সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label রিজিয়া রহমান. Show all posts
Showing posts with label রিজিয়া রহমান. Show all posts

পবিত্র নারীরা - রিজিয়া রহমান

amarboi
উপন্যাস
পবিত্র নারীরা
রিজিয়া রহমান

দূরের গাছের সারির পেছনেই পাহাড়, আঁকাবাঁকা সাদা বরফের টুপি পরা পাহাড়। এখন অবশ্য বরফের টুপিটা অত চোখে পড়ে না। ঝকঝকে রোদ উঠলে সাদা শিরা-উপশিরার মতো রেখাগুলো উজ্জ্বল ঝলক দেয়। কাল ওই পাহাড়ের শরীরে একটা আশ্চর্য দৃশ্য দেখা গেছে। বাতাসে ক্রমাগত ঢেউ তুলছে ঘাসবন। পনেরো বছরের সুন্দরী মেয়ে রুমিতা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকেই শুরু হয়েছে ঘাসের বন, একেবারে যেন বিশাল একটা সবুজ হ্রদ। হ্রদের সবুজ ঢেউগুলো একের পর এক বয়ে চলেছে, সেই দূরের পাহাড় অবধি। পাহাড়ের কোলের কাছেই গাঢ় সবুজ গাছপালার সারি। ঠিক সেইখানেই শেষ হয়েছে এই অবারিত তৃণভূমি। সারাটা শীতে ঘাসগুলো মাটির গর্ভে চলে যায়। একটানা ঘুমে কাটায় মাসের পর মাস। তারপর শীত বিদায় নেয়। তৃণভূমির ঘুম ভাঙতে থাকে। বসন্তের শেষে তারা চমৎকার ঝরঝরে হয়ে বেড়ে ওঠে। হেলেদুলে গান গায়, বাতাসের ছোঁয়ার গান। সে গান অসম্ভব ভালো লাগে রুমিতার। এখন অবশ্য রুমিতা তৃণভূমির গান খুব একটা মনোযোগ দিয়ে শুনছে না। তার দৃষ্টি দূরের পাহাড়ে। কাল ওখানে একটা আশ্চর্য দৃশ্য দেখা গেছে। রুমিতা সুন্দরী। ওদের গোত্রের সবাই একথা বলে। শরীরের রং পাকা জলপাইর চেয়ে আরো একটু উজ্জ্বল। কিছুটা হলুদের আভা ঝলক দেয়। ভরাট জানু, শক্ত কঠিন পায়ের পেশি, বাহু দুটি আশ্চর্য কোমল। একটু চ্যাপ্টা ধাঁচের মুখ, ভরাট ঠোঁট, সুডৌল গ্রীবা। এই বয়সেই সে পরিপূর্ণ যুবতীর দেহ পেয়ে গেছে। গোত্রের তার বয়সী সব ছেলে-মেয়ের মধ্যে রুমিতাই ভীষণ সাহসী, পরিশ্রমী।

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সংস্কৃতির ঢেঁকি - রিজিয়া রহমান

amarboi
সংস্কৃতির ঢেঁকি

রিজিয়া রহমান

ফাঁপরে পড়েই পুরনো বন্ধুর শরণাপন্ন হলেন হেকমত আলী। বললেন—ভাই একটা বুদ্ধি দাও। দেখে-শুনে বিয়ে করলাম নাইন পাস মেয়ে। ভেবেছিলাম আয়না-বায়নার ঝামেলা করবে না, মন দিয়ে করবে ঘর-গেরস্থালির কাজ। কিন্তু দুনিয়ার হাওয়াটাই এমন যে এখন অন্ধেরও চোখ খুলে যেতে দেরি হয় না।

ব্যাপারটা ভাববারই মতো। হেকমত মধ্যম আয়ের নিচের সীমার চাকুরে। আঙুলে গুনে করতে হয় সংসার খরচ। দেশের বাড়িতে একগণ্ডা পুষ্যি। এদিকে তার এক বছরের আনকোরা গৃহিণী মফস্বলের লাজুকলতা আশা বেগম অনেক বড় বড় আশা করতে শুরু করেছে। আজ এটা চাই। কাল সেটা চাই। ভি.সি.আর-ভি.সি.ডি চাই, হালের গয়না চাই, চাই ফ্যাশনদুরস্ত শাড়ি জামা জুতো ব্যাগ প্রসাধনী। বউ’র বায়নার ত্রিসীমায় যাবার কথা ভাবলেও ভয়ে হেকমতের সব হেকমত কর্পূর হয়ে উড়ে যায়। লাখ লাখ শর্ষেফুলের আমদানি হয়ে যায় চোখের সামনে।

অনেক ভেবেচিন্তেই সমাধানের উপায়টা পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগের বুদ্ধি দিল বন্ধু। বলল—বউকে সংস্কৃতি শেখাও। তাতে ওসব শখের ভূত ছেড়ে যাবে। তবে খবরদার—দেশি সংস্কৃতি ছাড়া আর কিছুতে নাক গলাতে দিয়ো না।

ফ্যাকাশে মুখে ঢোক গিললেন হেকমত আলী—কিন্তু ভাই ওসবে যে অনেক খরচ।

—আরে দূর। দেশি সংস্কৃতিতে খুব কম খরচ। পয়সা ফেলতে হয় তো অপসংস্কৃতির বেলায়। এক কাজ করো। বউকে বইয়ের নেশা ধরিয়ে দাও। ব্যস দুদিনেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

দোদুল্যমান সংশয় নিয়ে বিদায় নিলেন হেকমত। কিন্তু ফল হলো চমৎকার। হেকমতের বউ আশা এখন অসাধ্য সাধ্যের দুরাশা ছেড়ে মন দিয়েছে পাঠে। কিন্তু ক’দিন পরেই ব্যাজার মুখে হেকমত এসে হাজির। আবার বিপত্তি দেখা দিয়েছে। আশা বেগম দিনরাত গোগ্রাসে গিলছেন রাজ্যের গল্প-উপন্যাস। সংসারের কাজে মন নেই। রোজই ভাত পুড়ে যায়, তরকারিতে নুন হয় না। মাছ নিয়ে যায় বেড়ালে। এর ওপর রয়েছে বই জোগানোর সমস্যা। নতুন বই কেনা না হলে আশা প্রচণ্ড নিরাশ হয়ে বিছানায় পড়ে যায়। খায় না, নায় না। চোখ মেলে চায় না। বাধ্য হয়ে ধার-কর্জ করে কিনে আনতে হয় নতুন বই। তার ওপর দেখা দিয়েছে এক নতুন উপসর্গ। গল্প-উপন্যাসের নায়ক-নায়িকার মতো প্রায়ই ঘুরে বেড়াবার বায়না ধরছে নদীর ধারে, রাত দুপুরে প্রচণ্ড শীতে জ্যোৎস্না দেখবার শখ করছে ছাদে উঠে। যখন তখনই বলছে—সমুদ্রে যাব। পাহাড় দেখব। আর মুখ ভার করে স্বামীকে দোষারোপ করছে—তুমি তো বইয়ের নায়কদের মতো সুন্দর করে কথা বলো না আমার সঙ্গে।

বন্ধু এবার বললেন—এক কাজ করো, কিছু কট্টর প্রবন্ধের বই কিনে দাও। আজকাল সবকিছুতেই ভেজাল। প্রবন্ধে ভেজাল কিছুটা কম। হজম হবে সহজে।

এক বান্ডিল প্রবন্ধের বই জোগাড় করে আশা বেগমের হাতে তুলে দিয়ে বড় আশা নিয়েই বললেন হেকমত—নাও এবার কালচার সম্পর্কে কিছু জ্ঞান বাড়াও।

বইগুলো উলটে-পালটে নিরাশ হয়ে আশা বেগম ভুরু তুলে প্রশ্ন করল—সেটা আবার কত নম্বর অপকর্ম?

চমকে গেলেন হেকমত আলী। বইপত্র পড়ে পড়ে কি মাথাটা একেবারেই নষ্ট হয়ে গেল না কি তার সুন্দরী বউয়ের। বললেন—অপকর্ম কেন হতে যাবে। এ তো কালচার!

আশা বেগম বিজ্ঞভাবে জানিয়ে দিল—গল্প-উপন্যাসে ‘চার’ দিয়ে যত শব্দ পাচ্ছি সেগুলো সবই তো খারাপ কাজ। যেমন অবিচার, অত্যাচার, অনাচার—

বউয়ের জ্ঞানের বহরে অবাক হলেন হেকমত। বললেন—ওই আচার আর এই আচার মোটেই এক নয়। একেবারেই আলাদা। এ হলো গিয়ে কালচার। অর্থাৎ সংস্কৃতি। এরপর নিজের জ্ঞানের ভাণ্ডার ঝেড়েমুছে কালচারের ওপর নাতিদীর্ঘ এক বক্তৃতা দিয়ে বসলেন হেকমত আলী।

ওষুধ ধরে গেল। আশা বেগম দিনরাত প্রবন্ধের বইতে মনোনিবেশ করে সংস্কৃতিবিষয়ক জ্ঞান অর্জন করতে শুরু করল। তারপর হঠাৎ একদিন পাড়ার মহিলা সমিতির সংস্কৃতি সচিব হয়ে বসল। হেকমত আলী মহাখুশি। সংস্কৃতিচর্চা করে আশা বেগমের জ্ঞানগম্যি যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি বৃদ্ধি পাচ্ছে সামাজিক পরিচিতি। আশা বেগম এক প্রভাবশালী ব্যক্তির স্ত্রীর সঙ্গে খাতিরের সুবাদে হেকমত আলীর চাকরিতে প্রমোশন পর্যন্ত ঘটিয়ে ফেলল। ভাগ্যিস হেকমত আলীর বন্ধু সংস্কৃতির পথটা চিনিয়েছিল। তার বদৌলতেই হেকমত আলী সংস্কৃতিবতী স্ত্রীকে নিয়ে নতুন বাড়িতে সাজিয়ে-গুছিয়ে বসতে পারলেন।

কিন্তু বিপত্তি দেখা দিল আবার। পয়লা বৈশাখের সকালে গরমভাতে পানি ঢেলে ভাজা শুঁটকি মাছ কাঁচা মরিচসহ নাশতার টেবিলে পরিবেশন করল আশা বেগম। যথোচিত গুরুত্ব দিয়ে বলল—ভুলে যেয়ো না আমরা বাঙালি। পান্তাভাত আমাদের ঐতিহ্য।

অনভ্যস্ত অভ্যাসটি সংস্কৃতির খাতিরে মেনে নিলেন হেকমত আলী। যাই হোক সংস্কৃতিচর্চার কারণেই তো হেকমত আলীর কপালে সুখ এসেছে। কিন্তু বেশিদিন স্থায়ী হলো না তার সুখের কপাল। বাড়ি থেকে কাঠের চেয়ার-টেবিল সোফা উধাও হলো। তার বদলে এল পিঁড়ি আর পাটি। এরপর বিদায় হলো অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল। রান্না শুরু হলো মাটির হাঁড়িতে মাটির চুলোয়। চীনা মাটির প্লেট আর কাচের গ্লাসের বদলে মাটির থালাবাসন চালু করা যায় কি না এ সম্পর্কেও ভাবনা-চিন্তা শুরু করলেন আশা বেগম।

হেকমত আলী শঙ্কিত হয়ে বাতিল তৈজসপত্রের পক্ষে ওকালতি করতে চেষ্টা করলেন—এসব নিয়ে কি আর সংস্কৃতিচর্চা হয় না? এরা তো তোমার সংস্কৃতির কোনো ক্ষতি করেনি।

আশা বেগম ডায়াসের প্রধান বক্তার মতো জানিয়ে দিল—এসব হচ্ছে অপসংস্কৃতি। এগুলোর আমদানির মারফতই তো দেশজ শিল্প-সংস্কৃতি ধ্বংস হচ্ছে।

হেকমত আলী প্রমাদ শুনলেন। না গুনেই বা উপায় কী। এদিকে সংস্কৃতির বাহন শিকা, কুলো-ডালা, ঘটি-বাটিতে ঘর ভরে তুলেছে আশা বেগম। পদে পদে হোঁচট খেতে হয়। কিন্তু এতেই তো আর আশা বেগমের সংস্কৃতি গবেষণা নিরস্ত হতে পারে না। সংস্কৃতি-সভার নেতৃত্ব দিয়ে আশা বেগম বাড়ি ফিরেই ঘোষণা করে বসল—এবার একটা ঢেঁকি দরকার।

হেকমত আলী একেবারে হাঁ হয়ে গেলেন—ঢেঁকি দিয়ে কী হবে শহরের এই তিনতলা ফ্ল্যাটবাড়িতে? এ কি আর গাঁয়ের বাড়ি যে মণকে মণ ধান আসছে ক্ষেত থেকে। আর বাড়ির গিন্নি লোক দিয়ে ধান ভানাচ্ছে।

বিরক্ত হলো আশা বেগম—কী যে বলো। লোক দিয়ে কী হবে। ঢেঁকি আমি নিজেই ভানব।

চোখ কপালে উঠে গেল হেকমত আলীর। কী সাংঘাতিক কথা। বলা তো যায় না। সংস্কৃতি নিয়ে যেমন ক্ষেপেছে আশা বেগম তাতে তিনতলায় একটা ঢেঁকি চড়িয়ে—‘ও ধান ভানিরে’, গাইতে গাইতে ঢেঁকি ভানতে শুরু করা অসম্ভব কিছু নয়। স্ত্রীকে বুঝ দেবার চেষ্টায় হেকমত নরম হলেন—কী যে সব পাগলামির কথা বলো! তুমি ভানবে ঢেঁকি এ কখনো হতে পারে?

সংস্কৃতি ভাবনায় একাগ্র আশা নিজের মতো অবিচল—পাগলামি কেন হতে যাবে। এ তো আর যে সে ঢেঁকি নয়। কালচারের ঢেঁকি। আগে ঢেঁকিটা আসুক তখন দেখবে।

এতদিন পরে রাগে-দুঃখে নিজের মাথাটাই ঢেঁকিতে কুটতে ইচ্ছে হলো হেকমত আলীর। কোন দুঃখে যে বন্ধুর কথামতো খাল কেটে এই কুমির ঘরে এনেছিলেন তিনি। এর চেয়ে শাড়ি-গয়নার বায়না যে অনেক নিরাপদ ছিল, আশা বেগমের ঢেঁকির চিন্তাকে নিরস্ত করবার চেষ্টাতে ঢেঁকি অবতারণার নানা কুফল তুলে ধরলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত বললেন—দ্যাখো ঢেঁকি জিনিসটা নেহাতই ছোটলোকি জিনিস।

আশা বেগম মাথা নাড়ল—ওসব সামন্তবাদী কথার দিন শেষ।

হেকমত আলীও হাল ছাড়তে নারাজ। নতুন যুক্তির অবতারণা করে ফেললেন—তুমি তো ইদানীং মেলা বইপত্র পড়ছ। জানো তো ঢেঁকি কথাটা খুব তুচ্ছার্থে ব্যবহার করা হয়। বলা যায় এক ধরনের গাল-মন্দ। এই যেমন ধরো—তোমাকে যদি এখন বলি যে তুমি একটা বুদ্ধির ঢেঁকি। তাহলে নিশ্চয়ই তুমি রেগে উঠবে।

আশা বেগম প্রসন্ন হাসিতে উৎফুল্ল হলো—এসব ঔপনিবেশিক সংস্কৃতিকে উৎখাত করব বলেই তো ঢেঁকিকে ঘরে তুলতে চাচ্ছি। ঢেঁকিকে তার প্রাপ্য মর্যাদা না দিতে পারলে আমাদের সংস্কৃতির কোনো উন্নতিই হবে না।

‘ঢেঁকি’ বিষয় নিয়ে জরুরি সভায় যোগ দেবার জন্য বাড়ি থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল আশা বেগম। যাবার সময় বলে গেল—বাংলা বাগধারা থেকে ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে’ এ কথাটা তুলে দেবার জন্যই আমরা শিগগিরই আন্দোলন শুরু করব।

স্ত্রীকে মনে মনে অকর্মার ঢেঁকি গাল দিতে দিতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন হেকমত আলী।

দুদিন পরে অফিস থেকে ফিরেই দেখলেন ঠেলাগাড়ি থেকে বিরাট এক ঢেঁকি নামছে তাঁর বাড়িতে। হেকমত আলীকে দেখে আশা বেগম খুশিতে ডগমগ হয়ে বলল—ওগো, আর চিন্তা নেই। ঢেঁকি এসে গেছে।

আমকাঠের ঢেঁকির বেঢপ শরীরকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকবার পথ খুঁজতে খুঁজতে হেকমত পুরনো মেজাজে বললেন—একেবারে আহ্লাদের ঢেঁকি।

কটুবাক্য আশা বেগমের কর্ণ গোচর হলো না। সে এখন ঢেঁকি নিয়ে মহাব্যস্ত। অনেক ভাবনা-চিন্তা জল্পনা-পরিকল্পনার পর ঢেঁকিকে বসানো হলো ড্রইংরুমে। আশা বেগমের জোরালো যুক্তিও রয়েছে এর সপক্ষে। ডালা, কুলো, সরা, ঘটি, পাটি দিয়ে যদি বসার ঘর সাজানো যায়, তাহলে ঢেঁকিই বা কী দোষ করল। তাছাড়া ঢেঁকিকে তো তার যোগ্য সম্মানও দিতে হয়। বহুদিন ধান ভানা শ্রমিকের কাজ করে অনাদরে ঢেঁকির ঘরে পড়ে থেকে বহু বঞ্চিত হয়েছে। বেচারি অতি প্রাচীন অবহেলিত ঐতিহ্যের ঢেঁকি।

আশা বেগমের এখন দম ফেলবার অবসর নেই। অপ্রচলিত ঐতিহ্যকে প্রচলিত করবার ঐতিহাসিক দায়িত্ব তার ওপরে। আবহমানকালের ঢেঁকিকে নিয়ে তৈরি করে ফেলল ঢেঁকি কমিটি। আর ঢেঁকি কমিটির সভানেত্রী হয়ে উঠে পড়ে লেগে গেল ঢেঁকির প্রচারে। ঢেঁকির ওপর সেমিনার, ঢেঁকি প্রদর্শনী, ঢেঁকিভিত্তিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি নিয়ে। আশা বেগম যেন জীবনটাকে ঢেঁকির নিচে উৎসর্গ করবার ব্রত গ্রহণ করে ফেলল।

বিকেলে অফিস থেকে ফিরে বাড়িতে ঢুকতে বেগ পেতে হলো হেকমত আলীকে। বাড়িটা একটা জাদুঘর হয়ে গেছে। একদঙ্গল ইস্কুলের ছাত্র-ছাত্রীকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে ঢেঁকি চেনাচ্ছে আশা বেগম। হেকমত আলীকে দেখে পরম খেদে বলল—দ্যাখো কাণ্ড! এ দেশের ছেলেমেয়েরা ঢেঁকি চেনে না। কী লজ্জার কথা! আমাদের অতীত জীবনে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ঢেঁকি কত বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। ঢেঁকি কমিটির সদস্য-সদস্যাদের উদ্দেশে সুচিন্তিত সুপারিশ দিয়ে ফেলল আশা বেগম—শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে আমাদের দাবি পাঠাতে হবে যে এখন থেকে ঢেঁকিকে পাঠ্য তালিকাভুক্ত করা হোক।

হেকমত আলী দুর্বল প্রতিবাদ তুললেন একটু—কিন্তু একসময় গ্রামের ডাকাতরা যে ঢেঁকি নিয়ে গেরস্থের দরজা ভাঙত এটা প্রচার হলে যে সমাজবিরোধীরা অনুপ্রেরণা পেয়ে যাবে।

মহা খাপ্পা হলো আশা বেগম—তুমি থামো তো। এ ঢেঁকি কি আর সে ঢেঁকি! এ তো সংস্কৃতির ঢেঁকি।

শুকনো মুখে বাড়ি ছেড়ে পার্কে গিয়ে বসলেন হেকমত। ঢেঁকি-সমস্যার হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার উপায় না পেয়ে মাঝরাত অবধি পার্কেই বসে থাকলেন। শেষ পর্যন্ত ছিনতাইকারীর হাতে হাতঘড়ি আর মানিব্যাগ তুলে দিয়ে শুধুমাত্র প্রাণটা বাঁচিয়ে বাড়ি ফিরলেন। এবারও বাড়িতে ঢোকা গেল না। অকর্মা ঢেঁকি বাড়িটাকে সম্পূর্ণ ঢেঁকিশালা বানিয়ে বসে আছে। ঢেঁকিকে নিয়ে চলছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ঢোল, বাঁশি, কাসি সহযোগে ঢেঁকি ভানার গান আর নাচে বাড়ি প্রকম্পিত।

বাকি রাতটুকু সিঁড়ির ওপর কাটিয়ে হেকমত আলী এলেন বন্ধুর কাছে। প্রায় কেঁদেই ফেললেন—ভাই আমাকে এবার ঢেঁকির হাত থেকে বাঁচাও। ঢেঁকি আমার জীবনের সুখ-শান্তি কুটে ছাতু করে দিচ্ছে।

বন্ধু এবার নতুন বুদ্ধি বাতলে দিল। বলল—তোমার বউকে বইয়ের মেলায় নিয়ে যাও। আঁতকে উঠলেন হেকমত—আবার বই! বইয়ের হাত ধরেই তো ঢেঁকি এসে উঠেছে ঘরে।

আবার বইয়ের পিছে ছুটলে নির্ঘাৎ হাজারমণি একটা ধানের নৌকাই এসে উঠে বসবে বাড়ির ছাদে।

বন্ধু বিজ্ঞের হাসি হাসল—আরে এ বই সে বই না। আমাদের বইমেলায় দেশি প্রকাশকরা বিদেশি বই ছাপিয়ে দেশি সংস্কৃতির কভার লাগিয়ে বেদম বিক্রি করছে। সেই বইয়ের নেশাটা যদি একবার আশা বেগমকে ধরিয়ে দিতে পারো, তাহলে তোমার এই সাংস্কৃতিক ঢেঁকি পালাবার পথ পাবে না।

নতুন বুদ্ধিতে উদ্দীপ্ত হয়ে ঢেঁকির মাথায় আদরের হাত বুলিয়ে হেকমত প্রস্তাব পাড়লেন আশা বেগমের কাছে—বুঝলে এটা হচ্চে সংস্কৃতির মাস। এখন ঢেঁকিটাকে ঘরে বন্ধ না রেখে, জনসমাগমের মাঝখানে বসানো উচিত। ঢেঁকি তো মুষ্টিমেয় মানুষের নয়। এ তো গণসংস্কৃতিরই বাহন।

ঢেঁকিকে কি তাহলে চার রাস্তার মোড়ে বসাব? আশা বেগম উৎসাতি হয়ে বলল। কিন্তু তার এই কাঁচা প্রস্তাবকে উড়িয়ে দিলেন হকমত আলী।

—মাথা খারাপ। দেশের ট্রাকের দঙ্গল এমন নতুন জিনিসের সঙ্গে অ্যাকসিডেন্ট করবার জন্য যে তাহলে ম্যারাথন রেস দিয়ে ছুটে আসবে। তখন ঢেঁকি পাবে কোথায়?

চিন্তিত আশা বেগমকে পথপ্রদর্শন করলেন হেকমত—এক কাজ করো ঢেঁকিকে নিয়ে বসিয়ে দাও বইমেলায়।

এমন চমৎকার উদ্ভাবনী বুদ্ধির জন্য ঢেঁকি কমিটির সদস্য-সদস্যারা হেকমত আলীকে ঢেঁকি-স্মৃতি স্বর্ণপদক দেবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে দেরি করল না।

কিন্তু ভাগ্য অপ্রসন্ন হেকমত আলীর। আকাঠের ঢেঁকি এবারও তাকে জব্দ করতে কসুর করল না। বিদেশি বইয়ের সপক্ষে না গিয়ে বিপক্ষে চলে গেল আশা বেগম। ঢেঁকির ওপর উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদী বক্তৃতা দিয়ে ফেলল। বক্তৃতা শুনে হেকমত আলী পর্যন্ত চমকে গেলেন। এসব কী বলছে তার নাইন-পাস মফস্বলি স্ত্রী আশা বেগম। এ যে কেঁচো খুঁড়তে সাপ। আশা জোর গলায় বিদেশি বইয়ের নিন্দা করল। আমাদের নাজুক সংস্কৃতিকে রসাতলে পাঠাবার জন্য সংস্কৃতির মাসে, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যারা বিদেশি সংস্কৃতির দ্বারোদ্ঘাটন করছে তাদের জাতীয় শত্রু বলে গালমন্দ করল। উদাত্ত ভাষায় প্রশ্ন করল—আমরা জানতে চাই কার অনুমতিক্রমে এবং কোন আইনে এসব বই এ দেশে আমদানি হচ্ছে বা প্রকাশিত হচ্ছে। বড়ই দুঃখ প্রকাশ করে বলল আশা বেগম—আমরা যখন এত ঢাকঢোল পিটিয়ে বই নিয়ে করছি হইচই—ঢেঁকিকে স্থাপন করছি সংস্কৃতি অঙ্গনে তখন দেশি বইকে অঙ্কুরে বিনাশ করবার এই কারচুপি কেন! শুধু তাই-ই নয়, বিদেশি বইয়ের বাজার তৈরি করবার এই অপচেষ্টা নিঃসন্দেহে আত্মঘাতী। এর প্রভাবে দেশীয় সংস্কৃতি লোপাট হয়ে যাবে। আর ঢেঁকিকে আবার ফিরে যেতে হবে অগৌরবের ঢেঁকিঘরে। দেশবাসীর কাছে আকুল আবেদন জানাল আশা বেগম—আসুন আমরা সবাই মিলে এই অপচেষ্টা বন্ধ করে আমাদের আবহমানের সংস্কৃতির বাহন ঢেঁকিকে বাঁচিয়ে রাখি। হেকমত আলী প্রচণ্ড ক্ষেপে গিয়ে বন্ধুকে পাকড়াও করলেন—তোমাকেই এবার ঢেঁকিতে কোটা উচিত। কৌশল করে তুমি ঢেঁকিকেই জিতিয়ে দিচ্ছ।

বন্ধু হেকমতকে নতুন বুদ্ধি বাতলে দিল—যাও এবার বউকে বলো বিদেশি বই হাইজ্যাক করতে। দেখবে সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।

শেষবারের মতো বন্ধুর পরামর্শটা কাজে লাগালেন হেকমত আলী—বিদেশি বইগুলো সব হাইজ্যাক করা হোক। সেটাই হবে সাংস্কৃতিক মাসের উপযুক্ত সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ।

এমন প্রস্তাবে চমৎকৃত আশা বেগম লাফিয়ে নেমে পড়ল ঢেঁকির ডায়াস থেকে। সদলবলে চড়াও হলো বিদেশি লেখকের বইয়ের ওপর। ট্রাক বোঝাই অন্য সংস্কৃতির বই এনে ডাম্প করা হলো হেকমত আলীর বাড়িতে।

তারপরই সুফল দেখা দিল। ঢেঁকি কমিটির সভানেত্রী আশা বেগম ঢেঁকির কথা বেমালুম ভুলে গেল। রাতদিন হাইজ্যাক করা বিদেশি বইয়ের রাজ্যে বিভোর হয়ে রইল। যেন আলাদিনের জাদুর চেরাগ এসে গেছে ঘরে, ঢেঁকির ওপর বুক ডন দিতে শুরু করল ইঁদুর আরশোলা।

হেকমত আলীর বন্ধু বলল—এবার অকর্মা ঢেঁকিটাকে বিড়াল পার করে দাও। হেকমত আলী মাথা দোলালেন—ব্যাটা অনেক জ্বালিয়েছে, এবার ওকে একটু খাটিয়ে নিতে হবে। বাড়িতে অনেক সংস্কৃতির গ্যাঞ্জাম জমেছে ওগুলোকে ঢেঁকিতে কুটে ছাতু করতে হবে।

আশা বেগমের পাত্তা নেই। বইয়ের পর বই পড়ে চলেছে সে। এদিকে হেকমত আলী মহা আনন্দে দেশি সংস্কৃতিকে ঢেঁকিতে কুটে ধ্বংস করতে করতে বাহবা দিলেন বিদেশি বইকে—ভাগ্যিস এগুলো ছিল, তা নইলে এত সহজে কি দেশজ সংস্কৃতিকে ঘায়েল করা যেত। যাক সব চুলোয়। আপাতত শুধু ঢেঁকিটাই থাক। ঢেঁকি দিয়েই ভবিষ্যতে হয়তো চর্চা করা যাবে নতুন ঢেঁকি-সংস্কৃতির।

সমাপ্ত।


বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

হরতালের গল্প - রিজিয়া রহমান

হরতালের গল্প - রিজিয়া রহমান
হরতালের গল্প
রিজিয়া রহমান

রাস্তার ট্রাফিক সিগন্যালের মোড়ে ওরা তিনজন অপেক্ষা করছিল। অপেক্ষাটা বদুর জন্য। বদু বলেছিল হরতালের দিন আসবে। একটানা দু’দিন হরতালের একটা দিন কেটে গেছে। আজ শেষ দিন। কাল বদু আসেনি। শেষ হরতালের সকালটাও ফুরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। অথচ এখনো বদু আসেনি। পার্কের দিক থেকে এক ঝলক হাওয়া উঠল হঠাৎ। গাছের ডালপালা মর্মরিত হল। সবুজ একটা ঢেউ গড়িয়ে যেন আলগোছে বয়ে গেল গাছগাছালির ওপর দিয়ে। দৃশ্যটা নির্বাক চোখে দেখল ন’বছরের হিরু। ওর ঠোঁটের দু’পাশের ঘা থেকে কষ গড়িয়ে পড়ছে। একটা নীল মাছি ক্রমাগত ভন ভন করে উড়ছে মুখের ওপর। শূন্যে চড় মেরে মাছিটাকে তাড়াতে চেষ্টা করল হিরু। মাছিটা চক্কর দিয়ে উড়ে গেল দূরে। একটু পরেই ফিরে এল আবার। মুখ খিস্তি করল হিরু—শালার হারামি। এক্কেবারে আঠা হইয়া লাইগা রইছে। পাছ ছাড়ে না।

হিরুর বাবা আছে। মা নেই। বাবা রাজমিস্ত্রির জোগালি। কাজ নিয়ে চলে যায় কোথায় কোথায়। হিরুর সঙ্গে দেখাই হয় না প্রায়। হিরু এখানে ম্যাচ ফেরি করে। ট্রাফিক সিগন্যালের ডানায় লাল আলো জ্বলে উঠলে গাড়ির লাইন পড়ে যায়। হিরু তখন ম্যাচের বাক্স নিয়ে থেমে থাকা গাড়িগুলোর জানালার কাচে টোকা দিতে থাকে, ম্যাচ লাগব স্যার? কেউ কেউ ম্যাচ কেনে। অনেকেই কেনে না। দোতলা বাসের ড্রাইভার হালিম মিয়া মানুষটা ভালো। হিরুকে দেখলেই গলা বাড়িয়ে ডাকে—ওই বিচ্ছু। কাইল আমারে এক প্যাকেট ম্যাচ আইনা দিবি। প্রাইভেট কারের ড্রাইভারেরা হিরুর ম্যাচ কেনে না। উল্টো ধমকা-ধমকি করে।

মাছিটা এবার দুঃসাহসিকতা দেখিয়ে বসে পড়ল হিরুর নাকের ওপর। ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল হিরু—শালা...। আমারে জ্বালাইয়া খাইল। এইডারে খেদাইতে এইবার পুলিশ ডাকন লাগব।

হিরুর কথায় খিক খিক করে হেসে উঠল চুইংগাম ফেরিওয়ালা বারো বছরের বসির। ফুটপাথের ধারের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে সে চীনাবাদামের খোসা ছাড়াচ্ছে। তার কোনাচে দৃষ্টি রাস্তার ওপারের ফুটপাথ ছুঁয়ে এল। ফুটপাথের ধার ঘেঁষে সেখানে শুরু হয়েছে পার্কের সীমানা, চোখের ইশারায় সেদিকেই ইঙ্গিত করল বসির—কারে গাইলাস? হেইপারের তাইন রে নি?

বাদাম গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে ছোট্ট এক ঠোঙা মুড়ি নিয়ে তের বছরের রইস্যা খাচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে। যেন তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে মুড়ি চিবুনোর সুখ। গালভরা মুড়ি নিয়ে মুরব্বির মতো ধমকে উঠল—ওই হুমুন্দির...। রংবাজি করনের আর জাগা নাই? জামিলা বুজির কানে একবার হান্দাইলে অয়। গক্ষুর সাপের মোচড় দিয়া উঠব কইলাম। চুপ মেরে গেল বসির। জামিলার মেজাজকে ওরা চেনে। আজ সকালেও একবার চিৎকারে হরতালের ফাঁকা রাস্তা গরম করে তুলেছিল। এ দু’দিন হরতালে জামিলার ব্যবসা মন্দা। না খেয়েই কেটেছে রাত। সকালে মেজাজ ছিল একেবারে গনগনে কয়লা। গাল দিয়ে তুলোধোনা করেছে অপছন্দের হরতালকে আর অনুপস্থিত খদ্দেরদের।

গলির মুদিদোকানির কাছ থেকে টাকা কর্জ করে দুপুরে একটা পাউরুটি খাবার পর শান্ত হয়েছে মেজাজ। এখন পার্কের জারুলগাছের ছায়ায় পা ছড়িয়ে বসে বিড়ি টানছে। খোশগল্প করছে সিগারেট ফেরিওয়ালি জোছনা খাতুনের সঙ্গে।

জোছনা খাতুন হাত নেড়ে নেড়ে কি সব বলে চলেছে। মাথার ওপর চাঁদি কামড়ান রোদ, পেটে খিদের কামড়, এই দুই আক্রমণকারীকে প্রতিরোধ করবার শক্তি হরতালের দিনে হিরুর মোটেই থাকে না। দু’দিনে একটাও ম্যাচ বিক্রি হয়নি। হবে কি করে। বোমা আর ভাঙচুরের ভয়ে লোকেরা গাড়িই নামায় না পথে, ম্যাচ কিনবে কে! পথে যত হল্লাবাজ লোকের চলাচল। ওরা ম্যাচ কেনে না। পারলে আরো কেড়ে নেয় ম্যাচের ঠোঙা। বাধা দিলে পিকেটিংয়ের নামে বেধড়ক পিটিয়ে দিতে পারে।

হিরুর যত রাগ এখন গিয়ে পড়ল জোছনা খাতুনের ওপর। উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। হিরুর ব্যবসায় টান ধরিয়েছে ওই জাঁহাবাজ ধূর্ত মেয়েলোকটাই। ওদিকের ট্রাফিক সিগন্যাল মোড়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট আর দেশলাই বিক্রি করে। শুধু বিক্রি নাকি। খদ্দেরের মুখের সিগারেট ম্যাচ জ্বালিয়ে ধরিয়ে দেয়। তার পর সেই ন্যাকামি—এই ম্যাচ বাতিডাও দিয়া দেই স্যার লগে?

ফাউ মুখে আগুন দেয়ার ব্যবসাদারি কৌশলে বাস ট্রাকের ড্রাইভারদের কাছে এখন জোছনা খাতুনের ম্যাচের কদর। হিরুর ম্যাচের কদর নেই।

যানবাহনশূন্য রাজপথে পায়েহাঁটা লোকজনের চলাচলও কমে গেছে। কিছু রিকশা চলছিল, এখন তাও নেই। শূন্য পথের মতোই দৃষ্টিটা শূন্য হয়ে যায় হিরুর। মাথা ঝিমঝিম করে। বসির শেষ চীনাবাদামটি ভাঙতে ভাঙতে হঠাৎ বলল—জামিলা বুজি কিন্তু মানুষ খুব ভালো। দিলডা নরম। তাই না রে! বসিরের মন্তব্যের প্রতিবাদ কেউ করল না। ওরা তিন খুদে জীবন সংগ্রামী, যাদের ঘরবাড়ি নেই, মা-বাবা থাকতেও নেই, পথেই যাদের ঘরবাড়ি, তাদের কাছে জামিলার উপস্থিতিটা খুব দামি। জামিলাই এখানে ওদের অভিভাবক। ওদের ভালোমন্দের দায় যেন জামিলারই। সেবার রইসার পত্রিকা বিক্রির পয়সা ছিনতাই হল। জামিলাই কড়কড়ে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট হাতে ধরিয়ে দিয়ে লোকসানটাকে সামাল দিয়েছিল। গত শীতে চুইংগাম ফেরি করবার সময় বেবিট্যাক্সির ধাক্কায় জখম হল বদু। জামিলাই ওকে রিকশায় তুলে নিয়ে গেল পঙ্গু হাসপাতালে। বদু ভালো না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালেই পড়ে থাকল।

ম্যাচ ফেরি করতে করতে যখন হিরুর ঠোঁট বুক শুকিয়ে ওঠে, খিদেয় পেট মোচড়ায়, তখন কেমন করে যেন জামিলা বুঝতে পারে। রাস্তার ওপর থেকে হাঁক দেয়—ওই হির্যাে। এহানে আয়। এক ঢোক পানি মুখে দিয়া যা। পানির সঙ্গে প্রায়ই দেয় একটা শুকনো বনরুটি, নয়তো এক মুঠো মুড়ি। মাঝেমধ্যে হোটেলে নিয়ে ভাতও খাওয়ায়। জামিলাও পথের মানুষ। একটা চটের বস্তায় ভরা থাকে ওর সংসার। সেটা মাঝে মাঝে জমা রাখে জোছনা খাতুনের কাছে, তার আগারগাঁও বস্তির ঘরে। এর জন্য ভাড়া নিতে ছাড়ে না জোছনা।

রইস্যার মুড়ি খাওয়া শেষ। খালি ঠোঙাটা হাতে নিয়ে তাকাল দূরে। এখান থেকে যে রাস্তাটা সোজা চলে গেছে ফার্মগেটের দিকে সেখানে কিছু লোকের জটল। একটা দমকল গাড়ি ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে হুস করে চলে গেল, বসির সেদিকে তাকিয়ে বলল—আগুন লাগছে জানি কোহানে।

হরতালের দিনের এইসব আগুন লাগালাগি, মারপিট, বোমা মারা একটুও ভালো লাগে না হিরুর। কেন যে এরা এসব করে কিছুতেই বুঝে ওঠে না সে। ওদের তো গরম পিচে পা পুড়িয়ে ম্যাচ ফেরি করতে হয় না, পেট ভরা খিদে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে পথেঘাটে ঘুমিয়ে পড়তে হয় না। একটা রুটি অথবা এক ঠোঙা মুড়ি কিনবার পয়সা জোগাড়ের জন্য জামিলা বুজির মতো খদ্দেরের আশায় ল্যাম্পপোস্টের ধারে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। তাহলে? কি চায় ওরা!

বদু একদিন বলেছিল এইসব হইতাছে ক্ষমতার লড়াই। অগোর ক্ষমতা দরকার। কথাটা একটুও বোঝেনি হিরু। টাকা থাকলেই তো ক্ষমতা আসে মানুষের হাতে। টাকা তো ওদের অনেক আছে। টাকা থাকলে ফুটপাথে ফেরি করতে হয় না, শীতে কেঁপে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে পথে পড়ে থাকতে হয় না, খিদে তাড়াবার জন্য রঙ মেখে খদ্দের ধরতে হয় না। ওরা গাড়ি চড়ে, বড় বাড়িতে থাকে, ফুর্তির জন্য দু’হাতে টাকা ওড়ায়, তবুও এইসব বড় লোক কেন যে হরতালবাজির নিষ্ঠুর খেলা খেলতে থাকে! ওরা কি জানে না, এই খেলায় হিরুর কষ্ট বেড়ে যায়। জামিলা বুজি একদিন খুব রেগে গিয়ে বলেছিল, বুঝলি নি রে। এসব হরতাল হইল একটা বড় কিসিমের মজার জুয়া খেলা। এই খেলায় হারলে তাগো ক্ষেতি হয় না, আমাগো নাহান পথের মানুষ না খাইয়া থাকে, বোমায় মরে, গুলি খায়, ক্ষেতি আমাগো। জিতলে তাগো লাভ। মানুষরে না মারলে এই খেলায় জিতা যায় না। এইডা হইল গিয়া মানুষ মারার জুয়া খেলা। এই খেলায় আমাগো কপাল বদলায় না।

মুড়ির ঠোঙাটা ফুঁ দিয়ে ফুলিয়ে জবরদস্ত একটা ঘুষি বসাল রইস্যা। দম করে ফেটে গেল সেটা। চমকে উঠল হিরু, বসির দু’জনেই। জামিলাদের খোশগল্পও থমকাল। ক্রাচ বগলে গিয়ে ভিক্ষার আশায় ঘোরাঘুরি করে হতাশ হয়ে বসে ছিল পঙ্গু ভিক্ষুক জবেদ আলী। গলা উঁচিয়ে দূর থেকেই জিজ্ঞেস করল—ওই রইস্যা, ওই বসির হইল কি রে? কিয়ের আওয়াজ হইল? দাঁত বের করে হাসল রইস্যা—বোমা মারলাম। ডরাইছ নি কাকা? ক্রাচ উঠিয়ে কপট শাসন করল জবেদ আলী—মর হারামি।

—গাইলাইবা না কাকা। খবরদার!

জামিলা হাসছে। গলা তুলে চেঁচিয়ে বলল—কারে মারলি রে বোমা, ও রইস্যা?

—হরতালরে গো বুজি। হরতালেরে একটা বোমা ফেইকা মারলাম।

এতক্ষণের বিশ্রী দম আটকানো পরিবেশটা হালকা হয়ে গেল। রইস্যার রসিকতায় সবাই মিলে হাসাহাসি করল কিছুক্ষণ। দিনটা আজ সত্যি চড়া। কার্তিক মাস যায় যায়। তবু আসমানে ফাটাফাটি রোদের ঝলক। এমন রোদে পেটে খিদে নিয়ে কতক্ষণ বসে থাকা যায়। বসির বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল—বদু ভাইর আইজ অইল কি! অহন ত্যামত আইতাছে না!

—অয় আইজ আইত না। খামাখাই আমাগো বহাইয়া থুইল।

রইস্যা এখনো আশা ছাড়ে নি। রাস্তার শেষ মাথায় প্রতীক্ষার দৃষ্টি ধরে রেখে বলল—দিন তো শ্যাষ হয় নাই। দেহি না আরো কতক্ষণ।

কিন্তু কথা ছিল অন্যরকম। বদু বলেছিল সকালের দিকেই চলে আসবে। ওদের নিয়ে যাবে বাসস্ট্যান্ডে। সেখান থেকে ছাড়বে বাস। ওদের কিছুই করতে হবে না। কেবল বিনা ভাড়ার যাত্রী হয়ে শহরময় ঘুরে বেড়াবে। ঘণ্টাখানেক পরেই নামিয়ে দেবে। জনপ্রতি টাকাও দেওয়া হবে। হিরু খুব অবাক হয়েছিল, আমাগো ট্যাকাও দিব আবার বাসে উডাইয়া ঘুরাইব? অন্যদিন তো ভাড়া দিবার না পারলে ঘেটি ধইরা নামাইয়া দেয়। এইডা আবার কেমুন কথা! বদু, রইস্যা, বসির সবাই হেসে ফেলেছিল হিরুর কথায়। পরে অবশ্য হিরু জেনেছিল এ হল হরতালের বাস সার্ভিস। মানুষ টিভিতে দেখবে হরতাল হয়নি। বাস ট্রাক সবই চলাচল করেছে।

হিরুর হঠাৎ খুব পেট ব্যথা শুরু হয়ে যায়। ফুটপাথে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়ে। ক্রমে নিস্তেজ হয়ে আসে শরীর। চোখের সামনে চড়া রোদের দুপুর কাঁপতে থাকে। রাস্তার ওপারে থেকে জামিলা চেঁচিয়ে ওঠে—আলো মরা। ওইডা আবার মাটিতে গইড দিয়া পড়ল ক্যারে। ওই হির্যাচ, কি অইছে রে? প্যাডে ভুখ লাগছে নি? বুঝছি ভুখে মরতাছস! হিরু হঠাৎ ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। সেই কাল দুপুরে কিনেছিল পারাটা আর ভাজি। তাই খেয়েই কাটিয়েছে কাল। তারপর থেকে আর খাওয়া নেই। জামিলা তিন লাফে রাস্তা পেরিয়ে ঢুকে গেল গলিতে। দুটো চাঁপা কলা হাতে নিয়ে ফিরে এল তখনি। কলা দুটো হিরুর হাতে দিয়ে বলল—নে খা। খাইয়া মর। না খাইয়া মরিস না। ছ্যাড়া তর লাইগা ক্যালা ভিক্ষা চাইয়া আনলাম দোকানের থনে। কলা খেয়ে উঠে বসল হিরু। বায়না ধরা শিশুর মতো জামিলার হাত আঁকড়ে আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল—হরতাল ক্যান শ্যাষ হয় না জামিলা বুজি। আমার যে প্যাটের ভুখ যায় না। মায়ের মতো করে হিরুর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করল জামিলা—কাইন্দো না সোনা ভাইডি। কাইন্দো না। আর দেরি নাই সাইঝাঁ লাগতে। সাইনজা লাগলেই হরতাল ভাঙব। তখন ঠেইলা গাড়ি নামব রাস্তায়। তর সবডি ম্যাচ বিক্রি হইয়া যাইব। আমিও কাস্টমার পামু। আমি আর তুই হৈঠল থনে ভাত কিনা খামু রাইতে। কী দিয়া ভাত খাবি? মাছ না গোস্ত?

ভাত, মাছ, মাংস শব্দগুলো যেন ছেলে ভোলানো ছড়াগানের মতো গুনগুনিয়ে ঝরল জামিলার কণ্ঠ থেকে। কান্না থেমে গেল হিরুর। এখন বদুর জন্য নয়। সে রইল হরতাল শেষ হবার অপেক্ষায়। রইল ভাতের প্রতীক্ষায়। জামিলা উঠে চলে গেল নিজের আস্তানায়।

হিরুর কান্নার বিষণ্নতা ছুঁয়ে দিয়েছে রইস্যা আর বসিরকেও। ফেটে যাওয়া ঠোঙার কাগজ ছিঁড়ে কুটি কুটি করছিল রইস্যা। কাগজগুলো দলা পাকিয়ে ছুড়ে দিল পথের ওপর। বলে উঠল—না, আর ভালো লাগে না। ডেলি-ডেলি এত হরতাল হইলে ফেরি কইরা প্যাটের ভাত জুটামু ক্যামনে? এই কাম ছাইড়া দিমু। অহন বড় কাম ধরুম।

একটানে সোজা হয়ে গেল বসির—বড় কাম নি ধরবি?

বসিরের কথার রুক্ষতা পরোয়া করল না রইস্যা, জেদির মতো বলল—হ ধরুমই তো। ডাইলের কামে পয়সা বেশি, হেই কাম ধরলে হরতালে না খাইয়া মরণ লাগব না আর।

—মরবি না! তাইলে বারেইক্যা লাশ হইল ক্যান? বারেকের প্রসঙ্গ উঠতে অস্বস্তিকর নীরবতা থমকে দাঁড়াল। বারেক ছিল ওদের মতোই পথের মানুষ। এই ট্রাফিক লাইটের মোড়েই ফেরি করত চুইংগাম, রজনীগন্ধার ছড়া আর সিনেমা পত্রিকা। ট্রাফিক পুলিশের ডাণ্ডা খেয়ে ফেরিওয়ালার জীবনটাকে একদিন ছুড়ে ফেলে দিল।

এখানে দাঁড়িয়েই প্রচণ্ড চিৎকারে শূন্যে নালিশ ছুড়ল—এই শহরে আমাগো লিগা হালাল রুজি নাই। অহন যদি আমি ফেনসিডিল আর হেরোইনের ব্যবসায় নামি, যদি সন্ত্রাসী হইয়া যাই তাইলে কার কি কওনের আছে! ‘ডাইলের’ ব্যবসাতেই নেমে পড়ল বারেক। ফেনসিডিলের বোতল এক আস্তানা থেকে আরেক আস্তানায় পাচার করার কাজ তার। দু’হাতে রোজগার করে ঠাঁটে-বাটে চলতে শিখে ফেলল ক’দিনেই। তারপর যা হবার তাই হল। ধরা পড়ল পুলিশের হাতে। গরুর পিটু নি খেল। কারা যেন ওকে থানা থেকে ছাড়িয়েও নিয়ে এল। কিন্তু তারপর থেকে বারেক নিখোঁজ। ওকে কেউ আর কখনো এ শহরে দেখেনি। বদু বলেছিল, অয় আর বাঁইচ্যা নাই। আমার থে ঠাহে অরে খুন কইরা ফালাইছে।

ক্যান ক্যান? খুন করল ক্যান? ক্যাঠায় খুন করল?

সঙ্গীদের প্রশ্নের জবাব বদু এক কথায় দিয়ে দিয়েছে—এই ব্যবসা খুনোখুনির। তারপর বুঝিয়ে বলেছে, অয় যে ডাইলের আস্তানার খবর জাইনা ফালাইছিল। বুঝস না ক্যান, কানে ধইরা টান দিলে মাথাডা আইয়া পড়ে। কানডা কাইট্যা ফালাইলে মাথা বাঁচে। বারেইক্যারে শ্যাষ না করলে যে পালের গোদাডি ধরা খাইয়া যায়।

বদুই দলের মধ্যে বয়সে সবার বড়। বুদ্ধিতে চৌকস। অভিজ্ঞতায়ও পাকা। ওকে সবাই দলের নেতার গুরুত্বই দিয়ে থাকে। বদু সবাইকে সাবধান করে দিয়েছে—ওইসব ট্যাকার ফান্দে পাড়া দিছ কি মরচ। ভুলেও ডাইল, হেরন আর বোমাবাজির কামে যাবি না। সেই বুদ্ধিমান বদুই কিনা শেষে রাত জেগে দেয়ালে চিকা মারতে গিয়ে পড়ল দুর্দান্ত ক্ষমতাধরদের খপ্পরে। এর মধ্যে দু’বার হাজত খাটা হয়ে গেছে তার। হরতালের সময় ছোটখাটো সন্ত্রাসী কাজের শিক্ষানবিসিতে রীতিমতো ভালোভাবেই উতরে যাচ্ছে সে। বদু এখন কিশোর মস্তানদের মধ্যে উঠতি তারকা। বসির হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠল। ক্ষেপে উঠে ওর দিকে তেড়ে গেল রইস্যা—হাসনের কী হইল! আমি কি হাসনের কথা কইছি? থামা হাসি। বসির রাগল না একটুও। হাসতে হাসতে বলল— বদুডায় কেমুন একখান ঠক খাইওয়াইল আমাগো! এক্কেবারে বোকা বানাইয়া দিল। ঠইকা ঠইকাই আমরা বাঁইচা রইছি। অহন খাইতাছি হরতালের ঠক। বসিরের অদ্ভুত কথায় বোকার মতোই কয়েক পলক ওর দিকে তাকিয়ে থাকল রইস্যা। তারপরই হাসতে শুরু করল—এই যে শুন সবটিতে বসির কয় কি! অয় কয় আমরা নাকি ভাতের বদলে খাইতাছি হরতালের ঠক! আমাগো পাতিলে ভাত নাই হরতাল আছে। হাত নেড়ে নেচে কথাগুলো বার বার বলে চলল রইস্যা। যেন মজার তামাশা হচ্ছে। বসির হেসে গড়িয়ে পড়ল। ওর সঙ্গে রইস্যা হাসছে। হাসতে হাসতে ওর দম বন্ধ হয়ে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। ওদের হাসির শব্দ গুমোট দুপুরে কাঁপন তুলে দিল। ধাক্কা দিল জামিলাদের খোশগল্পে। কোমরে দু’হাত রেখে চেঁচিয়ে উঠল কলহপটু মুখরা জামিলা—ওই! ওই রস্যা! ওই বসির! আরে ওই! এমন, হিটকাইতে আছস ক্যান? রঙ লাগল নি। এইডা কি হিটকানের দিন? রঙ তামাশার দিন! মানুষ মরতাছে না খাইয়া, মানুষ মরতাছে বোমায়। আর তরা হাইসা জারে জার। হাসি থেমে গেল ওদের। রইস্যার কানের কাছে ফিস ফিস করল বসির—ওইডারেও পাগলামিতে ধরছে। অহন গোক্ষুর সাপটা ছাইড়া না দিলেই হয়।

ঠিক তখনি ফার্মগেটের দিক থেকে দুমদাম করে বোমা ফাটার শব্দ এসে আছড়ে পড়ল পার্কের নিস্তরঙ্গ বাতাসে। সেই সঙ্গে ভেসে এল মানুষের হল্লার আওয়াজ।

খুব নিরাসক্ত দৃষ্টিতে ওদিকে একবার তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল বসির। নির্বিকারভাবে বলল—দুই দলে ধাওয়াধাওয়ি করতাছে।

ফুটপাথে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়েছে আবার হিরু। উপবাসী করে রাখা এই হরতালের দিনটাকে সে প্রচণ্ডভাবে ঘৃণা করল। কেন যে সে টাকা পাবার আশায় আর গাড়ি চড়ার লোভে বদুর কথায় রাজি হয়েছিল। বরং কাওরান বাজারে গিয়ে দোকানির ফরমায়েশ খেটে দিলে দুপুরে খাওয়ার পয়সাটা জোগাড় হয়ে যেত।

পর পর আরো কয়েকটি বোমা ফাটল। গুলির আওয়াজও হল। রুখে উঠল জামিলা, হাতের মুঠি ঘুরিয়ে তার সেই সাপ নাচান ভঙ্গিটা নিয়ে ফেলল—খা, খা। শত্তুররে খা। যারা আমাগো মুখের ভাত কাইড়া খায় তাগো খা। যারা আমাগো ভিটাছাড়া করে তাগো খা।

জামিলার এই সাপ নাচান সংলাপ আর এই মারমুখী ভঙ্গি বন্দি দুপুরে তীব্র ধারাল ঝলকে জ্বলে উঠল ক’জন ক্ষুধার্ত ক্লান্ত উপায়হীন মানুষের সামনে। ম্যাচ ফেরিওয়ালি সদা অনাহারী জোছনা খাতুনের ভাঙাচোরা মুখে জ্বলে উঠল ঘৃণা আর ক্ষোভ। চাপা উচ্চারণে বলল—আর মানুষ না। অরা আমার গেদীর বাপেরে...।

কথাটা শেষ করতে পারল না জোছনা। কেঁদে উঠল হু হু করে। এমনি এক হরতালে তার রিকশাওয়ালা স্বামীকে রিকশাসমেত আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। জারুলগাছের গোড়ায় মাথা ঠেকিয়ে বিলাপ করতে লাগল জোছনা খাতুন— আমি বিচার চাই। ক্যান আমার স্বামীরে পোড়াইয়া মারল, ক্যান আমার তিনডা মাসুম বাচ্চার মুখের ভাত কাইড়া নিল। তার বিচার চাই আমি। সবার মাঝেই যেন জেগে উঠতে থাকে জোছনা খাতুনের দাবির অনুরণন। বিচার চাই। আমরা বিচার চাই। আমাদের ভাগের পয়সা লুটে নিয়ে যারা বড় গাড়ি চড়ে, দালানকোঠা ওঠায়, সোনাদানা টাকাকড়ি গাঁটরি বাঁধে তাদের বিচার চাই। আমরা মুখ খুলতে গেলে যারা মস্তান দিয়ে পিটিয়ে তক্তা বানায়, তাদের বিচার চাই। যারা ভোট নেবার জন্য মিথ্যা আশা দেয়, আর ভোট পাবার পর আমাদের পুলিশি ডাণ্ডা দেখায় তাদের বিচার চাই। আমাদের ভাগের পয়সা লুটবার লোভে যারা ক্ষমতার জন্য লড়াই করে তাদের বিচার চাই। মনের মাঝে নতুন করে জেগে ওঠা অচেনা দাবিগুলোকে ওরা ভয় পেল। ওরা নিঃশব্দ নির্বাক দর্শক হয়ে গেল, কেবল জামিলা সাপ নাচান সংলাপে গলা ফাটিয়ে ফেলছে। আর জোছনা খাতুন বিচারের দাবিতে কেঁদে কেঁদে মাথা কুটেই মরতে লাগল।

ফার্মগেটের দিক থেকে তখন ধেয়ে আসছে দুটি বিবদমান মিছিল, ঘন ঘন বোমা আর গুলির শব্দ। আসছে পুলিশের গাড়ি, দাঙ্গা পুলিশ, রবার বুলেট, টিয়ারগ্যাস। মানুষ ছুটছে দিশাহারা হয়ে। কয়েকজন আতঙ্কিত পথচারী ছুটে এল এদিকে। পার্কের দেয়াল টপকে পালাতে পালাতে ওদের সাবধান করে দিয়ে গেল—ওই ছ্যাড়ারা। পলা জলদি। পলা জলদি। গুললি হইতাছে। পিকেটাররা বোমা ফেকতে আছে। পুলিশ টিয়ারগ্যাস ছাড়ছে। লাঠিচার্জ করতে করতে এই দিকেই আইতাছে। জামিলা এক পাও নড়ল না। জ্বলন্ত দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে বলল—প্যাডের জ্বালাই এই পেশায় আইছি। অহন আর কিছুরেই ডরাই না। আমাগো আবার কিসের ডর? ভাত নাই, ঘর নাই, ইজ্জত নাই, কারে ডরামু?

হঠাৎ জোছনা খাতুনকেই প্রচণ্ড ধমক দিয়ে বসল—ওই করস কী? গাছে মাথা কুটলেই য্যান বিচার পাওয়া যায়! বিচার করে ক্যাঠায়! বিচার তো অহন আমাগো হাতে। উঠ। উইঠা খাড়া! ন’বছরের ক্ষুধার্ত শিশু হিরুও উঠে দাঁড়াল একটানে। তার বিস্ফারিত দৃষ্টির সামনে এখন অস্ত্রধারী সংঘর্ষকারী আর বোমাবাজ সন্ত্রাসীদের রাজপথ দখলের উন্মাদ লড়াই। ওদিকে শূন্য এজলাসের নিঃসঙ্গ বিচারকের মতো একা দাঁড়িয়ে আছে জামিলা। জোছনা খাতুনই প্রথম উঠে দাঁড়াল। ওরা তিনজনও একে একে এসে দাঁড়াল জামিলার পাশে। ক্রাচ খটখটিয়ে চলে এল পঙ্গু ভিখারি জবেদ আলীও। তারপর যত দুঃখী নিরন্ন নিরাশ্রয় মানুষের স্রোত বয়ে আসতেই থাকল। অমানবিকতার প্রতিরোধে তারা সবাই মিলে তৈরি করে ফেলল এক বিশাল মানববন্ধন।

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

হারুন ফেরেনি - রিজিয়া রহমান

amarboi
হারুন ফেরেনি
রিজিয়া রহমান

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

রক্তের অক্ষর - রিজিয়া রহমান

রক্তের অক্ষর - রিজিয়া রহমান রক্তের অক্ষর - রিজিয়া রহমান

সকালটা এখানে অকেজো নেশাখোরের মতো ঝিম ধরে পড়ে আছে। পলেস্তারা খসা ইট বের করা দেওয়ালে সরু রোদের রেখা বিনা পয়সার খরিদ্দারের মতো বেহায়াভাবে লুটোপুটি খাচ্ছে। ময়লা উপচানো ড্রেনের ধারে কয়েকটা শালপাতার ঠোঙা আর ছেঁড়া তেল-চপচপে কাগজ নিয়ে গৃহবিবাদে রত একদল কাক। একটু দূরেই একটা ঘেয়ো কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। আর কোনো শব্দ নেই।
কুসুম উঠেছে সকালেই। সবার আগে এ পাড়ায় সে ওঠে। তখনো বকুল, জাহানআরা, সখিনা, মর্জিনা সবাই হাত-পা ছড়িয়ে বিশ্রীভাবে ঘুমিয়ে থাকে। গলির ভেতর মান্নানের দোকান ঝাপ খোলে না। শুধু রাস্তার ও-ধারে ডালপুরি আর গোলগোল্লার দোকানের ছোকরাটা সবে চুলোয় আঁচ ধরায়।

ePub/PDF and Comments/Join our Facebook Group
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com