সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label blog. Show all posts
Showing posts with label blog. Show all posts

লোকসভা বিধানসভা - দিব্যেন্দু পালিত

লোকসভা বিধানসভা - দিব্যেন্দু পালিত

বইয়ের হাট ব্লগ
শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি

ছোটগল্প
লোকসভা বিধানসভা
দিব্যেন্দু পালিত
পড়ার সময় ৫ মিনিট

লেকের জলে এক ডুব দিয়ে উঠে মাথা ঝাড়তে ঝাড়তে পরী দেখল অল্প দূরে গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে তার চান করা দেখছে এক বাবু৷ প্যান্ট শার্ট পরা, লম্বাও নয়, বেঁটেও নয়, মাথাভর্তি চুল, গায়ের রঙ তারই মতো ময়লা, কিন্তু কেমন ছোকরা-ছোকরা চেহারা৷ চোখাচোখি হতে মুখ ফিরিয়ে নিল৷ দূর থেকে মাথায় গাঁটরি নিয়ে এগিয়ে আসছে একটা মেয়েমানুষ, তার পিছনে একটা সাইকেল৷ কিছুই জানে না এমন ভঙ্গি করে এখন এ সবই দেখছে৷
আর একটা ডুব দেবার আগে লোকটাকে খুঁটিয়ে দেখল পরী এবং ভাবল, তাকেই দেখছিল এটা সে বুঝল কী করে৷ আশপাশে চান করছে রেললাইনের ওপারের বস্তি থেকে আসা আরও তিন-চারজন মেয়েমানুষ৷ তবে ওদের কেউই তার মতো জোয়ান নয়৷ খানিকটা তফাতে গামছা পরে গায়ে জল থাবড়াচ্ছে একটা রিকশাওলা৷ আরও দূরে মাটি শুঁকতে শুঁকতে ঘোরাফেরা করছে দু-তিনটে ছাগল, মুখে কী যেন কামড়ে ধরে একটা নেড়ি হেঁটে গেল ছাগলগুলোর পাশ দিয়ে৷ সে যখন চান করতে নামে তখন লোকটা ছিল বলে মনে পড়ছে না৷ তারপর হঠাৎ-ই৷ এই ভোটের দিনে, যখন চারদিক শুনশান, মেয়েমদ্দরা কখনও জোড়ে, কখনও দল বেঁধে ছুটছে ইস্কুলবাড়িতে ভোটের লাইন দিতে, তখন কাজকম্ম ফেলে এই লোকটা নিশ্চয়ই ওই বুড়ি মেয়েমানুষগুলোকে, রিকশাওলাকে কি ছাগলগুলোকে দেখতে লেকের পাড়ে হঠাৎই দাঁড়িয়ে পড়েনি! যৈবন আলাদা জিনিস৷
ঘন্টি বাজাতে বাজাতে চলে গেল সাইকেলের লোকটা৷ পিছনে পিছনে মাথায় শুকনো ডালপালার গাঁটরি নিয়ে মেয়েমানুষটাও৷ লোকটা আবার মুখ ফিরিয়েছে এদিকে৷ তার সঙ্গে চোখাচুখি হতে সিগারেটে টান দিয়ে জল দেখতে লাগল৷ পরী দাঁড়িয়েই থাকল৷ কোমরজলে নেমে একটা বড় ডুব দেবার পর সাপটানো শাড়ির তলায় জলে ভিজে বিজবিজ করছে বুক৷ পাড়ে রাখা আছে আর একটি শাড়ি আর বেলাউজ৷ এই কাপড়ের জল নিংড়ে, গা মুছে, শুকনো জামাকাপড় পরে ঝুপড়িতে ফিরবে সে৷ ভিজে শাড়িটা শুকলে মা আসবে চান করতে৷ যা গরম! মনে হয় মেয়েছেলে না হলে গা উদোম করে ঘুরে বেড়াতে পারত৷
আজকের দিনটা খারাপ৷ সকালে দুটো পাউরুটি আর গোটাতিনেক আধপচা পেয়ারা ভাগাভাগি করে খেয়েছে পাঁচজনে, এক প্রস্থ ভাঁড়ের চা খেয়েছে সে আর তার মা শকুন্তলা, দেখতে দেখতে বেলা গড়িয়ে গেল৷ সকাল থেকে চল্লিশ পয়সার বেশি ভিক্ষে না জোটায় গুলেকে কাঁখে তুলে বাজারে তরকারি কুড়োতে গেছে মা৷ যাবার আগে লেকে চান করতে পাঠাল তাকে৷ বলল বিষ্টুদার দোকান ঘুরে যেতে৷ এ সব ধান্দা দিব্যি বোঝে পরী, শকুন্তলা তাকে রোজগারে পাঠাল৷ ফেরার আগে দু-পাঁচ টাকা হাতে পেয়ে গেলে ভাল হত৷ অন্তত চালটা ডালটা কেনা যেত তাতে৷ কিন্তু এই শুনশানের বাজারে দেবে কে টাকাটা?
লোকটাকে কি অস্থির লাগছে একটু? তা না হলে যে-সিগারেটটা ফুঁকছিল সেটা জলে ছুঁড়ে দিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে পকেট থেকে প্যাকেট বের করে আর একটা ধরাল কেন? কী মনে করে বসে পড়ল বেঞ্চিতে?
ফেলে দেওয়া সিগারেটের টুকরোটা এদিক ওদিক ভাসতে ভাসতে এখন এগিয়ে আসছে তারই দিকে৷ সেটাকে আর লোকটাকে লক্ষ্য করতে করতে আর ডুব দিল না পরী৷ দুহাতে জল সরিয়ে জায়গামতো সরে এসে হাওয়া লাগতে দিল বুকে৷ দেখতে চাইলে দেখুক৷ মনে হচ্ছে ঠিকই ভেবেছে৷ মতলব না থাকলে কেউ এদিকে এসে এভাবে তিত্থির কাকের মতো বসে থাকে৷ অন্যদিন এ সময় এদিকটা এমন চুপচাপ থাকে না৷ চান করতে নামে আরও বেশি পুরুষ মেয়েমানুষ৷ উল্টোদিকের পাড়ে কাপড় কাচে ধোপারা৷ এদিক ওদিক করে ছুটকো ছাটকা লোকজন, সাইকেল৷ আর গাছের ছায়ায় বসে ঢলাঢলি জুমাচুমা করবার জন্যে বগলদাবা করে ছুকরি নিয়ে আসে দু-একটা ছোঁড়া৷ আজ একেবারে শুনশান৷ বিষ্টুদা বলেছিল বলেই জানে আজ মে মাসের কুড়ি তারিখ, সোমবার৷ সকাল থেকে আকাশ মেঘলা, একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে গুঁড়িগুঁড়ি৷ সেজন্যে নয়৷ সব ভোটের জন্যে৷ ও বাবু, তোমার ভোট নাই নিকি গো! প্যাঁট প্যাঁট করে দেখছ কি!
পেটের ভিতর খিদে পাবার জায়গাটা খলবল করে উঠল রঙ্গ-তামাশায়৷ সামান্য হাসিতে কেঁপে উঠল ঠোঁটদুটো৷ ভিক্ষে করতে করতে একসময় হাত পাতলেই বুঝতে পারত কোন মানুষটা ভিক্ষে দেবে, কে দেবে না৷ নিজেকে মেয়েমানুষ হিসেবে চিনতে পারার পর থেকে শিকারও চিনতে শুরু করেছে পরী৷ মুখচোরা, হাবভাব, হাঁটাচলার ভঙ্গি দেখেই বুঝতে পারে কোন পুরুষটার মতলব কি৷ কখনও এ পাড়ায় কখনও ও পাড়ায়, ফুটপাথে আর ঝুপড়িতে থাকতে থাকতে আস্তে আস্তে শিখে গেছে সব৷ ইজের-পরা বয়স থেকে ফ্রক-পরা বয়সে পৌঁছনো পর্যন্ত এ ফুটপাথ থেকে ও ফুটপাথে দৌড়োদৌড়ি করে ট্রাফিকে দাঁড়ানো গাড়ির বাবুদের কাছে হাত পেতে ঘ্যানঘেনে গলায় দিব্যি ভিক্ষে চাইত সে৷ শাড়ি ধরার পর শকুন্তলা আর তাকে করতে দেয় না ওসব৷ তার বদলে এখন সে কর্পোরেশনের ছাইগাদায় গিয়ে ময়লা কাগজ, টিনের কৌটো, শিশি-বোতল আর পাঁশ কুড়োয়৷ বস্তা বোঝাই করে সেসব বিক্রি করে আসে বিষ্টুদার রদ্দির দোকানে৷ এখন গাড়ি ধরে ভিক্ষে চায় বোন সুন্দরী৷ দাদা আঁটুল মোটর গ্যারেজে কাজ পাবার পরেও কিছুদিন আসত, তারপর একদিন টাকাপয়সা নিয়ে মার সঙ্গে চিল্লাচিল্লি হল খুব৷ আঁটুল মাকে ‘খানকি’ বলল, শুনে ছাই ঘাঁটার লোহা হাতে তেড়ে গেল মা, ‘ওরে খানকির বাচ্চা— আয়— আজ খুন করব তোকে—’ বলল এই সব৷ সেই থেকে আঁটুল নাপাত্তা৷ আর দুভাই বাঁটুল, শাঁটুল এখনও ছোট, যখন যেমন পায় ভিক্ষে করে, খবরের কাগজ কুড়োয়, রাস্তার দেওয়াল থেকে পোস্টার ছিঁড়ে জড়ো করার জন্যে তক্কে তক্কে থাকে৷ ভালমন্দ খাবার ইচ্ছে হলে বাজারের হোটেলের সামনে কাঁদুনি গেয়ে ঝোলটা, আলুটা, মাছের কাঁটাটা নিয়ে আসে অ্যালুমিনিয়ামের পুরনো বাটিতে৷ দেড় দু-বছর আগে ফুটপাথে শুয়েই পাংচার সারানো গাড়ির চাকায় হাওয়া ফোলার মতো আবার পেট ফুলতে শুরু করল মার, দেখতে দেখতে বেরিয়ে এল গুলে৷ মানুষের বাচ্চা তো নয়, যেন ওল্টানো আরশোলা৷ আকাশ-চাওয়া হয়ে কখনও হাসে, কখনও কাঁদে৷
পরী জানে না তার বাপ কে, কে-ই জন্ম দিল সুন্দরী, বাঁটুল, শাঁটুলকে৷ আগে বুঝত না, এখন বোঝে ফুটপাথে গাদাগাদি করে শুয়ে এমনি এমনিই পেট ফোলে না মা-র৷ গুলের জন্মের আগে কিছুদিন রিকশাওলা গঙ্গারামের সঙ্গে খুব মাখামাখি হয়েছিল শকুন্তলার, নীল পাড়ের কোরা শাড়ি পেয়ে এমন ভাব দেখাত যেন গববে পা পড়ে না মাটিতে৷ সিঁদুরও পরত কিছুদিন৷ গঙ্গারাম একদিন তাদের রিকশায় চড়িয়ে ঘোরাল এক চক্কর৷ ফুটপাথ থেকে তাকেও ফ্রক কিনে দিয়েছিল একটা৷ লোকটাকে খারাপ লাগত না৷ গুলের জন্মের পরেও বেশ আদিখ্যেতা ছিল মার সঙ্গে৷ তো একদিন রাতে গঙ্গারাম তার ওপর চড়াও হবার পর সে চিল্লাচিল্লি শুরু করতে ঘুম ভেঙে ব্যাপারটা টের পেয়ে শকুন্তলাও গেল খেপে৷ গঙ্গারামকে তাড়াল, তাকেও শাড়ি ধরাল৷ হা রে বুদ্ধি! শাড়ি ধরালেই বুঝি রক্ষে পায় ফুটপাথের মেয়েমানুষ! তার পেট নেই? হোক ছেঁড়া, গা-গতর ঢাকবার জন্যে মাঝেমধ্যে শাড়ি বেলাউজের দরকার নেই? আর শুধু গঙ্গারামেরই বুঝি দোষ! ওই যে একদিন ফুটপাথ সাফাইয়ের নামে হললা গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়েছিল তাদের— শকুন্তলাকে ছাড়লেও তাকে ছাড়ল না সহজে, সে কি এমনি-এমনি নাকি! তারপর এই যে সেদিন বিষ্টুদার দোকানে দশ টাকা ধার চাইতে গিয়েছিল শকুন্তলা, বিষ্টুদা নাকি বলল, এখন যা, দুপুরে পরীকে পাঠাস— তো তাকেই পাঠাল শকুন্তলা, আর তাকে দোকানের আলমারির পিছনে নিয়ে গিয়ে আদর করল বিষ্টুদা, জুমাচুমা করল, তারপর লোক আসায় হাতে দশ টাকা গুঁজে দিয়ে বিদেয় করে দিল, এসব কি এমনি-এমনি নাকি! ছিয়া যা, ছিয়া যা৷ পরী জানে, সেও শকুন্তলার মতো খানকি হয়ে যাচ্ছে৷ শকুন্তলাও জানে, না হলে বিষ্টুদার দোকান ঘুরে চান করতে যেতে বলবে কেন! তা বিষ্টুদাও থাকলে তো! গিয়ে দেখল দোকানের ঝাঁপ ফেলা৷ আশপাশও কানা৷ চটপট একটা ডুব দিয়ে পরী ভাবল, আর চান করে কাজ নেই৷ লোকটা গরম থাকতে থাকতেই একটা কিছু করে ফেলা দরকার৷ কেটে গেলেই ফক্কা৷ মনে হচ্ছে এ বাবুটারও ভোট নেই তাদের মতো, কিন্তু খিদে আছে শরীরে৷
এতক্ষণ মজা পাচ্ছিল, জল ঠেলে পাড়ের দিকে এগোতে এগোতে শরীরে রাগ টের পেল পরী৷ ভোটের জন্যেই নাকি আজ সব ছুটি৷ আর এমনই ছুটি যে দোকানপাট সব বন্ধ, রাস্তায় বাস মিনিবাস নেই বললেই হয়, ট্রাম চলছে অনেকক্ষণ পরে পরে৷ তাও ফাঁকা ফক্কা৷ আর রাস্তায় মোটর আর ট্যাক্সি এতই কম যে হুসহাস করে বেরিয়ে যাচ্ছে সব৷ জ্যাম হচ্ছে না কোথাও৷ সকাল থেকে গাড়ি ধরার জন্যে অনেকবার ছুটোছুটি করেছে সুন্দরী— একবার তো চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে গেল, কিন্তু একটাও গাড়ি দাঁড়ায়নি৷ দশটা নয়া পয়সা পর্যন্ত ভিক্ষে দেয়নি কেউ৷ দিন তিন-চার হল বাঁটুল শাঁটুলেরও পোস্টার ছেঁড়া বন্ধ৷ কদিন আগে সিনেমার পোস্টার ছিঁড়তে ছিঁড়তে একটা ভোটের পোস্টারও ছিঁড়ে ফেলেছিল বাঁটুল, সঙ্গে সঙ্গে হইহই কাণ্ড, তিন-চারজন দৌড়ে এসে চড়চাপড় মারল বাঁটুলকে৷ সেই থেকে ভয়ে আর কোনও পোস্টারেই হাত দেয়নি ওরা৷ কাজকাম নেই, এখন ফুটপাথে ইটের টুকরো ছুঁড়ে ছুঁড়ে কংগ্রেস-বি জে পি- ছি পি এম-গঙ্গারাম-লোকসভা-বিধানসভা খেলে৷ তবে আজ বিকেল পাঁচটায় ভোট শেষ হয়ে যাবার পর আর কেউই পোস্টার, ঝোলানো কাগজের লম্বা দড়ি নিয়ে মাথা ঘামাবে না৷ কদিন খুব চিল্লাচিল্লি করেছে সব, মিছিল করেছে, মিটিং করেছে, ভোট ফিরি করেছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে৷ রাতের দিকে বোমা-টোমাও ফাটিয়েছে দু-একটা৷ আজ সব ক্লান্ত, হাল-বেহাল, গা-ছাড়া হয়ে থাকবে৷ তখনই সুযোগ৷ বিষ্টুদা বলেছে আগে থেকেই ভোটের কাগজ কুড়নোর জন্যে তৈরি থাকতে, ইস্কুলবাড়িতে ভোটের গেট বন্ধ হলেই ঝাঁপিয়ে পড়তে৷ বলেছে, ‘আশপাশের রাস্তায় যত যা আছে কুড়িয়ে বস্তা বোঝাই করবি৷ কাল নিয়ে আসবি এখানে, ওজন করে দাম দিয়ে দেব৷ লোকসভা বিধানসভা মিলিয়ে এবার তো এলাহি কাণ্ড রে! ভোটে তোদেরই বরাত খুলে গেল দেখছি!’
বিষ্টুদা বললেও পরী জানে কাজটা সহজ হবে না৷ আশপাশে তাদের মতো খানকির বাচ্চা কম নেই৷ আছে পাড়া, বে-পাড়া৷ ধান্দাটা সকলেই জানে৷ এই তো গেল বছর— নাকি তার আগের বছর? — ভোটের শেষে একটা কাগজ ঝোলানো ইয়া লম্বা দড়ির দখলদারি নিয়ে বে-পাড়ার কয়েকটা কাগজ-কুড়ুনের সঙ্গে তাদের দলের রক্তারক্তি লেগে গিয়েছিল আর কি! তাছাড়াও আছে খচড়া৷ পোস্টারে এমন এঁটেল লেই মারে আজকাল যে ছিঁড়তে গেলে দেওয়াল ছাড়ে না, ছিঁড়ে যায়৷ ছেঁড়া কাগজের দামও কমে যায়৷ এত সব খচড়া সামলে কতটা কী বস্তায় উঠবে শেষপর্যন্ত তা কে জানে! পরী নিঃশ্বাস চাপল৷ ঝটপট গা মুছে ভিজে শাড়ি ছেড়ে গায়ে জড়াল শুকনোটা, বেলাউজটাও৷ না, লোকটা নড়েনি৷ আড়ে তাকিয়ে দেখল, আবডালে চোখ রেখেছে তার ওপর৷ মুখ ফিরিয়ে নিল৷ লোকটা একা নয়৷ দেখছে ওই রিকশাওলাটাও৷ শালা আর একটা গঙ্গারাম যেন৷ এতক্ষণ জলের থাবড়া মারছিল গায়ে, এইবার জলে নামল৷ ভিজে শাড়িটা নিংড়োতে নিংড়োতে খর চোখে বেঞ্চিতে বসে থাকা লোকটাকে দেখল পরী৷ তারপর আশপাশে কে আছে না আছে দেখে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল৷
‘ও বাবু গো, একা কেন! ভোট নাই নাকি?’
লোকটা ঘাবড়ে গেল কেমন৷ হাতে সিগারেট ছিল তখনও, সেটা ফুঁকবে না ফেলে দেবে ভাবতে ভাবতে বলল, ‘কী চাই?’
পরী হাসল৷ তার আবার লজ্জা কিসের! আরও একটু এগিয়ে এসে বলল, ‘চল, ওদিকে গাছের তলায় বসবে৷ দশ টাকা দিও৷’
‘যাও, ভাগো এখান থেকে—৷’ লোকটা খেপে গেল এবার, ‘বদমাইশি করতে হলে অন্য জায়গায় যাও—’
‘ভাগব কেন! এটা তোমার জায়গা নাকি!’
‘ওহ! যত্ত সব—!’
লোকটা উঠে দাঁড়াতে এবং তারপর জায়গা ছেড়ে হাঁটা দিতে মুহূর্তের জন্যে থমকে গেল পরী৷ বোধহয় লোক চিনতে ভুল করেছিল সে৷ বোধহয় এমনিই এসে বসেছিল লোকটা, চোখ আছে বলে তাকিয়ে ছিল, ওই করতে গিয়ে তার চান করাও দেখেছে৷ কিন্তু এই লোকটা কেটে গেলে শূন্য হাতে ফিরতে হবে তাকে৷ বিষ্টুরও ঝাঁপ বন্ধ, বিকেলের আগে খুলবে মনে হয় না৷ আদৌ খুলবে কিনা কে জানে!
পরী মরিয়া হয়ে উঠল৷ লোকটা চলে যাচ্ছে, যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখান থেকেই দেখল দূরে একটা লোক এগিয়ে আসছে এদিকে, হয়ত আর কেউও এসে যাবে এর মধ্যে৷ তখনই ফন্দি এঁটে দৌড়ে গিয়ে পিছন থেকে লোকটার হাত টেনে ধরল সে৷
লোকটা দাঁড়িয়ে পড়ল৷ থমকানো ভাব, কথা ফুটল না মুখে৷
হাতটা ছেড়ে দিল পরী৷
‘ঠিক আছে, পাঁচ টাকা দিয়ে যাও৷ মায়ের দিব্যি, সারাদিন খাওয়া হয়নি, বাবু—’
‘ফাজলামি!’ লোকটা আবার এগিয়ে গেল, ‘এক পয়সাও দেব না৷’
‘না দিলে চিল্লাব৷’ আবার লোকটার গায়ে গায়ে এঁটে এল পরী, যেভাবে আগে ভিক্ষে চাইতে মোটরগাড়ির সঙ্গে সঙ্গে হাঁটত৷ বলল, ‘ওই দ্যাখ, লোক আসছে৷ বলব খারাপ লোক, গায়ে হাত দিয়েছিল—’
লোকটা আবার দাঁড়িয়ে পড়ল৷ মুখ ফ্যাকাশে৷ খুব ভয় পেয়ে গেছে যেন৷ তারপর হঠাৎই মুখ ঝুঁকিয়ে বুক পকেট হাতড়ে একটা দু টাকার নোট বের করে ছুঁড়ে দিল ওর মুখের ওপর৷ তারপরেই হাঁটতে শুরু করল হনহন করে৷
টাকাটা খামচে ধরে পরী ভাবল আবারও পিছু ধরে৷ তারপর ভাবল, থাক, তবু ভয় পেয়ে দুটাকা দিল৷ বাবুটা তো সত্যিই খারাপ কিছু করেনি৷ দেখল, দূর থেকে আরও দূরে যেতে যেতে লোকটা পিছন ফিরে তাকাল একবার৷ তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল অন্য রাস্তার বাঁকে৷
পরী ফিরতে লাগল৷ দুটাকায় আর কিছু না হোক, মুড়ি খেয়ে কাটানো যাবে দুপুরটা৷ শকুন্তলাও হয়ত কিছু জোগাড় করে আনবে এর মধ্যে৷ ভোট কি আর রোজই হচ্ছে! আর ভোট না হলেই বা কী! খানকির বাচ্চারা যেন মানুষের বাচ্চার মতো রোজই দুবেলা পেট ভরে খেতে পাচ্ছে!
এসব ভেবে মেঘলা আকাশের দিকে তাকাল পরী৷ কাঁধের ওপর জল নিংড়ানো শাড়ি, হাতের মুঠোয় টাকা৷ সামান্য জ্বালা করে উঠল চোখদুটো৷
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

স্মৃতিকথা: ম্যাজিক - হুমায়ূন আহমেদ

amarboi
বইয়ের হাট ব্লগ
শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি

ম্যাজিক - হুমায়ূন আহমেদ

উনিশশাে পঁয়ষট্টি সন। একটা স্যুটকেস এবং ‘হােল্ডঅল’ নামক বস্তুতে লেপ-তােষক ভরে ঢাকা কলেজের সাউথ হােস্টেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। আজ আমাকে সীট দেয়া হবে। একটু ভয় ভয় লাগছে কারণ শুনতে পাচ্ছি যত ভাল রেজাল্টই হােক সবাইকে সীট দেয়া হবে না। যাদের দুষ্ট প্রকৃতির ছেলে বলে মনে হবে হােস্টেল সুপার তাদের বাতিল করে দেবেন। তাঁর কথাই শেষ কথা। আপীল চলবে না।

আমি দুষ্ট প্রকৃতির ছেলে নই। কিন্তু চেহারায় সেই ব্যাপারটা আছে কি-না বুঝতে পারছি না। চেহারা দেখে যদি আমাকে দুষ্ট প্রকৃতির মনে হয় তাহলে তাে সর্বনাশ! আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছি চেহারায় এক ধরনের গােবেচারা ভাব ফুটিয়ে তুলতে।
সুপারের ঘরে ডাক পড়ল।

সুপার একবারাে আমার দিকে না তাকিয়ে বললেন, ২০৬ নম্বর রুম। জানালার কাছের সীট। কোন ফাজলামী বদমায়েশী করা চলবে না। প্রতিদিন সন্ধ্যায় রােল কল হবে। রােল কলের সময় যদি পরপর দুদিন সীটে না পাওয়া যায় তাহলে সীট ক্যানসেল । মনে থাকবে?

‘জ্বি স্যার, থাকবে।’

‘ভাল ভাল ছেলে ঢাকা কলেজে পড়তে আসে। অল্প কিছু ভাল থাকে, বেশির ভাগই বাঁদর হয়ে যায়। কথাটা যেন মনে থাকে।’

‘মনে থাকবে স্যার।’

‘হােস্টেল ফিস দাও। এক মাসের খাবার বাবদ ৩৮ টাকা। সীট ভাড়া পাঁচ টাকা, অন্যান্য ফী পাঁচ টাকা। মােট আটচল্লিশ।’

আমি আটচল্লিশ টাকা দিয়ে ঢাকা কলেজ সাউথ হােস্টেলে ভর্তি হয়ে গেলাম। আতংকে বুক কাঁপছে। মনে হচ্ছে জেলখানা। এর আগে কখনাে বাবা, মা, ভাইবােন ছেড়ে এত দুরে থাকি নি। কাঁদতে ইচ্ছা হচ্ছে। কলেজের ছাত্র, কাঁদলে সবাই হাসাহাসি করবে। চোখের পানি আসি আসি করেও আসছে না।

সেই সময়ে ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন জালালুদ্দিন আহমেদ।

কড়া লােক। তার আইন-কানুন বড়ই কঠিন। তৃতীয় দিনেই তার পরিচয় পেলাম। নর্থ হােস্টেলের এক ছাত্র সেকেণ্ড শাে সিনেমা দেখে হােস্টেলে ফিরছিল। কপালের ফেরে বেচারা প্রিন্সিপ্যাল স্যারের সামনে পড়ে গেল। স্যার শীতল গলায় বললেন, কাল ভাের দশটার আগেই তুমি হােস্টেল ছেড়ে চলে যাবে। তুমি দুষ্ট গরু। দুষ্ট গরু আমি গােয়ালে রাখব না।

দুষ্ট গরুকে পরদিন সকাল ন'টায় কাঁদতে কাঁদতে রিকশায় বেডিংপত্র তুলে চলে যেতে দেখা গেল। তাকে তখন মােটেই দুষ্ট গরু মনে হচ্ছিল না।

আমরা সবাই সাবধান হয়ে গেলাম। নিঃশ্বাস ফেলতেও সাবধানে ফেলি। প্রিন্সিপ্যাল স্যার যদি আবার নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ শুনে ফেলেন। প্রচণ্ড পড়াশােনার চাপ। রাতে রােল কল। মাঝে মাঝে গভীর রাতে চেকিং। ভয়াবহ অবস্থা। এর মধ্যে সপ্তাহটা কোনদিকে যায় বুঝতেই পারি না – সমস্যা হয় ছুটির দিনে। ছুটির দিন আর কাটতে চায় না। ছুটির দিন আইন-কানুন কিছু দুর্বল থাকে। রাত ন'টার সময় প্রিন্সিপ্যাল স্যারের সামনে পড়ে গেলে তিনি শুধু কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করেন – কি নাম? হুজুর বাহাদুরের কি নাম? এই পর্যন্তই। পরদিন সকালে বিছানা-বালিশ নিয়ে চলে যেতে হয় না। ছুটির দিনে হােস্টেলের ছাত্ররা আত্মীয়স্বজনের বাসায় যায়। কেউ কেউ যায় বলাকা সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে। আইয়ুব খানের কল্যাণে তখন ছাত্রদের সিনেমা দেখা খুব সহজ। ছাত্র হলে সরকারী ট্যাক্স দিতে হয় না। টিকিটের দাম অর্ধেক। মুশকিল হচ্ছে ঢাকায় তখন আমার কোন আত্মীয়স্বজন নেই। অর্ধেক দামে সিনেমার টিকিট কেনার মত পয়সাও নেই। সময় কাটানাের জন্যে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানাে শুরু করলাম। সকাল বেলা বেরিয়ে পড়ি। দুপুরের আগে হােস্টেলে ফিরে ভাত খেয়ে আবার বেরিয়ে পড়ি। ফিরি সন্ধ্যা মেলাবার পর।

এরকম ঘুরতে ঘুরতেই মুখলেসুর রহমান নামের একজনের দেখা পেলাম। তার পেশা অদ্ভুত। ম্যাজিক দেখায়। এবং টাকার বিনিময়ে ম্যাজিকের কৌশল বলে দেয়। ম্যাজিকের যন্ত্রপাতি বিক্রি করে। অপূর্ব সব ম্যাজিক। তাকে ঘিরে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যেই সে দেখাচ্ছে চারটা টেক্কা। নিমিষেই চার টেক্কা হয়ে গেল চার বিবি। এখানেই শেষ নয়, ফুঁ দিতেই চার বিবিও অদৃশ্য। বিবির জায়গায় শাদা তাস ! মুখলেসুর রহমান তাস রেখে বিড়ি ধরিয়ে বলল, কেউ যদি এই তাস কিনতে চান পাঁচ টাকা। আর যদি শুধু ম্যাজিক শিখতে চান, তিন টাকা।

খেলার কৌশল না জেনে বাড়ি যাওয়া সম্ভব না। আমার কৌতূহল প্রবল, আমার পায়ে শিকড় গজিয়ে গেছে। আমি নড়তে পারছি না। তিন টাকা দিয়ে কৌশল জানলাম। তবে কৌশল বলার আগে আমাকে তিন পীরের, মা-বাবার এবং ভাতের কসম কাটতে হল – এই কৌশল কাউকে বলা যাবে না। মুখলেসুর রহমান যা বলে আমি তাতেই রাজি। আমাকে জানতেই হবে। না জানলে আমি পাগল হয়ে যাব।

কৌশল জানার পর মনটা ভেঙে গেল। এত বড় ফাঁকি ! মানুষকে ধোকা দেয়ার এত সহজ পদ্ধতি? আমি এমন বােকা! এই সহজ ধোঁকা বুঝতে পারলাম না?

আমার তিনটা টাকা চলে গেল ? তিন টাকায় ছদিন সকালের নাশতা হত। রাগে-দুঃখে আমার চোখে প্রায় পানি এসে গেল। মুখলেসুর রহমান সম্ভবত আমার মনের অবস্থা বুঝল। সে উদাস এবং খানিকটা বিষণ গলায় বলল, তুমি খেলার ফাঁকিটা দেইখা মন খারাপ করলা? ফাঁকির পেছনে বুদ্ধিটা দেখলা না? এই বুদ্ধির দাম হাজার টেকা।

ম্যাজিসিয়ানের দার্শনিক ধরনের কথায়ও আমার মন মানল না। ফাঁকি হচ্ছে ফাঁকি। ফাঁকির পেছনে বুদ্ধি থাকুক আর না থাকুক তাতে কিছু যায় আসে না। মন খারাপ করে হােস্টেলে চলে এলাম ঠিকই কিন্তু আমার নেশা ধরে গেল। ছুটির দিন হলেই আমি খুঁজে খুঁজে মুখলেসুর রহমানকে বের করি। সে সাধারণত বসে গুলিস্তান এলাকায়। মাঝে মাঝে ফার্মগেটের কাছে। পরের বার তার কাছ থেকে শিখলাম দড়ি কাটার কৌশল। দড়ি কেটে দুখণ্ড করা হয়। নিমিষের মধ্যে সেই দড়ি জোড়া লাগিয়ে দেয়া হয়। কৌশল এত সহজ কিন্তু করা হয় অতি নিপুণ ভঙ্গিতে। দড়ি কাটার কৌশল শিখতে আমার পাঁচ টাকা চলে গেল। শিখলাম পয়সা তৈরির কৌশল। চার আনা, আট আনার মুদ্রা বাতাস থেকে তৈরি করে ঝনঝন করে টিনের কৌটায় ফেলা হয়। এই কৌশল শিখতে দশ টাকা চলে গেল। তবে এই খেলা কাউকে দেখাতে পারলাম না। এই খেলা দেখানাের জন্যে পামিং জানা দরকার। পামিং হচ্ছে হাতের তালুতে কোন বস্তু লুকিয়ে রাখার কৌশল। আমার পামিং জানা নেই।

হােস্টেলে থাকার জন্য বাসা থেকে সামান্যই টাকা পাই। সেই সামান্য টাকার বড় অংশই চলে যাচ্ছে ম্যাজিকে। আমাকে মিথ্যা করে চিঠি লিখতে হয় – “বই কিনতে হবে, টাকা দরকার। কলমটা হারিয়ে গেছে, নতুন কলম দরকার।”

দু’বছর পর আমি ঢাকা কলেজ থেকে পাস করে বেরুলাম। বন্ধুমহলে আমি তখন ম্যাজিসিয়ান হুমায়ূন বলে পরিচিত। ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ম্যাজিকের ভূত আমাকে ছাড়ল না। আমি তখন সিন্দাবাদ। ম্যাজিকের ভূত আমার ঘাড়ে বসে আছে। যতবার নামাতে যাই ততবারই সে আরাে জোরে আমার গলা চেপে ধরে।

পুরানাে ঢাকার আওলাদ হােসেন লেনে তখন একজন বৃদ্ধ ওস্তাদের সন্ধান পেয়েছি। বিহারের লােক। পামিং-এর রাজা বলা যায়। হাঁসের প্রকাণ্ড ডিম সে হাতের তালুতে লুকিয়ে ফেলে। তার এক ফুট সামনে বসে থাকা মানুষটিরও বােঝার উপায় নেই যে, সে প্রকাণ্ড একটা ডিম হাতের তালুতে লুকিয়ে রেখেছে। সে শুধু যে হাতের তালুতে ডিম লুকিয়ে রাখছে তাই না, এক হাত থেকে অন্য হাতে সেই ডিম দ্রুত চালান করে দিচ্ছে। চোখের পলকের চেয়েও তার হাতের গতি দ্রুত। তাকে আমি ডাকি ওস্তাদজী। লােকটা মহা ঠগ – আমার কাছ থেকে টাকা নেয় কিন্তু কিছু শেখায় না। বিরসমুখে বলে পামিং শেখানাের কিছু নাই - প্র্যাকটিস কর, প্র্যাকটিস।

সেই প্র্যাকটিস কিভাবে করব তাও বলে দেয় না। অনেক অনুরােধের পর আমার হাতের তালু খানিকক্ষণ টিপেটুপে বলে – তােমার হাত শক্ত। এই হাতে পামিং হবে না। বেহুদা পরিশ্রম। বরং ম্যাজিকের এক গল্প শােন।।

ওস্তাদজী এমিতে বাংলাতেই কথা বলে তবে গল্পের তােড় এসে গেলে বিহারী কথা শুরু হয়, যার এক বর্ণও আমি বুঝি না। এক সময় ওস্তাদজীর স্ত্রী এসে কড়া ধমক লাগায় এবং আমার দিকে উগ্র চোখে তাকিয়ে বলে, নিকালাে আভি নিকালাে। অত্যন্ত অপমানসূচক কথা কিন্তু আমি সেই অপমান গায়ে মাখি না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের মাঝামাঝি সময়ে এক প্রতিভা প্রদর্শনীর আয়ােজন হল। গান-নাচ-আবৃত্তি যে যা জানে। টিএসসিতে বিশাল ব্যবস্থা। আমিও উপস্থিত হলাম আমার ‘ম্যাজিক প্রতিভা’ নিয়ে।

হল ভর্তি ছাত্র-শিক্ষক। বিরাট মঞ্চ। চোখ-ধাঁধানাে আলাে। ভয়ে আমার পা কাঁপছে। মুখ দিয়ে কথা বেরুচ্ছে না। জিভ সীসার মত ভারী হয়ে গেছে। শুধু তাই না, সাইজেও মনে হয় খানিকটা বড় হয়ে গেছে। মুখ থেকে বেরিয়ে পড়তে চাচ্ছে। অনেক কষ্টে প্রথম আইটেম দেখালাম! ট্রায়াঙ্গুলার বাক্স থেকে কবুতর এবং মুরগি বের করার খেলা। এই বাক্স আমার নিজের না। অন্য এক জাদুকরের কাছ থেকে কুড়ি টাকায় ভাড়া করে এনেছি। প্রথম খেলা খুব জমে গেল। প্রচণ্ড হাততালি। আমার আড়ষ্টতা কেটে গেল। দ্বিতীয় আইটেম ‘এন্টি গ্রেভিটি বটল’! একটা বােতল মধ্যাকর্ষণ শক্তি উপেক্ষা করে শূন্যে ভাসবে। এটিও জমে গেল। আমার মনে হয় ছাত্র-ছাত্রীরা গান শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল – আমার সামান্য ম্যাজিকে যে কারণে তাদের উল্লাসের সীমা রইল ।

সেদিন ‘খেলা’ ভালই দেখিয়েছিলাম। কারণ এক সপ্তাহ না যেতেই টিভি থেকে ডাক পেলাম। তারা একটা প্রােগ্রাম করবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী নিয়ে অনুষ্ঠান, যেখানে আমার জন্যে পাঁচ মিনিট বরাদ্দ করা আছে। মিনিটে দশ টাকা হিসেবে আমি পাব পঞ্চাশ টাকা। আমার আনন্দ এবং বিস্ময়ের সীমা রইল না। ঠিক করলাম মুদ্রা তৈরির খেলা দেখাব। শূন্য থেকে মুদ্রা তৈরি করে টিনের কৌটায় ফেলা। ঝনঝন শব্দ হতে থাকবে - এক সময় কৌটা মুদ্রায় ভর্তি হয়ে যাবে।
পুরােটাই হাতের কৌশল। খুবই প্র্যাকটিস দরকার। আমি দরজা বন্ধ করে প্র্যাকটিস করি। নিরলস সাধনা যাকে বলে। এর চেয়ে অনেক কম সাধনায় ঈশ্বর ধরা দেন। মহসিন হলের প্রধান হাউস টিউটর তখন অধ্যাপক এমরান। তিনি একদিন জরুরি চিঠি পাঠিয়ে আমাকে ডেকে পাঠালেন। গম্ভীর গলায় বললেন, তােমার বিরুদ্ধে কমপ্লেইন আছে।

‘কি কমপ্লেইন স্যার?'

‘ঘর বন্ধ করে তুমি নাকি সারারাত কি-সব কর। ঝনঝন শব্দ হয়। কেউ ঘুমুতে পারে না। তুমি কি কর?”

‘স্যার, ম্যাজিক শিখি।’

ম্যাজিক শেখার জন্যে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছ ? এটা কি ম্যাজিকের স্কুল ? খবর্দার, আর যেন ঝনঝনানি না শুনি। আর একবার ঝন ঝন হলে সীট ক্যানসেল। মনে থাকে যেন।

আমি বিমর্ষমুখে রুমে ফিরে এলাম। তবে প্র্যাকটিস বন্ধ হল না। কৌটার নিচে তুলা দিয়ে প্রাকটিস চালাতে লাগলাম। যথাসময়ে টিভি অনুষ্ঠান হয়ে গেল। তখন টিভি ছিল ডিআইটি ভবনে। সব প্রগ্রাম হত লাইভ। আমার নিজের অনুষ্ঠান নিজে দেখতে পেলাম না। তাতে আমার আনন্দের কমতি হল না। স্টুডিও থেকে বের হয়ে মনে হল সবাই তাকিয়ে আছে আমার দিকে। বিস্ময়ের সঙ্গে দেখছে তরুণ জাদুকরকে।

আমার কোন নেশা দীর্ঘস্থায়ী হয় না – এটা হয়ে গেল। মানুষকে বিস্মিত করতে পারার আলাদা আনন্দ আছে। সেই আনন্দে বুদ হয়ে রইলাম। কেমিস্ট্রি পড়া চালিয়ে যাচ্ছি -- চালাতে হয় বলেই চালানাে। ডিপার্টমেন্টের স্যাররা প্রায়ই বলেন হুমায়ূন বাসায় জন্মদিনের পার্টি আছে, ম্যাজিক দেখিয়ে যাও। আমি মহা উৎসাহে রিকশায় করে বাক্স-টাক্স নিয়ে রওনা হই। একদিন ঢাকা জুট মিলে ম্যাজিক দেখিয়ে দুশ টাকা পেলাম। একশ’ চলে গেল যন্ত্রপাতির ভাড়ায়। একশ’ লাভ।

মহসিন হলে যে ঘরে আমি থাকি সেখানে খাঁচায় চারটা কবুতর এবং একটা টিয়া পুষি। ম্যাজিকে কবুতর, টিয়া এসব লাগে। আমার একটাই স্বপ্ন - “ইন্টারন্যাশনাল ব্রাদারহুড অব ম্যাজিসিয়ানস”-এর সদস্য হব। এই সদস্যপদের জন্যে আকাক্ষার কারণ হল ঢাকায় দু’জন জার্মান জাদুকর এসেছিলেন। দু’জনই “ইন্টারন্যাশনাল ব্রাদারহুড অব ম্যাজিসিয়ানস”-এর সদস্য। তাঁরা হােটেল শাহবাগে জাদু দেখিয়ে সবাইকে চমৎকৃত করেছেন। আমি নিজে হয়েছি স্তম্ভিত। তখন আর্থিকভাবে খুব অসহায় অবস্থা সত্ত্বেও দুবার তাদের শাে দেখলাম। নেশা লেগে গেল। কঠিন নেশা।

এখন বলি নেশা কি করে কাটল সেই গল্প। নেশা পুরােপুরি কেটে গেল আমার বাসর রাতে। বালিকাবধূকে মুগ্ধ করার জন্য রাত তিনটার দিকে তাকে ম্যাজিক দেখাতে শুরু করলাম। হয়ত খুব সাবধান ছিলাম না কিংবা নবপরিণীতা স্ত্রীর সামনে নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম - দড়ি কাটার খেলাটা সে ধরে ফেলল এবং খুব হাসতে লাগল। দ্বিতীয় খেলাটায়ও একই অবস্থা।

মেয়েটি তার স্বামীকে চূড়ান্ত রকমের অপদস্ত করল। সে তা বুঝতেও পারল । আমি তৃতীয় ম্যাজিক দেখাতে যাচ্ছি। সে বলল, রাখুন তাে আপনার ম্যাজিক, এইসব কি শুরু করেছেন ? রাত বাজে তিনটা।
ঐ রাতেই আমার শেষ ম্যাজিক শাে হল। আর কখনাে ম্যাজিক দেখাই নি। বা দেখাতে উৎসাহ বােধ করি নি।

বিয়ের দশ বছর পর গুলতেকিন হঠাৎ করে বলতে শুরু করল - বাসর রাতে আমি খুব বােকামি করেছি। আমার উচিত ছিল বিস্মিত হবার ভান করা। সরি, তােমাকে ঐ রাতে খুব লজ্জা দিয়েছি। বয়স কম ছিল। বুঝতে পারি নি যে তুমি এত আগ্রহ করে আমাকে বিস্মিত করার চেষ্টা করছ। এখন একবার ম্যাজিক দেখাও - দেখ, আমি কি পরিমাণ মুগ্ধ হই। ম্যাজিকের কৌশল ধরার চেষ্টা করব না – চেষ্টা করব বিস্মিত হবার।

বিয়ের পর পনেরাে বছর হয়েছে। পনেরাে বছরে কোন ম্যাজিক দেখাই নি। তার পরেও “কিম আশ্চর্যম!” হঠাৎ ইংল্যাণ্ড থেকে চিঠি এসে উপস্থিত -- আমাকে ইন্টারন্যাশনাল ব্রাদারহুড অব ম্যাজিসিয়ানস এর সদস্যপদ দেয়া হয়েছে। এই অতি আশ্চর্য ঘটনা সম্ভব হয়েছে আমার জাদুকর বন্ধু জুয়েল আইচের কারণে। এই ভালমানুষটি আমাকে বিস্মিত করবার সুন্দর ব্যবস্থাই করে রেখেছিলেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল ব্রাদারহুড অব ম্যাজিসিয়ানের চিঠিটি এসে পৌছল আমার জন্মদিনে। কাকতালীয় ব্যাপার তাে বটেই। মাঝে মাঝে কাকতালীয় ব্যাপার ঘটে বলেই আমাদের এই জীবন এবং এই পৃথিবী এত মজার।


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

শঙ্খ ঘোষের কলমে...

amarboi
বইয়ের হাট ব্লগ
শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
শঙ্খ ঘোষ

চালু হয়েছে বইয়ের হাট ব্লগ। এখন থেকে এখানে প্রকাশিত হবে বাংলা সাহিত্যের নানা অনুষঙ্গের বাছাইকৃত অংশবিশেষ। দীর্ঘ লেখা নয়, মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিটে পড়ে ফেলা যায় এমন সব লেখা নিয়ে সাজানো হবে বইয়ের হাটের ব্লগ। লেখাগুলো আশাকরি পাঠকের পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে। আপনাদের সহযোগিতায় আমরা এগিয়ে চলেছি। পাশে থাকুন, আমাদের সমৃদ্ধ করুন, নিজেকে আলোকিত করুন। ধন্যবাদ

'ছন্দের বারান্দা'র শেষ প্রুফটা দিতে গিয়েছি বিকাশবাবুর হাতে, সিগনেটের দোকানে, দেখেই হাসিমুখে বলে উঠলেন উনি: 'এই-যে ভাই, একটা কাজ করে দিতে হবে কিন্তু৷'
'কাজ! কী কাজ?'
'সতীনাথ ভাদুড়ীর সমস্ত লেখা একত্র করে ছাপব আমরা, ভাবছি৷ আমরা মানে, অরুণা প্রকাশনী থেকে৷ কয়েক খণ্ড হবে হয়তো৷ সেটার ভার নিতে হবে ভাই আপনাকে৷'
'ভার মানে!'
'সম্পাদনা করা৷ সম্পাদনা করে দিতে হবে আপনাকে৷'
'আমাকে? সে কী? হঠাৎ আমি? না না, এ আমি পারব না৷'
'না বললে শুনছি না৷ এ আমরা ঠিক করে ফেলেছি৷'
'বাঃ, আপনারা ঠিক করে ফেলেছেন বলেই আমাকে করতে হবে? এ-বিষয়ে আমার কোনো অধিকারই নেই৷'
'তা বললে শুনছি না৷ করতেই হবে৷ সঙ্গে নির্মাল্যও থাকবে৷ নির্মাল্যকেও বলেছি৷ ও বলেছে আপনি থাকলে ও থাকবে, নইলে নয়৷'
'নির্মাল্যকেই বলুন৷ আমি পারব না৷'
'আরে ভয় নেই৷ আমরা টাকাপয়সা কিছু দেব না৷'
এবারে একটু থমকে যাই৷ লিখে বা সম্পাদনা করে টাকাপয়সা যে বিশেষ কিছু পাওয়া যায় না, সে-রকম অভিজ্ঞতা ততদিনে ঘটে গেছে৷ কিন্তু টাকাপয়সা দেব না বলা যে একটা অভয়বাণীও হতে পারে, এতটা ধারণা ছিল না৷ এই অভয়বাণীর পর অবশ্য 'না' বলাও মুশকিল, কেননা তাহলে মানে দাঁড়াবে যে অর্থপ্রাপ্তি নেই বলেই করছি না কাজটা৷
সত্যি বলতে কী, এই বিকাশ বাগচী নামের মানুষটি এতই সজ্জন, এতই নিরীহ, এতই বন্ধুবৎসল যে তাঁকে প্রতিহত করা খুব শক্ত৷ যে-কাজ কোনোদিন করব বলে ভাবিনি কখনো, তেমনই একটা কাজের দায়িত্ব নিতে হলো তাই৷ হাত দিতে হলো সম্পাদনায়৷
তাহলে তো প্রথমেই সতীনাথের দাদার কাছে যাওয়া দরকার? তাঁরই কাছে তো অনুমতি নিতে হবে প্রথমে? বছর সাতেক আগে সতীনাথের মৃত্যু হয়েছে বলেই নয়, তারও আগে থেকে ওঁর লেখাপত্রের জন্য প্রকাশকদের যোগ রাখতে হতো দাদা ভূতনাথের সঙ্গেই৷ সামনের পথ দিয়ে চলে যাচ্ছেন দেখে সতীনাথকে একদিন দোকানে ধরে এনেছিলেন শচীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়৷ বলেছিলেন: 'একটু বসুন, আপনার কিছু টাকা পাওনা আছে৷' সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান সতীনাথ, বলেন: 'সেসব কথা দাদার সঙ্গে বলবেন', আর বলেই ত্বরিত পায়ে চলে যান দোকান ছেড়ে৷
'হ্যাঁ, সে তো ঠিকই৷ অনুমতির জন্য ভূতনাথবাবুর কাছে তো যেতেই হবে একবার৷ আপনিও যাবেন তো?'
'না গেলে আর চলবে কেন? আমাকে তো যেতে হবে নিশ্চয় অনেকবার৷ জানতে তো হবে কিছু৷'
সকালবেলায় একদিন তাই হাজির হই ওঁদের বাঙুর অ্যাভিনিউর বাড়িতে৷ প্রস্তাব শুনে খুশি হন ওঁরা৷ সতীনাথের বৌদি এসে তাঁর প্রয়াত দেবর বিষয়ে যে-ভাষায় যে-গলায় কথা বলতে থাকেন স্নেহমমতায় মাখানো, তাতে তাঁকে প্রায় শরৎচন্দ্রের হাতে তৈরি চরিত্র বলে মনে হতে থাকে৷ চিরকুমার সতীনাথ কীভাবে তাঁর একক জীবন কাটাতেন তার একটা ছবি জেগে উঠতে থাকে ওই দম্পতির গল্পগুজব থেকে, মনে মনে উপকৃত হতে থাকি আমি৷
ঘরে রাখা ছিল ছোটো দুটো বইয়ের আলমারি, কাচের পাল্লা দেওয়া, প্রায় গায়ে গায়ে লাগানো৷ কিন্তু দুটোই ফাঁকা৷ একটি-দুটি যে বই পড়ে আছে, তার দিকে নজর করে দেখছি যখন, ভূতনাথ বলেন: 'ওর তো বেশির ভাগই ছিল ফরাসি বই, সেসব দিয়ে দেওয়া হয়েছে চন্দননগরের লাইব্রেরিতে৷ এখানে তো কিছুই আর নেই৷'
আলতোভাবে জিজ্ঞেস করি একবার: 'আচ্ছা, উনি কি কখনো ডায়েরি লিখতেন?'
'না, ডায়েরি লেখার কোনো অভ্যাস ওর ছিল না৷'
বৌদি আপ্যায়ন করছেন আমাকে, বিকাশবাবু বৈষয়িক কথা সাঙ্গ করছেন ভূতনাথ ভাদুড়ীর সঙ্গে৷ ভূতনাথবাবু বলছেন: 'সতীনাথের বই কিন্তু বেশি বিক্রি হয় না৷'
অকুতোভয় বিকাশবাবু বলেন: 'দাদা, সে-ভাবনা আমার৷'
'না, সেইজন্য আমার শর্তের কথাটা আগে জেনে নিন৷ আমি কিন্তু বিক্রির উপর রয়্যালটির হিসেবে টাকা নেব না৷ আপনার কী বিক্রি হলো না হলো সে আমি জানতেও চাইব না৷ আমাকে দিতে হবে থোক টাকা, অগ্রিম, বাৎসরিক হিসেবে৷'
সে যে কত টাকা, তাও জানিয়ে দেন তিনি৷ আমার চমক লাগে শুনে যে মুহূর্তমধ্যে বিকাশবাবু মেনে নেন সেটা৷ তাঁর ক্ষীণ সামর্থ্য সত্ত্বেও কিছুমাত্র ইতস্তত করেন না তিনি৷
উঠে আসবার অল্প আগে শূন্যপ্রায় আলমারির নীচের তাকে দাঁড় করানো একইরকম কয়েকখানা বই দেখে, ভূতনাথবাবুকে জিজ্ঞেস করি: 'ওগুলো কী বই?'
'বই নয়, ওগুলি কয়েকটা ডায়েরি৷'
'কার?'
'সতীনাথেরই৷ সুর-ডায়েরি থেকে বছর বছর পাঠাত ওকে৷'
'তবে যে বললেন, উনি ডায়েরি লিখতেন না?'
'না না, ডায়েরি লেখা বলতে যা বোঝায়, ওগুলি তেমন কিছু নয়৷ একলা থাকত তো৷ তাই ওই বাজারের হিসেব, ধোপার হিসেব— এইসব টুকিটাকি আছে ওখানে৷'
'একটু কি আমি দেখতে পারি?'
'দেখবেন? হ্যাঁ, দেখুন৷' বলে আলমারি খুলে দিলেন উনি৷ নিজেই বার করে দিলেন এক এক করে ন খানা ডায়েরি৷ দু-চার পাতা উলটে দেখছি যখন, উনি বলছেন: 'আমি আর নাড়াচাড়া করিনি৷'
'দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে বাজারহিসেবের চেয়ে একটু হয়তো বেশিই আছে এখানে৷ আচ্ছা, এগুলো কি আমি কয়েকদিনের জন্য নিয়ে যেতে পারি? আমাদের কাজে হয়তো কিছু সাহায্যও হতে পারে৷'
'নিশ্চয় নিতে পারেন৷ দাঁড়ান, আমি একটু বেঁধে দেওয়ার ব্যবস্থা করি৷ সাবধানে রাখবেন কিন্তু৷'
'সে তো অবশ্যই৷'
বাঁধানোর আয়োজন করছেন উনি, লোভাতুর চোখে আমি তাকিয়ে আছি ওই আলমারি দুটিরই দিকে৷ হঠাৎ মনে হলো দুই আলমারির মধ্যবর্তী শীর্ণ ফাঁকটায় কিছু যেন গুঁজে রাখা আছে৷ ভূতনাথবাবুকে সেটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করি: 'ওটা কী বলুন তো?'
'ও একটা পুরোনো ব্যাগ৷ সতীনাথই ব্যবহার করত৷ এখন আর কাজে লাগে না৷ পড়ে আছে৷'
সসংকোচে বলি: 'দেখব একটু?'
'ওটা? ওটার কী দেখবেন?'
'কিছুই না৷ তবু একটু দেখতে পেতাম যদি৷'
'বেশ, দেখুন৷'
নিচু হয়ে টেনে বার করি একটা ছেঁড়া ক্যাম্বিসের ব্যাগ৷ হাঁ হাঁ করে ওঠেন ভূতনাথবাবু: 'আরে আরে করেন কী৷ ধুলোবালিতে ভর্তি, হাত দেওয়া হয়নি কতকাল, দাঁড়ান একটু ঝেড়েঝুড়ে দিক আগে৷'
কিন্তু পরিচ্ছন্নতার অপেক্ষায় না থেকে আমি খুলে ফেলি সে-ব্যাগের মুখ, আর দেখি অনেক টুকরো টুকরো ছেঁড়া কাগজ জমে আছে তার মধ্যে৷
'যদি আপনার কোনো আপত্তি না থাকে, এটাও তবে নেব৷'
'এটা? কতগুলো ছেঁড়া কাগজের টুকরো দিয়ে কী করবেন!'
'ছেঁড়া, তা সত্যি৷ ব্যাগটাও তো ছেঁড়া৷ তবু৷ এখানে বসে তো ঠিকমতো দেখা হলো না৷ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ভালো করে একটু দেখতে চাই৷ সময়মতো ফেরত দিয়ে দেব আবার৷'
'না না, ওটা ফেরত নিয়ে কী করব৷ নিয়ে যান আপনি, শখ যদি হয়৷ কিন্তু তার আগে, ওরে, একটু সাফ করে দিয়ে যা তো এগুলো, ওঁরা নিয়ে যাবেন বলছেন—'

দুই হাতে দুই বান্ডিল নিয়ে বেরিয়ে আসি আমরা৷ পথে নেমেই এক পানের দোকানের সামনে প্রায় নাচের ভঙ্গিতে বিকাশবাবু বলেন: 'আঃ, কী যে আনন্দ হচ্ছে আজ৷ কী বিরাট একটা কাজ হলো৷ দাঁড়ান, আগে একটু পান খেয়ে নিই৷'
'এত আনন্দ হচ্ছে আপনার? আমার তো ভয় হচ্ছে শুধু আপনার কথা ভেবে৷'
'কেন?'
'ও-রকম একটা শর্তে রাজি হয়ে গেলেন? বই যে বিক্রি হবে না, সত্যি সত্যি সেটা জানেন তো? তখন কী হবে?'
সুপ্রসন্ন মুখে বিকাশবাবু বলেন: 'তা না হোক৷ একটা ভালো কাজ তো হবে ভাই৷ কী বলেন, কাজটা ভালো হবে না?'

বাড়িতে ফিরেই ডায়েরিগুলি খুলে বসি৷ হ্যাঁ, বাজারহিসেব, ধোপার হিসেব আছে ঠিকই অল্পস্বল্প, কিন্তু পাতায় পাতায় তারও চেয়ে অনেক বেশি যা আছে তা হলো ওঁর লেখার ভিতকল্পনা৷ তার উৎস, তার পূর্বাভাস, তার সম্ভাব্য বুনুনি, এর সব কিছুই ধরা আছে এর পাতায় পাতায়, আর সেইসঙ্গে আছে অন্তর্লীন নানা সময়ে লেখা প্রগাঢ় কোনো অনুভবের কথা, আছে বইপড়া থেকে পাওয়া কোনো ভাবনার সারাৎসার বা মূল উদ্ধৃতি, আছে পড়াশোনার অনেক অতীত বা ভাবী ইশারা৷ কী আশ্চর্য, কেন তবে ভূতনাথ ভাদুড়ী বলেছিলেন যে ডায়েরি লেখার কোনো অভ্যাসই ছিল না সতীনাথের?
আর সেই ময়লা ছেঁড়া ব্যাগ? সে হয়ে উঠল এক রত্নভাণ্ডার৷ অনেকটা সেখানে ছিঁড়ে ফেলা চিঠিপত্র, আস্তও যে দু-একটি ছিল না তা নয়৷ ব্যক্তিগত নয়, সবই লেখকগত চিঠি৷ কোনোটায় সম্পাদকের তাড়া, কোনোটায় প্রকাশকের হিসেব, কোনোটায় সভাসমিতিতে আহ্বান, কোনোটায়-বা এই খবর যে 'গণনায়ক' বইটির জন্য প্রথম নাম ভাবছিলেন তিনি 'ওয়ার কোয়ালিটি', আর শেষ পর্যন্ত সেটা পালটে নেন মনোজ বসুর পরামর্শে৷ এসব কাগজপত্র থেকেই ধরা গেল যে 'জাগরী'র প্রকাশকাল পূর্বপ্রচারমতো ১৯৪৬ নয়, ১৯৪৫ সালের চৌঠা অক্টোবর, আর তা ছাপা হয়েছিল ৬৫০ কপি! এসব কাগজপত্রের সূত্র ধরেই সুব্রত রুদ্রকে সঙ্গে নিয়ে একদিন হানা দিতে হলো কৃষ্ণনগরের 'হোমশিখা' দপ্তরে, জানা গেল যে 'সতীনাথ-বিচিত্রা'য় 'গোপাল জাগো জাগো' নামের কবিতাটির লেখকপ্রদত্ত নাম ছিল 'দিবাস্বপ্ন'৷
বলা যায়, ওই ডায়েরি আর ছেঁড়া ক্যাম্বিসের ব্যাগটাই খবর জুগিয়ে জুগিয়ে আমাদের উৎসাহ বাড়িয়ে দিল অনেকখানি, বছর দুয়েক বেশ তৃপ্তিভরেই করা গেল বিকাশবাবুর কাজটা৷
একটাই শুধু সমস্যা হলো৷ সুমুদ্রিত সুশোভন চার খণ্ডে 'সতীনাথ গ্রন্থাবলী'র প্রথমটি যখন বেরোল, কলেজ স্ট্রিটের দোকানে দোকানে যখন তা গছিয়ে দিতে চাইছেন বিকাশবাবু, কোনো কোনো শুভার্থী দোকানি তখন বলেছিলেন তাঁকে: 'ধুর মশাই, এ আপনি কী করলেন? এঁরও গ্রন্থাবলী? না-হয় ইনি গাইতে পারেন ভালো, তাই বলে এঁর বইও ছাপবেন? ছিঃ! কিনবে কে?'
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

রসিকতা

amarboi
বইয়ের হাট ব্লগ
শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি

রসিকতা

চালু হয়েছে বইয়ের হাট ব্লগ। এখন থেকে এখানে প্রকাশিত হবে বাংলা সাহিত্যের নানা অনুষঙ্গের বাছাইকৃত অংশবিশেষ। দীর্ঘ লেখা নয়, মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিটে পড়ে ফেলা যায় এমন সব লেখা নিয়ে সাজানো হবে বইয়ের হাটের ব্লগ। লেখাগুলো আশাকরি পাঠকের পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে। আপনাদের সহযোগিতায় আমরা এগিয়ে চলেছি। পাশে থাকুন, আমাদের সমৃদ্ধ করুন, নিজেকে আলোকিত করুন। ধন্যবাদ।

পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিদ্যালয়ের এক পণ্ডিত একবার কতগুলি নিম্নমানের নীতিকথা জাতীয় কবিতা রচনা করে বিদ্যাসাগরকে দেখান। কবিতাগুলি পড়ে বিদ্যাসাগর বিরক্ত হন। কেমন লাগল কবিতাগুলি ? সেই পণ্ডিতের প্রশ্ন শুনে কবিতাগুলির শেষে রসিকতা করে বিদ্যাসাগর লিখে দিলেন,
“জেনে রেখে এ জগতে সকলেই গরু
যে যারে ঠেকাতে পারে সেই তার গুরু।”
এই দু লাইন পড়ে সেই পণ্ডিত বুঝে গেলেন কবিতাগুলি সম্পর্কে-বিদ্যাসাগরের মনোভাব।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন অত্যন্ত ভোজন রসিক। খেতে এবং খাওয়াতে তিনি
সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন। সংস্থার সভ্য ছিল তা প্ৰায় জনাদশেক। কী কাজ ছিল এই সংস্থার ? ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে হঠাৎ দল বেঁধে গিয়ে এই সংস্থার সভ্যরা খেতে চাইতেন। এদের এই সংস্থার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল ঘনিষ্ঠ মহলে। তাই প্রত্যেকেই সদা প্ৰস্তুত থাকতেন — এই বুঝি এল ভোজনসভার সভ্যরা!
একবার ঘটল এক কান্ড। কী কান্ড ? ভোজনসভার সভ্যরা দল বেঁধে এক বন্ধুর বাড়িতে বেশ ঘটা করে খাওয়া দাওয়া করলেন। খাওয়া-দাওয়ার পরের দিন সংস্থার এক সভ্যোর অসুখ হল। পেটের অসুখ। বেশ কয়েকদিন তার দেখা নেই। কিছুদিন পর সুস্থ হয়ে সভ্যটি এলেন ভোজনসভার বন্ধুদের কাছে। বন্ধুরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাসা করতে লাগলেন। তার উদ্দেশ্যে সবাই বললেন, এ বড়ো পেট-রোগা! ভোজনসভার সভ্য হওয়ার উপযুক্ত নয়। একে সংস্থা থেকে বাদ দেওয়া উচিত।
এতক্ষণ চুপ ছিলেন বিদ্যাসাগরমশাই। এবার তিনি মুখ খুললেন। হাসতে হাসতে বললেন, “না হে না, তোমরা ঠিক বলছো না, ওই তো আমাদের মধ্যে একমাত্র সভ্য যে আদর্শের জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে উদ্যত । ওকে ভোজনসভা থেকে কোনো মতেই বাদ দেওয়া যায় না।’
বিদ্যাসাগরের রসিকতা শুনে সবাই হাে-হাে করে হেসে উঠলেন।

সে সময় শান্তিনিকেতনের গ্রন্থাগারের দায়িত্বে ছিলেন রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখােপাধ্যায়। তিনি রাতে বাড়িতে গিয়ে পড়ার জন্য প্রতিদিন গ্রন্থাগার থেকে অনেকগুলাে বই বােঝাই করে নিয়ে ফিরতেন।
এমনই এক সন্ধ্যায় তিনি বেশকয়েকটা পছন্দের বই সঙ্গে নিয়ে গ্রন্থাগার থেকে বাড়ি ফিরছেন। এমন সময় রবীন্দ্রনাথ তাকে দেখতে পেয়ে ডাকলেন, 'ওহে বৈবাহিক, শুনে যাও দেখি একবার।
রবীন্দ্রনাথের মুখে এই কথা শুনে অবাক প্রভাতকুমার! কেন গুরুদেব এমন বললেন!-- এ কথা ভাবতে ভাবতে রবীন্দ্রনাথের সামনে এসে তিনি বললেন, ' গুরুদেব, আপনি আমাকে কেন বৈবাহিক বলছেন?’
রসিক রবীন্দ্রনাথ হেসে বললেন, “আরে, তুমি সেই বৈবাহিক নয়, তুমি বই বয়ে নিয়ে যাচ্ছে বলে আমি তােমাকে বই-বাহিক বলে ডাকছি। বুঝলে?”
এ কথা শুনে হেসে ফেললেন প্রভাতকুমার।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

পোশাক-সচেতন রবীন্দ্রনাথ - সেলিনা হোসেন

amarboi
পোশাক-সচেতন রবীন্দ্রনাথ
সেলিনা হোসেন

বইয়ের হাট ব্লগ
শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
চালু হয়েছে বইয়ের হাট ব্লগ। এখন থেকে এখানে প্রকাশিত হবে বাংলা সাহিত্যের নানা অনুষঙ্গের বাছাইকৃত অংশবিশেষ। দীর্ঘ লেখা নয়, মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিটে পড়ে ফেলা যায় এমন সব লেখা নিয়ে সাজানো হবে বইয়ের হাটের ব্লগ। লেখাগুলো আশাকরি পাঠকের পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে। আপনাদের সহযোগিতায় আমরা এগিয়ে চলেছি। পাশে থাকুন, আমাদের সমৃদ্ধ করুন, নিজেকে আলোকিত করুন। ধন্যবাদ।

রবীন্দ্রনাথের পোশাকে নিজস্ব ঢঙের দারুণ ফ্যাশন ছিল। এই ফ্যাশন তাঁর নিজের তৈরি। অবিশ্বাস্য সত্য এই যে তিনি একাই এই পোশাক ব্যবহার করেছেন। তাঁর সময়ে অন্য কোনো লেখক বা অন্য কোনো জমিদারের ছবিতে এই পোশাক দেখা যায় না।
এখানেই রবীন্দ্রনাথের বিশেষত্ব।

ফ্যাশনকে তিনি নিজস্ব মননশৈলীতে দেখেছেন। এই দেখা ছিল মানুষের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে একটি অসাধারণ বিবেচনা।

‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের এক জায়গায় কবি বলেছেন, ‘ফ্যাশন হলো মুখোশ, স্টাইলটা হলো মুখশ্রী।’

মুখোশ বলতে যদি গাত্রাবরণ বুঝিয়ে থাকেন, তবে স্টাইলের শ্রীতে তাঁর জোব্বা ঢংয়ের গাত্রাবরণ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। যৌবনে স্যুট পরেছেন। পরিণত বয়সে স্যুটপরা ছবি আর দেখা যায় না। তিনি নিজের ফ্যাশনকেই শ্রেয় মনে করেছেন।

এই পোশাক তাঁর শারীরিক সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে এক অসাধারণ মাত্রা। শিলাইদহ, পতিসর, শাহজাদপুরের প্রজারা এখন থেকে একশো বছর আগে তাঁকে মহামানব হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁরা তেমন অনুভবের কথা প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘদেহী সুঠাম মানুষটি জোব্বা পরে তাঁর বাবরি চুল এবং দাড়িসহ যখন মাঠের মাঝখানে দাঁড়াতেন বা হাঁটতেন তখন অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতেন প্রজারা।

যেন আকাশের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আছেন কোনো দেবদূত।

এখানে ফ্যাশন এবং স্টাইল যুক্ত হয়ে যেত।

‘বাল্মীকির প্রতিভা’ তাঁর প্রথম মঞ্চস্থ গীতি নাটক। তিনি নিজে বাল্মীকির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। তাঁর পোশাক, গলার মালা থেকে পায়ের জুতো পর্যন্ত বলে দেয় নাটকের পোশাক নিয়েও তিনি কতটা ভাবতেন। প্রতিটি নাটকের পোশাক নিয়ে তাঁর ভাবনার শেষ ছিল না।

বাংলার কবি নবীনচন্দ্র সেন রবীন্দ্রনাথের শারীরিক সৌন্দর্য বর্ণনায় লিখেছেন. ‘...মুখাবয়ব দেখিলে চিত্রিত খ্রিস্টের মুখ মনে পড়ে।’ আশি বছর বয়সের রবীন্দ্রনাথকে দেখে কবি বুদ্ধদেব বসু তাঁর রূপে মুগ্ধ হয়েছিলেন। লিখেছিলেন, অমন রূপবান হতে বুঝি অত বছর সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

ব্রাসেলসে রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতা শুনতে গিয়েছিলেন Gaston Denys Perier নামের এক ফরাসি লেখক। তিনি লেখেন, ‘A face like that of Christ, bronzed, Serene and superb, came into view।’ বার্লিনে রবীন্দ্রনাথকে দেখে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত লেখেন, ‘he was more impressive in appearance than most of the conceptions of Christ।’

দেশে এবং বিদেশে কবি তাঁর অসাধারণ সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন ফ্যাশন সচেতনতাকে। তাঁর পা-পর্যন্ত নামানো আলখাল্লার ডিজাইন সব সময় এক রকম নয়। ছবিতে দেখা যায় নানা রকম এবং একই সঙ্গে কাপড়ের মানও আশ্চর্য সুন্দর।

রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ছবির বই ‘Rabindranath Tagore : A Journey Through The Lenses’-এর প্রতি পৃষ্ঠা প্রমাণ করে কবি কতটা পোশাকের ডিজাইন সচেতন ছিলেন।

১৮-০৪-২০১১
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

আসলে, মায়ের কখনও মৃত্যু হয় না - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

আসলে, মায়ের কখনও মৃত্যু হয় না - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
আসলে, মায়ের কখনও মৃত্যু হয় না

পৃথিবীটা নাকি এখন একটা গ্রাম হয়ে গেছে। গ্লোবাল ভিলেজ কথাটা প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায়। পৃথিবীর এই নতুন আখ্যার তাৎপর্য ঠিক কী? গ্রাম বলতে সাধারণত যা বােঝায় তা নিশ্চয়ই নয়। একটি গ্রামের মানুষের ভাষা, ধর্ম, আহার্য, পােশাক, সামাজিক রীতিনীতি প্রায় একই হয়। কিছুটা বৈচিত্র্য থাকলেও তফাত বিশেষ থাকে না। তবে কি সারা বিশ্বে সমগ্র মানবসমাজের মধ্যে সমতা স্থাপনের সেই স্বর্ণযুগ এসে গেল ? এরকম অবস্থা কল্পনা করতে আনন্দের শিহরণ হয় বটে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের বাস্তব অবস্থা দেখে তা এক বিন্দুও বিশ্বাস করা যায় না। দেশগুলির সীমারেখা ক্রমশ ভাঙছে, যুদ্ধ লেগেই আছে কোথাও না কোথাও, শােষক ও শােষিতদের ব্যবধান প্রকট, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িক বিরােধ বেড়েই চলেছে। উগ্র, হিংস্র, সন্ত্রাসবাদের আক্রমণে কাঁপছে মানবসভ্যতা। 


বিগ ব্যাং তত্ত্ব অনুযায়ী ছােট্ট একটা বিন্দুর বিস্ফোরণের পর সৃষ্টি হয় এই মহাকাশের, অজস্র গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্রপুঞ্জ নিয়ে এই যে বিশাল ব্যাপ্তি, তা এখনও বিস্ফারিত হচ্ছে, আরও বেড়েই চলেছে সীমানা। মানবসভ্যতারও তুলনা করা যায় এর সঙ্গে। আফ্রিকার কোনও অঞ্চলে মানবজাতির যাত্রা শুরু, তারপর ছােট্ট একটা মানবগােষ্ঠী ছড়িয়ে পড়তে থাকে নানা দিকে, একদল যায় মধ্য এশিয়ায়, সেখান থেকে পারস্য, ভারত, চিন হয়ে পৌঁছে যায় অস্ট্রেলিয়ায়। অন্য ধারাটি ইউরােপের নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ার পর বেরিং সাগর পেরিয়ে ঢুকে পড়ে আমেরিকা ও ক্যানাডায়। তারপর মাত্র কয়েক লক্ষ বছরে এই মানবজাতিরই চেহারায় পােশাক ও আচার আচরণে কত পরিবর্তন হয়। এখন মহাকাশের গ্রহ নক্ষত্রের মতনই মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর বিশাল সংখ্যা প্রায় কাছাকাছি বলা যেতে পারে।


মানবগােষ্ঠীর সঙ্গে পার্থিব অন্যান্য প্রাণীর একটা প্রধান তফাত এই যে, মানুষের যৌনজীবন যেমন অন্যরকম, তেমনই মানুষেরই একটা সুসংবদ্ধ ভাষা আছে। ভাষার জন্যই মনুষ্যজাতি একতা সূত্রে আবদ্ধ, আবার ভাষার জন্যই মানুষে মানুষে এত বিভেদ। আফ্রিকার সেই ক্ষুদ্র মানবগােষ্ঠীর যােগাযােগের একটিই ভাষা ছিল এমন যদি ধরে নেওয়া যায়, তাহলে সেই হােমাে সেপিয়ান্সদের মধ্যে এখন অন্তত আট হাজারেরও বেশি ভাষা প্রচলিত। একজন হাঙ্গেরিয়ান, একজন তামিল এবং একজন অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী। এই তিনজনই এই পৃথিবী নামের গ্রহের মানুষ, কিন্তু এদের ভাষার বিন্দু বিসর্গ মিল নেই, মুখােমুখি দেখা হলে এরা বােবা। হয়ে থাকবে। 

বর্তমানে যদি নানান সীমানা ও কাটা তারে ঘেরা বহু বিভক্ত দেশের মানুষ একটি গ্লোবাল ভিলেজের ধারণায় ফিরে আসে, তা হলে তাদের আদিম ধর্ম ও ভাষা কী হবে, আপাতত আমরা ধর্মের প্রশ্নে যাচ্ছি না, ভাষাই আমাদের প্রধান বিবেচ্য। এবং বলাই বাহুল্য, সেই ভাষা হবে ইংরিজি। 


ইংরিজি ভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং উন্নত হলেও প্রায় সমান সমান অন্য দু-তিনটি ইউরােপীয় ভাষার চেয়ে অগ্রাধিকার পেয়ে গেছে ঐতিহাসিক কারণে। কলােনি স্থাপনের যুগে ইংরেজরা অন্যান্য ইউরােপিয়ানদের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে ছিল। প্রায় অর্ধেকেরও বেশি পৃথিবী তারা দখল করে রেখেছিল। ইংরেজরা গর্ব করে বলত, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে কোথাও সূর্যাস্ত হয় না! তারপর ঔপনিবেশিক যুগের অবসান হলেও ইংরেজের পরিত্যক্ত কলােনিগুলি কিন্তু ইংরিজি ভাষা পরিত্যাগ করেনি। গােটা অস্ট্রেলিয়া এবং উত্তর আমেরিকার অনেকখানিই ইংরিজি ভাষাকেই অবলম্বন করে থেকেছে। এমনকী ভারতবর্ষেও ইংরিজি অন্যতম জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। এবং ইংরিজি ভাষার পতাকাও ব্রিটেনের হাত থেকে আমেরিকায় হাতে চলে যায়, সে দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অসাধারণ উন্নতির কারণে। কমপিউটার ও ইনফরমেশন টেকনােলজির ব্যাপক প্রভাবের ফলে ইংরিজি ভাষা আজ সব ভাষার মাথায় চড়ে বসেছে। এক সময় ফরাসি আর স্প্যানিশ ভাষার সঙ্গে ইংরিজির বেশ রেশারেশি ছিল, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরেও ফরাসিরা নিজেদের ভাষার প্রতি অহংকারবশত একটা ইংরিজি বাক্যও উচ্চারণ করত না। এখন শুধু ইংরিজি জ্ঞান নিয়েই ইউরােপের সব দেশেই যে-কেউ মােটামুটি কাজ চালিয়ে নিতে পারে। 


ইংরিজি সবচেয়ে বেশি প্রয়ােজনের ভাষা হিসেবে অবশ্যই স্বীকৃত। তা হলে অন্যান্য ভাষাগুলির কী হবে? কেউ কেউ বলছেন, অন্য ভাষাগুলির আস্তে আস্তে অবলুপ্তি ছাড়া অন্য কোনও গতি নেই। আগামী একশাে বছরের মধ্যে। সেরকমই ঘটবে। এই ভবিষ্যৎবাণীর দুটি দিক আছে। অন্য ভাষাগুলির কি সহজ, স্বাভাবিকভাবে ধীরে ধীরে মৃত্যু হবে, জোর করে গলা মুচড়ে মেরে ফেলা হবে? দ্বিতীয়টি নিশ্চিত সম্ভব নয়। বড় মাছ ছােট মাছকে গিলে ফেলার উপমাও এখানে খাটবে না। কারণ, ইংরিজি যতই বড় মাছ হােক, অন্য বেশ কয়েকটি ভাষা মােটেই ছােট মাছের পর্যায়ে পড়ে না, তারাও এমনই বৃহৎ যে তাদের একটি একটি করে গিলে ফেলার ক্ষমতা ইংরিজিরও নেই। চিন ও ভারতীয় ভাষাগুলি পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ মানুষের মাতৃভাষা। স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, রাশিয়ান, জাপানি ভাষার ভিত অনেক শক্ত; ফরাসি ও জার্মান ভাষাভাষীর সংখ্যা খুব বেশি না হলেও ঐতিহ্যের ঐশ্বর্যে এই দুই ভাষার প্রভাব সুবিস্তৃত। এর মধ্যে যে-কোনও একটি ভাষার ওপর উদ্দেশ্যমূলক ভাবে আঘাত হানতে গেলে যে প্রবল বিক্ষোভের সম্মুখীন হতে হবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ভাষার আবেগে কোথাও কোথাও মানুষ প্রাণ দিতেও কুণ্ঠিত হয় না। তার একটি উদাহরণ, ভারত বিভাগের ফলে পাকিস্তান নামে নবীন রাষ্ট্রের জন্ম হওয়ার মাত্র সাত বছরের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বাংলাভাষায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে, পুলিশের গুলিতে ঢাকা শহরে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি চারজন শহীদ হয়। শুধু ভাষার দাবিতে এমন প্রাণদানের নজির সারা পৃথিবীতেই বিরল। পরবর্তীকালে পাকিস্তান আবার দ্বিখণ্ডিত হলে যে বাংলাদেশ নামে রাষ্ট্রের জন্ম হয়, তার অন্যতম কারণও সেখানকার গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবি। এর ফলেই পরবর্তীকালে এই একুশে ফেব্রুয়ারি দিবসটিকে UNESCO থেকে পৃথিবীর প্রতিটি দেশেরই মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘােষণা করা হয়েছে। ভারতে আসামের কাছাড় অঞ্চলে প্রায় নব্বই শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা, কিন্তু রাজ্য সরকার সেই ভাষার কোনও অধিকারই দেয়নি বলে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ মিছিল শুরু হয় শিলচর শহরে। সেখানও মিছিলের ওপর দায়িত্বজ্ঞানহীন পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়, মৃত্যু হয় এগারােজন মানুষের। ১ মে, ১৯৬১ সালে। এই চরম শােকাবহ ও লজ্জাজনক ঘটনা বেশি প্রচারিত হয়নি, বরং চাপা দেওয়ারই চেষ্টা হয়েছে। 


ভারত ও চিন এই দুটি পাশাপাশি দেশ দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ বলে সারা পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কিন্তু ভাষার প্রশ্নে এই দুটি দেশের দুরকম সমস্যা। চিনে শতকরা পঁচানব্বই ভাগ লােকের ভাষা ম্যান্ডারিজ, সুতরাং অধিবাসীদের মধ্যে ভাষার ব্যবধান নেই বললেই চলে, কিন্তু ইংরিজি শিক্ষায় সে দেশ এখনও অনেক পিছিয়ে। আবার ভারতে ইংরিজি শিক্ষার অনেক অগ্রগতি হলেও বিভিন্ন রাজ্যের মানুষের মধ্যে মাতৃভাষার ব্যবধান দুস্তর। ভারতে প্রচলিত আছে প্রায় ৮০০টি ভাষা, তার মধ্যে প্রধান ভাষাগুলির মধ্যে ২২টি ভারত সরকার কর্তৃক স্বীকৃত (সাহিত্য আকাদেমি আরও দুটি ভাষাকে গ্রহণ করেছে)। এর মধ্যে হিন্দি, বাংলা, তামিলের মতন এগারােটি ভাষারই পৃথক জনসংখ্যা এক এক কোটির বেশি। হিন্দি এবং বাংলা পৃথিবীর প্রধান পাঁচটি ভাষায় অন্তর্গত। স্বাধীনতার পর কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল যে, ইংরিজি এবং হিন্দিই হবে সারা দেশের যােগাযােগের ভাষা, এবং আশা করা হয়েছিল যে তিরিশ বছরের মধ্যে ইংরিজিকেও সরিয়ে দিয়ে হিন্দিই হবে প্রধান ভারতীয় ভাষা। সেই আশা বাস্তবায়িত হলে খুব ভালােই হত। যেমন এক কালের বহু ভাষায় বিভক্ত চিনকে এক সম্রাটের আদেশে ম্যান্ডারিজ ভাষা সারা দেশকে একতাবদ্ধ করেছে, সেইরকম গণতান্ত্রিক ভারতে হিন্দি সর্বজনগ্রাহ্য হলে অনেক সমস্যা এড়ানাে যেত। কিন্তু দুঃখের বিষয় স্বাধীনতার পর ষাট বছর কেটে গেলেও সেই আশা সার্থক হয়নি। বিশ্বের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের ভারতেও ইংরিজিই এখন প্রধান ভাষা। এটা ইংরিজি ভাষার প্রতি মুগ্ধতা বা ভালােবাসার জন্য ঘটেনি। ইংরিজির প্রতি আনুগত্য এসেছে নিতান্তই প্রয়ােজনের খাতিরে। এবং এখন আর কিংস ইংলিশের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য অনেকেই তােয়াক্কা করে না। আমেরিকান ও অস্ট্রেলিয়ান ইংলিশের মধ্যে ইন্ডিয়ান ইংলিশ দিব্যি চালু হয়ে গেছে। 


ইংরিজির এই প্রাধান্য আমরা বাধ্য হয়েই মেনে নিয়েছি। কিন্তু অন্য ভাষাগুলির কী হবে? ইংরিজিকেই একমাত্র ভাষা হিসেবে অবলম্বন করে কি অন্য ভাষাগুলি পরিত্যক্ত হয়ে যাবে? এখন নানান কারণে বহু মানুষই ভ্রাম্যমান, বেশ কিছু ভারতীয়ও পৃথিবীর অন্যান্য দেশে বসতি নিয়েছে, তাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম মাতৃভাষা শিক্ষার কোনও সুযােগই পায় না। তারা শুধু ইংরিজি নির্ভর হয়েই বেড়ে ওঠে। কিন্তু এখানে এদের সংখ্যা খুব বেশি নয়, ভারতের বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় তারা নগণ্য, অধিকাংশ ভারতীয়ই মাতৃভাষা থেকে বিচ্যুত হয়নি। তা হলে কি সব মানুষকেই দ্বিভাষী হতে হবে? কেউ কেউ বলছেন, অন্যান্য ভাষাগুলির যদি দ্রুত অবলুপ্তি নাও হয়, তা হলেও সেগুলি ক্রমশ বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যাবে। অর্থাৎ মা-বাবা, কাজের লােকদের সঙ্গে মাতৃভাষা আর বাড়ির বাইরে অন্য সব প্রয়ােজনে ইংরিজি। তা হলে কাব্য-সাহিত্য, দর্শন ইত্যাদি রচিত হবে কোন ভাষায়? আপাত দৃষ্টিতে এগুলি অপ্রয়ােজনীয় কিন্তু এসবের ওপর নির্ভর করেই সভ্যতা এগিয়ে চলে। দু-চারজন আত্মম্ভরি লেখক যাই বলুন, এখনও পর্যন্ত কাব্য-সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদগুলি লেখকদের মাতৃভাষাতেই রচিত। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ায় লেখকরা তাদের মাতৃভাষা ইংরিজিতেই লেখেন, তাদের সঙ্গে অসম প্রতিযােগিতায় নামতে হয় অন্য লেখকদের। এ পর্যন্ত সৃষ্টিশীল রচনায় দ্বিতীয় দলের সাফল্য নামমাত্র। 


ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলােচনা যতই প্রাসঙ্গিক হােক, এ কথাও সত্য যে, বর্তমান কালে গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষের মধ্যে ভাষা নিয়ে যথেষ্ট আবেগ আছে। যত ছােট ভাষাই হােক, অনেকেই মাতৃভাষাকে ভালােবাসে। মাতৃভাষার বিলুপ্তি রক্ষা করার জন্য কেউ কেউ এখানে প্রাণ দিতে রাজি আছে। এ সম্পর্কে একটা কৌতুককর বিবরণ এখানে উদ্ধৃত করা যেতে পারে। 


আইজাক বাশেভিস সিঙ্গার (Issac Bashevis Singer) Yiddish ভাষার প্রখ্যাত লেখক। নােবেল প্রাইজও পেয়েছিলেন। অনেকেরই ধারণা ইডিশ একটা মুমূর্ষ ভাষা। নােবেল পুরস্কার গ্রহণের সময় সিঙ্গার এই কথাগুলি বলেছিলেন। 



People ask me often, why do you write in a dying language? And I want to explain it in a few words.
Firstly, I like to write ghost stories and nothing fits a ghost better than a dying language. The deader the language the more alive is the ghost. Ghosts love Yiddish and as far as I know, they all speak it.
Secondly, not only do I believe in ghosts but also in recorrection, I am sure that millions of Yiddish speaking corpses will rise from their graves one day and their first question will be is there any new Yiddish book to read? for them, Yiddish will not be dead.
Thirdly, for 2000 years Hebrew was considered a dead language. Suddenly it became strongly alive. what happened to Hebrew may also happen to Yiddish one day, (although I haven't the slightest idea how this miracle takes place.)
There is still a fourth minor reason for not forsaking Yiddish and this is Yiddish may be a dying language, but it is the only language I know well. Yiddish is my mother language and a mother is never really dead.


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com