সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label সাক্ষাৎকার. Show all posts
Showing posts with label সাক্ষাৎকার. Show all posts

হুমায়ুন আজাদ সাক্ষাৎকার

amarboi
হুমায়ুন আজাদ সাক্ষাৎকার

হুমায়ুন আজাদ অভিনব অপ্রথাগত রীতিতে সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন এ-সময়ের চারজন প্রধান বাঙালির : অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, ডক্টর আহমদ শরীফ, ঔপন্যাসিক শওকত ওসমান, ও কবি শামসুর রাহমানের । সাক্ষাৎকারগুলাে পেরিয়ে গিয়েছিলাে বাঙলাদেশি সাক্ষাৎকারের সীমাবদ্ধতা । এগুলােতে প্রথম দেখা গিয়েছিলাে যে সাক্ষাৎকারদাতা, ও গ্রহণকারী উভয়েই সমান গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারে, এবং গ্রহণকারীর গুরুত্বের ওপরই নির্ভর করে সাক্ষাৎকারের মূল্য। এসব সাক্ষাৎকারে রুদ্ধ বঙ্গীয় সমাজের পাঁচজন মুক্ত মনে কথা বলেছেন সমাজ, রাজনীতি, সাহিত্য, শিল্পকলা, ধর্ম, জীবন, যৌনতা, ও আরাে বহু বিষয়, ও অন্তরঙ্গ জীবন সম্পর্কে । সাক্ষাৎকারেগুলাে হয়ে উঠেছে সময়ের দলিল, ও অপ্রকাশিত অন্তরের অকপট প্রকাশ। এ-সময়ের চারজন প্রধান বাঙলির অন্তলোক, ও তাঁদের উপব্ধির শিখায় বিশশতকের বাঙলাকে বুঝতে হলে আসতে হবে এ সাক্ষাৎকারগুলাে কাছে। এই প্রথম বাঙলাদেশে সাক্ষাৎকার হয়ে উঠেছে সৃষ্টিশীল ও মননশীল ।



বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কথাবার্তা সংগ্রহ সংকলন ও সম্পাদনা রফিক উল ইসলাম

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কথাবার্তা সংগ্রহ সংকলন ও সম্পাদনা রফিক উল ইসলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
কথাবার্তা সংগ্রহ
সংকলন ও সম্পাদনা
রফিক উল ইসলাম

মুখবন্ধ
বিশিষ্ট কবি ও গবেষক রফিকউল ইসলাম মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে এমন সব কাণ্ড করে, যাতে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই। আমার জীবনের অনেক ঘটনা ও রচনা যা হারিয়ে গেছে এবং আমার স্মৃতিতেও নেই, সেসব সে কোন অলৌকিক উপায়ে খুঁজে বার করে,তা আমি জানি না। লেখকদের মধ্যে কেউ কেউ নিজের সব রচনাই মনে রাখেন; শুধু মনে রাখাই নয়, দাঁড়ি কমা সমেত মুখস্থও বলে দিতে পারেন। আর কিছুকিছু লেখক নতুন কিংবা অনেক না-লেখা বিষয়ে এমনই মগ্ন থাকেন যে পুরোনো অনেক লেখা স্মৃতি-বর্জিত হতে দেন। আমি এই দ্বিতীয় দলের। মজার ব্যাপার এই যে, কোনো কোনো হারিয়ে যাওয়া লেখা কেউ যদি সংগ্রহ করে আমার চোখের সামনে রাখেন, তার দু’চার লাইন পড়েই আমি তা চিনতে পারি। সেদিক থেকে বিচার করে বলা যায় যে, রফিক সংগৃহীত সবকিছুই তথ্যভিত্তিক ও মৌলিক। কোনো কোনো সময়ে আমার পূর্ব প্রকাশিত,অধুনা দুষ্প্রাপ্য রচনা সম্পর্কে কিছু তথ্য জানার প্রয়োজন হলে আমি রফিকের বই থেকেই তা জেনে নিই। এক একসময় আমার মনে হয় যা হারিয়ে গেছে, তা যাক না, হারিয়ে যাওয়াই বোধহয় তার নিয়তি ছিল। কিন্তু রফিকের শ্যেন দৃষ্টিতে সেগুলিও ঠিক ধরা পড়ে যায়। এর মধ্যেই আমার জীবন ও রচনা বিষয়ে রফিক তিন খানা বই লিখে ফেলেছে, এবার সে হাত দিয়েছে আর এক বিস্ময়কর, বৃহৎ কাজে। আমি প্রায় পঞ্চাশ বছরের লেখক জীবনে বহুবার বিভিন্ন মানুষের কাছে সাক্ষাৎকার দিয়েছি এবং প্রকাশের পর জমিয়ে রাখার কথা কল্পনাও করিনি। কিন্তু রফিক সেসব উদ্ধার করার কাজে নিমগ্ন হয়ে পড়েছে। অনেক অধুনালুপ্ত ছোটো পত্রিকা, যেসব পত্রিকার নামও অনেকে জানে না এখন, রফিক কী করে যেন সেইসব পত্রিকা থেকেও সাক্ষাৎকার উদ্ধার করেছে। এই বিপুল পরিশ্রমের জন্য রফিককে অবশ্যই ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতেই হয়, যদিও আমি জানি না যে এইসব সাক্ষাৎকারের কোনো মূল্য আছে কি না। তবে, অর্ধেক জীবন’ নামে আমি যে স্মৃতিকথা লিখেছি, যার পরের অংশ লেখার জন্য অনেক শুভার্থী মাঝে মাঝে আমাকে অনুরোধ জানান, আমি আর তা লিখতে রাজি নই, কিন্তু এই সাক্ষাৎকার থেকে তার অনেক উপাদান পাওয়া যেতে পারে। রফিকের এই শ্রম ও নিষ্ঠার মূল্য কতখানি তা পাঠকরাই নির্ধারণ করবেন। আমি শুধু মনে মনে মাঝে মাঝে বলি, আমার চেয়ে অনেক বেশি দীর্ঘজীবন যাপন করো, রফিক!
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
১৭.৭.২০১২

ডাউনলোড লিঙ্ক এবং কিছু বক্তব্যঃ
বইটি স্বাভাবিক পাতার সাইজগুলো একটু বড়। প্রচুর ছবি রয়েছে বইটিতে (সংগ্রহের জন্য কিনে ফেলতে পারেন)। একাধিক রঙিন পোষ্টার রয়েছে, যা এই পিডিএফে যুক্ত করা হয়নি। বইটির পিডীএফ সাইজ হয়েছে ১৭৫ মেগাবাইট। যারা মোবাইলে ডাউনলোড করেন তাদের জন্য একটু সমস্যা হলেও হতে পারে। পিডিএফটির ডাউনলোড লিঙ্ক নিচে দেওয়া হলো।


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সাক্ষাৎকার - আলোলিকা মুখোপাধ্যায়

সাক্ষাৎকার - আলোলিকা মুখোপাধ্যায়


বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

কথা সাহিত্যিক সুরঞ্জন প্রামাণিকের সাক্ষাৎকার

সুরঞ্জন প্রামাণিক
কফিহাউজে বিপ্লবের স্বপ্নদেখা ভাঙাচোরা এক মানুষের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল :সুরঞ্জন প্রামাণিক

সুরঞ্জন প্রমাণিক একজন অসামান্য কথাকার। সুরঞ্জনকে শুধুমাত্র এই অভিধায় চিহ্নিত করে, চেনা ছকবন্দি করে ফেললে, সেটা বড়সড় ভুল হবে। বামপন্থায় আস্থাশীল লেখক মানবাধিকার কর্মী হিসাবেও পরিচিত। ইতিহাস সচেতন, সমাজ সচেতন, আদ্যান্ত মানবিক লেখকের এষণা, নতুন এক মানবিক সমাজ। তার বিভিন্ন প্রবন্ধে নির্মিত হয়েছে নতুন নতুন তত্ত্ব। প্রাবন্ধিক সুরঞ্জন বিদগ্ধ পাঠকের মননে বারংবার উপস্থিত হন সমাজবীক্ষায় প্রাপ্ত নববােধ বিশ্লেষণে। ঘােষিত ভাবে লিটল ম্যাগাজিনের এক লেখকের দৈনন্দিন যাপনচিত্র অনুকরণযােগ্য। বিশ্বজুড়ে চলছে অস্থিরতা, সমসাময়িক কালে বিপন্ন বামপন্থা, ধর্মের নামে ক্ষমতার নামে ধ্বংস হচ্ছে মানবিকতা। আবারও দীর্ঘ হচ্ছে হিটলারের ছায়া। লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলন পথ পালটে ‘প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার’ আন্দোলনে পর্যবসিত, বাংলা সাহিত্যে গল্প এবং অ্যান্টি গল্প নিয়ে পরীক্ষা-নীরিক্ষা চলছে। এই সব বিষয় নিয়ে সুরঞ্জন প্রামাণিকের সঙ্গে খােলামেলা আলাপচারিতা। - দ্বৈপায়ন থেকে সংগ্রহীত।

অমিতঃ সুরঞ্জনদা, প্রতি সেকেন্ডে প্রতি মিনিটে প্রতি মাসে প্রতি বছরে নানান ভাষায় প্রচুর সাহিত্য রচনা হচ্ছে, আর তাতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলা হচ্ছে মানবিকতার কথা, কিন্তু দেখা যাচ্ছে শেষমেশ সেই মানবিকতার পরাজয় হচ্ছে পৃথিবীর কোণে কোণে। তাহলে কেন সাহিত্য ? কেবল কি তা ক্ষণিকের বিনােদন কিংবা সময়ের পরােক্ষ দলিল? সমাজের উপর কি তার কোনাে ইতিবাচক প্রভাব থাকবে না?

সু: প্রা: তােমার প্রশ্নের পটকথা ও প্রশ্ন তিনটিতে সাহিত্য ও সমাজ বা সমাজ ও সাহিত্য সম্বন্ধে দীর্ঘ আলােচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে আছে। বলতে পারাে আমি নিজেই উস্কানি পাচ্ছি। ‘ফাঁদ'-এ পা দেওয়া ঠিক হবে না। বরং তােমার প্রথম প্রশ্ন থেকে তাহলে বাদ দিয়ে যে সাধারণ প্রশ্ন। দাঁড়ায় 'কেন সাহিত্য'- এ-বিষয়ে দু-একটা কথা বলা যেতে পারে।

তার আগে 'সাহিত্য কী?’-- এটা আমাদের মনে রাখতে হবে। প্রচলিত সব ‘ধারণা'-কেই স্বাগত জানাতে আমার আপত্তি নেই। তােমার নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে আমার ভাবনায় সাহিত্য কী! সাহিত্য- শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ-তাৎপর্যকে মান্যতা দিতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে মানুষের স্ব-অধীনতা আকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিচিন্তার লিপি রূপ হল সাহিত্য।

অর্থাৎ সাহিত্য এমন এক লিখিত ভাষ্য যার মধ্য থেকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা নৈতিক সৌন্দর্য বিকিরণ করে!

কেন সাহিত্য- এ প্রশ্নের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ শব্দ, কেবল শব্দ নয়- একটি তত্ত্বও বটে যার বিপরীত তত্ত্ব ‘পরাধীনতা’-- তুমি নিশ্চয়ই জানাে যে, বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে ‘প্রকৃতির অনিবার্যতা’-ই জীব মানুষের চৈতন্যে যে মনােভাবের জন্ম দিয়েছিল তা-ই কোনও এক সময়ে ‘পরাধীন’ শব্দে তার প্রকাশ ঘটেছে। প্রকৃতির অনিবার্যতার বিরুদ্ধে তার লড়াই করে টিকে থাকার সংস্কৃতির মধ্য থেকেই গড়ে উঠেছে স্বাধীনতার ধারণা এবং জানি না আমার সঙ্গে তােমার ভাবনা মিলবে কি না, ভাবনাটা এই যে, মানুষের জৈব বিবর্তন ও সমাজ বিবর্তনের ইতিহাসে যে যে জ্ঞানশাখার উদ্ভব হয়েছে সব শাখাতেই শব্দ দুটির প্রবেশ ঘটেছে।

না মিললেও ক্ষতি নেই। বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা প্রতিনিয়ত স্বাধীনতা-পরাধীনতা সম্বন্ধে আমাদেরকে ‘ঋদ্ধ করেছে এই অভিজ্ঞতা বিনিময়ের আকাঙ্ক্ষা থেকেই সাহিত্য- 'কেন সাহিত্য'- এর একটা আভাস বােধহয় এতক্ষণে দিতে পারলাম।

আর-একটু স্পষ্ট করার জন্য বলা যায় : 'প্রাকৃতিক অনিবার্যতার নিয়ম হল জীবনসংগ্রামের নিয়ম— তা জেনেটিক বা প্রকৃতিগত, কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে জেনেটিকের পাশাপাশি আর একটি ব্যাপার রয়েছে তা সাংস্কৃতিক-- সাংস্কৃতিক এ-কারণে যে, 'প্রাকৃতিক অনিবার্যতা'র বিরুদ্ধে মানুষের বৌদ্ধিক লড়াই এই মুহূর্তে যা পর মুহূর্তে তা নয়, এর অর্থ এই মুহূর্তে আমার বেঁচে থাকার পক্ষে যে ক্রিয়াকলাপ কার্যকর, পরবর্তী সময়ে তার থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা কার্যকর নাও হতে পারে, অর্থাৎ বেঁচে থাকা বাঁচিয়ে রাখার অভিজ্ঞতা নানা রকমের হওয়ায় তার সময়কালও ভিন্ন ভিন্ন কোনও বিষয় প্রাকৃতিক হতে গেলে, জেনেটিক হতে গেলে তাকে পুনঃপুন, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঘটতে হবে— অভিজ্ঞতা— এই নিয়মের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। কিন্তু বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে তার মূল্য রয়েছে, এ কারণে তা জানা ও জানানাের আকাঙ্ক্ষা মানবপ্রজাতির মধ্যে বর্তমান।

এই অনুষঙ্গে, যেমন বললে, '...নানান ভাষায় প্রচুর সাহিত্য রচনা হচ্ছে- এটা স্বাভাবিক। কিন্তু মানবিকতার প্রশ্নে, 'সামগ্রিক হিতার্থে সাহিত্য'— এই তাৎপর্য মনে রেখে আমাদের বলতেই হবে প্রচুর সাহিত্য রচিত হলেও প্রকৃত সাহিত্যের অভাব রয়েছে।

অর্থাৎ- ওই যে তুমি বললে, ‘প্রচুর সাহিত্য রচনা হচ্ছে, আর তাতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলা হচ্ছে মানবিকতার কথা’ -- কিছু মনে কোরাে না, তােমার এই পর্যবেক্ষণে ত্রুটি আছে। অথচ, ‘বিনােদন’ শব্দটা যে ভাবে তুমি ব্যবহার করেছ তাতে কিন্তু ওই ত্রুটি থাকার কথা নয়। যাই হােক বিনােদন রিপুতৃপ্তির সঙ্গে যুক্ত' --’মানবিকতার'র সঙ্গে তার বিরােধ আছে। 'মানবিকতা’ রিপুশাসক শাসক হয়ে উঠতে চায়।

আমার বিশ্বাস প্রচুর সাহিত্য’ যদি মানবিকতা'কে ধারণ করতে পারত তাহলে পৃথিবীর কোণে কোণে মানবিকতার পরাজয় ঘটত না, বা ঘটলেও এমন হতাশাব্যঞ্জক হত না।

বিনােদন সাহিত্য অনেকটা খবরের কাগজের মতাে, খবরের কাগজের যেমন ‘প্রত্নমূল্য আছে, তেমনই সমাজমনস্তত্ত্বকে বােঝার জন্য বিনােদন সাহিত্যের একটা মূল্য অবশ্যই আমরা দেব।

অমিতঃ প্রশ্নে উঠে এসেছিল মানবাধিকারের কথা। আপনি নিজেও এই বিষয়টির সাথে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। সভ্যতা এগিয়েছে, আর তার সাথে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, হচ্ছে দিকে দিকে। আজ পশ্চিম এশিয়ায় যা হচ্ছে তার জন্য নতুন পরিভাষা খুঁজতে হবে। দিল্লিকাণ্ড, কামদুনি, পার্কস্ট্রিট থেকে মেদিনীপুর কিংবা পুরুলিয়া কোথাও বাদ নেই এই লঙ্ঘন। ধর্মের নামে, ক্ষমতার নামে দিকে দিকে ধ্বংস হচ্ছে মানবিকতা। এর শেষ কোথায়? না-এ শেষের শুরু?

সু: প্রা: তুমি যা বললে আর তােমার প্রশ্ন— এর থেকে দুটি শব্দকে আমরা তুলে নেব-- মানবাধিকার ও মানবিকতা— এ দুটিকে বিষয় করে একটু আলােচনা করা দরকার, নইলে সভ্যতার এগােনাে আর মানবাধিকার লঙ্ঘন— একই সঙ্গে দুটিই ঘটছে- এরকম একটি প্রত্যয় আমাদের বােধিমূলে জড়িয়ে আছে, তাকে প্রশ্ন করা যাবে না।

একটু আগে আমরা প্রকৃতির অনিবার্যতার কথা বলছিলাম, তার বিরুদ্ধে মানুষের যে লড়াই-- এখানে মানুষ মানে মানবপ্রজাতি— সেই লড়াইয়ের মধ্য থেকে জন্ম নিয়েছে মানবিকতা। বলা ভালাে অর্জন করেছে এই গুণ। মানুষের নীচে থাকা কোনও প্রজাতি এই গুণ অর্জন করেছে বলে অন্তত আমি জানি না। প্রাকৃতিক নিয়ম’-এ বেঁচে থাকার অন্যতম বিধি একই প্রজাতির মধ্যকার লড়াই— মানবপ্রজাতি এই লড়াই থেকে এখনও রেহাই পায়নি প্রকৃত প্রস্তাবে, এই লড়াই-এর মধ্য থেকেই সে মানবিকতার জন্ম দিয়েছে; এই লড়াইটা জারি আছে বলেই তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ যুদ্ধ ‘পশ্চিম এশিয়ায় যা হচ্ছে তা তাে এই যুদ্ধই, মনে রাখতে হবে জায়মান মানবিকতা ধ্বংস না-হলে যুদ্ধ হয় না। আর যুদ্ধ একবার শুরু হলে, সাধারণ মানুষ বলতে আমরা যা বুঝি, তাদের যতটুকু প্রাকৃতিক অধিকার— এই যেমন জল-আলাে-হাওয়ার অধিকার তা সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়, উদাহরণ হিসাবে আমাদের জাপানের কথা মনে পড়তে পারে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ভয়ঙ্কর, বীভৎস সব তথ্য-পরিসংখ্যান— আমরা এখানে সে-সব উল্লেখ করছি না। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, মনে রাখতে হবে এ-কারণে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধই ছড়িয়ে থাকা মানবাধিকার’ ধারণাকে তালিকাবদ্ধ করেছিল ও রাষ্ট্রসংঘ মানবাধিকার সংস্কৃতি গড়ে তােলার যে উদ্যোগ নিয়েছিল এবং আজও যা জারি আছে, তার বিকাশ আশানুরূপ হয়নি। হয়নি বলেই আমরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’-এর আবহাওয়ার মধ্যে বাস করছি।

তােমাকে মনে করিয়ে দিই, যুদ্ধের ইতিহাস এই সত্য উন্মােচন করেছে মানবিকতার অবক্ষয় সবচে' বেশি ঘটে যুদ্ধের পরিসরে, আর নারীর প্রতি আক্রমণ ও তীব্র হয়-- নারীর প্রতি অত্যাচারের, একটা বিশেষণ যােগ করা উচিত, বীভৎস তাতেও সবটা বােঝানাে যায় না, অমানবিক বীভৎস অত্যাচারের ভয়ঙ্কর স্মৃতিফলক হয়ে ওঠা যে স্থানগুলাের নাম তুমি করেছ, সেগুলাে বিচ্ছিন্ন কোনও ক্ষেত্র নয়। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসরেই এগুলাে রয়েছে। খুব স্পষ্ট করে বলা যায় : ঘােষিত মানবাধিকার রক্ষার দায় যদি স্বাক্ষরকারী দেশগুলির চৈতন্যে থাকত, তা হলে “বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস’-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করতে হত না। তুমি নিশ্চয়ই জানাে, ১০ ডিসেম্বর

১৯৪৮ মানবাধিকার সনদ' ঘােষিত হয়। তার প্রস্তাবনায় এরকম একটা কথা ছিল, কোট আনকোট বলছি না, ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আছে—মানবাধিকার সমূহের অসম্মান আর অবজ্ঞার ফলেই বর্বরােচিত কার্যকলাপ সংঘটিত হতে পেরেছে-- এই 'বর্বরােচিত কার্যকলাপ’ মানে যুদ্ধ... দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ মানুষের বিবেককে আহত করেছে, নিশ্চয়ই সমগ্র মানবপ্রজাতির বিবেককে আহত করেনি, করলে আজও যাঁরা সনদের প্রস্তাব কথামতাে এমন এক পৃথিবীর অভ্যুদয়ের আকাঙ্ক্ষা করেন যেখানে মানুষ উপভােগ করবে বাকস্বাধীনতা, বিশ্বাসের স্বাধীনতা, আর সেখানে ভয় থাকবে না, থাকবে না অভাব— এই স্বপ্ন প্রত্যয় লালন করা মানুষের বিরুদ্ধে বর্বরােচিত ঘটনা ঘটতে পারত না।

এছাড়া এই বিশ্বায়নের যুগে ওই রকম পৃথিবীর স্বপ্ন দেখার ওপর যেন এক অঘােষিত নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে

কেন বলছি এ-কথা— তুমি বােধহয় জানোনা মানবাধিকার’ চেতনায় মানবপ্রজাতিকে উন্নত করার লক্ষ্যে ইউনেসকো ১৯৯৫ থেকে ২০০৪– 'মানবাধিকার শিক্ষা’ দশক ঘােষণা করেছিল, উদ্দেশ্য ছিল 'পাঠক্রম' রচনা সম্বন্ধে উদ্যোগ গ্রহণ, বলাবাহুল্য বিভিন্ন রাষ্ট্রের তরফ থেকে তা নেওয়ার কথা ছিল।

তার ভিত্তিতে মানবাধিকার শিক্ষার জন্য বিশ্বকর্মসূচি গৃহীত হয় এই কর্মসূচির প্রথম পর্যায়, ২০০৫-২০০৯ পর্যন্ত, কার্যকর করার কথা ছিল প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে। দ্বিতীয় পর্যায়ে, ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মানবাধিকার শিক্ষায় শিক্ষিত করা হবে উচ্চশিক্ষায় রত শিক্ষার্থীদের ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আধিকারিক ও কর্মীবৃন্দকে। তৃতীয় পর্যায় চলমান, শেষ হবে ২০১৯-এ, শিক্ষিত করা হবে ‘মিডিয়া প্রফেশনালদের ও সাংবাদিকদের। একটু খোঁজ নিলেই তুমি জানতে পারবে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মসূচী কতটা ফলপ্রসূ হয়েছে। অথবা ২০০৫ সাল থেকে ২০১৪ পর্যন্ত মানবাধিকার খর্ব করা তথা লঙ্ঘন করার তথ্যানুসন্ধান করলেও ব্যাপারটা অনুমান করা সম্ভব। সার্বিক এই প্রেক্ষাপটে তুমি নতুন পরিভাষা খুঁজতেই পারাে, তাতে আমরা সমৃদ্ধ হব।

‘মানবিকতা' ধ্বংসের ব্যাপারে ‘শেষ কোথায়'— জানি না, শুরুর কথাটা তাে আগেই বলেছি। আর আমার বিশ্বাসটাও জানিয়ে রাখি : মানুষ হয়ে-ওঠার লড়াই-এ ব্যক্তি বারবার হেরেও, আর-একটু মানবিক হয়ে সে উঠবে, উঠবেই। লড়াইটা জরুরি! ভীষণ জরুরী।

অমিতঃ ইদানিং মানুষেরা কি একটু বেশি উন্মাদগামী, না এরকমই ছিল বরাবর? কেউ পরিবারের সবাইকে হত্যা করে নিজ লিঙ্গ কাটছে, কেউ বাইসেক্সুয়ালিটির নাে ম্যানস ল্যান্ডে পড়ে আত্মঘাতী হচ্ছে, এমনকী সমবেত আত্মহত্যার জন্য বেছে নিচ্ছে বহুতল বাড়ির খােলা ছাদ। হত্যার দৃশ্য, প্রকট যৌনতার দৃশ্য ইন্টারনেটে ছেড়ে তামাশা দেখছে। বাঁদর নামছে। বাঁদর দেখছে। মনে হচ্ছে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে উত্তর-আধুনিক বাঁদর। আর তার বাঁদরামি আজ ভাইরাল! হিটলারের ছায়া ক্রমশ বড় হচ্ছে।

সু: প্রা: বরাবর এরকম ছিল কি না বলা মুশকিল। প্রাচীন সাহিত্য যা একটু-আধটু পড়েছি, মনে করতে পারছি না সেখানে এই আত্মহত্যা প্রবণতার কথা ছিল কি না। আত্মহত্যা মূলত ডিপ্রেসিভ ইলনেস বা অবসাদ-এর পরিণাম— আধুনিক সাহিত্যে এর ভুরিভুরি উদাহরণ আছে। ‘সাহিত্য সমাজের দর্পন'— এই তত্ত্বের নিরিখে এটা বলা যায় যে, ডিপ্রেসিভ ইলনেশ সমাজবিচ্ছিন্ন ব্যক্তিমনের অসুখ। কিন্তু এর সঙ্গে 'বাইসেক্সুয়ালিটির ব্যাপারটা মেলানাে যাবে না। মানবপ্রজাতির নারী-পুরুষ ধারণা মূলত দৈহিক গঠনকেন্দ্রিক, এটা প্রচলিত, এর বাইরে মনােগঠনের নিরিখে একজন পুরুষদেহী বা একজন নারীদেহী যে যথাক্রমে নারী বা পুরুষ মনের বাহক হতে পারে -- হতে যে পারে, এটা অশিক্ষিত সমাজ জানে না, জানালেও মানে না, ফলত এরকম মানুষকে সমাজ ঠাই দিতে চায় না— ঠাই পাওয়ার জন্য কেউ কেউ লড়াই করেন, এ লড়াইটার একটা দিক-মন যেমন শরীরটাকে তেমনভাবে রূপান্তরিত করা—এ লড়াইয়ে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান তার পক্ষে, চিকিৎসক তার সহযােদ্ধা যারা এই সুযােগটা পান না তাদের কেউ কেউ আত্মহত্যা করেন- এমনটা অনুমান করা যায়। মনে রাখতে হবে আধুনিক সভ্যতায় ‘যৌনতা' এমন এক পণ্য ও পণ্য-রেসিপি” যা উপভােক্তাকে পণ্যমােহগ্রস্থ করার ক্ষেত্রে অদ্বিতীয় আর ‘হত্যা’ ‘সুপারি কিলার'-এর নিরিখে, বলা যায়, এক অসাধারণ পরিষেবা পণ্য’– অতএব, ইন্টারনেটে এই বিনােদন হত্যার দৃশ্যগুলাে দেখতে দেখতে, নিজের অজান্তেই মানবিক মূল্যবােধগুলির বিরুদ্ধে যুক্তি তৈরি করি, হয়তাে এটাই কোনও অপরাধীর ফাসি চাওয়ার ক্ষেত্রে একটা কারণ হয়ে আমাদের মধ্যে কাজ করে। কিংবা, কোনও সমস্যা যার রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব, তা ভুলে গিয়ে সামরিক সমাধান দাবি করি। আর সাম্প্রতিক সময়ে তাে এমনটাই ঘটছে- তুমি ঠিকই বলেছ, হিটলারের ছায়া ক্ৰমদীর্ঘ!

অমিত: আপনি নিজেকে লিটিল ম্যাগাজিনের লেখক হিসাবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। আজ চারিদিকে পেটমােটা লিটিল ম্যাগাজিন, যা করতে গিয়ে ধার-দেনা করতে হয়। দৈত্যকে মারতে গিয়ে এ-ও দৈত্য হয়ে গেল! বাকিরা পড়ে থাকল পেছনে। ভীষণ পেছনে। তাহলে লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলনটা আর থাকল কি?

সু: প্রা: আমি মূলত ছােটগল্প লেখক। গল্পতত্বে এটি স্বীকৃত বিষয় যে, এক-একটি ছােটগল্পে গল্পকারের ব্যক্তিত্বের এক-একটি দিক অভিব্যক্ত হয় নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়কে অনুসরণ করে কথাটি বললাম, তাে আমার ব্যক্তিত্ব’ এমনই যে, লিটিল ম্যাগাজিন ছাড়া অন্য কোনও ম্যাগাজিন তা ধারণ করতে পারেনি, এমনকি কোনও-কোনও লিটিল ম্যাগাজিন আমার গল্প প্রকাশ করতে আগ্রহ দেখায়নি। এর মধ্যে দিয়ে গল্পকার হিসাবে যে পরিচয় তা তাে লিটিল ম্যাগাজিনই দিয়েছে। বলা বাহুল্য, লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনই আমাকে নির্মাণ করেছে— করে চলেছে এই যে তুমি আমাকে দিয়ে কথা বলাচ্ছ- এর অর্থ— আন্দোলনটা কিন্তু রয়েছে!

অমিত: কেউ কেউ বলেন, লিটিল ম্যাগাজিন সাহিত্য সৃষ্টির প্রকৃত রান্নাঘর। আবার কেউ কেউ বলে থাকেন, অনেকক্ষণ ওঁতােণ্ডতি করার পর বৈঠকখানায় জায়গা না পেয়ে রান্নাঘরকে অনেকে সাহিত্যচর্চার প্রকৃত স্থান বলে মনে করেন। আবার কেউ কেউ আরাে এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেন, কবি-সাহিত্যকরা সর্বদা হা করে থাকে কখন প্রতিষ্ঠান একটু ‘মুতে' দেবে! এই বিষয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে ইচ্ছে করে।

সু: প্রা: যারা এসব কথা বলেন, আমার মনে হয়, সাহিত্যতত্ত্ব সম্বন্ধে তাদের কোনও ধারণা না থাকার জন্যই বলতে পারেন। আর প্রতিষ্ঠান, সে যত ছােটই হােক না কেন, তার সঙ্গে লেখক কবিদের সম্পর্কের যে কথা তুমি বললে, এর প্রতিক্রিয়া জানানাের মতাে অভিজ্ঞতা আমার নেই। বলতে পারাে এটা আমার ওই ব্যক্তিত্ব’-র দোষ!

অমিত: একজন লেখক এক তরুণ লেখককে বলছেন, পত্রিকার (লিটল কিংবা ব্যবসায়িক) চরিত্র জেনেই লেখা পাঠাবে, তাহলে তারা ছাপবে, আমিও তাই করতাম। এখানে সৃষ্টি বা সততা কতটা থাকল? না, এটাই রেওয়াজ? আর লেখকের ‘পদবী' কি খুব গুরুত্বপূর্ণ?

সু: প্রা: এতক্ষণ আমরা যে-সব কথা বলেছি তার মধ্যে 'সমাজ’ শব্দটা দু-একবার এসেছে, কিন্তু। কোনও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দাবি নিয়ে আসেনি। এমনকি আমাদের মনেও হয়নি সমাজ শ্রেণিবর্ণে বিভক্ত। ‘পদবী'-সূত্রে কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হচ্ছে সমাজ বর্ণবিভক্ত। এবং শ্রেণিবিভক্ত সমাজে সাহিত্যেরও শ্রেণিচরিত্র থাকবে, এটাই স্বাভাবিক; পত্রিকার চরিত্র মানেই পত্রিকার সম্পাদক প্রকাশকের শ্রেণিচরিত্র বা যদি গােষ্ঠি থেকে থাকে তা হলে গােষ্ঠির চরিত্র, পত্রিকার প্রকাশ জ্ঞাতে অজ্ঞাতে শ্রেণিস্বার্থ রক্ষার জন্য। অতএব, যে লেখা আমার শ্রেণি স্বার্থ রক্ষার পক্ষে কাজ করতে পারে এমন লেখাই “আমরা” ছাপব। শ্রেণিচরিত্রকে আড়াল করে একজন লেখক অন্য শ্রেণির জন্য লিখতে পারেন বলে আমার মনে হয় না। কেননা, ব্যক্তিত্ব তাে আর শ্রেণি নিরপেক্ষ বিষয় নয় !

বর্ণবিভক্ত সমাজে একজন লেখকের ‘পদবী’ অবশ্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

অমিতঃ একজন একটা লেখা পড়ে বলছেন অসাধারণ, আর একজন ফুৎকারে উড়িয়ে দিচ্ছেন, এখন সেই লেখাটির প্রকৃত অবস্থান কী হবে?

সু: প্রা: একটি লেখাকে 'অসাধারণ' বলা বা ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়া দুটি ঘটনাই পাঠক ব্যক্তিত্বের প্রকাশ বলাবাহুল্য পাঠকের শ্রেণি অবস্থানই তার ব্যক্তিত্বের নিয়ন্ত্রক। যে শ্রেণির প্রতি লেখক-ব্যক্তিত্বের দরদ প্রকাশ পেয়েছে, সেই শ্রেণি পরিসরেই গল্পটি টিকে থাকবে।

কিন্তু আরও একটি কথা বলার আছে, একজন লেখক, তিনি যত মানবিক মূল্যবােধে ঋদ্ধ হবেন, তার ব্যক্তিত্ব ততই শ্রেণি-বর্ণচিহ্ন বর্জন করে অনেক বেশি মানবিক সৌন্দর্য বিকিরণ করবে।

অমিতঃ আপনি লিটিল ম্যাগাজিনের একজন সফল গদ্যকার। প্রচুর পড়েন। ঠিক কোন অনুপ্রেরণা আপনাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় ?

সু: প্রা: 'সফল'-এ ব্যাপারে কিছু বলার নেই। আর আমার পড়াশুনাের ব্যাপারে তােমার এই মন্তব্যটা একেবারেই ঠিক নয়। তবে, এই যে 'অনুপ্রেরণার কথা বললে, পড়তে পড়তে কোনও জাগ্রত জিজ্ঞাসার তাগিদে আমাকে লিখতে হয়েছে। যেমন, তােমাকে বলি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পােস্টমাস্টার’ গল্পটা পড়েছ তাে রতন-এর জন্য কেমন একটা মন খারাপ হয়, না? বােট থেকে নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা রতনকে আমি দেখতে পাই, কোনও তত্ত্বকথা মনে পড়ে না, কেবল রতনের চোখদুটো মনে পড়ে, 'ক্লোজআপ’-এ দেখতে পাই, রবীন্দ্রনাথকে বড় নিষ্ঠুর মনে হয় --কবে একদিন এই প্রশ্ন জেগেছিল : সম্পর্ক যেখানে প্রয়ােজনভিত্তিক– তুমি কী করতে? বােধহয় এই প্রশ্নেরই উত্তর লিখেছিলাম ‘জ্যোৎস্নায় হাঁটা’ গল্পে। এছাড়া বাংলা সাহিত্যে দুটি স্মরণীয় গল্প ‘টোপ’ আর ‘রস'— এই নামেই আমার দুটো গল্প আছে এই সূত্রে, এখনই মনে হল, ‘প্রাগমেটিক রিলেশনশিপ’-এর বিপরীতে সম্পর্ক তৈরির পরিসর নির্মাণ-আকাঙ্ক্ষাই আমার ক্ষেত্রে প্রেরণা বলতে পারাে। অমিতঃ আপনার ‘সােনালি ডানার চিল’ পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত একটি উপন্যাস। এই উপন্যাসটা কেন লিখলেন, যেখানে অনেকে বলে থাকেন ভূমেন্দ্র গুহ পড়লেই হয়ে যেত?

সুঃ প্রাঃ এই বিবৃতিতে একটু ভুল আছে। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি আমাকে যে পুরস্কার দিয়েছে তা ‘সােনালি ডানার চিল’-এর জন্য নয়, আমার সামগ্রিক সাহিত্যকৃতির জন্য। তবে, সাইটেশনে ‘সােনালি ডানার চিল’ থেকে উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছিল।

এখন প্রশ্ন : এই উপন্যাসটা কেন লিখলাম? তুমিই প্রথম যে এই প্রশ্নটা করলে তােমাকে ধন্যবাদ! কেন লিখলাম- আমাদের আলােচনার প্রথম দিকে, সমাজ বিচ্ছিন্ন মানুষের ডিপ্রেসিভ ইলনেস-এর কথা এসেছিল— সমাজ থেকে তাে মানুষ, মানে ব্যক্তি এমনি-এমনি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না, একটা প্রক্রিয়া থাকে, সমাজের দিক থেকে, মানে যাদের সঙ্গে ব্যক্তির মেলামেশা, আর একটা দিক হল ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব— একপক্ষ ব্যক্তিকে ‘সংঘচ্যুত করার প্রক্রিয়া চালায়, মূলত তার উপকরণ উপেক্ষা, তুমি আমাদের কেউ না বানিয়ে তােলা— ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব এক্ষেত্রে ব্যক্তিকে ‘সংঘ’ থেকে সরিয়ে নেয়— এটা ঘটেছিল আমার ক্ষেত্রে; তখন নিজেকে অসফল মনে হত, আত্মবিশ্বাস বলতে যা বােঝায় তা যেন একেবারেই তলানিতে, তখন, আমার প্রতিটি মনােভাবের প্রকাশ জীবনানন্দের কবিতায় আবিষ্কার করতাম— আর একটু একটু করে অসফলতার অন্য মানে আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে— যে মানুষ প্রকৃতির অংশ হিসাবে নিজেকে দেখতে শিখেছে তার প্রেমিক না-হয়ে উপায় নেই, তাকে বিপ্লবী হতেই হবে—আর এ-দুটি ক্ষেত্রে সফলতা সে ‘সুচেতনা'র মতাে সুচেতনা, তুমি এক দূরতর দ্বীপ’– প্রেম মানে আরাে আলাে— মানুষের তরে এক মানুষীর গভীর হৃদয়– জীবনানন্দীয় এই সব অনুভব আমার মাথায় হাত রাখে— এই সময়ে কফিহাউসে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা ভাঙাচোরা এক মানুষের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল, ব্যর্থ মানুষ।

তখন আমার মনে হয়েছিল এই দুজন আপাত অসফল মানুষের যে কোনও একজনের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারলে আমি পরিত্রাণ পাব। কিন্তু কার মধ্যে একজন প্রায় আমার জন্মকালে প্রয়াত হয়েছেন আর একজন জীবিত, মুখােমুখি কথা বলার সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য, তখন বছর খানেক আলাপ হয়েছে, আলাপ করিয়েছেন আমার কবিবন্ধু সহকর্মী অরিজিৎ সিংহ— তুলনামূলক সাহিত্যের ছাত্রী, অরিজিতের সহকর্মী, জোনাকি ঘােষ রায়-এর সঙ্গে আমি তাকে ব্যাপারটি বলি। আমি আজও স্পষ্ট মনে করতে পারছি, কয়েক মুহূর্ত তার চেয়ে থাকা... তিনি বললেন, জীবনানন্দ। জানালেন তার কাছে জীবনানন্দ সমগ্র আছে, জীবনানদের জীবনে ঢুকে পড়াটা খুব সহজ-সাবলীল করে দিলেন তিনি— রিপুদাসত্বের বিরুদ্ধে মানবিকতার যে লড়াইয়ের কথা বলেছি, জীবনানন্দের সাহিত্যকৃতি এক অনন্য অভিজ্ঞতা দিয়েছে আমাকে, আমি আমার বিশ্বাসে স্থিত হয়েছি পুনরায় ।

এই উপন্যাস লেখার এটা ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ। সামাজিক প্রেক্ষাপটে, জীবনানন্দকে আমার মনে হয়েছে এই বণিকসভ্যতাভিত্তিক আধুনিক সময়ের বিরুদ্ধে তিনি এক 'শান্ত বিপ্লবী'— আধুনিক সভ্যতা তীব্র আলাের আয়ােজনে যে অন্ধকার সৃষ্টি করেছে, জীবনানন্দের বয়ানে যা ‘অদ্ভুত আঁধার'— তার স্বরূপ উন্মােচনে জীবনানন্দ পথিকৃৎ, যারা অন্ধকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা। করেছেন, যুদ্ধ জারি রেখেছেন, আগামী দিনে যারা সৈনিক হবে- মানবিক সেনা, তাদের সামনে জীবনানন্দের ব্যক্তিগত লড়াই যেমন প্রেরণার বিষয়, তেমনই তার সংঘবাসনার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি তার জীবন আলেখ্য আমাদের অপ্রেমের থেকে প্রেমে গ্লানি থেকে আলােকের মহাজিজ্ঞাসায় নিয়ে যেতে পারে- এরকম সব সম্ভাবনার কথা মনে রেখে জীবনানন্দের ব্যক্তিত্বকে তার সময়কাল সমেত উপন্যস্ত করতে চেয়েছি।

এক-একজন পাঠক এক-এক রকম উদ্দেশ্য নিয়ে জীবনানন্দকে জানতে চাইবেন, ‘ভূমেন্দ্র গুহ পড়লেই’ কারও জীবনানন্দ জিজ্ঞাসার নিরসন হতে পারে, তিনি নিশ্চয়ই ‘সােনার ডানার চিল' পড়বেন না। অথবা পড়তেও পারেন।

অমিতঃ আচ্ছা, ছােটগল্প আপনার কাছে ঠিক কী? গল্প, নি-গল্প, অ্যান্টিগল্প ইত্যাদি নিয়ে আপনার কিছু মতামত জানতে ইচ্ছে করে।

সু: প্রা: ছােটগল্প এক প্রকার ভাষাশিল্প। শিল্প বলতে আমি বুঝি, মানবিক সচেতনতার রূপ, ইংরেজিতে বললে ব্যাপারটা দাঁড়াবে এরকম— Art is a form of humane consciousness, তুমি জানাে, ছােটগল্পের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া সংজ্ঞায় বলা হয়েছে ছােটগল্প usually presenting the crisis of single problem- কীসের সমস্যা বা কার সমস্যা ব্যক্তির সমস্যা— মানে ব্যক্তির সম্পর্কের সমস্যা যে সমস্যা মেটানাে যায়নি বলেই তা সংকট তৈরি করেছে; অর্থাৎ ছােটগল্প কোনও একটি সমস্যাসঞ্জাত সংকটকে কেবলমাত্র তুলে ধরে। সংকটমুক্তির কোনও দায় ছােটগল্পের নেই, মানে হল ছােটগল্পকারের ব্যক্তিত্ব এই দায় নিতে চায় না। আমি অবশ্য ব্যাপারটা অন্যভাবে দেখি, মানে আমার ব্যক্তিত্ব দেখে। আমার ব্যক্তিত্ব মনে করে, যে ঘটনার মাধ্যমে সমস্যাটা প্রকাশ পেল তা না-ঘটে আর কী-কী ঘটতে পারত যা খুব সহজেই সমাধান করা যেত- এমন এক সম্ভাব্য ঘটনার বিবরণকেই আমি গল্প বলে মনে করি, গল্প হল যদি এমন হত বা হয়-এর ন্যারেশান।

এ সূত্রে নি-গল্প মানে কি নেই গল্প? তা যদি হয়, এটা একটা ভেবে-চিন্তে না বলা একটা কথা— মানে কোনও গদ্য রচনাকে এই অভিধা দেওয়া— আমি গল্প লিখব কিন্তু তাতে গল্প থাকবে না তা কখনও হয় বলে আমার মনে হয় না। আর অ্যান্টিগল্প- সে তাে মারাত্মক ব্যাপার গল্পের বিরােধী মানে তাে এই যে তা রূঢ় বাস্তব, সেখানে তাে স্বপ্ন-কল্পনা এসবের কোনও অস্তিত্বই থাকবে না! আর যাই হােক, তাকে ‘গল্প' বলা যাবে না।

অমিতঃ আপনি একজন বামপন্থী। সমগ্র পৃথিবীতে আজ বামপন্থা বিপন্ন। তাহলে কি বামপন্থার দিন শেষ? বামপন্থী সাহিত্যটা ঠিক কী?

সু: প্রা: মানবাধিকার-চর্চা করতে এসে বুঝেছি মানবাধিকার'-এর ধারণা শিক্ষিত-মান্যগণ্য প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের মধ্যেও কত কম! একই রকম অবস্থা মার্কসবাদ ও বামপন্থা বিষয়ে। বামপন্থা সম্বন্ধে নিশ্চয়ই তােমার কোনও ধারণা আছে যার সঙ্গে আমার আচার-আচরণ কথাবার্তার মিল খুঁজে পেয়েছ অথবা আমিই হয়তাে কোথাও ঘােষণা করেছি— 'আমি বামপন্থী। একটি গল্পে, নাম মনে পড়ছে না, আমার এক চরিত্রকে সে যে কমিউনিস্ট নয় এটা প্রতিষ্ঠা দিতে চেয়েছিল তারই একসময়ের বন্ধুরা আর সে তীব্র বিরােধিতার অবস্থান নিয়ে ঘােষণা করেছিল, ‘আমি কমিউনিস্ট'। জানি না, এ গল্পও তুমি পড়ে থাকতে পারাে তার থেকে আমার সম্বন্ধে তােমার এ প্রত্যয় জাগতেই পারে। আমি আপত্তি জানাচ্ছি না।

কিন্তু 'সমগ্র পৃথিবীতে আজ বামপন্থা বিপন্ন’– এই কথাটা নিয়ে একটু আলােচনা দরকার তুমি বােধহয় মার্কসবাদ ও বামপন্থাকে অভিন্ন ভেবেছ। তা-কিন্তু নয়। কোট-আনকোট বামপন্থার আগেও বামপন্থা ছিল— ‘প্রাকৃতিক অনিবার্যতার বিরুদ্ধে আমরা যে লড়াইয়ের কথা বলেছি, তার ধারাবাহিক পরিণাম, তুমি জানাে প্রকৃতির ওপর প্রভুত্ব কায়েম করেছে মানব প্রজাতির একটা অংশ, আর একটা অংশ, বলা যায় কমবেশি ৮০% সদস্য প্রাকৃতিক থেকে গেছে অর্থাৎ এই প্রাকৃতিক মানুষকে বননিধনের মতাে কীভাবে নিধন করেছে তার প্রভু’রা তা ইউরােপ আমেরিকার আধুনিক ইতিহাসের পাঠকমাত্রেই জানেন, এমনকি পরাধীন ভারতবর্ষের ইতিহাসেও তার উদাহরণ মর্মান্তিক সাঁওতাল বিদ্রোহ, বিরসা মুন্ডার বিদ্রোহ নিশ্চয়ই আমাদের মনে পড়বে।

এই যে অধিকার হারানাে মানুষ তাদের দুর্বিসহ বেঁচে থাকার প্রেক্ষাপটকে যারা সহনীয় করে তােলার জন্য, উদ্যোগ নিয়েছিলেন, আমার অনুমান করতে ভালাে লাগে যে, তখন একটা পথ তৈরি হয়েছিল, ফরাসি বিপ্লবের পর সেই পথটারই নাম হয়েছিল বামপন্থা সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের জন্য, তাদের স্বার্থরক্ষার জন্য যারা আন্দোলন করেন সংহতি জানান সমর্থন করেন তারাই বামপন্থী। ওয়ালস্ট্রিট আন্দোলন'-এর কথা মনে আছে তােমার? সম্পদ বিষয়ে সেখানে কী-একটা হিসেব ছিল, মনে পড়ছে না, তবে আমি যে ৮০% মানুষের কথা বলেছি তার চেয়ে বেশি মানুষ ওই সম্পদ-হারানাে মানুষ— এই মানুষেরা আজ নিজেরাই আন্দোলন করছেন, করবেন— বামপন্থার বিপন্ন হওয়ার কোনও কারণ ঘটেনি, বরং সম্পন্ন হয়ে উঠছে।

'সমগ্র পৃথিবীতে আজ বামপন্থা বিপন্ন'—একথাটা তুমি বােধ হয় কোট-আনকোট মার্কসবাদী বামপন্থার কথা বলতে চেয়েছ, সমাজতন্ত্রের পতন, বামফ্রন্টের পতন ইত্যাদির কথা মনে রেখে! তা যদি হয়, তুমি ঠিকই বলেছ মার্কসের নাম করে মানে তাকে ‘সাইনবাের্ড’ করে বামপন্থার দিন শেষ।

এবার বামপন্থা সাহিত্য— এটা কী— আমাদের আলােচনার মধ্যে কিন্তু এর উত্তর রয়েছে— একটা গল্পের কথা বলি, হয়তাে স্কুলে তােমারও পাঠ্য ছিল, গুড সামারিটান- বাইবেলের গল্প, এটা বামপন্থী সাহিত্য; একটা জাতকের গল্প মনে পড়ছে, এটাও আমাদের সময় পাঠ্য ছিল, গল্পটার নাম ছিল 'বুড়ির কৌটা'- সেরিবা-সেরিবানের গল্প— এ গল্পও আমার বিচারে বামপন্থী গল্প- এসব গল্পে 'মানবিকতা’ আলাে ছড়িয়েছে, বলাই বাহুল্য- উত্তরটা নিশ্চয় তুমি খুঁজে পাবে।

অমিতঃ লিখতে আসতে গেলে কি পড়াশুনাে করে আসতেই হবে? আপনি কাদের পড়েছিলেন? একজন তরুণকে কী পড়তে বলবেন?

সু: প্রা: না। ছাত্র-অবস্থায় ফাল্গুনী মুখােপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র— সবারই দু-একটা লেখা পড়েছি— রবীন্দ্রনাথ পড়েছি অনেক পরে, আরও পরে জ্যাক লন্ডন, লুসুন, চেকভ, গাের্কি খুব যে নিয়ম করে ধারাবাহিক পড়া হয়েছে তা নয়— পড়াশুনাে আমার খুব কম— প্রসঙ্গ উঠলে আমি খুব সঙ্কোচবােধ করি।

এখন মাঝেমধ্যে মনে হয় আমার ছােটবেলায় যদি জাতকের গল্প পড়ার বা শােনার সুযােগ পেতাম, যদি কেউ বলতেন উপনিষদ পড়, মহাভারত পড়– বুঝলে অমিত, মহাভারতকে আমার মহাউপন্যাস বলে মনে হয়, আমার এখনও ওই ঔপন্যাসিক সমাজবাস্তবের মধ্যেই আছি- লিখছেন যে তরুণ, তার উদ্দেশে ওই বইগুলির কথাই বলব, তার সঙ্গে তােমাকেও বলছি, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র’ পড়বে, অ্যারিস্টটলের ‘রাজনীতি – একজন লেখক তাে সম্পর্ক লেখেন, সম্পর্কের আধার পরিবার পরিবার সমাজ সংলগ্ন অথচ সমাজের মূর্ত কোনও কাঠামাে নেই- তােমার মনে হয়তাে প্রশ্ন জাগছে- সাহিত্য তাে সমাজবিজ্ঞান নয়- ঠিক, কিন্তু সাহিত্য, বিশেষ করে মানবিক অবক্ষয় ঘটার এই যুগে, সমাজ বিজ্ঞানের অবলােকনগুলি ধারণ করতে চাইছে— কেননা, সম্পর্ক এখন কেনা-বেচার বিষয়— পণ্যের নিয়মে সম্পর্ক তৈরি হয়— আমার অনুমান সামগ্রিক হিতার্থে সাহিত্য একদিন সমাজবিজ্ঞানের অংশ হয়ে উঠবে।

অমিতঃ “এরকমই শিয়ালদা স্টেশনে একজনকে পার্থ ভেবে ভুল করেছি। আশ্চর্য ম্যাজিক যেন- এই ছিল। এই নেই! সবটাই কি আমার কারসাজি ? পেছন থেকে যে মানুষটা চেনা। মানুষ বলে মনে হল কোন জাদু বলে সে হয়ে যাচ্ছে অচেনা— এরকম একটা ভাবনা ছিল, সেটাতেও নতুন এক মাত্রা যােগ হল আজ।

আজ আমি মনীষাকে দেখলাম। সামনে থেকে। যত দূরত্ব কমেছে দুজনের মধ্যে ততই মনীষা না-মনীষা হয়ে গেছে।” [শুদ্ধিকরণ]।

নিখিলেশ, পার্থ কিংবা মনীষাদের কথকের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়াটা কেবলই কি রাজনৈতিক পট-বদলের জন্য, না এ-এক শাশ্বত পথ, যে-পথ দিয়ে অবশেষে সকল প্রিয়জনেরা হারিয়ে যায়, চেনামুখ হয়ে ওঠে ভীষণরকম অচেনা? তারা কি পেছন থেকে কিংবা দূর থেকেই কেবল চেনা থাকবে চিরকাল, আর কাছে আসলে প্রকৃত সারস’ উড়ে যাবে এভাবেই ?

সু: প্রা: রাজনৈতিক পট-বদল বলতে তুমি বােধ হয় সরকার-পরিবর্তনের কথা বলতে চাইছ, আমি অবশ্য এরকম ভেবে গল্পটা লিখিনি। বরং নিখিলেশ-পার্থ-মনীষারা যে সরকারি দলের সঙ্গে থাকা মানুষ— এটা শিল্পসম্মতভাবে বলার চেষ্টা করেছি।

যাই হােক— বিষয়টা হল হারিয়ে যাওয়া তুমি যে শাশ্বত পথ'-এর কথা বলছ, তা যদি মৃত্যু হয়, আমার অন্তত মৃত্যুই মনে হচ্ছে, এক্ষেত্রে নিখিলেশ-পাখ-মনীষাদের কথকের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া, এক অর্থে মৃত্যুই, কিন্তু এ মৃত্যু স্বাভাবিক নয়, আত্মহত্যা আদর্শকে হত্যা করেছে এরা।

কথকের রাজনৈতিক মানুষ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এদের ভূমিকা ছিল এদের এই বদলে যাওয়া আসলে আদর্শকে খুন করা অবিশ্বাস্য, ইনক্রেডবল অর্থে, খুন হতে দেখে, তখনও আদর্শ আঁকড়ে থাকা কথকের চৈতন্যে তাদের যে ইমেজ তৈরি হয়েছিল তা ‘ফেড আউট' হয়ে যাওয়ার পর্যায়ে চলে যাওয়ায় ওই বিভ্রম।

আর চেনা মুখের ভীষণ অচেনা হয়ে ওঠার ব্যাপারটা একটু কাব্য করে বলা যাক: অন্তরের যে আলাে ছড়িয়ে আমরা পরস্পরের মুখ দেখেছিলাম, চিনেছিলাম চোখের তারা, দূরনক্ষত্রের দুতি, আমাদের কণ্ঠস্বরে জেগেছিল ইমন, আমরা পরস্পরকে নির্মাণ করেছি তবু! অচেনা? আমি ভেবে দেখেছি কোনও এক পক্ষের আলােয় কালিমা ছড়িয়ে পড়েছে বা অন্ধকার, যা পরিচিত প্রােফাইলকে খাসবাংলায় ঘেঁটে দিয়েছে অথবা তুমি ভাবতে পারাে নির্মাণটাই ছিল বিভ্রমবশত ভেঙে পড়েছে। আমার মনে হয় এসবের জন্য, চেনাটাকে ঠিক চেনা হয়ে ওঠে না বলেই এই ভীষণ অচেনা মনে হওয়া | আর যদি 'বিজ্ঞান'কে মনে রেখে বলি, তা হলে এটা স্বাভাবিক; সংযােগে যা উৎপন্ন অবশ্যই তার ক্ষয় হবে— এ সত্য আমাদের প্রথম জানিয়েছিলেন বুদ্ধদেব এবং যার ক্ষয় অনিবার্য, তার অবক্ষয় ঘটানাে সম্ভব।

তুমি আমাকে উসকে দিয়েছ, আর একটু বলতে দিতে হবে মনুষ্যসমাজে সমস্ত সম্পর্কই কিন্তু সংযােগ-উৎপন্ন, প্রতিটি সম্পর্কের সঙ্গে আর-একটি সম্পর্কের সংযােগ রয়েছে- সম্পর্কের

চালিকাশক্তি— এটাও মনে রাখতে হবে বেঁচে থাকার নিরিখে অর্থনৈতিক কার্যকলাপ যা। রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে আমরা যে অবক্ষয়ের কথা বলছিলাম সম্পর্কের অবক্ষয় ঘটানাে। হয় অর্থনীতির পরিসর থেকে এ-কথাগুলাে বললাম এ-কারণে যে, যে গল্প-অনুষঙ্গে এর কথা— সেই গল্পে যে স্বপ্নকথা বলা হয়েছে তা বৌদ্ধসংঘ-অণুকরণে ও গল্পের কথক-চরিত্রটি মর্যাদাপূর্ণ অর্থনৈতিক কাজকর্মে যুক্ত না-হতে পারা এমন একজন মানুষ যে আদর্শকে আঁকড়ে আছে পরম মমতায়। সে সম্মিলন চায়, কিন্তু কার সাথে, কেবল মনে পড়ে স্মৃতি স্মৃতির। মানুষেরা কেউ-ই আর সত্তায় নেই। একটা বিভ্রম আছে।

তাই, নিখিলেশ-পাৰ্থ-মনীষারা কেউই প্রকৃত সারস'-এর উপমা হতে পারে না।

অমিতঃ “বিয়ে ব্যাপারটা তাে একটা মার্কেটিংয়ের মতাে কিছু। ওপেন মার্কেট আমরা যে কেউ যে কাউকে কিনতে পারি। কিংবা বেচতে পারি।' ইঙ্গিত স্পষ্ট। তবু পৃথা বলেছিল।

ব্যাপারটা কি অতই সহজ?'— বাজারটা বুঝলে সত্যিই সহজ।" [সুবাসকথা)।

দাদা, মাধবের এই ব্যাখ্যা আজকের পরিপ্রেক্ষিতে কতটা বাস্তব? আর এর মুক্তি কি 'বিবাহ' নামক সম্পর্কের বিনির্মান' তত্ত্বেই, যেমনটি মাধব ও পৃথা মনে করে ? যদি 'বিনির্মান বলে মেনে নিই, তাহলে সেটাও কি এক বাজার-কে প্রতিষ্ঠা করে না?

সুঃ প্রাঃ ব্যাখ্যাটি কিন্তু মাধবের নয়। পৃথার এক সহকর্মীর। সে বণিকসভ্যতার মানুষ। যৌনতাকে

সে কেনা-বেচার বিষয় রূপেই দেখে।

যৌনতার বাজার খুব ছড়িয়ে পড়েছে। টায়ারের বিজ্ঞাপনে বুক দেখানাে যুবতী। খবরের কাগজে, টিভিতে ‘জাপানি তেলের বিজ্ঞাপন, ‘বােল্ড রিলেশন'-এর বিজ্ঞাপন- এসব নিশ্চয়ই বাজারের তেজী ভাবকে প্রকাশ করছে ন্যাপকিন, গর্ভনিরােধক, এমনকি সুগন্ধের বিজ্ঞাপন এসব তাে যৌনােদ্দীপক হয়ে আমাদের হাইপােথ্যালামাসকে স্টিমুলেট করে!

করে, কেননা বাইনেচার আমরা নাকি পলিগ্যামী। এটা একটা বদযুক্তি। বহুগামিতাকে নিয়ন্ত্রণ করে, বলতে পারাে দমন করে বা দমিত করার ফলে মানুষ একনিষ্ঠ হয়েছে। সমাজ-অর্থনীতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই একনিষ্ঠতার সংস্কৃতির উৎকর্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে গড়ে উঠছে যৌনসুখ উৎপাদনের যন্ত্র হিসাবে দেহকে ভাড়া দেওয়া, ভাড়া নেওয়ার সংস্কৃতি-পরিবার আছে আবার ব্রথেলও আছে— কে একজন বলেছিলেন না বিবাহ ব্যাপারটা আইনি বেশ্যাবৃত্তি খেয়াল করাে "বৃত্তি’—মানে বেঁচে থাকার জন্য মুদ্রা’ উপার্জনের উপায় যৌনতা— এক্ষেত্রে আর প্রাকৃতিক নয়- এর বাইরে মানে বাজারের বাইরে লিভিং টুগেদার বিবাহের বিরুদ্ধে এক রকমের বিদ্রোহ পৃথা-মাধবের বিবাহ-বিনির্মাণের যে ইচ্ছা তার অন্তঃসারে রয়েছে যৌন-স্বাধীনতায় বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা এর অর্থ বাজার থেকে যৌনতার মুক্তি। তাই না! এই মুক্ত যৌনতাই তাে আর কেনা-বেচার বিষয় হয়ে থাকছে না, সেক্ষত্রে বাজার প্রতিষ্ঠা করার প্রশ্নই নেই।

অমিতঃ “থমকে রাজীব পিছন ফিরে বিনতার চলে যাওয়া দেখছিল। কে জানে বিনতাও হয়তাে ফিরে দেখবে আর তাতেই সম্পর্কটার এখনও যে প্রাণ আছে- এই বার্তা ছড়িয়ে পড়বে। এমনও হতে পারে বিনতা হাত তুলে নিজেকে জাহির করবে। হয়তাে রাজীবই প্রথম হাত তুলে বিনতার দিকে এগিয়ে যাবে, এমনও হতে পারে একই সঙ্গে দু'জনেরই হাত উঠল— পরস্পরের দিকে এগিয়ে যাওয়া... রাজীব ভাবছিল, দেখল, বাক পর্যন্ত রাস্তা শুনশান। রাজীব হাঁটছে...” [স্বপ্নভূমি) । শুরুটা এমনই চমৎকার। শেষটাও; 'ডাউন ট্রেন এসে দাঁড়িয়েছে। দু'জনে দাঁড়িয়ে যেন কেউ একজন সি-অফ করতে এসেছে, ঠিক বােঝা যাচ্ছে না কে যাবে— জানলার ধারে বসা দু একজন যাত্রীর চোখ দেখে এমনই মনে হল রাজীবের। ট্রেন ছাড়ার হুইসল দিল। সেই জলসার রাতের মতাে এই ভর দুপুরে রাজীব বিনতার হাত ধরল। জানলার মুখগুলাে কে জানে কী গল্প তৈরি করছে!" অসম্ভব স্মার্টনেস আপনার গদ্যে। একজন গদ্যচর্চাকারী হিসাবে বলতে দ্বিধা নেই যে, এরকম স্মার্টনেস খুব কম সমসাময়িক গদ্যশিল্পীর মধ্যে দেখেছি। কেন মনে হল গল্পের পাশাপাশি গদ্যকেও এতটা স্মার্ট করার প্রয়ােজন, যেখানে একজন প্রখ্যাত গদ্যশিল্পীকে দেখেছি গদ্যের পেছনে সময় দিতে গিয়ে তার আখ্যানে টান পড়েছে? গদ্য নির্মাণে আপনার অনুপ্রেরণা। কারা?

সু: প্রা: এমন নিবিড় পাঠের জন্য ধন্যবাদ! একই সঙ্গে তােমাকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনও করছি! যে অসম্ভব স্মার্টনেস' তুমি আবিষ্কার করেছ, তা কীভাবে সম্ভব হয়েছে, বলতে পারব না ভেবে দেখলাম। বানিয়ে বানিয়েও বলা সম্ভব নয়।

কিন্তু বলতে হবে।

দুটো ঘটনা বলি-- একবার ‘প্রমা' পত্রিকায় একটা গল্প জমা দিয়েছিলাম। কয়েক মাস পর খোঁজ নিতে গিয়ে জানলাম যে, আমার এক অগ্রজ গল্পকার প্রমা’র গল্প দেখেন, তার সঙ্গে কথা বলতে হবে। অসুবিধে নেই— কফি হাউসে একই টেবিলে বসি। তাকে বললাম। একদিন তিনি জানালেন, আমার হাতে নাকি দারুণ ক্রাফটম্যানশিপ রয়েছে, কিন্তু গল্পটা অমনােনীত হয়েছে আমাকে আর একটা লেখা দিতে বললেন। আমার মাথায় তখন ক্রাফটম্যানশিপ’ কথাটা বিধে গেছে, শব্দটা অচেনা, ক্রাফটম্যান জানি, শব্দটার মানে আন্দাজকরে নিলাম, আমার হাতে আছে মানে গল্পেও থাকার কথা, কিন্তু গল্পটা...

অনেক পরে লিখতে লিখতেই বুঝেছি গল্প ছাড়া ক্রাম্যানশিপ হয় না। দ্বিতীয় ঘটনা— আমি তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি জীবনানন্দ দাশের জীবন-অবলম্বনে উপন্যাস লিখব। বই-পত্র সংগ্রহের জন্য দু-একজনকে বলছি। সৌম্যদীপ-- ছেলেটির সঙ্গে বছর দুই হবে, ঠিক মনে নেই, আলাপ হয়েছে, জীবনানন্দকে 'জীবু' নামে ডাকে, তাকে বলতেই সে বলল, ভাষা তৈরি করতে পারবেন?

সে আমার অনুজপ্রতিম, কিন্তু অসম্ভব পড়াশুনাে, তার কথায় আমি ধাক্কা খেলাম— “ভাষা তৈরি'— ভাষা তৈরির ব্যাপারটা আমার অজানা- সে পরক্ষণেই যেন এক স্বপ্নঘােরে বলেছিল, আঁধার নৈঃশব্দ্যের ওপর ঝরে পড়ছে সুপারি ফুল...।

আমি “ভাষা শিখলাম। আমার অগ্রজ গল্পকার, অনুজপ্রতিম বন্ধু- এরা আমার শিক্ষকতুল্য আমার শিল্পতত্বে এদের অবদান রয়েছে। এবার তত্ত্বকথাটি বলি— শিল্পের বিষয়বস্তু তার কাঠামােগত রূপের স্রষ্টা- কনটেন্ট ক্রিয়েটস ইটস ফর্ম অ্যান্ড ফ্রেম— এই ফর্ম ও ফ্রেমই-তাে কারুকৃতির পরিসর, তা যদি চমৎকার হয়, তাহলে ‘গল্প" মানে বিষয়বস্তুই তা করেছে তাহলে গল্পটা বাতিল হয়। কীভাবে?

আসলে সম্পাদকের ব্যক্তিত্বই গল্পটাকে খারিজ করেছিল। আর তুমি যে স্মার্টনেস'-এর কথা বললে আসলে তা তাে ওই ‘কাঠামােগত রূপ’ যা তােমাকে মুগ্ধ করেছে, তার মধ্যেই তাে গল্প ছড়িয়ে আছে— খুব সাদা কথায় শিল্প বলতে আমরা বুঝি ভাবমূর্তি এই ভাব যত সৎ হবে, সম্যক অর্থে, ততই তার প্রকাশক শব্দগুলির যথাযথ চয়ন হবে, গ্রন্থিত হবে— সব মিলিয়ে স্মার্টনেস'।

মনুষ্যত্বের এই অবক্ষয়ের যুগে যারা মানবিক থাকা, মানবিক হয়ে-ওঠার লড়াই করছেন তারাই আমার গদ্যচর্চার অনুপ্রেরণা।

অমিতঃ আপনার প্রায় প্রতিটি গল্পের সমাপ্তি অসামান্য, যেমটটি হওয়া উচিত আর কি!

‘অচমকা পৃথা আবিষ্কার করল টিভিতে নয়, তার মাথার মধ্যে নানা দৃশ্যের জন্ম হচ্ছে...'

[সুবাসকথা] অথবা,

‘এই লেখাটাকে একটা সুইসাইড নােট ভাবতে কোনাে অসুবিধে নেই। সম্ভবত আগামী পরশু আমি খবর হব। শিরােনাম হবে: অবসাদে পার্টি-কর্মীর আত্মহত্যা... সেই খবরে আমাকে নিয়ে একটা গল্প তৈরির চেষ্টা হবে। যে গল্পে শেষ পর্যন্ত আমাকে এক অবসাদগ্রন্ত' বাতিল মানুষ হিসাবে দেখানাে হবে— যদি এরকম হয়, এই লেখাটি আমার হয়ে নিশ্চয়ই কিছু কথা বলবে।

[শুদ্ধিকরণ]। শেষােক্ত অংশে কথক দিবাকর কি কথাসাহিত্যিক সুরঞ্জন প্রামাণিক হয়ে উঠল, আর মিডিয়াকে এভাবে হঠাৎ এক হাত নিলেন কেন?

সু: প্রা: সুবাসকথা ও শুদ্ধিকরণ— গল্প-দুটিতে যে-ভাব ছড়িয়ে আছে, তার উৎস প্রথমটিতে সংবাদপত্রে পাত্র-পাত্রী’র বিজ্ঞাপন, দ্বিতীয়টিতে একটি সংবাদ যার শিরােনাম ছিল : অবসাদে পার্টি অফিসে আত্মহত্যা সিপিএম কর্মীর— সেই যে বলেছিলাম না যদি এমন হয়, এটাই ঘটেছে 'সুবাসকথা'য় বানানাে দৃশ্যের বাইরে বেরিয়ে এসেছে পৃথা, তার মাথার মধ্যে দৃশ্য জন্মাননা আসলে আর এক গল্পের মধ্যে পাঠকের ঢুকে পড়া।

দ্বিতীয়টিতেও তাই অবসাদে পার্টি কর্মীর আত্মহত্যা আদবে একটি খুন একটি অন্য রহস্য গল্পের আরম্ভ।

এরকম মনে হল কেন তােমার— এটা ঠিক লেখক-ব্যক্তিত্বের প্রকাশকে অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু ভেবে দেখাে, দিবাকর যদি সুরঞ্জন প্রামাণিক হয়ে উঠত, তা হলে তাে এ গল্পের ‘প্লট’ই তৈরি হত না!

আর ওই ‘সেলফ এক্সপােজার’-এর দিক থেকে আমি বলতে পারি, সুরঞ্জন প্রামাণিকের দিবাকর হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল।

না অমিত, 'মিডিয়াকে একহাত নিয়েছি’ বলে তােমার মনে হওয়াটা ঠিক নয়, ওটা একেবারেই স্টেটমেন্ট আকারে বলেছি- সেই খবরটা মনে রেখে।

আমাকে দিয়ে এই প্রলাপ বকানাের জন্য তােমাকে ধন্যবাদ!

অমিতঃ ধন্যবাদ দাদা আপনাকেও। তথ্যগত ত্রুটির জন্য একান্ত ক্ষমাপ্রার্থী। আমরা সমৃদ্ধ হলাম। ভালাে থাকবেন।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সাক্ষাৎকার: দেবজ্যোতি দত্ত

সাক্ষাৎকারঃ দেবজ্যোতি দত্ত

সাক্ষাৎকার
দেবজ্যোতি দত্ত

প্রকাশন সৌষ্ঠব যেমন আছে, তেমনই পাঠকের রুচি তৈরি করার গুরুদায়িত্বও আছে।

চিত্রিতা চক্রবর্তী: বাংলা প্রকাশনার জগতে ‘সাহিত্য সংসদ’, ‘শিশু সাহিত্য সংসদ’ সুপরিচিত নাম। মহেন্দ্রনাথ দত্ত থেকে দেবজ্যোতি দত্ত— এই দীর্ঘ অভিযাত্রার কথা যদি কিছু বলেন?
দেবজ্যোতি দত্ত: শিশু সাহিত্য সংসদের প্রতিষ্ঠাতা আমার বাবা স্বর্গত মহেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি কিন্তু প্রধানত একজন মুদ্রাকর ছিলেন। সরস্বতী প্রেস তাঁরই হাতে তৈরি। এই সরস্বতী প্রেস একসময় সারা ভারতে বিশেষ স্থান লাভ করেছিল। বর্তমানে তা সরকার পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। বিপ্লবী মনোভাব নিয়েই সরস্বতী প্রেসের পরিকল্পনা করেছিলেন মহেন্দ্রনাথ দত্ত। পরাধীন ভারতে জাতীয়তাবাদী সাহিত্যকে প্রোমোট করার উদ্দেশ্যেই তার প্রথম পথচলা। ১৯২৩ সালে সরস্বতী প্রেসের জন্ম। স্বাধীনতার পরে যখন প্রেস একটু ভাল অবস্থায় এসেছে, তখন বাবার মনে ভাবনা জাগে, বাংলায় ছোটদের জন্য তেমন ভাল কোনও বইপত্র নেই। সুন্দর চিত্র-সংবলিত গ্রন্থ নেই, যেটা ইংরেজি ভাষায় বহু আগে থেকেই ছিল। সেইসব বইপত্র বাইরে থেকে এদেশে আসত। কিন্তু এদেশে তেমন কোনও উদ্যোগ তখনও পর্যন্ত দেখা যায়নি। বাবার মাথায় এই ভাবনাটা অনেকদিন ধরেই ঘুরছিল। ১৯৪৯ সালে সরস্বতী প্রেসে প্রথম অফসেট প্রিন্টিং মেশিন আসে। অফসেট মেশিন আসার পরেই ওঁর ভাবনা একটা অভিমুখ পায়— তিনি ভাবেন, এবার বাচ্চাদের জন্য অন্যরকমভাবে বইপত্র করা যেতে পারে। এই ভাবনার প্রথম সার্থক রূপায়ণ— ছড়ার ছবি ১ এবং ছড়ার ছবি ২। সেটা ছিল সারা ভারতের মধ্যে অফসেটে ছাপা প্রথম ছবির বই। তার আগে বাচ্চাদের বই এইভাবে ছবি ছেপে, বিশেষ ফরম্যাটে বিন্যস্ত করে কেউ প্রকাশ করেননি। প্রথম প্রকাশেই বইগুলি বাচ্চাদের পাশাপাশি বড়দের কাছেও অত্যন্ত সমাদর পেল। তখনই পৃথক একটি প্রকাশনা সংস্থা প্রতিষ্ঠার বাসনা জেগেছিল বাবার মনে। ১৯৫১ সালের ১ অগস্ট প্রতিষ্ঠিত হল শিশু সাহিত্য সংসদ প্রাইভেট লিমিটেড। সেই থেকে শুরু। সিগনেট প্রেসের প্রতিষ্ঠাতা ডি কে গুপ্তর (দিলীপকুমার গুপ্ত) কথা এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে। তিনি একসময় ডি জে কিমার কোম্পানির পরিচালনায় ছিলেন। ওঁর সঙ্গে বাবার খুব ভাল পরিচয় ছিল। সরস্বতী প্রেসে তিনিও কাজ করতেন। সেইসময় ডি কে গুপ্ত বলেছিলেন, এইরকম বই ভারতে আগে কখনও বেরোয়নি। তাঁর এই উৎসাহব্যঞ্জক মন্তব্য বাবাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তারপর থেকেই নানা ধরনের বইয়ের পরিকল্পনা করতে থাকেন বাবা। সুকুমার রায়ের বড়বোন সুখলতা রাও যেচে বাবাকে চিঠি লিখেছিলেন যে, আপনারা বাচ্চাদের জন্য এত বই করছেন, আমাকে কাজে লাগান। উনিও শিশুসাহিত্যিক ছিলেন। সেই সূত্র ধরেই প্রকাশিত হল সুখলতা রাওয়ের নিজে পড় এবং নিজে শেখ। বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে সেটা ছিল বৈপ্লবিক এক পদক্ষেপ। ‘অ’ লিখতে গেলে আগে ‘ত’ লিখতে হয়, ‘ক’ লিখতে গেলে আগে ‘ব’ লিখতে হয়— এই যে স্ট্রাকচারাল সিস্টেম, এটা কিন্তু শিশু সাহিত্য সংসদই শুরু করেছিল। বলা যায়, বাংলা শিশুসাহিত্যের জগতে এই প্রকাশনা সংস্থা পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। এই যে এখন কমিক স্ট্রিপের এত জনপ্রিয়তা, ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, ভারতের প্রথম কমিকস আমরাই ছেপেছিলাম— পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তীর আঁকা ছবিতে রামায়ণ (১৯৫৬), ছবিতে মহাভারত (১৯৬০)।
প্র: সে তো এক অসাধারণ কাজ! সকলের ঘরেই বোধ হয় একটা করে কপি রয়েছে।
উ: ১৯৫০ সালের আগে কেউ এভাবে ভাবেননি। পরবর্তীকালে অরণ্যদেব, অমর চিত্রকথা প্রভৃতি বই হয়েছে। কিন্তু অফসেট মেশিনে, এইভাবে ছোটদের বই রঙিন
ছবি-সহযোগে ছেপে প্রকাশ করার প্রথম কৃতিত্ব শিশু সাহিত্য সংসদের। প্রকাশনা যে শিশুসাহিত্য দিয়েও করা যায়, তা কিন্তু হাতেনাতে প্রমাণ করেছিলেন আমার বাবা। অন্যান্য অনেক প্রকাশনা সংস্থা বড়দের বইয়ের পাশাপাশি ছোটদের বইপত্র প্রকাশ করত, কিন্তু প্রধানত শিশুসাহিত্য নিয়েই কাজ করা এবং সেটাকে সফলতাপূর্বক এগিয়ে নিয়ে চলা— এটা আমার পিতৃদেবই প্রথম করলেন।
প্র: তার মানে শিশু সাহিত্য সংসদ হিসেবেই যাত্রা শুরু...
উ: হ্যাঁ, মনে রাখতে হবে ‘সাহিত্য সংসদ’ কিন্তু শিশু সাহিত্য সংসদের একটি বিভাগ। শিশু সাহিত্য সংসদের ইমপ্রিন্ট লাইন। বড়দের বই প্রকাশ করার সময় ‘শিশু’ শব্দটি বাদ পড়ল। হল সাহিত্য সংসদ। সেখানে প্রথম সাফল্য এসেছিল ১৯৫৫ সালে বঙ্কিম রচনাবলী-র হাত ধরে।প্রথমে দু’খণ্ডে বইটি প্রকাশিত হয়— প্রথম খণ্ডে উপন্যাস এবং দ্বিতীয় খণ্ডে তাঁর অন্যান্য রচনা। তৃতীয় খণ্ডটি প্রকাশিত হয়েছিল অনেক পরে।সেখানে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সমস্ত ইংরেজি রচনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তখন কেউ ভাবতে পারেননি, এক খণ্ডে বঙ্কিমের সমগ্র উপন্যাস ওইরকম পাঠযোগ্য অবস্থায় হাতে ধরে পড়া যাবে। এটাও কিন্তু রচনাবলি প্রকাশনার ক্ষেত্রে নতুন এক পদক্ষেপ ছিল। এ ছাড়াও যেটা বিশেষভাবে বলার, রচনাবলির ক্ষেত্রে যথাযথ এডিটোরিয়াল ইনপুট, যা এর আগে ছিল না। বঙ্কিম রচনাবলী-র ক্ষেত্রে যোগেশচন্দ্র বাগলের সম্পাদকীয় সংযোজন একটা অ্যাসেট। বঙ্কিমের সামগ্রিক জীবন ও সাহিত্যের আলোচনার নিরিখে তিনি প্রতিটি উপন্যাসকে বিচার করেছেন।পরবর্তীকালে রচনাবলির ক্ষেত্রে, এই এডিটোরিয়াল ইনপুট আবশ্যিক হয়ে গেছে। এইভাবে বিভিন্নরকম কাজের মধ্য দিয়ে, বাবার চিন্তাভাবনার মধ্য দিয়ে শিশু সাহিত্য সংসদ এবং সাহিত্য সংসদ বাঙালি পাঠকের কাছে একটা স্থায়ী আবেদন তৈরি করল। এই বঙ্কিম রচনাবলী প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। বাইবেল পেপারে ছেপে বঙ্কিম রচনাবলী বেরিয়েছিল ১৯৫৪ সালে। ১৯৫৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় বাবাকে ডেকে পাঠালেন। তিনি বাবাকে বললেন, সাধারণ মানুষের জন্য সরকার সস্তায় রবীন্দ্র রচনাবলি প্রকাশ করতে চায়। বাবা ওঁকে আশ্বস্ত করলেন। রবীন্দ্র রচনাবলির সাইজ়টা কীরকম হবে বিধান রায় জানতে চেয়েছিলেন। বাবা তাঁকে বাইবেল পেপারে ছাপা ডিমাই সাইজ়ের বঙ্কিম রচনাবলী-র একটা কপি দেখান। তারপর ১৯৬১ সালে বেরোল ডিমাই সাইজ়ের রবীন্দ্র রচনাবলি। পরবর্তীকালে যেসব রবীন্দ্র রচনাবলি বেরিয়েছে, সবই রয়্যাল সাইজ়ের। এই সূত্রে আর-একটা মজার ঘটনা উল্লেখ করি। রবীন্দ্র রচনাবলি ছাপার কাগজ আসার কথা ছিল নোবেল ফাউন্ডেশন থেকে। কিন্তু যেটা দেখা গেল, নোবেল ফাউন্ডেশন কাগজ পাঠায়নি, পাঠিয়েছিল জাহাজ ভর্তি পাল্প!
প্র: আপনার কাছে কীভাবে এই প্রকাশনা জগতের দ্বার উদ্‌ঘাটিত হল?
উ: আমার কিন্তু এখানে আসার কথা ছিল না। আমি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক হয়েছি। তখন আমি অন্য ধরনের কাজকর্ম করছি। সরস্বতী প্রেসেও আমি কাজ শিখেছি, করেছি। ঠিক চাকরি হিসেবে নয়, কাজ শেখার জন্য। সেই সময় এই প্রকাশনা সংস্থার দেখাশোনার ভার ছিল আমার দাদার ওপর। দাদা হঠাৎ স্থির করলেন, তিনি ব্যবসা করতে পারবেন না। তখন স্বাভাবিকভাবেই আমার ডাক পড়ল। কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সূত্রে প্রিন্টিং প্রেসের কাজকর্ম আমি খানিক রপ্ত করেছিলাম। বাইরের দেশেও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করার পরে অনেকেই অ্যাডভান্স প্রেসে কাজ করে। কেননা, অফসেট প্রিন্টিংয়ের বেসিক প্রিন্সিপল দাঁড়িয়ে আছে কেমিস্ট্রির ওপর। পরবর্তীকালে প্রিন্টিং ইঞ্জিনিয়ারিং পৃথক বিভাগ হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে। তবে আগে কেমিক্যাল ই়ঞ্জিনিয়ারিং থেকে অনেকেই প্রিন্টিংয়ে যেত। প্রেসে থাকাকালীন কাগজ সম্পর্কেও আমি একটু পড়াশোনা করেছিলাম। ফলত, আমার পিতৃদেব আমাকেই এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব দিলেন। ব্যবসা খুব-একটা বড় ছিল না, কিন্তু পাঠকের কাছে এর সমাদর ছিল আকাশছোঁয়া। দীর্ঘদিনের এই প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে, সেটা বাবা মেনে নিতে পারছিলেন না। তাই আমিও রাজি হয়ে গেলাম। প্রকাশনার তিনটে ইনপুট আছে— প্রিন্টিং ইনপুট, এডিটোরিয়াল ইনপুট এবং পেপার ইনপুট। এই তিনটে খুবই জরুরি বিষয় প্রকাশনার ক্ষেত্রে। এর মধ্যে এডিটোরিয়াল ইনপুটটা হচ্ছে বেসিক।বলতে দ্বিধা নেই, বাঙালি প্রকাশনার জগতে এই এডিটোরিয়াল ইনপুটের বড়ই অভাব। অধিকাংশ প্রকাশনা সংস্থার সমস্ত কিছুই লেখককেন্দ্রিক। প্রকাশনা সংস্থার এডিটোরিয়াল ইনপুট নিয়ে এখানে খুব-একটা ভাবনাচিন্তা নেই। অথচ ইংরেজি প্রকাশনার ক্ষেত্রে দেখি, যত বড় লেখকই হোক না কেন, সম্পাদনার শাসন এড়িয়ে কোনও বই প্রকাশিত হয় না। লেখকরা কিন্তু সেটা মেনেও নেন। তাঁদের জানিয়েই সমস্তটা হচ্ছে। বাংলা প্রকাশনা জগতে সেটা একেবারেই নেই। সে যাই হোক, প্রকাশনার তিনটে গুরুত্বপূর্ণ ইনপুটের মধ্যে প্রিন্টিং এবং পেপার ইনপুটটা আমি জানতাম। বাকি রইল এডিটোরিয়াল ইনপুট। ভাবলাম, সেটা কাজ করতে করতে রপ্ত করে নেওয়া যাবে। প্রয়োজন হলে অন্যের সহায়তাও নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু অন্য দু’টি বিষয় সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান না থাকলে, কাজ করা খুব মুশকিল। ফলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। সেটা ছিল ১৯৭৫ সাল।
প্র: নতুন কার্যভার গ্রহণ করার পরের সময়টা কেমন ছিল?
উ: আমি শিশু সাহিত্য সংসদে যোগ দেওয়ার পরে, সেবার শুরু হল কলকাতা বইমেলা। গিল্ড শুরু করল। গিল্ড হয়েছিল ১৯৭৫ সালে।১৯৭৬ সালের মার্চ মাসে বইমেলা শুরু হল। তাতে শিশু সাহিত্য সংসদ যোগদান করল। আমার বাবার একটা মেম্বারশিপ ছিল গিল্ড-এ।অনেক প্রবীণ প্রকাশক তখন বইমেলাকে একটু হেলাফেলা করতেন— খোলা মাঠে বই সাজিয়ে একটা মেলা বসবে, সেটা আবার কীরকম হবে! প্রথমবার বইমেলায় ভিড় তেমন হয়নি। কিন্তু আমি এর গুরুত্বটা অনুভব করলাম। তাই আমিও এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করলাম। তখন যেহেতু শিশু সাহিত্য সংসদের দায়িত্বে এসেছি, ফলে আমি যুক্ত হয়ে পড়লাম। ১৯৭৭ সাল থেকেই আমি গিল্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়লাম। বাবা তখন গিল্ডের সদস্যপদ ছেড়ে দিলেন, আমি মেম্বার হয়ে গেলাম। সেই সময় বাংলা প্রকাশনা জগতে বিক্রিবাটা একটু কম হচ্ছিল। এই বইমেলা একটা রাস্তা খুলে দিল। এর আগে পাঠক হয় বিজ্ঞাপন দেখতেন, নয়তো কলেজ স্ট্রিট পাড়ায় এসে দেখতেন নতুন কী বই বেরিয়েছে। কিন্তু বইমেলায় একই জায়গায় বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার বই দেখতে পাওয়ার সুযোগ পেলেন পাঠক। এই সুযোগটা প্রকাশনা জগৎকেও অনেকটা এগিয়ে দিল। আগে বই বেরোত অক্ষয় তৃতীয়া আর পয়লা বৈশাখে। এখনও বেরোয়। কিন্তু তার সিংহভাগটা বেরোয় বইমেলার প্রাক্কালে।বইমেলার সঙ্গে শিশু সাহিত্য সংসদ প্রথম থেকে জড়িয়ে পড়েছিল বলে তাদেরও কিন্তু বিশেষ লাভ হয়েছিল। আমি শিশু সাহিত্য সংসদে আসার পরে প্রিন্টিংয়ে স্পেশ্যাল স্ক্রিনের ব্যবহার শুরু করলাম, যেটা তার আগে খুব-একটা ছিল না। তাতে দুটো কালারের বইকেই আরও দৃষ্টিনন্দন করে তোলা সম্ভব হল। হোয়াইট স্পেস ওপেনিংয়ের মধ্যেই কালারের ভেরিয়েশন হত। যার ফলে অনেক অন্যরকমভাবে বইপত্র প্রকাশ করা গেল। সেটা আমাদের বিক্রিবাটা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। ওইসময় থেকে আমরা প্রাইমারি লেভেলের বইয়ের দিকে, বেসিক বইয়ের দিকে ঝুঁকেছিলাম। কারণ, আস্তে আস্তে দেখছি যে, শিশুসাহিত্যের লেখক আর তৈরি হচ্ছেন না। শিশুসাহিত্য বলতে আমরা যেটা বুঝি— বারো বছর বয়স অবধি বাচ্চাদের জন্য সাহিত্য— সেটার অভাব বোধ হচ্ছে। টিনএজারদের জন্য লেখা হচ্ছে... ভূতের গল্প, অ্যাডভেঞ্চার ইত্যাদি... কিন্তু একদম ছোটদের লেখা কিন্তু সুনির্মল বসু, লীলা মজুমদার পর্যন্ত এসে হারিয়ে গেল। কয়েকজন লিখছেন, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে লিখছেন না। ফলে তিন বছর থেকে আঠারো-উনিশ বছর পর্যন্ত সবটাই ছোটদের লেখা হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু সেটা তো ঠিক নয়। একটা শিশুসাহিত্য, একটা কিশোরসাহিত্য। দুটোর মধ্যে অনেকটা ফারাক। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, লীলা মজুমদার, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ছোটদের গল্পগুলো বাচ্চাদের কাছে খুব প্রিয়, সুখশ্রাব্য... সেই বয়সে তারা তো পড়তে শেখে না। বাবা-মা কিংবা ঠাকুরমা-ঠাকুরদার কাছে সেইসব গল্প শুনত ছোটরা। দু’পক্ষই আনন্দ লাভ করতেন। তখন তো আর সব মায়েরা কাজে বেরোতেন না... এত ফোনের উপদ্রব ছিল না, টেলিভিশনের রমরমাও ছিল না। আজকালকার শিশুরা এটার অভাব বোধ করে। সেইসময় কল্পনার জগৎটা অনেক অন্যরকম ছিল। এখন টিভি-র দৌলতে কল্পনার জগৎ চোখের সামনে এসে পড়ায়, ছোটরা অন্যরকম চিন্তাভাবনা করতে পারছে না। আইকিউ ভাল হচ্ছে, সবই ভাল হচ্ছে এখনকার বাচ্চাদের, কিন্তু কল্পনার জগৎটা হারিয়ে যাচ্ছে। অবসর সময়ে বাংলা বই পাঠ করব— এই ভাবনাটাও প্রায় নেই। কাজের চাপে বাবা-মায়েরাও তো আজকাল বাচ্চাদের সঙ্গে খুব-একটা সময় কাটাতে পারছেন না। ফলে এই দিকগুলো ঠিকমতো বিকশিত হচ্ছে না।
প্র: শিশুসাহিত্য লেখকের যেমন অভাব বোধ হচ্ছে, তেমন শিশুপাঠকের সংখ্যাও তো ক্রমহ্রাসমান!
উ: শিশুপাঠক তো নেই! স্কুলের পড়াশোনা করতে করতে তারা অন্য কোনও কিছু করার সময় পাচ্ছে কোথায়? খেলারই সময় পায় না ছোটরা।যেটুকু যা পাওয়া যায়, সেটাও ক্রিকেট কিংবা টেনিস কোচিংয়ে কেটে যায়। কেননা, এগুলো অর্থকরী। সেটা ভাবা যে খারাপ কিছু তা বলব না, কিন্তু প্রতিভাজাত বিষয়গুলো ইদানীং আর দেখা যাচ্ছে না।
প্র: এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। শিশু সাহিত্য সংসদ ছোটদের প্রচুর সুচিত্রিত রঙিন বই উপহার দিয়েছে। এইসব বইয়ের ইলাস্ট্রেশন দেখে চোখ ফেরানো দায়! সে-প্রসঙ্গে যদি কিছু বলেন...
উ: ছোটদের বইয়ের ছবি আঁকতেন যাঁরা, তাঁদের বাদ দিয়ে শিশু সাহিত্য সংসদের কথা ভাবাই যায় না। বুক ইলাস্ট্রেশনের কাজে বাবার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী, প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ দত্ত, সূর্য রায়, সমর দে। পরবর্তীকালে তাপস দত্ত, সুদীপ্ত বসু, দেবব্রত ঘোষ, অলয় ঘোষাল, গৌতম চট্টোপাধ্যায় উল্লেখযোগ্য। এঁরা ছোটদের জন্যই ছবি আঁকতেন। এঁদের সান্নিধ্য পাওয়ার ফলে বাবা অনেক এক্সপেরিমেন্টাল কাজকর্ম করতে পেরেছেন। ছবিতে পৃথিবী নামে একটা বই বেরিয়েছিল ১৯৫৮ সালে। বইটির দু’টি ভাগে পৃথিবী কীভাবে সৃষ্টি হল এবং কীভাবে মানুষের উদ্ভব হল, তা এত সুন্দরভাবে পিক্টোরিয়ালি প্রেজ়েন্ট করা হয়েছিল! বাংলা প্রকাশনার জগতে এই ধরনের বই চার কালারে সেইসময় ছিল না। ছবিতে পৃথিবী (প্রস্তর যুগ) সুন্দর ছাপা এবং প্রকাশনার জন্য ভারত সরকারের পুরস্কার পেয়েছিল। এ ছাড়াও আমাদের অন্য অনেক বই পুরস্কৃত হয়েছে নানা সময়ে। প্রসঙ্গত বলি, ছোটদের বই দৃষ্টিনন্দন করে তোলার নেপথ্য-শিল্পী যাঁরা, সেই ইলাস্ট্রেটরদের বাবা অত্যন্ত সম্মান করতেন। এবং বাবা-ই প্রথম, যিনি লেখকের সঙ্গে আর্টিস্টকে রয়্যালটি দেওয়া শুরু করলেন। আজও আমাদের সংস্থা আর্টিস্টদের রয়্যালটি দেয়।
প্র: এবার একটু সাহিত্য সংসদের কথায় আসি। সাহিত্য সংসদ বলতেই প্রথমে মাথায় আসে অভিধানের কথা। সংসদ বাংলা অভিধান, ইংরেজি-বাংলা অভিধান, চরিতাভিধান, সমার্থ শব্দকোষ— বাংলা সাহিত্যচর্চায় এইসব অভিধানগ্রন্থের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে বলতে হয় সংসদ বাংলা অভিধানের কথা...
উ: সাহিত্য সংসদের অভিধান প্রকাশিত হওয়ার আগে বহু অভিধান প্রকাশিত হয়েছিল। যেমন, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, চারুচন্দ্র গুহর অভিধান সে সময় বাজারে প্রচলিত ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাবা দেখলেন, এগুলো সবই যেহেতু ব্যক্তিমানুষের সৃষ্টি, তার কপিরাইটের ব্যাপার থাকে। তাই পরবর্তীকালে কে পরিমার্জনা করবেন সেটা নিয়ে একটা সমস্যা তৈরি হয়।
প্র: এই পরিমার্জনার অভাবেই বোধ করি, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিধান খানিক প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে।
উ: হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিধানের মূল জায়গাটা ব্যাকরণগত। আর জ্ঞানেন্দ্রমোহনের অভিধানে শব্দের ব্যবহারিক দিকটি গুরুত্ব পেয়েছে।দুটো সম্পূর্ণ আলাদা। যে-কারণে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিধানে ‘অভিধান’ শব্দটি নেই— বঙ্গীয় শব্দকোষ। অন্যদিকে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বইটির নাম বাঙ্গালা ভাষার অভিধান। তো যাই হোক, বাবা ঠিক করলেন অভিধান করবেন, লোককে দিয়ে করাবেন ঠিকই কিন্তু সংসদের নামে প্রকাশিত হবে। যার ফলে, সংসদ উইল টেক কেয়ার অফ দ্য রিভিশন। এটা হয়ে আসছে বলেই আমাদের ডিকশনারিগুলো পাঠকের কাছে এত গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। রাজশেখর বসুর চলন্তিকা-ও তো ছিল। কিন্তু রাজশেখর বসুর প্রয়াণের পর সেটার কোনও পরিমার্জনা হয়নি।কারণ, ওই প্রজ্ঞা কারও নেই। এই যে প্রজ্ঞার অধোগতি, এটাও কিন্তু বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তার কারণ। অভিধান কিন্তু লিটারারি পার্সনদের দিয়ে লেখানো খুব মুশকিল। অভিধান নির্মাণে যুক্তির একটা বড় অবদান থাকে। রাজশেখর বসু ছিলেন একজন সায়েন্টিস্ট। তাঁর যুক্তিবাদী সত্তা অভিধান রচনার সময় প্রখর ছিল। যে-কারণেই চলন্তিকা-র মতো একটা অভিধান তৈরি করতে পেরেছেন। সংসদের অভিধানের যিনি সংকলক, শৈলেন্দ্র বিশ্বাস, তিনিও কিন্তু ওই একই মানসিকতা থেকেই কাজটা করেছিলেন। অভিধান রচনার একটা শৈলী আছে। লেক্সিকোগ্রাফি হচ্ছে অভিধানের মূল কথা। লেক্সিকোগ্রাফার না থাকলে ডিকশনারি করা খুব মুশকিল। শৈলেনবাবু ছিলেন একজন লেক্সিকোগ্রাফার। নির্দিষ্ট শব্দের ব্যাখ্যায় সঠিক শব্দচয়ন, ভাষাব্যবহার এবং পরিমিত বিন্যাস— এই জায়গাগুলো সম্পর্কে শৈলেনবাবু অত্যন্ত সচেতন ছিলেন।
প্র: ঠিক তাই... অভিধান বিষয়টা হয়তো খানিক নীরস, কিন্তু সেটাকে যুগোপযোগী করে তোলাও তো একটা কঠিন কাজ!
উ: হ্যাঁ, একেবারেই তাই। সংসদের অভিধানকে পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার অন্যতম কান্ডারি ছিলেন শৈলেনবাবু। সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত এবং শশিভূষণ দাশগুপ্ত বিভিন্ন জায়গায় শৈলেন্দ্র বিশ্বাসের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এক স্মৃতিচারণে সুবোধবাবু লিখছেন, ‘কম্পোজিটর, ম্যানেজার, শিশুসাহিত্যে নতুন পথের উদ্ভাবক মহেন্দ্রনাথ দত্ত অনেক কাজ করিয়াছেন, কিন্তু তাঁহার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার শৈলেন্দ্র বিশ্বাস। এই বিচিত্রবুদ্ধি খেয়ালী লোকটি অল্পবয়সে কিছু লেখাপড়া করিয়া দেশসেবায় রত হইয়াছিলেন, ফরোয়ার্ড ব্লকে যোগদান করিয়াছিলেন, পরে অনার্স সহ বি.এ. ও এম.এ. পাশ করিয়াছিলেন। মিলিটারিতে কাজ লইয়াছিলেন এবং অন্যান্য অনেক কাজের মধ্যে এক সময় একটা প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করিয়াছিলেন যাহারা অভিধান প্রকাশ করে। আমাদের দেশে ইংরেজির বহুল প্রচলন আছে, কিন্তু অধিকাংশ অভিধানই ওয়ার্ডবুক। আমাদের আমলে স্কুলে ব্যাকরণের সঙ্গে ওয়ার্ডবুকও পাঠ্য হইত। শৈলেন্দ্র বিশ্বাস খেয়ালী লোক, কিন্তু তাঁহার মধ্যে প্রকৃত আভিধানিক চেতনা ছিল। ইংরেজি সাহিত্য খুব সম্পদশালী ও প্রগতিশীল এবং নানা দেশে ইহা ব্যবহৃত হয় বলিয়া এই ভাষার শব্দসমূহের প্রয়োগবৈচিত্র্য আয়ত্তে আনা খুব শ্রমসাধ্য ব্যাপার। এই শ্রমও সেই লোকের পক্ষেই সম্ভব শব্দের অর্থবৈচিত্র্যের প্রতি যাঁহার সহজাত অন্তর্দৃষ্টি আছে। শৈলেন্দ্র বিশ্বাসের এই সহজাত শক্তি ছিল এবং মহেন্দ্রনাথ দত্তও সহজাত অন্তর্দৃষ্টির বলেই ইহা আবিষ্কার করেন।’ বাবা এইসব প্রাজ্ঞ ব্যক্তির সাহচর্য পেয়েছিলেন বলেই অভিধান প্রকাশ করতে পারলেন।
প্র: সংসদের আরও একটি প্রকাশনার কথা বলতেই হয়— সমার্থ শব্দকোষ (১৯৮৭)। এটাও তো একটা উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
উ: এই ধরনের বই এর আগে বাংলা অভিধানজগতে ছিল না। অশোক মুখোপাধ্যায় একজন ইঞ্জিনিয়ার। আমি আগেই বলেছি, সাহিত্যিকদের দিয়ে অভিধান হয় না। যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির অভিধানও খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিনিও কিন্তু সাহিত্যের লোক ছিলেন না। এই যে যুক্তি দিয়ে বিচার করা, কোনটা কখন বলব, কীভাবে বলব— কেউ কিছু মনে করবেন কি না জানি না— সাহিত্যিকদের চেয়ে এঁরা কিন্তু ভাল বুঝতে পারেন। সমস্ত কিছুর মধ্যেই একটা পরিধির ব্যাপার থাকে। একজন সাহিত্যিকের প্রবণতাই থাকে অনেকখানি এক্সপ্লেন করা। কিন্তু কত সংক্ষেপে কতখানি বলা যায়, সেটাই হচ্ছে অভিধানকারকের কৌশল। এই সমার্থ শব্দকোষ এক যুগান্তকারী কাজ। এই ধরনের কাজ পরবর্তীকালে আর কেউ করতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। অশোক মুখোপাধ্যায় যখন সমার্থ শব্দকোষ প্রকাশের উদ্দেশ্যে আমার কাছে আসেন, সেটা ১৯৮৩ সাল। আমার কাছেও সেটা একটা পরীক্ষা ছিল। আমি কিন্তু আমার পিতৃদেবকে বিষয়টা জানাইনি। এই কাজটা যখন করছি... বেশ কিছুদিন পরে ১৯৮৫ সালে একটি ছেলে আমার কাছে আসে। ছেলেটি জানায়, সে ফোটোটাইপ সেটিং আরম্ভ করেছে। যেটা আনন্দবাজারে তখন চালু। তার মাঝখানে এই সমার্থ শব্দকোষ প্রায় পাঁচ-ছয় ফর্মা ছাপা হয়ে গিয়েছিল লাইনোটাইপে। আমি ছেলেটিকে একটা ফর্মা কম্পোজ় করতে বললাম। দেখলাম, ফোটোটাইপ সেটিং-এ ষোলো পাতায় দেড় পাতা কমে গেল। তখন আমি স্থির করলাম এই বইটাকে ফোটোটাইপ সেটিংয়ে করব। তখন কিন্তু পেজ মেকআপের কোনও সুযোগ ছিল না। সবই স্ট্রিপে বেরোত। মনে পড়ে, প্রথম সংস্করণের চারশো কুড়ি পাতা আমি পেস্ট করেছিলাম। বাংলা প্রকাশনা জগতে ফোটোটাইপ সেটিংয়ে করা এটি প্রথম বই। এবং আরও একটা বিষয় উল্লেখযোগ্য, বইটির ইনডেক্স ছিল পাঁচ কলামের। এটাও একটা ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। সে কারণেই চারশো কুড়ি পাতার মধ্যে বইটি করা সম্ভব হয়েছিল। বইটি ছাপা হয়েছিল সুপার প্রিন্ট কাগজে। এই কাগজ সে সময় বাজারে নতুন এসেছে। আর্ট পেপারের পরেই স্থান ছিল সুপার প্রিন্ট পেপারের। তখন অনেকেই জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই বইটা করলেন, এটা চলবে? পাঁচ হাজার কপি ছাপিয়েছিলাম বইটা। সেটা অনেককেই বিস্মিত করেছিল।বইটা যখন প্রথম হাতে এল, আমি বাবার কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। উনি উলটেপালটে দেখে একটা কথাই বলেছিলেন, মনে হয় বইটা চলবে।এটা আমার কাছে এক পরম প্রাপ্তি ছিল। তারপরেই পাঁচ মাসে পাঁচ হাজার কপি বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। এই বই আমি রিপ্রিন্ট করিনি তখন।আমার কাছে অনেক চিঠি এল নানা ত্রুটি-বিচ্যুতির উল্লেখ করে। আমি অশোকবাবুকে জানালাম। জানতে চাইলাম, কতদিনের মধ্যে উনি পরিমার্জনার কাজ সম্পন্ন করে দিতে পারবেন। অশোক মুখোপাধ্যায় জানালেন, বছর দু’য়েক লাগবে। তেমনটাই হল। ১৯৮৭ সালে বইটা বেরিয়েছিল। ঠিক তার দু’বছর পরে, ১৯৮৯ সালে বেরোল পরিমার্জিত সংস্করণ। একশো পাতা বেড়ে গেল। দ্বিতীয় সংস্করণ অনেকদিন পর্যন্ত চলেছে। তৃতীয় সংস্করণ এই বছর দুয়েক আগে বেরিয়েছে। যতদিন বাংলা ভাষা চর্চা থাকবে, এই বইটার প্রয়োজনীয়তা থাকবে।
প্র: সংসদ তো বেশ কিছু বিষয়ে অভিধান, পরিভাষা অভিধান প্রকাশ করেছে...
উ: হ্যাঁ, বিষয় অভিধান প্রকাশের ক্ষেত্রেও সংসদের একটা বড় সাফল্য আছে। ব্যাকরণ অভিধান, বাগ্‌ধারা অভিধান, বিজ্ঞান অভিধান, অর্থবিদ্যা অভিধান, যুক্তিবিজ্ঞান অভিধানের মতো এত রকমের অভিধান কিন্তু আর কোনও প্রকাশনা সংস্থা প্রকাশ করেনি। এর সঙ্গে আছে নানা পরিভাষা অভিধান— বিজ্ঞান পরিভাষা, উদ্ভিদবিজ্ঞানের পরিভাষা, কৃষিবিজ্ঞানের পরিভাষা, রসায়নবিজ্ঞানের পরিভাষা প্রভৃতি। এইসব অভিধান রূপ পেয়েছে রমাপ্রসাদ দাস, ধীরেশ ভট্টাচার্য, হীরেন রায়ের মতো প্রাজ্ঞ ব্যক্তির সান্নিধ্যে।
প্র: এই প্রসঙ্গে জানতে চাইব, আপনাদের অভিধানগুলি তো পরিমার্জিত, পরিবর্ধিত হয়েছে নানা সময়ে। তা এই পরিমার্জনার কাজটি কতটা কঠিন?
উ: ভীষণই কঠিন। যোগ্য লোক পাওয়া যায় না। এর জন্য যে-নিষ্ঠা দরকার, সেই নিষ্ঠার এখন বড় অভাব। কারেকশন করার লোকের অভাব নেই, সেটা একটা আলাদা বিষয়। কিন্তু সংকলনের কাজ করা সহজ কথা নয়। এর জন্য গভীর প্রজ্ঞা এবং নিরলস নিষ্ঠা প্রয়োজন। এখনও আমি কিছু মানুষের সান্নিধ্যে রয়েছি, যাঁরা অভিধানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। যেমন, সুভাষ ভট্টাচার্য, শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, আশীষ লাহিড়ী, প্রবীর গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো মানুষ এখনও এই কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে করছেন। ভবিষ্যতে কতটা কী করতে পারব জানি না। এই যে মানুষগুলো, এঁদের নাম উল্লেখ করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। এঁরা প্রকাশনার ক্ষেত্রে ভীষণভাবে যুক্তিগ্রাহ্য। এঁদের সহযোগিতা ব্যতীত প্রকাশনা জগতের উন্নতি সম্ভব নয়। প্রকাশক নিজে কিছু করেন না। তাঁর কাজ, বিভিন্ন মানুষকে একটা জায়গায় নিয়ে এসে, তাঁদের কাছ থেকে সবচেয়ে ভাল জিনিসটি বের করে পাঠকের সামনে পরিবেশন করা। যদি কেউ মনে করেন যে, সাহিত্য সংসদ কিংবা শিশু সাহিত্য সংসদ প্রকাশনার জগতে নিজের একটা জায়গা করে নিতে পেরেছে, তার কৃতিত্বের সিংহভাগ কিন্তু এই নেপথ্যে থাকা মানুষগুলির প্রাপ্য। আমার কাজ তো ক্যাটালিস্টের।
প্র: একজন প্রকাশক বাণিজ্যের দিকটি যেমন দেখবেন, তেমনই পাঠকের আগ্রহ এবং রুচি অনুযায়ী উৎকৃষ্ট বইয়ের সন্ধানও দেবেন। এই দুইয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাটা সবসময় সহজ হয় না। আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে?
উ: ইদানীং প্রকাশকরা একটু বেশি-ই বাণিজ্যমুখী। আগে প্রকাশনা সংস্থার একটা ‘ক্রিয়েটিভ মাইন্ড’ ছিল। এখন সেই ‘ক্রিয়েটিভনেস’ তেমন পাওয়া যায় না। বাজারে কোনটা চলবে সেটাই বড় হয়ে ওঠে। অধিকাংশ বইয়ের কোনও সার নেই... লোকে চাইছে, তাই চলছে। বলা ভাল, পাঠকের চাহিদাটাকে সেইরকম জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে প্রকাশনা সংস্থাগুলি। পরিশীলিত কিছু আমরা দিতে পারছি না। এখন পুজোসংখ্যা বেশি চলে না। একসময় পুজোসংখ্যা গোগ্রাসে গিলত লোকে! এখন পড়ে না।
প্র: প্রকাশনা সংস্থাগুলিকে বাণিজ্যের খাতিরে পাঠকের রুচির ওপর নির্ভর করে বইপত্রের কথা ভাবতে হচ্ছে আজকাল। সেক্ষেত্রে প্রকাশককে অনেক সময়ই তো আপস করতে হয়...
উ: না, আমি এটা মনে করি না। প্রকাশকের কাজ হচ্ছে পাঠকের রুচি তৈরি করা। সংসদ সেটা করতে পেরেছে বলেই আমি মনে করি। যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছবিতে রামায়ণ, ছবিতে মহাভারত। যেটা অন্যান্য প্রকাশনা সংস্থা আরও অনেক পরে ভেবেছে, সংসদ সেটা বহু আগেই রূপায়িত করেছিল। আমার পিতৃদেব পঁচিশ বছর পরে কী হবে তা চিন্তা করতে পারতেন। এই যেমন বলা যায় আমার শৈশব বইটির কথা। এটা আসলে ছিল একটা অ্যালবাম। ছোটদের জন্ম থেকে নানা মুহূর্তকে ধরে রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এটাও কিন্তু বাবার পরিকল্পনা ছিল। সমর দে-কে দিয়ে বাবা ছবি আঁকিয়েছিলেন। সে সময় বাংলা বইয়ের জগতে এমনটা কেউ ভাবতেই পারেননি। কাজেই রুচি তৈরি করা কিন্তু প্রকাশকের কাজ।
প্র: প্রকাশনায় যত্ন এবং নিষ্ঠার অভাবে বাংলা বাজারে বহু প্রকাশনা সংস্থা নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে। প্রভূত গ্রন্থ প্রকাশ করছে তারা, কিন্তু কোনওটাই পাঠককে তেমন স্পর্শ করছে না। প্রকাশনায় অযত্নের ছাপ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খুব স্পষ্ট। মুদ্রণপ্রমাদের কথাই ধরুন...
উ: মুদ্রণপ্রমাদের আসল কারণটা হচ্ছে, ভাল প্রুফ-রিডার নেই। নতুন প্রজন্মের যাঁরা প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের মধ্যে ক’জন দ্য শিকাগো ম্যানুয়াল অফ স্টাইল বইটার কথা জানেন? দিস ইজ় দ্য বাইবেল অফ পাবলিশিং। প্রকাশনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সবক’টি বিষয় এই বইয়ে ধরা আছে। এই বইয়ের কথা তো বেশির ভাগ মানুষই জানেন না। বাংলাতে এরকম কোনও বই হল না। বই এমন একটা জায়গা যেখানে সৃজনশীলতার প্রচুর সুযোগ আছে। কিন্তু কোথাও হয়তো আমরা সুযোগের সদ্‌ব্যবহার করতে পারছি না। তাই অগ্রগতি থমকে যাচ্ছে। কিছু খামতি থেকে যাচ্ছে।...

সূত্রঃ ‘বইয়ের দেশ’ এপ্রিল-মে ২০১৮ সংখ্যা।
সম্পূর্ণ সাক্ষাত্কারটি পড়ার জন্য Click করুন Read Or Download.
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সাক্ষাৎকার নারায়ণ দেবনাথ

সাক্ষাৎকার নারায়ণ দেবনাথ


আমার মতো কমিকস-শিল্পী শিশুসাহিত্যিকের মর্যাদা পেয়েছে, সেটা খুব বড় কথা।
সাক্ষাৎকার
নারায়ণ দেবনাথ

হাঁদা-ভোঁদা, বাঁটুল-দি-গ্রেট, নন্টে-ফন্টের স্রষ্টা হিসেবে তাঁর পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা অনস্বীকার্য। নিজের জীবন, অন্যান্য নানা কাজ-সৃষ্টি নিয়ে কথা বললেন নারায়ণ দেবনাথ। শুনলেন দেবাশীষ দেব।

দেবাশীষ দেব: আপনি তো নব্বই পেরোলেন, অথচ কয়েক বছর আগে পর্যন্ত নিয়মিত কমিকস স্ট্রিপ করে গিয়েছেন মাসে তিন-চারটে করে।একটানা পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চালিয়ে গিয়েছেন ‘হাঁদা ভোঁদা’, যেটা তো মনে হয় একটা বিশ্বরেকর্ড!

নারায়ণ দেবনাথ: হতে পারে, লোকের ভাল লেগেছে, তাই আমি করে গিয়েছি। তবে এখন আর ইচ্ছে হয় না, তেমন উৎসাহ পাই না।
প্র: আপনার জন্ম তো এই হাওড়ার বাড়িতেই।
উ: হ্যাঁ, তবে আমাদের দেশ হল ওপার বাংলায়। আমার বাবা-কাকারা এখানে চলে এসে বাড়ি বানান, গয়নার ব্যবসা শুরু করেন। কাকা ছিলেন নকশাদার, তাগার ওপর relief-এর কাজ করতেন, সোনার পাতের ওপর ঠুকে-ঠুকে লতাপাতা এইসব। কাকার কাজ দেখতে দেখতেই আমার ছবি আঁকার শুরু। ভাল ছবি-টবি পেলেই কপি করতাম। যারা দেখত বলত, ওকে আর্ট কলেজে দিয়ে দাও। সেটা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়। পাড়ায় একটা ছেলে ছিল, সে আমায় নিয়ে গিয়ে তুলল একটা প্রাইভেট কলেজে। প্রিন্সিপাল ছিলেন লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অফ আর্ট থেকে পাশ করা, নাম কী রায়চৌধুরী... আমাকে খুব ভালবাসতেন। তো, এইভাবে দু’বছর চলল। পরে আমাদের কলেজ ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজের সঙ্গে মিশে গেল। আমাকে কমার্শিয়াল আর্ট নিতে হয়েছিল। কারণ, সবাই বলত, ‘দূর, এরা তো বেরিয়ে খেতে পাবে না।’ পাশ করার পর দেখলাম সত্যিই ফাইন আর্টস-এ কিছুই নেই। তখন ওই লেবেল-টেবেল-এর কাজ আসতে লাগল। তবে সিনেমা স্লাইড-টা বেশি করতাম।

প্র: চাকরি-টাকরি কিছু পাননি?
উ: সারা জীবন কোথাও কোনও বাঁধা মাইনের চাকরি করিনি, শুধু কয়েকমাস গরাণহাটার ‘দাস ব্রাদার্স’ বলে একটা প্রেসে আলতা, সিঁদুরের প্যাকেটের ওপর লেটারিং করার কাজ ছাড়া। ওখানে আমার মতো আরও দু’-তিনজন লেটারিং আর্টিস্ট ছিল।
প্র: ইলাস্ট্রেশন করা শুরু হল কীভাবে?
উ: ওই সময় কালিদাস রায়ের অনুবাদ-কবিতার বই ‘ত্রিবেণী’-র একটা এডিশনের জন্য ছবি এঁকেছিলাম এবং সেই সূত্রেই আলাপ হল সুবোধ মজুমদারের সঙ্গে, উনি তখন দেব সাহিত্য কুটিরের সবকিছু দেখাশোনা করতেন, সেই থেকে যুক্ত হয়ে গেলাম এই সংস্থার সঙ্গে। সেটা ১৯৫০ সাল। তবে চাকরি করিনি। নিয়মিত ছোটদের ‘শুকতারা’ পত্রিকার প্রচ্ছদ আর ইলাস্ট্রেশন করা শুরু হল।
প্র: তখন তো ওখানে শিল্পী প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের খুব নামডাক।
উ: হ্যাঁ, আমাকে খুব ভালবাসতেন, থাকতেন হিন্দ সিনেমার উলটো দিকে, বাড়িতে প্রচুর পুরনো ইলাস্ট্রেটেড ইংলিশ ম্যাগাজ়িন ছিল, একজনের কাজ দেখিয়ে বলতেন ‘এই আর্টিস্ট-কে আমি দশ বছর ধরে ফলো করেছি।’ মনে আছে কী সাংঘাতিক রিয়্যালিস্টিক কাজ, স্টাইলটাকে ভাল না বেসে উপায় নেই। প্রতুলবাবুর কাজ দেখেও শিখেছি অনেক কিছু, তারপর নানারকম চেঞ্জ করতে করতে নিজের স্টাইল তৈরি হয়ে গেল। সুবোধবাবু বলতেন, কখনও মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলছে আঁকবেন না... অ্যাকশন দেবেন। একজন বর্শা ছুড়ছে, তার বডি পসচার কী হবে মাথায় রাখতাম। প্রতুলবাবু বলতেন, ফিগার আঁকতে গেলে মনে রাখবে শরীরের হাড়গোড়, অ্যানাটমি যার করায়ত্ত তার হিউম্যান ফিগার কখনও ভুল হবে না।
প্র: এর পর তো কমিকস শুরু করলেন।
উ: হ্যাঁ, ১৯৬১ সালে ‘আনন্দবাজার’-এ ছোটদের পাতায় আমি প্রথম ধারাবাহিক কমিকস করি ‘রবি ছবি’ নামে, রবীন্দ্রনাথের জীবনী, ওই বছর ওঁর শতবর্ষ চলছে। তখন ওই পাতাটা দেখতেন বিমল ঘোষ, মানে মৌমাছি। লেখাটা ওঁরই ছিল... এর পর বিবেকানন্দ, শিবাজি, এঁদের নিয়েও কমিকস করেছি। এর পর বিমলবাবু ছেড়ে দিলেন, আমার কাজও বন্ধ হয়ে গেল।
প্র: কিন্তু তার আগে থেকেই তো আপনি আনন্দবাজারের ছোটদের বিভাগ ‘আনন্দমেলা’-য় নিয়মিত ইলাস্ট্রেশন করতেন।
উ: হ্যাঁ, ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৭০-এর দশকের গোড়া অবধি করেছি।
প্র: এর মাঝেই তো ‘হাঁদা ভোঁদা’ শুরু হল...
উ: হ্যাঁ, ১৯৬২ সালে ‘শুকতারা’-তে। সুবোধবাবুর ছোটভাই ছিলেন ক্ষীরোদবাবু, উনিই প্রস্তাবটা দেন... ছোটদের জন্য বিদেশে তো কতরকমের কমিকস হয়, আপনি ওইরকম কিছু ভাবুন। আমি টারজ়ান ছাড়া তখনও বিশেষ কমিকস-টমিকস দেখিনি। ভাবলাম, চেষ্টা তো করা যাক। আমাদের বাড়ির চারদিকে ছোটরা সারা দিন যেসব বিদঘুটে কাণ্ডকারখানা করে বেড়াত, আমি সেগুলোকেই কাজে লাগিয়ে হাঁদা ভোঁদা শুরু করলাম... দুটো ছেলে, একজন বেশি ওপরচালাকি করতে গিয়ে নাজেহাল হচ্ছে, আর-একজন ভাল। দু’-চারটে সংখ্যা বেরোবার পর ওঁরাই বললেন, খুব ভাল রেসপন্স পাচ্ছি, আপনি চালিয়ে যান।
প্র: এর পরেই তো বাঁটুল...
উ: হ্যাঁ, বছর তিনেক পর ১৯৬৫-তে। ওঁরা বললেন, এবার একটা রঙিন কমিকস করুন, তবে একটু অন্যরকমের হওয়া চাই। বাড়ি ফিরে ভাবতে ভাবতে প্রথমে বাঁটুল নামটা মাথায় এসে গেল, তারপর নানারকম আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে ক্যারেক্টারটা তৈরি হল। গল্প বানালাম।ব্যস, চলতে লাগল। এর কিছুদিন পরেই ভারতের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের যুদ্ধ লাগল, তখন ক্ষীরোদবাবু চাইলেন এটা নিয়ে কিছু করতে।ভাবলাম, অন্য দেশকে নিয়ে মজা করা কি ঠিক হবে... উনি বললেন ‘না না, এখন তো যুদ্ধ’। তো, আমি দেখালাম ওরা ট্যাঙ্ক নিয়ে আসছে আর বাঁটুল সেই ট্যাঙ্ক তুলে নিয়ে ওদের তাড়া করেছে! তারপর প্লেন আসছে বোমা ফেলতে আর বাঁটুল অমনি ল্যাসো দিয়ে প্লেনগুলোকে মাটিতে নামিয়ে আনছে। এইসব ঘটনাগুলো যদিও আজগুবি, কিন্তু দেখলাম সবার খুব ভাল লেগে গেল। মনে হয় সাধারণ লোক নিজে যা পারে না, যদি দেখে তা অন্য কেউ ঘটাচ্ছে, তখন খুব মজা পায়।
প্র: ওই সময় থেকেই আপনি কমিকস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন?
উ: হ্যাঁ, এর পর ‘কিশোর ভারতী’ পত্রিকা থেকে দীনেশবাবু (চট্টোপাধ্যায়) ডেকে পাঠিয়ে বললেন, আমাদেরও কমিকস দিন। ১৯৬৯ সাল থেকে শুরু হল ‘নন্টে আর ফন্টে’। ওখানেও দুটো ছেলের কাণ্ডকারখানা, তবে ঠিক হাঁদা ভোঁদা নয়, একটু অন্য ধরনের মজা।...
(সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি পড়ার জন্য নিচের Read Or Download বাটনটি ক্লিক করুন।)
সূত্রঃ বইয়ের দেশ’ অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১৮ সংখ্যা
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সাক্ষাৎকার সংগ্রহ - গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস (উৎপল ভট্টাচার্য সম্পাদিত)

সাক্ষাৎকার সংগ্রহ - গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ( উৎপল ভট্টাচার্য সম্পাদিত)
সাক্ষাৎকার সংগ্রহ - গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
উৎপল ভট্টাচার্য সম্পাদিত
সাক্ষাৎকার সংগ্রহ - গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ( উৎপল ভট্টাচার্য সম্পাদিত)
পাঠকদের কাছে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস সবিশেষ পরিচিত। তার সম্পর্কে নতুন করে বলা বাহুল্যমাত্র। যদিও মার্কেসকে নিয়ে পাঠকদের কৌতূহলের শেষ নেই। সাংবাদিকতার দায়িত্ব সামলে মার্কেস যে পরিমাণের সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন তা সত্যি অভাবনীয়। পৃথিবীর যে-কোনও লেখকের কাছে তা অত্যন্ত গর্বের বিষয়। গল্প উপন্যাস আত্মজীবনী নাটক প্রবন্ধ চিত্রনাট্য লেখা ছাড়াও তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বহু সাময়িকপত্র, রেডিও-টেলিভিশন, সংবাদপত্রের প্রতিনিধি, লেখক এবং অনুবাদকের সঙ্গে আলাপচারিতায় অংশ নিয়েছেন, দিয়েছেন সাক্ষাৎকার। তাদের কাছে খুলে বলেছেন মনের কথা। স্বাভাবিকভাবে সেইসব কথােপকথন-এ এসেছে : সাহিত্য সংস্কৃতি, গল্প উপন্যাস, ‘দ্য অটম্ অফ দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’, ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচিউট’, ‘এরিন্দিরা’, ‘নাে ওয়ান রাইটস টু দ্য কর্নেল', ‘লিফ স্ট্রম’ গল্প উপন্যাসের প্রেক্ষাপট, লেখনীশৈলী, ফার, কাফকা, জয়েস, নেরুদা, হেমিংওয়ের প্রসঙ্গ। El Heraldo', Ei Espectador' সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতার প্রসঙ্গ। উৎসমুখে যাত্রার গুয়াজিরা, পানামা, আরাকাতাকা, কলম্বিয়া, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, কদলী অঞ্চল, মাকোন্দো, মদ্যপান, গণিকালয়, যুদ্ধবিগ্রহ, গণহত্যা, রাজনৈতিক মধ্যস্থতা। ফিদেল কাস্ত্রো, কিউবা, জাপাতিস্তা গেরিলা নেতা সাব কমান্ডার মার্কোস প্রসঙ্গ। ভ্রমণ, নস্ট্যালজিয়া, বন্ধুবান্ধব, কুসংস্কার, ম্যানিয়া, পছন্দ-অপছন্দ, ছেলেবেলা, ঠাকুরদা-ঠাকুমা মা ও বাবা, স্ত্রী মার্সেসিসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্য এবং তাদের প্রসঙ্গ। মার্কেসের জীবনে, লেখালেখির ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা—এমনই সব কথাবার্তা। ওইসব কথােপকথন থেকে মার্কেসের লেখার বৈশিষ্ট্য, লেখক-সত্তার মূল সুর, একটা অবয়ব পাঠকের সামনে ফুটে উঠে। আশা করি, তা থেকে পাঠক মার্কেসের সাহিত্যের স্বাদ পেতে সচেষ্ট হবেন। মার্কেসের অনেকগুলাে সাক্ষাৎকার থেকে বাছাই করে সংকলিত হয়েছে আটটি সাক্ষাৎকার। তার মধ্যে চারটি সাক্ষাৎকার প্লিনিও আপুলেয় মেনদোসা গৃহীত এবং সংকলিত ‘The Fragrance of Guava : Conversation with Gabriel Garcia Marquez’ গ্রন্থ থেকে নেয়া। কথােপকথনগুলাের বঙ্গানুবাদ কবিতীর্থ পত্রের বিভিন্ন সংখ্যায় মুদ্রিত হয়েছিল। এবারে সেগুলি গ্রন্থাকারে প্রকাশ পেল।

কলকাতা
উৎপল ভট্টাচার্য ডিসেম্বর
২০১৫
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

'দীপ্র মনীষা' আনিসুজ্জামান

'দীপ্র মনীষা' আনিসুজ্জামান 'দীপ্র মনীষা' আনিসুজ্জামান
বিদ্বৎসাধনার ক্ষেত্রে অতুলনীয় কীর্তি যার, যার কণ্ঠস্বরে বেজে ওঠে বাংলা ও বাঙালির বিবেক, একজীবনে যিনি পূর্ণতার সাধনায় মগ্ন, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চায় আমাদের ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের স্বরূপ অন্বেষণে আগুয়ান, জাতীয় জীবনের প্রতিটি সংকটসন্ধিক্ষণে এগিয়ে এসে যিনি অন্ধকারবাসী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছেন–দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে যার অনন্য ভূমিকা, বাংলাদেশ' নামক নতুন রাষ্ট্রের সংবিধানের অন্যতম রচয়িতা, নানা সামাজিক আন্দোলনের অগ্রণী পুরুষ—সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের সুপরিচিত ও দক্ষ সংগঠক...। তিনি আনিসুজ্জামান।
সময়ের বাতিঘর হিসেবে গণ্য মহীরুহসম এই মানুষটির নানা কীর্তির ওপর আলো ফেলার তাগিদে একটি দীর্ঘ ও বিষয়ভিত্তিক সাক্ষাৎকারের উদ্যোগ গ্রহণ করে অন্যদিন। আনিসুজ্জামানের মুখোমুখি হন চারজন স্বনামধন্য মানুষ। তারা হলেন শফি আহমেদ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, মফিদুল হক এবং বিশ্বজিৎ ঘোষ। আপন আলোয় উদ্ভাসিত, বাংলা ভাষাভাষী জনসমষ্টির এই সময়ের খ্যাতকীর্তি পণ্ডিত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে নানা কোণ আর প্রেক্ষিত থেকে দেখার ও বোঝার চেষ্টা করেছেন তারা। উদ্দেশ্য একজন আনিসুজ্জামানকে পরিপূর্ণভাবে পাঠকসমীপে তুলে ধরা।





This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সরদার ফজলুল করিমের সাথে জাহানারা ইমামের কথোপকথন

amarboi
সরদার ফজলুল করিমের সাথে জাহানারা ইমামের কথোপকথন

{জাহানারা ইমাম: জাহানারা ইমাম ( জন্ম: মে ৩, ১৯২৯ – মৃত্যু:জুন ২৬, ১৯৯৪) একজন বাংলাদেশী লেখিকা, শহীদ জননী, কথাসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ এবং একাত্তরের ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলনের নেত্রী। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ একাত্তরের দিনগুলি। একাত্তরে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র শফি ইমাম রুমী দেশের মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন এবং কয়েকটি সফল গেরিলা অপারেশনের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন এবং পরবর্তীতে নির্মমভাবে শহীদ হন। বিজয় লাভের পর রুমীর বন্ধুরা রুমীর মা জাহানারা ইমামকে সকল মুক্তিযোদ্ধার মা হিসেবে বরণ করে নেন৷ রুমীর শহীদ হওয়ার সূত্রেই তিনি শহীদ জননীর মযার্দায় ভূষিত হন৷

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি প্রতিষ্ঠা: ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের আমীর ঘোষণা করলে বাংলাদেশে জনবিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। বিক্ষোভের অংশ হিসাবে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। তিনি হন এর আহ্বায়ক। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়। সর্বসম্মতিক্রমে এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম। এই কমিটি ১৯৯২ সালে ২৬ মার্চ ’গণআদালত’ এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান করে। গণআদালাতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদন্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন।

গণআদালতের রায় প্রতিষ্ঠা: জাহানারা ইমাম গণআদালতের রায় কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান। এই গণআদালতের সদস্য ছিলেনঃ এডভোকেট গাজিউল হক, ডঃ আহমদ শরীফ, মাজহারুল ইসলাম, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, সুফিয়া কামাল, কবীর চৌধুরী, কলিম শরাফী, শওকত ওসমান, লেঃ কর্ণেল (অবঃ) কাজী নুরুজ্জামান, লেঃ কর্ণেল (অবঃ) আবু ওসমান চৌধুরী এবং ব্যারিস্টার শওকত আলী খান।

গণআদালত অনুষ্ঠিত হবার পর সরকার ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে অ-জামিনযোগ্য মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে হাইকোর্ট ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির জামিন মঞ্জুর করেন। এরপর লাখো জনতার পদযাত্রার মাধ্যমে জাহানারা ইমাম ১২ এপ্রিল ১৯৯২ সালে গণআদালতের রায় কার্যকর করার দাবিসংবলিত স্মারকলিপি নিয়ে জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পীকার, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে পেশ করেন। ১০০ জন সাংসদ গণআদালতের রায়ের পক্ষে সমর্থন ঘোষণা করেন। জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশব্যাপি গণস্বাক্ষর, গণসমাবেশ, মানববন্ধন, সংসদ যাত্রা, অবস্থান ধর্মঘট, মহাসমাবেশ ইত্যাদি কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। সরকার ৩০ জুন ১৯৯২ সালে সংসদে ৪ দফা চুক্তি করে। ২৮ মার্চ ১৯৯৩ সালে নির্মূল কমিটির সমাবেশে পুলিশ বাহিনী হামলা চালায় । পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হন জাহানারা ইমাম, এবং তাঁকে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও গঠিত হয় নির্মূল কমিটি এবং শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন। পত্র-পত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠলে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন জাহানারা ইমাম। গোলাম আযমসহ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলনকে সমর্থন দেয় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে।

২৬ মার্চ ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা দিবসে গণআদালত বার্ষিকীতে জাহানারা ইমামের নেত্রত্বে গণতদন্ত কমিটি ঘোষিত হয় এবং আরো আটজন যুদ্ধাপরাধীর নাম ঘোষণা করা হয়। এই ঘৃণ্য আটজন যুদ্ধাপরাধীর নামঃ আব্বাস আলী খান, মতিউর রহমান নিজামী, মোঃ কামরুজ্জামান, আবদুল আলীম, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, মওলানা আবদুল মান্নান, আনোয়ার জাহিদ এবং আব্দুল কাদের মোল্লা ।

২৬ মার্চ ১৯৯৪ সালে স্বাধীনতা দিবসে গণআদালতের ২য় বার্ষিকীতে গণতদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান কবি বেগম সুফিয়া কামাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সামনে রাজপথের বিশাল জনসমাবেশে জাহানারা ইমামের হাতে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্ট হস্তান্তর করেন। গণতদন্ত কমিশনের সদস্যরা হচ্ছেনঃ শওকত ওসমান, কে এম সোবহান, সালাহ উদ্দিন ইউসুফ, অনুপম সেন, দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, খান সারওয়ার মুরশিদ, শামসুর রাহমান, শফিক আহমেদ, আবদুল খালেক এবং সদরুদ্দিন। এই সমাবেশে আরো আটজন যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে তদন্ত অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়া হয়।

সরদার ফজলুল করিম: সরদার ফজলুল করিম (মে ১, ১৯২৫-জুন ১৫, ২০১৪) বাংলাদেশের বিশিষ্ট্য দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, প্রবন্ধকার। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক।

সরদার ফজলুল করিম ১৯২৫ সালের পহেলা মে বরিশালের আটিপাড়া গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন৷ বাবা খবিরউদ্দিন সরদার কৃষিকাজ করতেন৷ মা সফুরা বেগম ছিলেন গৃহিণী৷ তাঁরা দুই ভাই তিন বোন৷ সরদার ফজলুল করিমের শৈশবকাল কেটেছে গ্রামে৷ ম্যাট্রিকুলেশন শেষে তিনি প্রথম ঢাকা আসেন ১৯৪০ সালে। ঢাকায় ১৯৪২ সনে তিনি তার আই.এ. পাঠ সমাপ্ত করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৪৫ সনে দর্শনশাস্ত্রে অনার্স ও ১৯৪৬ সনে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনশাস্ত্রে শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীতে তার সাম্যবাদী বামপন্থী সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত থাকার পর্যায়ে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিগৃহীত হন। রাজবন্দি হিসেবে দীর্ঘ ১১ বৎসর বিভিন্ন পর্যায়ে কারাজীবন যাপন করেন। জেলে থাকা অবস্থাতেই ১৯৫৪ সনে তিনি পাকিস্তান সংবিধান সভার সদস্য হিসেবে কাজ করেন। পরে ১৯৬৩ থেকে ‘৭১ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমির সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি পাকিস্তান হানাদারবাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হন। পরবর্তিতে তিনি আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭২ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত শিক্ষক হিসেবে শিক্ষাদান শুরু করেন। তিনি ১৫ জুন, ২০১৪ তারিখে ঢাকার শমরিতা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়মারা যান৷}

সরদার ফজলুল করিম: আপনার দেশ কোথায়?

জাহানারা ইমাম: যে গ্রামে জন্মেছিলাম, সে গ্রামের নাম সুন্দরপুর। আর সেটা তখন মুর্শিদাবাদ জেলায় ছিল। আর তখন তো ব্রিটিশ ইন্ডিয়া, ১৯২৯ সাল। আমার বাবার নাম সৈয়দ আবদুল আলী, মা হামিদা বেগম। তাঁরা দুজনেই এখন প্রয়াত। আমার বাবা সাব-ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন, আর আমার মা গৃহবধূ ছিলেন। আমরা সাত ভাইবোন ছিলাম। ঘন ঘন জন্ম হওয়ায় আমাদের ভাইবোনদের পরস্পরের মধ্যে বয়সের তফাত খুব একটা বেশি ছিল না।

সরদার: ভাইবোনদের কথা বলছিলেন, এটা একটু বলুন

জাহানারা: আমরা সাত ভাইবোনের মধ্যে আমিই সবচেয়ে বড়। অবশ্য আমার আগে আরেকটি বোন হয়েছিল। সে মারা যায়। তারপর আমি হই। সে জন্য আমার খুব আদর ছিল। আমি অনেক বেশি আদর পেয়েছি। যেহেতু আমার বড় বোন এক বছর বয়সে মারা যায়। সেটা একটা কারণ বলা যেতে পারে। তারপর আমার এক ভাই হয়। তারপর আমার আবার পরপর তিন বোন হয়। তিন বোনের পর আরও দুই ভাই হয়। এদের মধ্যে আমাদের বড় ভাইটি মারা যায়। ৬৪ সালে একটা অ্যাকসিডেন্টে মারা যায়।

সরদার: আপনারা মুর্শিদাবাদ থেকে ঢাকায় কবে এলেন?

জাহানারা: ১৯৪৭ সালে যখন দেশ ভাগ হয় তখন আমার আব্বাজান রংপুরে পোস্টেড ছিলেন। তার আগে সবাইকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কে কোথায় অপশন দেবে। আমার আমার আব্বাজান পাকিস্তান অপশন দিয়েছিলেন। তখন আমরা জানতাম যে মুর্শিদাবাদ জেলা পাকিস্তানে পড়বে। পাকিস্তান মানে পূর্ব পাকিস্তান। তবু যা হোক, আমরা যে সময়ে বিশ্বাস করতাম যে আমাদের একটা পৃথক আবাসভূমি হলে আমরা আরও একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারব। এই বিশ্বাস কিন্তু সেই সময় ছিল। সে জন্য আমার আব্বাজানও পূর্ব পাকিস্তানে অপশন দিয়েছিলেন। আমরা সেই সময় রংপুরে ছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ওই মুর্শিদাবাদ শেষ পর্যন্ত আর পূর্ব পাকিস্তানে যুক্ত হয়নি। অতএব ইন্ডিয়ায় থেকে যায়। তখন তার জন্য বিশেষ কোন অসুবিধা হয়নি। যেহেতু আমরা এমনিতে বছরে একবারের বেশি মুর্শিদাবাদে কখনো যেতাম না। আর আমরা সব সময় আব্বা যেখানে যেখানে চাকরি করতেন সেখানেই থাকতাম। আর আমার দাদাজান আর দাদিজান মারা যাওয়ার পরে আমাদের দেশে যাওয়া আরও কমে গিয়েছিল।

সরদার: আপনার স্কুলজীবন কী বাবার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় কেটেছে? না, নির্দিষ্ট কোনো একটা জায়গায় স্কুলজীবন কেটেছে?

জাহানারা: না। স্কুলজীবন আমার বাবার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় কেটেছে। তিনি প্রথম দিকে ওই মফস্বল টাউনে পোস্টেড হতেন। তিনি সাব-ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। কখনো সার্কেল অফিসার হিসেবে কখনো কোনো একটা রিভিনিউ অফিসার হিসেবে তাঁর এই পোস্টিংগুলো হতো। এবং সাধারণত একটা জায়গায় তিন বছর থাকার কথা। কিন্তু অনেক সময় দেড় বছর পর তিনি বদলি হয়ে যেতেন। এবং হয়তো এমন সময় বদলি হলেন, তখন সেটা জুলাই বা আগস্ট মাস। কোথাও হয়তো ক্লাস থ্রিতে পড়ছি, এমন সময় আরেক জায়গাতে বদলি হলেন, তখন আমাকে থ্রিতে ভর্তি না করে সেই জুলাই মাসে ক্লাস ফোরে বদলি করে দেওয়া হলো। তার কারণ, সেকালে যে মাস্টারমশাইরা বাসায় পড়াতেন, তাঁদের ধারণা ছিল যে আমি পড়াশোনায় খুব ভালো। আসলে ছোটবেলায় পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলাম। বড় হয়ে আমি ডাল হয়ে গেলাম।

সরদার: আপনি যে ম্যাট্রিক দিলেন, এটা কোত্থেকে?

জাহানারা: আমি ম্যাট্রিক দিলেন লালমনিরহাট থেকে। আমার আব্বাজান লালমনিরহাটে ছিলেন। আচ্ছা, আমি যেটা বলছিলাম সেটা একটু বলি। তা হলো, জুলাই মাসে আমাকে ক্লাস থ্রি থেকে ফোরে ভর্তি করা হলো, আগস্ট মাসে হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা হলো। আমি সেকেন্ড হয়ে গেলাম। তখন মাস্টারমশাই বললেন, এ তো পড়াশোনায় ভালো। থাক, ও ফোরেই থাক। তারপর ফোর-ফাইভ পড়লাম, সিক্সও পড়লাম। তারপর উনি এক গ্রামে বদলি হলেন; সেখানে মাসে মেয়েদের কোন হাইস্কুল নেই। তখন কী করব। মেয়েদের স্কুল তো নেই। ছেলেদের স্কুলেই আমাকে ভর্তি করা হলো। কিন্তু মাস্টারমশাই বললেন, ওর রোজ স্কুলে যাওয়ার দরকার নেই। ওর নামটা থাকল, বাড়িতে পড়বে। পরীক্ষার সময় গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে আসবে। সেভাবে আমি সেভেন পর্যন্ত পড়লাম। সেভেন পাস করার পর মাস্টারমশাই বললেন, এর কোন প্রয়োজন নেই। ওটা খামাখা রাখা হয়েছে সিলেবাসে। তখন নাইনের বই কিনে দিলেই তো হয়। অতএব আমি আর এইট পড়লাম না। আমি তো আর সেই সময় কিছু জানি না। বাবা যা বলেন, তারপর মাস্টারমশাইরা যা বললেন, তা-ই করতে হয়। তারপর সাইনের বই কিনে দিলেন। প্রাইভেটও পড়ি, মাস্টারমশাই পড়ান। যখন আমার ম্যাট্রিক দেওয়ার কথা, তখন আমার আব্বা লালমনিরহাটে বদলি হলেন। তখন কিন্তু এই লালমনিরহাটে ম্যাটিকের সেস্টার ছিল না। সেন্টার ছিল রংপুরে। সেই জন্যে আমার আব্বাজান পরীক্ষার আগে আমাকে নিয়ে ট্রেনে করে রংপুরে এলেন। রংপুরে তাঁর এক পরিচিত ভদ্রলোক ছিলেন, সেই বাড়িতে আমি আর আব্বাজান উঠলাম।

সরদার: এটা কি ’ ৪৪-৪৫ সাল?

জাহানারা: না। এটা ’৪২ সালে। ১৯৪২ সালে আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিই। আব্বার সঙ্গে রংপুরে এসে ওই বাসায় থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলাম। পরীক্ষা দিয়ে আমার আবার লালমনিরহাটে ফিরে গেলাম। কিন্তু ’৪২ সালের শেষের দিকে-ওই পরীক্ষার পর-তখন কিন্তু ওই যুদ্ধ ছিল। তো লালমনিরহাটে গোরাদের ছাউনি হলো। তখন সেখানকার যত অফিসার ছিলেন, সবাই তাদের ফ্যামিলি দেশের বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন। আমরাও আমাদের দেশের বাড়িতে সেই সুন্দরপুর গ্রামে চলে গেলাম।

সরদার: কোথায়? মুর্শিদাবাদ?

জাহানারা: মুর্শিদাবাদের সুন্দরপুর গ্রামে গিয়ে বেশ কয়েক মাস থাকলাম। ইতোমধ্যে আমার পরীক্ষার ফল বেরোল। দেখা গেল, আমি দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেছি। পরে আব্বাজান রংপুরে বদলি হলেন। কিন্তু রংপুরে যাওয়ার আগে আমরা আবার লালমনিরহাটে এলাম। মালসুদ্ধ জিনিসপত্র গুছিয়েটুছিয়ে শিফট করতে হবে তো, তাই। আব্বার একটা মন্তব্য আমার এখনো মনে আছে। আব্বাজান রেজাল্ট বের হওয়ার পর বললেন, ‘সেকেন্ড ডিভিশনে পাস করেছে; আমি আশা করেছিলাম ফার্স্ট ডিভিশন পাবে, তা সেকেন্ড ডিভিশন মন্দ কী। ভালোই তো পেয়েছে।’ আমার আব্বাজানের ওই রকম মানসিকতা ছিল। ছেলেমেদের কাছ থেকে খুব একটা বেশি কিছু ডিমান্ড করতেন না। ছেলেমেয়েরা যদি না পারে, মদ যদি ছোট হয়ে যায়, সে জন্য তিনি এভাবে বললেন। যা হোক, আমার আব্বা রংপুরে বদলি হলেন। রংপুরে যখন এলাম, তখন রংপুর কারমাইকেল কলেজে আমার আব্বা আমাকে ভর্তি করিয়ে দিলেন। কিন্তু ভর্তি হওয়ার আগে উনি খোঁজ ছিলেন পাড়ায় কে আছেন। উনি জানলেন যে সেখানে এক উকিল আছেন তাঁর নাম ছিল মোহাম্মদ আলী। তাঁর মেয়ে কলেজে যান। তখন তিনি আমাকে নিয়ে সেই বাড়িতে গেলেন। গিয়ে সব ব্যবস্থা করলেন। এই যে তাদের ছোট মেয়ে রেজিনা খাতুন, তিনি তখন ইংলিশে বিএ অনার্স পড়তেন। ওনার সঙ্গে আমি ঘোড়ার গাড়িতে করে যান, এটা আমার আব্বা ঠিক করে এলেন। তার পরদিন ঘোড়ার গাদিতে করে আমি ওই রেজিনা বুবুর সঙ্গে প্রথম দিন কলেজে গেলাম। তারপর আমাকে অন্য একটা ঘোড়ার গাড়ি ঠিক করে দেওয়া হলো। সেটায় করে আমি কলেজে পড়তে যাব, এ রকম ঠিক হলো।

সরদার: সেটা কোন সালে?

জাহানারা: ১৯৪২ সালের নভেম্বর মাসে।

সরদার: ’৪২-এর নভেম্বর মাসে ভারতবর্ষে তো সাংঘাতিক রাজনৈতিক আন্দোলন চলছিল।

জাহানারা: জি।

সরদার: ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলন, তারপর ‘কুইট ইন্ডিয়া’ কংগ্রেসের আন্দোলন, মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলনও কিছু কিছু জোর পাচ্ছিল। ওইগুলোর ধাক্কা কি আপনাদের কলেজে, আপনার জীবনে কিছু এসেছিল?

জাহানারা: আমার জীবনে অনেক এসেছিল। তার কারণ, আমার ছেলেবেলাটায় আমি একটু বইয়ের পোকা ছিলাম। আমার আব্বাও বইয়ের পোকা ছিলেন। সাব-ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের টাকাতে তাঁর কুলাত না। তিনি ওই বইপত্র কিনতে এত টাকাপয়সা খরচ করে ফেলতেন যে আমরা জীবনে কোনো দিন খাটে শুইনি। আমরা চৌকিতে শুয়েছি। আমাদের কোন ড্রেসিং টেবিল ছিল না। আমার মায়ের খুব শখ ছিল একটা আয়না-লাগানো আলমারি কেনার। কোনো দিন তা কেনার পয়সা আমার আব্বার হলো না। কিন্তু আব্বাজান সেকালে যতগুলো মাসিক পত্রিকা বের হতো-যেমন ভারতবর্ষ, বসুমতী, প্রবাসী, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মডার্ন রিভিউ আর দৈনিক আনন্দবাজার, অমৃতবাজার, স্টেটম্যান, তারপর মাসিক মোহাম্মদী যখন বেরোল তখন সেটাও রাখতেন। তারপর সওগাত যখন এলো-এতগুলো পত্রিকা উনি একা সাবস্কাইব করতেন। সজনীকান্ত দাসের সাপ্তাহিক শনিবারের চিঠিও উনি পড়তেন। আমি একেবারে বাচ্চা বয়স থেকে এই সব পড়ে পড়ে একেবারে পেকে ঝুনঝুন হয়ে গিয়েছিলাম।

সরদার: খুব প্রশংসনীয় সাংস্কৃতিক পরিবেশ। একটা মুসলিম পরিবারে এ রকম পাওয়া সাধারণ ব্যাপার না। তখন এটা নিয়মিত ব্যাপার ছিল না। এই যে সাম্প্রদায়িক আন্দোলন হচ্ছে তার কোনো ছায়াপাত তেমন তাঁর জীবনে হচ্ছিল না।

জাহানারা: না। উনি সব সময় চেষ্টা করতেন যে আমাদের যেন আধুনিক শিক্ষায় গড়ে তুলতে পারেন। সেকালের আধুনিক ভারত যে শিক্ষা লাভ করেছিল বা যে ইউরোপীয় রেনেসাঁ হয়েছিল, তার সারবস্তু তিনি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁকে বুর্জোয়া বলেন, যা-ই বলুন-ইউরোপীয় কালচারের দ্বারা তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি বইপত্র পড়তেন। একদিকে খুব অসাম্প্রদায়িক তো বটেই, তিনি পীর-ফকির একদম বিশ্বাস করতেন না। তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন, রোজা রাখতেন, কিন্তু কোন পীর-দরবেশে ওনার কোনো রকম বিশ্বাস ছিল না। উনি বলতেন, সৈয়দ হলেই যে খুব একটা বড় বংশের লোক হবে এমন কোনো কথা নেই। মানুষ তার নিজের যোগ্যতাবলে শ্রদ্ধা বা সম্মান অর্জন করে বা তাকে মানুষ হওয়ার জন্যে চেষ্টা করতে হয়। এই সব কথা উনি বলতেন। আমাদের নামের আগে উনি কোনো দিন সৈয়দ লাগাতে দেননি বা আমরা কোনো দিন ইচ্ছা করে দিইনি। উনি এমনিতে খুব নির্বিরোধী মানুষ ছিলেন। এই সব রাজনৈতিক আবহাওয়া উনি ঘরে বসে আলোচনা করতেন, কিন্তু নিজে কখনো কোন কিছুতে অংশ নেননি।

সরদার: উনি নিজে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নেননি বটে, কিন্তু ওনার ছেলেমেয়ে কেউ যদি জড়িত হয়ে পড়েন, তাহলে ওনার কী মনোভাব হতো?

জাহানারা: আমি জড়িয়ে পড়তে গিয়েছিলাম, কলেজে পড়ার সময়। আমাকে উনি জড়িয়ে পড়তে দেননি। খুব শক্ত হাতেই আমাকে উনি নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। আর একটা কথা, ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়া উনি রাখতেন। ক্লাস ফাইভ থেকে উনি বলতেন যে তুমি ইংরেজি খবরের কাগজগুলো বোঝে না-বোঝো, পড়বে। তাতে পড়তে পড়তে তোমার ইংরেজি জ্ঞান পরিষ্কার হবে। সেই জন্য পড়তাম। আর আমি কী করব, গল্পের যা পোকা ছিলা না না!

সরদার: তখন কি আপনি গল্প লিখতেন?

জাহানারা: আমার গল্প লেখার শুরুটা খুবই হাসির ব্যাপার। মানে আমার বয়স যখন ১২-১৩ বছর, না ১২-১৩ হয়নি, তখন আমি ছোটই, এই ১০-১১। আমি মোহাম্মদী, প্রবাসী, বসুমতী-এই সবের গল্প পড়তাম তো। আমার মনে হতো, সেই যে ছোটগল্পগুলো, সম্পূর্ণ করে না কেন? তখন আমি ভাবতাম, ভেবে একটা খাতা করলাম বেশ বড়। খাতা করে ওনাদের ছোটগল্পগুলো……।

সরদার: ওরা যেখানে শেষ করেছে…..।

জাহানারা: হ্যাঁ, অসম্পূর্ণ করে রেখেছে।

সরদার: আপনি সেখান থেকে শুরু করেছেন?

জাহানারা: আমি সেইগুলো সম্পূর্ণ করি। এইভাবে আমার হাতেখড়ি। বেগম জাহানারা চৌধুরী সেই সময় কলকাতায় সোসাইটি গার্ল। তিনি বর্ষবাণী বলে একটা বার্ষিকী বের করতেন। খুব হাই সোসাইটির মহিলা ছিলেন, খুব অভিজাত বংশ। আপনার ক্লাসের অনেক কথাবার্তা, তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের স্ক্যান্ডাল বা হইচই-এগুলো খবরের কাগজে বের হতো। কিন্তু তাঁকে আমি চিনেছিলাম ওই বর্ষবাণী বলে একটি বার্ষিকীর সম্পাদিকা হিসেবে। বর্ষবাণী আমার আব্বা আমাকে কিনে দিয়েছিলেন। ওইটা পড়ে তখন আমি খুব ইয়ে হই আরকি। উনি নাম লিখতেন জাহানারা চৌধুরী। আমার মনে হয়, তাঁর বাবার নাম ছিল চৌধুরী। আমি তো শুধু জাহানারা বেগম লিখি। আমি ভাবলাম, আমি বেগম জাহানারা আলী লিখব। উনি যদি বেগম জাহানারা চৌধুরী লেখেন, তাহলে আমি জাহানারা আলী লিখতে পারি। এইভাবে আমার হাতের লেখার খাতার মধ্যে আমি বেগম জাহানারা আলী লিখতে শুরু করি। খুব হাস্যকর ব্যাপার। তখন আমার বয়স খুব কম।

সরদার: আপনি কি কলকাতা ব্রেবোর্ন কলেজে গিয়েছিলেন?

জাহানারা: ওইখানে পড়েছি আমি। বিএ পড়েছি।

সরদার: এটা কোন সাল?

জাহানারা: এটা ’৪৩ থেকে’ ৪৫। ’৪২ সালে তো ম্যাট্রিক পাস করলাম। তারপর ’৪৩-৪৪ সালে আমি রংপুর কারমাইকেল কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়লাম। ইন্টারমিডিয়েট শেষ পরীক্ষার দিনে আমার খুব অসুখ করায় আমি সেই পরীক্ষাটা দিতে পারিনি। সে জন্য আমি কম্পার্টমেন্টাল পেয়েছিলাম। তাই পরের বছর শুধু একটা কম্পার্টমেন্টাল পরীক্ষা দিয়ে আমি আইএ পাস করি।

সরদার: এটা কি ফরটি ফাইভে?

জাহানারা: ফরটি ফাইভে। ’৪৫ থেকে আমি ব্রেবোর্ন কলেজে পড়ি। বিএ পড়ি তখন আরকি।

সরদার: তারপর ব্রেবোর্ন কলেজে বিএ শেষ করেছেন?

জাহানারা: হ্যাঁ, ওখানে বিএ শেষ করলাম। তারপর তখন ওই যে দেশভাগ এসে গেল। তারপর এই যে পাকিস্তান আন্দোলন, তারপর রশীদ আলী দিবস, আরও অনেক কিছু। ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে। সেই সময় হলো কি, রোজার মাসে দুই মাস কলেজ বন্ধ ছিল। আমি রংপুরে বাবার বাসায় চলে আসি। সেই জন্য ওই সময়টা কলকাতায় ছিলাম না আমি। তারপর কিন্তু আমার কলকাতায় যাওয়া হয়নি এই জন্যে যে দেশের পরিস্থিতি বুঝে যে যে যেখানকার, তার সেস্টার সেখানে হয়। আমার আব্বা চেষ্টা করে কলকাতা থেকে সেস্টার বদলে রংপুরে করে নিলেন। এর কারণ, উনি আমার আর পাঠাতে সাহস পেলেন না কলকাতায়।

সরদার: আপনি ঢাকায় আসার আগ পর্যন্ত কোনো ঘটনার কথা কি বিশেষভাবে মনে পড়ে?

জাহানারা: ছোটবেলায় আব্বা যেসব মফস্বল টাউনে ছিলেন, সেখানে আমরা থাকতাম। আমার দাদাজান যতদিন বেঁচে ছিলেন, তত দিন আমাদের ওই রোজার সময় দেশে যেতে হতো। রোজার ঈদ, তারপর একেবারে কোরবানি করে তবে আমরা আব্বার কাছে আবার যেতে পারতাম। ছোটবেলায় ওই যে আমরা কয়েক মাস করে গ্রামে থাকতাম, এতে গ্রামের জীবনের অপূর্ব স্মৃতি আমার মনে মধ্যে রয়েছে। গ্রামে যদি প্রতিবছর আমার যাওয়া না হতো, তাহলে আজকে আমার যে মানসিকতা আছে, এইটা সঠিকভাবে হয়তো গড়ে উঠত না। গ্রামে যাওয়ার একটা অভিজ্ঞতা প্রত্যেকের ছেলেবেলায় থাকা দরকার। ওই যে পুকুরে দাপাদাপি করে বেড়ানো; বৃষ্টি হয়েছে, মাথায় মাথালি দিয়ে কাদার মধ্যে ছপ ছপ করে বেড়ানো। কত গাছগাছালি, শীতকালে পিঠাপুলি, তারপর কত রকমের যে ছোট বাচ্চাদের আনন্দের উপকরণ গ্রামে থাকে, সেই যে দৌড়ে দৌড়ে মাঠের মধ্য দিয়ে বেড়ানো। শীতকালে যখন মটর-কলাই শক্ত হয়ে গেছে, গাছগুলো উঠে ফেলে দিচ্ছে জমি থেকে, তখন কিছু গাছ আমাদের বাচ্চাদের দেওয়া হতো। তখন আমরা করতাম কি, একটা সরু বাঁশের মধ্যে গাছগুলো উল্টো করে ঝুলিয়ে দিতাম। ঝুলিয়ে দিয়ে নিচে একটু আগুন ধরিয়ে দেওয়া হতো খড় দিয়ে। তাতে ওই মটর দানাগুলো একটু রোস্টেড হয়ে যেত। আমরা মাঠে বসে সেটা খেতাম। আমোদের হাতেমুখে কালি লেগে যেত। এই খাওয়াটকে বলা হতো হুড়া খাওয়া। একটা ছড়া ছিল, ‘হাতে কালি মুখে কালি, তবে জান যে হুড়া খেলি।’ এই একটা মহা আনন্দের ব্যাপার ছিল। যখন ধানের গাছ কোমর পর্যন্ত, তার মধ্যে আইন থাকত তো, আইল দিয়ে ছুটে ছুটে যাওয়া, দুই পাশ দিয়ে ধানের গাছগুলো গায়ে লাগছে-ধানের পাতা খুব ধার তো, হাতটাত কেটেও যেত। তখন আমি এই ধানের ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে ছুটে যাওয়ার যে একটা আনন্দ, সেটা পেয়েছি। গা-হাত-পা-যা-ই কাটুক, কিছু যায়-আসে না।

সরদার: আপনার যে এই মনোরম গল্প পড়া, আপনার তেমনি তো মনোরম হাতের লেখা। এই লেখার ব্যাপারটা-কবে ছাপা হতে শুরু করে?

জাহানারা: আমার আসলে ছোট বয়স থেকে লেখার ইচ্ছা থাকলেও ছাপানোর তাগিদ আমার মধ্যে খুব একটা কম ছিল। এবং ছাপা সত্যিকার অর্থে যদি বলতে হয়, ’৬৪ সালে আমার প্রথম বই ছাপা হয়।

সরদার: ঢাকাতে?

জাহানারা: ঢাকাতে। কিন্তু এর আগে দিলরুবা বলে একটা পত্রিকা ছিল। তার যে সম্পাদক, তাঁর নাম হলো আবদুল কাদের। তাঁর স্ত্রী ছিলেন দিলরুবা। সেই কালের প্রথম মহিলা ম্যাজিস্ট্রেট, মুসলমান মেয়েদের মধ্যে। তিনি অকালে মারা যান। তাঁর জন্য কাদের সাহেব এত কাতর হন-তাঁর স্ত্রী মারা যাওয়ায়-তখন তাঁর নাম দিয়ে তিনি একটা মাসিক পত্রিকা বের করেন। উনি আমার বাবার বন্ধু ছিলেন। উনি আমাকে প্রায়ই বলতেন, মাগো, তুমি একটু লেখো। তুমি গল্প লেখো আমার পত্রিকায়। কিন্তু আমার এত-কী বলব-আমার নিজের সংসার নিয়ে, আড্ডা নিয়ে, বেড়ানো নিয়ে, আমার ছোট বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে….।

সরদার: তখন তো আপনি ফ্যামিলি করছেন?

জাহানারা: হ্যাঁ, ফ্যামিলি হয়ে গেছে। এই সব করে আর লেখা হতো না। আর কাদের সাহেব দেখা হলে বলতেন, কই মা, আমাকে তুমি গল্প দিলে না। এই দেব, চাচা, দেব। এই করতে করতে আর লেখাই হয় না। তারপর আরও অনেকে আমাকে বলেন যে….।

সরদার: সেই সিক্সটিতে, সিক্সটি ফোরে আপনি তো দস্তরমতো সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মী হয়ে গেছেন।

জাহানারা: তা হয়েছি। কিন্তু লেখা যে আর হতো না। এই যে লেখাটা শেষ করে ছাপতে দেওয়া, এইটা আমার হতো না। তারপর এইটা হলো প্রথম-ওই ইউএস থেকে কবি হাবিবুর রহমান লরা ইংগলস ওয়াইন্ডারের বই অনুবাদ করতে দিলেন। আমি অনুবাদ করলাম। ঘাড়ের ওপর তাগাদা রেখে অনুবাদ করিয়ে ওনারা ছাপালেন। প্রথম বই হওয়ায় ওনারা খুব খুশি হলেন। অনুবাদ দেশে খুব খুশি।

সরদার: এটা আপনার একক অনুবাদ?

জাহানারা: একক। একক অনুবাদ।

সরদার: বইটার নাম কী?

জাহানারা: এইটা হলো ছয়টা বই। লরা ইংগলস ওয়াইন্ডারের লিটল হাউস অন দ্য প্রেইরি। ছয়টা বই। তার মধ্যে আমাকে একটা দিলেন। আরও দুই-তিনজনকে দুই-তিনটা বই দিলেন। চারজনে আমরা যখন করলাম, তখন উনি আমার অনুবাদটা দেশে এত খুশি হলেন যে আরেকটা বই আমাকে দিয়ে করালেন। আর তারপরে উনি কনরাড রিকটারের একটা বইও আমাকে দিয়ে অনুবাদ করালেন। তারপর ওই কবি হাবিবুর রহমান ভাইবোন নামের একটা প্রকাশনী সংস্থা করলেন। তাগাদা দিয়ে একটা ছোটগল্পের বই আর কিশোরদের উপন্যাস আমাকে দিয়ে লেখালেন। সেইগুলো একেবারে খুব যে অরিজিনাল তা বলব না। কিন্তু বিদেশি কোনো বাচ্চাদের গল্পের ছায়াটায়া ছিল। আমি দুটো লিখলাম, উনি ছাপিয়ে দিলেন। তারপর হলো কি, উনি মারা গেলেন। উনি অবশ্য অনেক পরে মারা যান। আমার আর লেখাটেখা বিশেষ হলো না। তারপর আমি এখন এই একাত্তরের পর থেকে বলতে গেলে লিখছি, মানে একাত্তরের পরে আমার জীবনে যা হলো, আমি তো কয়েক বছর খুবই শোকে বিহ্বল ছিলাম। তখন বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদাত চৌধুরী-সে আমার ছেলের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেছে-ফিরে এসে আমাকে আম্মা বলে ডাকে। সেই বলল, আম্মা, আপনি বিচিত্রায় কিছু লিখেন। কী লিখব কী লিখব-তখন ওই টেলিভিশন সমালোচনা… এমন কিছু না, কিন্তু আমাকে একটুখানি নিজেকে ভুলিয়ে রাখা, এনগেজ রাখা। তারপর আমি ’৭৪-এ আমেরিকায় গেলাম। ওখান থেকে আমি ‘প্রবাস থেকে বলছি’ নামে ছয় মাস ধরে ওই ভ্রমণকাহিনী বিচিত্রায় ধারাবাহিকভাবে লিখি।

সরদার: ’৬৪-৬৫ থেকে শুরু করে ’৭১ পর্যন্ত-এর মধ্যে যদি বিশেষ কোনো ঘটনা, বিশেষ ব্যাপার আপনার মনের মধ্যে এসে থাকে যে আপনি বলতে চান, একটু বলুন।

জাহানারা: তাহলে আরেকটু আগে থেকে বলতে হবে। ছোটবেলা থেকে তো আমার আব্বা এত বইপত্র রাখতেন, সেগুলো পড়তাম। তা ছাড়া আব্বার এক বন্ধু ছিলেন, নাম আবদুল ওয়াহেদ। তিনি ইনস্যুরেন্সের এজেন্ট ছিলেন। বই পড়তেন। এত ভালো ইংলিশ জানতেন! ছোটবেলায় তাঁর অনেক প্রভাব আমার ওপর পড়ে। উনি আমাকে বলতেন বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতের কথা, পৃথিবীর আরও বড় বড় নামকরা মহিলার কথা। ছোটবেলায় আমি পড়ালেখা করতে চাইতাম না। উনি আমাকে বলতেন যে লেখাপড়া শিখতে হবে, এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে। উনি অনেক কিছু আমাকে ভালোভাবে শিখিয়েছেন, মানে মোটিভেট করতেন আমাকে। তারপর স্কুল পর্যন্ত বই পড়েই সব জ্ঞান লাভ করি। এমনি তখন আমি মানবেন্দ্রনাথ রায়ের নাম পর্যন্ত জানতাম। স্বামী বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ ঠাকুর-এঁদের বইও পড়তাম। কিন্তু আমার কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ গড়ে ওঠেনি।

সরদার: কোনো রাজনৈতিক পার্টি আপনার কাছে আসত না?

জাহানারা:১৯৪২-এ যখন আমি কলেজে ভর্তি হলাম নভেম্বর মাসে, সেখানে যেসব মেয়েদের সঙ্গে আলাপ হলো, তাদের মধ্যে অঞ্জলি দাশগুপ্ত বলে একটি মেয়ে ছিল। সে কমিউনিস্ট পার্টির কাজকর্ম কিছু কিছু করত। তার সঙ্গে আমার সবচেয়ে বেশি ভাব হয়ে গেল এই জন্য যে আমার কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ না থাকলেও বইপত্র অনেক পড়েছি। আর ওই রকম মতাদর্শের জন্য ওর সঙ্গে আমার খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেল।

সরদার: আচ্ছা, ওই যে আপনি বলছিলেন, আরও একটু আগে যাই, ছোটকালের কথায়। আপনি বলছিলেন, যিনি আপনাকে নানা বইপত্র দিয়ে সাহায্য করতেন, সেটা না-হয় একটু পরে বলব। আমি বলছিলাম যে একাত্তরের আগের পর্যায়টা, যদি কিছু থাকে বলেন।

জাহানারা: আমি যাকে মোটকা চাচা বলতাম-সেই আবদুল ওয়াহেদ বা ওয়াহেদ আলী-তিনি খুব জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন, অনেক জ্ঞান দিয়েছেন পৃথিবী সম্পর্কে। আর আমার আব্বাজানের তো বইপত্র ছিলই। কিন্তু আমি কারমাইকেল কলেজে গিয়ে অঞ্জলি দাশগুপ্তের সঙ্গে যখন পরিচিত হলাম, তার সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো, তখন বাম রাজনীতির সঙ্গে আমার একটা অপ্রত্যক্ষ যোগাযোগ হতো। অপ্রত্যক্ষ মানে অঞ্জলি জাস্ট একজন কর্মী ছিল। আপনি জানেন যে প্রথম দিকে কর্মী থাকে, বাইরের কর্মী। আমাকে কিছু কিছু অনুবাদ করতে দিত। আর আমি ওসব শুনতাম; মার্কসিজম এবং অন্যান্য সহজ পাঠ্য যে বইগুলো আছে তা দিন, আমি সেগুলো পড়তাম। তারপর জনযুদ্ধ বলে একটা পত্রিকা বের হতো। সেই জনযুদ্ধ সে আমাকে পড়তে দিত। আব্বাজান একদিন বাড়িতে জনযুদ্ধ দেশে হঠাৎ চমকে গেলেন। সরকারি অফিসার তো-সেই জন্য। তিনি এমনিতে খুব একটা রাজভক্ত ব্রিটিশ অফিসার ছিলেন না। উনি কিন্তু জীবনে ওনার কোনো বসের সঙ্গে ঈদের দেখা করতে যাননি। আর এসব কারণে তাঁর প্রমোশনও হয়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি ওই অনুবাদ, জনযুদ্ধ দেখে আমাকে বললেন, এই সব তুমি কী করছ? তখন ওনার চোখের সামনে থেকে লুকিয়ে ফেললাম। ওনাকে আর দেখাই না, কিন্তু আমি পড়ি। অঞ্জলির সঙ্গে যোগাযোগ তো আছেই। অঞ্জলি আমাকে ছোট ছোট সব ম্যাগাজিন এনে দিয়ে বলে, ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করো এগুলো। সেই সময়ই আমার ওই কাজটা করতে ভালো লাগত। তবে যা হোক, অনুবাদও কিছু করেছি। আমি এখন বুঝতে পারি তখন সেসব অনুবাদ কিছুই হয়নি। তখন আমি মনে করতাম, আমি বোধ হয় খুব ভালো অনুবাদ করতে পারি। এই রকম সময়ে আমাদের আইএ পরীক্ষা হয়ে গেল। আইএ পরীক্ষার শেষ দিনে আমার খুব জ্বর উঠেছিল, যার জন্যে আমি পরীক্ষা দিতে পারিনি। তারপর আমি বিকোলাইটিস অসুখে ভুগি প্রায় এক-দেড় মাস। পরে আর আমার আব্বা আমাকে কলেজে যেতে দেননি। অঞ্জলি সঙ্গে আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

সরদার: একাত্তরের ব্যাপারটা তো আপনি-আমি সবাই জানি। আপনি নিজেও একাত্তরের দিনগুলি লিখলেন। সেভিন্টি ওয়ান পর্যন্ত সিক্সটি ফোর, সিক্সটি ফাইভ ধরেন। এই যে আপনার ছেলে রুমী, তখন তো সে কিশোর। সে এখানে নানা পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে।

জাহানারা: আমার যখন ওই কিশোরী বয়সে অঞ্জলির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, তার ফলে আমার সেই যে বই পড়া, এসবের যোগাযোগটাও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। সেই সময় আমার যাঁর সঙ্গে বিয়ে হয়, তারঁ সঙ্গে প্রথম আমার প্রেম হয়। আমার আব্বা-আম্মা জানতে পেরে একটা পানচিনি অনুষ্ঠান করে রাখার ব্যবস্থা করলেন। কথা হলো, দুজন পাস করলে পরে বিয়ে হবে। আমার স্বামীকে-আমার যত দূর মনে হয়-আমার আব্বা-আম্মা বলেছিলেন, আমি জানি না, আমার অনুমান-তাঁরা হয়তো বলেছিলেন, তুমি বোঝাও জাহানারাকে, এই সব রাজনীতি বইটই পড়া ভালো না। তখন আমি আবার মুকুল মেলা করতাম। ওই যে মুকুলের মহফিল-ওইটা। পাড়াতে ছেলেমেয়েদের নিয়ে মুকুলের মহফিল পরিচালনা করার জন্য বাগবান ভাই একবার রংপুরে গেলেন। আমরা একটা সম্মেলন করলাম। আব্বা ওই সব পছন্দ করতেন না। মা বলতেন, আহা, করছে করুক না। আমার স্বামীও চাইতেন না যে সভা-সমিতি বা ছেলেমেয়েদের নিয়ে দলবল এগুলো করি।

সরদার: তিনি চাইতেন না। আপনার পরবর্তী যে কাহিনী-আপনার হাজব্যন্ড তো আবার আপনাকে ভেতরে ভেতরে উৎসাহ দিতেন।

জাহানারা: বলা যেতে পারে যে এটাও তাঁর মধ্যে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে। তিনিও তো তখন ছাত্র ছিলেন এবং তাঁর বাবা তাঁকে কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করতেন। বলতেন, তুই কোনো দলে যাবি না। ছেলেদের সঙ্গে এই সব কোনো কিছু করবি না, লেখাপড়া কর। আর তাঁর তো মা ছিলেন না।

সরদার: এটা কোন সময়ের কথা বলছেন? আপনাদের দুজনের পরিচয় কখন হয়?

জাহানারা: আমাদের পরিচয় হয় রংপুর কারমাইকেল কলেজে। রংপুর কারমাইকেল কলেজে উনি আইএসসিতে ভর্তি হলেন। আর আমি আইএতে ভর্তি হলাম। একই বছরে ম্যাট্রিক পাস করেছি।

সরদার: ওঁর বাড়ি কোথায়?

জাহানারা: ওঁর বাড়ি রংপুরে। আমার আব্বা যে রেজিনা খাতুনের বাবার কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন ঘোড়ার গাড়িতে আমার যাওয়ার ব্যবস্থা করতে, সেই রেজিনার কনিষ্ঠ ভ্রাতাই হলো পরবর্তীকালে আমার স্বামী। তখন আমি জানতাম না যে এইটাই আমার শ্বশুরবাড়ি হবে। ওনার মা ছিলেন না। ওনার বাবা খুব শক্ত হাতে তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। লেখাপড়া আর বিকেলবেলা খেলা-এ ছাড়া আর কিছু করতে দিনে না।

সরদার: আপনার হাজব্যান্ডের বাবা কী করতেন?

জাহানারা: উনি তখন উকিল ছিলেন। মোহাম্মদ আলী ওনার নাম। আমার স্বামীর যখন দুই বছর নাকি দেড় বছর বয়স তখন আমার শাশুড়ি মারা যান। আমার শ্বশুর আর বিয়ে করেননি। চারটি ছেলেমেয়ে তিনি নিজের হাতে মানুষ করেন। নিজে পড়াতেন। কাজের লোক রান্নাবান্না করে দিত। উনি নিজ হাতে ছেলেমেয়েদের খাওয়াতেন। তখনকার দিনে তো আবার ছেলেমেয়ে মানুষ করার ধরন আলাদা ছিল। খুব কঠিন হাতে মানুষ করার হতো এবং আমার স্বামী রেজাল্ট খুব ভালো করতেন। পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলেন, ফার্স্ট স্ট্যান্ড করতেন। আমার শ্বশুরের কথা ছিল, কলেজে যাবে, পড়বে, বিকেলে খেলবে, সূর্য ডোবার আগে বাসায় চলে আসবে, পড়তে বসবে। এর বাইরে আর কোন জীব নেই। এই জন্য আমার স্বামী বা আমি, আমার সেকালে এমনভাবে মানুষ হয়েছি। পরে আমরা যখন ঘর-সরকার করি-বই পড়ার অভ্যাস ছিল তো-আমি তখন আমার স্বামীকে বলি, স্টেটসম্যান এনে দাও। স্টেটসম্যান তখন তখন ওই হকাররা দিতে পারে না। অনিয়মিত ছিল। ’৫০ সালে। তখন আমার স্বামী আমার জন্যে স্টেটসম্যান আনতেন ওই রেলওয়ের কী বলে একটা স্টল, সেই হুইলারের স্টলে উনি অফিস ফেরত যেতেন।

সরদার: ফুলবাড়িয়া স্টেশন?

জাহানারা: তখন অফিস ছিল ৯.৩০ থেকে ৪.৩০। বেচারা ফিস করে সেই হুইলারের ওখানে গিয়ে আমার জন্যে একটা স্টেটসম্যান কিনে আনতেন। তাও কয়েক দিনের বাসি। আমার জন্য এত করেছেন। কিন্তু আমার বা তাঁর কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যেহেতু ছাত্রাবস্থায় কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগ হয়নি, সেই জন্য আমাদের পরবর্তী সময়ে কোনো দলে যোগদানের জন্য কেউ কিছু করেননি। কিন্তু কাগজ আমরা খুব পড়তাম। দেশের অবস্থা সম্পর্কে খুব সজাগ ছিলাম। আমার স্বামীও ছিলেন। কোথাও কী হচ্ছে না হচ্ছে, সেই সব। যখন জিন্নাহ এখানে এলেন, বললেন যে উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে; সবাই ‘নো, নো’ করে উঠেছে-সেইগুলো উনি শুনে আমাকে বাসায় এসে বলতেন, জানো, জানো, এই রকম হয়েছে, এই সমস্ত কী কাণ্ড। এই রকম মানুষ ছিলেন। আমিও তাই। তারপর রুমী হলো।

সরদার: রুমী কবে হলো?

জাহানারা: রুমী হলো ১৯৫১ সালের ২৯ মে। রুমীর যখন বয়স ১০ মাস, তখন আমি সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলে চাকরি নিলাম। তার আগে আমি ঢাকায় চাকরি করিনি। কিন্তু আমার আব্বা যখন ময়মনসিংহে এবং আমি (যখন) বিএ পরীক্ষা দিই, তখন বিদ্যাময়ী গার্লস স্কুলের হিন্দু টিচার সব চলে যান। তখন সেইখানে হেন মিস্ট্রেস ছিলেন আনোয়ারা বাহার চৌধুরী। কাজী জাহানারা এবং আনোয়ারা মনসুর, তাঁরা দুই বোন ছিলেন। তখন কাজী জাহানারার বিয়ে হয়নি। কাজী আনোয়ারার স্বামী ওইখানে পোস্টেড ছিলেন। উনি তখন ওখানে অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড মিস্ট্রেস। কাজী জাহানারা-এঁদের সঙ্গে আমারা কলকাতায় যোগাযোগ ছিল। ওনারা বদলি হয়ে গেছেন ময়মনসিংহে ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রংপুরে থেকে। খোঁজ পেয়ে আমাকে নিয়ে চাকরি দিয়েছেন। বললেন, আমাদের টিচার নেই, তুমি আসো। তারপর ঢাকায় চলে এলাম, আমার স্বামী যখন ঢাকায় পোস্টিং হলো।

সরদার: ওর আগে কোথায় ছিল পোস্টিং?

জাহানারা: উনি পাস করলেন ১৯৪৮ সালে। আমার বিয়ে হলো ’৪৮ সালের আগস্ট মাসে, ময়মনসিংহে। তারপর ওনার একটা ট্রেনিং হলো চিটাগাংয়ে। তখন আমি ময়মনসিংহে ছিলাম, চিটাগাঙয়ে যাইনি। আমি বিদ্যাময়ী স্কুলে চাকরি করছিলাম, বিয়েটা ওখানেই হয়। তারপর ওনার ফরটি নাইনের আগস্টে ঢাকায় পোস্টিং হলো অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। তখন আমি ঢাকায় চলে এলাম চাকরি ছেড়ে দিয়ে। কিন্তু কাজী জাহানারা, কাজী আনোয়ারা খুব চেষ্টা করেছিলেন; মিসেস বাহারও বললেন, তুমি চাকরি ছেড়ো না। তোমাকে কামরুন্নেসা স্কুলে বদলি করে দিচ্ছি। কিন্তু আমার স্বামী বললেন, না, আমরা দুজন গভর্নমেন্ট সার্ভিসে থাকলে আমাদের সংসারজীবন নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তুমি চাকরি ছেড়ে দাও। আমিও চাকরি ছেড়েই দিলাম। কিন্তু মনে দুঃখ হলো। কিন্তু উনি বোঝালেন, দেখো, দুজনে গভর্নমেন্ট সার্ভেন্ট হলে তোমাকে এক জায়গায় বদলি করবে, আমাকে একখানে বললি করবে। নাইনটিন ফরটি নাইনে আনোয়ারা, কাজী আনোয়ারা মনসুর, মিসেস বাহার, কাজী জাহানারা-সবার অনুরোধ উপেক্ষা করে আমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঢাকায় এলাম। এসে ঢাকায় সংসার করছি। আজিমপুরে ফ্ল্যাট পেয়েছি। আজিমপুরে দুই কামরার রুমগুলো তখন নতুন হয়েছে। ওখানে থাকি। আমার ছেলে হলো ১৯৫১ সালের ২৯ মে। তারপর ছেলের যখন ১০ মাস তখন আমি সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলে হেড মিস্ট্রেসের চাকরি নিলাম। সেও একটা কাহিনী। আমি আগে রেডিওতে প্রোগ্রাম করতাম। এখানেও কিন্তু আমাকে খুঁজে পেয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বলে যে, আমাদের কথিকার লোক নেই। যে আমাকে ধরে নিয়েছিল সে হলো হোসনে আরা, অভিনেতা গোলাম মুস্তফার স্ত্রী। সে আমাদের পাশের বিল্ডিংয়ে থাকত আজিমপুরে। সে আবার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে আমার চেয়ে এক বছরের জুনিয়র। আমাদের চিনত। একদিন হঠাৎ রাস্তায় দেখা, তারপর বাড়ি এলো। ও তখন ওখানে স্টা আর্টিস্ট। তখন আমাকে বলে, কী জাহানারা আপা, তুমি চলো। তোমাকে কথিকা পড়তে হবে। আমি মহিলা মহফিল পরিচালনা করার ভার পেলাম। তখন ওখানে যে প্রয়োজক ছিলেন, এম এ মোতাহার, তিনি তোমাকে বলতেন, আপনি এতটার সময় আসবেন। আমি ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় মিলিয়ে ততটার সময় গিয়ে পৌঁছাতাম। সে দুপুর তিনটা হোক আর চারটা হোক, কখনো রোদ বেশি বা বৃষ্টি হলেও দেরি করতাম না। উনি খুব ইমপ্রেসড হলেন, ওই রকম একটা ভদ্রমহিলা, ঠিক ঘড়ির কাঁটায় তাল রেখে আসেন। ওনার বাসা ছিল ওই সিদ্ধেশ্বরী। ওনার বাবা বোধহয় কোনো মেম্বার-টেম্বার ছিলেন। ওই স্কুলে কোনো হেড মিস্ট্রেস থাকেন না। দুই-দুই মাস পর চলে যান। উনি আমাকে বললেন, আপনি চাকরি করবেন? বলি, কোথায়? বলেন, সিদ্ধেশ্বরীতে একটা গার্লস স্কুল আছে। সকাল সাতটা থেকে দশটা, তিন ঘণ্টা কাজ। কিন্তু হেড মিস্ট্রেস টেকে না। তবে আমি দেখলাম, আপনি খুব পাংচুয়াল। সে জন্যই, সাতটায় স্কুল তো, আপনি যদি হন তবে আপনি ঠিক টাইমে যাবেন। আপনি কি করবেন? দেশ শ টাকা বেতন। আমি তখন আমার স্বামীর সঙ্গে আলাপ করি। স্বামী বললেন যে মন্দ না। একটা স্কুলে হেড মিস্ট্রেস হওয়া খারাপ না। আমাকে যে গভর্নমেন্টের চাকরি থেকে ছাড়িয়ে এনেছেন, তা কিন্তু তিনি ফিল করতেন। আমি একটা শিক্ষিতা মেয়ে, বাড়িতে বসে আছি। এই জন্যই আমার স্বামী একদিকে আমাকে দিয়েছেন, অন্যদিকে কমপেনসেট করেছেন। স্বামীই বললেন, চাকরিটা নাও। সাতটা থেকে দশটা খুব কম সময়। সাদে নয়টায় অফিসে চলে যাব, তুমি ১০টা সাড়ে ১০টায় এসে যাবে, বাচ্চাটা এক ঘণ্টা মাত্র একা থাকবে। তখন আমি চাকরি নিলাম। তখন একটা মাত্র ছেলে আমার। আমি চাকরি করি।বাকি সময় বাসায় থাকি। রাজনীতির কোনো অবকাশ নাই। আমার স্বামী চাকরি করেন, আমিও চাকরি করি। কাগজ পড়ি, দেশের অবস্থা আলোচনা করি। যেদিন একুশে ফেব্রুয়ারি গুলি হলো, আমার স্বামীও একদম সেক্রেটারিয়েট থেকে বের হয়ে চলে এলেন। এসে বললেন, জানো, আমাদের ছেলেদের ওপর গুলি চালিয়েছে! কী সাংঘাতিক কথা! আমি চলে এসেছি। যুক্তফ্রন্ট যখন হলো-আমার স্বামী শরীফের এক বন্ধু ছিল, তার নাম ফখরুদ্দীন। একদম স্কুলজীবনের বন্ধু। সে বেশি পড়াশোনা করেনি। বোধহয় ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত পড়ে ব্যবসাট্যাবসা করেছিল। সে নিজে কোনো দলভুক্ত ছিল না। কিন্তু ওই রাজনীতির সম্বন্ধে, নেতাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো-ওই সোহরাওয়ার্দী আসছেন, শেরেবাংলা আসছেন, অমুক আসছেন; ফকির তার সঙ্গে সঙ্গে আছে। তাকে আমরা ফকির বলে ডাকতাম। আমাদের বাড়িতে এসে সে সম্বন্ধে বলত। জানো, এই হয়েছে, ওই হয়েছে। ওর সঙ্গেই আমরা ওই সব আলাপ করতাম। ওর কাছ থেকে বেশির ভাগ জানতাম। একবার ১৯৫৪ সালে ওই যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন হবে। তার আগ দিয়ে এসে বলল, ভাবি, আপনাকে আমরা মহিলা ক্যান্ডিডেট হিসেবে দাঁড় করাতে চাই। তো আমার স্বামী দেবেন না। না, আমি তো গভর্নমেন্ট সার্ভিসে আছি। আমার যতদূর মনে হয়, নূরজাহার মুরশিদ দাঁড়িয়েছিলেন। আমাদের তো টাকা-পয়সা বেশি ছিল না। আমার বাবা হিসাব করে, টানাটানি করে সংসার চালাতেন। আমার শ্বশুর উকিল ছিলেন, কিন্তু আমার শাশুড়ি ছিলেন না বলে ছেলেপেলে দেখতেন। যেটুকু না হলেই নয়, করতেন। স্বামীরও চাকরিটাই ভরসা। আমাদের কোথাও কোনো সম্পত্তি, টাকা-পয়সা নেই। কাজেই স্বামীর টাকরিটা না থাকলে চলে না। আমার আর সেবার দাঁড়ানো হলো না।

সরদার: আপনার কি তখন মনে হচ্ছে হয়েছিল যে, আমি দাঁড়াব?

জাহানারা: হ্যাঁ, হ্যাঁ। ভীষণ ইচ্ছা হয়েছিল। আমার এই প্রচণ্ড এনার্জি, ওটাই যেহেতু রাজনীতির পথে যেতে পারল না, ঘর-সরসার করা, ছেলেপেলে মানুষ করা, স্কুল করা, রেডিও প্রোগ্রাম করা, বন্ধুবান্ধবকে দাওয়াত করে খাওয়ানো, পিকনিকে যাওয়া-আমার এনার্জি এই সব দিকে ব্যয় হতো।

সরদার: এটা একটা ইউনিক ব্যাপার। এটা একটা গর্বের ও আনন্দেরও ব্যাপার আমাদের।

জাহানারা: তবে আমার স্বামী একদিকে যেমন আমাকে রাজনীতি করতে দেননি, অন্যদিকে যতভাবে পারেন পুষিয়ে দিয়েছেন। আমি বলব, দ্বিতীয় কারও স্বামীকে আমি দেখিনি তার বউকে এতো দিক দিয়ে পুষিয়ে দিয়েছে। এমনি সাংস্কৃতিক সভা-সমিতিতে যেতাম। বাইরে এই যে নানা রকম বড় বড় সাহিত্যিক আসছেন, আমার স্বামী….।

সরদার: আপনার সঙ্গে তো তখনই আমার পরিচয় বাংলা একাডেমিতে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। এসবে তো সব সময়ই আপনাকে দেখেছি। আমিও তখন বাংলা একাডেমিতে যোগ দিয়েছি। আমার ডিটেনশনের পরে।

জাহানারা: আপনি যখন জেলে ছিলেন তখন তো…..। কলির (সরদার ফজলুল করিমের স্ত্রী) সঙ্গে কতোবার আমার দেখা হয়েছে। তার মনের অবস্থা, সেই সব আমার মনে আছে। সেই হিসেবে রাজনীতি আর করতে পারলাম না। আমি তারপর সিদ্ধেশ্বরী স্কুলে চাকরি করতে করতে এমনই চাকরির নেশায় পড়ে গেলাম।

সরদার: আপনি কত বছর ছিলেন সিদ্ধেশ্বরীতে?

জাহানারা: আট বছর। প্রথম তো সকালে স্কুল ছিল সাতটা থেকে দশটা। আমি যে বছর জয়েন করলাম, ১০৮ জন শিক্ষার্থী ছিল। ১০টা ক্লাসে ১০৮ জন শিক্ষার্থী ছিল। সেই কয়েক বছর ধরে আমার সময় ১৪-১৫ শ শিক্ষার্থী হলো। স্কুলের জন্য বাড়ি দরকার, জমি দরকার, দিনের স্কুল দরকার, দিনে ওখানে ছেলেদের স্কুল হতো। সে সময় আমি ডিপিআই অফিসে দৌড়াদৌড়ি করি। ঘোরাঘুরি করি যে আর একটা জমি দরকার। তখন এই বয়েজ স্কুলটা আলাদা হয়ে গেল। আর জমিটা গার্লস স্কুলের হলো। তখন ১০টা থেকে চারটা পর্যন্ত স্কুল। আমি যখন স্কুল ছাড়ি তখন ১৮ শ শিক্ষার্থী।

সরদার: কোন বছর আপনি স্কুল ছাড়লেন?

জাহানারা: স্কুল ছাড়লাম ’৬০ সালে। ম্যানেজিং কমিটির মেম্বাররা কিছুতেই আমাকে ছাড়তে না না। তাঁরা আমার ওপর খুশি ছিলেন যে স্কুলের উন্নতির জন্য এত কিছু করেছি। আমি দেখলাম, আমার ছেলে দুজনের খুব অযত্ন হচ্ছে। আমি ভাবলাম, এত হাজার হাজার ছেলেমেয়েকে পড়াচ্ছি। আমার ছেলেমেয়ে যদি বখে যায়, তাহলে তো খুব পরিতাপের বিষয় হবে। আর আমার মনের অর্ধেক বোধহয় ঘরোয়া ছিল। স্বামী-ছেলেদের নিয়ে একটা সংসারজীবন, ওটা বোধহয় আমার অর্ধেক মন চাইত। আর অর্ধেক মন চাইত আমি চাকরি করি, কি রাজনীতি করি, কি এই সব করি। এই একটা দ্বন্দ্ব আমার মনের মধ্যে ছিল। আমার গলব্লাডার অপারেশন হয় ফিফটি নাইনে। তখন আমার শরীরটা খুব খারাপ হয়ে যায়। আমার এমএ পড়ারও খুব ইচ্ছা ছিল। তা ছাড়া স্কুলের চাপটা আমার ওপর খুব বেশি হয়ে গেল। কারণ ম্যানেজিং কমিটি আমাকে বিশ্বাস করে। আমাকে ভালোবাসে, আমার ওপর এত ভার চাপিয়ে দিল, যেটা তাদের করার কথা ছিল (না)। এইটা আমার পক্ষে খুব বেশি হয়ে গেল। এমনকি আমি স্কুলের বিল্ডিং করার জন্য ড. এফ আর খান, যিনি বিশ্ববিখ্যাত স্থপতি…..।

সরদার: হ্যাঁ, মারা গেছেন তিনি।

জাহানারা: তিনি তখন এই সময় দুই বছর ঢাকায় ছিলেন। সেই সময় বিনা পয়সায় আমি তাঁকে দিয়ে স্কুলের প্ল্যান করিয়ে নিয়েছি। এই রকমও করেছি। কিন্তু আমি দেখলাম যে আমার জন্যে খাটুনিটা খুব বেশি হয়ে যাচ্ছে। তখন আমি বললাম যে, আমাকে ছেড়ে দিন, সংসার-স্কুল এটা আমি আর পারছি না। আমার ছেলেগুলো খুব ডিমান্ডিং ছিল। আমার শ্বশুর অন্ধ হয়ে এসেছেন। আমার বাড়িতে অনেক আত্মীয়স্বজন আসত, অনেক রকম ঝামেলা আমার ছিল। যা হোক, আমার মনের ভিতর সব সময় একটা দ্বন্দ্ব ছিল। এইটা হলো আসল জিনিস। দ্বন্দ্ব এই জন্য যে বাবা-মা মানুষ করেছেন ভালো স্ত্রী হওয়ার জন্য, ভালো মা হওয়ার জন্য। আমার মা কিন্তু মেয়েরা সংসারধর্মের পাশাপাশি অন্য সবকিছু সমান দক্ষতায় করবে-এই শিক্ষা আমাকে দেননি। এই জন্য আমি একটা দ্বন্দ্বে ভুগতাম। মনে হতো, স্কুল আমার সময়টা বেশি নিয়ে নিচ্ছে। ছেলে দুটি বখে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা আছে। তখন ম্যানেজিং কমিটি রেজুলিউশন করেছিল যে হেড মিস্ট্রেসকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া গেল বটে, সেটা অল্প কিছুদিনের জন্য। যেহেতু তিনি এমএ পড়ে তাঁর জ্ঞান আরও বাড়াতে চান, সেই জন্য আমরা তাঁর এই রেজিগনেশন লেটার অ্যাকসেপ্ট করলাম এই আশাতে যে উনি এমএ পাস করে এসে আবার এই স্কুলেই জয়েন করবেন। এর ফলে নতুন হেড মিস্ট্রেস কোনো দিনই সিকিউরড ফিল করতে পারেননি। যা হোক, আমি আর কোনো দিনই স্কুলে ফিরে যাইনি।

সরদার: আপনি এমএ নিয়েছিলেন? এমএ কবে নিলেন?

জাহানারা: ১৯৬০ সালে আমি এমএতে ভর্তি হলাম। কিন্তু এমএ পার্ট ওয়ান পাস করতে আমার দুই বছর লেগে গেল। তার কারণ ওই শ্বশুর অন্ধ হয়ে আমাদের বাড়িতে চলে আসেন। তার আগে কোমরে চোট লেগে আমি অনেক দিন শয্যাশায়ী ছিলাম। সেই জন্য প্রথমবার পরীক্ষা দেওয়া হলো না। সিক্সটি-টুতে আমি এমএ পরীক্ষা দিলাম। পার্ট ওয়ান পাস করে পার্ট টুতে ভর্তি হলাম। এমন সময় আমার স্বামী বললেন, দেখো, ফুলব্রাইট স্কলারশিপ বোধ হয় বন্ধ হয়ে যাবে। আর দেশের যা অবস্থা, তুমি তো ঘুরতে চাও, খুব বিদেশ যেতে চাও, তুমি অ্যাপ্লাই করো। আমি খুব বিদেশে যেতে চাইতাম, কিন্তু আমি নিজে থেকে উদ্যোগ নিতাম না। আমি আমার স্বামীর কথামতো ফরম এনে ফুলব্রাইট স্কলারশিপের জন্যে অ্যাপ্লাই করে দিলাম। কী আশ্চর্য, পরের বছর আমি সিলেক্টেড হয়ে গেলাম। সিলেক্টেড হয়ে যাওয়ায় সেবার আর আমার এমএ পার্ট টু দেওয়া হলো না।

সরদার: আপনি কি ফুলব্রাইট পেয়েছিলেন?

জাহানারা: হ্যাঁ। পেয়ে গেলাম এবং আমার স্বামীর উৎসাহ না হলে আমি পেয়ে আবার পিছিয়ে যাচ্ছি। আমার ছোট দুটি ছেলে, আমি যাব কী করে। উনি বললেন, না, না, আমি দেখব তোমার বাচ্চা। তুমি চিন্তা কোরো না। এই সুযোগ তুমি তো আর পাবে না। ওনার মনে একটা ধারণা ছিল যে আমাকে রাজনীতি করতে দেননি। এর জন্য সব সময় তাঁর উৎসাহ ছিল। তারপর এই ভেবে শেষে আমি এমএ পরীক্ষা না দিয়ে গেলাম। ওটা ছিল ছয় মাসের জন্য। ইন্টার্ভিউ দিতে গিয়ে দেখি মনিরুজ্জামান ওখানে। আমি বললাম, স্যার, আপনি! আমি যে অ্যাপ্লাই করেছি, কাউকে কিন্তু বলিনি। কারণ টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রিন্সিপাল চান না যে আমি তাড়াতাড়ি পার্ট টু পাস করে ফেলি। আমি যে এখানে ইন্টার্ভিউ দিতে এসেছি প্লিজ, আপনি কাউকে বললেন না। স্যার বললেন কি, আমি যে ইন্টার্ভিউ দিতে এসেছি, প্লিজ আপনিও কাউকে বলবেন না। এই রকম ব্যাপার। আমি তো চলে গেলাম সিক্সটি ফোরে, ছয় মাসের জন্য। ফিরে এসে পরীক্ষা দিয়ে পাস করলাম।

সরদার: এটা কি এমএ?

জাহানারা: এমএ। বিএড কিন্তু আমি সিক্সটি নাইনে করেছি। স্কুল থেকে আমাকে পাঠানো হয়েছিল।

সরদার: প্রিন্সিপাল খুবই স্নেহ করতে বলে, তাই না?

জাহানারা: খুবই স্নেহ করতেন। ওনার ইচ্ছা, ‘তোমাকে আমি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে লেকচারার করে আনব।’ তাঁর ধারণা হয়েছিল, আমি খুব ভাল টিচার। আল্লাহ জানেন, আমি জানি না। আমি সিক্সটি ফাইভে এমএ পাস করলাম। ওনার কথামতো আমি সিক্সটি সিক্সে টিচার্স ট্রেনিং কলেজে চাকরি পাই।

সরদার: আপনি ’৭১ সালের আগের যে পর্যায়টা, সেটা মোটামুটি কিছুটা বলেছেন। আমরা অন্য কোনো প্রশ্ন করব। আজকে এর মধ্যে, আপনি নিজের দিক থেকে যদি (কিছু) চিন্তা করে থাকেন, তবে বলুন।

জাহানারা: আমি এই বিষয়ে কী বলব। আমার মনে তো অনেক কথা ওঠে, কিন্তু আমি একজন সাধারণ মানুষ। এখন আমি অসুস্থ, তাই ঘরের বাইরে খুব একটা বেশি বের হতে পারি না। বর্তমানে দেশের যে অবস্থা, এটা খুবই দুঃখজনক, পরিতাপের বিষয়।

সরদার: ঠিকই বলেছেন আপনি। কিছু ভুল হয়তো আমাদেরও এমনও হয়েছিল, সেগুলো পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে বেড়েছে। কী রকম ভুল আপনার মনে আঘাত করে? কী কী ভুল আমরা করেছি?

জাহানারা: আমাদের যুদ্ধটা নয় মাসে শেষ হয়েছে। কিন্তু অনেকে বলে থাকবেন যে যুদ্ধ যদি আরও অনেক দিন ধরে চলত, তাহলে হয়তো আমাদের চরিত্র যেটা সেটা বদল হয়ে যেত। নয় মাস পরেই আমরা স্বাধীনতা পেয়ে যেন এর মর্যাদাটা এত ভালো করে বুঝতে পারলাম না। সেই সময় আমি রুমীকে বলেছিলাম, আরে, কবে যে শেষ হবে, আর তো পারি না। তখন বোধ হয় অগাস্ট মাস। রুমী বলল, মাগো, এত অস্থির কেন? এই যুদ্ধ তো কয়েক বছর ধরে চলা উচিত। আমি বলেছিলাম, অসম্ভব, আর পারব না। আর সহ্য হয় না। তুই এটা কী বলছিস? সে ঠিকই বলেছিল। আজকে আমি বুঝতে পারি এবং আমার মনে হয়, ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগ যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল, এর ফলে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা ছিল শেষ মুজিবের। কিন্তু ইয়াহিয়া সরকার সেটা দিল না। তাদের দেওয়ার ইচ্ছাও ছিল না। পরে যার জন্যে এই গণহত্যা হলো এবং দেশটা ছিন্নভিন্ন হলো। তারপর ওই যে নয় মাস যুদ্ধ হলো, শেষের নামে ওই স্বাধীনতা ঘোষিত হলে তার নামে উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাই এক হয়ে যে যুদ্ধটা করল, পরে শেষ যখন আমাদের দেশে ফিরলেন-তিনি আমাদের অসাংবাদিত নেতা-আমরা সবাই তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তাঁকে আমরা প্রাণের এরচেয়ে ভালোবাসি। তিনি তার আগেও বহু বছর ধরে স্বাধিকার আন্দোলনে নিজের জীবনটাই একরকম উৎসর্গ করেছিলেন, ক্রমে ক্রেমি তিনি দেশের সবচেয়ে বড় নেতা হয়েছেন, যার ওপর ভাসানীরও আশীর্বাদ ছিল এবং ভাসানীও যাঁর সঙ্গে একসঙ্গে মিএ স্বাধীনতাযুদ্ধে কাজকর্ম করেছেন। শেষ যখন এলেন, তখন আমার মনে হয় যে তিনি দেশবাসীর, মুক্তিযোদ্ধাদের মোকাবিলা করতে পারলেন না। মনে হলো, তিনি ভাবলেন, আওয়ামী লীগ যেহেতু ’৭০ সালে নির্বাচনে জিতেছিল, অতএব আওয়ামী লীগই সরকার গঠন করবে। অথচ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল সবাই, কেমন? কাজেই সেই সব মুক্তিযোদ্ধাকে কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার সন্দেহের চোখে দেখে তাদের সরিয়ে রাখল। আমার মনে হয় যে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধের প্রয়োজনে পুল ভেঙ্গেছিল, রাস্তা ভেঙ্গেছিল। উচিত ছিল স্বাধীনতার পর তাদের দিয়েই ভাঙা রাস্তা, ভাঙা পুল মেরামত করানো; একটা বছর তাদের দিয়ে দেশ গড়ার কাজ করিয়ে নেওয়া। একটা বছর হয়তো লেখাপড়া তাদের হতো না। এখন তো কতো বছরই নষ্ট হচ্ছে সেশনজটের জন্য, তাই না? তখন এটা করে সবাই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে বা শিক্ষাজীবনে ফিরে যেত। ওইটা যদি করা যেত বা সরকার গঠনে যদি সবার প্রতিনিধিত্ব থাকত, তাহলে বোধ হয় তার ফলটা ধীরে ধীরে ভালো হতো। কিন্তু তা হলো না, দেখা গেল যে আসল মুক্তিযোদ্ধাদের বলা হলো যে তোমরা অপেক্ষা করো কিংবা তোমরা নিজেরের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাও। এদিকে আবার অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট পেয়ে গেল। যাদের পরে সিক্সটিন্থ ডিভিশন বা ষোড়শ বাহিনী বলে উপহাস করা হতো। সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ আসল মুক্তিযোদ্ধারা ক্রমশ হতাশাগ্রস্ত হয়ে গেল। তারা কী রকম হয়ে গেল, তারপর দেশে নানা মতের নানান রাজনৈতিক দল হলো। সেগুলোকে তদানীন্তন সরকার অত্যন্ত রূঢ় হাতে দমন করল। কতো সোনার ছেলে, কত তরুণ-যাদের মনের মধ্যে ছিল আদর্শ, চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন-মৃত্যুবরণ করেছে। যে শেখকে আমরা হৃদয়ের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্থান দিয়ে রেখেছিলাম, তিনি কি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলেন? আমি এই রকম একটা সময় ভাবি, আমি তো এগুলো বিশ্লেষণ করতে পারব না। কিন্তু আমার এই রকম মনে হয়। কয়েকটা ভুলও বোধহয় ওই সরকার করেছিল। যেমন দালালদের ক্ষমা করে দেওয়া হলো। তারা তখন জেলে জেলে রয়েছে, কেউ লুকিয়ে রয়েছে। ক্ষমা করে দেওয়ার ফলে তারা বেরিয়ে এসে বেশ কিছুদিন মাথা নিচু করে থাকল। আস্তে আস্তে নিজেদের শক্তি সঞ্চয় করতে লাগল। তখন যদি ওই দালালদের শেষ করে দেওয়া যেত, তাহলে তারা তো পরে এই ক্ষতি করতে পারত না। আমাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় নেতা শেখ মুজিব কিছু পারিবারিক ব্যাপারে দুর্বলতা ছিল। নিজের ছেলে, নিজের ভাগ্নেকে তিনি কন্ট্রোল করতে পারতেন না। আমি এইগুলো বলছি এই জন্য যে ওই সব বলা কেউ বলেন না।

সরদার: আপনি বলুন, বলুন আপনি?

জাহানারা: শেখ মারা যাওয়ার পর এবং তাঁর যে ভাই খুলনায় মারা গিয়েছিলেন, আমি শুনেছি লোকের মুখে, সেখানকার লোকেরা নাকি আনন্দে মিলাদ পড়িয়েছে। তিনি এতই অত্যাচারী ছিলেন। এসব বলতে খারাপ লাগে, কষ্ট লাগে। কিন্তু এমন ঘটনা ঘটেছে তো। তারপর তাঁর ভাগ্নে শেষ মণিকে তো অনেকে পছন্দ করত না। কিন্তু তাঁর যে একটা-যা হোক, তাঁর আরও আত্মীয়স্বজন এগুলো যে করত-অনেককে অত্যাচার করা, অন্যায় সুযোগ-সুবিধা নেওয়া-এগুলো যে সে সময়কার লোকেরা সবাই জানে। কিন্তু শেষ স্নেহে অন্ধ হয়ে এগুলোর কিছু করেননি। তারপর যে শেষ একসময় বলেছিলেন বেলি ফুলের মালা দিয়ে মেয়েদের বিয়ে হওয়া উচিত, তিনি তাঁর ছেলের বিয়ের সময় পুত্রবধূর মাথায় সোনার মুকুট পড়ালেন। সে সময় দেশে দুর্ভিক্ষ চলছিল। এসব কথা কেউ বলে না। আমি বলছি এই জন্য যে এই সব ঘটনা ঘটে যাওয়ায় সেই সময় লোকদের মন সত্যিই খুব বিরূপ হয়েছিল। আমি বলব, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কয়েকটা বড় বড় ভুল হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে দেশের অবস্থা আরও খারাপ হতে পেরেছে। তা ছাড়া একদলীয় শাসন….সেটাও আমি মনে করি, আমাদের দেশের জন্যে ক্ষতি হয়েছিল এবং রক্ষীবাহিনীর সৃষ্টিটাও আমাদের দেশের জন্যে ক্ষতি করেছিল। এইগুলো করা উচিত হয়নি। আমি মনে করি, পরবর্তীকালে জিয়া রাষ্ট্রপতি হলেন, তিনিও আমাদের চোখের মণি তিনি আমাদের মুক্তিযোদ্ধা। তিনি তো আমাদের আরও বেশি হতাশ করলেন। অনেকে বলেন, শেখ সাহেব বিদেশে বন্দী ছিলেন। তিনি যুদ্ধের সময়ের এই সব নিজ চোখে দেখেননি। কাজেই তাঁকে তাঁর চারপাশের সাঙ্গোপাঙ্গরা যে রকম বুঝিয়েছেন তিনি সে রকম বুঝেছেন। তাই যদি হয় তবে জিয়া নিজে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে কোন আক্কেলে পরবর্তীকালে দেশের ক্ষতিকর এইসব কারবার করলেন। তাঁর জন্য আমার আরও দুঃখ এবং রাগ হয় যে, মুক্তিযোদ্ধা হয়ে তিনি যতটা সর্বনাশ করলেন, শেখ ততটা সর্বনাশ তাঁর ভুল সিদ্ধান্তের দ্বারা করতে পারেননি। সেসব দালাল শেখের আমলে ক্ষমাপ্রাপ্ত হলো, তারা আস্তে আস্তে মাথাচাড়া দিতে দিতে জিয়ার আমলে রাজনীতি করার অনুমতি পেয়ে গেল। তখন পেট্রোডলারের ভীষণ দাপট। অথচ জিয়া বলেছিলেন যে দুইটা হাত, ঝুড়ি আর কোদাল-এই নিয়ে আমরা পারি। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, আমাদের সরকারপ্রধানদেরও দুর্বলতা এবং পৃথিবীর যে বড় বড় পরাশক্তি তাদেরও ভীষণ করম ষড়যন্ত্র যে তৃতীয় বিশ্বের এই সব দেশকে নিজেদের কবজায় রাখবে। তার জন্যে তারা যে খেলাটা খেলেছে, তা থেকে কেউ ইচ্ছা করলেও বেরিয়ে আসতে পারবে না।

সরদার: ঠিক বলেছেন। আপনার মনের প্রশ্ন, এটা তো আপনার একার না। আরও বিভিন্নজনের মনের প্রশ্ন। এর জবাব একজন হয়তো এক রকম দেবে, আরেকজন হয়তো আরেক রকম দেবে। আচ্ছা, ১৯৭০-৭১ সালে আপনি, শরীফ সাহেব, আপনার ছেলে রুমী-এরা তো অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে আন্দোলনের যে স্রোত, সেই স্রোতের সঙ্গে থেকেছেন। ওই সময় এই সব পার্সোনালিটির মধ্যে…ধরুন শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আপনাদের কি কোন ঘনিষ্ঠতা, সাক্ষাৎ, আলাপ-এ রকম কোন ঘটনা ঘটেছে?

জাহানারা: না। শেখের সঙ্গে আমার ঠিক ওই রকম সাক্ষাৎ ঘটেনি। কিন্তু খবরের কাগজ পড়ে, লোক মারফত শুনে শেখের প্রতি আমাদের আস্থা ও ভালোবাসা পুরোপুরি ছিল। কিন্তু আমার ছেলে বিশেষণ করত শেখকে। বলত, শেখ এটাই ঠিক করছে না, ওইটা ঠিক করছে না। কিন্তু আমি বলতাম, না, শেখ ঠিক করছেন। শেখের প্রতি আমাদের আস্থা, সেটা পুরোপুরি অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতো ছিল। আমার ছেলে তো বিশ্লেষণধর্মী মনের মানুষ। সে কিন্তু এই রকম বলত।

সরদার: রুমীর কি কোনো ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ ছিল?

জাহানারা: না, না। কোন ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু ও প্রথম থেকেই যেমন ধরুন মার্কস, এঙ্গেলস-এগুলো যেমন পড়েছে, তেমনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের যে রাজনৈতিক অবস্থা, সেই সব সম্পর্কে-যেমন রাশিয়ার রেভস্যুশন সম্পর্কে সে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়েছিল। মাও সে তুংয়ের রাইটিংস পড়েছে, চে গুয়েভারার কথা পড়েছে। সে আমাকেও পড়াতে চাইত, নিজে যেসব বই পড়ত। ধীরে বহে ডন বইটা আছে না চার খণ্ডে-রুমী বলে, আম্মা, তুমি এই বইটা পড়ো। তুমি দেখো, রাশিয়ান রেভল্যুশন আসার আগে দেশের অবস্থা কী ছিল। রেভল্যুশন যে ধীরে ধীরে আসছে, সেটা কিন্তু লেখার মধ্যে ফুটে উঠেছে। আমি বললাম তখন, তোর কি মনে হয় আমাদের দেশেও এই রকম রেভল্যুশন আসছে। তখন ও বলল, এখনো দেরি আছে, মা। আমাদের দেশের জনসাধারণ এখনো তৈরি হয়নি। এইটা আপনার মনে হয় ’৬৬-৬৭ সালের কথা। ও কোনো দলভুক্ত না হওয়া সত্ত্বেও সাধারণভাবে পৃথিবীর সব দেশের রিভল্যুশন, সেই সব দেশের রেভল্যুশনের পরবর্তী অবস্থা, তার আগে কী ছিল; রাশিয়া, চায়না, কিউবা-এগুলো তার ইন্টারেস্টেড বিষয় ছিল।

সরদার: অথচ ও ছিল সায়েন্সের ছাত্র?

জাহানারা: হ্যাঁ, সায়েন্সের ছাত্র ছিল।

সরদার: আপনার কথা থেকে, বইয়ের মধ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, রুমী একটা অতুলনীয় ছেলে ছিল। সেটা ও চলে যাওয়ার পর আরও বোঝা যাচ্ছে। ও নিজেও তো রাজনৈতিক মনের ছেলে। ওর বন্ধুবান্ধব তো রাজনৈতিক সংগঠনের ছিল।

জাহানারা: ওর বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ভাসানী (ন্যাপ)-সব রকমের ছিল। আমার মনে হয় দক্ষীণপন্থী, বামপন্থী আমি কিছু বুঝতে পারতাম না। ওর আবার নাটকের ওপর খুব শখ ছিল। নাটক করে এমন কিছু ছেলেও ওর বন্ধু ছিল।

সরদার: ভালো টাইপের ছেলে।

জাহানারা: ভালো টাইপের ছেলে বলতে পারেন। ইন্টেলেকচুয়াল টাইপ, লেখাপড়া, সব বিষয়ে জ্ঞান রাখা-এ রকম ছিল।

সরদার: আপনার বাড়িতে বিশেষ করে আপনি, রুমীর আব্বা, রুমী-তিনজনে মিলে এই যে এই সব বই, এগুলো পড়ে ক্রিটিক্যাল আলোচনা করতেন।

জাহানারা: হ্যাঁ, করতাম। যখন টিচার্স ট্রেনিং কলেজে পড়াতাম, আমি তখন দুই বছর চাকরি করেছি ’৬৬-৬৮ সালে। আমার ছেলে একটা বই পড়ত আর বলত, আম্মা, তুমি এই বইটা পড়ো। আমি হয়তো কলেজে চাকরি করে পারতাম না। তারপর আমি তখন কিছু লেখালেখি করতাম। সংসার করে এসব করতাম। তখন ও বলত, মা, তুমি চাকরি করো কেন? তুমি এই সব বই পড়তে পার না? আমি তোমার সঙ্গে আলাপ করতে চাই। আমি দুই বছর পর চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম। চাকরি ছাড়ার পেছনে অনেক কারণ ছিল। সেগুলো এখন বলার দরকার নেই। একটা কারণ হলো যে রুমী চাইত, সে যে বই পড়ে, আমি যেন সেই বইটা পড়ি। তখন সে আলাপ করতে পারবে।

সরদার: এই যে রুমীর আব্বা, ছেলের আগ্রহ, আপনারও তাই। এর মধ্যে কার মনের ইচ্ছেটা কোন দিকে?

জাহানারা: তিনিও আলাপ-আলোচনা করতেন ওর সঙ্গে। দেশের অবস্থা নিয়ে বলতেন। শরীফ একেবারে পাকিস্তানিদের দেখতেই পারত না। তার বন্ধু ফকির প্রায়ই আসত-পাকিস্তানে কী হচ্ছে, আইয়ুব খান কী রকম সর্বনাশ করছেন, বেসিক ডেমোক্রেসি নিয়ে শত তামাশা করত। ইয়াহিয়া কী করছে, ভুট্টো কী করছে-এই সব আরকি। আমরা কতভাবে শোষিত, আমাদের ওপর কতটা অবিচার করা হচ্ছে। শরীফ, রুমী, শফির-আমরা এই সব আলোচনা করতাম।

সরদার: আওয়ামী লীগ যেহেতু আন্দোলনটা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, এসব শুনে আওয়ামী লীগের দিকে আমাদের মন ছিল, তাই না?

জাহানারা: হ্যাঁ, ছিল। ছয় দফা এবং ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’-খুবই আমাদের ইমপ্রেস করেছিল। তা ছাড়া যখন যুক্তফ্রন্ট প্রথম হয় ’৫৪ সালে, সেই সময় তো ফকিরও চেয়েছিল আমি ইলেকশনে দাঁড়াই। ইলেকশনে আমার স্বামীর জন্য দাঁড়াতে না পারলেও আমরা তো এই কাজের প্রতি একাত্ম ছিলাম। এই প্রগতিশীল আওয়ামী লীগ সে সময় যা করেছে, সে জন্য আমরা তো সাপোর্ট দিয়েছি। ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানও সাপোর্ট করেছি।

সরদার: ফিফটি ফোরে তো আপনি ইলেকশনে গেলেন না। কিন্তু যুক্তফ্রন্টের কাছ থেকে আপনার কাছে কি এ রকম কোন অ্যাপ্রোচ হয়েছিল যে আপনি ইলেকশনে দাঁড়ান মহিলা ক্যান্ডিডেট হিসেবে?

জাহানারা: যুক্তফ্রন্টের তখন থেকে না। ওই ফকির বলল, আমাদের মহিলা ক্যান্ডিডেট হিসেবে আমরা ভাবিকে দাঁড় করাতে চাই। এখন তাদের তরফ থেকে ফকির এসেছিল কি না, এটা আমি এত দিন পর বলতে পারব না।

সরদার: আপনি বললেন যে শেখ মুজিবের সঙ্গে ব্যক্তিগত কোনো ঘনিষ্ঠতা ঘটেনি…।

জাহানারা: হয়নি। তবে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে আগরতলা থেকে নীরা চক্রবর্তী বলে এক ভদ্রমহিলা এসেছিলেন ঢাকায় এবং আমার বাড়িতে ছিলেন। সেই সময় সবাই তো বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করত। নীরা চক্রবর্তীকে আমি চিনতাম না। হয়তো খুব নামকরা শিক্ষয়িত্রী, না হয় প্রধান শিক্ষয়িত্রী হবে এবং গার্লস গাইডে চিলেন। ওনাকে নিয়ে বাংলা একাডেমিতে বেড়াতে গেলে ২৫ জানুয়ারি নূরজাহান মুরশিদ আপার সঙ্গে দেখা হলো। নূরজাহান আপার সঙ্গে নীরা আপনার পরিচয় হলে নীরা আপা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলেন। তখন নূরজাহান মুরশিদ আপা বললেন, তোমরা আগামীকাল বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে এসো। আমি আলাপ করিয়ে দেব। আমার মা শুনে বললেন, আমিও যাব। আমি শেখ মুজিবকে একটু দেখব। মা এই নয় মাস দুজন লোক সম্পর্কে খুব বলতেন। (অন্যজন) এম আর আখতার মুকুল, এই যে চরমপত্র পড়তেন। মা বলতেন, মাগো, এই ওই দুইটা লোকের সঙ্গে দেখা করতে চাই। তাদের দুই গালে দুইটা করে চুমো খেয়ে আমি মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করব। পরদিন মা, নীরা আপা, এবং আমাকে নিয়ে নূরজাহান মুরশিদ আপা শেখের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

সরদার: ধানমন্ডির বাড়িতে কি?

জাহানারা: ধানমন্ডি না গণভবনে আমার এতটা মনে নেই। নীরাদির ইচ্ছা, একটা ছবি নেওয়া হোক। তখন আমরা সবাই দাঁড়ালাম। আমি, মা, নীরা আপা, নূরজাহান মুরশিদ আপা ও শেখ একসঙ্গে ছবি তুললাম। নীরা আপাকে একটা কপিও দেওয়া হয়েছিল।

সরদার: ওই ছবি কি আপনার অ্যালবামে আছে?

জাহানারা: অ্যালবামে নেই। তবে কপিটা কোথাও নিশ্চয়ই আছে। সময়টা ছিল সন্ধ্যা ছয়টা অনুমান, ২৬ জানুয়ারি। ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস ছিল। শেখ তখন যাচ্ছিলেন তখনকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। উনি বললেন, আপনারাও সবাই আসুন। আমরা মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমরা গেলে সেখানে এম আর আখতার মুকুলসহ আরও অনেকের সঙ্গে আলাপ হলো। মুকুলের বউ, তারপর ভারতের সাপ্তাহিক দেশ-এর আশোক সরকার, তাঁর ছেলে, লেখক সমরেশ বসু, অমিতাভ চৌধুরী, তুষার পণ্ডিতসহ আরও অনেকে উপন্থিত ছিলেন। তখন আমার মা এত খুশি হলেন! আমার মায়ের এ জিনিসগুলো তো ভোলার নয়।

সরদার: এই যে আপনি বললেন, মাকে নিয়ে গেলেন, মা খুব খুশি হয়েছেন, এটা আমার খুব ভালো লেগেছে।

জাহানারা: আমার মা এমনি কোনো স্কুলে লেখাপড়া শেখেননি। কিন্তু বাড়িতে নিজের চেষ্টায় কিছু লেখাপড়া শিখেছেন। উনি খুব বই পড়তে পারতেন। নয় মাস-যেদিন থেকে আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার শুনতে পেরেছি, সেইদিন থেকে উনি বোধহয় একটা দিনও বাদ দেননি। উনি খুব শুনতেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত থাকা-উনি এটা সমর্থন তো করতেনই এবং বুক দিয়ে রুমীকে আগলে রাখার চেষ্টা করতেন। রুমী যখন ধরা পড়ল, আমার মায়ের শোক তো আর মনে হয় আমার চেয়ে বেশি ছিল। মা তো জীবনে অনেক দুঃখ পেয়েছেন। রুমী তাঁর নয়নের মণি ছিল। মায়ের এই বই ছিল এবং চরমপত্র শুনতেন। কাজেই এম আর আখতারের সঙ্গে আলাপ করতে পেরে মা খুবই খুশি হয়েছিলেন। সে সময় এম আর আখতার মুকুল জনতা খুব অ্যাভয়েড করতেন। সবাই তাঁকে ঘিরে ধরত তো, তাই। তিনি তখন একজন চিত্রতারকার চেয়ে বেশি পপুলার। কিন্তু আমার মাকে কেন জানি উনি গ্রহণ করেছেন। মায়ের সামনে তিনি কোনো সংকোচ বোধ করতেন না।

সরদার: একাত্তরের ব্যাপারে একটা প্রশ্ন। এই যে ২৫ মার্চে গণহত্যা শুরু হলো, যাদের একটু সামাজিক-রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল, তাদের জীবনের একটা ভয়ের ব্যাপার ছিল তো। আপনি, রুমীর আব্বা, আপনার ফ্যামিলি-কোনো জায়গায় যাওয়ার দরকার মনে করেননি?

জাহানারা: না। কারণ আমরা তো কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। আমরা স্বাধিকার আন্দোলন এবং পরবর্তী পর্যায়ে স্বাধীনতার জন্য বা আমরা যে নিপীড়িত হচ্ছি পাকিস্তানি অত্যাচারে-ওই সব ব্যাপারে খুব সোচ্চার ছিলাম। কিন্তু আমরা তো পাবলিক ফিগার ছিলাম না। কিংবা কোথাও কোন বক্তৃতা বা কোন মিছিলে নেতৃত্ব দিইনি। সেই জন্য বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কথাটা আমাদের মনে আসেনি।

সরদার: আমরা দেখতে পাই, একাত্তরের দিনগুলি বলে আপনার একটা লিপি আছে, এর মধ্যে তো আপনার জীবনের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। এটা তো শুধু আপনার জীবনই না। লেখার ভক্ত যারা, তারা নিজেদের জীবন পাঠ করে আপনার লেখার মধ্য দিয়ে।

জাহানারা: খুব আনন্দ লাগছে শুনে।

সরদার: আমি এ জন্য জিজ্ঞেস করছি, আপনি এটা তৈরি করলেন, আমাদের বাংলা সাহিত্যে এ রকম ঘটনা ঘটেনি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পূর্ব-পশ্চিম বলে যে ধারাবাহিক উপন্যাস লিখেছেন তার মধ্যে একাত্তরের দিনগুলি থেকে ব্যবহার করে পরিচ্ছেদ তৈরি করেছেন।

জাহানারা: সেটা আমি দেখেছি। ’৭২ সালে ওঁর সঙ্গে পরিচয় হয়। রুমীর সঙ্গে যেসব ছেলে মুক্তিযুদ্ধে ছিল, তারা পরে অনেকেই আমাকে আম্মা বলে ডাকত। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শক্তি চট্টোপাধ্যায় যখন এসেছিলেন, তখন এম আর আখতার মুকুল দাওয়াত করেছেন। উনি আমাকে পরিচয় করিয়েছেন যে, এই জাহানারা, মুক্তিযোদ্ধা ছেলেদের আম্মা। শক্তি আর সুনীল তখন বলে, আমরাও তাহলে আপনাকে আম্মা বলে ডাকব। সেই থেকে তারা ‘আম্মা’ বলে ডাকে। সুনীল এবার এসেছিল। সে বলল, আম্মা, আপনার বইটা আমি অনেকবার পড়েছি। যতবারই পড়ি ততবারই আমার চোখে জল এসেছে। আপনার বই থেকে আমি অনেক ঘটনা নিয়ে আমার উপন্যাসে ব্যবহার করেছি।

সরদার: আমি জানতে চাইছি, আপনি এটা কীভাবে তৈরি করলেন?

জাহানারা: আমার চিরকালই একটা ডায়েরি রাখার অভ্যাস ছিল। কিশোর বয়সে হয়তো ডায়েরিতে আমার মনের ভাব-ভাবনা লিখতাম। পরে যখন সংসার করি, আমি একটা স্কুলের হেড মিস্ট্রেস। কোথায় গেলাম, কী করলাম-এই সব লিখতাম ডায়েরিতে। কিন্তু একাত্তরে যখন এই সব শুরু হলো তখন আমি আরেকটু বেশি করে লিখলাম, কিন্তু একটু চুম্বক আকারে। আমার ডায়েরি অব অ্যানা ফ্রাংক পড়া ছিল। কিন্তু আমার অনেক ভয় হতো। যদি কখনো মিলিটারি সার্চ করে। আমি করতাম কি, ডায়েরির পাতাটার মধ্যে খানিকটা বাঁ কোণ দিয়ে তেরছা করে লিখতাম, খানিকটা ডান কোণ দিয়ে, মানে একটা চিত্রের মতো করে, জ্যামিতি ছক করে এদিকে দুই লাইন, ওদিকে দুই লাইন। আর চার-পাঁচটা রং দিয়ে লিখতাম। চার-পাঁচটা রং ছিল, পেনসিল ছিল, কলম ছিল। আবার যেমন কতকগুলো অপ্রয়োজনীয় কথাও থাকত। জমাদারনি আর আসেনি। কাঠমিস্ত্রিকে টাকা দিলাম। আর ফাঁকে ফাঁকে সাংকেতিক ভাষায় এই সব জিনিস লিখতাম। এইভাবে লিখতাম এই জন্য যে হঠাৎ যদি মিলিটারি এসে সার্চ করে তবে ডায়েরি দেখে যেন মনে করে, ও কি একটা হিজিবিজি, এই দিকে একটা ওই দিকে একটা, ব্যাঁকাত্যাড়া। জমাদারনি, কাঠমিস্ত্রি-এই সব অমুক-সমুকের মধ্যে তেমন কিছু নেই। কিন্তু ওর মধ্যেই আমার সব আছে। যেমন, মুক্তিযোদ্ধাদের একটা ছেলেকে দিয়ে ৫০০ টাকা পাঠালাম। লিখলাম যে অমুককে পাঁচটা বই দিলাম। তারপর রুমীর নামটা উল্টিয়ে মীরু এইভাবে লিখতাম। একাত্তরে ছেলে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল। আমি জানতাম, ছেলেকে আমি হারাতে পারি। কিন্তু আমি কল্পনাও করতে পারিনি যে একই সঙ্গে স্বামীকেও হারাব। সেই জন্য আমার দশা অনেকটা একচোখা হরিণের মতো। সে তার কানা চোখটা সমুদ্রের দিকে দিয়ে ঘাস খেত। ভাবত যে সমুদ্র থেকে কোন বিপদ আসবে না। বিপদ এলে ডাঙার দিক থেকে আসবে। আমি আমার ভালো চোখটা ছেলের দিকে রেখেছিলাম, কানা চোখটা স্বামীর দিকে ছিল। ভাবিনি যে স্বামীর হার্টঅ্যাটাক হতে পারে।

সরদার: রুমীর আব্বার কি হার্টের প্রবলেম আগেও ছিল?

জাহানারা: না। এমনি হাই ব্লাডপ্রেসার ছিল। কিন্তু তাঁর কোলেস্টেরল ছিল। কিন্তু ঠিক হার্টঅ্যাটাক যাকে বলে সেটা তখন হয়নি। আমি যেটা বলছিলাম তাকে ফিরে যাই। আমি এভাবে ডায়েরি রাখতাম। ১৩ ডিসেম্বর যখন আমার স্বামীও মারা গেলেন, আমি অনেকটা শোকে আধপাগলের মতো হয়ে গেলাম। আমার বন্ধুবান্ধবের সার্কেল খুব বড় ছিল। আত্মীয়স্বজন অনেক। মুক্তিযোদ্ধা ছেলেগুলোও তখন সবাই আসত। এত লোক আসত। তাদের সঙ্গে কথা বলা, তাদের আপ্যায়ন করা, এটা-ওটা-এই সবে সময় কেটে যেত। তখনো কিছুদিন যেন বিশ্বাস হয়নি যে রুমীকে মেরে ফেলেছে। কাজেই রুমীর খোঁজখবর রাখতাম। মেজর হায়দার তখন ঢাকার চার্জে ছিল। মেজর হায়দারই তো রুমীকে হাতে ধরে মানুষ করেছিল। তার তখন ঢাকায় জায়গা ছিল না। আমি মেজর হায়দারকে বললাম, তুমি আমার বাসায় থাকো। যা হোক, আমি কিন্তু পাঁচ-সাত বছর আর ডায়েরি লেখার চিন্তা করিনি। কিন্তু পরে আস্তে আস্তে একটু লিখতে শুরু করলাম। তখন মাঝে মাঝে ডায়েরিটা আমি পড়তাম আর লিখতাম। পড়ার পর ভীষণ কষ্টে ভেঙে পড়তাম। আবার ওটা বাদ থাকত। তারপর ’৮০-৮১ সাল যখন এলো, আমি এক-ওকে বললাম যে আমার রুমীর কথা লিখতে চাই, আমার ডায়েরি আছে। সচিত্র সন্ধানীর সম্পাদক গাজি সাহাবুদ্দিন আমাকে খালাম্মা বলে। বিচিত্রার সম্পাদক শাহাদাত চৌধুরী আম্মা বলে, কাইয়ুম চৌধুরীও বন্ধু। ’৮২ সালে আমার ক্যান্সার অপারেশন হলে আমি বাইরে বেশি বের হতে পারতাম না। তখন গাজী একটা বই এনে দিয়ে আমাকে বলে, খালাম্মা, আপনি অনুবাদ করেন। বইটি ডালাস। সেটা সন্ধানীতে ছাপা হতে লাগল। তারপর সে আমাকে বলল, আপনি বিদেশিদের জন্য বাংলা বই লেখেন। আমি ছাপাব। তখন আমার খুব ইচ্ছে হলো লিখতে। আমি অনেক দিন ধরে বিদেশীদের বাংলা পড়াই।একটা ধ্যান-ধারণা ছিল। অপারেশনের পর আমি যে সেমি-ইনভ্যালিড, আমার মনটা খুব ভালো হয়ে গেল। পরে ও আমাকে দিয়ে আরও একটা বই অনুবাদ করাল। তারপর ’৮৪ সালের ডিসেম্বর মাসে কাইয়ুম ভাই আর ও দুজনে মিলে প্ল্যান করলেন আমাকে দিয়ে ডিসেম্বর শেষ দুই সপ্তাহ মানে বিজয়ের আগের দুই সপ্তাহের ঘটনা লেখাবেন। ৯ ডিসেম্বর একটা সংখ্যা বেরোবে, আর ১৬ ডিসেম্বর অন্য সংখ্যা। আমার এতো উৎসাহ লাগল যে ১ ডিসেম্বর আমি লিখে ফেললাম ডায়েরি দেখে দেখে। ছাপা হওয়ার পর এদিক-ওদিক তেকে খুব ফোন আসে। সবাই খুব অ্যাপ্রিশিয়েট করছে। তখন কাইয়ুম ভাই এবং গাজী বলল যে ওনাকে দিয়ে ’৮৫-তে পুরো নয় মাসই লেখানো হবে। ওরা তখন বলেছে, আপনি ২৫ মার্চ থেকে লিখে যান। আমি বলি, না, ১ মার্চ থেকে শুরু হবে। ১ মার্চ থেকেই তো অগ্নিস্ফুলিঙ্গটা ঘটল, অ্যাসেম্বলি বাতিল করে দিল। জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি আমি একটু রিসার্চও করলাম। ন্যাশনাল আর্কাইভে গিয়ে ওই সময়ের কাগজ পড়ে আর আমার ডায়েরি মিলিয়ে পড়ে পড়ে নোট করে তারপর আমি লিখতে শুরু করি।

সরদার: একাত্তরের দিনলিপি আপনি কীভাবে তৈরি করেছেন? সব ঘটনা বিস্তারিত এসেছে। এত বিস্তারিত কি আপনি নোট রাখতে পেরেছিলেন, নাকি স্মৃতি থেকে এইটা বিস্তারিত করেছেন?

জাহানারা: আপনাকে বললামই যে ন্যাশনাল আর্কাইভে গিয়ে একাত্তরের কিছু কাগজটাগজ দেখেছি, কবে কোথায় কী মিটিং হতো, প্রতিবাদের মিটিং হতো-এসব। আমার ডায়রিতে হয়তো লেখা থাকত, আজকে পাঁচটায় বাংলা একাডেমিতে মিটিং, যাব ওখানে। পরে কোন মিটিংটা কী প্রসঙ্গে হয়েছিল এবং নামটামগুলো আমি কাগজ দেখে ঠিক করে নিয়েছি। তার পরও ধরুন, ছেলেদের যে অ্যাশনগুলো হতো, শাহাদাত চৌধুরী আর আলম ঠিক কোন তারিখে ঢাকায় এসেছিল, এসে যে তারা আমার কাছ থেকে ওই ব্রিজের ডিজাইন নিয়ে গেল-মানে আমার স্বামীর কাছ থেকে জোগাড় করে দিলাম-নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু ও রাইসুল ইসলাম আসাদ। আমি ঘটনাগুলো প্রথমে লিখেছি। তারপর এদের ডেকি বলেছি, ঘটনাগুলো তোমরা শুনে আমাকে বলো। তা ছাড়া ওদের ডেকে আমি ক্যাসেটে বলেছি, তোমাদের ঘটনাগুলো আগে আমাকে বলো। আবার আমি বলছি, যাতে আমার স্মৃতিবিভ্রম না হয়ে যায়। যেমন ধরুন, আমি আপনাকে বলতে পারলাম না শেখ মুজিবের সঙ্গে ৩২ নম্বরে দেখা হয়েছিল, না গণভবনে। সেটা যেমন আমার মনে নেই। তেমনি অনেক ঘটনা আমার মনে না-ও থাকতে পারে। কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা তো ভীষণ রকম উজ্জ্বল। তবু তারিখ যেন ভুল না হয়ে যায়, আর একেক অপারেশনে কয়টা করে ছেলে ছিল, কে কে ছিল। যেমন আমি রুমীর একটা অপারেশনের কথা লিখেছি। তারা ছয়জন ছিল গাড়িতে কিন্তু কে সামনে বসেছে, কে পেছনে বসেছে, আমি এ ব্যাপারে প্রত্যেককে ডেকেছি, কিন্তু একসঙ্গে ডাকিনি। ছয়জনের মধ্যে চারজন বেঁচে আছে। আর চারজনকে আলাদা করে ডেকে ক্যাসেটে ওদের কথা শুনে লিখেছি। তারপর বিচিত্রার সম্পাদক শাহাদাত চৌধুরী আমাকে খুব হেল্প করেছে। ও তো ওদের সঙ্গে ছিল সব সময়। কখন কোন ঘটনা ঘটল, জানে।

এ রকম একটা ঘটনা হলো যে, দেখা যাচ্ছে, আলম বলছে আমরা পাঁচজন ছিলাম, সেলিম বলছে যে আমি সেই ওয়েতে ছিলাম। এখন সেলিমের কথা আলমের মনে নেই, কিন্তু কাজীর মনে আছে। কাজী বলল, হ্যাঁ, সেলিম ছিল। তখন শাহাদাত আলমকে আলাদাভাবে জিজ্ঞেস করল। তখন আলম বলেছে, হ্যাঁ, বোধহয় গাড়িতে ছয়জনই ছিল। সামনে তিনজন বসায় গিয়ার দিতে গেলে একজনের হাঁটুতে হাত ঠেকে যাচ্ছিল। এভাবে শাহাদাত আমাকে এই নয় মাসের প্রতিটি ঘটনার বিবরণ দিয়েছে। আমি লিখেছি, অন্যদের কাছ থেকেও একবার করে শুনে নিয়েছি, যাতে স্মৃতি আমাকে বিভ্রান্ত না করে। বাদল, আলম, শাহাদাত চৌধুরী-এরা সব সময় আমাকে সাহায্য করেছে। আমি বলেছি যে আমি স্মৃতি থেকে লিখলাম, তোমরা দেখো মিলছে কি না। পরে যাতে কেউ বলতে না পারে যে আপনি এটা ঠিক লেখেননি। এমনকি আলতাফ মাহমুদের চার শালা দিনু, খনু, নেহেল, লিনু-এদের আমি আলাদাভাবে ডেকে ক্যাসেটে ওদের বলতে বলেছি। তারপর সবগুলো শুনেছি, ট্রান্সক্রাইব করেছি। ডিসক্রিপেন্সি থাকলে আবার দেখেছি। এরা চার ভাই একসঙ্গে ছিল তো, তাই এদের আবার ডেকেছি, ডেকে মিলিয়েছি। কারণ স্মৃতির ব্যাপার তো। যাঁরা জীবিত আছেন, তাঁরা যেন কাউকে বলতে না পারেন, আপনি ঘটনাটা ঠিক লেখেননি।

সরদার: অর্থাৎ আপনার এই রচনা শুধু স্মৃতিচারণা নয়। পরিশ্রমলব্ধ গবেষণা যথাসাধ্য ওর সঙ্গে মিশ্রিত হয়েছে। আপনি নিজে থেকে আরেকটু বলুন।

জাহানারা: যখন লিখতে শুরু করলাম, তখন আমি ভাবলাম যে রুমীর কথা লিখব, যাদের জন্যে লিখছি তাদের হৃদয় যেন এটা প্রবেশ করে। তারা (যেন) মনে না করে যে এটা শুধু জাহানারা ইমামের পারিবারিক ব্যাপার। এ ব্যাপারে আমি খুব সচেতন ছিলাম। আমি চেষ্টা করেছি আমাদের সঙ্গে যারা যুক্ত ছিল তাদের প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত জীবনে যে ট্র্যাজেডিগুলো ঘটেছে সেগুলো আনতে। আপনি বোধহয় লক্ষ করেছেন যে আমি একটা আঙ্গিক গ্রহণ করেছিলাম। সেটা হলো, আমি একাত্তরে আমার ছেলের মারফর যেভাবে যতটুকু জানতে পেরেছিলাম সেই ধারাটা ঠিক রাখতে চেষ্টা করেছি। ’৮৫ সালে আমি তো সব ঘটনা জানি। কিন্তু বইতে (এই) ধারা মেইনটেইন করেছি, তখন একজন গৃহবধূ এবং মা হিসেবে রুমী বা অন্যদের মুখ থেকে যেভাবে জেনেছি সেভাবেই লিখেছি।

সরদার: রুমী এখন আর আপনার ব্যক্তিগত সন্তান না। দেশের সন্তান হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। যে দায়িত্ব আপনি পালন করেছেন, সে দায়িত্বের প্রতিদানে আপনি কী পাবেন, সেটা আপনার মনে আসে না।

জাহানারা: প্রতিদান আমি হাজার হাজার গুণ পেয়ে গেছি। প্রত্যেকটি পাঠকের যে ভালোবাসা আমি পেয়েছি, তাতে আর কোনো প্রাপ্তির আশা আমার নেই।



[বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের ‘কথ্য ইতিহাস প্রকল্প’ থেকে সংগৃহীত]

এছাড়া ২০০৯ সালে প্রথম আলো ঈদসংখ্যায় সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়।

লেখাটি প্রথম অনলাইনে প্রকাশিত হয় নর্ফিকা সাইটে
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors