সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label muhammad zafar iqbal. Show all posts
Showing posts with label muhammad zafar iqbal. Show all posts

শর্টকাট প্রোগ্রামিং - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

amarboi
শর্টকাট প্রোগ্রামিং - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

গণিতের মজা মজার গণিত - মুহম্মদ জাফর ইকবাল [New Edition]

amarboi
গণিতের মজা মজার গণিত - মুহম্মদ জাফর ইকবাল [New Edition]
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

অনলাইন জীবন - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

amarboi
অনলাইন জীবন - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আমরা আসলে একটা ক্রান্তিকালের মাঝে বাস করছি। পুরো পৃথিবীটা আসলে একটা খুব বড় ধরনের পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। আমরা এখনও জানি না পরিবর্তনটা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে। বিষয়টা অনেকটা তেজস্ক্রিয়তার মতো। বিজ্ঞানী মাদাম কুরি যখন তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা করেছেন তখন তিনি এই বিচিত্র রহস্যময় বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াটার ভয়াবহতার দিকটুকু জানতেন না। ল্যাবরটরিতে তিনি দিনের পর দিন তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে কাজ করেছেন এবং নিজের অজান্তে অদৃশ্য তেজস্ক্রিয়তার রশ্মি তাঁর শরীরকে বিষাক্ত করে তুলেছে, তিনি শেষ পর্যন্ত মারা গিয়েছেন সেই তেজস্ক্রিয় রশ্মির কারণে।

আমার বর্তমান ইন্টারনেট কিংবা ফেসবুক আসক্তি দেখে এই তেজস্ক্রিয়তার কথা মনে হয়। আমরা যখন এর সুযোগ-সুবিধা, বৈচিত্র্য এবং বিনোদনে সম্মোহিত হচ্ছি ঠিক তখন অদৃশ্য তেজস্ক্রিয় রশ্মির মতো কিছু একটা আমাদের ভেতরে গুরুতর একটা পরিবর্তন করে যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও আমরা অনেক বেশি মনোযোগী ছাত্রছাত্রী পেতাম। এখন তাদের মনোযোগ কেন কমে যাচ্ছে? ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, ফেসবুকের কি এখানে প্রত্যক্ষ ভূমিকা আছে?

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

জনৈক অপদার্থ পিতা - মুহম্মদ জাফর ইকবাল [ছোটগল্প]

amarboi
জনৈক অপদার্থ পিতা

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

বাসের মানুষজন শঙ্কিত মুখে বসে আছে। বাসটির এখানে থামার কথা নয়, কালো কাপড় পরা মিলিশিয়া ধরনের একজন এটিকে থামিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়েছে। রাস্তাঘাটে বাস থামিয়ে চেক করা কোন ব্যাপার নয়, তবু ব্যাপারটিতে কেউ অভ্যস্ত হতে পারছে না। মিলিটারির কেউ একজন ভেতরে ঢুকে বাসটি পরীক্ষা করে যেতে দেবে, যতক্ষণ সেটা না হচ্ছে চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই।

আজাদ কাজলকে বুকে চেপে ধরে বাসের অন্য সবার সাথে চুপ করে বসে থাকে। কাজলের বয়স চার, যদিও তাকে দেখে আরো কম মনে হয়। গত কয়েক মাস দৌড়াদৌড়িতে তার চেহারার মাঝে আতঙ্কের একটা ছাপ পাকাপাকিভাবে পড়ে গেছে। ছেলেটার শরীর ভাল নয়। গত কয়েকদিন থেকে কেঁপে কেঁপে জ্বর উঠছে। রোগ শোক সম্পর্কে আজাদের ভাল ধারণা নেই, কিন্তু দেখেশুনে মনে হয় ম্যালেরিয়া। যে গ্রামে গত কয়েক মাস থেকে লুকিয়ে আছে সেখানে কোন ডাক্তার নেই। ডাক্তারের খোঁজে সে ময়মনসিংহ শহরে যাচ্ছে।

কাজল আজাদের বুক থেকে মুখ তুলে বলল, আব্বা আমরা কখন যাব?

এই তো একটু পরে।

মিলিটারি আমাদের থামিয়েছে?

হ্যাঁ।

কেন বাবা?

জানি না, মনে হয় চেক করবে।

কী চেক করবে?

জানি না বাবা।

জয় বাংলা আছে কি না দেখবে?

আজাদ ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলল, শ-স-স-স, বলে না এখন।

কাজল চুপ করে গেল। কখন জয় বাংলার কথা বলা যাবে এবং কখন বলা যাবে না ব্যাপারটা সে এখনো পরিষ্কার ধরতে পারেনি।

আজাদ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। সামনে আরো কয়েকটি বাস থামানো হয়েছে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে বাসগুলো, ভেতরে শঙ্কিত মুখে যাত্রীরা নিঃশব্দে বসে আছে। বাসগুলোর কাছাকাছি কালো কাপড় পরা কিছু মিলিশিয়া। খানিকটা দূরে একটা বটগাছের নিচে বেশ কিছু মিলিটারি রাস্তার পাশে অলস ভঙ্গিতে বসে আছে। বাসের ভেতরে মানুষজন কেউ কোন কথা বলছে না। আজাদ চাপা স্বরে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করল, সব সময় কি এখানে থামায়?

ড্রাইভার দরদর করে ঘামছে, আজাদের প্রশ্নটা ঠিক শুনতে পেল না। আজাদ আবার জিজ্ঞেস করল, ড্রাইভার সাহেব, সব সময় কি এখানে থামায়?

না। কিছু একটা গোলমাল আছে আজ।

কী গোলমাল?

জানি না। আল্লাহরে ডাকেন।

ড্রাইভার এইমাত্র দেখতে পেয়েছে মিলিশিয়ারা সামনের একটা বাস থেকে সব যাত্রীদের সারি বেঁধে নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার পাশে একটা ছোট ডোবা আছে সবাই হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে সেদিকে। কান খাড়া করে রাখবে সে, গুলির শব্দ শোনা গেলে বুঝতে হবে রোজ কেয়ামতো আজ।

আজাদ কাজলের মুখের দিকে তাকাল। ছেলেটা দেখতে নাকি বাবার মতো হয়েছে। আজাদের অবশ্যি সেরকম মনে হয় না, তার ধারণা মায়ের মতোই হয়েছে। বিশেষ করে চোখ এবং ঠোঁটের অংশটুকু হুবহু শিরীনের মতোন। শিরীন এখন কী করছে কে জানে, ডাক্তারকে দেখিয়ে বাসায় ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত বেচারি স্বস্তি পাবে না। আজাদকে এসব ব্যাপারে একেবারে বিশ্বাস করে না। কিন্তু এখন যে অবস্থা শিরীনের ঘর থেকে বের হওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। ডাক্তারকে কী জিজ্ঞেস করতে হবে, কী বলতে হবে সবকিছু বারবার করে আজাদকে বলে দিয়েছে। আজাদ যে নিজের দায়িত্বে ডাক্তারকে দেখাতে পারে সেটা তার পক্ষে বিশ্বাস করাই সম্ভব নয়!

শিরীনের ধারণা, আজাদ একজন অপদার্থ বাবা। কেন তার এই ধারণাটি হয়েছে বলা মুশকিল। যে কোন ব্যাপারেই স্পষ্ট একটা ধারণা না হওয়া পর্যন্ত শিরীন স্বস্তি বোধ করে না। জীবনের নানা জটিল ব্যাপারে বড় বড় চিন্তাবিদেরাও যখন কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি সেখানেও শিরীন স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে থাকে। ধর্ম, রাজনীতি, সমাজনীতি এ ধরনের বড় বড় ব্যাপার থেকে শুরু করে নিউ মার্কেটের কোন দরজি সবচেয়ে কম খরচে নিখুঁত ব্লাউজ তৈরি করে দেয়—সব ব্যাপারে তার স্পষ্ট ধারণা রয়েছে। শিরীন এবং আজাদের একমাত্র ছেলে কাজলের বয়স মাত্র চার এবং বাবার দায়িত্ব পালন করার জন্যে আজাদের পুরো জীবনটাই পড়ে রয়েছে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় আজাদ জীবনপণ করে যত চেষ্টাই করুক এই জন্মে শিরীন তার ধারণাটি পাল্টাতে রাজি নয়।

ব্যাপারটি শুরু হয়েছিল কাজলের জন্মের সময়। ডাক্তার কাজলের জন্ম তারিখ দিয়েছিল মার্চের মাঝামাঝি। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে আজাদের রাজশাহী যাওয়ার প্রয়োজন হলো। ঢাকা শহরে আজাদ এবং শিরীন দু’জনের পরিবারের সবাই থাকে। যে ডাক্তার শিরীনকে দেখছে সে কিভাবে কিভাবে শিরীনদের আত্মীয়া হয় হঠাৎ করে ক্লিনিকে যেতে হলেও কোন অসুবিধে নেই। সাত পাঁচ ভেবে আজাদ রাজশাহী চলে গেল। তার দু’দিনের ভেতর শিরীনকে ক্লিনিকে নিয়ে যেতে হলো। প্রথমে সবাই ভেবেছিল সবকিছু বুঝি স্বাভাবিক। শেষ মুহূর্তে দেখা গেল সিজারিয়ান প্রয়োজন। শিরীনের এক মামা আজাদের হয়ে কাগজপত্র সই করল। আজাদ যখন ফিরে এসেছে কাজলের বয়স তখন আট দিন। যে বাবা তার সন্তানকে আট দিনের আগে দেখার সুযোগ পায়নি শিরীনের পক্ষে তাকে ক্ষমা করা সহজ নয়। এর থেকে আরো অনেক কম অপরাধের জন্য শিরীন তার এক খালাতো বোনের সাথে গত নয় বছর কোন কথা বলেনি!

অপদার্থ বাবা হিসেবে আজাদ দ্বিতীয়বার সুপ্রতিষ্ঠিত হলো যখন কাজলের বয়স সাত মাস। একদিন আজাদের উপর দায়িত্ব দিয়ে শিরীন কোন এক জায়গায় গিয়েছে। যাবার আগে কাজলকে নিয়ে কী করতে হবে আজাদকে সে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়ে গেছে। আজাদের সদিচ্ছার কোন অভাব ছিল না, কিন্তু দুধ খাবার সময় কী কারণে কাজল কিছুতেই দুধের বোতল মুখে নিয়ে দুধ খেতে রাজি হলো না সে বুঝে উঠতে পারল না। মধ্যরাতে শিরীন ফিরে এসে আবিষ্কার করে কাজল চিৎকার করে কেঁদে ঘরবাড়ি মাথায় তুলে ফেলেছে—আজাদ তাকে নিয়ে সম্ভাব্য সব রকমভাবে শান্ত করে দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। শিরীন দুধের বোতলের দিকে এক নজর তাকিয়েই সমস্যাটা বুঝে ফেলল, নিপলটিতে কোন ফুটো নেই। ফুটোবিহীন একটি নিপল কোন বাসায় তার জন্যে রাখা হবে তার কোন ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু তার সমস্ত অপরাধের গ্লানি এখনো আজাদকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।

আজাদ বাবা হিসেবে মোটামুটি অপদার্থ—এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হয়ে যাবার পর যতই দিন যাচ্ছে ততই শিরীনের ধারণা আরো বদ্ধমূল হয়ে উঠেছে। কাজলের অসুখের সময় আজাদ সারারাত জেগে তাকে বুকে নিয়ে হেঁটে বেড়িয়েছে এই ঘটনাটি শিরীনের চোখে পড়ে না, কিন্তু একদিন গরম চা চলকে পড়ে হাতে ফোসকা পড়ে গিয়েছিল সেই ঘটনাটি সে কিছুতেই ভুলতে পারে না। কেউ যদি কোন ব্যাপারে সত্যি সত্যি বিশ্বাস করে তাহলে তার স্বপক্ষে যুক্তি এবং উদাহরণ খুঁজে বের করা কঠিন কোন ব্যাপার নয়—বিশেষ করে এ ধরনের ব্যাপারে।

আজাদ প্রথম প্রথম শিরীনের এই ধারণা পাল্টানোর চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়েছে। প্রথমতো, শিরীন একবার কোন একটা জিনিস বিশ্বাস করে নিলে সে ব্যাপারে তার মতো পাল্টানো প্রায় অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, শিরীন তার জীবনে যতগুলো ব্যাপারে একটা স্পষ্ট ধারণা করছে তার বেশিরভাগই ভুল বের হয়েছে।

যেমন তার ধারণা ছিল তাদের প্রথম বাচ্চা হবে মেয়ে। ব্যাপারটিতে সে প্রায় নিশ্চিত হয়ে মেয়ের জন্যে একটি নাম পর্যন্ত ঠিক করে রেখেছিল। কিন্তু দেখা গেল তাদের প্রথম বাচ্চাটি হলো ছেলে। শিরীনের ধারণা ছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের চেহারা যত কুৎসিতই হোক মানুষটি নির্বাচনের রায়কে অক্ষুণ্ন রাখবে। মার্চ মাসে তার এই ধারণাটিও ভুল প্রমাণিত হলো। শিরীনের তৃতীয় ধারণাটি ভুল প্রমাণিত হলো পঁচিশে মার্চের রাতে, সে মোটামুটি নিঃসন্দেহ ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর জুলফিকার আলী ভুট্টো একটা রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছে যাবেন, পাকিস্তানি মিলিটারিরা কিছুতেই বাঙালিদের গায়ে হাত তোলার সাহস পাবে না। পঁচিশে মার্চের রাতে গোলাগুলিতে ঘুম ভেঙে জেগে উঠে তার সেই ধারণাটিও পুরোপুরি ভেস্তে গেল। শিরীনের শেষ ধারণাটি ভুল প্রমাণিত হলো এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি। শিরীন একেবারে নিঃসন্দেহ ছিল বাইরের পৃথিবী যখন খবর পাবে পাকিস্তানি মিলিটারিরা কিভাবে এ দেশের মানুষকে মারছে তখন পৃথিবীর বড় বড় দেশ এসে হস্তক্ষেপ করবে। এপ্রিলের মাঝামাঝি শিরীন কাজলকে বুকে চেপে আজাদের পিছু পিছু এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। বাইরের পৃথিবী ততদিনে খবর পেয়ে গেছে, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান নামে ছোট একটি দেশের জন্যে পৃথিবীর কোন দেশের এতটুকু মাথাব্যথা দেখা যায়নি।

আজাদ এবং শিরীন আগে কখনো দীর্ঘ সময়ের জন্যে গ্রামে থাকেনি। ব্যাপারটি যত দুঃসহ হবে বলে ধারণা করেছিল কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল সেটি তত খারাপ নয়। গ্রামের জীবনে নতুন এক ধরনের বৈচিত্র্য আছে এবং খুব তাড়াতাড়ি তারা সেটিতে অভ্যস্ত হয়ে গেল। আজাদ কখনো কল্পনা করেনি সে কোনদিন লুঙ্গির সাথে একটা বুশ শার্ট পরে জনসমক্ষে যাবে, কিন্তু দেখা গেল গ্রামের বাজারে চা খাবার জন্যে সে শুধু যে লুঙ্গির সাথে বুশ শার্ট পরে রওনা দিয়েছে তা নয়, সে পায়ে পরে নিয়েছে রবারের এক ধরনের ধূসর জুতো এবং সেই জুতো কাদায় আটকে গেলে সেগুলো হাতে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছে না। আজকেও সে এসেছে লুঙ্গি পরে, গায়ে ঢিলেঢালা একটা পাঞ্জাবি এবং পায়ে এক জোড়া স্পঞ্জের স্যান্ডেল। ছয় মাস আগেও সে কোন্ প্যান্টের সাথে কোন্ জুতো জোড়া পরবে সেটা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছে। সেই সব দিনগুলো এখন স্বপ্নের মতো মনে হয়।

আজাদ হঠাৎ বাসের মাঝে একটা উত্তেজনা অনুভব করে। মাথা ঘুরিয়ে দেখে কালো পোশাক পরা একজন মিলিশিয়া উঠে এসেছে। অল্পবয়সী কিশোরের মতো চেহারা, কিন্তু তাকে দেখে হঠাৎ আজাদের পেটের মাঝে কেমন যেন পাক দিয়ে ওঠে। দেশে যদি যুদ্ধ না চলতে থাকত আর রাস্তায় হঠাৎ যদি অল্পবয়সী এই ছেলেটার সাথে কোথাও দেখা হত আজাদ কি তাকে দেখে এত ভয় পেত?

মিলিশিয়াটি তাদের বাস থেকে নেমে যেতে বলল, ভাষাটি উর্দু নয়, অন্য কোন ভাষা হবে। পাঞ্জাবি বা পশতু, কিন্তু তবু সে কী বলছে বুঝতে কোন অসুবিধা হলো না। বাস থেকে নামতে নামতে বুড়ো মতোন একজন মানুষ মিলিশিয়াটিকে বাবা ডেকে কিছু একটা জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করল, কিন্তু মিলিশিয়াটি তার দিকে কোন উৎসাহ দেখাল না, পুরোপুরি নিস্পৃহভাবে সে বুড়ো মানুষটির দিকে তাকিয়ে রইল। বুড়োর কথা সে বোঝে না, বোঝার কোন কৌতূহলও নেই।

বাস থেকে নামার সময় আজাদ হঠাৎ এক ধরনের আতঙ্ক অনুভব করে, সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ধরনের আতঙ্ক। এই আতঙ্কের সাথে তার কোন পরিচয় নেই, সমস্ত শরীর হঠাৎ অবশ হয়ে আসে, মাথা কেমন ঝিম ঝিম করতে থাকে। কাজল হঠাৎ আজাদের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, এখন চেক করবে আব্বু?

আজাদ নিচু গলায় বলল, হ্যাঁ বাবা।

কেমন করে চেক করে আব্বু?

এই তো এরকম করে।

কাজল কী বুঝল কে জানে, বলল, ও।

নিচে আরো কয়েকজন মিলিশিয়া দাঁড়িয়ে ছিল। তারা দুই পাশে দাঁড়িয়ে থেকে বাসের সবাইকে হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে বাঁশঝাড়ের পিছনে ডোবাটির কাছে নিয়ে যেতে থাকে। আজাদের সাথে হেঁটে যেতে যেতে মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ শুকনো গলায় বলল, গুলির বাক্স টানাবে আমাদের দিয়ে।

গুলির বাক্স?

হ্যাঁ। যখন গুলির বাক্স টানার দরকার হয় তখন লোকজন জড়ো করে।

সত্যি?

হ্যাঁ। গত সপ্তাহে আমার ছোটভাই টেনেছে।

ও।

নিশ্চয়ই গুলির বাক্স। কী বলেন?

লোকটি কেমন এক ধরনের ব্যাকুল চোখে আজাদের দিকে তাকাল। আজাদ বলল, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই গুলির বাক্স।

ডোবার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে আজাদ তাকাবে না তাকাবে না করেও ডোবাটার ভেতরে তাকাল। অনেক কয়েকজন মানুষ পাশাপাশি শুয়ে আছে। কারো পা পানিতে ডুবে আছে কারো হাত। এমনকি কারো মাথা—কিন্তু সেটা নিয়ে কেউ কোন আপত্তি করছে বলে মনে হলো না। আজাদ দ্বিতীয়বার তাকাল এবং বুঝতে পারল মানুষগুলো মৃত। গুলি করে মারা হয়েছে। তাদের আগের বাসের যাত্রীরা, একটু আগে হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে আনা হয়েছে।

একেবারে ডান পাশে একটা শিশুও রয়েছে, এক হাত দিয়ে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে এখনো। টুকটুকে লাল শার্ট গায়ে। শার্টটা কী লাল ছিল নাকি রক্ত লাল হয়েছে?

কাজল জিজ্ঞেস করল, আব্বু এরা কারা?

আজাদ বলল, এদিকে তাকায় না বাবা।

কাজল চোখ সরিয়ে বলল, কেন আব্বু

পরে বলব। ঠিক আছে?

কাজল মাথা নাড়ল, ঠিক আছে। তারপর হঠাৎ একটু হাসল তার দিকে তাকিয়ে। কেন হাসল কে জানে।

আজাদ কাজলের দিকে তাকিয়ে থাকে মাথার মাঝে তার সবকিছু গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। কেন জানি সে আর কিছু চিন্তা করতে পারছে না। মনে হচ্ছে প্রচণ্ড জ্বরের ঘোরে রয়েছে, আশপাশে মানুষজনেরা কি কাঁদছে? কেউ কি চিৎকার করছে? কেউ কি কিছু বলছে? সে কেন আর কিছু শুনতে পাচ্ছে না। কাজল ঘাড় উঁচিয়ে দেখতে চেষ্টা করছে কিছু। কী দেখছে?

আজাদ ফিস ফিস করে বলল, কাজল।

কি আব্বু?

আমাকে শক্ত করে ধরবি। খুব শক্ত করে।

কাজল কী একটা বলল সে শুনতে পেল না। চারজন মিলিশিয়া তাদের দিকে রাইফেল উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে আরো একজন মিলিশিয়া হেঁটে হেঁটে আসছে। কাজল আবার ডাকল তাকে, আব্বু।

কী বাবা?

চেক কি করছে?

হ্যাঁ বাবা।

কখন শেষ হবে?

এই তো একটু পরে।

তখন আমরা যাব?

হ্যাঁ বাবা।

আম্মুর কাছে যাব?

আম্মুর কাছে যাব।

কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মিলিটারিটা কিছু একটা বলল, তারপর দাঁড়িয়ে গেল। কেমন যেন বিষণ্ন চোখে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। চেহারায় কেমন যেন এক ধরনের দুঃখের ছাপ।

রাইফেল হাতে মিলিশিয়াগুলো হঠাৎ রাইফেলগুলো উপরে তুলে। আজাদ ফিসফিস করে বলল, কাজল—

কী আব্বু?

তুমি কি সেই বোকা রাজার গল্পটা শুনতে চাও? সেই যে একটা বোকা রাজা ছিল—

হ্যাঁ আব্বু হ্যাঁ। কাজল হঠাৎ আনন্দে ছটফট করে ওঠে।

তাহলে আমার দিকে তাকাও—

কাজল তার বাবাকে ধরে তার দিকে তাকাল।

এক ছিল রাজা। সে ছিল ভারি বোকা—

কাজলের মুখ হাসিতে উদ্ভাসিত হয়। বোকা রাজার গল্প তার সবচেয়ে প্রিয় গল্প। অনেক বার শুনেছে সে, প্রতিবার হেসে কুটি কুটি হয়েছে। আশপাশের মানুষেরা কেন জানি কাঁদছে সে জানে না। সে জানতেও চায় না। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মিলিটারিগুলোকে দেখতে কেমন যেন ভয় করে। সে সেদিকে তাকাবে না। আব্বুকে শক্ত করে ধরে রাখবে তার কোন ভয় নাই। ভয় থাকলে কি তার আব্বু কখনো বোকা রাজার গল্প বলত।

বলত না।

কাজল হাসিমুখে আব্বুর দিকে তাকিয়ে রইল, গল্পটা শোনার জন্যে। অনেকবার শুনেছে সে গল্পটি। আজাদ জানে, পুরোটা শুনতে না পারলেও ক্ষতি নেই।

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

চা - মুহম্মদ জাফর ইকবাল [ছোটগল্প]

amarboi
চা

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

শিরীন গত তিন মাসে এক কাপ চাও খায়নি। দেশ স্বাধীন হবার পর বাজার থেকে যেসব জিনিস উধাও হয়ে গেছে ভাল চা তার মাঝে একটা। কিন্তু শিরীনের চা না খাওয়ার কারণ সেটা নয়। শিরীনের বাবার অনেক মানুষের সাথে পরিচয়, তিনি খোঁজখবর করে ভাল এক প্যাকেট চা জোগাড় করে এনেছেন। শরীন ইচ্ছে করলেই খেতে পারে, কিন্তু শিরীন তবু খায় না। সে খায় না তার কারণ সে খেতে পারে না। অনেকবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সে একেবারেই খেতে পারে না। ব্যাপারটা এখনো বাসার কেউ লক্ষ করেনি, শিরীন ইচ্ছে করেই সেটা গোপন রাখছে। সকাল বিকাল সে সবার সাথে চা নিয়ে বসে, মাঝে মাঝে চুমুক দেবার চেষ্টা করে। একসময় কাপে চা ঠাণ্ডা হয়ে আসে, তখন সে কাউকে না দেখিয়ে চা টা কোথাও ঢেলে ফেলে দেয়। এভাবেই চলে আসছে, শিরীনের ধারণা এভাবেই চলবে—সে আর কোনদিন চা খেতে পারবে না।

ব্যাপারটি বেশ গুরুতর। যারা শিরীনকে জানে শুধু তারাই এর গুরুত্ব বুঝতে পারবে। শিরীন চা খেয়ে আসছে সেই চার বছর বয়স থেকে। প্রথম খেত বাবার কাপের তলানিটুকু। বাবা ইচ্ছে করে একটু বেশি রেখে দিতেন তার জন্যে। দুষ্টুমি না করে ভাল হয়ে থাকলে মাঝে মাঝে বাসার বাচ্চাদের আধকাপ করে দুধবহুল এক ধরনের চা দেয়া হতো। শিরীন শুধু চায়ের লোভে বরাবর ভাল মেয়ে হয়ে থেকে এসেছে। তার বড় হওয়ার প্রধান আকর্ষণ ছিল যে সে নিজের ইচ্ছে মতো চা খেতে পাবে। বড় হয়ে সত্যি সত্যি সে চা খাওয়ার ব্যাপারটাকে মোটামুটি উপাসনার পর্যায়ে তুলে এনেছিল। অন্য কারো হাতে তৈরি চা সে খেতে পারত না, চা তৈরি করার ব্যাপারটা তার কাছে ছিল প্রিয় শিল্পকলার মতো। চা খাবার আগে সবার আগে সে টিপটটি ধুয়ে টেবিলে রাখত। তারপর কেতলিতে মেপে পানি দিয়ে চুলার উপরে বসিয়ে দিত। কখনোই সে কেতলিতে পানিকে বেশিক্ষণ ফুটতে দিত না, এতে নাকি পানির ভেতরকার দ্রবীভূত বাতাসটুকু বের হয়ে পানি বিস্বাদ হয়ে যায়। যখন কেতলিতে পানি গরম হচ্ছে তখন সে টিপটে চায়ের চামুচে মেপে চায়ের পাতা ঢালত। তার প্রিয় চা ছিল দার্জিলিং এর সাথে সমান সমান সিলেটের চায়ের পাতা। দার্জিলিং চা দিত সুঘ্রাণ, সিলেটের চা থেকে আসত রং। পানি ফুটে গেলে সে সাবধানে ফুটন্ত পানি ঢালত টিপটে। তারপর চায়ের চামচে একটু চিনি নিয়ে সে টিপটের ফুটন্ত পানিটাকে ভাল করে একবার নেড়ে দিত। পানিতে একটু চিনি থাকলে চায়ের লিকারটি ভাল বের হয়—দুধ থাকলে হয় তার উল্টো, মোটে লিকার বের হতে চায় না। সব শেষ করে টিপটটি টিকুজি দিয়ে ঢেকে দিয়ে শিরীন ঘড়ি ধরে দুই মিনিট অপেক্ষা করত। দুই মিনিট পর যখন চায়ের কাপে চা ঢালা হতো সব সময় সারা ঘর চায়ের মিষ্টি গন্ধে ভরে যেত। চায়ের জন্যে সে দুধও আগে তৈরি করে রাখত। জ্বাল দিয়ে ঘন করে রাখা দুধ। গাঢ় লাল রঙের চায়ের মাঝে দু’চামচ দুধ দিয়ে নেড়ে দিতেই চায়ের একটা কোমল রং ফুটে উঠত সব সময়! তার মাঝে তখন সে দিত এক চামচ চিনি, বাজারের মোটা দানার ময়লা চিনি নয়, অনেক খুঁজে বের করা সূক্ষ্ম দানার ধবেধবে সাদা চিনি। শিরীন চা খেত কারুকাজ করা পাতলা পোর্সেলিনের কাপে, অনেক সখ করে পয়সা জমিয়ে কিনেছিল সেই চায়ের কাপ। দুধের মতো সাদা কাপে হালকা নীল রঙের নক্সা। শিরীন বসে বসে একেবারে দুই থেকে তিন কাপ চা খেত, সাথে আর যারা থাকে তারাও, এত ভাল চা এত সুন্দর করে আর কে খেতে দেবে?

সেই শিরীন চা খেতে পারছে না ব্যাপারটা গুরুতর সন্দেহ কী, কিন্তু কিছু করার নেই। সে চায়ের কাপ হাতে নিলেই দেখতে পায় আঠারো কুড়ি বছরের একটি ছেলে মাছের মতো নিষ্পলক চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টির সামনে তার সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়, সে চায়ের কাপ মুখে তুলতে পারে না। চেষ্টা করে দেখেছে কোন লাভ হয়নি, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে তার, হঠাৎ করে মাথার মাঝে কেমন জানি করে ওঠে। এত যন্ত্রণা সহ্য করার কোন মানে নেই, শিরীন আজকাল আর চেষ্টাও করে না। ছেলে-মেয়ে দুটিকে নিয়ে ভুলে থাকতে চেষ্টা করে।

ছেলেটা বড়, বয়স পাঁচ, ছোটটার বয়স তিন। ছোটটা মেয়ে যদিও তার মেয়েসুলভ কোন হাবভাব নেই। সে বড় ভাইকে অন্ধের মতো অনুকরণ করে এবং দিনের বেশির ভাগ সময় একটা খেলনা বন্দুক নিয়ে অনুগত ভৃত্যের মতো তার পিছনে পিছনে ঘুরতে থাকে। তাদের খেলার বিষয়বস্তু বিশেষ সরল, একটা কোল বালিশকে লাথি মেরে মেরে ঘরের এক কোনা থেকে আরেক কোনায় নিয়ে যাওয়া। আপাতদৃষ্টিতে বালিশটিকে বৈশিষ্ট্যহীন মনে হলেও তাদের কাছে সেটি হচ্ছে বদরবাহিনী। কাজেই খেলার শেষে সব সময়েই এই দুর্ভাগা বালিশটি দু’জনের হাতে শোচনীয়ভাবে প্রাণ ত্যাগ করে। সম্ভবত এই বয়সী বাচ্চাদের জন্যে এটি সঠিক খেলা নয়, কিন্তু কিছু করার নেই। যুদ্ধের সময় প্রতিদিন মানুষ মারার কথাবার্তা শুনে শুনে এরা খুন খারাপির ব্যাপারটি বেশ সহজভাবে নিচ্ছে। শিরীন আশা করে আছে কয়দিন পর এই খেলায় আকর্ষণ কমে আসবে, এক খেলা মানুষ আর কয়দিন খেলতে পারে?

বেলা তিনটার দিকে পিয়ন চিঠি নিয়ে আসে। বাসায় এতগুলো মানুষ, রোজই কারো না কারো জন্যে কিছু একটা থাকে। আজকাল শিরীনও চিঠির জন্যে অপেক্ষা করে, বিভিন্ন জায়গায় চাকরির জন্যে লেখালেখি শুরু করেছে কোন উত্তর আসছে কি না দেখতে চায়। বাসার সবাই তার চাকরির চেষ্টাটাকে একটা কৌতুক হিসেবে নিচ্ছে। পরিচিত মানুষকে ধরাধরি না করে শুধু চিঠি লিখে যে চাকরি পাওয়া যায় না এই সহজ জিনিসটা শিরীন এখনো স্বীকার করে নেয়নি, কৌতুকটা সেখানে। তাছাড়াও বাবার বাসায় উঠে আসার ব্যাপারটাকে শিরীন সহজভাবে না নিয়ে চাকরির চেষ্টা করছে, সেটাও সবার জন্যে খানিকটা মনোকষ্টের কারণ। সেটাকেও কৌতুকের ভান করে নিজেদের মাঝে আড়াল করে রাখা হয়।

শিরীন যখন তার চিঠি পড়া শুরু করেছে তখন তার ছেলে টোপন এবং পিছনে পিছনে অনুগত ভৃত্যের মতো তার মেয়ে শাওন এসে হাজির হলো। টোপন বলল, আম্মা, বড় মামা বলেছে তোমার মাথা খারাপ।

টোপন যেটা বলে শাওনও সব সময় সেটা বলে, কাজেই সেও বলল, তোমার মাথা খারাপ, আম্মু।

শিরীন চিঠি থেকে চোখ না তুলে বলল, ঠিক আছে।

এরকম বড় একটা জিনিস এত সহজে মেনে নিলে ব্যাপারটার মজা নষ্ট হয়ে যায়। টোপন তাই আবার চেষ্টা করল, তোমার কেন মাথা খারাপ আম্মা?

শাওন কৌতূহলী হয়ে বলল, দেখি আম্মা তোমার মাথা, দেখি—

শিরীন বলল, এখন জ্বালাতন করো না। যাও। দেখছ না, আমি চিঠি পড়ছি?

টোপন এবারে অন্যভাবে চেষ্টা করল, বলল, বড় মামা বলেছে কোনদিন তোমার চিঠি আসবে না।

শাওন মাথা নেড়ে যোগ করল, আসবে না, কখনো আসবে না।

শিরীন বলল, ঠিক আছে এখন ভাগ এখান থেকে।

টোপন তবুও শিরীনের কাছাকাছি ঘুরঘুর করতে থাকে। একটু পর ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, আম্মা, তুমি কেন চাকরি করতে চাও? আম্মারা তো কখনো চাকরি করে না।

শাওন এই প্রসঙ্গে বিশেষ উত্তেজিত হয়ে ওঠে, গলা উঁচিয়ে ঝাঁকিয়ে বলল, কখনো করে না কখনো করে না।

শিরীন আড়চোখে দুজনকে একটু দেখে বলল, তোর আব্বা বলেছে আমার চাকরি করতে হবে। মনে আছে?

টোপন প্রতিবাদ করে কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল। আব্বার কথার উপরে কোন কথা হয় না। আব্বা যদি বলে থাকে আম্মার চাকরি করতে হবে তাহলে তো করতেই হবে। টোপন তার মুখে বয়সের তুলনায় বেমানান একটা গাম্ভীর্য এনে বলল, শাওন।

কী?

আব্বা বলেছে আম্মার চাকরি করতেই হবে।

কিন্তু বড় মামা বলেছে আম্মার মাথা খারাপ।

শিরীন হাসি গোপন করে বলল, আমার তো শুধু মাতা খারাপ, তোর বড় মামার কি খারাপ জানিস?

কী?

তোর বড় মামার চোখ খারাপ, নাক খারাপ, গলা খারাপ, পেট খারাপ—সবকিছু খারাপ।

কথাটি এমন কিছু হাসির কথা নয়, কিন্তু বাচ্চা দুটি এটি শুনে হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে থাকে। কোন্ কথায় কতটুক হাসা যায় সে ব্যাপারে ছোটদের এবং বড়দের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই আলাদা। অনেক কষ্ট করে হাসি থামিয়ে শাওন শিরীনের কাছে এসে বলল, আম্মু, আবার বলো দেখি বড় মামার কী খারাপ—

শিরীন আবার অঙ্গভঙ্গি করে বলল, বড় মামার চোখ খারাপ, নাক খারাপ, গলা খারাপ, পেট খারাপ—সবকিছু খারাপ!

আবার দু’জনে হাসতে হাসতে লুটোপুটি খেতে থাকে। ব্যাপারটি শিরীনের বড় ভাই রাজুর জন্যে ভাল হলো না। এখন থেকে কে জানে কতদিন পর্যন্ত তাকে একটু পরে পরে এই অর্থহীন হাস্যকর কথাটি শুনে যেতে হবে।

টোপন শাওনকে নিয়ে বড় মামার খোঁজে চলে যাবার পর শিরীন চিঠিটা আরেকবার পড়ল। চিঠিতে উৎসাহব্যঞ্জক বিশেষ কিছু নেই। কে জানে হয়তো বাবার অন্য সবার কথাই ঠিক সত্যিই হতো ধরাধরি না করে চাকরি পাওয়া যায় না। সে অবশ্যি এত সহজে হাল ছেড়ে দেবে না, টোপন শাওনের বাবা ধরাধরি জিনিসটা দু’চোখে দেখতে পারত না।

শিরীন খাবার টেবিলে কাগজ-কলম নিয়ে চিঠির উত্তর লিখতে বসল। খানিকটা লিখেছে তখন মা এসে জিজ্ঞেস করলেন, চা খাবি এক কাপ?

শিরীন অন্যমনস্কভাবে বলল, না।

মা বলল, আজকাল দেখি একেবারে চা খেতে চাস না।

শিরীন মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ইচ্ছে করে না মা।

গলার স্বরে কিছু একটা ছিল, মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সরে গেলেন।

সারাদিন কোন না কোনভাবে কেটে যায়, কিন্তু রাতটা আর কাটতে চায় না। সন্ধ্যে হবার পরই কেমন জানি মনটা বিষণ্ন হয়ে যায়। বাসার সবাই চেষ্টা করে তাকে হাসিখুশি রাখতে। বাচ্চা দুটিকে নিয়ে নতুন নতুন খেলা আবিষ্কার করা হয়, সবাই মিলে বই দেখে রান্না করা হয়, বাবা কখনো কখনো ‘বরযাত্রী’ পড়ে শোনান। সবার সাথে যতক্ষণ থাকে শিরীন চেষ্টা করে হাসিখুশি থাকতে, কিন্তু যখন নিজের ঘরে বাচ্চা দুটিকে নিয়ে শুতে আসে মনে হয় বুকটা বুঝি ভেঙে যাবে। দশ বছর ঘর করেছিল মানুষটার সাথে, সেই মানুষটা আর কখনো ফিরে আসবে না, শিরীন কেমন করে সেটা মেনে নেয়?

শাওন সারাদিন হৈ চৈ করে এত ক্লান্ত হয়ে থাকে যে বিছানায় শোওয়ানোর পর ‘আমি এখন ঘুমাব না—ঘুমাব না’, —বলে বার কয়েক মাছের মতো লাফ দিয়ে প্রায় সাথে সাথেই ঘুমিয়ে যায়। টোপন বড় হয়েছে সে অপেক্ষা করে শিরীনের জন্য। কেমন করে জানি বুঝতে পারে মায়ের মন খারাপ, চেষ্টা করে ভুলিয়ে রাখতে। মায়ের মন ভাল করার জন্যে পৃথিবীর এমন কোন প্রসঙ্গ নেই যা নিয়ে কথা বলে না, শুধু ভুলেও কখনো বাবার কথা তোলে না। ছোট বাচ্চারা এত বুঝতে পারে কেমন করে কে জানে?

টোপনকে বিছানায় শুইয়ে শিরীন চিরুনি নিয়ে চুল ঠিক করছিল। দীর্ঘদিনের অভ্যাস, ঘুমানোর আগে চুল শক্ত করে না বেঁধে শুতে পারে না। সেই ছেলেবেলায় মা বলেছিলেন ঘুমানোর সময় শক্ত করে চুল বেঁধে শুলে চুল বড় হয়, সেই থেকে তাই করে আসছে। টোপন আর শাওনকে দুই কোলে নিয়ে নুরুল তার চুল ঠিক করা নিয়ে কতই না হাসাহাসি করত! মানুষটার কথা মনে পড়ে আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল শিরীন। মানুষ মরে গেলে কী হয় কেউ কি বলতে পারে? কিছু কি হয় সত্যি?

মা এক কাপ চা নিয়ে ঢুকলেন, টেবিলে রেখে বললেন, শিরীন খেয়ে দেখ তো চা টা কেমন। রাজু এনেছে, দার্জিলিং চা নাকি।

শিরীন বলল, টেবিলে রেখে দাও মা, খাব।

টোপন মশারির ভেতর থেকে বলল, নানু, বড় মামা চা এনেছে?

হ্যাঁ।

নানু তাহলে তো এই চা খাওয়া যাবে না।

কেন গো সোনা।

তুমি জানো না, বড় মামার চোখ খারাপ, নাক খারাপ, পেট খারাপ—সবকিছু খারাপ। কথা শেষ করার আগেই টোপন অট্টহাসি দিয়ে বিছানায় গড়াগড়ি দিতে থাকে। আজ সারাদিনে বাসার সবাই অজস্রবার দু’জনের মুখ থেকে এই অর্থহীন কথাটি শুনে এসেছে, কিন্তু তবুও মা টোপনের সাথে হাসিতে যোগ না দিয়ে পারলেন না। যদি সুচিন্তিত অর্থবহ কথাতেই মানুষকে হাসতে হবে তাহলে হাসির জিনিস তার কয়টা থাকবে পৃথিবীতে?

মা চায়ের কাপ টেবিলে রেখে চলে গেলেন। কাপে চা ঠাণ্ডা হতে থাকে। শিরীন একদৃষ্টে চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে থাকে, আবার পুরো ব্যাপারটা মনে পড়ে যায়। ডিসেম্বরের বারো তারিখ ছিল সেদিন। রাত দশটার মতো বাজে, বাচ্চারা, সকাল সকাল ঘুমিয়ে গেছে তাই বসে চা খাচ্ছিল ওরা। দরজায় শব্দ হলো তখন। নুরুল খুলে দেখে তার এক ছাত্র। অবাক হয়ে বলল, বারেক! কী ব্যাপার?

ছেলেটার গায়ে চাদর জড়ানো, মুখে হালকা দাড়ি। চোখের দৃষ্টি মাছের মতো নিষ্পলক। সালাম দিয়ে বলল, স্যার আপনি একটু আসতে পারবেন।

কোথায়?

আমার সাথে।

কেন?

ছেলেটা একটু ইতস্তত করে বলল, কয়েকজন মানুষকে আইডেন্টিফিকেশন করার জন্যে।

নুরুল কেমন জানি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে গেল। চারদিকে নানারকম গুজব, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার প্রফেসারদেরকে জামায়াতে ইসলামীর লোকজন, আল-বদরেরা নাকি ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এও কি তাদের দলের কেউ? ছেলেটা হেসে বলল, বেশিক্ষণ লাগবে না স্যার, মাত্র আধাঘণ্টা।

ঠিক আছে চলো।

শিরীন বলল, চা-টা শেষ করে যাও। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি খাবেন এক কাপ?

ছেলেটার মাছের মতো চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। শিরীন দেখল চোখে হালকা সুরমা দিয়েছে এই ছেলে। হাত ঘষে বলল, দেন একটু। বাইরে যা ঠাণ্ডা।

শিরীন টিপট থেকে এক কাপ চা ঢেলে দিল ছেলেটাকে।

ছেলেটার সাথে নুরুল বের হয়ে যাবার পর দরজা বন্ধ করে চায়ের কাপগুলো তুলতে গিয়ে শিরীন দেখল ছেলেটা তার চা স্পর্শ করেনি, কাপে পুরো চা রয়ে গেছে। কী কারণ কে জানে, হঠাৎ করে বুকটা ধক্ করে ওঠে শিরীনের।

ষোলো তারিখ মিলিটারিরা সারেন্ডার করল রেসকোর্সে। নুরুলকে পাওয়া গেল আঠারো তারিখ রায়ের বাজারের বিলে। হাত পিছনে বাঁধা, মাথায় আর বুকে গুলি। প্রফেসর রায়হানও ছিলেন সেখানে, ডক্টর ইদ্রিসও। আরো অনেকে। সবাইকে শিরীন চেনে না। নুরুলকে তুলে এনে কবর দিল বাসার লোকজন, শিরীনকে দেখতে দিল না। কতদিন পড়েছিল বিলে কে জানে, সুপুরুষ একটা মানুষ মরে গেলে কত তাড়াতাড়ি না বিকৃত হয়ে যায়।

শিরীন লক্ষ করল তার শরীর অল্প অল্প কাঁপছে। কষ্ট করে নিজেকে শান্ত করে সে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বাথরুমের বেসিনে পুরোটা ঢেলে ফেলে দিল। খালি কাপ নিয়ে শোওয়ার ঘরে ফিরে আসতেই মশারির ভেতর থেকে টোপন ডাকলো, আম্মা।

কী বাবা?

তুমি সব সময় চা না খেয়ে ফেলে দাও কেন?

শিরীন ছেলের দিকে তাকাল। আর কেউ ধরতে পারেনি, কিন্তু এইটুকু ছেলে ঠিক ধরে ফেলেছে। কী উত্তর দেবে শিরীন?

কেন ফেলে দাও?

নুরুল সব সময় বলতো বাচ্চাদের কখনো মিথ্যে কথা বলবে না। লোকটা মরে গেছে, তার কথা রাখবে শিরীন, টোপনকে সত্যি কথাই বলবে। বিছানায় উঠে গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে বলল, আমার আর চা খেতে ভাল লাগে না।

কেন?

তোর আব্বুকে যে লোকটা নিয়ে মেরে ফেলেছিল তাকে আমি এক কাপ চা দিয়েছিলাম। লোকটা সে চা-টা খায়নি। সেই থেকে চা দেখলেই আমার সেই লোকটার কথা মনে পড়ে। আমি আর চা খেতে পারি না।

টোপন দীর্ঘসময় চুপ করে থেকে বড় মানুষের মতো বলল, ও।

শিরীন টের পাচ্ছিল তার চোখে পানি এসে যাচ্ছে, অনেক কষ্ট করে আটকে রাখল সে। টোপনের সামনে কাঁদতে চায় না কিছুতেই। খানিকক্ষণ দুজন চুপ করে বসে রইল, তারপর টোপন আস্তে আস্তে বলল, আম্মা।

কী বাবা।

আব্বু তোমাকে যেভাবে ধরে রাখত আমি সেভাবে তোমাকে ধরে রাখব?

রাখ বাবা।

টোপন দুই হাত দিয়ে শক্ত করে শিরীনকে জড়িয়ে ধরে।

হে ঈশ্বর, পৃথিবীর মানুষের জন্যে তুমি এত দুঃখ কেন তৈরি করেছিলে?

বেড সুইচ টিপে আলো নিভিয়ে দিতেই মেঝেতে এক ঝলক চাঁদের আলো এসে পড়ল। জোছনার কোমল আলো এমনিতে চোখ পড়ে না, সেটা চোখে পড়ে যখন সব আলো নিভে যায় তখন।
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

ভালবাসার নক্ষত্র - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

amarboi
ভালবাসার নক্ষত্র

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আজহার ভাই উঠে দাঁড়ালেন, মনে হয় একটা লেকচার ঝাড়বেন। এটা লেকচার ঝাড়ার সময় না আর লেকচার শোনার মতো কারোর মনের অবস্থাও নেই, কিন্তু তবু মনে হয় তিনি তার লেকচারটা ঝেড়ে দেবেন। কে জানে কতক্ষণ থেকে তিনি মনে মনে এটা ঝালাই করছেন। ফরিদ আজহার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে একটা হাই তুলল। এই মানুষটির কথাবার্তা হাবভাব এমনি বৈচিত্র্যহীন যে তাকে দেখলে এমনিতেই হাই উঠে যায়। ছোটখাটো একটা হাই উঠবে ভেবেছিল কিন্তু ফরিদ অবাক হয়ে দেখল সে বিকট একটা হাই তুলল। হাই তুলতে গিয়ে একবার নাকি কার চোয়াল আটকে গিয়েছিল, কিছুতেই আর মুখ বন্ধ হয় না। হাই তোলার সময় মাঝে মাঝেই ফরিদের এই গল্পটা মনে পড়ে, আজো পড়ল। কপাল ভাল তার মুখটা আটকে গেল না হাইটা বের করে দিয়ে সেটা আবার সহি সালামতে বন্ধ হয়ে গেল।

বন্ধুগণ। আজহার ভাই গলা কাঁপিয়ে বললেন, লাল সালাম।

ফরিদ আজহার ভাইয়ের দিকে তাকাল, লোকটার বুদ্ধিশুদ্ধি মনে হয় বেশি নেই। যা ছিল তাও মনে হয় মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিংয়ে একেবারে ধুয়ে-মুছে গেছে। তা না হলে অন্ধকার নদীর তীরে মাঝে দাঁড়িয়ে মশার কামড় খেতে খেতে কেউ কখনো লাল সালাম দেয়? লাল সালাম জিনিসটা কী? সালাম আবার লাল হয় কেমন করে?

বন্ধুগণ, আমাদের দীর্ঘ প্রস্তুতির আজ হবে অগ্নিপরীক্ষা।

লে শালার অগ্নিপরীক্ষা! মাথায় গুলির বাক্স নিয়ে এই যে জলিল খালি পায়ে আঠালো কাদার মাঝে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছে তাকে জিজ্ঞেস করে দেখো দেখি অগ্নিপরীক্ষা কথাটার মানে জানে কি না? একশো টাকা বাজি সে যদি ‘পরীক্ষা’ কথাটার মানে বলতে পারে, ‘অগ্নি’ তো ছেড়েই দিলাম। ফরিদের মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় জলিল এখনো জানে কি না যে সে কোন্ পক্ষে যুদ্ধ করছে, পাকিস্তানের নাকি স্বাধীন বাংলার।

মনে রেখো কমরেডরা, আমরা মরতে আসিনি—আজহার ভাই হুংকার দিলেন, আমরা মারতে এসেছি। শত্রুর বিষদাঁত ভেঙে দেব চিরদিনের মতো।

দাদ ও খুজলির মলম বিক্রি করার সুরে আজহার ভাইয়ের গলা ওঠানামা করতে থাকে। ফরিদ প্রথম খানিকক্ষণ মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করল কিন্তু লাভ হলো না, বক্তব্যটা ঠিক ধরা গেল না। আওয়ামী লীগ দেশের জন্যে কি একটা সাংঘাতিক জিনিস করছে এ ধরনের কথাবার্তা বলে মনে হয়। কিছুক্ষণ শুনে ফরিদ অন্যমনস্ক হয়ে যায় আর ঠিক তার দ্বিতীয়বার হাই উঠল, তার প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেটি আবার বিকট একটি হাইয়ে পরিণত হয়ে গেল। কিছু করার নেই, ফরিদ বুঝতে পারে এখন তার একটার পর একটা হাই উঠতে থাকবে। রাত প্রায় দুইটা বাজে, সারাদিন ঘুম নেই, কিন্তু সেজন্যে তার হাই উঠছে না। তার হাই উঠছে কারণ সে একটু একটু ভয় পাচ্ছে। সে যখন একটু একটু ভয় পায় কিন্তু কিছু করতে পারে না তখন তার এরকম একটার পর একটা হাই উঠতে থাকে। পরীক্ষার হলে প্রশ্ন পাবার ঠিক আগে তার এরকম হাই ওঠে, প্রথমবার গোপনে বিলকিসের সাথে দেখা করার জন্যে সে যখন লাইব্রেরির সামনে অপেক্ষা করছিল তার এরকম হাই উঠছিল। বিলকিস! এখন কোথায় আছে কে জানে? মনে হলেই বুকের ভেতর জানি কী রকম করে ওঠে।

ফরিদ বিরক্ত ভঙ্গিতে আজহার ভাইয়ের দিকে তাকাল। লোকটার আক্কেল বলে কিছু নেই, শুধু ইউনিভার্সিটিতে পড়ে বলে তাকে তাদের গ্রুপ কমান্ডার তৈরি করে দেয়া হয়েছে। লোকটার কী কমান্ডার হবার মতো কোন যোগ্যতা আছে? মুক্তিবাহিনীর একজন কমান্ডার কী ঠিক অপারেশনের আগে এরকম ঘ্যান ঘ্যান করে বইয়ের ভাষায় বক্তৃতা শুরু করে? ফরিদ আবার অন্যমনস্ক হয়ে যায়, আবছা অন্ধকারে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হয় সবকিছু একটা স্বপ্ন, এক্ষুনি তার ঘুম ভেঙে যাবে আর দেখবে সে তার পরিচিত বিছানায় শুয়ে আছে, মাথার কাছে টেবিলে খালি চায়ের কাপ, নিচে সমরেশ বসুর একটা আধখোলা উপন্যাস, জানালা দিয়ে রাতের আকাশ দেখা যাচ্ছে। কখনো কী সে কল্পনা করেছিল অন্য কিছু নয়, শুধু নিজের ঘরে বিছানায় আধশোয়া হয়ে একটা ঝাঁজালো উপন্যাস পড়ার মতো সহজ ব্যাপারটির জন্যে সে এরকম বুভুক্ষের মতো অপেক্ষা করবে? আবার কবে সে করতে পারবে সেটা? পারবে কি কোনদিন? ফরিদ একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

ঠিক তখন আজহার ভাইয়ের বক্তৃতা শেষ হলো, কারণ ফরিদ শুনল তিনি বিকট সুরে বললেন, ‘জয় বাংলা’। বেশি আবেগ দিয়ে বলেছেন বলেই হয়তো সেটা শোনাল ‘জেয় বাংলা’।

সাবই সমস্বরে উত্তর দিল ‘জয় বাংলা’। ভাগ্যিস আশেপাশে কোন বাড়িঘর নেই, থাকলে এই স্লোগান শুনে সবার পিলে চমকে উঠত তাতে কোন সন্দেহ নেই। জয় বাংলা স্লোগানটা এভাবে লেগে যাবে কে জানত, ভাল স্লোগানের নিয়মকানুনের কোনটাই এখানে ব্যবহার করা হয়নি। স্লোগান সব সময় হতে হয় দুই অংশ, একজন চিৎকার করে বলে প্রথম অংশ অন্যরা সবাই তখন বলে দ্বিতীয় অংশ। যেরকম পাকিস্তান-জিন্দাবাদ। একজন বলে পাকিস্তান অন্যেরা বলে জিন্দাবাদ। তাছাড়া ভাল স্লোগানে একটু ছন্দও থাকতে হয়, যেমন ‘টিক্কা খানের চামড়া’ ছিলে নিব আমরা’। জয় বাংলা স্লোগানে না আছে নিয়মকানুন না আছে ছন্দ, প্রথম পার্টি বলে ‘জয় বাংলা’ দ্বিতীয় পার্টিও বলে ‘জয় বাংলা’। এটা আবার কেমন ধরনের স্লোগান? কিন্তু কেমন লেগে গেছে দেখো! পৃথিবীতে আর কি একটি স্লোগানও আছে যেটি শুধু উচ্চারণ করার জন্যে মানুষকে গুলি করে মারা হয়? না বুঝে উচ্চারণ করলেও? পাঁচ বছরের শিশুকেও? আজ থেকে কুড়ি বছর পর কাউকে এটা বললে সে বিশ্বাস করবে যে পৃথিবীর সবচেয়ে নৃশংস জাতি হচ্ছে পাকিস্তান জাতি, শুধু জয় বাংলা স্লোগান দেয়ার জন্যে তারা পাঁচ বছরের শিশুকে গুলি করে মারে?

মনে হয় করবে না।

আজহার ভাই নিশ্চয়ই সবাইকে হাঁটতে বলেছেন, অন্যমনস্ক ছিল বলে ঠিক শুনতে পায়নি। সবাই হাঁটতে শুরু করেছে, ফরিদও তাদের সাথে হাঁটতে শুরু করে। ঘণ্টাখানেক আগে তাদের স্কাউট রাব্বানী মাস্টারকে পাঠানো হয়েছে। মুখে ছাগল দাড়ি আর চোখে সুরমা দেখে কে সন্দেহ করবে সে মুক্তিবাহিনীর ভেতরের লোক। রাস্তায় কোনরকম সমস্যা দেখলে সে ফিরে এসে তাদের থামাবে। সবকিছু ঠিকঠাক হলে থানা থেকে আধমাইল দূরে স্কুলঘরে তাদের সাথে দেখা করার কথা। অনেক ভেবেচিন্তে আজকের অপারেশনটা ঠিক করা হয়েছে। তাদের দলে এখন আটজন। এর মাঝে বেশির ভাগই নতুন। ফরিদ নিজে, আজহার ভাই আর লালু নামের গোমড়া মুখের ছেলেটা আগে ছোটখাটো অপারেশনে গিয়েছে। অন্যেরা আর কেউ কখনো যায়নি, সবেমাত্র ট্রেনিং শেষ করেছে। যারা নতুন তাদের জন্যেই এই সোজা অপারেশনটি বেছে নেয়া হয়েছে। জলাডিঙি থানায় গোটা ছয়েক রাজাকার আর কিছু স্থানীয় পুলিশ থাকে। খালি হাতে গিয়ে ধমকাধমকি করলেই তারা নাকি জামা-কাপড়ে পেচ্ছাব করে দেয়। নিশি রাতে হঠাৎ করে গিয়ে যদি তাদের কানের কাছে মেশিনগান দিয়ে ব্রাশ ফায়ার শুরু করা হয় তাদের বাপ বাপ বলে পালিয়ে যাবার কথা। তখন থানাটা দখল করে স্বাধীন বাংলার পতাকাটা তুলে দিয়ে সময় থাকতে থাকতে আবার সরে আসতে হবে। যারা নতুন তাদের একটু অভিজ্ঞতা হবে, সাহস বাড়বে পরের বার হয়তো আরো বড় কিছু করতে পারবে। পাশের থানায় নাকি পুরো এক কোম্পানি পাকিস্তানি মিলিটারি এসেছে। খবর পেলে তারা চলে আসতে পারে, তার আগেই সরে পড়ার কথা। এখনো তাদের পেশাদার মিলিটারির সাথে সামনাসামনি যুদ্ধ করার সময় হয়নি। সামনাসামনি যুদ্ধ করার জন্যে দরকার ভাল অস্ত্র। একটা চাইনিজ ভারী মেশিনগান, একটা রকেট লঞ্চার আর একটা তিন ইঞ্চি মর্টার থাকলে যুদ্ধের পুরো ব্যাপারটাই অন্যরকম হয়ে যায়। থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা যায়, কিন্তু সত্যিকার যুদ্ধের জন্যে দরকার সত্যিকার অস্ত্র। আটজনের এই দলটাতে রয়েছে মাত্র একটা হালকা মেশিনগান, একটা অটোমেটিক রাইফেল আর একটা স্টেনগান, বাকি সব থ্রি নট থ্রি রাইফেল। যেটুক গোলাগুলি বয়ে নিয়ে যাচ্ছে টেনেটুনে একঘণ্টার মতো চলবে কি না সন্দেহ। আজ অবিশ্যি সহজ অপারেশন, একঘণ্টা দূরে থাকুক মিনিট দশেকও লাগার কথা নয়।

জলিল একটু পিছিয়ে ফরিদের পাশে পাশে হাঁটতে থাকে। নির্বোধ এই মানুষটিকে কেউই কোনরকম গুরুত্ব দেয় না অথচ সেটা নিয়ে তার কোন রকম দুঃখ আছে বলে মনে হয় না। ফরিদ পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল, কষ্ট হচ্ছে বাই?

শব্দটি বাই নয়, শব্দটি ভাই—ফরিদ শুদ্ধ করে দিতে গিয়েও গেল না। লাইট মেশিনগানটা ঘাড় বদল করে বলল, না।

নাম লাইট, বাংলায় যেটার অর্থ হালকা, কিন্তু জিনিসটা কী ওজন! এটাকে কী ঠাট্টা করে এই নাম দেয়া হয়েছে? মনে হয় না, মিলিটারির লোকজনের রসবোধ খুব তীক্ষ্ণ হওয়ার কথা নয়। কে জানে মিলিটারিরা এত তাগড়া জোয়ান হয়ে যে তাদের কাছে হয়তো এটা হালকাই মনে হয়!

জলিল আলাপ চালিয়ে যাওয়ার জন্যে বলল, আপনাগো তো মাল টানাটানি করে অব্যাস নাই।

শব্দটি অব্যাস না, শব্দটি অভ্যাস। এখানেও ফরিদ শুদ্ধ করে দিল না। বলল, অভ্যাস না থাকলে কী হয়? শরীরের আরেক নাম মহাশয়, তাকে যা সহানো যায় তাই সয়।

হা হা হা—জলিল বিকট স্বরে হাসতে থাকে, কিছুতেই আর থামতে পারে না। কথাটি তার এত পছন্দ হয়ে যাবে কে জানত, জানলে ফরিদ বলত না, স্বল্পবুদ্ধির মানুষকে এভাবে উত্তেজিত করা ঠিক না। জলিল অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বলল, বাই, আপনি তো অনেক মজার কথা বলেন। শরীলের নাম মহাশয়—হা হা হা।

শব্দটা শরীল না শব্দটা শরীর। এবারেও ফরিদ শুদ্ধ করে দিল না। একে ঘাঁটিয়ে কাজ নেই, কিছু একটা বললে সেটা তাকে বোঝাতেই হয়তো আধঘণ্টা পার হয়ে যাবে। ফরিদের কাছে খুব বেশি উৎসাহ না পেয়ে জলিল এবারে পিছিয়ে আরেকজনের সঙ্গে আলাপ জমাল। ফরিদ শুনল সে বলছে, শুনছেন, ফরিদ বাই কী কইছেন শুনেছেন? কইছেন, শরীলের নাম মহাশয়, হা হা হা।

জলিলের মাথার ভেতরে গিয়ে একবার দেখতে পারলে হতো সেখানে কী আছে। সম্ভবত চায়ের চামচের দু’চামচ মস্তিষ্ক, এর বেশি হবার কথা নয়। ফরিদের মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে জলিলের মাথায় একটা ঠোকা দিয়ে দেখতে, সে মোটামুটি নিঃসন্দেহ যে তাহলে ভেতর থেকে একটা ফাঁপা আওয়াজ বের হবে!

হালকা মেশিনগানটা আবার ঘাড় বদল করে ফরিদ আকাশের দিকে তাকাল। ঝকঝকে পরিষ্কার একটা আকাশ, লক্ষ লক্ষ নক্ষত্র ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। ঐ যে চারটা তারা চতুর্ভুজের মতো সাজানো, ওটার কী নাম কে জানে? খগোল পরিচয় নামে একটা বই দেখেছিল সে, সবকিছু লেখা ছিল সেখানে, কোন নক্ষত্র কোথায় থাকে, কোনটার কী নাম। তখন কোনই কৌতূহল হয়নি। আজকাল দীর্ঘ রাত সে নক্ষত্রদের দেখে, কোন কোনটার সাথে তার গোপন ভালবাসার মতো রাত হয়ে গেছে। যুদ্ধ যদি শেষ হয় বইটা খুঁজে বের করে তার ভালবাসার নক্ষত্রগুলোর নাম জেনে নিতে হবে।

ফরিদ ভাই

নবাব সিরাজদ্দৌলা ফরিদের কাছে এসে গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করে, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?

করো।

এই চরিত্রটির নাম সিরাজ। ফরিদ মনে মনে তাকে নবাব সিরাজদ্দৌলা বলে ডাকে। তার কারণ তাদের পুরো দলে এর মতো শৌখিন মানুষ আর একটিও নেই, মুক্তিযুদ্ধের চালু ফ্যাশন হচ্ছে চুল দাড়ি গজিয়ে চে গুয়েভারার মতো হয়ে যাওয়া। তার মুখেও লম্বা দাড়ি, চুলও এখন প্রায় কাঁধ ছুঁই ছুঁই করছে। কিন্তু নবাব সিরাজদ্দৌলার লুঙ্গির গোঁজে একটা কৌটায় রয়েছে একটা কমেট ব্লেড, এক টুকরো সাবান আর শবনমের ছবিওয়ালা ছোট একটি গোল আয়না। যখনই সময় পায় মুখে সাবান ঘষে কমেট ব্লেডটি খালি হাতে ধরে সে দাড়ি কামিয়ে ফেলে। ব্যাপারটি বিস্ময়কর, পুরনো একটি ব্লেড দিয়ে কড় কড় শব্দ করে এত তাড়াতাড়ি যে দাড়ি কামিয়ে ফেলা যায় সেটি নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হওয়ার কথা না। শুধু যে দাড়ি কামায় তাই না, তারপর দুই হাঁটুতে ছোট আয়নাটা চেপে ধরে সে তার বগল কামানো শুরু করে দেয়। ভয়াবহ ব্যাপার, দেখে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার অবস্থা হয়। ফরিদ প্রায় নিশ্চিত যে এই চরিত্রটি তার শরীরের অন্যান্য অংশের রোমরাজিকেও সমপরিমাণ উৎসাহে নিয়মিতভাবে উৎপাটিত করে থাকে, তবে কপাল ভাল সেগুলো আর কাউকে দেখতে হয় না। এই যুদ্ধ শুরু না হলে সে ঘূণাক্ষরেও সন্দেহ করতে পারত না যে আপাত দর্শনে নেহায়েত একটি সাদামাটা মানুষের কত রকম বিচিত্র অভ্যাস থাকতে পারে।

নবাব সিরাজদ্দৌলা গলা নামিয়ে বলল, আপনি কি নিজের চোখে কখনো সিনেমার নায়িকা দেখেছেন?

নায়িকা?

হ্যাঁ। শবনম, সুচন্দা, না হয় কবরী?

না, দেখি নাই। কেন?

আমাদের গ্রামের একজন দেখেছে। সে বলেছে সিনেমার মাঝে দেখতে তাদের যত সুন্দর লাগে আসলে নাকি তারা তত সুন্দর না। গায়ের রং নাকি শ্যামলা।

তাই নাকি?

হুঁ। সেইটা কেমন করে হয় ফরিদ ভাই? সেইটা কী হতে পারে?

ফরিদ নবাব সিরাজদ্দৌলার সাথে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি নিয়ে আলাপ করার চেষ্টা করে আবিষ্কার করল, নবাব সিরাজদ্দৌলার তুলনায় চিত্র জগৎ সম্পর্কে তার জ্ঞান একেবারেই সীমিত। নবাব সিরাজদ্দৌলা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে চায়ের দোকানে বসে চিত্রালী গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে আসছে। চিত্র তারকাদের সম্পর্কে সে যেটুকু জানে চিত্র তারকারা নিজেরাও তাদের সম্পর্কে ততটুকু জানে কি না সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ শেষ করায় নবাব সিরাজদ্দৌলার ব্যক্তিগত আগ্রহ রয়েছে, সে আবার চায়ের দোকানে বসে নিরবচ্ছিন্ন শান্তিতে প্রতি সপ্তাহে চিত্রালী পড়া শুরু করতে চায়।

আগুন আছে কার কাছে? সালাম ভাই মুখে একটা সিগারেট চেপে ধরে দল থেকে বের হয়ে দাঁড়ালেন।

আমার কাছে আছে। ফরিদ পকেট থেকে ম্যাচটা বের করে দিল। সালাম ভাইয়ের সিগারেট খাওয়া দেখে তারও সিগারেট ধরানোর ইচ্ছে হলো, পকেট হাতড়ে প্যাকেটটি বের করছিল, সালাম ভাই তাকে থামিয়ে নিজের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে দিলেন। সিগারেট এখন দুষ্প্রাপ্য জিনিস, সবাই নিজের সঞ্চয় যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখে সালাম ভাই ছাড়া। লোকটি অসাধারণ, বলা যায় তাদের দলের একমাত্র খাঁটি ভদ্রলোক। তাদের সবার মাঝে সম্ভবত তার বয়স সবচেয়ে বেশি, বিয়ে করেছেন, দুইটা ছোট ছোট বাচ্চাও রয়েছে। কালীগঞ্জ বাজারের ছোট মনিহারী দোকান ছিল, মে মাসের গোড়ার দিকে মিলিটারির আগুনে পুরো বাজারের সাথে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তখন বউ বাচ্চাকে শ্বশুরবাড়িতে রেখে যুদ্ধে চলে এসেছেন। সালাম ভাই ফরিদকে সিগারেট দিচ্ছেন দেখে শাহজাহান এগিয়ে এসে হাত বের করে দিল। শাহজাহানের নামটি মোগল বাদশাহের হলেও তার স্বভাব চরিত্র ছোটলোকের। ফরিদ লক্ষ করে দেখেছে শাহজাহানের কড়ে আঙুলটি ছোট। কিরোর হাত দেখার বইয়ে পড়েছিল, কারো হাতের কড়ে আঙুল ছোট হলে সে পকেটমার হয়।

সালাম ভাই সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললেন, একটু জিরাতে পারলে হতো। মাজা ব্যথা হয়ে যাচ্ছে।

ফরিদ বলল, আজহার ভাইকে বলি?

না থাক। সালাম ভাই নির্মমভাবে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললেন, ইস্কুল তো এসেই যাচ্ছে, তখন জিরাবো। একটু থেমে যোগ করল, শালার উকুনের জ্বালায় আর পারি না।

ফরিদ হেসে বলল, কেন গালি দিচ্ছেন সালাম ভাই, কালকেই আপনাকে ফাস্ট প্রাইজ জোগাড় করে দিল।

সালাম ভাই উচ্চ স্বরে হেসে উঠল, চাপা গুমোট ভাবটা কেটে হঠাৎ করে পরিবেশটা তরল হয়ে যায়।

দলে সবার মাথায় উকুন হয়েছে। ফরিদ প্রথমবার যখন চিরুনিতে একটা নধর উকুন আবিষ্কার করেছিল তার বিস্ময়ের সীমা ছিল না। লজ্জার এই ব্যাপারটি সে গোপন রাখার চেষ্টা করছিল। কিন্তু দেখা গেল অন্যেরা উকুনের ব্যাপারটি বেশ স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে। সালাম ভাই রসিক ব্যক্তি, তিনি উকুন দিয়ে একটা খেলা আবিষ্কার করে ফেললেন। প্রথমে সবাই গোল হয়ে বসে নিজের মাথা আচড়ে উকুন বের করে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার, প্রথমবার ফরিদের মাথা থেকে মোট চৌদ্দটি নানা আকারের উকুন বের হয়েছিল। তারপর সবাই বেছে সবচেয়ে পুরুষ্ট উকুনটি নিয়ে সালাম ভাইয়ের কাছে আসে। সালাম ভাই তখন কাগজে একটি গোল বৃত্ত আঁকেন। সেটার নাম দেয়া হয় উকুন স্টেডিয়াম। স্টেডিয়ামের মাঝে তিনি সবগুলো উকুন ছেড়ে দেন। যার উকুন সবচেয়ে প্রথম বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসতে পারে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। খেলাটি দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে যাচ্ছে, কারণ অন্যান্য গ্রুপেও সেটি খেলা হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। কিছুদিনের ভেতরে বিভিন্ন মুক্তিবাহিনীর দলের ভেতরে একটা টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হবে বলে শোনা যাচ্ছে। আজহার ভাই আগে এইসব ছেলেমানুষী ব্যাপার থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতেন। ইদানীং তিনিও খেলায় যোগ দিচ্ছেন এবং অন্যদের মতো চিৎকার করে নিজের উকুনকে উৎসাহ দিচ্ছেন। জয়নালের সব ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করার অভ্যাস, সেদিন তার উকুন বিজয়ী হওয়ার পর কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উকুনটিকে আবার নিজের চুলের মাঝে ছেড়ে দিয়েছিল।

আজহার ভাই সবাইকে থামতে বললেন। সামনে স্কুলের দোচালা ঘরটা দেখা যাচ্ছে। ভেতরে রাব্বানী মাস্টার থাকার কথা। তিনি এগিয়ে গিয়ে চাপা গলায় ডাকলেন, রাব্বানী মাস্টার?

কোন উত্তর শোনা গেল না। অভ্যেসবশত সবাই একটু পিছিয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নেয়।

রাব্বানী মাস্টার? আজহার ভাই আবার ডাকলেন, আমি আজহার।

তখন সন্তর্পণে কয়েকজন বের হয়ে আসে। কাছে এলে দেখা গেল রাব্বানী মাস্টার আর তার সাথে আরো দুজন স্থানীয় লোক।

আজহার ভাই ওদের দিকে ঘুরে বললেন, সবাই বিশ্রাম নাও দশ মিনিট। সাথে সাথে যে যেখানে ছিল সেখানেই বসে পড়ল। শরীর এক আশ্চর্য জিনিস, প্রয়োজনে তাকে যা খুশি করিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু বিশ্রামের লোভ দেখালে চোখের পলকে সেটা লুফে নেয়।

থানাটি ঘিরে ওরা আটজন নিঃশব্দে পজিশন নিয়েছে। বেশিরভাগ জায়গায় থানার আশপাশে সব গাছপালা কেটেকুটে পরিষ্কার করে দেয়া হয়েছে। এখানে শুধু গোটা ছয়েক রাজাকার, পাকিস্তানি মিলিটারিরা এখনো আসেনি, এলে নিশ্চয়ই এর চেহারা পাল্টে যাবে। তখন দু-এক মাইলের ভেতরে পজিশন নেয়ার জায়গা থাকবে না।

ফরিদ সড়কটার পাশে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। হালকা মেশিনগানটা রাখার জন্যে একটা সমতোল জায়গা দরকার, কিন্তু সেরকম ভাল জায়গা পাওয়া গেল না। একবার গুলি করা শুরু হলে এটাকে চেপে ধরে রাখতে গিয়ে মনে হয় দম বের হয়ে যাবে। গুলির বেল্ট নিয়ে থাকবে জলিল। ফরিদের কপাল! সবচেয়ে নির্বোধ মানুষটিই সব সময় তার সঙ্গী। কিছু করার নেই, এই নির্বোধ মানুষটিকে মাথায় করে গুলির বাক্স টেনে আনা কিংবা মেশিনগানের গুলির বেল্ট ধরে রাখা এই ধরনের কাজ ছাড়া আর অন্য কোন রকম দায়িত্ব দেয়া যায় না। চেষ্টা করে দেখা হয়েছে, লাভ হয়নি।

ফরিদের ডান দিকে প্রায় ত্রিশ চল্লিশ ফুট দূরে থাকলেন আজহার ভাই, তার সাথে নবাব সিরাজদ্দৌলা। তাদের ডান দিকে সমান দূরত্বে শাহজাহান, তার সাথে লালু। আরো ডান দিকে সালাম ভাই আর জয়নাল। যতটুকু সম্ভব ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, কিন্তু মোটামুটি কাছাকাছি যেন প্রয়োজনে চিৎকার করে কথাবার্তা বলা যায়।

আজহার ভাই প্রথমে একটা গ্রেনেড ছুঁড়বেন, এখান থেকে সেটা থানা পর্যন্ত যাবে না, কিন্তু বিস্ফোরণের একটা প্রচণ্ড শব্দ হবে, সেটা দিয়েই শুরু হবে, সবাই তখন গুলি করা শুরু করবে। গুলি বেশি নেই, বাজে খরচ করা যাবে না, কিন্তু প্রথম কয়েক মিনিট তবুও তুমুল গুলিবর্ষণ করার কথা। একসাথে সবাই না করে, তাল রেখে একজনের পরে আরেকজন, ভেতরে যারা আছে হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে যেন ভয়ে কাপড় জামা নষ্ট করে ফেলে। পিছন দিয়ে পালিয়ে যাবার সুযোগ দেয়া হয়েছে, পাল্টা গোলাগুলি না করে পালিয়ে যাওয়ারই সম্ভাবনা বেশি, তখন থানায় ঢুকে পড়া যাবে। তাদের কিছু গ্রেনেডও আছে, একেবারে কাছাকাছি যেতে পারলে সেগুলো ব্যবহার করা যাবে তবে খুব সাবধানে, নিজেদের গ্রেনেডে নিজেদের আঘাত পাওয়া অনেকগুলো ঘটনা ঘটে গেছে কিছুদিন আগে।

ফরিদ নিঃশব্দে হালকা মেশিনগানটা ধরে শুয়ে থাকে। পেটের ভেতরে কেমন জানি পাক খাচ্ছে, প্রত্যেকবার অপারেশনের আগে আগে তার পেটের ভেতরে এরকম অস্বস্তিকর একটা অনুভূতি হতে থাকে। আকাশের দিকে তাকাল ফরিদ, মেঘ এসে তার প্রিয় নক্ষত্রগুলোকে ঢেকে দিচ্ছে, কে জানে বৃষ্টি হবে কি না।

জলিল ফিসফিস করে বলল, বাই।

কী হলো?

কেমুন একটা গন্ধ আসে না?

ফরিদ নাক টেনে একটা নিঃশ্বাস নিল। সত্যিই কেমন জানি একটা বাজে দুর্গন্ধ আসছে। বলল, হুঁ।

মনে হয় কোন হারামজাদা হেগে রেখেছে ধারে কাছে। কী বলেন?

নিশি রাতে একটি খণ্ড যুদ্ধ শুরু করার পূর্বমুহূর্তে আলাপ করার জন্যে এই নির্বোধ মানুষটি কি এর থেকে ভাল একটি বিষয় খুঁজে বের করতে পারত না?

ঠিক এই সময় বিকট আওয়াজ করে গ্রেনেডের বিস্ফোরণ হলো। রোগাপটকা আজহার ভাই গ্রেনেডটি ভালই ছুঁড়েছেন বলতে হবে। জলিল বলল, বিসমিল্লা, ফরিদ ভাই।

ফরিদ তার ট্রিগার টেনে ধরল। প্রচণ্ড আওয়াজ করে তার হালকা মেশিনগানটি থেকে ঝলকে ঝলকে গুলি বের হতে থাকে, বারুদের ঝাঁঝালো গন্ধ আর কানে তালা লাগানো শব্দে মুহূর্তে সাদামাটা এই গ্রাম্য অঞ্চলটি একটি নিষ্ঠুর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়ে যায়।

সাথে সাথেই থানার ভেতর থেকে মানুষজনের গলায় আওয়াজ শোনা গেল। চিৎকার চেঁচামেচি হৈ চৈ শুরু হয়েছে, এরকমই হওয়ার কথা, কিন্তু ফরিদ তবু একটু অবাক হলো। ভেতরে ছয় সাতজনের বেশি মানুষ থাকার কথা নয়, কিন্তু মনে হচ্ছে অনেক মানুষ। তাছাড়া যে জিনিসটি তাকে বেশি অস্বস্তির মাঝে ফেলে দিচ্ছে সেটি হলো ভেতরে মানুষজন যেন বিজাতীয় ভাষায় কথা বলছে। পাকিস্তানি মিলিটারিরা ঘাঁটি করে ফেলেনি তো? ফরিদ ট্রিগারটি ছেড়ে শোনার চেষ্টা করল আর কী আশ্চর্য, সত্যিই শুনতে পেল পাকিস্তানি সৈন্যরা উচ্চ স্বরে চিৎকার করে একজন আরেকজনের সাথে কথা বলছে। কী সর্বনাশ!

মাই গুডনেস! বেশি ভয় পেলে ফরিদ মাঝে মাঝে ইংরেজিতে একটা দুইটা কথা বলে ফেলে।

জলিল জিজ্ঞেস করল, কী হইছে বাই?

পাকিস্তানি মিলিটারি।

তয়?

তয়, কী কোন বাংলা শব্দ আছে? কিন্তু সেটা নিয়ে এখন মাথা ঘামানোর সময় নেই, আবছা অন্ধকারে থানার ভেতরে হঠাৎ হঠাৎ কাউকে ছুটে যেতে দেখা যাচ্ছে, কয়েকটাকে গুলি করে ফেলে দিতে পারলে হতো। ফরিদ মেশিনগানটা ঘুরিয়ে আবার গুলি করতে থাকে। মারতে কী পারবে কোন শুয়োরের বাচ্চাকে? গুলি করে কি চূর্ণ করে দিতে পারবে কোন শালার মাথা? ঘিলু কি ছিটকে বের করে ফেলে দিতে পারবে? শেষ করে দিতে পারবে হারামজাদার গুষ্টিকে? পারবে কী? চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে ফরিদের, বিজাতীয় একটা আক্রোশ এসে ভর করে ওর উপর। পাগলের মতো গুলি করতে থাকে। গুলির প্রচণ্ড শব্দ যেন আগুন ধরিয়ে দেয় স্নায়ুর ভেতরে। মার হারামজাদাদের—মার!

বাই। জলিল আবার ডাকল।

কী হলো?

মরছে কী একটা দুইটা?

জানি না।

মারেন বাই মারেন। খাঁটি পাঞ্জাবি শালাদের ছাইড়েন না।

ঠিক আছে।

কী কপাল আমাগো, খাঁটি পাঞ্জাবি পাইয়া গেলাম। জলিল অন্ধকারে দাঁত বের করে হাসল।

নির্বোধ হওয়ার অনেক সুবিধে। মোটামুটি একটা বিপর্যয়কেও মাথা মোটা মানুষটি ভাবছে একটা দুর্লভ সৌভাগ্য। কিছু ছেলেমানুষী অস্ত্র নিয়ে ভুল করে এক কোম্পানি পেশাদার মিলিটারিকে আক্রমণ করে ফেলাটা আর যাই হোক ভাল কপালের লক্ষণ হতে পারে না। এখান থেকে সময়মতো সবাই মিলে জান নিয়ে সরে যেতে পারলে বুঝতে হবে তাদের ওপর মা-বাপের দোয়া রয়েছে। তার সম্ভাবনা কম। একমাত্র ভরসার কথা যে যে শালারা জানে না তারা ভুল করে আক্রমণ করে ফেলেছে, নিশ্চয়ই ধরে নিয়েছে জেনে শুনেই এসেছে, সঙ্গে আছে অনেক লোকজন, অনেক রকম অস্ত্রপাতি। তবে পেশাদার মিলিটারি, বেশিক্ষণ ধোঁকা দিয়ে রাখা যাবে না, একটু পরে ঠিকই বুঝে ফেলবে। তাড়াতাড়ি কিছু একটা ঠিক করতে হবে। আজহার ভাই কী করবেন ঠিক করেছেন কি? মানুষটা কথাবার্তা বলতে পছন্দ করে, কিন্তু বিপদের সময় ঠাণ্ডা মাথায় ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কি?

ফরিদ আবার গুলি করতে থাকে। কোথায় পজিশন নেবে হারামজাদারা?

কোথা থেকে গুলি করবে? কতজন আছে কে জানে। না জানি কী রকম অস্ত্র আছে সাথে, ভাল হওয়ারই কথা। হেভি মেশিনগান কি আছে? রকেট লঞ্চার? যাই থাকুক একটানা গুলি করে যেতে হবে, শালারা যেন ভাল পজিশন নিতে না পারে। একবার ঠিক করে পজিন নিয়ে নিলেই সমস্যা, তখন পালানো ছাড়া উপায় নেই।

ওপাশ থেকে প্রথমে গুলি হলো ছাড়া ছাড়া ভাবে। এলোপাতাড়ি গুলি, মনে হচ্ছে রাইফেল। তারপর অটোমেটিক রাইফেলের শব্দ শুনতে পেল। সবশেষে ভারী মেশিনগান, ফরিদ শব্দটা চিনতে পারল, চাইনিজ মেশিনগান! কতদিন থেকে ওরা জোগাড় করার চেষ্টা করছে। কী চমৎকার জিনিস! শালারা গুছিয়ে নিয়েছে কত তাড়াতাড়ি। ফরিদের হিংসে হলো, তিন মাসের ট্রেনিং নিয়ে একটা রাইফেল হাতে বের হয়ে আসা এক কথা, আর দিনের পর দিন বছরের পর বছর মানুষ মারা শেখা অন্য কথা। মনে হচ্ছে বেশিক্ষণ আর এখানে থাকা যাবে না। আজহার ভাইয়ের সাথে একবার কথা বলতে পারলে হতো। ফরিদ গুলি করা থামিয়ে ডাকল, আজহার ভাই।

আজহার ভাই শুনতে পেলেন না। দু’পক্ষের গুলির শব্দে এখন কানে তালা লাগার অবস্থা। ফরিদ আবার গলা উঁচিয়ে ডাকল, আজহার ভাই—

কী হলো?

কী করবেন এখন?

আজহার ভাই শুনতে পেলেন না, বললেন, কী বলো?

ফরিদ আবার চিৎকার করে বলল, কী করবেন এখন?

আর ঠিক তখন ব্যাপারটি ঘটল।

গুলির আঘাত প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক বলে যে ধারণা রয়েছে সেটি সত্যি নয়। তবে সেটি শক্তিশালী, একটি ছোট বুলেটে যে এত শক্তি থাকতে পারে সেটি ফরিদের ধারণা ছিল না। প্রচণ্ড আঘাতে ছিটকে পড়ে গিয়েও বুঝতে পারেনি কী হয়েছে? তার কয়েক মুহূর্ত লাগল বুঝতে। যখন বুঝতে পারল সে গুলি খেয়েছে প্রচণ্ড আতঙ্কে সে উঠে বসার চেষ্টা করল আর হঠাৎ করে আবিষ্কার করল সে উঠতে পারছে না। প্রথমবার মৃত্যুভয় পেল সে, ভয়ংকর সেই ভয়। যন্ত্রণাটি এলো একটু পরে। প্রথমে এলো সূক্ষ্ম একটু যন্ত্রণা হিসেবে, ভোঁতা একটু যন্ত্রণা, বোঝা যায় না এরকম। তারপর সেটি বাড়তে শুরু করল। কিছু বোঝার আগে হঠাৎ অমানুষিক একটা যন্ত্রণা তার পুরো অনুভূতিকে গ্রাস করে নেয়। আকাশের দিকে মুখ করে সে নিঃশ্বাস নিতে চেষ্টা করে, কিন্তু কিছুতেই বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারে না। পৃথিবী থেকে কে যেন সমস্ত বাতাস শুষে নিয়েছে। আহ খোদা! তুমি কী করলে এটা? কী করলে?

জ্ঞান হারানোর আগে সে দেখতে পায় জলিল তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে ডাকছে, ফরিদ বাই বাই, ও বাই। আল্লাহর কসম ফরিদ বাই—আল্লাহর কসম—

জলিলের আর্ত চিৎকার, গুলির প্রচণ্ড শব্দ সবকিছু ধীরে ধীরে ধরে মিলিয়ে যাচ্ছে, প্রাণপণে তাকিয়ে থাকার চেষ্টা করে ফরিদ, কিন্তু সবকিছু ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে যায় তার সামনে। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেই চেতনা হারাল ফরিদ।

ফরিদের মনে হলো সে প্রায় একযুগ পরে চোখ খুলে তাকাল। এত অন্ধকার কেন চারদিকে? কোথায় সে? কিসের এত শব্দ চারিদিকে? হঠাৎ করে দুঃস্বপ্নের মতো সব মনে পড়ে গেল। চমকে উঠে বসার চেষ্টা করল সে সাথে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় সারা শরীর কেঁপে ওঠে তার। চেতনা হারিয়ে যাচ্ছিল তার, অনেক কষ্টে আবার অবচেতনার অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনল নিজেকে। মুখের উপর ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছে, প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় সারা শরীর শিউরে উঠছে তার। একটু উষ্ণতা কী পাওয়া যায় না কোথাও? কেউ কি আছে আশপাশে? মাথা ঘুরে তাকাল চারদিকে। না কেউ নেই। সবাই চলে গেছে। সবাই চলে গেছে? সবাই? তাকে ফেলে?

এক আশ্চর্য শূন্যতা গ্রাস করল তাকে। এই তাহলে শেষ? নিজের ঘরে নিজের বিছানায় শুয়ে আর সে কখনো আকাশের দিকে তাকাবে না। বিলকিসকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে কোনদিন সে তার ঠোঁট স্পর্শ করবে না? কোনদিন না? ঠিক জানে না কার উপর কিন্তু এক প্রচণ্ড অভিমানে তার চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে আসে। বুক ভেঙে যায় এক অসহনীয় দুঃখে। আস্তে আস্তে সে ডাকল, মা, মাগো—

গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু কেউ তার ডাকের উত্তর দিল না।

ফরিদ আবার তলিয়ে গেল বিস্মৃতির অন্ধকারে।

ফরিদ দেখল ওর মা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। ফিসফিস করে বললেন, খোকা তোকে বলেছিলাম না তুই যাসনে, তুই কেন গেলি? কেন গেলি?

মা তুমি বুঝবে না মা। তুমি বুঝবে না।

কেন গেলি তুই? কেন গেলি? বাবা আয় আমার বুকে আয়। আয়। মা হাত তুলে ওর দিকে এগিয়ে এলেন।

না না মা, তুমি যাও, ফরিদ চিৎকার করে বলল, তুমি যাও। তোমার কাপড়ে রক্ত লেগে যাবে, কত রক্ত দেখো। তুমি যাও।

আয় বাবা একবার আয় আমার কোলে আয়। একবার আয়। মাত্র একবার।

না না না। যাও মা, যাও। মিলিটারি এসে যাবে মা ভোর হলেই মিলিটারি আসবে, খুঁজে খুঁজে বের করবে আমাকে মা। তুমি যাও।

বাবা তুই কেন গেলি? কেন গেলি?

মিলিটারি এসে আমাকে গুলি করে মারবে এখন, তুমি যাও, তুমি সেটা দেখো না।

বাবা আমার সোনা আমার ধন আমার তুই কেন গেলি বাবা আমায় ছেড়ে। কেন গেলি?

তুমি বুঝবে না মা, তুমি বুঝবে না। যেতে হয়।

কেন যেতে হয়? কেন যেতে হয়? কেন? ফরিদ কথা বলো। ফরিদ। ফরিদ ফরিদ—

ফরিদ আবার চোখ খুলে তাকায়। কে ডাকছে তাকে?

ও ফরিদ। ফরিদ বাই।

সত্যিই কেউ ডাকছে তাকে। কে? এটা কি স্বপ্ন? না কি সত্যি? কে ডাকছে? তার মাথার কাছে বসে আছে কে?

জলিল! আজহার ভাই! পিছনে কে? গুলি মেরে এগিয়ে আসছে ওরা কারা? শাহজাহান? সিরাজ? লাল্লু? তাকে নিয়ে যেতে এসেছে? সত্যি তাকে নিয়ে যাবে?

গুলির শব্দ হচ্ছে, কী প্রচণ্ড গুলি বৃষ্টির মতো গুলি হচ্ছে, লক্ষ কালবোশেখী যেন একসাথে নেমে এসেছে ওদের মাথার ওপর। আহা! কী শব্দ! এত শব্দ কেন! সব শব্দ ঝাপসা হয়ে যায়, তারপর আবার নদীর স্রোতের মতো চেতনা ফিরে আসে তারপর আবার মিলিয়ে যায়। তার মাঝে আবার সে কথা শুনতে পারে, আজহার ভাই বলেছেন, না জলিল তুমি পারবে না।

পারুম বাই। আপনি আমারে দেন।

তুমি পারবে না।

পারুম বাই। বাংকার থাইকা হেভী মেশিনগান চালাইছে বাই, কুনোদিন ফরিদ বাইরে লইয়া যাইতে পারবেন না। আমারে দেন দুইটা গ্রেনেড একবারে কাছে গিয়া ভেতরে ফালাইয়া দিই। মিশিনগানটা বন্ধ কইরা আসি।

পাগল! তুমি মরবে!

না বাই এই সময়ে অফয়া কথা বইলেন না। থু থু থু। আমি মরমু না। পীর সাহেবের তাবিজ আছে আমার গলায়। এই দেহেন। দেন বাই দুইটা গ্রেনেড। পিনটা টাইনা বার করবার কতক্ষণ পরে যেন ফুটে?

আকাশ থেকে যেন বজ্র নেমে আসে পৃথিবীতে। ধ্বংস করে দেবে সৃষ্টি জগৎ। তার মাঝে সরীসৃপের মতো গুড়ি মেরে জলিল এগিয়ে যায় দুটি গ্রেনেড নিয়ে। পাথরের মতো মুখ করে অন্যেরা বসে আছে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে। বিস্ফোরণের শব্দের সাথে সাথে প্রচণ্ড গুলির বন্যায় ভাসিয়ে দিবে চারদিক, তার মাঝে টেনে সরিয়ে নেবে ফরিদকে, রাব্বানী মাস্টার গ্রামের লোকজন নিয়ে বসে আছে অদূরে। ফরিদকে নিয়ে ছুটে যেতে হবে ডাক্তারের কাছে, খবর চলে গেছে ডাক্তারের কাছে, চার গ্রামে একজন মাত্র ডাক্তার, কিন্তু তাতে কী? ঘুম ভেঙে উঠে এসেছে চার গ্রামের লোক, তারা কি এক নজর দেখতে পারবে বিদ্যুতের ঝলক এই তরুণদের? যারা পিশাচের জিব ছিঁড়ে আনে খালি হাতে?

আকাশে মেঘ কেটে আবার নক্ষত্র দেখা দিয়েছে। ঐতো ভালবাসার নক্ষত্র ফরিদের দিকে তাকিয়ে আছে জ্বল-জ্বল করে নিঃসঙ্গ নক্ষত্র, ভাল করে তাকিয়ে দেখো। আমি যদি না থাকি তোমায় পৃথিবীকে বলতে হবে এর ইতিহাস।

ছাই, চোখে পানি আসে কেন?

ঝাপসা হয়ে আসে ভালবাসার নক্ষত্র, কিন্তু ফরিদ জানে বিস্ময়াভিভূত এই নক্ষত্র মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

জঞ্জাল (ছোটগল্প) - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

amarboi
জঞ্জাল

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আমার বাসাটির নাম জনসন হাউজ। শুধু নামেই বাসা আসলে এটি একটি পুরাতন গুদাম ঘরের মতো। বাসার যিনি মালিক তিনি বাসার প্রতি বর্গইঞ্চি ব্যবহার করে অসংখ্য ছোট ছোট খুপড়িতে ভাগ করে নিয়েছেন। একেকটা খুপড়ি একেকজনের কাছে ভাড়া দেয়া হয়, ভাড়া নেয় আমার মতো দরিদ্র ছাত্রেরা। পুরাতন, অন্ধকার, মলিন ঘর, আমরা যারা থাকি পয়সা বাঁচানোর জন্যেই থাকি। শুনে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু ঘরের ভাড়া ঊনষাট ডলার। এক ডলার বাড়িয়ে এটাকে ষাট ডলার কেন করে দেয়া হলো না সেটি এখনো আমার কাছে রহস্য। ঊনষাট ডলারের সেই খুপড়িতে আমার বেশ চলে যাচ্ছিল। অসুবিধে যে হয় না তা নয়, বাথরুম এবং রান্নাঘর বারোয়ারি, সময় মতো ব্যবহার করার জন্যে লাইন না দিলে হাতছাড়া হয়ে যায়। সস্তা ঘর বলে ছাত্র ছাড়াও আরো কিছু চালচুলোহীন মানুষ থাকে। তাদের কেউ কেউ পাকাপাকিভাবে রান্নাঘরে বসে সস্তা মদ খেতে থাকে। প্রথম দিকে বেশ হাসিখুশি থাকে কয়েক বোতল খাওয়ার পর তাদের মেজাজি মর্জি পাল্টে যায়। বাসার ম্যানেজার সাতফুট উঁচু তিনশ পাউন্ড ওজনের একজন দানববিশেষ, কেউ কোন গোলমাল করার সাহস পায় না। কিন্তু সব মিলিয়ে বাসাটিতে এক ধরনের দূষিত পরিবেশ। সামনের ক্রিসমাসের ছুটিতেই এখান থেকে সরে মোটামুটি একটা ভদ্র এলাকায় চলে যাব বলে ঠিক করেছি।

একদিন রাতে ল্যাবরেটরি থেকে ফিরে এসেছি, ঘুমানোর আগে এক কাপ চা খাবার ইচ্ছে হলো। রান্নাঘরটি বাসার বেসমেন্টে অনেক ঘুরে যেতে হয়। রান্নাঘরের কাছাকাছি আসতেই একটা হল্লা শুনতে পেলাম, মনে হলো খুব আনন্দের কিছু ঘটছে। মধ্য রাতে মদ্যপ কিছু মানুষের আনন্দ সুখের ব্যাপার নাও হতে পারে। ভয়ে ভয়ে রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে দেখি ভারতীয় চেহারার বুড়ো একজন মানুষ পাংশু মুখে খাবার টেবিলে বসে আছে, সামনে একটা পাউরুটি। তাকে ঘিরে বসে আছে এই বাসার উচ্ছৃঙ্খল ছেলেগুলো। একজনের হাতে একটা বিয়ারের বোতল, চেষ্টা করছে বুড়ো মানুষটিকে এক ঢোক খাইয়ে দিতে। আমাকে দেখে তাদের উল্লাসে একটু ভাটা পড়ল, আমি নিজের ভয়টাকে ঢেকে জিজ্ঞেস করলাম, কী হচ্ছে ওখানে?

পার্টি। ওয়াইল্ড পার্টি।

তরুণগুলো আমাকে উপেক্ষা করে আবার সেই বৃদ্ধকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। একজন তার ঘাড় ধরে মুখটা হাঁ করিয়ে রাখে, অন্যজন তার মুখে বিয়ার ঢালতে চেষ্টা করে। ব্যাপারটির অমানুষিকতা সহ্য করার মতো নয়। আমার কপালে বড় দুঃখ হতে পারে জেনেও আমি গলা উঁচিয়ে বললাম, ছেড়ে দাও তোমরা ওকে। ছেড়ে দাও।

একজন চোখ লাল করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কোথাকার লাট সাহেব আমাদের মজা নষ্ট করতে এসেছ? তারপর আমার সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করা সংক্রান্ত কিছু কুৎসিত গালিগালাজ করে দিল।

মাতাল মানুষের চরিত্র নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা খুব কম, কিন্তু মধ্যরাতে একাধিক মদ্যপ তরুণের সাথে ঝগড়া বিবাদ শুরু করার ফল যে শুভ নাও হতে পারে সেটি বুঝতে আমার এতটুকু দেরি হলো না।

আমি আমার ভয় গোপন করে চিৎকার করে বললাম, এক্ষুনি ছেড়ে দাও ওকে, না হয় আমি পুলিশ ডাকব। তোমরা পেয়েছটা কী? এটা কি মগের মুল্লুক নাকি?

আমার চিৎকার আর চেঁচামেচির জন্যেই কি না জানি না তারা বৃদ্ধটিকে ছেড়ে দিল। আমার দিকে তাকিয়ে কিছু কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করে বলল, তোমার চোদ্দগুষ্টিকে আমি ইয়ে করি।

আমি বুক টান করে বললাম, দূর হও এক্ষুনি, না হয় আমি ম্যানেজারকে ডাকছি। পুলিশের ভয় দেখিয়ে যে কাজটি করা যায়নি, ম্যানেজারের ভয় দেখিয়ে সেটা করা গেল। সত্যি সত্যি পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুলিশ এসে বড় জোর খানিকক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করে একটু শাসিয়ে যাবে। ম্যানেজারের বেলা ভিন্ন কথা, তাকে খবর দেয়া হলে সে কারো কোন কথা না শুনে এই উচ্ছৃঙ্খল মদ্যপ তরুণগুলোকে এমনভাবে রগড়ে দেবে যে দীর্ঘদিনের জন্যে তারা সিধে হয়ে থাকবে। ম্যানেজারের গায়ের রং কুচকুচে কাল হতে পারে, তার আকার আকৃতি দানবের মতো হতে পারে, কিন্তু তার মনটি শিশুর মতো কোমল। গান্ধী ছায়াছবি দেখার পর থেকে তার ধারণা পাক-ভারত উপমহাদেশের আমরা সবাই একটি ছোটখাটো গান্ধী এবং আমাদের রক্ষা করার জন্যে সে প্রয়োজনে নিজের জানও দিতে রাজি আছে!

ছেলেগুলো বিদায় নেয়ার পর আমি ভারতবর্ষীয় এই বৃদ্ধ লোকটির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কে? এখানে কী করছেন?

বৃদ্ধ লোকটি বাংলাদেশের স্কুল মাস্টারের ইংরেজি উচ্চারণে বললেন, আমার নাম শওকত আলী। আমি একটা ঘর ভাড়া করে থাকব। ভদ্রলোক তখনো ভয়ে একটু একটু কাঁপছেন।

আপনি কোন দেশের?

বাংলাদেশের। আপনি?

আমি উৎফুল্ল হবার ভান করে বললাম, আমিও বাংলাদেশের! কী যোগাযোগ!

এবারে আমরা বাংলায় কথা বলতে শুরু করলাম। সামনের চেয়ারে বসে জিজ্ঞেস করলাম, এত জায়গা থাকতে জনসন হাউজে এলেন কী মনে করে?

ইউনিভার্সিটিতে কাজ পেয়েছি একটা, এটা ইউনিভার্সিটির কাছে তাই এসেছি। এই অবস্থা কে জানত—

কী কাজ?

কাফেটেরিয়াতে বাসনপাতি ধোয়া।

আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এই বৃদ্ধটির দিকে তাকালাম। কমবয়সী তরুণেরা নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করার জন্যে আমেরিকা পাড়ি দিয়ে বাসনপত্র ধোয়াধুয়ি করছে, ট্যাক্সি চালাচ্ছে ব্যাপারটা বুঝতে পারি, কিন্তু এই বয়সের একজন মানুষ জনসন হাউজের মতো একটি বাসায় একটা ছোট খুপড়ি ভাড়া করে কাফেটেরিয়াতে বাসন ধুচ্ছেন, ব্যাপারটা কেমন যেন গ্রহণ করা যায় না।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, কবে এসেছেন আপনি?

আমি?

হ্যাঁ।

অনেকদিন হলো। শওকত সাহেব আঙুলে গুনে বললেন, নয় বছর।

নয় বছর?

হ্যাঁ।

এর আগে কোথায় ছিলেন?

শওকত সাহেব একটু ইতস্তত করে বললেন, ছেলের কাছে।

ছেলের কাছে? আমি অবাক হয়ে বললাম, আপনার ছেলে এখানে আছে?

হ্যাঁ। আমার চার ছেলে তিন মেয়ে। একটা মেয়ের দেশে বিয়ে হয়েছে, সে দেশে আছে। আর সবাই এখানে।

কারো ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে কৌতূহল দেখানো ঠিক নয়, কিন্তু আমি জিজ্ঞেস না করে পারলাম না, এই বয়সে আপনি এখানে পড়ে আছেন কেন? ছেলেদের সাথে থাকেন না কেন?

ভদ্রলোক কেমন জানি আহত একটা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বাবা, এই দেশের তো এটাই নিয়ম। সবাই নিজের পায়ে দাঁড়ায়। শুধু শুধু ঘরে বসে না থেকে একটু কাজকর্ম করে নিজেকে ব্যস্ত রাখি আর কী! একটু থেমে যোগ করলেন, যদি ভাল না লাগে ছেলের কাছে চলে যাব।

ভাল লাগা না লাগার কী আছে, চলে যান ছেলের কাছে! এটা একটা থাকা হলো! আমরা কমবয়সী বলে পারি, আপনি কেমন করে পারবেন?

তা ঠিক। ভদ্রলোক দুর্বলভাবে মাথা নেড়ে বললেন, তা ঠিক।

এরপর শওকত সাহেবের সাথে প্রায়ই দেখা হতে লাগল। খুব ভোরে উঠে রান্নাঘরে কেউ আসার আগে নাশতা করে নিতেন। রুটি, টোস্ট, মাখন এবং ডিম। এই বয়সে প্রতিদিন সকালে দুটো করে ডিম খাওয়া যে তার জন্য ভাল নয় ব্যাপারটা তাকে ঠিক বোঝাতে পারলাম না। সম্ভবত মধ্যবিত্ত পরিবারে বড়ে হয়েছেন, ধরে নিয়েছেন দুধ মাখন ডিম হচ্ছে বড়লোকের ভাল খাবার। যৌবনে যেটা খেতে পাননি এখন সেটা পুষিয়ে নিচ্ছেন। নাস্তা করে নীল রঙের একটা পার্কা পরে তিনি কাজে যেতেন, এক হাতে সব সময় একটা ছাতা অন্য হাতে দুপুরের খাবার। সারাদিন কাজ করে বিকালে ফিরে আসতেন। রাতের খাবার রান্না করে নিজের রুমে নিয়ে যেতেন, সম্ভবত অন্য সবার সামনে হাত দিয়ে খেতে তার লজ্জা লাগত।

শনি রবিবার ছুটির দিন, আমি বেলা করে ঘুমাই। ঘুম থেকে উঠে নাশতা করতে বাইরে যাচ্ছিলাম, দেখি শওকত সাহেব জনসন হাউজের সামনে হাঁটাহাঁটি করছেন। পরনে পরিষ্কার জামা-কাপড় এবং গলায় একটা টাই। এক হাতে চকলেটের একটা বাক্স। আমাকে দেখে একটু লাজুক ভঙ্গিতে বললেন, উইক এন্ডে ছেলের বাসায় যাবার কথা। এসে নিয়ে যাবে। নাতিটার জন্যে একটা চকলেটের বাক্স কিনলাম। এক টুকরা চকলেট খেতে পেলে আর কিছু চায় না।

আমি বললাম, বেশ, ভাল। উইক এন্ডে যদি সবাইকে নিয়ে একটু হৈ চৈ না করেন কেমন করে হবে! কখন ফিরে আসবেন?

দেখি। কাল রাতের মাঝে আসতে হবে। ভোর বেলা তো আবার কাজ!

নাশতা করে আড্ডা মেরে ফিরে আসতে আসতে বেলা একটা বেজে গেছে, দেখি তখনো বাইরে শওকত সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে দেখে দুর্বলভাবে একটু হাসলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী হলো গেলেন না?

ইয়ে, মানে—ছেলে এখনো আসেনি তো, তাই অপেক্ষা করছি। খুব ব্যস্ত মানুষ। উইক এন্ডে তো কথাই নেই! নাতিটা কারাটে স্কুলে যায়, নাতিটা ব্যালে ক্লাসে! সবাইকে নামিয়ে আসতে আসতে মনে হয় দেরি হয়ে যায়।

আমি বিকেল চারটার সময় জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম শওকত সাহেব তখনো সেজেগুজে বাইরে অপেক্ষা করছেন। তখনো তার ছেলের বৃদ্ধ বাবাকে তুলে নিয়ে যাবার সময় হয়নি।

ছুটির দিনে প্রায়ই এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে। শওকত সাহেব সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছেন তার ছেলে এসে তাকে নিয়ে যাবে, কিন্তু তার ছেলের দেখা নাই। কেমন ধরনের ছেলে আমি ভেবে পেতাম না। আমি কখনো সোজাসুজি জিজ্ঞেস করিনি। কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলতে পারি এই বৃদ্ধ মানুষটিকে দেশ থেকে জোর করে ধরে নিয়ে এসে আমেরিকার নাগরিকত্ব দিয়ে দেয়া হয়েছে তার অন্য ছেলেদের আনার জন্যে। ছেলেরা পাকাপাকিভাবে আসন গেড়ে নেবার পর হঠাৎ করে আবিষ্কার বাবা একটি বাড়তি যন্ত্রণার মতো। এক ছেলে অন্য ছেলের ঘাড়ে গছিয়ে দেবার চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত তার গতি হয়েছে জনসন হাউজের এই দূষিত খুপড়িতে।

আমার ভদ্রলোকের জন্য একটু মায়া হতো সত্যি, কিন্তু তার জন্যে কিছু করতে পারতাম না। নিজের কাজে ব্যস্ত থাকি, অন্যদের সাথে কথা বলার সময় নেই। সময় থাকলেও বন্ধুদের সাথে হৈ চৈ করে আড্ডা মারি। এই বৃদ্ধ মানুষের সাথে কথা বলার সময় কোথায়? নিজের ছেলে যদি তার বাবার দায়িত্ব নিতে না পারে আমি কেমন করে নেব?

একদিন শওকত সাহেব খুব উৎসাহ নিয়ে আমার ঘরে এসে হাজির হলেন, জিজ্ঞেস করলেন, এই শনিবারে কী করছ?

এখনো ঠিক করিনি। কেন?

আমার নাতির জন্মদিন, আমার ছেলে তোমাকে যেতে বলেছে।

সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষের ছেলের জন্মদিনে যাবার আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই, কিন্তু কথাটা সোজাসুজি শওকত সাহেবকে বলতে পারলাম না। বললাম, দেখি কী রকম প্রোগ্রাম হয়।

শওকত সাহেব বললেন, না না কোন প্রোগ্রাম রাখবে না। আমার সাথে যাবে তুমি।

শওকত সাহেবের প্রবল উৎসাহে সত্যি সত্যি পরের শনিবার আমি চকলেটের একটা বাক্স নিয়ে তার ছেলের বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। শহরের সম্ভ্রান্ত এলাকায় বিরাট এলাকা নিয়ে চমৎকার দোতলা বাসা। ছেলের জন্মদিন উপলক্ষে স্থানীয় বাঙালিরা এসেছে, খাবারের বিশাল আয়োজন। আমি ইউনিভার্সিটির ছাত্র, এখানে যারা এসেছে তাদের সবাই মোটামুটিভাবে প্রতিষ্ঠিত। কারো সাথে আমার পরিচয় নেই। ভেবেছিলাম সন্ধেটা পুরোপুরি মাটি হবে, কিন্তু লোকজনের সাথে পরিচয় হওয়ার পর সময়টা বেশ ভালই কাটল। শওকত সাহেবের দুই ছেলে এবং তাদের স্ত্রীদের সাথে পরিচয় হলো। তৃতীয় ছেলেটি আমেরিকান বিয়ে করেছে বলে এরকম জায়গায় আসে না। আমি ভেবেছিলাম এই বৃদ্ধ মানুষটিকে এভাবে জনসন হাউজে ফেলে না রেখে নিজেদের বাসায় নিয়ে রাখার কথা বলব, কিন্তু তার সুযোগ হলো না। চারদিকে এত হৈ চৈ আনন্দ, তার মাঝে এ ধরনের কথাবার্তা মনে হয় একেবারে খাপ খায় না। আমি শওকত সাহেবের দুই ছেলের টেলিফোন নাম্বার নিয়ে এলাম, ফোনে কথা বলব কোন একদিন।

শরৎকাল পর্যন্ত শওকত সাহেব ভালই ছিলেন, শীতের শুরুতে তার শরীর খারাপ হয়ে গেল। এদেশে শীতকালটি বড় বাজে সময়। ভোর আটটা বেজে গেলেও সূর্য ওঠে না আবার বিকেল চারটার মাঝে অন্ধকার নেমে আসে। বাইরে কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস, বৃষ্টিভেজা প্যাঁচপ্যাঁচে কাদা সব মিলিয়ে মন খারাপ করা একরকমের আবহাওয়া। জনসন হাউজে ঘর গরম রাখার ভাল ব্যবস্থা নেই, শওকত সাহেবের বুকে কাশি বসে গেল। কাজ কামাই করে তিনি কয়দিন ঘরে বসে থাকলেন। আমি একদিন শওকত সাহেবের ছেলের বাসায় ফোন করলাম, ছেলে ছিলেন না তার স্ত্রী ফোন ধরলেন। নিজের পরিচয় দিতেই ভদ্রমহিলা একটু শঙ্কিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে?

শওকত সাহেবের শরীর খারাপ।

কী হয়েছে?

ঠাণ্ডা লেগেছে, জ্বর কাশি। আমার মনে হয় তাকে আপনারা এখন আপনাদের বাসায় নিয়ে যান। এখানে থাকলে খুব কষ্ট হবে।

ভদ্রমহিলা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আপনাকে আমার ভাশুরের টেলিফোন নাম্বার দিই, আপনি তাকে ফোন করে বলেন।

কী বলব?

শ্বশুরকে তার বাসায় নিয়ে যাবার জন্যে।

আমি উষ্ণ হয়ে বললাম, আমি কেন বলব? বুড়ো একজন মানুষ কষ্ট পাচ্ছে শীতের মাঝে, ছেলেরা এত ভাল বাসায় থাকে আর বুড়ো বাবাকে নিয়ে নিজের বাসায় রাখতে পারবে না? এটা কোন ধরনের কথা?

অন্য পাশ থেকে ভদ্রমহিলাও উষ্ণ হয়ে উঠে বললেন, দোষ শুধু আমাদের? কতদিন নিজের ঘাড়ে টেনেছি আপনি জানেন? আমার সাহেবই শুধু ছেলে? অন্যেরা তার ছেলে না? দরকারে অদরকারে শুধু আমাদের খোঁজ পড়ে? অন্যেরা আছে কী জন্যে?

আপনাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার আপনারা বোঝেন, একজন বুড়ো মানুষ কষ্ট পাচ্ছেন নিজের ছেলেরা দেখছে না জিনিসটা ভাল দেখায় না, তাই বললাম। যা ইচ্ছে হয় করেন।

আমি রেগে মেগে টেলিফোন রেখে দিলাম।

সন্ধেবেলা শওকত সাহেবকে দেখতে গেলাম। কম্বল মুড়ি দেয়ে বিছানায় পা তুলে বসে আছেন। ঘরের মাঝামাঝি ছোট একটা ইলেকট্রিক হিটার ঘরটাকে গরম করার চেষ্টা করছে। আমাকে দেখে দুর্বলভাবে হেসে বললেন, এই ঠাণ্ডাটা বড় কাহিল করে দিয়েছে।

হ্যাঁ। ভীষণ ঠাণ্ডা পড়েছে এবার। আপনার শরীর কেমন?

এই বয়সে আর শরীর। আল্লাহ্ আল্লাহ্ করে কাটিয়ে দিই আর কয়টা দিন।

ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেন?

না যাইনি।

আপনার হেলথ ইন্স্যুরেন্স আছে?

ইন্স্যুরেন্স? মনে হয় আছে। মেজো ছেলেটা সেদিন নিয়ে গিয়ে করিয়ে দিল।

সেদিন করিয়ে দিল মানে? আগে অসুখ বিসুখ হলে কী করতেন?

শওকত সাহেবকে একটু বিভ্রান্ত দেখা গেল। আমি কথা বলে বুঝতে পারলাম তার আলাদা করে কোন রকম হেলথ ইন্স্যুরেন্স নেই। এ দেশের বুড়ো মানুষদের জন্যে সরকার থেকে দায়সারা যে চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে সেটাই একমাত্র অবলম্বন। মেজো ছেলেটি তাকে নিয়ে যে ইন্স্যুরেন্স কিনে দিয়েছে সেটা লাইফ ইন্স্যুরেন্স। শওকত সাহেব মারা গেলে মেজো ছেলে মোটা অংকের টাকা পাবেন। বুড়ো মানুষ মারা তো যাবেনই তাকে বিক্রি করে কিছু বাড়তি টাকা পেলে মন্দ কী? ব্যাপারটা ভেবে আমার কেমন জানি গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।

শওকত সাহেবের সাথে আরো কিছুক্ষণ কথাবার্তা হলো। ভদ্রলোকের মনটা নিশ্চয়ই দুর্বল হয়েছিল। ঘুরে ফিরে শুধু তার মৃত স্ত্রীর কথা বললেন। হৃদয়হীন এই পৃথিবীতে স্ত্রীর স্মৃতি ছাড়া ভালবাসার আর কিছু তার জন্যে অবশিষ্ট নেই।

শওকত সাহেব এক সপ্তাহ পরে মারা গেলেন। রাতে কাজ থেকে ফিরে এসে ম্যানেজারের কাছে শুনলাম দুপুরে তার ঘর থেকে গোঁ গোঁ ধরনের একটা শব্দ হচ্ছিল। দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ভেঙে ফেলা হলো। ভেতরে তিনি বিছানায় অচেতন হয়ে পড়েছিলেন, মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্স ডেকে সাথে সাথে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। ম্যানেজারের কাছে তার ছেলের টেলিফোন নাম্বার ছিল তাদেরকে খবর দেয়া হয়েছে। তার ঠিক কী হয়েছিল এখনো জানা যায়নি, সন্দেহ করা হচ্ছে স্টোক বা হার্ট অ্যাটাক জাতীয় কিছু হয়েছে।

হাসপাতালে যেতে আমার একেবারেই ভাল লাগে না। আমি তবু শওকত সাহেবকে দেখতে গিয়েছিলাম। ভিজিটরদের সময় পার হয়ে গিয়েছিল তবু আমাকে যেতে দিল। হাসপাতালের বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে আছেন। নাকে একটি নল লাগানো।

নিশ্চয়ই অক্সিজেন দেয়া হচ্ছে। হাতে পায়ে নানা ধরনের ওষুধপত্র যাচ্ছে। শওকত সাহেবের জ্ঞান নেই। তাকে ঘিরে তার তিন ছেলে এবং ছেলেদের স্ত্রী। আমার সাথে কিছু কথাবার্তা হলো। শওকত সাহেবকে দেখে শুনে রাখার জন্যে তারা আমাকে নানাভাবে ধন্যবাদ দিলেন। আমি কিছুক্ষণ থেকে ফিরে এসেছিলাম, সকালে খবর পেয়েছি রাতেই মারা গেছেন।

শওকত সাহেবের চেহলামে আমাকে দাওয়াত দেয়া হয়েছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম যাব না, শেষ পর্যন্ত কি মনে করে গিয়ে হাজির হলাম। বাসা ভরা লোকজন, শোকের চিহ্নটি খুব স্পষ্ট নয়। একজন মৌলভী গোছের মানুষ ধরে নিয়ে আসা হয়েছে, তিনি এক কোনায় বসে কোরান শরীফ পড়ছেন। খাওয়া-দাওয়ার আগে মিলাদ পড়ানো হলো। মৌলভী গোছের মানুষটি উর্দু আরবি মিশিয়ে অনেক ভাল ভাল কথা বললেন। একটি কথা এরকম; শওকত সাহেবের মতো সৌভাগ্যবান মানুষ খুব বেশি নেই, তার মৃত্যুর পর তার আত্মার মাগফেরাতের জন্য যে পরিমাণ দোয়া খায়েরের ব্যবস্থা করা হয়েছে, আমেরিকা দূরে থাকুক, বাংলাদেশেও আজকাল কোন মানুষ তাদের বাবা-মায়ের জন্য সেই পরিমাণ দোয়া খায়ের করতে চায় না। শুধু যে ছেলেরা তার আত্মার জন্যে দোয়া খায়ের করছে তাই নয়, তাদের স্ত্রীরাও করছে। চেহলাম উপলক্ষে খতমে ইউনুস শেষ করা হয়েছে এবং শওকত সাহেবের দুই পুত্রবধূ একলক্ষ বার দোয়া ইউনুস পড়ে ফেলেছেন। মৌলভী সাহেবের মতে এটি একটি অভূতপূর্ব ঘটনা।

মিলাদ চলাকালীন ঘরের এক কোনায় একটি ভিডিও ক্যামেরায় পুরো ব্যাপারটি ধরে রাখা হচ্ছিল। কোথায় জানি শুনেছিলাম লাইফ ইন্স্যুরেন্সের টাকা তোলার সময় মৃত মানুষের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার একটা প্রমাণ দেখাতে হয়।

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

যখন টুনটুনি তখন ছোটাচ্চু - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

যখন টুনটুনি তখন ছোটাচ্চু  - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
যখন টুনটুনি তখন ছোটাচ্চু
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

হটলাইন - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

হটলাইন - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
হটলাইন
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

অবিশ্বাস্য সুন্দর পৃথিবী - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

অবিশ্বাস্য সুন্দর পৃথিবী - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
অবিশ্বাস্য সুন্দর পৃথিবী
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
"ঘুমিয়ে আছি, না জেগে আছি জানি না। আবছা অন্ধকারে অনেকে চুপচাপ বসে আছে। তার মাঝে শুধু ইঞ্জিনের গর্জন। যাচ্ছি তো যাচ্ছি। মনে হয় বুঝি যোজন যোজন পার হয়ে গেছে।
এক সময় ইঞ্জিনের শব্দ থেমে গেল। নিশ্চয়ই ঢাকা পৌঁছে গেছি। মানুষজন ছোটাছুটি করছে। আমাকে নামানো হয়েছে হেলিকপ্টারে থেকে। নামিয়ে আমাকে একটা ট্রলি বা স্ট্রেচারে শোয়ানো হয়েছে। ওপরে খোলা আকাশ সেই আকাশে একটা ভরা চাঁদ। কী অপূর্ব একটি দৃশ্য! আমি সেই চাঁদটির দিকে বুভুক্ষের মতো তাকিয়ে রইলাম! পৃথিবী এতো অবিশ্বাস্য সুন্দর?
খোদা আমাকে এই অবিশ্বাস্য সুন্দর পৃথিবীটিকে আরো কয়দিন দেখতে দেবে?"

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সায়েন্স ফিকশন সমগ্র ০৩ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

সায়েন্স ফিকশন সমগ্র ০৩ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল সায়েন্স ফিকশন সমগ্র ০৩ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

সূচিপত্র
*সিস্টেম এডিফাস
*একজন অতিমানবী
*মেতসিস
*ইরন
*শাহনাজ ও ক্যাপ্টেন ডাবলু
*জলজ
*প্রজেক্ট নেবুলা
*ফোবিয়ানের যাত্রা

Download and Join our Facebook Group
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সায়েন্স ফিকশন সমগ্র ০৫ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

সায়েন্স ফিকশন সমগ্র ০৫ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল সায়েন্স ফিকশন সমগ্র ০৫ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

সূচিপত্র
*রুহান রুহান
*জলমানব
*অন্ধকারের গ্রহ
*অক্টোপাসের চোখ
*ইকারাস
*রবো নিশি
*কেপলার টুটুবি

বাংলাদেশের সাহিত্যে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লিখে মুহম্মদ জাফর ইকবাল জনপ্রিয় হয়েছেন। না, কেবল জনপ্রিয়ই নন, তিনি বাংলা সায়েন্স ফিকশানকে শক্ত ফিকশান-এর পরিমণ্ডলে দীপ্যমান উজ্জ্বল নক্ষত্র তিনি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের অধ্যাপনায় নিযুক্ত। ফলে তার লেখায় বর্ণিত বিজ্ঞান সম্পর্কিত তথ্যাদি নিছক কল্পনা-আশ্রিত নয়, সে-সবের যথার্থ ভিত্তি থাকে। কিন্তু বিশেষভাবে যা লক্ষীয় তা হল বিজ্ঞানের জয় আসলে বরং মানুষের শুভবুদ্ধি ও পরোপকারের ইচ্ছাকে সার্থক ও বিজয়ী করে। জলমানব নিহন ও স্থলমানবী কাটুঙ্কার এর যান্ত্রিক সত্তা পরাজিত হয়। প্রডিজি’র শারমিনের অসাধারণ মেধা এবং রাফি ও ঈশিতার সদিচ্ছার কাছে হার মানে উচ্চাভিলাষী বিজ্ঞানী বব লাস্কির অশুভ বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি। ইকারাস-এ ডক্টর কাদেরের বিকৃত গবেষণার ফসল পাখিমানব বুলবুলের জন্য পাঠক-হৃদয়ে সহানুভূতি জেগে ওঠে। মানুষেরই সৃষ্ট পঞ্চম মাত্রার রোবট কিংবা রোবোমানব কেউই মানুষের শুভবুদ্ধিকে পরাজিত করতে পারে না। অন্ধকারের গ্রহতে কালো কুৎসিত অশুভ ভয়ংকর গ্রহ এবং এতে বসবাসকারী বীভৎস কুৎসিত প্রাণী যেমন আতঙ্কিত করে তেমনি কেপলার টুটুবি গ্রহে নিষ্পাপ মানুষের পদচিহ্ন দিয়ে নতুন পৃথিবী গড়ে তোলার সূচনা অবারিত সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। এ গ্রহে সূর্যটা বড়, দিনগুলি লম্বা, রাতের আকাশে চাদ দুটি । সত্যিই কি আছে এরকম কোনো গ্রহ? হয়তো আছে, কিংবা নেই। এ শুধু কেবলই বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী? কিংবা অদূরভবিষ্যতে একদিন হয়তো আবিষ্কার হবে এরকম একটা পৃথিবী, কেননা কথাশিল্পীরা অনেক সময় ভবিষ্যদ্রষ্টার ভূমিকায় থাকেন-এ তারই প্রতিফলন। যেমন ছিলেন জুল ভের্ন ডুবোজাহাজের কথা যখন কেউ কল্পনাও করে নি—তখন তিনি বলেছেন নটিলাস’ নামে ডুবোজাহাজের কথা, তাও আবার সৌরশক্তি-চালিত। মুহম্মদ জাফর ইকবাল তার গল্প বলার অসাধারণ ক্ষমতা প্রয়োগ করে পাঠককে সম্মোহিত করেন নিয়ে যান অন্য এক ভুবনে, যেখানে কল্পনা আর বিজ্ঞান একাকার হয়ে যায়।


Download and Comments/Join our Facebook Group
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সায়েন্স ফিকশন সমগ্র ০৪ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

সায়েন্স ফিকশন সমগ্র ০৪ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল সায়েন্স ফিকশন সমগ্র ০৪ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

সূচিপত্র
*ত্রাতুলের জগৎ
*বেজি
*ফিনিক্স
*সায়রা সায়েন্টিস্ট
*সুহানের স্বপ্ন
*অবনীল
*নায়ীরা
*বিজ্ঞানী অনিল লুম্বা

Download and Comments/Join our Facebook Group
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

মুহম্মদ জাফর ইকবালের ছোটগল্প 'চোখ'

চোখ মুহম্মদ জাফর ইকবাল

চোখ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
সোবহান মিয়া গোলাঘরের পাশে দাঁড়িয়ে এদিকে সেদিকে তাকালেন। আশপাশে কেউ নেই, শুধু আলাউদ্দিন কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সোবহান মিয়া নিচু গলায় বললেন, আলাউদ্দিন ঝাপিটা খোল।
আলাউদ্দিন ঝাঁপিটা খুলে সরে দাঁড়াল, সোবহান মিয়া ঢুকতে গিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী অবস্থা?
উনিশ বিশ হয় নাই চাচাজান। ঐ রকমই আছে।
ও।
ভেতরে দিনের বেলাতেই আবছা অন্ধকার। সোবহান মিয়া ভেতরে ঢুকতেই একটা সূক্ষ্ম পচা গন্ধ পেলেন। ভেতরে কোথায় জানি একটা ইঁদুর মরে আছে। আলাউদ্দিনকে বলতে হবে মরা ইঁদুরটাকে খুঁজে বের করতে।
ভেতরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেই অন্ধকারে চোখ সয়ে গেল। গোলার নিচে মশারি টানিয়ে বিছানা করা হয়েছে। সামনে কয়টা চাটাই আর ঝাঁপ রাখা হয়েছে হঠাৎ করে কেউ ঢুকে গেলে যেন কিছু বুঝতে না পারে। সোবহান মিয়া চাটাইটা সরাতেই বিছানা থেকে ছেলেটা বলল, কে?
গলার স্বর পরিষ্কার, পায়ে এত বড় জখম নিয়ে শুয়ে আছে বোঝার কোন উপায় নাই। সোবহান মিয়া নিচু গলায় বললেন, আমি।
ও। আসেন।
সোবহান মিয়া নিচু হয়ে মশারিটা তুলতেই নাকে পচা গন্ধটা ধক করে ধাক্কা দিল। ইঁদুর না, ছেলেটার পা—পচন ধরেছে।
কেমন আছ বাবা?
ভাল নাই।
সোবহান মিয়া গায়ে হাত দিলেন। জ্বরে শরীরটা পুড়ে যাচ্ছে। তিনি একটা নিশ্বাস ফেললেন। এত বড় একটা জখম নিয়ে ছেলেটা বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে, খোদার দরবারে কি এর বিচার নাই?
ছেলেটা ঘোলাটে চোখে সোবহান মিয়ার দিকে তাকাল, কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, এখনো আসে নাই কেউ?
না বাবা।
এত দেরি করছে কেন?
মিলিটারি ক্যাম্প করেছে থানায়। গ্রামের দশজনের মাঝে এখন আটজন রাজাকার। এর মাঝে তো আসা খুব মুশকিল।
ছেলেটা কোন কথা বলল না, ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে রইল।
সোবহান মিয়া নরম গলায় বললেন, এসে যাবে বাবা। চিন্তা করো না।
ছেলেটা এবারেও কোন কথা বলল না। চোখ দুটি বন্ধ করে ফেলল।
সোবহান মিয়া আস্তে আস্তে বললেন, পায়ের ব্যথাটা কেমন?
ব‍্যথা নাই।
নাই? সোবহান মিয়া অবাক হয়ে বললেন, ব্যথা নাই?
না। পা’টা কেমন জানি অসাড় হয়ে গেছে।
একটু দেখি—বলে সোবহান মিয়া কাঁথাটা তুলে পায়ের দিকে তাকিয়ে অনেক কষ্টে চেহারা স্বাভাবিক রাখলেন। ছেলেটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সোবহান মিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল, জিজ্ঞেস করল, কী রকম অবস্থা?
সোবহান মিয়া ঢোক গিলে বললেন, আগের মতোই আছে।
ছেলেটার ঠোঁটের কোণে হঠাৎ কেমন যেন একটু হাসির মতো ভাঁজ হয়ে গেল। বলল, না, আগের মতো নাই। গ্যাংগ্রিন হয়ে গেছে।
গ্যাংগ্রিন?
হ্যাঁ। পা কেটে ফেলতে হবে।
সোবহান মিয়া কোন কথা বললেন না।
ছেলেটা আবার চোখ বন্ধ করে ফেলল, সোবহান মিয়া চুপচাপ কাছে বসে রইল। কার না জানি বুকের ধন গুলি খেয়ে মাচার নিচে শুয়ে আছে। চিকিৎসা নাই, সেবা শুশ্রূষা নাই, কথা বলার একটা মানুষ নাই। খোদা কি সত্যিই পাষাণ হয়ে গেছে?
ছেলেটা আবার চোখ খুলল, সোবহান মিয়া বললেন, তোমার কী কিছু লাগবে বাবা?
না।
কিছু না?
ছেলেটা একটু ইতস্তত করে, সোবহান মিয়া বললেন, বল—
অন্ধকারটা খুব খারাপ লাগে।
কী করব বাবা, জানাজানি হলে তোমারও বিপদ আমারও বিপদ। একটু কষ্ট করো—
তা ঠিক।
তুমি বিশ্রাম করো। তোমার দলের ছেলেরা আসলেই তোমার খবর দিব।
ঠিক আছে।
সোবহান মিয়া মশারিটা গুঁজে দিয়ে বের হয়ে এলেন। খোলা ঝাঁপটার কাছে আলাউদ্দিন দাঁড়িয়ে ছিল, গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী অবস্থা চাচাজান?
ভাল না। পচন ধরেছে।
সোবহান আল্লাহ—
চিকিৎসা না হলে বাঁচানো যাবে না। একটা খবর কি দেয়া যায়?
আলাউদ্দিন কোন কথা না বলে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। সোবহান মিয়া একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, ইয়া মাবুদ। ইয়া পরওয়ারদিগার—
ফারুক চুপচাপ শুয়ে আছে। একটা চাটাই ভাঁজ করে তার ওপরে কয়েকটা কাঁথা বিছিয়ে তার বিছানা করা হয়েছে। গুলি খাওয়া পাটা রেখেছে তুষ বোঝাই একটা বস্তার উপরে। প্রথম কয়দিন অসহ্য যন্ত্রণা ছিল পায়ে, তারপর হঠাৎ করে যন্ত্রণা কমে গেছে। যেখানে একসময় প্রচণ্ড যন্ত্রণা ছিল সেখানে এখন এক ধরনের ভোঁতা অনুভূতি। পা-টা আছে কি নেই বোঝা যায় না। মাঝে মাঝে মনে হয় এই অসাড় অনুভূতি থেকে বুঝি যন্ত্রণার অনুভূতিটাই ভাল ছিল, অন্তত মনে হতো সে বেঁচে আছে। মনে হয় শরীরটা যুদ্ধ করছে। এখন মনে হচ্ছে সে-ই যুদ্ধে হেরে গেছে আর বুঝি কোন আশা নেই।
ফারুক চোখ খুলে তাকাল। দিনের বেলা আবছা একটা আলো থাকে। ফাঁকা ফুটো দিয়ে ছিটেফোঁটা আলো আসে। সেই আলোতে মশারির ভেতরটা ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। মনে হয় সে বুঝি চতুষ্কোণ একটা বাক্সের মাঝে শুয়ে আছে। শুয়ে শুয়ে সে মাঝে মাঝে মানুষজনের কথা শুনে, কেউ আসছে যাচ্ছে কথা বলছে। দেশকে, দেশের মানুষ গালি দিচ্ছে। রাত্রিবেলা ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে আসে, চোখ খুলে রাখলেও বোঝা যায় না সে চোখ খুলেছে কি না। চারদিকে নীরব হয়ে আসে। গোলাঘরে ইঁদুরের ছোটাছুটি রাত জাগা পাখির ডাক ছাড়া আর কোথাও কোন শব্দ নেই।
এর মাঝে ফারুক অজ্ঞানের মতো পড়ে থাকে। কখন জেগে আছে, কখন ঘুমিয়ে আছে বা কখন অচেতন হয়ে আছে সে আর আলাদা করে অনুভব করে না। সবকিছু এখন মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে।
ফারুক আবার চোখ খুলে তাকাল, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। মাতার কাছে জগে পানি রাখা আছে, কিন্তু আর হাত বাড়িয়ে পানিটুকু নেয়ার ইচ্ছে করছে না। ফারুক পানির জগটির দিকে তাকিয়ে রইল। ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসছে, একটু পরে সে আর কিছুই দেখতে পারে না।
খুট করে ঘরের মাঝে একটা শব্দ হলো, মনে হয় অনেক মানুষের পায়ের শব্দ। ফারুক ভয় পাওয়া গলায় বলল, কে?
প্রথমে কে যেন চাপা গলায় হেসে উঠল, তারপর বলল, আমরা।
আমরা কে?
মশারি তুলে ভেতরে একসাথে কয়েকজনের মাথা উঁকি দেয়। ইলিয়াছ, মজনু আর জয়নাল। পিছনে রশীদ।
ফারুক উত্তেজনায় উঠে বসার চেষ্টা করতে করতে বলল, তোরা! তোরা এসেছিস? তোরা—
ইলিয়াছ ফারুককে ধরে শুইয়ে দিল, উঠিস না, উঠিস না শুয়ে থাক।
ফারুক আবার শুয়ে পড়ল, বলল, তোরা তাহলে শেষ পর্যন্ত এসেছিস। আমি ভাবলাম আর আসবি না।
আসব না কেন, গাধা! তোকে ফেলে গেছি সেটা আমাদের মনে নেই?
মজনু কাঁথা সরিয়ে পায়ের দিকে তাকিয়ে মুখ বিকৃত করল, এ কী! তোর পায়ের এ কী অবস্থা!
গ্যাংগ্রিন হয়ে গেছে মনে হয়।
গ্যাংগ্রিন? তাহলে তো কেটে ফেলতে হবে।
হ্যাঁ। কেটে ফেলতে হবে। ফারুক মাথা নাড়ল, কেটে ফেলতে হবে।
ইলিয়াছ একটা ধমক দিল, থাক তোদের নিজেদের আর ডাক্তারি করতে হবে না।
স্ট্রেচারটা কোথায়?
এই যে।
নে সাবধানে তুলে নে দেখিস ব্যথা যেন না পায়।
ওরা ধরাধরি করে ফারুককে স্ট্রেচারে তুলে আনে। মাথার নিচে একটা বালিশ রেখে কাঁথাটা নিয়ে শরীর ঢেকে দেয়। পা-টা একটু উপরে রাখার জন্যে পায়ের নিচে আরেকটা বালিশ গুঁজে দিল।
ইলিয়াছ বলল, সাবধানে বাইরে নিয়ে আয়। দেখিস কেউ যেন হোঁচট খেয়ে পড়ে না যাস।
ঠিক আছে।
ফারুক ফিসফিস করে বলল, থানার কাছে মিলিটারি ক্যাম্প করেছে।
ধুর! মিলিটারি ক্যাম্প। আমরা কাল রাতে অপারেশন করলাম, শুনিসনি কিছু?
না। শুনিনি।
মড়ার মতো ঘুমালে শুনবি কেমন করে। মর্টার ছিল দুইটা। রকেট লঞ্চার চারটা সাথে চাইনিজ মেশিনগান। একেবারে ফাটাফাটি অবস্থা। সব মিলিটারি ভেগে গেছে।
গ্রামের মানুষ নাকি দশজনের মাঝে আটজন রাজাকার।
রাজাকার না হাতি। সব ভেগে গেছে। সারা গ্রাম এখন জয় বাংলা।
সত্যি?
সত্যি। আয় বাইরে গেলেই দেখবি।
স্ট্রেচারটা ধরে বাইরে আনতেই আলোতে ফারুকের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সে ফিস ফিস করে বলল, আহা কত আলো।
ইলিয়াছ বলল, জয়নাল, কাঁথা দিয়ে ফারুকের মুখটা ঢেকে দে দেখি।
না, না ঢাকিস না। কতদিন আলো দেখি না।
ইলিয়াছ ফারুকের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল, বলল, দেখ তাহলে কত দেখবি। আর তোকে অন্ধকারে থাকতে হবে না।
জয়নাল বলল, হ্যাঁ, ফারুক ভাই। নদীর ঘাটে স্পিডবোট বেঁধে রেখে এসেছি। আপনাকে তুলেই রওনা দিব।
হ্যাঁ। পা চালাও সবাই।
ফারুক স্ট্রেচারে শুয়ে তাকিয়ে রইল। মুখে রোদ পড়ছে। কী ভালই না লাগছে তার। সে মাথা ঘুরিয়ে সূর্যের দিকে তাকাল, কী তীব্র আলো সূর্যের! সে তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে সূর্যের দিকে তাকিয়ে রইল যেন তার সমস্ত আলো সে তার চোখ দিয়ে শুষে নেবে।
সোবহান মিয়া মশারি তুলে ফারুকের শোয়ার ভঙ্গিটি দেখেই কেমন যেন চমকে উঠল। হাত বাড়িয়ে ফারুকের কপাল স্পর্শ করে দেখল তার শরীর হিম শীতল। সাথে সাথে হাত সরিয়ে বিড় বিড় করে বললেন, ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন—
আলাউদ্দিন মৃদু গলায় বলল, মরে গেছে চাচাজান?
হ্যাঁ।
তাকিয়ে আছে কেমন করে।
চোখগুলো ঢেকে দাও আলাউদ্দিন। মরা মানুষের চোখ বন্ধ করে দিতে হয়।
আলাউদ্দিন চোখ দুটি ঢেকে দিতে গিয়ে থেমে গেল, দেখে মনে হচ্ছে ছেলেটা এই চোখ দুটি দিয়ে কিছু একটা কী অবাক হয়ে দেখছে।
[এই গল্পটি লেখার পর আবিষ্কার করেছি, এর মাঝে খুব একটি বিখ্যাত গল্পের ছায়া রয়েছে। প্রিয় লেখকেরা আমাকে কিভাবে অনুপ্রাণিত করেন এটি সম্ভবত তার উদাহরণ।—মু. জা. ই]
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

আমাদের বুকশেলফ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আমাদের বুকশেলফ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আমাদের বুকশেলফ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা সময় কেটেছে অনেকটা পিকনিকের মতো করে। মানুষ যখন বাসায় থাকে, তখন সত্যিকারের বিছানায় ঘুমায়, সত্যিকারের কাপড় পরে, সত্যিকার থালা-বাসন, কাপ-পিরিচে খায়। যখন হঠাৎ করে কেউ এক-দুই দিনের জন্য পিকনিকে যায়, তখন কোনো কিছুই সত্যিকারের হয় না—জোড়াতালি দিয়ে কাটিয়ে দেয়। যুদ্ধের পর যখন দেশ স্বাধীন হলো, তখন আমাদের সবকিছুই ছিল জোড়াতালি দেওয়া। বিছানা নেই, তাই মেঝেতে শুয়ে ঘুমিয়েছি। কাপড় নেই, তাই একে অন্যের কাপড় পরেছি। আইসক্রিমের কাপে চা খেয়েছি—সেসব নিয়ে আমাদের সে রকম মাথাব্যথাও ছিল না। পুরো জীবনটাই একটা বড় পিকনিক, ব্যাপারটা খুব খারাপ লাগত না। এ রকম সময় হুমায়ূন আহমেদ ঠিক করল, বিয়ে করবে। যাকে বিয়ে করবে, সে বাচ্চা একটি মেয়ে, হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ে মুগ্ধ হয়ে পরিচয়, পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠতা আর সেখান থেকে বিয়ের পরিকল্পনা। মেয়েটির পরিবার খুব অবস্থাপন্ন, দেশের সবাই চেনে সেই প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ সাহেবের নাতনি। হুমায়ূন আহমেদ তখনো হুমায়ূন আহমেদ হয়নি। তাই এ রকম পরিবারের চালচুলোহীন একটা ছেলের সঙ্গে এত কমবয়সী একটা মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কথা নয়—কিন্তু তারা বিয়ে দিতে আপত্তি করলেন না। হুমায়ূন আহমেদ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার। বিয়ের আগে আগে আমাদের বাসাটা দেখে তার মনে হলো, এত বড় সচ্ছল পরিবারের একটা মেয়েকে আমাদের বাসায় আনা হচ্ছে—বাসায় আরও কিছু ফার্নিচার থাকা দরকার। সে কীভাবে কীভাবে কিছু টাকা জোগাড় করে একদিন আমাকে নিয়ে বের হলো ফার্নিচার কিনতে। রিকশা করে নিউমার্কেট এলাকায় গিয়ে একটা ফার্নিচারের দোকানে এর দাম দেখে আমাদের প্রায় হার্ট অ্যাটাক হওয়ার মতো অবস্থা। কেনা দূরে থাকুক, ফার্নিচারের গায়ে হাত বোলানোর মতো অবস্থাই আমাদের নেই। আমরা দুই ভাই মনমরা হয়ে এক ফার্নিচারের দোকান থেকে অন্য ফার্নিচারের দোকানে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে শেষে বের হয়ে এলাম। হুমায়ূন আহমেদ একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘এক কাজ করলে কী হয়?’ আমি বললাম, ‘কী কাজ?’ ‘কিছু ফার্নিচার বানিয়ে ফেললে কেমন হয়?’ আমি হাতে কিল দিয়ে বললাম, ‘ফার্স্ট ক্লাস আইডিয়া।’ (এখানে বলে রাখা ভালো, কেউ যদি আমাকে বলে, খামোখা বাইপাস সার্জারির জন্য হাসপাতালে না গিয়ে ইন্টারনেটে দেখে বাথরুমে বাইপাস সার্জারি করলে কেমন হয়? আমি সম্ভবত হাতে কিল দিয়ে বলব, ফার্স্ট ক্লাস আইডিয়া।) আমি জানি, বিষয়টা বিশ্বাস করা কঠিন, কিন্তু আমরা দুই ভাই সত্যি সত্যি ফার্নিচার না কিনে কিছু কাঠ, একটা করাত, হাতুড়ি-বাটালি, রেদা ও কিছু পেরেক কিনে বাসায় হাজির হলাম। আমি জানি, অন্য যেকোনো পরিবারের লোকজন এ রকম কাণ্ড ঘটতে দেখলে মাথায় থাবা দিয়ে হায় হায় করতেন, কিন্তু আমাদের অন্য ভাইবোন এবং মা ব্যাপারটাকে খুবই স্বাভাবিকভাবে নিলেন। (বাবা বেঁচে নেই, বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই আরও বেশি উৎসাহী হতেন।) বসার ঘরে বসে কী ফার্নিচার তৈরি করা যায়, সেটা নিয়ে আলোচনা শুরু হলো। সোফা সেট থেকে শুরু করে হারমোনিয়াম রাখার বাক্স পর্যন্ত একটা বিশাল তালিকা তৈরি হলো। শেষ পর্যন্ত একটা বুকশেলফ দিয়ে এই প্রজেষ্ট শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। বাসার ছাদে বাতি জ্বালিয়ে কাজ শুরু হলো। করাত দিয়ে কাঠ কাটা দেখে কখনোই মনে হয়নি কাজটা কঠিন। আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই আবিষ্কার করলাম, আসলে সেটা অনেক কঠিন একটা কাজ। শেষ পর্যন্ত কোনোভাবে কাঠের তক্তাগুলো মাপমতো কাটা হলো। এখন রেদা দিয়ে সেগুলো পলিশ করা। যেটুকু উৎসাহ তখনো বাকি আছে, সেটুকু দিয়ে কাঠ পলিশ করা শুরু হলো এবং এই পর্যায়ের মাঝামাঝি হুমায়ূন আহমেদ প্রজেক্ট থেকে খসে পড়ল। (এটি অবশ্য নতুন কিছু নয়, বড় ভাই হিসেবে যেকোনো ঝামেলা থেকে সে খসে পড়ে এবং সবকিছু ধীরে ধীরে কীভাবে কীভাবে জানি ছোট ভাই আহসান হাবীবের ঘাড়ে এসে পড়ে।) আমি অবশ্য হাল ছেড়ে দিলাম না। আমার সমবয়সী এক মামাকে নিয়ে কাঠের মাঝে রেদা চালিয়ে যেতে লাগলাম। কাঠগুলো কেনার সময় টের পাইনি। এখন আবিষ্কার করছি, কাঠগুলো বাঁকা এবং সেই বাঁকা কাঠ রেদা চালিয়ে সোজা করতে আমাদের জান বের হয়ে যাওয়ার অবস্থা। যা-ই হোক, শেষ পর্যন্ত কাঠের তক্তাগুলো মাপমতো কেটে, সোজা ও পলিশ করে রেডি করা হলো। এখন পেরেক ঠুকে সেগুলো লাগিয়ে নিলেই বুকশেলফ হয়ে যাবে। আমরা শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে ঘুমাতে গেলাম। সারা শরীরে ব্যথা—তবে ঘুমটা হলো খুব গভীর। সকালে তক্তাগুলো দেখে আমাদের আক্কেলগুড়ুম। রেদা দিয়ে ঘষে যে তক্তাগুলো সোজা করা হয়েছে, সারা রাতে সেগুলো আবার বাঁকা হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে জানা গেল, ভেজা কাঠের তা-ই নিয়ম—আমাদের বোকা পেয়ে কাঠের দোকানদার ভেজা তক্তা গছিয়ে দিয়েছে। কিন্তু প্রজেক্ট তো আর ফেলে রাখা যায় না। তাই আবার নব উদ্যমে কাঠ পলিশ করা শুরু হলো। সবকিছু শেষ করে ঘুমাতে গিয়েছি—সকালে উঠে দেখি আবার বাঁকা হয়ে গেছে। হুবহু গ্রিক পুরানের সেই সিসিফাসের অবস্থা। যে সারা রাত একটা পাথর ঠেলে পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি নিয়ে পরদিন ঘুম থেকে উঠে দেখে, সেটা পাহাড়ের নিচে আগের জায়গাতেই আছে। আমাদের যেহেতু সিসিফাসের ধৈর্য নেই, তাই ঠিক করা হলো, কাঠগুলোকে বাঁকা হওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না, তার আগেই পেরেক ঠুকে শেলফ বানিয়ে ফেলতে হবে। কাজেই পরের বার আমরা আর দেরি করলাম না। পলিশ করে সোজা হওয়ার পর দ্রুত পেরেক ঠুকে শেলফ তৈরি করে ফেললাম। সেটার ওপর কালো রং দেওয়ার পর শেলফের সৌন্দর্য দেখে আমরা নিজেরাই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ড্রয়িংরুমে এনে তার মাঝে যখন বই রাখা হলো, তখন তার সৌন্দর্য আরও শতগুণে বিকশিত হলো। কাঠমিস্ত্রি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার গৌরবে অহংকারে আমাদের মাটিতে পা পড়ে না। যথাসময়ে হুমায়ূন আহমেদের বিয়ে হলো, কমবয়সী বাচ্চা একটি মেয়ে আমাদের ভাবি হয়ে বাসায় উঠে এল। অত্যন্ত সচ্ছল একটা পরিবার থেকে চালচুলোহীন একটা পিকনিক মার্কা পরিবারে এসে আমাদের এই বাচ্চা ভাবি খুব সুন্দরভাবে মানিয়ে নিয়েছিল—সেখানে আমাদের ঐতিহাসিক বুকশেলফের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, কখনো তাকে সেটা জিজ্ঞেস করা হয়নি। ধীরে ধীরে বড় ভাই আজকের ‘হুমায়ূন আহমেদ’ হয়ে উঠল। একসময় দেখা গেল, তার টাকাপয়সার সমস্যা নেই, ফার্নিচার কিনতে গিয়ে তার ভেজা কাঠের তক্তা আর হাতুড়ি-বাটালি কিনে ফিরে আসতে হয় না। যেভাবে টাকা আসত, সেভাবে খরচ করতে শিখে গেল। যেমন, একবার ঠিক করল, পরিবারের সবাইকে নিয়ে নেপাল থেকে ঘুরে আসবে। ভাইবোন, তাদের স্বামী-স্ত্রী, বাচ্চাকাচ্চা, বন্ধুবান্ধব সব মিলিয়ে প্রায় ত্রিশ-চল্লিশজনের দল! তাদের সবার জন্য প্লেনের টিকিট কেটে নেপালে নিয়ে হোটেলে রেখে সব জায়গায় ঘুরে বেড়ানো বিশাল খরচের ব্যাপার। কিন্তু সেটি নিয়ে সে কখনো দুর্ভাবনা করেছে বলে মনে হয়নি। নেপাল ভ্রমণ নিয়ে ছোট্ট একটা ঘটনার কথা বলে শেষ করি। আয়োজন করার সময় হঠাৎ করে আবিষ্কার করলাম, আমার মা যেতে চাইছেন না। তাঁকে রাজি করানো যাচ্ছে না, তাই আমাকে রাজি করানোর দায়িত্ব দেওয়া হলো। আমি একদিন মাকে বললাম, ‘আপনি কি জানেন, নেপালের কাঠমান্ডু এয়ারপোর্ট হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক এয়ারপোর্ট। পাহাড়ের মাঝখানে হঠাৎ করে নেমে প্লেন ল্যান্ড করতে হয়। অনেকবার প্লেন ক্র্যাশ করে সব প্যাসেঞ্জার মারা গেছে।’ আমার মা আতঙ্কিতভাবে আমার দিকে তাকালেন, ‘তাই নাকি!’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। তার মানে বুঝতে পারছেন তো? আপনার সব ছেলেমেয়ে, তাদের বউ, জামাই, আপনার সব নাতি-নাতনি একটা প্লেনে করে যাচ্ছে। কোনোভাবে যদি সেই প্লেন ক্র্যাশ করে, তা হলে আপনার ছেলেমেয়ে, বউ-জামাই, নাতি-নাতনি সবাই শেষ। আপনি শুধু একা বেঁচে থাকবেন। সারা পৃথিবীতে আপনার কেউ নেই—আপনি থাকবেন একা। এ-কা!’ আমার মা কাঁপা গলায় বললেন, ‘আমার জন্যও প্লেনের একটা টিকিট কাট!’ বলা বাহুল্য, আমার মা এবং তাঁর সব ছেলেমেয়ে, বউ-জামাই, নাতি-নাতনি নিয়ে সেই প্লেন ক্র্যাশ করেনি। সবাই মিলে যা আনন্দ করেছি, সেটা লিখতে হলে আরেকটা বই হয়ে যাবে। আমাদের পুরো পরিবারের জীবনটা এভাবে হুমায়ূন আহমেদ বর্ণাঢ্য আর আনন্দময় করে রেখেছিল। শুধু কি আমাদের পরিবারের? তার পাঠক, তার নাটক ও চলচ্চিত্রের দর্শকদের জীবনও কি সে সমানভাবে আনন্দময় করে রাখেনি?
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com