি শিক্ষায় সমাজস্বীকৃত অধিকার পেতেন, নারীর জন্যে তেমন কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। কিছু কিছু দয়াপরবশ আত্মীয় বা গুরু বা ঋষি নিজের দায়িত্বে সম্ভবত এঁদের উপনয়নের ব্যবস্থা করে এদের মনের পুষ্টির একটা ব্যবস্থা করে দিতেন।
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

দ্রৌপদী - সুকুমারী ভট্টাচার্য

amarboi
দ্রৌপদী
সুকুমারী ভট্টাচার্য

বহুলপ্রচারিত একটি শ্লোকে শুনি, 'অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তী, তারা, মন্দোদরী তথা। পঞ্চ কন্যা: স্মরেন্নিত্যং মহাপাতক নাশনম।। শ্লোকটিতে সব কটি নারীকেই কন্যা বলা হয়েছে। যদিও কন্যা শব্দটি কুমারী সম্বন্ধে প্রয়োগ বেশি। ওই পাঁচজন কেউই কুমারী নয়; কিন্তু প্রত্যেকেই দ্বিচারিণী; কেউ স্বেচ্ছায় কেউ বা ঊর্ধ্বতন কারো নির্দেশে।

পঞ্চপাণ্ডব যখন দ্রুপদ রাজার সভা থেকে দ্রৌপদীকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন তখন, স্নানের ঘরে কুন্তী, ছেলেরা বললেন, দেখো মা কী এনেছি। কুন্তী ভাবলেন মূল্যবান বা স্বাদু বস্তু এনেছেন বুঝি, ঘরের ভেতর থেকে নির্দেশ দিলেন ''যা এনেছ সকলে সমান ভাগে ভাগ করে নাও।''

একসময় দ্রুপদ রাজা দ্রোণের কাছে যুদ্ধে পরাজিত হলে 'যাজ' ও 'উপযাজ' নামে দুই পুরোহিতের শরণাগত হয়ে রাজা বলেন আমাকে এমন পুত্র কন্যা দাও যারা দ্রোণের মৃত্যু ঘটাতে পারবে। দুই পুরোহিত যজ্ঞ করলে প্রথমে অস্ত্র-মণ্ডিত সুসজ্জিত অত্যন্ত সুদর্শন এক পুরুষ যজ্ঞাগ্নি থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি ধৃষ্টদ্যুম্ন। পরে বেরিয়ে এলেন যিনি তিনি মনোরম এক উজ্জ্বল কন্যা দ্রৌপদী। ধীরে ধীরে এই দুই তরুণ তরুণী দ্রুপদ রাজার কাছে বাড়তে লাগলেন। পুত্রটি বসুবিদ্যা ও অন্যান্য অস্ত্র শিক্ষায় বিভূষিত শিক্ষিত হয়ে উঠলেন।

রূপে গুণে বিভূষিত কন্যাটির বীর্যশুল্কা হবার জন্য দ্রুপদ এক মহতী সভার আয়োজন করলেন। পাণ্ডবরা দ্রুপদ রাজ্যের কাছাকাছি ছিলেন, তাঁরা ওই সভায় যোগদান করার উদ্দেশ্যে সেখানে গেলেন। অর্জুন অপরাজেয় ধনুর্ধর, তাঁর জানাই আছে যে বীর্যশুক্লা দ্রৌপদী তাঁরই হবে। এদিকে অর্জুনকে দেখে পর্যন্ত দ্রৌপদী উদভাসিত। বড়ো মোটা সাদা ফুলের একটি গোড়ে মালা দু-হাতে স্মিতহাস্যে ধরে ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন অর্জুনের দিকে। মুখে শুভ্র স্মিত হাস্য, চোখে বিজয়িনীর উজ্জ্বল দৃষ্টি। মাল্যদান করে দ্রৌপদী ও অর্জুন ধীরে ধীরে রাজসভা থেকে বেরিয়ে এলেন সঙ্গে এলেন আর চার ভাই। বাড়ি এসে মাকে এই মূল্যবান প্রাপ্তি নিবেদন করলেন; কুন্তী স্নান করতে করতে বললেন, 'যা এনেছ পাঁচভাই সমান ভাগে ভাগ করে নাও'। বলা বাহুল্য, এখনও যদিও উত্তর-পূর্ব ভারতে কোনো অঞ্চলে বাড়ির এক বা দুই পুত্রের একটিমাত্র স্ত্রী তখনও তাই ছিল। কিন্তু দ্রুপদ রাজের অমন অসামান্য কন্যার পাঁচ স্বামী হবে একথা দ্রুপদরাজ মানতে পারেননি, এজন্য যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ বাক বিতণ্ডা চলে; অবশেষে ব্যাস কুন্তীর কথার নির্দেশ যাতে মিথ্যা না হয় সেজন্যে কুন্তীর নির্দেশ অবশ্য পালনীয় বললেন।

এর মধ্যে হস্তিনাপুর বা রাজসভাতেও এই অচলিত রীতির পুনরুভ্যুত্থান নিয়ে একপ্রস্থ তর্ক হয়ে গেছে। ধৃতরাষ্ট্র কর্ণ, বিদুর, দ্রোণ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞ মহারথীরা অচলিত রীতির বিরুদ্ধে তর্ক করলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এঁরা দ্রৌপদীর পঞ্চস্বামিত্ব মেনে নিলেন।

দ্রৌপদীর একার ওপর তাঁর পরিবার ও আগন্তুক অতিথিদের আতিথ্য দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না বলে একদিন সূর্য দেখা দিয়ে বৃহৎ একটি তামার থালা তাঁকে দিয়ে বলেন, অতিথি এলে এই থালাখানি উচ্চে ধরে আমাকে স্মরণ করলেই এটা সুখাদ্যে ভরে উঠবে। এতে দ্রৌপদীর কার্যভার অনেকটাই কমে গেল।

সেই মতোই চলতে লাগল কুন্তী, পাণ্ডবগণ ও দ্রৌপদীর সংসার। একে একে দ্রৌপদী পাঁচটি পুত্রের জননী হলেন— প্রতিবিন্ধ্য, সুতসোম, শ্রুতকর্ম্মা, শতানীক ও শ্রুতসেন।

দ্রৌপদীর পাঁচ স্বামী আর একজন সখা— কৃষ্ণ, দ্রৌপদীর সখা ছিলেন। অনাত্মীয় নারী পুরুষের এধরনের সখ্য শুধু বিরল নয়, অজ্ঞাতই ছিল।

দৈনন্দিন জীবনে খুচরো বিপর্যয় তো লেগেই ছিল, কিন্তু দ্রৌপদী তাতে বিচলিত না হয়ে সমাধান করতেন। সংসার চলছিল শান্ত লয়ে।

কতকটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে নেবার পরে পাণ্ডবরা পরামর্শ করে দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে পড়েন এবং সফলও হন। ফলে তাঁরা এবার রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেন, এ যজ্ঞে তাঁরা কৃষ্ণকে প্রধানের আসনে অভিষিক্ত করেন। রাজসূয় যজ্ঞে যজ্ঞসম্পাদনকারী রাজা যজ্ঞ শেষে রাজাদের মধ্যে প্রধান বলে গণ্য হত। তবে কৌরবপক্ষ এর মধ্যে এক দ্যূতক্রীড়ার আয়োজন করেন। যুধিষ্ঠিরের নেশা দ্যূতক্রীড়া কিন্তু যোগ্যতা কম। তা একে একে সব সম্পত্তি ও চার ভাই খেলায় পণ রেখে হারলেন। বাকি ছিলেন দ্রৌপদী। মতিভ্রষ্ট যুধিষ্ঠির বাজি রেখে তাঁকেও হারলেন। দ্যুতসভা থেকে হুকুম দেওয়া হল দ্রৌপদীকে সভায় আনা হোক, দুঃশাসন পাণ্ডব প্রাসাদে গিয়ে দ্রৌপদীকে হিড়হিড় করে টেনে আনলেন। রাজকন্যা রাজকুলবধূকে রজস্বলা অবস্থায় প্রকাশ্য টেনে আনা হল। তাঁর সমস্ত মিনতি অগ্রাহ্য করে তাঁর পরনের শাড়িটা ক্রমাগত টানতে লাগলে, কিন্তু ছাড়িয়ে নেওয়া শাড়ির স্থানে তৎক্ষণাৎ দেখা দিল নতুন এক বস্ত্র— ফলে দ্রৌপদীকে বিবসনা করা গেল না।

কোনো সংস্করণে কৃষ্ণ স্বয়ং উপস্থিত থেকে বস্ত্রহরণ নিবারণ করেন। দ্রৌপদীর সখা কৃষ্ণ সখীর বিপদে অলৌকিক ক্ষমতা দ্বারা, তাঁর লজ্জানিবারণ করলেন, এইটেই পণ্ডিতগণের সুচিন্তিত অভিমত। যখন পাণ্ডবরা অজ্ঞাতবাসে ছিলেন তখন এক কামুক কীচকের নজর পড়ল দ্রৌপদীর ওপরে। তার হাত থেকে বাঁচবার জন্যে দ্রৌপদী গেলেন ভীমের কাছে। সব শুনে ভীম লুকিয়ে থেকে কীচককে সম্মুখ সমরে হারিয়ে মেরে ফেললেন। পরে তাঁর অনুচররা এসে ভীমের সঙ্গে যুদ্ধ করে হেরে গিয়ে আহত হয়ে চলে গেলেন।

বনবাসকালে জয়দ্রথ রাক্ষস দ্রৌপদীকে নিয়ে পালিয়েছিলেন পাণ্ডবরা তাঁকে ফিরিয়ে আনেন। অর্থাৎ স্বামী শ্বাশুড়ির কাছে সম্মানের আসনে থাকলেও নানা হীন জাতি ও রাক্ষসের দ্বারা দ্রৌপদী আক্রান্ত হয়েছিলেন; তাদের কাছে তিনি কেবলমাত্র লোভনীয় নারী, রাক্ষসের কাছে খাদ্যও বটে। বলা বাহুল্য এইসব আতঙ্ক ও অবমাননায় দ্রৌপদী বিচলিত হলেও স্থৈর্য হারাননি।

অপমানিত হয়েছিলেন আপন জ্যেষ্ঠ স্বামী যুধিষ্ঠিরের কাছে যিনি এই অলোকসামান্য নারীকে পণ্য বস্তুর মতো পণ রেখেছিলেন, নারীর চূড়ান্ত অপমান করেছিলেন। প্রথমত দ্রৌপদী রূপেগুণে অদ্বিতীয়া, দ্বিতীয়ত তিনি একা যুধিষ্ঠিরের স্ত্রী ছিলেন না, অপর চার ভাইয়ের মত না নিয়ে দ্রৌপদীকে পণ রাখার কোনো অধিকারই তাঁর ছিল না এবং এই দুষ্কর্মের জন্য দ্রৌপদীর কাছে ক্ষমা চাওয়াও তিনি দরকার মনে করেননি। পাঁচ রাজপুত্রের একক ভার্যা হয়েও যে সু-উচ্চ সম্মান তাঁর একান্ত প্রাপ্য ছিল তা-ও তিনি পাননি এবং পঞ্চপাণ্ডব তাঁকে বধূ রূপেই দেখতে চেয়েছিলেন ও পেয়েছিলেন। দ্রৌপদী, তাদের এত ভালো বুঝতেন যে যেচে মান কেঁদে সোহাগকে তিনি তাঁর যথার্থ মর্যাদার নীচে মনে করতেন। এখন কত অলক্ষিত অস্বীকৃত মর্যাদায় ভূষিত হয়ে তিনি বেণুদণ্ডের মতো উচ্চ থেকে পাঁচ বিচিত্র স্বামীর বিভিন্ন প্রকাশে বিচলিত না হয়ে আত্মগৌরবের সঙ্গে জীবনের পথ অতিক্রম করে চলেছিলেন।

দৈনন্দিন জীবনে, দ্রৌপদীর ওপরে যে চাপগুলি পড়েছিল সুদীর্ঘকাল ধরে ও অরণ্যবাসের সময়েও, এবং যেভাবে তিনি অবলীলাক্রমে সেগুলির সম্মুখীন হয়ে অতিক্রম করেছিলেন তার কোনো তুলনা নেই।

এক সময়ে অন্য রাজবাড়িতে পাঁচ ভাই ভিন্ন ভিন্ন নামে বিভিন্ন বৃত্তি নিয়ে বেশ কিছুকাল কাটিয়েছিলেন। সেখানে দ্রৌপদী সৈরিন্ধ্রী। এমনিতেই তাঁর রান্নার সুখ্যাতি সকলেই জানত, ওই রাজবাড়িতেও তাঁর এই যশ সকলে জানত এবং তাঁর সমাদর ছড়িয়ে গিয়েছিল। সেখানে দ্রৌপদী পাঁচ স্বামীর কারো কারো দেখা পেতেন লুকিয়ে চুরিয়ে। মনে একটা সান্ত্বনা ছিল যে স্বামীরা তাঁর মর্যাদা রক্ষা করবেন। করেওছিলেন। অজ্ঞাতবাসের মধ্যেই কীচক তাঁকে কামনা করবেন জেনে দ্রৌপদী গোপনে ভীমকে সে কথা জানায়। মহাবলশালী ভীম কীচক ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গকে বধ করে দ্রৌপদীকে বিপদ মুক্ত করেন। দিন ফুরোলে পাণ্ডবরা এসে তাঁদের যথার্থ পরিচয় দিলেন। দ্রৌপদীও। এমন একটি মহিমান্বিত পরিবারের সান্নিধ্যে ছিলেন বলে রাজা মনে ও প্রকাশ্যেই গৌরব ও আনন্দ প্রকাশ করেন। মহিষী বিশেষভাবে দ্রৌপদীকে আশীর্বাদ করলেন।

তারপর যুদ্ধ। প্রতিদিনই আত্মীয়বিয়োগের খবর পেতেন দ্রৌপদী। তার পাঁচ স্বামী ও পুত্ররা যুদ্ধে আহত হচ্ছেন এ সংবাদ রোজই পেতে হচ্ছে তাঁকে। এতে তাঁর মুক্তি নেই। প্রচণ্ড ভারাক্রান্ত হৃদয়ে দিন কাটছে তাঁর, অথচ এ ভার নামাবার স্থান নেই দ্রৌপদীর। কুন্তীর মতো তিনিও যথেষ্ট কষ্ট পাচ্ছেন কিন্তু অন্তঃপুরে নিভৃত বিষাদদিগ্ধ চিত্তে দিন কাটাচ্ছেন।

একদিন কৃষ্ণের স্ত্রী সত্যভামা এলেন দ্রৌপদীর সঙ্গে গল্প করতে। প্রশ্ন একটাই : আমার একটিমাত্র স্বামী, তাকে তুষ্ট রাখতে পারি না বহু পরিশ্রম করেও আর তোমার দেখছি পাঁচ-পাঁচটা স্বামী একজন শাশুড়ি, এঁরা সবাই তোমার গুণে পঞ্চমুখ। তাই জিজ্ঞাসা করতে এসেছি, কোন গুণী বা জ্যোতিষীর দেওয়া কবচ, মাদুলি ব্যবহার করে তুমি এই অসাধ্য সাধন করে চলেছ আমাকে একটু সন্ধান দিয়ো, আমার সব শ্রম সার্থক হবে। নেহাতই অপারগ হয়ে দ্রৌপদী বললেন, ''তুমি বিশ্বাস করো, ভাই, আমি ঋষি গুণিনের কোনো সাহায্য কখনো নিইনি স্বামীদের তুষ্ট রাখতে।'' ''তবে কোন উপায়ে তুমি এই অসাধ্য সাধন করে চলেছ, বছরের পর বছর?'' ''আমার কলাকৌশল শুনবে, সখি?'' ''বলো, আমি উৎকণ্ঠ হয়ে আছি দীর্ঘকাল ধরে তোমার কাছে এই কথাটি শুনব বলে।'' ''তবে শোনো সত্যভামা। আমার পাঁচটি স্বামীর ইচ্ছে-অনিচ্ছে, রুচি, অরুচি লক্ষ করে জেনেছি কে কী পছন্দ করে বা করে না। কিন্তু আমার নিয়ম হল স্বামীরা বা শাশুড়ি জাগবার অনেক আগেই আমি উঠে ঘরদোর পরিষ্কার করি তারপর প্রাতঃকৃত্য স্নানাদি সেরে বয়স ও মর্যাদা অনুসারে গুরুজনদের অভিবাদন করে সাধ্যমতো যত্ন ও নিষ্ঠা দিয়ে সংসারের কাজে প্রবৃত্ত হই। সব কাজ সেরে ওঁরা ঘুমোতে গেলে পরে আমি শুতে যাই। দেখেছি এতেই ওঁরা সকলেই আমার ওপরে প্রসন্ন থাকেন। এ ছাড়া আমি আর কোনো দৈব, তান্ত্রিক, গুণী বা ঋষির দ্বারস্থ হইনি। কারণ তার কোনো প্রয়োজনই হয়নি।'' সত্যভামা দ্রৌপদীর কথা বিশ্বাস করলেন। পরে দুই সখী যার যার কাজে চলে গেলেন।

ব্যবহারিক জীবনে এই-ই ছিল দ্রৌপদীর সাধনা, সমস্ত শক্তি ইচ্ছা ও নিষ্ঠা নিয়ে একাগ্রচিত্তে দৈনন্দিন কাজকর্ম সাঙ্গ করতেন। এ ছাড়া কোনো ব্যবহারিক, রাজনৈতিক সমস্যা দেখা দিলেও পাণ্ডবরা দ্রৌপদীর সঙ্গে পরামর্শ করতেন। এমনকী যুধিষ্ঠিরও দ্রৌপদীর সঙ্গে ধর্মনীতি ও রাজনীতি বিষয়ে বাক্যালাপ উত্তর-প্রত্যুত্তর করতেন। অর্থাৎ সংসার প্রতিপালনের জন্য যেসব ক্ষমতার প্রয়োজন, শারীরিক শক্তি ও মানসিক শক্তি তাঁর তা ছিল। উপরন্তু ধর্ম ও শাস্ত্রবিষয়ক চিন্তা ও আলাপের ক্ষমতাও তাঁর ছিল। এই সমস্ত শক্তি বুদ্ধি ও জ্ঞান একটি আধারে বিধৃত ছিল বলে চারপাশের লোকেরা যথেষ্ট শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমের চোখে তাঁকে দেখতেন। নারী বলে হীন মনে করতেন না, বা তাঁর সঙ্গে তর্ক করতে বিমুখ হতেন না। নিজের অন্তনির্হিত গুণেই দ্রৌপদী একজন বিশিষ্ট নাগরিকের সম্মান পেয়েছিলেন। এ তো গেল দ্রৌপদীর বাইরের দিক। তাঁর প্রকৃত সমস্যা অন্তরে এবং তাঁর প্রকৃত মহিমাও অন্তরে। তাঁর সমস্যা তাঁর একারই, কারণ সমাজের অন্য মেয়েদের প্রত্যেকের একটি করে স্বামী যাঁর যথাযথ সেবা বা দেখাশোনা করা অপেক্ষাকৃত সহজ। কিন্তু পাঁচজন পাঁচটি পৃথক ব্যক্তি, তাঁদের প্রত্যেকের রুচি ও বোধ পৃথক। সকলকে পৃথকভাবে লক্ষ করে জানতে হয় কী পছন্দ ও অপছন্দ করে। প্রত্যেককে পৃথকভাবে প্রসন্ন রাখা অনেক সহজ কাজ। যাঁর সঙ্গে যে বছর কাটাতে হবে, তাঁকে সম্পূর্ণভাবে জেনে নিলে বাকি বছরগুলো চালানো সহজ।

এ তো হল দ্রৌপদীর বাইরে অর্থাৎ পারিবারিক জীবনের অপেক্ষাকৃত সহজ সমস্যা ও সংকট। প্রকৃত যেখানে তাঁর যন্ত্রণা সে হল অর্জুনকে নিয়ে। বিয়ের দিন যে তরুণীর মুখে মাখানো ছিল পরিতৃপ্ত প্রেমের আনন্দে উজ্জ্বল হাসি, দু-হাতে ধরা ছিল একটি স্থুল শ্বেতপুষ্পের মালা ও বীর্যশুল্কা নারীর গর্ব ও গৌরবের স্মিত হাস্যটি। সভার মধ্যে এই সুন্দরী তরুণীটি ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে এসে হাতের মালাটি পরিয়ে দিলেন। মনে জানলেন চির কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নে দেখা অর্জুনপত্নী হয়ে তাঁর কুমারীজীবনের আশা, আকাঙ্ক্ষা এতদিনে পূর্ণ হল: আজ থেকে দ্রৌপদী অজুর্নের স্ত্রী। কিন্তু শ্রেয়াংসি বহুবিঘ্নানি, বিঘ্ন সেদিন থেকে শুরু হল। ছেলেরা কুন্তীকে বললেন দুর্মূল্য বস্তু তাঁরা এনেছেন। ব্যক্তি 'না বলে' বস্তু বলাতে নেপথ্য থেকে কুন্তীর নির্দেশ: যা এনেছ পাঁচ ভাই সমানভাগে ভাগ করে নাও। পরিতৃপ্ত এক পত্নীত্বের আনন্দ গর্বগৌরব সব নিষ্প্রভ, ম্লান হয় দ্রৌপদীর জীবনে।

যদিও দ্রৌপদী একনিষ্ঠভাবে অর্জুনকেই ভালোবেসে বিবাহের মাল্যদান করেছিলেন, আজ কুন্তীর এই প্রত্যাদেশে তাঁর সেই অতিযত্নে গাঁথা বরণমালাটি পাঁচখণ্ডে বিভক্ত হয়ে তার সৌন্দর্য ও মহিমা হারাল। আর অর্জুনের প্রতি তাঁর একনিষ্ঠতাও সমস্ত মহিমা হারাল। আজ থেকে তিনি পঞ্চপাণ্ডবের স্ত্রী। এমন নারীর কর্তব্য নির্ধারিত হল প্রত্যেক পাণ্ডবের সঙ্গে এক বৎসর করে থাকতে হবে। সম্ভবত সন্তানের পিতৃত্ব নিরূপণ করার জন্য। কর্তব্যে শিথিল ছিলেন না, সেদিক থেকে কোনো ত্রুটি ছিল না তাঁর। যন্ত্রণা ছিল অতি সংগোপনে চিত্তের কেন্দ্রস্থলে। এঁদের বিয়ের অল্পকালের মধ্যেই তাঁর প্রিয় স্বামী অর্জুন নাগরাজকন্যা উলুপী ও মণিপুর রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদাকে বিবাহ করেন। একনিষ্ঠ দ্রৌপদীর দুটি সপত্নী হল।

যে প্রেমে তিনি একান্তবর্তী সেখানেই আরো দুই রাজকন্যা রাজসপত্নী হওয়াতে দ্রৌপদীর গৌরব খানিকটা ম্লান হল বই কী। কিন্তু দ্রৌপদী কথায় বা কাজে এ নিয়ে কোনো ক্ষোভ জানাননি। নিভৃতে একা অর্জুনকে কিছু বলে থাকলেও তার কোনো প্রমাণ নেই। তবে মনে হয় তাও বলেননি, কারণ তাঁর অহংকার। দ্রুপদের রাজসভা থেকে বাড়ি ফিরে অন্তরালে থেকে কুন্তীর নির্দেশ কী শোনার আগে পর্যন্ত তাঁর একজীবন, যা মনে পূর্বপ্রস্তুতি থেকে তিনি নিজেকে অর্জুনের একমাত্র প্রিয়তমা পত্নী ভেবে এসেছেন। রাজসভা থেকে বাড়ি এসেও কুন্তীর আদেশ শোনা পর্যন্ত তিনি লজ্জারুণা পরিতৃপ্তা অজুর্নের পত্নী ছিলেন। দ্রুপদ, তাঁর পুত্র এবং সম্ভবত অন্যদের কথার নিষ্পত্তি হবার পর যখন দ্রৌপদী নিশ্চিতভাবে জানালেন যে তিনি পাণ্ডবদের পাঁচ ভাইয়ের একমাত্র পত্নী, সেই হিসেবেই অর্জুনের এক পঞ্চমাংশ পত্নী এবং তিনি ছাড়া আরো দুই রাজকন্যাও তাঁর সপত্নী; তখন বিশেষ করে অর্জুনের পত্নী হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে তিনি আর আমল দিলেন না। 'সত্য যে কঠিন/কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।'

এইটিতেই দ্রৌপদী প্রেমে একান্ত একা হয়ে গেলেন। যে-অন্তরে অর্জুনের একাধিপত্য ছিল, তাই রইল; কিন্তু এ একাধিপত্য বিবাহের বাতাবরণে মণ্ডিত। এর মধ্যে তাঁর অন্তরের গভীরতম স্থানে অর্জুনের প্রতি ঐকান্তিক যে প্রেম অনির্বাণ দীপশিখার মতো জ্বলে রইল আমৃত্যু, যার শুধু দীপ্তি নেই, জ্বলন্ত বহ্নিশিখার দাহিকা জ্বালা আছে, সেই অনির্বাণ প্রেমের শিখাটির দীপ্তি ও জ্বালায় সারাজীবনই তিনি দীপান্বিতা ও দহ্যমানা হয়ে রইলেন।

দ্রৌপদীর একান্ত নিজস্ব সময় সম্ভবত খুব কমই ছিল। স্বামীদের কেউ বাইরে গেলে সেই সময়টুকু তাঁর একান্ত নিজস্ব, হয়তো একান্তে কোথাও বসে নিজের অন্তরের দীপ্ত শিখাটির জ্যোতি ও তাপ অনুভব করতেন। এই ছিল তাঁর গোপন বিলাস। যখন অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকতেন, তখনও তাঁর অন্তরের বেদনাদিগ্ধ উপলব্ধি তাঁর জীবনে এক ধরনের মহিমা সৃষ্টি করত। তিনি নিজে হয়তো সর্বদা সচেতনভাবে তা উপলব্ধি করতেন না। কিন্তু অন্তরের একান্ত গভীরে ওই অনির্বাণ প্রজ্বলন্ত বহ্নিশিখাটি তাঁর চতুষ্পার্শ্বে যে জ্যোতির্বলয় সৃষ্টি করেছিল তা তাঁকে অনন্যা করে রেখেছিল।

দ্রৌপদী অনন্যা তাঁর অপরিমেয় বেদনায়। বহির্বিশ্বে তাঁর এই নিরন্তর বেদনার কথা কেউ জানতে পারেনি। জানতেন হয়তো যুধিষ্ঠির। মহাপ্রস্থানের পথে প্রথম ভূপতিত হলেন দ্রৌপদী। যুধিষ্ঠির ভাইদের বললেন, এঁর পাপ হল ইনি অর্জুনকে সর্বাধিক ভালোবাসতেন। কিন্তু এ অতলান্ত সুগভীর প্রেমের প্রত্যাখানের যন্ত্রণাই যে তাঁকে একক মহিমা দান করেছে এবং তিনি যে সে প্রত্যাখ্যানকে অন্তরে নৈবেদ্যের মতো স্থান দিয়ে অহরহ দাহের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করলেন একথা যুধিষ্ঠিরের উক্তির আগে কেউ জানতেও পারেনি। একনিষ্ঠ প্রেমের আসনে যে নিরন্তর যন্ত্রণা সেইটি দ্রৌপদীকে অনন্য এক বিরহিণীর মাহাত্ম্যে ভূষিত করেছিল, কেই বা তা জানত? এই যন্ত্রণাই দ্রৌপদীকে অনন্যা করে তুলেছিল।

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সুকুমারী ভট্টাচার্য রচনাসংগ্রহ

সুকুমারী ভট্টাচার্য রচনাসংগ্রহ
সুকুমারী ভট্টাচার্য রচনাসংগ্রহ

সুকুমারী ভট্টাচার্য
রোমিলা থাপার

সুকুমারী ভট্টাচার্য তাঁর সমসাময়িক ইন্ডোলজিস্টদের মধ্যে একজন অন্যতম অগ্রগণ্য, যিনি তাঁর বিভিন্ন লেখার মাধ্যমে ভারতীয় পৌরাণিক আখ্যানগুলির (Mythology) ওপর এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করেছেন। আমি এই ব্যাপারে তাঁর লেখা The Indian Theogony বইটির কথা উল্লেখ করতে চাই, যা আমি মনে করি তাঁর গবেষণার এক নতুন ও সুন্দর উদাহরণ। ইংরেজী ও সংস্কৃত দুই ভাষাতেই তাঁর শিক্ষা এবং ভারতীয় ও ইউরোপীয়ান পৌরাণিক কথাগুলির সম্বন্ধে তাঁর প্রভূত জ্ঞান তাঁকে এই বিষয়ে তুলনামূলক স্টাডি করতে সাহায্য করেছিল।

সুকুমারী ভট্টাচার্য খালি বিভিন্ন সংস্কৃতির পৌরাণিক আখ্যানগুলির পাশাপাশি তুলনা করেই থেমে যান নি, তিনি এর থেকেও দু’পা এগিয়ে গেছেন। তার প্রথমটা হচ্ছে কোন প্রসঙ্গে (context) আখ্যানটি ঘটেছিল এবং সেটি কি ভাবে সেই প্রসঙ্গের সাথে যুক্ত। প্রসঙ্গটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেটাই পৌরাণিক আখ্যানগুলির আঁতুড় ঘর। এর অর্থ আখ্যানটি বর্তমান আকারে কি ভাবে এলো, তার গভীর নিরীক্ষা। আর অন্যটা হচ্ছে যে পৌরাণিক আখ্যানটি সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে কি না, আর হয়ে থাকলে কতটা ও কিভাবে।

তুলনামূলক স্টাডিতে এর অর্থ দুই বা ততোধিক প্রসঙ্গগুলিকে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা এবং বিচার করা যে তারা এক এক নিরীক্ষিত সমাজে এক এক রকম কিনা। অথবা এক ধরণের প্রসঙ্গ অনুরূপ পৌরাণিক আখ্যানের জন্ম দিয়েছে কিনা। ইন্ডো-ইউরোপীয়ান ভাষাদের আখ্যানগুলির তুলনামূলক স্টাডিতে কিছু কিছু দেবতা একই রকম থাকেন, কিন্তু মাঝে মাঝে তাঁদের ব্যবহার এক সমাজ থেকে অন্য সমাজে ভিন্ন ভিন্ন। এটা তুলনামূলক স্টাডিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। যেখানে যেখানে মিল থাকে সেই জায়গাগুলি বিভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কেউ কেউ যুক্তি দিয়েছেন যে মানুষের ধ্যান-ধারণা গুলি ছড়িয়ে পড়ার জন্য (diffusion of ideas) পৌরাণিক আখ্যানগুলির মধ্যে মিল দেখা গেছে। অন্যরা বলেছেন সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রসঙ্গগুলির মধ্যে সামঞ্জস্য থাকলে আখ্যানগুলির মধ্যে মিল থাকাই স্বাভাবিক। আবার অন্যরা যুক্তি দেখান যে এক সমষ্টিগত অচেতনতা (collective unconscious) এই ধরণের আখ্যানগুলির পরিবেশ তৈরী করে দেয়। যুক্তি বা ব্যাখ্যা যাই হোক, এটা ঠিক যে পৌরাণিক আখ্যানগুলি ও সমাজের মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে।

অনেক বিদ্বজ্জন ইন্ডো-ইউরোপীয়ান ও তুলনামূলক পৌরাণিক আখ্যানের ওপরে কাজ করেছেন, যেমন Stig Wikender, Mircea Eliade এবং Claude Leve-Strauss. সুকুমারী ভট্টাচার্য শেষোক্ত দুজনের কাজ তাঁর নিজের গবেষণা ও বিশ্লেষণের জন্য ব্যবহার করেছেন। পৌরাণিক আখ্যানগুলিকে দেখানো হয়েছে সমাজের মর্মস্থলের অভিজ্ঞতাগুলির অভিক্ষেপ হিসেবে, অথবা সাধারণ ভাবে সামাজিক অনুমান হিসেবে। অন্যরা তর্ক পেড়ে বলেন, ওসব নিছক স্বকপোল-কল্পনা, পুরোপুরি অন্য জগতের গল্প, আর এই কাল্পনিক জগতটা বাস্তবের সাথে ভারসাম্য রাখার জন্য জরুরী। পৌরাণিক আখ্যানগুলি সাধারণত দেবতা ও মানুষদের নিয়েই, যদিও তারা কখনো স্বতন্ত্র স্তরে থাকেন আবার কখনো মিলে-জুলে যান। কখনো দেবতারা মানব সমাজের আদর্শ উদাহরণ, আবার কখনো তাঁদের দেখা যায় মানব সমাজের অযোগ্য কাজ করতে। পরবর্তী ক্ষেত্রে দেবতাদের কাজ-কারবার মানুষের কাজের ও ব্যবহারের সীমারেখা টেনে দেয়।

সুকুমারী ভট্টাচার্য পৌরাণিক আখ্যানগুলির অন্য আর একটা দিক সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন – সেটা হল এই আখ্যানগুলি স্থির বা জড় নয়। তাদেরও একটা নিজস্ব জীবন আছে এবং মূল কিছু বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তিত রেখেও কিছু কিছু আখ্যান সময়ের সাথে বদলে যায়। তিনি দেখিয়েছেন বৈদিক দেবতা ও আখ্যানগুলি মহাভারত ও রামায়ণের উত্তরভাগে বদলাতে শুরু করে, যা আরো বেশী বদলে যায় পুরাণগুলিতে। কিছু পুরোনো দেবতাদের ব্যক্তিত্ব বদলে যায় আর কিছু নতুন দেবতার দেখা পাওয়া যায়। পুরাতন বৈদিক দেবতারা স্পষ্টত গৌণ হয়ে পড়েন বা আস্তে আস্তে পশ্চাদপটে চলে যান। বৈদিক মিত্র-বরুণ, অগ্নি ও ইন্দ্র রাস্তা ছেড়ে দেন দুই প্রভাবশালী দেবতা, বিষ্ণু ও শিবকে।

নব্য দেবতারা দুটো মূল নীতি চিত্রিত করেন। ব্রহ্মা সৃষ্টি করার পর বিষ্ণু সেই সৃষ্টি পালন করেন, শিবকে যুক্ত করা হয় সৃষ্টিকে ধ্বংসের সাথে। সুকুমারী ভট্টাচার্য বলছেন যে এই দ্বিত্ব (duality) পরস্পরবিরোধী হলেও কিন্তু এটা বৈষ্ণব ও শৈবদের আচার-বিশ্বাসের একটা দিক। বৈদিক যজ্ঞ, যা ছিল বৈদিক উপাসনার প্রধান অঙ্গ, মন্দিরে মূর্তিপূজার দ্বারা প্রতিস্থাপিত হল। পূজা করতে মাত্র একজন বা দুজন পুরোহিতের প্রয়োজন হয়, বৈদিক যজ্ঞানুষ্ঠানের মতো ষোল জনের নয়। প্রার্থনা ও মন্ত্রগুলিও আলাদা। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও বদলে যায় এবং শূদ্র ও নারী, যারা আগে যাগ-যজ্ঞের অনুষ্ঠান থেকে সম্পূর্ণ বহিষ্কৃত ছিল, তাদের অল্পস্বল্প জায়গা করে দেওয়া হয় - যদিও পুরোপুরিভাবে নয়, কারণ আমরা জানি যে অনেক মন্দির ও জনগোষ্ঠীরা সম্পূর্ণ বাইরে রাখত নিচু জাতের মানুষ ও নারীদের, যাদের নিজেদের উপস্থিতি বহাল রাখতে অনেক কষ্ট করতে হত। কিন্তু নতুন প্রকারের ধর্ম নারীদের অনেক বেশী গুরুত্ব দেয় এবং দুর্গা ও লক্ষ্মী এই দেবতাগনের কেন্দ্রের দুই দেবী।

এই ছিল নতুন ধারনার এক হিন্দুধর্মের শুরু। সুকুমারী ভট্টাচার্য একেই আমাদের জানা-চেনা ও আচরিত হিন্দু ধর্ম বলেছেন আর অন্য লেখকরা একে পৌরাণিক হিন্দুধর্ম (Puranic Hinduism) বলেছেন, বৈদিক হিন্দুধর্ম থেকে আলাদা করে দেখানোর জন্য। এতে ‘ভক্তি’র ধারনাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, অহিংসার দিকে কিছুটা জোর, আর তার সাথে ‘কর্ম’ ও ‘সংসার’-এর মতবাদ - এই সমস্তই এই ধর্মের বিশ্বাস এবং উপাসনার বৈশিষ্ট্য।

আমাদের কাছে প্রশ্ন অনেক। সুকুমারী ভট্টাচার্য কিছু প্রশ্ন তুলেছেন ও তার সাথে অন্যদের উৎসাহ দিয়েছেন নিহিত অনুল্লেখিত প্রশ্নগুলি তোলবার জন্য। পৌরাণিক হিন্দুধর্ম কি অ-বৈদিক দেবদেবীদের উপাসনার পুনরুত্থান, যারা এতদিন গুরুত্ব না পেয়ে অলক্ষ্যে ছিল? অহিংসার ওপর নতুন করে জোর দেওয়া থেকে কি ধারনা হয় যে এতে কি বৌদ্ধ ও জৈন শ্রমণদের প্রভাব আছে? এর সাথে সাথে কি স্থানীয় লৌকিক ধর্মের পুনরুত্থান হয়েছিল? - যাতে পবিত্র জায়গা, গাছপালা, বিভিন্ন অশরীরীদের পূজা এবং বিশেষ করে দেবমাতৃকার পূজা এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল যা মনে করিয়ে দেয় হরপ্পার ধর্মের কথা, যার সম্বন্ধে আমরা খুব কমই জানি।

The Indian Theogony বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে পুরাণের যুগ অবধি বিভিন্ন দেব-দেবী ও পৌরাণিক আখ্যানের এক তথ্যপূর্ণ বই। কিন্তু তার চেয়ে বড়ো কথা এই বইটি পণ্ডিতদের যা করা উচিৎ, তাই করে – অর্থাৎ প্রশ্ন করতে উৎসাহ যোগায়। এই প্রশ্নগুলির জবাব খুঁজতে খুঁজতেই এই ব্যাপারে আমাদের জ্ঞান সম্মুখবর্তী হয়।

সূত্রঃ অবসর

ভারত ও ভারততত্ত্ব - অধ্যাপক সুকুমারী ভট্টাচার্য সন্মাননা গ্রন্থ
ইতিহাসের আলোকে বৈদিক সাহিত্য - সুকুমারী ভট্টাচার্য
প্রবন্ধসংগ্রহ ০১ - সুকুমারী ভট্টাচার্য
প্রবন্ধসংগ্রহ ০২ - সুকুমারী ভট্টাচার্য





This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com