সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label Short-stories. Show all posts
Showing posts with label Short-stories. Show all posts

পৌরানিক গল্প - হরিশংকর জলদাস

amarboi
পৌরানিক গল্প - হরিশংকর জলদাস
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

দুই দশকের দেশ গল্প সংকলন (১৯৮৩ - ২০০৩)

amarboi
দুই দশকের দেশ গল্প সংকলন (১৯৮৩ - ২০০৩)
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

ফরগেট মি নট - সত্যজিৎ রায় [Netflix Ray Episode 1 - Forget Me Not by Satyajit Ray]

amarboi
বিপিন চৌধুরীর স্মৃতিভ্রম
সত্যজিৎ রায়

নিউ মার্কেটের কালীচরণের দোকান থেকে প্রতি সোমবার আপিস-ফেরতা বই কিনে বাড়ি ফেরেন বিপিন চৌধুরী। যতরাজ্যের ডিটেকটিভ বই, রহস্যের বই আর ভূতের গল্প। একসঙ্গে অন্তত খান পাঁচেক বই না কিনলে তাঁর এক সপ্তাহের খোরাক হয় না। বাড়িতে তিনি একা মানুষ। লোকের সঙ্গে মেলামেশা তাঁর ধাতে আসে না, আড্ডার বাতিক নেই, বন্ধুপরিজনের সংখ্যাও কম। সন্ধ্যায় তাঁর বাড়িতে যেসব কাজের লোক আসেন, তাঁরা কাজের কথা সেরে উঠে চলে যান। যাঁরা ওঠেন না বা উঠতে চান না, বিপিনবাবু তাঁদের সোয়া আটটা বাজলেই বলেন— ‘আমার ডাক্তারের আদেশ আছে— সাড়ে আটটায় খাওয়া সারতে হবে। কিছু মনে করবেন না…’। খাওয়ার পর আধঘণ্টা বিশ্রাম, তারপর গল্পের বই হাতে নিয়ে সোজা বিছানায়। এই নিয়ম যে কতদিন ধরে চলেছে বিপিনবাবুর নিজেরই তার হিসেব নেই।
আজ কালীচরণের দোকানে বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে বিপিনবাবুর খেয়াল হল আরেকটি লোক যেন তাঁর পাশে কিছুক্ষণ থেকে দাঁড়িয়ে আছে। বিপিনবাবু মুখ তুলে দেখেন একটি গোলগাল অমায়িক চেহারার ভদ্রলোক তাঁরই দিকে চেয়ে হাসছেন।
‘আমায় চিনতে পারছেন না বোধহয়?’
বিপিনবাবু কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত বোধ করলেন। কই, এর সঙ্গে তো কোনদিন আলাপ হয়েছে বলে তাঁর মনে পড়ে না। এমন মুখও তো কোন মনে পড়ছে না তাঁর।
‘অবিশ্যি আপনি কাজের মানুষ। অনেক রকম লোকের সঙ্গে দেখা হয় তো রোজ—তাই বোধহয়…’
‘আমার কি আপনার সঙ্গে আলাপ হয়েছে এর আগে?’ বিপিনবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
ভদ্রলোক যেন এবার একটু অবাক হয়েই বললেন, ‘আজ্ঞে সাতদিন দু’বেলা সমানে দেখা হয়েছে। আমি গাড়ির ব্যবস্থা করে দিলুম—সেই গাড়িতে আপনি হুড্রু ফল্‌স দেখতে গেলেন। সেই নাইনটিন ফিফটি-এইটে—রাঁচিতে! আমার নাম পরিমল ঘোষ।’
‘রাঁচি?’ বিপিনবাবু এবার বুঝলেন যে ভুল তাঁর হয় নি, হয়েছে এই লোকটিরই। কারণ বিপিনবাবু কোনদিন রাঁচি যান নি। যাবার কথা হয়েছে অনেকবার, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়ে ওঠে নি। এবার বিপিনবাবু একটু হেসে বললেন, ‘আমি কে তা আপনি জানেন কি?’
ভদ্রলোক চোখ কপালে তুলে জিভ কেটে বললেন, ‘আপনি কে তা জানব না? বলেন কী? বিপিন চৌধুরীকে কে না জানে?’
বিপিনবাবু এবার বইয়ের দিকে দৃষ্টি দিয়ে মৃদুস্বরে বললেন, ‘কিন্তু তাও আপনার ভুল হয়েছে। ওরকম হয় মাঝে মাঝে। আমি রাঁচি যাই নি কখনো।’
ভদ্রলোক এবার বেশ জোরে হেসে উঠলেন।
‘কী বলছেন মিস্টার চৌধুরী? ঝরনা দেখতে গিয়ে পাথরে হোঁচট খেয়ে আপনার হাঁটু ছড়ে গেল। আমিই শেষটায় আয়োডিন এনে দিলুম। পরদিন নেতারহাট যাবার জন্যে আমি গাড়ি ঠিক করেছিলুম—আপনি পায়ের ব্যথার জন্যে যেতে পারলেন না। কিচ্ছু মনে পড়ছে না? আপনার চেনা আরেকজন লোকও তো গেস্‌লেন সেবার—দীনেশ মুখুজ্যে। আপনি ছিলেন একটা বাংলো ভাড়া করে—বললেন হোটেলের খাবার আপনার ভালো লাগে না—তার চেয়ে বাবুর্চি দিয়ে রান্না করিয়ে নেওয়া ভালো। দীনেশ মুখুজ্যে ছিলেন তাঁর বোনের বাড়িতে। আপনাদের দুজনের সেই তর্ক লেগেছিল একদিন চাঁদে যাওয়ার ব্যাপার নিয়ে—মনে নেই? সব ভুলে গেলেন? আরো বলছি—আপনার কাঁধে একটা ঝোলানো ব্যাগ ছিল—তাতে গল্পের বই থাকত। বাইরে গেলে নিয়ে যেতেন। কেমন—ঠিক কিনা?’
বিপিনবাবু এবার গম্ভীর সংযত গলায় বললেন, ‘আপনি ফিফ্‌টি-এইটের কোন্‌ মাসের কথা বলছেন বলুন তো?
ভদ্রলোক বললেন, ‘মহালয়ার ঠিক পরেই। হয় আশ্বিন, নয় কার্তিক।’
বিপিনবাবু বললেন, ‘আজ্ঞে না। পুজোয় সে বছর আমি ছিলুম কানপুরে আমার এক বন্ধুর বাড়িতে। আপনি ভুল করলেন। নমস্কার।’
কিন্তু ভদ্রলোক গেলেন না। অবাক অপলক দৃষ্টিতে বিপিনবাবুর দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে বলে যেতে লাগলেন, ‘কী আশ্চর্য! একদিন সন্ধ্যাবেলা আপনার বাংলোর দাওয়ায় বসে চা খেলুম। আপনি আপনার ফ্যামিলির কথা বললেন-বললেন, আপনার ছেলেপিলে নেই, আপনার স্ত্রী বারো তেরো বছর আগে মারা গেছেন। একমাত্র ভাই পাগল ছিলেন, তাই আপনি পাগলা গারদ দেখতে যেতে চাইলেন না। বললেন, ভাইয়ের কথা মনে পড়ে যায়…’
বিপিনবাবু যখন বইয়ের দামটা দিয়ে দোকান থেকে বেরোচ্ছেন তখনও ভদ্রলোক তাঁর দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছেন।
বারট্রাম স্ট্রীটে লাইটহাউস সিনেমার গায়ে বিপিন চৌধুরীর বুইক গাড়িটা লাগানো ছিল। তিনি গাড়িতে পৌঁছে ড্রাইভারকে বললেন, ‘একটু গঙ্গার ধারটায় ঘুরে চলো তো সীতারাম।’
চলন্ত গাড়িতে বসে মাথাটা একটু ঠাণ্ডা হতেই বিপিনবাবুর আপসোস হল। বাজে ভণ্ড লোকটাকে এতটা সময় কেন মিছিমিছি দিলেন তিনি! রাঁচি তো তিনি যান নি, কখনই যেতে পারেন না। মাত্র ছ’ সাত বছর আগেকার স্মৃতি মানুষে অত সহজে ভুলতে পারে না, এক যদি না—
বিপিনবাবুর মাথা হঠাৎ বন্ করে ঘুরে গেল।
এক যদি না তাঁর মাথা খারাপ হয়ে গিয়ে থাকে।
কিন্তু তাই বা হয় কী করে? তিনি তো দিব্যি আপিসে কাজ করে যাচ্ছেন। এত বিরাট আপিস—এত দায়িত্বপূর্ণ কাজ। কোথাও তো কোন ত্রুটি হচ্ছে বলে তিনি জানেন না। আজও তো একটা জরুরী মিটিং-এ আধ ঘণ্টার বক্তৃতা দিয়েছেন তিনি। আশ্চর্য! অথচ—
অথচ লোকটা তাঁর এত খবর রাখল কী করে? এ যে একেবারে নাড়ী-নক্ষত্র জেনে বসে আছে। বইয়ের ব্যাগ, স্ত্রীর মৃত্যু, ভাইয়ের মাথা খারাপ! ভুল করেছে কেবল ওই রাঁচির ব্যাপারে। ভুল কেন—জেনেশুনে মিথ্যে বলছে। আটান্ন সালের পুজোয় তিনি রাঁচি যান নি; গিয়েছিলেন কানপুরে, তাঁর বন্ধু হরিদাস বাগচির বাড়িতে। হরিদাসকে লিখলেই—নাঃ, হরিদাসকে লেখার উপায় নেই।
বিপিনবাবুর হঠাৎ খেয়াল হল হরিদাস বাগচি আজ মাসখানেক হল সস্ত্রীক জাপানে গেছেন তাঁর ব্যবসার ব্যাপারে। জাপানের ঠিকানা বিপিনবাবু জানেন না। কাজেই চিঠি লিখে প্রমাণ আনানোর রাস্তা বন্ধ।
কিন্তু প্রমাণের প্রয়োজনটাই বা কোথায়। এমন যদি হত যে উনিশ শ’ আটান্ন সালের আশ্বিন মাসে রাঁচিতে কোন খুনের জন্য পুলিশ তাঁকে দায়ী করার চেষ্টা করছে, তখনই তাঁর চিঠির প্রয়োজন হত হরিদাস বাগচির কাছ থেকে। এখন তো প্রমাণের কোন দরকার নেই। তিনি নিজে জানেন তিনি রাঁচি যান নি। ব্যস্‌, ল্যাঠা চুকে গেল।
গঙ্গার হাওয়াতে বিপিন চৌধুরীর মাথা অনেক ঠাণ্ডা হলেও, মনের মধ্যে একটা খটকা, একটা অসোয়াস্তিবোধ যেন থেকেই গেল!
হেস্‌টিংস-এর কাছাকাছি এসে বিপিনবাবু তাঁর প্যান্টের কাপড়টা গুটিয়ে উপরে তুলে দেখলেন যে ডান হাঁটুতে একটা এক ইঞ্চি লম্বা কাটা দাগ রয়েছে। সেটা কবেকার দাগ তা বোঝবার কোন উপায় নেই। ছেলেবেলা কি কখনও হোঁচট খেয়ে হাঁটু ছড়ে নি বিপিনবাবুর? অনেক চেষ্টা করেও সেটা তিনি মনে করতে পারলেন না।
চড়কডাঙার মোড়ের কাছাকাছি এসে তাঁর দীনেশ মুখুজ্যের কথাটা মনে পড়ল। লোকটা বলছিল দীনেশ মুখুজ্যে ছিল রাঁচিতে ওই একই সময়ে। তাহলে দীনেশকে জিজ্ঞেস করলেই তো হয়। সে থাকে কাছেই—বেণীনন্দন স্ট্রীট। এখনই যাবেন কি তার কাছে? কিন্তু যদি রাঁচি যাওয়ার ব্যাপারটা মিথ্যেই হয়—তাহলে দীনেশকে সে সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞেস করতে গেলে তো সে বিপিনবাবুকে পাগল ঠাওরাবে। না না—এ ছেলেমানুষি তাঁর পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। নিজেকে সেধে সেধে এইভাবে বোকা বানানো কোনমতেই চলতে পারে না। আর দীনেশের বিদ্রূপ যে কত নির্মম হতে পারে তার অভিজ্ঞতা বিপিনবাবুর আছে।…
বাড়ি এসে ঠাণ্ডা ঘরে বসে ঠাণ্ডা শরবত খেয়ে বিপিনবাবুর উদ্বেগটা অনেক কম বলে মনে হল। যত সব বাউন্ডুলের দল! নিজেদের কাজকর্ম নেই, তাই কাজের লোকদের ধরে ধরে বিব্রত করা।
রাত্রে খাওয়াদাওয়া সেরে বিছানায় শুয়ে নতুন বইটা পড়তে পড়তে বিপিনবাবু নিউ মার্কেটের ভদ্রলোকটির কথা ভুলেই গেলেন।
পরদিন আপিসে কাজ করতে করতে বিপিনবাবু লক্ষ করলেন যে, যতই সময় যাচ্ছে ততই যেন গতকালের ঘটনাটা তাঁর স্মৃতিতে আরো বেশি স্পষ্ট হয়ে আসছে। সেই গোলগাল মুখ, সেই ঢুলুঢুলু অমায়িক চাহনি, আর সেই হাসি। তাঁর এত ভেতরের খবরই যদি লোকটা নির্ভুল জেনে থাকে, তবে রাঁচির ব্যাপারটায় সে এত ভুল করল কী করে?
লাঞ্চের ঠিক আগে—অর্থাৎ একটা বাজতে পাঁচ মিনিটের সময়—বিপিনবাবু আর থাকতে না পেরে টেলিফোনের ডিরেক্টরিটা খুলে বসলেন। দীনেশ মুখুজ্যেকে ফোন করতে হবে একটা। ফোনই ভালো। অপ্রস্তুত হবার সম্ভাবনাটা কম।
টু-থ্রি-ফাইভ-সিক্স-ওয়ান-সিক্স।
বিপিনবাবু ডায়াল করলেন।
‘হ্যালো।’
‘কে, দীনেশ? আমি বিপিন কথা বলছি।’
‘কী খবর?’
‘ইয়ে ফিফ্‌টি এইটের একটা ঘটনা তোমার মনে আছে কিনা জানবার জন্য ফোন করছি।’
‘ফিফটি এইট? কী ঘটনা?’
‘সে বছরটা কি তুমি কলকাতাতেই ছিলে? আগে সেইটে আমার জানা দরকার।’
‘দাঁড়াও দাঁড়াও। ফিফটি এইট—আটান্ন…দাঁড়াও, আমার ডায়েরি দেখি। একটু ধরো।’
একটুক্ষণ চুপচাপ। বিপিনবাবু তাঁর বুকের ভেতরে একটা দুরুদুরু কাঁপুনি অনুভব করলেন। প্রায় এক মিনিট পরে আবার দীনেশ মুখুজ্যের গলা পাওয়া গেল।
‘হ্যাঁ, পেয়েছি। আমি বাইরে গেস্‌লাম—দু’বার।’
‘কোথায়?’
‘একবার গেলাম ফেব্রুয়ারিতে কাছেই—কেষ্টনগর—আমার এক ভাগনের বিয়েতে। আরেকবার—ও, এটা তো তুমি জানই। সেই রাঁচি। সেই যে যেবার তুমিও গেলে। ব্যস্‌। কিন্তু কেন বলো তো?’
‘না। একটা দরকার ছিল। ঠিক আছে। থ্যাঙ্ক ইউ…’
বিপিনবাবু টেলিফোনটা রেখে দিয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। তাঁর কান ভোঁ ভোঁ করছে, হাত পা যেন সব কেমন ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। সঙ্গে টিফিনের বাক্সে স্যান্ডউইচ ছিল, সেটা আর তিনি খেলেন না। খাবার কোন ইচ্ছেই হল না। তাঁর খিদে চলে গেছে।
লাঞ্চ টাইম শেষ হয়ে যাবার পর বিপিনবাবু বুঝতে পারলেন, এ অবস্থায় তাঁর পক্ষে আপিসে বসে কাজ করা অসম্ভব। তাঁর পঁচিশ বছরের কর্মজীবনে এর আগে এরকম কখনো হয় নি। নিরলস কর্মী বলে বিপিনবাবুর একটা খ্যাতি ছিল। কর্মচারীরা তাঁকে বাঘের মতো ভয় করত। যত বিপদই আসুক, যত বড় সমস্যারই সামনে পড়তে হোক, বিপিনবাবুর কোনদিন মতিভ্রম হয় নি। মাথা ঠাণ্ডা করে কাজ করে সব সময়ে সব বিপদ কাটিয়ে উঠেছেন তিনি।
আজ কিন্তু তাঁর সমস্ত গোলমাল হয়ে গেছে!
আড়াইটের সময় বাড়ি ফিরে, শোবার ঘরের সমস্ত দরজা জানালা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে মনটাকে প্রকৃতিস্থ করে, কী করা উচিত সেটা ভাববার চেষ্টা করলেন বিপিনবাবু। মানুষ মাথায় চোট খেয়ে বা অন্য কোনরকম অ্যাকসিডেন্টের ফলে মাঝে মাঝে পূর্বস্মৃতি হারিয়ে ফেলে। কিন্তু আর সব মনে আছে, শুধু একটা বিশেষ ঘটনা মনে নেই—এর কোন উদাহরণ তিনি আর কখনও পাননি। রাঁচি যাবার ইচ্ছে তাঁর অনেকদিন থেকেই ছিল। সেই রাঁচিই গেছেন, অথচ গিয়ে ভুলে গেলেন, এ একেবারে অসম্ভব।
বাইরে কোথাও গেলে বিপিনবাবু তাঁর বেয়ারাকে সঙ্গে নিয়ে যান। কিন্তু এখন যে বেয়ারাটা আছে সে নতুন লোক। সাত বছর আগে তাঁর বেয়ারা ছিল রামস্বরূপ। তিনি রাঁচি গিয়ে থাকলে সেও নিশ্চয়ই যেত, কিন্তু এখন সে আর নেই, তিন বছর হল নেই।
সন্ধ্যা পর্যন্ত বিপিনবাবু একাই কাটালেন তাঁর ঘরে। মনে মনে স্থির করলেন আজ কেউ এলেও তাঁর সঙ্গে দেখা করবেন না।
সাতটা নাগাদ চাকর এসে খবর দিল তাঁর সঙ্গে ধনী ব্যবসায়ী শেঠ গিরিধারিপ্রসাদ দেখা করতে এসেছেন। জাঁদরেল লোক গিরিধারিপ্রসাদ। কিন্তু বিপিনবাবুর মানসিক অবস্থা তখন এমনই যে তিনি বাধ্য হয়ে চাকরকে বলে দিলেন যে, তাঁর পক্ষে নীচে নামা সম্ভব নয়। চুলোয় যাক গিরিধারিপ্রসাদ!
সাড়ে সাতটায় আবার চাকরের আগমন। বিপিনবাবুর তখন সবে একটু তন্দ্রার ভাব এসেছে, একটা দুঃস্বপ্নের গোড়াটা শুরু হয়েছে, এমন সময় চাকরের ডাকে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। আবার কে এল? চাকর বলল, চুনিবাবু! বলছে ভীষণ জরুরী দরকার।
দরকার যে কী তা বিপিনবাবু জানেন। চুনি তাঁর স্কুলের সহপাঠী। সম্প্রতি দুরবস্থায় পড়েছে, কদিন থেকেই তাঁর কাছে আসছে একটা কোন চাকরির আশায়। বিপিনবাবুর পক্ষে তার জন্যে কিছু করা সম্ভব নয়, তাই প্রতিবারই তিনি তাকে না বলে দিয়েছেন, আচ্ছা নাছোড়বান্দা লোক তো চুনি!
বিপিনবাবু অত্যন্ত বিরক্তভাবে চাকরটাকে দিয়ে বলে পাঠালেন যে, শুধু আজ নয়—বেশ কিছুদিন তাঁর পক্ষে চুনির সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হবে না।
চাকর ঘর থেকে চলে যেতেই বিপিনবাবুর খেয়াল হল যে চুনির হয়তো আটান্নর ঘটনা কিছুটা মনে থাকতে পারে। তাকে একবার জিজ্ঞেস করাতে দোষ কী?
বিপিনবাবু তরতরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে বৈঠকখানায় হাজির হলেন। চুনি যাবার জন্য উঠে পড়েছিল, বিপিনবাবুকে নেমে আসতে দেখে সে যেন একটু আশান্বিত হয়েই ঘুরে দাঁড়াল।
বিপিনবাবু ভণিতা না করেই বললেন, ‘শোনো চুনি, তোমার কাছে একটা—মানে, একটু বেখাপ্পা প্রশ্ন আছে। তোমার তো স্মরণশক্তি বেশ ভালো ছিল বলে জানি—আর আমার বাড়িতে তো তুমি অনেক বছর ধরেই মাঝে মাঝে যাতায়াত করছ। ভেবে দেখো তো মনে পড়ে কিনা—আমি কি আটান্ন সালে রাঁচি গিয়েছিলাম?
চুনি বলল, ‘আটান্ন? আটান্নই তো হবে। নাকি উনষাট?’
‘রাঁচি যাওয়াটা নিয়ে তোমার কোন সন্দেহ নেই?’
চুনি এবার রীতিমত অবাক হয়ে গেল।
‘তোমার কি যাওয়ার ব্যাপারটা নিয়েই সন্দেহ হচ্ছে?’
‘আমি গিয়েছিলাম? তোমার ঠিক মনে আছে?’
চুনি সোফা থেকে উঠেছিল, সেটাতেই আবার বসে পড়ল। তারপর সে বিপিন চৌধুরীর দিকে কিছুক্ষণ তীক্ষ দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বলল, ‘বিপিন, তুমি কি নেশাটেশা ধরেছ নাকি আজকাল? এদিকে তো তোমার কোন বদনাম ছিল না! তুমি কড়া মেজাজের লোক, পুরোনো বন্ধুদের প্রতি তোমার সহানুভূতি নেই—এসবই তো জানতুম! কিন্তু তোমার তো মাথাটা পরিষ্কার ছিল; অন্তত কিছুদিন আগে অবধি ছিল!’
বিপিনবাবু কম্পিতস্বরে বললেন, ‘তোমার মনে আছে আমার যাবার কথা?’
চুনি এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে একটা পালটা প্রশ্ন করে বসল। সে বলল—
‘আমার শেষ চাকরি কী ছিল মনে আছে তোমার?’
‘বিলক্ষণ। তুমি হাওড়া স্টেশনে বুকিং ক্লার্ক ছিলে।’
‘তোমার সেটা মনে আছে, আর আমিই যে তোমার রাঁচির বুকিং করে দিলাম সেটা মনে নেই? তোমার যাবার দিন তোমার কামরায় গিয়ে দেখা করলাম, ডাইনিং কারে বলে তোমার খাবারের ব্যবস্থা করে দিলাম, তোমার কামরায় পাখা চলছিল না—সেটা লোক ডেকে চালু করে দিলাম—এসব তুমি ভুলে গেছ? তোমার হয়েছে কী?’
বিপিনবাবু একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন।
চুনি বলল, ‘তোমার কি অসুখ করেছে? তোমার চেহারাটা তো ভালো দেখছি না।’
বিপিনবাবু বললেন, ‘তাই মনে হচ্ছে। ক’দিন কাজের চাপটা একটু বেশি পড়েছিল। দেখি একটা স্পেশালিস্ট-টেশালিস্ট…’
বিপিনবাবুর অবস্থা দেখেই বোধহয় চুনি আর চাকরির উল্লেখ না করে আস্তে আস্তে বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে গেল।
পরেশ চন্দ্রকে ইয়াং ডাক্তার বলা চলে, চল্লিশের নীচে বয়স, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। বিপিনবাবুর ব্যাপার শুনে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। বিপিনবাবু তাঁকে মরিয়া হয়ে বললেন, ‘দেখুন ডক্টর চন্দ্র, আমার এ ব্যারাম আপনাকে সারিয়ে দিতেই হবে। আপিস কামাই করার ফলে যে কী ক্ষতি হচ্ছে আমার ব্যবসার তা আমি বোঝাতে পারব না। আজকাল তো অনেক ওষুধ বেরিয়েছে। আমার এ ব্যারামের জন্য কি কিছুই নেই? আমি যত টাকা লাগে দেব। যদি বিদেশ থেকে আনাবার দরকার হয় তারও ব্যবস্থা করব। কিন্তু এ রোগ আপনাকে সারাতেই হবে।’
ডাক্তার একটু ভেবেচিন্তে মাথা নেড়ে বললেন, ‘ব্যাপারটা কী জানেন মিস্টার চৌধুরী? আমার কাছে এ রোগ একেবারে নতুন জিনিস; আমার অভিজ্ঞতার একেবারে বাইরে। তবে একটা মাত্র উপায় আমি বলতে পারি। ফল হবে কিনা জানি না, কিন্তু চেষ্টা করে দেখতে পারেন। ক্ষতির কোন আশঙ্কা নেই।’
বিপিনবাবু উদ্‌গ্রীব হয়ে কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে বসলেন।
ডাক্তার বললেন, ‘আমার যতদূর মনে হচ্ছে—এবং আমার বিশ্বাস আপনারও এখন তাই ধারণা—যে আপনি সত্যিই রাঁচি গিয়েছিলেন, কিন্তু যে কোন কারণেই হোক, এই যাওয়ার ব্যাপারটা আপনি বেমালুম ভুলে গেছেন। আমি সাজেস্ট করছি যে আপনি আরেকবার রাঁচি যান। তাহলে হয়তো জায়গাটা দেখে আপনার আগের ট্রিপ-এর কথাটা মনে পড়ে যাবে। এটা অসম্ভব নয়। আজ এই মুহূর্তে তো বেশি কিছু করা সম্ভব নয়। আমি আপনাকে একটি বড়ি লিখে দিচ্ছি—সেটা খেলে হয়তো ঘুমটা হবে। ঘুমটা দরকার, তা নাহলে আপনার অশান্তি এবং তার সঙ্গে সঙ্গে আপনার অসুখও বেড়ে যাবে। আপনি একটা কাগজ দিন, আমি ওষুধটা লিখে দিচ্ছি।’
বড়ির জন্যেই হোক, বা ডাক্তারের পরামর্শের জন্যেই হোক, বিপিনবাবু পরদিন সকালে অপেক্ষাকৃত সুস্থ বোধ করলেন।
প্রাতঃকালীন জলযোগ সেরে আপিসে টেলিফোন করে কিছু ইন্‌স্ট্রাকশন দিয়ে সেইদিনই রাত্রের জন্য রাঁচির টিকিট কিনলেন।
পরদিন রাঁচি স্টেশনে নেমেই তিনি বুঝলেন এ জায়গায় তিনি কস্মিনকালেও আসেন নি।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা গাড়ি করে এদিক ওদিক খানিকটা ঘুরে বুঝলেন যে এখানের রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, প্রাকৃতিক দৃশ্য, মোরাবাদি পাহাড়, হোটেল, বাংলো, কোনটার সঙ্গেই তাঁর বিন্দুমাত্র পরিচয় নেই। হুড্রু ফল্‌স কি তিনি চিনতে পারবেন? জলপ্রপাতের দৃশ্য দেখলেই কি তাঁর পুরোনো কথা সব মনে পড়ে যাবে?
নিজে সে কথা বিশ্বাস না করলেও, পাছে কলকাতায় ফিরে অনুতাপ হয় তাই একটি গাড়ির ব্যবস্থা করে দুপুরের দিকে হুড্রুর দিকে রওনা দিলেন।
সেইদিনই বিকেল পাঁচটার সময় হুড্রুতে একটি পিকনিকের দলের দুটি গুজরাটি ভদ্রলোক বিপিনবাবুকে অজ্ঞান অবস্থায় একটি পাথরের ঢিপির পাশে আবিষ্কার করল। এই দুই ভদ্রলোকের শুশ্রূষার ফলে জ্ঞান ফিরে পেতেই বিপিনবাবু প্রথম কথা বললেন—‘আমি রাঁচি আসি নি। আমার সব গেল! আর কোন আশা নেই…’
পরদিন সকালে বিপিন চৌধুরী কলকাতায় ফিরে এলেন। তিনি বুঝেছিলেন যে যদি না তিনি এই রহস্যের উদ্ঘাটন করতে পারেন, তবে তাঁর আর সত্যই কোন আশা নেই। তাঁর কর্মক্ষমতা, তাঁর আত্মবিশ্বাস, তাঁর উৎসাহ বুদ্ধি বিবেচনা সবই তিনি ক্রমে ক্রমে হারাবেন। শেষে কি তাহলে তাঁকে সেই রাঁচির…?
এর পরে আর বিপিনবাবু ভাবতে পারেন না, ভাবতে চান না।…
বাড়ি ফিরে কোনরকমে স্নান করে মাথায় বরফের থলি চাপা দিয়ে বিপিন চৌধুরী শয্যা নিলেন। চাকরকে বললেন ডাক্তার চন্দ্রকে ডেকে নিয়ে আসতে। চাকর যাবার আগে তাঁর হাতে একটি চিঠি দিয়ে বলল, কে জানি ডাকবাক্সে ফেলে দিয়ে গেছে। সবুজ খাম, তার উপর লাল কালিতে লেখা—‘শ্রীবিপিনবিহারী চৌধুরী। জরুরী, একান্ত ব্যক্তিগত।’
অসুস্থতা সত্ত্বেও বিপিনবাবুর কেন জানি মনে হল যে চিঠিটা তাঁর পড়া দরকার। খাম খুলে দেখেন এই চিঠি—
‘প্রিয় বিপিন,
হঠাৎ বড়লোক হওয়ার কুফল যে তোমার মধ্যে এভাবে দেখতে পাব তা আশা করি নি। একজন দুঃস্থ বাল্যবন্ধুর জন্য একটা উপায় করে দেওয়া কি সত্যিই তোমার পক্ষে এত অসম্ভব ছিল? আমার টাকা নেই, তাই ক্ষমতা সামান্যই। যে জিনিসটা আছে আমার সেটা হল কল্পনাশক্তি। তারই সামান্য কিছুটা খরচ করে তোমার উপর সামান্য প্রতিশোধ নিলাম। নিউ মার্কেটের সেই ভদ্রলোকটি আমার প্রতিবেশী; বেশ ভালো অভিনেতা। দীনেশ মুখুজ্যে তোমার প্রতি সদয় নন, তাই তাকে হাত করতে কোন অসুবিধা হয় নি। হাঁটুর দাগটার কথা নিশ্চয়ই মনে আছে—সেই চাঁদপাল ঘাটে আছাড় খাওয়া—উনিশ শ’ ছত্রিশ সনে?…
আর কী? এবার সেরে উঠবে। আমার একটি উপন্যাস এক প্রকাশকের পছন্দ হয়েছে। কয়েকটা মাস তাতেই কোনরকমে চালিয়ে নেব। ইতি
তোমার বন্ধু চুনিলাল’
ডাক্তার চন্দ্র আসতেই বিপিনবাবু বললেন, ‘ভালো আছি। রাঁচি স্টেশনে নেমেই সব মনে পড়ে গেল।’
ডাক্তার বললেন, ‘ভেরি স্ট্রেঞ্জ! আপনার কেসটা একটা ডাক্তারি জার্নালে ছাপিয়ে দেব ভাবছি।’
বিপিনবাবু বললেন, ‘আপনাকে যেই জন্য ডাকা—দেখুন তো, আমার কোমরের হাড়টাড় ভাঙল কিনা। রাঁচিতে হোঁচট খেয়েছিলাম। টনটন করছে।’


বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

বহুরূপী - সত্যজিৎ রায় [Netflix Ray Episode 2 - Bahrupiya by Satyajit Ray]

amarboi
বহুরূপী
সত্যজিৎ রায়

নিউ মহামায়া কেবিনের একটি চেয়ার দখল করে হাফ কাপ চা আর আলুর চপ অর্ডার দিয়ে নিকুঞ্জ সাহা একবার চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিল। তার চেনাপরিচিতের কেউ এসেছে কি? হ্যাঁ, এসেছে বৈকি। ওই ত রসিকবাবু, আর ওই যে শ্রীধর। পঞ্চানন এখনো আসেনি, তবে মিনিট দশেকের মধ্যে এসে যাবে নিশ্চয়ই। যত বেশি চেনা লোক আসে ততই ভালো। চেনা লোক চিনতে না পারলে তবেই না ছদ্মবেশের সার্থকতা।
অবিশ্যি এখনো পর্যন্ত তার সব কটা ছদ্মবেশই আশ্চর্যরকম সফল হয়েছে। আজকে ত তাও দাড়ির আবরণ রয়েছে—মুখের অর্ধেকটা অংশই ঢাকা। বয়সও বাড়িয়ে নিয়েছে নিকুঞ্জ অন্তত বছর পঁচিশ। গতকালের মেক-আপ ছিল একটি ছোট্ট প্রজাপতি মার্কা গোঁফ, আর সেই সঙ্গে প্লাস্টিসিনের সাহায্যে নাকের শেপটা বদলানো। কিন্তু হাবভাব হাঁটাচলা গলার স্বর এমনই চতুর ভাবে পালটে নিয়েছিল নিকুঞ্জ যে তার দশ বছরের আলাপী পঞ্চানন গুঁই তার কাছ থেকে দেশলাই ধার নেবার সময়ও তাকে চিনতে পারেনি। নিকুঞ্জ অসম সাহসের সঙ্গে কয়েকটা কথাও বলে ফেলেছিল—‘আপনি ওটা রাখতে পারেন। আমার কাছে আরেকটা দেশলাই আছে।’ পঞ্চানন গলার স্বর শুনেও চেনেনি। একেই বলে আর্ট।
নিকুঞ্জ সাহার আর সব শখ চলে গিয়ে এটাই পোক্তভাবে রয়ে গেছে। শুধু রয়ে গেছে না, উত্তরোত্তর বেড়ে গিয়ে শখটা নেশায় পরিণত হয়েছে। তার হাতে এখন সময়ও অঢেল। আগে একটা চাকরি ছিল। কলেজ স্ট্রীটে ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানিতে সে ছিল সেলসম্যান। সম্প্রতি তার এক জ্যাঠামশাই শেয়ার মার্কেটে অনেক টাকা করে গত হয়েছেন; তাঁর নিজের সন্তান ছিল না; স্ত্রীও মারা গেছেন সেভেনটি টুতে। নিকুঞ্জকে তিনি উইল করে যে টাকা দিয়ে গেছেন তার ব্যাঙ্কের সুদ হয় মাসে সাড়ে সাতশো। কাজেই সেলসম্যানের চাকরিটা সে অক্লেশে ছাড়তে পেরেছে। এই জ্যাঠাই বলতেন, ‘বই পড়ো নিকুঞ্জ, বই পড়ো। বই পড়ে না শেখা যায় এমন জিনিস সেই। ইস্কুলের দরকার হবে না, মাস্টারের দরকার হবে না—স্রেফ বই। লোকে এরোপ্লেন চালাতে শিখেছে বই পড়ে, একথাও শুনেছি!’ জ্যাঠা নিজে বই পড়ে দুটি জিনিস শিখেছিলেন—হাত দেখা আর হোমিওপ্যাথি। দুটোই তিনি বেশ ভালো ভাবেই রপ্ত করেছিলেন বলে জানা যায়। নিকুঞ্জ তাঁর কথা মেনে নিয়েই বই পড়ে শিখেছিল চামড়ার কাজ আর ফোটোগ্রাফি। মাস ছয়েক আগে কলেজ স্ট্রীটের ফুটপাথে মেক-আপ সম্বন্ধে একটা মোটা আমেরিকান বই দেখে সে কেনার লোভ সামলাতে পারেনি। সেইটে পড়ে এই নতুন শখটা তাকে পেয়ে বসে।
অথচ মেক-আপের যেটা আসল জায়গা—থিয়েটার—সে সম্বন্ধে নিকুঞ্জর কোনো উৎসাহই নেই। একবার মনে হয়েছিল—এ তো বেশ নতুন জিনিস শেখা হল, এর থেকে একটা উপরি রোজগারের রাস্তা ধরলে কেমন হয়?
নব নট্ট কোম্পানির ভুলু ঘোষের সঙ্গে নিকুঞ্জর কিছুটা আলাপও ছিল। দুজনেই ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের মেমবার, সেই সূত্রেই আলাপ। আমহার্স্ট স্ট্রীটে ভদ্রলোকের বাড়ি গিয়ে কথাটা পাড়তে ভুলু ঘোষ বললেন, ‘বেশ ত আছ নিকুঞ্জ, আবার থিয়েটার লাইনে আসার ইচ্ছে হল কেন? আর, আমাদের কোম্পানির কথা যদি বল, সেখানে অপরেশ দত্তকে সরিয়ে তুমি তার জায়গায় বসবে কি করে? সে লোক আজ ছত্রিশ বছর ধরে মেক-আপ করছে; পুরো আর্টটি তার নখের ডগায়। তোমার ছ’মাসের বিদ্যে শুনলে ত সে তোমার দিকে চাইবেই না—কথা বলা দূরের কথা। না হে—ওসব ভুলে যাও। সুখে যখন আছ, তখন ভূতের কিল ভোগ করবে কেন সাধ করে?’
নিকুঞ্জ সেইদিনই পেশাদার মেক-আপের চিন্তা মন থেকে মুছে ফেলে দেয়।
তাহলে মেক-আপ শিখে করবে কী সে? কার মেক-আপ করবে? চুল ছাঁটার সেলুনের মতো ত মেক-আপের সেলুন খোলা যায় না, যেখানে লোক পয়সা দিয়ে নিজের চেহারা পালটে নিতে আসবে!
তখনই নিকুঞ্জর মনে হয়—কেন, আমার নিজের চেহারা কী দোষ করল? সত্যি বলতে কি, তার নিজের চেহারায় কয়েকটা সুবিধে আছে—যাকে বলে ন্যাচারেল অ্যাডভানটেজেস। নিকুঞ্জর সবই মাঝারি। সে না-লম্বা না-বেঁটে, না-কালো না-ফরসা, না-চোখা না-ভোঁতা। যে নাক খাড়া তাকে ভোঁতা করা যায় না। যে বেশি লম্বা, তাকে বেঁটে করা যায় না, যে বেশি কালো, তাকে ফরসা বানাতে হলে যে-পরিমাণ রঙের প্রলেপ লাগে তাতে মেক-আপ ধরা পড়ে যেতে বাধ্য।
দুদিন ধরে আয়নায় নিজের চেহারাটা স্টাডি করে নিকুঞ্জ তাই স্থির করল যে মেক-আপ সে নিজেকেই করবে, নিজের চেহারার উপরেই চলবে তার যত এক্সপেরিমেন্ট।
কিন্তু তারপর? এই মেক-আপের উদ্দেশ্যটা হবে কী?
উদ্দেশ্য হবে দুটি—এক, নিজের শিল্পচাতুরীকে পারফেকশনের সবচেয়ে উঁচু স্তরে নিয়ে যাওয়া; এবং দুই, লোকের চোখে ধূলো দেবার আনন্দ উপভোগ করা।
বই কেনার দিন-সাতেকের মধ্যেই নিকুঞ্জ মেক-আপের সরঞ্জাম কিনতে শুরু করে। বইয়েতেই সে জেনেছে ম্যাক্স ফ্যাক্টর কোম্পানির প্যান-কেক মেক-আপের মাহাত্ম্যের কথা। সে জিনিস আমেরিকায় তৈরি হয়, কলকাতায় আসে না। অথচ দিশি রং-এ নিখুঁত মেক-আপ সম্ভব নয়। নিকুঞ্জকে তাই যেতে হল প্রতিবেশী ডাক্তার বিরাজ চৌধুরীর কাছে। এই ডাক্তার চৌধুরীই একবার নিকুঞ্জর জনডিস সারিয়ে দিয়েছিলেন। এঁর ছেলে আমেরিকায় পড়াশুনা করে, নিকুঞ্জ খবর পেয়েছে সে বোনের বিয়েতে শিগগিরই দেশে আসছে।
ডাক্তারবাবুর কাছে গিয়ে নিকুঞ্জ ভণিতা না করে সোজাসুজি বলল, ‘আপনার ছেলে যদি একটি জিনিস আমার জন্য আনতে পারে; ও এলেই আমি দামটা দিয়ে দেব।’
‘কী জিনিস?’ জিগ্যেস করলেন ডাক্তার চৌধুরী।
‘কিছু, রং। মেক-আপের রং। আমি নাম লিখে এনেছি। এখানে পাওয়া যায় না।’
‘বেশ ত। আপনি ডিটেলটা দিয়ে দিন, আমি ওকে পাঠিয়ে দেব।’
ম্যাক্স ফ্যাক্টরের রং এসে যায় তিন সপ্তাহের মধ্যেই। তার আগেই অবশ্য বাকি সব জিনিস কেনা হয়ে গেছে—তুলি, স্পিরিট গাম, ভুরু আঁকার কালো পেনসিল, ফোকলা দাঁত করার জন্য কালো এনামেল পেন্ট, পাকা চুল করার জন্য সাদা রং, পরচুলা লাগানর জন্য সূক্ষ্ম নাইলনের নেট। এ ছাড়া কিনতে হয়েছে বেশ কিছু আলগা চুল, যা ওই সুক্ষ্ম নেটের উপর একটা একটা করে বসিয়ে নিকুঞ্জ নিজে হাতে তৈরি করে নিয়েছে বিশ রকমের গোঁফ, বিশ রকমের দাড়ি আর বিশ রকমের পরচুলা। রুক্ষ, মসৃণ, সোজা, ঢেউ খেলানো, কাফ্রিদের মতো পাকানো—কোনোরকম চুল বাদ নেই।
কিন্তু শুধু মুখ পালটালেই ত হল না, সেই সঙ্গে পোশাক না বদলালে চলবে কি করে? নিকুঞ্জর সাতদিন লেগেছে নিউ মার্কেট, বড়বাজার আর গ্রান্ট স্ট্রীট ঘুরে নিজের মাপ অনুযায়ী পোশাক জোগাড় করতে। রেডিমেড আর কটা জিনিস পাওয়া যায়? তাই দরজিকে দিয়েও বেশ কিছু পোশাক করিয়ে নিতে হয়েছে। আর শুধু জামা কাপড় ত নয়, পরিধেয় সব কিছুই। সাত রকমের চশমা, বারো রকম চটিজুতো স্যান্ডেল, দশ রকম টুপি— তার মধ্যে দারোগার টুপিও বাদ যায় না—পাগড়ির জন্য পাঁচ রকম কাপড়, পাঁচ রকম হাত ঘড়ি। শিখদের হাতের লোহা, তাগা, তাবিজ, মাদুলি, পৈতে, বোষ্টমের মালা, শাক্তের রুদ্রাক্ষ, ওস্তাদের কানে পরার নকল হীরে—কিছুই বাদ যায়নি।
আর কিনতে হয়েছে একটা বড় আয়না, আর তার ফ্রেমে বসানোর জন্য জোরালো বাল্‌ব। লোডশেডিং-এ যাতে কাজ বন্ধ না হয়ে যায় তার জন্য একটা ছোট জাপানী জেনারেটরও কিনতে হয়েছে নিকুঞ্জকে। চকির নিতাইকে সে শিখিয়ে দিয়েছে সেটা কি করে চালাতে হয়।
কাজ শুরু হয় ষোলই অগ্রহায়ণ। তারিখটা নিকুঞ্জ ডায়রিতে লিখে রেখেছে। সকাল আটটা থেকে শুরু করে বিকেল সাড়ে চারটেয় মেক-আপ শেষ হয়। মোটামুটি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকেরই মেক-আপ নিতে হবে সেটা নিকুঞ্জ আগেই ঠিক করে রেখেছিল। রাস্তার ভিখিরি বা কুলি-মজুর সেজে ত লাভ নেই, কারণ মেক-আপ উৎরেছে কিনা সেটা পরীক্ষা হবে নিউ মহামায়া কেবিনে। সেখানে বসে চা খেতে পারে এমন লোক ত হওয়া চাই।
প্রথম দিনেই বাজিমাৎ। ঘন কালো ভুরু আর তার সঙ্গে মানানসই ঘন কালো ঝুপো-গোঁফ-বিশিষ্ট মোক্তার সেজেছিল নিকুঞ্জ। সাদা প্যাণ্ট ও বহুব্যবহৃত কালো মোক্তারি কোট; হাতে একটা পুরোন ব্রীফ কেস, পায়ে সুকতলা খয়ে যাওয়া কালো শু আর ইলাসটিক-বিহীন সাদা মোজা। তারই টেবিলে এসে বসল পঞ্চানন। নিকুঞ্জ যতক্ষণ চা খেয়েছে, তার বুকের ধুকপুকুনি চলেছে সমানে। কিন্তু সামনে বসা অচেনা সাধারণ মানুষ সম্বন্ধে একজন লোক যে কত কম কৌতূহলী হয়—বিশেষত সে লোকের যদি অন্য দিকে মন থাকে—সেটা নিকুঞ্জ সেদিন বুঝেছে। পঞ্চানন তার দিকে দেখেও দেখেনি। বাঁ হাতে রেস বুকের পাতা উলটে দেখেছে আর ডান হাতে চামচ দিয়ে অমলেট ছিঁড়ে খেয়েছে। নিকুঞ্জ যখন বয়ের কাছে বিল চাইল, তখনও পঞ্চাননের দৃষ্টি ঘুরল না তার দিকে। এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা, অদ্ভুত আনন্দ। নিকুঞ্জ সেদিনই বুঝেছিল যে আজ থেকে এটাই হবে তার জীবনের একমাত্র অকুপেশন।
সেদিন বাড়ি ফিরে একটা মজা হল। এটা যে হবে সেটা আগেই বোঝা উচিত ছিল, কিন্তু নিকুঞ্জর খেয়াল হয়নি। শশীবাবু থাকেন একতলার সদর দরজার পাশের ফ্ল্যাটে। তাঁর বসার ঘর থেকে কে ঢুকছে না-ঢুকছে দেখা যায়। নিকুঞ্জ ফিরেছে সোয়া সাতটায়। লোডশেডিং হয়নি বলে দরজার সামনের প্যাসেজে আলো ছিল। মোক্তার-নিকুঞ্জ ঢুকতেই শশীবাবুর হাঁক এল, ‘কাকে চাই?’

নিকুঞ্জ থামল। তারপর শশীবাবুর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। এবার তারা মুখোমুখি। শশীবাবু আবার বললেন, ‘কাকে খুঁজছেন মশাই?’
‘নিকুঞ্জ সাহা কি এই বাড়িতে থাকে?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ। দোতলার সিঁড়ি উঠে ডান দিকের ঘর।’
উত্তরটা দিয়ে শশীবাবু ঘুরে গেলেন, আর সেই ফাঁকে একটানে গোঁফ-ভুরু খুলে ফেলে নিকুঞ্জ বলল, ‘একটা কথা ছিল।’
‘বলুন,’ বলেই নিকুঞ্জর দিকে ফিরে শশীবাবুর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।
‘সে কি—এ যে নিকুঞ্জ!’
নিকুঞ্জ শশীবাবুর ঘরে ঢুকে গেল। এঁকে ব্যাপারটা জানানো দরকার। বাড়ির অন্তত একজন জানলে ক্ষতি নেই, বরং সুবিধেই হবে।
‘শুনুন শশীদা, আমি এবার থেকে মাঝে মাঝে এইরকম মেক-আপ নিয়ে ফিরব। কোনোদিন ডাক্তার, কোনোদিন মোক্তার, কোনোদিন শিখ, কোনোদিন মারোয়াড়ি—বুঝছেন? বেরোব বিকেলে, ফিরব সন্ধেয়। আপনার ঘরে এসে মেক-আপটা খুলে ফেলব। ব্যাপারটা আমার-আপনার মধ্যেই থাক, কেমন?’
‘কিন্তু হঠাৎ এ উদ্ভট শখ কেন? থিয়েটার-টিয়েটার?’
‘না না। থিয়েটার নয়। এটা একটা এক্সপেরিমেন্ট। আপনাকে কনফিডেন্‌সে নিচ্ছি কারণ আপনি বুঝবেন। মোটকথা আপনি আর ছড়াবেন না ব্যাপারটা, এইটে আমার রিকোয়েস্ট।’
শশীবাবু সজ্জন ব্যক্তি, পাড়ার বঙ্কিম পাঠাগারের লাইব্রেরিয়ান, নিজেও বইয়ের পোকা। নিকুঞ্জর কথায় রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, ‘কোনো বদ মতলব নেই যখন বলছ, তখন আর কি? কত লোকের ত কতরকম শখই থাকে।’
কাজটা মেহনতের ও সময়সাপেক্ষ, তাই সপ্তাহে দুদিনের বেশি মেক-আপ নেওয়া চলবে না এটা নিকুঞ্জ আগেই বুঝেছিল। তবে বাকি সময়টা সদ্ব্যবহার করতে বাধা নেই; নিকুঞ্জ সেই সময়টা শহরে ঘুরে বেড়িয়ে লোকজন স্টাডি করে। নিউ মার্কেট যে এ ব্যাপারে একটা স্বর্ণখনি সেটা একদিন গিয়েই বুঝেছে। তাছাড়া খেলার মাঠ, হিন্দি সিনেমার কিউ—এসব ত আছেই। ইণ্টারেস্টিং টাইপের লোক দেখলেই নিকুঞ্জ খাতায় নোট করে নেয়, এমনকি কোনো ছুতো করে সে-লোকের সঙ্গে দুটো কথাও বলে রাখে। ‘কটা বাজল দাদা, আমার ঘড়িটা আবার...’ অথবা ‘এখান থেকে গড়িয়াহাট যেতে কত নম্বর বাস ধরব বলতে পারেন?’—এ ধরনের প্রশ্নেও যথেষ্ট কাজ হয়। যেদিন মেক-আপ থাকে না সেদিন বিকেলে সে স্বাভাবিক বেশেই চলে যায় নিউ মহামায়া কেবিনে। যে তিন-চারজন আলাপী আসে তাদের সঙ্গে গল্পগুজব করে রাজা উজীর মেরে যথা-সময়ে ফিরে আসে তার বৃন্দাবন বসাক লেনের ফ্ল্যাটে। ছোকরা চাকর নিতাই অবশ্য বাবুর ব্যাপারটা জানে, বাবুর কাণ্ডকারখানা দেখে এবং রীতিমতো উপভোগ করে। তবে চাকরটি যে খুব বুদ্ধিমান তা বলা চলে না।
‘চিনতে পারছিস?’
‘হ্যাঁ—!’
‘মারব এক থাপ্পড়! তোর বাবু বলে চিনতে পারছিস?
‘আপনি ত বাবু বটেই। সে ত জানি।’
‘তোর বাবুর এরকম গোঁফ, এরকম টাক? এরকম পোশাক পরে তোর বাবু? এরকম চশমা পরে? কাঁধে এরকম চাদর নেয়?’
নিতাই হাসিমুখ করে দাঁড়িয়ে থাকে দরজায় হেলান দিয়ে। নিকুঞ্জ বুঝতে পারে মাথামোটা লোকেদের জন্য তার এই ছদ্মবেশ নয়! তারা এর আর্ট কোথায় তা ধরতে পারবে না।
কিন্তু শুধুমাত্র তিনজন কি চারজন বন্ধুকে ঠকিয়েই কি তার কাজ শেষ?
এ প্রশ্নটা কদিন থেকেই নিকুঞ্জকে ভাবিয়ে তুলেছে। সে বুঝেছে যে তার আকাক্ষা ঊর্ধ্বগামী পথ নিতে চাইছে। তার আর্টের দৌড় কতটা সেটা জানার একটা গোপন বাসনা মাথা উঁচিয়ে উঠছে।
সেই বাসনা চরিতার্থ করার একটা সুযোগ এসে গেল কয়েকদিনের মধ্যেই।
শশীবাবুর ঘরেই কথা হচ্ছিল এই ফ্ল্যাটবাড়ির কয়েকজন বাসিন্দার মধ্যে; নিকুঞ্জ সেখানে উপস্থিত। ভুজঙ্গবাবু একটু আধটু ধর্মচর্চা করেন, তার মধ্যে প্রাণায়াম, কুম্ভক রেচক, নাক দিয়ে জল টানা, এসব আছে। গুজব শোনা যায় তিনি নাকি সন্ন্যাসী হতে হতে সংসারী হয়ে পড়েন। তবে অনেক সাধু-সন্ন্যাসীর সঙ্গে আলাপ আছে তাঁর, কেদার-বদ্রী কাশী-কামাখ্যা সব ঘোরা আছে কুণ্ডু স্পেশালে। তিনিই বললেন তারাপীঠে এক তান্ত্রিক সাধু এসে আস্তানা গেড়েছেন যাঁর ক্ষমতা নাকি পৌরাণিক সাধুদের হার মানায়।
‘নামটা কী বললেন?’ জিজ্ঞেস করল ব্যাঙ্কের চাকুরে হরবিলাস।
‘নাম বলিনি’, বিরক্তভাবে বললেন ভুজঙ্গবাবু। রাগলে এঁর ভুরু উপরে ওঠে, ফলে চশমা নাক দিয়ে হড়কে নিচে নেমে যায়।
‘হেঁচকি বাবা কি?’ প্রশ্ন করল হরবিলাস।
হেঁচকি বাবা নামে একজন সাধুর কথা কাগজে বেরিয়েছিল বটে। ইনি নাকি ভক্তদের সামনে কথা বলতে বলতে হঠাৎ হঠাৎ এমন হেঁচকি তোলেন যে মনে হয় অন্তিমকাল উপস্থিত, কিন্তু পরক্ষণেই সামলে নিয়ে এমন ভাব করেন যেন কিছুই হয়নি। অথচ উপস্থিত ডাক্তারেরাও বলেছেন এ-হেঁচকি মরণ-হেঁচকি ছাড়া কিছুই না।
ভুজঙ্গবাবু ডান হাতের তর্জনী দিয়ে চশমা নাকের উপর ঠেলে তুলে জানালেন সাধুর নাম কালিকানন্দ স্বামী।
‘যাবেন নাকি? জিজ্ঞেস করলেন ইনসিওরেন্সের দালাল তনয়বাবু। ‘আপনি যান ত আমিও ঝুলে পড়ি আপনার সঙ্গে। সাধুদর্শনে বেশ একটা ইয়ে হয়। কলকাতার এই হোলসেল নোংরামি আর ভাল্লাগে না।’
ভুজঙ্গবাবু বললেন তিনি যাবেন বলেই স্থির করেছেন।
নিকুঞ্জ আর কিছু না বলে দোতলায় নিজের ঘরে চলে গেল। তার ধমনীতে রক্ত যে বেশ দ্রুত চলাচল শুরু করেছে সেটা সে বেশ বুঝতে পারছে। তান্ত্রিক সাজতে হলে কী কী জিনিস লাগে, কী কী তার কাছে আছে, এবং কী কী জোগাড় করতে হবে সেটা জানা চাই।
তাক থেকে বঙ্কিম গ্রন্থাবলী নিয়ে কপালকুণ্ডলার তান্ত্রিকের বর্ণনাটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিল নিকুঞ্জ। আজও এ বর্ণনার কোনো পরিবর্তন হয়নি। সাধু সন্ন্যাসীদের চেহারা পৌরাণিক যুগে যেমন ছিল, আজও তেমনি আছে। নিকুঞ্জ একবার বেনারস গিয়েছিল। দশাশ্বমেধ ঘাটে গিয়ে মনে হয়েছিল যে প্রাচীন ভারতবর্ষের চেহারাটা এই একটা জায়গায় এখনো ধরা রয়েছে।
নিকুঞ্জর প্ল্যান ঠিক হয়ে গেল।
তারাপীঠ হল বীরভূমে। রামপুরহাটে নিকুঞ্জর এক খুড়তুতো ভাই থাকে। সেইখানে সে চলে যাবে তান্ত্রিক মেক-আপের সরঞ্জাম নিয়ে। তারপর সেখান থেকে তৈরি হয়ে নিয়ে হাজির হবে তারাপীঠে। তারপর হবে পরীক্ষা। সাধু-বাবাজীদের মধ্যে সে বেমালুম মিশে যেতে পারে কিনা সেইটে তাকে দেখতে হবে। ভুজঙ্গবাবুরাও সেখানে থাকবেন; তাঁরাও তার ছদ্মবেশ ধরতে পারেন কিনা দেখা যাবে।
মেক-আপের অধিকাংশ জিনিসই নিকুঞ্জর ছিল, কেবল হাতে নেবার যষ্ঠি, চিমটে আর কমণ্ডলু ছাড়া। ঝাঁকড়া চুল আছে একটা, সেটাকে জটায় পরিণত করতে হবে। ও হয়ে যাবে; চিন্তার কোনো কারণ নেই।
ভুজঙ্গবাবু সপরিবারে বুধবার রওনা দিচ্ছেন খবর পেয়ে নিকুঞ্জ মঙ্গলবার বেরিয়ে পড়ল। ভাই সন্তোষকে আগেই খবর দেওয়া ছিল, যদিও কেন যাচ্ছে সেটা নিকুঞ্জ জানায়নি। ভাইয়ের বয়স বত্রিশ, বাবা মারা গেছেন গত বছর। তিনি ছিলেন রামপুরহাটে পূর্ণিমা টকিজের মালিক। এখন সন্তোষই মালিকানা ভোগ করছে, এবং হিন্দি ছবি দেখিয়ে পয়সাও কামিয়েছে মন্দ না। হয়ত হিন্দি ছবি দেখার জন্যই সে নিকুঞ্জর প্ল্যানের মধ্যে একটা দারুণ অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পেল। বলল, ‘তোমার কোন চিন্তা নেই নিকুঞ্জদা। আমার গাড়িতে করে সোজা নিয়ে গিয়ে তোমাকে একেবারে শ্মশানের মুখে নামিয়ে দেব।’
নিকুঞ্জের খেয়াল ছিল না যে তারাপীঠের শ্মশানেই হচ্ছে মন্দির, আর শ্মশানেই যত সাধুদের আস্তানা। সন্তোষ বলাতে মনে পড়ল তারাপীঠের বিখ্যাত সাধু বামাক্ষ্যাপা তো শ্মশানেই সাধনা করতেন; ঠিক কথা।
বিষ্যুদবার দিন ভোর থেকে মেক-আপ শুরু করে দিল নিকুঞ্জ। দাড়ি গোঁফ জটা লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে তার পরিচয় লোপ পেল। তারপর কপালে চন্দনের লেপ আর লাল ফোঁটা দিয়ে গলায় তিন গাছি বড় বড় রুদ্রাক্ষের মালা পরে গায়ে গেরুয়া বস্ত্র চাপানোর সঙ্গে সঙ্গে সন্তোষ তড়াক করে লাফিয়ে উঠে ঢিপ্‌ করে এক প্রণাম করল নিকুঞ্জকে।
‘ওফ্‌ফ্‌—নিকুঞ্জদা—এ যা হয়েছে না! কার বাপের সাধ্যি তোমাকে চেনে। নেহাত তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি বলে, নইলে আমিও ব্যোম্‌কে যেতুম।’
এই ক মাসে হাত পেকেছে, তাই দুপুর আড়াইটার মধ্যে মেক-আপ হয়ে গেল। চিমটে-কমণ্ডলু নতুন কেনা, তাই তাদেরও একটু মেক-আপ করে পুরোন করে নেওয়া হল। চারটের মধ্যে সম্পূর্ণ তৈরি নিকুঞ্জ সাহা ওরফে ঘনানন্দ মহারাজ। একটা নাম না দিলে চলে না, যদিও নিকুঞ্জ মাঝে মাঝে বম্‌ বম্‌ ছাড়া কথা বলবে না বলেই স্থির করেছে। সাধুরা অন্য জগতের মানুষ; সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের কথা বলতে হবে এমন কোনো কথা নেই। নামটা দরকার হচ্ছে সন্তোষের জন্য। সেই বলেছে, ‘নিকুঞ্জদা, তুমি যখন গাড়ি থেকে নামবে, লোকে ত ঘিরে ধরবেই। তখন যদি জিগ্যেস করে কে, তার জন্য একটা নামের দরকার।’ ঘনানন্দ দিব্যি গম্ভীর নাম। সন্তোষ এখন নিশ্চিন্ত।
সন্তোষ সচরাচর নিজেই গাড়ি চালায়। কিন্তু এবার সে একটি ড্রাইভার সঙ্গে নিল। বলল, ‘আমাকে সাধুবাবার সঙ্গে ঘোরাঘুরি করতে হবে, গাড়িটা কিন্তু আপনার জিম্মায় থাকবে।’
একটা কথা নিকুঞ্জ সন্তোষকে না বলে পারল না। ওখানে পৌঁছানর পর আমি কিন্তু একা হয়ে যেতে চাই। আমার লক্ষ্য হবে কালিকানন্দ। তাঁর আশেপাশে আরো পাঁচজন সাধুবাবা কি থাকবে না? নিশ্চয়ই থাকবে। আমি সেই দলে গিয়ে ভিড়ব। তুই বরং আলগা থেকে ভক্তদের দলে গিয়ে বসে পড়িস।’
‘তোমার কোনো চিন্তা নেই, নিকুঞ্জদা।’
সন্তোষের গাড়ি যখন তারাপীঠ শ্মশানে পৌঁছাল, তখন সূর্য ডুবতে আরো আধ ঘণ্টা বাকি। আর পাঁচটা পীঠস্থানের মতোই এখানেও লোকের ভিড়, পাণ্ডার ভিড়, পথের দুধারে লাইন করা দোকানে গাঁদা ফল আবির কুমকুম বই ক্যালেণ্ডার চা বিস্কুট তেলেভাজা মাছিবসা-জিলিপি ইত্যাদি সবই রয়েছে।
নিউ মহামায়া কেবিনের পর নিকুঞ্জর এখানে এসে এক আশ্চর্য নতুন অভিজ্ঞতা হল। গেরুয়া পরা লোক দেখলেই লোকের মনে যে কী করে ভক্তি ভাব জেগে ওঠে সে এক আশ্চর্য ব্যাপার। গাড়ি থেকে নামা মাত্র নিকুঞ্জ দেখল যে গড় করা শুরু হয়ে গেছে। ছেলেবুড়ো মেয়েপুরুষ কেউ বাদ নেই। আপনা থেকেই আশীর্বাদের ভঙ্গিতে নিকুঞ্জর হাতটা উঠে সামনের দিকে এগোতে শুরু করল। শেষে এমন হল যে হাত টেনে নেবারও অবসর নেই। পাশে সন্তোষ না থাকলে তাকে বোধহয় এক জায়গাতেই আটকে পড়তে হত। ‘দাদা সরুন, মা পথ দিন, পথ দিন’—এই করে সন্তোষ কোনো মতে একটা অপেক্ষাকৃত জনবিরল জায়গায় নিয়ে গিয়ে ফেলল নিকুঞ্জকে। এখানে চারিদিকে সাধুর অভাব নেই, ফলে আলাদা করে নিকুঞ্জর দিকে লোকের দৃষ্টি পড়ার কোনো কারণ নেই।
এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে নিকুঞ্জ দেখল যে কিছদূরে একটা বটগাছের নিচে একটা ভিড় দেখা যাচ্ছে। গেরুয়া ছাড়াও অন্য রং রয়েছে সেখানে। সন্তোষ বলল, ‘আপনি একটু দাঁড়ান, আমি দেখে আসছি ওইখেনেই কালিকানন্দ বসেছেন কিনা। ওঁর সামনে আপনাকে পৌঁছে দিয়ে তবে আমার কাজ শেষ। আমি আপনাকে চোখে চোখে রাখব, তারপর যখন যাবার ইচ্ছে হবে তখন আমাকে ইশারা করলেই আমি বুঝতে পারব।’

‘সন্তোষ দেখে এসে ফিস্‌ ফিস্‌ করে জানাল ওই ভিড়টা কালিকানন্দর জন্যই বটে। ‘আপনি সোজা এগিয়ে যান নিকুঞ্জদা। কুছ পরোয়া নেই।’
পরোয়া নিকুঞ্জের এমনিতেও নেই। সে এখানে এসে অবধি অত্যন্ত সহজ বোধ করছে। সেই সঙ্গে একটা পরম তৃপ্তির ভাব। মেক-আপে তার জুড়ি কেউ নেই সে বিশ্বাসটা তার মনে আজ পাকা হয়েছে।
নিকুঞ্জ এগিয়ে গেল ভিড়ের দিকে। পথে দু একজন গড় করল। নিকুঞ্জ যথারীতি হাত বাড়িয়ে আশীর্বাদ করল।
উদাত্ত কণ্ঠে উচ্চারিত বাণী কিছুক্ষণ থেকেই শোনা যাচ্ছে; নিকুঞ্জ এগোনর সঙ্গে সঙ্গে শব্দ ক্রমশ জোর হয়ে আসছে। আরেকটু এগিয়ে যেতেই সে দেখতে পেল কালিকানন্দকে। বাঘের মত চেহারা বটে, এবং বাঘছালের উপরেই বসেছেন তিনি। তিনিই বাণী শোনাচ্ছেন ভক্তদের। সবই ছেঁদো কথা, কিন্তু বলার ঢং-এ বিশেষত্ব আছে। আর সেই সঙ্গে চোখের দৃষ্টিতেও। মণিকে ঘিরে যে সাদা অংশ সেটা সাদা নয়, গোলাপী। গাঁজা খাওয়ায় ফল কি? হতেও পারে।
ভক্তের সংখ্যা পঞ্চাশ-ষাটের বেশি নয়, তবে একজন দুজন করে ক্রমেই বাড়ছে। ওই ত ভুজঙ্গবাবু আর তাঁর স্ত্রী! তনয়বাবুও নিশ্চয়ই আছেন ভিড়ের মধ্যে। ভুজঙ্গবাবুরা মনে হয় বেশ সকাল সকাল এসেছেন, কারণ তাঁদের স্থান ভক্তদের একেবারে প্রথম সারিতে।
কালিকানন্দের দুপাশে এবং পিছনে দশ বারো জন গেরুয়াধারী বসেছেন, তাঁদের সকলেরই গোঁফদাড়ি জটা, রুদ্রাক্ষের মালা, সর্বাঙ্গে ভস্ম। অর্থাৎ নিকুঞ্জর সঙ্গে তাঁদের চেহারার তফাত করা প্রায় অসম্ভব।
নিকুঞ্জ ভিড়ের পিছন দিয়ে এগিয়ে গেল সাধুদের দলের দিকে। কোত্থেকে যেন একটা গান ভেসে আসছে—
কে হরি বোল হরি বোল বলিতে যায়
যা রে মাধাই জেনে আয়
বুঝি গৌর যায় আর নিতাই যায়
যাদের সোনার নূপুর রাঙ্গা পায়—
হঠাৎ গানটা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল। কেন? কারণ আর কিছুই না—কালিকানন্দের কথা থেমে গেছে।
নিকুঞ্জের দৃষ্টি গেল সাধুবাবার দিকে।
কালিকানন্দ তার দিকেই চেয়ে আছে। এক দৃষ্টে। রাঙা চোখে।
নিকুঞ্জের হাঁটা থেমে গেছে।
অন্যান্য সাধ আর ভক্তদের দৃষ্টিও তার দিকে।
এবার কালিকানন্দের উদাত্ত কণ্ঠে প্রশ্ন এল, ‘বাবাজীর ভেক ধরা হয়েছে, অ্যাঁ? গেরুয়া পরলেই সাধু হয়? গলায় মালা পরলেই সাধু? গায়ে ছাই মাখলেই সাধু? অ্যাঁ? তোর আস্পর্ধা তো কম না? তোর জটা ধরে যদি টান দিই, তখন কী হবে? কোথায় যাবে তোর সাধুগিরি?’
চোখের পলকে সন্তোষ হাজির নিকুঞ্জের পাশে।
‘আর নয় দাদা। সোজা গাড়িতে।’
নিকুঞ্জের সমস্ত দেহ অবশ, কিন্তু তাও পালানো ছাড়া পথ নেই। সন্তোষের কাঁধে ভর করে প্রায় চোখ বন্ধ করে সে রওনা দিল শ্মশানের গেটের উদ্দেশে। কান ত খোলা, তাই কালিকানন্দের শেষ কথাগুলো না শুনে পারল না—‘এই ভণ্ডামির ফল কী তা জান তুমি, নিকুঞ্জ সাহা?’
কলকাতায় পৌঁছে বাসা বদল করতে হল। আর এ তল্লাটেই নয়। ভুজঙ্গবাবুর সামনে ঘটেছে ঘটনাটা; তিনি এসেই হাটে হাঁড়ি ভাঙবেন। তখন আর টিটকিরিতে কান পাতা যাবে না। ভবানীপুরে কাঁসারিপাড়া লেনে একটা ফ্ল্যাট পাওয়া গেল ভাগ্যক্রমে। ফ্ল্যাট মানে দেড়খানা ঘর। ভাড়া আড়াইশো টাকা। বাপ্‌রে বাপ্‌—তান্ত্রিকের কী তেজ, কী অন্তর্দৃষ্টি! পাদ্রী, পুরুত, মোল্লা, দরবেশ—এই সব মেক-আপের যা সরঞ্জাম ছিল নিকুঞ্জর কাছে, সব বাক্স থেকে বার করে নিয়ে কাছেই আদিগঙ্গার জলে ফেলে দিল সে।
তিন হপ্তা গেল আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে। ইতিমধ্যে নতুন পাড়ায় আলাপী হয়েছে দু একজন। এখানেও রয়েছে বাড়ি থেকে আধমাইলের মধ্যে বড় রাস্তায় একটি রেস্টোরাণ্ট, নাম পরাশর কেবিন। এখানে কেউই জানে না নিকুঞ্জের কলঙ্কময় ইতিহাস—তারকবাবু, নগেন মাস্টার, শিবু পোদ্দার। শিবু আবার থিয়েটারে পার্ট করে। নিকুঞ্জকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল একদিন তপন থিয়েটারে ‘আগুনের ফুল্‌কি’ দেখাতে। ‘দেখবেন কেমন ফার্স্ট ক্লাস মেক-আপ নিই’, যাবার আগে বলেছিল শিবু। নিকুঞ্জ দেখে হাসবে না কাঁদবে ঠিক করতে পারেনি। এ-ই মেক-আপ! এরা কি ভালো মেক-আপ দেখেছে কোনোদিন? আমার মেক-আপ দেখলে ত এদের লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যাবে!
পরক্ষণেই অবিশ্যি মনে পড়ল তারাপীঠের অভিজ্ঞতার কথা। তবে, তান্ত্রিকদের অলৌকিক ক্ষমতার কথা ত শোনাই যায়। এতে অবাক হবার কিছু নেই। নিকুঞ্জর চালে একটু ভুল হয়ে গিয়েছিল, এই যা।
কিন্তু তাই বলে কি তার এত সাধের অকুপেশনটি একেবারে বরবাদ করে দিতে হবে? সে হয় না, হতে পারে না। আরো কত কী সাজতে বাকি আছে! যেমন, একটা সত্যি করে ষণ্ডা চরিত্র এখনো সাজা হয়নি। এক তান্ত্রিক ছাড়া যা সেজেছে সবই নিরীহ অমায়িক চরিত্র—যাদের দিকে এমনিতেই লোকের দৃষ্টি যায় না। চোখ যাবে অথচ চেনা যাবে না—তেমন একটা চরিত্রের মেক-আপ না করলে আর সত্যি করে সাফল্যের পরীক্ষা হবে কি করে?
কেমন হবে এই ষণ্ড চরিত্র? মাথায় কদম-ছাঁট চুল, মুখে চার দিনের দাড়ি, চোখের নিচে একটা ক্ষতচিহ্ন—যাকে বলে ‘স্কার’—নাকটা একটু ভাঙা—মুষ্টি-যোদ্ধার মতো—হাতে উল্‌কি, গলায় চেন, পরনে বোতাম ছাড়া চেক শার্ট আর বর্মার লুঙ্গি।
তারাপীঠের অভিজ্ঞতার পর নিকুঞ্জর আর ছদ্মবেশের ত্রিসীমানায় যাওয়া উচিত ছিল না, কিন্তু শখটা বোধহয় এমনই মজ্জাগত যে কাজের বেলা দেখা গেল সে দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে বসে গেছে আবার আয়নার সামনে।
সকালবেলা চা খেয়েই কাজে লেগে যাওয়ার ফলে সেদিন আর নিকুঞ্জর খবরের কাগজটা দেখা হয়নি। ফলে খিদিরপুরে জোড়া খুনের খবরটা, এবং পলাতক আততায়ী ডাকসাইটে গুণ্ডা বাঘা মণ্ডলের ছবিটাও দেখা হয়নি। যদি হত তাহলে অবিশ্যি নিকুঞ্জ মেক-আপটা অন্যরকম ভাবে করত। বাঘা মণ্ডলের ছবি মাস ছয়েক আগেও একবার বেরিয়েছিল কাগজে। সেটা একটা দুঃসাহসিক ডাকাতির পরে। সে বারও বাঘা পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়েছিল। কাগজে ছবি ছাপার উদ্দেশ্য ছিল জনসাধারণকে সতর্ক করা। সেই প্রথমবারের ছবি কি নিকুঞ্জ দেখেছিল, আর সেই চেহারা তার মনের অবচেতনে গাঁথা হয়ে গিয়েছিল? না হলে আজ সে হুবহু বাঘা মণ্ডলের ছদ্মবেশ নেবে কেন?
ছবি দেখে থাকলেও, বাঘা সংক্রান্ত ঘটনাবলী নিশ্চয়ই নিকুঞ্জর জানা ছিল না। যদি থাকত তাহলে তাকে এসে টেবিলে বসতে দেখে যেভাবে পরাশর কেবিন খালি হয়ে গেল, সেটা তার মনে কোনো বিস্ময়ের সৃষ্টি করত না।
ব্যাপারটা কী? এরা এরকম করছে কেন? ম্যানেজার উঠে কোথায় গেলেন? বয়টা ওই কোণে, ওরকম ফ্যাকাসে মুখ করে দাঁড়িয়ে ঠক্‌ ঠক্‌ করে কাঁপছে কেন?
ম্যানেজার যে পাশের ডাক্তারখানায় গিয়েছেন পুলিশে ফোন করতে এবং সেই ফোন যে পুলিশ ভ্যানকে চুম্বকের মতো টেনে আনবে নিকুঞ্জের পাড়ায়, সেটা আর নিকুঞ্জ জানবে কি করে? তবে এমনও দেখা যায় যে একজন লোকের চরম সংকটের মুহূর্তে তার উদ্ধারকল্পে ভাগ্যদেবতা পুরো হাতটা না হলেও, অন্তত একটা আঙুল তার দিকে বাড়িয়ে দেন। সেই আঙুলই হল নিকুঞ্জর পাশের চেয়ারে পড়ে থাকা একটি দৈনিক কাগজ। কাগজটা পুরো দেখারও দরকার নেই; যে পাতায় সেটা খোলা রয়েছে, তাতেই রয়েছে খুনী বাঘা মণ্ডলের ছবি, আর সঙ্গে সংক্ষিপ্ত গরম খবর।
এই মুখই আজ নিকুঞ্জের আয়নায় তারই চোখের সামনে ক্রমে ফুটে উঠেছে।
নিকুঞ্জর হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেলেও কাগজটা কাছে টেনে এনে খবরটায় একবার চোখ বুলিয়ে নেবার লোভ সে সামলাতে পারল না। আর নেওয়ামাত্র সমস্ত ব্যাপারটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল।
রাস্তায় বেরিয়ে দ্রুতপদে (দৌড়ালে লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে) কাঁসারিপাড়া লেনে নিজের বাসায় গিয়ে ঢুকতে সময় লাগল দশ মিনিট। একটা গাড়ির শব্দ সে পিছন থেকে পেয়েছে, এবং ঠিকই সন্দেহ করেছে সেটা পুলিশ ভ্যান—কিন্তু সেদিকে দৃক্‌পাত করেনি। আসুক পুলিশ। পুলিশই বোকা বনবে। তারা সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় পৌঁছানর আগেই নিকুঞ্জর ছদ্মবেশ উধাও হয়ে যাবে। নিকুঞ্জ সাহা ত কোনো অপরাধ করেনি, করেছে বাঘা মণ্ডল।
ঘরে ঢুকে চাকরকে চায়ের জল চাপাতে বলে নিকুঞ্জ দরজাটা খিল দিয়ে বন্ধ করে দিল। ওই যাঃ!—লোড শেডিং। এখন জাপানী জেনারেটর চালাতে গেলে সময় লাগবে।
কুছ পরোয়া নেই। মোমবাতি আছে। কিন্তু আগে জামাটা ছেড়ে ফেলা উচিত। সে কাজটা অন্ধকারেই হবে।
নিকুঞ্জ এক নিমেষে লুঙ্গি শার্ট কালো কোট ছেড়ে খাটের উপর ছুঁড়ে ফেলে এক ঝটকায় আলনা থেকে পায়জামাটা নামিয়ে নিয়ে সেটাকে পরে ফেলল। তারপর দেশলাইয়ের আলোয় মোমবাতিটা দেরাজ থেকে বার করে সেটাকে জ্বালিয়ে টেবিলের উপর রাখল।
এখনো পুলিশ ভ্যানের কোনো শব্দ নেই। পুলিশ হয়ত পাড়ায় নেমে খোঁজ নিচ্ছে কোন্‌ বাড়িতে ঢুকেছে বাঘা মণ্ডল। এ বাড়ির লোক অন্তত তাকে ঢুকতে দেখেনি। সামনের বা আশেপাশের বাড়ির কথা নিকুঞ্জ জানে না।
এই সব চিন্তার মধ্যেই নিকুঞ্জ হাত চালাতে শুরু করল। প্রথমে নকল গোঁফ।
নকল গোঁফ?
নকল যদি হবে ত টানলে খোলে না কেন? স্পিরিট গাম দিয়ে আটকানো গোঁফ ত এক টানেই খুলে যায়—তবে?
মোমবাতিটা মুখের কাছে এনে আয়নার দিকে ঝুঁকতে নিকুঞ্জর রক্ত জল হয়ে গেল।
এ গোঁফ ত নকল বলে মনে হয় না! এ যে তার চামড়া থেকেই গজিয়েছে! আঠার কোন চিহ্ন ত এ গোঁফে নেই!
এ পরচুলাও ত পরচুলা নয়—এ যে তার নিজেরই চুল? এমনকি চারদিনের যে গজানো দাড়ি, যে দাড়ি সে একটি একটি করে গালে লাগিয়েছিল—তাতেও ত কৃত্রিমতার কোনো চিহ্ন নেই।
আর চোখের তলার ওই ক্ষতচিহ্ন? কোন ক্ষণজন্মা মেক-আপ শিল্পীর ক্ষমতা এমন ক্ষতচিহ্ন তৈরি করে রং তুলি আঠা আর প্লাস্টিসিনের সাহায্যে? এ তো সেই উনিশ বছর আগে এন্টালির গাঁজা পার্কে বদ্রু শেখের সঙ্গে হাতাহাতির সময় ছুরির আঘাতের ফল! বাঘা তখন বাঘা হয়নি, তখন সে রাধু মণ্ডল, বয়স একুশ, সবে গুণ্ডামিতে তালিম নিচ্ছে মেঘনাদ রক্ষিতের কাছে।...
দরজা ভেঙে ঢুকতে হল পুলিশকে। মাটিতে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকা বাঘা মণ্ডলের দিকে টর্চ ফেলে দারোগা চাকর নিতাইকে জিগ্যেস করলেন, ‘এই লোক কি এ বাড়িতেই থাকে?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। উনি ত আমার মনিব।’
‘কী নামে জান ওঁকে?’
‘নিকুঞ্জবাবু। সাহাবাবু।’
‘হুঁঃ!—ভদ্রলোক সাজা হয়েছে!’ ব্যাঁকা হাসি হেসে বললেন দারোগাবাবু। তারপর কনস্টেবলের দিকে ফিরে বললেন, ‘ওকে ধরে বেশ করে ঝাঁকাও ত দেখি। হুঁশ ফিরুক, তারপর বাকি কাজ।’
রিভলভার বার করে তাগ করে রইলেন দারোগা বেহুঁশ আততায়ীর দিকে।
ঝাঁকানি দিতেই প্রথমে বাঘা মণ্ডলের পরচুলাটা খসে মাটিতে পড়ল। তারপর গোঁফটা। তার প্লাস্টিসিন দিয়ে সযত্নে তৈরি ক্ষতচিহ্ন ও নাকের বাড়তি অংশটা উঠে এল নেট সমেত।
ততক্ষণে অবিশ্যি নিকুঞ্জ সাহার জ্ঞান ফিরেছে।
কাপালিকের ধমকানিতে যে কাজ হয়নি, আজ পুলিশের শাসানিতে তা হল।
নিকুঞ্জ এখন বই পড়ে মৃৎশিল্প বা ক্লে মডেলিং শিখছে। গঙ্গা কাছেই, নিতাই সেখান থেকে মাটি এনে দেয়। নিকুঞ্জর ইচ্ছা নিতাই হবে তার প্রথম মডেল।


বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

বারীন ভৌমিকের ব্যারাম - সত্যজিৎ রায় [Netflix Ray Episode 3 - Hungama Hai Kyon Barpa by Satyajit Ray]

amarboi
বারীন ভৌমিকের ব্যারাম
সত্যজিৎ রায়

কন্‌ডাক্‌টরের নির্দেশমতো ‘ডি’ কামরায় ঢুকে বারীন ভৌমিক তাঁর সুটকেসটা সিটের নীচে ঢুকিয়ে দিলেন। ওটা পথে খোলার দরকার হবে না। ছোট ব্যাগটা হাতের কাছে রাখা দরকার। চিরুনি, বুরুশ, টুথ-ব্রাশ, দাড়ি কামানোর সরঞ্জাম, ট্রেনে পড়ার জন্য হ্যাডলি চেজের বই—সবই রয়েছে ওই ব্যাগে আর আছে থ্রোট পিলস। ঠাণ্ডা ঘরে ঠাণ্ডা লেগে গলা বসে গেলে কাল গান খুলবে না। চট করে একটা বড়ি মুখে পুরে দিয়ে বারীন ভৌমিক ব্যাগটাকে জানলার সামনে টেবিলটার উপর রেখে দিলেন।
দিল্লিগামী ভেস্টিবিউল ট্রেন, ছাড়তে আর মাত্র সাত মিনিট বাকি, অথচ তাঁর কামরায় আর প্যাসেঞ্জার নেই কেন? এতখানি পথ কি তিনি একা যাবেন? এতটা সৌভাগ্য কি তাঁর হবে? এ যে একেবারে আয়েশের পরাকাষ্ঠা! অবস্থাটা কল্পনা করে বারীন ভৌমিকের গলা থেকে আপনিই একটা গানের কলি বেরিয়ে পড়ল—বাগিচায় বুলবুল তুই ফুলশাখাতে দিনে আজি দোল!
বারীন ভৌমিক জানলা দিয়ে বাইরে হাওড়া স্টেশন প্ল্যাটফর্মের জনস্রোতের দিকে চাইলেন। দুটি ছোকরা তাঁর দিকে চেয়ে পরস্পরে কী যেন বলাবলি করছে। বারীনকে চিনেছে তারা। অনেকেই চেনে। অন্তত কলকাতা শহরের, এবং অনেক বড় বড় মফস্বল শহরের অনেকেই শুধু তাঁর কণ্ঠস্বর নয়, তাঁর চেহারার সঙ্গেও পরিচিত। প্রতি মাসেই পাঁচ-সাতটা ফাংশনে তাঁর ডাক পড়ে। বারীন ভৌমিক-গাইবেন নজরুলগীতি ও আধুনিক। খ্যাতি ও অর্থ—দুই-ই এখন বারীন ভৌমিকের হাতের মুঠোয়। অবিশ্যি এটা হয়েছে বছর পাঁচেক হল। তার আগে কয়েকটা বছর তাঁকে বেশ, যাকে বলে, স্ট্রাগলই করতে হয়েছে। গানের জন্য নয়। গাইবার ক্ষমতাটা তাঁর সহজাত। কিন্তু শুধু গাইলেই তো আর হয় না। তার সঙ্গে চাই কপালজোর, আর চাই ব্যাকিং। উনিশশো সাতষট্টি সালে উনিশ পল্লীর পুজো প্যান্ডেলে ভোলাদা—ভোলা বাঁড়ুজ্যে—তাঁকে দিয়ে যদি না জোর করে ‘বসিয়া বিজনে’ গানখানা গাওয়াতেন…
বারীন ভৌমিকের দিল্লি যাওয়াটাও এই গানেরই দৌলতে। দিল্লির বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন তাঁকে ফার্স্ট ক্লাসের খরচ দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের জুবিলি অনুষ্ঠানে নজরুলগীতি পরিবেশনের উদ্দেশ্যে। থাকার ব্যবস্থাও অ্যাসোসিয়েশনই করবে। দু’দিন দিল্লিতে থেকে তারপর আগ্রা-ফতেপুর-সিক্রি দেখে ঠিক সাতদিন পরে আবার কলকাতায় ফিরবেন বারীন ভৌমিক। তারপর পুজো পড়ে গেলে তাঁর আর অবসর নেই; প্রহরে প্রহরে হাজিরা দিতে হবে গানের আসরে, শ্রোতাদের কানে মধুবর্ষণ করার জন্য।

‘আপনার লাঞ্চের অর্ডারটা সার…’
কন্‌ডাক্‌টার গার্ড এসে দাঁড়িয়েছেন।
‘কী পাওয়া যায়? বারীন প্রশ্ন করলেন।
‘আপনি নন-ভেজিটেরিয়ান তো? দিশি খাবেন না ওয়েস্টার্ন স্টাইল? দিশি হলে আপনার…’
বারীন নিজের পছন্দমতো লাঞ্চের অর্ডার দিয়ে সবেমাত্র একটি থ্রিকাস্‌লস ধরিয়েছেন, এমন সময় আরেকটি প্যাসেঞ্জার এসে কামরায় ঢুকলেন, এবং ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই দিল্লির গাড়ি গা-ঝাড়া দিয়ে তার যাত্রা শুরু করল।
নবাগত যাত্রীটির সঙ্গে চোখাচুখি হতেই তাঁকে চেনা মনে হওয়ায় বারীনের মুখে একটা হাসির আভাস দেখা দিয়ে আগন্তুকের দিক থেকে কোনও সাড়া না পেয়ে মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। বারীন কি তা হলে ভুল করলেন? ছি ছি ছি! এই অবিবেচক বোকা হাসিটার কী দরকার ছিল। কী অপ্রস্তুত! মনে পড়ল একবার রেসের মাঠে একটি ব্রাউন পাঞ্জাবি-পরা প্রৌঢ় ভদ্রলোককে পিছন দিক থেকে ‘কী খ্‌খবো-র ত্রিদিবদা’ বলে পিঠে একটা প্রচণ্ড চাপড় মারার পরমুহূর্তেই বারীন বুঝেছিলেন তিনি আসলে ত্রিদিবদা নন। এই লজ্জাকর ঘটনার স্মৃতি তাঁকে অনেকদিন ধরে যন্ত্রণা দিয়েছিল। মানুষকে অপদস্থ করার জন্য কত রকম ফাঁদ যে চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে!
বারীন ভৌমিক আরেকবার আগন্তুকের দিকে দৃষ্টি দিলেন। ভদ্রলোক স্যান্ডাল খুলে সিটের ওপর পা ছড়িয়ে বসে সদ্য কেনা ইলাস্‌ট্রেটেড উইক্‌লিটা নেড়েচেড়ে দেখছেন। কী আশ্চর্য! আবার মনে হচ্ছে তিনি লোকটিকে আগে দেখেছেন। নিমেষের দেখা নয়, তার চেয়ে অনেক বেশিক্ষণের দেখা। কিন্তু কবে? কোথায়? ঘন ভুরু, সরু গোঁফ, পমেড দিয়ে পালিশ করা চুল, কপালের ঠিক মাঝখানে একটা ছোট্ট আঁচিল। এ মুখ তাঁর চেনা। নিশ্চয়ই চেনা। তিনি যখন সেন্ট্রাল টেলিগ্রাফে চাকরি করতেন তখনকার চেনা কি? কিন্তু এক তরফা চেনা হয় কী করে? তাঁর হাবভাব দেখে তো মনে হয় না যে, তিনি কস্মিনকালেও বারীন ভৌমিককে দেখেছেন।
‘আপনার লাঞ্চের অর্ডারটা…’
আবার কন্‌ডাক্‌টার গার্ড। বেশ হাসিখুশি হৃষ্টপুষ্ট অমায়িক ভদ্রলোকটি।
‘শুনুন’, আগন্তুক বললেন, ‘লাঞ্চ তো হল—আগে এক কাপ চা হবে কি?
‘সার্টেনলি।’
‘শুধু একটা কাপ আর লিকার দিলেই হবে। আমি র’ টি খাই।’
বারীন ভৌমিকের হঠাৎ মনে হল তাঁর তলপেট থেকে নাড়িভুঁড়ি সব বেরিয়ে গিয়ে জায়গাটা একদম খালি হয়ে গেছে। আর তার পরেই মনে হল তাঁর হৃৎপিণ্ডটা হঠাৎ হাত-পা গজিয়ে ফুসফুসের খাঁচাটার মধ্যে লাফাতে শুরু করেছে। শুধু গলার স্বর নয়, ওই গলার স্বরে বিশেষভাবে বিশেষ জোর দিয়ে বলা শুধু একটি কথা—র টি—ব্যস। ওই একটি কথা বারীনের মনের সমস্ত অনিশ্চয়তাকে এক ধাক্কায় দূর করে দিয়ে সেই জায়গায় একটি স্থির প্রত্যয়কে এনে বসিয়ে দিয়েছে।
বারীন যে এই ব্যক্তিটিকে শুধু দেখেছেন তা নয়, তাঁর সঙ্গে ঠিক এই একইভাবে দিল্লিগামী ট্রেনের প্রথম শ্রেণীর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কামরায় মুখোমুখি বসে একটানা প্রায় আটঘণ্টা ভ্রমণ করেছেন। তিনি নিজে যাচ্ছিলেন পাটনা, তাঁর আপন মামাতো বোন শিপ্রার বিয়েতে। তার তিনদিন আগে রেসের মাঠে ট্রেবল টোটে এক সঙ্গে সাড়ে সাত হাজার টাকা জিতে তিনি জীবনে প্রথমবার প্রথম শ্রেণীতে ট্রেনে চড়ার লোভ সামলাতে পারেননি। তখনও তাঁর গাইয়ে হিসেবে নাম হয়নি; ঘটনাটা ঘটে সিক্সটি-ফোরে।—ন’ বছর আগে। ভদ্রলোকের পদবিটাও যেন আবছা-আবছা মনে পড়ছে। ‘চ’ দিয়ে। চৌধুরী? চক্রবর্তী? চ্যাটার্জি?…
কন্‌ডাক্‌টার গার্ড লাঞ্চের অর্ডার নিয়ে চলে গেলেন। বারীন অনুভব করলেন তিনি আর এই লোকটার মুখোমুখি বসে থাকতে পারছেন না। বাইরে করিডরে গিয়ে দাঁড়ালেন, দরজার মুখ থেকে পাঁচ হাত ডাইনে, ‘চ’-এর দৃষ্টির বেশ কিছুটা বাইরে। কোইন্সিডেন্সের বাংলা বারীন ভৌমিক জানেন না, কিন্তু এটা জানেন যে, প্রত্যেকের জীবনেই ও জিনিসটা বারকয়েক ঘটে থাকে। কিন্তু তা বলে এইরকম কোইন্সিডেন্স?
কিন্তু ‘চ’ কি তাঁকে চিনেছেন? না-চেনার দুটো কারণ থাকতে পারে। এক, হয়তো ‘চ’-এর স্মরণশক্তি কম; দুই, হয়তো এই ন’বছর বারীনের চেহারার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। জানালা দিয়ে বাইরের চলমান দৃশ্যের দিকে দেখতে দেখতে বারীন ভাবতে চেষ্টা করলেন, তাঁর ন’বছর আগের চেহারার সঙ্গে আজকের চেহারার কী তফাত থাকতে পারে।
ওজন বেড়েছে অনেক, সুতরাং অনুমান করা যায় তাঁর মুখটা আরো ভরেছে। আর কী? চশমা ছিল না, চশমা হয়েছে। গোঁফ? কবে থেকে গোঁফ কামিয়ে ফেলেছেন তিনি? হ্যাঁ, মনে পড়েছে। খুব বেশিদিন নয়। হাজরা রোডের সেই সেলুন। একটা নতুন ছোকরা নাপিত। দু’পাশের গোঁফ মিলিয়ে কাটতে পারল না। বারীন নিজে ততটা খেয়াল করেননি, কিন্তু আপিসের সেই গোপপে, লিফ্‌টম্যান শুকদেও থেকে শুরু করে বাষট্টি বছরের বুড়ো ক্যাশিয়ার কেশববাবু পর্যন্ত যখন সেই নিয়ে মন্তব্য করলেন তখন বারীন মরিয়া হয়ে তাঁর সাধের গোঁফটি কামিয়ে ফেলেন। সেই থেকে আর রাখেননি। এটা চার বছর আগের ঘটনা।
গোঁফ বাদ, গালে মাংসযোগ, চোখে চশমাযোগ। বারীন খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে আবার কামরায় এসে ঢুকলেন।
বেয়ারা একটা ট্রেতে চায়ের কাপ আর টি-পট ‘চ’-এর সামনে পেতে দিয়ে চলে গেল। বারীনও পানীয়ের প্রয়োজন বোধ করছিলেন—ঠাণ্ডা হোক, গরম হোক—কিন্তু বলতে গিয়েও বললেন না।
যদি গলার স্বরে চিনে ফেলে!
আর চিনলে পরে যে কী হতে পারে সেটা বারীন কল্পনাও করতে চান না। অবিশ্যি সবই নির্ভর করে ‘চ’ কীরকম লোক তার ওপর। যদি অনিমেষদার মত হন, তা হলে বারীন নিস্তার পেতেও পারেন। একবার বাসে একটা লোক অনিমেষদার পকেট হাতড়াচ্ছিল। টের পেয়েও লজ্জায় তিনি কিছু বলতে পারেননি। মানিব্যাগ সমেত চারটি দশ টাকার করকরে নোট তিনি পকেটমারটিকে প্রায় একরকম দিয়েই দিয়েছিলেন। পরে বাড়িতে এসে বলেছিলেন, ‘পাবলিক বাসে একগাড়ি লোকের ভিতর একটা সিন হবে, আর তার মধ্যে একটা প্রমিনেন্ট পার্ট নেব আমি—এ হতে দেওয়া যায় না।’ এই লোক কি সেই রকম? না হওয়াটাই স্বাভাবিক; কারণ অনিমেষদার মতো লোক বেশি হয় না। তা ছাড়া চেহারা দেখেও মনে হয় এ-লোক সে-রকম নয়। ওই ঘন ভুরু, ঠোক্কর খাওয়া নাক, সামনের দিকে বেরিয়ে থাকা থুতনি—সব মিলিয়ে মনে হয়, এ-লোক বারীনকে চিনতে পারলেই তার লোমশ হাত দিয়ে সার্টের কলারটা খামচে ধরে বলবে, ‘আপনিই সেই লোক না?—যিনি সিক্সটি-ফোরে আমার ঘড়ি চুরি করেছিলেন? স্কাউন্ড্রেল! এই ন’বছর ধরে তোমায় খুঁজে বেড়াচ্ছি আমি। আজ আমি তোমার…’
আর ভাবতে পারলেন না বারীন ভৌমিক। এই ঠাণ্ডা কামরাতেও তাঁর কপাল ঘেমে উঠেছে। রেলওয়ের রেক্সিনে মোড়া বালিশে মাথা দিয়ে তিনি সটান সিটের উপর শুয়ে পড়ে বাঁ হাতটা দিয়ে চোখটা ঢেকে নিলেন। চোখ দেখেই সবচেয়ে সহজে মানুষকে চিনতে পারা যায়। বারীনও প্রথমে চোখ দেখেই ‘চ’-কে চিনতে পেরেছিলেন।
প্রত্যেকটি ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তাঁর মনে পড়ছে। শুধু ‘চ’-এর ঘড়ি চুরির ঘটনা না। সেই ছেলে বয়েসে যার যা কিছু চুরি করেছেন সব তিনি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন। একেক সময় খুবই সামান্য সে জিনিস। হয়তো একটা সাধারণ ডটপেন (মুকুলমামার), কিম্বা একটা সস্তা ম্যাগনিফাইং গ্লাস (তাঁর স্কুলের সহপাঠী অক্ষয়ের), অথবা ছেনিদার একজোড়া হাড়ের কাফ-লিংকস, যেটার কোনও প্রয়োজন ছিল না বারীনের, কোনওদিন ব্যবহারও করেননি। চুরির কারণ এই যে, সেগুলো হাতের কাছে ছিল, এবং সেগুলো অন্যের জিনিস। বারো বছর বয়স থেকে শুরু করে পঁচিশ বছর পর্যন্ত কমপক্ষে পঞ্চাশটা পরের জিনিস বারীন ভৌমিক কোনও না কোনও উপায়ে আত্মসাৎ করে নিজের ঘরে নিজের কাছে এনে রেখেছেন। একে চুরি ছাড়া আর কী বলা যায়? চোরের সঙ্গে তফাত শুধু এই যে, চোর চুরি করে অভাবের তাড়নায়, আর তিনি করেছেন অভ্যাসের বশে। লোকে তাঁকে কোনওদিন সন্দেহ করেনি, তাই কোনওদিন ধরা পড়তে হয়নি। বারীন জানেন যে এইভাবে চুরি করাটা একটা ব্যারাম বিশেষ। একবার কথাচ্ছলে এক ডাক্তার বন্ধুর কাছ থেকে তিনি ব্যারামের নামটাও জেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু এখন মনে পড়ছে না।
তবে ন’ বছর আগে ‘চ’-এর ঘড়ি নেওয়ার পর থেকে আজ অবধি এ কাজটা বারীন আর কখনও করেননি। এমনকী করার সেই সাময়িক অথচ প্রবল আকাঙ্ক্ষাটাও অনুভব করেননি। বারীন জানেন যে, এই উৎকট রোগ থেকে তিনি মুক্তি পেয়েছেন।
তাঁর অন্যান্য চুরির সঙ্গে ঘড়ি চুরির একটা তফাত ছিল এই যে, ঘড়িটায় তাঁর সত্যিই প্রয়োজন ছিল। রিস্টওয়াচ না; সুইজারল্যান্ডে তৈরি একটি ভারী সুন্দর ট্রাভেলিং ক্লক। একটা নীল চতুষ্কোণ বাক্স, তার ঢাকনাটা খুললেই ঘড়িটা বেরিয়ে এসে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অ্যালার্ম ঘড়ি, আর সেই অ্যালার্মের শব্দ এতই সুন্দর যে ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে কান জুড়িয়ে যায়। এই ন’বছর সমানে সেটা ব্যবহার করেছেন বারীন ভৌমিক। তিনি যেখানেই গেছেন, সেখানেই সঙ্গে গেছে ঘড়ি।
আজকেও সে ঘড়ি তাঁর সঙ্গেই আছে। জানলার সামনে ওই টেবিলের উপর রাখা ব্যাগের মধ্যে।
‘কদ্দূর যাবেন?’
বারীন তড়িৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠলেন। লোকটা তাঁর সঙ্গে কথা বলছে, তাঁকে প্রশ্ন করছে।
‘দিল্লি।’
‘আজ্ঞে?’
‘দিল্লি।’
প্রথমবার অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে গিয়ে একটু বেশি আস্তে উত্তর দিয়ে ফেলেছিলেন বারীন।
‘আপনার কি ঠাণ্ডায় গলা বসে গেল নাকি।’
‘নাঃ।’
‘ওটা হয় মাঝে মাঝে। অ্যাকচুয়েলি এয়ার কন্ডিশনিং-এর একমাত্র লাভ হচ্ছে। ধুলোর হাত থেকে রেহাই পাওয়া। না হলে আমি এমনি ফার্স্ট ক্লাসেই যেতুম।’
বারীন চুপ। পারলে তিনি ‘চ’-এর দিকে তাকান না, কিন্তু ‘চ’ তাঁর দিকে দেখছে কি না সেটা জানার দুর্নিবার কৌতূহলই তাঁর দৃষ্টি বার বার ভদ্রলোকের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ‘চ’ নিরুদ্বিগ্ন, নিশ্চিন্ত। অভিনয় কী? সেটা বারীন জানেন না। সেটা জানতে হলে লোকটিকে আরো ভাল করে জানা দরকার। বারীন যেটুকু জানেন সেটা তাঁর গতবারের জানা। এক হল দুধ-চিনি ছাড়া চা-পানের অভ্যাস। আরেক হল স্টেশন এলেই নেমে গিয়ে কিছু না কিছু খাবার জিনিস কিনে আনা। নোনতা জিনিস, মিষ্টি নয়। মনে আছে গতবার বারীন ভৌমিকের অনেক রকম মুখরোচক জিনিস খাওয়া হয়ে গিয়েছিল ‘চ’-এর দৌলতে।
এ ছাড়া তাঁর চরিত্রের আরেকটা দিক প্রকাশ পেয়েছিল পাটনা স্টেশনের কাছাকাছি এসে। এটার সঙ্গে ঘড়ির ব্যাপারটা জড়িত। তাই ঘটনাটা বারীনের স্পষ্ট মনে আছে। সেবার গাড়িটা ছিল অমৃতসর মেল। পাটনা পৌঁছবে ভোর পাঁচটায়। কন্‌ডাক্‌টর এসে সাড়ে চারটেয় তুলে দিয়েছেন বারীনকে। ‘চ’ও আধ-জাগা, যদিও তিনি যাচ্ছেন দিল্লি। গাড়ি স্টেশনে পৌঁছবার ঠিক তিন মিনিট আগে হঠাৎ ঘ্যাঁচ করে থেমে গেল। ব্যাপার কী? লাইনের উপর দিয়ে ল্যাম্প ও টর্চের ছুটোছুটি দেখে মনে হল কোনও গোলমাল বেধেছে। শেষটায় গার্ড এসে বললেন একটা বুড়ো নাকি লাইন। পার হতে গিয়ে এঞ্জিনে কাটা পড়েছে। তার লাশ সরালেই গাড়ি চলবে। ‘চ’ খবরটা পাওয়ামাত্র ভারী উত্তেজিত হয়ে স্লিপিং সুট পরেই অন্ধকারে নেমে চলে গেলেন ব্যাপারটা চাক্ষুষ দেখে আসতে।
এই সুযোগেই বারীন তাঁর বাক্স থেকে ঘড়িটা বার করে নেন। সেই রাত্রেই ‘চ’কে দেখেছিলেন সেটায় দম দিতে। লোভও যে লাগেনি তা নয়, তবে সুযোগের অভাব হবে জেনে ঘড়ির চিন্তা মন থেকে দূর করে দিয়েছিলেন। এই মুহূর্তে অপ্রত্যাশিতভাবে সে সুযোগ এসে পড়তে সে-লাভ এমনভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে যে, বাঙ্কের উপর অন্য একটি ঘুমন্ত প্যাসেঞ্জার থাকা সত্ত্বেও তিনি ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করেননি। কাজটা করতে তাঁর লাগে মাত্র পনেরো-বিশ সেকেন্ড। ‘চ’ ফিরলেন প্রায় পাঁচ মিনিট পরে।
‘হরিব্‌ল ব্যাপার! ভিখিরি। ধড় একদিকে, মুড়ো একদিকে। সামনে কাউক্যাচার থাকতে কাটা যে কেন পড়ে বুঝতে পারি না মশাই। ওটার উদ্দেশ্য তো লাইনে কিছু পড়লে সেটাকে ঠেলে বাইরে ফেলে দেওয়া!…’।
পাটনায় নেমে স্টেশন থেকে বেরিয়ে মেজোমামার মোটরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই বারীন ভৌমিকের তলপেটের অসোয়াস্তিটা ম্যাজিকের মতো উবে যায়। তাঁর মন বলে, ঘড়ির মালিকের সঙ্গে এতকাল যে ব্যবধান ছিল—কেউ কারুর নাম শোনেনি, কেউ কাউকে দেখেনি—গত আট ঘণ্টার আকস্মিক সান্নিধ্যের পর আবার সেই ব্যবধান এসে পড়েছে। এর পরে আবার কোনও দিন পরস্পরের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা কোটিতে এক। কিম্বা হয়তো তার চেয়েও কম।
কিন্তু এই তিলপ্রমাণ সম্ভাবনাই যে ন’বছর পরে হঠাৎ সত্যে পরিণত হবে সেটা কে জানত? বারীন মনে মনে বললেন, এই ধরনের ঘটনা থেকেই মানুষ কুসংস্কারের জালে জড়িয়ে পড়ে।
‘আপনি কি দিল্লির বাসিন্দা, না কলকাতার?’
বারীনের মনে পড়ল সেবারও লোকটা তাঁকে নানারকম প্রশ্ন করেছিল। এই গায়ে পড়া আলাপ করার বাতিকটা বারীন পছন্দ করেন না।
‘কলকাতা’, বারীন জবাব দিলেন। তাঁর অজান্তেই তাঁর স্বাভাবিক গলার স্বরটা বেরিয়ে পড়েছে। বারীন নিজেকে ধিক্কার দিলেন। ভবিষ্যতে তাঁকে আরো সতর্ক হতে হবে।
কিন্তু এ কী! ভদ্রলোক তাঁর দিকে এভাবে একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছেন কেন? সহসা এ হেন কৌতূহলের কারণ কী? বারীন অনুভব করলেন তাঁর নাড়ি আবার চঞ্চল হয়ে উঠেছে।
‘আপনার কি রিসেন্টলি কোনও ছবি বেরিয়েছে কাগজে?’
বারীন বুঝলেন এ ব্যাপারে সত্য গোপন করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, ট্রেনে অন্যান্য বাঙালি যাত্রী রয়েছে, তাদের মধ্যে কেউ না কেউ তাঁকে চিনে ফেললেও ফেলতে পারে। এর কাছে নিজের পরিচয়টা দিলে ক্ষতি কী? বরং বারীন যে একজন খ্যাতনামা ব্যক্তি সেটা জানলে পরে ন’বছর আগের সেই ঘড়ি-চোরের সঙ্গে তাঁকে এক করে দেখা ‘চ’-এর পক্ষে আরো অসম্ভব হবে।
‘কোথায় দেখেছেন আপনি ছবি?’ বারীন পালটা প্রশ্ন করলেন।
‘আপনি গান করেন কি?’ আবার প্রশ্ন।
‘হ্যাঁ, তা একটু-আধটু…’
‘আপনার নামটা…?’
‘বারীন্দ্রনাথ ভৌমিক।’
‘তাই বলুন বারীন ভৌমিক। তাই চেনা-চেনা মনে হচ্ছিল। আপনি তো রেডিয়োতেও গেয়ে থাকেন মাঝে মাঝে?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
‘আমার স্ত্রী আপনার খুব ভক্ত। দিল্লি যাচ্ছেন কি গানের ব্যাপারে?’
‘হ্যাঁ।’
বেশি ভেঙে বলবেন না বারীন। শুধু হ্যাঁ বা না-য়ে যদি উত্তর হয়, তবে তাই বলবেন।
‘দিল্লিতে এক ভৌমিক আছে—ফিনান্সে। স্কটিশে পড়ত আমার সঙ্গে। নীতীশ ভৌমিক। আপনার কোনও ইয়ে-টিয়ে নাকি?’
ইয়ে-টিয়েই বটে। বারীনের খুড়তুতো দাদা। কড়া সাহেবি মেজাজের লোক, তাই বারীনের আত্মীয় হলেও সমগোত্রীয় নয়।
‘আজ্ঞে না। আমি চিনি না।’
এখানে মিথ্যে বলাটাই শ্রেয় বিবেচনা করলেন বারীন। লোকটা এবার কথা বন্ধ করলে পারে। এত জেরা কেন রে বাপু!
যাক, লাঞ্চ এসে গেছে। আশা করি কিছুক্ষণের জন্য প্রশ্নবাণ বন্ধ হবে।
হলও তাই। ‘চ’ ভোজনরসিক। একবার মুখে খাদ্য প্রবেশ করলে কথার রাস্তা যেন আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বারীন ভৌমিকের ভয় খানিকটা কেটে গেলেও একটা অসোয়াস্তি এখনও রয়ে গেছে। এখনও বিশ ঘণ্টার পথ বাকি। মানুষের স্মৃতিভাণ্ডার বড় আশ্চর্য জিনিস। কীসে খোঁচা মেরে কোন আদ্যিকালের কোন স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলবে তার কিচ্ছু ঠিক নেই। ওই যেমন ‘র’ টি। বারীনের বিশ্বাস, ওই বিশেষ কথাটা না শুনলে যে সেই ন’বছর আগের ঘড়ির মালিক ‘চ’ সে ধারণা কিছুতেই ওর মনে বদ্ধমূল হত না। সেরকম বারীনেরও কোনও কথায় বা কাজে যদি তাঁর পুরনো পরিচয়টা ‘চ’-এর কাছে ধরা পড়ে যায়?
এইসব ভেবে বারীন স্থির করলেন যে, তিনি কথাও বলবেন না, কাজও করবেন না। খাবার পর মুখের সামনে হ্যাডলি চেজের বইটা খুলে বালিশে মাথা দিয়ে শুয়ে রইলেন। প্রথম পরিচ্ছেদটা শেষ করে সাবধানে ঘাড় ফিরিয়ে দেখলেন যে, ‘চ’ ঘুমিয়ে পড়েছে। অন্তত দেখলে তাই মনে হয়। ইলাসট্রেটেড উইকলিটা হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গেছে, চোখ দুটো হাতে ঢাকা, কিন্তু বুকের ওঠানামা দেখে ঘুমন্ত লোকের স্বাভাবিক স্বচ্ছন্দ নিশ্বাস বলেই মনে হয়। বারীন জানালা দিয়ে বাইরের দিকে চাইলেন। মাঠ-ঘাট, গাছপালা খোলার বাড়ি মিলিয়ে বিহারের রুক্ষ দৃশ্য। জানলার ডবল কাচ ভেদ করে ট্রেনের শব্দ প্রায় পাওয়াই যায় না। ‘যেন দূর থেকে শোনা অনেক মৃদঙ্গে একই সঙ্গে একই বোল তোলার শব্দ—ধাদ্ধিনাক্‌ নাদ্ধিনাক্‌ ধাদ্ধিনাক্‌ নাদ্ধিনাক্‌ ধাদ্ধিনাক্‌ নাদ্ধিনাক্‌…
এই শব্দের সঙ্গে এবার যোগ হয় আরেকটি শব্দ, ‘চ’-এর নাসিকাধ্বনি।
বারীন ভৌমিক অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করলেন। নজরুলের একটা বাছাই করা গানের প্রথম লাইনটা গুনগুন করে দেখলেন। সকালের মতো অতটা মসৃণ না হলেও, গলাটা তাঁর নিজের কানে খারাপ লাগল না। এবার বেশি শব্দ না করে গলাটা খাঁকরে তিনি গানটা আবার ধরলেন। এবং ধরেই তৎক্ষণাৎ তাঁকে থেমে যেতে হল।
একটা চরম বিভীষিকাজনক শব্দ তাঁর গলা শুকিয়ে দিয়ে গান বন্ধ করে দিয়েছে।
ঘড়িতে অ্যালার্ম বাজার শব্দ।
তাঁর ব্যাগের মধ্যে রাখা সুইস ঘড়িতে কেমন করে জানি অ্যালার্ম বেজে উঠেছে। এবং বেজেই চলেছে। বারীন ভৌমিকের হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে গেছে। তাঁর দেহ কাষ্ঠবৎ। তাঁর দৃষ্টি ঘুমন্ত ‘চ’-এর দিকে নিবদ্ধ।
‘চ’-এর হাত যেন একটু নড়ল। বারীন প্রমাদ গুনলেন।
‘চ’-এর ঘুম ভেঙেছে। চোখের ওপর থেকে হাত সরে এল।
‘গেলাসটা বুঝি? ওটাকে নামিয়ে রাখুন তো—ভাইব্রেট করছে।’
বারীন ভৌমিক দেয়ালে লাগানো লোহার আংটার ভেতর থেকে গেলাসটা তুলতেই শব্দটা থেমে গেল। সেটা টেবিলে রাখার আগে তার ভিতরের জলটুকু খেয়ে গলাটা ভিজিয়ে তিনি খানিকটা আরাম পেলেন। তবু গানের অবস্থায় আসতে দেরি আছে।
হাজারিবাগ রোডের কিছু আগে চা এল। পর পর দু’ পেয়ালা গরম চা খেয়ে এবং ‘চ’-এর কাছ থেকে আর কোনওরকম জেরা বা সন্দেহের কোনও লক্ষণ না পেয়ে বারীনের গলা আরো অনেকটা খোলসা হল। বাইরে বিকেলের পড়ন্ত রোদ আর দূরের টিলার দিকে চেয়ে গাড়ির ছন্দের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে একটা আধুনিক গানের খানিকটা গুনগুন করে গেয়ে আসন্ন বিপদের শেষ আশঙ্কাটুকু তাঁর মন থেকে কেটে গেল।
গয়াতে ‘চ’ তাঁর ন’বছরের আগের অভ্যাস অনুযায়ী প্ল্যাটফর্মে নেমে সেলোফোনে মোড়া দু’ প্যাকেট চানাচুর কিনে এনে তার একটা বারীন ভৌমিককে দিলেন। বারীন দিব্যি তৃপ্তির সঙ্গে সেটা খেলেন। গাড়ি ছাড়ার মুখে সূর্য ডুবে গেল। ঘরের বাতিগুলো জ্বালিয়ে দিয়ে ‘চ’ বললে—
‘আমরা কি লেট রান করছি? আপনার ঘড়িতে কটা বাজে?’
এই প্রথম বারীন ভৌমিকের খেয়াল হল যে, ‘চ’-এর হাতে ঘড়ি নেই। ব্যাপারটা অনুধাবন করে তিনি বিস্মিত হলেন এবং হয়তো সে বিস্ময়ের খানিকটা তাঁর চাহনিতে প্রকাশ পেল। পরমুহূর্তেই খেয়াল হল ‘চ’-এর প্রশ্নের জবাব দেওয়া হয়নি। নিজের ঘড়ির দিকে এক ঝলক দৃষ্টি দিয়ে বললেন, ‘সাতটা পঁয়ত্রিশ।’
‘তা হলে তো মোটামুটি টাইমেই যাচ্ছি।’
‘হ্যাঁ।’
‘আমার ঘড়িটা আজই সকালে…এইচ এম টি…দিব্যি টাইম দিচ্ছিল…বিছানার চাদর ধরে এমন এক টান দিয়েছে যে ঘড়ি একেবারে…’
বারীন চুপ। তটস্থ। ঘড়ির প্রসঙ্গ তাঁর কাছে ষোলো আনা অপ্রীতিকর অবাঞ্ছনীয়।
‘আপনার কী ঘড়ি?’
‘এইচ এম টি।’
‘ভাল সার্ভিস দিচ্ছে?’
‘হুঁ’
‘আসলে আমার ঘড়ির লকটাই খারাপ।’
বারীন ভৌমিক একটা হাই তুলে নিজেকে নিরুদ্বিগ্ন প্রতিপন্ন করার চেষ্টায় ব্যর্থ হলেন। তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অসাড়তা চোয়াল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। মুখ খুলল না। শ্রবণশক্তি লোপ পেলে তিনি সবচেয়ে খুশি হতেন, কিন্তু তা হবার নয়। ‘চ’-এর কথা দিব্যি তাঁর কানে প্রবেশ করছে—
‘একটা সুইস ঘড়ি, জানেন—সোনার—ট্র্যাভলিং ক্লক—জিনিভা থেকে এনে দিয়েছিল আমার এক বন্ধু—একমাসও ব্যবহার করিনি…ট্রেনে যাচ্ছি দিল্লি—বছর আষ্টেক আগে—এই যে আমি-আপনি ট্র্যাভল করছি, সেইরকম একটা কামরায় আমরা দু’জন—আমি আর একটি ভদ্রলোক—বাঙালি…কী ডেয়ারিং ভেবে দেখুন! হয়তো বাথরুমে-টাথরুমে গেছি, কি স্টেশন এসেছে, প্ল্যাটফর্মে নেমেছি—আর সেই ফাঁকে ঘড়িটাকে বেমালুম ঝেপে দিল! অথচ দেখে বোঝার জো নেই—ফার্স্ট ক্লাসে যাচ্ছে, দিব্যি ভদ্রলোকের মতো চেহারা। খুন-টুন যে করে বসেনি এই ভাগ্যি! তারপর থেকে তো আর ট্রেনেই চড়িনি। এবারও প্লেনেই যেতুম, কিন্তু পাইলটদের স্ট্রাইকটা দিল ব্যাগড়া…’
বারীন ভৌমিকের গলা শুকনো, ঠোঁটের চারপাশটা অবশ। অথচ তিনি বেশ বুঝতে পারছেন যে এতগুলো কথার পর কিছু না বললে অস্বাভাবিক হবে, এমনকী সন্দেহজনকও হতে পারে। প্রাণান্ত চেষ্টা করে, অসীম মনোবল প্রয়োগ করে, অবশেষে কয়েকটি কথা বেরোল মুখ দিয়ে—
‘আপনি খোঁ-খোঁজ করেননি?’
‘আ-র খোঁজ! এসব কী আর খোঁজ করে ফেরত পাওয়া যায়? তবে লোকটার চেহারা মনে রেখেছিলুম অনেক দিন। এখনও আবছা-আবছা মনে পড়ে। মাঝারি রং, গোঁফ আছে, আপনারই মতো হাইট হবে, তবে রোগা। আর একটিবার যদি সাক্ষাৎ পেতুম তো বাপের নাম ভুলিয়ে দিতুম। এককালে বক্সিং করতুম, জানেন? লাইট হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ান ছিলুম। সে লোকের চোদ্দ পুরুষের ভাগ্যি যে, আর দ্বিতীয়বার আমার সামনে পড়েনি…’
ভদ্রলোকের নামটাও মনে পড়ে গেছে। চক্রবর্তী। পুলক চক্রবর্তী। আশ্চর্য! ওই বক্সিং-এর কথাটা বলামাত্র নামটা সিনেমার টাইটেলের মতো যেন চোখের সামনে দেখতে পেলেন বারীন ভৌমিক। গতবারও বক্সিং নিয়ে অনেক কথা বলেছিলেন পুলক চক্রবর্তী।
কিন্তু নামটা জেনেই কী হবে? ইনি তো আর কোনও অপরাধ করেননি। অপরাধী বারীন নিজে। আর সেই অপরাধের বোঝা দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। সব স্বীকার করলে কেমন হয়? ঘড়িটা ফেরত দিলে কেমন হয়? হাতের কাছে ব্যাগটা খুললেই তো—
দূর—পাগল! এসব কী চিন্তাকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন বারীন ভৌমিক? নিজেকে চোর বলে পরিচয় দেবেন? প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী তিনি, তিনি না বলিয়া পরের দ্রব্য নেওয়ার কথা স্বীকার করবেন? তার ফলে তাঁর নাম যখন ধুলোয় লুটোবে তখন আর গানের ডাক আসবে কোত্থেকে? তাঁর ভক্তের দলই বা কী ভাববে, কী বলবে? ইনি নিজেই যে সাংবাদিক নন, বা সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত নন, তারই বা গ্যারান্টি কোথায়? না। স্বীকার করার প্রশ্নই ওঠে না।
হয়তো স্বীকার করার প্রয়োজনও নেই। পুলক চক্রবর্তী ঘন ঘন চাইছেন তাঁর দিকে। আরো ষোলো ঘণ্টা আছে দিল্লি পৌঁছতে। কোনও এক বীভৎস মুহূর্তে ফস্ করে চিনে ফেলার দীর্ঘ সুযোগ পড়ে আছে সামনে। আরে এই তো সেই লোক!—বারীন কল্পনা করলেন তাঁর গোঁফ খসে পড়ে গেছে, গাল থেকে মাংস ঝরে গেছে, চোখ থেকে চশমা খুলে গেছে; পুলক চক্রবর্তী এক দৃষ্টে চেয়ে রয়েছে তাঁর ন’ বছর আগের চেহারাটার দিকে, তাঁর ঈষৎ কটা চোখের দৃষ্টি ক্রমশ তীক্ষ হয়ে আসছে, তাঁর ঠোঁটের কোণে ক্রুর হাসি ফুটে উঠছে। হুঁ হুঁ বাছাধন! পথে এসো এবার! অ্যাদ্দিন বাদে বাগে পেয়েছি তোমায়! ঘুঘু দেখেছ, ফাঁদ তো দেখোনি…
দশটা নাগাদ বারীন ভৌমিকের কম্প দিয়ে জ্বর এল। গার্ডকে বলে তিনি একটি অতিরিক্ত কম্বল চেয়ে নিলেন। তারপর দুটি কম্বল একসঙ্গে পা থেকে নাক অবধি টেনে নিয়ে শয্যা নিলেন। পুলক চক্রবর্তী কামরার দরজা বন্ধ করে ছিটকিনি লাগিয়ে দিলেন। বাতি নেভাতে গিয়ে বারীনের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাকে অসুস্থ বলে মনে হচ্ছে। ওষুধ খাবেন? ভাল বড়ি আছে আমার কাছে, দুটো খেয়ে নিন। এয়ারকন্ডিশনিং-এর অভ্যাস নেই বোধহয়?’
ভৌমিক বড়ি খেলেন। একমাত্র ভরসা যে, ঘড়ি-চোর বলে চিনতে পারলেও তাঁকে অসুস্থ দেখে অনুকম্পাবশত পুলক চক্রবর্তী কঠিন শাস্তি থেকে বিরত হবেন। একটা ব্যাপার তিনি ইতিমধ্যে স্থির করে ফেলেছেন। পুলক তাঁকে চিনতে না পারলেও, কাল দিল্লি পৌঁছবার আগে কোনও এক সুযোগে সুইস ঘড়িটা তার আসল মালিকের বাক্সের মধ্যে চালান দিতে হবে। যদি সম্ভব হয় তো মাঝরাত্রেই কাজটা সারা যেতে পারে। কিন্তু জ্বরটা না কমলে কম্বলের তলা থেকে বেরোনো সম্ভব হবে না। এখনও মাঝে মাঝে সমস্ত শরীর কেঁপে উঠছে।
পুলক তাঁর মাথার কাছে রিডিং ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে রেখেছেন। তাঁর হাতে খোলা একটা পেপারব্যাক বই। কিন্তু তিনি কি সত্যিই পড়ছেন, না বইয়ের পাতায় চোখ রেখে অন্য কিছু চিন্তা করছেন? বইটা একভাবে ধরা রয়েছে কেন? পাতা উলটোচ্ছেন না কেন? কতক্ষণ সময় লাগে পাশাপাশি দুটো পাতা পড়তে?
এবার বারীন লক্ষ করলেন যে, পুলকের দৃষ্টি বইয়ের পাতা থেকে সরে আসছে। তাঁর মাথাটা ধীরে ধীরে পাশের দিকে ঘুরল। দৃষ্টি ঘুরে আসছে বারীনের দিকে। বারীন চোখ বন্ধ করলেন। বেশ কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইলেন। এখনও কি পুলক চেয়ে আছেন তাঁর দিকে? খুব সাবধানে চোখের পাতা দুটোকে যৎসামান্য ফাঁক করলে বারীন। আবার তৎক্ষণাৎ বন্ধ করে নিলেন। পুলক সটান চেয়ে আছেন তাঁর দিকে। বারীন অনুভব করলেন তাঁর বুকের ভিতরে সেই ব্যাঙটা আবার লাফাতে শুরু করেছে। পাঁজরার হাড়ে আবার ধাক্কা পড়ছে—ধুকপুক…ধুকপুক…ধুপপুক্‌…ধুকপুক্‌…। দাদ্‌রার ছন্দ। ট্রেনের চাকার গম্ভীর ছন্দের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে সে ছন্দ।
একটা মৃদু ‘খচ’ শব্দের সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ অবস্থাতেই বারীন বুঝতে পারলেন যে কামরার শেষ বাতিটাও নিভে গেছে। এবার সাহস পেয়ে চোখ খুলে বারীন দেখলেন যে দরজার পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা ক্ষীণ আলো কামরার অন্ধকারকে জমাট বাঁধতে দেয়নি। সেই আলোয় দেখা গেল পুলক চক্রবর্তী তাঁর হাতের বইটা বারীনের ব্যাগের পাশে রাখলেন। তারপর কম্বলটাকে একেবারে থুতনি অবধি টেনে নিয়ে পাশ ফিরে বারীনের মুখোমুখি হয়ে একটা সশব্দ হাই তুললেন।
বারীন ভৌমিক টের পেলেন তাঁর হৃৎস্পন্দন ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে আসছে। কাল সকালে—হ্যাঁ, কাল সকালে—পুলকের ট্র্যাভলিং ব্লক তাঁর নিজের ব্যাগ থেকে পুলকের সুটকেসের জামা-কাপড়ের তলায় চালান দিতে হবে। সুটকেসে চাবি লাগানো নেই। একটুক্ষণ আগেই পুলক স্লিপিং সুট বার করে পরেছে। বারীনের কাঁপুনি বন্ধ হয়ে গেছে। বোধহয় ওষুধে কাজ দিয়েছে। কী ওষুধ দিলেন ভদ্রলোক? নামটা তো জিজ্ঞেস করা হয়নি। অসুস্থতার ফলে দিল্লির সংগীত-রসিকদের বাহবা থেকে যাতে সঞ্চিত না হন, সেই আশায় অত্যন্ত ব্যগ্রভাবে পুলক চক্রবর্তীর দেওয়া বাড়ি গিলেছেন তিনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে…
নাঃ, এসব চিন্তাকে প্রশ্রয় দেবেন না তিনি। গেলাসের ঠুনঠুনিকে অ্যালার্ম ক্লক ভেবে কী অবস্থা হয়েছিল৷ এসবের জন্য দায়ী তাঁর অপরাধবোধ-জর্জরিত অসুস্থ মন। কাল সকালে তিনি এর প্রতিকারের ব্যবস্থা করবেন। মন খোলসা না হলে গলা খুলবে না, গান বেরোবে না। বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন…
চায়ের সরঞ্জামের টুংটাং শব্দে বারীন ভৌমিকের ঘুম ভাঙল। বেয়ারা এসেছে ট্রে নিয়ে চা রুটি মাখন ডিমের অমলেট। এসব তাঁর চলবে কি? জ্বর আছে কি এখনও? না, নেই। শরীর ঝরঝরে হয়ে গেছে। মোক্ষম ওষুধ দিয়ে ছিলেন পুলক চক্রবর্তী। ভদ্রলোকের প্রতি একটা কৃতজ্ঞতার ভাব জেগে উঠল বারীনের মনে।
কিন্তু তিনি কোথায়? বাথরুমে বোধহয়। নাকি করিডরে? বেয়ারা চলে গেলে পর বারীন বাইরে বেরোলেন। করিডর খালি। কতক্ষণ হল বাথরুমে গেছেন ভদ্রলোক? একটা চান্স নেওয়া যায় কি?
বারীন চান্সটা নিলেন বটে, কিন্তু সফল হলেন না। ব্যাগ থেকে ঘড়ি বার করে পুলক চক্রবর্তীর সুটকেস টেনে বার করার জন্য নিচু হতে না হতেই ভদ্রলোক তোয়ালে ও ক্ষৌরীর সরঞ্জাম হাতে কামরায় এসে ঢুকলেন। বারীন ভৌমিক তাঁর ডান হাতটা মুঠো করে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।
‘কেমন আছেন? অলরাইট?’
‘হ্যাঁ। ইয়ে…এটা চিনতে পারছেন?’
বারীন তাঁর মুঠো খুলে ঘড়ি সমেত হাতটা পুলকের সামনে ধরলেন। তবে মনে এখন একটা আশ্চর্য দৃঢ়তা এসেছে। চুরির ব্যারাম তিনি অনেক দিন কাটিয়ে উঠেছেন, কিন্তু এই যে লুকোচুরি, সেটাও তো চুরি! এই ঢাক-ঢাক গুড়-গুড় কিন্তু-কিন্তু করছি-করব ভাব, এই তলপেট-খালি, গলা-শুকনো, কান-গরম, বুক-ধুকপুক—এটাও তো একটা ব্যারাম। এটাকে কাটিয়ে না উঠলে নিস্তার নেই, সোয়াস্তি নেই।
পুলক চক্রবর্তী হাতের তোয়ালের একটা অংশ তাঁর ডান হাতের তর্জনীর সাহায্যে সবেমাত্র কানের মধ্যে গুঁজেছিলেন, এমন সময় বারীনের হাতে ঘড়িটা দেখে হাত তাঁর কানেই রয়ে গেল। বারীন বললেন, ‘আমিই সেই লোক। মোটা হয়েছি, গোঁফটা কামিয়েছি, আর চশমা নিয়েছি। আমি পাটনা যাচ্ছিলাম, আপনি দিল্লি। সিক্সটি-ফোরে। সেই যে একটি লোক কাটা পড়ল, আপনি দেখতে নামলেন, সেই সুযোগে আমি ঘড়িটা নিয়ে নিই।’
পুলকের দৃষ্টি এখন ঘড়ি থেকে সরে গিয়ে বারীনের চোখের ওপর নিবদ্ধ হল। বারীন দেখলেন তাঁর কপালের মাঝখানে নাকের উপর দুটো সমান্তরাল খাঁজ, চোখের সাদা অংশটা অস্বাভাবিক রকম প্রকট, ঠোঁট দুটো ফাঁক হয়ে গিয়ে কিছু বলার জন্য তৈরি হয়েও কিছু বলতে পারছে না। বারীন বলে চললেন—
‘আসলে ওটা আমার একটা ব্যারাম, জানেন। মানে, আমি আসলে চোর নই। ডাক্তারিতে এর একটা নাম আছে, এখন মনে পড়ছে না। যাই হোক, এখন আমি একেবারে, মানে, নরম্যাল। ঘড়িটা অ্যাদ্দিন ছিল, ব্যবহার করেছি, আজও সঙ্গে রয়েছে, আপনার সঙ্গে দেখে হয়ে গেল—প্রায় মিরাক্‌লের মতো—তাই আপনাকে ফেরত দিচ্ছি। আশা করি আপনার মনে কোনও…ইয়ে থাকবে না।’
পুলক চক্রবর্তী একটা অস্ফুট ‘থ্যাঙ্কস’ ছাড়া আর কিছু বলতে পারলেন না। তাঁর হারানো ঘড়ি তাঁর নিজের কাছে ফিরে এসেছে, হতভম্ব ভাবে সেটি হাতে নিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। বারীন তাঁর ব্যাগ থেকে দাঁতের মাজন, টুথব্রাশ ও দাড়ি কামানোর সরঞ্জাম বার করে তোয়ালেটা র‍্যাক থেকে নামিয়ে নিয়ে কামরার দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে নজরুলের ‘কত রাতি পোহায় বিফলে’ গানের খানিকটা গেয়ে বুঝলেন যে, তাঁর কণ্ঠের স্বাভাবিক সাবলীলতা তিনি ফিরে পেয়েছেন।
ফাইনান্সের এন. সি. ভৌমিককে টেলিফোনে পেতে প্রায় তিন মিনিট সময় লাগল। শেষে একটা পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠে শোনা গেল ‘হ্যালো।’
‘কে, নীতীশদা? আমি ভোঁদু।’
‘কীরে, তুই এসে গেছিস? আজ যাব তোর গলাবাজি শুনতে। তুইও একটা কেউকেটা হয়ে গেলি শেষটায়? ভাবা যায় না!…যাক, কী খবর বল। হঠাৎ নীতীশদাকে মনে পড়ল কেন?’
‘ইয়ে—পুলক চক্রবর্তী বলে কাউকে চিনতে? তোমার সঙ্গে নাকি স্কটিশে পড়ত। বক্সিং করত।’
‘কে, ঝাড়ুদার?’
‘ঝাড়ুদার?’
‘ও যে সব জিনিসপত্তর ঝেড়ে দিত। এর-ওর ফাউন্টেন পেন, লাইব্রেরির বই, কমন-রুম থেকে টেবিল টেনিস ব্যাট। আমার প্রথম রনসনটা তো ও-ই ঝেড়েছিল। অথচ অভাব-টভাব নেই, বাপ রিচ ম্যান। ওটা একধরনের ব্যারাম, জানিস তো?’
‘ব্যারাম?’
‘জানিস না? ক্লেপ্‌টোমেনিয়া। কে-এল-ই-পি…’
টেলিফোনটা নামিয়ে রেখে বারীন ভৌমিক তাঁর খোলা সুটকেসটার দিকে দেখলেন। হোটেলে এসে সুটকেস খুলতেই কিছু জিনিসের অভাব তিনি লক্ষ করেছেন। এক কার্টন থ্রি কাসলস সিগারেট, একটা জাপানি বাইনোকুলার, পাঁচটা একশো টাকার নোটসমেত একটা মানিব্যাগ।
ক্লেপ্‌টোমেনিয়া। বারীন নামটা জানতেন, কিন্তু ভুলে গেছিলেন। আর ভুলবেন না।


বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

স্পটলাইট - সত্যজিৎ রায় [Netflix Ray Episode 4 - Spotlight by Satyajit Ray]

amarboi
স্পটলাইট
সত্যজিৎ রায়
ছোটনাগপুরের এই ছোট্ট শহরটায় পুজোর ছুটি কাটাতে আমরা আগেও অনেকবার এসেছি। আরো বাঙালীরা আসে; কেউ কেউ নিজেদের বাড়িতে থাকে, কেউ কেউ বাড়ি-বাংলো-হোটেল ভাড়া করে থাকে, দিন দশেকে অন্তত মাস ছয়েক আয়ু বাড়িয়ে নিয়ে আবার যে-যার জায়গায় ফিরে যায়। বাবা বলেন, ‘আজকাল আর খাবার-দাবার আগের মতো সস্তা নেই ঠিকই, কিন্তু জলবায়ুটা ত ফ্রী, আরে সেটার কোয়ালিটি যে পড়ে গেছে সে কথা ত কেউ বলতে পারবে না।’
দলে ভারী হয়ে আসি, তাই গাড়ি-ঘোড়া সিনেমা-থিয়েটার দোকান-পাট না থাকলেও দশটা দিন দারুণ ফুর্তিতে কেটে যায়। একটা বছরের ছুটির সঙ্গে আরেকটা বছরের ছুটির তফাত কী জিগ্যেস করলে মুশকিলে পড়তে হবে, কারণ চারবেলা খাওয়া এক—সেই মুরগী মাংস ডিম অড়হর ডাল, বাড়িতে দোওয়া গরুর দুধ, বাড়ির গাছের জামরুল পেয়ারা; দিনের রুটিন এক—রাত দশটায় ঘুম, ভোর ছটায় ওঠা, দুপুরে তাস মোনপলি, বিকেলে চায়ের পর রাজা পাহাড় অবধি ইভনিং ওয়ক্‌; অন্তত একদিন কালীঝোরার ধারে পিকনিক; দিনে ঝলমলে রোদ আর তুলো পেঁজা মেঘ; রাত্তিরের আকাশের এমাথা থেকে ওমাথা ছড়ানো ছায়াপথ, কাক শালিক কাঠবেড়াল গুবরে ভোমরা গিরগিটি কাঁচপোকা কুঁচফল—সব এক।
কিন্তু এবার নয়।
এবার একটা তফাত হল।
অংশুমান চ্যাটার্জিকে আমার তেমন ভালো না লাগলে কী হল—সে হচ্ছে পশ্চিম বাংলার সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে জনপ্রিয় ফিল্মস্টার। আমার ছোট বোন শর্মি—বারো বছর বয়স—তার একটা পুরো বড় বঙ্গলিপি খাতা ভরিয়ে ফেলেছে ফিল্ম পত্রিকা থেকে কাটা অংশুমান চ্যাটার্জির ছবি দিয়ে। আমার ক্লাসের ছেলেদের মধ্যেও তার ‘ফ্যান’-এর অভাব নেই। এর মধ্যেই তারা অংশুমানের চুলের স্টাইল নকল করছে, ওর মতো ভারী গলায় ভুরু তুলে কথা বলার চেষ্টা করে, শার্টের নিচে গেঞ্জি পরে না, ওপরের তিনটে বোতাম খোলা রাখে।
সেই অংশুমান চ্যাটার্জি সঙ্গে তিনজন চামচা নিয়ে কুন্ডুদের বাড়ি ভাড়া করে ছুটি কাটাতে এসেছে এই শহরে, সঙ্গে পোলারাইজড কাঁচের জানালাওয়ালা এয়ার কন্ডিশন্‌ড হলদে মার্সেডিজ গাড়ি। সেবার আন্দামান যাবার সময় দেখেছিলাম আমাদের জাহাজ ঢেউ তুলে চলেছে আর আশেপাশের ছোট নৌকাগুলো সেই ঢেউয়ে নাকানিচোবানি খাচ্ছে। অংশুমান-জাহাজ বাড়ি থেকে রাস্তায় বেরোলে এখানকার পান্‌সে-নৌকো বাঙালী চেঞ্জারদের সেই রকম অবস্থা হয়—ছেলে-বুড়ো-মেয়ে-পুরুষ কেউ বাদ যায় না। মোটকথা এই একরত্তি শহরে এরকম ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি। ছোটমামা ছবি-টবি দেখেন না। শখ হল পামিস্ট্রির, তিনি বললেন, ‘ছেলেটার যশের রেখাটা একবার দেখে আসতে হচ্ছে। এ সুযোগ কলকাতায় আসবে না।’ মা-র অবিশ্যি ইচ্ছে অংশুমানকে একদিন ডেকে খাওয়ানোর। শর্মিকে বললেন, ‘হাঁরে, তোরা ত ফিলিমের ম্যাগাজিনে ওর বিষয় এত সব পড়িস-টড়িস—ও কী খেতে ভালোবাসে জানিস?’ শর্মি মুখস্থ আউড়ে গেল—‘কৈ মাছ, সরষে বাটা দিয়ে ইলিশ মাছ, কচি পাঠার ঝোল, তন্দুরি চিকেন, মসুরির ডাল, আমের মোরব্বা, ভাপা দই—তবে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে চাইনীজ।’ মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বাবা বললেন, ‘খেতে বলতে ত আপত্তি নেই। হয়ত বললে আসবেও, তবে সঙ্গের ওই মোসাহেবগুলো...’
ছেনিদা আমার খুড়তুতো ভাই। সে সাংবাদিক, খবরের কাগজের আপিসে কাজ করে, ছুটি প্রায় পায় না বললেই চলে। এবার এসেছে ঝিকুড়িতে সাঁওতালদের একটা পরব হয় এই সময়, সেই নিয়ে একটা ফীচার লিখতে। সে বলল এই ফাঁকে অংশুমানের সঙ্গে একটা সাক্ষাৎকারের সুযোগ তাকে নিতেই হবে। ‘লোকটা বছরে তিনশো সাতষট্টি দিন শুটিং করে; ছুটির মওকা কি করে পেল সেটাই ত একটা স্টোরি।’
একমাত্র ছোটদারই কোনো তাপ উত্তাপ নেই। ও প্রেসিডেন্সিতে পড়া ভয়ংকর সিরিয়াস ছেলে। ফিল্ম সোসাইটির মেম্বার, জার্মান সুইডিশ ফরাসী কিউবান ব্রেজিলিয়ান ছবি দেখে, বাংলা ছবি নিয়ে একটা কড়া থসিস লিখবে বলে ফাঁকে ফাঁকে পড়াশুনা করছে। অংশমানের বিনিদ্র রজনী’ ছবি টেলিভিশনে তিন মিনিট দেখে ‘ডিসগাসটিং’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। তাকে দেখে মনে হয় এবারের ছুটিটাই মাটি; ফিল্ম স্টার এসে এমন সুন্দর চেঞ্জের জায়গার আবহাওয়াটা নষ্টই করে দিয়েছে।
যারা চেঞ্জে আসে তারা ছাড়াও বাঙালী এখানে দু’চার জন আছে যাঁরা এখানেই থাকেন। তার মধ্যে গোপেনবাবু, একজন। একটা ছোট্ট বাড়ি করে আছেন এখানে বাইশ বছর, চাষের জমিও নাকি আছে কিছু। বয়স বোধ হয় বাবার চেয়ে বছর পাঁচেকের বেশি, রসিক মানুষ, উনি এলেই মনটা খুশি-খুশি হয়ে যায়।
আমরা পৌছানর দুদিন পরেই ভদ্রলোক সকালে এসে হাজির, খদ্দরের পাঞ্জাবীর সঙ্গে মালকোঁচা-মারা ধুতি, হাতে বাঁকানো লাঠি আর পায়ে ব্রাউন কেডস জুতো। বাংলোর বাইরে থেকেই হাঁক দিলেন ভদ্রলোক—‘চৌধুরী সাহেব আছেন নাকি?’
আমরা চা খাচ্ছিলাম, বাবা ভদ্রলোককে ডেকে এনে বসালেন আমাদের সঙ্গে।
‘ওরে বাবা, এ যে দেখছি এলাহি কারবার!’ বললেন ভদ্রলোক। ‘আমি কিন্তু শুধু এক কাপ চা।’
গতবারে ভদ্রলোকের চোখে ছানি ছিল, বললেন মার্চ মাসে কলকাতায় গিয়ে কাটিয়ে এসেছেন।—‘দিব্যি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি।’
‘এবার ত এখানে রমরমা ব্যাপার মশাই,’ বললেন বাবা।
‘কেন?’ ভদ্রলোকের ভুরু কুঁচকে গেছে।
বাবা বললেন, ‘সে কি মশাই, তারার হাট বসে গেছে এখানে, আর আপনি জানেন না?’
‘তার মানে আপনার দৃষ্টি এখনো ফরসা হয়নি,’ বললেন ছোটমামা, ‘এত বড় ফিল্ম স্টার এসে রয়েছে এখানে, শহরে হৈ হৈ পড়ে গেছে, আর আপনি সে খবর রাখেন না?’
‘ফিল্ম স্টার?’ গোপেনবাবুর ভুর, এখনো কুঁচকোন। ‘ফিল্ম স্টার নিয়ে’ এত মাতামাতি করার কী আছে মশাই? ফিল্ম স্টার মানে ত শুটিং স্টার। তারা ত শুটিং করে শুনেছি। শুটিং স্টার জান ত, সুমোহন?’ আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন গোপেনবাবু—‘আজকে আছে, কালকে নেই। ফস্‌ করে খসে পড়বে আকাশ থেকে আর বায়ুমণ্ডলে যেই প্রবেশ করল অমনি পুড়ে ছাই। তখন পাত্তাই পাওয়া যাবে না তার।’
ছোটদার একটা ছোট্ট চাপা কাশিতে বুঝলাম গোপেনবাবুর কথাটা তার মনে ধরেছে।
‘আসল স্টারের খবরটা তাহলে পৌঁছয়নি আপনাদের কাছে?’ গরম চায়ে চুমুক দিয়ে জিগ্যেস করলেন গোপেনবাবু।
‘আসল স্টার?’
প্রশ্নটা করলেন বাবা, কিন্তু সকলেরই দৃষ্টি গোপেনবাবুর দিকে, সকলেরই মনে এক প্রশ্ন।
‘গির্জার পিছনদিকে কলুটোলার চাটুজ্যেদের একটা বাগানওয়ালা একতলা বাড়ি আছে দেখেছেন ত? সেইখেনে এসে রয়েছেন ভদ্রলোক। নাম বোধ হয় কালিদাস বা কালীপ্রসাদ বা ওইরকম একটা কিছু। পদবী ঘোষাল।’
‘স্টার বলছেন কেন?’ বাবা জিগ্যেস করলেন।
‘বলব না?’ একেবারে পোল স্টার। স্টেডি। ইটারন্যাল। একশোর ওপর বয়স, কিন্তু দেখে বোঝার জো নেই।’
‘বলেন কি! সেঞ্চুরিয়ন?’ মামার হাঁয়ের মধ্যে চিবোন টোস্টের অনেকটা এখনো গেলা হয়নি।
‘সেঞ্চুরি প্লাস টোয়েনটি-সিক্স। একশো ছাব্বিশ বছর বয়স ভদ্রলোকের। জন্ম এইটিন-ফিফ্‌টিসিক্স। সিপাহী বিদ্রোহের ঠিক এক বছর আগে। রবীন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন এইটিন সিক্সটি-ওয়ান।’
আমাদের কথা বন্ধ, খাওয়া বন্ধ। গোপেনবাবু, আবার চুমুক দিলেন চায়ে।
প্রায় এক মিনিট কথা বন্ধের পর ছোটদা প্রশ্ন করল, ‘বয়সটা আপনি জানলেন কি করে? উনি নিজেই বলেছেন?’
‘নিজে কি আর যেচে বলেছেন? অতি অমায়িক ভদ্রলোক। নিজে বলার লোকই নন। কথায় কথায় বেরিয়ে পড়ল। দেখে মনে হবে আশি-বিরাশি। ওঁরই বাড়ির বারান্দায় বসে কথা হচ্ছিল। একবার পর্দার ফাঁক দিয়ে এক মহিলাকে দেখলুম, পাকা চুল, চোখে সোনার চশমা, পরনে লালপেড়ে শাড়ি। কথাচ্ছলে শুধোলুম—“আপনার গিন্নীর এখানকার ক্লাইমেট সুট করছে ত?” ভদ্রলোক স্মিতহাস্য করে বললেন, “গিন্নী নয়, নাতবৌ।” আমি ত থ। বললম, “কিছু, মনে করবেন না, কিন্তু আপনার বয়সটা—?” “কত মনে হয়?” জিগ্যেস করলেন ভদ্রলোক। বললুম, “দেখে ত মনে হয় আশি-টাশি।” আবার সেই মোলায়েম হাসি হেসে বললেন, “অ্যাড অ্যানাদার ফর্টি-সিক্স।” বুঝুন তাহলে। সোজা হিসেব।
এর পর ব্রেকফাস্টটা ঠিকমতো খাওয়া হল না। এমন খবরে খিদে মরে যায়। ভারতবর্ষের—না, শুধু ভারতবর্ষ কেন—খুব সম্ভবত সারা পৃথিবীর মধ্যে সব চেয়ে দীর্ঘায়ু লোক এখানে এসে রয়েছেন, আমরা যখন রয়েছি তখনই রয়েছেন, এটা ভাবতে মাথা ভোঁ ভোঁ করছে।
‘দেখে আসনে গিয়ে’, বললেন গোপেনবাবু। এমন খবর ত চেপে রাখা যায় না, তাই বললুম দু’চার জনকে—সুধীরবাবুদের, সেন সাহেবকে, বালিগঞ্জ পার্কের মিঃ নেওটিয়াকে। সবাই গিয়ে দর্শন করে এসেছেন। আর দুটো দিন যাক না, দেখুন কী হয়। আসল স্টারের অ্যাট্রাকশনটা কোথায় সেটা বুঝতে পারবেন।’
‘লোকটির স্বাস্থ্য কেমন?’ মামা জিগ্যেস করলেন।
‘সকাল বিকেল ডেইলি দুমাইল।’
‘হাঁটেন!’
‘হাঁটেন। লাঠি একটা নেন হাতে। তবে সে ত আমিও নিই। ভেবে দেখুন, আমার দ্বিগুণ বয়স!’
‘ভদ্রলোকের আয়ুরেখাটা...’
মামার ওয়ান-ট্র্যাক মাইল্ড।
‘দেখবেন হাত’, বললেন গোপেনবাবু, ‘বললেই দেখাবেন।’
ছেনিদা এতক্ষণ চুপচাপ ছিল, হঠাৎ টেবিল ছেড়ে উঠে পড়ল।—‘স্টোরি। এর চেয়ে ভালো স্টোরি হয় না। এ একেবারে স্কূপ।‘
‘তুই কি এখনই যাবি নাকি?’ প্রশ্ন করলেন বাবা।
‘একশো-ছাব্বিশ বয়স’, বলল ছেনিদা। ‘এরা কিভাবে মরে জান ত? এই আছে, এই নেই। ব্যারাম-ট্যারামের দরকার হয় না। সুতরাং সাক্ষাৎকার যদি নিতে হয় ত এই বেলা। পরে দর্শনের হিড়িক পড়ে গেলে আর চান্স পাবো?’
‘বোস্‌!’ বাবা একটু ধমকের সুরেই বললেন। ‘সবাই একসঙ্গে যাব। তোর ত একার প্রশ্ন নেই, আমাদের সকলেরই আছে। খাতা নিয়ে যাস, নোট করে নিবি।’
‘বোগাস।’
কথাটা বলল ছোটদা। আর বলেই আবার দ্বিতীয়বার জোরের সঙ্গে বলল, ‘বোগাস! ধাপা। গুল।’
‘মানে?’ গোপেনবাবুর মোটেই পছন্দ হয়নি কথাগুলো। ‘দ্যাখো সুরঞ্জন, শেকসপীয়র পড়েছ ত? দেয়ার আর মোর থিংস ইন হেভ্‌ন অ্যাণ্ড আর্থ জানা আছে ত? সব ব্যাপার বোগাস বলে উড়িয়ে দিলে চলে না।’
ছোটদা গলা খাক্‌রে নিল।
‘আপনাকে একটা কথা বলছি গোপেনবাবু—আজকাল প্রমাণ হয়ে গেছে যে যারা একশো বছরের বেশি বয়স বলে ক্লেম করে তারা হয় মিথ্যেবাদী না হয় জংলী ভূত। রাশিয়ার হাই অলটিচিউডে একটা গ্রামে শোনা গিয়েছিল মেজরিটি নাকি একশোর বেশি বয়স, আর তারা এখনো ঘোড়া-টোড়া চড়ে। এই নিয়ে ইনভেসটিগেশন হয়। দেখা যায় এরা সব একেবারে প্রিমিটিভ। তাদের জন্মের কোনো রেকর্ডই নেই। পুরোন কথা জিগ্যেস করলে সব উলটো পালটা জবাব দেয়। নব্বুই-এর গাঁট পেরোন চাট্টিখানি কথা নয়। লঞ্জিভিটির একটা লিমিট আছে। নেচার মানুষকে সেই ভাবেই তৈরি করেছে। বার্নার্ড শ’. বার্ট্রাণ্ড রাসেল. পি জি. উডহাউস—কেউ পৌঁছতে পারেননি একশো। যদুনাথ সরকার পারেননি। সেঞ্চুরি কি মুখের কথা? আর ইনি বলছেন একশো-ছাব্বিশ।হুঁঃ!’
‘জোরো আগার নাম শুনেছিস?’ খেঁকিয়ে প্রশ্ন করলেন মামা।
‘না। কে জোরো আগা?’
‘তুর্কীর লোক। কিম্বা ইরানের। ঠিক মনে নেই। থার্টি ফোর-থার্টি ফাইভের কথা। একশো চৌষট্টি বছরে মারা যায়। সারা বিশ্বের কাগজে বেরিয়েছিল মত্যু-সংবাদ।’
‘বোগাস।’
ছোটদা মুখে যাই বলুক, কালী ঘোষালের বাড়ি যখন গেলাম আমরা, সে বোধ হয় অবিশ্বাসটাকে আরো পাকা করার জন্যই আমাদের সঙ্গে গেল। গোপেনবাবুই নিয়ে গেলেন। বাবা বললেন, ‘আপনি আলাপটা করিয়ে দিলে অনেক সহজ হবে। চেনা নেই শোনা নেই, কেবল একশো ছাব্বিশ বয়স বলে দেখা করতে যাচ্ছি, এটা যেন কেমন কেমন লাগে।’ ছেনিদা অবিশ্যি সঙ্গে নোটবুক আর দুটো ডট পেন নিয়েছে। মা বললেন, ‘আজ তোমরা আলাপটা সেরে এস। আমি এর পর দিন যাব।’
কালী ঘোষালের বাড়ির সামনের বারান্দায় বেতের চেয়ার, কাঠের চেয়ার, মোড়া আর টুলের বহর দেখে বুঝলাম সেখানে রেগুলার লোকজন আসতে শুরু করেছে। ব্রেকফাস্টের ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই বেরিয়ে পড়েছিলাম আমরা, কারণ গোপেনবাবু বললেন ওটাই বেস্ট টাইম। গোপেনবাবুর ‘ঘোষাল সাহেব বাড়ি আছেন?’ হাঁকের মিনিট খানেকের মধ্যেই ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। মন খালি বলছে একশো ছাব্বিশ—একশো ছাব্বিশ—একশো ছাব্বিশ—অথচ চেহারা দেখলে সত্যিই আশির বেশি মনে হয় না। ফরসা রং, বাঁ গালে একটা বেশ বড় আঁচিল, টিকোলো নাক, চোখে পরিষ্কার চাহনী, কানের দুপাশে দগোছা পাকা চুল ছাড়া বাকি মাথায় চক্‌চকে টাক। এককালে দেখতে বোধহয় ভালোই ছিলেন, যদিও হাইট পাঁচ ফুট ছয়-সাতের বেশি নয়। গায়ে সিল্কের পাঞ্জাবী, পাজামা, কট্‌কি চাদর, পায়ে সাদা কট্‌কি চটি। চামড়া যদি কুঁচকে থাকে ত চোখের দুপাশে আর থুতনির নিচে।
আলাপের ব্যাপারটা সারা হলে ভদ্রলোক আমাদের বসতে বললেন। ছোটদা থামের পাশে দাঁড়িয়ে থাকার মতলব করেছিল বোধহয়, বাবা ‘রঞ্জু, বোস্‌ না’ বলতে একটা টুলে বসে পড়ল। সে এখনো গম্ভীর।
‘এভাবে আপনার বাড়ি চড়াও করাতে ভারী লজ্জিত বোধ করছি আমরা’, বললেন বাবা, ‘তবে বুঝতেই পারছেন, আপনার মতো এমন দীর্ঘজীবী মানুষ ত দেখার সৌভাগ্য হয়নি, তাই...’
ভদ্রলোক হেসে হাত তুলে বাবাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘অ্যাপোলোজাইজ করার কোনো প্রয়োজন নেই। একবার যখন বয়সটা বেরিয়ে পড়েছে, তখন লোকে আসবে সেটা ত স্বাভাবিক। বয়সটাই যে আমার বিশেষত্ব, ওটাই একমাত্র ডিস্টিংশন—সেটা কি আর বুঝি না? আর আপনারা এলেন কষ্ট করে, আপনাদের সাথে আলাপ হল, এ ত আনন্দের কথা।’
‘তাহলে একটা কথা বলেই ফেলি’, বললেন বাবা। ‘একটা অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন। আমার এই ভাইপোটি নাম শ্রীকান্ত চৌধুরী, হল সাংবাদিক। এর খুব শখ আপনার সঙ্গে যে কথাবার্তা হয় সেটা ওর কাগজে ছাপায়। অবিশ্যি যদি আপনার আপত্তি না থাকে।’


বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

নির্বাচিত গল্প - ওয়াসি আহমেদ

amarboi
নির্বাচিত গল্প - ওয়াসি আহমেদ
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

বক ও বাঁশফুল - ওয়াসি আহমেদ

amarboi
বক ও বাঁশফুল - ওয়াসি আহমেদ
সাম্প্রতিক সময়ের বাংলা গল্পের অন্যতম কণ্ঠস্বর ওয়াসি আহমেদ। তাঁর গল্প সবসময় আমাদের সামনে গল্পের চেয়েও বেশি কিছু নিয়ে হাজির হয়। যা গল্পের সাধারণ বাস্তবতাকে অতিক্রম করে আরো বিশেষ কিছুকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করে। তাঁর সেসব গল্প দৈনন্দিন জীবনের সত্যকে গল্পের আকারে তুলে আনে তো বটেই কিন্তু কিছুটা বাঁকাভাবে এবং অতি অবশ্যই নিজস্ব বয়ানে। সেই ধারাবাহিকতায় তাঁর গল্পের ভাণ্ডারে আরেকটি সংযোজন ‘বক ও বাঁশফুল’ নামক গল্পগ্রন্থটি। যথারীতি এখানেও ওয়াসি আহমেদ গল্পের সত্যকে ধরতে চেয়েছেন নিজস্ব ঢঙে। যা রহস্যময়তা এবং বৈচিত্র্যে ভরা।ভাষা এবং বিষয়ের আবর্তে যে ঘোর এই কথাসাহিত্যিক নির্মাণ করেন তার রেশ রয়ে যায় অনেকদিন পর্যন্ত। এই বইয়ের প্রতিটি গল্প যেন ভিন্ন-ভিন্ন বাস্তবতায় একটা সমধর্মীয় ঐন্দ্রজালিক সুরে আবদ্ধ। বইয়ের নামগল্পটি যেটি আবার বইয়ের সূচনাগল্পও বটে, সেখানেই পাওয়া যায় সে রহস্যময় মায়ার সন্ধান। এই মায়া কেবল বিষয়বস্তুর মায়া নয়, যেখানে একজন মন্তাজের সামনে বাঁশঝাড়ের আদলে হাজির হয় তার অতীত। সে অতীত থেকে তাকে বাঁচানোর লড়াইয়ে তার সঙ্গী হয় একদল বক। তারাও চালিয়ে যায় নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আর এই বিষয়কে আরো বেশি নান্দনিক করে তোলে ওয়াসি আহমেদের মায়াময় ভাষা এবং নিজস্ব বয়ান ভঙ্গি। নামগল্পটা শুরু হয় এভাবে, ‘সূর্য ডোবার আগে আগে বকের ঝাঁক ফিরে আসতে বাঁশঝাড়ের কুঁজো মাথাগুলো ফকফকে সাদা।’ ওয়াসি আহমেদের ভাষাভঙ্গি এই গল্পে অনেক ক্ষেত্রে কবিতার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ায়। তবে তা অবশ্যই কবিতা নয়।তাঁর গল্প আমাদের সামনে গল্পকেই হাজির করে। ‘আলী দোস্ত বৃত্তান্ত’ নামক গল্পে ঐতিহাসিকতার আড়ালে আমাদের সামনে এক মানবিক গল্পই বলেছেন লেখক। আরেক গল্প ‘মুগ্ধতার কারসাজি’ মূলত দুই রিটায়ার্ড অধ্যাপক দম্পতি মনজুর হাসান এবং শাহানা
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

শৈত্যপ্রবাহ - ওয়াসি আহমেদ

amarboi
শৈত্যপ্রবাহ - ওয়াসি আহমেদ
‘শৈত্যপ্রবাহ’ কথাসাহিত্যিক ওয়াসি আহমেদের গল্পসংকলন। গ্রন্থটিতে মোট আটটি গল্প সংকলিত হয়েছে। প্রথম গল্প ‘ছয় মিটার দূরত্ব’-এ মানুষের অন্তর্নিহিত বোধ ও স্বপ্ন-কল্পনা এবং এই ব্যস্ত সময়ের দ্বান্দ্বিকতা পরম নিষ্ঠায় তুলে ধরেছেন গল্পকার। প্রতিটি মানুষের ভেতরে একটি হননেচ্ছা বিরাজ করে। কারও ভেতর তা প্রকাশ্য হয়, কারও অপ্রকাশ্য; কিন্তু মনের অবচেতনে, স্বপ্নের মায়াজালে সেই ইচ্ছা পাখা মেলে। নিজেকে শেষ করার প্রবল স্পৃহায় পীড়িত হয় মানুষ। গ্রন্থের শিরোনামীয় গল্প ‘শৈত্যপ্রবাহ’-এ আছে একজন অফিস কেরানীর কর্মজীবন শেষের কথা। আহমদ হোসেন সারাজীবন এক অফিসে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করলেও কখনো কাক্সিক্ষত মূল্যায়ন পাননি। কিন্তু কর্মজীবন শেষে অফিস যখন তাকে ঘটা করে বিদায় জানাচ্ছিল তখন তিনি এক নিদারুণ অস্থিরতায় ভুগতে থাকেন। এতদিনের সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতনদের সুকথাগুলো তার কানে ঢুকলেও মনের মধ্যে বেজে উঠছিল অন্তিমের সুর। তিনি তার অতীত দিনের ভালো কাজের মন্দ কাজের হিসাব মেলাতে মেলাতে একসময় জীবন থেকেই যেন ছুটি নিয়ে নিলেন। আবার ‘অভয়ারণ্যে’ পাওয়া যায় এক আইনের লোকের কথা। যে বাইরে থেকে দেখতে কঠিন, কিন্তু ভেতরটা জলের মতো নরম। কর্তব্যের জন্য তাকে অনেক জঘন্যতম কাজ করতে হয়। কিন্তু এই লোকটিই আবার উপন্যাস পড়ে অঝোরধারায় কাঁদে। যাদেরকে সে কর্তব্যের খাতিরে মারধর করেছে, কষ্ট দিয়েছে, তারাই কেউ কেউ তার স্বপ্নে ফিরে এসে তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। তার সেই ‘অদ্ভুত’ আচরণের কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পান না স্ত্রী। আদতে প্রত্যেকের ভেতরেই যে একজন মানবিক মানুষ বাস করেন এ গল্পে তা ফুটে ওঠে। গ্রন্থটির অন্যান্য গল্পেও ছড়িয়ে আছে শহর-গ্রামের সহজ-সরল মানুষের দুঃখ-বঞ্চনা, হাসি-আনন্দের ছবি।
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

চাঁদা মামার দেশে - গিরীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

amarboi
চাঁদা মামার দেশে - গিরীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

গদ্যপরম্পরা - সঙ্কলক ফাদার দ্যতিয়েন

amarboi
গদ্যপরম্পরা - সঙ্কলক ফাদার দ্যতিয়েন
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

প্র না বি-র নিকৃষ্ট গল্প

amarboi
প্র না বি-র নিকৃষ্ট গল্প (প্রমথনাথ বিশীর গল্প)
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সমগ্র গল্প - হর্হে লুইস বর্হেস

amarboi
সমগ্র গল্প - হর্হে লুইস বর্হেস
বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক! সাধ্যের মধ্যে থাকলে বইটি কিনবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com