সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label মহাভারত. Show all posts
Showing posts with label মহাভারত. Show all posts

মহাভারতে নাস্তিকতা - শামিম আহমেদ

amarboi
মহাভারতে নাস্তিকতা - শামিম আহমেদ
কথায় বলে, ‘যা নেই ভারতে, তা নেই মহাভারতে।’ ভারতের অন্যতম মহাকাব্য মহাভারতের শান্তিপর্বে, মোক্ষধর্ম অধ্যায়ে নানারকম দার্শনিক তত্ত্ব রয়েছে। পিতামহ ভীষ্ম যখন শরশয্যায় শায়িত, তখন তিনি যুধিষ্ঠিরের জগৎ ও জীবন সংক্রান্ত নানা জিজ্ঞাসা নিরসন করেছেন। ভীষ্ম কয়েকটি ‘নাস্তিক’ মতের কথা বলেন, সেখানে সিদ্ধান্তী আচার্য পঞ্চশিখ, আর পূর্বপক্ষগুলি হল লোকায়ত বা চার্বাক, জৈন, বৌদ্ধ বা সৌগত এবং বৈশেষিক। আবার অশ্বমেধ পর্বে তৈর্থিক বা উড়ুলোম নামক দার্শনিক সম্প্রদায়ের সন্ধান পাওয়া যায়, যাদের নাস্তিক অভিহিত করেছেন ব্যাসদেব। মহাকাব্যের বিভিন্ন জায়গায় মহর্ষি কণাদ-প্রণীত বৈশেষিক দর্শনকেও নাস্তিক বলা হয়েছে। ‘আন্বীক্ষিকী’ বা তর্কবিজ্ঞানও নাস্তিকের শিরোপা পেয়েছে। এই গ্রন্থে মহাভারতের আলোকে সেইসব নাস্তিক সম্প্রদায়গুলি নিয়েই দার্শনিক আলোচনা করা হয়েছে।
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

মহাভারতের মহারণ্যে - প্রতিভা বসু [২০]

amarboi
মহাভারতের মহারণ্যে
প্রতিভা বসু

২০

দুর্যোধনের হৃদয় আর প্রবোধ মানলো না। কর্ণ তো কেবলমাত্র বন্ধু ছিলেন না। ছিলেন আশ্রয়, অবলম্বন, পিতামাতাভ্রাতাবন্ধুস্বজন, সব। সব কিছুর উত্স। সব কিছুর সমন্বয়। তাঁর দুই গাল জলে ভেসে গেলো। তারপরেই সমস্ত দুঃখ এবং ক্রোধ উত্তাল হয়ে উঠলো। সারথিকে বললেন, ‘হে সূত! আমি আজ অর্জুনকে সংহার করবো। অর্জুন আজ আমাকে কিছুতেই অতিক্রম করতে সমর্থ হবে না।’

দুর্যোধন সমাগত শত্রুগণের প্রতি বেগে ধাবমান হলেন। যে কর্ণ পৃথিবীর ঈশ্বর হতেও রাজি হননি দুর্যোধনের হিতাভিলাষে, সেই কর্ণকে ওরা এভাবে নিধন করলো? এর নাম যুদ্ধ! যুদ্ধ করলে অর্জুন কি কর্ণের কাছে জয়ী হতে পারতেন? পিছন থেকে ছুরি মেরে খুন করতে তাদের বিবেকে কি এক ফোঁটাও দ্বিধা উদ্রিত হলো না? লজ্জা কুণ্ঠা ধর্ম কিছুই কি নেই তাদের মধ্যে? তারা কি মানুষ? মনুষ্য পদবাচ্য কোনো জীবই কি এটা করতে পারে? দুর্যোধন ‘হা কর্ণ!’ বলে রোদন করতে করতে উন্মাদের মতো প্রচণ্ড বেগে যাকে কাছে পেলেন তাকেই শরনিকরে বিদ্ধ করতে করতে আহ্বান করতে লাগলেন যোদ্ধাদের।

মদ্রাধিপতি শল্য শেষে কোনোরকমে নিবৃত্ত করলেন তাঁকে। বললেন, ‘হে রাজন! তোমার অদ্ভুত পৌরুষ দেখে আমি অভিভূত। তুমি একা একা এই অসংখ্য শত্রু সৈন্যকে কী ভাবে নিপাতিত করছো। কিন্তু আমাদের সৈন্যরা এখন চতুর্দিকে পলায়মান। কর্ণের মৃত্যুতে তারা সকলেই ভীত, ব্যথিত। ক্ষত্রিয়ধর্ম যারা পালন করে না, যুদ্ধক্ষেত্রে যারা অন্যায় হত্যা করে, তাদের সঙ্গে একজন ক্ষত্রিয় যোদ্ধা ধর্মযুদ্ধ কী ভাবে পালন করবে? তুমি শান্ত হও। সূতপুত্রের নিধনে সকল সৈন্যই বিষাদগ্রস্ত, বিপন্ন এবং পরিশ্রান্ত। আজকের মতো সকলকে ছুটি দাও। তুমিও শিবিরে চলো।’ শোকাকুলচিত্ত মদ্রাধিপতি এই সব বলে চুপ করলেন। তখন দুর্যোধন বাষ্পাকুল নয়নে যুদ্ধ শেষ করে সৈন্যদের ছুটি দিয়ে শিবিরে গেলেন।

সকলেই কর্ণের কথা বলতে বলতে গভীর রাত্রি পর্যন্ত জেগে কাটিয়ে দিয়ে অবশেষে নিদ্রিত হলেন। কিন্তু দুর্যোধনের নিদ্রা এলো না। গভীর যামিনী গত হয়ে কখন আকাশ রক্তবর্ণ হলো, তবু তাঁর দুই গাল জলেই ভরে রইলো। হৃদয় কেবলই হাহাকার করতে লাগলো একমাত্র বন্ধু কর্ণের জন্য।

কৃপাচার্য বলেছিলেন, ‘হে রাজন! তুমি এবার ওদের সঙ্গে সন্ধি করো। আমার মনে হয় কৃষ্ণ ধৃতরাষ্ট্রের বাক্য লঙ্ঘন করতে সমর্থ হবেন না। হে মহারাজ! আমি দীনতা বা প্রাণরক্ষার নিমিত্ত একথা বলছি না। একথা তোমার হিতকর বলেই বলছি।’

দুর্যোধন বললেন, ‘হে আচার্য! আপনি পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে প্রাণপণে যুদ্ধ করেছেন, এখনো বন্ধুজনোচিত বাক্যই বলছেন, কিন্তু আমি কীরূপে এ কাজ করতে পারি! আমি আপনার বাক্য শ্রদ্ধার সঙ্গে মেনে নিয়েও বলছি, পাণ্ডবদের সঙ্গে সন্ধি করা উচিত নয়, যুদ্ধ করাই শ্রেয়। দেখুন, আমি বহুবিধ যজ্ঞ অনুষ্ঠান, ব্রাহ্মণগণকে প্রভূত দক্ষিণাদান, বেদাধ্যয়ন ও বিপক্ষগণের শীর্ষস্থানীয়রূপে অবস্থান করেছি। আমি যা চেয়েছি সবই পেয়েছি। আমার ভৃত্যগণ অতি সুখে প্রতিপালিত হয়েছে। আমি দুঃখীদের দুঃখ দূর করেছি, স্বরাজ্য প্রতিপালন, ভোগ্যদ্রব্য উপভোগ এবং ধর্মঅর্থকামের সেবা করেছি। ক্ষত্রিয়ধর্ম ও পিতৃঋণ থেকেও আমার মুক্তিলাভ হয়েছে। এই পৃথিবীতে কিছুতেই সুখ নেই। কেবল কীর্তিলাভ করাই লোকের কর্তব্য। আমি ক্ষত্রিয়। ক্ষত্রিয়গণ গৃহমধ্যে রোগভোগ করে মরতে চায় না। যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুই আমার কাম্য। তদ্ব্যতীত, আমার জন্য নিহত পিতামহ ভীষ্ম, আচার্য দ্রোণ, মহাবীর জয়দ্রথ এবং কর্ণ, যে আমার কথা ভেবে পৃথিবীর ঐশ্বর্য ও কৃষ্ণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাঁদের কথা আমি কী করে ভুলতে পারি? কতো অবনীপাল আমার জন্য যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের নিকটও আমি বহুরূপে ঋণী। সেই কৃতজ্ঞতার শোধ কি আমি নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে তাঁদের দিতে পারি? যুদ্ধক্ষেত্রে আমার প্রাণ দিয়েই আমি ক্ষত্রিয়ধর্ম পালন করে তাঁদের সঙ্গে মিলিত হতে চাই।’

কুরুরাজ দুর্যোধনের একথা শুনে অন্যান্য ক্ষত্রিয়গণ সাধু সাধু বলে প্রশংসা করতে লাগলেন। তখন পরাজিত হয়েছেন বলে কারো মনের মধ্যে কোনো কষ্ট রইলো না। বিক্রম প্রকাশে উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন। যুদ্ধার্থে নরপতিগণও স্ব স্ব মত প্রকাশ করলেন। আচার্যপুত্র অশ্বত্থামা প্রাণত্যাগে উদ্যত নগরপালদের ইঙ্গিত অবগত হয়ে রাজা দুর্যোধনের নবোদিত সূর্যতুল্য সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘শুনুন, পণ্ডিতেরা স্বামীভক্তি, দেশকালাদি সম্পত্তি, রণপটুতা ও নীতি এই কয়েকটিকে যুদ্ধের সাধন বলে নির্দেশ করেছেন। আমাদের যে সব দেবতুল্য লোকপ্রবীর মহারথগণ নীতিজ্ঞ, রণদক্ষ, প্রভুপরায়ণ, ও নিয়ত যুদ্ধে নিযুক্ত ছিলেন, তাঁরা কেউ যুদ্ধের দ্বারা পরাজিত হননি। পাণ্ডবরা তাঁদের পিছন থেকে লুকিয়ে হত্যা করেছেন। তা বলে জয়ের আশা ত্যাগ করা উচিত নয়। সুনীতি প্রয়োগ করলে দৈবকেও অনুকূল করা যায়। এখন আপনি বিশ্রাম করুন। আপনি শান্ত হোন।’

অতি প্রত্যূষে পুনরায় আবার সকলে একত্রিত হলেন। দুর্যোধনকে সম্ভাষণ করে বললেন, ‘হে মহারাজ! আপনি একজন সেনাপতি নিযুক্ত করুন, আমরা সেই সেনাপতির নিকট রক্ষিত হয়ে সম্মুখ সমরে সমুদয় শত্রুকে পরাজিত করবো।’ তখন রাজা দুর্যোধন নিজের রথে বসেই অশ্বত্থামার কাছে গেলেন।

অশ্বত্থামার রূপের কোনো তুলনা ছিলো না। তিনি বায়ুর মতো বলবেগশালী এবং তেজে দিবাকর ও বুদ্ধিতে শুক্রাচার্য। দুর্যোধন সেই দ্রোণপুত্রের নিকট গিয়ে বললেন, ‘হে গুরুপুত্র! আজ আপনিই অগতির গতি। আপনিই বলুন কাকে সেনাপতিপদে অভিষিক্ত করবো।’ অশ্বত্থামা দুর্যোধনের বাক্য শুনে তখনি বললেন, ‘হে মহারাজ! মদ্রাধিপতি শল্য বলবীর্যে শ্রী ও যশ প্রভৃতি অশেষ গুণসম্পন্ন এবং সৎকুলসম্ভূত। ঐ মহাবীরকেই আপনি আমাদের সেনাপতির পদে অভিষিক্ত করুন। ঐ মহাত্মা নিজের ভাগিনেয়দের ছেড়ে আমাদের নিকট উপস্থিত হয়েছেন, তাঁর মিত্রতার তুলনা নেই।’

তখন দুর্যোধন রথ থেকে নেমে ভীষ্মসদৃশ মহাবীর মদ্রাধিপতিকে বললেন, ‘হে মিত্রবৎসল, আপনি আমাদের বন্ধু। অসময়েই মানুষ জানতে পারেন কে বন্ধু আর কে নয়। অতএব আপনি আমাদের সেনাপতি পদে অভিষিক্ত হোন।’

শল্য বললেন, ‘হে কুরুরাজ, তুমি আমাকে যা বলবে, আমি তাই করবো। আমার রাজ্য মনপ্রাণ যা কিছু আছে সবই তোমার।’

দুর্যোধন বললেন, ‘হে মাতুল! আমি আপনাকে সেনাপতিপদে বরণ করছি। আপনি আমাদের রক্ষায় প্রবৃত্ত হোন।’

শল্যরাজ বললেন, ‘হে মহারাজ! আমি যা বলছি তুমি তা অবিহিত হয়ে শোনো। ধনঞ্জয় আর বাসুদেবকে শ্রেষ্ঠ মনে করো না। সমস্ত পৃথিবী উদ্যত হলেও, আমি ক্রোধাবিষ্ট হলে অনায়াসেই তাদের জয় করতে পারি। এখন আমি তোমার সেনাপতি হয়ে বিপক্ষগণের নিতান্ত দুর্ভেদ্য ব্যূহ রচনা এবং সমস্ত পাণ্ডবদের পরাজিত করবো সন্দেহ নেই।’

বস্তুতই মদ্রাধিপতি শল্য একজন প্রকৃত যোদ্ধা। অবশ্য কুরুকুলে কুরুরাজ দুর্যোধন তো আছেনই, তাঁর জন্য যাঁরা প্রাণ দিয়েছিলেন তাঁরা কেউ এমন যোদ্ধা ছিলেন না, যাঁদের সঙ্গে যুদ্ধ করে পাণ্ডবপক্ষের কেউ জয়ী হতে পারেন। পারেনওনি। কৃষ্ণের মিথ্যাচারেই অর্জুনের মতো যোদ্ধা একবারের জন্যও রণক্ষেত্রে তাঁর পারদর্শিতার প্রমাণ রাখার অবকাশ পেলেন না। ভীষ্ম দ্রোণ জয়দ্রথ ভূরিশ্রবা কর্ণ কারো সঙ্গে তাঁকে যুদ্ধ করতে দেননি বাসুদেব। প্রত্যেককে যুদ্ধ ছাড়াই পিছন থেকে অতর্কিতে অথবা অসৎপন্থায় নিহত করিয়েছেন। যুদ্ধের শেষদিন পর্যন্ত তাঁর এই অন্যায় কর্ম অব্যাহত ছিলো।

কর্ণ অর্থিগণের কল্পবৃক্ষ স্বরূপ ছিলেন। যাচকদের কখনোই প্রত্যাখ্যান করতেন না। সাধু ব্যক্তিরা তাঁকে সৎপুরুষ বলে অতীব শ্রদ্ধা করতেন। কর্ণ কৃষ্ণেরও বন্ধু ছিলেন। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও কৃষ্ণ তাঁকে ধর্মচ্যুত করতে পারেননি। দুর্যোধনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কে ফাটল ধরাতে পারেনি। এই সততা কুরুপক্ষের সকলের মধ্যেই বর্তমান ছিলো। দুর্যোধন নিজে একজন বিশেষ মানুষই ছিলেন। তাঁর পক্ষের রাজাগণ এবং সৈন্যগণ তাঁর প্রতি সেজন্যই এতো একনিষ্ঠ ছিলো। তিনি যুধিষ্ঠিরের মতো যুদ্ধের মধ্যে আরামশয্যায় শুয়ে বসে দিন কাটাননি। অবিশ্রান্ত যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত থেকেছেন। পিতৃবৎসল, মিত্রবৎসল, প্রজাবৎসল—এসব গুণ তাঁর মধ্যে প্রভূত পরিমাণে ছিলো। একটি মিথ্যাবাক্যও তিনি উচ্চারণ করেছেন এমন ঘোষণা বিদুরও করতে পারেননি।

যেদিন কর্ণ অন্যায়যুদ্ধে অসহায় অবস্থায় নিহত হলেন, সেই সময়ে যুধিষ্ঠির তাঁর সুবর্ণময় উত্তম শয্যায় শুয়ে আলস্য যাপন করছিলেন। সহর্ষে অর্জুন ও কৃষ্ণ প্রবেশ করলেন। তাঁদের মুখ দেখেই যুধিষ্ঠির বুঝতে পারলেন কর্ণকে তাঁরা নিহত করতে পেরেছেন। তাঁর মুখে উত্তেজনার ভাব ফুটে উঠলো। তিনি গাত্রোত্থান করলেন। শুভসংবাদ অবগত হলেন। কৃষ্ণকে আলিঙ্গন করে তিনি কর্ণের মৃতদেহ দেখবার জন্য ব্যাকুল হয়ে সমরক্ষেত্রে এসে দাঁড়ালেন। আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, ‘এর কথা ভেবে আমি ভয়ে তেরো বৎসর ভালো করে ঘুমোতে পারিনি। আজ সুখে নিদ্রা যাবো।’

কর্ণের মৃত্যুর পরে পাণ্ডবরা নিজেদের নিরাপদ বোধ করছিলেন। তার পরেও শল্য যে যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে একেবারে উথালপাথাল করে তুলবেন সেটা ভাবেননি। পাঞ্চাল আর সোমক আর পাণ্ডবেরা সেই সৈন্যনিপাতনে কৃতান্ততুল্য মদ্ররাজের পরাক্রম দেখে অধীর হয়ে উঠলো। সাত্যকি ভীম নকুল সহদেব অসাধারণ বলসম্পন্ন মদ্রাধিপতিকে সহসা যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে যুদ্ধে উদ্যত দেখে অতি তৎপরতার সঙ্গে তাঁকে পরিবেষ্টন করে মহাবেগসম্পন্ন শর দ্বারা মদ্রাধিপতি শল্যকে নিপীড়িত করতে লাগলেন। শল্য সে সব অগ্রাহ্য করে যুধিষ্ঠিরের দিকেই ধাবিত হলেন। সমরাঙ্গন মৃতের স্তূপে পরিণত হলো। এই যুদ্ধে কৃষ্ণ উপস্থিত ছিলেন না, তাই যুদ্ধটা যুদ্ধের মতোই হলো। যুধিষ্ঠির-পরিবেষ্টিত যোদ্ধাদের বাণে বিদ্ধ হতে হতে এক সময়ে যুধিষ্ঠিরের একটি বাণে তিনি বিনষ্ট হলেন। শল্য যুধিষ্ঠিরের দিকেই তাঁর একান্ত মনোযোগ নিবিষ্ট করেছিলেন। দেখতে পেয়েই অর্জুন ভীম নকুল সহদেব সাত্যকি ধৃষ্ট্যদ্যুম্ন শিখণ্ডী দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র পাঞ্চাল ও সোমকদল তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছিলেন। তাদের সকলের সাহায্যে শেষ পর্যন্ত যুধিষ্ঠির তাঁর জীবনের প্রথম কীর্তি স্থাপন করতে পারলেন। মহাভারত নামের গ্রন্থটিতে যুধিষ্ঠিরের এই একমাত্র বীরত্বের কাহিনী মোটা দাগে অঙ্কিত হলো। মহারাজা শল্য যে তাঁর দ্বারাই বিনষ্ট হয়েছেন, তা যেন অন্য কোনো পরিবেষ্টনকারীর নামে না যায় সেটাই বারে বারে উল্লিখিত হলো।

সেই সময়ে দুর্যোধনের দুর্জয় যুদ্ধ সন্দর্শন করে শত্রুপক্ষ ভীত হলেন। অরাতিগণ কোনোক্রমেই দুর্যোধনকে নিবারিত করতে সমর্থ হলো না। অসংখ্য সৈন্য নিহত হলো। শল্যকে মারতে পেরে তখন অন্যদিকে আনন্দ কোলাহল শুরু হলো, কুরুসৈন্যরা পলায়মান হলো। মহারাজা দুর্যোধন সমস্ত সৈন্যগণকে পালাতে দেখে একাই যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করে সরোষ নয়নে প্রত্যেকের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন। ধৃষ্টদ্যুম্ন শিখণ্ডী দ্রৌপদীর পাঁচপুত্র এবং পাণ্ডব পাঞ্চাল কৈকেয় সোমক ও সঞ্জয়গণকে নিবারিত করে মন্ত্রপূত যজ্ঞীয় পাবকের মতো বিচরণ করতে লাগলেন। শত্রুরা ঐ ভয়ঙ্কর রোষপূর্ণ মহাবীরের সম্মুখীন হতে সমর্থ হলো না।

একসময়ে দুর্যোধন রণাঙ্গন ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। তাঁর ক্ষত বিক্ষত দেহ থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিলো, দুই চোখ অশ্রুপ্লাবনে সিক্ত, শোকাকুল হৃদয়ে তিনি হ্রদের দিকে গিয়ে, সেখানে প্রবেশ করে, মায়ার দ্বারা তার জল স্তম্ভিত করে রাখলেন। জল স্তম্ভিত করা বিষয়ে শল্যপর্বে লেখা আছে ‘জলের উচ্ছ্বাস কম্পনাদি সর্বপ্রকার গতিরোধ।’ আধুনিক য়ুরোপীয় সাবমেরিনে লোকসকল জলমধ্যে যেমন অনায়াসে শ্বাসপ্রশ্বাসক্রিয়া নির্বাহ করে থাকে এই জলস্তম্ভন তারই সূক্ষ্ম আদর্শ।

দুর্যোধন হ্রদের মধ্যে প্রবেশ করলে, কৃপাচার্য, অশ্বত্থামা ও কৃতবর্মা এই তিন মহাবীর ক্ষতবিক্ষত দেহে শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে সেই প্রদেশের কাছাকাছি এসে সঞ্জয়কে দেখতে পেলেন। বললেন, ‘নিতান্ত ভাগ্যগুণেই তোমাকে দেখতে পেলাম। আমাদের রাজা দুর্যোধন জীবিত আছে কিনা তা কি তোমরা জানো?’

সঞ্জয় বললেন, ‘আমার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিলো। আমাকে এ কথাই বললেন যে তিনি হ্রদের জলে বিশ্রাম করতে যাচ্ছেন।’ সঞ্জয় তাঁদের হ্রদটিও দেখিয়ে দিলেন। অশ্বত্থামা বেদনার্দ্র সুরে বললেন, ‘হায়! রাজা নিশ্চয়ই জানতেন না আমরা জীবিত আছি। কী কষ্ট! আমরা তাঁর সঙ্গে মিলে অনায়াসেই যুদ্ধে অরাতি দমন করতে পারতাম।’

দ্রুতপদে তাঁরা রাজা দুর্যোধনের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হলেন। অতি মৃদুকণ্ঠে বললেন, ‘মহারাজ, তুমি হ্রদ থেকে উঠে এসো, আমাদের সমভিব্যহারে যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও। হয় পাণ্ডুনন্দনকে নিহত করে পৃথিবী ভোগ করো, নচেৎ নিজে নিহত হয়ে সুরলোক প্রাপ্ত হও। হে দুর্যোধন! তুমি একাই পাণ্ডবসৈন্য সমুদয়কে প্রায় বিনাশ করেছো, যারা অবশিষ্ট আছে তারাও তোমার শরনিকরে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। আমরা তোমাকে রক্ষা করবো, পাণ্ডবরা তোমার বেগ সহ্য করতে পারবে বলে মনে হয় না।’

অশ্বত্থামা বললেন, ‘হে বীর! কাল প্রভাতে আমি যদি শত্রুদের বিনাশ করতে না পারি তবে যেন আমার দানধ্যান যাগযজ্ঞ সব বিফল হয়। আমি নিশ্চয় করে বলতে পারি যদি ওরা যুদ্ধ কাকে বলে সেই জ্ঞান মনে রেখে অবতীর্ণ হয়, তবে আমি বলছি পাঞ্চালগণকে শেষ না করে কবচ পরিত্যাগ করবো না। তুমি কিছু ভেবো না, শান্ত মনে বিশ্রাম করো। শঠতা না করলে অবশ্যই আমাদের জয় হবে।’

কিন্তু এখানেও বিধি বাম হলো।

কয়েকটি ব্যাধ, যারা ভীমের জন্যে মাংস সরবরাহ করতো, যাদের কাছে যুধিষ্ঠির কিছু পূর্বেই দুর্যোধনকে তারা দেখেছে কিনা জিজ্ঞেস করেছিলেন, তারা আড়াল থেকে এই সব আলোচনা শুনে ফেললো। ব্যাপারটা বুঝে পরস্পরের দিকে অর্থপূর্ণভাবে তাকালো।

সকলেই সকলের মনের বাসনা জ্ঞাত হয়ে অস্ফুটে বললো, ‘ইতিপূর্বে যুধিষ্ঠির দুর্যোধনের কথা আমাদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন। মনে হয় রাজা দুর্যোধন নিশ্চয়ই এই হ্রদের কোথাও অবস্থান করছেন। চলো, আমরা গিয়ে এই বৃত্তান্ত প্রকাশ করি। তা হলে তাদের নিকট আমরা বিপুল অর্থ প্রাপ্ত হবো। তবে আর আমাদের প্রতিদিন এই রকম শুষ্ক মাংস বহন করতে হবে না।’ এই বলে তাড়াতাড়ি তারা পাণ্ডবদের শিবিরের দিকে রওনা হলো।

তাদের কাছে দুর্যোধনের খবর শুনে পাণ্ডবভ্রাতারা ও কৃষ্ণ তখুনি রথারোহণে সাগরতুল্য দ্বৈপায়ন হ্রদের তীরে এসে উপস্থিত হলেন। শঙ্খনাদ, রথের শব্দ এবং সৈন্যদের কোলাহলে নিঝুম হ্রদের তীর কম্পিত হয়ে উঠলো।

কৃপাচার্য, অশ্বত্থামা ও কৃতবর্মা দুর্যোধনকে অস্ফুটে বললেন, ‘রাজা! পাণ্ডবরা আসছে, আমাদের এবার যাবার অনুমতি দাও, আমরা চলে যাই।’

দুর্যোধন বললেন, ‘তারা এই স্থানে এলো কেন? কেউ তাদের কোনো খোঁজ দিয়েছে?

তাঁরা বললেন, ‘তা বোধহয় নয়। যাই হোক, আমরা সরে যাই, নচেৎ বুঝে যাবে।’ এ বলে অতিশয় বিষণ্ণমনে চলে গেলেন তাঁরা। কিন্তু শিবিরে গেলেন না। কিছু দূরেই একটি বৃক্ষের তলায় গিয়ে বসলেন।

যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে সবাই এসেছে। কৃষ্ণ অর্জুন ভীম নকুল সহদেব ধৃষ্ট্যদ্যুম্ন শিখণ্ডী সাত্যকি দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র সবাই দ্বৈপায়ন হ্রদের তীরে সমুপস্থিত হলেন। যুধিষ্ঠির বললেন, ‘কৃষ্ণ! ঐ দ্যাখো, দুর্যোধন মায়াবলে জলস্তম্ভ করে হ্রদের মধ্যে অবস্থান করছেন। আমি ঐ মায়াবীকে কদাচ জীবিতাবস্থায় পরিত্যাগ করবো না। যদি স্বয়ং ইন্দ্র ওর সহযোগিতা করেন, তবুও লোকে একে সংগ্রামে নিহত দর্শন করবে।’

যুধিষ্ঠির জলমধ্যস্থিত মহাবল পরাক্রান্ত দুর্যোধনকে বললেন, ‘তুমি সমস্ত ক্ষত্রিয় বিনষ্ট করে এখন নিজের জীবন রক্ষার্থে জলাশয়ে প্রবেশ করেছো। এই মুহূর্তে জল থেকে উঠে এসো। আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করো। তোমার দর্পের তো কোনো সীমা ছিলো না, এখন সেই দর্প তোমার কোথায় গেলো? সভামধ্যে সকলেই তোমাকে বীরপুরুষ বলে থাকে, এখন তারাই বা কোথায় গেলো? নির্লজ্জ! এখন তুমি প্রাণভয়ে জলের মধ্যে লুকিয়ে আছো। ভেবো না এই সলিলমধ্যে লুকিয়ে থাকলে তুমি নিস্তার পাবে। তুমি কুরুবংশে জন্মগ্রহণ করেছো, যুদ্ধে ভীত হয়ে সলিলমধ্যে পলায়ন, এটা তোমার নিতান্ত অন্যায়। সমরে পরাঙ্মুখ হয়ে অবস্থান করা ক্ষত্রিয়ধর্ম নয় (যুধিষ্ঠির সর্বদাই যা করেছেন)। হে দুরাত্মা! তুমি লোকসম্মুখে আপনাকে যে বীর বলে পরিচয় প্রদান করো তা নিতান্ত নিরর্থক। বীরপুরুষেরা প্রাণান্তেও শত্রুসন্দর্শনে পলায়ন করেন না। তুমি এখন জল থেকে উত্থিত হয়ে যুদ্ধ করো। তুমি মোহবশত কর্ণ এবং শকুনিকে আশ্রয়পূর্বক আপনাকে অমর জ্ঞান করে যে পাপাচরণ করেছো এখন তার ফল ভোগ করো। তোমার ন্যায় বীরপুরুষেরা কখনোই সমর পরিত্যাগপূর্বক পলায়ন করে না। তুমি আর কীসের আশায় জলাশয়ে শায়িত আছো? ওঠো, গাত্রোত্থান করো, যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও। আমাদের পরাজিত করে এই পৃথিবী ভোগ করো।’

দুর্যোধন জলের মধ্যে থেকেই বললেন, ‘প্রাণীমাত্রেরই অন্তঃকরণে ভয়সঞ্চার হওয়া বিচিত্র নয়। কিন্তু আমি প্রাণভয়ে পলায়ন করিনি। সংগ্রামে আমার রথ ও তূণীর দুই-ই বিনষ্ট হয়েছে। সৈন্য সামন্ত পৃষ্ঠপোষক নিহত হয়েছে। আমি অতিরিক্ত পরিশ্রান্ত হয়েই সলিলমধ্যে প্রবেশ করে বিশ্রামের চেষ্টা করছি। প্রাণভয়ে বা বিষাদযুক্ত হয়ে এখানে লুকোতে আসিনি। অনুচরগণের সঙ্গে তুমিও কিয়ৎকাল বিশ্রাম নাও। আমি অবিলম্বেই সলিল থেকে সমুত্থিত হয়ে সংগ্রাম করবো।’

যুধিষ্ঠির বললেন, ‘আমাদের কোনো বিশ্রামের প্রয়োজন নেই। তুমি অবিলম্বে হ্রদের মধ্য থেকে উত্থিত হয়ে আমাদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও। আমাদের হাতে নিহত হয়ে বীরলোক প্রাপ্ত হও।’

দুর্যোধন বললেন, ‘আমি যাদের জন্য রাজ্যলাভের অভিলাষ করেছিলাম, আমার সেই সমস্ত ভ্রাতা পরলোক গমন করেছে। পৃথিবীও রত্নহীন, ক্ষত্রিয় বলেও আর কিছু নেই। এই অবনীকে ভোগ করতে আর আমার কোনো স্পৃহা নেই। হে যুধিষ্ঠির! আমি এখনো পাণ্ডবগণকে ভগ্নোৎসাহ করে তোমাকে পরাজিত করতে পারি। কিন্তু পিতামহ ভীষ্ম, দ্রোণ এবং কর্ণকে হারিয়ে আমার মনে আর যুদ্ধের কোনো স্পৃহা নেই। তুমিই এখন সকলকে নিয়ে এই পৃথিবী ভোগ করো। আমার জীবনধারণেরও কোনো ইচ্ছা নেই। আমি মৃগচর্ম পরিধান করে বনে গমন করবো। ভোগে আর বিন্দুমাত্র স্পৃহা অনুভব করছি না।’

যুধিষ্ঠির বললেন, ‘আর পরিতাপ করে কী হবে? তোমার আর্তপ্রলাপে আমার মনে অণুমাত্র দয়ার সঞ্চার হচ্ছে না। তুমি পৃথিবী দান করলে আমি নেবো কেন? আর এখন তুমি পৃথিবী দান করবার কে? এখন তোমার এই রাজ্য বলপূর্বক গ্রহণ বা দান করবার ক্ষমতাই কি আছে? দুর্যোধন, তুমি রাজ্য দানে অভিলাষী হলেও, আমি তোমার প্রাণ রক্ষা করবো না। এখন তোমার জীবন আমার অধীন। আমি ইচ্ছে করলে তোমার প্রাণ রক্ষা করতে পারি, কিন্তু তুমি আত্মপরিত্রাণে কখনোই সমর্থ হবে না। এখন তুমি জল থেকে উত্থিত হয়ে সংগ্রামে প্রবৃত্ত হও।’

এবার জল আলোড়িত করে উঠে এলেন দুর্যোধন। যুদ্ধে কৃতনিশ্চয় হয়ে বললেন, ‘তোমাদের রথ ও বাহন, বন্ধুবান্ধব সবই আছে। কিন্তু আমি একা এবং বিরথ, অত্যন্ত পরিশ্রান্ত। এখন তোমরা অনেকে রথারূঢ় হয়ে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমাকে চারদিক থেকে বেষ্টন করে আছো, সুতরাং আমি কী করে তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবো? অতএব, তোমরা একে একে আমার সঙ্গে সংগ্রামে প্রবৃত্ত হও। তোমাদের কারোকে দেখেই আমার মনে কোনো ভয়ের সঞ্চার হচ্ছে না। আমি একা তোমাদের সকলকে নিবারণ করবো। হে যুধিষ্ঠির! আমি তোমাকে তোমার ভ্রাতৃগণের সঙ্গে নিপাতিত করে বাহ্লীক ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, জয়দ্রথ, শল্য, ভূরিশ্রবা শকুনি এবং আমার ভ্রাতাগণ পুত্রগণ ও বন্ধুবান্ধব সকলের ঋণ পরিশোধ করবো।’

যুধিষ্ঠির বললেন, ‘তোমার অভীষ্ট আয়ুধ গ্রহণ করে আমাদের মধ্যে যে কোনো বীরের সঙ্গে সমাগত হয়ে যুদ্ধ করো। আমরা সকলে রণস্থলে অবস্থানপূর্বক যুদ্ধব্যাপার নিরীক্ষণ করবো। এখন আমি বলছি, তুমি আমাদের মধ্যে একজনকে বিনাশ করতে পারলে, সমুদয় রাজ্য তোমার হবে।’

দুর্যোধন বললেন, ‘যদি আমাকে একজনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়, তা হলে আমি তোমাদের মধ্যে যে সর্বাপেক্ষা বলশালী তার সঙ্গেই যুদ্ধ করবো। তুমি আমাকে যে কোনো আয়ুধ গ্রহণ করতে বলেছো, আমি এই গদা মনোনীত করলাম। এখন তোমাদের মধ্যে যিনি আমার বলবীর্য সহ্য করতে সমর্থ, তিনিই আসুন।’

যুধিষ্ঠির বললেন, ‘তুমি যে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে গদাযুদ্ধে প্রবৃত্ত হও।’

দুর্যোধন তাঁর সুদৃঢ় ভীষণ লৌহময় গদা কাঁধে নিয়ে প্রচণ্ড মার্তণ্ডের ন্যায় সমাগত হলেন। বললেন, ‘হে পাণ্ডবগণ! আমি অচিরাৎ তোমাদের যমালয়ে প্রেরণ করবো।’

যুধিষ্ঠির বললেন, ‘এখন তুমি কবচ পরিধান, কেশকলাপ বন্ধন ও যে কোনো দ্রব্যের অভাব থাকে, সে সব গ্রহণ করো। আমি এখনো বলছি, তুমি পাণ্ডবদিগের যার সঙ্গে অভিরুচি হয়, যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও। হয় তাকে বিনাশ করে রাজ্যপদ লাভ করো, না হয় তার হস্তে নিহত হয়ে স্বর্গসুখ অনুভব করো।’



দুর্যোধন সুবর্ণময় বর্ম ও কনকমণ্ডিত বিচিত্র শিরস্ত্রাণ গ্রহণ করে গদা সমুদ্যত করে পাণ্ডবদের বললেন, ‘হে বীরগণ, এখন তোমরা কে আসবে এসো। আমি ক্রমে ক্রমে সকলকেই বিনাশ করে বৈরানল নির্বাণ করবো।’

যখন দুর্যোধন এভাবে তর্জনগর্জন করছিলেন, কৃষ্ণ পরম ক্রোধান্বিত হয়ে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, ‘আপনি কোন সাহসে বলছেন যে আমাদের মধ্যে যাকে খুশি তাকে বেছে নাও? আপনি দুর্যোধনের সঙ্গে পারবেন লড়তে? সে যদি এখন আপনাকে চায়? আপনি কেন, অর্জুন নকুল সহদেব কেউ কি পারবে? তখন? তখন আপনার কী হবে ভেবে দেখেছেন? গদাযুদ্ধে দুর্যোধন অতিশয় পারদর্শী, ভীমসেনও পারবেন কিনা সন্দেহ। পূর্বে দ্যূতক্রীড়া করে যে সর্বনাশ করেছিলেন, আবার তাই হবে। দুর্যোধন গদাযুদ্ধে কৃতী, যদি তিনি ভীমসেনকে চান, তবু রক্ষা। ভীমসেন পরাক্রমশালী, ভাগ্যবলে ভীমসেনকে নির্বাচন করলে তবু কিছু আশা করা যায়। নচেৎ, সেই পাশাক্রীড়াই পুনরায় শুরু হবে বলে ধরে নিন। যেখানে ভীমসেন পারবে কিনা সন্দেহ, আপনি এই প্রতিজ্ঞা করে বসলেন, আমাদের মধ্যে যার সঙ্গে খুশি তার সঙ্গেই এই গদাযুদ্ধে অবতীর্ণ হও।’

কৃষ্ণের কথা শুনে ভীম বললেন, ‘যদুনন্দন! তুমি বিষণ্ণ হয়ো না। আমি নিশ্চয়ই দুর্যোধনকে বিনাশ করবো।’

একথা শুনে কৃষ্ণ আশ্বস্ত হয়ে বললেন, ‘হে বীর! যুধিষ্ঠির তোমার বাহুবলেই আজ অরাতিবিহীন হয়ে রাজলক্ষ্মী লাভ করতে চলেছেন। এখন তুমি দুর্যোধনকেও নিপাতিত করে, বিষ্ণু যেমন দেবরাজকে স্বর্গরাজ্য প্রদান করেছিলেন তুমিও ধর্মরাজকে সেইরূপ পৃথিবী প্রদান করো।’

ভীমসেনকে তারপর সবাই খুব প্রশংসা করতে লাগলেন।

ভীমসেন বললেন, ‘ঐ পুরুষাধম কখনোই আমাকে পরাজিত করতে পারবে না। আজ গদার আঘাতে ঐ পাপাত্মার প্রাণসংহার পূর্বক দুর্যোধনের প্রতি হৃদয়নিহিত ক্রোধানল নিক্ষেপ করবো।’ এই বলে ভীম গদা উত্তোলন করে দাঁড়ালেন।

দুর্যোধনও উত্তম মাতঙ্গ যেমন মত্ত মাতঙ্গ প্রতি ধাবমান হয়, সেভাবে ভীমসেনের প্রতি ধাবমান হলেন। নির্ভয়শরীরে অসংকোচিতচিত্তে সমরক্ষেত্র অবলোকন করতে লাগলেন। তারপর বললেন, ‘বাগাড়ম্বর করবার প্রয়োজন নেই। অবিলম্বে আমার সঙ্গে সংগ্রামে প্রবৃত্ত হও। আমি সিক্ত দেহ তাতেই শুষ্ক করে নেবো। শোনো, ন্যায়ানুসারে গদাযুদ্ধে সুররাজ পুরন্দরও আমাকে পরাজিত করতে সক্ষম নন। কিন্তু বাসুদেবের পরামর্শে অন্যায়যুদ্ধে প্রবৃত্ত হয়ো না। সেটা ব্রাত্যের ধর্ম হতে পারে, ক্ষত্রিয়ের ধর্ম নয়।’

বীরদ্বয়ের ভীষণ গদাযুদ্ধ আরম্ভ হলে পাণ্ডবগণ সকলেই উপবেশন করলেন। ঐ সময়ে বলরামও শিষ্যদ্বয়ের সংগ্রাম বৃত্তান্ত অবগত হয়ে সেখানে এলেন। তাঁকে দেখে সকলেই খুব প্রীত হলেন। তিনি তাঁর শিষ্যদ্বয়ের যুদ্ধ দেখতে বসলেন। বলরাম কৃষ্ণকে বলেছিলেন, ‘তুমি কৌরবপক্ষে যুদ্ধ করো,’ কিন্তু কৃষ্ণ সেকথা না শুনে পাণ্ডবপক্ষে গেলেন। তখন বলরাম রোষপরবশ হয়ে, কারো পক্ষ অবলম্বন না করে, তীর্থযাত্রায় নির্গত হয়েছিলেন। প্রত্যাবর্তনের পথে শিষ্যদ্বয়ের গদাযুদ্ধের সংবাদ পেয়ে এখানে এসেছেন। সকলেই তাঁকে যার যার সম্পর্ক অনুযায়ী আলিঙ্গন অভিবাদন নমস্কার পূর্বক স্বাগত ও কুশল প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন। রাজা দুর্যোধন আর ভীমও এসে অতিপ্রীতমনে নমস্কার পূর্বক স্বাগত ও কুশল প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন। অনন্তর, তিনিও অতি প্রীতমনে গদাযুদ্ধ নিরীক্ষণ করবার জন্য উপবেশিত হলেন।

ভীম চিৎকার করে দুর্যোধনকে নানা বাক্যশল্যে বিদ্ধ করছিলেন। দুর্যোধন বললেন, ‘কেন বৃথা বাগজাল বিস্তার করছো, অদ্য অবশ্যই তোমার যুদ্ধ করার ঔৎসুক্য অপনোদন করবো। দুর্যোধন সামান্য ব্যক্তির মতো তৎসদৃশ লোকের কথায় ভীত হবার পাত্র নয়। আমার বহুদিনের বাসনা তোমার সঙ্গে গদাযুদ্ধ করবো। আজ দৈব অনুকূল। এখন বৃথা বাক্য ব্যয় না করে অচিরাৎ কার্যে সেটা পরিণত করো।’ বলেই মহাবেগে ভীমের দিকে ধাবমান হলেন।

অনন্তর পরস্পর পরস্পরকে আক্রমণপূর্বক জিগীষাপরবশ হয়ে তুমুল যুদ্ধে ব্যাপৃত হয়ে রণস্থলে ঘোরতর শব্দ সমুত্থিত করলেন। গদা নিষ্পেষণে হুতাশনস্ফুলিঙ্গ বিদ্যুতের মতো চমকাতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরে দুজনে শ্রমকাতর হয়ে মুহূর্তকাল বিশ্রাম করে, পুনরায় যুদ্ধ শুরু করলেন। সেই বীরদ্বয়ের যুদ্ধ দেখে সকলেই বিস্ময়াবিষ্ট হলেন এবং কার যে জয়লাভ হবে স্থির করতে পারলেন না। দুই যোদ্ধাই দুজনকে বিবিধ কৌশল দেখিয়ে সময় সুযোগমতো আঘাত করতে লাগলেন।

একসময়ে অর্জুন দুই যোদ্ধার এই ঘোরতর যুদ্ধ দেখতে দেখতে কৌতূহলবশত কৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এঁরা সমানেই যুদ্ধ করছেন। তোমার মতে এঁদের মধ্যে কে অপেক্ষাকৃত যুদ্ধকুশল এবং কারই বা কোন গুণ অধিক বলো তো।’

কৃষ্ণ বললেন, ‘এঁরা দুজনেই সমান উপদেশ পেয়েছেন। তবে ভীমসেন বলবান বটে কিন্তু দুর্যোধন ভীমসেন অপেক্ষা অনেক বেশি শিক্ষিত এবং যুদ্ধনৈপুণ্যে অনেক বেশি পটুত্ব অর্জন করেছেন। ভীমসেন ন্যায়যুদ্ধে কখনোই দুর্যোধনকে পরাজিত করতে পারবেন না। অন্যায় যুদ্ধ করেই দুর্যোধনকে বিনষ্ট করতে হবে। যদি ভীমসেন দুর্যোধনের সঙ্গে ন্যায়যুদ্ধ করেন, তবে রাজা যুধিষ্ঠির মহাসংকটে নিপতিত হবেন। পুনরায় ধর্মরাজের অপরাধেই আমাদের মহৎ ভয় উপস্থিত হয়েছে। ভীষ্ম প্রভৃতি মহাবীরগণ নিহত হওয়াতেই আমরা জয়লাভ করেছিলাম। এখন আবার ধর্মরাজের জন্যই ঘোর বিপদ উপস্থিত। তবু ভালো দুর্যোধন তাঁকেই যুদ্ধে আহ্বান করেননি।’ বীরগণ অবশ্য তা কখনো করেনও না। তদ্ব্যতীত, দুর্যোধন যুধিষ্ঠিরের মতো শুয়ে বসে অন্যদের বিক্রমে যুদ্ধ করেননি। তাঁর রাজত্বও তিনি তাঁর একার যোগ্যতাতেই অতি সুশৃঙ্খলভাবে চালিয়েছেন।

কৃষ্ণের কথা শুনে অর্জুন ভয় পেলেন। বললেন, ‘তা হলে কী হবে?’

কৃষ্ণ বললেন, ‘অন্যায় যুদ্ধেই জয়ী হতে হবে।’

অর্থাৎ এই পর্যন্ত যা করে এসেছেন, যে পরামর্শ দিয়ে এসেছেন, পুনরায় সে কার্যই করলেন তিনি। যুদ্ধের চরম মুহূর্তে অর্জুন ইঙ্গিতে তখন ভীমকে নিজের ঊরুদেশটা দেখিয়ে দিলেন। অর্থাৎ মনে করিয়ে দিলেন তিনি দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গের প্রতিজ্ঞা করেছিলেন।

বৃকোদর তদ্দর্শনে তাঁর অভিপ্রায় অবগত হয়ে গদাহস্তে বিবিধ গতি প্রদর্শন পূর্বক পরিভ্রমণ করে দুর্যোধনকে চমৎকৃত করতে লাগলেন। আরো কিছুক্ষণ অবিরাম যুদ্ধ করে সংগ্রামে উভয়েই পরিশ্রান্ত হয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে, দুজনেই পুনরায় ক্রুদ্ধচিত্তে গদা গ্রহণ পূর্বক সংগ্রাম শুরু করলেন। পরস্পর পরস্পরের আঘাতে শোণিতাক্ত কলেবর হয়ে আরো দুর্জয় হয়ে উঠলেন। একসময়ে ভীম মিথ্যা দৌর্বল্য দেখিয়ে, দুর্যোধনকে ঈষৎ গর্বিত করে, তাঁর প্রতি ধাবমান হতে প্রলোভিত করলেন। দুর্যোধন যেইমাত্র তাঁর সম্মুখীন হলেন তৎক্ষণাৎ ভীম অতি বেগে গদা নিক্ষেপ করলেন। দুর্যোধনও তৎক্ষণাৎ সেই স্থল হতে বহুদূরে অপসৃত হলেন। সুতরাং ভীমের এই সুযোগটা ব্যর্থ হলো। দুর্যোধন তখন স্বীয় গাদঘাতে ভীমকে এতো জোরে আঘাত করলেন যে বৃকোদর প্রায় মূর্ছাগত হলেন। এ অবস্থায় ভীমকে অবস্থিত দেখে দুর্যোধন আর তাঁকে প্রহার করতে পারলেন না। মানবিক ধর্ম প্রযুক্ত হয়ে ভীমকে সুস্থ হবার অবকাশ দিলেন। তিনি কুরুকুলের রাজা দুর্যোধন! বীর্যপ্রয়োগেও তাঁরা নিয়ম কানুনের অধীন। কৃষ্ণের মিথ্যাচারে সমাচ্ছন্ন পাণ্ডবদের প্রবঞ্চনা তিনি জানেন না। যেই মুহূর্তে দুর্যোধন একটু স্থির হলেন, তৎক্ষণাৎ ভীম দুর্যোধনের প্রতি মহাবেগে ধাবিত হলেন। ভীমকে রোষান্বিত চিত্তে আগমন করতে দেখে, তাঁর গদাঘাতের প্রহার ব্যর্থ করবার জন্য দুর্যোধন ঊর্ধ্বে উঠবার চেষ্টা করলেন, এবং লম্ফ দিয়ে যেই মাটি ছাড়লেন, তৎক্ষণাৎ বৃকোদর তাঁদের চিরাচরিত মিথ্যা কৌশলে, যুদ্ধের নিয়ম ভেঙে, তাঁর বজ্রতুল্য ভীষণ গদা দুর্যোধনের দিকে মহাবেগে নিক্ষেপ করে তাঁর জানুদ্বয় ভঙ্গ করে ভূতলে নিপাতিত করলেন। তারপর তাঁর মস্তক পা দিয়ে মাড়িয়ে দিলেন।

এই অন্যায় যুদ্ধ দেখে বলরাম অত্যন্ত ক্রোধাবিষ্ট হলেন। হাত তুলে ভীষণ আর্তনাদ পরিত্যাগ ও ভীমসেনকে বারংবার ধিক্কার দিয়ে বললেন, ‘ধর্মযুদ্ধে নাভির অধঃস্থলে গদাঘাত করা নিতান্ত অন্যায় হয়েছে। গদাযুদ্ধে ভীম যেরকম কুকার্যের অনুষ্ঠান করলো, এরকম আর কখনো দৃষ্টিগোচর হয়নি। নাভির নিচে কদাচ গদাঘাত করবে না, এটা শাস্ত্রের নিয়ম ও স্থির সিদ্ধান্ত। কিন্তু মহামূর্খ বৃকোদর শাস্ত্রসম্মত ব্যবহার অতিক্রম করে স্বেচ্ছাচারে প্রবৃত্ত হয়েছে।’ বলতে বলতে ক্রোধে একান্ত অধীর হয়ে লাঙল উদ্যত করে মহাবেগে ভীমের দিকে ধাবমান হলেন। অনেক কষ্টে বাসুদেব তাঁকে শান্ত করলেন।

হলধর বললেন, ‘সাধু লোকেরাই ধর্মের অনুষ্ঠান করে থাকেন, কিন্তু সেই ধর্ম, অর্থ ও কাম দ্বারা নষ্ট হয়। অতএব, যে ব্যক্তি ধর্ম অর্থ ও কামের প্রতি সমদৃষ্টি সম্পন্ন হয়ে কালযাপন করতে পারে, সে-ই যথার্থ সুখভোগে সমর্থ হয়। হে হৃষিকেশ! এখন তুমি যতো চেষ্টাই করো না কেন, ভীম যে অধর্মাচরণ করেছে, তা আমার মন থেকে কখনোই দূর করতে সমর্থ হবে না। ভীম ধর্মপরায়ণ দুর্যোধনকে অধর্মানুসারে বিনষ্ট করেছে, এই কূট যোদ্ধাকে আমি কখনোই ক্ষমা করতে পারবো না। আর ন্যায়যুদ্ধ করার জন্য দুর্যোধন শাশ্বত স্বর্গ লাভ করবেন।’ এই বলে নিতান্ত অসন্তুষ্ট চিত্তে তিনি চলে গেলেন সেখান থেকে।

অতঃপর কৃষ্ণ যখন দুর্যোধনের বিরুদ্ধে অনেক কটুবাক্য প্রয়োগ করছিলেন, তখন দুর্যোধন কৃষ্ণের মুখে ঐ ধরনের বাক্য শুনে হাতে ভর দিয়ে উঠে বসলেন। বললেন, ‘হে কংসদাসতনয়! অর্জুন তোমারই নির্দেশে ভীমকে আমার ঊরুভঙ্গ করতে ইঙ্গিত করেছিলো। হে নির্লজ্জ! প্রতিদিন তোমার কূট উপায় দ্বারাই যুদ্ধে প্রবৃত্ত সহস্র সহস্র নৃপতি নিহত হয়েছেন। তুমি শিখণ্ডীকে অগ্রসর করে পিতামহকে নিপাতিত করেছো। যুধিষ্ঠির তোমারই প্ররোচনায় মিথ্যা বলে আচার্যকে অস্ত্রশস্ত্র পরিত্যাগ করিয়েছিলো আর সেই অবসরে দুরাত্মা ধৃষ্টদ্যুম্ন তোমারই সমক্ষে আচার্যকে নিহত করেছে। কর্ণ অর্জুনের বিনাশার্থ বহুদিন অতি যত্ন করে যে শক্তি রেখেছিলেন, তুমি তোমার কৌটিল্যের দ্বারা সেই শক্তি ঘটোৎকচের উপর নিক্ষেপ করিয়ে ব্যর্থ করেছো। সাত্যকি তোমারই প্ররোচনায় ছিন্নহস্ত প্রায়োপবিষ্ট ভূরিশ্রবাকে নিহত করেছে। মহাবীর কর্ণ অর্জুন বধে সমুদ্যত হলে তুমি নিজে তার সর্পবাণ ব্যর্থ করেছো। কিন্তু তোমার প্রতিজ্ঞা ছিলো তুমি যুদ্ধ করবে না। তদ্ব্যতীত, একজনের সঙ্গে দুজনের যুদ্ধও অধর্ম। তারপর কী-ভাবে তাকে মারলে! রথ থেকে নেমে সে মাটিতে বসে যাওয়া রথের চাকাটা যখন তুলছিলো এবং বলেছিলো আমি এখুনি চাকাটা তুলে রথে উঠছি, তোমরা যেন আমাকে সেই নিরস্ত্র অবস্থায় মেরে অধর্ম করো না, সেটা ধর্মের বা যুদ্ধের রীতি নয়, তুমি তক্ষুনি অর্জুনকে বললে, ওকে রথে ওঠার সময় দিয়ো না, এই অবস্থাতেই নিহত করো। তোমার কি লজ্জাও হয় না। অনার্য। আজ তুমি আমাকে কীভাবে ভীমকে দিয়ে অন্যায় আঘাতে নিপাতিত করালে।’

এসব শুনতে শুনতে পাণ্ডবগণ ও অন্যরা নিজেদের অধর্মাচরণ স্মরণ করে বিষণ্ণ হলেন। কৃষ্ণ বললেন, ‘হে পাণ্ডবগণ! রাজা দুর্যোধন অসাধারণ সমরবিশারদ এবং ক্ষিপ্রহস্ত। তোমরা কোনোভাবেই তাঁকে ধর্মযুদ্ধে পরাজিত করতে সমর্থ হতে না। তোমাদের হিতের জন্যই আমি এই উপায় উদ্ভাবন করেছি। আর যে সব মহারথীকে কৌশলে নিহত করা হয়েছে, ধর্মযুদ্ধ করলে কি তোমরা কখনো তাঁদের জয় করতে পারতে? সেজন্যই ছলের প্রয়োজনে ছিলো।’

অতঃপর আস্তে আস্তে সকলেই সেখান থেকে চলে গেলেন।

তাঁরা চলে গেলে সঞ্জয় এলেন। তাঁকে দেখে দুর্যোধন বললেন, ‘হে সঞ্জয়! আমার পিতামাতা যুদ্ধধর্ম বিলক্ষণ অবগত আছেন। তুমি তাঁদের বলো, আমি বিবিধ যাগযজ্ঞানুষ্ঠান, ভৃত্য প্রতিপালন, ধর্মানুসারে সসাগরাবসুন্ধরা শাসন, যাচকদিগকে অর্থদান, অধ্যয়ন ও মিত্রগণের প্রিয়কার্য সাধন করেছি। সৌভাগ্যবশত, স্বধর্মনিরত ক্ষত্রিয়গণ যেরূপ মৃত্যু অভিলাষ করে, আমি সেভাবেই মৃত্যুর সাক্ষাৎ পেয়েছি। হে সঞ্জয়! তুমি আমার বাক্যানুসারে অশ্বত্থামা, কৃতবর্মা ও কৃপাচার্যকে বলবে, ‘‘পাণ্ডবেরা নিয়ম ব্যতিক্রম ও সতত অধর্মানুষ্ঠান করে থাকে, অতএব তোমরা যেন তাদের বিশ্বাস করো না’।’’

এদিকে হতাবশিষ্ট অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা দূতদিগের কাছে জানতে পারলেন দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে অতি দ্রুতগামী রথে চলে এলেন সেখানে। দুর্যোধনের অবস্থা দেখে বাষ্পাকুল নয়নে বাকশূন্য হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তাঁদের অতি প্রিয় রাজা আজ রুধিরাক্ত কলেবরে সহসা নিপতিত সূর্যমণ্ডলের ন্যায়, পরিশুষ্ক সাগরের ন্যায়, পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় ভূতলে শায়িত। শোকে দুঃখে তাঁরা অভিভূত হলেন।

দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ক্রন্দনরত কণ্ঠে বললেন, ‘হায়, তুমি পৃথিবী শাসন করতে, আজ তুমি এই নির্জন অরণ্যে এভাবে অবস্থান করছো? কৃতান্তের গতি দুর্জ্ঞেয়। হে মহারাজ! তোমার এ অবস্থা আমি সহ্য করতে পারছি না। তুমি সর্বলোকের মাননীয়, সকলের প্রিয় ইন্দ্র তুল্য বিভবশালী হয়েও এই অবস্থা প্রাপ্ত হলে।’

অশ্বত্থামার কথা শুনে দুর্যোধন দুই হাতে চোখের জল মুছে বললেন, ‘হে বীরগণ! তোমরা তো জানো, কালক্রমে সর্বভূতেরই বিনাশ হয়। ভাগ্যক্রমে, আমি কোনো বিপদেই সমরে পরাঙ্মুখ হইনি; পাপাত্মারা ছলপূর্বক আমার এই অবস্থা ঘটিয়েছে। এই ভালো হলো, এখন আমি সমরক্ষেত্রে জ্ঞাতি ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে নিহত হলাম। আর আজ যে তোমাদের এই ভীষণ জনক্ষয়ের মধ্য থেকে বিমুক্ত দেখছি সেটা আমার পরম সৌভাগ্য!’ দুর্যোধনের চোখের জলে কথা থেমে গেল।

ক্রোধে প্রজ্বলিত হয়ে অশ্বত্থামা দুর্যোধনের হাতে হাত রেখে বললেন, ‘হে মহারাজ! নীচাশয় পাণ্ডবগণ একমাত্র তোমাকেই তো এই নৃশংস ব্যবহারের দ্বারা আহত করেনি, আমার পিতাকেও তো নিধন করেছে। তা-ও আমি ভুলিনি, ভুলবো না। কিন্তু আজ তোমার জন্য যে কষ্ট আমার হৃদয়কে মথিত করছে, এমন কখনো হয়নি। আমি শপথ করছি, যে কোনো প্রকারেই হোক, বাসুদেব সমক্ষেই সমস্ত পাঞ্চালগণকে শমনসদনে প্রেরণ করবো। তুমি অনুজ্ঞা দাও।’

দুর্যোধন প্রীত হয়ে তখনি কৃপাচার্যকে বললেন, ‘আচার্য! সমস্ত নিয়মকানুন মান্য করে আমার সমক্ষেই এখন অশ্বত্থামাকে সেনাপতিপদে বরণ করুন।’

মহাবীর কৃপাচার্য সেই আদেশ শিরোধার্য করে অশ্বত্থামাকে সেনাপতি পদে অভিষিক্ত করলেন, অতঃপর দুর্যোধনকে আলিঙ্গনপূর্বক সবাই বিদায় নিলেন।

সেখান থেকে চলে গিয়ে তাঁরা শিবিরের অনতিদূরে প্রচ্ছন্নভাবে অবস্থান করে ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করতে লাগলেন, রজনী গভীর হয়ে এলে কৃতবর্মা এবং কৃপাচার্য নিদ্রিত হলেন, কিন্তু অশ্বত্থামা বসে রইলেন। তিনি কোনোক্রমেই নিদ্রাচ্ছন্ন হতে পারলেন না। দুর্যোধনকে মেরে পাণ্ডবরা দুর্যোধনদের সমস্ত শিবিরের অধিকার দখল করেছিলেন। অশ্বত্থামা কৃতবর্মা এবং কৃপাচার্যকে জাগরিত করে বললেন, ‘আমি এই সব কূটযুদ্ধের প্রতিশোধ নেবো। আমার পিতৃহন্তাকে, ধৃষ্টদ্যুম্নকে প্রথম হত্যা করে সমস্ত পাঞ্চাল এবং পাণ্ডবদের নিহত করবো। নীচাশয় ভীমসেন মহাবল পরাক্রান্ত অদ্বিতীয় বীর কুরুরাজকে অন্যায় ভাবে আহত করে মস্তকে পদার্পণপূর্বক যে নিষ্ঠুরকার্যের অনুষ্ঠান করেছে, সেটা ভুলে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। অন্যায়ের শাস্তি আমি অন্যায় ভাবেই দেবো। কীভাবে বিনাশ করেছে! হা কর্ণ! তোমাকেই বা কীভাবে বাণবিদ্ধ করলো।’

প্রকৃত অর্থে পাণ্ডবরা একজন মহারথীর সঙ্গেও সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হননি। আজ অশ্বত্থামা দুর্যোধনের কাছে প্রতিজ্ঞা করে এসেছেন, পাণ্ডবগণকে তিনি অবশ্যই বিনাশ করবেন। যে ভাবেই হোক, এখন ওরা বিজয়ী, অস্ত্রশস্ত্র ও উৎসাহশক্তিসম্পন্ন। তাদের সম্মুখ যুদ্ধে কোনোভাবেই বিনাশ করা সম্ভব নয়। ওরা কখনোই ধর্মানুসারে সংগ্রাম করেনি। কৃষ্ণের কুবুদ্ধিতে অন্যায় ব্যতীত একটি বড় যোদ্ধাকেও ধর্মসঙ্গতভাবে বিনাশ করতে সক্ষম হয়নি। সেই ক্ষমতা তাদের ছিলো না। নীচাশয় পাণ্ডবগণ পদে পদে শঠতা পরিপূর্ণ অতি কুৎসিত কার্যে অনুষ্ঠান করেছে। শ্রান্ত ক্লান্ত শস্ত্রদীর্ণ জলসিক্ত দুর্যোধনকে যেভাবে মিথ্যা আক্রমণে আহত করে, বিজয় গর্বে তার শিবির লুঠ করে, পাণ্ডবেরা সুখে নিদ্রা যাচ্ছে, সেই সুখ কেড়ে নেবার জন্য উত্তাল হয়ে উঠলেন অশ্বত্থামা।

অশ্বত্থামাকে কৃপাচার্য বললেন, ‘আমি সম্পূর্ণ অবগত আছি তুমি অতিশয় উত্তেজিত। কিন্তু বৎস, আমার ব্যক্য তুমি মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করো। দৈব ও পুরুষকার অপেক্ষা কিছুই বলবান নয়। ঐ উভয়ের একত্র সমাবেশ না হলে সিদ্ধিলাভ হওয়া নিতান্ত সুকঠিন। পর্জন্য পর্বতোপরি সলিল বর্ষণ করে ফল উৎপাদনে সমর্থ হয় না। কিন্তু কৃষ্টক্ষেত্রে বারিবর্ষণ করলে প্রচুর ফল উৎপন্ন হয়। মনুষ্যের সমস্ত কার্যই দৈব ও পুরুষকারের সংযোগ সাপেক্ষ।’

কৃপাচার্য তাঁকে উৎসাহ দিলেন না, বিরত করতে অনেক চেষ্টা করলেন। কিন্তু অশ্বত্থামাকে কোনোক্রমেই শান্ত করা গেলো না। তাঁর মন তখন শোকানলে দগ্ধ হচ্ছিলো। বিষম দুঃখপ্রভাবে স্থির থাকতে পারছিলেন না। যা তিনি স্থির করেছেন, মনে হলো সেটা করতে পারলেই তাঁর শোক শান্ত হবে। সুতরাং, তাঁর সংকল্প তিনি ত্যাগ করতে অসমর্থ হলেন। সেই মুহূর্তেই স্বীয় পিতা এবং রাজা দুর্যোধনের জন্য তাঁর প্রতিহিংসা প্রবৃত্তি প্রজ্বলিত হয়ে উঠলো। আজ পাণ্ডবরা জয়লাভে প্রফুল্ল হয়ে নিশ্চয়ই কবচ পরিত্যাগ করে শান্তিতে নিদ্রাগত হয়েছে। আজই সুযোগ। পাণ্ডবগণ কী করলো? শঠতা, প্রবঞ্চনা এবং সুযোগের দ্বারাই লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটালো। তা সত্ত্বেও তাঁরা যদি নিন্দনীয় না হন, তাঁরও হবার কথা নয়। পিতৃহন্তাকে নিধন না করা পর্যন্ত মুহূর্তকালও জীবিত থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে না। রাজা দুর্যোধন নিতান্ত অন্যায়ভাবে ভগ্নোরু হয়ে কীভাবে পড়ে আছেন সমরাঙ্গনে। সেই বেদনাতেও বার বার দুই চক্ষু জলে ভরে যাচ্ছে।

কৃপাচার্য ও কৃতবর্মার কোনো প্রবোধবাক্যই তাঁর ক্রোধ উপশমিত করতে পারলো না। অশ্বত্থামা চলে গেলেন শিবিরের নিকট। তারপরে অনেক অলৌকিক ঘটনার ব্যাখ্যা আছে। সেই অপ্রাকৃত ব্যাখ্যায় যাবার দরকার নেই। মোট কথা, ঈশ্বরের পদে নিজেকে সমর্পিত করে, অশ্বত্থামা শিবিরে প্রবেশ করলেন। কৃতবর্মা ও কৃপাচার্য দ্বারদেশে অবস্থান করতে লাগলেন। তাঁদের দেখে দ্রোণপুত্র খুব আহ্লাদিত হলেন, তাঁর মন অনেক সবল হলো। আনন্দিত চিত্তে বললেন, ‘হে বীরদ্বয়! আপনারা যত্ন করলে সবই সম্ভব। আমি এখন কৃতান্তের মতো শিবির মধ্যে প্রবেশ করি।’

শিবির মধ্যে প্রবেশ করে নিঃশব্দ পায়ে ধৃষ্টদ্যুম্নের শয়নাগারে উপস্থিত হলেন। ঐ সময়ে সমরপরিশ্রান্ত পাঞ্চালগণ গাঢ় নিদ্রায় অভিভূত ছিলেন। অশ্বত্থামা দ্রুপদপুত্রের শয়নগৃহে প্রবেশ করে তাকে অকুতোভয়ে নিদ্রায় মগ্ন দেখে প্রচণ্ড জোরে পদাঘাতে জাগরিত করলেন। দুই হাতে তার চুল ধরে মাটিতে নামিয়ে নিষ্পেষিত করতে লাগলেন। ধৃষ্টদ্যুম্ন নিদ্রার ঘোর ও ভয়ে তার প্রতিবিধানের কোনো চেষ্টাই করতে পারছিলেন না। অশ্বত্থামা তাঁর দুপায়ের পাতায় সমস্ত শক্তি সংহত করে ধৃষ্টদ্যুম্নের বক্ষঃস্থল ও কণ্ঠদেশ আক্রমণ করে পশুর মতো নিধন করতে সমুত্থিত হলেন। তখন ধৃষ্টদ্যুম্ন দুহাতের নখর প্রহারে তাঁকে ক্ষতবিক্ষত করতে করতে রুদ্ধস্বরে বললেন, ‘আচার্যপুত্র! তুমি আমাকে অস্ত্রপ্রহারে সংহার করো। তাহলে আমি তোমার প্রসাদে পবিত্রলোকে গমন করতে পারবো।’ অশ্বত্থামা দ্রুপদতনয়ের এই অব্যক্ত বাক্য শ্রবণ করে বললেন, ‘কুলাঙ্গার! আচার্যকে তুমি কী ভাবে সংহার করেছো তা কি তোমার স্মরণে নেই? আচার্য-হন্তা হয়ে এখন তুমি কোনো লোকেই স্থান পাবে না অতএব তোমার উপর আমি কোনো অস্ত্রই নিক্ষেপ করবো না।’ এই বলে সিংহ যেমন মদমত্ত মাতঙ্গের মর্মপীড়া করে সেভাবে পদাঘাতে পদাঘাতে ধৃষ্টদ্যুম্নের মর্মপীড়া করতে লাগলেন। তখন ধৃষ্টদ্যুম্নের চিৎকারে সবাই জেগে উঠলো। কিছু বুঝতে না বুঝতেই অশ্বত্থামা ধৃষ্টদ্যুম্নকে শেষ করে রথে উঠে বসলেন।

ধৃষ্টদ্যুম্নের গৃহ থেকে বহির্গত হতেই শিবিরের প্রধান প্রধান ব্যক্তিরা জাগরিত হয়ে অশ্বত্থামাকে পরিবেষ্টন করলেন। দ্রোণপুত্র তাদের রুদ্রাস্ত্র দিয়ে নিপাতিত করে অনতিদূরে নিদ্রিত উত্তমৌজাকে দেখে তাকেও পদদ্বয়ের শক্তিতে কণ্ঠ ও বক্ষঃস্থল আক্রমণ করে শমনসদনে পাঠালেন। মোটকথা, অশ্বত্থামা শিবিরে নিদ্রামগ্ন মহা মহা যোদ্ধৃগণকে নিধন করে, রুধিরাক্ত দেহে, কালান্তকের চেহারা নিয়ে, সাক্ষাৎ যমের মতো দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র ও শিখণ্ডীসহ আরো অনেক মহারথকে নিধন করে, পাণ্ডবশিবির প্রায় শূন্য করে অপসৃত হলেন। দ্রোণপুত্রের রক্তমাখা ভয়ঙ্কর চেহারা দেখে কেউ ভাবলে ভূত, কেউ ভাবলো রাক্ষস। কেউ যুদ্ধ করতে চেষ্টা করে বিফল হলো, কেউ পালিয়ে গেলো। কিন্তু কেউ তাঁকে চিনতে পারলো না। কিছু করতেও পারলো না। কৃতবর্মা ও কৃপাচার্যও দ্বারদেশে দাঁড়িয়ে থেকে বহু পলায়ন-তৎপর রক্ষীকে নিধন করলেন। তারপর তাঁরাই শিবিরের তিন স্থানে অগ্নিপ্রদান করলেন। অগ্নি প্রজ্বলিত হওয়াতে শিবির আলোকময় হয়ে উঠলো। সেই আলোতে অশ্বত্থামা তরবারি হাতে নিয়ে বিচরণ করতে লাগলেন এবং যারা তাঁর দিকে আসছিলো আর যারা ভয়ে পলায়ন করছিলো সকলকেই বিনাশ করলেন।



দ্রোণপুত্র এইভাবে অর্ধরাত্রির মধ্যেই পাণ্ডবদিগের সমুদয় সৈন্য শমনসদনে প্রেরণ করলেন। কুরুক্ষেত্রের মতো সেখানেও মৃতদেহের স্তূপ জমে উঠলো। শিবিরের সব ঘুমন্ত মানুষ পুনরায় চিরনিদ্রায় নিদ্রিত হলেন। অশ্ব গজ প্রভৃতি সেইসঙ্গে মৃত্যুর স্তূপে পরিণত হয়ে একটা ভীষণ আকৃতি নিলো। অতঃপর কৃতবর্মা, কৃপাচার্য ও অশ্বত্থামা তিনজন আনন্দে করতালি প্রদানপূর্বক হর্ষধ্বনি করতে আরম্ভ করলেন। আনন্দের আতিশয্যে তিনজনেই তিনজনকে আলিঙ্গন করে অতি দ্রুত কুরুরাজ দুর্যোধনের নিকটে এলেন।

এসে দেখলেন তখনো তিনি জীবিত আছেন, কিন্তু দেহের দুর্জয় যন্ত্রণায় প্রায় সংজ্ঞাহীন। এই অবস্থা দেখে তিনজনেই অতি শোকাকুল হয়ে ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস পরিত্যাগ করে তাঁকে স্পর্শ করলেন। দুর্যোধন অতি কষ্টে চক্ষু উন্মীলিত করে তাকালেন তাঁদের দিকে। কুরুরাজকে তাকাতে দেখে তাঁরা দুর্বিষহ দুঃখে অশ্রুসম্বরণ করতে পারলেন না। নিজেদের হস্তদ্বারা দুর্যোধনের মুখ থেকে রক্তধারা মুছিয়ে দিলেন। অশ্বত্থামা কুরুরাজকে সম্বোধন করে বিলাপ ও পরিতাপ করে বললেন, ‘হে মহারাজ! তোমাকে সবাই ধনুর্ধরাগ্রগণ্য বলে নির্দেশ করতো। বলরাম তোমার গুরু ও যুদ্ধে সর্বাগ্রগণ্য। দুরাত্মা ভীম কীভাবে তোমার এমন দশা ঘটালো? সেই পাপাত্মা ছলপূর্বক তোমাকে ধরাশায়ী করেছে। ধর্মযুদ্ধে আহ্বান করে যারা এই ধরনের কূটযুদ্ধে পরাস্ত করে তাদের নরকে ঠাঁই হয়। তদুপরি, সে তোমার মস্তকে পা রেখেছে, আর যুধিষ্ঠির বসে বসে তা দেখেছেন। যুধিষ্ঠিরকে ধিক্কার দেবার ভাষা নেই। হে মহারাজ! তুমি কখনো অন্যায় যুদ্ধ করোনি, তুমি সর্বদা সৎ থেকেছো, মহর্ষিগণ ক্ষত্রিয়দের যা প্রশস্ত গতি বলে কীর্তন করেছেন, তুমি সেই গতিই লাভ করবে। কৃষ্ণ ও অর্জুনকে ধিক্। এরা আবার নিজেদের ধার্মিক বলে প্রচার করে।’ দ্রোণপুত্র এইসব বলে পরিতাপ করতে লাগলেন। তাঁরা তাঁদের এমন প্রিয় রাজাকে নিজেদের শক্তি দিয়ে রক্ষা করতে পারলেন না বিধেয় রোদন করতে লাগলেন। অবশেষে বললেন, ‘হে রাজন! আপনার শ্রুতিসুখকর কিছু সংবাদ জ্ঞাপন করি। দ্রৌপদীর পাঁচপুত্র, ধৃষ্টদ্যুম্নের পুত্রসহ ধৃষ্টদ্যুম্ন এবং অবশিষ্ট সকলকেই আমরা পশুর ন্যায় সংহার ও পাণ্ডবগণের সমুদয় বাহন, সৈন্য ও পুত্রগণকে বিনাশ করে এর প্রতিশোধ নিয়েছি।’

দুর্যোধন দ্রোণপুত্রের এই সমাচার শুনে প্রীত হয়ে বললেন, ‘পিতামহ ভীষ্ম, আচার্য দ্রোণ এবং কর্ণ যা পারেননি, তোমরা তা পেরেছো।’ দুই বাহু বাড়িয়ে দিলেন তিনজনের দিকে, গভীরভাবে আলিঙ্গন করলেন। বললেন, ‘তোমাদের মঙ্গল হোক। পুনরায় স্বর্গে দেখা হবে।’ এই বলে প্রাণত্যাগ করলেন।

দুর্যোধনের মৃত্যুতে নায়িকা সত্যবতীর সমস্ত সংকল্প পূর্ণ হলো। আর এক ফোঁটা রক্তও রইলো না যা তাঁর নিজের রক্ত নয়। যাঁরা রইলেন তাঁদের একজন সত্যবতীর অবৈধ পুত্র অনার্য কৃষ্ণদ্বৈপায়ন, কৃষ্ণদ্বৈপায়নের অবৈধ পুত্র বিদুর, আর বিদুরের অবৈধ পুত্র যুধিষ্ঠির। যে যুধিষ্ঠিরকে শান্তনুর সিংহাসন অধিকার করাবার বাসনায় তাঁর পিতা বিদুর এবং পিতামহ দ্বৈপায়নের এতো কাণ্ড, সেই যুধিষ্ঠির ঠিকই সেখানে অধিরূঢ় হলেন। কিন্তু কাকে শাসন করবেন, প্রজা কোথায়?

কর্ণকে যখন কৃষ্ণ বলেছিলেন, ‘তুমি বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণদের সেবা করেছো, ধর্মশাস্ত্রের সূক্ষ্ম তত্ত্ব সকল শিখেছো, তুমি ধর্মানুসারে পাণ্ডুরই পুত্র। অতএব তুমি রাজা হও। তোমার পিতৃপক্ষীয় পাণ্ডবগণ এবং মাতৃপক্ষীয় বৃষ্ণিগণ, দুই পক্ষকেই তোমার সহায় বলে জেনো। তুমি আজ আমার সঙ্গে চলো, পাণ্ডবরা জানুক যে তুমি যুধিষ্ঠিরের অগ্রজ। তোমার পাঁচ ভ্রাতা, এবং দ্রৌপদীর পাঁচপুত্র, এবং অভিমুন্য, তোমার চরণ ধারণ করবেন। দ্রৌপদীও ষষ্ঠকালে তোমার সঙ্গে মিলিত হবেন। আমরা তোমাকে পৃথিবীর রাজপদে প্রতিষ্ঠিত করবো। কুন্তীপুত্র, তুমি ভ্রাতৃগণে বেষ্টিত হয়ে রাজ্যশাসন করো। পাণ্ডব ভ্রাতাদের সঙ্গে তোমার সৌহার্দ্য হোক।’ কর্ণ জবাব দিয়েছিলেন, ‘গোবিন্দ! সমস্ত পৃথিবী এবং রাশি রাশি সুবর্ণ পেলেও আমি আমার পুরোনো সম্বন্ধ কক্ষনো অস্বীকার করতে পারি না।’ তারপর আরো অন্যান্য কথার শেষে বলেছিলেন, ‘আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি, তুমি যেন এক রক্তাক্ত পৃথিবীকে হাতে ধরে নিক্ষেপ করছো আর সেই অগ্নিস্তূপের উপর উঠে দাঁড়িয়ে যুধিষ্ঠির সুবর্ণপাত্রে ঘৃত পায়স ভক্ষণ করছেন।’

সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত সফল হলো।

কিন্তু পার্থিব লীলা সাঙ্গ হবার পর যুধিষ্ঠির স্বর্গে গিয়ে দেখলেন দুর্যোধন সেখানে অতি সম্মানের সঙ্গে উপবিষ্ট। তাঁর পরমতম আত্মীয়গণ তখন নরকে। তাঁকেও কিছুকালের জন্য নরকবাস করতে হয়েছিলো। অাসলে স্বর্গ কোথায় কেউ জানে না। কোথায় নরক তা-ও কেউ জানে না। স্বর্গ-নরকের ধারণা এবং অস্তিত্ব মানুষের মনেই। মানুষের মনই তার অব্যর্থ বিচারে দুর্যোধনদের শাশ্বত স্বর্গবাসের গরিমাদান করে পাণ্ডবদের নরকদর্শন করিয়েছিলো।

সমাপ্ত

বাকি পর্বগুলো পড়ুন এই লিঙ্কেঃ https://www.amarboi.com/search/label/mahabharatera-maharanye


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

মহাভারতের মহারণ্যে - প্রতিভা বসু [১৯]

amarboi
মহাভারতের মহারণ্যে
প্রতিভা বসু

১৯

রাজার ধর্ম ত্যাগ করে কর্ণ ভীষ্মের কাছে গিয়ে তাঁকে প্রণাম করে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলেন। পাণ্ডব সৈন্যগণ মধ্যে তখন সহস্র তূর্য বাজতে লাগলো, ভীম মহা আনন্দে নৃত্য করতে লাগলেন। যখন রাত একটু গভীর হলো, সকলে নিজ নিজ শিবিরে ফিরে গেলেন, তখন কর্ণ কিঞ্চিৎ ভীতভাবে ভীষ্মের কাছে এলেন এবং তাঁর চরণে মাথা রেখে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘কুরুশ্রেষ্ঠ, আমি রাধেয় কর্ণ। কোনো অপরাধ না করেও আমি আপনার বিরাগভাজন।’

চক্ষু উন্মীলিত করতে কষ্ট হচ্ছিলো ভীষ্মের। সবলে উন্মীলিত করে দেখলেন কেউ নেই। রক্ষীদেরও তিনি সরিয়ে দিলেন। তারপর এক হস্তে কর্ণকে পিতার ন্যায় আলিঙ্গন করে সস্নেহে বললেন, ‘আমি জানি তুমি কুন্তীপুত্র, সূর্য তোমার পিতা। সত্য বলছি, তোমার প্রতি আমার কোনো বিদ্বেষ নেই। তুমি না এলেই আমি দুঃখ পেতাম। আমি তোমার দুর্জয় বীরত্ব, বেদনিষ্ঠা ও দানের বিষয়েও জ্ঞাত আছি।’ আরো কিছু কথার পরে কর্ণ ভীষ্মকে অভিবাদন করে, সরোদনে রথে উঠে দুর্যোধনের কাছে চলে গেলেন।

ভীষ্ম কর্ণকে কোনো কটূক্তি করাতে কর্ণ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ভীষ্মের পতন না হলে তিনি যুদ্ধ করবেন না। দুর্যোধনের কাছে গিয়ে সকলকে প্রবোধ দিয়ে বললেন, ‘মহাত্মা ভীষ্ম তোমাদের যেমন রক্ষা করতেন, আমিও তোমাদের সেভাবেই রক্ষা করবো। আমি পাণ্ডবদের যমালয়ে পাঠিয়ে পরম যশস্বী হবো। অথবা শত্রুহস্তে নিহত হয়ে ভূতলে শয়ন করবো।’

পরদিন রণসজ্জায় সজ্জিত হয়ে পুনরায় কর্ণ রথারোহণে ভীষ্মের কাছে এলেন। অশ্রুসিক্ত নয়নে কৃতাঞ্জলিপুটে বললেন, ‘ভরতশ্রেষ্ঠ, আমি কর্ণ। আপনি আমাকে শুভবাক্য বলুন। কুরুবীরদের বিপদসাগরে ফেলে আপনি পিতৃলোকে যাচ্ছেন, ক্রুদ্ধ ব্র্যাঘ্র যেমন মৃগনিধন করে, পাণ্ডবগণ সেইরূপ এখন কৌরবগণকে বিনাশ করবে। আপনি অনুমতি দিলে আমি প্রচণ্ড বিক্রমশালী অর্জুনকে অস্ত্রের বলে বধ করতে পারবো।’

ভীষ্ম বললেন, ‘কর্ণ! সমুদ্র যেমন নদীগণের, ভাস্কর যেমন সকল তেজের, সাধুগণ যেমন সত্যের, উর্বরা ভূমি যেমন বীজের, মেঘ যেমন জীবগণের, তুমিও তেমন বান্ধবগণের আশ্রয় হও। আমি প্রসন্নচিত্তে বলছি, তুমি শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করো, কৌরবগণকে উপদেশ দাও, দুর্যোধনের জয়বিধান করো। দুর্যোধনের ন্যায় তুমিও আমার পৌত্রতুল্য। তুমি তাঁদের রক্ষা করো।’

ভীষ্মকে প্রণাম করে কর্ণ রণস্থলের দিকে চলে গেলেন। তারপর, কুরুরা কর্ণের পরামর্শে সর্বসম্মতিক্রমে দ্রোণাচার্যকে সেনাপতি করলেন। দ্রোণ সকল যোদ্ধার শিক্ষক, মাননীয় এবং শ্রেষ্ঠ অস্ত্রধর। তাঁর তুল্য আর কে আছে? ভীষ্ম যুদ্ধ থেকে বিরত না হওয়া পর্যন্ত যে কর্ণ যুদ্ধ করবেন না সেটা কৃষ্ণ জানতেন। যখন যুধিষ্ঠির ভীষ্ম, দ্রোণ কৃপাচার্য ইত্যাদি অবধ্য যোদ্ধাদের কাছে গিয়ে ভক্তি গদ গদ ভাবে চরণবন্দনা করে কথা প্রসঙ্গে তাঁদের মৃত্যুর গুহ্য খবর সংগ্রহ করে এবং শল্যকেও সম্মান দেখিয়ে, প্রদক্ষিণ করে বলে এলেন তিনি যেন তাঁর পূর্বেকার বর ভুলে না গিয়ে যুদ্ধকালে সূতপুত্রের তেজ নষ্ট করেন, ততোক্ষণে কৃষ্ণ কর্ণের নিকট গেলেন। বললেন, ‘হে কর্ণ। যতোদিন ভীষ্ম যুদ্ধ করবেন, সেই সময়টা তুমি আমাদের পক্ষে থাকো।’ কর্ণ বললেন, ‘কেশব! আমি দুর্যোধনের অপ্রিয় কার্য করবো না। জেনে রাখো আমি তাঁর হিতৈষী, তাঁর জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত হয়েছি।’ কর্ণের সততা এবং কৃষ্ণের সততার অভাব, একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত।

কর্ণকে পাণ্ডব দলে নিয়ে আসার জন্য কৃষ্ণ যে কতো ধরনের অন্যায় চেষ্টা করেছেন তা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। অতি ক্রূর উপায়ে ভীষ্মকে যে ভাবে অর্জুন কৃষ্ণের পরামর্শে অতিশয় কাপুরুষের মতো পাতিত করলেন সেটাও যুদ্ধের দশম দিনে প্রত্যক্ষ করলাম। এই যুদ্ধে পাণ্ডবদের দিকে থেকে কোনো ধর্ম ছিলো না, বীরত্ব ছিলো না, যোদ্ধাধার গৌরবও ছিলো না। নিয়ম কানুনের বালাই তো ছিলোই না। যা ছিলো তার নাম শঠতা আর তুলনারহিত চক্রান্ত ও হৃদয়হীনতা। এবং এই হৃদয়হীনতা যে কতো দূর যেতে পারে তার চরম উদাহরণ দ্রোণের মৃত্যু। রণস্থলে প্রবেশ করে যুদ্ধ না করা, অন্তরালে থেকে যুদ্ধ করা, আর সমর পরিত্যাগপূর্বক পলায়ন করা এটাই যাদববংশের তথা কৃষ্ণের ধর্ম। অর্জুন প্রকৃতই একজন মহাবীরের সম্মানে ভূষিত হবার মতো যোগ্যতা রাখেন। যুধিষ্ঠিরের মতো রাজ্যলোভী নন, ভীমের মতো ধৈর্যহীন নন, স্বীয় স্বার্থে অনৃতভাষণেও তিনি সম্মত নন। কিন্তু কৃষ্ণের চক্রান্তে যা যা তিনি করেছেন তাতে তিনি নিশ্চিতভাবেই কলঙ্কিত এবং নিন্দার্হ। তাঁর বীরত্বের সম্মান তিনি অধার্মিক কর্মে নিম্নগামী করেছেন। সেনাপতি হয়ে দ্রোণ অবিশ্রান্তভাবে কেবলমাত্র পাণ্ডবসৈন্যই নয়, বড় বড় যোদ্ধা, রাজা মহারাজাকে বিনষ্ট করতে লাগলেন এবং কুন্তীপুত্রগণকে নিপীড়িত ও ভয়ার্ত করতে লাগলেন; তাতে একথা স্পষ্টই অনুমিত হলো পাণ্ডবদের জয়াশা একা তিনিই সমূলে উচ্ছিন্ন করবেন। তৎক্ষণাৎ কৃষ্ণ অর্জুনকে পরামর্শ দিলেন, ‘ধর্ম পরিত্যাগ করো। নচেৎ দ্রোণ কারোকে আজ প্রাণ নিয়ে ফিরতে দেবেন না।’

পাঠকদের অবশ্যই মনে আছে যুধিষ্ঠির দ্রোণের মৃত্যুর গুহ্য তথ্যও সংগ্রহ করে এনেছিলেন। সেই পথেই কৌশল করে পা ফেলতে কৃষ্ণ উপদেশ দিলেন। কৃষ্ণের অন্তরে কোনো বিবেকবোধ ছিলো না, ষড়যন্ত্র ব্যতীত তিনি জরাসন্ধকেও জয় করতে পারেননি, শিশুপালকেও নিধন করতে পারেননি। এই যুদ্ধেও তিনি অর্জুনকে দিয়ে সেভাবেই জয়ের পথ পরিষ্কার করতে চাইলেন। বললেন, ‘শোনো, যা বোধ হচ্ছে, দ্রোণ আজ সকলকেই বিনাশ করবেন। তুমি বলো তাঁর পুত্র সংগ্রামে নিহত হয়েছে।’

কৃষ্ণ অনৃতবাক্য উচ্চারণেও যেমন বিমুখ নন, তেমনি যে কোনো হীনকর্ম করতেও দ্বিধাহীন। কৃষ্ণের যাদুবলে মোহচ্ছন্ন অর্জুন কিন্তু এই মিথ্যা উক্তিতে কোনো রকমেই সম্মত হলেন না। দ্রোণ বলেছিলেন, হাতে ধনুর্বাণ থাকলে তিনি দেবগণেরও অজেয়। কিন্তু যদি অস্ত্র ত্যাগ করেন, তবে মানুষও তাঁকে বধ করতে পারে। দ্রোণ অতিশয় পুত্রবৎসল, তার মৃত্যুসংবাদ শুনলে শোকে বিহ্বল হয়ে অবশ্যই তিনি অস্ত্রত্যাগ করবেন, আর তখনি তাঁকে নিহত করা যাবে।

অর্জুনকে সম্মত করা গেলো না, কিন্তু ‘সত্যবাদী’ যুধিষ্ঠির সম্মত হলেন। মালবরাজ ইন্দ্রবর্মার অশ্বত্থামা নামে একটি হাতি ছিলো। ভীম তাকে গদাঘাতে সংহার করে দ্রোণের কাছে গিয়ে বললেন, ‘অশ্বত্থামা হত হয়েছেন।’ ভীমসেনের কাছে অশ্বত্থামা হাত হয়েছেন শুনে তিনি বিমনা হলেন, কিন্তু বিশ্বাস হলো না। তখন তিনি একান্ত ব্যথিত হৃদয়ে যুধিষ্ঠিরকে স্বীয় পুত্র নিহত হয়েছে কিনা জিজ্ঞাসা করলেন। প্রচারের দক্ষতায় তিনি চিরদিন শুনে এসেছেন যুধিষ্ঠির সত্যবাদী। তাঁর মনে হলো যুধিষ্ঠির ত্রিলোকের ঐশ্বর্যলাভ হলেও কদাচ মিথ্যাবাক্য উচ্চারণ করবেন না। সেজন্যই আর কারোকে জিজ্ঞাসা না করে যুধিষ্ঠিরকেই জিজ্ঞাসা করলেন। কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, ‘দ্রোণাচার্য রোষবশ হয়ে আর দেড়দিন যুদ্ধ করলেই আপনার সমস্ত সৈন্য বিনষ্ট হবে। শান্তনুর সিংহাসনে কোনোদিন আর বসবার সুযোগ হবে না। আপনি মিথ্যা বলে ত্রাণ করুন।’

প্রথমে ভীম বলেছিলেন, ‘হে ব্রাহ্মণ! অশ্বত্থামা বিনষ্ট হয়েছেন। তবে আর কেন অাপনি যুদ্ধ করছেন?’ যুধিষ্ঠির রাজ্যের লোভে মিথ্যে কথাটাই বললেন। ‘অশ্বত্থামা হত’ এই বাক্য দুটি খুব জোরে বললেন। তারপর অস্ফুটে বললেন, ‘ইতি কুঞ্জর।’ সেটা শোনা গেলো না।

দ্রোণ যখন যুধিষ্ঠিরের কথা বিশ্বাস করে পুত্রশোকে অত্যধিক কাতর হয়ে অশ্বত্থামার নাম উচ্চারণ পুর্বক উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করে উঠলেন, এবং রথোপরি সমুদয় অস্ত্রশস্ত্র সন্নিবেশিত করে অস্ত্রত্যাগী হয়ে বিচেতন হলেন, যুধিষ্ঠির বলতে লাগলেন, ‘শীঘ্র তোমরা দ্রোণাভিমুখে ধাবমান হও, এই সুযোগ।’

যুধিষ্ঠিরের আদেশে ধৃষ্টদ্যুম্ন তখন ঐ রকম বিচেতন অবস্থাতেই তাঁকে রথ থেকে নিপাতিত করলেন, কেশাকর্ষণ করে অসিদণ্ড দিয়ে মস্তক ছেদন করলেন। তারপর গুরুর প্রকাণ্ড মস্তক নিয়ে উল্লাসে মেতে উঠে তরবারি বিঘূর্ণিত করে সিংহনাদ করলেন। যুধিষ্ঠির এবং ভীম আনন্দে আত্মহারা হলেন। অচেতন অবস্থায় গুরুহত্যার এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে অর্জুন ক্ষুব্ধ হলেন। জ্যেষ্ঠভ্রাতাকে তিরস্কার করে বলে উঠলেন, ‘হে মহারাজ! দ্রোণাচার্য সৌহার্দ্যবশত ও ধর্মানুসারে আমাদের পিতার তুল্য ছিলেন। তিনি আপনাকে শিষ্য ও সত্যপরায়ণ বলে জানতেন। বিশ্বাস করতেন আপনি তাঁকে কখনো মিথ্যা বলবেন না। গুরু কেবল আপনার বাক্য শ্রবণেই ন্যস্তশস্ত্র হয়ে ভগ্ননৌকার ন্যায় অাপনার সম্মুখেই বিহ্বলতাবশত গতচেতন হলেন, আর আপনি রাজ্যলালসায় শিষ্য হয়েও সেই পুত্রশোকসন্তপ্ত গুরুকে এমন নৃশংসভাবে হত্যা করে হৃষ্টচিত্ত হচ্ছেন? আমি বারবার আপনাকে মিথ্যাকথা বলতে নিষেধ করেছিলোম, তুচ্ছ রাজ্যলোভে তথাপি আপনি লঘুচিত্ত ও অনার্যের মতো স্বধর্ম পরিত্যাগ করে নিত্যোপকারী যোগারূঢ় বৃদ্ধ আচার্যের প্রাণ সংহার করলেন? ধিক্! জীবনে আর প্রয়োজন কী? মরণই শ্রেয়। এই বয়সে কতোদিন আর রাজত্ব ভোগ করবেন?’

লক্ষণীয়, অর্জুন যতোবার যুধিষ্ঠিরকে তিরস্কার করছেন, ততোবার তাকে রাজ্যলোলুপ বলছেন। প্রকৃতপক্ষে দ্রোণাচার্যকে যেভাবে বধ করা হয়েছে, এবং তাঁর কাটা মুণ্ডু নিয়ে যে রকম বীভৎস উল্লাসে যুধিষ্ঠির ভীম নৃত্য করেছেন, সেই দৃশ্য দেখা যে-কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষেই অসহ্য। যুদ্ধক্ষেত্রে তার প্রমাণও পাওয়া গেছে। প্রত্যেকেই এই অপকর্মের নিন্দা করেছে, ধিক্কার দিয়েছে। কৈশোরকাল থেকে দ্রোণাচার্য এঁদের গুরু। এঁদের তিনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন এবং অর্জুনের প্রতি পক্ষপাত তাঁর অনিরুদ্ধ ছিলো। যুধিষ্ঠির যদি ক্ষত্রিয়ের মতো ন্যায়যুদ্ধে জয়ী হতেন, বীরের মতো সংহার করতেন, তা হলে উল্লসিত হবার কারণ ঘটতে পারতো। তা তিনি করেননি। মিথ্যে কথা বলে একটা অচৈতন্য মানুষের গলা কেটেছেন, আর তা নিয়ে লজ্জা নেই, দুঃখ নেই, আনন্দে নৃত্য করছেন। কয়েকদিন পূর্বে ভীষ্মকেও ঠিক একইভাবে শিখণ্ডীকে সম্মুখে রেখে পিছন থেকে অনবরত বাণবিদ্ধ করেছেন অর্জুন। সম্মুখে দাঁড়িয়ে শিখণ্ডীও সমানে বাণ বর্ষণ করে গেছেন এবং জেনেছেন তিনি তাঁকে যতো বাণেই বিদ্ধ করুন না কেন, ভীষ্ম তাকে মারবেন না। অর্জুনকে মারবেন না। স্বধর্মে নিরত থেকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তাঁরা জেতেননি। স্বধর্মে নিরত ছিলেন বলে দুর্যোধন হেরেছেন। মহাভারতে ধর্মের কোনো জয় নেই, ন্যায়ের কোনো স্থান নেই, সত্যের কোনো দাম নেই, বিবেকের কোনো দংশন নেই।

কৃষ্ণের কুটিল পরামর্শে হীনকর্ম এখানেই শেষ নয়, আরো আছে, যা আরো বীভৎস। পাঠকদের মনে থাকতে পারে চতুর্দশ দিনের যুদ্ধে অর্জুনের প্রতিজ্ঞা ছিলো সূর্যাস্তের পূর্বেই তিনি জয়দ্রথকে বধ করবেন। তা তিনি পেরে ওঠেননি। যখন সূর্য অস্ত গেলো এবং জয়দ্রথ যখন যুদ্ধ শেষ জেনে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে আকাশের দিকে তাকালেন, এই সময় কৃষ্ণ বললেন, ‘ছলনা ভিন্ন জয়দ্রথকে বধ করা যাবে না, এই সুযোগ, জয়দ্রথকে তুমি বধ করো।’ অর্জুন জয়দ্রথের প্রতি ধাবিত হলেন এবং কৃষ্ণের পরামর্শে তার শিরশ্ছেদ করলেন। শুধু তাই নয়, কৃষ্ণ বললেন, ‘এইবার এই কাটা মুণ্ড জয়দ্রথের বৃদ্ধ পিতা বুদ্ধক্ষত্রের ক্রোড়ে ফ্যালো।’ অর্জুন তাই করলেন। বুদ্ধক্ষত্র তখন সন্ধ্যাবন্দনা করছিলেন, সহসা কৃষ্ণকেশ ও কুণ্ডলে শোভিত জয়দ্রথের ছিন্নমুণ্ড তাঁর ক্রোড়ে পতিত হতেই তিনি সচমকে অতি দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন, পুত্রের ছিন্নমস্তক দর্শনে তাঁরও মৃত্যু ঘটলো।

আরো আছে। কৃষ্ণের পরামর্শে অর্জুন পিছন থেকে সাত্যকির সঙ্গে যুদ্ধরত ভূরিশ্রবার দক্ষিণ হস্ত কেটে ফেললেন। কেননা সাত্যকি ভূরিশ্রবার কাছে হেরে যাচ্ছিলেন। যুদ্ধের মধ্যে নিয়ম বহির্ভূত এই অপকর্ম দেখে ভূরিশ্রবা অত্যধিক ক্ষুব্ধ হলেন। বললেন, ‘অর্জুন, তুমি অত্যন্ত গর্হিত ও নৃশংস কর্ম করলে। আমি অন্যের সঙ্গে যুদ্ধে রত ছিলাম, সেই সময়ে তুমি এই কাজ করলে? যুদ্ধের এই শিক্ষা তোমাকে কে দিয়েছে? অন্ধক বংশের লোকজন সবাই ব্রাত্য, নিন্দার্হ কর্ম করাই তাদের স্বভাব। আমি জানি সেই বংশজাত কৃষ্ণের আদেশেই তুমি এই অন্যায় কর্মে প্রভাবিত হয়েছো। তার কথা তুমি শুনলে কেন? তোমার নিজের ধর্মবোধ কি তোমাকে বিরত করতে পারলো না?’ এই বলে তিনি প্রায়োপবেশনে বসলেন এবং যোগস্থ হলেন মৃত্যুর জন্য।

দ্রোণের মৃত্যুর পর দুর্যোধন কর্ণকেই আনুষ্ঠানিকভাবে সেনাপতিত্বে বরণ করেছিলেন। কিন্তু ভীষ্মের যুদ্ধবিরতির পর থেকেই কর্ণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছিলেন। কৃষ্ণের প্রথম থেকেই এই লোকটিকে ভয়। তিনি বুঝেছিলেন কর্ণ আর অর্জুনের সম্মুখ যুদ্ধ হলে অর্জুন কখনোই জিততে পারবেন না। পাঠকরা জানেন, সে জন্য নানা কৌশলে কর্ণকে নিজেদের দলে এনে ফেলার অনেক চেষ্টাই তিনি করেছিলেন। কিন্তু সেই মনোরথ তাঁর পূর্ণ হয়নি। তারপরে কর্ণের স্বার্থপর মাতা কুন্তীও গিয়েছিলেন সেই অভিপ্রায় নিয়ে। তা-ও তাঁকে টলানো যায়নি। শুধু বলেছিলেন, ‘অর্জুন ব্যতীত আর কারোকে আমি প্রাণে মারবো না। আমি অর্জুনের সঙ্গেই যুদ্ধ করতে চাই। তার ফলে হয়তো আমার মৃত্যু ঘটবে অথবা তাঁর। আপনার পঞ্চপুত্র পঞ্চপুত্রই থাকবে।’

ভীমের সঙ্গে যখন তাঁর যুদ্ধ হচ্ছিলো, তখন কর্ণ ভীমকে নিদারুণ ব্যাকুল ও বারবার অভিভূত করতে লাগলেন। কিন্তু সহসা কুন্তীর বাক্য স্মরণ করে ভীমসেনের প্রাণসংহার করতে পারলেন না। বললেন, ‘ওহে তূবরক! তুমি মূঢ়! রণস্থল তোমার উপযুক্ত স্থান নয়। যে স্থানে বহুবিধ ভক্ষ্য, ভোজ্য ও পানীয় আছে, তুমি সেই স্থানেরই যোগ্য।’ এই ধরনের সব উপহাস করে ভীম তরুণ বয়সে যে সকল অপ্রিয় কার্যের অনুষ্ঠান করেছিলেন, সে কথাও তাঁর কর্ণগোচর করতে লাগলেন। তারপর ধনুষ্কোটি দ্বারা স্পর্শ করে হাসতে হাসতে বললেন, ‘আমার সদৃশ ব্যক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করতে হলে এইরূপ বা সেইরূপ অবস্থাও ঘটে। অতএব যেখানে কৃষ্ণ ও অর্জুন বিদ্যমান আছেন, তুমি সেখানেই যাও। তাঁরা তোমাকে রক্ষা করবেন।’

কর্ণ কেবলমাত্র ভীমকেই যে প্রাণে মারলেন না তাই নয়। যুধিষ্ঠিরও একবার এগিয়ে এসেছিলেন তাঁর অপটু বীরত্ব নিয়ে। তাঁকেও কর্ণ প্রাণে মারলেন না। কোনো লোভই যেমন তাঁকে বন্ধুর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করাতে সমর্থ হলো না, তেমনি কুন্তীর নিকট কথা দিয়েছিলেন বলে ভীমকে পরাজিত করেও প্রাণে মারলেন না, যুধিষ্ঠিরকে পরাজিত করেও প্রাণে মারলেন না। কুবুদ্ধিতে কৃষ্ণ যতো পটু, সৎবুদ্ধিতে কর্ণ ততোই মহান। অবশ্য কুরুপক্ষে এমন কেউ নেই, যিনি যুদ্ধ করতে এসে যুদ্ধ না করে, যুদ্ধের নিয়ম ভেঙে, মিথ্যাচারের সাহায্যে শত্রু বধ করে, নিজেকে নীচাশয়ের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। ভীষ্ম দ্রোণ জয়দ্রথের মতো সব মহারথীকে কৃষ্ণ যেভাবে হত্যা করিয়েছেন অর্জুনকে দিয়ে, তার চাইতে অধিক কাপুরুষোচিত নীচকর্মসিদ্ধির কলঙ্ক আর কারো নামেই নেই।

কর্ণ যুদ্ধে নেমেই পাণ্ডবদের একেবারে উথালপাথাল করে তুলেছিলেন। পাণ্ডব সৈন্যরা ভয়ার্ত হয়ে পালাতে লাগলো। অর্জুন কৃষ্ণকে বললেন, ‘কর্ণের ভার্গবাস্ত্রের শক্তি দ্যাখো, আমি কোনো রকমেই এই অস্ত্র নিবারণ করতে পারবো না। কিন্তু কর্ণের সঙ্গে যুদ্ধ না করে পালাতেও পারবো না।’

কৃষ্ণ বললেন, ‘রাজা যুধিষ্ঠির কর্ণের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন। প্রথমে তাঁর কাছেই তোমার যাওয়া উচিত। এখন সেখানে চলো তো, তারপর ফিরে এসে যা হয় হবে।’

আসলে একথা বললেন অর্জুনকে বাঁচাবার জন্যই। আপাতত কর্ণকে যুদ্ধে নিযুক্ত রেখে ক্লান্ত করাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো। সেজন্যই এই অজুহাতে অর্জুনকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তিনি সরিয়ে নিলেন।

কর্ণের দ্বারা প্রকৃতই যুধিষ্ঠির কিঞ্চিৎ ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলেন। কর্ণ তাঁকে মারেননি, কিন্তু উপহাস করতেও ছাড়েননি। কর্ণ উপহাস করে তাঁর পিঠে হাত রেখে বলেছিলেন, ‘হে পাণ্ডুনন্দন! তুমি ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করেও ক্ষত্রিয় ধর্ম পালন না করে প্রাণভয়ে সমর পরিত্যাগ করে পলায়ন করছো কেন? আমার মনে হয় তুমি ক্ষত্রিয়ধর্ম অবগত নও। যুদ্ধ করা তোমার কর্ম নয়। এখন সংগ্রাম ইচ্ছা পরিত্যাগ করো, বীরপুরুষদের কাছে আর যেও না, কোনো অপ্রিয় কথাও বোলো না।’

রণক্ষেত্র থেকে মহাত্মা যুধিষ্ঠির তৎক্ষণাৎ পালিয়ে বাঁচলেন।

অর্জুন কৃষ্ণকে বললেন, ‘ঐ দ্যাখো, সূতনন্দন কালান্তক যমের মতো ক্রুদ্ধ হয়ে রণস্থলে নিদারুণ কার্য সম্পাদন করে বারংবার আমার প্রতি কটাক্ষ নিক্ষেপ করছে। এখন কর্ণকে পরিত্যাগ করে পলায়ন করা আমার নিতান্ত অকর্তব্য।’

কৃষ্ণ রণস্থল থেকে অর্জুনকে সরিয়ে নিতে নিতে বললেন, ‘হে পার্থ! রাজা যুধিষ্ঠির কর্ণবাণে নিতান্ত নিপীড়িত হয়েছেন। তুমি সর্বাগ্রে তাঁকে দর্শন ও আশ্বাস প্রদান করে পরে কর্ণকে নিপীড়িত করবে।’

এর মধ্যে অর্জুন ভীমকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে মহাত্মন! এখন ধর্মরাজ কোথায়?’

ভীম বললেন, ‘ভ্রাতঃ! ধর্মনন্দন রাজা যুধিষ্ঠির সূতপুত্রের শরনিকরে সন্তপ্ত হয়ে এখান থেকে চলে গেছেন। তিনি জীবিত আছেন কিনা সন্দেহ।’

তখন অর্জুন ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে তিনি সূতপুত্রের শরনিকরে গাঢ়তর বিদ্ধ হয়ে শিবিরমধ্যে প্রবেশ করেছেন। পুর্বে তিনি দ্রোণাচার্যের নিশিত শরে বিদ্ধ হয়েও বিজয়লাভ প্রত্যাশায় সংগ্রামস্থল ছেড়ে যাননি। আজ যখন তাঁকে সংগ্রামস্থলে দেখছি না, তখন কর্ণের সঙ্গে সংগ্রামে নিশ্চয়ই তাঁর প্রাণসংশয় উপস্থিত হয়েছে। অতএব চলো, অবিলম্বে তাঁর কাছে যাই।’

অন্য কোনো কারণে নয়, যে কুন্তীকে তিনি আদৌ শ্রদ্ধা করেন না, তাঁর কাছে দেওয়া বাক্য রক্ষার্থেই অবধারিত জয়কে উপেক্ষা করে, ভীম ও যুধিষ্ঠিরকে ছেড়ে দিয়েছিলেন কর্ণ। তাঁর মহত্ত্বের কোনো তুলনা নেই। বাক্ পৃথিবীর আদি সত্য। সেই সত্যরক্ষাই কর্ণের চরিত্রের মহত্তম বস্তু, তাঁর ধর্ম। এই প্রসঙ্গে দুর্যোধনকেও কৃতিত্ব দেওয়া আবশ্যক। কারণ যুদ্ধটা রাজার আদেশে এবং আদর্শেই চলে। কৌরবপক্ষে অসৎ রণনীতি অনুসরণের দৃষ্টান্ত বিরল। দুর্যোধনসহ প্রতিটি অবধ্য বীরকে কৃষ্ণের প্ররোচনায় পাণ্ডবেরা অন্যায় যুদ্ধে হত্যা করেছে।

কৃষ্ণ ভীমকে সংশপ্তকগণকে সংহার করতে বলে বেগগামী অশ্বগণকে সঞ্চালন করে অতি দ্রুত অর্জুনকে নিয়ে রাজা যুধিষ্ঠিরের কাছে গেলেন। দেখলেন তিনি একাকী শায়িত। এবং ভালোই আছেন। তাঁদের দেখে যুধিষ্ঠির আহ্লাদিত হয়ে অভিনন্দন করলেন। বললেন, ‘হে কৃষ্ণ! হে ধনঞ্জয়! তোমাদের দেখে অতিশয় প্রীতিলাভ হচ্ছে। তোমরা অক্ষত শরীরে কর্ণকে নিহত করেছো। মহাবীর সূতপুত্র সমরাঙ্গনে আশীবিষ সদৃশ ও সমস্ত শস্ত্রপারদর্শী কৌরবগণের বর্ম। ঐ বীর পরশুরামের নিকট দুর্জয় অস্ত্রপ্রাপ্ত হয়েছে। কর্ণ সতত কৌরবগণের রক্ষক হয়ে শত্রুদের মর্দন করছে এবং সর্বদাই দুর্যোধনের হিতসাধনে তৎপর। তোমরা ভাগ্যক্রমে সেই অনলের মতো তেজস্বী, বাতাসের মতো বেগশালী, আমার মিত্রগণের অন্তকস্বরূপ মহাবীরকে বিনষ্ট করে আমার কাছে এসেছো। সে সাত্যকি ধৃষ্টদ্যুম্ন নকুল সহদেব শিখণ্ডী ও পাঞ্চালগণকে পরাজিত করে, তাদের সমক্ষেই আমার রথধ্বজ ছিন্ন করে, অশ্বগণকে নিহত করে, আমাকে পরাজিত করে, সমরাঙ্গনে আমাকে অনুসরণ করে অনেক পরুষবাক্য প্রয়োগ করেছে। কর্ণকৃত অপমান আমার নিতান্ত অসহ্য বোধ হচ্ছে। আমি এই লোকটির ভয়ে তেরো বৎসর নিদ্রিত হতে পারিনি, সুখী হতে পারিনি। আজ অবশ্য সে আমাকে মারেনি, কিন্তু পরাজিত করে উপহাস করেছে। কী ভাবে তোমরা তাকে মারলে সে কথা আমাকে অবগত করাও। কী ভাবে সূতনন্দনের মস্তকচ্ছেদ করলে?’

যখন শুনলেন কর্ণকে নিপাত না করে অর্জুন তাঁকে দেখতে এসেছেন, তখন তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। বললেন, ‘আমি রাজ্যলাভে একান্ত লোলুপ। হে ধনঞ্জয়! বীজ যেমন মেঘের উপর নির্ভর করে, তদ্রূপ আমরা কেবল রাজ্যলাভের আশায় তোমার উপরই নির্ভর করেছিলাম। দুর্যোধনের উন্নতি বিষয়ে আমি অণুমাত্র প্রত্যাশা করিনি, এবং তুমি যে সূতপুত্রকে দেখে ভীত হবে আমার মনে কখনও এরকম বিশ্বাস হয়নি। বিশেষ বাসুদেব তোমার সারথি হয়েছেন, তথাচ তুমি সূতপুত্রের ভয়ে ভীত হয়ে রণস্থল থেকে প্রত্যাগমন করলে। এখন তুমি বাসুদেবকে গাণ্ডীব শরাসন প্রদান করো। তুমি সমর পরিত্যাগপূর্বক পলায়ন করা অপেক্ষা পঞ্চম মাসে গর্ভস্রাবে বিনষ্ট হলে না কেন? হে দুরাত্মা! এখন তোমার গাণ্ডীবে ধিক্! বাহুবীর্যে ও অসংখ্য শরনিকরেও ধিক্!’

এভাবে অন্যায় তিরস্কারে অর্জুন অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে অসিগ্রহণ করলেন। কৃষ্ণ অতি সত্বর বাধা দিলেন। অর্জুন যুধিষ্ঠিরের প্রতি দৃষ্টিপাত করে ক্রুদ্ধ সর্পের মতো নিশ্বাস ত্যাগ করে বললেন।‘‘তুমি অন্যকে গাণ্ডীব সমর্পণ করো’’ এই কথা যিনি আমাকে বলবেন, আমি তাঁর মস্তকছেদন করবো, এই আমার গুপ্ত প্রতিজ্ঞা। হে রাজা! তুমি রণস্থল থেকে একক্রোশ অন্তরে অবস্থান করছো, আর তিরস্কার করছো আমাকে। তোমার তো সে অধিকার নেই-ই, বললে বলতে পারেন ভীম। ঐ মহাবল একাকী দুর্যোধনের চতুরঙ্গ বল প্রমথিত করে অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ নিষাদ মাগধ এবং অন্যান্য শত্রুগণের প্রাণসংহার করেছেন। শিখণ্ডী ভীষ্মের সঙ্গে সংগ্রামে প্রবৃত্ত হলে আমিই তাকে রক্ষা করেছিলোম, নচেৎ দ্রুপদতনয় কদাচ তাঁকে সংহার করতে পারতো না। আমি স্ত্রী পুত্র শরীর ও জীবন পর্যন্ত পণ করে তোমার হিতার্থে যত্নবান থাকি, তথাপি তুমি আমাকে বাক্যবাণে নিপীড়িত করছো। আমি তোমার জন্য মহারথগণকে নিহত করেছি, আর তুমি নিঃশঙ্কচিত্তে দ্রৌপদীর শয্যায় শয়ন করে আমার অবমাননায় প্রবৃত্ত হয়েছো। তুমি নিতান্ত নিষ্ঠুর। তোমার নিকট কখনো কোনোদিন সুখী হতে পারিনি। তুমি অক্ষক্রীড়ায় আসক্ত হয়ে, স্বয়ং ঘোরতর অধর্মানুষ্ঠান করে, এখন আমাদের প্রভাবে শত্রুদের পরাজিত করতে অভিলাষ করছো। আমি তোমার রাজ্যলোভে বিন্দুমাত্র সন্তুষ্ট নই। তোমার অক্ষক্রীড়া বিষয়ে সহদেব অনেক দোষ কীর্তন করেছিলো, বুঝিয়েছিলো। তুমি কি সে কথা শুনেছো? আজ আমরা কার পাপে এই দুঃখের সাগরে নিপতিত? তোমার অপরাধেই আজ এই যুদ্ধ, এতো মনুষ্যের ছিন্নগাত্র ভূমিতলে পতিত। কৌরব বংশ আজ কার জন্য নির্মূল হতে চলেছে? তোমার জন্য। তোমার দোষেই প্রাচ্য-প্রতীচ্য-উদীচ্য-দাক্ষিণাত্যগণ নিহত। হে রাজন! তুমি দ্যূতক্রীড়ায় প্রবৃত্ত হয়েছিলে, তোমার জন্যই আমাদের রাজ্যনাশ ও অসহ্য দুঃখ উপস্থিত হয়েছে।’



রোষবশে অর্জুনের মনের কথা এতোদিনে উচ্চারিত হলো। এই মানুষটির জন্যই তাঁর প্রথম প্রণয় বিনষ্ট হয়েছে। বারো বছর বনবাস করতে হয়েছে। দ্রৌপদীকে তিনি কখন পেলেন? দুঃখ কি ছিলো না সেজন্য? ছিলো। তখনকার দিনে জ্যেষ্ঠভ্রাতাকে কনিষ্ঠভ্রাতাদের অন্ধভক্তি করারই নিয়ম ছিলো। কিন্তু এই মুহূর্তে সমস্ত বেদনাই বেরিয়ে এসেছে মন থেকে। অর্জুন কিছুতেই তাঁর ক্রোধ সামলাতে পারছিলেন না।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য কৃষ্ণের মধ্যস্থতায় সবই আবার ঠিকঠাক হয়ে গেলো এবং পুনরায় সংগ্রামস্থলে উপস্থিত হলেন অর্জুন, এবং কর্ণ-বিনাশে কৃতসংকল্প হলেন। কৃষ্ণ বললেন, ‘হে অর্জুন! তুমি কিন্তু কর্ণকে অবজ্ঞা করো না। মহারথ সূতপুত্র মহাবল পরাক্রান্ত। সুশিক্ষিত কার্যকুশল বিচিত্র যোদ্ধা, এবং কীরূপ স্থানে, কী রকম কালে, যুদ্ধ কর্তব্য সে বিষয়ে অভিজ্ঞ। আমি সংক্ষেপে তোমাকে জানিয়ে দিচ্ছি, তুমি মন দিয়ে শোনো। ঐ বীর আমার মতে, হয়তো বা তোমাপেক্ষা সমধিক বলশালী হবে। অতএব খুব সতর্কভাবে তাঁকে সংহার করা কর্তব্য। কর্ণ তেজে হুতাশসঙ্কাশ, বেগে বায়ুসদৃশ, ক্রোধে অন্তকতুল্য। ঐ বিশালবাহুশালী বীরবরের দৈঘ্যও যেমন, সে রকম বক্ষঃস্থলও অতি বিস্তৃত। এবং সে নিতান্ত দুর্জয়, অভিমানী, প্রিয়দর্শন, যোদ্ধৃগণে সমলঙ্কৃত, মিত্রগণের অভয়প্রদ, পাণ্ডবগণের বিদ্বেষী ও ধার্তরাষ্ট্রদিগের হিতানুষ্ঠানে নিরত। তাকে বিনাশ করা অতি কঠিন। অদ্য যুদ্ধের সপ্তদশ দিন। যাবতীয় পাণ্ডব ও সমাগত অন্যান্য নৃপতিরা তোমাকে আশ্রয় করেই অবস্থান করছেন। কৌরব পক্ষে এখনো অশ্বত্থামা, কৃতবর্মা, কর্ণ, মদ্ররাজ আর কৃপাচার্য এবং পাঁচজন মহারথী উপস্থিত আছেন।’

অর্জুন বললেন, ‘তুমি যখন আমার সহায় তখন আমার জয়লাভ হবেই। এখন আমি সূতপুত্রকে অশঙ্কিতচিত্তে সমরাঙ্গনে সঞ্চারণ করতে নিরীক্ষণ করছি।’

এদিকে শল্য কর্ণকে বললেন, ‘হে রাধেয়! তুমি যার অনুসন্ধান করছো, ঐ দ্যাখো, সে রোষারক্ত নয়নে মহাবেগে আমাদের দিকেই ধাবিত হচ্ছে। কৌরবগণ এই মহাসাগরে দ্বীপের মতো তোমার আশ্রয় গ্রহণ করেই অবস্থান করছেন। তুমি যে রকম ধৈর্যসহকারে বৈদেহ কাম্বোজ নগ্নজিৎ ও গান্ধারগণকে পরাজিত করেছো, সেই রকম ধৈর্য অবলম্বন করেই স্বীয় পুরুষকার প্রকাশ করে অর্জুন ও বাসুদেবের দিকে গমন করো।’

কর্ণ বললেন, ‘হে মদ্ররাজ! তুমি এতোদিন আমাকে তোমার বাক্যশল্যেই বিদ্ধ করেছো। কিন্তু আজ তোমার ব্যবহারে আমার মন শান্ত হয়েছে। তুমি চিন্তা করো না। ধনঞ্জয় থেকে তোমার কিছু মাত্র ভয় নেই। আজ আমি কৃষ্ণ ও অর্জুনকে বধ না করে রণাঙ্গন ছাড়বো না। আমি জানি অর্জুনের মতো যোদ্ধা আর কেউ নয়। অর্জুন শরযুদ্ধে আর কৃষ্ণ চক্রযুদ্ধে অতিশয় নিপুণ। এখন আমি ব্যতিরেকে আর কে ওদের নিকট যুদ্ধার্থে অগ্রসর হবে?’

ইতিমধ্যে অর্জুন আরো অনেক কৌরব নিষ্পিষ্ট করলেন, কর্ণও অনেক পাণ্ডবসৈন্যকে নিহত করলেন। ভীমের সঙ্গে দুঃশাসনের যুদ্ধ হচ্ছিলো। এই ভীমকে পরাজিত করেও কর্ণ প্রাণে মারেননি। যদি মারতেন, যুদ্ধ প্রায় সেখানেই সমাপ্ত হতো। সেই ভীম দুঃশাসনকে পরাজিত করে মেরে ফেললেন। তারপর তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করে ঈষদুষ্ণ রক্তপান করতে করতে বললেন, ‘মাতৃদুগ্ধ ঘৃত মধু সুরা, সুবাসিত উৎকৃষ্ট জল, দধি দুগ্ধ এবং উত্তম ঘোল, প্রভৃতি সকল অমৃততুল্য সুস্বাদু যতো পানীয় আছে, আজ এই রক্ত আমার সর্বাপেক্ষা সুস্বাদু বোধ হচ্ছে।’ ঐ সময়ে যে সকল বীর সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাঁরা ভয়ে আর্তনাদ করে বলতে লাগলেন, ‘এ ব্যক্তি মনুষ্য নয়, নিশ্চয়ই রাক্ষস।’

কর্ণ হয়তো তখন মনে মনে ভেবেছিলেন কুন্তীর মতো গর্ভধারিণীর গর্ভে জন্মধারণ করে তাঁর সমস্তটা জীবন শুধু অপমানে অসম্মানে ওলোটপালোটই হয়েছে। তবে কুন্তী নামের সেই মহিলার কাছে তিনি কেন এই কথা দিলেন, ‘আপনার পঞ্চপুত্র পঞ্চপুত্রই থাকবে?’ আর আমরা ভাবি, কথা দিলেও রক্ষা করবার কী প্রয়োজন ছিলো? যাঁদের সঙ্গে তিনি আজ যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ, তাঁরা তো একের পর এক মহারথীকে কেবলমাত্র শঠতার দ্বারাই হত্যা করেছেন। যুধিষ্ঠিরকে বা কেন তিনি মারলেন না? তাঁর মিথ্যাবাক্যই তো তাঁদের পিতৃতুল্য গুরু দ্রোণাচার্যকে পুত্রশোকে বিচেতন করলো, আর সেই বিচেতন অবস্থাতেই যুদ্ধের কোনো নিয়ম পালন না করে ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁর মুণ্ডচ্ছেদন করলো। আর তা নিয়ে বীভৎস উল্লাস! যুদ্ধ শেষ হবার পরে অসতর্ক জয়দ্রথের মস্তক ছিন্ন করা হলো। এদের সঙ্গে তিনি কোন মঞ্চে দাঁড়িয়ে ন্যায়যুদ্ধ করবেন? এখানে যুদ্ধ কোথায়? এটা তো যুদ্ধ নয়। কেন ধর্মযুদ্ধের নামে এতোগুলো প্রাণ বিনষ্ট হলো? তার চেয়ে যে ভাবে জরাসন্ধকে নিহত করেছে, সে ভাবে ছদ্মবেশে লুকিয়ে যে কোনোদিন যে কোনো মহারথীকে পিঠে ছুরি মেরেই তো পালিয়ে আসতে পারতো পাণ্ডবরা। যে মহিলাকে তিনি শ্রদ্ধা করেন না, তাঁর সঙ্গে বাক্য-বিনিময় না করলেই ভালো হতো। সত্যি বলতে, কুন্তীর কাছে দেওয়া এই অর্থহীন প্রতিশ্রুতির কাছে কর্ণ দায়বদ্ধ না থাকলে পাণ্ডবদের পক্ষে কখনোই যুদ্ধ জয় সম্ভব হতো না। যুধিষ্ঠিরের মৃত্যু অবধারিত ছিলো।

যুধিষ্ঠির কি রাজা হবার যোগ্য? যিনি রাজা তিনিই যদি যুদ্ধস্থল থেকে পালিয়ে যান, তবে তাঁকে কী ভাবে রাজা বলা যায়? অন্যদিকে দুর্যোধন সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত, অর্থাৎ যতোক্ষণ যুদ্ধ চলে, একবারের জন্য বিশ্রাম নেন না, শিবিরে গিয়ে আশ্রয় নেন না। নিজ দলের একটি মানুষকেও তিনি ছেড়ে চলে আসেন না। কে জানে আজ কর্ণের ভাগ্যে কী আছে। তাঁকেও যে আর সব মহারথীদের মতো অর্জুনকে দিয়ে কৃষ্ণ সুযোগমতো খুন করাবেন না, তা-ও কি কেউ বলতে পারে?

পরের দিন রজনী প্রভাত হলে কর্ণ দুর্যোধনকে বললেন, ‘আমি ধনঞ্জয় অপেক্ষা যে যে অংশে হীন সেগুলো তোমাকে জানানো কর্তব্য। অর্জুনের সারথি বাসুদেব, কাঞ্চনভূষণ রথ অগ্নিদত্ত ও অচ্ছেদ্য। অশ্বসকল অতি বেগশালী এবং ধ্বজা বিস্ময়কর। হে কুরুরাজ! তুমি দুঃসহবীর্য মদ্ররাজকে আমার সারথি হতে দাও। তোমার নিশ্চয়ই জয়লাভ হবে। শকট সমুদয় আমার যুদ্ধাস্ত্র বহন করুক এবং উৎকৃষ্ট অশ্ব-সংযোজিত রথসকল আমার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করুক। এ রকম হলে আমি অর্জুন অপেক্ষা সমধিক হবো। শল্য অপেক্ষা ভুজবীর্যসম্পন্ন আর কেউ নেই। আর আমার তুল্য অস্ত্রযুদ্ধে পারঙ্গমও আর কেউ নেই। অতএব শল্য সারথি হলে আমার রথ অর্জুনের রথ থেকেও উৎকৃষ্ট হবে। আমি নিঃসন্দেহে অর্জুনকে পরাজিত করবো।’

দুর্যোধন বললেন, ‘হে রাধেয়! তুমি যা বললে আমি সেই অনুষ্ঠানই করবো।’

তা অবশ্য করলেন। যদিও শল্য প্রথমে খুবই আপত্তি করেছিলেন। ক্রুদ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘আমার মতো একজন অদ্বিতীয় যোদ্ধা শেষে সূতপুত্রের সারথি হবে?’ দুর্যোধন বিনীত বচনে তাঁকে তুষ্ট করে বললেন, ‘হে মহারাজা! আমি কর্ণকে সূতকুলোৎপন্ন বলে মনে করি না। আমার মতে উনি ক্ষত্রিয়কুলপ্রসূত দেবকুমার এবং মহদগোত্র সম্পন্ন। উনি কখনোই সূতকুলসম্ভব নন। তদ্ব্যতীত, আপনি তো জানেন, ভগবান ব্রহ্মাও রুদ্রদেবের সারথ্য স্বীকার করেছিলেন। ফলত, রথী অপেক্ষা সমধিক বলশালী ব্যক্তিকে সারথি করা কর্তব্য। হে মাতুল! আপনি অস্ত্রবিদগণের অগ্রগণ্য, সর্বশাস্ত্রবিশারদ কর্ণকে অবজ্ঞা করবেন না। যাঁর ভীষণ জ্যা নির্ঘোষ শব্দ পাণ্ডব সৈন্যের শ্রবণে প্রবিষ্ট হলে তারা দশদিকে পলায়ন করে, মায়াবী রাক্ষস ঘটোৎকচ আপনারই চোখের সম্মুখে রাত্রিকালে যাঁর মায়াপ্রভাবে নিহত হয়েছে, মহাবীর অর্জুন নিতান্ত ভীত হয়ে এতোদিন যাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করতে প্রবৃত্ত হননি, যে মহারথ মহাবল পরাক্রান্ত বৃকোদরকে কার্মুক দ্বারা সঞ্চালিত করে বার বার মূঢ় ঔদরিক বলে ভর্ৎসনা করেছেন, যিনি নকুল সহদেব যুধিষ্ঠিরকে পরাজিত করে কী জানি কী গূঢ় কারণবশত বিনাশ করেননি, পাণ্ডবরা কী করে সেই মহাবীর কর্ণকে পরাজয় করতে সমর্থ হবেন? আর আপনি সারথি হিশাবে বাসুদেব অপেক্ষাও উৎকৃষ্ট।’

এইসব নানা বাক্যে দুর্যোধন শল্যকে সন্তুষ্ট করে কর্ণের সারথি করলেন। যুদ্ধে নেমেই কর্ণ পাণ্ডবদের ভীতি উৎপাদন করেছিলেন। এখন আরো দুর্জয় হলেন। পাণ্ডবপক্ষের বহু শত্রুবিনাশ করে, শরাসন হাতে যেন নৃত্য করেই পরিভ্রমণ করতে লাগলেন সমরাঙ্গনে।

শল্যরাজ বললেন, ‘কর্ণ, তুমি প্রকৃতই একজন অস্ত্রবিশারদ, যুদ্ধদুর্মদ ও অন্তকের ন্যায় অসহ্য। তুমি অনায়াসে সমরাঙ্গনে শত্রুগণকে পরাজিত করতে সমর্থ হবে।’ শল্যরাজ-মুখনিঃসৃত এই সব বাক্য শ্রবণ করে কর্ণ আনন্দিত হলেন, তাঁর মনে হলো, ভীষ্ম ও দ্রোণাচার্যের পরে তিনিই পাণ্ডবগণকে পরাজিত করবেন। তাঁর মনে আশা সঞ্জাত হলো।

দুর্যোধন বললেন, ‘আমি তোমার বাক্যানুসারে পিতামহ ও দ্রোণাচার্যকে অতিশয় বীর বলে গণ্য করতাম। কিন্তু ভীষ্ম পিতামহ বলেই দশদিন পাণ্ডুতনয়দের রক্ষা করেছিলেন। দ্রোণাচার্যও শিষ্য বলেই তাঁদের মারতে পারেননি। হে কর্ণ! এখন তোমার মতো পরাক্রান্ত যোদ্ধা আর কারোকেও নয়নগোচর হয় না। আমি তোমার বলবীর্য ও আমার সৌহার্দ্যের বিষয় সম্যক অবগত আছি। তুমিই পূর্বাপর আমার হিতসাধন করেছো। কৌরবদের সেনাপতি হয়ে, সৈন্যগণকে রক্ষা করে, দৈত্যনিসূদন মহেন্দ্রের মতো শত্রুনিপাতনে নিযুক্ত হও।’

কর্ণ বললেন। ‘হে কুরুরাজ! আমি বরাবর তোমাকে বলেছি, পাণ্ডবগণকে তাদের পুত্রগণ ও জনার্দনের সঙ্গে পরাজিত করবো। তুমি প্রশান্তচিত্ত হয়ে পাণ্ডবগণকে পরাজিত বলে স্থির করো।’

কর্ণের কথা শুনে দুর্যোধন পরম পরিতুষ্ট হলেন। তাঁর মনে পুনরায় জয়ের আশা সঞ্জাত হলো। অনন্তর যুদ্ধ যেভাবে তুমুলরূপ ধারণ করলো, কে যে কাকে মারছে তা-ও প্রায় অননুধাবনীয় হয়ে উঠলো।

অবশেষে কর্ণ ও অর্জুন মুখোমুখি হলেন। কর্ণকে অতি উদ্বেল সমুদ্রের মতো গর্জন করে আসতে দেখে কৃষ্ণ বললেন, ‘বন্ধু, আজ যাঁর সঙ্গে তোমার যুদ্ধ করতে হবে, ঐ দ্যাখো তিনি আসছেন। তুমি স্থির হও। সূতনন্দন দুর্যোধনের হিতচিকীর্ষায় শরজাল বর্ষণ করে সমাগত হচ্ছেন। মদ্ররাজ তাঁর রথে অবস্থিত থেকে অশ্বসঞ্চালন করছেন। কর্ণের ধনুকের শব্দে যুদ্ধের অন্য সব শব্দ আর শোনা যাচ্ছে না। সূতপুত্রকে নিরীক্ষণ করে দ্যাখো পাঞ্চালরা কীভাবে পলায়ন করছে। তুমি ভিন্ন আর কেউ কর্ণের বাণ সহ্য করতে সমর্থ নয়।’

অর্জুন বললেন, ‘হে সখে! তুমি রথ সঞ্চালন করো। অর্জুন কর্ণকে সমরে নিপাতিত না করে কখনো প্রতিনিবৃত্ত হবে না।’ একথা শুনে অর্জুনের মতো এমন একজন যোদ্ধার প্রতি পুনরায় পাঠকদের বিশ্বাস ফিরে আসে। মনে হয় এবার অর্জুন যা করবেন নিজে করবেন। দুজন প্রায় সমযোদ্ধা মুখোমুখি হচ্ছেন, এবারই বোঝা যাবে কার কতো পারদর্শিতা। এতোক্ষণ তো পাণ্ডবপক্ষীয় এই মহাযোদ্ধাটিকে আমরা যুদ্ধ করতেই দেখলাম না। যে সব মহারথীরা লোকান্তরিত হলেন, তাঁদের সঙ্গে তো পাণ্ডবগণ যুদ্ধ করেননি, গুপ্ত ঘাতক হয়ে অতি অসৎভাবে হত্যা করেছেন। অন্তত একবারের জন্যও তাঁরা এমন কিছু করুন, যা থেকে মনে করা যায় তাঁরাও যুদ্ধ করতে জানেন। অন্তত অর্জুন।

অর্জুন স্পর্ধা করেই বললেন, ‘হয় আমি আজ আমার বাণে কর্ণকে নিহত করবো নচেৎ, কর্ণের বাণে ক্ষতবিক্ষত হয়ে নিহত হবো। তুমি তাড়াতাড়ি অশ্বচালনা করো।’

সেই সময়টাতে কর্ণ পুত্রের মৃত্যুসংবাদে সন্তপ্ত হয়ে অশ্রুবারি পরিত্যাগ করছিলেন। ইত্যবসরে অর্জুনকে সমাগত দেখে শোক ভুলে রোষাবিষ্ট হয়ে তাঁকে যুদ্ধ করতে আহ্বান করলেন। অন্যান্য যোদ্ধারা এই দুই বীরকে মুখোমুখি দেখে সবিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। কৌরবগণ কর্ণকে উত্তেজিত করার জন্য বাদিত্রধ্বনি ও শঙ্খ বাজাতে লাগলেন, পাণ্ডবরা তূর্য ও শঙ্খের শব্দে অর্জুনকে উত্তেজিত করতে লাগলেন।

যুদ্ধের বর্ণনা দিয়ে লাভ নেই। কে কতো অস্ত্রের দ্বারা কতোবার কাকে বিদ্ধ করেছিলেন সেই বর্ণনায় গিয়েও কাজ নেই। তবে সেই বর্ণনায় এটা স্পষ্ট ছিলো যে কর্ণ হেরে যাবেন না, জয়ী হয়ে কৌরবদের রক্ষা করতে পারবেন। কিন্তু নিয়তিক্রমে তাঁর রথের একটা চাকা সহসা মাটিতে বসে গলো। কর্ণ বললেন, ‘হে পার্থ! তুমি মুহূর্তকাল যুদ্ধে নিবৃত্ত হও, আমি চাকাটা উদ্ধার করছি। দৈবক্রমে আমার দক্ষিণচক্র পৃথিবীতে প্রোথিত হয়েছে। এ সময়ে তুমি কাপুরুষোচিত দুরভিসন্ধি পরিত্যাগ করো। তুমি রণপণ্ডিত বলে বিখ্যাত, এখন অসাধু কার্য করা তোমার উচিত নয়। আমি এখন ভূতলগত, অসহায়, আর তুমি রথের উপর বসে আছো। যে পর্যন্ত চাকাটা উদ্ধার করতে না পারি, তাবৎ আমাকে বিনাশ করা তোমার উচিত নয়। তুমি মুহূর্তকাল আমাকে ক্ষমা করো। অন্তত সেই পৌরুষটুকু তোমার আছে বলেই বিশ্বাস করি।’

এখানে ছোট্টো একটি উপকথা বলা হয়েছে। সেটির উল্লেখ এখানে অবান্তর হবে না। যদিও উপকথা, তথাপি তার দ্বারাই একটা মানুষের চরিত্রগত ছবি ফুটে ওঠে। ইতিমধ্যেই আমরা দেখেছি কর্ণ ভীমকে ও যুধিষ্ঠিরকে পরাস্ত করেও প্রাণে মারলেন না শুধু তাঁর কামুক গর্ভধারিণী, যিনি নিজের সুনাম রক্ষার্থে কুমারীকালের এই সন্তানকে প্রসব করে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন, যিনি কখনো কোনো দুঃখ বেদনা অপমান অসম্মান থেকে কোনোদিনই এই সন্তানকে চিনতে পেরেও উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেননি, অথচ লজ্জাহীনভাবে এসেছিলেন স্বীয় স্বার্থ রক্ষা করতে, সেই মহিলার নিকট দেওয়া কথা লঙ্ঘন করতে পারেননি বলেই যুদ্ধে যোগ দিয়েই মহাবীর কর্ণ, মহানুভব কর্ণ, কোনো প্রলোভনের অনধীন কর্ণ, অগ্নিগোলকের মতো সমরাঙ্গনে ছিটকে পড়েই শত্রুমর্দনে সকলকে ত্রাসিত করেছিলেন। সেই ত্রাসে ত্রাসিত হয়ে অতি শঠ কৃষ্ণ অজুর্নকে সমরাঙ্গন থেকে সরিয়ে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তারপর যেদিন মুখোমুখি হলেন দুজনে, অতি প্রিয়দর্শন দুটি ভ্রাতা, যখন যুদ্ধ প্রায় তুঙ্গে, এই সময়ে বেগে পাতালতল থেকে উত্তীর্ণ হয়ে, অন্তরীক্ষ থেকে কর্ণ এবং অর্জুনের সংগ্রাম সন্দর্শন করে, বৈরনির্যাতনের এটাই সর্বাপেক্ষা যোগ্য সময় বিবেচনায় সর্প অশ্বসেন কর্ণের এক তূণীরশায়ী শরমধ্যে প্রবেশ করলো।

কর্ণ কিছুই জানতে পারলেন না। কিন্তু কৃষ্ণ জানতে পেরে তাঁর রথ চার আঙুল নিচে নামিয়ে দিলেন। এটি কর্ণের অব্যর্থ শর। সাপ না ঢুকলে অনায়াসে অর্জুনের মস্তকচ্ছেদ করতে পারতেন। কিন্তু তা হলো না। শল্য বলেছিলেন, ‘তুমি এই শরটি নিক্ষেপ করো না। এটা কিন্তু অর্জুনের গ্রীবাচ্ছেদনে সমর্থ হবে না। অতএব, যদ্দ্বারা অর্জুনের মস্তকচ্ছেদন করা যায়, সে রকম একটি শর সন্ধান করো।’

ক্ষত্রিয়জনোচিত অহংকারে কর্ণ শল্যের কথা শুনলেন না। বললেন, ‘হে মহাবাহো! এক শর হাতে নিলে আর সেটা আমি পরিত্যাগ করি না। আমার সদৃশ ব্যক্তিরা কখনো কূটযুদ্ধে প্রবৃত্ত হয় না।’

সুতরাং অব্যর্থ শরটি বিফল হলো। সেই ভীষণ শর হুতাশন ও সূর্যের মতো অন্তরীক্ষে উত্তীর্ণ হয়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটালো। কিন্তু অর্জুনের মস্তক ছেদনে সমর্থ হলো না। তাঁর সুবর্ণখচিত মণিহীরক সমলঙ্কৃত নাগাস্ত্র কেবল অর্জুনের দিব্য কিরীট মহাবেগে চূর্ণ করলো। পূর্বে পুরন্দর অসুরসংহার কালে ঐ কিরীট দিয়েছিলেন। বিপক্ষেরা সেটা দেখলে ভয় পেতো। সাপ সূতপুত্রের শরে প্রবিষ্ট হয়ে সেই কিরীট চূর্ণ করলো।

কর্ণ এতোক্ষণে সেই অশ্বসেন নামের সাপকে দেখলেন। সে বললো, ‘অর্জুন আমার মাতাকে বধ করেছিলেন, আমি আজ তার প্রতিশোধ নেবো। তখন তুমি না জেনে প্রয়োগ করেছিলে, সেজন্যই অর্জুনের মস্তক ছেদন করতে পারোনি। এখন তো আমাকে দেখলে, এবার প্রয়োগ করো, তাহলে আমি অবশ্যই তাকে সংহার করবো। যদি স্বয়ং দেবরাজও ওর রক্ষক হন, তথাপি আমি ওকে যমরাজার রাজধানীতে প্রেরণ করবো।’

তখন কর্ণ বললেন, ‘হে নাগ! কর্ণ কখনো অন্যের বলবীর্য অবলম্বন করে সমরবিজয়ী হয় না, এবং একশত অর্জুনকে বধ করতে হলেও এক শর দুবার সন্ধান করে না।’

এরই নাম ক্ষত্রিয়। এরই নাম যোদ্ধা। এই সমরে অর্জুন ভীম বা যুধিষ্ঠির যে সব অসৎ উপায়ে বড় বড় যোদ্ধাদের বধ করেছেন সবই কৃষ্ণের দুর্বদ্ধিতে। নচেৎ অর্জুনের মতো একজন যোদ্ধা একবারের জন্যও কোনো ছলনা ব্যতীত যুদ্ধ জয় করতে পারলেন না কেন? যেমন বিদুরের দুষ্ট প্ররোচনায় যুধিষ্ঠিরের রাজ্যলিপ্সা যুধিষ্ঠিরকে নষ্ট করেছে, এখন কৃষ্ণের দুষ্ট প্ররোচনায় অর্জুন তার ব্যক্তিত্বের বিনাশ ঘটিয়েছেন। এবং সেই দুষ্টবুদ্ধির পরবশ হয়েই কর্ণ যে সময়ে নিচু হয়ে তাঁর রথের চাকাটা মাটি থেকে তুলতে চেষ্টা করছিলেন, এবং অস্ত্রহীন অবস্থায় ছিলেন, সেই সময়ে কৃষ্ণ যেই বললেন, ‘হে পার্থ! কর্ণ রথে আরোহণ না করতেই তুমি অতি দ্রুত ওর মস্তক ছেদন করো,’ অর্জুন অতীব কাপুরুষের মতো তা-ই করলেন। এখানেও অর্জুন সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন না।

অর্জুনের মতো যোদ্ধা বিরল। দুঃখ হয়, কৃষ্ণ তাঁকে যুদ্ধ করতেই দিলেন না। কেবল কতোগুলো মানুষকে অন্যায় যুদ্ধে অথবা পিছন থেকে লুকিয়ে খুন করালেন। কর্ণ যখন নিরস্ত্র, যখন রথ থেকে নেমে নিচে বসে যাওয়া চাকাটা তুলছিলেন, অনুরোধ করছিলেন, ‘একটুখানি সময় আমাকে ক্ষমা করো, যেন যুদ্ধের নিয়ম ভেঙে আমাকে নিরস্ত্র অবস্থায় রথে না ওঠা পর্যন্ত নিহত করো না,’ কৃষ্ণ বুঝলেন, এই একমাত্র সুযোগ, বললেন, ‘এক্ষুনি মারো ওকে, কোনোরকমেই যেন রথে উঠে না বসে।’ আর মহাবীর অর্জুন তাই করলেন। এতোদিন ধরে এতো সব বড় বড় যোদ্ধার কাছে কতো যত্নে কতো ধরনের যুদ্ধ শিখলেন, মহাদেবের বরপ্রাপ্ত হলেন, সবই বিফলে গেলো। কর্ণ এবং অর্জুনের যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করার মতোই একটা দৃশ্য ছিলো। অনেকেই এই দুটি বড় মাপের যোদ্ধার যুদ্ধ দেখতে কৌতূহলী ছিলেন। কৃষ্ণ সেখানেও হস্তক্ষেপ করলেন। কিন্তু অর্জুন? মহাভারতের তিনটি সর্বোৎকৃষ্ট যোদ্ধা এবং সর্বাঙ্গসুন্দর পুরষ ভীষ্ম, কর্ণ, অর্জুন। সেই অর্জুন নিজেকে কেন এমনভাবে মুছে দিলেন? তাঁর তো কোনো রাজ্যলোভ ছিলো না। জ্যেষ্ঠের আদেশে কাজ করার নিয়ম, তাই করে যাচ্ছেন। প্রকৃতিগতভাবে তিনি শুভবুদ্ধিধারী ছিলেন বলেই মনে হয়। কিন্তু কৃষ্ণের নীতিহীনতার কাছে মন্ত্রমুগ্ধের মতো নতিস্বীকার করে গেলেন তিনি।


চলবে...
বাকি পর্বগুলো পড়ুন এই লিঙ্কেঃ https://www.amarboi.com/search/label/mahabharatera-maharanye


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

মহাভারতের মহারণ্যে - প্রতিভা বসু [১৮]

amarboi
মহাভারতের মহারণ্যে
প্রতিভা বসু

১৮

অতঃপর যা অবশ্যম্ভাবী তাই হলো। শুরু হয়ে গেলো যুদ্ধের প্রস্তুতি। কুরু পিতামহ ভীষ্ম সিংহনাদ করে শঙ্খ বাজালেন। তখন ভেরী পণব আনক প্রভৃতি রণবাদ্য তুমুল শব্দে বেজে উঠলো। কৃষ্ণও তাঁর পাঞ্চজন্য শঙ্খ বাজালেন। যুধিষ্ঠির প্রভৃতিও নিজ নিজ শঙ্খ বাজালেন। সেই শব্দ যেন আকাশ ও পৃথিবী অনুনাদিত করে দুর্যোধনাদির হৃদয় বিদীর্ণ করে দিলো। কৃষ্ণ কুরু-পাণ্ডব সেনার মধ্যে রথ নিয়ে গেলেন। অর্জুনও ঐ পক্ষের স্বজনদিগের প্রতি দৃষ্টিপাত করে বেদনায় কম্পিত হলেন। তাঁর হৃদয়ও দুর্যোধনের হৃদয়ের মতো বিদীর্ণ হলো। ব্যাকুল হয়ে বললেন, ‘আমি বিজয় চাই না। যাদের সঙ্গে বিজেতা হতে যাচ্ছি, তারা কারা? কাদের দেখছি আমি? কাদের নিরীক্ষণ করে আমার বক্ষঃস্থল আমাকে বিরত হতে বলছে? দুই পক্ষেই পিতা-পিতামহস্থানীয় গুরুজন, আচার্য মাতুল শ্বশুর ভ্রাতা পুত্র ও সুহৃদগণ। যুদ্ধ তবে আমি কার সঙ্গে করবো?’ কৃষ্ণ তাঁকে ব্যথিত ও অবসন্ন দেখে বললেন, ‘এই সংকটকালে তুমি মোহগ্রস্ত হলে চলবে কেন? ক্লীব হয়ো না।’ তথাপি অজুর্নকে যুদ্ধবিমুখ দেখে, শোকাচ্ছন্ন দেখে এবং অনেক বোঝালেও বুঝছেন না দেখে কৃষ্ণ তাঁকে বিশ্বরূপ দেখালেন। অর্জুন দেখলেন, দংষ্ট্রাকরাল কালানলসন্নিভ মুখসকলের মধ্যে পতঙ্গ যেমন প্রদীপ্ত অনলে প্রবেশ করে সেই রকম দ্রুতবেগে জীবসমূহ সেই মুখসকলের মধ্যে প্রবেশ করছে। জ্বলন্ত বদনে সর্বদিক থেকে সমগ্রলোক গ্রাস করতে করতে লেহেন করছে। সমস্ত জগৎ সেই তেজে পূরিত হয়ে সন্তপ্ত হচ্ছে। অর্জুন অভিভূত হয়ে কৃতাঞ্জলিপুটে প্রণত হলেন। ভয়ার্ত আবেগে বললেন, ‘কে তুমি? তোমাকে নমস্কার। হে দেবেশ, প্রসন্ন হও।’

কৃষ্ণ বললেন, ‘আমি লোকক্ষয়কারী কাল। এখানে যারা সমবেত হয়েছে, তুমি না মারলেও তারা মরবে। সব্যসাচী! তুমি নিমিত্তমাত্র। ওঠো, যশোলাভ করো। শত্রুজয় করে সমৃদ্ধ রাজ্য ভোগ করো।’

অর্জুনের অন্তর যখন স্বজনদের প্রতি দৃষ্টিপাত করে ব্যথিত, অবসন্ন, এঁদের সঙ্গে যুদ্ধ জয় করার চেয়ে ভিক্ষান্ন ভোজনও অনেক ভালো বলে মনে করছেন, এবং কৃষ্ণ যখন তাঁকে উত্তপ্ত করার জন্য বিশ্বরূপ দর্শন করালেন, সেই সময়ে যুধিষ্ঠির তাঁর বর্ম খুলে, অস্ত্রত্যাগ করে, দ্রুত রথ থেকে নামলেন এবং শত্রুসেনার ভিতর দিয়ে পদব্রজে যুক্তকর হয়ে ভীষ্মের অভিমুখে চললেন। তাঁকে এভাবে যেতে দেখে সকলেই উৎকণ্ঠিত বোধ করলেন। ভ্রাতারা অগ্রসর হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘একি। শত্রুসৈন্যর মধ্য দিয়ে আপনি কোথায় যাচ্ছেন? আপনার অভিপ্রায় কী?’ ক্ষণকালের জন্য মনে হয়েছিলো যুধিষ্ঠির এইজন্যই বুঝি মহাত্মা যুধিষ্ঠির। এখন আর তিনি যুদ্ধ চান না, এভাবেই সব থামিয়ে দিতে চলেছেন। তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। যেমন যাচ্ছিলেন তেমনই যেতে লাগলেন। কৃষ্ণ সহাস্যে বললেন, ‘ইনি ভীষ্মদ্রোণাদি গুরুজনদের সম্মান দেখিয়ে তারপর যুদ্ধে নিয়োজিত হবেন। শাস্ত্রে আছে, গুরুজনদের সম্মানিত করে কোনো কর্মে প্রবিষ্ট হলে সে কাজ সম্পন্ন হয়।’

অত বুদ্ধিমান হয়েও কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে চিনতে পারেননি, কিংবা পেরেও অর্জুনকে প্রবোধ দিচ্ছেন। হাজার হোক, যুধিষ্ঠির তো বিদুরের পুত্র! স্বার্থসিদ্ধির বুদ্ধিতে তিনি সকলের ঊর্ধ্বে। অন্তত এই কর্মে তিনি তা স্পষ্টতই প্রমাণ করলেন। অর্জুনের মতো তাঁর হৃদয়ে কোনো দুর্বলতার প্রশ্ন নেই। তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য যুদ্ধে জয়ী হয়ে রাজ্য গ্রহণ। যে উদ্দেশ্যে অজ্ঞাতবাসে থেকে দ্রুপদের জামাতা হয়েছিলেন, উদ্দেশ্য তাঁর সেই গন্তব্যেই স্থিরীকৃত। তিনি জানতেন ভীষ্মকে জয় করা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। কী উপায়ে তাঁকে বধ করা যায় সেই কথাটা জানবার জন্যই তাঁর এই গুরুপ্রণামের ছলনা।

ভীষ্মের কাছে এসে তাঁর পদবন্দনা করে বিগলিত করলেন। বললেন, ‘পিতামহ, আশীর্বাদ করুন। যুদ্ধে অনুমতি দিন।’

ভীষ্ম বললেন, ‘যদি তুমি এভাবে আমার কাছে না আসতে, আমি তোমাকে পরাজয়ের জন্য অভিশাপ দিতাম। তোমার ব্যবহারে আমি প্রকৃতই প্রীতিলাভ করেছি।’

যুধিষ্ঠির যথাযোগ্য বিনীত বচনে বললেন, ‘মহাপ্রাজ্ঞ, আমার হিতের জন্য আপনি মন্ত্রণা দিন।’

ভীষ্ম বললেন, ‘আমি তোমার শত্রুপক্ষে যুদ্ধ করছি, তুমি আমার কাছে কী সাহায্য চাও?’

যুধিষ্ঠির বললেন, ‘পিতামহ, আপনি অপরাজেয়। যদি আমাদের শুভকামনা করেন, তবে বলুন, আপনাকে কোন উপায়ে জয় করবো?’

ভীষ্ম হেসে বললেন, ‘আমি সকলেরই অবধ্য। আমাকে তোমরা জয় করতে পারবে না। তুমি পরে আমার কাছে এসো।’

ভীষ্মের কাছে তাঁর মৃত্যুর উপায় পরে জানবার প্রতিশ্রুতি নিয়ে দ্রোণাচার্যের কাছে গেলেন। সেখানে গিয়েও এই ভক্তি গদগদ ভাব দেখিয়ে নানা ছলে তাঁর মৃত্যুর উপায় জেনে নিলেন। তারপর গেলেন কৃপাচার্যের কাছে। কিন্তু কৃপাচার্য কিছু বললেন না। তিনি যুধিষ্ঠিরের মনোভাব বুঝতে পেরেছিলেন। যুধিষ্ঠির শল্যের কাছেও গেলেন। গিয়ে তাঁকে অভিবাদন ও প্রদক্ষিণ করে বললেন, ‘আপনি পূর্বে বর দিয়েছিলেন যে যুদ্ধকালে সূতপুত্রের তেজ নষ্ট করবেন, আমি সেটাই আবার কামনা করছি।’ শল্য বললেন, ‘তাই হবে।’ অতঃপর কার্যসিদ্ধ করে যুধিষ্ঠির ফিরে এলেন।

কৃষ্ণ অর্জুনকে যেভাবে চালিত করতে চেয়েছেন সেভাবেই তিনি চলেছেন। যুধিষ্ঠির কিন্তু নামতই ধার্মিক। এটাও শ্রবণ থেকে শ্রবণান্তরে ব্যাপ্ত প্রচার ব্যতীত অন্য কিছু নয়। এবং সেটা তাঁর প্রতি পদক্ষেপেই প্রকট। অর্জুনের হৃদয়বৃত্তি তদপেক্ষা অনেক বড়, অনেক মহৎ। সর্বাপেক্ষা বিস্ময়ের বিষয় ভীমের শান্তিবাদ। শেষ পর্যন্ত ভীমও যুদ্ধ করতে চাইলেন না। বললেন, ‘হে মধুসূদন! যুদ্ধের কথা বলো না। তুমি আমাদের পিতামহ ভীষ্ম ও অন্যান্য সভাসদকে বলো, যা করলে আমাদের পরস্পর সৌভ্রাত্র জন্মে ও দুর্যোধন প্রশান্ত হয়, সেই উপায়ই তুমি নির্ধারণ করবে।’

কৃষ্ণ যদি সে বিষয়ে উদ্যোগী হতেন হয়তো বা সেটা সম্ভব হতো। দুর্যোধন জন্মাবধি শুনে এসেছেন তাঁকে মেরে ফেলা হলো না কেন, সে নিষ্ঠুর, পাপপরায়ণ, ঐশ্বর্যমদমত্ত। পরিজনদের নিকট বিদুর তাঁকে একটি নরকের কীট বানিয়ে রেখেছেন। কখনো কারো কাছে ভালো ব্যবহার পাননি, কারো মুখে কটু বিশেষণ ব্যতীত কোনো স্বাভাবিক কথা শোনেননি, জন্ম থেকে শুধু জেনেছেন জন্মানো মাত্র তাঁকে মেরে না ফেলাটাই ঘোর অন্যায় হয়েছে। তথাপি যে দুর্যোধন তাঁর স্বাভাবিক চরিত্র নিয়ে বেড়ে উঠেছেন, তার চেয়ে বড়ো ঘটনা আর কী হতে পারে? একমাত্র কর্ণ ব্যতীত কোথাও যার কোনো শান্তি নেই, সান্ত্বনা নেই, আশ্রয় নেই, ভালোবাসা নেই, স্নেহমমতাপ্রীতি কিছুই নেই, তাকে তুষ্ট করতে কৃষ্ণর একটা নিমেষের অধিক ক্ষয় হতো না। কিন্তু তিনি তা করলেন না। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো।

সর্বমোট আঠারো দিনের যুদ্ধের নবম দিনে ভীষ্ম সর্বতোভদ্র নামে এক মহাব্যূহ রচনা করলেন। কৃপ, দ্রোণ, ভুরিশ্রবা, শল্য, ভগদত্ত, দুর্যোধন, ইত্যাদি এ ব্যূহের বিভিন্ন স্থানে রইলেন। সেদিন ভীষ্মের প্রচণ্ড বাণবর্ষণে পাণ্ডবসেনা বিধ্বস্ত হলো, সকলে পলায়ন করতে লাগলো। হস্তী ও অশ্বের মৃতদেহে, ভগ্ন রথ ও ধ্বজে রণস্থল ব্যাপ্ত হলো, সৈন্যরা হাহাকার করতে লাগলো।

কৃষ্ণ অর্জুনকে উশকে দিয়ে বললেন, ‘তুমি না বিরাটনগরে সঞ্জয়কে বলেছিলে, ভীষ্ম দ্রোণ প্রমুখ কুরুসৈন্য সংহার করবে? ক্ষত্রধর্ম মনে রেখে এখন সেই বাক্য স্মরণ করো।’ অর্জুন বিষণ্ণ স্বরে বললেন, ‘যাঁরা অবধ্য তাঁদের বধ করে নরকের পথ-স্বরূপ রাজ্যলাভের চেয়ে বনবাসের কষ্টভোগও অনেক ভালো। ঠিক আছে, তোমার কথাই রাখবো, ভীষ্মের নিকট রথ নিয়ে চলো। কুরুপিতামহকে নিপাতিত করবো।’ তারপর দুপক্ষেই প্রবল যুদ্ধ হতে লাগলো, এপক্ষের ওপক্ষের বহু সৈন্য নিহত হলো। শেষে সূর্যাস্ত হলে যুদ্ধও শেষ হলো।

কিন্তু দশম দিনে ভীষ্ম নিপাতিত হলেন। নবম দিনের যুদ্ধের পরে পাণ্ডবরা কৃষ্ণসহ ভীষ্মের কাছে পুনরায় গিয়ে কী ভাবে তাঁকে বধ করবেন সেটা জেনে এলেন। প্রকৃত পক্ষে, পাণ্ডবদের জয়ার্থে ভীষ্ম স্বেচ্ছামৃত্যুই বরণ করেছিলেন। ভীষ্ম বলেছিলেন, ‘আমি জীবিত থাকতে তোমাদের জয় হবে না। আমি সুরাসুরেরও অবধ্য। কিন্তু আমি যদি অস্ত্র ত্যাগ করি তবে তোমরা আমাকে বধ করতে পারবে। কখনো শরণাপন্ন স্ত্রী, স্ত্রীনামধারী, বিকলেন্দ্রিয়, একপুত্রের পিতা, নিরস্ত্র, ভূপতিত, বর্ম ও ধ্বজবিহীন, ইত্যাদির সঙ্গে যুদ্ধ করতে আমার অবশ্য প্রবৃত্তি হয় না। তোমার সৈন্যদলে শিখণ্ডী আছেন। তিনি পূর্বে স্ত্রী ছিলেন তা তোমরা জানো। তাঁকে সম্মুখে রেখে অর্জুন আমাকে বধ করুক।’ ভীষ্মের নিকট থেকে এই গুহ্য তথ্য জেনে দশমদিনে সেই শিখণ্ডীকেই সম্মুখে রেখে কৃষ্ণ অর্জুনকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করলেন। ভীষ্ম শিখণ্ডীর রথসেনাকে দগ্ধ করতে লাগলেন, কিন্তু তাঁর প্রতি শরনিক্ষেপ করলেন না। আর এদিকে ভীম নকুল সহদেব সাত্যকি এদেরও সব ধ্বংস করতে লাগলেন। যতোক্ষণ ভীষ্ম তাদের বিনষ্ট করলেন, শিখণ্ডীকে সম্মুখবর্তী করে, ভীষ্মকে পরাজিত করতে অক্ষম অর্জুনকে কৃষ্ণ পুনঃপুন অন্যায়ভাবে শরনিক্ষেপ করতে অনুপ্রাণিত করতে লাগলেন। যুদ্ধের কোনো রীতি না মেনে শিখণ্ডীর পিছনে প্রচ্ছন্ন থেকে অর্জুনও কৃষ্ণের পরামর্শে অনবরত শরনিক্ষেপ করতে লাগলেন। শিখণ্ডী শরদ্বারা ভীষ্মের বক্ষঃস্থলে আঘাত করলে ভীষ্ম বললেন, ‘হে শিখণ্ডী! তুমি আমার প্রতি শরনিক্ষেপ করো বা না করো, আমি তোমার সঙ্গে কখনোই যুদ্ধ করবো না। বিধাতা তোমাকে শিখণ্ডিনীরূপে সৃষ্টি করেছিলেন, তুমি সেই শিখণ্ডিনীই আছো।’

ভীষ্মের কথা শুনে শিখণ্ডী বললেন, ‘হে ভীষ্ম! তোমাকে আমি বিলক্ষণ জানি। তোমার দিব্যপ্রভা আমার অবিদিত নেই। তথাপি আমি তোমার সঙ্গে যুদ্ধ করবো। তুমি আমার প্রতি শরনিক্ষেপ করো বা না করো, তথাপি আমি তোমার সঙ্গে যুদ্ধ করবো। তুমি জীবিত থাকতে আমার কাছে ত্রাণ পাবে না।’

অর্জুন পিছন থেকে উত্তেজিত হয়ে বলতে লাগলেন, ‘আমি তোমাকে যথাসাধ্য সাহায্য করবো, তুমি ভীষ্মকে অনবরত আক্রমণ করো, সংহার করো, আমি তোমার পশ্চাতেই আছি। আমি রক্ষা করবো তোমাকে। তুমি যথাসম্ভব শীঘ্র ভীষ্মের প্রতি ধাবমান হও। তাঁকে বধ করো। যুধিষ্ঠিরের সৈন্যগণের মধ্যে এমন কেউ নেই যে ভীষ্মের সঙ্গে প্রতিযুদ্ধ করতে সমর্থ। ভীষ্মের সম্মুখে দাঁড়িয়ে তুমি শরনিক্ষেপ করো।’

অর্জুনের বাক্য শ্রবণান্তর শিখণ্ডী নানাবিধ শরে তাঁকে আকীর্ণ করতে লাগলো, কিন্তু প্রতিবার ভীষ্ম তা উপেক্ষা করে প্রজ্বলিত দাবানলের মতো শূরগণকে দগ্ধ করতে লাগলেন। অজুর্নও শিখণ্ডীকে সম্মুখে রেখে ভুরি ভুরি শরে তাঁকে আচ্ছাদিত করতে লাগলেন। ভুরি ভুরি শরে আকীর্ণ হয়েও তা অগ্রাহ্য করে, পাণ্ডবদের সৈন্যগণকে নিপাতিত করে, ‘ভীষ্মরূপ অনল রথরূপ অগ্নিগৃহে অবস্থিত হয়ে চারুরূপ শিখায় শোভিত হলেন।’ এক অপূর্ব শোভা প্রত্যক্ষ করলেন সকলে। কৃষ্ণের পরামর্শে তখন সমুদয় পাণ্ডব ও সঞ্জয়রা ভীষ্মকে পরিবেষ্টন করে ফেললেন ও পিছন থেকে মারণাস্ত্র প্রয়োগ করে তাঁকে বধ করতে চেষ্টা করলেন। কিছুকাল মধ্যে সেই অজস্র নিক্ষিপ্ত শর ভীষ্মের শরীরে প্রবিষ্ট হলো, তত্রাচ তিনি পাণ্ডবদের সহস্র সৈন্য ধ্বংস করতে লাগলেন। শিখণ্ডীও যেমন শত সহস্র শরনিক্ষেপে তাঁকে বিচলিত করতে সক্ষম হলো না, তেমনি লুকিয়ে পিছনে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করে অর্জুনও কোনোরকমেই তাঁকে ব্যাহত করতে পারলো না। ভীষ্ম স্থির করেছিলেন শিখণ্ডীর সঙ্গে কখনোই যুদ্ধ করবেন না, অর্জুনকেও প্রাণে মারবেন না।

যুধিষ্ঠির অস্থির হয়ে গেলেন। মৃত্যুর উপায় জেনে এসেও কি তবে শেষরক্ষা হলো না? শেষ পর্যন্ত অবশ্য শিখণ্ডীর পিছনে লুকিয়ে অনবরত বাণবিদ্ধ করতে করতে অর্জুন একসময় ভীষ্মকে ধরাতলে নিপাতিত করলেন। প্রতিযোদ্ধার সম্মান পেলেন না, শুধু অন্যায়ের উপর দাঁড়িয়ে শেষ করলেন তাঁর কর্ম। যুধিষ্ঠির আশ্বস্ত হলেন। অর্জুন এতো শর নিক্ষেপ করেছিলেন ভীষ্মের শরীরে যে দুই আঙুল পরিমাণ স্থানও অবশিষ্ট ছিলো না। অর্জুনকে কিন্তু তিনি একটি প্রতিশরও নিক্ষেপ করেননি। না করে রথ থেকে পড়ে গেলেন। কাপুরুষের মতো অন্যায় যুদ্ধের আশ্রয় না নিলে পাণ্ডবরা যে জিততে পারতেন না, তার প্রথম নজির ভীষ্মের পতন। অবশ্য মহাভারতে কৃষ্ণ-অর্জুন-শিখণ্ডী কেউ-ই ভীষ্মকে মারবার জন্যে দায়ী নন, কারণ ‘ইচ্ছা-মৃত্যু’ ব্যতীত তাঁকে পাতন করা অসম্ভব ছিলো। তবু, যুদ্ধের একটা নিয়মবন্ধন ছিলো। সেই নিয়মকেও কৃষ্ণের পরামর্শে অতিক্রম করা হলো। আর নিষ্ঠুরতার তো কোনো তুলনাই নেই।

ভীষ্মের পতন কুরুপাণ্ডব সকলের নিকটই অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা। এঁরা সবাই তাঁর শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন, দ্রোণাচার্যকে তিনিই তাঁদের অস্ত্রশিক্ষায় শিক্ষিত করবার জন্য সসম্মানে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা যাতে সেই শিক্ষায় বড়ো হয়ে ওঠেন, বীরত্বে শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য হন, তাঁদের প্রশংসা যেন দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে, এটাই ছিলো তাঁর ঐকান্তিক প্রার্থনা। সকলের চক্ষুই সজল হয়ে উঠলো। সূর্যাস্তের কিছু পূর্বে অর্জুনের শরাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে ভীষ্ম পূর্বদিকে মাথা রেখে রথ থেকে পতিত হলেন। হায় হায় করে উঠেছিলো সবাই। ভীষ্ম বললেন, ‘ভূতলে পতিত থেকেই আমি উত্তরায়ণের প্রতীক্ষায় প্রাণ ধারণ করবো।’

বলাই বাহুল্য, কৌরবগণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলেন। কৃপ দুর্যোধন প্রভৃতি রোদন করতে লাগলেন, যুদ্ধে আর তাঁদের মন গেলো না। ওদিকে, এইরকম দুর্জয় অন্যায়ভাবে কাপুরুষের মতো প্রতিযোদ্ধাহীন যুদ্ধ করে লজ্জিত না হয়ে পাণ্ডবগণ সিংহনাদ করতে লাগলেন। দুঃশাসনের মুখে ভীষ্মের পতনসংবাদ শুনে দ্রোণ মূর্ছিত হলেন। সংজ্ঞালাভ করে সৈন্যদের যুদ্ধ থেকে বিরত করলেন।



চলবে...
বাকি পর্বগুলো পড়ুন এই লিঙ্কেঃ https://www.amarboi.com/search/label/mahabharatera-maharanye


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

মহাভারতের মহারণ্যে - প্রতিভা বসু [১৭]

amarboi
মহাভারতের মহারণ্যে
প্রতিভা বসু

১৭

অতঃপর বনবাসপর্ব শেষ করে তাঁরা উদ্যোগপর্বে এসে পৌঁছলে গৃহবিবাদের পুনরায় সূত্রপাত হলো। সেই সময়েই বিরাট রাজার কন্যা উত্তরার সঙ্গে অভিমন্যুর বিবাহক্রিয়া সাঙ্গ হয়। বিরাট রাজার গৃহেই মন্ত্রণাসভা বসলো, এখন কী ভাবে দুর্যোধনের হাত থেকে পাণ্ডবদের পিতৃরাজ্য উদ্ধার করা যায় মন্ত্রণার বিষয় সেটাই।

দ্রুপদ বললেন, ‘দুর্যোধন সহজে রাজ্য ফিরিয়ে দেবে না। আমাদের এখন প্রয়োজন ধর্মসম্মত যুক্তির দ্বারা ধৃতরাষ্ট্রকে স্ববশে আনা।’ অতএব তিনি তাঁর পুরোহিতকে দূত হিশাবে পাঠিয়ে দিলেন। বলে দিলেন, ‘পাণ্ডবদের হিত নিমিত্ত আপনি পুষ্যানক্ষত্রের যোগে জয়সূচক শুভ মুহূর্তে যাত্রা করুন।’ পুরোহিতকে গোপনে পরামর্শ দিলেন, ‘আপনি সেখানে উপস্থিত হয়ে ধর্মবাক্যে ধৃতরাষ্ট্রকে প্রসন্ন করে, তাঁদের যোদ্ধৃবর্গদের গতি পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন। এদিকে বিদুর সেইসব বাক্য শ্রবণ করে ভীষ্ম দ্রোণ কৃপাচার্য প্রভৃতির পরস্পরের মতভেদ উপস্থিত করবেন। অমাত্যবর্গের মধ্যে অন্তর্ভেদ সৃষ্টি হলে ও সৈনিকরা বিমুখ হলে তাদের একতা সম্পাদনের জন্য কৌরবগণকে বিশেষ যত্নবান হতে হবে। সেই সময়টুকুর মধ্যে পাণ্ডবেরা একাগ্রচিত্তে সৈন্যসংগ্রহ প্রভৃতি সাংগ্রামিক কার্যসকলের আয়োজন করতে পারবেন। আত্মভেদ হলেই আপনি সে বিষয়ের পোষকতা করবেন। তা হলে বিপক্ষ দুর্বল হয়ে পড়বে, আর ওরা সেনা সংগ্রহ করতে পারবে না। এখন আপনি যত্নপূর্বক আমাদের এই উদ্দেশ্য সাধন করুন।’

বলরাম বললেন, ‘যুধিষ্ঠির দ্যূতপ্রিয়, কিন্তু অজ্ঞ। সুহৃদগণের নিষেধ না শুনে দ্যূতনিপুণ শকুনিকে আহ্বান করেছিলেন। অন্যান্য নৃপতিদের সঙ্গেও তিনি খেলতে পারতেন, হারাতেও পারতেন। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে না খেলে ঐ শকুনির সঙ্গেই তিনি খেলতে গেলেন, এবং প্রমত্ত হয়ে রাজ্য হারালেন। শকুনি নিজের শক্তিতেই যুধিষ্ঠিরকে পরাস্ত করেছেন। তাতে শকুনির কোনো দোষ হয়নি। যদি আপনারা শান্তি চান, তবে মিষ্ট বাক্যেই দুর্যোধনকে প্রসন্ন করুন। সামনীতিতে যা পাওয়া যায় তাই অর্থকর, যুদ্ধ অন্যায় ও অনিষ্টকর।’

কথাটা কারোই পছন্দ হলো না। যুধিষ্ঠির দ্রুপদ প্রভৃতি সংগোপনে যুদ্ধের আয়োজন করতে লাগলেন এবং নানা দেশের রাজাদের নিকট দূত পাঠালেন। আমন্ত্রণ পেয়ে রাজারা আসতেও লাগলেন।

সাত্যকি ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, ‘দুর্যোধন ছল করে যুধিষ্ঠিরের রাজ্য হরণ করেছেন। শকুনি কপট পাশায় যুধিষ্ঠিরকে হারিয়েছেন। আপনারা দুর্যোধনকে বলুন, দুর্যোধন যে ভরসায় যুদ্ধ করতে চান তা মিথ্যা। পাণ্ডবরাই অধিক বলশালী।’

বলরাম বললেন, ‘যুধিষ্ঠির সমধিক সম্পদশালী ছিলেন, কিন্তু দ্যূতে প্রমত্ত হয়েই তাঁর সমস্ত রাজ্য পরহস্তগত হয়েছে, তাতে শকুনির কিছুমাত্র অপরাধ নেই। অতএব কোনো বাগ্মীপুরুষ ধৃতরাষ্ট্র সমীপে উপস্থিত হয়ে, প্রণিপাতপূর্বক সন্ধিবিষয়ক প্রস্তাবই করুন।’

সাত্যকি বলরামকে দোষারোপ করে বলতে লাগলেন, ‘এক বংশে ক্লীব ও শূর দুই প্রকার পুরুষই জন্মগ্রহণ করে। যেমন তুমি, তেমনই তোমার বাক্য। অক্ষবিশারদগণ এই দ্যূতানভিজ্ঞ মহাত্মাকে দ্যূতে আহ্বান করলেন কেন? তা না হলে তো তিনি পরাজিত হতেন না? এখন তোমরা সতর্ক হলে মহারাজ যুধিষ্ঠির দীর্ঘকালের আশাপোষিত (‘আশাপোষিত’ শব্দটা লক্ষ করুন) ধৃতরাষ্ট্রবিসৃষ্ট রাজ্য গ্রহণ করতে পারবেন।’

দুর্যোধন যা ভেবেছেন সেটা যে কতোখানি সত্য এই বাক্যই তার প্রমাণ। তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করার জন্যই এই যুদ্ধের প্রয়োজন ছিলো যুধিষ্ঠিরের। দ্রুপদ বলরামের দিকে তাকিয়ে আপোসের গলায় বললেন, ‘মহারাজ! আপনি যা বললেন, তাই হবে।’

আসলে বলরামের নির্মল হৃদয়ে কখনো কোনো মিথ্যার কলঙ্ক নেই। যে বিষয়ে তাঁর ভ্রাতা বাসুদেব অতি সুযোগ্য। ন্যায় অন্যায় দুটি শব্দকেই বলরাম কষ্টিপাথরে ঘষে যাচাই করে দেখেন। অন্যায়ের সঙ্গে আপোসে তিনি যতোটা অক্ষম, ততোটাই সক্ষম যা সত্য তার মর্যাদা দিতে। অকারণ অসূয়া বিদ্বেষ স্বার্থ বা কৌটিল্য তাঁর চরিত্রের বিপরীত। শকুনি যে কপট পাশায় হারাননি তার সাক্ষী ছিলেন অন্যান্য নৃপতিরা এবং ভীষ্ম। স্বয়ং যুধিষ্ঠিরও সেখানে এই মিথ্যেটা বলতে পারেননি যে শকুনি তাঁকে কপট পাশায় হারিয়েছেন। সভার সকল সদস্যই দেখেছেন এই খেলায় শকুনির প্রতিভা কী ঊর্ধ্বগতি। একমাত্র বিদুর তার প্রতিকূল। তিনিই শ্রবণ থেকে শ্রবণান্তরে গুজব ছড়িয়ে দিলেন, যুধিষ্ঠিরকে কপট পাশায় হারিয়েছেন মাতুল শকুনি।

আজও পর্যন্ত সেই মিথ্যেই অকাট্য সত্য হিশাবে প্রচলিত। পাশাখেলায় সৌবল প্রকৃতই যে একজন অদ্বিতীয় ব্যক্তি, এবং যুধিষ্ঠির যে তাঁর মতো একজন খেলোয়াড়ের নিকট একটা ফুৎকারও নয়, এ কথা যুধিষ্ঠিরের তো প্রথম খেলাতেই বুঝতে পারা উচিত ছিলো। তখুনি তিনি শেষ করে দিতে পারতেন খেলা। অন্য কারো সঙ্গে খেলতে পারতেন। তাঁর সমকক্ষ খেলোয়াড়ের অভাব ছিলো না সেখানে। কিন্তু সর্ব বিষয়ে অক্ষম ব্যক্তিদের মধ্যে একটা মাত্রহীন জেদ থাকে, কিছুতেই হার স্বীকার করতে পারে না। আত্মসম্মান রক্ষার্থে সেই জেদই চালিত করেছিলো যুধিষ্ঠিরকে। সর্বত্র হেরে যেতে কার বাসনা থাকে? তদ্ব্যতীত, রাজসূয় যজ্ঞ করে এতো অঢেল ধনসম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন যে মনে করেছিলেন তাঁর সঙ্গে এঁরা পাল্লা দিতে পারবেন না, এবং তিনি খেলতে খেলতে একবার জয়ী হতেই পারবেন। তখন এঁরা তাঁর অর্থের প্রাচুর্য দেখে নিজেদের অনেক দীন বলে ভাববে আর যথেষ্ট অপমানিত হবে। সে ইচ্ছে তিনি শেষ পর্যন্তও ছাড়তে পারেননি। এই অসৎ ইচ্ছাই তাঁকে সেই নরকে নিয়ে গেছে, যেখান থেকে তিনি ভ্রাতাদের বাজি রেখেছেন, পত্নীকে বাজি রেখেছেন, আত্মবিক্রয় করে অবশেষে নিঃস্ব হয়েছেন।

যুদ্ধের আলোচনা সবই একপক্ষে চলছিলো। অভিমন্যু-উত্তরার বিবাহে সব মহানুভব ব্যক্তিরা অতিথি হিশাবে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন। সুতরাং ঐ পক্ষ কী করছে সেটা না জেনেই এই আলোচনা চলছিলো। কৃষ্ণ অন্যান্য আমন্ত্রিত রাজাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘পরাজিত হলে হৃতরাজ্য ও বনবাসের জন্য সৌবল শঠতাপূর্বক প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করিয়েছিলেন যুধিষ্ঠিরকে। এখন কৌরব ও পাণ্ডবগণের পক্ষে যা মঙ্গল তাই আপনারা চিন্তা করুন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির অধর্মগতভাবে সুরসাম্রাজ্যও কামনা করেন না। যদিও ধৃতরাষ্ট্রের পুত্ররা বলবীর্যে এঁদের পরাজিত করতে অসমর্থ হয়েই শঠতাপূর্বক পৈতৃকরাজ্য অপহরণ করে এঁদের এতোদিন দুঃখে দগ্ধ করেছে।’ কৃষ্ণ সব কিছু জেনেই এই অসত্য কথাগুলো বললেন।

স্বভাব দোষে অনর্থক অসূয়া বিভিন্ন পিতার পাঁচটি সন্তানের পক্ষে সম্ভব হতে পারে। শৈশব তাঁদের কোথায় কীভাবে কেটেছে তা আমরা কেউ জানি না। কী তাঁদের বোঝানো হয়েছে তা-ও অজানা। কিন্তু কৃষ্ণ কেন দুর্যোধনের বৈবাহিক হয়েও তাঁর ঘোর শত্রু সেটা বোঝা দুরূহ।

মহাভারত নামের বৃহৎ পুস্তকখানিতে আমরা কৃষ্ণকে দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভাতেই প্রথম দেখতে পেলাম। দুর্যোধনের সঙ্গে তাঁর কোনো শত্রুতার সংবাদও আগোচর ছিলো। দুর্যোধন তাঁর বৈবাহিক। তাঁর পুত্র দুর্যোধনের কন্যাকে বিবাহ করেছে। সুতরাং একজন বিশেষ আত্মীয়। তাঁকে এই ধরনের অপমান করার মধ্যে যে অশিষ্টতা এবং অভদ্রতা লক্ষ করা যায় তা উন্নতমনস্ক সজ্জনের শোভা পায় না।

কৃষ্ণ তখন প্রৌঢ়ত্বের চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়েছেন, দুর্যোধনের বয়সও কিছু থেমে নেই, একজন বিশিষ্ট রাজাও বটে। তাঁর সঙ্গে কৃষ্ণের যদি বা কোনো কারণে কোনো শত্রুতাও থাকে, তথাপি এই ব্যবহার তাঁকে মানায় না। তবে কি যাদববংশের এই নেতা কৌলিন্যের অভাবেই বোঝেন না যে ব্যক্তিবিশেষ বলে একটা শব্দ আছে অভিধানে! একথাটা অবশ্যই জানা উচিত, একজন আত্মসম্মানজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি কখনো অপমান ভুলবেন না, ভুলতে পারবেন না। ব্যাসদেব এমনভাবে ঘটনাটা সাজালেন যেন দুর্যোধন ঈর্ষাপরায়ণ হয়েই এই কৌশলে নিতান্ত অকারণে সরল সাধু যুধিষ্ঠিরকে এই অন্ধকারে ঠেলে দিলেন। যেমন একবার ভীমকে বিষ খাইয়ে জলে ফেলে দিয়েছিলেন বলে রটানো হয়েছিলো, এই ঘটনাটাও তারই আর এক চেহারা। পিছনে কোনো কারণ নেই, যা আছে তা যুধিষ্ঠিরের দুর্যোধনের প্রতি নির্ভেজাল এক নারকীয় ঈর্ষা। বলরামের বাক্য কারো কর্ণেই সুধাবর্ষণ করলো না, শুধু তিক্ততা ছড়ালো। অতএব সত্যটা কখন মুছে গিয়ে মিথ্যাটাই উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।

কৃষ্ণ উপস্থিত রাজন্যবর্গকে বললেন, ‘যদি কৌরবগণ এঁদের সঙ্গে যুদ্ধ করেন, তবে এঁরা আহত হওয়ামাত্রই ওদের নিহত করবেন।’ আরো বললেন, ‘যদি আপনারা মনে করেন পাণ্ডবগণ সংখ্যায় অল্প বলে ওদের পরাজিত করতে অক্ষম হবেন, তা হলে সকল সুহৃদ একসঙ্গে হয়ে তাদের সংহার করতে যত্নশীল হবেন।’ এই পরামর্শে এটা অতি স্বচ্ছ যে কৃষ্ণ যুদ্ধটাই চাইছেন। কৌরব বংশ ধ্বংস করতে কৃষ্ণ এবং বিদুর একই রকম উগ্র ইচ্ছার অধীন। যুধিষ্ঠির তো বটেই।

এদিকে পাণ্ডবগণ সৈন্য সংগ্রহ করেছেন জেনে দুর্যোধনও সৈন্য সংগ্রহে একাগ্র হলেন। দুর্যোধনের আহ্বানে প্রচুর সৈন্য সংগৃহীত হলো। নানাবিধ ধ্বজা পতাকাশালী সৈন্যগণের সমাবেশে হস্তিনানগর পরিপূর্ণ হয়েও ছাপিয়ে গেলো। তাদের সব বিভিন্ন স্থানে সংস্থাপিত করলেন দুর্যোধন। পাঞ্চালপতি প্রেরিত সেই পুরোহিত সৈন্যর প্রাচুর্য দেখে স্তম্ভিত হলেন।

পুরোহিত কৌরবদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং দ্রুপদরাজার শিক্ষামতো যা যা বক্তব্য সবই ব্যক্ত করলেন। ধৃতরাষ্ট্র ভীষ্ম ইত্যাদি তাঁকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণও করলেন। এবং তাঁদের দিক থেকেও সঞ্জয়কে সন্ধির প্রস্তাব দিয়ে পাঠালেন। যুধিষ্ঠির বললেন, ‘দুর্যোধন আমাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করে যদি ইন্দ্রপ্রস্থ প্রদান করেন, তা হলে আমি শান্তিপক্ষ অবলম্বন করবো। প্রদীপ্ত অগ্নি যেমন ঘৃত পেয়ে তৃপ্ত হয় না, সে রকম বিপুলভোগ্যে বিষয় পেয়েও ধৃতরাষ্ট্র তৃপ্ত হননি। এখন সংকটে পড়ে পরের উপর নির্ভর করছেন। এতে তাঁর মঙ্গল হবে না। এখন তিনি তাঁর দুর্বুদ্ধি ক্রুর স্বভাব কুমন্ত্রীবেষ্টিত পুত্রের জন্য বিলাপ করছেন কেন? বিদুরের উপদেশ অগ্রাহ্য করে অধর্মের পথে চলেছিলেন কেন?’

সঞ্জয়ের বিনীত নিবেদনের উত্তরে এই জবাব নিতান্তই নির্লজ্জ জবাব। রাজা হতে চাইলেও রাজার আচরণ তিনি জানেন না। তদ্ব্যতীত, ধৃতরাষ্ট্রকে যদি নিজের পিতৃব্য বলে বিবেচনা করতেন, তা হলে এভাবে তাঁর বিষয়ে কথা বলতেন না। জন্মাবধি তিনি যদি পাণ্ডুর নিকটই বড়ো হয়ে উঠতেন, তা হলেও এই ধরনের শিক্ষায় শিক্ষিত হতেন না। কথা বলতে জানাটাও যে একটা শিক্ষা, কথাবার্তার মধ্যেও যে মানুষ তার সংস্কৃতির ও আভিজাত্যের প্রমাণ দেয়, তাহলে সেটুকু রাজকীয় জ্ঞান অন্তত জানা থাকতো তাঁর। যে ব্যক্তি জুয়ার নেশায় পত্নীকে পর্যন্ত বিক্রয় করেন, আমরা তেমন ব্যক্তিকে কোনোভাবেই সম্মানিত ব্যক্তি বলে গ্রহণ করতে পারি না। যুধিষ্ঠিরের সামান্য অপরাধবোধ থাকলেও তিনি এভাবে কথা বলতেন না। বিদুরের পুত্র বিদুরই হয়েছেন, রাজবাড়ির প্রলেপ পড়েনি সেখানে। তিনি জানেন, শান্তনুর সিংহাসনের অধিকার না পাওয়া পর্যন্ত, কুরুদের অধীনস্থ না করা পর্যন্ত, শত্রুতা স্তব্ধ হবে না। আর অন্য কিছুতেই তাঁর তুষ্টি নেই। ভীষ্মের রাজপুত্র বানাবার শিক্ষাও এখানে একান্তভাবেই ব্যর্থ হয়েছে মনে হয়। প্রকৃতপক্ষে যাঁর কিছুই স্বোপার্জিত নয়—সিংহাসন তো নয়ই, এমন কি পত্নীটিও নয়—ভোগের লালসা তাঁর মধ্যে সর্বাধিক। অর্ধরাজ্য পেয়ে তিনি তুষ্ট ছিলেন না, সমস্ত রাজ্যের আকাঙ্ক্ষা নিয়েই শকুনির সঙ্গে খেলেছিলেন। সমস্ত রাজ্যের অধিকার পাবার জন্যই বিদুর তাঁকে হাতে ধরে যে রাস্তায় পা ফেলতে বলেছেন সে রাস্তাতেই তিনি পা ফেলেছেন। তারপর পিতামহর হাত ধরে গিয়েছেন দ্রুপদরাজার কন্যার স্বয়ংবর সভায়। কনিষ্ঠ ভ্রাতার উপার্জিত পত্নীটিকে পর্যন্ত দ্বিধাহীনভাবে গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে ধৃতরাষ্ট্র কী করেননি তার জন্য? সাদরে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসেছেন, সন্তুষ্ট চিত্তেই রাজত্বের অর্ধাংশ দিয়েছেন সুখে থাকার জন্য।

সঞ্জয় বললেন, ‘আপনি উদ্বেগহীন হয়ে নিজে সরে যান। স্বর্গের পথ থেকে ভ্রষ্ট হবেন না।’

কৃষ্ণ বললেন, ‘দস্যু বধ করলে পুণ্য হয়। অধর্মজ্ঞ কৌরবগণ দস্যুবৃত্তিই অবলম্বন করেছে।’

কৃষ্ণ হঠাৎ এই নতুন চেনা পাঁচটি ভ্রাতার সঙ্গে বন্ধুতা করে কেন এই বিবাদটা আরো পাকিয়ে তুলছেন তার কোনো কারণ এই মহাগ্রন্থে লেখা নেই। দস্যুবৃত্তি কৌরবরা করেননি, যা করেছেন পাণ্ডবরাই করেছেন। গ্রন্থটির প্ৰথম থেকে শেষ পর্যন্ত অবিশ্রান্ত দুর্ব্যবহার করাটাই ছিলো দুর্যোধনের সঙ্গে তাঁদের একমাত্র সম্পর্ক। কোনো না কোনো ছলে তাঁকে অপদস্থ করা আর হারিয়ে দেওয়া। দুর্যোধন মধ্যস্থ না থাকলে অন্ধ রাজাটিকে রাজ্যচ্যুত করে কর্মচারী বানানোর কোনো অসুবিধে ছিলো না, এটাই কি তবে এই শত্রুতার মূল কারণ? কিন্তু কৃষ্ণ কেন তার মধ্যে ঢুকে পড়লেন, বাস্তববুদ্ধিতে তার ব্যাখ্যা মেলে না।

প্রথম দিকে অনেক তেজ দেখিয়ে যুধিষ্ঠির তাঁর রাজত্ব ফিরে চাইছিলেন, শেষের দিকে ভ্রাতাদের নিশ্চুপ দেখে কিছুটা ভীত হয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে, রাজ্যের একটি প্রদেশ আমাদের দিক, নতুবা আমাদের পাঁচটি ভ্রাতাকে পাঁচটি গ্রাম দিক।’

সঞ্জয় ফিরে এসে যা বললেন তা শুনে ভীষ্ম বললেন, ‘বৎস দুর্যোধন! ধর্ম ও অর্থ থেকে তোমার বুদ্ধি চ্যুত হয়েছে। তুমি যদি আমার কথা অগ্রাহ্য করো, তাহলে বহু লোকের মৃত্যু হবে।’

দ্রোণও তাই বললেন, কিন্তু দুর্যোধন চুপ করে রইলেন। সবাই যখন ধৃতরাষ্ট্রকে পাণ্ডবদের শক্তির কথা বলে ভয় দেখাতে লাগলেন, তখন ধৃতরাষ্ট্রকে সম্বোধন করে দুর্যোধন বললেন, ‘মহারাজা! ভয় পাবেন না। পাণ্ডবরা বনে গেলে কৃষ্ণ, কেকয়গণ, ধৃষ্টকেতু, ধৃষ্টদ্যুম্ন ও বহু রাজা সসৈন্যে ইন্দ্রপ্রস্থের নিকটে এসে আমাদের নিন্দা করেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, পাণ্ডবদের উচিত কৌরবদের উচ্ছেদ করে পুনরায় রাজ্য উদ্ধার করা। গুপ্তচরদের মুখে এই সংবাদ পেয়ে আমার ধারণা হয়েছিলো পাণ্ডবরা তাঁদের বনবাসের প্রতিজ্ঞা পালন করবেন না। যুদ্ধে আমাদের পরাস্ত করবেন। সেই সময়ে পূর্বাপর না জেনে আমাদের মিত্র ও প্রজারা সকলেই ক্রুদ্ধ হয়ে আমাদের ধিক্কার দিচ্ছিলো। তখন আমি ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ ও অশ্বত্থামাকে বললাম, ‘‘পিতা আমার জন্য দুঃখবোধ করছেন।’’ অতএব সন্ধি করাই ভালো। তাতে ভীষ্ম দ্রোণাদি আমাকে আশ্বাস দিলেন, ‘‘ভয় পেয়ো না, যুদ্ধে কেউ আমাদের জয় করতে পারবে না।’’ মহারাজ অসীমতেজ ভীষ্মদ্রোণাদির তখন এই ধারণা দৃঢ় ছিলো। এখন পাণ্ডবগণ পূর্বাপেক্ষা বলহীন হয়েছে। সমস্ত পৃথিবী আমাদের বশে এসেছে। যে রাজারা আমাদের পক্ষে যোগ দিয়েছেন, তারা শোকদুঃখে আমাদেরই অংশভাগী হবেন। অতএব আপনি ভয় দূর করুন। আমাদের সৈন্য সমাবেশে যুধিষ্ঠির ভীত হয়েছেন। তাই তিনি কেবল পাঁচটি গ্রাম চেয়েছেন। তাঁর রাজধানী চাননি। যুদ্ধজয়ের বল সম্বন্ধে যা মনে করেন তা মিথ্যা। আমি যখন বলরামের কাছে অস্ত্র শিক্ষা করতাম, তখন সকলে বলতো, সম্মুখ যুদ্ধে আমার সমান পৃথিবীতে কেউ নেই। আমি এক আঘাতেই ভীমকে যমালয়ে পাঠাবো। ভীষ্ম দ্রোণ অশ্বত্থামা কৃপ কর্ণ ভুরিশ্রবা শল্য ভগদত্ত ও জয়দ্রথ এঁদের যে কেউ পাণ্ডবদের বধ করতে পারেন। এঁরা সম্মিলিত হলে ক্ষণমাত্রেই তাদের যমালয়ে পাঠাবেন। কর্ণ ইন্দ্রর কাছ থেকে অমোঘ শক্তি অস্ত্র পেয়েছেন। সেই অস্ত্রের সঙ্গে যুদ্ধে অর্জুন কী করে বাঁচবেন? মহারাজ! বিপক্ষের বল আমাদের তুলনায় সর্বরকমেই হীন। আমি জীবন, রাজ্য ও সমস্ত ধন ত্যাগ করবো, কিন্তু কোনো কিছুর বিনিময়েই পাণ্ডবদের সঙ্গে বাস করবো না।’

দুর্যোধন জানিয়ে দিলেন পাঁচটি গ্রাম তো দূরের কথা, তীক্ষ্ণ সূঁচের অগ্রভাগ দিয়ে যতোটুকু ভূমি বিদ্ধ করা যায় তা-ও তিনি পাণ্ডবদের ছেড়ে দেবেন না।

ধৃতরাষ্ট্র পুত্রের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, ‘দেবগণ পাণ্ডবদের পিতা, তাঁরা পুত্রদের সাহায্য করবেন। দেবগণের সঙ্গে মিলিত হলে পাণ্ডবদের বিপরীত পক্ষে কেউ দৃষ্টিপাত করতেও ভয় পাবে।’

দুর্যোধন বললেন, ‘তাই যদি হতো, তবে তাদের এতোদিন কষ্ট ভোগ করতে হতো না। দেবতারা আমার উপর বিক্রম প্রকাশ করবেন না, কারণ আমারও যথেষ্ট তেজ আছে। আমি মন্ত্রবলে অগ্নি নির্বাপিত করতে পারি, ভূমি বা পর্বতশিখর বিদীর্ণ হলে পুনরায় স্থাপিত করতে পারি, শিলাবৃষ্টি ও প্রবল বায়ু নিবারণ করতে পারি, জল স্তম্ভিত করে তার উপর দিয়ে রথ ও পদাতিক নিয়ে যেতে পারি। আমি যা বলি তা সর্বদাই সত্য হয়। সেজন্যই লোকে আমাকে সত্যবাক্ বলে।’

কৃষ্ণ হস্তিনাপুরে এলেন। কৃষ্ণ আসছেন শুনেই ধৃতরাষ্ট্র হৃষ্ট হয়ে তাঁর উপযুক্ত সম্বর্ধনার জন্য পুত্রকে আদেশ দিলেন। দুর্যোধন নানা স্থানে সুসজ্জিত পরিমণ্ডল নির্মাণ করে খাদ্য পেয় ইত্যাদির বন্দোবস্ত করলেন। বিদুর ইতিমধ্যে পুনরায় ধৃতরাষ্ট্রকে তাঁর পুত্রের বিরূদ্ধে এবং পাণ্ডবদের সপক্ষে অনেক কথা বলে একটি সুদীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন।

কৃষ্ণ এসে তাঁর বৈবাহিক এবং রাজা ধৃতরাষ্ট্রের কোনো আদর আপ্যায়ন গ্রহণ না করে প্রথমেই বিদুরের কাছে গেলেন। আর বিদুরের কাছে যাওয়া মানেই কুন্তীর কাছে যাওয়া। কৃষ্ণ আসছেন জেনে দুর্যোধন যতো আয়োজন করেছিলেন তার আসল উদ্দেশ্যটা খুব ভালো ছিলো না। তিনি তাঁকে বন্দী করতে চেয়েছিলেন। আবার এদিকে কৃষ্ণও যে এসেছিলেন সন্ধির নামে, তাও সন্ধির চেহারায় কর্ণকে দলে টেনে নেবার চেষ্টায়। বৈবাহিকের ভোজ্য পেয় গ্রহণ না করলেও সভাস্থ সকলের সঙ্গে দেখা করতে এসে বিশ্বরূপ দর্শন করিয়ে একেবারে মুহ্যমান করে দিলেন সবাইকে।

দুর্যোধন এসব প্রদর্শনে বিচলিত হতেন না। বরং পাণ্ডব শিবিরে উলুককে পাঠাবার সময়ে বলে দিলেন, ‘কৃষ্ণকে আমার হয়ে বলবে, তোমার ইন্দ্রজাল দেখলে অস্ত্রধারী বীর ভয় পায় না, সিংহনাদ করে। আমরাও বহুপ্রকার যাদুবিদ্যা দেখাতে পারি, কিন্তু সেই উপায়ে কার্যসিদ্ধি করতে চাই না। রাজাদের পক্ষে সেটা লজ্জা। ছিলে তো কংসের ভৃত্য, সেজন্য আমার মতো রাজা তোমার সঙ্গে যুদ্ধ পর্যন্ত করে না।’

মহাভারতে এই ধরনের বিশ্বরূপ আরো দুজন দেখাতে পারতেন বলে উল্লেখ আছে। এ কথা তো একান্তই সত্য যে পাণ্ডবদের যতো ক্লেশ, যতো গ্লানি সবই যুধিষ্ঠিরের জন্য। রাজ্যলিপ্সাও যুধিষ্ঠিরেরই প্রবল। যুধিষ্ঠিরই রাজা হয়েছেন, যুধিষ্ঠিরই রাজসূয় যজ্ঞের অধিকারী হয়েছেন, সেই সাধ মেটাতে অতি নিকৃষ্ট পদ্ধতিতে জরাসন্ধ বধ করেছেন, শিশুপালের মস্তক চূর্ণ করেছেন, অবশ্য সবই ভ্রাতাদের হাত দিয়ে। দেশদেশান্তর ঘুরে ক্লান্তবিধ্বস্ত হয়ে ভ্রাতারাই কতো রাজ্য জয় করে কতো রাজাকে যুধিষ্ঠিরের পদতলে এনে ফেলেছেন, সীমাহীন ধনরত্নের অধীশ্বর করেছেন। তারপর তিনি কী করলেন? জুয়া খেলে সবাইকে ডোবালেন। এখনো যে যুদ্ধের জন্য এতো আস্ফালন করছেন, তা-ও তাঁর নিজের ক্ষমতায় নয়। এখন তো আবার চতুর কৃষ্ণ এসে সঙ্গে জুটেছেন।

দুর্যোধন পাণ্ডবপক্ষের সকলেরই শত্রু। এমন কোনো অপযশ নেই যা তাঁর কপালে জোটেনি বিদুরের দয়ায়। এবং সেই বিদ্বেষ পরিজনদের মধ্যে ভালোভাবেই সংক্রামিত হয়েছে। অতএব দুর্নামের আর ভয় নেই দুর্যোধনের। পাণ্ডবদেরও যেমন সুনামের ক্ষয় নেই।

দুর্যোধন এটা ঠিকই বুঝেছেন যে পাঁচটা গ্রাম কেন ইন্দ্রপ্রস্থ দিয়ে দিলেও বিদুর এবং যুধিষ্ঠির যে ক্ষান্ত হবেন তা নয়। মাত্র ঐ অর্ধেক রাজত্বের জন্য তাঁরা পর্বতশিখর থেকে নামেননি। প্রয়াত শান্তনুর সিংহাসনে বসে সম্পূর্ণ হস্তিনাপুরের অধীশ্বর হবার বাসনাই তাঁদের মুখ্য উদ্দেশ্য। বনবাসে যাবার সময়ও তাঁরা এই প্রতিজ্ঞা করেই গিয়েছিলেন, যুদ্ধে দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ করবেন, দুঃশাসনের রক্তপান করবেন। যখন জতুগৃহে আগুন লাগিয়ে বিদুরের পাঠানো যন্ত্রযুক্ত নৌকায় উঠলেন, তখনও চালক বলেছিলো, ‘বিদুর আপনাদের আলিঙ্গন জানিয়ে বলেছেন, আপনারা দুর্যোধন কর্ণ এবং শকুনিকে যুদ্ধে জয় করবেন।’ অবস্থাবৈগুণ্যে সে ইচ্ছা তাঁদের অবদমিত হয়ে থাকলেও সুযোগ পাওয়ামাত্রই সেটা তাঁরা কার্যকর করবেন, সে বিষয়ে দুর্যোধনের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। সুতরাং অর্জিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ করে নিজেকে বলহীন করা আর তাদের বলবান করার মতো মূর্খতা অার কী হতে পারে? ক্ষত্রিয়দের যুদ্ধে পরাঙ্মুখ হলে চলে না।

কৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শনে মুগ্ধ ভীষ্ম ও দ্রোণ বললেন, ‘দুর্যোধন! যুধিষ্ঠিরকে প্রণাম করো, তিনি তাঁর সুলক্ষণ দক্ষিণ বাহু তোমার স্কন্ধে রাখুন, তোমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিন, (হে ঈশ্বর! কতো অলীক কল্পনাই না এঁরা করতে পারেন) ভীম তোমাকে আলিঙ্গন করুন (সর্বনাশ!)।’

এসবের কী জবাব দেবেন দুর্যোধন! মনে মনে বিদুরকে বাহবা দেন, কী করে এই সব সরল ধর্মজ্ঞ বৃদ্ধদের তাঁর কূটনীতির বুদ্ধি দিয়ে বশ করে ফেলেছেন। তাঁরা তো তাঁর ভালোর জন্যই বলছেন। ভাবছেন, এভাবেই তাঁদের সৌভ্রাত্র পুনরায় স্থাপিত হবে। প্রথমত, আদৌ তাঁরা ভ্রাতা নয়; তদ্ব্যতীত, সেই ভ্রাতৃত্বের জন্মই তো হয়নি কখনো। বিদুর ব্যতীত আর কারোকেই পাণ্ডবরা চেনেন না। জানেন না। মানেন না।

এদিকে হস্তিনাপুর থেকে সকলের নিকট বিদায় নিয়ে প্রত্যাবর্তিত হবার জন্য কৃষ্ণ যখন তাঁর রথে আরোহণ করলেন, তখন কর্ণকেও সঙ্গে নিলেন। আসল উদ্দেশ্য কৃষ্ণের এটাই ছিলো, যুদ্ধে কর্ণকে পাণ্ডবদের সঙ্গী হতে বলা। সন্ধির প্রস্তাবটা একটা ছলনামাত্র। এরকম যোদ্ধাকে সঙ্গে পেলে পাণ্ডবদের শক্তি দ্বিগুণ বেড়ে যাবে।

রথে তুলে বললেন, ‘কুমারী কন্যার গর্ভে পুত্র হলে তাকে কানীনপুত্র বলে। কর্ণ, তুমি কানীনপুত্র। রাধেয়, তুমি বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণদের সেবা করেছো, ধর্মশাস্ত্রের সূক্ষ্ম তত্ত্বসকল শিখেছো। তুমি ধর্মানুসারে পাণ্ডুরই পুত্র। অতএব তুমি রাজা হও। তোমার পিতৃপক্ষীয় পাণ্ডবগণ এবং মাতৃপক্ষীয় বৃষ্ণিগণ, দুই পক্ষকেই তোমার সহায় বলে জেনো। তুমি আজ আমার সঙ্গে চলো, পাণ্ডবরা জানুন যে তুমি যুধিষ্ঠিরের অগ্রজ। তোমার পাঁচভ্রাতা এবং দ্রৌপদীর পাঁচপুত্র এবং অভিমন্যু তোমার চরণধারণ করবেন, দ্রৌপদীও ষষ্ঠকালে তোমার সঙ্গে মিলিত হবেন। আমরা তোমাকে পৃথিবীর রাজপদে অভিষিক্ত করবো। কুন্তীপুত্র, তুমি ভ্রাতৃগণে বেষ্টিত হয়ে রাজ্যশাসন করো, পাণ্ডবভ্রাতাদের সঙ্গে তোমার সৌহার্দ্য হোক।’

মৃদু হেসে কর্ণ বললেন, ‘ধর্মশাস্ত্র অনুসারে আমি পাণ্ডুরই পুত্র, সে কথা আমি জানি। কুন্তী আমাকে গর্ভে ধারণ করেন এবং হিত চিন্তা না করে ত্যাগ করেন। অধিরথ আমাকে তাঁর গৃহে আনেন, তাঁর পত্নী রাধার স্নেহবশে স্তনদুগ্ধ ক্ষরিত হয়েছিলো। আমি কী করে তাঁর পিণ্ডলোপ করতে পারি? পত্নীদের সঙ্গে আমার প্রেমের বন্ধন আছে। গোবিন্দ! সমস্ত পৃথিবী এবং রাশি রাশি সুবর্ণ পেলেও আমি সেই সম্বন্ধ কখনো অস্বীকার করতে পারি না। তদ্ব্যতীত, আমি ত্রয়োদশ বৎসর দুর্যোধনের আশ্রয়ে নিষ্কণ্টক রাজ্যভোগ করেছি, সূতগণের সঙ্গে আমি বহু যজ্ঞ করেছি, তাদের সঙ্গে সম্বন্ধও আমার গভীর। আর সর্বোপরি, দুর্যোধন আমার ভরসাতেই যুদ্ধের উদযোগ করেছেন। দ্বৈরথ যুদ্ধে অর্জুনের প্রতিযোদ্ধারূপেই আমাকে বরণ করেছেন। কোনো কিছুর বিনিময়েই আমি তাঁর সঙ্গে মিথ্যাচার করতে পারি না। কেশব! সারা বিশ্বে পুণ্যতম স্থান কুরুক্ষেত্রে ক্ষত্রিয়মণ্ডল যেন অস্ত্রযুদ্ধে নিহত হন। সমস্ত ক্ষত্রিয়ই যেন স্বর্গলাভ করেন।’

কৃষ্ণ একটু হাসলেন, ‘তাহলে তুমি পৃথিবীর রাজ্য চাও না?’

কর্ণও মৃদুহাস্যে বললেন, ‘সব জেনেও আমাকে কেন ভোলাচ্ছো। পৃথিবীর ধ্বংস আসন্ন, আমরা তার নিমিত্তমাত্র। আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি, তুমি এক রক্তাক্ত পৃথিবীকে হাতে ধরে নিক্ষেপ করছো আর অগ্নিস্তূপের উপর উঠে দাঁড়িয়ে যুধিষ্ঠির স্বর্ণপাত্রে ঘৃতপায়েস ভক্ষণ করছেন, আর তোমার পৃথিবী তা গ্রহণ করছে।’

কৃষ্ণ বললেন, ‘তা হলে তুমি এই পৃথিবীর বিনাশই চাও?’

কর্ণ কৃষ্ণকে গাঢ় আলিঙ্গন করে বললেন, ‘হয়তো স্বর্গেই পুনরায় আমাদের মিলন হবে।’ এই বলে নেমে গেলেন রথ থেকে।

কৃষ্ণ বিফল হয়ে ফিরে গেলে কুন্তী ভাবলেন, কর্ণ তো আমারই পুত্র। আমি কিছু বললে কি সে শুনবে না? সকলের মতো আমিও জানি আমার পুত্র দয়ালু, সত্যনিষ্ঠ। এই রকম ভেবে কুন্তীও কর্ণর নিকটে গেলেন। কর্ণ কুন্তীকে দেখতে পেয়ে সবিস্ময়ে প্রণাম করে কৃতাঞ্জলিপুটে বললেন, ‘আমি অধিরথ ও রাধার পুত্র কর্ণ। আজ্ঞা করুন, আপনার জন্য আমি কী করতে পারি।’

কর্ণর বাক্য শুনে কুন্তী বললেন,‘কর্ণ, তুমি কৌন্তেয়। রাধার গর্ভে তোমার জন্ম হয়নি, অধিরথও তোমার পিতা নন, তপনদেব তোমার জন্মদাতা। তুমি সর্বগুণসম্পন্ন, আমার পুত্রদের সর্বজ্যেষ্ঠ—’

কর্ণ বললেন, ‘ক্ষত্রিয়জননী, আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা নেই। আপনার অনুরোধও আমি ধর্মসংগত মনে করি না। আপনি আমাকে ত্যাগ করেছিলেন। তাতে আমার যশ ও কীর্তি নষ্ট করেছেন। জন্মে ক্ষত্রিয় হলেও আপনার জন্য আমি ক্ষত্রিয়োচিত সম্মান পাইনি। এরচেয়ে অধিক অপরাধ কোনো শত্রুও করতে পারে না। যথাকালে আমার প্রতি আপনার কিঞ্চিৎমাত্র দয়াও ছিলো না। এখন এসেছেন কেবল আপনার নিজের হিতের জন্য। আমার জন্য নয়। কিন্তু আপনার আগমন আমি ব্যর্থ করবো না, আমি অর্জুনকে নিহত করে অভীষ্ট ফল লাভ করবো, অথবা তার হাতে নিহত হয়ে যশোলাভ করবো। যেই মরুক, অর্জুন অথবা আমাকে নিয়ে আপনার পাঁচপুত্রই জীবিত থাকবে।’

স্বার্থপর কুন্তী বললেন, ‘এই কথা কিন্তু মনে রেখো।’ বলতে বলতে পুত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে সহসা স্নেহে আপ্লুত হয়ে আলিঙ্গন করলেন পুত্রকে, আশীর্বাদ করলেন। কর্ণ তাঁকে অভিবাদন করলেন।



চলবে...
বাকি পর্বগুলো পড়ুন এই লিঙ্কেঃ https://www.amarboi.com/search/label/mahabharatera-maharanye


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com