সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label শামসুল আলম সাঈদ. Show all posts
Showing posts with label শামসুল আলম সাঈদ. Show all posts

বেদাত ওমর খৈয়ম দর্শন - শামসুল আলম সাঈদ

বেদাত ওমর খৈয়ম দর্শন শামসুল আলম সাঈদ বেদাত ওমর খৈয়ম দর্শন

শামসুল আলম সাঈদ

ইসলামের মূলনীতি এবং প্রচলিত তরিকা পরিপ্রেক্ষিত কিংবা পরিপন্থী যুক্তি তর্ক বুদ্ধি, চিন্তা, জ্ঞান, দর্শন, বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য ও শিল্পানুরাগ সময়ের বিবর্তনের কারণে কিছুটা বিচূতি প্রাপ্ত কিংবা নব সংযোজনের দাবিদার হয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকতে পারে। সে প্রেক্ষিতে চেতনা সাপেক্ষ নব উদ্ভাবন সমৃদ্ধ হয়ে অগ্রসর সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়, বিশেষত যুব মানসে গ্রাহ্য সমন্বিত হয় এবং একটা নতুন মতবাদ সৃষ্টির প্রশ্ৰয়ও পেয়ে থাকে। রক্ষণশীল গোড়া পশ্চাৎমুখী ধর্মরক্ষী পণ্ডিতৰ্ম্মন্য বা বিনষ্টের আশংকায় নিজেরা পাহারাদার বিবেচনায় অসহিষ্ণু হয়ে কৃপাণ উদ্যত অবস্থায় এই নবচিন্তার উদ্ভিন্ন চারাগাছকে মুড়ে দেবার জন্য কিংবা ব্যতিক্রমী এ প্রথাকে উচ্ছেদ বা তার অনুপ্রবেশের দ্বার রুদ্ধ করে দেবার জন্য উদগ্রীব হয়ে হিংস হয়ে ওঠে। শিক্ষা ও সভ্যতা বিমুখ মুসলমান সমাজের কাচা বিচার বুদ্ধিকে কাজে লাগায়, তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও অন্ধ বিশ্বাসের আচ্ছন্নতার সুযোগে রক্ষণশীল পন্থীরা তাদের সহজে দলভুক্ত করে নিয়ে শিক্ষিত ও সভ্য শ্রেণীর ওপর জবরদস্তি খাটায় এবং সহজে তা সম্ভবপর করে তোলে। ফলে নব উদ্ভাবন বা বেদাত যা প্রকৃত নাম থেকে সরে ধর্মে অপচিত নামে অজ্ঞদের হাতে সুকৌশলে তুলে দেওয়া অগ্রসর হলেও বেদাতপন্থীরা সংখ্যালঘু পর্যায়ে সীমাবদ্ধ পরিসরে তাদের সামান্যই প্রতিহত করতে পারল অথবা সাধনা ব্ৰত উদযাপন করে গেলেন কেবল ।

তাদের একজন ওমর খৈয়াম; তার চিন্তা যুক্তি দর্শন ও কাব্য অগ্রসর মুসলমান সমাজকে প্রতিবাদী প্রেরণা যুগিয়েছিল, যা সে যুগে অতি সাহসিকতার কর্ম এবং চিরন্তন নব চিন্তার উৎস ছিল আর সেটাও এখন বিবেচনা করা যায়। তার মতো আরও যারা প্রকাশ্যে এ ধরনের মতবাদ ও সত্য কথন উচ্চারণ করেছিলেন তাদের অনেকের শির স্কন্ধোপরি স্থির ছিল না, স্বদেশ ও সম্প্রদায় থেকে কেউ কেউ নিষ্কাষিত বিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মরক্ষার্থে বিদেশে পাড়ি দিয়ে অজ্ঞাত পরিবেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং অন্য সম্প্রদায়ের আশ্রয় পেয়ে বিদেশের পরিবেশেও উন্নত চিন্তা দিয়ে বিশ্বের জন্য স্থায়ী কোনও সুকৃতি স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছেন, যা মধ্যযুগের ইয়োরোপের জন্য যথেষ্ঠ ফলপ্রসু হয়েছে। এই মনীষীদের ভেতর আভেসিন্না, আভেরুশ, আভেপকম্পা, আল কান্দি প্রমুখ খ্যাত। তারা সকলেই নাম এখনও উদ্ধার করা যায় নি। আভেসিন্না বা ইবনে সিনার বেদাত হল গ্রিক জ্ঞান ও গ্রিক বা যুনান চিকিৎসা পদ্ধতি মুসলমানদের জন্য প্রয়োগ করা। তার আগে মুসলমনাদের জন্য কোনও প্রকার চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল না, কেবল পবিত্র গ্রন্থের কোনও সুরা পাঠ করে ফু দিয়ে যা চিকিৎসা হত তাই। কিন্তু ইবনে সিনা গ্রিক বা ইউনানী চিকিৎসা পদ্ধতি মুসলমানদের ভেতর চালু করে অনেককে সুস্থ করে তোলেন। ফলে রক্ষণশীল সমাজের কোপদৃষ্টি তার ওপর পড়ল। তারা ক্ষিপ্ত হয়ে তার বেদাতি 'খোদার ওপরে খোদকারী নীতিকে আক্রমণ করলেন, তাকে কাফের আখ্যা দিয়ে বিতাড়িত করেন। অবশ্য তার রেখে যাওয়া গোপন পদ্ধতি অনুসরণ করে পরবতী কালে সাধারণ মুসলমান সমাজ এর সুফল ভোগ করে। তবে তার সঙ্গে ফু দিয়েও চিকিৎসার মনোযোগ কমে যায় নি, এখনও পর্যন্ত ফু বেদাতি ও অন্য অন্য চিকিৎসা পদ্ধতির সঙ্গে রয়ে গেছে, যতদিন মুসলমান থাকবে ফুও থাকবে ।

দ্বারা উজ্জীবিত হয়ে থাকবেন। কিন্তু তার প্রতিভাগুণে অল্প বয়সেই সম্রাট মালিক শাহের প্রিয়ভাজন হন। সম্রাট কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে পৃথিবীর জন্য সর্বপ্রথম সৌর ক্যালেন্ডার আবিষ্কার করেন, বিজ্ঞানাচার্যের পদ গ্রহণ করেন এবং মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করে অধ্যক্ষের পদ গ্রহণ করেন। নানা কারণে সে সময়ে তিনি বুজুর্গ হিসেবে সম্মানিত ছিলেন। ইবনে সিনার মতো প্রকাশ্যে কোনও বেদাত প্রচার করেন নি তার জীবিত কালে। কিন্তু গোপনে তার বেদাত দর্শন মতবাদ রেখে যান, যা তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়ে বিপুল আলোড়ন ও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছিল। অবশেষে তার মৃত্যুর ছয়শত বছর পরে ইংরেজ কবি এডওয়ার্ড ফিটসজেরাল্ড সুমার্জিত ও সুভাষিত ভাবে তার কবিতা অনুবাদ করতে গিয়ে এই অমূল্য সম্পদের আবিষ্কার করেন, যা বিশ্বে আজ সমাদৃত।

জীবিতকালেও তিনি মসৃণ জীবনযাপন করতে পারেন নি, মালিক শাহের অকাল মৃত্যুর পর তিনি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন, রাজকীয় পদ হারান এবং গবেষণাগারও পরিত্যক্ত হয়। পরে নিযামিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকের যে চাকুরি নেন তাতে ছাত্রদের পাঠদান কালে তার মুখ নিভৃত 'বেদাতি লেকচার শুনে খোদাদ্রোহীতা প্রচার অপবাদের কারণে সে চাকুরি হারান এবং অভাবগ্রস্থ হয়ে দীনভাবে জীবন যাপনে বাধ্য হয়ে শহরের প্রান্তে অজ্ঞাতবাস কালেও তার মতবাদের বহি চাপা থাকে নি। লোকেরা তার কাছে চিকিৎসার জন্য এলে তিনি দাওয়ার সঙ্গে ভূৰ্জপত্রে অনুপান’ হিসেবে চার লাইনের রুবাই রচনা করে সেটা ব্যবস্থাপত্র হিসেবে তাদের ধরিয়ে দিতেন। পরে সে পত্রগুলো সংকলিত করে তার রুবাইয়াত বা কাব্যগ্রস্থ সৃষ্টি হয়েছে।

বেদাত মতবাদ বা দর্শন নিয়ে ইতিপূর্বে কোনওগ্রন্থ বা চিন্তাকর্ম সৃষ্টির অবকাশ আমার জানামতে নেই অথবা দৃষ্টিগোচর হয় নি। ইসলামের দর্শনে 'বেদাত' এর উল্লেখ অপরিহার্য নয় অথবা বেদাত এ দর্শনে স্থান সংকুলান করতে পারে না অথবা তা ইসলামের চিন্তাবিদদের বিবেচ্য বিষয় নয়, অথবা ঠাই ধরতে পারে কিনা সেটা তাদেরই বিবেচ্য বিষয়। তা ছাড়া দর্শন চর্চার জন্য আমি কোনও মতেও কৃপান্ত অধিকার সম্পন্নও নই। কিন্তু মানব চিন্তার সকল অধিকারের একটু করে হলেও নাসিকা উচ্চাসন করে শ্বাস গ্রহণের অধিকার সবারই রয়েছে, সেখানে কারও আপত্তি উত্থাপন চলে না। সে কারণে আমার এ দুঃসাহস। বেদাত ইসলামের সৌন্দর্য সৌধের ভেতর খচিত গোলাপকুঞ্জ, সে শিল্পী কারিগরেরই কাজ। তবে আল গাজেল অর্থাৎ আল গাজ্জালি প্রথমে অনেক তথ্য বেদাতের জন্য সংযোজন করলেও পরে সস্তা নেতৃত্বের মোহে রক্ষণশীল সম্প্রদায়ের নেতা হয়ে বেদাতের শক্র হয়ে যান। নেতৃত্বের মোহে রক্ষণশীল সম্প্রদায়ের নেতা হয়ে বেদাতের শক্র হয়ে যান। বেদাতি ফালসোফদের বিরুদ্ধে প্রখর আন্দোলন গড়ে তোলেন, ফালসোফের বিরুদ্ধে তার শর্ত হল, "সাপুড়ে যেমন আপন সন্তানকে সর্প খেলা শেখায় না, তার থেকে বিরত রাখে, তেমনি মুসলমান সমাজকে ফালসোফদের ক্রীড়া রপ্ত করা থেকে বিরত রাখতে হবে, নইলে ছোবলে ধর্ম বিনষ্ট হবার ভয় রয়েছে। এই তত্ত্বজ্ঞান ইসলামের দর্শনের মূল মন্ত্র হয়েছে। অনেকের মতে তার ইয়াহিয়া উলুমুদিন সে দর্শনের পথ প্রদর্শক।

সত্যিকার ফালসোফ বা দর্শন তা হতে পারে না। ফালসোফে ধর্মের প্রতি ছোবল থাকবে তবে মানব চিন্তা অর্থই হল ধর্মের প্রতি ছোবল, কেবল যে চিন্তা একটা গ্রন্থে আবদ্ধ তার বাইরে নয় এটা মুসলিম দর্শন। প্রকৃত দর্শন হচ্ছে মানব সুন্দর জীবন বোধি। মধ্যযুগীয় কট্টর খ্রিস্টীয় সংস্কার নামে আবর্জনা পৃথিবীর জন্য অভিশাপ ছিল, উমাইয়া যুগের স্বেচ্ছাচারিতা প্রায় অনুরূপ যা এখনও জঙ্গিবাদের রূপে রয়েছে। খৈয়ামের প্রতিবাদী মতবাদ তো ওখানেই। বিশ্বগুরু সক্রেটিস মানবচিন্তাকে অন্ধকার থেকে বের করে আনলেন, সেই আলোই তো ফালসোফি বা ফিলোসোফি। একজন ফালসোফ কখনও বিশ্বাসের ধর্মে আকৃষ্ট হতে পারেন না, মানবধর্ম হচ্ছে একজন দার্শনিকের আসল ধর্ম। সে জন্য খৈয়ামও বলেন,

‘তা নিয়েও মনে করি হতে পারি মুসলমান’

এটা একটা আধুনিক মতবাদ। কারণ আপন ধর্মের প্রতি উদাসীন হলেও কোনও শিক্ষিত লোক অন্য কোনও ধর্মে এখন দীক্ষিত হতে পারেন না। তাই আপন ধর্মের সুন্দর আচারগুলো নিজের কাছে রেখে জীবনাচার রচনা করেন এবং অন্যকেও চাইলে ব্যবহার করতে দেন। তবু যদি কেউ ধর্মান্তরিত হন বুঝতে হবে ভবিষ্যতের কাছে তিনি প্রেসিডেন্ট পদ অভিলাষী বটেন।

এমন একটি অপেয় বিষয়োচ্ছাসজনিত হবার জন্য সাধ্যস্থিত হয়েছি তার গোপন কথা হল প্রকাশক রিয়াজ খান স্নেহাম্পদের সোৎসাহ এবং পাঠকও এর জন্য দায়ী হতে পারেন।





This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

চর্যাপদ : তাত্ত্বিক সমীক্ষা - ড. শামসুল আলম সাঈদ

Charyapad Tattwic Samiskha - Shamsul Alam Sayed in pdfচর্যাপদ : তাত্ত্বিক সমীক্ষা - ড. শামসুল আলম সাঈদ
বাঙালি জ্যোতিলন্ধ প্রথম চিত্ত-সম্পদ চর্যাপদ; এমন স্নিগ্ধ সংরক্ষণযোগ্য । চর্যাপদ বৌদ্ধ বজ্রযানি সিদ্ধাচার্যদের সাধন সংগীত, সম্পূর্ণ রূপক ভঙ্গিতে এবং তন্ত্রের মন্ত্র হিসেবে ধর্মশিক্ষার্থীদের জন্য রচিত । উদ্দেশ্য যা-ই থাক, চারদিকেও তার জ্যোতি ও আভা বাদ যায় না । ঠিক তেমনি তান্ত্রিক উদ্দেশ্য ব্যতিরেকেও চর্যাপদের সম্মোহনীয় পদ্মশ্রীর রূপস্পর্শে আকুলিত হয় না এমন কেউই নেই, সেখানেই চর্যাপদের কৃতিত্ব। কবিতা যে উদ্দেশ্যে লেখা হোক না কেন, যদি তা হয় হৃদয় নিঃসৃত শিল্পানুরাগে জারিত তবে কবিতা কবিতাই । বৌদ্ধ গান চর্যাপদ তাই আমাদের সেই উৎকৃষ্ট সুরভিত কবিতা এবং আস্বাদনের বিষয় ।
পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবার থেকে চর্যাপদ আবিষ্কার করেন । সেখানে রাজকীয় পরিবেশে সমাদরে তা গৃহীত হয়েছিল হয়তো-বা বাংলার বৌদ্ধ জীবন-মননে তার ঠাই ছিল না বলে । তাই মাজা-ঘষার দরুন বঙ্গীয় রূপ-লাবণ্য কিছুটা ছিন্ন বা ফিকে হয়ে গেলেও পণ্ডিত সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও মুহম্মদ শহীদুল্লাহর আপ্রাণ চেষ্টায় চর্যাপদে বাংলার প্রাচীনত্ব যথেষ্ট পরিমাণে প্রমাণিত এবং বাংলার আদি সাহিত্যভাষার নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত হয়।
বর্তমান সমীক্ষায় সেই উদ্দেশ্য সামঞ্জস্য রেখেও চর্যাপদের কবিতায় যে জগৎ এবং জীবনের অনুপম তাত্ত্বিক সৌকর্য সম্ভার লুকিয়ে তা উদ্ধার করার প্রয়াস রয়েছে।

ভূমিকা
চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রথম প্রাণস্পন্দন। পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী একশত বছর আগে নেপালের রাজদরবার থেকে একে বের করে এনে বিশ্ব দরবারে হাজির করার পরপরই পূর্ব ভারতীয় অন্যান্য ভাষা দাবি করল যে এটাই আসলে তাদের সকলের পূর্বেকার সঠিক প্রাণ। কিন্তু ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় সেসব দাবি নাকচ করে বললেন, এটা বাংলার। সঠিক এবং তাই সত্য কথা ।
এত বলবীর্য সম্পন্ন ভাষা ও সাহিত্য কীর্তি বঙ্গ জননী হাজার বছর আগে প্রসব করেছিল, তবে জননীর কোল ছেড়ে কী অভিমানে তা অন্যত্র গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল তার কারণ এখনও নিণীত হয় নি এবং মাঝখানে বঙ্গ সাহিত্য ভাষার গ্রন্থিসূত্র এতটাই ছিন্ন হয়েছিল যে একমাত্র মাঠে ঘাটে অনাদরে থাকা বাউলরা কেবল একতারে যেটুকু পারে ধরে রেখেছিল, নইলে চর্যাপদকে বাংলা বলার কথা নয়। তাছাড়াও চর্য যে বাংলা পদ সাহিত্যের ঐতিহ্য পদাবলী তার চর্চাও তাই বলে দিচ্ছে। কিন্তু চর্য রচয়িতা সিদ্ধাচার্যরা কিন্তু একে পদ বলেন নি, এ পদগুলো কেবল চর্যা নামে অভিহিত, যা সিদ্ধাদের মন্ত্রধ্বনি বা সাধন সংগীত। বৌদ্ধ বজ্রযানি তান্ত্রিক সিদ্ধাচার্যরা আপন আপন গুহ্য আচারের নিমিত্ত এ চর্যা ব্যবহার করতেন আগম নিগম রূপে, সাধারণের জন্য নয়। টীকাকার মুনিদত্ত তাই চর্যার ভাষাকে প্রাকৃত-সান্ধ্য ভাষা বলেছেন অর্থাৎ একটা আশ্চর্য মরমি ভাষা, যা সাধারণের বোধগম্য নয়। তাই বোধগ্রহীদের জন্য টীকা নির্মাণ করেন। এ রকম চর্যা বাংলা বৌদ্ধ বিহারগুলোতে কিংবা অন্যত্র ‘লোকজ্ঞানলোকভাসের নিমিত্ত নৃত্য গীত রাগ তাল লয় সহকারে গীত হত। বাংলার বুক থেকে বৌদ্ধ প্রভাব বিলুপ্ত হবার পর এ অমর সম্পদও অন্যত্র অপসারিত হয়েছে, অবশেষে হিমালয়ের ভেতরে গিয়ে যতটা সম্ভব অস্তিত্ব রক্ষা করেছে।
চর্যার ভেতরে বঙ্গ নামের উল্লেখ থাকলেও ভাষার নাম তখনও বঙ্গ হয়ে ওঠে নি, অথবা অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ-মগধ সবকে মিলে তৎকালে বঙ্গই বলা হত, এ সমগ্র অঞ্চলের ভাষাটাই ছিল পূবী প্রাকৃত বা চর্যার ভাষা, বর্তমান বাংলাভাষায় মূলরোম অন্য ভাষাগুলো তা থেকে গেড় পেয়েছে। এ ভাষাতে দেড় হাজার কি তারও আগে এ রকম চর্য রচিত হত বলে অনুমান করা যায়। হাজার হাজার আগাছা চর্য সৃষ্টির পর এ চর্যার মত মহীরুহ উৎপন্ন হয়েছে, যা হঠাৎ করে এ অঞ্চলে জেগে ওঠে নি। টীকাকারের মন্তব্যে ধরা পড়ে যে এ সব হাজার হাজার চর্য সংগ্রহের পর তার থেকে নির্বাচিত একশতটি চর্যার একটি সংকলন হয়েছিল, তার ভেতর থেকে মুনিদত্ত মাত্র একান্নটি, পরে একটি ব্যাখ্যা নাস্তি’ বলে বাদ দিয়ে পঞ্চাশটির নির্মল টীকা প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীদের জন্য, সেই টীকাযুক্ত চর্যগ্রন্থের নাম হল চর্যাগীতিকোষবৃত্তি যা হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কার করেন এবং এ চর্য্যাচৰ্য্যাচয়' কে তিনি নামকরণ করেন চর্য্যাচৰ্য্যবিনিশ্চয়', প্রকৃতপক্ষে এর নাম আশ্চৰ্য্য-চৰ্য্যাচয়'। 'আশ্চর্য-মরমি ভাষা ও কথার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, অথচ শাস্ত্রী চর্যার ভাষাকে সান্ধ্য বা আলো আঁধারি ভাষা বলেছেন, যা ঠিক নয়। মুনিদত্তের টীকা অনুসরণে চর্যার ভাষাকে দুর্বোধ্য বলার অবকাশ নেই।
চর্যাপদ বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ, একে এখন আর মন্ত্র বা সাধন সংগীত বলে একপেশে আচরণ দিয়ে বিচার করার প্রয়োজন নেই, এখন নিশ্চয়ই আমাদের জ্ঞান প্রসারিত হয়েছে, চর্যার শব্দ ও ভাষার অর্থভেদ করার মত চিন্তা চেতনা যুক্তি ও মুক্ত মননের উদয় হয়েছে যা নিয়ে অনুধাবন করলে সহজেই বোধগম্য হয় যে চর্যাপদ বাংলা কবিতার এক অপূর্ব সৃষ্টি এবং এর ভাব ব্যঞ্জনা শব্দ অনুষঙ্গ আধুনিক কবিতাকেও অতিক্রম করার শক্তি রাখে। সেই সময়ের চর্য রচয়িতা এ সকল সিদ্ধাচার্য বা রাজপুত্র কী অমোঘ ভঙ্গিতে এ বাণী সমিধ উচ্চারণ করে গেছেন ভাবতে অবাক লাগে, যার গোপন গন্ধের চারিদিকে বাঙালি চিরদিন অবশ্য ঘুরে বেড়াবে।
চর্যাগীতি আমাদের অহংকার, বাংলা গানের প্রথম ঘরানা তো এখানেই। এ মন্ত্রধ্বনি উচ্চারণ করতেন ঈশ্বরের মত শক্তিসম্পন্ন সিদ্ধাচার্যরা। তারা তাকে মার্গ সংগীত বা সাধন সংগীত হিসেবে চর্চা করতেন। বাংলা গানের এই নামের ঈশ্বরদের গুণ এমনই যে তারা একাধারে বাণী রচনা করতেন, সুর সংযোজন করতেন, রাগ তাল নির্ণয় করতেন এবং অবশেষে নিজের কণ্ঠ নিঃসৃত সুরে প্রকাশ করতেন, সেই একই ধারায় বৈষ্ণব মহাজন পদকর্তাদের বৈভব থেকে শুরু করে এই সেদিন পর্যন্ত রবীন্দ্র-নজরুল সংগীত বাংলা সংগীত সম্ভারে জমা পড়েছে। এ রকম সৃষ্টিকে কেউ গানবাধা সাধনা বলেছেন, তাতে প্রত্যেক ক্ষেত্রে নিজস্ব ঘরানা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এর পর থেকে গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী আলাদা-আলাদা ভাবে তাদের প্রতিভার বিস্তার করে থাকে, তাই আধুনিক গানকে আর মার্গ সংগীত বলা যাচ্ছে না। লোকসংগীতের মত ব্যাপারটা এর জন্য অচেনা রূপকারদের কাজ হিসেবেই থেকে যাচ্ছে, আগের মার্গ গৌরব অর্জন এরা করতে পাচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে বলতে হয় চর্যাগীতি হল বাংলা গানের বা বাণীর মাতৃস্তন্য, যা পান করে বাংলা ভাষা সংস্কৃতি ও বাঙালির জীবনবোধ বর্ধিত হয়েছে।
চর্যাপদ নিয়ে দীর্ঘদিন দানাপানি ছেড়ে মাঠে প্রান্তরে মগ্ন থেকে কবিতা হিসেবে এগুলোকে আস্বাদন করতে গিয়ে অতি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করা গেল যে যারা এ শব্দ ভাষানুষঙ্গ ও বাণীর রূপকার ছিলেন, মনে হয়েছে তারা নিশ্চয়ই ঈশ্বরই ছিলেন, তা না হলে আধুনিক কাব্যগুণের ব্যাপারগুলো কী করে তারা জানতে পারলেন? তবে মাঝখানে দ্বাদশ শতাব্দীতে মুনিদত্ত যে এর জন্য আধ্যাত্মিক তত্ত্ব চেপে কাব্যরস পিপাসাকে আলগা করে দিয়েছেন একথা ভুলে যেতে হবে। অথচ তিনিই চর্যাপদকে নবজীবন দান করেছেন। বর্তমান গ্রন্থচর্চায় আধুনিক পাঠক হয়তো এ দায়িত্বটা উদ্ধার করতে পারেন, তবু তা সন্দেহ নিশ্ছিদ্র নয়। মনে করছি এ জন্য যে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও মানুষ জঙ্গিবাদের জন্য ধর্মদায় মোচন করছে, গির্জায় মঠে মন্দিরে তাদের গগন বিস্ফারিত সত্য নয় কে বলতে পারে? এ মহাশক্তিবলেই তো চর্যাশক্তি উৎসারিত হয়েছে। অবশ্য আমাদের বিস্ময় যে নেওয়ারি দুর্বোধ্য লিপি থেকে জননীর প্রথম জাতককে কেমন করে উদ্ধার করলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী? এ সব কিছু ঈশ্বরের কাজ-এমনও বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে। আর এ বিশ্বাসাপ্লুত হয়ে এ গ্রন্থ রচনা আর পাঠকই তার দায় মোচন করতে পারেন।
ঢাকা
শামসুল আলম সাঈদ

Download Now
Charyapad Tattwic Samiskha - Shamsul Alam Sayed in pdf
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com