সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label হাসান আজিজুল হক. Show all posts
Showing posts with label হাসান আজিজুল হক. Show all posts

সক্রেটিস - হাসান আজিজুল হক

amarboi
সক্রেটিস - হাসান আজিজুল হক
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

চালচিত্রের খুঁটিনাটি - হাসান আজিজুল হক

amarboi.comচালচিত্রের খুঁটিনাটি - হাসান আজিজুল হক

হাসান আজিজুল হকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে: গল্পগ্রন্থ- সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য (১৯৬৪), আত্মজা ও একটি করবী গাছ (১৯৬৭), জীবন ঘষে আগুন (১৯৭৩), নামহীন গোত্রহীন (১৯৭৫), পাতালে হাসপাতালে (১৯৮১), আমরা অপেক্ষা করছি (১৯৮৮), রোদে যাবো (১৯৯৫), মা মেয়ের সংসার (১৯৯৭), বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প (২০০৭), রাঢ়বঙ্গের গল্প (১৯৯১), নির্বাচিত গল্প (১৯৮৭), হাসান আজিজুল হকের শ্রেষ্ঠগল্প (১৯৯৫)। উপন্যাস- বৃত্তায়ন (১৯৯১), আগুনপাখি (২০০৬), শিউলি। নাটক - চন্দর কোথায় (জর্জ শেহাদের নাটকের ভাষান্তর) প্রবন্ধ- চালচিত্রের খুঁটিনাটি, একাত্তর: করতলে ছিন্নমাথা, কথাসাহিত্যের কথকতা, অপ্রকাশের ভার, অতলের আধি, সক্রেটিস, কথা লেখা কথা, লোকযাত্রা অআধুনিকতা সংস্কৃতি। শিশুসাহিত্য- লালঘোড়া আমি (১৯৮৪ সালে প্রকাশিত কিশোর উপন্যাস), ফুটবল থেকে সাবধান (১৯৯৮ সালে প্রকাশিত শিশুতোষ গল্প)।
জাতীয় সাহিত্য প্রকাশন থেকে পাঁচ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে হাসান আজিজুল হকের রচনাসংগ্রহ।
তিনি ১৯৬৭ সালে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার এবং ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আরও অনেক পুরস্কার, পদক ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি। এসবের মধ্যে রয়েছে লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩), অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪), ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮), কাজী মাহবুব উল্লাহ ও বেগম জেবুন্নিসা পুরস্কার। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পদক 'একুশে পদকে' ভূষিত হয়েছেন হাসান আজিজুল হক।
দীর্ঘ ৩১ বছর অধ্যাপনার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরে নিজ বাড়ি 'উজান'-এ প্রতিদিনের সবটুকু সময় লেখালেখি নিয়ে বিমগ্ন আছেন তিনি।

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

ভূতের কষ্ট - হাসান আজিজুল হক [ছোটগল্প]

amarboi
ভূতের কষ্ট

হাসান আজিজুল হক

নিমগাছের ডালে বসেছিলো হাভাতে ভূত। ছয় ফ্লাটের বিরাট বাড়িটার একটা জানালার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে চেয়ে ভাবছিলো ঢুকে পড়বে কিনা। এই সময় ঝপ করে জানলা বন্ধ হয়ে গেল। হাভাতে ভূত চেয়ে দেখলো জানলার উপরের দিকের কাচ দিয়ে রান্নাঘরটা দেখা যাচ্ছে। বাসায় ঝি ঝন্ ঝন্ ঠক্ ঠক্ শব্দে হাঁড়ি পাতিল মাজছে। আফসোস্ হলো হাভাতের, এখন সে ভিতরে ঢুকবে কি করে? ঝি বেটিকে বাগে আনার চমৎকার সুযোগ ছিলো। জানলা খোলা থাকতে ঢুকে পড়লেই হতো, এখন তো আর ঢোকা সম্ভব নয়। অনেকের ধারণা, ভূত ইচ্ছে করলেই যেখানে খুশি যেতে পারে—দরজা জানলা বন্ধ থাকলেও তাদের কিছু এসে যায় না। তারা দেয়াল ভেদ করে ঘরে ঢোকে। ভূতদের সম্বন্ধে এই রকম ধারণা ঠিক নয়। হাভাতে যখন ভূত হয়নি তখন তারও এই রকম ধারণা ছিলো। কিন্তু এখন ভূত হবার পরে সে দেখছে যে, তার মূল অসুবিধে হচ্ছে সে বর্তমান নয়, অতীত। সে এখন নেই, কোনো এক সময়ে ছিলো। তার মানে, সে কোথাও ঠিক উপস্থিত নেই। কোথাও উপস্থিত হলে নিজেও যেমন সেটা বিশ্বাস করতে পারে না, অন্যেরাও বিশ্বাস করে না। ভূত হয়ে যাবার পরে হাভাতে এমন সব অসুবিধের মুখোমুখি হবে চিন্তাও করেনি। সে যখন খুশি অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে ঠিকই—বলতে গেলে অদৃশ্য হওয়াটাই তার একমাত্র সুবিধে—এ জন্য তাকে চেষ্টাই করতে হয় না। অদৃশ্য যেন সে হয়েই আছে। খুব কষ্ট করেই সে দৃশ্য হতে পারে। হাত পা মাথামুণ্ডু প্রাণপণ চেষ্টায় এক জায়গায় করে সে দৃশ্যমান হতে চায়, কি রকম বিজ বিজ করে সব আলাদা হয়ে যায়, হাভাতে কিছুতেই ঠেকাতে পারে না। মাটি থেকে পাঁচতলা ছাদটায় লাফ দেওয়া, হুস করে উড়ে যাওয়া এসব সে সহজেই পারে। ইচ্ছেমতো ছোটো বড়োও সে মোটামুটি হতে পারে। কিন্তু দেয়াল ভেদ করে যাওয়া বা জানলা বন্ধ থাকলেও ঘরে ঢুকে পড়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। খোঁজ নিয়ে জেনেছে কোনো ভূতের পক্ষেই তা সম্ভব নয়। দেহের সুবিধে প্রায় কিছুই নেই কিন্তু অসুবিধে সবই আছে।

হাভাতে বরাবরের ভূত নয়। হালে হয়েছে। সে রাতটা তার খুব মনে পড়ে। তিন ছেলেমেয়ে বউ সুদ্ধ উপোস চলছিলো। আর শালার বৃষ্টি পনেরো দিনেও ধরে না। সন্ধে নামলো। অন্ধকারের মধ্যে একটানা বৃষ্টি হতে লাগলো। বিদ্যুৎ চমকানি নেই, মেঘ ডাকাডাকি নেই, বাতাসের আওয়াজ নেই, একঘেয়ে ঝম্ ঝম্ বৃষ্টির শব্দ শুধু। শুনতে শুনতে হাভাতের মনে হলো পৃথিবীর কোথাও কোনো মানুষ বেঁচে নেই, বেঁচে থাকার দরকারও নেই। বৃষ্টি হতে হতে পৃথিবীটাই গলে ধুয়ে উবে যাবে। ওর নিজের এখন একমাত্র কাজ হচ্ছে, গলায় দা দিয়ে এক এক করে ছেলেমেয়ে তিনটে আর বউটাকে সাবাড় করে দেওয়া।

চালের ছ্যাঁদা দিয়ে ঘরের মধ্যে নানা জায়গায় বৃষ্টি পড়ছে। কোণে একটা কালিভরা হারিকেন। আরেকটু পরেই নিভে যাবে। এখন গল গল করে ধোঁয়া ছাড়ছে। এমন তীব্র নেশা এলো হাভাতের যে বউ ছেলেমেয়ে খুন করা পর্যন্ত তার তর হইলো না। ঘরের আড়ায় ছেঁড়া চাদর ছুঁড়ে সে ঝুলে পড়লো। ফট করে ঘাড় ভেঙে সে-ও মরলো, চাদরটাও ছিঁড়ে তাকে নিয়ে মাটিতে নেমে এলো।

মরার কালে হাভাতের শরীরে একটি জিনিসই ছিলো—তীব্র খিদে। বেঁচে থাকার সময় সে শুনেছিলো, মরলে সব জ্বালা যন্ত্রণা জুড়িয়ে যায়। মানুষ খিদেতেষ্টা, রোগযন্ত্রণা, হাগামোতা সব কিছুর উপরে উঠে যায়। মরার পর হাভাতে দেখলো সব ভুল। পেট নেই খিদে আছে। পেট থাকলে খিদের চোটে চোখে অন্ধকার দেখে পেটে কাপড় বাঁধা যায়। কিন্তু পেট না থাকলে সেটা করা যায় না। তবে ভূতদের একটা সুবিধের কথা হচ্ছে, তারা যে যা যন্ত্রণা নিয়ে মরেছিলো ঠিক সেই যন্ত্রণা ছাড়া অন্য আর কোনো কষ্টযন্ত্রণা ভোগ করে না। খিদে নিয়ে হাভাতে মরেছিলো। এখন খিদে ছাড়া তার আর কোনো বোধ নেই। বউটাও তো কদিন পর মরেছে। মাঝে মাঝে দেখাও হয়। জ্যান্ত থেকে সংসার করার সময় বউটাকে মাঝে মাঝে দখল করার জন্যে যে তীব্র খিঁচুনি হতো তার মধ্যে—কই, সে সব তো আর একবারও মনে হয়নি। ও বেটি ছানা তিনটের জন্যে হেদিয়ে মরছে।

যাক, এখন কথা হচ্ছে, রান্নাঘরের জানলা তো বন্ধ হয়ে গেলো। অতোবড়ো বিল্ডিং-এর পিছন দিকের একটা জানলাও খোলা দেখা যাচ্ছে না। তাহলে সে করে কি এখন?

পেট ভরা অথচ পেট রোগা কাউকে তো এখন পাওয়া দরকার। একটা মেয়েমানুষ হলেই ভালো হয়। আঁ আঁ আঁ শব্দ করে চিৎ হয়ে পড়ে। ওর পেটের খাবারটা নিজের যে পেট নেই সেই পেটে নিতে সুবিধে হয়। যে সব ভুঁড়িওয়ালা ভদ্রলোকেরা ঐ বাড়িগুলিতে থাকে, ভরপেটে তারা যখন বিছানায় কাৎ হয়ে শুয়ে পান জাবর কাটে তখন তাদের কাছে যাওয়ার সাহস হাভাতের হয় না। যখন বেঁচে ছিলো তখন তাদের কাছে ঘেঁষতো না, এখনো তেমনি কাছে ঘেঁষতে চায় না।

হাভাতের পক্ষে আর খিদে সহ্য করা সম্ভব হচ্ছে না। এখানকার আশা ছেড়ে দিয়ে সে হঠাৎ হুস করে উড়ে তিনতলা, চারতলা বাড়িগুলির উপর দিয়ে বিকেলের রোদের মধ্যে মাটিতে ছায়ার কোনো চাপ না রেখে নদীপাড়ের গ্রামটিতে চলে এলো। তখন শীতের রোদ ঝিলমিল করছে। মাথা নামিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে নিচের দিকে চেয়ে দেখতে দেখতে হাভাতে উড়ছে। গালে হাত দিয়ে গাঁয়ের মানুষেরা বসে আছে, কেউ মাটির দাওয়ায়, ... কেউ সোঁদা গন্ধভরা অন্ধকার ঘরের স্যাঁতসেঁতে মেঝেয়। মেয়েরা উঠোনে বসে উকুন বেছে দিচ্ছে না বা চুল বাঁধছে না। শুধু এক জায়গায় দেখা গেলো উঠোনের একপাশে বসে এক কিশোরীর চুলের জট্ ছাড়ানো হচ্ছে।

মেয়েটা একবার কি বলতে গুম্ গুম্ করে তার পিঠে তিনটে কিল বসিয়ে দিল তার মা। হাভাতে খুঁজছিল একটি ভারভারন্ত বউ। দুপুরে ভরপেটে ভাত খেয়ে একটি পান মুখে দিয়ে শুয়েছে সে। স্বামী পাশে শুয়েছে। এখন ঘুমিয়ে চোখমুখ ফোলা। পেটটা এখনো ভরাট আছে। পেটে বাচ্চা আছে বলে খাবার হজম হতে অনেকটা সময় লাগে। এই রকম একটা বউ পেলে হাভাতে লাফিয়ে পড়তে পারে। কিন্তু কিছুতেই তেমন কাউকে খুঁজে পেলো না সে। এদিকে সন্ধ্যে হয়ে আসছে। একটু পরেই অন্ধকার নেমে আসবে। আলো বোধ হয় কোনো ঘরেই জ্বলবে না। হাভাতে দেখলো চিমসে শুকনো সব মেয়েরা ঘরে উঠোনে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কি আর করে সে? কলতলায় একটি যুবতীকে পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার উপর সে ভর করলো। কাজ হলো ঠিকই। আঁ আঁ আঁ শব্দ করে মেয়েটা দাঁতকপাটি লাগিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লো। কাজে লেগে গেল হাভাতে। হাঁজোর পাঁজোর করে ওর পুরো পেটটা ঝেড়ে নিল। নিজের তো পেট নেই। আছে ভীষণ খিদে। সেই খিদের আগুনে মেয়েটার পেট থেকে যা পাওয়া গেল সব নিয়ে নিলো হাভাতে। নিয়ে মেয়েটিকে ছেড়ে সে উঠে দাঁড়ালো। না, কিছুই জোটেনি তার। মেয়েটার চোখে মুখে পানি-টানি দেওয়া হচ্ছে। হাভাতে আরেকজনের খোঁজে এগিয়ে গেল হাঁফাতে হাঁফাতে। কেউ তো আর জানে না, একমাত্র ভূতই জানে, কারো উপর ভর করতে কি অসম্ভব পরিশ্রম করতে হয় তাদের। কিন্তু উপায় নেই। পুকুরের ঢালু পাড়ে প্রাকৃতিক কাজ সারছিলো এক প্রৌঢ়া। সে উঠে দাঁড়াতেই তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো হাভাতে। বেচারি হাউ মাউ করে ঢালু বেয়ে গড়িয়ে একটা জমির আলে গিয়ে ঠেকলো; দাঁতকপাটি তারও লাগলো। কিন্তু হাভাতের লাভ হলো না কিছুই। শুকনো নাড়িভুঁড়ির গন্ধে ভূত হয়েও তার বমি এলো। অন্যের খাবার কেড়ে নেবার এমন চমৎকার সুবিধে ভূতের রয়েছে। কিন্তু কেউ যদি খাবারই না খায় তাহলে সে তৈরি করবার ক্ষমতা তো তাদের নেই। তিন তিনবার এই রকম ভর করবার ক্লান্তিতে হাভাতে আর একবার মরতে বসেছিলো প্রায়। এ সময় দেখা হয়ে গেলো তার নিজের বউ-এর সঙ্গে। ওকে দেখেই সে বুঝতে পারলো, ভালো-মন্দ ভালোই জমা পড়েছে তার পেটে। যদিও তার পেটই নেই।

রে রে রে করে শব্দহীন বিকট চিৎকারে সে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। হকচকিয়ে গেলেও বউ বুঝলো, এ তার পুরনো কামড়ানো অভ্যেস। সে কোনো রকম আপত্তি করার চেষ্টা করলো না। কিন্তু ভূত হয়ে যাবার পরে তার পক্ষেও কোনো কিছু আর টের পাওয়া সম্ভব নয়। কাজেই সে নিশ্চেষ্ট হয়ে শুয়ে রইল।

হাভাতে ভূত হাঁফাতে হাঁফাতে উঠে পড়ে বউ-এর দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে রইলো। তার খেয়াল হলো, ভূত জ্যান্ত মানুষের খাওয়া তার পেট থেকে খেয়ে নিতে পারে। মানুষ তা টের পায় না কিন্তু ভূত ভূতের খাওয়া লুট করতে পারে না তার পেট থেকে। হাভাতে লজ্জায় দুঃখে মিসমার হয়ে আবার নিমগাছের ডালে গিয়ে বসলো।

১৯৮২

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

একাত্তর করতলে ছিন্নমাথা - হাসান আজিজুল হক

একাত্তর করতলে ছিন্নমাথা - হাসান আজিজুল হক
একাত্তর করতলে ছিন্নমাথা
হাসান আজিজুল হক

আমাদের কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক যখন আমাদের ইতিহাসের মহত্তম ঘটনায় শরিক থাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনায় অগ্রসর হন, তখন নিঃসন্দেহে গভীরতর ব্যঞ্জনা নিয়ে ফুটে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা। কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক তার দেখা একাত্তরের ভাষ্য শুরু করেছেন নিস্পৃহ নিরাবেগ ভঙ্গিতে। বইয়ের সূচনাবাক্যে তিনি লিখেছেন : আমার জানা ছিল যে পানিতে ভাসিয়ে দিলে পুরুষের লাশ চিৎ হয়ে ভাসে আর নারীর লাশ ভাসে উপুড় হয়ে। এই জ্ঞান আমি পাই '৭১ সালের মার্চ মাসের একেবারে শেষে। জীবনের নিষ্ঠুরতার বর্ণনায় এমনি অসাধারণ সংযমী শিল্পদৃষ্টির প্রকাশ আমাদের এক লহমায় দাঁড় করিয়ে দেয় কঠিন সত্যরূপের মুখােমুখি। শক্তিমান লেখকের সংহত জীবনদৃষ্টি এমনিভাবেই পরতে পরতে উদ্ভাসিত হয়েছে এই গ্রন্থে । একান্ত ব্যক্তিগত ছােট-বড় সাধারণ অভিজ্ঞতাসমূহ শিল্পের পুণ্যস্পর্শে তিনি করে তুলেছেন সর্বকালীন ও সর্বজনীন। শিল্পী অশােক কর্মকারের তুলিস্পর্শে নতুনভাবে বিন্যস্ত এই সংস্করণ পাঠকের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে গ্রন্থের পাঠ আরাে নিবিড় করবার লক্ষ্য। নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অজস্র বইয়ের ভিড়ে তাই উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হিসেবে অনায়াসে চিহ্নিত হবে এই গ্রন্থ।
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

ছোটগল্প | স্বপ্নেরা দারুণ হিংস্র - হাসান আজিজুল হক


স্বপ্নেরা দারুণ হিংস্র
হাসান আজিজুল হক

সকালের খাবারের পর এক কাপ দুধ-চিনি ছাড়া ঠাণ্ডা চা তিন চুমুকে গিলে নিয়ে লেখক তাঁর স্ত্রীকে বললেন, আমি লেখার ঘরে যাচ্ছি, কেউ আমার সঙ্গে দেখা করতে এলে বলবে, দেখা হবে না, আমার স্বপ্ন দেখা চলছে। স্বামীর দিকে একবার স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে দেখলেন লেখকের স্ত্রী। সত্যি, অনেকদিন তো তেমন করে দেখেননি স্বামীকে! গোল মাথার সমস্ত চুল উঠে গেছে, পরিচ্ছন্ন রোঁয়াহীন শালগমের মতো দেখাচ্ছে মাথাটা। ঘাড় যেন কয়েকগুচ্ছ নড়বড়ে দড়ি, মাথাটাকে ধরে রাখতে থরতর করে কাঁপছে। হাত পা সরু সরু। চোখে পড়ে বিরাট একটা ভুঁড়ি, শরীর থেকে বাড়তি, এক কোপে ওটাকে নামিয়ে দিতে পারলেই শরীরটায় যেন সামঞ্জস্য ফেরে। স্ত্রী ভাবলেন, শামলা রঙের লোহার মতো শক্ত মজবুত কাঠামোর লম্বা চুলের উজ্জ্বল চোখের সেই মানুষটি কোথায়! তিনি শুধু বললেন, আচ্ছা বলব।

নিজের ঘরে এসে উত্তরের জানলা খুললে বাইরে নিমগাছ আর বড়ো ফাঁকা একটা মাঠ। অনাবাদি পাথুরে টিলার মতো উঁচু জায়গাটার ঢালুতে একটা বড়ো মরা গরু ফেলে দিয়ে গেছে কেউ। গোটা কতক কুকুর আর শকুন দেখা যাচ্ছে সেখানে। শকুন তো দেখা যায় না আজকাল! মরা গরুও তেমন দেখা যায় না। গরুদের মরার কোনো সুযোগই হয় না, তার আগেই ওদের গলায় ছুরি বসে। কসাইয়ের ছুরি ফসকে এক আধটা গরু মরে গেলেও আবার তারা কসাইয়ের দোকানে ঝোলে। একবার এক পড়ো ভুতুড়ে বাড়িতে রাত কাটাতে হয়েছিল, সকালে পায়খানার দিকে যেতে ছাদ ছাড়া ভাঙা ঘরটার মধ্যে একটা কুকুরের মুণ্ডু দেখেছিলেন, লাল রঙের কুকুরটার ধড়ও চোখে পড়েছিল। যে লোকটা তার ছাল ছাড়াচ্ছিল, তার পিছনে দশ বছরের একটি ছেলে গলা নামিয়ে বলেছিল, আদমি আয়া, দেখতা হ্যায়। কুকুরটার স্বাস্থ্য বেশ ভালো ছিল।

লেখকের স্বপ্ন দেখা শুরু হয়ে গেল। ধুলোর পাহাড় সরিয়ে নিজের চেয়ারে বসতে হয় তাঁকে। পা থেকে ভুরু পর্যন্ত ধুলোয় ডোবা। গলার মধ্যে ঢুকে যায় শুকনো হড়কড়াই ধুলো, দমকে দমকে কাশি উঠে আসে নাভিমূল থেকে, কষ বেয়ে নেমে আসে লালায়-ভেজা আঠালো ধুলোর সরু নালি, জিভে মাটির রোদা স্বাদ। শুধুমাত্র চোখ দুটিকে ধুলোর বাইরে আনেন লেখক, চোখ দুটি খোলা না থাকলে স্বপ্ন দেখতে পান না তিনি। দুপাশে কাঠের আর লোহার র্যাোকে হলুদ হয়ে যাওয়া বইয়ের সারি, সমস্ত অক্ষর উঠে গেছে, ধুলো একটা অক্ষরও আস্ত রাখেনি, সমস্ত শুষে খেয়ে নিয়েছে। আঙুল দিয়ে মুছে মুছে তবে অনেক সময় দেখা যায় কিছু কিছু অক্ষর আধ-খাওয়া রয়েছে। আঙুলের ডগায় সেই সব অক্ষরের ভাঙা জায়গাগুলো করকর করে। সমস্ত বইয়ের কাঁধে এমনিই ধুলোর প্রতাপ যে কারো নাম পড়া যায় না।

কোলকুঁজো হয়ে লেখক চেয়ারে বসলে দুমদাম করে এক একটি বই র্যা ক ছেড়ে উঠে এসে তাঁর উপরে পড়ে। পত্রিকাগুলো উড়তে থাকে আকাশের অনেক উঁচুতে ঠিক যেন শকুনের ঝাঁক, নিঃশব্দে কালো বিন্দুর মতো চক্কর দিতে দিতে তারা নিচে নামে, শেষে ঝটপট শব্দে ডানা গুটিয়ে নিতে নিতে লেখকের ঘাড়ে ঝেঁপে আসে। একসাথে একটা গোটা র্যা কের সমস্ত পত্রিকা উড়ে এসে তাঁকে সম্পূর্ণ ঢেকে দেয়। শুধুমাত্র ময়লা চোখ দুটি ছাড়া লেখক পুরোপুরি ঢাকা পড়েন, হ্যাঁ, এখন তিনি স্বপ্নের মতোই স্পষ্ট বিশ্বাসযোগ্য দেখতে পাচ্ছেন জিনিসপত্র, মানুষজন, বারান্দার উপর ঘটিবার মতো সাজানো নানা ঘটনা। স্পষ্ট কিন্তু এলোমেলো। আবার স্বপ্নে যেমন হয়, আবছা, রহস্যময়, ফিকে, আঁধার, স্বপ্নের যা স্বভাব, মিশে গলে কাদার মতো ঢলঢলে হয়ে যাওয়া। যেমন সারাজীবন তিনি যা লিখতে চেয়েছেন, কিন্তু লিখতে পারেননি, এখন স্বপ্নে দেখা ছাড়া আর লিখতে পারবেনও না কোনোদিন। ধুলোয় বুঁজে আছে কলম, সমুদ্রের মুখের কাছটায় গিয়ে যেমন পলি পড়ে পড়ে স্রোত আটকানো মাথা-মোটা বিষাক্ত সাপের মতো হয়ে যায় নদী, নীল বিষের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যায় জনপদ, অনেকটা সে রকম। লিখতে না পারার ক্ষোভে ধোঁয়া আর দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পুড়তে থাকে ওঁর মগজ, নিঃশ্বাসের সঙ্গে বাষ্পের মতো বেরিয়ে যায় ঐ থকথকে পদার্থ। তিনি স্বপ্ন দেখতে থাকেন : তালগাছের মাথার উপরে কি বিশাল একটা নৌকো, আলকাতরা মাখানো নিকষ কালো, নদী থেকে অনেকটা দূরে, চিকচিকে অসুস্থ একটি জলের ধারা, ঐ হচ্ছে নদী, তালগাছের মাথা পর্যন্ত ফেঁপে উঠে নৌকোটিকে সেখানে আটকে দিয়ে গজরাতে গজরাতে নেমে যায় আর মাঝে মাঝে কঠিন আক্রোশে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে। আশেপাশে সবই প্রকাণ্ড, ঢাকের মতো বাজবার অপেক্ষায় মানুষের লাশ চারপাশে ছিটিয়ে আছে, একটা করে টোকা দিলেই দ্রিমি দ্রিমি বেজে উঠবে। স্বপ্নে আবার নিজে নিজে কিছু করার উপায় নেই, সবই শুধু ঘটে যায়, সবই সয়ে যেতে হয়, গরু ছাগলগুলোও ফুলে ঢাক হয়ে আছে, সমস্ত দিগন্ত নদী নালা মাঠ প্রান্তর নিয়ে চক্রাকারে ঘুরছে, বাতাসও বাইরে যেতে পারে না। ওদিকে জঙ্গলের মধ্যে বিশাল মহীরুহের মাঝখানে বাবুই পাখির বাসার মতো দুহাতে লতা ধরে ঝুলে আছে বারো বছরের এক শিশু, শুকনো খড়ের মতো হালকা। এ সব নিয়ে লেখা যায়নি। কিংবা বিষম ফেঁপে ওঠা বলেশ্বর গদগদিয়ে জল ঢালে সমুদ্রের মুখে, বলেশ্বর হয়ে ওঠে হরিণঘাটা, দিকহীন মোহনা বাতাসে নীল চাদরের মতো ফেঁপে-ওঠে, আর প্রবল ধারায় বৃষ্টি হতে থাকে, আকাশ নেমে এসে সমুদ্রের সঙ্গে বুক লাগিয়ে মিশে যায়—এই নিয়ে পুরো একটি বই লিখবার ছিল, তার একটি অক্ষরও লেখা হয়নি। এখন শুধুই স্বপ্ন, হিংস্র শ্বাপদের মতো বারবার হানা দেয়, বিলের তলায় ড্রামভর্তি আচারের মতো ফালি ফালি করে কাটা মানুষের দেহ, তারা ড্রাম থেকে বেরিয়ে হেঁটে নিজেদের বাড়িতে চলে যায়, টোয়াং টোয়াং শব্দে ঘড়ি সময়কে পিছিয়ে দেয়, বিশাল একটা দা তেরছা করে মানুষগুলিকে কেটে ফেলে, ড্রামের মধ্যে হাত পা মাথা বুক, আবার ঢুকছে, ড্রাম আবার বিলের জলের তলার আঁধারে; ঝোপের আড়ালে যে বস্তুটি ছিল সেটা উঠোনে এনে মুখটা খুলতেই গড়গড় করে গড়িয়ে যায় একটি মাথা, একটি বিধবা চোখ আকাশে তুলে পেত্নীর গলায় চেঁচিয়ে উঠে বলে, হা ভগমান, আমাদের বাড়ির লোক। কিন্তু লেখকের এই গল্প লেখা হয়নি। এমনি করে রাস্তার ভাঁড়, বাজারের বেশ্যা, জমির মজুর কাউকে নিয়ে কিছুই লেখা হয়ে ওঠেনি। তারপর যাযাবর জাদুকর, বাণ্ডিলের সুতো শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে যে বলে, লেগে যা। সাথে সাথে সুতোটা ঝুলতে থাকে, মুহূর্তের মধ্যে সুতো ধরে তরতর করে উপরে উঠতে থাকে জাদুকর আর দুএক মিনিটের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে যায়, তখন আকাশ থেকে বিকট আর্তনাদের আওয়াজ আসে, শূন্য থেকে প্রথমে আসে জাদুকরের কালো টুপিটা, তারপর তার চেয়ে থাকা মাথা, তখনো টাটকা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে তা থেকে, তারপর জাদুকরের টুকরো টুকরো হাত পা ধড়। এর একটুখানি পর, আপনারা সব এখানে কি করছেন বলে ভিড় থেকে জাদুকর নিজেই বেরিয়ে এসে তার নিজের শরীরের অংশগুলো হাওয়া করে দিয়ে বাণ্ডিলের সুতোটাও গুটিয়ে এনে তালুতে রেখে দেয়—এইসব বৃত্তান্ত তিনি কতকাল থেকে লিখতে চেয়েছেন, কিন্তু লেখা হয়নি। এত রক্ত দিয়ে কি লিখবে লেখক যখন তার নিজেরই শুক্র পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে। ধুলোর মধ্যে চোখ দুটি পুরোপুরি ঢেকে গেলে লেখকের স্বপ্ন দেখা শেষ হয়। তখন নিষ্কম্প বিরাট মুখ-থুবড়োনো আঁধার। আঁধার।



This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

মানুষটা খুন হয়ে যাচ্ছে (ছোটগল্প) - হাসান আজিজুল হক

মানুষটা খুন হয়ে যাচ্ছে (ছোটগল্প)
হাসান আজিজুল হক

আজকাল প্রায়ই লক্ষ করি আমি বাসা থেকে বেরিয়ে এলেই বাসার পিছনদিকে দেয়ালের ছায়ার আড়ালে একটা মুখ লুকিয়ে পড়ে। একতলা বাড়ির ওদিকটা নির্জন, অনেকটা ঘুরে না গেলে ওখানে যাওয়া যায় না। বড়ো বড়ো কটা আম-জাম গাছে অন্ধকারও বটে জায়গাটা।
আজও বেরিয়ে আসার পরে আমার মনে হলো ওখানে চোখ পড়ার আগেই একটা মুখ টুক করে ছায়ার মধ্যে সরে গেল। বাড়ির সীমানার পাঁচিলটা ভাঙা, সেদিক দিয়ে গেলে সহজেই বড়ো রাস্তায় রোদে অন্য মানুষদের সঙ্গে মিশে যাওয়া চলে। আমি তাড়াতাড়ি হেঁটে বড়ো রাস্তায় পড়ে ঘাড় ঘুরিয়ে বেশ ভালো করে দেখি। নাঃ, কাউকে দেখা যায় না। তাহলে সাঁৎ করে সরে গেল কে? একদিন দেখি বাসায় ঢোকার দরজাটার ঠিক পাশে চকখড়ি দিয়ে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা রয়েছে : ‘হারামজাদা গণআদালতী’। আমাকে শাসানোর জন্যই লেখা বুঝতে পারি। আমি জানি আমার পিছু পিছু সব সময়েই কেউ-না-কেউ হাঁটছে। ঘাড় ফিরিয়ে পিছনে চাইলে কাউকেই দেখি না। যে পিছনে হাঁটছিলো সে কি থেমে গেল? আমি চলতে শুরু করলেই সে আবার চলতে থাকবে আমার পিছু পিছু? ভালো চাকরি নিয়েছে লোকটা। এর চেয়ে আমাকে মেরে ফেলা অনেক সহজ। পাশ দিয়ে চলতে চলতে কিংবা সামনাসামনি থমকে দাঁড়িয়ে ঝোলা থেকে বোমাটা বের করে ছুঁড়ে দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। এ রকম তো রাতদিন করছে ওরা। আমাকে চিঠিতে লেখেও তো সেইরকম : ‘হারামজাদা, শুয়োরের বাচ্চা গোলাম আযম কি তোমার পাকা ধানে মই দিয়েছে? ওর তো একটা ... ও ছিঁড়তে পারবি না, গণআদালত মারিয়ে বেড়াচ্ছিস। তোর দিন শেষ।’ কিন্তু কিছুই তো করে না ওরা। সুতোর মতো শুধু লেগে আছে। আলো অন্ধকারের মধ্যে, রাস্তায় হাটে বাজারে। গায়ের উপর দিয়ে চলা ছিনেজোঁকের মতো।
আমি এত বেপরোয়া যে ভয়-টয়ের ধার ধারি না বলা ভুল হবে। যায় যাবে প্রাণ এ কথাও ঠিক নয়। তবে ভয়েরও সীমা আছে। আমি ভয়কেও বলতে পারি, ব্যস, ঐ পর্যন্তই, আর এগিয়ো না। আর তোমার কয়েদ খাটতে পারব না। জীবনের সবচেয়ে বড় আদর্শ কি আমি একটুও জানি না। তা নিয়ে মাথাও ঘামাই না। কিন্তু প্রত্যেক দিনের জীবনটা কাটানোর জন্য কিছু মূল সিদ্ধান্ত তো নিতেই হবে, সেগুলোকে কাজে খাটাতেও হবে। এর নিচে নামলেই আমি আর মানুষ থাকি না। বোধহয় কেউই থাকে না। মানুষ থাকা-না-থাকাটাই হচ্ছে ভয়ের সীমা। ব্যস, ঐ পর্যন্তই, ভয়, আর এগোতে পারছো না তুমি। পঞ্চাশ হাজার মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ছে। ঐ পঞ্চাশ হাজার যখন রাস্তা ধরে প্রচণ্ড রাগে গর্জন করতে করতে এগোয় ‘ফাঁসি দাও, ফাঁসি দাও, ঐ লোকটাকে ফাঁসি দাও, দেশের বুকের উপর উঠে দাঁড়িয়েছে যে, যে বিশ্বাসঘাতক এদেশে বিশ্বাস করে না তাকে ফাঁসি দাও’—তখন যে প্রচণ্ড শক্তি সাগরের ঢেউয়ের মতো ফুলে ফেঁপে ওঠে তা চোখে দেখে আমি আমার মাথা আকাশ পর্যন্ত তুলতে পারি ঠিকই, পঞ্চাশ হাজারের সামনে আমি যখন কথা বলতে পারি, তখন আমার রক্তে বিদ্যুতের চলাচল টের পাই, তবু সেটাই শেষ হিশেব নয়। একেবারে একা যখন নিজের মধ্যে আমি কাঁদি, তখনও আমাকে ভাবতে হয়, আমি একা এই মানুষ, অসহায়, দুর্বল, কোনো প্রত্যাশা না রেখে, সবচেয়ে ভঙ্গুর মুহূর্তটিতেও মানুষ থাকা-না-থাকার ফায়সালা করার জন্য একাই রুখে দাঁড়াবো।
পিছন থেকে সাইকেলে চেপে একটা লোক আমার গায়ের উপর পড়তে পড়তে কোনো রকমে সামলে নিয়ে মুখটা আমার কানের কাছে এনে বলে গেল, কিছু ফেলে গেলেন কি! রাস্তার উপরে খুব বড়ো একটা ছায়া। সেটাকে আমি কোনোক্রমেই ছাড়িয়ে যেতে পারছি না। ছায়া আমার সামনে ক্রমেই লম্বা হয়ে পড়ছে। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারি, ভঙ্গুর মুহূর্তটি এসে গেছে। ভিতরে ভিতরে একা কেঁপে ওঠার মুহূর্তটি। আমি খুব তাড়াতাড়ি হাঁফাতে হাঁফাতে ফিরে এসে বাসার সামনে দেখতে পাই, আমার মেয়ে দুটি খোলা মাঠে, কখনও ছায়ার মধ্যে কখনও রোদের মধ্যে খেলছে। ছোট বোন একটি মাত্র ফুটে-ওঠা ফুল নিয়ে চন্দ্রমল্লিকার চারার মতো। ভালো করে হাঁটতে শেখে নি, খঞ্জনার মতো লাফাচ্ছে শুধু বড়ো বোনের চার পাশে। ভঙ্গুর মুহূর্তটি আমার জন্য এসে গেল। বুনো মোষের খুরের নিচে পুরো দৃশ্যটি চাপা পড়ে যায়। আমি বড়ো মেয়েটির কাঁধে দুহাত দিয়ে তার দু চোখের দিকে চেয়ে বলি, কি করছো মাগো?
প্রজাপতি ধরি।
প্রজাপতি ধরছো? কই প্রজাপতি?
ওই যে—আঙুল তুলে সে ঘাড়-ভাঙা শুকনো চন্দ্রমল্লিকার গাছটির দিকে দেখায়। খুব সাধারণ ছোটো শাদা একটি প্রজাপতি সেখানে বসে আছে।
প্রজাপতি ধরে কি করবে?
মারবো।
ছিঃ, প্রজাপতি কি কেউ মারে?
প্রজাপতি ধরে ডানা ছিঁড়বো। মেয়ের ঠোঁটের কোণ বেয়ে লালা ঝরে পড়ে।
প্রজাপতি কেউ ধরে না, প্রজাপতি কেউ মারে না। যাও, বাসার ভিতরে যাও। খুব কঠিন শোনালো আমার গলা। আমি আবার বড়ো রাস্তার দিকে পা বাড়িয়েছি, কাঁধে-ঝোলা একটি লোক আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। কালো কাপড়ের ঝোলা, অনেক কিছু ভরা আছে তাতে, লোকটার একটা কাঁধ ঝুঁকে আছে। থমকে দাঁড়িয়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে কিছু খুঁজছে সে।
আমি ঠাণ্ডা পাথুরে গলায় বলি, কাকে চাই ভাই আপনার?
আপনাকে।
আমাকে? আমাকে চেনেন আপনি? তা বলুন কি দরকার আপনার।
আপনি খুললের লোক না? ডুমুরে না আপনার বাড়ি?
আপনার দরকার কি বলুন না।
বলবানে, বলবানে, নিশ্চয়ই বলবানে। বলবার জন্যিই তো আইছি। আপনি খুলনের লোক আমি জানি। এত বড়ো একডা ব্যক্তি কোয়ান থে আসবে? আমাদের খুলনে ছাড়া!
আপনার ঝোলাটা খুব ভারি। কাধ বাঁকে গেল আপনার। হাতে নেন। আমি একটু হেসে বললাম।
লোকটা ঝপ করে ঝোলাটা কাঁধ থেকে নামিয়ে ডান হাতে ঝুলিয়ে নেয়।
এইবার বলুন আপনার কথা।
ভারি বিপদে পড়িছি। একটু বসতি পারলি হতো। এক কাপ চা খাতি খাতি—আপনার বাসা তো কাছেই শুনিছি।
আমি এই চালাক লোকটির দিকে ভালো করে চেয়ে দেখি। ঝোলার মুখটা সে শক্ত করে চেপে ধরে আছে। না, এ বোধহয় সে নয়, না, এখুনি কিছু নয়। পরনে আধ ময়লা পাজামা, নীল রঙের ফুলশার্ট। পায়ে ধুলোভরা হাওয়াই চপ্পল, মুখে সপ্রতিভ হাসি, চোখ দুটো তার চেয়েও বেশি হাসছে, ফেন কতোদিনের পরিচিত ইয়ার।
বাসায়? আচ্ছা, চলুন আমার বাসায়। এই যে দরজা। ঠিক জায়গাতেই এসেছেন। কে সন্ধান দিল বলুন তো?
বড়ো মেয়েটি দু হাত মেলে প্রজাপতির মতোই একটি শাদা প্রজাপতির পিছনে পিছনে দৌড়ুচ্ছে। ছোট মেয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে মনের আনন্দে খিল খিল করে হাসছে। বাসায় বসার ঘরে ঢুকেই লোকটা ধপ্‌ করে একটা খালি চেয়ারে বসে পড়ে বলল, আঃ, হাঁটতি হাঁটতি হাফসায়ে গিইছি। আপনের সন্ধান আবার কার কাছে নিতি হবে? আমি শহরে পা দিয়েই বুঝিচি—অসম্ভব ধড়িবাজ লোকটিকে আমার ঘাড় ধরে বাসা থেকে বের করে দিতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু যে কাজটি তার এতক্ষণে করে ফেলা উচিত ছিল বলে আমি ধরে নিয়েছিলাম, সে যে তা এখনও করে নি তাতে হঠাৎ মজায়-কৌতুকে আমার মন ভরে উঠল। আমি বললাম, দাঁড়ান, আপনার চায়ের কথা বলে আসি ভিতরে, তারপরে আপনার কথা শুনব।
আরে না না, বসেন আপনি। চায়ের কথা কেডা কইছে? আমি কইছি? তা হতি পারে। চা আমি খাইনে—এমনি কইছি। বসেন আপনি।
আপনার নামটা এইবার বলুন তো।
আমি কাজি বাড়ির ছেলে। বাঘডাশার কাজি বাড়ি। নিশ্চয় চেনেন না কবেন না। সগীর কাজি—আমার নাম—বড়ো তরফের নাতি—
আমি ওকে চিনে ফেলাই মনস্থ করলাম, চিনিছি, কন—আমাদের এলাকার ভাষাতেই ওকে বলি, আর কথা না কয়ে আপনের কথাডা কন!
হইছে কি জানেন, ঠেহিছি, সামান্য কিছু টাকার জন্যি ঠেহিছি।
কতো টাকা? আমি একটু শক্ত হয়ে বলি।
কিছু না, কিছু না, ও কোনো টাকা না। আপনের হাতের ময়লা, শ তিনেক মাত্র।
এই দ্যাখেন ভাই—আমি দুই হাত তার দিকে মেলে দিয়ে বললাম, আমার হাতে এক পয়সার ময়লা নেই। ময়লা যা পাই চাল-ডাল কিনতেই শেষ হয়ে যায়।
যাঃ, কি যে বলেন, সগীর কাজি ঘাড় বেঁকিয়ে, চোখ ট্যারা করে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে থাকে।
এডা তো আমাকে না দিলেই চলতিছে না।
আমি এবার স্পষ্ট করে বলি, শোনেন সগীর মিয়া। তিনশো টাকা আপনাকে দিতি পারলিও দিতাম না। কিন্তু কথা হচ্ছে দেবার আমার ক্ষমতাই নেই। আমি আপনার জন্যি যা করতি পারি—কথা বলতে বলতে ঝোলাটার দিকে নজর রাখি আমি, দেখি, লোকটা শক্ত মুঠোয় ঝোলার মুখটা ধরে আছে। আমি কথাটা শেষ করি, হ্যাঁ, আমি আপনের জন্যি কি করতি পারি কচ্ছি। কাল ভোরে খুলনের ট্রেন আছে, আমি আপনার সঙ্গে কাল স্টেশনে যাবানে, আপনাকে একটা খুলনের টিকিট কেটে দেবানে, মনের আনন্দে আপনি খুলনে ফিরে যাবেন। আজ রাতে আমার এখানে খাবেন, থাকবেন, কোনো চিন্তা নেই। হবে?
আমার কথা শুনে লোকটার চেহারা একটুও টসকালো না, ঠিক তেমনি হাসিমুখে ঝোলাটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, মাত্তর তিনশো টাকার জন্যি আমি এমন আটক হয়ে পড়বানে চিন্তা করি নি। কাল সকালে ফিরতি আমাকে হবেই—তবে এই সামান্য টাকাটা জোগাড় না হলি তো হচ্ছে না। আপনি আর একবার চিন্তা করে দেখেন।
চিন্তা আমি করিছি। আমি পারতিছি না। কি, আপনি রাতে আমার এখানে খাবেন তো? দেখেন, ইস্ত্রিকে বলে আসি। একজনের রান্না করা ভাত নষ্ট করবার পয়সা নেই আমার, বুঝিছেন?
সগীর মিয়া ঝোলা হাতে উঠে পড়ল। একগাদা ভাঁজ পড়লো চোখে-মুখে। ছড়িয়ে পড়া কান এঁটো-করা হাসিটা ফালি ফালি হয়ে মুখের ভাঁজে ভাঁজে বসে গেল, রাতে খাবানি বই কি? খাতি তো হবেই। তবে আমি একবার এট্টু ঘুরে আসতিছি, দেহি, দু একজন পরিচিত ব্যক্তি আছেন আমার এহানে। খুলনের লোক, বুঝিছেন না। আসতিছি আমি, আলাম বলে, রাতে গপ্পো-সপ্পো হবেনে—খুলনে নিয়ে কিছু চিন্তাভাবনা আছে আমার, গভমেন্টের ভাব-সাব তো দেহিছেন। বলে ঝোলাটা হাতে নিয়ে, আসতিছি, আস্‌সালামালেকুম বলে লোকটা রোদের মধ্যে নেমে গেল।
রাতে লোকটা এলো না। আমি জানতাম সে আর আসবে না। তিনশো টাকা আমি দিলাম না, কিছুতেই দিলাম না, নিজের ব্যর্থতায় রাগে সে কি আর এলো না, প্রবঞ্চনা ব্যবসার যোগ্য সে নয় এই ধরে নিয়ে, নাকি নিজের দায়িত্বটুকু কিছুতেই পালন করতে না পেরে লোকটা নিজের ভিতরে জ্বলছে, আমি জানি না। ঝোলাটা সে শুধুই নাড়াচাড়া করেছে, কাঁধ থেকে হাতে নিয়েছে, মেঝেতে নামিয়ে রেখে বার বার শক্ত মুঠোয় মুখটা চেপে চেপে ধরেছে।
সে রাতে ঘরের মধ্যে বড়ো বড়ো হালকা ছায়া, স্ত্রী ঘুমের মধ্যে গুমরে উঠে একটু পরে করুণ গলায় কাঁদতে শুরু করলেন। জানালা দিয়ে দুটি চোখ একদৃষ্টিতে আমাদের বিছানার দিকে চেয়ে আছে আমি স্পষ্ট অনুভব করতে পারি, ফিরে তাকালেই অতি দ্রুত সরে যাবে ঐ দৃষ্টি। চারদিকে অনেক ছায়া।




শক্ত মোটা খামটা আমি যেদিন পাই সেদিন আমার অনেক কাজ। চিঠি খোলার সময়ই মেলে না, বুক পকেটে খামটা রেখে দিয়ে আমি ওটার কথা সম্পূর্ণ ভুলে যাই। বাড়ির চিঠি, আমার ভাইয়ের লেখা, বাড়িতে মা আছেন, চিঠিটা সঙ্গে সঙ্গে পড়া দরকার এসব কিছুই আমার মনে থাকে না। তবে খুলনার সগীর মিয়ার কথা যে আমার কখনোই মনে পড়ে নি তা নয়। দু একজনের কাছে আমি ওর গল্পও করেছি। নীল শার্ট, ময়লা পাজামা, ঝোলার মধ্যে বোমা। লোকটা সেটা ফাটানোর সময় পাচ্ছে না। তিনশো টাকার গল্পটা একটু বেশি লম্বা হয়ে গেল বলে কি? গল্পটা সে আদৌ শুরু করতে যায় কেন? বাসাতেই-বা তার ঢোকার দরকার কি? পথে যখন তার শিকার বাঁক নিচ্ছে, একটু অন্যমনস্ক, ঘাড়ের পিছন দিকটা দেখা যাচ্ছে, ভিড়ের লোকেরা একেবারে বিশৃঙ্খল, ঝোলা থেকে ওটা বের করে ছুঁড়ে দিলেই তো কাজ শেষ হয়ে যায়—তা না করে বাসায় ঢুকে গল্প জমাতে যায় কেন? না কি ওর ঝোলায় ছিল বাদা অঞ্চলের মানুষের সুখ-দুঃখের কবিতা—নোনা গন্ধ মাখানো—ঘরে বসে হারিকেনের আলোয় লেখা, নোনা পানি ঠেকানোর বাঁধের কথা, চিংড়ির ঘেরের মধ্যে আটকানো লবণ জলের হাহাকারের কেচ্ছা। নাকি লোকটা সত্যিই শাদামাঠা ঠক—সব জায়গাতেই তিনশো টাকার জন্য আটকে যাচ্ছে।
ভাইয়ের চিঠি যেদিন পাই সেদিন আমি ভয়ানক ব্যস্ত। রিকশা আর স্কুটারে করে ছেলেরা শহরের বাইরে চলে যাচ্ছে। আমার কথা হলো শহরের প্রত্যেকটি মানুষ তো বটেই, শহরের বাইরের দশ মাইলের মধ্যে এমন একজনও থাকবে না যে জনসভার কথা জানবে না। ছেলেরা গত দুতিন দিনে ধুলোভরা গাঁয়ের পাথরগুলোকে পর্যন্ত জাগিয়ে তুলেছে।
মানুষজন জমায়েত হতে শুরু করেছে দুপুরের অনেক আগে থেকে। বেলা চারটের সময় আমি উঁচু মঞ্চ থেকে দেখতে পাই—মানুষের সংখ্যার আন্দাজ আমি কোনোদিন পাই না— আমার ধারণা হলো এক লাখ লোক এখানে এসেছে। রাস্তার উপরে যারা বসেছে, তারা যেন লেপ্টে গেছে রাস্তার সঙ্গে, এমন গাদাগাদি লাগালাগি বসেছে যেন মানুষের লেই রাস্তার উপরে পুরু হয়ে জমেছে পিচের মতো। যেন জ্যান্ত একটা তরল, বড়ো বড়ো বোতলে, বয়ামে, ড্রামে সংগ্রহ করে রাখা যায়। রাস্তার দুপাশে মানুষের এই তরল জমে কঠিন দেয়াল তৈরি করেছে। সেখান দিয়ে কিছুই ঢুকতে-বেরুতে পারবে না। মঞ্চে দাঁড়িয়ে সেদিকে চেয়ে আমি সিংহের পিঙ্গল একজোড়া চোখ পেয়ে যাই।
বেলা পাঁচটার সময় মা কথা বলতে শুরু করলে পশ্চিমের সূর্যের রোদটা সরাসরি তাঁর মুখে এসে পড়েছিল। আমি দেখলাম আর একটি সূর্য। আকাশ থেকে নেমে এসেছে বা মায়ের মুখটাই সূর্য হয়ে গেছে। মা কথা বন্ধ করে একটুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন—ডান হাতের তর্জনি তোলা, ধপধপে শাদা শাড়ি পরনে, একটু সময় চুপ করে থেকে তিনি শান্তকণ্ঠে বললেন, আমি মা, আমি বিচার চাই, আমি বাংলাদেশের সমস্ত মায়ের পক্ষ থেকেই বিচার চাই। বলে তিনি থেমে গেলেন। ঠিক তক্ষুনি আমি আর একবার সভার দিকে চেয়ে মানুষে-লেপা পথঘাট, আকাশ-মাটি দেখতে দেখতে ভাবি, হ্যাঁ, বাংলাদেশ এই রকমই তো!
মা চলে যাওয়ার একটু পরে—আর একজন কেউ তখন উত্তেজিত বক্তৃতা করছিলেন—মঞ্চের পিছন দিক দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ওরা উঠে এলো। একপাশে চুপ করে দাঁড়াই, একটুও উত্তেজনা হয় না আমার। ওরা এত ছটফট করছিল যে কারও চেহারা খেয়াল করা যাচ্ছিল না। মাথা ন্যাড়া, দাড়ি আছে, কিন্তু টুপি নেই, টুপিও নেই দাড়িও নেই, জিনস্‌ আর গেঞ্জি পরা, টুপিও আছে দাড়িও আছে, শাদা আলখাল্লাও পরা আছে—এই রকম সব পোশাক ওদের। মাইক্রোফোনগুলো ছুঁড়ে ছুঁড়ে মঞ্চের বাইরে ফেলে দিল। মঞ্চের নিচে ফাঁকা জায়গাটায় ছুঁড়লো একটা হাতবোমা। তার প্রচণ্ড আওয়াজে কানে তালা লেগে গেল। ধোঁয়ায় ভরে গেল জায়গাটা। একটা উড়ন্ত গোড়ালি, শাদা নিষ্ঠুর একটি চোখ, কালো রঙের একটি কব্জি এইসব আমার চারদিকে ছুটে বেড়াতে লাগল। বক্তারা যতোদূর সম্ভব তাড়াতাড়ি মঞ্চ থেকে নেমে যাচ্ছেন। একেবারে পিছনে ছিলেন যিনি, যাঁর টাক মাথাটা আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, তিনি সিঁড়ির একটি ধাপ নেমেছেন, বিদ্যুতের মতো একটি লাঠি পড়লো সেই মাথায়। একটা বিশ্রী অস্বস্তিকর চাপা শব্দ হলো। আমি দেখতে পেলাম, সিঁড়ির ধাপগুলো বেয়ে গড়িয়ে তিনি পড়ে যাচ্ছেন, টকটকে লাল রক্ত তাঁর ফর্সা ঘাড় বেয়ে নিচের দিকে নামছে আর জবজবে হয়ে ভিজে যাচ্ছে তাঁর পাঞ্জাবি। তারপর আর কিছুই মনে করতে পারি না।
আজ দশদিন পরে হাসপাতালের বিছানার বালিশের নিচে রক্তমাখা খামটা পাই। মনে পড়ে না কিছুই। শক্ত খড়মড়ে খামটা হাতে নিয়ে দু একটি টোকা দিতেই মনে পড়ে গেল খামের মধ্যে চিঠি আছে আমার ভাইয়ের। হাত কাঁপতে থাকে আমার, কিছুতেই খামের ভিতর থেকে চিঠিটা আর বের করতে পারি না। শুকনো রক্তের মধ্যে আটক হয়ে আছে চিঠি, টানাটানি করতে ফ্যাঁশ করে মাঝ বরাবর ছিঁড়ে গেল, ধুলোর মতো ঝুরঝুর করে ঝরে পড়লো গুঁড়ো রক্তের ধুলো। তাড়াতাড়ি ছেঁড়া কাগজ একসাথে করে এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলি চিঠি। চিঠি লিখেছে মা, ভাই লিখে দিয়েছে মার কথা, মা যা যা বলেছে তাই : মা বাঁচে থাহে ক্যানো বাবা যদি ছাওয়াল থাহে দূর দেশে, যদি ছাওয়ালকেই না দেখতি পায় তালি মা চোহে দ্যাহে ক্যানো এই কথার ভেদ জানিনে। সগীর কাজি ও কথা কলো ক্যানো? সগীর কাজির আচ্চার্য কথা কি শুনিছো? একদিন সন্ধেবেলায় কেচ্ছা শোনাব বলে নিজির বাড়িতি লোক ডাকে নিয়ে কইছে, তুমি নাকি খুন হয়ে গিইছো—এ আমারে কি কথা শুনাইচে রে? সেই রাতে আমি মরি নাই ক্যানো কে জানে। সকালে আমি নিজি যাই সগীর কাজির বাড়ি—দেহি কি নিজির দুই ছাওয়াল মিয়েরে সে নিজি কুপোয়ে কাটিছে, বউ তো নেই তার অনেকদিন—তারপর ছাওয়াল মিয়ের রগ কাটিছে রে বাপ—তারপর নিজি গলায় গরুর দড়ির ফাঁশ লাগায়ে ঝুলে রইছে।
এসব কথার পরে মা আমাকে শেষ কথা লিখেছে : এর ভেদ তুমি আমারে বুঝায়ে কবা।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

শকুন - হাসান আজিজুল হক

শকুন - হাসান আজিজুল হক
শকুন
হাসান আজিজুল হক

কয়েকটি ছেলে বসে ছিল সন্ধ্যার পর। তেঁতুলগাছটার দিকে পিছন ফিরে। খালি গায়ে ময়লা হাফশার্টকে আসন করে। গোল হয়ে পা ছড়িয়ে গল্প করছিল। একটা আর্তনাদের মত শব্দে সবাই ফিরে তাকাল। তেঁতুলগাছের শুকনো ডাল নাড়িয়ে, পাতা ঝরিয়ে সোঁ সোঁ শব্দে কিছু একটা উড়ে এল মাথার ওপর। ফিকে অন্ধকারের মধ্যে গভীর নিকষ একতাল সজীব অন্ধকারের মত প্রায় ওদের মাথা ছুঁয়ে সামনের পড়ো ভিটেটায় নামল সেটা।
হৈ-চৈ করে উঠল ছেলেরা, ছুটে এল ভিটেটার কাছে। আবছা অন্ধকারে খানিকটা উঁচু মাটি আর অন্ধকার একটা ঝোঁপ ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না তাদের। ওদের সর্দার ছেলেটি বুঝতে পারল, হামেশা দেখা যায় এমন পাখিদের মধ্যে শকুনই তীব্রভাবে মাটিতে নেমে তাল সামলানোর জন্যে খানিকটা দৌড়ে যায়। তাই তার চোখেই প্রথমে পড়ল অন্ধকারের তালটা দৌড়তে দৌড়তে খানিকটা এগিয়ে বিব্রত হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে গেল।
অপেক্ষাকৃত ছোট ছেলেটি বলল ভয়চকিতস্বরে, কিরে ওটো? আর একজন জবাব দিল, মুটেই বুঝতে পারচি না।
পাখি ওটো।
পাখি-টাখি হবে।
ক্যা জানে, সঞ্জেব্যালায় ক্যার মনে কি আচে? সে বুকে থু থু দিল।
অনড় হয়ে রয়েছে অন্ধকারের দলাটা। লুকিয়ে যাওয়ার একটা ভাব, পারলে কোন বহু পুরনো বটের কোটরে, কোন পুরীষ গন্ধে বিকট আবাসে, কোন নদীর তীরে বেনাঝোপের নিচে শেয়ালের তৈরি গর্তে লুকিয়ে যাওয়ার মতলব।
শালা ক্যার মনে কি আচে, ক্যা কি চায়, ক্যার ভ্যাকে ক্যা আসে। চ বাড়ি যাই।
দলের মধ্যে গরু চরানো রাখাল আছে। স্কুলের ছাত্র আছে। স্কুলের ছাত্র অথচ দরকার হলে গরু চরায়, ঘাস কাটে, বীজ বোনে এমন ছেলেও আছে।
তু তো ভীতু, দ্যাখলোম একটো জিনিস, শ্যাষ পর্যন্ত দেখি দাঁড়া।
না, আমি চলে যাব।
তু যা গা তবে, আমরা যাব না।
ক্যারে বাড়ি যেচিস, তেঁতুলতলাটা পার হয়ে দ্যাখগা। স্কুলে পড়ে সেই ছেলেটি বলল, জিনিসটো দেখতে হবে।
প্রায় সবাই দাঁড়িয়ে গেল। তারপর বড় ছেলেটা এগিয়ে এল। অতি সন্তর্পণে পা টিপে টিপে।
সর্দার ছেলেটি জানত, সেটা একটা বুড়ো শকুন। একেবারে কাছে এগিয়ে গেল সে। এত কাছে যে হাত বাড়ালে ধরা যায়।
শালা, ক্যার মনে কি আচে, ক্যার ভ্যাকে ক্যা আসে—রাখালটা তখনও বিড়বিড় করছে।
একটা দমকা বাতাসে অজস্র শুকনো পাতা ঝরে পড়ল। পুকুরের পানিতে প্রথমে মৃদু কম্পন, তারপর ছোট ছোট ঢেউ উঠল—কার হাত থেকে কোথায় ধাতব কিছু পড়ে বিশ্রী অস্বস্তিদায়ক একটা শব্দ হলো।
ছেলেটা খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল, দেখল সত্যিই সেটা একটা শকুন, আলো থাকতে থাকতে বাসায় ফিরতে পারে নি। এখন রাতকানা। উগ্র একটা দুর্গন্ধ ওর নাকে এল। ভাগাড়ের আঁশটে গন্ধ। গলিত শবদেহের পচা পাঁকে সে যেন এইমাত্র স্নান করে এসেছে। শকুন কুকুরে লড়াইয়ের শেষ চিহ্ন এখনও ছিটকে বেরিয়ে-আসা মোটা খসখসে নোংরা পালক থেকে টের পাওয়া যায়।
মারামারি করেচে শালা ঠিক সারা দোপরবেলা। একনও ধুকচে।
পলটু এগিয়ে এল। পিছু পিছু জামু, এদাই। আরও অনেকে যারা ছিল।
পলটু বলল, শিকুনি লয়?
হ্যাঁ, দেকতে পেচিস না?
মোল্লা শিকুনি লয় তো?
বোধহয় মোড়ল শিকুনি।
রাখাল জামু বলল, মেদী না মদা বলতে পারলে বলি হ্যাঁ!
সর্দার রফিক বলল, তু তো গরু। তাই গরুর মতন কথা বলিস।
শকুনটা তখনও দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। বোধহয় সে পছন্দ করছে না এই বিরক্তিকর অবস্থাটা। রফিক হাঁক দিল, আয়, খানিক মজা করি—আয় লাচাই খানিকটো ওটোকে।
হৈ-চৈ করে উঠল ছেলের দল। বাড়ি যাবার ইচ্ছা অথচ ভয়ে তেঁতুলতলাটা পার হতে পারছে না সেই যে ছেলেটি, সেও চেঁচিয়ে উঠল।
রফিক এগিয়ে শকুনটার ডানা ধরে ফেলল। এতক্ষণে চেতে উঠল কুৎসিত পাখিটা, অত সহজে সে ধরা দিতে চায় না। নোংরা বিরাট দুটো পাখা মেলে বিচ্ছিরি নখওয়ালা পা-দুটো ক্ষিপ্রতার সঙ্গে চালিয়ে দৌড়ুতে শুরু করল সে গাঁয়ের সরু গলিটার মধ্যে দিয়ে।
এইভাবেই ওরা ওড়বার প্রস্তুতি নেয়, ভারমুক্ত হবার চেষ্টা করে, বোধহয় সে শেষ পর্যন্ত উড়তে পারত, অন্তত মুক্তি পেত এই অসহনীয় কিশোরদের হাত থেকে, তাদের হিংস্র কৌতূহল আর প্রাণান্ত খেলার খপ্পর থেকে। কিন্তু তার চোখে দৃষ্টি নেই, চলার কোন উদ্দেশ্য নেই। শকুনটার মাথা ঠুকে গেল দেয়ালে। পেছনে পেছনে একদল খুদে শয়তানের মত প্রতিহিংসাপরায়ণ ছেলের দল নিষ্ঠুর আনন্দে ধাওয়া করেছে।
কিন্তু পাখিটা পার হতে পেরেছে অন্ধকার গলিটা। কারণ গলিটা কানাগলি নয়। গলির দুপাশের দেয়ালের ফুটোয় যে সাপগুলো গ্রীষ্মের গরমে গলা বের করে থাকে, যদি তারা সেই অবস্থায় থাকত তাহলে নিশ্চয়ই মাথা আবার গুটিয়ে নিয়েছে।
কুলতলার পাশ দিয়ে, আরও দুটো পড়ো ভিটের ওপর দিয়ে, হাড়গোড় জড়ো-হওয়া টুকরো জমিটার নীরস আর্তনাদ উপেক্ষা করে জীবটা অনবরত ডানা মেলে ওড়বার চেষ্টা করছে, আরও দ্রুত দৌড়ুচ্ছে, আরও পরিষ্কারভাবে পথ চিনতে চাচ্ছে—পালাতে চাচ্ছে। কিন্তু সে নিস্তেজ, উপায়হীন। আক্রমণ করতে জানে না। দারুণ রোষে ছেলেদের দলের মধ্যে পড়ে তীক্ষ্ণ-ঠোঁটে এদের খেলার আয়োজন বন্ধ করে দিতে পারছে না।
চিৎকার করে কে আর্তনাদ করে উঠল। তার পায়ে শুকনো হাড়ের চোখাদিক ফুটে গিয়েছে।
আচ্ছা উ বসে থাকুক, শিকুনিটোকে ধরবুই। চেঁচিয়ে বলে উঠল রফিক।
হ্যাঁ, তু বোস, আমরা ওটোকে ধরবুই।
নাইলে তু বাড়ি যা।
এঃ লউ পড়ছে যি।
যাকে লেগেছে সে বলল, পড়ুক যা। বলে খোঁড়াতে খোঁড়াতে আবার ছুটল। সামনেই একটা এঁদো ডোবা। মোড় ফিরেই মাটি ছাড়ল, উড়ল সে। কিন্তু বড় ইতস্তত, বড় অনিশ্চিত তার পক্ষসঞ্চালন, হয়ত হাঁফ ধরে গিয়েছে, ক্লান্ত হয়েছে সে। হয়ত দিকনির্ণয় করতে পারে নি। সে পড়ল ডোবাতে, পানি ছিটকে, নোংরা মোটা পানির ঢেউ তুলে যেসব ঢেউ আঁধারে চকচকে চোখে চেয়ে রইল, প্রায় শোনা যায় না এমনিভাবে আঘাত করল তীরে।
একটি কদর্য জীব হিঁচড়ে উঠল ওপারে।
পরিবর্তিত, ভিজে, ধুলোমাখা।
ছেলেরা দৌড়ে এসেছে এপারে।
গ্রামের ঘনবসতি পাৎলা হতে হতে এখানে ছিটিয়ে গিয়েছে। কালো কালো স্তূপের মত হঠাৎ হঠাৎ গজিয়ে উঠেছে। সহজবুদ্ধিতে ফাঁকফোকর দিয়ে জন্তুটা পড়ল মাঠে। খোলা বিস্তৃত মাঠে।
ছেলেরা পরস্পর পরস্পরের মুখ দেখতে পাচ্ছে না। তারাও হাঁফিয়ে উঠেছে।
শালা কত দড়বি দড়—যিখানে যাবি চ।
আর লয় মানিক, আর লয়।
তুমার ইবার হয়ে আলচে।
অকে ধরবুই আজ। হ্যাঁ, ধরবুই।
এবার আল টপকে উঁচুনিচু এবড়ো-খেবড়ো জমি পেরিয়ে পগার আর শিশুশস্যের ওপর দিয়ে—শেয়ালকুলের কাঁটায় জামা ছিঁড়ে ছিঁড়ে মরণপ্রতিজ্ঞায় ক্ষেপে উঠল ছেলের দল।
এদাই জিগ্গেস করল রফিককে, কি করবি উটোকে ধরে?
কিছু করব না, শুধু ধরব।
তার পর?
হুঁ।
হুঁ ক্যানে, তা পর কি করবি?
এগু ধরে তা পর অন্য কাজ।
কেউ আর কথা বলছে না। বলতে পারছে না। ভূতের মত, অন্ধকারে চলন্ত চঞ্চল বিভীষিকার মত ছুটেছে।
দক্ষিণদিকের বাতাস গায়ে লাগছে না। দূরে বাবলাবনের পাশে আমের পাতা ভাঙার মড়মড়মসমস শব্দ কানে আসছে না। কিংবা শেয়াল ডেকে উঠল, কি ঝিঁ ঝিঁ সিমেন্টের মেঝেতে পাথর ঘষার মত একটানা শব্দ করছে, কি প্রতি পদক্ষেপে পায়ের নিচের নাড়া গুঁড়িয়ে যাচ্ছে, অন্ধকার ঘনতর হয়েছে এসব কিছুই না।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাই ধরে ফেলল ওকে। আঁকড়ে জাপটে দুমড়ে ধরে ফেলল শকুনটাকে। তারা বুক দিয়ে অনুভব করল হাঁপরের মত ফ্যাসফেসে শূন্য শব্দ উঠছে শকুনটার ভিতর থেকে। দীর্ঘশ্বাসের মত—ফাঁপা, শূন্য, ধরা-পড়ার।
ছেলেগুলোর উত্তেজিত বক্ষস্পন্দন পাখিটা অনুভব করতে পারল কি?
সেই, সেটোই বটে তো?
যেটোর পেচু পেচু অ্যালোম এটো সেই শিকুনিটোই বটে তো?
ক্যানে, পেত্যয় হচে না তোর?
কি জানি ক্যামন পারা লাগচে।
ক্যামন ভকভক করে বই বেরুইচে দেখচিস?
বই কি র্যা বল দুগ্গন্ধ।
তাতে বই কমচে কি?
অর্থাৎ দুর্গন্ধ কমছে কি?
ভিজে গিয়ে চিমসে গন্ধ ছাড়ছিল শকুনটা। জমাট গন্ধ তরল হয়ে এসেছে। গলা গলা দম আটকানো গন্ধ।
রফিক বলল, লে এ্যাখন ধর এটোকে—ঠোঁটটো ধরতে হবে না—দোম বন্ধ হয়ে যাবে। রাখালটা এগিয়ে এল, শালোকে আমি ধরব। পীরিত ক্যাকে বলে দেখবি শালো!
একদিকে জামু আর একদিকে রফিক ছড়িয়ে মেলে ধরল শকুনটার বিশাল শক্তিশালী পাখা দুটো।
কি পেল্লাই ড্যানা র্যা —আট ল হাত হবে।
গোটানো ঘনবুনুনির পালক মেলে গেল। বুনট যেন পাতলা হয়ে এল। স্তরে স্তরে সাজানো পালক পাশাপাশি চওড়া হয়ে কারকিত করা গালিচার মত বিছিয়ে যাওয়ার কথা—কিন্তু শকুনটা ভিজে গিয়েছে, ধুলো লেগে গুটিয়ে গিয়েছে তার পালক। এখন তাই অনেক ফাঁক, পাশাপাশি পালক অনেক ছিটোনো ছিটোনো। দুই ডানা অসহায়ভাবে ছড়িয়ে দিয়ে আত্মসমর্পণ করল শকুনটা।
এবার দ্বিতীয় দফা দৌড়।
দড় দড়—লেংগুড় তুলে দড়।
শকুনের পা পারে না অতো জোরে তাল দিতে। কিন্তু তাতে কি-ই বা এসে যায়! পা না হয় মাটিতে পড়চে না। ছেলেদের দৌড়ের গতিই চানচে তাকে—হিঁচড়ে নিয়ে যাবে।
এ্যাদা, মুখটো ঠুকে গেল। কি টেনে লিয়ে যেচিস দ্যাক, মরে গেল লিকিন দ্যাক এগু।
ক্যার গরজ কেঁদেছে দ্যাকবার। মরাটোকেই টানব।
ভয়ানক হুল্লোড় করে ওরা দৌড়ুচ্ছে এই টানার পিছু পিছু। চেঁচাতে চেঁচাতে। ভার মজা পেয়ে। অদ্ভুতরকমের খেলা পেয়ে। কি লাভ?
লাভ?
লাভ, তোকে দেখে লোব—তু তো শিকুনি, তোর গায়ে গন্ধ, তু ভাগাড়ে মরা গরু খাস, কুকুরের সাথে ছোঁড়াছিড়ি করিস—তোকে দেখে রাগ লাগে ক্যানে?
ছেলেদের কথায় শকুনটাকে দেখে তাদের রাগ লাগে, মনে হয় তাদের খাদ্য যেন শকুনের খাদ্য, তাদের পোশাক যেন ওর গায়ের গন্ধভরা নোংরা পালকের মত; সুদখোর মহাজনের চেহারার কথা মনে হয় ওকে দেখলেই। নইলে মহাজনকে লোকে শকুন বলে কেন। কেন মনে হয় শকুনটার বদহজম হয়েছে। যে ধূসর রঙটা দেখলেই মন দমে যায় তার সঙ্গেই এর রঙের এত মিল থাকবে কেন। প্রায় জীবন্ত, ফেলে দেওয়া যে শিশুগুলোকে গর্তে, খানা-ডোবায়, তেঁতুলতলায় ছেলেরা দেখে, না বোঝার যন্ত্রণায় মন যখন হু হু করে ওঠে, তখন তাদের কচিমাংস খেতে এর এত মজা লাগে কিসের!
কে বলল, ভোক লেগেছে।
কিছু খাস নাই?
দোপরবেলায় গোস্ত দিয়ে ভাত।
আমিও—আমার ভোক লেগেছে।
তোর জামার রঙটো দেখে রাগ লাগে।
য্যামন মোটা, তেমনি খসখসে।
ঠিক শালা শিকুনিটোর মতুন।
হামিদের বাপটো দু’একদিনের ভিত্রেই মরবে। আজ সারা বৈকালি কি করচে জানিস? জানি—খালি হাঁফিয়েছে—এই শালোর মতুন।
জামু বলল, সব শালোর হাঁফনির ব্যায়রাম। ওরে শালা, পালাইতে চাও, শালা শিকুনি, শালা সুদখোর অঘোর বোষ্টম।
অঘোর বোষ্টমের চেহারার কথা মনে পড়তে হা হা করে হেসে উঠল সবাই।
মাতামাতি চলে, আল টপকে টপকে, উঁচুনিচু জমির উপর দিয়ে ক্ষতবিক্ষত মনে আর দাগরা দাগরা ঘায়ে, শেয়ালকুল আর সাঁইবাবলার বনে লম্বা শুকনো ঘাসে, পগারে, সাপের নিশ্বাসের মত ফাটা মাটির উষ্ণ ভ্যাপসা হাওয়ায়, আখ আর অড়হর কাটা জমির বল্লমের মত ছুঁচলো সরল গুঁড়ির আক্রমণে ও আর্তনাদে। একটা মাটির ঢেলার মত গড়িয়ে গড়িয়ে, শক্তির বেদনাবোধের অতীত অবস্থায়, আচ্ছন্ন চেতনাহীন তন্দ্রার মধ্যে শকুনটা শুধুই চলেছে। যখন ছেলেরা বিশ্রাম নিচ্ছে, কথা বলছে নিজেদের মধ্যে ক্ষতের রস মুছলে প্যান্টে, শকুনটা তখনও দাঁড়িয়ে আছে। পালানোর অসম্ভব চেষ্টা করছে না সে।
কত তারা উঠেছে দ্যাক।
কিন্তুক আলো তো হচে না।
চাঁদ নাইকো যি।
বাতাস দিচে লয়রে?
দিচে, তা শালার বাতাস।
আমার কিন্তুক জাড় লাগচে।
তোর ভয় লেগেচে।
কতদূরে এ্যালোম র্যাগ?
উরে সব্বোনাশ, মাঝমাঠে এসে পড়িচি, মানুষমারীর মাঠ যে র্যাত! উইটো নিচ্চয় কেলেনের পাড়।
চ কেলেনের পাড়ে যাই, আর একবার গা ধোয়াই গা চ শিকুনিটোকে। পথটা ঠাহর করা যায় না। চারদিকের গাঁ ঝাপসা, দিশাহারা মনে হয়, এতবড় আকাশ, এত অন্ধকার।
জামু বলে, শুনিচিস রাত দোপরে কি সব হয়?
হেই ভাই পায়ে পড়ি, বলিস না।
যিখানে সিখানে তেঁতুলগাছ দেখা যায়। ঘরের খিল খুলে মেয়ে হোক আর মরদ হোক ঘুমের ঘোরে ঘোরে মাঝমাঠে চলে আসে, দ্যাখে, খালি শালা তেঁতুলগাছ আর মিশমিশে কালো বিলুই। যিদিকে তাকাও খালি বিলুই আর বিলুই। ক্যার ভ্যাকে ক্যা আসে—শকুনটাকে হঠাৎ কালো বিড়াল বলে মনে হয়।
ছেলেদের আর কারো গায়ে হাত দেবার সাহস নেই। নিজের নিজে বুকে হাত দিয়ে অনুভব করে।
একটা বেপার তো হরে পারে, ধর্ সবাই ভূত আর সবাই মানুষের ভ্যাকে এয়েছে।
না, না আমি ভূত লই, এ্যাদা আমি মানুষ।
তাইলে আমাকে ছুঁয়ে দ্যাক, আমি যদি মানুষ না হই, আমি উড়ে মিরিয়ে যাব, ছোঁ আমাকে।
আমি ছুঁতে পারব না।
সবাই সবাই-এর থেকে সাবধান হয়ে ক্যানেলের পাড়ে বসল। একে অপরের দিকে তীব্র চোখে তাকাচ্ছে। তারপর নিজের হাতে চিমটি কাটছে। শকুনটাকে ছেড়ে দিয়েছে ওরা। সে দুটো ডানা ঝেঁপে, পা দুমড়ে মাটিতে গোঁজ হয়ে পড়ে আছে।
রাত দোপর ঘুরে গেয়েচে লয়?
এ্যাকন সাঁজও লাগতে পারে আবার দোপর রাতও হতে পারে।
বোধহয় তাই। তাদের হিসেব নেই। এ সময়টুকু ঠিক সময় নয়।
এ খেলাটা তাদের সময়ের বাইরে ঘটেচে যেন।
তবু কে বলল, তিনবার শেয়াল ডেকেচে।
তাইলে পেরায় শ্যাষ রাত।
চ ভাই, পানিতে নামি।
পাগলের মত ছুটে ক্যানেলে নামল ছেলেরা।
একটা বাতাসও সঙ্গে সঙ্গে অগভীর পানির উপর দিয়ে সরসর করে এসে ওদের চোখে মুখে লাগল; কি একটা যেন সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এল।
আর একবার স্নান করল শকুনটা।
শালা কিছু খাবে না?
কি খাবে—মরা আচে এখানে যে খাবে!
জামু বলল, ভুঁই-এর লাড়া ছিঁড়ে লিয়ে, ঐ খাক শালা।
তাই নিয়ে এল কে। রফিক বলল, গরু তো লয় যে খ্যাড় খাবে। কিন্তুক এখন ঐ শালাকে তাই গিলতে হবে।
হ্যাঁ, লাও গেলাও।
দেখি র্যা , তোর ছড়িটা দে।
হ্যাঁ, ঠিক অমনি করে অর ঠোঁটটো চিরে ধর।
খ্যাক খ্যাক করে শব্দ করে উঠল শকুনটা, তার ঘাড় মুচড়ে ঠোঁট ফাঁক করে অতি সাবধানে ছেলেরা তাকে খড়ের টুকরো খাওয়াচ্ছে।
খা শালা, মর্ শালা।
আমিও লোব, মুটূক করব।
রফিক সব থেকে বড় পালকটা ছিঁড়ে নিল। মাংসের ভিতর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো পালকটা। শিউরে উঠলো যেন শকুনটা। তারপর সবাই ছি’ড়ল।
কদাকার বড় মুরগির মত দেখাতে লাগল তাকে।
তারা সবাই ফিরছে। টলতে টলতে। বসে দাঁড়িয়ে। হোঁচট খেতে খেতে। ছেঁড়া শার্ট দেখতে দেখতে। আগামীকালের কথা ভাবতে ভাবতে। গাঁয়ে ঢুকতেই এপাশে তালগাছ ওপাশে ন্যাড়া বেলগাছের যে ছোট তোরণটি আছে তারই আবছা ছায়ায় শাদামত কি দেখা যাচ্ছে।
জামু বলল, উদিকে যাস না—চ ঘুরে যাই।
তোর বাড়ি তো উদিকেই—চ দেখি না উ দুটো কি।
বাড়ি কাচে বলেই জানি উ শালা শালী ক্যা?
কা র্যা ?
দরকার কি তোর শুনে?
বল্ ক্যানে!
উ হচে জমিরদ্দি আর কাদু শ্যাখের রাঁড় বুন।
কি করচে উখানে?
আমড়ার আঁটি। চ বাড়ি যাই।

পুবদিকে রঙ ধরবার ঠিক আগেই যখন গভীর অন্ধকার নেমে আসে তখন ছেলেরা ছেঁড়া মাদুরে, সোঁদা মাটিতে অচৈতন্য হয়ে ঘুমোয়-অসুবিধের মধ্যে, অশান্তির মধ্যে না খেলে খালি পেটে ছেলেগুলো বেঘোরে ঘুমোয়। যখন সূর্য উঠল, রোদ উঠল, গাছপাতা ঝকমক করে উঠল তখন এবং তারপর যখন রোদ চড়া হয়, বাতাস গরম হয়, মাঠে ছেড়ে দেওয়া গরুগুলো মাটি শুঁকে শুঁকে শুকনো ঘাস খেয়ে ফেরে তখনও ছেলেদের ঘুম শেষ হচ্ছে না। ন্যাড়া বেলতলা থেকে একটু দূরে প্রায় সকলের চোখের সামনেই গতরাতের শকুনটা মরে পড়ে আছে। মরার আগে সে কিছু গলা মাংস বমি করেছে। কত বড় লাগছে তাকে! ঠোঁটের পাশ দিয়ে খড়ের টুকরো বেরিয়ে আছে। ডানা ঝামড়ে, চিৎ হয়ে, পা দুটো ওপরের দিকে গুটিয়ে সে পড়ে আছে। দলে দলে আরও শকুন নামছে তার পাশেই। কিন্তু শকুন শকুনের মাংস খায় না। মরা শকুনটার পাশে পড়ে রয়েছে অর্ধস্ফুট একটি মানুষের শিশু। তারই লোভে আসছে শকুনের দল। চিৎকার করতে করতে। উন্মত্তের মত।
আশপাশের বাড়িগুলি থেকে মানুষ ডেকে আনছে মৃত শিশুটি।
ই কাজটো ক্যা করল গো? মেয়ে-পুরুষের ভিড় জমে গেল আস্তে আস্তে। শুধু কাদু শেখের বিধবা বোনকে দেখা যায় না। সে অসুস্থ, দিনের চড়া আলোয় তাকে ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।
১৯৬০
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

বঙ্গ বাংলা বাংলাদেশ - হাসান আজিজুল হক (সম্পাদিত)

বঙ্গ বাংলা বাংলাদেশ - হাসান আজিজুল হক (সম্পাদিত) বঙ্গ বাংলা বাংলাদেশ - হাসান আজিজুল হক (সম্পাদিত)


বাংলাদেশের ইতিহাস, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতির মুল বিন্দুগুলিকে স্পর্শ করা এ বইয়ের মূখ্য উদ্দেশ্য। অন্যতম বৈশিষ্ট্য অতীতমুখিতা। বর্তমান বাংলাদেশ যে বৃহৎ বঙ্গের ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে আছে, যেখান থেকে সে আত্মপরিচয় গঠন করে, যেখান থেকে তার বিকাশ ও উত্তরণ ঘটে, সেই অতীতের সঙ্গে এর সম্পর্ক প্রায় সবগুলো প্রবন্ধে কমবেশি প্রতিফলিত।

বর্তমান পশ্চিমবঙ্গসহ বাংলাদেশের খ্যাতিমান পন্ডিতদের লেখায় পুষ্ট।



Download and Comments/Join our Facebook Group
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

এই পুরাতন আখরগুলি - হাসান আজিজুল হক

এই পুরাতন আখরগুলি এই পুরাতন আখরগুলি
হাসান আজিজুল হক

ভাষার জাদু দিয়ে হাসান আজিজুল হক বহুকাল আমাদের আপ্লুত রেখেছেন। সামান্য বিষয়ও তার লেখনগুণে মহার্ঘ্য হয়ে ওঠে। তার গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ তাই আমাদের চিরকালীন সম্পদে পরিণত হয়েছে। সেই তিনিই যখন নিজের জীবনী লেখেন তখন তা যে অন্যমাত্রার হবে তাতে সন্দেহ কী? তাই দেখি ইতিপূর্বে লেখা তার দুই পর্বের আত্মজীবনী ফিরে যাই ফিরে আসি আর উকি দিয়ে দিগন্ত-তে তিনি প্রায় নিস্তরঙ্গ শৈশব আর রুখোমাটির রাঢ়ের ভূগোলকেও কী সজীব আর বাজময় করে তোলেন।
কিন্তু আত্মজীবনীর এই তৃতীয় পর্বে এসে এবারে তিনি যেন নিজেকে প্রায় নিরাভরণভাবে মেলে ধরেছেন। বয়েসন্ধিক্ষণের বিপুল রহস্যময়তা আর আত্ম-আবিষ্কারের অন্বেষণ হয়ে উঠেছে এ বইয়ের প্রাণভোমরা। শিক্ষার প্রতি আগ্রহ, বইপ্রীতি, লেখকসত্তার উন্মেষ, যৌনবোধের জাগরণ, দেশ ও পরিবারের ভাঙন, রবীন্দ্রনাথ ও দেশ-বিদেশের সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয়, প্রকৃতি ও ঋতুর সৌন্দর্য উপলব্ধি, মানুষ পাঠ ইত্যাদি মিলিয়ে বইটি হয়ে উঠেছে বিপুল ঘটনাবিস্তারী।
এই পুরাতন আখরগুলি ব্যক্তি ও লেখক হাসান আজিজুল হকের বেড়ে ওঠা আর গড়ে ওঠার সবচে গুরুত্বপূর্ণ সময়ের ইতিহাস আমাদের জানিয়ে দেয়।

Download and Comments/Join our Facebook Group
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

আগুনপাখি - হাসান আজিজুল হক

Aagun Pakhi - Hasan Azizul Hoque
আগুনপাখি - হাসান আজিজুল হক
হাসান আজিজুল হক মানেই তো অন্য এক নতুন আবিষ্কার। যে আবিষ্কার ঢেউ তুলতে সক্ষম যে কোনো লেখায়। আগুনপাখি বাংলাসাহিত্যেই এক অভাবনীয় যোগ। কারণ এই উপন্যাসটি দিয়ে হাসান আজিজুল হক জানিয়ে দিয়েছেন তিনি শুধু অসম্ভব শক্তিমান ছোটগল্পকারই নন, তিনি একজন আধুনিক উপন্যাসিকও।

বইটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সাবিত্রী উপখ্যান - হাসান আজিজুল হক

সাবিত্রী উপখ্যান - হাসান আজিজুল হক

ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
হাসান আজিজুল হকের সম্প্রতি প্রকাশিত উপন্যাস সাবিত্রী উপাখ্যান এমনই অসহ্য কিন্তু নাছোড় এক কাহিনি, যা পড়তে পড়তে মনে হয়, স্নায়ু ছিঁড়ে যাচ্ছে। লেখকের বয়স সত্তর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু উপন্যাস লিখেছেন মোটে দুইখানা। প্রথমটা আগুনপাখি, লিখেছেন ত্রিকালদর্শী এক বৃদ্ধার প্রত্যক্ষ জবানে। ওইটাতে গল্প বলার ভার তাঁকে বইতে হয়নি। কিন্তু সাবিত্রী দেবীর আখ্যান তিনি রচেছেন নিজের বয়ানে, লেখক হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করে। সাবিত্রী যখন বুড়ি হয়ে গেছেন, পুরোনো দিনের কথাগুলো আর স্মরণ করতে পারছেন না, তখন লেখক নিজেই সে দায়িত্ব নিচ্ছেন; গল্প শুরু করার খানিক পরই আটকে গিয়ে বলছেন, ‘ঠিক আছে। বুড়ি মনে করতে পারছেন না। আমি পরিষ্কার করে বলছি। আমি লেখক। আমি সর্বজ্ঞ। বাইরে যা ঘটেছিল তা জানি, আর মনের ওপরে, মাঝখানে, তলায় যা যা ঘটেছিল তা-ও জানি। আমি বলছি ও শুধু ঘোলা-ময়লা চোখ দুটো মেলে জানতে চায়, এখন চাঁদের সময় না আঁধারের সময়। কেন জানতে চায় তা সে একটুও ভাবে না। অথচ কারণটা কোথাও আছে, নিশ্চয় আছে। খুঁজে পাওয়া যায় না।’
লেখকের বয়ান থেকে আমরা কারণটা খুঁজে পাই—এক অসম্ভব চাঁদনী রাতে সাবিত্রী দেবীর জীবনে সর্বনাশ নেমেছিল। সর্বনাশ মানে সম্পূর্ণ সর্বনাশ, তার সারাটি জীবন ধরে কেবলই সর্বনাশের পুনরাবৃত্তি। এক নারী কতবার কতজনের দ্বারা কত দিন ধরে একের পর এক ধর্ষিত হলে সে কাহিনি অবিশ্বাস্য বলে মনে হতে পারে? বিশ শতকের অবিভক্ত বাংলায় এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে, তারপর আরও এক গ্রামে, তারপর আরও আরও গ্রামে, হিন্দু-মুসলমান, যুবা-প্রৌঢ় যেন এককাট্টা হয়ে নির্বিচারে উপর্যুপরি সাবিত্রী নামের একরত্তি মেয়েকে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কেবলই ধর্ষণ করে চলে। লেখকের বয়ানে সেসব ছবি এমন জ্যান্ত হয়ে ওঠে যে তা সহ্য করা যায় না; অসম্ভব, অবিশ্বাস্য ভেবেও চোখের সামনেই তা দেখতে দেখতে মনে হয় স্নায়ুতন্ত্রের ওপর দিয়ে বুলডোজার চলে যাচ্ছে।
একদম প্রথমে একসঙ্গে তিন পুরুষের কবলে পড়ে সাবিত্রী। তাদের পাশবিকতার বর্ণনা করছেন লেখক, ‘দুর্গাপদ হাত বাড়িয়ে সাবিত্রীকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বালির ওপর শুয়ে পড়ল। বটা, হাত দুটো চেপে ধর। সবুর, তুই ধর পা দুটো। আগে ধর তো, তারপর দেখছি।...সাবিত্রী এখন শুধুই মাথা নাড়তে পারে, মাথার পেছনটা ঠুকতে পারে বালির ওপর আর একটানা না না, আমার সব্বোনাশ কোরো না কোরো না। ভীষণ বিরক্ত দুর্গাদাস বটার দিকে চেয়ে বলল, মুখটা চেপে ধরতে পারছিস না! দুই হাতের ওপর বোস, মুখটা চেপে ধর! খুব ধীরে ধীরে কাজ এগোতে লাগল। দুর্গাপদ সাবিত্রীকে ভালো করে শুইয়ে দিচ্ছে। তারপর নাভির ওপর ধীরে ধীরে চেপে বসছে, সবুর আস্তে আস্তে পা দুটো হাঁটু অবধি গুটিয়ে দিচ্ছে, শাড়িটা এতক্ষণে বাতাসে উড়ে গিয়ে একটা মাটির ঢিবিতে আটকে রক্ত-পতাকার মতো পতপত করে উড়ছে। দুর্গাপদ সযত্নে শুয়ে পড়ল সাবিত্রীর ওপর। ইস্পাতের একটা বল্লম স্বচ্ছ আচ্ছাদনটুকু ছিঁড়ে মাখনের শেষ মাথায় গিয়ে পৌঁছাল। সাবিত্রী আর একবার মাত্র চিৎকার করে উঠল। পৃথিবীতে বিশুদ্ধ, সংক্ষিপ্ত মৃত্যু-চিৎকার একটাই।’
সাধারণত গল্প-উপন্যাসের চূড়ান্ত মুহূর্ত বা ক্লাইমেক্স হয় এ রকম। এরপর আর বিশেষ কিছু থাকে না। পাঠকেরও আর ধৈর্য থাকে না এরপর। কিন্তু হাসান আজিজুল হকের সাবিত্রী উপাখ্যান-এর এ কেবল শুরু। পুরো আখ্যানটিই আসলে সাবিত্রীর এমন অকহতব্য নিগ্রহের বিবরণ। সেই বিবরণে উঠে এসেছে বিচিত্র সব ব্যক্তিচরিত্র, তিনের দশকের সমাজ-চরিত্র, হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্কের চিত্রও বাদ যায়নি। আসলে, কেবল একজন নারীর সীমাহীন নিগ্রহের আখ্যান এটি নয়, সমাজেরও চিত্র বটে। লেখকের সঙ্গে আলাপ থেকে জেনেছি, ১৯৩৮ সালে পশ্চিমবঙ্গে এ রকম একটি চাঞ্চল্যকর ধর্ষণ-মামলার খবর ও নথিপত্র অবলম্বন করে তিনি রচনা করেছেন এই উপন্যাস। এই লেখায় তিনি সে মামলার কিছু নথিপত্র ব্যবহারও করেছেন। কিন্তু সেটা কাহিনির কঙ্কাল মাত্র। সেই কঙ্কালের গায়ে তিনি যে মেদ-মাংস জুড়েছেন, তা কেবল একজন দক্ষ কথাশিল্পীর হাতেই সম্ভব। শিল্পীর হাত বলেই এ কাহিনি নিছক একটা ফৌজদারি কেস স্টাডি বা সমাজ-গবেষণার প্রতিবেদন না হয়ে হয়েছে অপূর্ব এক সাহিত্যকর্ম।
কিন্তু এই সাহিত্যকর্মের আঘাত করার ক্ষমতা এমনই মারাত্মক যে সে আঘাত সহ্য করা প্রায় অসম্ভব বলে বোধ হয়। সাবিত্রীর নিগ্রহ-নিপীড়নের বর্ণনা দিতে দিতে একটা পর্যায়ে এমনকি খোদ লেখককেও ক্লান্ত হয়ে পড়তে দেখি। শেষের দিকে লেখক বলছেন, ‘না, এ গল্প আর চালানো যাচ্ছে না, কেবলই বেঁকে যাচ্ছে অক্ষর।’
হাসান আজিজুল হক একবার প্রশ্ন তুলেছিলেন, সাহিত্য সমালোচনা কি আদৌ সম্ভব? আমার মনে হয়, না, সম্ভব নয়। যা সম্ভব বলে মনে হয়, তা হলো পাঠের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা এবং সেটা একান্তই ব্যক্তিগত বিচার, সর্বজনীন কিছু নয়। তাঁর সাবিত্রী উপাখ্যান পড়ে আমার প্রতিক্রিয়া হয়েছে মারাত্মক। আমি রীতিমতো ধরাশায়ী বোধ করেছি। আর মনে হয়েছে, তিনি এই অসহ্য উপাখ্যান রচনা করেছেন বাংলাভাষী সাহিত্য-পাঠকের মানসিক সুস্থতা ও স্নায়বিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে।
উপরের আলোচনাটি প্রথম প্রকাশিত হয়ে দৈনিক প্রথম আলোতে।

Download Now
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

রেপ - হাসান আজিজুল হক

amarboi

উপন্যাস
রেপ
হাসান আজিজুল হক

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

আত্মজীবনী - হাসান আজিজুল হক

amarboi.com
আত্মজৈবনিক রচনা করে সেতু—অতীতের সঙ্গে ভবিষ্যতের। হাসান আজিজুল হকের উঁকি দিয়ে দিগন্ত তেমনই একটি সেতু। এ লেখায় সন-তারিখের বালাই নেই; কিন্তু সময়টি চিনে নিতে একটুও কষ্ট হয় না। ঘটনাপ্রবাহ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের এক গ্রামীণ জনপদের। কিন্তু সারা দেশের ও সমস্ত পৃথিবীর ঢেউ ছুঁয়ে যায় সেই জনপদের মানুষগুলোকে। বিশ্বযুদ্ধ, মহামারি, বভুক্ষা, হিন্দু-মুসলমান কাটাকাটি-ভাগাভাগি, কংগ্রেস-মুসলিম লীগ—সবকিছু এসে পড়ে। এবং সবই দেখা যায় পাঠশালার পড়ো এক বালকের চোখ দিয়ে। আবার এই সমস্ত বড় বড় ঘটনার অন্তরালেই বয়ে চলে মানুষের চিরন্তন জীবনপ্রবাহ, দেশ-কাল নির্বিশেষে যেখানে মানুষ শুধুই মানুষ। কত মানুষ, কত ঘটনা, কত কথা, কত দৃশ্য, কত মুহূর্ত, কত অনুভব—সম্পূর্ণ একটি ভুবন। কিন্তু সেই ভুবন আজ হারিয়ে গেছে, যেমন সেই কিশোরটিকে আজ আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
বইটির আংশিক অংশ আমরা amarboi.com এর পাঠকদের কাছে তুলে দিলাম। পূর্ণাঙ্গ বইটি অচিরেই এখানে প্রকাশিত হবে।

আপনাদের সহযোগীতা না পেলে এই সাইট সামনের দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। তাই যদি বইটি ভালো লেগে থাকে তাহলে দুচার লাইন লিখে আপনার অভিব্যাক্তিগুলো জানিয়ে রাখুন আমাদের কমেন্টস বক্সগুলোতে। আর শুধু মাত্র তাহলে আমরা আরও অনেক বই নিয়ে আপনাদের সামনে আসতে পারবো। ধন্যবাদ।

নতুন বই ইমেইলে পেতে হলে

Click on +1 button before download =>
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com