সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label আয়েশা ফয়েজ. Show all posts
Showing posts with label আয়েশা ফয়েজ. Show all posts

জীবন যে রকম - আয়েশা ফয়েজ

amarboi.comজীবন যে রকম - আয়েশা ফয়েজ
হুমায়ূন আহমেদ, জাফর ইকবাল এবং আহসান হাবীব তিন জনপ্রিয় লেখকের গর্বিত জননী। মুহাম্মদ জাফর ইকবাল ও হুমায়ুন আহমেদ এর মা রত্নগর্ভা আয়েশা ফয়েজ এর লেখা জীবন যে রকম বইটি। বইটির প্রচ্ছদ যথাযথ। বাংলার অল্পবয়স্কা একজন মায়ের সাদাকালো ছবি বইটির প্রচ্ছদে স্থান পেয়েছে। তিনি তাকিয়ে আছেন, মনে হচ্ছে তিনি এ জাতিকে কিছু একটা প্রশ্ন করে বসবেন। প্রচ্ছদ উল্টালেই মুহাম্মদ জাফর ইকবাল তাঁর মাকে নিয়ে লিখলেন কয়েক কলম। মাকে নিয়ে লিখতে লিখতে জাফর ইকবাল বলে ফেললেন ১৯৭১ সালের সে দিনগুলোর কথা। মুখবন্ধে আয়শা ফয়েজ লিখলেন, ১৯৯১ সালে তিনি গিয়েছিলেন আমেরিকায় মেজো ছেলে ইকবালের বাসায়। ঠিক সেখানে বসে অনেকটা খেয়ালের বশে লিখে ফেললেন জীবন যে রকম বইয়ের পান্ডুলিপি। দেশ সেরা সন্তানদের মায়ের সে লেখাগুলো পরবর্তীতে ছাপার অক্ষরে বের হলো বই হয়ে। মা হয়েও এই বইটি প্রকাশে উদ্যোগ নেওয়ায় আয়েশা ফয়েজ তাঁর পুত্র মুহাম্মদ জাফর ইকবালকে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারলেন না। আত্নজীবনীর শুরুতেই তিনি ১৯৪৪ সালের একজন বেকার ছেলের গল্প দিয়ে শুরু করলেন। ঠিকই মনে রেখেছেন ১৯৪৪ সালের ফেব্রুয়ারীর আট তারিখে একজন বেকার ছেলের সাথে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। বেকার লোকটির নাম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ফয়েজুর রহমান। নতুন বউ হিসেবে নতুন পরিবারের দায়িত্ব্য, কর্তব্য কিভাবে পালন করলেন সবই উঠে এসেছে এই বইটিতে। গ্রামের চলমান কুসংস্কার নিয়ে সেসময়ের অনেক কথা জীবন্ত হয়ে উঠে এসেছে এই বইটিতে। আরও কিছু পৃষ্ঠা উল্টালেই পাঠক খুজে পাবেন নতুন মা হওয়ার একটি খবর। আয়েশা ফয়েজ মা হয়েছেন। যে শিশুটি এখন আমাদের হুমায়ুন আহমেদ। পোয়াতি মানুষের ভাইটামিন খাওয়ার ঘটনাটি সত্যিই হাস্যরসে ভরপুর। সে যুগে মুরুববীরা বিশ্বাস করতো পোয়াতি মানুষদের ভাইটামিন খাওয়ানো নিষেদ। ভূতের ঝাড়ু দিয়ে ঝাড়া দেবার ঘটনাও সত্যিই কৌতুকময়। বইটি পড়তে পড়তে মনে হবে এই ঘটনাটি এখনই ঘটলো বুঝি। এরপরের গল্পগুলোতে উঠে এসছে নেত্রোকনার মোহন গন্জ এর হুমায়ুন আহমেদ এর নানার বাড়ির কিছু ঘটনা। আজমীর শরীফের ফুল নিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর উল্লেখ করার মতো। এতো নাটকীয় ঘটনার পর যে ছেলেটির জন্ম হলো তাঁর নাম রাখা হলো কাজল। সেই কাজল হলো আমাদের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদ। সেই কাজলের আসল নাম রাখা হয়েছিল শামসুর রহমান। কাজলের দাদা ও দাদী এই নামটি রেখেছিলেন। কিন্তু কাজলের বাবা ফয়জুর রহমান এই নামটি গ্রহন করেননি। তিনি নাম বদলে রাখলেন হুমায়ুন আহমেদ। তারপর একে একে উঠে এসেছে হুমায়ুন আহমেদ শৈশবের দুরন্তপনা, টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাগুলো। হুমায়ুন আহমেদ এর বোন শেফুকে নিয়েও তিনি লিখতে ভুলে যাননি। বর্ননায় এসেছে ইকবাল, শাহীন এবং শিখুকে নিয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা। ইকবাল কে নিয়ে নিয়ে লিখেছেন ছোটবেলা থেকেই ইকবাল ছিল পড়াশোনায় বেশ মনোযোগী কিন্তু কাজল দুষ্ট প্রকৃতির। মনিকে নিয়ে লেখাগুলোর ভেতরে রয়েছে আদর মাখানো কিছু উক্তি। যেমন মনি কথা বলতে পারে না কিন্তু সত্যিই সে ছিল মিষ্টি স্বভাবের একটি মেয়ে। তারপর ফয়েজুর রহমান এর বদলির চাকরী কারনে আয়েশা ফয়েজ ঘুরেছেন সিলেট, পচাগড়, রাঙামাটি, বান্দরবান, চট্রগ্রাম, বগুড়া, কুমিল্লা এবং অবশেষে ফিরোজপুর। ১২ নভেম্বর ১৯৭০ সাল থেকে উঠে এসেছে সেসময়ের রাজনীতির বিখ্যাত পুরুষদের কথা। শেখ মুজিব, ভাসানী, ইয়াহিয়াসহ অনেকের কথা তিনি অকপটে বলে গেছেন।





This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সোনার পুতলা - আয়েশা ফয়েজ

সোনার পুতলা - আয়েশা ফয়েজকাজল, সবাই যাকে হুমায়ূন আহমেদ নামে জানে, আমার প্রথম সন্তান। আমার সোনার পুতলা ওর জন্মের সময় আমি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ি। ডাক্তার পর্যন্ত ডাকতে হয়েছিল। অবশ্য ডাক্তার আসার আগেই ওর জন্ম হয়। সুস্থ-সুন্দর সন্তানের মুখ দেখে সমস্ত যন্ত্রণা মুহূর্তেই উবে গিয়েছিল। সবাই খুব খুশি। আমার বাবা ছিলেন পরিবারের প্রথম সন্তান, আমিও আমার বাবার প্রথম মেয়ে, কাকতালীয়ভাবে আমার শ্বশুর ও স্বামীও ছিলেন পরিবারের প্রথম সন্তান। সে কারণেই আমাদের প্রথম সন্তান যখন ভূমিষ্ঠ হয়, তখন আনন্দটা একটু বেশিই ছিল।
'আমার ছেলেবেলা' গ্রন্থের এক জায়গায় হুমায়ূন লিখেছে : 'নভেম্বর মাসের দুর্দান্ত শীত গাড়ো পাহাড় থেকে উড়ে আসছে অসম্ভব শীতল হাওয়া। মাটির মালসায় আগুন করে নানিজান সেঁক দিয়ে আমাকে গরম করার চেষ্টা করছেন। আশপাশের বৌ-ঝিরা একের পর এক আসছে এবং আমাকে দেখে মুগ্ধ গলায় বলছে_ 'সোনার পুতলা'।
এতক্ষণ যা লিখলাম সবই শোনা কথা। মার কাছ থেকে শোনা। কিন্তু আমার কাছে খুব বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। কারণ আমি ঘোর কৃষ্ণবর্ণের মানুষ।'
হুমায়ূন বিশ্বাস না করুক, কিন্তু ছেলেবেলায় ও আসলেই টুকটুকে ফর্সা ছিল। এতটাই ফর্সা ছিল যে, ওর ফুফু-খালারা ওকে 'সোনার পুতলা' বলে ডাকত। কেন যে দিন দিন কালো হয়ে গেল ঠিক বুঝলাম না।
এদিকে সবাই ছেলে সন্তান হওয়ায় অনেক বেশি খুশি হলেও আমার স্বামীর প্রত্যাশা ছিল কন্যা সন্তানের। উনি ধরেই নিয়েছিলেন যে, আমাদের মেয়ে হবে। সে জন্য কন্যা সন্তানের জন্য জামা-কাপড়ও কিনেছিলেন। হুমায়ূনের অনেক ছেলেদের পোশাক থাকলেও ওর বাবা ওকে মেয়েদের পোশাক পরাতে বেশি পছন্দ করতেন। মেয়েদের পোশাকে ওর ছেলেবেলার অনেক ছবিও ছিল।
আরেকটি কথা, হুমায়ূনের বাবা কিন্তু জ্যোতিষ চর্চাও করতেন। তিনি জন্মের পরপরই ছেলেকে দেখে বলেছিলেন_ এই ছেলে অনেক বড় মাপের কেউ হবে।
হুমায়ূন আর প্রিন্স চার্লসের জন্ম একই দিনে। একদিন ওর বাবা আমাকে বললেন, দেখ আমাদের ছেলে একদিন চার্লসের মতোই বিখ্যাত হবে। আমি হেসে বললাম, কোথায় রানীর ছেলে আর কোথায় আমার ছেলে! উনি ভীষণ রেগে গেলেন। আমাকে বললেন, তুমি হাসলে কেন রানীর ছেলে বিখ্যাত হবে পারিবারিক কারণে আর আমার ছেলে বিখ্যাত হবে তার নিজের যোগ্যতায়। তখন তো তাঁর কথা হেসে উড়িয়ে দিয়েছি। কিন্তু পরে দেখেছি তাঁর প্রতিটি কথাই হুমায়ূন যে অনেক বড় মাপের লেখক হবে_ এটিও উনি বলেছিলেন। মনে পড়ে, হুমায়ূনের লেখা প্রথম উপন্যাস 'শঙ্খনীল কারাগার'-এর পাণ্ডুলিপি পড়ে উনি খুব উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, 'তুমি তো অনেক বড় লেখকের মা হতে যাচ্ছ। দ্যাখো ছেলের লেখা পড়ে দ্যাখো। কত চমৎকার লিখেছে! আমাদের ছেলে অবশ্যই একদিন অনেক বড় মাপের লেখক হবে। উনার নিজেরও সাহিত্যের প্রতি অনেক ঝোঁক ছিল। তার লেখা একটি বইও প্রকাশিত হয়েছিল। আরও বেশ কয়েকটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি ছিল। যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আগুনে সব পুড়ে গেছে।
লেখালেখির বিষয়টি যেমন হুমায়ূন ওর বাবার কাছ থেকে পেয়েছে, স্বভাবও অনেকটা ওর বাবার মতো। তিনিও ছিলেন অন্য ধরনের মানুষ। যেমন একদিন রাতে আমি এবং হুমায়ূনের বাবা সিনেমা দেখে ফিরছিলাম। রিকশাটা একটা দীঘির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার ওই দীঘিতে গোসল করার ইচ্ছা হয়েছিল। কেননা দীঘির পানি খুবই চমৎকার ছিল। চাঁদের আলোয় পানিটা একদম টলমল করছিল। দেখেই গোসল করতে ইচ্ছা হয়। তো আমি বললাম, ইস! আমি যদি এখন ওই পানিতে নামতে পারতাম! কথাটা বলতেই উনি বললেন, মানুষের জীবন খুবই সামান্য সময়ের। এসব ছোটখাটো ইচ্ছা অপূর্ণ রাখতে নেই। আমি বাধা দিয়ে বললাম, কী পাগলামি করছ? উনি বললেন, কোনো অসুবিধা নেই। চলো তো। পরে রিকশাওয়ালাকে দাঁড় করিয়ে রেখেই দু'জনে মিলে নেমে পড়লাম পানিতে। হুমায়ূনের একটা স্বভাব ছিল_ মানুষকে চমকে দিয়ে আনন্দ দিতে পছন্দ করত খুব। ওর বাবারও তো এই স্বভাবটা ছিল। বলা যায়, মানুুুুুষকে হঠাৎ ভয় দেখানো, নানারকম মজা করা, অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা করে সবাইকে চমকে দেওয়া_ এই অভ্যাসটা বাবা-ছেলে দু'জনের মধ্যেই প্রবল মাত্রায় ছিল।
হুমায়ূন ছোটবেলায় ভীষণ দুষ্টু ছিল। অদ্ভুত কাণ্ডকারখানায় মেতে থাকত সারাক্ষণ। আর এসব কিছুতে ওর বাবা বাধা তো দিতেনই না বরং সব সময় উৎসাহ দিতেন। একবার হুমায়ূনের কী এক অদ্ভুত খেয়াল হলো, গাছের কাঁঠাল সব পেড়ে ফেলবে। কাঁঠাল পেড়ে ফেললে নাকি লিচু হয়। আমি ওর বাবাকে বললাম সব। তখন উনি আমকে বললেন, তুমি বোঝ না কেন? নিশ্চয়ই এর ভেতর ওর অন্য ধরনের একটা চিন্তা আছে। আবার একবার ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে খেতে গেল লঙ্গরখানায়। পুলিশের ছেলেমেয়ে হিসেবে তখনকার কেউ একজন চিনতে পেরে ওদের বাসায় নিয়ে আসে। আমি তো সব কথা শুনে দু'জনকে অনেক বকাঝকা করলাম। ওদের বাবাকে কথাটা বললে সব কথা শুনে খানিকক্ষণ হাসলেন। বললেন, লঙ্গরখানায় যারা খায় তারাও মানুষ। তাদের সঙ্গে খেয়েছে বলে রাগ করার কিছু নেই। আমি তখন রাগ করে হুমায়ূনকে বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে, বাইরের খাবার যদি এতই ভালো লাগে তাহলে বের হয়েই যা। লঙ্গরখানাতেই খা। তখন উনি বললেন, তুমি এভাবে চিন্তা করো কেন? বিষয়টি অন্যভাবে চিন্তা করো। এরপর হুমায়ূনকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন লঙ্গরখানায় কেন খেতে গিয়েছিল। তখন হুমায়ূন বলল, কলাপাতায় যখন খাবার দেয়, খাবারটা অনেকখানি ছড়িয়ে যায়। দেখতে তখন বেশ লাগে। খেতেও ভালো লাগে। তখন ওর বাবা আমাকে বললেন, দেখেছ অন্যরা শুধু খেয়েই গেছে। কিন্তু সেটার মাঝে যে একটা সৌন্দর্য আছে, সেটা কেউ বোঝেনি। তোমার ছেলে সেটা বুঝেছে, ওর মধ্যে আলাদা একটা জিনিস আছে। ও অন্যরকম একটা কিছু করলেই তুমি রাগ করো না।
কেউ কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, কোনো অলৌখিক শক্তি বা কোনো রহস্যময় বিষয় কি হুমায়ূনের মধ্যে ছিল? আলাদা একটা শক্তি যে ছিল, তা আমি বিশ্বাস করি। ছোটবেলায় একবার আমাদের দেশের বাড়িতে রাতে উঠে একবার বলছে_ আম্মা আমি গরুর কথা বুঝতে পারছি। তখন আামি ওকে ধমক দিয়ে বললাম, গরুর কথা আবার মানুষ বোঝে কী করে? এখন ঘুমাও। তখন আমার ভাই বলল, পাশেই গরুর ঘর আছে। ওর ভুলটা ভাঙ্গিয়ে নিয়ে আসি। গরু পাহারা দেওয়ার জন্য ওখানে তো মানুষ ঘুমায়। ওকে দেখিয়ে নিয়ে আসি। হুমায়ূনকে কোলে করে নিয়ে আমার ভাই গরু ঘরের দিকে গেল। গিয়ে দেখি ওই ঘরে যে থাকে সে নেই। ফাঁকি দিয়ে সে রাতে যাত্রা দেখতে চলে গেছে। অর্থাৎ গরুর ঘরে গরুই আছে, পাহারা দেওয়ার মানুষ নেই। যা হোক, হুমায়ূন বরাবরই বলত, আমি গরুর কথা বুঝি। তখন আমি জিজ্ঞেস করতাম, আচ্ছা তুই কী বুঝিস, বল। ও বলত, আমি বলতে পারব না। তবে আমি গরুর কথা বুঝি। আমার একটা ধারণা ছিল যে, আল্লাহ একটা বিশেষ শক্তি ওকে দিয়েছেন। ও আসলেই কিছু একটা বুঝতে পেরেছিল। ওর যে বিশেষ একটা শক্তি ছিল, এটা আমি বিশ্বাস করি।

মনে পড়ছে, একটা সময় আমিও মানুষের ভবিষ্যৎ বলতে পারতাম। ওই সময়ে আমি স্বপ্নে যা দেখতাম, সেটা সত্যি হয়ে যেত। কিছু একটা মনে মনে চিন্তা করলে দেখা যেত সেটাও সত্যি হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে এ বিষয়গুলো আর ঘটে না।
হুমায়ূনের বাবার মৃত্যু প্রসঙ্গ যখন এলোই, এ সম্পর্কে কিছু বলি। যুদ্ধের সময় উনি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। তিনি তখন মহকুমা শহরে দায়িত্ব পালন করতেন। উনি সবাইকে বোঝালেন, মিলিটারিরা জেলা শহরগুলো পর্যন্তই আসবে। মহকুমা শহরে তারা আসবে না। পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা ছয় মাসের অগ্রিম বেতন উঠানোর সিদ্ধান্ত নিল। উনি সবাইকে কাজটি না করার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু কেউ তাঁর কথা শুনল না। এদিকে উনার স্বাক্ষর ছাড়া বেতন ওঠানো তো সম্ভব নয়। উনি বাধ্য হয়েই স্বাক্ষর করলেন। এরপর সবাই মিলে সেখানকার ট্রেজারি লুট করার সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি সবাইকে বোঝালেন, ট্রেজারি জ্বালিয়ে দিলে মিলিটারি এখানে আসবেই। তোমরা এ কাজটি করো না। তাঁর কথা কেউ শোনেনি। ট্রেজারি লুট হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেখানে মিলিটারি আসে। তখন আমরা বাবলা নামে একটি জায়গায় ছিলাম। তিনি যখন মিলিটারিদের সঙ্গে দেখা করার জন্য যেতে চাইলেন, আমি তাঁকে যেতে নিষেধ করেছিলাম। তিনি বললেন, পুলিশ কখনও পালিয়ে থাকতে পারে না। যেভাবেই হোক তারা আমাকে খুঁজে বের করবেই। আর যেহেতু আমার তিন ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সে কারণে আমাকে একটি বেশিই খোঁজ করবে। এরপর তাঁকে কোর্টে নিয়ে
উনাকেও নদীর পাড়ে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে। লাশ ভাসিয়ে দেয় নদীতে। ওই সময় তহশিলদারকেও ধরে নেওয়া হয়েছিল হত্যা করার জন্য। কিন্তু শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আফজাল হোসেনের পরামর্শে তাকে মিলিটারিরা বাঁচিয়ে রাখে। কারণ তাকে হত্যা করলে অর্থের হিসাবটা ঠিকমতো পাওয়া যাবে না। মৃত্যুর আগে তিনি নাকি বলেছিলেন, আমার ছেলে হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে পড়ে। তাঁকে তোমরা বলো তার বাবাকে অন্যায়ভাবে মিলিটারিরা হত্যা করেছে। তহশিলদার এ কথাটা শুনেছিল। তার এক ভাগ্নে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। তার মাধ্যমেই খবরটা পেয়েছিলাম। তাঁকে হত্যা করার পর কেউ কেউ বলত যে, তাঁকে ধরে নিয়ে গেছে, আবার কেউ কেউ বলত তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। ওই সময় আফজাল সাহেবের সঙ্গে দেখা করলে তিনিও বলেন, তোমার স্বামী বেঁচে আছে। তিনি যে মারা গেছেন এ কথা আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইতাম না। আমার মেজ ছেলে ইকবাল আমাকে বোঝাত_ দেখো, তুমি যদি এভাবে ভেঙে পড় আমাদের কী হবে? যুদ্ধে অনেকের বাবা মারা গেছেন। আমাদের বাবাও বেঁচে নেই। তুমি কারও কথা বিশ্বাস করো না। এর বেশ কিছু দিন পর তাঁকে যারা নদী থেকে তুলে কবর দিয়েছিল তাদের কাছে সংরক্ষিত থাকা উনার কিছু জিনিসপত্র দেখে তারপর কথাটি বিশ্বাস করি।
হুমায়ূনকেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। ওকে অনেক অত্যাচারও করেছিল। অনেকদিন আগের কথা তো। পুরোটা মনে নেই। সেই সময়ে হুমায়ূন হলে থাকত। একজন শিক্ষক আর ৫-৬ জন ছাত্রের সঙ্গে তাকেও ধরে নিয়ে গিয়েছিল। পরে তারা কীভাবে যেন জানতে পেরেছিল যে, ওর বাবাকেও আর্মিরা ধরে নিয়ে গেছে। বাবাকে আর্মিরা ধরে নিয়ে যাওয়ার পরও ছেলে হলে রয়েছে জেনে তার ওপর ভালোই অত্যাচার করে তারা। ওই সময়ে আমার দূরসম্পর্কের এক ভাই আর্মিতে চাকরি করতেন। তারই অনুরোধে খুব সম্ভবত হুমায়ূনকে ছেড়ে দেয়।
এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই। আমি বই পড়তে ভীষণ পছন্দ করি। আমার স্বামীর বই পড়ার প্রতি ঝোঁক রয়েছে শুনে আমার বাবা আমাকে রবীন্দ্রনাথের নৌকাডুবি উপন্যাসটা কিনে দিয়েছিলেন বিয়ের আগে। আর আমি নৌকাডুবি উপন্যাস পড়েছি জেনে আমার স্বামী অবাক হয়ে গিয়েছিলেন।
ছেলের লেখা প্রতিটি বইই আমার অনেক প্রিয়। এমনকি যেসব বই সম্পর্কে অনেকে বলে যে, বইটি ভালো হয়নি, সেসব বইও আমার অনেক ভালো লাগে। হুমায়ূন লেখা শুরু করার আগে আমি ভারতীয় লেখকদের লেখা অনেক পড়তাম। কোনো বই না পাওয়া গেলে ভারত থেকে আনিয়ে নিতাম। কিন্তু ছেলে লেখা শুরু করার পর অন্য কারও লেখা পড়ার আর প্রয়োজন পড়েনি। ছেলের লেখা প্রতিটি উপন্যাসই আমার খুবই প্রিয়। আমি ওকে একদিন বললাম, কী চিকন চিকন বই লিখিস! অল্প সময়েই শেষ হয়ে যায়। মোটা বই লিখতে পারিস না, যাতে অনেকদিন ধরে পড়তে পারি?
এবার হুমায়ূনের স্কুল প্রতিষ্ঠার কথা বলি। ... হুমায়ূনের বাবা মানুষের বাড়িতে জায়গির থেকে পড়ালেখা করেছিলেন। তো আমি ওকে বলেছিলাম, আল্লাহ তো তোকে অনেক কিছুই দিয়েছে। তোর বাবা অনেক কষ্ট করে পড়ালেখা শিখেছে। তুই এই এলাকার ছেলেমেয়েদের কষ্ট দূর করার জন্য একটা স্কুল করে দে। এর পরই ও নেত্রকোনায় 'শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ' নামে একটি বিদালয় গড়ে তোলে।
হুমায়ূন বিদেশ পছন্দ করত না, হাসপাতাল পছন্দ করত না। ডাক্তার পছন্দ করত না। আমি হাসপাতালে গেলে একমাত্র আমাকে দেখতে হাসপাতালে যেত। এমনকি হাসপাতালে যাওয়ার ভয়ে নিজের অসুখ-বিসুখও চাপা দিয়ে রাখত। বিদেশে ও যখন পিএইচডি করতে যায় প্রায়ই বলত, আমি আর পড়ব না। দেশে ফিরে আসব। যে দেশের মানুষ ঠিকমতো খেতে পায় না, সে দেশের মানুষের এত পড়ে কী হবে? তখন আমি অনেক বোঝাতাম।
হুমায়ূন দেশকে ভালোবাসত, দেশের মানুষকে ভালোবাসত। দেশের মানুষও যে ওকে কত পছন্দ করে, কত ভালোবাসে ওকে_ এটা শহীদ মিনারেই দেখলাম; নুহাশ পল্লীতে ওকে কবর দেওয়ার সময়ও দেখেছি। কিন্তু এ দৃশ্য আমি কখনোই দেখতে চাইনি। এর চেয়ে অনেক বেশি আনন্দের হতো আমার কবরের মাটি যদি আমার ছেলে দিয়ে যেতে পারত। সন্তানের লাশের সামনে বসে থাকার চেয়ে বড় কোনো কষ্ট একজন মায়ের হতে পারে না।
এখন হুমায়ূন নুহাশ পল্লীর লিচুতলায় শুয়ে আছে। জন্মের পর কয়েক বছর ও আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। নানার বাড়িতে নানির কাছে মানুষ হয়েছে। কেননা আমি তখন অসুস্থ ছিলাম। সুস্থ হওয়ার পর যখন আমার বুকের মানিককে কাছে পেলাম, তখন ওকে জড়িয়ে ধরে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলাম_ বাকি জীবন যেন আমার ছেলেকে তিনি সুখে রাখেন; শান্তিতে রাখেন। তা হয়নি। হুমায়ূন সুখ পায়নি; শান্তি পায়নি। তাই পরম করুণাময়ের কাছে আমার প্রার্থনা: ইহলোকে ওকে শান্তি না দিলেও পরলোকে তুমি শান্তি দাও। ওর আত্মা শান্তি পাক।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

হুমায়ূন আহমেদ - আয়েশা ফয়েজ

হুমায়ূন আহমেদ - আয়েশা ফয়েজজন্ম থেকেই আমার সন্তানরা প্রতিভাবান : আয়েশা ফয়েজ
নিজের জন্য নয়, ঠিক ছোট সংসারের জন্যও নয়- প্রকাণ্ড বড় একটা বিমিশ্র সংসারের জন্য কঠিন ব্রত পালন করেছেন শহীদজায়া আয়েশা ফয়েজ। আমাদের সবার প্রিয় খালাম্মা। সংসারের হাল ধরতে গিয়ে সাধারণ জননী থেকে অসাধারণ এক জননীতে পরিণত হয়েছেন তিনি। ছয়টি সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে তাঁকে কত চোখের জল ফেলতে হয়েছে, কত অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়েছে, জননী হৃদয়ের ওই গভীরতর ব্যথা নিকটজন ছাড়া বোঝার নয়। মাঝেমধ্যে এসব কথা তিনি বলেছেন নিকটজনদের। খানিকটা লিখেছেন তাঁর আত্মকথা 'জীবন যে রকম' বইয়ে। লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সূত্রে অনেকবার তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। প্রতিবার সস্নেহে ডেকে নিয়েছেন কাছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বলেছেন। পরিবার, নিজের সন্তান, তাঁর স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা, ছেলেবেলা নিয়ে বলেছেন। সর্বশেষ গত রবিবার ১৪ জুলাই পল্লবীর বাসায় সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কথা হয়। সেদিন অনেক কথা বলেছেন তিনি। এর কিছু অংশ পরিবেশিত হলো প্রশ্নর পাঠকদের জন্য। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নওশাদ জামিল

প্রশ্ন : খালাম্মা, আপনার শৈশবের কথা জানতে চাচ্ছি। আপনার বেড়ে ওঠা, ভাইবোনদের কথা বলবেন কি? কয় ভাইবোন ছিলেন আপনারা?
আয়েশা ফয়েজ : আমাদের বাড়ি ছিল মোহনগঞ্জে। নেত্রকোনায়। বাড়িটাকে সবাই বলত 'শেখবাড়ি'। আমার বাবা আবুল হোসেন শেখ, মা খায়রুন্নেসা শেখ। আমরা ৯ ভাইবোন। ছয় ভাই, তিন বোন। পরিবারের প্রথম সন্তান ছিলাম। এ কারণে একটু বাড়াবাড়ি রকমের যত্ন-আদর ছিল। অত্যন্ত সুখের ছিল শৈশবের দিনগুলো।
প্রশ্ন : আপনার ছেলেবেলা ছিল ত্রিশের দশকে। সেই সময়ের দিনগুলো মনে পড়ে কি? তখনকার পরিবেশ কেমন ছিল?
আয়েশা ফয়েজ : সব কথা তো মনে নেই, বাবা। বয়সের কাছে হারিয়ে গেছে অনেক কথা। ৮৩ বছর বয়স এখন। আবছা আবছা লাগে স্মৃতিগুলো। ছোটবেলার কিছু স্মৃতি ভুলতে পারি না। আমরা ভাইবোনরা হৈচৈ করতাম, অনেক আনন্দ করতাম। আমাদের বাড়ি সারাক্ষণ যেন লোকজনে ভর্তি থাকত। চাচাতো ভাই, ফুফাতো ভাইবোন মিলে আনন্দ করতাম। চাচা, ফুফুরা আমাকে খুব আদর করতেন। ছোটবেলায় ঈদ এলে খুব একটা হৈচৈয়ের ব্যাপার হয়ে যেত। অনেক মানুষ আসত বাড়িতে। এটাই আমাদের কাছে আনন্দের ছিল। তখন সামান্য কিছুতেই অনেক আনন্দ ছিল।
প্রশ্ন : পর্দা প্রথা কি খুব কড়াকড়ি ছিল? আপনারা কি ঘরের বাইরে যেতে পারতেন?
আয়েশা ফয়েজ : সে সময় পর্দা প্রথার কড়াকড়ি ছিল, এর পরও বাবা আমাদের নানা জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যেতেন। পর্দার বেশি কড়াকড়ি ছিল আমার নানাবাড়িতে। আমাদের বাড়িতে এটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ের ছিল না। নানাবাড়িতে খুব পর্দাটর্দা থাকত। তারা বলত, মেয়েদের এত বেড়ানো ভালো নয়। তবে আমার মা-বাবা এসব নিয়ে কখনো বাড়াবাড়ি করেননি।
প্রশ্ন : আপনার বাবার কথা বলুন। তিনি কী করতেন?
আয়েশা ফয়েজ : বাবা রাজনীতি করতেন। মুসলিম লীগ করতেন। বিস্তর পণ্ডিত মানুষ ছিলেন তিনি। খুব বইটই পড়তেন। আমাদেরও পড়াতেন। পরিবারে পড়াশোনার ব্যাপারটা ছিল বরাবরই। পড়াশোনা নিয়ে বাবাও খুব আগ্রহী ছিলেন। তখন বাবা পত্রিকা আনতেন এবং সেটা আমরা পড়েছি কি না, খোঁজ নিতেন। আম্মাও খোঁজ নিতেন।
প্রশ্ন : আপনার মায়ের কথা জানতে চাচ্ছি।
আয়েশা ফয়েজ : আমার মা পড়াশোনা করতেন। স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। পড়াশোনার বিষয়ে আম্মাও খুব উৎসাহ দিতেন। আমাদের বাসায় প্রাইভেট মাস্টার ছিল, আর তখন জায়গির শিক্ষকের প্রচলন ছিল। একজন শিক্ষক, একজন ছাত্র বাধ্যতামূলক ছিল, সবার বাসায়ই। আমাদের পড়াশোনা শুরু হয় বাড়িতেই। আম্মা তা দেখভাল করতেন, তদারকি করতেন।
প্রশ্ন : আপনার আত্মকথা 'জীবন যে রকম' পড়ে জানতে পারি, আপনার বিয়ে হয় ১৯৪৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। বিয়ের প্রথম দিকের কথা, আপনার শ্বশুর-শাশুড়ি সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
আয়েশা ফয়েজ : বাবার পছন্দেই হুট করে আমার বিয়ে হয়ে যায়।
আমার বাবা হুমায়ূনের বাবাকে দেখেই পছন্দ করেন। বিয়ের পর মানুষটাকে ধীরে ধীরে জানতে পারি। অসম্ভব ভালো মানুষ হুমায়ূনের বাবা। মানুষটার কথা মনে হলেই বুকটা হাহাকার করে। এখন হুমায়ূনের জন্যও ওই শূন্যতা অনুভব করি (কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বারবার চোখ মোছেন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদেন)। চোখ মুছতে মুছতে বলেন, হুমায়ূনের বাবার শোক কাটিয়ে উঠেছিলাম। এখন ছেলে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারব না।
প্রশ্ন : (খালাম্মার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় ধরি) খালাম্মা, আল্লাহর কথা ভাবেন। আল্লাহ আপনার পাশেই থাকবেন (এরপর ধীরে ধীরে চোখ মোছেন তিনি)। খালাম্মা, এখন এসব কথা নয়। আপনার বিয়ের কথা বলছিলেন।
আয়েশা ফয়েজ : একেবারে বিয়ের প্রথম দিকের কথা বলি। প্রথম শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি। বউ ওঠানো হয়েছে, আত্মীয়স্বজনে ঘর ভরে গেছে। আমি তো এর আগে হুমায়ূনের বাবার কণ্ঠ শুনিনি। কিন্তু অনেক রাগারাগি হচ্ছে শুনতে পাচ্ছি। তখন ওই বাড়িতে নিয়ম ছিল, নতুন বউ এলে বউকে পান্তা ভাত আর শাড়ি দিয়ে বলবে, এই তোমাকে ভাত-কাপড় দিলাম। এটা বউ ঘরে তোলার একটা রীতি। কিন্তু হুমায়ূনের বাবা এটা মানবেই না। শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি।
প্রশ্ন : আপনাদের প্রথম সন্তান হুমায়ূন আহমেদ। প্রথম মা হওয়ার অনুভূতি প্রত্যেক জননীর জন্য এক স্বর্গীয় অনুভূতি। আপনার ওই স্মৃতি কি বলবেন?
আয়েশা ফয়েজ : প্রথম মা হওয়ার অনুভূতি বড় আনন্দের। সেসব কথা আর কী বলব! আমার বইটাতে লিখেছি। আমার চাচা ছিলেন হুমায়ূনের বাবার বন্ধু। তিনি এসে সিলেট থেকে আমাকে নিয়ে গেলেন। সবাই তো তখন অসম্ভব রকমের খুশি। আমার বাবার ছিল তিন ভাই। প্রত্যেকে আলাদাভাবে মিষ্টি নিয়ে এলেন। খুব খাওয়াদাওয়া, আনন্দ-অনুষ্ঠান হলো। তারপর আমি আবার সিলেটে এলাম। সিলেট থেকে পরে আবার গেলাম বাবার বাড়িতে। সেখানেই হুমায়ূনের জন্ম। ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর রাত ৯টার দিকে জন্ম হয় হুমায়ূনের।
প্রশ্ন : সন্তানের প্রথম মুখ দেখার অনুভূতি বলুন।
আয়েশা ফয়েজ : আমার বুকের ভেতর নড়েচড়ে গিয়েছিল আমার প্রথম সন্তানের মুখ দেখে। মাথা ভরা চুল, টকটকে ফরসা গায়ের রং, চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। তখন বুঝিনি, আমার এই ছেলেই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। তখন বুঝিনি, ছেলে আমার আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে (কথাটা বলেই দীর্ঘশ্বাস ফেলেন খালাম্মা। কিছুক্ষণ আনমনা হয়ে ডুবে যান স্মৃতির অতলে। চোখ তখন ছলছল করছিল। তারপর দীর্ঘ নীরবতা। অনেকক্ষণ পরে আবার বলা শুরু করেন)।
প্রশ্ন : হুমায়ূন আহমেদের নাম রাখা হয়েছিল কাজল। কাজল নামটা বুঝি আপনার প্রিয় ছিল?
আয়েশা ফয়েজ : কাজল নামটা রেখেছিল ওরা বাবা। নামটা ওর বাবার খুব পছন্দের ছিল। আমার কাছেও খারাপ লাগত না নামটা। কিন্তু এই নামও পরে আর টেকেনি।
প্রশ্ন : এরপর কি নাম রাখা হয় শামসুর রহমান?
আয়েশা ফয়েজ : আমার বাবা আর শ্বশুরের মধ্যে খুব ভাব ছিল। খাতির ছিল। তাঁরা দুজন মিলে রাখলেন শামসুর রহমান। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আমাকে শামসুর মা বলেই ডাকত। আমার শাশুড়ি কখনো হুমায়ূন আহমেদ নামটা গ্রহণ করেননি। শেষদিন পর্যন্ত তিনি আমাকে শামসুর মা বলে ডেকেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত হুমায়ূন আহমেদ নামটা স্থায়ী হয়েছিল।
প্রশ্ন : ছোটবেলায় হুমায়ূন আহমেদ নাকি খুব দুষ্টু ছিলেন? অনেক খামখেয়ালি আচরণ করতেন?
আয়েশা ফয়েজ : দুষ্টু হলেও বুদ্ধিমান ছিল। ওর বাবা বলত, ছেলের প্রতিটা কাজেই নাকি বুদ্ধির ছাপ ছিল। আবার মাঝেমধ্যে খামখেয়ালি আচরণ করত। কেমন যেন একটা পাগলামি করত। হঠাৎ করে হুলস্থুল-চিৎকার করত। তার বাবাকে এ কথা বললে বলতেন, ওর মধ্যে আলাদা একটা কিছু আছে। আবার বলতেন, প্রমথনাথ বিশি এমন ছিল। কোথায় কোথায় ঘুরতে যেত তার ঠিক নেই। কোনো খোঁজখবর নেই। একবার দেশে খুব দুর্ভিক্ষ হলো। সরকারিভাবে লঙ্গরখানা খুলে দেওয়া হলো। হুমায়ূন ওই লঙ্গরখানায় গিয়ে খেয়ে আসত। আমি খুব রেগে গেলাম। বললাম, লঙ্গরখানায় যদি খাওয়া লাগে, তাহলে বাসায় এসেছিস কেন? লঙ্গরখানাতেই যা। খুব রাগারাগি করলাম আমি। ওর বাবা শুনে বললেন, ওর মধ্যে বিশেষ কিছু আছে, যেটা অন্যদের মধ্যে নেই। হুমায়ূনের বাবা ছেলের সব কিছু সম্পর্কে একটা ভালো ব্যাখ্যা করতেন। আরেক দিনের ঘটনা, এক ফকিরকে ভাত খেতে দেওয়া হলো। সেই ফকির তার বিশাল এক টিনের থালায় ডাল দিয়ে খাচ্ছে, তা দেখে হুমায়ূনের খুব ভালো লাগল। এখন সেও সেভাবে ভাত খাবে, না হলে খাবে না। কী যে পাগলামি তার মাথার মধ্যে ঢুকত! পরে তাকে সেভাবে খেতে দেওয়া হলো। এ রকম পাগলামি তার ভেতরে ছিল। যেটা অন্যরা করত না, সেটা সে করবেই।
প্রশ্ন : ছেলেমেয়েরা নাকি ছোটবেলা থেকেই আঁকিবুকি করতেন। তাঁরা কি ছবি আঁকা কোথাও শিখেছিলেন?
আয়েশা ফয়েজ : আমার পরিবারের সবাই ছবি আঁকতে পারে। সব ছেলেমেয়ে আঁকতে পারে। কিভাবে ছবি আঁকা শিখল, সেটা আমার কাছেও বিস্ময়। হুমায়ূন খুব সুন্দর ছবি আঁকত। ইকবাল, শাহীন (আহসান হাবীব)- ওরা তো আঁকেই। ইকবাল তো কার্টুন এঁকে পড়ার খরচও চালাত। এখন জানতে চাইলে বলে যে বড় মামার কাছে শিখেছে। কিন্তু ওদের বড় মামা যে ছবি আঁকতে জানে, সেটা তো আমরাই জানতাম না। জন্ম থেকেই আমার সন্তানরা প্রতিভাবান। ওদের প্রতিভা বিকাশে আমার কোনো হাত নেই। কিভাবে যেন ওরা সব করেছে। হয়তো আল্লাহর অশেষ রহমত এটা।
প্রশ্ন : খালাম্মা, এবার আপনার সন্তানদের লেখালেখি প্রসঙ্গে আসি। আপনার তিন ছেলে দেশের শিল্প-সাহিত্য-শিক্ষা-সংস্কৃতিজগতের তিন নক্ষত্র। হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও আহসান হাবীব। কখনো কি ভেবেছিলেন, আপনার ছেলেরা লেখক হবেন?
আয়েশা ফয়েজ : সত্যি কথা, আমি ভাবিনি ওরা এত বড় লেখক হবে। কিন্তু ওদের বাবা ভাবতেন। তিনি বলতেন, দেখো, তোমার ছেলেরা বিখ্যাত হবে। ওদের বাবার কথা সত্যি হয়েছে। লেখালেখি, সাহিত্যচর্চা তো ওদের রক্তেই আছে। আমাদের পরিবারেও আছে। ওদের বাবা লিখতেন, পড়তে ভালোবাসতেন। তাঁর এই গুণটা ওরা পেয়েছে। ছোটবেলা থেকেই ওরা আঁকত। বই পড়ত।
প্রশ্ন : আপনি নিজেও পড়তে ভালোবাসেন। লেখালেখি পছন্দ করেন। পড়াশোনার প্রতি এই ভালোবাসা সন্তানদের মধ্যে আপনি কিভাবে সঞ্চারিত করেছিলেন?
আয়েশা ফয়েজ : আসলে আমি তেমন কিছু করিনি। কিভাবে যেন ওদের মধ্যে বইপড়ার একটা নেশা ঢুকে গিয়েছিল। ইকবালের প্রিয় লেখক ছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। একদিন বাসায় এসে বলল, মানিকসমগ্র বের হয়েছে। কিনতে ৩০০ টাকা লাগবে। কিনতে পারবে না বলে ওর মন খারাপ। আমি ইকবালকে টাকা দিলাম। বাসায় মানিকসমগ্র আসার পর অন্য রকম এক আবহ। তখন সবাই মানিকের বই পড়ছি। হুমায়ূনও পড়ত। আঁকত। আমি কখনো ভাবিনি, ওরা লেখক হবে। তবে ওদের বাবা ভাবতেন। আঁচ করতে পেরেছিলেন, ছেলেরা লেখক হবে। ওদের বাবা পুলিশ অফিসার হলেও খুব রসিক ছিলেন। তিনিও লেখালেখি করতেন। জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস করতেন। আমরা, বিশেষ করে আমি বিশ্বাস করতাম না। পরে দেখলাম, যা যা বলছেন তার অনেক কিছু সত্যি হয়েছে। হুমায়ূন সম্পর্কে বলতেন, 'অনেক বিখ্যাত হবে তোমার ছেলে! জানো, রানি এলিজাবেথের ছেলে আর তোমার ছেলের জন্ম একই দিনে, একই লগ্নে।' আমি বলতাম, কই রানি এলিজাবেথ, আর কই আমি! তিনি বলতেন, 'রানির ছেলে বিখ্যাত হবে তার মা-বাবার নামে। আমার ছেলে হবে নিজের যোগ্যতায়।' হুমায়ূনের যেকোনো দুষ্টুমির মধ্যেও বিশেষ কারণ খুঁজে পেতেন ওর বাবা। হুমায়ূন সারা দিন কই কই ঘুরত। আমি কিছু বললে ওর বাবা বলতেন, 'প্রমথনাথ বিশি এ রকম ছিলেন, কাজলের ভেতরে অন্য রকম কিছু আছে।' 'নন্দিত নরকে'র পাণ্ডুলিপি ওর আব্বাও পড়েছিলেন। দেখে বলেছেন, 'তোর হবে'।
প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন আপনার স্বামী ফয়জুর রহমান। পরবর্তী সময়ে ছয় সন্তান নিয়ে আপনাকে ভীষণ কষ্ট করতে হয়েছে। তখন আপনি সাহসের সঙ্গে হাল ধরেছিলেন সংসারের। পরে অমিত সাহস আর ধৈর্যের সঙ্গে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দিয়েছেন সন্তানদের। পেছনে তাকালে এখন কী মনে হয়?
আয়েশা ফয়েজ : টাকা-পয়সার জন্য, একটু মাথা গোঁজার জন্য অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। সন্তানরা তা জানে। যদিও কখনো ছেলেমেয়েদের কষ্টের কথা বলিনি। শেয়ার করিনি। কিন্তু ওরা ঠিকই বুঝত। আল্লাহর রহমতে অনেকে আমাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। ছেলেমেয়েদের বলি, তোমরাও মানুষকে বিপদ-আপদে সাহায্য করবে। সন্তানরা আমার কাছে উপদেশ চাইল, আমাদের জন্য আপনার কোনো উপদেশ আছে? আমি বলেছিলাম, উপদেশ নয়, একটি আদেশ আছে। আদেশটি হচ্ছে- কেউ যদি কখনো তোমাদের কাছে টাকা ধার চায় তোমরা 'না' বলবে না। আমাকে অসংখ্যবার মানুষের কাছে ধারের জন্য হাত পাততে হয়েছে। ধার চাওয়ার লজ্জা ও অপমান আমি জানি। আল্লাহর রহমতে, আমার সন্তানরা মানুষের বিপদে-আপদে সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করে। এই মাটি, এই মানুষকে ওরা অনেক ভালোবাসে। হুমায়ূনের বিদেশ ভালো লাগত না, ইকবালেরও তাই। ছোট ছেলে বিদেশে যেতেই চায় না।
প্রশ্ন : আপনার জীবনে অনেক সুখের ও আনন্দের স্মৃতি রয়েছে। দুঃখের কোনো স্মৃতি নয়, আপনার কি কোনো আনন্দময় স্মৃতির কথা মনে হয়?
আয়েশা ফয়েজ : এখন আর কোনো সুখের স্মৃতি মনে পড়ে না, দুঃখের স্মৃতি মনে পড়ে বেশি। একাত্তরের পর জীবনের ওপর দিয়ে কেমন ঝড় গেছে, অনেকের তা বোঝা সম্ভব নয়। তার পরও বিশ্বাস ছিল পারব। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানি। কথায় বলে না, 'এতিমের সংসার আল্লাহ চালায়।' আল্লাহর অশেষ কৃপায় সংসারের হাল ধরেছিলাম। আল্লাহর রহমত ছিল। কিভাবে ছেলেমেয়েরা এত বড় হলো, মানুষ হলো, আমি নিজেও এখন ভাবি। আর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলে আল্লাহ শোনেন। তাদের বাবা খুব সৎ মানুষ ছিলেন। ওদের বাবার দোয়া আছে। মানুষটার অছিলায় এই ছেলেগুলো মানুষ হয়েছে। ভাবতাম, বাচ্চাগুলোর কী হবে? আমার দোয়া আল্লাহ কবুল করেছেন।
প্রশ্ন : খালাম্মা, আমরা শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। হুমায়ূন আহমেদের ভক্ত, পাঠক, অনুরাগীদের উদ্দেশে আপনার কি কিছু বলার আছে?
আয়েশা ফয়েজ : হুমায়ূন তার কথা বইয়ে লিখে গেছে। আমাদের কথা লিখে গেছে। নতুন আর কী বলব! পাঠকরা তার জন্য, আমাদের পরিবারের জন্য যে দরদ দেখিয়েছেন, তার কোনো তুলনা নেই। আমার পরিবারের জন্য অনেকে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ছাড়া আর কী করতে পারি। আল্লাহ সবাইকে রহমত দেবেন- এ দোয়া করি।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com