সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label এডওয়ার্ড সাঈদ. Show all posts
Showing posts with label এডওয়ার্ড সাঈদ. Show all posts

অরিয়েন্টালিজম - এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ

amarboi
অরিয়েন্টালিজম - এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ
এডওয়ার্ড সাঈদ-এর অরিয়েন্টালিজম
ভূমিকা ও ভাষান্তর ফয়েজ আলম

গত শতকের অস্থির, দ্রুত পরিবর্তনমুখী বুদ্ধিবৃত্তিক আবহে এডওয়ার্ড সাঈদ ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টিশীল চিন্তাবিদদের একজন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, বিশেষত ষাট ও সত্তরের দশকে সকল ধরনের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের কাছে আনত অসম্ভব একটা মানব-বিশ্বে সাঈদের আবির্ভাব প্রচণ্ড আলোড়নের মতো, যা নাড়িয়ে দেয় পশ্চিমের সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও দমনের দীর্ঘ, স্থিতিশীল আয়োজন-উন্নত বিশ্বের সাংস্কৃতিক প্রভাবনের সূত্রে অর্জিত ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের মূল-ভিত্তির কৃত্রিম গ্রন্থিগুলো খুলে খুলে দেখায় এবং এভাবে অনুন্নত অঞ্চলগুলোর, বিশেষ করে প্রাক্তন উপনিবেশিত দেশসমহের মানুষদের চিন্তাভঙ্গির দীর্ঘকালীন উপনিবেশিক অনবর্তনের মধ্যে সুচিত করে অবমুক্তি ও বিকাশের তীব্র সম্ভাবনা। সাহিত্যের ছাত্র ও অধ্যাপক হয়েও আর্থ-রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সকল কর্তৃত্বকেই তিনি চিহ্নিত করেন, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে আক্রমণ করেন, তার স্বরূপ উন্মোচন করে দেখান।

সমকালে আধুনিক মনোভাবের ধীর কিন্তু নিশ্চিত বিলুপ্তি এবং নতুন চিন্তাভঙ্গির বিচিত্র উৎসারণে যে প্রশ্নময়তা, সন্দেহ, অবিশ্বাস ও অনিশ্চিত অনুসন্ধান শুরু হয় সাঈদ তার মধ্যে কিছুটা ভিন্ন এক পথে যাত্রা শুরু করেন: সংস্কৃতি-সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতি, আধিপত্য, ক্ষমতা এবং অনুন্নত বিশ্বের মানুষের মনোজগতে তার প্রভাব ও পরিণতি হয়ে ওঠে তার পরীক্ষণ-পর্যবেক্ষণের বিষয়। এভাবেই তিনি চিহ্নিত করেন প্রাচ্যতত্ত্বের গৃঢ়-গোপন সংগঠন যাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ধর্মযাজকের মন্ত্রপাঠ থেকে শুরু করে রুশোর রাজনৈতিক তত্ত্ব কিংবা জেন অস্টিনের উপন্যাস; এর লক্ষ্য হলো প্রাচ্যের মানুষদের মনোজগৎকে বশে রেখে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা ও তা অক্ষুন্ন রাখতে সহায়তা করা। এ ধরনের আত্মমুখী অন্বেষা আধুনিকতা-উত্তর চিন্তাধারায় সাঈদকে তিষ্ঠিত করে অনন্য অবস্থানে । উপনিবেশিক শক্তিসংঘের জটিল কাঠামো ও তার কর্ম-প্রক্রিয়া উন্মোচন এবং উত্তর-উপনিবেশ কালে উপনিবেশিক যুগের সাংস্কৃতিক প্রভাবন ঝেড়ে ফেলার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাঈদের এই বিশ্লেষণই ক্রমে উত্তর-উপনিবেশবাদ রূপে সুসংঘটিত ও পরিচিত হয় ।

সাঈদের জন্ম ১৯৩৫ সালে, ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে এক এপিসকোপ্যালিয়ান খ্রিস্টান পরিবারে। ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর উদ্বাস্তুর নিয়তি মেনে কিশোর বয়সে পরিবারের সাথে মিশরে পাড়ি জমান। কিছুকাল কায়রোর ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। ওখানে মাউন্ট হারমান স্কুল, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি এবং হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে পাঠ শেষে ১৯৬৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। ওখানেই আজীবন ইংরেজি ও তুলনামূলক সাহিত্য পড়িয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইংল্যান্ডের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসরের দায়িত্বও পালন করেন।

ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন সাঈদ । ১৯৭৭ সালে প্রবাসী ফিলিস্তিন পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রায় ১৪ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে ইসরাইল-ফিলিস্তিন চুক্তি সংক্রান্ত মতবিরোধে পদত্যাগ করেন তিনি। এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের পিতা সাঈদ প্রায় এক যুগ ধরে ব্লাড ক্যান্সারে ভুগছিলেন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০০৩খ্রী: আমেরিকার এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন এই মহান মানুষটি।

অরিয়েন্টালিজম সাঈদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ১৯৭৮ সালে এ গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ত্রিশটিরও অধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এই একটি মাত্র গ্রন্থের জন্যেও সাঈদ অমর হয়ে থাকতেন। এখন পর্যন্ত এ গ্রন্থটি মানববিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তার গভীরতর প্রভাব অব্যাহত রেখেছে। এ গ্রন্থে সাঈদ অঙ্গীকার করেন মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোয় ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর রাজনৈতিক, সামাজিক, নৃ-তাত্ত্বিক, আর্থিক আধিপত্যের সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি ও প্রতিফলন প্রাচ্যের ঐ অঞ্চলের ওপর পশ্চিমের কর্তৃত্ব, কর্তৃত্বের আরোপণ, তার উপায় ও ধরনের ইতিহাস রচনার ।

ঐ কর্তৃত্বের বা আধিপত্যের পেছনে কার্যকর সাংস্কৃতিক মনোভঙ্গি ব্যাখ্যা করার জন্যে সাঈদ ব্যবহার করেন অরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যতত্ত্ব পরিভাষাটি। প্রাচ্যতত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাঈদ বলেন, প্রাচ্য হলো পশ্চিমের জ্ঞান জগতের নির্মাণ; পশ্চিমের নিকট প্রাচ্য ছিলো দূর ও অজানা। সেই দূর ও অজানাকে জানার চেষ্টায় প্রাচ্য হয়ে উঠে পশ্চিমের অন্য বা আদার—–পশ্চিমের প্রতিপক্ষ। ফলে পশ্চিম (অর্থাৎ নিজ) হয় ভালো, ‘প্রাচ্য (অন্য) মন্দ। এ ‘প্রাচ্য বাস্তব প্রাচ্য নয়, পশ্চিমের সৃষ্টি মাত্র। পশ্চিম প্রাচ্যে তার উপনিবেশ গড়ার বহু পূর্ব হতেই প্রাচ্যের ইতিহাস, জনগোষ্ঠী, সংস্কৃতি, বিশ্বাস সম্পর্কে অজস্র কাল্পনিক ধারণা সৃষ্টি করেছে, প্রচার করেছে, প্রজন্মক্রমে নিজেরা তা বিশ্বাসও করেছে। সে কল্পনা ও ধারণার মূলে আছে পশ্চিমের শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাচ্যের নিকৃষ্টতার বোধ। আঠারো শতকের শেষ ও উনিশ শতকের শুরুতে এ ধারণায় উদ্বুদ্ধ হয়েই পশ্চিম প্রাচ্যে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালায় ।

পাশ্চাত্যের মানুষেরা উপনিবেশিত প্রাচ্যে এসে বাস্তবতার নিরিখে তাদের সংশোধন না করে বরং তাকেই জোরদার ও পুনরুৎপাদন করে । বাস্তব প্রাচ্যকে তাদের নির্মিত প্রাচ্য' রূপেই দেখে, এমনকি বাস্তবের উপর চাপিয়ে দেয় তাদের কল্পনার প্রাচ্যকে। ফলে এই দূরত্ব আর ঘোচেনি। এভাবে প্রাচ্যকে হেয়করণ, দমন ও শাসন করার সাংস্কৃতিক তৎপরতা ও মনোভাবই হলো প্রাচ্যতত্ত্ব। পশ্চিমা জ্ঞানজগতে ‘প্রাচ্যতত্ত্ব’ নামের এই ডিসকোর্সের পরিশোধিত বক্তব্য হলো (পৃথিবীতে) পশ্চিমের মানুষ আছে, আর আছে প্রাচ্যবাসী। প্রথমোক্তরা আধিপত্য করবে। সেই আধিপত্যের শিকার হতে হবে, অবশ্যই, দ্বিতীয়োক্তদেরকে যা সচরাচর বোঝায় তারা তাদের ভূমি দখল করে নিতে দেবে, তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়সমূহ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে দেবে, তারা তাদের রক্ত ও সম্পদ তুলে দেবে কোনো না কোনো পশ্চিমা শক্তির হাতে। (অরিয়েন্টালিজম, ১৯৯৫, ৩৬)।

প্রাচ্যতত্ত্ব প্রাচ্যকে নিকৃষ্ট মনে করে এবং প্রাচ্যের মানুষদেরকে নিজস্ব শাসনে পরিচালিত হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করে। যেহেতু প্রাচ্য বিনষ্ট, অসভ্য, তাই প্রাচ্যজনকে কথা বলতে দেয়া যায় না। কারণ সে নিজেকেও ভালো করে চেনে না, তাকে যতোটা চেনে পশ্চিমের লোকেরা। তাই প্রাচ্যের পক্ষে কথা বলে সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপ—প্রাচ্য পরিণত হয় নিকৃষ্ট, নির্বাক, নিষ্ক্রিয় উপনিবেশে। আঠারো শতকের শেষ থেকে প্রাচ্যতত্ত্বের সক্রিয় যাত্রা শুরু হয়। এখনো তা অব্যাহত রয়েছে—যাবতীয় প্রভাব-প্রতিপত্তি সমেত, ভিন্নরূপে, নব্য-সাম্রাজ্যবাদের মধ্য দিয়ে।

অরিয়েন্টালিজম-এ বিন্যস্ত চিন্তাভাবনার পেছনে সাঈদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার একটা ভূমিকা আছে। তিনি লিখেছেন এ রচনায় আমার ব্যক্তিগত বিনিয়োগের বেশিরভাগটাই এসেছে দু'টো ব্রিটিশ উপনিবেশে বেড়ে ওঠা শিশু হিসেবে ‘অরিয়েন্টাল’ হয়ে ওঠার সচেতনতা থেকে। ঐ দুই উপনিবেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে আমার সকল পড়াশোনা পশ্চিমা ধাঁচের। এ সত্ত্বেও কম বয়সের ঐ সুগভীর সচেতনতা অক্ষয় রয়ে গেছে। আমার এই অধ্যয়ন অনেক দিক থেকে প্রাচ্য বিষয়রূপী আমার ওপর সেই সংস্কৃতির চিহ্নসমূহের তালিকা প্রণয়নের প্রয়াস, যে সংস্কৃতির আধিপত্য সকল প্রাচ্যবাসীর জীবনে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এ কারণে আমার বেলায় মনোযোগের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে ইসলামি প্রাচ্য (অরিয়েন্টালিজম, ১৯৯৫, ২৫)।

অরিয়েন্টালিজম এমন এক রচনা যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক চিন্তার প্রেক্ষিত ও অভিমুখ চিরতরে পাল্টে দিয়েছে, অন্যদিকে, তার স্রষ্টাকে পরিণত করেছে কিংবদন্তিতুল্য মানুষে

পশ্চিমের আধিপত্যবাদী জ্ঞান ও সংস্কৃতি যখন সারা পৃথিবীতে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত তখন অরিয়েন্টালিজম এক ধীরগতির বিস্ফোরণ, যা আক্রান্ত করেছে সেই আধিপত্যের মূল প্রক্রিয়া ও কৌশলসমূহকে। ইউরোপ ও আমেরিকান শক্তি প্রাচ্যের ওপর সামরিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য চালানোর সঙ্গে সঙ্গে কিভাবে প্রাচ্যের মানুষের মন, আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও সাংস্কৃতিক স্বভাবের ওপরও আধিপত্য করেছে, নিজেদের ইচ্ছেমত রূপান্তরিত, বিকৃত ও পরিবর্তন করেছে তাদের মনোজগৎ ও বাইরের ইমেজকে তা জানার জন্যে। অরিয়েন্টালিজম-এর বিকল্প নেই। সাঈদের দৃঢ় যুক্তিসহ বক্তব্য, তীক্ষ্ণ ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ, ক্ষমতা ও সংস্কৃতির সম্পর্ককে যথাযথভাবে শনাক্তকরণের সক্ষমতা অরিয়েন্টালিজম-কে পরিণত করেছে আধিপত্য ও সংস্কৃতির তাত্ত্বিক আলোচনার ‘অনিবার্য আদর্শ’-এ।

বিশ শতকে আধিপত্যের রাজনীতির সর্বগ্রাসী ছায়ায় আড়ষ্ট পৃথিবীতে বহুদিক-গামী বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা করেছেন সাঈদ। একাধারে সাহিত্য সমালোচনা, সংস্কৃতি, সমাজতত্ত্ব, সঙ্গীত, রাজনীতি-এ সমস্ত বিষয়েই লিখেছেন। কুড়িটিরও বেশি প্রকাশিত গ্রন্থে অভিব্যক্ত তার ভাবনায় ক্ষমতা ও আধিপত্যের নানা দিকের প্রতিভাস মেলে। তার রচিত গ্রন্থগুলো হলো জোসেফ কনরাড অ্যান্ড দি ফিকশান অব অটোবায়োগ্রাফি; বিগিনিংস: ইনটেনশন অ্যান্ড মেথডস; অরিয়েন্টালিজম; রিএ্যাকশন অ্যান্ড কাউন্টার রেভলিউশন ইন দি কনটেমপরারি আরব ওয়ার্ল্ড দি কোশ্চেন অব প্যালেস্টাইন; লিটারেচার অ্যান্ড দি সোসাইটি, কভারিং ইসলাম; দি ওয়ার্ল্ড, দি টেক্সট অ্যান্ড দি ক্রিটিক; আফটার দি লাস্ট স্কাই; ব্লেইমিং দি ভিকটিমস; স্পারিয়াস স্কলারশিপ অ্যান্ড দি প্যালেস্টাইনিয়ান কোশ্চেন; মিউজিক্যাল ইলাবোরেশনস; কালচার অ্যান্ড ইম্পেরিয়ালিজম; দি পলিটিক্স অব ডিসপজেশন: দি স্ট্রাগল ফর প্যালেস্টাইনিয়ান সেলফ-ডিটারমিনেশন; রিপ্রেজেন্টেশন অব দি ইন্টেলেকচুয়াল; আউট অব প্লেস; পিস অ্যান্ড ইটস ডিসকন্টেন্টস ও ক্রিটিসিজম বিটুইন কালচার অ্যান্ড সিস্টেম; ফ্রম অসলো টু ইরাক অ্যান্ড দি রোড ম্যাপ ইত্যাদি। শেষােক্ত বইটি প্রকাশিত হয়েছে তার মৃত্যুর পর, ২০০৪ সালে।

জোসেফ কনরাড অ্যান্ড দি ফিকশান অব অটোবায়োগ্রাফি, দি ওয়ার্ল্ড, দি টেক্সট অ্যান্ড দি ক্রিটিকএবং মিউজিক্যাল ইলাবোরেশন ক্ষমতার রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্ট নয়। অনেকগুলো গ্রন্থ সরাসরি ইসরাইলি দখলদারিত্ব এবং ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে সম্পর্কযুক্ত। অন্যান্য গ্রন্থ এবং নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারের মূল অভিপ্রায় আধিপত্যবাদী সংস্কৃতি ও রাজনীতির আন্তরবিন্যাস।

প্রচলিত সাহিত্য সমালোচনার কার্যকারিতা এবং টেক্সট-এর পরিপ্রেক্ষিত বিষয়ক প্রশ্নে সাঈদের গুরুত্বপূর্ণ রচনা দি ওয়ার্ল্ড, দি টেক্সট অ্যান্ড দি ক্রিটিক প্রকাশিত হয় ১৯৭৯ সালে। এতে সাহিত্য সমালোচনায় অন্যতর চিন্তাভঙ্গির প্রস্তাবনা পণ্ডিতদের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সাঈদের মতে টেক্সট বা রচনা গণ সংশ্লিষ্ট একটি জিনিস। রচনাকালীন পরিবেশ-পরিস্থিতির ছাপ ধারণ করেও প্রচারের পর তা পাঠ, পাঠের অর্থ ও প্রতিক্রিয়ার সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়। তিনি পশ্চিমের উন্নাসিক টেচুয়াল সমালোচনারীতির বিরোধিতা করে বলেন, এ হলো টেক্সট-এর ভেতরের রাজনীতি, আধিপত্য ও দমননীতির প্রত্যক্ষ প্রভাবকে আলোচনার বাইরে রাখার একটি কৌশল। অতএব, টেক্সটকে পাঠ করতে হবে মানবজীবনের বাস্তবতার সাথে সম্পর্কিত করে। গ্রন্থটিতে সুইফট ও কনরাডের ওপর তার নাতিদীর্ঘ আলোচনা লেখকদ্বয়ের সৃষ্টি ও দৃষ্টিকোণ সম্পর্কে নতুন ধরনের আলোকপাত করেছে। দি ওয়ার্ল্ড, দি টেক্সট অ্যান্ড দি ক্রিটিক প্রচলিত সাহিত্য সমালোচনার রীতিনীতি সম্পর্কে প্রশ্ন তোলে, টেক্সট-এর সাথে মানবজীবনের অবিচ্ছিন্ন বাস্তবতার সম্পর্কের গুরুত্ব অনুধাবনে সহায়তা করে এবং প্রস্তাব করে সমালোচনার অপেক্ষাকৃত পরিপূর্ণ একটি ধরন ।

১৯৮০ সালে প্রকাশিত দি কোশ্চেন অব প্যালেস্টাইন আমাদের সময়ের সবচেয়ে তীব্র, রক্তক্ষয়ী আন্তর্জাতিক সংঘাতের রাজনীতির ওপর আলোকপাত । ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কারণে দেশচ্যুত, রাষ্ট্রচ্যুত ফিলিস্তিনিদের দুর্দশার জীবন্ত চিত্র এ গ্রন্থটি। লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি আজ ছড়িয়ে আছে সারা পৃথিবীতে। তাদের দেশ নেই, ভোট নেই, নাগরিক অধিকার নেই। সাঈদ প্রশ্ন রাখেন এসব ফিলিস্তিনির দায় নেবে কে?

আফটার দি লাস্ট স্কাই (১৯৮৬) সাঈদের তীব্র রাজনীতি সচেতন রচনা। মূলভাবগত অর্থে এটা দি কোশ্চেন অব প্যালেস্টাইনেরই বিস্তৃতি। একদিকে ফিলিস্তিন পরিস্থিতি সম্পর্কে তার অনুপম বিশ্লেষণ, অন্যদিকে, ফিলিস্তিনের ওপর ফটোগ্রাফার জঁ মোর-এর গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছবি মিলে আফটার দি লাস্ট স্কাই-কে দিয়েছে সমকালের দালিলিক স্পর্শ। এখানে সাঈদ খুঁজে দেখেছেন সমকালে একজন ফিলিস্তিনি হওয়ার অর্থ কী, একজন ফিলিস্তিনি হিসেবে কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় তাকে? সাঈদ বলেন যে, পশ্চিমে এমন একটি দিনও পার হয় না যেদিন ফিলিস্তিনিরা প্রধান প্রধান সংবাদে অন্তর্ভুক্ত থাকে কিন্তু প্রচার মাধ্যম তাদের যে ইমেজ সৃষ্টি করেছে, সাঈদ দেখান, তা খুনী-সন্ত্রাসী-অপহরণকারী অথবা সর্বহারা শরণার্থীর। ফিলিস্তিনিরা আজ পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমের ঐ কৃত্রিম, ঘৃণ্য রাজনৈতিক ইমেজে বন্দি।

ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কারণে ফিলিস্তিনিরা কিভাবে তাদের দেশ হারিয়েছে, ঘরবাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে সেই মর্মান্তিক বিবরণ দেন সাঈদ। এবং সাম্প্রতিক ঘটনার আলোকে দেখান ফিলিস্তিনিরা প্রবাসী ও উদ্বাস্তু ইমেজ প্রত্যাখ্যান করে এখন নতুন আত্মপরিচয়ে উদ্বুদ্ধ হতে শুরু করেছে। সে পরিচয় প্রতিরোধের, আত্মত্যাগের, দৃঢ় চৈতন্যের সংগ্রামী এক জাতির যারা ভবিষ্যৎ এক উজ্জ্বল সময়ের স্বপ্ন দেখছে।

দি পলিটিক্স অব ডিসপজিশন দি স্ট্রাগল ফর প্যালেস্টাইনিয়ান সেলফ ডিটারমিনেশন (১৯৯৪) ফিলিস্তিন সমস্যার ওপর লিখিত প্রবন্ধের সংকলন । এতে ১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রক্তাক্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারা বিবরণী তুলে ধরেছেন সাঈদ। ১৯৯৪ সালে ইসরাইলের সাথে সম্পাদিত শান্তিচুক্তিও আলোচনায় এসেছে, যাকে সাঈদ অন্যত্র অভিহিত করেছেন শান্তি প্রচেষ্টার সমাপ্তি হিসেবে।

কভারিং ইসলাম-এর প্রথম প্রকাশ ১৯৮১ সালে। অরিয়েন্টালিজম লিখে সাঈদ প্রাচ্যতাত্ত্বিক বুদ্ধিজীবীবৃত্তে ধ্বস নামিয়েছিলেন, সৃষ্টি করেছিলেন অসংখ্য বুদ্ধিবৃত্তিক শক্র। কভারিং ইসলাম-এ তিনি পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমের সাম্রাজ্যবাদী ও সাম্প্রদায়িক রূপটি উন্মোচন করেন। এর ফলে তিনি আর কখনো প্রচার মাধ্যমের সুনজরে আসতে পারেননি। তার ফলাফলও উল্লেখযোগ্য বৈষয়িক ক্ষতির কারণ হয়েছে। আমরা প্রচার মাধ্যমের বদৌলতে প্রায়শই চমস্কি বা দেরিদার বিশাল ছায়ার মুখোমুখি হই, অথচ সাঈদকে অতো ভালো করে জানি না, যদিও আমাদের অর্থাৎ প্রাক্তন উপনিবেশগুলোর মানুষদের জন্যেই নিবেদিত ছিলো সাঈদের সারাজীবনের সৃষ্টিশীল তৎপরতা।

যাহোক, কভারিং ইসলাম-এ সাঈদ প্রতিদিনের সংবাদ পরিবেশন, ফিচার, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ঘেটে দেখান পশ্চিমের প্রচার মাধ্যম দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের খুনী, সন্ত্রাসী, অপহরণকারী হিসেবে চিত্রিত করে আসছে। ফিলিস্তিনি মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে অথবা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের মুখে আত্মরক্ষার জন্যে ইরানের যুদ্ধকৌশলকে ব্যাখ্যা করা হয় সন্ত্রাসী তৎপরতা বলে, কিন্তু আগ্রাসনের নিন্দা করা হয় না । এ হলো প্রচার মাধ্যমের ভাষ্য সৃষ্টির রাজনীতি। সাঈদ আমাদেরকে পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমের এ তৎপরতা ও তার ভাষ্যের রাজনীতি সম্পর্কে সতর্ক করেন।

রিপ্রেজেন্টেশন অব দি ইন্টেলেকচুয়াল (১৯৯৪) সাঈদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য রচনা। সারা পৃথিবীর জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশ যখন তথ্য ব্যবসায় জড়িত অথবা সংশ্লিষ্ট তখন বুদ্ধিজীবী পরিভাষাটি কী অর্থ বহন করে, কারা বুদ্ধিজীবী, কী তার চারিত্র্য, কী তার দায়িত্ব—এসব প্রশ্নের জবাব সন্ধান করা হয়েছে আলোচ্য গ্রন্থে। এ প্রসঙ্গে সাঈদ বুদ্ধিজীবী সম্পর্কে প্রচলিত মতামত তুলে ধরেন। ইতালীয় বামপন্থী এন্টনিও গ্রামসি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ঋণ-পরামর্শক সকলকেই বুদ্ধিজীবী বলে অভিহিত করেছেন যাদের কাজ হলো ক্ষমতামুখী প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের পক্ষে বুদ্ধি প্রয়োগ করে নিজস্ব স্বার্থ অর্জন। অন্যদিকে, ফরাসি জুলিয়ান বেন্ডা প্রমুখের সংজ্ঞানুযায়ী বুদ্ধিজীবীদেরকে সমাজের সংখ্যালঘু, মহৎ হৃদয় মানুষ বলে মনে করা হয়, যার দায়িত্ব ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। বুদ্ধিজীবীর পরিচয় প্রসঙ্গে সাঈদ প্রথাগত মতামত এবং বামপন্থী চিন্তাধারার মাঝামাঝি অবস্থান গ্রহণ করেও জুলিয়ান বেভার মতের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। সাঈদের মতে বুদ্ধিজীবীর মেধা, সততা, দায়িত্ববোধ তাকে অন্য মানুষদের থেকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করে। বুদ্ধিজীবী তাই নিঃসঙ্গ মানুষ। “বুদ্ধিজীবী পরবাসী, সংখ্যালঘু, অপেশাদার—এমন এক ভাষার অধিকারী, যা ক্ষমতার মুখের ওপর সত্য উচ্চারণ করে” (রিপ্রেজেন্টেশন..., ১৯৯৬, xvii)। সাঈদ মনে করেন পরিচ্ছন্ন মানবিক বোধ, অবিচ্ছিন্ন সততা, চিন্ত র তীব্রতা এবং সজাগ চৈতন্য—এ হলো বুদ্ধিজীবীর আজন্ম সম্বল। রিপ্রেজেন্টেশন অব দি ইন্টেলেকচুয়াল আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত সর্বশেষ গ্রন্থ ফ্রম অসলো টু ইরাক অ্যান্ড দি রোড ম্যাপ (২০০৪)-এ সংকলিত ৪৬টি অসাধারণ নিবন্ধে সাঈদ মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে আমেরিকা ও ইসরাইলের তৎপরতা সম্পর্কে এমন সব তথ্য প্রকাশ করেছেন যেগুলো কোনোদিন মার্কিন প্রচার মাধ্যমের মুখ দেখেনি।

এডওয়ার্ড সাঈদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দু'-একটি কাজের একটি হলো কালচার অ্যান্ড ইম্পেরিয়ালিজম (১৯৯৩)। এ গ্রন্থে সাঈদের চিন্তা প্রথা ও চর্চার সীমানা পেরিয়ে পশ্চিমের সংস্কৃতির এমন এক দিক উন্মোচিত করে যার সাথে সম্পর্কিত আধিপত্য, দমন ও ক্ষমতার রাজনীতি। ইউরোপীয় এবং সামগ্রিকভাবে পশ্চিমের সংস্কৃতির ইতিহাসের অনেক পেছনেও আধিপত্যবাদী চিন্তাভাবনার প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়।

সাঈদ পশ্চিমা সংস্কৃতিতে সাম্রাজ্যবাদের বীজ শনাক্ত করার জন্যে বেছে নেন সংস্কৃতির একটি ক্ষেত্র—সাহিত্য। জেন অস্টিন থেকে সালমান রুশদি, ইয়েটস থেকে প্রচার মাধ্যমের তৎপরতাও তার অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণের আওতায় আসে। অরিয়েন্টালিজমে তার পর্যবেক্ষণ সীমিত ছিলো মধ্যপ্রাচ্যে।

কালচার অ্যান্ড ইম্পেরিয়ালিজম-এ তিনি দৃষ্টি প্রসারিত করে দেন পৃথিবীর সকল প্রাক্তন উপনিবেশে, যেখানে উপনিবেশিক শক্তি কখনো না কখনো তাদের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চালিয়েছিলো। এর মধ্যে আছে আফ্রিকা, পাক-ভারত উপমহাদেশ, দূরপ্রাচ্যের অংশ বিশেষ, অস্ট্রেলিয়া, ক্যারিবীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ। এসব দেশে বসে অথবা তার অভিজ্ঞতা নিয়ে সাম্রাজ্যের গর্বিত নাগরিক সমকালীন লেখকগণ যে সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন সাঈদের আলোচনার লক্ষ্য সেই সব সৃষ্টি।

ঐ সব সাহিত্যিক রচনায় দু’টো বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেন তিনি প্রথমত, ওগুলোয় উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীকে দেখা হয়েছে মানসিকতার একক একটি ছাঁচে। যেমন ঐ সব লেখায় পাওয়া যায় ভারতীয় মন’, ‘ক্যারেবীয় নারী। চরিত্র', বা আফ্রিকান স্বভাব’, ‘জ্যামাইকান আচরণ ইত্যাদি পরিভাষা ও ধারণা। এর অর্থ হলো ঐ লেখকের নিকট সকল ভারতীয়’র মন একই রকম, সকল ক্যারিবীয় নারীর চরিত্র এক, আফ্রিকান মানবগোষ্ঠী বুঝি বা যুগ যুগ ধরে বেঁচে আছে স্বভাবের একটি মাত্র আদর্শ নিয়ে ।

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো, ঐ সব লেখকের প্রত্যেকের রচনায় সাম্রাজ্য বিস্তার, উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছে। নমুনা হিসেবে জোসেফ কনরাডের হার্ট অব ডার্কনেস-এর কথা ধরা যায় (ইয়ুথ অ্যান্ড আদার স্টোরিজ, ১৯০২)। কাহিনী কেন্দ্রে আছে পশ্চিমের ‘সভ্যতার ছোয়াবিহীন আফ্রিকার অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চল। বক্তা মালো যদিও মুখে সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনা করেন কিন্তু তার মনোভাব ঘুরেফিরে যুক্তির জাল বুনে আফ্রিকার স্বায়ত্তশাসনের বিরুদ্ধেই। সাঈদ তাই মন্তব্য করেন, “কনরাড় আমাদের দেখাতে চান (সাদা মানুষ) কুর্দজের লুটের অভিযান, নদীপথে মালোর ভ্রমণ এবং গোটা কাহিনীটিই কিভাবে এই একটি মাত্র মূলভাব সমর্থন করে যে, ইউরোপীয়রা দক্ষ হাতে সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে, ভবিষ্যতে আফ্রিকায় তা অব্যাহতও রাখবে” (কালচার অ্যান্ড ইম্পেরিয়ালিজম, ১৯৯৩, ২৫)।

সাঈদ আরো কয়েক যুগ পেছনে গিয়ে চার্লস ডিকেন্সের দুম্বে অ্যান্ড সন্স (১৮৪৮) থেকেও উদাহরণ দেন। ঐ গ্রন্থে দেখা যায়, দুম্বে তার নবজাত সন্তানের জন্যে কামনা করছে পৃথিবীব্যাপী বাণিজ্যিক আধিপত্য, যা আসলে উপনিবেশিক আধিপত্যেরই একটি রূপ (পূর্বোক্ত, ১৩)। একইভাবে সাঈদ উপনিবেশিক আকাঙক্ষা চিহ্নিত করেন জর্জ এলিয়ট, রুডইয়ার্ড কিপলিঙ, জেন অস্টিন, আলবেয়ার কামুসহ অনেকের রচনায় ।

চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত কালচার অ্যান্ড ইম্পেরিয়ালিজম-এর তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়ে বিশ্লেষিত হয়েছে বিরোধ ও প্রতিরোধাত্মক সংস্কৃতিরউত্থান। বিশ শতকের তৃতীয়-চতুর্থ দশক থেকেই সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতির বিপরীতে প্রতিরোধাত্মক সাহিত্যের সূচনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় সকল উপনিবেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ক্রমে সাম্রাজ্যবাদী সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রভাব কাটিয়ে ওঠার প্রয়াস দেখা দেয় সাহিত্য, সমাজতত্ত্ব, ইতিহাস, নৃ-তত্ত্বসহ মানব-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায়। সূচনাপর্বে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর লেখকদের মধ্যেও বিপরীত সংস্কৃতির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। ক্রমে বিকশিত হয় প্রতিরোধের তীব্র ভাষা।

এডওয়ার্ড সাঈদের তীক্ষ-তীব্র চিন্তনভঙ্গি, নিরপেক্ষ ও অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ, ভাষার কৌশল ব্যবহার কালচার অ্যান্ড ইম্পেরিয়ালিজমকে ধ্রুপদ রচনার মর্যাদা এনে দিয়েছে। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতা ও দমননীতির সংস্কৃতির বিশ্লেষণ করতে হলে এখন আর অরিয়েন্টালিজম ও কালচার অ্যান্ড ইম্পেরিয়ালিজমকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

বিশ শতকের প্রথমার্ধে পশ্চিমের উপনিবেশগুলোর বুদ্ধিবৃত্তি, পশ্চিমের সাংস্কৃতিক প্রভাবনের ফলেই আধুনিকতার নেতিবাদী বৃত্তে ঘুরপাক খেয়েছে। দীর্ঘদিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে প্যারিসে প্রথমে কাঠামোবাদী আন্দোলন, পরে উত্তর-কাঠামোবাদ নতুন চিন্তাভঙ্গি হিসেবে বিপুল আলোড়ন তোলে। উত্তরাধুনিকতা পাশ্চাত্যের চিন্তাভাবনার ফসল; ওখানেই ষাট, সত্তর ও আশির দশকে এই নতুন চিন্তারীতির বিভিন্ন দিকগামী বিস্তার আমরা লক্ষ্য করি।

এ সময় ফরাসি চিন্তাবিদ মিশেল ফুকো ইউরোপীয় চিন্তার দার্শনিক ভিত্তি সম্পর্কেই প্রশ্ন তোলেন, সন্দেহ প্রকাশ করেন এনলাইটমেন্ট ও পশ্চিমা মানবতাবাদের যাথার্থ বিষয়ে। দেরিদা ভাষায় দোত্যকের খেলার উল্লেখ করে টেক্সটকে প্রায় সকল কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বেচ্ছাচারী অর্থ-সঞ্চারের তত্ত্ব দেন; এর ফলে পারিপার্শ্বের রাজনীতি থেকে টেক্সটকে আলাদা করে ফেলার সুযোগ ও ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।

উত্তরাধুনিক চিন্তাভাবনার এই জাগরণকালে পশ্চিমের ঐ সব মত ও পথ এড়িয়ে প্রাচ্যের মানুষ এডওয়ার্ড সাঈদ উপনিবেশিক আধিপত্যের সাংস্কৃতিক রূপটি পরীক্ষণে মনোনিবেশ করে সূচিত করেন উত্তর-উপনিবেশবাদী ভাবনা-প্রক্রিয়ার। আলজেরিয়ায় ফরাসি উপনিবেশের বিরোধিতা করতে গিয়ে ফ্রাঞ্জ ফানো উপনিবেশিক শক্তি ও উনিবেশের সম্পর্কে আলোকপাত করেছিলেন আরো আগে, তবে সাঈদের মাধ্যমেই তা তত্ত্বের সুষম গঠন ও প্রয়োজনীয় কৌশল অর্জন করে। উপনিবেশিত মানবগোষ্ঠীর মনোজগতে দমন ও আধিপত্যের বিশ্লেষণে তিনি শনাক্ত করেন প্রাচ্যতাত্ত্বিক ডিসকোর্সকে। অরিয়েন্টালিজম এবং কালচার অ্যান্ড ইম্পেরিয়ালিজম প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে অনুন্নত বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে যে অভাবনীয় পরিবর্তন সূচিত হয় তাকে প্রায়-পুনর্জাগরণ আখ্যায়িত করা যেতে পারে। আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা ও ভারতে অরিয়েন্টালিজম-এর চিন্তা সূত্রের অনুসঙ্গে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজও হয়েছে।

এখন প্রাচ্যতত্ত্ব কেবল প্রাচ্যে পশ্চিমা আধিপত্যের ব্যাখ্যা নয়, তা একটি ভাবনাভঙ্গিও, যা প্রয়োগ করা হচ্ছে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের উপনিবেশিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিশ্লেষণে। যে কোনো সাংস্কৃতিক আধিপত্য/প্রভাবন/বিকৃতি সাঈদের তত্ত্বে বিশ্লেষণ করা সম্ভব। প্রাচ্যের প্রাক্তন উপনিবেশগুলোয় উত্তর-উপনিবেশিক চিন্তাধারাই এখন প্রবল, যা আত্মানুসন্ধানী, ঐতিহ্যমুখী, নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভিত্তির খোঁজে অবিরাম প্রশ্নমুখর। পশ্চিমের আধিপত্যে সূচিত ও ব্যাখ্যাত উত্তরাধুনিক ভাবনা রীতির অন্যপিঠে এই নতুন দিগন্তের সূচনা সাঈদের এক বিরাট অবদান।

এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ ছিলেন পণ্ডিত, নন্দনতাত্ত্বিক ও সমালোচকের এক বিরল ও মেধাবী সংশ্লেষ। সাংস্কৃতিক আত্মানুসন্ধানে নিয়ত উনুখ নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি প্রেরণা ও আদর্শ। সাঈদ পশ্চিমের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই প্রভাব বিস্তার করে গেছেন।

ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের কাছে তিনি কোনো দায় অনুভব করেননি, তার দায় ছিলো বুদ্ধিবৃত্তিক চৈতন্যের নিকট, যা তিনি নিজেই চিহ্নিত করেছেন (দ্র. রিপ্রেজেন্টেশন অব ইন্টেলেকচুয়াল, ১৯৯৬)। মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি দেশগুলোর জনগোষ্ঠীর পক্ষে কথা বলার কারণে তাকে কম দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি। তবু মানবতা ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার প্রশ্নে তার ছিলো দৃঢ় ও সক্রিয় ভূমিকা। প্রথা ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী, ক্ষমতাবিরোধী এমন সৃষ্টিশীল মানুষের জন্যে নোবেল পুরস্কার অপেক্ষা করার কথা নয়। তার প্রয়োজনও ছিলো না। এডওয়ার্ড সাঈদ ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে জাগ্রত করে গেছেন আমাদের চৈতন্যকে, যেমন বলেছেন এ সময়ের আরেক বেপরোয়া, মেধাবী বুদ্ধিজীবী আব্রাম নোয়াম চমস্কি- “তিনি (সাঈদ) আমাদের এটি বুঝতে সহায়তা করেন যে আমরা কে, ক্ষমতার দাস না হয়ে নৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে বাঁচার জন্যে আমাদের কী করা উচিৎ”।


বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

নির্বাসনের কথা - এডওয়ার্ড সাঈদ অনুবাদ : মুহম্মদ মুহসি


নির্বাসনের কথা
মূল : এডওয়ার্ড সাঈদ
অনুবাদ : মুহম্মদ মুহসি
নির্বাসন এমন একটি বিষয়, যা ভাবনার জগতের জন্য অদ্ভুতের অনুভব জাগায়; কিন্তু অভিজ্ঞতার জন্য মর্মান্তিকতা ও বিভীষিকার কম্পন জাগায়। নির্বাসন একটি অমোচনীয় ফাটল, যা একটি মানুষকে তার মাটি থেকে চিরতরে আলাদা করে দেয়। একটি সত্তাকে তার অস্তিত্বের ভূমি থেকে বিতাড়িত করে দেয়। একটি জীবনের জন্য এর চেয়ে বড় কোনো দুঃখ হয় না। নির্বাসিতদের নিয়ে রচিত গাথায় এবং ইতিহাসে আমরা যেসব রোমান্টিক, বীরত্বব্যঞ্জক গৌরব কীর্তির কাহিনী পড়ে থাকি, সেগুলো মূলত নির্বাসনের জীবনবিদারী কষ্টকে জয় করারই এক ট্র্যাজিক চেষ্টার প্রকাশ। একজন নির্বাসিত যা হারায় নির্বাসিতের জীবনের কোনো প্রাপ্তিই কোনো দিন সেই হারানো সম্পদের তুলনায় উজ্জ্বলতর হয়ে উঠতে পারে না।
কিন্তু প্রশ্ন জাগে, নির্বাসন যদি এমন এক স্থায়ী ও অপূরণীয় ক্ষতিই হবে, তাহলে নির্বাসন নিংড়িয়ে আধুনিক সংস্কৃতিতে ও সাহিত্যে এত ঐশ্বর্য ও শক্তি কিভাবে অর্জিত হলো? আমরা জানি যে আধুনিক যুগ আধ্যাকতা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং ভ্রষ্ট। আধুনিক যুগ যন্ত্রণার এবং বিচ্ছিন্নতার। নিৎশে আমাদের দেখিয়েছেন ঐতিহ্য আমাদের কী রকম অস্বস্তিতে ফেলেছে। ফ্রয়েড আমাদের দেখিয়েছেন আমাদের পারিবারিক অন্তরঙ্গতার মাঝে কিভাবে লুকিয়ে আছে আপত্তিকর যৌনতা। ঐতিহ্যের এই অস্বস্তি কিংবা অন্তরঙ্গতায় এই অস্বস্তি ভেতরে ভেতরে আমাদের নির্বাসনবোধ থেকে সৃষ্ট বিচ্ছিন্নতার উপজাত। এভাবে আধুনিক পশ্চিমা সংস্কৃতির একটা বড় অংশই নির্বাসিত ও অভিবাসিতের কর্মের-ভাবনার ফসল। যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা, বুদ্ধিবৃত্তি ও নন্দনবোধের বর্তমান রূপটি তাদের দান, যারা ফ্যাসিজম, কমিউনিজম এবং এ জাতীয় দেশীয় নিগ্রহের ফলে ইউরোপ থেকে নির্বাসিত হয়েছিল আমেরিকায়। সমালোচক জর্জ স্টিনার এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, বিশ শতকীয় পশ্চিমা সাহিত্যের একটি বড় শাখার নামকরণই হতে পারে Extraterritorial অর্থাৎ 'নির্বাসিতের সাহিত্য'। স্টিনার বলেন : প্রায় বর্বর এই সভ্যতা, যা অসংখ্য মানুষকে ছিন্নমূল করে দেয়, এই সভ্যতায় যাঁরাই শিল্পকলা চর্চা করেন তাঁরা সবাই নির্বাসিত কবি_তাঁদের নিজের কোনো বাড়ি নেই_নিজের কোনো ভাষা নেই।
ওপরের বক্তব্যের ধারায় নির্বাসনের বা দেশত্যাগের ইতিবাচকতা সাহিত্যে বা ধর্মে যদি থেকেও থাকে তা পূর্বযুগীয়। আগের যুগে দুনিয়ার সব নির্বাসিতকে বা মোহাজেরকে নিজ ভাষার বাইরে এবং নিজ জাতির বাইরে গমনের একটি কল্পনা ও পরিকল্পনা ছিল। তাঁদের দুঃখ-দুর্দশাও এক রকম ছিল। অভিজ্ঞতায় একরূপতা ছিল। রাশিয়ার বুদ্ধিজীবী Herzen-কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নির্বাসিত বুদ্ধিজীবীদের ওপর লিখিত ই এইচ কারের গ্রন্থ 'দ্য রোমান্টিক এঙ্াইলস'-এ এ কথার প্রমাণ মেলে। আগের যুগের এই নির্বাসিতদের সঙ্গে বর্তমান যুগের নির্বাসিতদের পার্থক্য নির্বাসনের আয়তনে ও মানসিক পীড়নে। আজকের নির্বাসন ও নির্বাসিত দুনিয়া-বিস্তারী। আজকের সমর-আয়োজন, সাম্রাজ্যবাদ এবং সর্বগ্রাসী রাজনৈতিক থিওরিতে বিশ্বব্যাপী শাসন আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে আজকের যুগটিই হলো নির্বাসিতের যুগ। অস্থানিক মানুষের যুগ এবং গণ-অভিবাসনের যুগ। মানুষ নিজের জন্য কিংবা মানবের কল্যাণের জন্য মাতৃভূমি ত্যাগ করছে_এই ভাবনার আজ আর সুযোগ নেই। বিশ শতকীয় ঘটনার ধারায় আজকের নির্বাসন ও অভিবাসন কোনো নন্দনবোধ কিংবা মানববোধে উপলব্ধিযোগ্য নয়। সাহিত্য এই দেশত্যাগ ও নির্বাসনের এমন কিছু বেদনা ও সংকটকে চিহ্নিত ও চিত্রিত করছে, যা অনেককে শুরুতে আহত ও বিস্মিত করছে। কারণ দেশত্যাগ, নির্বাসন বা অভিবাসনকে অনেকেই এই বোধে গ্রহণ করে না বা করতে পারে না। কিছু এরূপ সংকটকে অনুভবযোগ্য করে তোলার মধ্য দিয়ে নির্বাসন বা অভিবাসন নন্দনবোধ তথা সাহিত্যের উপকার করছে_এমন ভাবতে গেলে নির্বাসন বা অভিবাসন রক্তপাত ছাড়াই যে মানুষকে কেটে টুকরো টুকরো করছে, সেই ঘটনাকে তুচ্ছ করা হয়। এ ছাড়া এটা কি সত্য নয় যে নির্বাসন বা অভিবাসন নিয়ে ধর্ম ও সাহিত্যের ভাবনা নির্বাসনের অনেক ভয়ংকরকে চাপা দেয় বা ঢেকে ফেলে? এটা কি সত্য নয় যে মৃত্যুর মতো শক্তিশালী এই নির্বাসন লাখ লাখ মানুষকে তার বংশ, ইতিহাস ও মাটির সঙ্গে লাগানো নাড়ি থেকে ছিঁড়ে ফেলে? মৃত্যু তো অবশেষে জীবনকে ঈশ্বরের কৃপারাজ্যে পেঁৗছে দেয়, কিন্তু নির্বাসন সেই কৃপা থেকেও বঞ্চিত করে।
নির্বাসিত সাহিত্যিকদের নিয়েই প্রথমে কথা বলা যাক। ধরা যাক নির্বাসিত কবিদের কথা। একজন নির্বাসিত কবি সত্যিকার অর্থে হয়ে থাকেন নির্বাসনের বিপ্রতীপ রূপ ও অবস্থাকে সয়ে নেওয়ার এক প্রতিমূর্তি। কয়েক বছর আগে সমসাময়িক শ্রেষ্ঠ উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের সঙ্গে আমি কিছু সময় কাটিয়েছিলাম। প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের সময় তিনি পাকিস্তান থেকে নির্বাসিত হয়েছিলেন এবং বৈরুতে দিন পার করছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই ফিলিস্তিনিরা ছিলেন তাঁর কাছের বন্ধু। কিন্তু আমি অনুভব করছিলাম যে যদিও তাদের একটি সহমর্মিতার ক্ষেত্র আছে, তার পরও ভাষা, কাব্যরীতি কিংবা জীবনেতিহাসের কোথাও কোনো মিলনের বা ঐক্যের ভিত্তি তাদের মধ্যে নেই। ফলে একাকিত্বের বিষাদ তাঁকে সর্বদাই ঘিরে থাকত। একবারই দেখেছিলাম, যখন আরেক নির্বাসিত পাকিস্তানি ইকবাল আহমদ বৈরুতে এলেন; তখন ফয়েজ আহমেদ একমাত্র তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে বিচ্ছিন্নতার স্থায়ী মন খারাপটুকু মুছতে পেরেছিলেন। আমরা তিনজন বৈরুতের একটি অপরিচ্ছন্ন রেস্তোরাঁয় গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দিচ্ছিলাম। ফয়েজ কবিতা পড়ে যাচ্ছিলেন। একসময় তাঁরা আমার জন্য কবিতাগুলো আর অনুবাদ করছিলেন না। কিন্তু রাত যতই বাড়ছিল, আমি অনুভব করছিলাম; অনুবাদ ছাড়াই আমি বুঝে যাচ্ছি উর্দু কবিতা। মূলত আমি তখন আর কবিতার শব্দ বা ধ্বনি শুনছি না, বরং কবিতা দেখছি। আমি দেখছিলাম দুই নির্বাসিত যেন দেশে ফিরেছেন এবং চিৎকার করে বলছেন_'জিয়া-তুমি দেখ আমরা এখানে_তোমাকে আমরা থোড়াই পরোয়া করি।' আমার এই দেখা কবিতার কোনো অনুবাদ দরকার হচ্ছিল না। রশীদ হুসাইন একজন ফিলিস্তিনি কবি। তিনি আধুনিক হিব্রু কবি বিয়ালিকের কাব্যকর্ম আরবিতে অনুবাদ করেছেন। তিনি ১৯৪৮ সাল-পরবর্তীকালের একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী বাগ্মী জাতীয়তাবাদী। তিনি নাসেরের ভাবধারা ও আরব জাতীয়তাবাদকে মেলাতে চেয়েছিলেন এবং এ লক্ষ্যে আরব ও ইহুদি লেখকদের একবার একত্রে আলোচনায়ও বসিয়েছিলেন। একপর্যায়ে তিনি রাষ্ট্রীয় চাপ সহ্য করতে না পেরে দেশ ছেড়ে নিউইয়র্ক চলে গেলেন এবং এক ইহুদি মেয়ে বিয়ে করলেন। সেখানে জাতিসংঘের পিএলও অফিসে একটা চাকরি নিলেন। কিন্তু পিএলওর কর্তাস্থানীয়রা তাঁর নতুন নতুন চিন্তাধারায় রীতিমতো বিরক্ত ও নাখোশ হচ্ছিলেন। ১৯৭২ সালে তিনি পাড়ি জমালেন আরব জগতে। সিরিয়া, লেবানন কিংবা কায়রোর সর্বত্রই মনে হলো, এ তো তাঁর ভূমি নয়। আবার ফিরলেন যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাষ্ট্র তাঁর দেহকে আশ্রয় দিলেও তাঁর মনের আশ্রয় যুক্তরাষ্ট্র নয়। তাঁর মনের আশ্রয় তো ছিল ইসরায়েলের সেই গ্রাম মুজমুজ, যেখান থেকে তিনি বিতাড়িত হয়েছেন। ফলে রশীদ হুসাইনের উদ্বাস্তু মনের বাস হলো মদে আর সিগারেটে। এই মদ ও সিগারেটেই তাঁর মৃত্যু হলো। তাঁর মৃতদেহ পেঁৗছানো হলো তাঁর গ্রাম মুজমুজে। মৃত্যুর পর হলেও মুজমুজে ফিরে আজ হয়তো রশীদ হুসাইন ভালোই আছেন।
এমন অনেক কবি কবিতায় নির্বাসিতের জীবনের উচ্চারণে কবিতার মধ্য দিয়ে নির্বাসনকে একটি ট্র্যাজি-রোমান্টিক মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন। কিন্তু সে হলো কবিতার দেওয়া বাস্তবের নিরিখে এক অভিশপ্ত মর্যাদা। মূলত নির্বাসন কোনো মর্যাদার বিষয় নয়। বরং নির্বাসন হলো মানুষকে তার পরিচিতির নিম্নতম মর্যাদাটুকু থেকেও বঞ্চিত করা। সুতরাং নির্বাসনের সংকট ও সমস্যা শুধু সাহিত্য দিয়ে পরিমাপের নয়। এর সংকট, সমস্যা, গ্লানির অনেক কিছুই সাহিত্যের জগতের বাইরে। নির্বাসন নিয়ে ভাবার সময়ে জয়েস বা নবোকভকে পাশে রেখে ভাবতে হবে সেই সব হাজারো উদ্বাস্তু মানবেতর জীবনের মানুষের কথা, যাদের জন্য জাতিসংঘের উদ্বাস্তু সংস্থাগুলো তৈরি হয়েছে। ভাবতে হবে সেই সব উদ্বাস্তু কৃষক ও শ্রমিকের কথা, যারা আর কোনো দিন ফিরতে পারবে না তার দেশের মাটিতে এবং চিরজীবন তাদের পরিচয় হবে একটি রেশন কার্ড এবং জাতিসংঘের উদ্বাস্তু সংস্থার দেওয়া একটি সংখ্যা। নির্বাসন নগরী প্যারিসের ভুবনজোড়া খ্যাতির হাতেগোনা কয়েকজন নির্বাসিত ছাড়াও যে রয়েছে জন্মভূমি থেকে চির-বিচ্ছিন্ন ভাগ্যহত অজস্র ভিয়েতনামি, আলজেরীয়, কম্বোডীয়, লেবাননি কিংবা সেনেগালীয় যুবক-যুবতী_তাদের কথা ভাবতে হবে। এমন সব নির্বাসন নগরী কায়রো, বৈরুত, মাদাগাস্কার, ব্যাংকক কিংবা মেঙ্েিকা সিটির কথা ভাবতে হবে। আর আটলান্টিক থেকে যত পশ্চিমে যাওয়া যাবে মাতৃভূমিহীন জীবনের যন্ত্রণা চোখের সামনে ততই বাড়বে। দেখা যাবে মানুষ আর মানুষ, যাদের কোনো অতীত-ভবিষ্যৎ নেই_যাদের কোনো নাম-ধাম-ঠিকানার কাগজ নেই। তারা নিজেরা ছাড়া তাদের আজ সব কিছুই হারিয়ে গেছে।

নির্বাসন বা দেশত্যাগের আলোচনায় জাতীয়তাবাদ একটি আবশ্যিক প্রসঙ্গ। জাতীয়তাবাদ মানে একটি স্থান, জাতি এবং একটি ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রাখার লড়াই। জাতীয়তাবাদ জোর গলায় বলে সেই স্বদেশের কথা, যার ভিত্তিভূমে রয়েছে একটি ভাষা, সংস্কৃতি এবং প্রথাবদ্ধ সামাজিক আচার। এই বলার মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদ বিরোধিতা করে সব নির্বাসন বা দেশত্যাগমূলক কর্মকাণ্ডকে এবং বাধা দেয় নির্বাসনের সব ধ্বংস প্রক্রিয়াকে। তবে আশ্চর্যজনক সত্য হলো, মূলত জাতীয়তাবাদের মধ্যেই নিহিত থাকে নির্বাসনের সব প্রক্রিয়ার বীজ। হেগেলীয় মনিব-ভৃত্য ডায়ালেক্টিকসে যেমন মনিব-ভৃত্য পরস্পর সম্পূর্ণ বিরোধী হলেও মূলত একে অপরের জন্য দায়ী, তেমনি নির্বাসন এবং জাতীয়তাবাদ পারস্পরিক বিরোধী হলেও একে অপরকে সৃষ্টি করে। প্রথমত, জাতীয়তাবাদের সৃষ্টিই একটি গোষ্ঠীকে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন করার প্রয়াসের মধ্যে নিহিত। আমেরিকার স্বাধীনতা, জার্মানি বা ইতালির একত্রীকরণ কিংবা আলজেরিয়ার মুক্তি_এমন সব ঘটনাই মূলত আগে যেখানে ছিলাম কিংবা যাদের সঙ্গে ছিলাম, তা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সংগ্রাম এবং এক অর্থে পূর্ববর্তী অবস্থা থেকে নির্বাসিত হওয়ার সংগ্রাম। এই সংগ্রামে বিজয়ী হলে অর্জিত জাতীয়তাবাদ ভূতাপেক্ষিকভাবে এবং ভবিষ্যতের গর্ভজুড়ে নৈতিক মর্যাদায় নির্বাচিত ঘটনার নির্ধারিত অর্থ দিয়ে গড়ে তোলে এক ইতিহাস। এই ইতিহাস হয়ে দাঁড়ায় জাতীয়তাবাদের আখ্যান। এই আখ্যানে থাকে জাতির জনকের কথা, থাকে ধর্মজ্ঞানের মতো পবিত্র কিছু মূলমন্ত্র, থাকে কী তাদের আঁকড়ে থাকার বিষয়, সেই সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত কিছু শব্দমালা, থাকে তাদের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সাফল্যসূচক ঘটনা বা বিজয়স্তম্ভসমূহ; এবং আরো থাকে কারা বন্ধু এবং কারা তাদের নেতা_এ সম্পর্কিত উচ্চারণ।
জাতীয়তাবাদের এ আখ্যানকেই Pierre Bourdieu বলেছেন Habitus। জাতীয়তাবাদের সফল সীমানায় পেঁৗছলে সংশ্লিষ্ট জাতি মনে করে, সব সত্য হলো তা, যা তারা ভাবে বা করে এবং সব মিথ্যা হলো তা, যা অন্যরা ভাবে বা করে। যেমনটা পুঁজিবাদীরা ভাবে সমাজতান্ত্রিকদের কিংবা ইউরোপীয়রা ভাবে এশীয়দের। কোনো জাতির এই 'তারা' (জাতির নিজ ভাষায় 'আমরা') এবং 'অন্যরা' প্রত্যয়দ্বয়ের মাঝে যে সীমানাসূচক রেখাটি রয়েছে, সেই রেখায় থাকে তারা, যাদের আঁকড়ে ধরার কিছু নেই কিংবা যাদের কাছ থেকে আঁকড়ে ধরার সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয়েছে; এবং এরাই হলো এক শব্দে 'নির্বাসিত'। আদিম যুগে এই রেখায় জনকে বা জনগোষ্ঠী নির্বাসন দেওয়া হতো। আর আধুনিক যুগে এই রেখায় জমতে থাকে শরণার্থী নামের মানুষেরা কিংবা পা থেকে মাটি কেড়ে নেওয়া মানুষেরা, অর্থাৎ নির্বাসিতরা।
জাতীয়তাবাদীরা একেকটি দল। নির্বাসন হলো সেই দলহারা একাকিত্ব। এই একাকিত্বে পতিত হলে জাতি থেকে একাকিত্বে পতিত লোকটির দূরত্ব বাড়ে না, বরং বিপরীতভাবে জাতীয় গৌরবের সব বিষয়, জাতীয় মনোভঙ্গি এবং সাকল্যে জাতির প্রতি নাড়ির টানটি তার আরো দুর্মর হয়ে ওঠে। এমতাবস্থায় কি প্রশ্ন জাগে না_জাতীয়তাবাদ ও নির্বাসনের মাঝে অনেক অভিন্ন চরিত্র বিদ্যমান? তারা কি পরজাতি বিদ্বেষের দুটি বিপরীত স্রোত নয়? এ জিজ্ঞাসাগুলোর কোনো চূড়ান্ত উত্তর নেই। কারণ এ জিজ্ঞাসাগুলোর প্রতিটি ধরে নেয়, নির্বাসন ও জাতীয়তাবাদের আলোচনা হতে হবে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে, একটিকে অপরটির সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত না করে। কিন্তু সেই বিযুক্তিই তো কখনো সম্ভব নয়। তবে একটি মাত্র জায়গায়ই তাদের আলাদা করে এ কথা বলা যায়, জাতীয়তাবাদের জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষার কিছুই নির্বাসিতের সংকটকে একবারও ছুঁয়ে যায় না।
জাতীয়তাবাদ জীবনের একটি ধারাবাহিকতা। কিন্তু নির্বাসন সেই ধারাবাহিকতার ছেদ। নির্বাসিত তার শিকড়, তার ভূমি এবং তার অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন। নির্বাসিতের রাষ্ট্র নেই, প্রতিরক্ষা বাহিনী নেই। তবে নির্বাসিতরা এই শেষোক্ত দুইয়ের অর্জনের জন্যই চেষ্টা করে। নির্বাসিতরা বোধ করে, তাদের ভাঙাচুরা জীবনগুলোকে জোড়াতালি দিয়ে এক করতে হবে। এ লক্ষ্যে পেছনকে পেছনে ফেলে অনেক সময়ই তারা বেছে নেয় এমন কোনো আদর্শকে, যে আদর্শ বিশ্বের বুকে বিজয়ী রূপে বর্তমান। বিজয়ীর আদর্শ ছাড়া অন্য কোনো আদর্শের তলে দাঁড়িয়ে এক হয়ে দাঁড়ানো কার্যত সম্ভব নয় বলেই দূর থেকে এনে হলেও কিংবা ধার করে এনে হলেও নির্বাসিতরা এই পথে জাতীয় পুনর্গঠনের দিকে অগ্রসর হয়। ইহুদি, ফিলিস্তিনি কিংবা আর্মেনীয়দের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলেও এ বক্তব্যের বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নৌবর একজন বিচ্ছিন্ন আর্মেনীয়। ১৯১৫ সালে তাদের পরিবারের ওপর ভয়ংকর অত্যাচার নেমে আসে। তার মাতামহকে হত্যা করা হয়। এ পরিস্থিতিতে তার মা-বাবাকে পূর্ব তুরস্ক ছাড়তে হয়। তার মা-বাবা আশ্রয়ের সন্ধানে নামেন। প্রথমে আলেপ্লোতে, পরে কায়রোতে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মিসরে অমিসরীয়দের জন্য থাকাটা কঠিন হয়ে ওঠে। তার মা-বাবা চার সন্তানসহ একটি আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থার সহায়তায় বৈরুতে পাড়ি জমান। ত্রাণ সংস্থাটির ভাতার ওপর নির্ভর করে দুই রুমের একটি ঘরে গাদাগাদি করে বাস শুরু হয় নৌবরের পরিবারের। তারপর একসময় তাদের হাতে কোনো অর্থ থাকে না এবং অপেক্ষা শুরু হয় কোনো ত্রাণ সংস্থার সুদৃষ্টির ওপর। আট মাস পর একটি ত্রাণ সংস্থা তাদের গ্লাসগো যাওয়ার জন্য কয়েকটি বিমান টিকিটের ব্যবস্থা করে। এভাবেই পরবর্তীকালে নৌবরের পরিবার পেঁৗছে গান্ডারে এবং শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্কে। গ্রেহাউন্ড বাসে করে তারা রওয়ানা হয় নিউইয়র্ক থেকে সিয়াটলে। আমি নৌবরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমরা শেষ পর্যন্ত সিয়াটলে যাচ্ছ? নৌবর হাসল; এবং হাসিতেই বোঝাল, আর্মেনিয়ার চেয়ে সিয়াটলই ভালো। এভাবে অতীত কেটে দিয়ে নির্বাসিতরা বিজয়ীর আদর্শে একত্রিত হওয়ার লক্ষ্যে আত্মবিসর্জন দেয়।
নির্বাসিতের জীবনে কোনো কিছুরই নিরাপত্তা নেই। তাই নির্বাসিতের জীবনদৃষ্টিটি হিংসার। নির্বাসিতদের কেউ কিছু পেলে স্বার্থপরের মতো তা একক ভোগের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এই স্বার্থপরতা থেকে তাদের মধ্যে তৈরি হয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলের কঠিন ঐক্য এবং অন্যের প্রতি কঠিন হিংসা। এমনকি একই রকম সংকটে পতিত অন্য দলের প্রতিও হতে পারে নির্বাসিতের এই হিংসা। ফিলিস্তিনি ও ইহুদিবাদী ইসরায়েলিদের হিংসা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ফিলিস্তিনিরা মনে করে, তারা আজ উদ্বাস্তু ইহুদিদের কারণে, যে ইহুদিরা নিজেরাই ছিল স্মরণকালের দুর্গততম উদ্বাস্তু। অর্থাৎ উদ্বাস্তুরাই উদ্বাস্তুদের হিংসার শিকার। আবার ফিলিস্তিনিরা আজ জানে, তাদের জাতীয়তার ঐক্যে আজকের যে জাগরণ, সেই জাগরণ মূলত তাদের এই উদ্বাস্তু জীবনের দান। উদ্বাস্তু জীবনে পেঁৗছে তারা প্রথম বুঝেছে, তাদের 'আমরা' কারা। আজ তারা বোঝে, তাদের যারা সহমর্মী, সেই ত্রাণ সংস্থার লোকেরাও তাদের 'আমরা' নয়। তারা বোঝে, এই 'আমরা' থেকে কারো বেরিয়ে যাওয়া কতটা বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয়।
নির্বাসিতদের ইতিহাসে এটাই সম্ভবত সবচেয়ে করুণ ঘটনা যে একটি জনগোষ্ঠী আরেকটি নির্বাসিত জনগোষ্ঠী দ্বারা নির্বাসিত হচ্ছে। স্বদেশহারা একটি জনগোষ্ঠী সুবিধাপন্নতায় পেঁৗছে আরেকটি জনগোষ্ঠীকে স্বদেশহারা করছে। ১৯৮২ সালের গ্রীষ্মে সব ফিলিস্তিনির মনে একটি জিজ্ঞাসা ছিল_ইসরায়েলিরা ১৯৪৮ সালে আমাদের দেশছাড়া তো করলই, এরপর আজ লেবাননের শরণার্থী শিবিরগুলো থেকেও কেন তারা আমাদের তাড়াচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত এই যে, ইহুদিরা তাদের বসতির কাছাকাছিও কোনো উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীর বাস সহ্য করতে পারছিল না। কারণ সেসব উদ্বাস্তুকে দেখলেই তো তাদের নিজেদের উদ্বাস্তু-জীবনের যন্ত্রণার কথা অনিবার্যভাবে মনে পড়ে যায়। ইসরায়েলিদের এই সহ্য করতে না পারাটা দিন দিন বেড়ে ফিলিস্তিনি জাতীয়তার এক স্থায়ী শত্রুতায় পরিণত হয়। আজ এই ৪৬ বছর যাবৎ ফিলিস্তিনিরা জাতীয়তায় আবদ্ধ হতে চেষ্টা করছে আর ৪৬ বছর ধরে বাড়ছে ইসরায়েলি শত্রুতা।
ফিলিস্তিনিদের নির্বাসিত জীবনের অনেক বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতার মধ্য থেকে জাতীয়তার অঙ্কুরোদ্গমের এই চেষ্টা দৃশ্যমান মাহমুদ দারবিশের কবিতায়। তাঁর কবিতা হারানোর ব্যথাকে প্রাপ্তির আরাধনা বেদিতে পেঁৗছে দেওয়ার এক মহাকাব্যিক প্রয়াস। তাই তো তাঁকে দেখি, তিনি ভিটা হারানোর দুঃখকে সাঙ্গ না হওয়া কতগুলো কাজের তালিকায় প্রকাশ করেন এবং একটি অনুভূতি জাগিয়ে তোলেন যে এ কাজগুলোকে উপসংহারে নিয়ে যাওয়ার একটি দায় আছে_
আমি নির্বাসিত
তোমার চাহনি আমার শরীরে এক সিলমোহর।
আমাকে নিয়ে যাও যেখানে খুশি
আমাকে নিয়ে যাও তুমি যে-ই হও।
শুধু আমাকে ফিরিয়ে দাও আমার চেহারার রং
ফিরিয়ে দাও আমার শরীরের উষ্ণতা
ফিরিয়ে দাও আমার চোখের ও হৃদয়ের আলো
ফিরিয়ে দাও আমার রুটির লবণটুকু
ফিরিয়ে দাও আমার ভূমির, আমার মাতৃভূমির
স্বাদটুকু।
এক কথায়, নির্বাসন বলতে দেশে ফিরতে বাধা দেওয়াকে বোঝালেও নির্বাসনের বিভিন্ন রূপ, যেমন_নির্বাসিত, শরণার্থী, দেশত্যাগী, অভিবাসী ইত্যাদির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এগুলোর মূলে রয়েছে অবশ্যই আদি ঘটনা, অর্থাৎ দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া। যার দেশ ছাড়তে হলো, তার শুরু হলো দুর্দশার জীবন এবং পরদেশি নামের কলঙ্কময় জীবন। নির্বাসনের বিভিন্ন রূপের মধ্যে শরণার্থী রূপটি একেবারেই বিংশ শতকীয় একটি রূপ। 'শরণার্থী' (Refugee) শব্দটি অনেকটা রাজনৈতিক শব্দ, যা মনে করিয়ে দেয় একদল দেশহারা নির্দোষ মানুষকে, যাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু 'নির্বাসিত' (Exile) শব্দটি একটু ভিন্ন মাত্রার, যার সঙ্গে একাকিত্ব এবং অন্তর্গত বেদনার বিষয়গুলো বেশি প্রাসঙ্গিক।
দেশত্যাগীরা (Expatriate) স্বেচ্ছায়ই ব্যক্তিক বা সামাজিক পটভূমিতে নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে বসবাস করে। হেমিংওয়ে কিংবা ফিটজেরাল্ডকে কেউ ফ্রান্সে বাস করতে বাধ্য করেনি। দেশত্যাগীরা নির্বাসিতদের নিঃসঙ্গতার অনেক তীব্রতা অনুভব করতে পারে। তবে তারা নির্বাসিতদের নিষেধ-তালিকার অনেক কিছুরই বাইরে। অভিবাসীরা একেবারেই আলাদা। উপনিবেশের স্বার্থে ঔপনিবেশিকরা অনেকে অভিবাসী হতো। তারা নিঃসঙ্গতার কষ্ট কিছু পেলেও তাদের তো কেউ নির্বাসন দেয়নি। একইভাবে সাদা ইউরোপীয়, যারা অস্ট্রেলিয়া বা আফ্রিকায় স্থায়ী হয়েছে, তারা অভিবাসী হলেও 'নির্বাসিত' (Exile) শব্দটি তাদের সঙ্গে একেবারেই যায় না। একজন নির্বাসিত তার হারানো ভূমির ক্ষতিপূরণে চেষ্টা করে নতুন ভূমি সৃষ্টির জন্য, যে ভূমিতে থাকবে তার শাসন। এই নতুন ভূমি সৃষ্টির চেষ্টার ফলাফল হিসেবেই নির্বাসিতদের অনেকেই বড় মাপের ঔপন্যাসিক, দাবাড়ু, রাজনীতিক এবং বুদ্ধিজীবী। এ ক্ষেত্রগুলোর নির্বাসিতদের আগ্রহ বেশি এ কারণে যে নির্বাসিতরা স্বাভাবিকভাবেই গরিব হয়ে থাকে এবং খালি পকেটে এসব ক্ষেত্রেই যা কিছুটা সুবিধা করা যায়; অন্যত্র নয়। নির্বাসিতের সৃষ্ট জগৎ প্রায় এক অবাস্তব জগৎ এবং এই অবাস্তবতা উপন্যাসের জগতের বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়। গিয়র্গ লুকাস 'থিয়রি অব দ্য নভেল' গ্রন্থে বলেছেন, উপন্যাসের বাস্তবতা দেশহারা অনুভবের অতীন্দ্রিয় পর্যায়ের (Transcendental Homelessness) মূর্তায়ন। লুকাস বলেন, মহাকাব্য ও উপন্যাসের পার্থক্য হলো_মহাকাব্য তৈরি হয় এমন ভূমিতে, যেখানে সংস্কৃতি থিতু হয়েছে, মূল্যবোধ স্থায়ী রূপ পেয়েছে এবং জীবন পরিবর্তনশীলতা রোধ করেছে। পক্ষান্তরে উপন্যাস হলো সেই ভূমির নির্মিতি, যে ভূমির অবস্থা পুরো উল্টো রূপ। বিশেষ করে ইউরোপীয় উপন্যাসগুলোর নির্মিতি সেই ভূমিতে, যেখানে একটি অস্থির আদিবিচ্ছিন্ন মধ্যবিত্ত সমাজ চেষ্টা করে চলেছে একটি নতুন ভূমি নির্মাণের, যা মূলত ধারণ করবে ফেলে আসা আদি ভূমিরই ছায়া। উপন্যাসের নির্মিতি এমন একটি দ্বিতীয় ভূমি। কিন্তু মহাকাব্যে এমন কোনো দ্বিতীয় ভূমির স্থান নেই। মহাকাব্যের ভূমি অদ্বিতীয়ভাবে একটি, যা স্থায়ী এবং অপরিবর্তনীয়। অডিসিউস দীর্ঘ পরিভ্রমণ শেষে সেই স্থায়ী ভূমি ইথাকায় পেঁৗছেন। একিলিসকে মরতে হয়। কারণ তিনি সেই স্থায়ী ভূমিতে পেঁৗছতে পারেননি।

উপন্যাস বেঁচেই আছে এই প্রাকল্পিক ধারণার ওপর যে একটি দ্বিতীয় বা বিকল্প ভূমি আছে। উপন্যাসের এই দ্বিতীয় ভূমি আর দেশত্যাগী এবং নির্বাসিতদের বিকল্প ভূমি আদতে অভিন্ন।
নির্বাসিতরা যত ভালো অবস্থায়ই থাকুক না কেন, তারা সব সময় মনে করে, তাদের স্বাতন্ত্র্যগুলো হলো একজন ইয়াতিমের স্বাতন্ত্র্য এবং সেই ইয়াতিমিপনাকে তারা ব্যবহারও করে। এই স্বাতন্ত্র্যকে অস্ত্রের মতো ব্যবহার করে তারা জেদি মনোভাবের সঙ্গে মনে করে, তাদের অধিকার আছে কোনো কিছুকে আঁকড়ে না ধরার। এ থেকে অনেক সময় তৈরি হয় অপরকে সহ্য না করার গোয়ার্তুমি। খামখেয়ালিপনা, অতিরঞ্জন, অতিশায়ন ইত্যাদি নির্বাসিতের জীবনের বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। এগুলো দ্বারা অপরকে তারা চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে গ্রহণ করাতে বাধ্য করতে চায়। চরমতাকে দাবিয়ে প্রশান্তি ও স্নিগ্ধতা নির্বাসিতের কর্মে আসতেই চায় না। নির্বাসিত শিল্পীরা চূড়ান্তভাবেই আমাদের অনুভূতির ওপর একটি ধাক্কা। তাদের জেদীপনা তাদের শ্রেষ্ঠ কর্মগুলোর ওপরও কটমট চোখে তাকিয়ে থাকে। 'ডিভাইন কমেডি'র প্যারাডাইস পর্ব যেখানে স্বর্গীয় শান্তির এবং পরমানন্দের বাইরে আর কিছু থাকার কথা নয়, সেখানেও দেখা যায় ইনফার্নোর প্রতিহিংসা এবং বিচারের অত্যাচার উঁকি দিচ্ছে। ফ্লোরেন্স থেকে নির্বাসিত দান্তে স্বর্গের খোদায়ি জগৎ পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছেন তাঁর ফ্লোরেন্স হারানোর যন্ত্রণা।
জেমস জয়েস নির্বাসিতের জীবনভাবনাকে পছন্দ করে নিয়েছিলেন। এই ভাবনায় তিনি তাঁর লেখকবৃত্তিকে শাণিত করেছিলেন। জয়েসের জীবনীগ্রন্থে রিচার্ড এলম্যান বলেছেন, জয়েস আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে একটি দ্বন্দ্ব স্ব-উদ্যোগে তৈরি করে সেটাকে জিইয়ে রাখতেন আয়ারল্যান্ড থেকে নির্বাসিত এমন একটি অনুভবকে তাঁর মাঝে কার্যকর রাখার জন্য। এই দ্বন্দ্ব মিইয়ে যেতে বসলে কিংবা মিটমাট হতে গেলে আবার নতুন কোনো ঘটনা দ্বারা সেটাকে মানস রাজ্যে শাণিত করে নিতেন। এভাবেই জয়েসের উপন্যাস বহন করে অস্তিত্বের নিঃসঙ্গতা ও বিচ্ছিন্নতা। এমন নির্বাসিতের জীবন অনুভবকে জীবনের জন্য নির্বাচন করাটা খুব সাধারণ ঘটনা না হলেও জয়েস সেই অসাধারণের চর্চা করেছেন। তবে জয়েসের এই চর্চা একটি কঠিন প্রশ্ন তোলে। জয়েসের চর্চা কি প্রমাণ করে না, নির্বাসন আদতে এত ব্যক্তিগত একটি বিষয় যে জাতীয়ভাবে এটাকে খুব বড় করে দেখার সুযোগ কম। এ বাস্তবতায় বর্তমানে নির্বাসন সম্পর্কে এমন একটি ধারণাও অনেকের মধ্যে দেখা যায়, অনির্বাসিতরাও নির্বাসিতদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে আ@ে@@@াপকারে ব্যবহার করছে। এ বক্তব্যের কিছুটা সত্যতাও রয়েছে। মধ্যযুগীয় পরিব্রাজক পণ্ডিতদের মতো তারাও পরিবেশকে কিছুটা সমৃদ্ধি দেয়। এগুলোর ভিত্তিতে অনেক সময়ই আমরা নির্বাসিতদের আলোকদায়ী ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ করে দেখি এবং তাদের দুর্দশাকে আমলে কম নিই। কিন্তু সাহিত্য জগতের বাইরে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে দেখলে নির্বাসিতদের ঘরহারা বা দেশহারা জীবনের ট্র্যাজিক দুর্ভাগ্য এবং নির্দয় জগতের তাদের প্রতি করুণ অবহেলা বেশি চোখে পড়বে।
এক প্রজন্ম আগে সাইমন ভিল নির্বাসিতদের সংকট নিয়ে খুব সংক্ষেপে সুন্দর কিছু কথা বলেছিলেন। ভিল বলেছিলেন, স্বদেশের মাটির সঙ্গে শিকড়টি ধরে রাখতে পারাটা মানুষের আত্মার জন্য সবচেয়ে কম মূল্যায়িত অথচ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রয়োজন। তিনি আরো দেখিয়েছিলেন, এই বিশ্বযুদ্ধ, গণহত্যা ও নির্বাসনের যুগে স্বদেশ থেকে বিচ্ছিন্নকরণের বিরুদ্ধে যেসব উপায় অবলম্বন করা হচ্ছে, তা বিছিন্নকরণ বা নির্বাসন-প্রক্রিয়ার চেয়ে অনেক সময়ই কম জঘন্য নয়। নির্বাসন মোকাবিলায় সেসব ব্যবস্থার একটি হলো রাষ্ট্রবাদীব্যবস্থা। এ ব্যবস্থার জঘন্যতা হলো_রাষ্ট্র এমন এক বন্ধন দাবি করে যে সেই বন্ধনের দাবিতে রাষ্ট্র তার জনগণের অন্য সব বন্ধন কেটে দিতে দ্বিধা করে না।
ভিল নির্বাসনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা যেসব অপ্রতিরোধ্য চাপ ও অক্টোপাস-বেষ্টনীর কথা বলেছেন, সেগুলোর নিরিখে নির্বাসিতদের জীবনকে ট্র্যাজেডি ব্যতীত অন্য কোনো শব্দে বা ধারণায় ব্যক্ত করা যায় না। নির্বাসিতের বিচ্ছিন্নতা এবং বিভুঁইয়ের জীবন তার ভেতর এক আত্মপীড়নের বোধ জাগিয়ে তোলে, যা তাকে আত্মবিকাশ বা সাংস্কৃতিক সম্মোহন থেকে দূরে ঠেলে দেয়। তখন নির্বাসনই তার চাওয়া হয়ে ওঠে এবং সব মানবিক প্রতিশ্রুতি থেকে সে দূরে সরতে থাকে। তখন জীবন এমন হয়ে ওঠে যে এর চারপাশের সব কিছুই বড় অস্থায়ী এবং তুচ্ছ মনে হয়। তখন কোনো কিছুর প্রতিই আর ভালো লাগার বোধ জাগে না। তখন জাতীয় আন্দোলনে যোগদানও বাজে এবং বোঝা মনে হয়ে উঠতে পারে।
এটাও বিবেচনার বিষয় যে রক্ষণমূলক জাতীয়তা নির্বাসিতদের মধ্যে আত্মচেতনা জাগায় এবং একইভাবে জাগায় নিজেকে জাহির করার প্রবণতা। সেখান থেকে জাগে জাতিরূপে একত্রিত হওয়ার প্রয়াস। তার জন্য দরকার হয় জাতীয় ইতিহাস, প্রাচীন ভাষা, ঐতিহ্য এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠান; যেমন_গ্রন্থাগার, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি। এর মধ্য দিয়ে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার বোধ এবং তারও ভেতর দিয়ে আত্মানুসন্ধানী প্রক্রিয়ায় 'এথ্নিসিটি'র বিষয়বোধ ও ভাবনা শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক এ বাস্তবতার নিরিখেই আমি বলব, পরদেশে বাস কোনো সুবিধা নয়। এটা শুধু অনেক দিক দিয়ে আধুনিক, সেসব অবস্থা বা প্রতিষ্ঠানের একটি, যা আধুনিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ বা শাসন করছে। প্রবাস বা নির্বাসন কোনো চাওয়া নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই নিয়তি-নির্দিষ্ট অবস্থা। নির্বাসিত জানে, এই অনিশ্চিত জগতে সব নিবাসই বড় সাময়িক বাস। দেশের সীমারেখা আর প্রতিবন্ধক দেয়াল দ্বারা যেমন নিরাপত্তার বলয় তৈরি হয়, তেমনি তাদের দ্বারাই বন্দিখানার জিঞ্জিরও তৈরি হয়। নির্বাসিতরা সেই সীমারেখা ও দেয়াল ভেঙে বের হয়। সেই দেয়ালের সঙ্গে তারা ভাঙে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার দেয়াল।
স্যাঙ্নির এক ধর্মীয় পুরুষ হুগো এ প্রসঙ্গে কতকগুলো চমৎকার কথা লিখেছিলেন। হুগো লিখেছিলেন : 'অনুশীলনার্থী মনের জন্য এটি একটি আনন্দের উৎস যে এই মন অল্প অল্প করে এগোবে। প্রথমে অদৃশ্য ও অসহনীয় বস্তুগুলো নিয়ে মনের পরিবর্তন ঘটাবে এবং ধীরে ধীরে পেছনের সব কিছুই পেছনে ফেলে দেবে। যে এখনো মাতৃভূমিকে মমতাময় মনে করে, তার যাত্রা এ পথে প্রায় শুরুই হয়নি বলা যায়। যেকোনো দেশকে নিজের মনে করতে পারে, সে বেশ কিছু দূর এগিয়েছে এবং শক্তিশালী হয়ে উঠছে। আর গন্তব্যে পেঁৗছেছে সে, যে বুঝে গেছে সারা দুনিয়াই তার জন্য প্রবাস এবং বিদেশ-বিভুঁই। যার যাত্রা কেবল শুরু হয়েছে, তার ভালোবাসা একটি ভূমিতে। আর যে কিছু দূর এগিয়েছে, তার ভালোবাসা সব ভূমিতে। আর যে গন্তব্যে পেঁৗছেছে, সে ধ্বংস করতে পেরেছে সব ভালোবাসা।'
বিশ্বযুদ্ধকালে তুরস্কে বসবাসরত নির্বাসিত বা প্রবাসী এরিখ আউরবেখ এই বাক্যগুলো উদ্ধৃত করে উৎসাহ দিয়েছিলেন তাদের, যারা জাতীয় এবং দৈশিক সীমারেখা থেকে বের হতে আগ্রহী। এই মনোভাব ধারণ করে একজন ঐতিহাসিক বুঝে উঠতে পারেন, মানব অভিজ্ঞতার ইতিহাস এবং সেই অভিজ্ঞতার বিভিন্নতা ও এককতা। এই হুগোর বাক্যগুলোতে একটি বিষয় স্মর্তব্য। হুগোর বর্ণিত তৃতীয় ধাপে যেখানে ব্যক্তি পূর্ণতায় বা গন্তব্যে পেঁৗছে, সেখানে পেঁৗছতে হলে ভালোবাসা বিসর্জন দিতে হয়। তবে তার জন্য প্রথম এবং দ্বিতীয় স্তরের ভালোবাসার মধ্য দিয়েই যেতে হয়। শুরুতেই সব ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান হলে পথ চলাটাই শুরু হয় না। সে সূত্রেই বলতে হয়, নির্বাসন বা প্রবাসের ভিত্তি স্বদেশের মাটির প্রতি ভালোবাসা বা বন্ধনটির অস্তিত্ব। স্বদেশটি হারিয়েছে_এই হারানোর বোধটাই ঘোষণা করে, স্বদেশটির সঙ্গে আছে একটি শক্তিশালী বন্ধন।
নির্বাসনের ভালো দিকও আছে_এমন ধারণা করাটা যদিও কিছুটা খটকা লাগায়, তার পরও ভালো মনে হয় এমন দিক কিছু খুঁজলে পাওয়া যাবে। সারা পৃথিবীকে নিরাসক্তভাবে বিদেশ হিসেবে দেখতে পারার মধ্যে নির্বাসিতের দৃষ্টিরেখা প্রসারিত হয়। পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ এক দেশ, এক সংস্থা এবং এক পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন। প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্বাসিতরা অন্তত দুটি বিষয় সম্পর্কে সচেতন। দৃষ্টিরেখায় এই বহুত্ব একই সঙ্গে ভাবনায় ও মননে বহুমাত্রিকতা আনয়ন করে। সংগীতের সুরের মিশ্রণে যে মূর্ছনা জাগে, দৃষ্টিরেখায় এই বহুত্ব মননে তেমন মূর্ছনের সঞ্চার করে। প্রবাসের বর্তমান ও অতীতের স্বদেশ একত্রে জাগরূক থাকে। এমন অনুভবও সম্ভব হয় যে নির্বাসিত প্রবাসেই স্বদেশে বাসের আনন্দ আস্বাদ ঝরে।
তবে এই ভাবনাজাত অলীক আস্বাদে আশঙ্কাও থাকে। 'নাই'-এর মাঝে 'আছে' কল্পনার এই মূর্তায়ন এবং এর আস্বাদ দেহ ও মন_দুইয়ের জন্য বড়ই কষ্টকর ও ক্লান্তিকর। ফলে শান্তি, সন্তুষ্টি ও ভালো লাগার জায়গা প্রবাস বা নির্বাস কখনোই নয়। ওয়ালেস স্টিভেন্সের শব্দে প্রবাস হলো মনোরাজ্যের স্থায়ী শীতকাল, যেখান থেকে হেমন্ত ও বসন্তের ঐশ্বর্য খুব কাছ থেকেই দেখা যায়, কিন্তু কখনো হাতে পাওয়া যায় না। এ কথাই এভাবে বলা যায়, নির্বাসিতের জীবন এক আলাদা দিনপঞ্জিতে চলে। স্বদেশের জীবনে যেভাবে ঋতু আসে, এই জীবনে সেভাবে ঋতুরা আসে না। [ঈষৎ সংক্ষেপিত]

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com