বহুরূপী - সত্যজিৎ রায় [Netflix Ray Episode 2 - Bahrupiya by Satyajit Ray]

amarboi
বহুরূপী
সত্যজিৎ রায়

নিউ মহামায়া কেবিনের একটি চেয়ার দখল করে হাফ কাপ চা আর আলুর চপ অর্ডার দিয়ে নিকুঞ্জ সাহা একবার চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিল। তার চেনাপরিচিতের কেউ এসেছে কি? হ্যাঁ, এসেছে বৈকি। ওই ত রসিকবাবু, আর ওই যে শ্রীধর। পঞ্চানন এখনো আসেনি, তবে মিনিট দশেকের মধ্যে এসে যাবে নিশ্চয়ই। যত বেশি চেনা লোক আসে ততই ভালো। চেনা লোক চিনতে না পারলে তবেই না ছদ্মবেশের সার্থকতা।
অবিশ্যি এখনো পর্যন্ত তার সব কটা ছদ্মবেশই আশ্চর্যরকম সফল হয়েছে। আজকে ত তাও দাড়ির আবরণ রয়েছে—মুখের অর্ধেকটা অংশই ঢাকা। বয়সও বাড়িয়ে নিয়েছে নিকুঞ্জ অন্তত বছর পঁচিশ। গতকালের মেক-আপ ছিল একটি ছোট্ট প্রজাপতি মার্কা গোঁফ, আর সেই সঙ্গে প্লাস্টিসিনের সাহায্যে নাকের শেপটা বদলানো। কিন্তু হাবভাব হাঁটাচলা গলার স্বর এমনই চতুর ভাবে পালটে নিয়েছিল নিকুঞ্জ যে তার দশ বছরের আলাপী পঞ্চানন গুঁই তার কাছ থেকে দেশলাই ধার নেবার সময়ও তাকে চিনতে পারেনি। নিকুঞ্জ অসম সাহসের সঙ্গে কয়েকটা কথাও বলে ফেলেছিল—‘আপনি ওটা রাখতে পারেন। আমার কাছে আরেকটা দেশলাই আছে।’ পঞ্চানন গলার স্বর শুনেও চেনেনি। একেই বলে আর্ট।
নিকুঞ্জ সাহার আর সব শখ চলে গিয়ে এটাই পোক্তভাবে রয়ে গেছে। শুধু রয়ে গেছে না, উত্তরোত্তর বেড়ে গিয়ে শখটা নেশায় পরিণত হয়েছে। তার হাতে এখন সময়ও অঢেল। আগে একটা চাকরি ছিল। কলেজ স্ট্রীটে ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানিতে সে ছিল সেলসম্যান। সম্প্রতি তার এক জ্যাঠামশাই শেয়ার মার্কেটে অনেক টাকা করে গত হয়েছেন; তাঁর নিজের সন্তান ছিল না; স্ত্রীও মারা গেছেন সেভেনটি টুতে। নিকুঞ্জকে তিনি উইল করে যে টাকা দিয়ে গেছেন তার ব্যাঙ্কের সুদ হয় মাসে সাড়ে সাতশো। কাজেই সেলসম্যানের চাকরিটা সে অক্লেশে ছাড়তে পেরেছে। এই জ্যাঠাই বলতেন, ‘বই পড়ো নিকুঞ্জ, বই পড়ো। বই পড়ে না শেখা যায় এমন জিনিস সেই। ইস্কুলের দরকার হবে না, মাস্টারের দরকার হবে না—স্রেফ বই। লোকে এরোপ্লেন চালাতে শিখেছে বই পড়ে, একথাও শুনেছি!’ জ্যাঠা নিজে বই পড়ে দুটি জিনিস শিখেছিলেন—হাত দেখা আর হোমিওপ্যাথি। দুটোই তিনি বেশ ভালো ভাবেই রপ্ত করেছিলেন বলে জানা যায়। নিকুঞ্জ তাঁর কথা মেনে নিয়েই বই পড়ে শিখেছিল চামড়ার কাজ আর ফোটোগ্রাফি। মাস ছয়েক আগে কলেজ স্ট্রীটের ফুটপাথে মেক-আপ সম্বন্ধে একটা মোটা আমেরিকান বই দেখে সে কেনার লোভ সামলাতে পারেনি। সেইটে পড়ে এই নতুন শখটা তাকে পেয়ে বসে।
অথচ মেক-আপের যেটা আসল জায়গা—থিয়েটার—সে সম্বন্ধে নিকুঞ্জর কোনো উৎসাহই নেই। একবার মনে হয়েছিল—এ তো বেশ নতুন জিনিস শেখা হল, এর থেকে একটা উপরি রোজগারের রাস্তা ধরলে কেমন হয়?
নব নট্ট কোম্পানির ভুলু ঘোষের সঙ্গে নিকুঞ্জর কিছুটা আলাপও ছিল। দুজনেই ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের মেমবার, সেই সূত্রেই আলাপ। আমহার্স্ট স্ট্রীটে ভদ্রলোকের বাড়ি গিয়ে কথাটা পাড়তে ভুলু ঘোষ বললেন, ‘বেশ ত আছ নিকুঞ্জ, আবার থিয়েটার লাইনে আসার ইচ্ছে হল কেন? আর, আমাদের কোম্পানির কথা যদি বল, সেখানে অপরেশ দত্তকে সরিয়ে তুমি তার জায়গায় বসবে কি করে? সে লোক আজ ছত্রিশ বছর ধরে মেক-আপ করছে; পুরো আর্টটি তার নখের ডগায়। তোমার ছ’মাসের বিদ্যে শুনলে ত সে তোমার দিকে চাইবেই না—কথা বলা দূরের কথা। না হে—ওসব ভুলে যাও। সুখে যখন আছ, তখন ভূতের কিল ভোগ করবে কেন সাধ করে?’
নিকুঞ্জ সেইদিনই পেশাদার মেক-আপের চিন্তা মন থেকে মুছে ফেলে দেয়।
তাহলে মেক-আপ শিখে করবে কী সে? কার মেক-আপ করবে? চুল ছাঁটার সেলুনের মতো ত মেক-আপের সেলুন খোলা যায় না, যেখানে লোক পয়সা দিয়ে নিজের চেহারা পালটে নিতে আসবে!
তখনই নিকুঞ্জর মনে হয়—কেন, আমার নিজের চেহারা কী দোষ করল? সত্যি বলতে কি, তার নিজের চেহারায় কয়েকটা সুবিধে আছে—যাকে বলে ন্যাচারেল অ্যাডভানটেজেস। নিকুঞ্জর সবই মাঝারি। সে না-লম্বা না-বেঁটে, না-কালো না-ফরসা, না-চোখা না-ভোঁতা। যে নাক খাড়া তাকে ভোঁতা করা যায় না। যে বেশি লম্বা, তাকে বেঁটে করা যায় না, যে বেশি কালো, তাকে ফরসা বানাতে হলে যে-পরিমাণ রঙের প্রলেপ লাগে তাতে মেক-আপ ধরা পড়ে যেতে বাধ্য।
দুদিন ধরে আয়নায় নিজের চেহারাটা স্টাডি করে নিকুঞ্জ তাই স্থির করল যে মেক-আপ সে নিজেকেই করবে, নিজের চেহারার উপরেই চলবে তার যত এক্সপেরিমেন্ট।
কিন্তু তারপর? এই মেক-আপের উদ্দেশ্যটা হবে কী?
উদ্দেশ্য হবে দুটি—এক, নিজের শিল্পচাতুরীকে পারফেকশনের সবচেয়ে উঁচু স্তরে নিয়ে যাওয়া; এবং দুই, লোকের চোখে ধূলো দেবার আনন্দ উপভোগ করা।
বই কেনার দিন-সাতেকের মধ্যেই নিকুঞ্জ মেক-আপের সরঞ্জাম কিনতে শুরু করে। বইয়েতেই সে জেনেছে ম্যাক্স ফ্যাক্টর কোম্পানির প্যান-কেক মেক-আপের মাহাত্ম্যের কথা। সে জিনিস আমেরিকায় তৈরি হয়, কলকাতায় আসে না। অথচ দিশি রং-এ নিখুঁত মেক-আপ সম্ভব নয়। নিকুঞ্জকে তাই যেতে হল প্রতিবেশী ডাক্তার বিরাজ চৌধুরীর কাছে। এই ডাক্তার চৌধুরীই একবার নিকুঞ্জর জনডিস সারিয়ে দিয়েছিলেন। এঁর ছেলে আমেরিকায় পড়াশুনা করে, নিকুঞ্জ খবর পেয়েছে সে বোনের বিয়েতে শিগগিরই দেশে আসছে।
ডাক্তারবাবুর কাছে গিয়ে নিকুঞ্জ ভণিতা না করে সোজাসুজি বলল, ‘আপনার ছেলে যদি একটি জিনিস আমার জন্য আনতে পারে; ও এলেই আমি দামটা দিয়ে দেব।’
‘কী জিনিস?’ জিগ্যেস করলেন ডাক্তার চৌধুরী।
‘কিছু, রং। মেক-আপের রং। আমি নাম লিখে এনেছি। এখানে পাওয়া যায় না।’
‘বেশ ত। আপনি ডিটেলটা দিয়ে দিন, আমি ওকে পাঠিয়ে দেব।’
ম্যাক্স ফ্যাক্টরের রং এসে যায় তিন সপ্তাহের মধ্যেই। তার আগেই অবশ্য বাকি সব জিনিস কেনা হয়ে গেছে—তুলি, স্পিরিট গাম, ভুরু আঁকার কালো পেনসিল, ফোকলা দাঁত করার জন্য কালো এনামেল পেন্ট, পাকা চুল করার জন্য সাদা রং, পরচুলা লাগানর জন্য সূক্ষ্ম নাইলনের নেট। এ ছাড়া কিনতে হয়েছে বেশ কিছু আলগা চুল, যা ওই সুক্ষ্ম নেটের উপর একটা একটা করে বসিয়ে নিকুঞ্জ নিজে হাতে তৈরি করে নিয়েছে বিশ রকমের গোঁফ, বিশ রকমের দাড়ি আর বিশ রকমের পরচুলা। রুক্ষ, মসৃণ, সোজা, ঢেউ খেলানো, কাফ্রিদের মতো পাকানো—কোনোরকম চুল বাদ নেই।
কিন্তু শুধু মুখ পালটালেই ত হল না, সেই সঙ্গে পোশাক না বদলালে চলবে কি করে? নিকুঞ্জর সাতদিন লেগেছে নিউ মার্কেট, বড়বাজার আর গ্রান্ট স্ট্রীট ঘুরে নিজের মাপ অনুযায়ী পোশাক জোগাড় করতে। রেডিমেড আর কটা জিনিস পাওয়া যায়? তাই দরজিকে দিয়েও বেশ কিছু পোশাক করিয়ে নিতে হয়েছে। আর শুধু জামা কাপড় ত নয়, পরিধেয় সব কিছুই। সাত রকমের চশমা, বারো রকম চটিজুতো স্যান্ডেল, দশ রকম টুপি— তার মধ্যে দারোগার টুপিও বাদ যায় না—পাগড়ির জন্য পাঁচ রকম কাপড়, পাঁচ রকম হাত ঘড়ি। শিখদের হাতের লোহা, তাগা, তাবিজ, মাদুলি, পৈতে, বোষ্টমের মালা, শাক্তের রুদ্রাক্ষ, ওস্তাদের কানে পরার নকল হীরে—কিছুই বাদ যায়নি।
আর কিনতে হয়েছে একটা বড় আয়না, আর তার ফ্রেমে বসানোর জন্য জোরালো বাল্‌ব। লোডশেডিং-এ যাতে কাজ বন্ধ না হয়ে যায় তার জন্য একটা ছোট জাপানী জেনারেটরও কিনতে হয়েছে নিকুঞ্জকে। চকির নিতাইকে সে শিখিয়ে দিয়েছে সেটা কি করে চালাতে হয়।
কাজ শুরু হয় ষোলই অগ্রহায়ণ। তারিখটা নিকুঞ্জ ডায়রিতে লিখে রেখেছে। সকাল আটটা থেকে শুরু করে বিকেল সাড়ে চারটেয় মেক-আপ শেষ হয়। মোটামুটি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকেরই মেক-আপ নিতে হবে সেটা নিকুঞ্জ আগেই ঠিক করে রেখেছিল। রাস্তার ভিখিরি বা কুলি-মজুর সেজে ত লাভ নেই, কারণ মেক-আপ উৎরেছে কিনা সেটা পরীক্ষা হবে নিউ মহামায়া কেবিনে। সেখানে বসে চা খেতে পারে এমন লোক ত হওয়া চাই।
প্রথম দিনেই বাজিমাৎ। ঘন কালো ভুরু আর তার সঙ্গে মানানসই ঘন কালো ঝুপো-গোঁফ-বিশিষ্ট মোক্তার সেজেছিল নিকুঞ্জ। সাদা প্যাণ্ট ও বহুব্যবহৃত কালো মোক্তারি কোট; হাতে একটা পুরোন ব্রীফ কেস, পায়ে সুকতলা খয়ে যাওয়া কালো শু আর ইলাসটিক-বিহীন সাদা মোজা। তারই টেবিলে এসে বসল পঞ্চানন। নিকুঞ্জ যতক্ষণ চা খেয়েছে, তার বুকের ধুকপুকুনি চলেছে সমানে। কিন্তু সামনে বসা অচেনা সাধারণ মানুষ সম্বন্ধে একজন লোক যে কত কম কৌতূহলী হয়—বিশেষত সে লোকের যদি অন্য দিকে মন থাকে—সেটা নিকুঞ্জ সেদিন বুঝেছে। পঞ্চানন তার দিকে দেখেও দেখেনি। বাঁ হাতে রেস বুকের পাতা উলটে দেখেছে আর ডান হাতে চামচ দিয়ে অমলেট ছিঁড়ে খেয়েছে। নিকুঞ্জ যখন বয়ের কাছে বিল চাইল, তখনও পঞ্চাননের দৃষ্টি ঘুরল না তার দিকে। এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা, অদ্ভুত আনন্দ। নিকুঞ্জ সেদিনই বুঝেছিল যে আজ থেকে এটাই হবে তার জীবনের একমাত্র অকুপেশন।
সেদিন বাড়ি ফিরে একটা মজা হল। এটা যে হবে সেটা আগেই বোঝা উচিত ছিল, কিন্তু নিকুঞ্জর খেয়াল হয়নি। শশীবাবু থাকেন একতলার সদর দরজার পাশের ফ্ল্যাটে। তাঁর বসার ঘর থেকে কে ঢুকছে না-ঢুকছে দেখা যায়। নিকুঞ্জ ফিরেছে সোয়া সাতটায়। লোডশেডিং হয়নি বলে দরজার সামনের প্যাসেজে আলো ছিল। মোক্তার-নিকুঞ্জ ঢুকতেই শশীবাবুর হাঁক এল, ‘কাকে চাই?’

নিকুঞ্জ থামল। তারপর শশীবাবুর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। এবার তারা মুখোমুখি। শশীবাবু আবার বললেন, ‘কাকে খুঁজছেন মশাই?’
‘নিকুঞ্জ সাহা কি এই বাড়িতে থাকে?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ। দোতলার সিঁড়ি উঠে ডান দিকের ঘর।’
উত্তরটা দিয়ে শশীবাবু ঘুরে গেলেন, আর সেই ফাঁকে একটানে গোঁফ-ভুরু খুলে ফেলে নিকুঞ্জ বলল, ‘একটা কথা ছিল।’
‘বলুন,’ বলেই নিকুঞ্জর দিকে ফিরে শশীবাবুর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।
‘সে কি—এ যে নিকুঞ্জ!’
নিকুঞ্জ শশীবাবুর ঘরে ঢুকে গেল। এঁকে ব্যাপারটা জানানো দরকার। বাড়ির অন্তত একজন জানলে ক্ষতি নেই, বরং সুবিধেই হবে।
‘শুনুন শশীদা, আমি এবার থেকে মাঝে মাঝে এইরকম মেক-আপ নিয়ে ফিরব। কোনোদিন ডাক্তার, কোনোদিন মোক্তার, কোনোদিন শিখ, কোনোদিন মারোয়াড়ি—বুঝছেন? বেরোব বিকেলে, ফিরব সন্ধেয়। আপনার ঘরে এসে মেক-আপটা খুলে ফেলব। ব্যাপারটা আমার-আপনার মধ্যেই থাক, কেমন?’
‘কিন্তু হঠাৎ এ উদ্ভট শখ কেন? থিয়েটার-টিয়েটার?’
‘না না। থিয়েটার নয়। এটা একটা এক্সপেরিমেন্ট। আপনাকে কনফিডেন্‌সে নিচ্ছি কারণ আপনি বুঝবেন। মোটকথা আপনি আর ছড়াবেন না ব্যাপারটা, এইটে আমার রিকোয়েস্ট।’
শশীবাবু সজ্জন ব্যক্তি, পাড়ার বঙ্কিম পাঠাগারের লাইব্রেরিয়ান, নিজেও বইয়ের পোকা। নিকুঞ্জর কথায় রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, ‘কোনো বদ মতলব নেই যখন বলছ, তখন আর কি? কত লোকের ত কতরকম শখই থাকে।’
কাজটা মেহনতের ও সময়সাপেক্ষ, তাই সপ্তাহে দুদিনের বেশি মেক-আপ নেওয়া চলবে না এটা নিকুঞ্জ আগেই বুঝেছিল। তবে বাকি সময়টা সদ্ব্যবহার করতে বাধা নেই; নিকুঞ্জ সেই সময়টা শহরে ঘুরে বেড়িয়ে লোকজন স্টাডি করে। নিউ মার্কেট যে এ ব্যাপারে একটা স্বর্ণখনি সেটা একদিন গিয়েই বুঝেছে। তাছাড়া খেলার মাঠ, হিন্দি সিনেমার কিউ—এসব ত আছেই। ইণ্টারেস্টিং টাইপের লোক দেখলেই নিকুঞ্জ খাতায় নোট করে নেয়, এমনকি কোনো ছুতো করে সে-লোকের সঙ্গে দুটো কথাও বলে রাখে। ‘কটা বাজল দাদা, আমার ঘড়িটা আবার...’ অথবা ‘এখান থেকে গড়িয়াহাট যেতে কত নম্বর বাস ধরব বলতে পারেন?’—এ ধরনের প্রশ্নেও যথেষ্ট কাজ হয়। যেদিন মেক-আপ থাকে না সেদিন বিকেলে সে স্বাভাবিক বেশেই চলে যায় নিউ মহামায়া কেবিনে। যে তিন-চারজন আলাপী আসে তাদের সঙ্গে গল্পগুজব করে রাজা উজীর মেরে যথা-সময়ে ফিরে আসে তার বৃন্দাবন বসাক লেনের ফ্ল্যাটে। ছোকরা চাকর নিতাই অবশ্য বাবুর ব্যাপারটা জানে, বাবুর কাণ্ডকারখানা দেখে এবং রীতিমতো উপভোগ করে। তবে চাকরটি যে খুব বুদ্ধিমান তা বলা চলে না।
‘চিনতে পারছিস?’
‘হ্যাঁ—!’
‘মারব এক থাপ্পড়! তোর বাবু বলে চিনতে পারছিস?
‘আপনি ত বাবু বটেই। সে ত জানি।’
‘তোর বাবুর এরকম গোঁফ, এরকম টাক? এরকম পোশাক পরে তোর বাবু? এরকম চশমা পরে? কাঁধে এরকম চাদর নেয়?’
নিতাই হাসিমুখ করে দাঁড়িয়ে থাকে দরজায় হেলান দিয়ে। নিকুঞ্জ বুঝতে পারে মাথামোটা লোকেদের জন্য তার এই ছদ্মবেশ নয়! তারা এর আর্ট কোথায় তা ধরতে পারবে না।
কিন্তু শুধুমাত্র তিনজন কি চারজন বন্ধুকে ঠকিয়েই কি তার কাজ শেষ?
এ প্রশ্নটা কদিন থেকেই নিকুঞ্জকে ভাবিয়ে তুলেছে। সে বুঝেছে যে তার আকাক্ষা ঊর্ধ্বগামী পথ নিতে চাইছে। তার আর্টের দৌড় কতটা সেটা জানার একটা গোপন বাসনা মাথা উঁচিয়ে উঠছে।
সেই বাসনা চরিতার্থ করার একটা সুযোগ এসে গেল কয়েকদিনের মধ্যেই।
শশীবাবুর ঘরেই কথা হচ্ছিল এই ফ্ল্যাটবাড়ির কয়েকজন বাসিন্দার মধ্যে; নিকুঞ্জ সেখানে উপস্থিত। ভুজঙ্গবাবু একটু আধটু ধর্মচর্চা করেন, তার মধ্যে প্রাণায়াম, কুম্ভক রেচক, নাক দিয়ে জল টানা, এসব আছে। গুজব শোনা যায় তিনি নাকি সন্ন্যাসী হতে হতে সংসারী হয়ে পড়েন। তবে অনেক সাধু-সন্ন্যাসীর সঙ্গে আলাপ আছে তাঁর, কেদার-বদ্রী কাশী-কামাখ্যা সব ঘোরা আছে কুণ্ডু স্পেশালে। তিনিই বললেন তারাপীঠে এক তান্ত্রিক সাধু এসে আস্তানা গেড়েছেন যাঁর ক্ষমতা নাকি পৌরাণিক সাধুদের হার মানায়।
‘নামটা কী বললেন?’ জিজ্ঞেস করল ব্যাঙ্কের চাকুরে হরবিলাস।
‘নাম বলিনি’, বিরক্তভাবে বললেন ভুজঙ্গবাবু। রাগলে এঁর ভুরু উপরে ওঠে, ফলে চশমা নাক দিয়ে হড়কে নিচে নেমে যায়।
‘হেঁচকি বাবা কি?’ প্রশ্ন করল হরবিলাস।
হেঁচকি বাবা নামে একজন সাধুর কথা কাগজে বেরিয়েছিল বটে। ইনি নাকি ভক্তদের সামনে কথা বলতে বলতে হঠাৎ হঠাৎ এমন হেঁচকি তোলেন যে মনে হয় অন্তিমকাল উপস্থিত, কিন্তু পরক্ষণেই সামলে নিয়ে এমন ভাব করেন যেন কিছুই হয়নি। অথচ উপস্থিত ডাক্তারেরাও বলেছেন এ-হেঁচকি মরণ-হেঁচকি ছাড়া কিছুই না।
ভুজঙ্গবাবু ডান হাতের তর্জনী দিয়ে চশমা নাকের উপর ঠেলে তুলে জানালেন সাধুর নাম কালিকানন্দ স্বামী।
‘যাবেন নাকি? জিজ্ঞেস করলেন ইনসিওরেন্সের দালাল তনয়বাবু। ‘আপনি যান ত আমিও ঝুলে পড়ি আপনার সঙ্গে। সাধুদর্শনে বেশ একটা ইয়ে হয়। কলকাতার এই হোলসেল নোংরামি আর ভাল্লাগে না।’
ভুজঙ্গবাবু বললেন তিনি যাবেন বলেই স্থির করেছেন।
নিকুঞ্জ আর কিছু না বলে দোতলায় নিজের ঘরে চলে গেল। তার ধমনীতে রক্ত যে বেশ দ্রুত চলাচল শুরু করেছে সেটা সে বেশ বুঝতে পারছে। তান্ত্রিক সাজতে হলে কী কী জিনিস লাগে, কী কী তার কাছে আছে, এবং কী কী জোগাড় করতে হবে সেটা জানা চাই।
তাক থেকে বঙ্কিম গ্রন্থাবলী নিয়ে কপালকুণ্ডলার তান্ত্রিকের বর্ণনাটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিল নিকুঞ্জ। আজও এ বর্ণনার কোনো পরিবর্তন হয়নি। সাধু সন্ন্যাসীদের চেহারা পৌরাণিক যুগে যেমন ছিল, আজও তেমনি আছে। নিকুঞ্জ একবার বেনারস গিয়েছিল। দশাশ্বমেধ ঘাটে গিয়ে মনে হয়েছিল যে প্রাচীন ভারতবর্ষের চেহারাটা এই একটা জায়গায় এখনো ধরা রয়েছে।
নিকুঞ্জর প্ল্যান ঠিক হয়ে গেল।
তারাপীঠ হল বীরভূমে। রামপুরহাটে নিকুঞ্জর এক খুড়তুতো ভাই থাকে। সেইখানে সে চলে যাবে তান্ত্রিক মেক-আপের সরঞ্জাম নিয়ে। তারপর সেখান থেকে তৈরি হয়ে নিয়ে হাজির হবে তারাপীঠে। তারপর হবে পরীক্ষা। সাধু-বাবাজীদের মধ্যে সে বেমালুম মিশে যেতে পারে কিনা সেইটে তাকে দেখতে হবে। ভুজঙ্গবাবুরাও সেখানে থাকবেন; তাঁরাও তার ছদ্মবেশ ধরতে পারেন কিনা দেখা যাবে।
মেক-আপের অধিকাংশ জিনিসই নিকুঞ্জর ছিল, কেবল হাতে নেবার যষ্ঠি, চিমটে আর কমণ্ডলু ছাড়া। ঝাঁকড়া চুল আছে একটা, সেটাকে জটায় পরিণত করতে হবে। ও হয়ে যাবে; চিন্তার কোনো কারণ নেই।
ভুজঙ্গবাবু সপরিবারে বুধবার রওনা দিচ্ছেন খবর পেয়ে নিকুঞ্জ মঙ্গলবার বেরিয়ে পড়ল। ভাই সন্তোষকে আগেই খবর দেওয়া ছিল, যদিও কেন যাচ্ছে সেটা নিকুঞ্জ জানায়নি। ভাইয়ের বয়স বত্রিশ, বাবা মারা গেছেন গত বছর। তিনি ছিলেন রামপুরহাটে পূর্ণিমা টকিজের মালিক। এখন সন্তোষই মালিকানা ভোগ করছে, এবং হিন্দি ছবি দেখিয়ে পয়সাও কামিয়েছে মন্দ না। হয়ত হিন্দি ছবি দেখার জন্যই সে নিকুঞ্জর প্ল্যানের মধ্যে একটা দারুণ অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পেল। বলল, ‘তোমার কোন চিন্তা নেই নিকুঞ্জদা। আমার গাড়িতে করে সোজা নিয়ে গিয়ে তোমাকে একেবারে শ্মশানের মুখে নামিয়ে দেব।’
নিকুঞ্জের খেয়াল ছিল না যে তারাপীঠের শ্মশানেই হচ্ছে মন্দির, আর শ্মশানেই যত সাধুদের আস্তানা। সন্তোষ বলাতে মনে পড়ল তারাপীঠের বিখ্যাত সাধু বামাক্ষ্যাপা তো শ্মশানেই সাধনা করতেন; ঠিক কথা।
বিষ্যুদবার দিন ভোর থেকে মেক-আপ শুরু করে দিল নিকুঞ্জ। দাড়ি গোঁফ জটা লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে তার পরিচয় লোপ পেল। তারপর কপালে চন্দনের লেপ আর লাল ফোঁটা দিয়ে গলায় তিন গাছি বড় বড় রুদ্রাক্ষের মালা পরে গায়ে গেরুয়া বস্ত্র চাপানোর সঙ্গে সঙ্গে সন্তোষ তড়াক করে লাফিয়ে উঠে ঢিপ্‌ করে এক প্রণাম করল নিকুঞ্জকে।
‘ওফ্‌ফ্‌—নিকুঞ্জদা—এ যা হয়েছে না! কার বাপের সাধ্যি তোমাকে চেনে। নেহাত তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি বলে, নইলে আমিও ব্যোম্‌কে যেতুম।’
এই ক মাসে হাত পেকেছে, তাই দুপুর আড়াইটার মধ্যে মেক-আপ হয়ে গেল। চিমটে-কমণ্ডলু নতুন কেনা, তাই তাদেরও একটু মেক-আপ করে পুরোন করে নেওয়া হল। চারটের মধ্যে সম্পূর্ণ তৈরি নিকুঞ্জ সাহা ওরফে ঘনানন্দ মহারাজ। একটা নাম না দিলে চলে না, যদিও নিকুঞ্জ মাঝে মাঝে বম্‌ বম্‌ ছাড়া কথা বলবে না বলেই স্থির করেছে। সাধুরা অন্য জগতের মানুষ; সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের কথা বলতে হবে এমন কোনো কথা নেই। নামটা দরকার হচ্ছে সন্তোষের জন্য। সেই বলেছে, ‘নিকুঞ্জদা, তুমি যখন গাড়ি থেকে নামবে, লোকে ত ঘিরে ধরবেই। তখন যদি জিগ্যেস করে কে, তার জন্য একটা নামের দরকার।’ ঘনানন্দ দিব্যি গম্ভীর নাম। সন্তোষ এখন নিশ্চিন্ত।
সন্তোষ সচরাচর নিজেই গাড়ি চালায়। কিন্তু এবার সে একটি ড্রাইভার সঙ্গে নিল। বলল, ‘আমাকে সাধুবাবার সঙ্গে ঘোরাঘুরি করতে হবে, গাড়িটা কিন্তু আপনার জিম্মায় থাকবে।’
একটা কথা নিকুঞ্জ সন্তোষকে না বলে পারল না। ওখানে পৌঁছানর পর আমি কিন্তু একা হয়ে যেতে চাই। আমার লক্ষ্য হবে কালিকানন্দ। তাঁর আশেপাশে আরো পাঁচজন সাধুবাবা কি থাকবে না? নিশ্চয়ই থাকবে। আমি সেই দলে গিয়ে ভিড়ব। তুই বরং আলগা থেকে ভক্তদের দলে গিয়ে বসে পড়িস।’
‘তোমার কোনো চিন্তা নেই, নিকুঞ্জদা।’
সন্তোষের গাড়ি যখন তারাপীঠ শ্মশানে পৌঁছাল, তখন সূর্য ডুবতে আরো আধ ঘণ্টা বাকি। আর পাঁচটা পীঠস্থানের মতোই এখানেও লোকের ভিড়, পাণ্ডার ভিড়, পথের দুধারে লাইন করা দোকানে গাঁদা ফল আবির কুমকুম বই ক্যালেণ্ডার চা বিস্কুট তেলেভাজা মাছিবসা-জিলিপি ইত্যাদি সবই রয়েছে।
নিউ মহামায়া কেবিনের পর নিকুঞ্জর এখানে এসে এক আশ্চর্য নতুন অভিজ্ঞতা হল। গেরুয়া পরা লোক দেখলেই লোকের মনে যে কী করে ভক্তি ভাব জেগে ওঠে সে এক আশ্চর্য ব্যাপার। গাড়ি থেকে নামা মাত্র নিকুঞ্জ দেখল যে গড় করা শুরু হয়ে গেছে। ছেলেবুড়ো মেয়েপুরুষ কেউ বাদ নেই। আপনা থেকেই আশীর্বাদের ভঙ্গিতে নিকুঞ্জর হাতটা উঠে সামনের দিকে এগোতে শুরু করল। শেষে এমন হল যে হাত টেনে নেবারও অবসর নেই। পাশে সন্তোষ না থাকলে তাকে বোধহয় এক জায়গাতেই আটকে পড়তে হত। ‘দাদা সরুন, মা পথ দিন, পথ দিন’—এই করে সন্তোষ কোনো মতে একটা অপেক্ষাকৃত জনবিরল জায়গায় নিয়ে গিয়ে ফেলল নিকুঞ্জকে। এখানে চারিদিকে সাধুর অভাব নেই, ফলে আলাদা করে নিকুঞ্জর দিকে লোকের দৃষ্টি পড়ার কোনো কারণ নেই।
এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে নিকুঞ্জ দেখল যে কিছদূরে একটা বটগাছের নিচে একটা ভিড় দেখা যাচ্ছে। গেরুয়া ছাড়াও অন্য রং রয়েছে সেখানে। সন্তোষ বলল, ‘আপনি একটু দাঁড়ান, আমি দেখে আসছি ওইখেনেই কালিকানন্দ বসেছেন কিনা। ওঁর সামনে আপনাকে পৌঁছে দিয়ে তবে আমার কাজ শেষ। আমি আপনাকে চোখে চোখে রাখব, তারপর যখন যাবার ইচ্ছে হবে তখন আমাকে ইশারা করলেই আমি বুঝতে পারব।’

‘সন্তোষ দেখে এসে ফিস্‌ ফিস্‌ করে জানাল ওই ভিড়টা কালিকানন্দর জন্যই বটে। ‘আপনি সোজা এগিয়ে যান নিকুঞ্জদা। কুছ পরোয়া নেই।’
পরোয়া নিকুঞ্জের এমনিতেও নেই। সে এখানে এসে অবধি অত্যন্ত সহজ বোধ করছে। সেই সঙ্গে একটা পরম তৃপ্তির ভাব। মেক-আপে তার জুড়ি কেউ নেই সে বিশ্বাসটা তার মনে আজ পাকা হয়েছে।
নিকুঞ্জ এগিয়ে গেল ভিড়ের দিকে। পথে দু একজন গড় করল। নিকুঞ্জ যথারীতি হাত বাড়িয়ে আশীর্বাদ করল।
উদাত্ত কণ্ঠে উচ্চারিত বাণী কিছুক্ষণ থেকেই শোনা যাচ্ছে; নিকুঞ্জ এগোনর সঙ্গে সঙ্গে শব্দ ক্রমশ জোর হয়ে আসছে। আরেকটু এগিয়ে যেতেই সে দেখতে পেল কালিকানন্দকে। বাঘের মত চেহারা বটে, এবং বাঘছালের উপরেই বসেছেন তিনি। তিনিই বাণী শোনাচ্ছেন ভক্তদের। সবই ছেঁদো কথা, কিন্তু বলার ঢং-এ বিশেষত্ব আছে। আর সেই সঙ্গে চোখের দৃষ্টিতেও। মণিকে ঘিরে যে সাদা অংশ সেটা সাদা নয়, গোলাপী। গাঁজা খাওয়ায় ফল কি? হতেও পারে।
ভক্তের সংখ্যা পঞ্চাশ-ষাটের বেশি নয়, তবে একজন দুজন করে ক্রমেই বাড়ছে। ওই ত ভুজঙ্গবাবু আর তাঁর স্ত্রী! তনয়বাবুও নিশ্চয়ই আছেন ভিড়ের মধ্যে। ভুজঙ্গবাবুরা মনে হয় বেশ সকাল সকাল এসেছেন, কারণ তাঁদের স্থান ভক্তদের একেবারে প্রথম সারিতে।
কালিকানন্দের দুপাশে এবং পিছনে দশ বারো জন গেরুয়াধারী বসেছেন, তাঁদের সকলেরই গোঁফদাড়ি জটা, রুদ্রাক্ষের মালা, সর্বাঙ্গে ভস্ম। অর্থাৎ নিকুঞ্জর সঙ্গে তাঁদের চেহারার তফাত করা প্রায় অসম্ভব।
নিকুঞ্জ ভিড়ের পিছন দিয়ে এগিয়ে গেল সাধুদের দলের দিকে। কোত্থেকে যেন একটা গান ভেসে আসছে—
কে হরি বোল হরি বোল বলিতে যায়
যা রে মাধাই জেনে আয়
বুঝি গৌর যায় আর নিতাই যায়
যাদের সোনার নূপুর রাঙ্গা পায়—
হঠাৎ গানটা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল। কেন? কারণ আর কিছুই না—কালিকানন্দের কথা থেমে গেছে।
নিকুঞ্জের দৃষ্টি গেল সাধুবাবার দিকে।
কালিকানন্দ তার দিকেই চেয়ে আছে। এক দৃষ্টে। রাঙা চোখে।
নিকুঞ্জের হাঁটা থেমে গেছে।
অন্যান্য সাধ আর ভক্তদের দৃষ্টিও তার দিকে।
এবার কালিকানন্দের উদাত্ত কণ্ঠে প্রশ্ন এল, ‘বাবাজীর ভেক ধরা হয়েছে, অ্যাঁ? গেরুয়া পরলেই সাধু হয়? গলায় মালা পরলেই সাধু? গায়ে ছাই মাখলেই সাধু? অ্যাঁ? তোর আস্পর্ধা তো কম না? তোর জটা ধরে যদি টান দিই, তখন কী হবে? কোথায় যাবে তোর সাধুগিরি?’
চোখের পলকে সন্তোষ হাজির নিকুঞ্জের পাশে।
‘আর নয় দাদা। সোজা গাড়িতে।’
নিকুঞ্জের সমস্ত দেহ অবশ, কিন্তু তাও পালানো ছাড়া পথ নেই। সন্তোষের কাঁধে ভর করে প্রায় চোখ বন্ধ করে সে রওনা দিল শ্মশানের গেটের উদ্দেশে। কান ত খোলা, তাই কালিকানন্দের শেষ কথাগুলো না শুনে পারল না—‘এই ভণ্ডামির ফল কী তা জান তুমি, নিকুঞ্জ সাহা?’
কলকাতায় পৌঁছে বাসা বদল করতে হল। আর এ তল্লাটেই নয়। ভুজঙ্গবাবুর সামনে ঘটেছে ঘটনাটা; তিনি এসেই হাটে হাঁড়ি ভাঙবেন। তখন আর টিটকিরিতে কান পাতা যাবে না। ভবানীপুরে কাঁসারিপাড়া লেনে একটা ফ্ল্যাট পাওয়া গেল ভাগ্যক্রমে। ফ্ল্যাট মানে দেড়খানা ঘর। ভাড়া আড়াইশো টাকা। বাপ্‌রে বাপ্‌—তান্ত্রিকের কী তেজ, কী অন্তর্দৃষ্টি! পাদ্রী, পুরুত, মোল্লা, দরবেশ—এই সব মেক-আপের যা সরঞ্জাম ছিল নিকুঞ্জর কাছে, সব বাক্স থেকে বার করে নিয়ে কাছেই আদিগঙ্গার জলে ফেলে দিল সে।
তিন হপ্তা গেল আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে। ইতিমধ্যে নতুন পাড়ায় আলাপী হয়েছে দু একজন। এখানেও রয়েছে বাড়ি থেকে আধমাইলের মধ্যে বড় রাস্তায় একটি রেস্টোরাণ্ট, নাম পরাশর কেবিন। এখানে কেউই জানে না নিকুঞ্জের কলঙ্কময় ইতিহাস—তারকবাবু, নগেন মাস্টার, শিবু পোদ্দার। শিবু আবার থিয়েটারে পার্ট করে। নিকুঞ্জকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল একদিন তপন থিয়েটারে ‘আগুনের ফুল্‌কি’ দেখাতে। ‘দেখবেন কেমন ফার্স্ট ক্লাস মেক-আপ নিই’, যাবার আগে বলেছিল শিবু। নিকুঞ্জ দেখে হাসবে না কাঁদবে ঠিক করতে পারেনি। এ-ই মেক-আপ! এরা কি ভালো মেক-আপ দেখেছে কোনোদিন? আমার মেক-আপ দেখলে ত এদের লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যাবে!
পরক্ষণেই অবিশ্যি মনে পড়ল তারাপীঠের অভিজ্ঞতার কথা। তবে, তান্ত্রিকদের অলৌকিক ক্ষমতার কথা ত শোনাই যায়। এতে অবাক হবার কিছু নেই। নিকুঞ্জর চালে একটু ভুল হয়ে গিয়েছিল, এই যা।
কিন্তু তাই বলে কি তার এত সাধের অকুপেশনটি একেবারে বরবাদ করে দিতে হবে? সে হয় না, হতে পারে না। আরো কত কী সাজতে বাকি আছে! যেমন, একটা সত্যি করে ষণ্ডা চরিত্র এখনো সাজা হয়নি। এক তান্ত্রিক ছাড়া যা সেজেছে সবই নিরীহ অমায়িক চরিত্র—যাদের দিকে এমনিতেই লোকের দৃষ্টি যায় না। চোখ যাবে অথচ চেনা যাবে না—তেমন একটা চরিত্রের মেক-আপ না করলে আর সত্যি করে সাফল্যের পরীক্ষা হবে কি করে?
কেমন হবে এই ষণ্ড চরিত্র? মাথায় কদম-ছাঁট চুল, মুখে চার দিনের দাড়ি, চোখের নিচে একটা ক্ষতচিহ্ন—যাকে বলে ‘স্কার’—নাকটা একটু ভাঙা—মুষ্টি-যোদ্ধার মতো—হাতে উল্‌কি, গলায় চেন, পরনে বোতাম ছাড়া চেক শার্ট আর বর্মার লুঙ্গি।
তারাপীঠের অভিজ্ঞতার পর নিকুঞ্জর আর ছদ্মবেশের ত্রিসীমানায় যাওয়া উচিত ছিল না, কিন্তু শখটা বোধহয় এমনই মজ্জাগত যে কাজের বেলা দেখা গেল সে দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে বসে গেছে আবার আয়নার সামনে।
সকালবেলা চা খেয়েই কাজে লেগে যাওয়ার ফলে সেদিন আর নিকুঞ্জর খবরের কাগজটা দেখা হয়নি। ফলে খিদিরপুরে জোড়া খুনের খবরটা, এবং পলাতক আততায়ী ডাকসাইটে গুণ্ডা বাঘা মণ্ডলের ছবিটাও দেখা হয়নি। যদি হত তাহলে অবিশ্যি নিকুঞ্জ মেক-আপটা অন্যরকম ভাবে করত। বাঘা মণ্ডলের ছবি মাস ছয়েক আগেও একবার বেরিয়েছিল কাগজে। সেটা একটা দুঃসাহসিক ডাকাতির পরে। সে বারও বাঘা পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়েছিল। কাগজে ছবি ছাপার উদ্দেশ্য ছিল জনসাধারণকে সতর্ক করা। সেই প্রথমবারের ছবি কি নিকুঞ্জ দেখেছিল, আর সেই চেহারা তার মনের অবচেতনে গাঁথা হয়ে গিয়েছিল? না হলে আজ সে হুবহু বাঘা মণ্ডলের ছদ্মবেশ নেবে কেন?
ছবি দেখে থাকলেও, বাঘা সংক্রান্ত ঘটনাবলী নিশ্চয়ই নিকুঞ্জর জানা ছিল না। যদি থাকত তাহলে তাকে এসে টেবিলে বসতে দেখে যেভাবে পরাশর কেবিন খালি হয়ে গেল, সেটা তার মনে কোনো বিস্ময়ের সৃষ্টি করত না।
ব্যাপারটা কী? এরা এরকম করছে কেন? ম্যানেজার উঠে কোথায় গেলেন? বয়টা ওই কোণে, ওরকম ফ্যাকাসে মুখ করে দাঁড়িয়ে ঠক্‌ ঠক্‌ করে কাঁপছে কেন?
ম্যানেজার যে পাশের ডাক্তারখানায় গিয়েছেন পুলিশে ফোন করতে এবং সেই ফোন যে পুলিশ ভ্যানকে চুম্বকের মতো টেনে আনবে নিকুঞ্জের পাড়ায়, সেটা আর নিকুঞ্জ জানবে কি করে? তবে এমনও দেখা যায় যে একজন লোকের চরম সংকটের মুহূর্তে তার উদ্ধারকল্পে ভাগ্যদেবতা পুরো হাতটা না হলেও, অন্তত একটা আঙুল তার দিকে বাড়িয়ে দেন। সেই আঙুলই হল নিকুঞ্জর পাশের চেয়ারে পড়ে থাকা একটি দৈনিক কাগজ। কাগজটা পুরো দেখারও দরকার নেই; যে পাতায় সেটা খোলা রয়েছে, তাতেই রয়েছে খুনী বাঘা মণ্ডলের ছবি, আর সঙ্গে সংক্ষিপ্ত গরম খবর।
এই মুখই আজ নিকুঞ্জের আয়নায় তারই চোখের সামনে ক্রমে ফুটে উঠেছে।
নিকুঞ্জর হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেলেও কাগজটা কাছে টেনে এনে খবরটায় একবার চোখ বুলিয়ে নেবার লোভ সে সামলাতে পারল না। আর নেওয়ামাত্র সমস্ত ব্যাপারটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল।
রাস্তায় বেরিয়ে দ্রুতপদে (দৌড়ালে লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে) কাঁসারিপাড়া লেনে নিজের বাসায় গিয়ে ঢুকতে সময় লাগল দশ মিনিট। একটা গাড়ির শব্দ সে পিছন থেকে পেয়েছে, এবং ঠিকই সন্দেহ করেছে সেটা পুলিশ ভ্যান—কিন্তু সেদিকে দৃক্‌পাত করেনি। আসুক পুলিশ। পুলিশই বোকা বনবে। তারা সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় পৌঁছানর আগেই নিকুঞ্জর ছদ্মবেশ উধাও হয়ে যাবে। নিকুঞ্জ সাহা ত কোনো অপরাধ করেনি, করেছে বাঘা মণ্ডল।
ঘরে ঢুকে চাকরকে চায়ের জল চাপাতে বলে নিকুঞ্জ দরজাটা খিল দিয়ে বন্ধ করে দিল। ওই যাঃ!—লোড শেডিং। এখন জাপানী জেনারেটর চালাতে গেলে সময় লাগবে।
কুছ পরোয়া নেই। মোমবাতি আছে। কিন্তু আগে জামাটা ছেড়ে ফেলা উচিত। সে কাজটা অন্ধকারেই হবে।
নিকুঞ্জ এক নিমেষে লুঙ্গি শার্ট কালো কোট ছেড়ে খাটের উপর ছুঁড়ে ফেলে এক ঝটকায় আলনা থেকে পায়জামাটা নামিয়ে নিয়ে সেটাকে পরে ফেলল। তারপর দেশলাইয়ের আলোয় মোমবাতিটা দেরাজ থেকে বার করে সেটাকে জ্বালিয়ে টেবিলের উপর রাখল।
এখনো পুলিশ ভ্যানের কোনো শব্দ নেই। পুলিশ হয়ত পাড়ায় নেমে খোঁজ নিচ্ছে কোন্‌ বাড়িতে ঢুকেছে বাঘা মণ্ডল। এ বাড়ির লোক অন্তত তাকে ঢুকতে দেখেনি। সামনের বা আশেপাশের বাড়ির কথা নিকুঞ্জ জানে না।
এই সব চিন্তার মধ্যেই নিকুঞ্জ হাত চালাতে শুরু করল। প্রথমে নকল গোঁফ।
নকল গোঁফ?
নকল যদি হবে ত টানলে খোলে না কেন? স্পিরিট গাম দিয়ে আটকানো গোঁফ ত এক টানেই খুলে যায়—তবে?
মোমবাতিটা মুখের কাছে এনে আয়নার দিকে ঝুঁকতে নিকুঞ্জর রক্ত জল হয়ে গেল।
এ গোঁফ ত নকল বলে মনে হয় না! এ যে তার চামড়া থেকেই গজিয়েছে! আঠার কোন চিহ্ন ত এ গোঁফে নেই!
এ পরচুলাও ত পরচুলা নয়—এ যে তার নিজেরই চুল? এমনকি চারদিনের যে গজানো দাড়ি, যে দাড়ি সে একটি একটি করে গালে লাগিয়েছিল—তাতেও ত কৃত্রিমতার কোনো চিহ্ন নেই।
আর চোখের তলার ওই ক্ষতচিহ্ন? কোন ক্ষণজন্মা মেক-আপ শিল্পীর ক্ষমতা এমন ক্ষতচিহ্ন তৈরি করে রং তুলি আঠা আর প্লাস্টিসিনের সাহায্যে? এ তো সেই উনিশ বছর আগে এন্টালির গাঁজা পার্কে বদ্রু শেখের সঙ্গে হাতাহাতির সময় ছুরির আঘাতের ফল! বাঘা তখন বাঘা হয়নি, তখন সে রাধু মণ্ডল, বয়স একুশ, সবে গুণ্ডামিতে তালিম নিচ্ছে মেঘনাদ রক্ষিতের কাছে।...
দরজা ভেঙে ঢুকতে হল পুলিশকে। মাটিতে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকা বাঘা মণ্ডলের দিকে টর্চ ফেলে দারোগা চাকর নিতাইকে জিগ্যেস করলেন, ‘এই লোক কি এ বাড়িতেই থাকে?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। উনি ত আমার মনিব।’
‘কী নামে জান ওঁকে?’
‘নিকুঞ্জবাবু। সাহাবাবু।’
‘হুঁঃ!—ভদ্রলোক সাজা হয়েছে!’ ব্যাঁকা হাসি হেসে বললেন দারোগাবাবু। তারপর কনস্টেবলের দিকে ফিরে বললেন, ‘ওকে ধরে বেশ করে ঝাঁকাও ত দেখি। হুঁশ ফিরুক, তারপর বাকি কাজ।’
রিভলভার বার করে তাগ করে রইলেন দারোগা বেহুঁশ আততায়ীর দিকে।
ঝাঁকানি দিতেই প্রথমে বাঘা মণ্ডলের পরচুলাটা খসে মাটিতে পড়ল। তারপর গোঁফটা। তার প্লাস্টিসিন দিয়ে সযত্নে তৈরি ক্ষতচিহ্ন ও নাকের বাড়তি অংশটা উঠে এল নেট সমেত।
ততক্ষণে অবিশ্যি নিকুঞ্জ সাহার জ্ঞান ফিরেছে।
কাপালিকের ধমকানিতে যে কাজ হয়নি, আজ পুলিশের শাসানিতে তা হল।
নিকুঞ্জ এখন বই পড়ে মৃৎশিল্প বা ক্লে মডেলিং শিখছে। গঙ্গা কাছেই, নিতাই সেখান থেকে মাটি এনে দেয়। নিকুঞ্জর ইচ্ছা নিতাই হবে তার প্রথম মডেল।


বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

If Download link doesn't work then please try VPN or TOR Browser and then comment below. Also You can follow us on Twitter, Facebook Page, join our Facebook Reading Group to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature. Also try our Phonetic Bangla typing: Avro.app
বইটি শেয়ার করুন :

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com