সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label bangla ebooks. Show all posts
Showing posts with label bangla ebooks. Show all posts

টুকি ও ঝায়ের (প্রায়) দুঃসাহসিক অভিযান - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

Tooki Ebong Jhaer Dusshashik Abhijan by Md Jafar Iqbal
টুকি ও ঝায়ের (প্রায়) দুঃসাহসিক অভিযান - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
টুকি ও ঝায়ের (প্রায়) দুঃসাহসিক অভিযান - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
All books password is amarboi.com
আমারবই.কম শুধু মাত্র বই ডাউনলোড করে কম্পিটারে রেখে দেবার বা অন্য সাইটে শেয়ার করবার জন্য আপলোড করে না। পাঠক বইটি পড়বে সেটাই আমাদের মৌলিক উদ্দেশ্য। আমরা চাই পাঠক বইটি পড়ুক, আলোচনা, সমালোচনা করুক, তাহলেই আমাদের সার্থকতা। নইলে এতো কষ্ট বৃথা, তাই আপনাদের মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম। আর্থিক ভাবে আমাদের সহায়তা করবার জন্য, অনুরোধ রইলো আমারবই.কম এর প্রিমিয়াম সদস্য হবার। বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন।
কিছু সমস্যার কারনে আমরা আমাদের ডাউনলোড লিংকে পরিবর্তন এনেছি। এখন থেকে ফাইলটি ডাউনলোড করবার পর পাসওয়ার্ড হিসেবে amarboi.com ব্যবহার করুন।
You can follow us on Twitter or join our Facebook fanpage or even follow our Google+ Page to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature. Also try our chrome extension.
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

জলদাসীর গল্প - হরিশংকর জলদাস [বইমেলা ২০১১]

Jaladasir Golpo by Harishankar Jaladas [Short Stories] Ebook

হরিশংকর দল দাস
বইয়ের ধরন: ছোটগল্প
প্রকাশনী: মাওলা ব্রাদার্স
প্রকাশকাল: ৪ঠা ফেব্রুয়ারী ২০১১
ডাউনলোডঃ এখানে ক্লিক করুন
কালিন্দীর যে-তীরে ডমরনগর, সে-তীরে বারাঙ্গনাপল্লী। এই পল্লী নগরীর বাইরে, বাজারের পাশে। ও-পাড়ের মাঝিরা যে-ঘাটে নৌকা ভিড়ায়, তার থেকে সামান্য পশ্চিমে বারাঙ্গনাপল্লীটি। জোয়ার ভাটার নদী কালিন্দী। ভাটায় জল নেমে গেলে চর ভেসে ওঠে। বারাঙ্গনাপল্লী থেকে দু’কদম হাঁটলেই নদীপাড়। ওখান থেকে ঢালু হয়েছে ভূমি। বারাঙ্গনারা সকালে একবার, সন্ধেয় আরবার গা-গতর ধুতে যায় নদীজলে। পুরুষ-বর্জ্য শরীর থেকে সাফ করতে হয় যে তাদের। রাতে দিনে অতিথি আসে বারাঙ্গনাগৃহে। শরীর-ক্ষুধার তো কোনো রাত দিন নেই। মাহুত, মশালচি, সৈন্য, চারণকবি, টিকিনাড়া ব্রাহ্মণ, বাজারিয়া, হাটুরিয়া সবাই আসে ক্ষুধা মিটাতে। আর আসে ভীমের একজন সেনানায়ক, চণ্ডক তার নাম। মোহনার কাছে আসে সে। নদী-সমুদ্রের মিলনস্থল মোহনা। মিষ্টি আর নোনা জলে মাখামাখি, লুটোপুটি। নদী সমুদ্রকে আর সমুদ্র নদীকে পেয়ে তৃপ্ত। মোহনার কাছে এলেই চণ্ডকের তৃপ্তি। মোহনা তার নদী।
বারাঙ্গনাপল্লীটি তত বড় নয়, তবে এর মাঝখানে বিশাল চত্বর। চত্বরের চতুর্দিকে সারি সারি ঘর, মাটির দেয়াল। ঘরগুলো উঁচু উঁচু, প্রশস্ত আঙিনা। সেই আঙিনায় অতিথিদের বসার ব্যবস্থা। মিলনের স্থান ভিতরে। ভিতরটা নয়নাভিরাম। একদিকে বিশাল খাট, চারদিকে অগুরু চন্দনের সুবাস। একটু দূরে তাকিয়ার ওপর গুবাক-তাম্বুলের বাটা। অতিথিকে গুবাক-তাম্বুলে আপ্যায়নের রেওয়াজ আছে।
এই বারাঙ্গনাপল্লীর প্রধানা জানকি। জানকি একদা এই পল্লীরই বারাঙ্গনা ছিল। এখন প্রৌঢ়া জানকি ত্রিশ-চল্লিশ জন যৌবনবতী বারাঙ্গনার দেখাশোনা করে। তাদের নিরাপত্তার দিকেও নজর তার। পল্লীর চারদিকে সুউচ্চ মাটির পাঁচিল। দক্ষিণ দিকে প্রবেশদ্বার। ওই দ্বার দিয়েই আসা যাওয়া। পাঁচিল ডিঙানোর উপায় নেই।
শুধু ডমরনগরে নয়, আরও বিশাল বিশাল নগরীতে বাররামাদের আবাসস্থল। গৌড়, চম্পকনগর, মগধ, বৈশালী—এসব নগরে চিরায়ুষ্মতীরা বাস করে। তারা নগরীর শোভা। গঙ্গা-করতোয়া-কালিন্দী-সংলগ্ন ভূমিতে বারাঙ্গনারা বহু বহু প্রাচীনকাল থেকে কামলোভীদের তৃপ্তি দিয়ে আসছে। সমাজে তারা আদরণীয়। বাররামারাও তা জানে। ডমরনগরের বারাঙ্গনাপল্লীর মেয়েরা জানে যে, তারা ভোগের, ভোগের পর ছুড়ে ফেলারও। মোহনা, কুন্তি, সুবর্ণা, দময়ন্তী, অঙ্গনা, মেনকারা এও জানে যে, সমাজে তাদের কদর ওইটুকু সময় পর্যন্ত, যতদিন তাদের গতরে যৌবন আছে। তাই তারা স্তনের পরিচর্যা করে, অধরের পরিচর্যা করে। শরীরের ভাঁজে ভাঁজে মহুল মদ গরম করে ডলে। উষ্ণ মদে গতরের ব্যথা সারে। দীর্ঘ সময় মদের গন্ধ লেগে থাকে শরীরে। ওই গন্ধে গ্রাহকের দেহমন আনচান করে।
বারাঙ্গনাপল্লীর দুয়ারে দুয়ারে দীপাধার হাতে দাঁড়িয়ে থাকে চিরায়ুষ্মতীরা। তাম্বুল চর্চিত অধর তাদের। বারাঙ্গনাদের সন্তান হতে নেই। তবু হয়। কন্যাসন্তানেই সুখ তাদের। বিগতযৌবনে এই কন্যাই মূলধন। ডমরনগরের বারাঙ্গনাপল্লীতে এই পেশায় প্রথম যেদিন হাতেখড়ি হয়, সেদিন সকালে নাপিতানী এসে নখ খুঁটে দিয়ে যায়। মেয়েটির মাথায় ঘষে ঘষে সুবাসিত তেল মাখানো হয়। নদীতে স্নান করানো হয়। নতুন কাপড় আলতা কাজল পরিয়ে ধানদূর্বা দেয়া হয় তার মাথায়। ওর হাত ধরে লক্ষ্মী ঢুকবে যে এই বারাঙ্গনাপল্লীতে।
মোহনার স্পষ্ট মনে আছে—এই বৃত্তিতে ব্রতী হবার প্রথম দিনের কথা। সদ্য রজস্বলা হয়েছে সে। বামুনঠাকুর এসে গোধূলি লগ্নে একটি বঁটির সঙ্গে বিয়ে দিল তার। সিঁথিতে চিকন করে সিঁদুর দিল, গলায় ঝুলাল গাঁদাফুলের মালা। রাতের অতিথি ফুলমালা ছিঁড়তে বড় ভালোবাসে। অতিথি জানে—এ মালা শুধু মালা নয়, মেয়েটির অক্ষতযোনীর প্রমাণও। অক্ষতযোনীতে যুবা প্রৌঢ় বৃদ্ধ কার না আগ্রহ!
জানকির কাছ থেকে মোহনার কুমারিত্ব কিনে নিয়েছিল চণ্ডক। উচ্চ মূল্যে। সেরাতে আধা পন কড়ি দিয়ে মোহনার ঘরে ঢুকেছিল চণ্ডক।
বঁটির সঙ্গে বিয়ের পর থেকে ভাবনায় পড়েছিল মোহনা। বিয়েই যদি, বঁটির সঙ্গে কেন? জিজ্ঞেস করেছিল জানকিকে, ‘লোহার সাথে বিয়া কেনে, মানুষের সাথে নয় কেনে?’
জানকি বলেছিল, ‘এই পাড়ার অক্ষতযোনীদের গাছ বা লোহার সাথে বিয়া দেওয়ার নিয়ম। গাছ ত অমর, লোহার ক্ষয় নাই। এক গাছ মরল ত, তার বীজ থেকে আরেক গাছ জন্মাল, গাছ চিরায়ু, লোহা অক্ষয়। বারবধূরাও চিরায়ুষ্মতী। এক মোহনা গেলে, আরেক কাঞ্চনা আসে। জায়গা খালি থাকে না। তাই অমর জিনিসের সাথে মোদের বিয়া হয়। তোহারও হয়েছে।’
সেই থেকে বঁটিটিকে কাছে কাছে রাখে মোহনা। ভাবে—ওই-ই ত মোর স্বামী।
মোহনা উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা। জালিকদের ঘরে ফর্সা রঙের নারী নেই। মোহনার চুল কোঁকড়ানো। কোঁকড়া চুল খুব বেশি লম্বা হয় না। কিন্তু বিপুল হয়। মাথাভর্তি চুল মোহনার। চিপচিপে শরীর। চোখেমুখে এখনো গ্রামজীবনের শৈশব লেপ্টে আছে। কালিন্দী এগিয়ে যেতে যেতে যেতে যেখানে বাঁক নিয়েছে, সেই বাঁকে জেলেপল্লী। সেই পল্লীর নাম গাঙ্গী। সেই গাঙ্গী থেকে তিন বছরের মোহনাকে চুরি করে এনেছিল সনকা। কিনে নিয়েছিল জানকি। তারপর লালন-পালন। তারপর চ্লকের ডুবসাঁতার, মোহনায়। মদিরারক্তিম চোখে চণ্ডক মোহনার ঘরে ঢুকেছিল সেরাতে। মোহনার গলার মালায় হাত বুলাতে বুলাতে বলেছিল, ‘এই মালা আমার, এই মোহনা আমার। এর ঘরে আর কাউরে ঢুকতে দিও না।’


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

প্রডিজি - মুহাম্মদ জাফর ইকবাল [বইমেলা ২০১১]

amarboi.com
প্রডিজি - মুহাম্মদ জাফর ইকবাল [বইমেলা ২০১১] Chrome Extension for Amarboi, Add it Now

Always have your stuff when you need it with @Dropbox. 2GB account is free! http://db.tt/AcDEI7NP

You can follow us on Twitter or join our Facebook fanpage or even follow our Google+ Page to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature.
Download Bangla books in pdf form amarboi.com and also read it online. 'bangla-boi, boimela, humayun ahmed, bangla boi, ebook, bangla-ebook, bangla-pdf, bangla book, bangla pdf, zafar iqbal, boi, bengali books download'
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

আমরা কেউ বাসায় নেই হুমায়ূন আহমেদ কিস্তি ০৮

amarboi.com
আমরা কেউ বাসায় নেই
ধারাবাহিক উপন্যাস
কিস্তি ০৮
হুমায়ূন আহমেদ


মা জেনেছেন, তাঁর পাকস্থলীতে ক্যানসার। অল্পদিনের মধ্যেই মারা যাবেন। তিনি যে খুব চিন্তিত, এ রকম মনে হচ্ছে না। এত বড় অসুখ বাঁধানোয় নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। অন্যদের সঙ্গে টেলিফোনের কথাবার্তায় সে রকমই মনে হয়। তাঁর টেলিফোনে কথাবার্তার নমুনা—
রুনি! আমার খবর শুনেছিস। কী আশ্চর্য! কেউ বলে নাই? আমার ক্যানসার হয়েছে। চিকিৎসা চলছে। বাঁচব মনে হয় না। কথায় আছে না, ক্যানসার নো আনসার। ক্যানসারের কারণে বিদেশ যাচ্ছি। টগরের বাবা বলেছে, আমাকে ব্যাংককে নিয়ে যাবে। দুই ছেলেকেও সঙ্গে নিয়ে যাবে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে দলবেঁধে বেড়ালাম। সেখানে ‘পাতায়া’ বলে একটা জায়গা আছে, খুব সুন্দর।
এমন অনেক আত্মীয়স্বজন বাসায় আসছেন, যাঁদের আগে কখনো দেখা যায়নি। খালি হাতে কেউ আসছেন না। ডাব, পেঁপে, হরলিক্সের কৌটা জড়ো হচ্ছে। মা প্রতিটি আইটেমের হিসাব রাখছেন। উদাহরণ, ‘মনজু! ডাব চারটা ছিল, আরেকটা গেল কই?’
মা আনন্দিত, তবে বাবা বিধ্বস্ত। বিদেশযাত্রার খরচ তুলতে পারছেন না। গাড়ি বিক্রি করতে চেয়েছিলেন, সেটা সম্ভব হলো না। দেখা গেল, গাড়ির কাগজপত্রও পদ্মর মায়ের নামে। বাবা অবাক হয়ে ভাইয়াকে বললেন, তুমি গাড়ির কাগজপত্রও ওই মহিলার নামে করিয়ে দিয়েছ?
ভাইয়া বলল, না। এটা উনি নিজে নিজেই করেছেন। বাড়ির নকল কাগজপত্র তৈরি করে পথ দেখিয়ে দিয়েছি, এতেই কাজ হয়েছে। উনি নিজেই এখন পথ বানিয়ে এগোচ্ছেন। মহীয়সী মহিলা!
কী মহিলা বললি?
মহীয়সী মহিলা। পলিটিকসে ভালো কেরিয়ার করতে পারবেন। প্রথমে মহিলা কমিশনার, তারপর পৌরসভার চেয়ারম্যান, সেখান থেকে এমপি। এমপি হওয়ামাত্র তোমার এই গাড়ি বাতিল। নতুন শুল্কমুক্ত গাড়ি।
বাবা বললেন, খামাখা কথা বলছ কেন? চুপ করো।
ভাইয়া চুপ করলেন। বাবা গেলেন পদ্মর মায়ের কাছে। তিনি আগে পদ্মর মাকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠাতেন। এখন ডাকলে আসেন না বলে নিজেই যান। তাদের ঘরের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে খুক্ খুক্ করে কাশেন। দেখে মায়া লাগে।
বেশ অনেকবার কাশাকাশির পর পদ্মর মা বের হয়ে এলেন। বিরক্ত গলায় বললেন, কিছু বলবেন?
গাড়ির বিষয়ে একটা কথা ছিল।
কী কথা?
গাড়ির আপনি নতুন করে কাগজপত্র করিয়েছেন। এখন গাড়িও আপনার নামে।
পদ্মর মা বললেন, এটাই তো হবে। বাড়িভাড়া হিসেবে মাসে বিশ হাজার করে টাকা গাড়ির দামের সঙ্গে কাটা যাচ্ছে। মাসে বিশ হাজার টাকা দিতে বলেছিলাম। এক পয়সা কি দিয়েছেন?
নিজের বাড়িতে থাকব আবার বাড়িভাড়াও দেব!
পদ্মর মা বললেন, পুরোনো কথা তুলবেন না। পুরোনো কথা শোনার সময় আমার নাই।
বাবা প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, আমি কত বড় বিপদে আছি, আপনি তো জানেন।
পদ্মর মা বললেন, আপনি এখন বিপদে পড়েছেন। আমি পদ্মর বাবার মৃত্যুর পর থেকেই বিপদে আছি। আমাকে আপনি বিপদের কথা শোনাবেন না। মায়ের কাছে মাসির গল্প করবেন না।
বাবা বললেন, আপনার বিপদে আমি সাধ্যমতো সাহায্যের চেষ্টা করেছি। মাঝেমধ্যে টাকা-পয়সা পাঠিয়েছি। আপনাকে আশ্রয় দিয়েছি।
পদ্মর মা বললেন, ভাইসাহেব, উল্টা কথা বলবেন না। আশ্রয় আপনি দেন নাই। আশ্রয় আমি আপনাদের দিয়েছি। আমার জমিতে তোলা বাড়িতে থাকতে দিয়েছি। আপনার সঙ্গে এই নিয়ে আর বাহাস করতে পারব না। মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে। মনে হয় জ্বর আসবে।
হতাশ বাবা ডিকশনারি হাতে কলতলায় বসে রইলেন।

আমাদের সবার তিন মাসের ভিসা হয়েছে। মা ক্যানসারের ব্যথা ভুলে আনন্দে ঝলমল করছেন। বাবাকে ডেকে বললেন, আমার একটা কথা তোমাকে রাখতেই হবে। ‘না’ করতে পারবে না। ক্যানসার হয়েছে, মারা যাব—এটা তো জানোই, ধরে নাও একজন মৃত মানুষের কথা।
বাবা বললেন, বলো, কী কথা।
রাখবে তো?
রাখব।
মা বললেন, টগর-মনজু প্রথমবারের মতো বিদেশ যাচ্ছে। ওদের স্যুট কিনে দিতে হবে। ওরা স্যুট-টাই পরে যাবে। স্যুট-টাই, নতুন জুতা।
বাবা বললেন, এসব তুমি কী বলছ?
মা বললেন, তুমিও নতুন স্যুট কিনবে। লাল রঙের টাই।
মা কিশোরী মেয়েদের মতো আহ্লাদী হাসি হাসতে লাগলেন।
বাবা বললেন, তুমি আমার অবস্থা বুঝতে পারছ না। মাত্র আশি হাজার টাকা জোগাড় হয়েছে। এই টাকায় যাওয়া-আসার টিকিট হবে, তোমার চিকিৎসা হবে না।
মা বললেন, আমার চিকিৎসার দরকার নাই। যাওয়া-আসা হলেই হবে। তবে তিনজনেরই নতুন স্যুট লাগবে।
গ্রামের বসতবাড়ি বিক্রি করার জন্যে বাবা চলে গেলেন। আমাকে সঙ্গে নিতে চেয়েছিলেন, আমি নানান অজুহাত দেখিয়ে কাট মারলাম। চাকরিতে জয়েন করব, শুরুতেই অ্যাবসেন্ট হওয়া যাবে না। কথাটা মিথ্যা নয়। সোমবার আমার জয়েন করার কথা। শকুনশুমারি সামনের মাসের এক তারিখ থেকে শুরু হবে।
বাবার বসতবাড়ির কথা এই ফাঁকে বলে নিই। বসতবাড়িটা বেশ সুন্দর। বেশির ভাগ দরজা-জানালা ভেঙে পড়ে গেলেও দক্ষিণমুখী একতলা পাকা বাড়ি। বাড়ির পেছনে পুকুর। পুকুরে বাঁধানো ঘাট আছে। ঘাট এখনো নষ্ট হয়নি। বর্ষায় পুকুর ভর্তি পদ্ম ফুল ফোটে। দুপুর বারোটায় সব ফুল একসঙ্গে বুজে যায়। অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য। পুকুরের চারপাশে আম-কাঁঠালের বাগান ছিল, এখন হয়েছে আম-কাঁঠালের জঙ্গল। সুন্দর এই জায়গাটা অন্যের হাতে চলে যাবে, ভাবতে খারাপই লাগছে। উপায় কী?
বাবার অনুপস্থিতি আমাদের জীবনযাত্রায় তেমন প্রভাব ফেলল না। যখন ব্যথা থাকে না, তখন মা আগের মতোই ডিভিডি প্লেয়ারে হিন্দি ছবি দেখেন। পাড়ায় নতুন একটা ডিভিডির দোকান হয়েছে। নাম ‘ডিভিডি হোম সার্ভিস’। এরা বাড়ি বাড়ি ডিভিডি সাপ্লাই করে এবং নিয়ে যায়। ভাড়া দৈনিক কুড়ি টাকা। মা তাদের সক্রিয় সদস্য।
ভাইয়া আগের মতোই শুয়ে শুয়ে বই পড়ে সময় কাটাচ্ছে। গৃহত্যাগের কথাবার্তা তার মুখ থেকে শোনা যাচ্ছে না। মায়ের অসুখের কারণে গৃহত্যাগ সাময়িক স্থগিত কি না, তা-ও বুঝতে পারছি না। ভাইয়া দাড়ি-গোঁফ কামানো সাময়িক বন্ধ রেখেছে। এখন তার মুখ ভর্তি দাড়ি। তাকে অন্য রকম দেখাচ্ছে। চেহারায় ঋষি ভাব আসি আসি করছে।
বাবার গাড়িটা মনে হয় শেষটায় ঠিকঠাক হয়েছে। ড্রাইভার ইসমাইল রোজই গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছে। পেছনের সিটে সেজেগুজে পদ্ম এবং তার মা বসে থাকেন। নিয়মিত গাড়িতে চলার কারণেই কি না কে জানে, ভদ্রমহিলার চেহারা উজ্জ্বল হয়েছে। আগে তিনি ঠোঁটে লিপস্টিক দিতেন না; এখন দিচ্ছেন।
পদ্ম ভালো আছে। সুখে এবং আনন্দে আছে। সে নতুন একটা খেলা শিখেছে। খেলার নাম সুডুকু। জাপানি কী একটা অঙ্কের হিসাবের খেলা। সে আমাকে বোঝাতে চেয়েছিল। আমার গবেট মাথায় বিষয়টা ঢোকেনি। পদ্ম হতাশ হয়ে বলেছে, আপনাকে দেখে যতটা বোকা মনে হয়, আপনি তার চেয়েও বোকা।
আমার ভাইয়ার অবস্থা কী?
পদ্ম বলল, তাঁর চেহারায় গবেট ভাব আছে, তবে তিনি বুদ্ধিমান।
আমি বললাম, ভাইয়া বুদ্ধিমান কী করে বুঝলে? তার সঙ্গে তো তোমার কথা হয় না।
পদ্ম বলল, কে বোকা, কে বুদ্ধিমান তা জানার জন্যে কথা বলতে হয় না। চোখ দেখেই বোঝা যায়। আপনাদের এই বাড়িতে সবচেয়ে বোকা রহিমার মা। তার পরই আপনি।
বোকামির দিক থেকে ফার্স্ট হওয়া গেল না?
না।
পদ্ম সুডুকু খেলা বন্ধ করে বলল, আমি যদি আপনাকে একটি জটিল প্রশ্ন করি আপনি উল্টাপাল্টা জবাব দেবেন। রহিমার মা কিছুই বলতে পারবে না। কিন্তু আপনার ভাই চমৎকার জবাব দেবেন।
আমি বললাম, প্রশ্নটা কী?
পদ্ম বলল, ছেলে ও মেয়ের মধ্যে যখন প্রেম হয়, সেই প্রেমটা আসলে কী?
আমি বললাম, প্রেম হচ্ছে দুজনে একসঙ্গে ফুসকা খাওয়া। রিকশায় করে বেড়ানো। রাত জেগে মোবাইলে কথা বলা।
পদ্ম বলল, আপনার কাছ থেকে এই উত্তরই আশা করছিলাম। রহিমার মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে বলল, পিরিতিরে বলে প্রেম। ভালো কথা, রহিমার মা যে প্রেগন্যান্ট, এটা জানেন?
আমি চমকে উঠে বললাম, না তো!
সে আড়ালে-আবডালে বমি করে বেড়াচ্ছে।
বলো কী?
পদ্ম বলল, সন্তানের বাবা কে, আন্দাজ করতে পারছেন?
না।
আমি জানি।
জানলে বলো কে?
আমি বলব কেন! আপনি খুঁজে বের করুন।
পদ্ম সুডুকু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমি কী করব বুঝতে পারছি না। বসে থাকব, না ভাইয়ার কাছে যাব? শকুন বিষয়ে কিছু তথ্য জানব। প্রথম দিনের চাকরিতে শকুন বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলে যদি উত্তর না দিতে পারি, তাহলে লজ্জার বিষয় হবে।
পদ্ম মনে হয় সুডুকু ঝামেলা শেষ করেছে। সে আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। আমি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললাম—‘কাহারও হাসি ছুরির মতো কাটে, কাহারও হাসি অশ্রুজলের মতো।’ পদ্মর হাসি ছুরির মতো কাটে।
পদ্ম বলল, প্রেম বিষয়ে আমার কাছ থেকে জানতে চান? আমার ব্যাখ্যা?
বলো।
পদ্ম গম্ভীর মুখে বলল, প্রেম হলো এক ধরনের আবেগ, যা লুকানো থাকে। প্রেমিককে দেখে প্রেমিকার সেই আবেগ লুকানো অবস্থা থেকে বের হয়ে আসে। তখন হার্টবিট বেড়ে যায়। ঘাম হয়। পানির পিপাসা হয়। একসঙ্গে প্রবল আনন্দ এবং প্রবল বেদনা হয়। আনন্দ—কারণ, প্রেমিক সামনে আছে। বেদনা— কারণ, কতক্ষণ সে থাকবে কে জানে!
আমি বললাম, বাহ! ভালো বলেছ।
পদ্ম হাই তুলতে তুলতে বলল, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে প্রেমের ডেফিনেশন দিলাম। আপনি আশপাশে থাকলে আমার মধ্যে এই ব্যাপারগুলো ঘটে।
আমি বললাম, ঠাট্টা করছ?
পদ্ম বলল, হ্যাঁ। ঠাট্টা যে বুঝতে পারছেন, তার জন্যে ধন্যবাদ।
ভাইয়ার কাছ থেকে শকুন বিষয়ে যা জানলাম, তার সারসংক্ষেপ—

শকুন
পৃথিবীতে দুই ধরনের শকুন আছে। পুরোনো পৃথিবীর শকুন এবং নতুন পৃথিবীর শকুন। পুরোনো পৃথিবীর শকুন পাওয়া যায় আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপে। পরিবারের নাম Accipitrydae। এই পরিবারে আছে ইগল, বাজপাখি।
নতুন পৃথিবীর শকুন থাকে আমেরিকার উষ্ণ অঞ্চলে। এদের পরিবার পুরোনো পৃথিবীর পরিবারের সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত নয়। এই পরিবারের নাম Cathartidae। এদের বকপাখি গোত্রের মনে করা হয়।
শকুনকে (পুরোনো পৃথিবীর শকুন) বলা হয় ‘মেথর পাখি’। এরা গলিত শবদেহ (পশু, মানুষ) খেয়ে পরিষ্কার করে বলেই মেথর। এদের দৃষ্টিশক্তি ও ঘ্রাণশক্তি অসাধারণ; আকাশের অনেক ওপরে থেকেও গলিত শব দেখতে পায় এবং এর ঘ্রাণ পায়।
শকুন কখনো সুস্থ প্রাণীকে আক্রমণ করে না। তবে আহত প্রাণীকে করে।
পৃথিবীর দুটি অঞ্চলে কোনো ধরনের শকুন নেই। অস্ট্রেলিয়া ও অ্যান্টার্কটিকা।

শকুন গবেষণার হেড অফিস মিরপুরে। ছিমছাম তিনতলা বাড়ি। বাড়ির নাম ‘পবন’। এক ও দোতলায় শকুন গবেষণাকেন্দ্র। তিন তলায় ‘বনলতা সেন রিসার্চ সেন্টার’। এই রিসার্চ সেন্টারের কাজ হলো, জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেনকে খুঁজে বের করা। তবে এটা কোনো এনজিও নয়। ব্যক্তি-উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত রিসার্চ সেন্টার। এর কর্মীরা বনলতা সেনের পরিচয় উদ্ধারে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
আমি শকুন গবেষণাকেন্দ্রের ফিল্ড সুপারভাইজার আব্দুস সোবাহান মোল্লা সাহেবের সামনে বসে আছি। বিস্ময়কর ঘটনা হলো, ভদ্রলোকের চেহারায় শকুনভাব প্রবল। শকুনের মাথায় পালক থাকে না; এঁর মাথায় একটি চুলও নেই। শকুনের ঠোঁট লম্বা এবং নিচের দিকে বাঁকানো; মোল্লা সাহেবের নাক যথেষ্ট লম্বা এবং নিচের দিকে খানিকটা ঝুঁকে আছে। তাঁর চোখও শকুনের মতোই তীক্ষ। ভদ্রলোক আমার দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, চাকরিতে জয়েন করতে এসেছেন?
আমি বললাম, জি।
মোটরসাইকেল নিয়ে এসেছেন?
আমি থতমত খেয়ে বললাম, মোটরসাইকেল কেন নিয়ে আসব? তা ছাড়া মোটরসাইকেল পাবই বা কোথায়?
মোল্লা সাহেব তাঁর তীক্ষ চোখ আরও তীক্ষ করে বললেন, আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারে লেখা আছে—ফিল্ডকর্মীরা নিজেদের মোটরসাইকেল নিয়ে আসবেন। মোটরসাইকেলে করে তাঁরা শকুন অনুসন্ধান করবেন।
আমি বললাম, স্যার, আমাদের এই এনজিওর কোনো শাখা কি অস্ট্রেলিয়ায় আছে?
মোল্লা সাহেব বললেন, আমাদের শাখা সারা পৃথিবীজুড়ে। অস্ট্রেলিয়ার খোঁজ কেন জানতে চাচ্ছেন?
আমি বিনয়ী গলায় বললাম, যদি সম্ভব হয়, আমাকে অস্ট্রেলিয়ায় ট্রান্সফার করে দিন। অস্ট্রেলিয়ার ফিল্ড অফিসাররা ঘরে বসে কাজ করতে পারবেন। তাদের মোটরসাইকেলের প্রয়োজন পড়বে না। কারণ, অস্ট্রেলিয়ায় কোনো শকুন নেই।
মোল্লা সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, যদি মোটরসাইকেল জোগাড় করতে পারেন তাহলে আসবেন। এখন বিদায়। অকারণ কথা শোনার সময় আমার নেই।
আমি শকুন অফিস থেকে বের হয়ে তিন তলায় বনলতা সেন রিসার্চ সেন্টারে চলে গেলাম। এখানে যদি মোটরসাইকেল ছাড়া চাকরি পাওয়া যায়।
বনলতা সেন অফিসটা দর্শনীয়। হালকা নীল রঙের বড় একটা ঘর হিম করে রাখা হয়েছে। একপাশে শাড়ি পরা (নীল রং) এবং খোঁপায় বেলি ফুলের মালা জড়ানো শ্যামলা এক মেয়ে কম্পিউটার নিয়ে বসে আছে। সব শ্যামলা মেয়ের চেহারায় দুঃখী দুঃখী ভাব থাকে। এই মেয়েটির চেহারায় দুঃখী ভাব প্রবল। তার চোখ বড় বড়। মনে হচ্ছে, কাঁদার জন্যে সে প্রস্তুত।
মেয়েটির ঠিক মাথার ওপর জীবনানন্দ দাশের ছবি। এর উল্টো দিকে বনলতা সেন কবিতাটি বাঁধানো।
আমি দুঃখী চেহারার মেয়েটির দিকে এগিয়ে গেলাম। আমি কিছু বলার আগেই মেয়েটি বলল, ‘এত দিন কোথায় ছিলেন?’ বনলতা সেনের মতোই ভাষ্য। মনে হয়, তাকে এভাবেই অভ্যর্থনা করতে বলে দেওয়া হয়েছে।
আমি বললাম, আপনাদের রিসার্চ সেন্টার সম্পর্কে কিছু জানতে এসেছি। আপনাদের কাজ কেমন এগোচ্ছে?
মেয়েটি বলল, খুবই ভালো। সবার ধারণা, বনলতা সেন থাকতেন রাজশাহীর নাটোরে। কথাটা ভুল। বরিশালের একটা গ্রামের নাম নাটোর। বীরভূমেও নাটোর আছে। বনলতা সেনের জন্যে এসব অঞ্চলেও আমরা অনুসন্ধান চালাচ্ছি।
কী ধরনের অনুসন্ধান?
পুরোনো নথিপত্র ঘাঁটা হচ্ছে। বয়স্ক মানুষের ইন্টারভিউ নেওয়া হচ্ছে। পত্রিকা দেখা হচ্ছে। আমরা আধুনিক প্রযুক্তি অর্থাৎ ইন্টারনেটের সাহায্যও নিচ্ছি।
আমি বললাম, আপনাদের কি ফিল্ডওয়ার্কার লাগবে? অনুসন্ধানের কাজে আমার ব্যাপক অভিজ্ঞতা আছে। এ মুহূর্তে আমি শকুন অনুসন্ধানের কাজে আছি। তবে শকুনের চেয়ে বনলতা সেনের অনুসন্ধান আনন্দময় হওয়ার কথা।
মেয়েটি বলল, চা খাবেন?
আমি বললাম, অবশ্যই খাব। আপনার নামটা কি জানা যায়?
মেয়েটি বলল, আমার নাম বনলতা। এটা নকল নাম। আসল নাম শ্যামলী। আমার বস ‘বনলতা’ নাম দিয়েছেন। বসের ধারণা, আমার চেহারা বনলতা সেনের মতো।
উনি কি বনলতা সেনকে দেখেছেন?
না। ওনার কল্পনার বনলতা।
আপনার বস কি বিবাহিত?
বনলতা হ্যাঁ-সূচক মাথা নেড়ে বলল, ওনার দুই ছেলে, দুই মেয়ে। বস আমাকে খুব পছন্দ করেন। ওনাকে বললে আপনার চাকরি হয়ে যাবে। আপনি একটা বায়োডাটা দিয়ে যান।
বায়োডাটা তো সঙ্গে নিয়ে আসিনি।
আপনি মুখে মুখে বলুন, আমি কম্পিউটারে নিয়ে নিচ্ছি।
আমি বনলতার সঙ্গে চা খেলাম। দুপুরের লাঞ্চ করলাম। খুবই আশ্চর্যের কথা, বনলতা অফিসের গাড়িতে করে আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে গেল।
কখনোই কোনো মেয়ে আমার প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায়নি। বনলতা কেন আগ্রহ দেখাচ্ছে, তা বুঝতে পারছি না। আমার চেহারার সঙ্গে জীবনানন্দ দাশের চেহারায় কোনো মিল কি আছে? ভালো করে আয়না দেখতে হবে।(চলবে)

আপনাদের সহযোগীতা না পেলে এই সাইট সামনের দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। তাই যদি বইটি ভালো লেগে থাকে তাহলে দুচার লাইন লিখে আপনার অভিব্যাক্তিগুলো জানিয়ে রাখুন আমাদের কমেন্টস বক্সগুলোতে। আর শুধু মাত্র তাহলে আমরা আরও অনেক বই নিয়ে আপনাদের সামনে আসতে পারবো। ধন্যবাদ।

নতুন বই ইমেইলে পেতে হলে

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

আমরা কেউ বাসায় নেই - হুমায়ূন আহমেদ কিস্তি ০৭

amarboi.com
আমরা কেউ বাসায় নেই
ধারাবাহিক উপন্যাস
কিস্তি ০৭
হুমায়ূন আহমেদ

সালামত এসেছে। ভাইয়ার ঘরে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আছে। সালামতকে ভয়ংকর দেখাচ্ছে। চোখ টকটকে লাল। দুটা চোখেই ময়লা। চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। সালামতের মাথা কামানো। মুখ ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি।
ভাইয়া বলল, আপনার ঘটনা কী? দশ দিন পরে আসবেন বলে গেলেন। এক মাস পার করে এসেছেন।
সালামত বলল, মরতে বসেছিলাম, ভাইসাহেব। প্রথমে হলো টাইফয়েড, তারপর জন্ডিস। এখন চোখ-ওঠা রোগ হয়েছে। সানগ্লাস খরিদ করেছিলাম; সানগ্লাস পরলে চোখে দেখি না বলে রেখে দিয়েছি।
পদ্মকে নিতে এসেছেন?
জি।
আপনার চোখের দিকে তাকালে পদ্ম যাবে না। সানগ্লাস পরুন। পদ্মকে ডাকি।
সালামত সানগ্লাস পরে বাড়ি কাঁপিয়ে কাশতে লাগল। ভাইয়া বলল, যক্ষ্মাও বাঁধিয়েছেন নাকি?
সালামত বলল, জি না। বৃষ্টিতে ভিজে বুকে কফ জমেছে। পদ্মকে ডেকে দেন, ভাইসাহেব। অধিক কথা বলা মানে সময় নষ্ট।
পদ্ম যেতে রাজি না হলে কী করবেন?
জোর করে তুলে নিয়ে যাব। লোকজন সঙ্গে করে এনেছি। এরা গাড়িতে বসা। আজ উনিশ বিশ যা হবার হবে। তবে...
বিকট কাশি শুরু হয় সালামতের, বাকি কথা শোনা গেল না।
পদ্ম এসেছে। সে সালামতের দিকে তাকিয়ে বলল, নিতে এসেছ?
সালামত বলল, হুঁ।
ট্রাক নিয়ে এসেছ?
না। নোয়া মাইক্রোবাস নিয়ে আসছি।
আমরা যাব কই?
প্রথমে আমার নানার বাড়িতে যাব। সুসং দুর্গাপুর। আমার বিশ্রাম দরকার।
পদ্ম বলল, চলো, রওনা দেই। মা বাড়িতে নাই। চলে যাওয়ার এখনই সময়। মা থাকলে নানা ঝামেলা করবে। যেতে দেবে না।
সালামত বলল, ব্যাগ-সুটকেস নেবে না?
পদ্ম বলল, ব্যাগ-সুটকেট গোছাতে গেলে দেরি হবে। মা চলে আসবে। আমার আর যাওয়া হবে না। চলো, চলো।
আমি বিস্মিত হয়ে দেখলাম, পদ্ম সত্যি সত্যি মাইক্রোবাসে উঠে চলে গেল। মাইক্রোবাস ভর্তি সন্দেহজনক চেহারার লোকজন। একজন আমার পরিচিত। আগারগাঁও বস্তিতে তাকে দেখেছি। সেদিনও তার গায়ে নীল গেঞ্জি ছিল, আজও ক খ গ লেখা নীল গেঞ্জি। তার মনে হয় একটাই গেঞ্জি।
এমন এক ঘটনা ঘটেছে, ভাইয়া নির্বিকার। যেন কিছুই হয়নি। সে তার বিশেষ ভঙ্গিতে শোয়া। চোখ বন্ধ। কোলের ওপর বই। আমি ঘরে ঢুকে বললাম, ভাইয়া, কাণ্ডটা দেখেছ?
ভাইয়া বলল, হুঁ। ইন্টারেস্টিং মেয়ে।
আমি বললাম, এক বস্ত্রে লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে চলে গেল।
ভাইয়া বলল, ফিরে আসবে বলেই এক বস্ত্রে গেছে। পৃথিবীর কোনো মেয়েই এক কাপড়ে বাড়ি ছাড়ে না। সীতাকে যখন রাবণ হরণ করে, তখনো সীতার হাতে পানের বাটা ছিল।
ভাইয়া বুকের ওপর থেকে বই নিয়ে পাশ ফিরল, এর অর্থ এখন সে ঘুমাবে। ভাইয়ার হচ্ছে ইচ্ছাঘুম, সে যেকোনো সময় যেকোনো পরিস্থিতিতে মাথার নিচে হাত রেখে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়তে পারে।
সালামত এসে ভাইয়ার ঘুম ভাঙাল। সালামত ভীষণ উত্তেজিত। তার সঙ্গে নীলগেঞ্জিও এসেছে। নীলগেঞ্জি চোখ-মুখ শক্ত করে রেখেছে।
ভাইয়া হাই তুলতে তুলতে বলল, কী সমস্যা?
সালামত বলল, পদ্ম কোথায়?
ভাইয়া বলল, এই প্রশ্ন আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করব। আপনি তাকে নিয়ে গেছেন, এখন আপনি বলছেন পদ্ম কোথায়। কিছু কিছু জিনিস আমি অপছন্দ করি, তার মধ্যে একটা হলো টালটুবাজি। আপনি টালটুবাজি করছেন।
সালামত বলল, আমি কোনো টালটুবাজি করছি না। অস্থির হয়ে আপনার কাছে এসেছি। ঘটনা বললেই বুঝবেন। আমরা শ্যামলী পর্যন্ত গিয়েছি, তখন পদ্ম বলল, ‘আমাকে পঞ্চাশটা টাকা দাও, আমি একটা জিনিস কিনব।’ আমি বললাম, ‘কী জিনিস বলো, আমি নিয়ে আসি।’ সে বলল, ‘উহুঁ, আমি আনব।’ গাড়ি থেকে নেমে একটা দোকানে ঢুকল, আর দেখা নাই। পালায়ে গেছে।
ভাইয়া বলল, পালিয়ে গেছে, নাকি কোথাও বেচে দিয়েছেন?
এই সব কী বলেন? নিজের বউ বেচব কীভাবে?
পরের বউ বেচার চেয়ে নিজের বউ বেচা সহজ না? আপনাকে চব্বিশ ঘণ্টা সময় দিলাম, এর মধ্যে পদ্মকে হাজির করবেন। চব্বিশ ঘণ্টা পর আমি ব্যবস্থা নিব।
নীলগেঞ্জি বলল, কী ব্যবস্থা নিবেন?
ভাইয়া নীলগেঞ্জির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে নির্বিকার গলায় বলল, তোমাকে খাসি করে দেব।
কী বললেন?
কী বললাম একবার শুনেছ, তোমাকে খাসি করা হবে। অণ্ডকোষ থেকে বিচি ফেলে দেওয়া হবে। একজন পাস করা ডাক্তার এই কাজটা করবেন, কাজেই ভয়ের কিছু নেই। আগে এনেসথেসিয়া করা হবে বলে ব্যথাও পাবে না।
নীলগেঞ্জির শক্ত চোখ-মুখ হঠাৎ লুজ হয়ে গেল। থুতনি খানিকটা ঝুলে গেল। সালামতের মুখ হয়ে গেল শক্ত। সালামত বিড়বিড় করে বলল, ভাইসাহেব, আমি আপনার সঙ্গে কোনো ঝামেলায় যাব না। আমি ঝামেলা পছন্দ করি না।
ভাইয়া বলল, আপনার সঙ্গে আমি ঝামেলায় যাচ্ছি না। আমি শুধু এই নীলগেঞ্জিকে খাসি করব। এ শামসুর লোক। শামসু নতুন করে ঝামেলা শুরু করেছে। একে খাসি করে দিলে শামসুর খবর হবে। শামসুর খবর হওয়া দরকার। এক দিনে অনেক কথা বলে ফেলেছি, এখন বিদায়। পদ্মর খোঁজে বের হয়ে যান। হাতে সময় বেশি নাই।
দুজন চলে যাওয়ার এক ঘণ্টা পর পদ্ম বাড়িতে ফিরল। তার হাতে আটটা হাওয়াই মিঠাই। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে কিছুই হয়নি। সে আমাকে বলল, হাওয়াই মিঠাই খাবেন?
আমি বললাম, না।
আপনার ভাই কি খাবে?
সেটা আমার ভাই জানে।
পদ্ম বলল, এই বাড়ির সবার জন্যে আমি একটা করে হাওয়াই মিঠাই কিনেছি। আপনি খাবেন না, বাকি সবাই কিন্তু খাবে। আমি মিষ্টি করে যখন বলব, তখন কেউ ‘না’ করবে না।
ভালো কথা, সবাইকে হাওয়াই মিঠাই খাইয়ে বেড়াও।
প্লিজ, একটা নেন না। এমন করেন কেন?
আমি হাত বাড়িয়ে নিলাম। পদ্ম খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল, দেখলেন, আপনি কিন্তু নিয়ে নিয়েছেন।
আমি বললাম, তুমি আগ্রহ করে স্বামীর সঙ্গে গেলে আবার চলে এলে, এর মানে কী?
পদ্ম বলল, ও আমার স্বামী আপনাকে কে বলল?
তুমিই বলেছ।
আপনাকে রাগানোর জন্যে বলেছি। আমার আশপাশে যারা থাকে, তাদের রাগিয়ে দিতে আমার ভালো লাগে।
সালামত যদি আবার তোমাকে নিতে আসে, তুমি কী করবে?
তার সঙ্গে আবার যাব।
পরেরবার সে তোমাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাবে।
পদ্ম হাওয়াই মিঠাইয়ে কামড় দিতে দিতে বলল, তার উচিত আমাকে শিকল দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাওয়া।
সালামত রাত দশটায় আবার এল। তার চিমশে যাওয়া চেহারা আরও চিমশেছে। আগে চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল, এখন নাক দিয়েও পড়ছে। সালামত ফ্যাসফেসে গলায় ভাইয়াকে বলল, জনাব, মাফ করে দেন। হানিফকে রিলিজ দিয়ে দেন।
ভাইয়া বলল, হানিফটা কে?
শামসুর নিজের লোক।
নীলগেঞ্জি?
জি, জনাব। তারে রিলিজ দিয়ে দিলে শামসু ভাই আপনার সঙ্গে আর ঝামেলায় যাবে না।
ভাইয়া হাই তুলতে তুলতে বলল, ঝামেলায় কেন যাবে না? আমি তো ঝামেলা পছন্দ করি।
ভাইসাহেব, আমি আপনার পায়ে ধরি।
সালামত সত্যি সত্যি ভাইয়ার পা ধরতে এগিয়ে এল। ভাইয়া বলল, আপনার হাত ময়লা-জীবাণুতে ভর্তি। এই হাতে পায়ে ধরবেন না। আগে সাবান দিয়ে ভালোমতো হাত ধুয়ে আসুন। বিজ্ঞাপনে দেখেছি, লাইফবয় সাবান জীবাণু ধ্বংস করে। পদ্ম ঘরে আছে, তাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন লাইফবয় সাবান আছে কি না। না থাকলে ড্রাইভার ইসমাইলকে বলুন, বাজার থেকে কিনে এনে দেবে।
সালামত বলল, আপনি একটা জিনিস বুঝেন, ভাইসাহেব। হানিফের কিছু হলে আপনি বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়বেন।
ভাইয়া হাসি-হাসি মুখে বলল, পৃথিবী বিশৃঙ্খলা চায়। শুধু পৃথিবী না, ইউনিভার্স বিশৃঙ্খলা চায়। এটা একটা বৈজ্ঞানিক সত্য। সেকেন্ড ল অব থার্মডিনামিকস বলে এনট্রপি বাড়বে। ডেলটা এস সমান সমান কিউ বাই টি। কিছু বুঝেছেন?
সালামত বলল, একটা জিনিস বুঝেছি, শামসু ভাইয়ের সঙ্গে আপনি ডাইরেক্ট অ্যাকশনে যেতে চান। ওনাকে সেটাই বলব। ভাইসাহেব, গেলাম।
পদ্মর সঙ্গে দেখা করে যাবেন না?
সালামত কোনো উত্তর না দিয়েই বের হয়ে গেল। আমি ভাইয়াকে বললাম, নীলগেঞ্জিকে সত্যি সত্যি খাসি করা হচ্ছে?
ভাইয়া বলল, জানি না। অপারেশন হয়ে গেলে রহিমার মায়ের মোবাইলে খবর দিতে বলেছি। এখনো কোনো খবর আসেনি।
আমি বললাম, তোমার ব্যাপারটা কী, আমাকে বুঝিয়ে বলো তো।
ভাইয়া বলল, রগট ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আমি জানি ‘শৃঙ্খলা’ একটি অস্বাভাবিক অবস্থা। প্রকৃতি বিশৃঙ্খলা চায় বলেই বিশৃঙ্খলা একটি স্বাভাবিক ব্যবস্থা। কিছু বোঝা গেল?
না।
বিশৃঙ্খলা হলো এনট্রপির বৃদ্ধি। প্রকৃতি তা-ই চায়। এখন বুঝেছিস?
না।
ভাইয়া হয়তো আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করত, তার আগেই রহিমার মা ঢুকে বলল, ভাইজান, টেলিফোনে বলছে অপারেশন সাকসেস হইছে।
ভাইয়া বলল, গুড। বিশৃঙ্খলা হচ্ছে, এনট্রপি বাড়ছে।
রহিমার মা বলল, খালুজান আপনাদের দুইজনরে ডাকে।
ভাইয়া বলল, আবার মিটিং?
রহিমার মা বলল, জানি না। খালুজান খুব অস্থির।

বাবাকে যথেষ্টই অস্থির দেখাচ্ছে। সালামতের মতোই অস্থির। অস্থিরতার কারণ, ডাক্তাররা বলছে মায়ের পেটে ক্যানসার।
ভাইয়া বলল, ডাক্তার কখন বলল?
রাত আটটার সময় রিপোর্ট আনতে গিয়েছিলাম, তখন বলল। তোমার মাকে এখনো কিছু বলিনি। বলব কি না বুঝতে পারছি না। আমার মনে হয় বলা উচিত। টগর, তুমি কী বলো?
ভাইয়া বলল, বলা উচিত।
তাহলে তুমি তোমার মাকে বুঝিয়ে বলো, যাতে ভয় না পায়। চিকিৎসার আমি ত্রুটি করব না। প্রয়োজনে ঘরবাড়ি, জমি—সব বেচে দিব।
ভাইয়া বলল, কীভাবে বেচবে? সব তো পদ্মর মার নামে। অবশ্যি নকল দলিল।
বাবা বললেন, এই ঝামেলা তুমি বাজিয়েছ, তুমি ঠিক করো। It is an order.
ভাইয়া বলল, একদিকে ঝামেলা ঠিক করলে অন্যদিকে ডাবল ঝামেলা দেখা যায়, কাজেই ঝামেলা ঠিক করা অনুচিত।
বাবা হতাশ গলায় বললেন, আমি তাহলে কী করব? তুমি কি জানো, পদ্মর মা আমাকে বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিয়েছে?
জানি। ঝামেলা না বাড়িয়ে তোমার উচিত বাড়ি ছেড়ে দেওয়া।
আমি কোথায় থাকব?
পথেঘাটে থাকবে। ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে ইংরেজিতে ভিক্ষা করবে। রাতে ঘুমাবার জন্যে চলে যাবে কমলাপুর রেলস্টেশনে। ভবঘুরেদের জন্যে সেখানে ঘুমাবার ভালো ব্যবস্থা আছে।
বাবা তাকিয়ে আছেন। মায়ের ক্যানসারের খবরে তার মধ্যে যে প্রবল হতাশা তৈরি হয়েছিল, তা কেটে গেছে। এখন তিনি বিস্মিত।
বাবা চাপা গলায় বললেন, আমি ইংরেজিতে ভিক্ষা করব আর রাতে কমলাপুর রেলস্টেশনে ঘুমাব?
ভাইয়া বলল, তুমি একা মানুষ। যেকোনো জায়গায় ঘুমাতে পারো।
আমি একা?
মা তো ক্যানসারে মারাই যাচ্ছে। মায়ের মৃত্যুর পর তুমি একা হয়ে যাচ্ছ। আমার মনে হয়, এই মুহূর্তে তোমার উচিত পদ্মর মায়ের কাছ থেকে গ্রেসপিরিয়ড নেওয়া। মায়ের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তুমি এ বাড়িতে থাকবে। মৃত্যুর পর কুলখানির দিন গৃহত্যাগ করবে।
তুমি এই ধরনের কথা বলতে পারছ? তোমার জন্মদাতা মা। মা নিয়ে বিকট কথা! আর আমি তোমার বাবা।
ভাইয়া হেসে ফেলল।
বাবা অবাক হয়ে বললেন, তুমি হাসছ?
হাসি এলে কী করব, বলো। হাসি চেপে রাখব? তুমি বোধহয় জানো না, হাসি চেপে রাখতে প্রচণ্ড এক শারীরিক প্রেশার হয়। এই প্রেশারে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। থ্রম্বসিস হতে পারে।
ইউ গেট লস্ট।
ভাইয়া উঠে দাঁড়াল। আমি অবাক হয়ে দেখি, তার ঠোঁটের কোনায় এখনো হাসি লেগে আছে।
বাবাও অবাক হয়ে ভাইয়ার ঠোঁটের হাসি দেখছেন। বাবা বললেন, তোমার মাকে তুমি কিছু বলতে যাবে না। তুমি মস্তিষ্কবিকৃত একজন মানুষ। কী বলতে কী বলবে, তার নেই ঠিক।
মায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারব?
বাবা জবাব দিলেন না। ভাইয়া রওনা হলেন মায়ের শোবার ঘরের দিকে। পেছনে পেছনে আমি।
ভাইয়া বলল, কেমন আছ, মা?
মা বলল, ভালো। আজ ব্যথা নাই।
ভাইয়া বলল, মা, তোমাকে একটা প্রশ্ন করছি, ভেবেচিন্তে জবাব দিবে। বলো তো তোমার গায়ের রক্ত আছে, এমন কাউকে কি তুমি খুন করতে পারবে?
তুই কি পাগল হয়ে গেলি? আমার শরীরে রক্ত আছে এমন কাউকে আমি কীভাবে খুন করব?
ভাইয়া বলল, ঘরে ঢুকতেই দেখলাম তুমি একটা মশা মারলে। মশার গায়ে তোমার রক্ত।
মা হতাশ চোখে তাকাচ্ছেন। তাঁকে চিন্তিত মনে হচ্ছে। ভাইয়ার ঠোঁটের কোনায় মিটিমিটি হাসি।
[চলবে]

আমার বই পাঠকদের সাথে এই বইটি শেয়ার করবে বিভিন্ন পর্বে। তাই আজ প্রকাশিত হলো পর্ব ০১। আপনাদের সহযোগীতা না পেলে এই সাইট সামনের দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। তাই যদি বইটি ভালো লেগে থাকে তাহলে দুচার লাইন লিখে আপনার অভিব্যাক্তিগুলো জানিয়ে রাখুন আমাদের কমেন্টস বক্সগুলোতে। আর শুধু মাত্র তাহলে আমরা আরও অনেক বই নিয়ে আপনাদের সামনে আসতে পারবো। ধন্যবাদ।

নতুন বই ইমেইলে পেতে হলে

Click on +1 button before download =>
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

আমরা কেউ বাসায় নেই - হুমায়ূন আহমেদ কিস্তি ০৬

amarboi.com  
আমরা কেউ বাসায় নেই
ধারাবাহিক উপন্যাস
কিস্তি ০৬
হুমায়ূন আহমেদ

‘রগট ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা টগর সাহেব আষাঢ়ি অমাবস্যায় গৃহত্যাগ করিয়াছেন। ঢাকার নিকটবর্তী গাজীপুর শালবনে তিনি কিছুদিন তপস্যায় থাকিবেন এমন আভাস পাওয়া গিয়াছে। ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গিয়াছে, তাঁহার কিছু ভাবশিষ্য তাঁহার অনুগমন করিয়াছে। ইহাদের মধ্যে ব্যাঙা ভাইয়ের নাম উল্লেখযোগ্য।’
টগর ভাইয়ার গৃহত্যাগ খবরের কাগজের বিষয় হলে এ রকম একটা খবর হতে পারত। তা হলো না। ভাইয়া ঝড় ও শিলাবৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাত নটায় বাড়ি ছাড়ল। বাবা তখন উঠানে বসে শিলাবৃষ্টি দেখছেন। মরি নামের মেয়েটা ছাতা মাথায় দিয়ে শিল কুড়াচ্ছে। তার উৎসাহ দেখার মতো। মানুষের স্বভাব হচ্ছে সে অন্যের অতি-উৎসাহী কর্মকাণ্ডে একসময় অজান্তেই নিজেকে যুক্ত করে ফেলে। বাবা তা-ই করেছেন। মরিকে কোথায় বড় শিল আছে বলে দিচ্ছেন, ‘মরি, টিউবওয়েলের কাছে যাও। দুটা বড় বড় আছে। আরে, এই মেয়ে তো চোখেই দেখে না। টিউবওয়েলের উত্তরে।’
এই অবস্থায় ভাইয়া হাসিমুখে বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, বাবা! যাই।
বাবা বললেন, কোথায় যাও?
অমাবস্যায় বাড়ি ছেড়ে যাব বলেছিলাম। আজ অমাবস্যা!
বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছ?
হুঁ।
কোথায় যাবে?
গাজীপুরের শালবনের দিকে যাবার একটা সম্ভাবনা আছে। এখনো ঠিক করিনি।
তোমার মা জানে যে তুমি চলে যাচ্ছ?
জানে। তার কাছে বিদায় নিয়ে এসেছি।
তোমাকে আটকানোর চেষ্টা করেনি?
না। মা অস্থির তার পায়ের ব্যথায়। আহ-উহ করেই কুল পাচ্ছে না। আমাকে কি আটকাবে।
বাবা গম্ভীর গলায় বললেন, তোমার মা যখন তোমাকে কিছু বলেনি, আমিও বলব না। শুধু একটি কথা, তুমি বিকৃতমস্তিষ্ক যুবক।
ভাইয়া মনে হয় বাবার কথায় আনন্দ পেল। তার ঠোঁটের কোনায় সামান্য হাসির আভাস দেখা গেল। বাবা বললেন, মিডিয়কার যদি নষ্ট হয়, তাতে তার নিজের ক্ষতি হয়। সমাজে তার প্রভাব পড়ে না। মেধাবীরা নষ্ট হলে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমাজ-সংসার ছেড়ে তোমার জঙ্গলে পড়ে থাকা বাঞ্ছনীয়।
ভাইয়া বলল, ‘জি, আচ্ছা।’ বলেই উঠানে নেমে মরির হাত থেকে হ্যাঁচকা টান দিয়ে ছাতা নিয়ে বের হয়ে গেল। ঘটনার আকস্মিকতায় মরি হকচকিয়ে গেছে। সে শিলভর্তি মগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই সময় তার মাথায় বড় সাইজের একটা শিল পড়ল। ‘ও আল্লা গো’ বলে সে উঠানে চিত হয়ে পড়ে গেল। সুন্দর দৃশ্য। একটি বালিকা চিত হয়ে পড়ে আছে। তার ওপর বৃষ্টি ও শিল পড়ছে। এমন দৃশ্য সচরাচর তৈরি হয় না। আমি আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছি, বাবার ধমক শুনে সংবিত ফিরল। বাবা বললেন, মেয়েটাকে তুলে আন।
আমি বললাম, থাকুক না।
বাবা বললেন, থাকুক না মানে? থাকুক না মানে কী?
আমি বললাম, থাকুক না মানে হলো, মরি চিত হয়ে উঠানে শুয়ে আছে, থাকুক। শিলাবৃষ্টির মধ্যে এ রকম শুয়ে থাকার সুযোগ সে আর পাবে বলে মনে হয় না।
আমার কথা শুনে বাবা বিকট চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করলেন। বাবার চিৎকার শুনে মা তীক্ষ গলায় চেঁচাতে লাগলেন, ‘কী হয়েছে? এই, কী হয়েছে?’ ড্রাইভার ইসমাইল মনে হয় নামাজে ছিল। নামাজ ফেলে সে ছুটে এল। উঠানে মরিকে পড়ে থাকতে দেখে সে হতভম্ব গলায় বলল, স্যার! কী হয়েছে? মারা গেছে? ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন!
হইচই শুনেই মনে হয় মরির জ্ঞান ফিরল। সে এখন বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে। তার হাতে কাচের পানির জগ। জগ ভর্তি শিল। মরির মাথা ফেটেছে। সেখান থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে জগে। ধবধবে সাদা বরফখণ্ডের ভেতর লাল রক্ত। অদ্ভুত দৃশ্য।
পদ্ম এসে দাঁড়িয়েছে বারান্দায়। সে হঠাৎ শব্দ করে হেসে ফেলল। এর মধ্যে হাসির কী উপাদান সে খুঁজে পেয়েছে কে জানে!
ভাইয়ার গৃহত্যাগের দ্বিতীয় দিবস। রগট ধর্মমতের সাল গণনায় ০২.০১.০১ রগট সন। এই দিনে বাবার গাড়ি ফিরে এল। ইঞ্জিন মোটামুটিভাবে সারানো হয়েছে। বছর খানেক ঝামেলা ছাড়াই চলবে। গাড়ি সারাইয়ের কাজটা করেছে ছগীর মিস্ত্রি। সে পদ্মর মায়ের বিশেষ পরিচিত। বস্তিতে তার ঘর ছিল পদ্মর মায়ের ঘরের পাশে। গাড়ির সঙ্গে ছগীর মিস্ত্রি এসেছে। কালিঝুলিমাখা একজন হাসিখুশি মানুষ। তার কাছেই জানলাম, গাড়ি সারাইয়ে ত্রিশ হাজার টাকা বিল হয়েছে। পদ্মর মা বললেন, আমার গাড়ি ঠিক করেছ, তার জন্যে তোমাকে বিল দিব কী জন্যে? এক পয়সাও পাবে না।
ছগীর পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলল, না দিলে নাই।
পদ্মর মা বললেন, গোসল করো। খাওয়াদাওয়া করে তারপর যাবে।
ছগীর বলল, গোসল করব কীভাবে? কাপড়চোপড় আনি নাই।
পদ্মর মা বললেন, কাপড়ের ব্যবস্থা হবে।
ড্রাইভার ইসমাইলকে পাঠিয়ে নতুন লুঙ্গি-পাঞ্জাবি কিনে আনানো হলো। ছগীর মিয়া আয়োজন করে কলপাড়ে গোসল করতে বসেছে। তার মাথায় সাবান ঘসে দিচ্ছে পদ্ম। পদ্মর পাশেই তার মা বসা। ছগীর নিশ্চয়ই মজার কোনো কথা বলছে। মা-মেয়ে হাসতে হাসতে একজন আরেকজনের গায়ে গড়িয়ে পড়ছে। পদ্ম ছগীর মিস্ত্রিকে ডাকছে ‘দুষ্ট বাবা’। যতবারই পদ্ম ‘দুষ্ট বাবা’ ডাকছে, ততবারই ছগীর বিকট ভেংচি দিচ্ছে। ঘনিষ্ঠ পারিবারিক চিত্র।
বাবা এই দৃশ্য দেখে আমাকে ডেকে পাঠালেন। গম্ভীর গলায় বললেন, দাড়িওয়ালা ওই লোক কে?
তার নাম ছগীর। সে মোটর মেকানিক। তোমার গাড়ি ঠিক করে এনেছে। পদ্মর মায়ের চেনা লোক।
বিল কত করেছে?
কোনো টাকা-পয়সা দিতে হবে না বলে মনে হচ্ছে।
এখানে গোসল করছে কেন?
গোসল করে খাওয়াদাওয়া করে গেস্টরুমে ঘুমাবে। আমার ধারণা, পদ্মর মা নতুন গেস্টরুম এই লোকের জন্যে নিয়েছে। এতে তোমার যে সুবিধা হবে, তা হলো গাড়ি নষ্ট হলে চিন্তা করতে হবে না। গাড়ি সরাইয়ের মিস্ত্রি ঘরেই আছে।’
বাবা বললেন, তুমি এই ধরনের কথাবার্তা তোমার ভাইয়ের কাছে শিখেছ। নিজের মতো হও, অন্যের ছায়া হবার কিছু নাই।
আমি বিনীত গলায় বললাম, বাবা, এখন তাহলে যাই? একটা জরুরি কাজ করছি।
কী জরুরি কাজ করছ?
মিস্ত্রি ছগীরের গোসল দেখছি।
বাবার হতাশ চোখের সামনে থেকে বের হয়ে এলাম।
মিস্ত্রি ছগীর খাওয়াদাওয়া শেষ করে মাতা-কন্যাকে নিয়ে বের হলো। গাড়ি টেস্টিং হবে। ঘণ্টা দুই তারা গাড়ি নিয়ে ঘুরবে। নিউমার্কেটে নাকি কিছু কেনাকাটাও আছে। মা-মেয়ে দুজনই আনন্দে কলকল করছে।
গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার আধঘণ্টার মধ্যে পদ্ম এবং তার মা রিকশা করে ফিরে এল। গাড়ি আবার বসে গেছে। ছগীর গাড়ি গ্যারেজে নিয়ে গেছে।
আমি ভাইয়ার ঘরে শুয়ে আছি। আমার বুকের ওপর ভাইয়ার একটা বই। এসিমভের লেখা The Winds of Change. বইটা ভাইয়ার মতো উল্টো করে ধরেছি। পড়তে গিয়ে মাথায় জট পাকিয়ে যাচ্ছে—
‘Sraet otni tsrub dna deddon ehs.’
অনেকক্ষণ এই বাক্যটার দিকে তাকিয়ে দুটি শব্দের খোঁজ পেলাম। dna মানে and এবং ehs-এর মানে she.
বই উল্টা করে ধরে রেখেছেন কেন?
আমি বই নামিয়ে তাকালাম, পদ্ম ঘরে ঢুকেছে। তার হাতে চায়ের কাপ। সে কাপে চুমুক দিচ্ছে। পদ্ম বলল, চা খাবেন?
আমি বললাম, খেতে পারি।
পদ্ম চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল, তিনটা চুমুক দিতে পারেন। এর বেশি না।
আমি উঠে বসতে বসতে বললাম, তোমার চুমুক দেওয়া চা আমি খাব কেন?
পদ্ম চেয়ারে বসতে বসতে বলল, খেতে না চাইলে নাই। চা-টা ভালো হয়েছে। এক চামচ খেয়ে দেখতে পারেন।
না।
পদ্ম বলল, ধমক দিয়ে ‘না’ বলার দরকার ছিল না। মিষ্টি করে বললেও হতো। যা-ই হোক, আমি কি কিছুক্ষণ গল্প করতে পারি?
হ্যাঁ, পারো।
হঠাৎ আপনার সঙ্গে গল্প করতে চাচ্ছি কেন, জানেন?
না।
পদ্ম হাসতে হাসতে বলল, আমিও জানি না।
আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি। মেয়েটাকে আজ অন্য দিনের চেয়ে সুন্দর লাগছে। সাজগোজ কি করেছে? চোখে মনে হয় কাজল দিয়েছে। মেয়েরা সামান্য সেজেও অসামান্য হতে পারে।
পদ্ম বলল, আমি আপনাকে একটা ধাঁধা জিজ্ঞেস করব। উত্তর দিতে পারবেন?
আমি বললাম, ধাঁধা খেলার মধ্যে আমি নাই।
উত্তর দিতে পারলে পুরস্কার আছে।
কী পুরস্কার?
পদ্ম চাপা হাসি হেসে বলল, টাকা-পয়সা লাগে এমন কোনো পুরস্কার না। এ ছাড়া আমার কাছে যা চাইবেন তা-ই। ভয়ংকর খারাপ কিছুও চাইতে পারেন। ধাঁধাটা হচ্ছে, এমন একটা পাখির নাম বলুন যে পাখি মানুষের কথা বুঝতে পারে এবং মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারে।
পারলাম না।
ইশ! আপনার কপালে পুরস্কার নেই। পাখির নাম হচ্ছে ব্যাঙামা বাঙামি। রূপকথার বইতে পড়েন নাই?
আমি ছাড়াও নিশ্চয়ই অনেককে এই ধাঁধা জিজ্ঞেস করেছ। কেউ কি পেরেছে?
একজন পেরেছিল।
সে কি পুরস্কার পেয়েছে?
সেটা আপনাকে বলব না।
পদ্ম চায়ের কাপ নিয়ে বের হয়ে গেল। আমি বই উল্টো করে ধরে আবার পড়ার চেষ্টা করছি। এর নাম সাধনা। সাফল্য না আসা পর্যন্ত সাধনা চালিয়ে যেতে হবে—
‘em dlot ton dah uoy.’
এই তো, এখন পারছি, em হলো me, dlot হলো told.
ভাইজান, চা নেন।
রহিমার মা চা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আমি বললাম, চা তো চাইনি, রহিমার মা।
পদ্ম আপা বলেছে, আপনি চা চাইছেন।
আমি উঠে বসে চায়ের কাপ হাতে নিলাম। রহিমার মা ক্লান্ত গলায় বলল, বড় ভাইজানের কোনো খবর জানেন?
আমি বললাম, না।
রহিমার মা বলল, ওনার তো মোবাইলও নাই যে একটা মোবাইল ছাড়ব। মনটা এমন অস্থির হয়েছে, ওনাকে নিয়া একটা বাজে খোয়াব দেখেছি। কী দেখছি শুনবেন?
বলো, শুনি।
স্বপ্নে দেখলাম, উনি শাদি করেছেন।
এটা খারাপ স্বপ্ন হবে কেন? এটা তো ভালো স্বপ্ন।
খারাপটা এখনো বলি নাই। বললে বুঝবেন কত খারাপ! স্বপ্নে দেখলাম, শাদির কারণে দুনিয়ার মেহমান আসছে। কইন্যা যেখানে সাজাইতাছে, সেইখানে সুন্দর সুন্দর মেয়েছেলে। শইল ভর্তি গয়না, চকমকা শাড়ি। আমিও তাহার সাথে আছি, আমোদ-ফুর্তি করতাছি। আমার একটাই ঘটনা, শইল্যে কাপড় নাই। কাপড় দূরের কথা, একটা সুতাও নাই। কেমন লইজ্যার কথা চিন্তা করেন। এখন আমি কী করি, বলেন, ভাইজান?
আমি ভাইয়ার মতো হাই তুলতে তুলতে বললাম, তোমাকে খুব সাবধানে থাকতে হবে। নেংটো হয়ে ঘর থেকে বের হবে না।
এটা কেমন কথা বললেন! নেংটা হয়ে ঘর থেকে কী জন্যে বের হব? আইজ পর্যন্ত শুনছেন নেংটা হইয়া কেউ ঘর থাইকা বাইর হইছে?
শুনেছি। জৈন ধর্মের সাধুরা বাড়িতে সব কাপড় খুলে রেখে বের হন। পাগলরাও তা-ই করে।
আপনার কি মনে হয়, আমি পাগল হয়ে গেছি?
এখনো হও নাই, তবে হবে।
রহিমার মা হতাশ চোখে তাকিয়ে আছে। তার চোখের দৃষ্টিই বলে দিচ্ছে, পাগল হওয়ার আশঙ্কা সে নিজেও বিশ্বাস করছে।
বড় ধরনের ক্রাইসিসের মুখোমুখি হলে মানুষ দুঃস্বপ্ন দেখে। সমুদ্রপারের জেলে-স্ত্রীরা প্রতিরাতেই স্বপ্ন দেখে, সমুদ্রে ঝড় উঠেছে। ঝড়ে নৌকাডুবি হয়ে তাদের স্বামীরা মারা গেছে।
আমাদের পরিবারের প্রধান, বাবা, ভয়ংকর ক্রাইসিসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি কী দুঃস্বপ্ন দেখছেন তা জানা যাচ্ছে না। বাবার ক্রাইসিসগুলো কী দেখা যাক—
১. দ্বিতীয় গেস্টরুম দখল হয়ে গেছে। পদ্মর মা সুচ হয়ে ঢুকে এখন ফাল হয়ে আছেন। কিছুদিনের মধ্যে ট্রাক্টর হবেন, এমন নমুনা দেখা দিয়েছে।
২. বাড়িতে দুটি দল তৈরি হয়েছে। বাবার দল অর্থাৎ সরকারি দল। পদ্মর মার দল অর্থাৎ বিরোধী দল। বিরোধী দল দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করছে। ড্রাইভার ইসমাইল সরকারি দল ত্যাগ করে বিরোধী দলে যোগ দিয়েছে। এখন সে দুই বেলাই পদ্মর মায়ের রান্না খাচ্ছে। তাঁর বাজার করে দিচ্ছে।
৩. মায়ের পা জোড়া লাগছে না। সারা রাত তিনি ব্যথায় চিৎকার করেন। বাবা ঘুমাতে পারেন না। ভোরবেলায় পায়ের ব্যথা খানিকটা কমে, তখন মা ঘুমাতে যান।
৪. যক্ষ্মা রোগগ্রস্ত খড়ম পায়ের যে ভূত গেস্টরুমে থাকত, সে ঘরছাড়া হয়ে বাবার ঘরে আশ্রয় নিয়েছে। নানা ধরনের ভৌতিক কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে। বাবা তার আতঙ্কে অস্থির হয়ে আছেন। বাবার পরিচিত এক পীরসাহবে তাবিজ দিয়েছেন। পঞ্চধাতুর তাবিজ। বাবা ডান হাতে বেঁধে রেখেছেন। তাবিজে লাভ হচ্ছে না, বৃদ্ধ ভূত যন্ত্রণা করেই যাচ্ছে। ভূতের যন্ত্রণার নমুনা: মায়ের পায়ে ব্যথার কারণে বাবা অঘুম রাত কাটাচ্ছেন। হঠাৎ একটু চোখ ধরে এল, ঘুম এসে যাচ্ছে ভাব কিংবা ঘুম এসে গেছে, তখনই বাবার কানের কাছে বিকট ভৌতিক কাশি। বাবা ধড়ফড় করে জেগে উঠে দেখেন, কোথাও কেউ নেই। এই ঘটনা একবার ঘটেছে তা না, প্রতি রাতেই কয়েকবার করে ঘটছে। একদিন ইউনিভার্সিটিতে যাবেন, জুতাজোড়া সামনে নিয়ে বসেছেন। বাঁ পায়ের জুতা পরেছেন [তিনি লেফট হ্যান্ডার, তাঁর সবকিছু বাঁ দিয়ে শুরু হয়], ডান পায়েরটা পরতে যাবেন, তাকিয়ে দেখেন জুতা নেই। সেই জুতা পাওয়া গেল বাথরুমের কমোডে। নোংরা পানিতে মাখামাখি। বৃদ্ধ ভূতের কাণ্ড, বলাই বাহুল্য।
ভাইয়া বাসায় থাকলে এই ঘটনার লৌকিক ব্যাখ্যা দাঁড়া করিয়ে ফেলত। ভাইয়া বলত, নানান ঝামেলায় বাবা আছেন ঘোরের মধ্যে। তিনি নিজেই নিজের জুতা কমোডে ফেলে এসেছেন। আর কানের কাছে কাশির ব্যাখ্যা হলো, বাবা নিজের কাশি শুনে জেগে উঠেছেন। তার ক্রনিক খুকখুক কাশি। ঘুমের মধ্যে এই খুকখুক কাশিই প্রবল শোনাচ্ছে বলে তিনি ধড়মড় করে জেগে উঠছেন।
বাবার ছোটখাটো ঝামেলার কথা এতক্ষণ বলা হলো। এখন বলা হবে প্রধান ঝামেলা। তিনি উকিলের নোটিশ পেয়েছেন। নোটিশে লেখা, ‘সালমা বেগমের জমির ওপর অবৈধভাবে ঘরবাড়ি তুলে আপনি বাস করছেন। নোটিশ পাওয়ামাত্র আপনি সপরিবারে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবেন। অন্যথায় আমরা আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হব।’
নোটিশ পাওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে বাবার বয়স পাঁচ বছর বেড়ে গেল। তিনি বেতের ইজিচেয়ারে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শুয়ে রইলেন। সন্ধ্যায় ড্রাইভার ইসমাইলের মাগরেবের আজান শুনে তিনি চেয়ার থেকে উঠলেন। অজু করে নামাজ পড়তে গেলেন। বাবাকে আমি এই প্রথম নামাজ পড়তে দেখলাম।
নোটিশের বিষয় আমি জানলাম রাত আটটায়। বাবা নিজেই নোটিশ হাতে আমার ঘরে ঢুকলেন। আমাকে বললেন, এখন আমাদের করণীয় কী? আমি এক্সট্রিম কিছু করার চিন্তা করছি। কাঁটা তুলতে হয় কাঁটা দিয়ে।
আমি বললাম, তুমি কী করতে চাচ্ছ? খুনখারাবি?
বাবা চুপ করে রইলেন। আমি বললাম, খুনখারাবির লাইনে চিন্তা করলে ব্যাঙা ভাইকে খবর দিতে হবে। উনি নিমেষে কার্য সমাধা করবেন, কেউ কিছুই জানবে না।
ব্যাঙা ভাইটা কে?
ভাইয়ার অতি পরিচিত একজন। ভাইয়াকে সে ওস্তাদ ডাকে।
এ রকম একটা ক্যারেক্টারের সঙ্গে তোমার ভাইয়ার পরিচয় কীভাবে হলো?
তা জানি না, তবে পরিচয় থাকায় আমাদের কত সুবিধা হয়েছে এটা দেখো। তোমাকে নিজের হাতে খুন করতে হচ্ছে না।
বাবা বললেন, Don’t talk nonsense. তুমি এই নোটিশ নিয়ে মহিলার কাছে যাও। এ রকম একটা নোটিশ পাঠানোর অর্থ কী জেনে আসো।
আমি বললাম, আমি যাব না, বাবা। আমি গেলে ওই মহিলা আমার গায়ে এসিডের বোতল ছুড়ে মারবে। তুমি যাও, তুমি মুরব্বি মানুষ। তোমার গায়ে এসিড হয়তো মারবে না।
বাবা বেশ কিছু সময় অপলক আমার দিকে তাকিয়ে থেকে নোটিশ হাতে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।
রাত এগারোটা বাজার কিছু আগে বাবার ঘরে আমার ডাক পড়ল। ঘরে ঢুকে দেখি বাবার সামনে পদ্মর মা বসে আছেন। বাবার হাতে উকিলের নোটিশ। আমি বাবার পাশের মোড়ায় বসলাম। বাবা অসহায়ের মতো কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আমাকে দেখে খুব ভরসা পেয়েছেন, এ রকম মনে হলো না।
পদ্মর মা বললেন, ভাই, কী বলবেন বলুন। পদ্মর জ্বর এসেছে। তার গা স্পঞ্জ করতে হবে।
বাবা কয়েকবার গলা খাকারি দিলেন। তাতেও গলা তেমন পরিষ্কার হলো না। তিনি ফ্যাসফেসে গলায় বললেন, আজ একটা উকিল নোটিশ পেয়েছি। আমাকে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছে।
পদ্মর মা বললেন, আপনার হাতে তো সময় আছে। ত্রিশ দিনের সময়। এখনই ঘরবাড়ি ছাড়তে হবে তা তো না। জিনিসপত্র যদি নিয়ে যেতে চান, আমি নিষেধ করব না।
ভাবি, এই সব আপনি কী বলছেন?
পদ্মর মা খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, আপনাকে বিকল্প একটা প্রস্তাব দেই। প্রতি মাসে কুড়ি হাজার টাকা করে আমাকে বাড়িভাড়া দিবেন।
আমি নিজের বাড়িতে থেকে আপনাকে বাড়ি ভাড়া দিব?
এটা আপনার নিজের বাড়ি না। আপনি আমার জমির ওপর অবৈধভাবে বাড়ি তুলেছেন। আমার কাছে কাগজপত্র আছে। আমার যা বলার আমি বলেছি। আপনার যদি তার পরেও কিছু বলার থাকে, কোর্টে বলবেন।
পদ্মর মা উঠে চলে গেলেন। হতভম্ব বাবার দিকে তাকিয়ে আমি বললাম, বাবা, তোমার জন্যে একটা গুড নিউজ আছে।
বাবা চাপা গলায় বললেন, গুড নিউজটা কী?
তোমার গাড়ি মনে হয় আবার ঠিক হয়েছে। ছগীর মিস্ত্রি গাড়ি নিয়ে এসেছে। এক কাজ করো, মাকে নিয়ে গাড়িতে করে ঘুরে আসো। তোমার ভালো লাগবে।
বাবা মূর্তির মতো বসে রইলেন। কোনো জবাব দিলেন না। মায়ের পায়ের ব্যথা মনে হয় খুব বেড়েছে। তাঁর কাতরানি শোনা যাচ্ছে। পায়ের হাড় জোড়া না লাগলে এ রকম ব্যথা হয় তা জানতাম না। অন্য কোনো সমস্যা না তো?
বাবা ক্লান্ত গলায় বললেন, রহিমার মা বলছে ড্রাইভার ইসমাইলের সঙ্গে জিন থাকে, এই বিষয়ে কিছু শুনেছ?
শুনেছি। জিনের নাম মাহি, তার স্ত্রীর নাম হামাছা। জিনের বয়স তিন হাজার বছর। স্ত্রীর বয়স জানি না। কিছু কম নিশ্চয়ই হবে।
তোমার বিশ্বাস হয়?
না।
বাবা বললেন, শেক্সপিয়ার বলেছেন, ‘There are many things in heaven and earth.’
আমি বললাম, শেক্সপিয়ারের ওপর কথা নাই। উনি যখন বলেছেন তখন বিশ্বাস হয়।
বাবা বললেন, জিনরা ভবিষ্যৎ বলতে পারে। জিনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ জানতে পারলে হতো।
মাহি সাহেবকে জিজ্ঞেস করব?
বাবা চুপ করে রইলেন। ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো ধরে। এই প্রথমজনকে দেখলাম জিন ধরতে চাইছেন।
রগট সন অনুযায়ী আজ ০৩.০১.০১। সময় রাত নয়টা। ভাইয়ার ঘরে জিন নামানো হচ্ছে। ড্রাইভার ইসমাইল জায়নামাজে বসা। বাবা আর আমি খাটে বসে আছি। আমাদের দুজনই অজু করে পবিত্র হয়েছি। আগরবাতি জ্বলছে। দরজা-জানালা বন্ধ। ঘর অন্ধকার। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। ইসমাইল একমনে সূরায়ে জিন আবৃত্তি করছে। বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে সূরার শব্দ মিলে অতি রহস্যময় পরিবেশ।
ইসমাইল সূরা আবৃত্তি বন্ধ করে বলল, মাহি উপস্থিত হয়েছেন। কিছু জিজ্ঞাসা করতে চাইলে আদবের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করেন। প্রথমে সালাম দিবেন।
বাবা ভয়ে ভয়ে বললেন, আসসালামু আলায়কুম।
গম্ভীর এবং খানিকটা বিকট গলায় কেউ একজন বলল, ওয়ালাইকুম সালাম।
এই গলা ইসমাইলের না। তার গলা মেয়েলি। সে কি গলা চেপে এমন শব্দ বের করছে? ডেন্ট্রিকুয়েলিজম?
বাবা বললেন, জনাব, আমার বড় ছেলে কোথায় বলতে পারবেন?
তার নাম কী?
ডাক নাম টগর।
ভালো নাম বলেন।
আবদুর রশীদ।
জিন বলল, সে জঙ্গলে আছে। তার শরীর ভালো না।
কী হয়েছে?
বুখার হয়েছে।
তার কি বাড়িতে ফেরার সম্ভাবনা আছে?
এক বৎসর পরে ফিরবে। অল্প সময়ের জন্য। এই বাড়িতে সে থাকবে না।
বাবা বললেন, আমার আর কোনো প্রশ্ন নাই। মনজু, তুই কিছু জানতে চাস?
আমি বললাম, জনাব, আপনার স্ত্রীর কথা শুনেছি। ছেলেমেয়ে কি আছে?
আমার সাত ছেলে। মেয়ে নাই।
আপনাদের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কি আছে?
এই প্রশ্নের উত্তরে হুম-হাম শব্দ হলো। তার সঙ্গে খকখক কাশি। ইসমাইল বলল, ভাইজান, আপনার কথায় মাহি বিরক্ত হয়েছেন।
আমি বললাম, সরি।
আমি বললাম, একটা শেষ প্রশ্ন, আপনাদের অসুখ-বিসুখ আছে বুঝতে পারছি। আপনি কাশছেন। পাতলা পায়খানা, যাকে ভদ্র ভাষায় বলা হয় ডায়েরিয়া, তা কি আপনাদের হয়?
মাহি আমার প্রশ্নে খুব মনে হয় রাগল। হুম-হাম শব্দ বৃদ্ধি পেল। আর তখনই বন্ধ দরজায় কেউ ধাক্কাতে লাগল। প্রবল ধাক্কা। দরজা খুলে দেখি ভাইয়া দাঁড়িয়ে।
ভাইয়া বলল, দরজা বন্ধ করে কী করছিস? ঘর অন্ধকার কেন?
আমি বললাম, জিন নামানো হচ্ছে।
ভাইয়া বলল, ভেরি গুড। জিন নেমেছে?
আমি বললাম, নেমেছে, মনে হয় চলেও গেছে। তুমি ফিরে এলে কেন?
ভাইয়া বলল, যেদিন ঘর ছেড়েছি, সেদিন অমাবস্যা ছিল না। তার আগের দিন ছিল। কাজেই চলে এসেছি। এবার পঞ্জিকা দেখে, আবহাওয়া অফিসে খোঁজ নিয়ে বের হব। আরে, তোর ঘরে বাবাও বসে আছে দেখি! বাবা কেমন আছ?
বাবা প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। পুত্রের ফেরত চলে আসায় তিনি আনন্দিত না দুঃখিত বোঝা গেল না। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই রহিমার মাকে পোলাও রাঁধতে বললেন। পোলাও ভাইয়ার অতি পছন্দের খাবার।
[চলবে]


নতুন বই ইমেইলে পেতে হলে

Click on +1 button before download =>
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

মাত্র এক হাজার পিএইচডি - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

মাত্র এক হাজার পিএইচডি
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

মানুষের চরিত্রে যে কয়টি দোষ থাকা সম্ভব, তার মধ্যে সবচেয়ে খারাপটি মনে হয় হিংসা—তার কারণ এটাকে নিজের ভেতর থেকে সহজে দূর করা যায় না। আজ (৩ জুন) সকালে এমআইটির (ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউটি অব টেকনোলজি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি) সব পিএইচডি শিক্ষার্থীর হুড পরানোর উৎসবে থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। প্রায় সাড়ে ৪০০ শিক্ষার্থী এই বছর এমআইটি থেকে ডক্টরেট পেয়েছে, আগামীকাল (৪ জুন) তাদের সমাবর্তন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট আর নির্দিষ্ট বিভাগের বিভাগীয় প্রধান পিএইচডি পাওয়া প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীকে নিজ হাতে তাদের হুড পরিয়ে দিয়েছেন, আগামীকাল তারা সেটি পরে সমাবর্তনে যাবে। এমআইটির ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ১০ হাজার, তাদের ভেতর থেকে বছরে সাড়ে ৪০০ ডক্টরেট বের হয়। আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সেই বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার, আমরা বছরে নিয়মিতভাবে একজন ডক্টরেটও বের করতে পারি না। কাজেই এমআইটির আনন্দোচ্ছল অনুষ্ঠানে বসে বসে আমি যদি হিংসায় জর্জরিত হই, কেউ নিশ্চয়ই আমাকে দোষ দিতে পারবে না!
আমি জানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনা করা নেহাতই গাধামো (বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার আগে আমি এই দেশে ১৮ বছর কাটিয়ে গেছি। কাজেই এই বিষয়টা আমার থেকে ভালো করে আর কে জানে?)। যে জিমনেসিয়ামে বসে আমি অনুষ্ঠানটি দেখেছি, বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সে রকম একটি জিমনেসিয়াম পর্যন্ত নেই—কাজেই গবেষণার সঙ্গে তুলনা করি কেমন করে? কিন্তু কেউ যেন আমাকে ভুল না বোঝে—আমি নির্বোধ নই—এমআইটির সঙ্গে তুলনা করে আমি হিংসায় জর্জরিত হয়েছি সত্যি কিন্তু আমি যন্ত্রণায় কাতর হয়েছি অন্য কারণে! কারণটি ব্যাখ্যা করলে সবাই বিষয়টি বুঝতে পারবে।
আমার বিশ্ববিদ্যালয় (শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) সিলেটে এবং মাত্র কিছুদিন আগে আমরা আবিষ্কার করেছি, আমাদের সবচেয়ে কাছাকাছি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টি আসলে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নয়—সেটি পড়েছে ভারতবর্ষে। বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম আসাম বিশ্ববিদ্যালয়। সেই আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর এবং আরও বেশ কয়েকজন অধ্যাপক কর্মকর্তা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন। আমাদের সঙ্গে শিক্ষা গবেষণা বিনিময়ের একটা চুক্তিও স্বাক্ষর করে গেছেন। আমি খুব আনন্দের সঙ্গে আবিষ্কার করলাম, তাঁরা সবাই বাঙালি—কাজেই দীর্ঘ সময় আমরা খুব সহজভাবে কথা বলতে পেরেছি। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি যে ভারতবর্ষের এই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টি আমাদের পরে যাত্রা শুরু করেছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত পিএইচডি শিক্ষার্থী একজনও নেই (বিচ্ছিন্নভাবে দু-একটি বিভাগে মাত্র কাজ শুরু হয়েছে) অথচ আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১২০০। হ্যাঁ, আমি লিখতে গিয়ে ভুলে একটা শূন্য বেশি দিয়ে দিইনি—আসলেই এক হাজার ২০০।
প্রায় একই সঙ্গে তৈরি হওয়া দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটিতে নিয়মিত পিএইচডি একজনও নেই, অন্যটিতে পিএইচডির সংখ্যা এক হাজার ২০০। তার পেছনের কারণটি কেউ কি বলতে পারবে? আমি জানি, এই দেশের খবরের কাগজ, মিডিয়া এবং আমলারা আমাদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দুই চোখে দেখতে পারে না। তাঁরা নিশ্চয়ই ভুরু নাচিয়ে বলছেন, ‘কারণ খুবই সহজ! ভারতবর্ষের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা লেখাপড়া করেন, গবেষণা করেন! আমাদের শিক্ষকেরা দলাদলি করেন, লাল-নীল রাজনীতি করেন! সেই জন্য এই অবস্থা!
যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছি, তাই আমি সব সময়ই আমাদের সমালোচনাটি মাথা নিচু করে মেনে নিই, কিন্তু এবারে সবিনয় প্রকৃত তথ্যটি দিতে চাই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত পিএইচডি একজনও নেই, কারণ সরকার থেকে এ জন্য একটি কানাকড়িও দেওয়া হয় না। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক হাজার ২০০, কারণ তাদের প্রত্যেকটি শিক্ষার্থীকে মাসে ১২ হাজার রুপি করে বৃত্তি দেওয়া হয়। যদি আমরা আমাদের ছাত্রছাত্রীদের এ রকম বৃত্তি দিতে পারতাম, তাহলে আমরাও এ রকম পিএইচডি শিক্ষার্থী পেতে পারতাম। (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের উদ্যোগে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্প নামে একটি প্রজেক্ট চালু হয়েছে, যেসব বিশ্ববিদ্যালয় সেই প্রজেক্টের আওতায় কিছু টাকা-পয়সা পেয়েছে, তারা দু-একজন পিএইচডি ছাত্রছাত্রী নিতে পেরেছে—কিন্তু আমি আবার সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই, এটা নিয়মিত কিছু নয়। এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা।)

২.
আমি সুযোগ পেলেই সবাইকে মনে করিয়ে দিই, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে ওঠেনি। তার কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল দায়িত্ব দুটি, এক: জ্ঞান বিতরণ করা, দুই: জ্ঞান সৃষ্টি করা। এই দুটি মূল দায়িত্বের একটি আমরা হয়তো জোড়াতালি দিয়ে পালন করছি, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে জ্ঞান বিতরণ করে যাচ্ছি। কিন্তু আমরা জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারছি না। জ্ঞান সৃষ্টি করতে হলে গবেষণা করতে হয় আর সত্যিকার অর্থে গবেষণা করার জন্য দরকার মাস্টার্স এবং বিশেষ করে, পিএইচডি ছাত্রছাত্রী। কাজেই কোন বিশ্ববিদ্যালয় কতটুকু জ্ঞান সৃষ্টি করছে, তার সবচেয়ে সহজ হিসাব হচ্ছে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ছাত্রছাত্রী নেই, বুঝে নিতে হবে সেখানে গবেষণাও নেই! (তার পরও আমাদের দেশে প্রায় নিয়মিতভাবে কিছু কনফারেন্স হয়, সেখানে ছাত্রছাত্রীরা এবং শিক্ষকেরা গবেষণা পেপার প্রকাশ করেন—দেশের তুলনায় তার পরিমাণ খুবই কম। কিন্তু তার পরও যাঁরা এই ধারাটি কষ্ট করে ধরে রেখেছেন, তাঁদের অভিনন্দন জানানোর ভাষা আমার জানা নেই।)

৩.
কেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয় তাদের এক হাজার ২০০ পিএইচডি ছাত্রছাত্রীকে মাসে ১২ হাজার টাকা করে বৃত্তি দিতে পারে এবং আমরা একজনকেও পারি না, তার কারণটি কি কেউ জানতে চান? কারণটি খুবই সহজ, ভারতবর্ষ শিক্ষার গুরুত্বটি ধরতে পেরেছে। তারা শিক্ষার জন্য টাকা খরচ করতে পারছে। আমরা এখনো শিক্ষার গুরুত্বটি ধরতে পারিনি—আমরা তাই শিক্ষার জন্য টাকা খরচ করতে শিখিনি। পৃথিবীর সব দেশ মিলে ঠিক করেছিল, পৃথিবীটাকে একটা সুন্দর জায়গা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সবাইকে শিক্ষা দিতে হবে, এই প্রতিটি দেশ অঙ্গীকার করেছিল, তারা তাদের বাজেটের ২০ শতাংশ অথবা জিডিপির শতকরা ৬ ভাগ শিক্ষার পেছনে খরচ করবে। ডাকার চুক্তি নামে সেই চুক্তিতে বাংলাদেশও স্বাক্ষর করে এসেছিল, কাজেই বাংলাদেশেরও জিডিপির শতকরা ৬ ভাগ শিক্ষার জন্য খরচ করার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ খরচ করে মাত্র ২ দশমিক ৪ ভাগ। ভারতবর্ষ খরচ করে শতকরা ৪ ভাগ। তাই তাদের ছোট একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেকোনো সময় এক হাজার ২০০ পিএইচডি শিক্ষার্থী থাকে—আমাদের একজনও থাকে না।
কেউ যেন মনে না করে, আমি এই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করার জন্য বসেছি। আমাদের অর্জন কিন্তু কম নয়। অর্থনৈতিক ভিত্তি তুলনা করলে ভারতবর্ষ থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে, তাদের জিএনপি ১১৭০ ডলার, বাংলাদেশের মাত্র ৫৯০ ডলার। কিন্তু অমর্ত্য সেন তাঁর একটি লেখায় বাংলাদেশ আর ভারতবর্ষ তুলনা করে দেখিয়েছেন (Quality of life: India Vs. China, The New York Review of Books, May 12, 2011) বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেশি (৬৬.৯ বছর বনাম ৬৪.৪ বছর) পাঁচ বছর থেকে কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার কম (৫.২ শতাংশ বনাম ৬.৬ শতাংশ) ডিপিটি ভ্যাকসিন দেওয়া শিশু বেশি (৯৪ শতাংশ বনাম ৬৬ শতাংশ)। অপুষ্ট শিশুর সংখ্যা কম (৪১.৩ শতাংশ বনাম ৪৩.৫ শতাংশ), জন্মহার কম (২.৩ বনাম ২.৭), স্কুলের সময় বেশি ৪.৮ বছর বনাম ৪.৪ বছর)। পুরুষের সাক্ষরতা ভারতবর্ষে বেশি হলেও নারী সাক্ষরতায় বাংলাদেশ এগিয়ে। অমর্ত্য সেন লক্ষ করেছেন যে কম বয়সী মেয়েরা বাংলাদেশে লেখাপড়ায় ছেলেদেরও ডিঙিয়ে গেছে। তাঁর ধারণা, বাংলাদেশের উন্নতির পেছনে আমাদের এই মেয়েরা অনেক বড় ভূমিকা পালন করছে। জিএনপি ভারতবর্ষের অর্ধেক হওয়ার পরও বাংলাদেশের এ রকম অভাবনীয় সাফল্যের জন্য অমর্ত্য সেন একদিকে যে রকম সরকারের ভূমিকার কথা বলেছেন, ঠিক সে রকম গ্রামীণ ব্যাংক বা ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানের সৃজনশীল ভূমিকার কথা বলেছেন। (না, আমরা গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে এই দেশে কীভাবে অসম্মান করেছি, সে সম্পর্কে কিছু বলেননি, কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে কখনো সেটা ভুলতে পারি না!)
অমর্ত্য সেন অনেকগুলো বিষয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, তিনি না দেখালেও আমরা মোটামুটি বুঝতে পারি যে দেশের অবস্থা ধীরে ধীরে ভালো হচ্ছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক কিছু ঘটেছে, কিন্তু আমরা আরও কিছু চাই। খুব সহজভাবে বলা যায়, ১৬ কোটি মানুষের দেশে প্রতিবছর অন্তত কয়েক হাজার পিএইচডি বের হওয়া দরকার। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা মোটামুটি একটা লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, কিন্তু এই দেশের উচ্চশিক্ষা আধুনিক পৃথিবীর তুলনায় মোটামুটি প্রাগৈতিহাসিক যুগে পড়ে আছে। বাংলাদেশকে যদি আধুনিক দেশে তৈরি করতে হয়, তাহলে উচ্চশিক্ষাকে আধুনিক করতে হবে আর সেটা করা সম্ভব, যদি আমরা প্রতিবছর অন্তত কয়েক হাজার পিএইচডি বের করতে পারি।

৪.
আমি ছোট একটা হিসাব করে দেখেছি, একজন ছাত্রকে যদি পিএইচডি করতে দেওয়া হয়, তাহলে প্রতি মাসে আনুমানিক ১৫ হাজার টাকা বৃত্তি দেওয়া দরকার (ভারতবর্ষের ১২ হাজার রুপির তুলনায় সেটা যথেষ্ট কম কিন্তু বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার কথা বিবেচনা করলে এর থেকে বেশি হয়তো এ মুহূর্তে বিবেচনা করা সম্ভব নয়)। একজন শিক্ষার্থীর পিএইচডি করতে কমপক্ষে চার বছর লেগে যায়, কাজেই মোটামুটি ১০ লাখ টাকা খরচ করা হলে এই দেশে একজন পিএইচডি তৈরি করা সম্ভব। গবেষণার একটি খরচ আছে, আমি ধরে নিচ্ছি, শিক্ষার্থীর মাসিক বৃত্তি ছাড়াও গবেষণার এই খরচটিও এখান থেকে দেওয়া হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে খরচ আরও অনেক বেশি। আমি ধরে নিচ্ছি, প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খানিকটা অবকাঠামো দাঁড়িয়ে গেছে, তারা সেটা ব্যবহার করতে পারবে।
কাজেই খুব সহজ একটা হিসাব, প্রতিবছর এক হাজার পিএইচডি বের করতে হলে সরকারকে ১০০ কোটি টাকা খরচ করতে হবে। আমি খবরের কাগজে দেখেছি, এই বছরের বাজেট এক লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা—সেখান থেকে ১০০ কোটি টাকা আলাদা করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দেওয়া কি কঠিন কোনো ব্যাপার? আমরা যদি এক হাজার পিএইচডি বের করতে পারি, সেটা এই দেশের জন্য কত বড় একটা ব্যাপার হতে পারে, কেউ কি চিন্তা করে দেখেছে? প্রথমত, তারা আমাদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি স্কুলের সত্যিকারের শিক্ষক হতে পারবে। পিএইচডি করার সময় তারা যে গবেষণার পদ্ধতিটি শিখে নেবে, সেই জ্ঞানটুকু তারা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারবে। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা পিএইচডি করবে, তারা সেখানে যেহেতু সার্বক্ষণিক থাকবে, তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে—লেখাপড়ার মান বেড়ে যাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, তারা যে বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করবে, সেগুলো হবে আমাদের সত্যিকারের সম্পদ!
কী কী বিষয় নিয়ে গবেষণা করা যায়, সেটা চিন্তা করতেই আমার জিবে পানি এসে যায়। সবার আগে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে পারি, আমাদের ইতিহাসের এত গৌরবোজ্জ্বল একটি বিষয় কিন্তু আমরা কি সেটা নিয়ে সত্যিকারের গবেষণা করেছি? পৃথিবীর জ্ঞানভান্ডারে সেই জ্ঞান কি সঞ্চিত আছে? আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-প্রক্রিয়া শুরু করেছি। সবাই টের পাচ্ছি যুদ্ধাপরাধীদের অপকর্মের সঠিক তালিকা এখনো আমাদের হাতে নেই। আমরা যদি সত্যিকারভাবে গবেষণা করতে পারতাম, মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই যদি হাজার খানেক পিএইচডি থাকত, তাহলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজটি কি এক শ ভাগ সহজ হয়ে যেত না? বঙ্গবন্ধুর মতো বর্ণাঢ্য জীবন কজনের আছে, আমরা কি তাঁকে নিয়েই গবেষণা করেছি? জনপ্রিয় বই খুঁজে পাওয়া যায় কিন্তু গবেষণা কি পাওয়া যায়? পৃথিবীর ইতিহাসে আমরা আমাদের দেশের নেতাদের নাম কেন খুঁজে পাই না? একাত্তরে তাজউদ্দীন আহমদ যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন, তাঁর ওপরে কি গবেষণা করা হয়েছে? স্বাধীনতার পর কেমন করে পঁচাত্তরে দেশ উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করল, সেটা নিয়ে এই দেশে কয়টি নির্মোহ গবেষণা হয়েছে?
এ বছর রবীন্দ্রনাথের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী আনুষ্ঠানিকভাবে হলেও আমরা কি এই দেশে রবীন্দ্র-সাহিত্যের ওপর কয়েক ডজন পিএইচডি শুরু করতে পারি না? আমি সিলেটে থাকি, বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমকে আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি—তাঁর ওপর কি কয়েকটি পিএইচডি করা যায় না?
আমাদের দেশের অনেক সমস্যা আমাদের একেবারেই নিজস্ব, পৃথিবীর অন্য কেউ সেই সমস্যার সমাধান করে দেবে না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি সেই সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার দায়িত্ব নিতে পারে না? সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে, অত্যন্ত রুটিন ব্যাপারের সমাধান খুঁজতে গিয়ে অনেক বিষয় বের হয়ে আসে, যেটা পৃথিবীর জ্ঞানভান্ডারে মাথা উঁচু করে জমা দেওয়া যায়। বাংলা ভাষাকে আমরা এখনো কম্পিউটারে পুরোপুরি উপস্থাপন করতে পারিনি—এটাকে সত্যিকার অর্থে কম্পিউটারে উপস্থাপন করার প্রক্রিয়া শুরু করলে কত বিচিত্র গাণিতিক বিষয় বের হয়ে আসবে, কত নতুন অ্যালগরিদম জন্ম নেবে, আমরা কি সেটা চিন্তা করে দেখেছি? বিজ্ঞান, যার প্রযুক্তিতে আমাদের অবদান সবচেয়ে কম, কিন্তু দেশকে যদি সামনে নিতে হয়, আমাদের যেভাবে হোক এখানে অবদান রাখতে হবে—সেটা সম্ভব শুধু এই ক্ষেত্রে গবেষণা শুরু করে। একটা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা এ দেশে কি পাটের জিনোম বের করিনি?
আর কয়েক দিনের মধ্যে আমাদের দেশের বাজেট দেওয়া হবে। সেই বাজেটে এক হাজার পিএইচডি তৈরি করার জন্য কি ১০০ কোটি টাকা আলাদা করে রাখা সম্ভব?
আসামের একটি বিশ্ববিদ্যালয়েই যদি এক হাজার ২০০ পিএইচডি শিক্ষার্থী থাকতে পারে, তাহলে কি আমাদের সারা দেশ মিলিয়েও এক হাজার পিএইচডি শিক্ষার্থী থাকতে পারে না?
৩.৬.১১
মুহম্মদ জাফর ইকবাল: লেখক। অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।


নতুন বই ইমেইলে পেতে হলে

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Humayun Ahmed Amra Keu Basay Nei Part 05


আমরা কেউ বাসায় নেই
ধারাবাহিক উপন্যাস
কিস্তি ০৫
হুমায়ূন আহমেদ

ট্রাকড্রাইভার এবং ট্রাকচালক সমিতির পিআরও সালামত এসেছে ভাইয়ার কাছে। সালামত লম্বা, চেহারায় ইঁদুরভাব প্রবল। চোখ কোটর থেকে খানিকটা বের হয়ে আছে। লম্বা নাক, নাকের নিচে পুরুষ্ট গোঁফ। গায়ের রং কোনো একসময় হয়তো ফরসা ছিল। ময়লা জমে কিংবা রোদে পুড়ে কালচে ভাব ধরেছে। তাকে ঘিরে সস্তা সিগারেটের গন্ধের সঙ্গে মিলেছে জর্দার কড়া গন্ধ। তবে এখন সে পান খাচ্ছে না।
আমি বসেছি ভাইয়ার ঘরের বারান্দায়। ভাইয়াকে দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু সালামতকে দেখতে পাচ্ছি না। ভাইয়া বলল, আপনি ট্রাক চালান? আপনি তো ভাগ্যবান মানুষ।
এটা কেন বললেন?
বাংলাদেশের সব ট্রাকচালকের বেহেশত নসিব হবে, এই জন্যে বললাম।
কী বলেন এই সব?
ছুটন্ত ট্রাক দেখলেই আশপাশের সবাই আল্লাহর নাম নেয়। আপনাদের কারণে এত লোকজন আল্লাহর নাম নিচ্ছে, এই জন্যে আপনারা সরাসরি বেহেশতে যাবেন।
এই সব বাদ দেন। আমি আপনার কাছে কী জন্যে এসেছি সেটা শোনেন। উপায় না দেখে এসেছি।
বলুন, কী ব্যাপার।
পদ্ম মেয়েটার সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দেন। এটা আমার রিকোয়েস্ট। তার সঙ্গে আমার বিবাহ হয়েছে। একজনের বিবাহিত স্ত্রীকে আপনারা উঠায়ে নিয়ে এসেছেন, এটা কেমন কথা? আপনার স্ত্রীকে কেউ উঠায়ে নিয়ে গেলে আপনি কী করতেন?
ভাইয়া বলল, আমার স্ত্রীকে কেউ উঠায়ে নিয়ে যায় নাই, কাজেই কী করতাম বলতে পারছি না।
ভাইসাহেব, আমি ট্রাক নিয়ে এসেছি। পদ্মকে ডেকে দিন। আমি তাকে নিয়ে চলে যাব। কী ঘটেছিল তা নিয়ে মাথা ঘামাব না।
পদ্ম কি যাবে আপনার সঙ্গে?
অবশ্যই যাবে। তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন। এটা আপনার কাছে রিকোয়েস্ট। রিকোয়েস্ট না শুনলে অন্য পথ ধরব। সেটা আপনার ভালো লাগবে না।
ভাইয়া পদ্মকে ডেকে পাঠালেন। পদ্ম এসে দাঁড়াল। আমি বারান্দা থেকে পদ্মকে দেখতে পাচ্ছি না। দেয়ালে পদ্মর ছায়া পড়েছে। সেই ছায়া দেখতে পাচ্ছি।
ভাইয়া বলল, পদ্ম! ট্রাকড্রাইভার সালামত তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছে। ট্রাক নিয়ে এসেছে। তুমি কি তার সঙ্গে যাবে?
পদ্ম মিষ্টি করে বলল, যাব। কেন যাব না!
সালামত বলল, আমার স্ত্রীর নিজের মুখের কথা শুনলেন। এই কথার পর আর বিবেচনা নাই। পদ্ম, যাও, তৈয়ার হয়ে আসো। দশ মিনিট সময়।
পদ্ম বলল, এখন তো যেতে পারব না। পায়ে ব্যথা পেয়েছি। হাঁটতে পারি না। পায়ের ওপর দিয়ে রিকশা চলে গিয়েছিল। তুমি দেখো, পা ফুলে কী হয়েছে! পায়ের ফোলা কমুক। দশ দিন পরে আসো। এর মধ্যে পা ভালো হয়ে যাবে। আমি তোমার সঙ্গে চলে যাব।
সালামত বলল, পদ্ম, আমার কথা শোনো।
পদ্ম বলল, দশ দিন পরে তোমার কথা শুনব। এখন শুনব না।
পদ্ম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বের হয়ে গেল। ভাইয়া বলল, দশ দিন পর আসুন, দেখি কী হয়।
সালামত হতাশ গলায় বলল, দশ দিন পরেও কিছু হবে না। এই মেয়েকে আর মেয়ের মাকে আমি হাড়ে-গোশতে চিনি। ভাইসাহেব, শুনেন। এই মেয়ের পড়াশোনার খরচ, হাতখরচ—সব আমি দিয়েছি। মা-মেয়ের মাসখোরাকি খরচ দিয়েছি। আমার টাকায় মেয়ে বিএ পাস দিয়েছে। যখন বিয়ের কথা বলাম তখন পদ্ম বলল, ‘আপনার স্ত্রী আছে, আমি তো সতিনের ঘর করব না। স্ত্রীকে তালাক দিয়ে আসেন। তারপর বিবেচনা করব।’ জোবেদারে তালাক দিলাম। জোবেদা আমার স্ত্রী। সে দুই মেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেল। পদ্ম শুরু করল নানান ক্যাঁচাল। আজ না, সাত দিন পরে বিয়ে। সাত দিন পরে বলে, ‘বিষ্যুদবারে আমি বিয়ে করব না। বিষ্যুদবার আমার জন্যে খারাপ।’ তখন অন্য ব্যবস্থা নিলাম। বিয়ে হয়ে গেল। সন্ধ্যাবেলা তাকে নিয়ে ট্রাক চালায়ে দিনাজপুর যাব—সব ঠিকঠাক। ট্রাক নিয়ে উপস্থিত হয়ে শুনি, তাকে আপনারা জোর করে তুলে নিয়ে গেছেন।
ভাইয়া বলল, এত দিন যখন অপেক্ষা করেছেন, আরও দশটা দিন যাক। সবুরে মেওয়া ফলে। আপনার বেলায় সবুরে বউ ফলবে।
সালামত বলল, আপনার কথা মানলাম। আসব দশ দিন পরে। তখন যদি কিছু না হয়, আমি অন্য লাইন ধরব। আমি এত সহজ পাত্র না। পদ্ম এটা জানে না, পদ্মর মা জানে। সবকিছুর মূলে আছে ওই বদমাগি।
শাশুড়িকে মাগি ডাকছেন, এটা কেমন কথা!
ক্ষুব্ধ সালামত ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
সালামতের আগমন এবং প্রস্থানে পদ্মর মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। সে কলপাড়ে বসে আছে। তার এক পা প্লাস্টিকের গামলায় ডোবানো। পায়ের জলচিকিৎসা চলছে। রহিমার মা গলা নামিয়ে তার সঙ্গে গল্প করছে।
গল্পের বিষয়বস্তু ড্রাইভার ইসমাইলের জিন। এই জিন ইসমাইলের সঙ্গেই সারাক্ষণ থাকে। শুধু শনিবার আর সোমবার থাকে না। এই দুই দিন জিন তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যায়। জিনের স্ত্রীর নাম হামাছা।

আজ ছুটির দিন। বাবা বাসায় আছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি সাপ্তাহিক বাজারে যাবেন। আমাকে সঙ্গে যেতে হবে কি না বুঝতে পারছি না। বাবার সঙ্গে বাজারে যাওয়া বিড়ম্বনার ব্যাপার। কাঁচা মরিচ কেনার আগে তিনি মরিচ টিপে টিপে দেখবেন। একটা ভেঙে গন্ধ শুঁকবেন। ভাঙা মরিচ আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলবেন, ‘জিভে ছুঁইয়ে দেখ ঝাল কি না।’ মরিচ বিক্রেতা এই পর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে বলবে, ‘মরিচ ভাঙেন ক্যান?’ বাবা শান্ত গলায় বলবেন, ‘তোমার কাছ থেকে যদি মরিচ নাও কিনি, এই ভাঙা মরিচের দাম দেব। কাজেই হইচই করবে না। যে ভোক্তা, তার আইনি অধিকার আছে দেখেশুনে পণ্য কেনার। প্রয়োজনে মামলা করে দেব। বুঝেছ?’
একবার মাছ কিনতে গিয়ে মাছওয়ালার সঙ্গে তাঁর মারামারির উপক্রম হলো। মাছওয়ালা বঁটি উঁচিয়ে বলল, ‘দিমু কোপ।’ বাবা শান্ত গলায় বললেন, ‘কোপ দিতে হবে না। তুমি যে বঁটি উঁচিয়েছ, এর জন্যেই অ্যাটেম টু মার্ডারের মামলা হয়ে যাবে। সাত বছর জেলের লাপসি খেতে হবে। লাপসি চেন?’
বাবার কথা থাক। নিজের কথা বলি। আমি আগ্রহ নিয়ে পদ্ম ও রহিমার মায়ের কথা শুনছি। রহিমার মা উঠে যাওয়ার পর আমি পদ্মর কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। পদ্ম আমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, ট্রাকড্রাইভারের সঙ্গে বিয়ে আমার হয়েছে, এই কথা আপনাকে বলেছিলাম। এখন কি আমার কথা বিশ্বাস হয়েছে?
হ্যাঁ।
এ কিন্তু মানুষ খারাপ না। আমাকে পড়াশোনা করিয়েছে। যেদিন বিএ পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়েছে, সেদিন শাড়ি কিনে দিয়েছে।
প্রিয় স্বামীর সঙ্গে চলে গেলে না কেন?
পদ্ম বলল, ভাঙা পা নিয়ে যাব নাকি! পা ঠিক হোক, তারপর যাব। স্বামী ট্রাক চালাবে, আমি পাশে থাকব। বিড়ি ধরিয়ে তার ঠোঁটে দিয়ে দেব। ট্রাক চালাতে চালাতে যেন ঘুমিয়ে না পড়ে এই জন্যে সারাক্ষণ তার গায়ে চিমটি কাটব। দেখুন, আমি হাতের নখ বড় রেখেছি চিমটি কাটার সুবিধার জন্যে। আপনি হাতটা বাড়ান, আপনার হাতে একটা চিমটি কেটে দেই।
আমার হাতে চিমটি কাটবে কেন?
আপনি আমার নকল স্বামী, এই জন্যে আপনার হাতে নকল চিমটি কাটব।
পদ্ম চিমটি কাটার সুযোগ পেল না, বাবা বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন।
হাতের ইশারায় আমাকে ডাকলেন।
আমি এখন বাবার শোবার ঘরে। মা চাদর গায়ে শুয়ে আছেন। হাঁপানির টান এখনো ওঠেনি। টান উঠবে কি না তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। পরিস্থিতি যথেষ্ট ঘোলাটে বলে মনে হচ্ছে। কারণ, পদ্মর মা উপস্থিত আছেন। তিনি চেয়ারে বসে আছেন। তাঁর পাশের একটা চেয়ারে আমি বসেছি। ভদ্রমহিলা বিরক্ত চোখে আমাকে দেখছেন। বাবা বসেছেন মায়ের পাশে। বাবা প্রধান বিচারকের ভূমিকায় আছেন বলে মনে হচ্ছে। মা প্রধান বিচারকের সাহায্যকারী।
বাবা পদ্মর মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ভাবি! আমাকে বলা হয়েছিল, আপনি আপনার মেয়েকে নিয়ে ঝামেলায় পড়েছেন বলেই কিছুদিন আমার এখানে থাকতে এসেছেন। আমি বিষয়টা মেনে নিয়েছি। অনেক দিন পার হয়েছে। এখন আপনাদের চলে যেতে হবে। আপনাকে এক সপ্তাহ সময় দিচ্ছি।
পদ্মর মা চুপ করে আছেন। বাবার কথা শুনে তিনি যে ঘাবড়ে গেছেন এ রকম মনে হচ্ছে না। ভদ্রমহিলা শক্ত জিনিস। এসিড-মাতা বলে কথা!
বাবা বললেন, শেক্সপিয়ার বলেছেন, I have to be cruel only to be kind. এর অর্থ, মমতা প্রদর্শনের জন্যেই আমাকে নির্মম হতে হবে। আমি আমার ছেলেদের প্রতিও নির্মম। শুনেছেন নিশ্চয়ই, আমি আমার বড় ছেলেকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছি। শুনেননি?
শুনেছি।
আপনাকেও একটা সময় বেঁধে দিচ্ছি। এই মঙ্গলবারের পরের মঙ্গলবার।
পদ্মর মা অবাক হয়ে বললেন, যে জমির ওপর এই বাড়ি, সেই জমি তো আমার। আমি কেন বাড়ি ছাড়ব?
বাবা বললেন, তার মানে?
জমির কাগজপত্র আমার নামে।
বাবা বললেন, ভাবি, শুনুন। নানা দুশ্চিন্তায় আপনার মাথা এলোমেলো হয়ে আছে। জমি আপনার নামে, মানে কী?
আমার কাছে কাগজপত্র আছে। আপনার বড় ছেলে জোগাড় করে দিয়েছে।
বাবা বললেন, আচ্ছা, আপনি যান, পরে আপনার সঙ্গে কথা বলব। মনজু, তুই তোর ভাইকে ডেকে আন।
আমি বললাম, ভাইয়া তো এখন ঘুমাচ্ছে।
ঘুম থেকে ডেকে তুলে আন।
পদ্মর মা বলল, আপনি কি কাগজগুলো দেখবেন?
পরে দেখব। এখন আপনি যান।

দ্বিতীয় সিটিং বসেছে। ভাইয়াকে ঘুম ভাঙিয়ে আনা হয়েছে। ঘুম পুরোপুরি কাটেনি। ভাইয়া একটু পরপর হাই তুলছে। পদ্মর মা যে চেয়ারে বসেছিলেন, ভাইয়া সেখানে বসেছে। বাবা অনেকক্ষণ ভাইয়ার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। এটা বাবার পুরোনো টেকনিক। মূল বাজনায় যাওয়ার আগে তবলার ঠুকঠাক।
বাবা বললেন, শুনলাম তুমি পদ্মের মাকে কী সব কাগজপত্র দিয়েছ?
ভাইয়া বলল, ঠিকই শুনেছ। জমির দলিল আর নামজারির কাগজ।
পেয়েছ কোথায়?
সাবরেজিস্ট্রি অফিসে দুষ্ট কিছু লোকজন থাকে, যারা মিথ্যা কাগজ তৈরি করে দেয়।
তুমি ভুয়া কাগজপত্রের ব্যবস্থা করেছ?
হ্যাঁ। তবে ভুয়া হলেও কঠিন ঝামেলার কাগজ। মামলা করলে ফয়সালা হতে বিশ-পঁচিশ বছর লাগবে। তারপর দেখা যাবে, মিথ্যা কাগজ টিকে গেল।
তুমি এই কাজটা কেন করেছ জানতে পারি?
ভাইয়া বলল, টেনশন তৈরি করার জন্যে করেছি, বাবা। ছোট মা এবং তুমি—এই দুজন এখন শত্রুপক্ষ। এক ছাদের নিচে দুই কঠিন শত্রুর বাস মানে নানান কর্মকাণ্ড। এত দিন তুমি ভেজিটেবল হয়ে বাস করছিলা, এখন থেকে তোমার ভেতর থেকে ভেজিটেবল ভাব চলে যাবে। ভেজিটেবল হয়ে তো আর শত্রুর মোকাবেলা করা যায় না। তোমাকে বাধ্য হয়ে জেগে উঠতে হবে। এতে তোমার লাভ হবে একপর্যায়ে দেখা যাবে, তোমার ছাত্রছাত্রীরা তোমাকে মুরগি ডাকছে না। অনেক কথা বলে ফেললাম। নো অফেন্স, বাবা, যাই।
ভাইয়া উঠে দাঁড়াল। বাবা অধিক শোকে পাথর হয়ে বসে আছেন। একবার মায়ের দিকে তাকাচ্ছেন, একবার আমার দিকে। মায়ের হাঁপানির টান উঠে গেছে। নিঃশ্বাস নিতে গিয়ে তিনি এখন বিচিত্র শব্দও করছেন। শব্দ অনেকটা প্রেশার কুকারের মতো। কিছুক্ষণ বিজবিজ, তারপর ফোঁস—গ্যাস বের হয়ে যাওয়া।
বাবা মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, একটা পিস্তল থাকলে আমি নিজের হাতে তোমার ছেলেকে শ্যুট করতাম।
প্রবল ঝড়ের পর পরিস্থিতি অস্বাভাবিক শান্ত হয়। এখন আমাদের বাসার পরিস্থিতি শান্ত। পদ্মর মাথায় তার মা বাটা মেন্দি ঘসে ঘসে দিচ্ছেন। বাবা বাজার নিয়ে ফিরেছেন। কাঁচাবাজার হাতে নির্বোধ চেহারার এক ছেলেকে দেখা যাচ্ছে। বাবার কাছ থেকে জানা গেল, সে নিউমার্কেটে মিনতির কাজ করত। এখন থেকে এই বাড়িতে কাজ করবে। বাবার হাত-পা টিপে দেবে, ঘর ঝাঁট দেবে। ছেলের নাম জামাল। সে বাবাকে ‘আব্বা’ ডাকছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে, বাবা তার মুখে ‘আব্বা’ শুনে সন্তুষ্ট। বাবা নিজে জামালের জন্যে তোশক-বালিশ আর মশারি কিনে আনলেন। তাকে কৃমির ওষুধ খাইয়ে দেওয়া হলো। সন্ধ্যাবেলা সে লাইফবয় সাবান দিয়ে গোসল করে আমাদের পরিবারভুক্ত হলো। বাবা তার সঙ্গে মিটিংয়ে বসলেন। কঠিন মুখ করে বললেন, আমি তোর দায়িত্ব নিয়েছি। শুধু ঘরের কাজ করলে হবে না। তোকে লেখাপড়া শিখতে হবে। রোজ আধঘণ্টা করে তোকে আমি পড়াব। ঠিক আছে?
জামাল বলল, জি, আব্বা।
বাবা বললেন, আজ থেকে শুরু। এই দেখ, একে বলে স্বরে অ। বল, স্বরে অ।
স্বরে অ।
এর পাশে আকার দিলে হয় আ, বল, আ।
আ।
দুইটা অক্ষর এক দিনে শিখে ফেললি। রাতে ঘুমাতে যাবার সময় একশবার করে স্বরে অ, স্বরে আ বলবি। ঠিক আছে?
ঠিক আছে, আব্বা।
এক একটা অক্ষর শিখবি আর দুই টাকা করে বকশিশ পাবি। আজ দুইটা অক্ষর শিখেছিস, এই নে চার টাকা।
জামাল টাকা নিয়ে বাবাকে পা ছুঁয়ে সালাম করল। পরদিন সকালে জামালকে পাওয়া গেল না। সে বাবার মোবাইল ফোন আর মানিব্যাগ নিয়ে পালিয়েছে। মানিব্যাগে ছিল সাতাশ শ টাকা। উঠানে পদ্মর একটা শাড়ি শুকাতে দেওয়া ছিল। সেই শাড়িও পাওয়া গেল না।
ভাইয়ার কর্মকাণ্ডে বাবা যতটা না মর্মাহত হয়েছিলেন, জামালের কর্মকাণ্ডে তার চেয়ে বেশি মর্মাহত হলেন। ইউনিভার্সিটি বাদ দিয়ে ঘরে বসে রইলেন। হাতে Party Jokes-এর বই।

পদ্মদের নিজস্ব রান্নাঘর চালু হয়েছে। বারান্দায় বাঁশের বেড়া দিয়ে ওপেন এয়ার কিচেন টাইপ রান্নাঘর। সে রাঁধছে, বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি দুইটা কেরোসিনের চুলায় প্রথম রান্না বসল। রহিমার মা ভাইয়াকে জানাল, প্রথম দিন সরপুঁটি ভাজি আর কুমড়াফুলের ভাজি হচ্ছে।
ভাইয়া বলল, দুটাই তো শুকনা আইটেম।
রহিমার মা বলল, তরকারি আর ডাল আমাদের কাছ থেকে যাবে।
আমরা ওদের কোনো আইটেম পাব না?
মনে লয় না। একটা মাছ ভাজছে আর চাইরটা ফুল।
ভাইয়া বলল, কুমড়াফুলের ভাজি খেতে ইচ্ছা করছিল।
রহিমার মা বলল, কাইল আপনারে খিলাব। বকফুল ভাজি পছন্দ হয়? বকফুল আনব। সূত্রাপুর বাজারে পাওয়া যায়।
পদ্মদের পাশের গেস্টরুম তালাবদ্ধ ছিল। এক সকালবেলা (বুধবার আটটা চল্লিশ) পদ্মর মা তালা ভেঙে সেই ঘরের দখল নিয়ে নিলেন। বাবা হতভম্ব। আমাকে ডেকে বললেন, ঘটনা কী? পদ্মর মা আমার ঘরের তালা ভেঙেছে কী জন্যে?
আমি বললাম, ওনার কাছে চাবি ছিল না বলেই তালা ভেঙেছেন। চাবি থাকলে তালা ভাঙতেন বলে আমার মনে হয় না।
তুমি ব্যাপারটা বুঝতেই পারছ না। এরা চাচ্ছেটা কী? আমার বাড়িঘর দখল করে নিচ্ছে কেন? একটা ঘর কি তাদের জন্যে যথেষ্ট ছিল না?
আমি বললাম, না। একটা ঘরে থাকবে পদ্ম আর ওদের কাজের মেয়ে মরি। অন্য ঘরে পদ্মর মা। সবারই প্রাইভেসির দরকার।
তুমি ওদের হয়ে কথা বলছ কেন? তোমার সমস্যা কী? তোমার আচার-আচরণ, কথাবার্তা এবং চিন্তাভাবনা প্রতিবন্ধীদের মতো, এটা জানো?’
না।
সামনে থেকে যাও। পদ্মর মাকে আমার কাছে পাঠাও।
উনি বাড়িতে নেই, বাবা। ড্রাইভার ইসমাইলকে নিয়ে বের হয়েছেন।
কোথায় গেছেন?
কোথায় গেছেন শুনলে তুমি আপসেট হয়ে যাবে। তোমাকে আপসেট করতে চাচ্ছি না। উনি তোমার গাড়ি নিয়ে বের হয়েছেন।
গাড়ি নিয়ে বের হয়েছেন, মানে কী? গাড়ি তো নষ্ট।
অন্য একটা গাড়ি দড়ি দিয়ে বেঁধে তোমার গাড়ি টেনে নিয়ে গেছেন।
তুমি কিছু বললে না?
না। আমার ধারণা, উনি গাড়ি সারাতে নিয়ে গেছেন। ইসমাইল ড্রাইভার তা-ই বলল।
আমার সামনে হাবার মতো দাঁড়িয়ে থাকবে না। Get lost.
বাবার কাছ থেকে ছাড়া পাওয়ার পর মায়ের কাছে ধরা খেলাম। মা গাড়ির বিষয়ে এখনো কিছু জানেন না, তবে দ্বিতীয় গেস্টরুম দখল হয়ে গেছে এই খবর পেয়েছেন। তিনি হতাশ গলায় বললেন, এই সব কী হচ্ছে? ওরা নাকি গেস্টরুম দখল করে নিয়েছে?
হুঁ।
এখন আমরা কী করব? পুলিশে খবর দিব?
পুলিশে খবর দিয়ে লাভ হবে না। ওনার কাছে কাগজপত্র আছে, জমি তাঁর।
মা ফিসফিস করে বললেন, কাউকে দিয়ে কাগজপত্রগুলি চুরি করাতে পারবি?
আমি বললাম, এই বুদ্ধিটা খারাপ না। তুমি রহিমার মাকে লাগিয়ে দাও।
মা অনেক দিন পর উত্তেজনায় বিছানায় উঠে বসলেন। চাপা গলায় বললেন, টগরের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে আলাপ করলে কেমন হয়? এই সব বিষয় সে ভালো বুঝবে।
ভাইয়াকে ডেকে নিয়ে আসব?
না। আমি তার কাছে যাব।
মা তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নামতে গিয়ে খাট থেকে পড়ে বিকট চিৎকার করতে লাগলেন, তখনো আমরা জানি না, মা তাঁর বাঁ পা ভেঙে ফেলেছেন।
[চলবে]


নতুন বই ইমেইলে পেতে হলে

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com