সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label হুমায়ূন আহমেদ. Show all posts
Showing posts with label হুমায়ূন আহমেদ. Show all posts

হিমু - হুমায়ূন আহমেদ (বাংলা ইপাব)

amarboi হিমু - হুমায়ূন আহমেদ

হিমু আমার প্রিয় চরিত্রের একটি। যখন হিমুকে নিয়ে কিছু লিখি-- নিজেকে হিমু মনে হয়, একধরনের ঘোর অনুভব করি। এই ব্যাপারটা অন্য কোন লেখার সময় তেমন ঘটে না। হিমুকে নিয়ে আমার প্রথম লেখা ময়ুরাক্ষি। ময়ুরাক্ষি লেখার সময় ব্যাপারটা প্রথম লক্ষ করি। দ্বিতীয়বারে লিখলাম রজার ওপাশে। তখনো একই ব্যাপার। কেন এরকম হয়? মানুষ হিসেবে আমি যুক্তিবাদী। হিমু যুক্তিহীন, রহস্যময় জগৎ একজন যুক্তিবাদীকে কেন আকর্ষণ করবে? আমার জানা নেই। যদি কখনও জানতে পারি-- পাঠকদের জানাব।

হুমায়ূন আহমেদ
এলিফেন্ট রোড
Created By : Sisir Suvro

Download : | ePUB | | Mobi | | PDF |
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

রূপা - হুমায়ূন আহমেদ

image
ভাই, আপনি কি একটা ইন্টারেস্টিং গল্প শুনতে চান?
আমি ভদ্রলোকের দিকে অবাক হয়ে তাকালাম। কিছুক্ষণ আগে তার সঙ্গে আলাপ হয়েছে— তাও এমন কোনো আলাপ না । আমি ট্রেনের জন্যে অপেক্ষা করছি কি-না জানতে চাইলেন। আমি বললাম, হ্যা, এবং ভদ্রতা করে জানতে চাইলাম, আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’
ভদ্রলোক হাসিমুখে বললেন, ‘আমি কোথাও যাচ্ছি না। আমি আমার স্ত্রীকে রিসিভ করতে এসেছি। ও চিটাগাং থেকে আসছে। ট্রেন দু’ঘণ্টা লেট। ফিরে তার সঙ্গে এইটুকুই আমার আলাপ | এই আলাপের সূত্র ধরে কেউ যখন বলে, ভাই আপনি কি একটা ইন্টারেস্টিং গল্প শুনতে চান, তখন খানিকটা হলেও বিস্মিত হতে হয়। অপরিচিত লোকের কাছ থেকে গল্প শোনার আগ্রহ আমার কম । তা ছাড়া আমি আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় লক্ষ করেছি— ইন্টারেস্টিং গল্প বলে যে গল্প শুরু হয় সে গল্প কখনোই ইন্টারেস্টিং হয় না।
আমি কিছু না বলে চুপ করে রইলাম। ভদ্রলোক বুদ্ধিমান হলে আমার চুপ করে থাকার অর্থ বুঝতে পারবেন। বুদ্ধিমান না হলে এই গল্প আমার শুনতেই হবে |
দেখা গেল ভদ্রলোক মোটেই বুদ্ধিমান নন। পকেট থেকে পানের কৌটা বের করে পান সাজাতে সাজাতে গল্প শুরু করলেন—
‘আপনি নিশ্চয়ই খুব বিরক্ত হয়ে আমার কথা শুনছেন। নিতান্তই অপরিচিত একজন মানুষ হড়বড় করে গল্প বলা শুরু করেছে, বিরক্ত হবারই কথা। কিন্তু সমস্যাটি কি জানেন? আজ আমার জন্যে বিশেষ দিন। এই বিশেষ দিনে আমার মজার গল্পটা কাউকে না কাউকে বলতে ইচ্ছা করে। যদি অনুমতি দেন — গল্পটা বলি।’
‘বলুন।’
'আপনি কি পান খান?”
'জি-না।"
একটা খেয়ে দেখুন, মিষ্টি পান। খারাপ লাগবে না।’
'আপনি কি বিশেষ দিনে গল্পের সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে পানও খাওয়ান?"
ভদ্রলোক হেসে ফেললেন। আন্তরিক ভঙ্গিতেই হাসলেন। ভদ্রলোকের বয়স চল্লিশের মতো হবে। অত্যন্ত সুপুরুষ। ধবধবে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবিতে তাকে চমৎকার মানিয়েছে। মনে হচ্ছে তিনি স্ত্রীর জন্যে খুব সেজেগুজেই এসেছেন।
প্রায় কুড়ি বছর আগের কথা। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স করছি— পদার্থবিদ্যায়। এখানে অন্ধকার বলে আপনি সম্ভবত আমাকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন না। আলো থাকলে বুঝতেন আমি বেশ সুপুরুষ। কুড়ি বছর আগে দেখতে রাজপুত্রের মতো ছিলাম। ছাত্রমহলে আমার নাম ছিল— ‘দ্যা প্রিন্স। মজার ব্যাপার হচ্ছে, মেয়েমহলে আমার কোনো পাত্তা ছিল না। আপনি ব্যাপারটা লক্ষ করেছেন কি-না জানি না— পুরুষদের রূপের প্রতি মেয়েরা কখনো আকৃষ্ট হয় না। পুরুষদের সবকিছুই তাদের চোখে পড়ে— রূপ চোখে পড়ে না। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে কোনো মেয়ে আমার সঙ্গে ভাব করার জন্যে কিংবা কথা বলার জন্যে এগিয়ে আসেনি। আমিও নিজ থেকে এগিয়ে যাইনি। কারণ, আমার তোতলামি আছে। কথা আটকে যায়।’
আমি ভদ্রলোককে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘আমি তো কোনো তোতলামি দেখছি না। আপনি চমৎকার কথা বলে যাচ্ছেন।"
'বিয়ের পর আমার তোতলামি সেরে যায়। বিয়ের আগে প্রচণ্ড রকম ছিল। অনেক চিকিৎসা করেছি– মারবেল মুখে নিয়ে কথা বলা থেকে শুরু করে হোমিওপ্যাথি অষুধ, পীর সাহেবের তাবিজ কিছুই বাদ দেইনি। যাই হোক— গল্পে ফিরে যাই, আমার সাবসিডিয়ারি ছিল ম্যাথ এবং কেমিস্ট্রি। কেমিস্ট্রি সাবসিডিয়ারিতে একটি মেয়েকে দেখে আমার প্রায় দম বন্ধ হয়ে যাবার মতো অবস্থা হলো। কী মিষ্টি চেহারা! দীর্ঘ পল্লব, ছায়াময় চোখ। সেই চোখ সব সময় হাসছে। ভাই, আপনি কি কখনো প্রেমে পড়েছেন?
'জি-না।"
‘প্রেমে না পড়লে আমার সেই সময়কার মানসিকতা আপনাকে বুঝাতে পারব না। আমি প্রথম দিন মেয়েটিকে দেখেই পুরোপুরি অসুস্থ হয়ে পড়লাম। সারারাত ঘুম হলো না। প্রচণ্ড পানির পিপাসায় একটু পরপর গলা শুকিয়ে যায়। পানি খাই আর মহসিন হলের বারান্দায় হাটাহাটি করি।
সপ্তাহে আমাদের দু'টা মাত্র সাবসিডিয়ারি ক্লাস। রাগে-দুঃখে আমার কাদতে ইচ্ছা করে। প্রতিদিন একটা করে সাবসিডিয়ারি ক্লাস থাকলে কী ক্ষতি হতো? সপ্তাহের দু'টা ক্লাস মানে পঞ্চাশ মিনিট করে একশ' মিনিট । এই একশ' মিনিট চোখের পলকে শেষ হয়ে যায়। তা ছাড়া মেয়েটা খুব ক্লাস ফাকি দেয়। এমনও হয়েছে সে পরপর দু'সপ্তাহ কোনো ক্লাস করল না। তখন আমার ইচ্ছা করতো লাফ দিয়ে মহসিন হলের ছাদ থেকে নিচে পড়ে সমস্ত জ্বালা-যন্ত্রণার অবসান ঘটাই। সে যে কী ভয়াবহ কষ্ট আপনি বুঝবেন না! কারণ, আপনি কখনো প্রেমে পড়েননি।’
‘মেয়েটার নাম তো বললেন না, তার নাম কী?
"তার নাম রূপা । সেই সময় আমি অবিশ্যি তার নাম জানতাম না। নাম কেন— কিছুই জানতাম না। কোন ডিপার্টমেন্টের ছাত্রী তাও জানতাম না। শুধু জানতাম তার সাবসিডিয়ারিতে কেমিস্ট্রি আছে এবং সে কালো রঙের একটা মরিস মাইনর গাড়িতে করে আসে। গাড়ির নাম্বার— ভ৮৭৮১ '
'আপনি তার সম্পর্কে কোনো রকম খোজ নেননি?’ না। খোজ নেইনি। কারণ, আমার সব সময় ভয় হতো খোজ নিতে গেলেই জানক— মেয়েটির হয়তো বা কারো সঙ্গে ভাব আছে। একদিনের একটা ঘটনা বললেই আপনি বুঝতে পারবেন— সাবসিডিয়ারি ক্লাসের শেষে আমি হঠাৎ লক্ষ করলাম মেয়েটা হেসে হেসে একটা ছেলের সঙ্গে গল্প করছে। আমার সমস্ত শরীর কাপতে লাগল। মনে হলো আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। সব ক্লাস বাদ দিয়ে হলে চলে এলাম এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সমস্ত শরীর কাপিয়ে আমার জ্বর এসে গেল।”
'আশ্চর্য তো!"
'আশ্চর্য তো বটেই। পুরো দু’বছর আমার এইভাবেই কাটলো। পড়াশোনা মাথায় উঠল। তারপর একদিন অসীম সাহসের কাজ করে ফেললাম। মরিস মাইনর গাড়ির ড্রাইভারের কাছ থেকে বাড়ির ঠিকানা জেনে নিলাম। তারপর মেয়েটিকে সম্বোধনহীন একটা চিঠি লিখলাম। কী লিখেছিলাম এখন আর মনে নেই। তবে চিঠির বিষয়বস্তু হচ্ছে— আমি তাকে বিয়ে করতে চাই। তাকে রাজি হতেই হবে। রাজি না হওয়া পর্যন্ত আমি তাদের বাড়ির সামনে না খেয়ে পড়ে থাকব । যাকে পত্রিকার ভাষায় বলে “আমরণ অনশন।" গল্পটা কি আপনার কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে?"
হ্যা হচ্ছে। তারপর কী হলো বলুন। চিঠি ডাকে পাঠিয়ে দিলেন?
না। নিজেই হাতে করে নিয়ে গেলাম। ওদের বাড়ির দারোয়ানের হাতে দিয়ে বললাম, এ বাড়ির একজন আপা আছেন-না ইউনিভার্সিটিতে পড়েন— তার হাতে দিয়ে এসো। দারোয়ান লক্ষ্মীছেলের মতো চিঠি নিয়ে চলে গেল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এসে বলল, আপা বলেছেন তিনি আপনেরে চিনেন না। আমি বললাম, তিনি ঠিকই বলেছেন, তবে আমি তাকে চিনি। এটাই যথেষ্ট ।
এই বলে আমি গেটের বাইরে খুঁটি গেড়ে দাড়িয়ে গেলাম। বুঝতেই পারছেন— নিতান্তই পাগলের কাণ্ড । সেই সময় মাথা আসলেই বেঠিক ছিল।
লজিক নষ্ট হয় গিয়েছিল। যাই হোক, সকাল ন’টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত কোনো রকম ঘটনা ছাড়াই গেটের সামেন দাড়িয়ে রইলাম। লক্ষ করলাম দোতলার জানালা থেকে মাঝে-মধ্যে কিছু কৌতুহলী চোখ আমাকে দেখছে। বিকেল চারটায় এক ভদ্রলোক বাড়ি থেকে বের হয়ে কঠিন গলায় বললেন, যথেষ্ট পাগলামি করা হয়েছে। এখন বাড়ি যাও।”
আমি তার চেয়েও কঠিন গলায় বললাম, যাবো না।"
পুলিশে খবর দিচ্ছি। পুলিশ এসে তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে।'
কোনো অসুবিধা নেই খবর দিন।'
‘ইউ রাস্কেল মাতলামি করার জায়গা পাও না?"
‘গালাগালি করছেন কেন? আমি তো আপনাকে গালি দিচ্ছি না।’
ভদ্রলোক রাগে জুলতে জুলতে বাড়ির ভেতর চলে গেলেন। তার পরপরই শুরু হলো বৃষ্টি। ঢালাও বর্ষণ। আমি ভিজছি নির্বিকার ভঙ্গিতে। সঙ্গে সঙ্গে বুঝছি যে জুর এসে যাচ্ছে। সারা দিন রোদে পোড়ার পর এই ঠাণ্ডা বৃষ্টি সহ্য হবে না। তখন একটা বেপরোয়া ভাব চলে এসেছে— যা হবার হবে। ক্ষুধায়, ক্লান্তিতে শরীর অবসন্ন। মাঝে মাঝেই মনে হচ্ছে এই বুঝি মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম।
ইতিমধ্যে আমি আশপাশের মানুষদের কৌতুহলী দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছি। বেশ কয়েকজন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে? এখানে দাড়িয়ে দাড়িয়ে ভিজছেন কেন? আমি তাদের সবাইকে বলেছি, আমাকে নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। আমি একজন পাগল-মানুষ।
মেয়েটির বাড়ি থেকেও হয়তো টেলিফোনে এই বিচিত্র ঘটনার কথা কাউকে কাউকে জানানো হয়েছে। তিনটি গাড়ি তাদের বাড়িতে এলো। গাড়ির আরোহীরা রাগী ভঙ্গিতে আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকলেন।
রাত নটা বাজলো। বৃষ্টি এক মুহুর্তের জন্যে থামল না। জ্বরে তখন আমার গা পুড়ে যাচ্ছে। দাড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না। পা ছড়িয়ে বসে পড়লাম। দারোয়ান এসে আমাকে ফিসফিস্ করে বলল, সাহেব পুলিশ আনতে চাইতেছে, বড় আফা রাজি না। বড় আফা আপনের অবস্থা দেইখ্যা খুব কানতাছে। টাইট হইয়া বইয়া থাকেন।
আমি টাইট হয় বসে রইলাম।
রাত এগারোটা বাজলো। ওদের বাড়ির বারান্দায় বাতি জ্বলে উঠল। বসার ঘরের দরজা খুলে মেয়েটি বের হয়ে এলো। মেয়েটির পেছনে পেছনে ওদের বাড়ির সব ক'জন মানুষ। ওরা কেউ বারান্দা থেকে নামল না। মেয়েটি একা এগিয়ে এলো। আমার সামনে এসে দাড়াল এবং অসম্ভব কোমল গলায় বলল, কেন এমন পাগলামি করছেন?
আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলাম। কারণ, এই মেয়ে সেই মেয়ে নয়। অন্য একটি মেয়ে। একে আমি কোনোদিন দেখিনি। মরিস মাইনর গাড়ির ড্রাইভার আমাকে ভুল ঠিকানা দিয়েছে। হয়তো ইচ্ছা করেই দিয়েছে।
মেয়েটি নরম গলায় বলল, আসুন, ভেতরে আসুন। টেবিলে খাবার দেয়া হয়েছে। আসুন তো।
আমি উঠে দাড়ালাম। বলতে চেষ্টা করলাম, কিছু মনে করবেন না। আমার ভুল হয়ে গেছে। আপনি সেই মেয়ে নন। আপনি অন্য একজন। মেয়েটির মমতায় ডুবানো চোখের দিকে তাকিয়ে এই কথা বলা সম্ভব হলো না। এত মমতা নিয়ে কোনো নারী আমার দিকে তাকায়নি।
জ্বরের ঘোরে আমি ঠিকমতো পা ফেলতে পারছিলাম না। মেয়েটি বলল, আপনার বোধহয় শরীর খারাপ। আপনি আমার হাত ধরে হাটুন। কোনো অসুবিধা নেই।
বাসার সবাই বারান্দায় দাড়িয়ে কঠিন চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের সবার কঠিন দৃষ্টি উপক্ষো করে মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দিলো। যে গভীর ভালোবাসায় হাত বাড়ালো সে ভালোবাসাকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা ঈশ্বর মানুষকে দেননি। আমি তার হাত ধরলাম। এই কুড়ি বছর ধরেই ধরে আছি। মাঝে মাঝে এক ধরনের অস্থিরতা বোধ করি। ভ্রান্তির এই গল্প আমার স্ত্রীকে বলতে ইচ্ছা করে। বলতে পারি না। তখন আপনার মতো অপরিচিত একজন কাউকে খুঁজে বের করি। গল্পটা বলি। কারণ, আমি জানি– এই গল্প কোনোদিন আমার স্ত্রীর কানে পৌছাবে না। আচ্ছা ভাই, উঠি। আমার ট্রেন এসে গেল।’
ভদ্রলোক উঠে দাড়ালেন। দূরে ট্রেনের আলো দেখা যাচ্ছে। রেললাইনে ঘড়ঘড় শব্দ উঠছে। ট্রেন সত্যি সত্যি এসে গেল।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ - হুমায়ূন আহমেদ

amarboi.com



পূর্ণেন্দু পত্রীর একটি কবিতার শিরোনাম— ‘ক্রেমলিনের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ’। আমি যেখানে আছি, সেই রেস্টহাউসের জানালা দিয়ে তাকিয়ে পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতার লাইন মনে এল। ঝকঝক করছে রোদ। আকাশ ঘন নীল। জানালার পাশে অচেনা এক বৃক্ষের পাতায়ও রোদের রং লেগেছে। রোদ আমাকে কখনো অভিভূত করে না, আমি বৃষ্টিরাশির জাতক, কিন্তু আজ আকর্ষণ করল। আমি অভিভূত গলায় উচ্চারণ করলাম, নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ!
আমি ঘরে একা। পাশের ঘরে এস আই টুটুল বন্ধুবান্ধব নিয়ে এসেছে। তার সঙ্গে গিটার। সে ঘোষণা করেছে, আজ সারা রাত সে আমার লেখা গান গেয়ে শোনাবে। আমি বললাম, কেন?
সে বলল, আপনাকে আনন্দ দেওয়ার জন্য।
আমি বললাম, গান ছাড়াই ভালো আছি। আমাকে একা থাকতে দিলেই অনেক আনন্দে থাকব।
টুটুল গত কিছুদিন ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে ডলার কামাচ্ছে। সব অনুষ্ঠানের শেষের গান নাকি হুমায়ূন আহমেদের লেখা ‘চান্দিপসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়’। সংগত কারণেই এই গানের পর শ্রোতারা খানিকটা বিচলিত হন। শ্রোতাদের এই বিচলিত অবস্থা টুটুল উপভোগ করে। আমি সুস্থ হয়ে দেশে ফিরলে টুটুল মনে হয় খানিকটা বেকায়দা অবস্থায় পড়বে। সে সবাইকে ধারণা দিয়ে দিয়েছে, নিউইয়র্কযাত্রা আমার অগস্ত্যযাত্রা।
আমার স্বভাব হচ্ছে, যেকোনো অবস্থায় যেকোনো বিষয় নিয়ে রসিকতা করা। মৃত্যু নিয়ে ক্রমাগত রসিকতা করে যাচ্ছি। এই রসিকতা কেউ সহজভাবে নিতে পারছে না।
রসিকতার নমুনা দেওয়া যেতে পারে। আমাকে বিদায় জানানোর জন্য সবাই উপস্থিত হয়েছে। চেহারা করুণ করার আপ্রাণ চেষ্টা সবার। একপর্যায়ে আমি বললাম, ভালো খাবারের ব্যবস্থা আছে, সবাই খেয়ে যাবেন। এটা আমার কুলখানির খাবার। নিজের কুলখানির খাবার নিজে উপস্থিত থেকে খাওয়ানো একটা ভাগ্যের ব্যাপার। আমি ভাগ্যবান। ক্যামেরাম্যান মাহফুজুর রহমান খান বিদায় জানাতে এসেছেন। তাঁকে বললাম, আপনার মৃত বাবার কাছে কোনো খবর পৌঁছাতে হলে আমাকে দিতে পারেন। আমি খবর দিয়ে দেব।
নিউইয়র্কে পৌঁছালাম বিকেলে। এম্বেসি থেকে আমাকে রিসিভ করতে এসেছে দেখে চমকালাম। ‘এম্বেসি মণিহার’ আমার নাহি সাজে। মুক্তধারার বিশ্বজিৎ গাড়ি নিয়ে এসেছে। নুহাশের মায়ের মামাতো বোন (জলি) থাকেন নিউইয়র্কে; তিনিও গাড়ি নিয়ে এসেছেন। আমি পড়লাম মহাবিপদে। কোন গাড়িতে চড়ব? এম্বেসি? বিশ্বজিৎ, না জলি?
আমার চিকিৎসা শুরু হবে মেমোরিয়েল স্লোয়ান কেটারিং ক্যানসার সেন্টারে। এটি নাকি পৃথিবীর এক নম্বর ক্যানসার গবেষণা ও চিকিৎসাকেন্দ্র। স্লোয়ান ও কেটারিং নামের দুই ইঞ্জিনিয়ার তাঁদের জীবনের সব সঞ্চয় দান করে এই হাসপাতাল তৈরি করেছেন। পৃথিবীর ক্যানসার রোগীদের নজর এই হাসপাতালের দিকে বলেই তিন-চার সপ্তাহের আগে ডাক্তারের কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়াই সম্ভব না।
আশ্চর্যের ব্যাপার, নিউইয়র্কে যেদিন পৌঁছালাম তার পরদিনই ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া গেল। ব্যবস্থা করলেন গল্পকার জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের স্ত্রী পূরবী দত্ত। তিনি নিজেও গল্পকার; একসময় এই ক্যানসার সেন্টারে গবেষক হিসেবে কাজ করতেন। কেন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ হাসপাতালে আমার মতো অভাজনের চিকিৎসা হওয়া উচিত, তা তিনি তাদের লিখে জানালেন। পূরবী দত্ত এতটা মমতা আমার জন্য লুকিয়ে রেখেছিলেন, তা আমার জানা ছিল না। ‘অকৃতী অধম জেনেও তো তুমি কম করে কিছু দাওনি।’
আমার ডাক্তারের নাম স্টিফান আর ভেচ। দীর্ঘদেহী সুস্বাস্থ্যের বয়স্ক একজন মানুষ। খানিকটা গম্ভীর। ভুরু কুঁচকানো। তিনি সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের সব কাগজপত্র পরীক্ষা করলেন। ওই হাসপাতাল থেকে মূল স্লাইড তলব করলেন। আমি একসময় বললাম, আমার ক্যানসার কোন পর্যায়ের? ডাক্তার বলেন, চতুর্থ পর্যায়ের। ক্যানসার যখন মূল কেন্দ্র থেকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন আমরা তাকে বলি চতুর্থ পর্যায়ের ক্যানসার। 
আমি ভীত গলায় বললাম, ডাক্তার, আমি কি মারা যাচ্ছি?
ডাক্তার ভেচ নির্বিকার গলায় বললেন, হ্যাঁ।
শাওনের দিকে তাকিয়ে দেখি, সে মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছে। আমি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। 
মারা গেলে করার তো কিছু নেই। কে সারা সারা!
ডাক্তার ভেচ হঠাৎই আমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, তুমি একা তো মারা যাচ্ছ না। আমরা সবাই মারা যাচ্ছি। এই কারণে বললাম তুমি মারা যাচ্ছ। তবে খুব দ্রুত যে মারা যাবে, সে রকম মনে হচ্ছে না।
রোগের বাইরে ডাক্তারের সঙ্গে অনেক কথা হলো। ডাক্তার বললেন, তুমি পেশা কেন বদলেছ? ছিলে কেমিস্ট, হয়েছ লেখক।
আমি বললাম, পৃথিবীতে অনেক কেমিস্ট আছে, সে তুলনায় লেখক কম বলেই পেশা বদলেছি।
আমার ছেলেও কেমিস্ট। তার কেমিস্ট্রিতে তোমার মতো পিএইচডি ডিগ্রি আছে। লেখালেখির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তোমার কোনো বই কি ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে?
আমি বললাম, হয়েছে। তবে তোমার জন্য আমি আমার নিজের ভাষা বাংলায় লেখা বই নিয়ে এসেছি। এই বইয়ে কী লেখা তুমি কিছুই বুঝবে না। তবে তুমি যদি বইটা তোমার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে সাজিয়ে রাখো, তাহলে আমার ভালো লাগবে। বইটার দিকে চোখ পড়লেই তোমার মনে হবে, অতি দূরদেশের বাংলা ভাষার এক লেখককে তুমি চিকিৎসা দিয়েছিলে।
ডাক্তার ভেচের হাতে বাদশাহ নামদার উপন্যাস তুলে দিলাম। তিনি বই হাতে নিয়ে বললেন, এই বই আমি আনন্দের সঙ্গে আমার লাইব্রেরিতে রেখে দেব।
শাওন একটু পরপর কেঁদে উঠছিল। ডাক্তার একসময় শাওনের পিঠে হাত রাখলেন। ভরসার এই স্পর্শ শাওনের জন্য প্রয়োজন ছিল।


পাদটীকা
একটা আলাদা স্যুটকেস ভর্তি করে আমি লেখালেখির প্রয়োজনীয় সাজসরঞ্জাম নিয়ে এসেছি। কাগজ, কলম, কাঁচি, গাম, ডিকশনারি এবং বেশ কিছু রেফারেন্স বই।
পুত্র নিষাদকে পাশে নিয়ে স্যুটকেস খুললাম। আমাদের দুজনকে চমকে দিয়ে স্যুটকেস থেকে একটা তেলাপোকা বের হলো। অসম্ভব প্রাণশক্তির এই পোকা বাংলাদেশ থেকে চলে এসেছে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। তেলাপোকাটা আমার দিকে সামান্য এগিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। তার পাগুলো শূন্যে, পাখা মেঝেতে। কিছুক্ষণ পা নেড়ে সে স্থির হয়ে গেল। দীর্ঘ ভ্রমণ চমৎকারভাবে শেষ করে সে মৃত। আমি নিষাদকে বললাম, বাবা, দেখো, বেচারা মারা গেছে।
নিষাদ বলল, তেলাপোকাকে বেচারা বলতে হয় না। মানুষকে বেচারা বলতে হয়। তুমি যখন মারা যাবে, তখন বলবে বেচারা।
তেলাপোকার মৃত্যু এবং পুত্রের কথায় প্রতীকী কিছু কি আছে?

You can follow us on Twitter or join our Facebook fanpage to keep yourself updated on all the latest from Bangla Literature.


Download Bangla books in pdf form mediafire.com and also read it online. Read it from iPad, iPhone. New york er nil akash, bangla ebooks, free download , mediafire , humayun ahmed , zafar iqbal , sunil gangopadhaya , suchitra , bengali ebooks, free bangla books online, ebooks bangla, bangla pdf, bangla books, boi, bangla boi, amarboi.


Subscribe To Get FREE Books!




This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সম্রাট - হুমায়ূন আহমেদ

amarboi.com


সম্রাট - হুমায়ূন আহমেদ

Download

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

মাই নেম ইজ রেড - ওরহান পামুক

amarboi.com
বুক রিভিউ

মাই নেম ইজ রেড - ওরহান পামুক
ফারুক ওয়াসিফ

খুন হয়েছে, লাশটি পড়ে আছে কুয়োর তলায়। কথা শুরু তারই জবানিতে, ‘আমি এখন একটি লাশ ছাড়া আর কিছু নই’।
ওদিকে শাদা ঘোড়ায় চড়ে নিজের শহরে ফিরছে এক মুসাফির শিল্পী। বিরহজ্বালায় পৃথিবীর পথে পথে অনেক ঘুরেছে সে। ডাক এসেছে, তাই ফেরা, কিন্তু কার কাছে? চাচা এনিশতে এফেন্দি শিল্পগুরু। তাঁর বাড়িতেই জায়গির থেকে শিখত রং-রেখার শিল্প। শিরিন ও ফরহাদের ছবি আঁকার সময় মনে ভাসতো চাচাতো বোন শেকুরের মোহময়ী মুখ। কিন্তু সে যে বড্ড দেমাগি! প্রত্যাখ্যানের অপমানে ইস্তাম্বুল ছাড়া সেই তরুণ দশ বছর পর ফিরে এসে বলবে: ‘মাই নেম ইজ ব্ল্যাক’।
মহামান্য সুলতানের হুকুমে ওস্তাদ এনিশতে এফেন্দি এক মহাগ্রন্থ সৃজন করছেন। ব্ল্যাক হবে সেই বইটির পাঁচ শিল্পীর একজন। পুরো বইটি সম্পর্কে জানেন একমাত্র এনিশতে। যতই কাছে আসে নিষিদ্ধ গ্রন্থটির, ততই ব্ল্যাকের মনে বলক দিয়ে ওঠে সেই নিষিদ্ধ প্রেম। শেকুর এখন ভরযুবতী, বহুদিন হলো স্বামী যুদ্ধে নিখোঁজ। দেবর হাসানের বাসনায় ভীতা সে ফিরে আসে বাবার গৃহে। সে রকম এক দিনে জানালার ফাঁক দিয়ে সে দেখে, ডালিমগাছের তলা দিয়ে যাচ্ছে তার বাল্যপ্রেমিক; এই প্রথম চোখের দেখা পেল চোখ। কিন্তু নিজের মনের খবর কি জানে শেকুর? স্বপ্নবান ব্ল্যাক নাকি গোঁয়ারগুণ্ডা হাসান, কাকে চায় সে?
এ রকম এক দিনেই খুন হয় অলিভ। সুলতানের নির্দেশ, হিজরি সনের সহস্রবর্ষপূর্তিতে প্রকাশিত হবে বইটি। সৌন্দর্যে হবে ফিরদৌসীর শাহনামার সমকক্ষ। রক্ষণশীল অভিজাত মহলের আড়ালে, নিষিদ্ধ ইউরোপীয় শৈলীতে অঙ্কিত হবে প্রতিটি পৃষ্ঠা। এনিশতের তত্ত্বাবধানে আঁকবেন ইস্তাম্বুলের সেরা পাঁচ শিল্পী। তাদের সাংকেতিক নামই কেবল জানব: ব্ল্যাক বা কৃষ্ণ, রেড বা রক্তিম, বাটারফ্লাই বা প্রজাপতি, স্টর্ক বা সারস এবং অলিভ বা জলপাই। অলিভের খুনী হয়তো এদেরই একজন। গুঞ্জন রটে, কুফরি ইউরোপীয় ঢংয়ে আঁকার পাপে কিংবা সেই পাপ ঠেকানোই এই খুনের হেতু। এতদিন ইসলামী প্রাচ্যের শিল্পীরা বাস্তবের প্রতিচ্ছবি নয়, খোদার দৃষ্টির প্রতিফলনই ঘটাতে চাইতেন তাঁদের অনুশিল্পকর্মে (মিনিয়েচার আর্ট)।
দৃষ্টিটা মনের, চোখের নয়। বাস্তবের চরিত্র বা উপাদান নয়, খোদার সৃষ্টির বিশুদ্ধ সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলাই তাদের সাধনা। কিন্তু সুলতান চান দুনিয়া তাঁর বাস্তব কীর্তি জানুক, বিশেষত প্রতিদ্বন্দ্বী ইউরোপ জানুক তাঁর গরিমা। এবং সেটা ইউরোপীয় শৈলীতেই সম্ভব। সাবেকি মন এটা মানবে কেন?
ব্ল্যাকের প্রেমের কাঁটাও এই সনাতন প্রথা। শেকুরকে বিয়ে করতে হলে ব্ল্যাককে প্রমাণ করতে হবে, তার স্বামী যুদ্ধে নিহত। নইলে নিরস্ত হবে না হাসান। উত্তেজনা ঘন হয়ে এলে ঘটে দ্বিতীয় খুন। এবারের শিকার ওস্তাদ এনিশতে স্বয়ং। হাসানের সঙ্গে ব্ল্যাকের দ্বন্দ্ব এভাবে ঢুকে যায় ইসলামি বনাম ফ্রাঙ্কিশ তথা ইউরোপীয় সংস্কৃতির রেষারেষির মধ্যে। শিল্পের দুই ধারার নামে মুখোমুখি হয় সভ্যতার দুই নিরিখ, জীবনের দুই আদল, ইতিহাসের দুটি স্রোতোধারা। এভাবে ষোল শতকের পটভূমিতে ঘটতে দেখি ‘সভ্যতার সংঘাত’।
কিন্তু স্বামীহারা শেকুরকে কি পাবে ব্ল্যাক? জানা যাবে কি অলিভ ও এনিশতের খুনী কে? কিংবা শেষ হবে কি সেই মহাগ্রন্থ সৃজন? বাইরে থেকে ইউরোপের চাপ, ভেতরে রক্ষণশীলদের উত্থানের দোলাচলে কোন পথে যাবে ইসলামী দুনিয়ার নেতা তুর্কি সুলানাতাত? এই ঐতিহাসিক পটেই তুর্কি ঔপন্যাসিক অরহান পামুক দাঁড় করান তাঁর মানবিক চরিত্রদের।
ছিল প্রেমকাহিনী, হয়ে দাঁড়াল আলো-আঁধারি রহস্যকাহিনী, আসলে তা মানবাত্মার ইতিহাসও। কিন্তু এ তো আজকের দুনিয়ারই গল্প। সেটাই হয়তো পামুকের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার (২০০৬) পাওয়ার কার্যকারণ। কিন্তু ইতিহাস, শিল্প সব ছাপিয়ে শোনা যায় চিরায়ত মানব-মানবীর বুকের ধুকপুক। তাই কেন এই খুন, তার থেকে বড় হয়ে ওঠে খুনি কে, এই প্রশ্ন।
পামুক অভিনব। কুয়োর হিমগহ্বরে পড়ে থাকা লাশের গল্পটা কেড়ে নিয়ে একজন বলতে শুরু করে, ‘মাই নেম ইজ রেড’। তার কথা শেষ হতে না হতেই, গল্পের লাগাম টেনে নেয় দেওয়ালে ঝোলানো ছবির একটি কুকুর বা ফলে ভরা ডালিমগাছ। আবার ফিরে আসে অলিভের লাশ। দাফনকাফনের শেষে তার দেহছাড়া আত্মার উড়ালসঙ্গী হয়ে আমরাও পাখির চোখে দেখতে পাই তুর্কি সালতানাতের রাজধানী ইস্তাম্বুলের অপূর্ব স্থাপত্য, নদী, সেতু, লোকালয়: ওই যে সুলতানের প্রাসাদ, ওই বসফরাস সমুদ্র, ওই মসজিদের সরু মিনার। কথা বলা শুরু করে সেই বৃদ্ধা ইহুদি ফেরিওয়ালি, আয়না ও সিল্কের রুমাল বিক্রি করার ছলে কুমারী কিংবা বিবাহিতা মেয়েদের মনের আনচান আবিষ্কার করাই যার পেশা ও নেশা। সে-ই আবার তাদের চিঠি চালাচালির দূতীয়ালি। ওদিকে মধ্যরাতে কফিখানায় কিংবা দরবেশের আস্তানায় গল্প শোনায় এক ভ্রাম্যমাণ কথক, একটু পরেই মোল্লাদের হামলায় যে নিহত হবে। এদিকে খোজা প্রহরীর পিছু পিছু আমরা ঢুকে পড়ি ইসলামের খলিফার মহাফেজখানার রহস্যময় আঁধারে। অনুচিত্রকলায় যেমন বিন্দুতে সিন্ধুদর্শন করানো হয়, তেমনি মাই নেম ইজ রেডও কাহিনীর পরতে পরতে, আখ্যানের দানার পর দানায় জীবন্ত করে তোলে এক অদেখা মানবজমিন।
মাই নেম ইজ রেড এক সন্ধিক্ষণের গল্প, যখন প্রাচ্য আর পাশ্চাত্য মিলন ও সংঘাতে পরস্পরকে বদলে দিচ্ছিল। যখন সময় হঠাৎ দৌড়াতে শুরু করেছে আর টান পড়ছে আত্মায়। এসব কিছুর মধ্যেও কান পাতলে শোনা যাবে তুচ্ছ সাধারণ মানুষের হূদস্পন্দন—মাই নেম ইজ রেড তারই কথাচিত্রলেখা।
ভাষায় ও গল্প বলায় পামুক সতর্ক, তুখোড় ও বিশদ। মনে হবে পড়ছেন তুর্কি-পারস্য প্রেমলীলার মহাকাব্যগুলো, জানছেন প্রাচ্যের লুপ্ত চিত্রকলার দর্শন ও তার কিংবদন্তীর শিল্পগুরুদের কথা। সবই নাহয় হলো, কিন্তু কী আছে পথের শেষে? এই প্রশ্ন উপন্যাসের পাঠককে শেষ বাক্যের শেষ শব্দটার দিকে ইউলিসিসের সাইরেন ডাকিনীর মতো হাতছানি দিয়ে ডাকে। এমনকি এই আকাঙ্ক্ষাও আপনাকে পেয়ে বসতে পারে, বিপজ্জনক বইটির সব ছবি আঁকা শেষ হোক, খুনি ব্ল্যাক বা রেড বা স্টর্ক বা বাটারফ্লাই যে-ই হোক, তারা তো শিল্পীই শেষপর্যন্ত। একবারের জন্য হলেও বিরহী মুসাফির ব্ল্যাক পাক তার শেকুরকে। কিন্তু শেকুর কি এখনো সেই ছলনাময়ী নয়? নইলে কেন সে ব্ল্যাককে পাঠায় দুর্ধর্ষ হাসানের বিরুদ্ধে, কেন সে বাবার খুনীকে চিহ্নিত করা ছাড়া তার বুকে ধরা দেবে না বলে শর্তের ফাঁদ পাতে? পাঠিকা চঞ্চল হবেন, পাঠক হয়তো উপন্যাসের লম্বা সফরে ক্লান্তও হবেন। উপন্যাস এক বিষন্ন শিল্প, শেষ পৃষ্ঠায় তারই প্রমাণ। আর প্রেম ও শিল্পের হাতে নিহতদের খুনের রংতো লালই হবে চিরটাকাল। তারপরও একটা খেদ রয়ে যাবে মনে; হায় এই প্রেম, আহা এ জীবন! কেন যে কেন যে, তবু!

আপনাদের সহযোগীতা আমাদের একান্ত কাম্য। তাই যদি বইটি ভালো লেগে থাকে তাহলে দুচার লাইন লিখে আপনার অভিমতগুলো জানিয়ে রাখুন আমাদের কমেন্টস বক্সগুলোতে। বন্ধু-বান্ধবদের বলুন এই সাইটটির কথা। আপনাদের অনুপ্রেরণায় আমরা আরও অনেক বই নিয়ে আপনাদের সামনে আসতে পারবো। ধন্যবাদ।

Download Bangla books in pdf form mediafire.com and also read it online. Read it from iPad, iPhone. My Name is Red - Orhan Pamuk, bangla ebooks, free download , mediafire , humayun ahmed , zafar iqbal , sunil gangopadhaya , suchitra , bengali ebooks, free bangla books online, ebooks bangla, bangla pdf, bangla books, boi, bangla boi, amarboi.
নতুন বই ইমেইলে পেতে হলে

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

কুটু মিয়া - হুমায়ূন আহমেদ

amarboi.com
ডাউনলোড করতে হলে নিচের ডাউনলোড অপশনে ক্লিক করুন
কুটু মিয়া - হুমায়ূন আহমেদ
আপনাদের সহযোগীতা আমাদের একান্ত কাম্য। তাই যদি বইটি ভালো লেগে থাকে তাহলে দুচার লাইন লিখে আপনার অভিমতগুলো জানিয়ে রাখুন আমাদের কমেন্টস বক্সগুলোতে। বন্ধু-বান্ধবদের বলুন এই সাইটটির কথা। আপনাদের অনুপ্রেরণায় আমরা আরও অনেক বই নিয়ে আপনাদের সামনে আসতে পারবো। ধন্যবাদ।

Download Bangla books in pdf form mediafire.com and also read it online. Read it from iPad, iPhone. Kutu Mia Humayun Ahmed, bangla ebooks, free download , mediafire , humayun ahmed , zafar iqbal , sunil gangopadhaya , suchitra , bengali ebooks, free bangla books online, ebooks bangla, bangla pdf, bangla books.
নতুন বই ইমেইলে পেতে হলে

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সমুদ্রের ডাক হরিশংকর জলদাস

amarboi.com
ডাউনলোড করতে হলে নিচের ডাউনলোড অপশনে ক্লিক করুন

সমুদ্রের ডাক

হরিশংকর জলদাস

আমি যখন আমার ভেতরে চোখ রাখি, সমুদ্র দেখি—গর্জনশীল, ঢেউবহুল। তীরলগ্ন জল-কাদা মেশানো, দূরের জল নীল। জলের ওপরে ছোট-বড় ঢেউ, ঢেউয়ের মাথা ভাঙা। ঝড়ের তোড়ে মাথাভাঙা ঢেউগুলো দক্ষিণ থেকে উত্তরে ধাবমান। অজগরের মতো ওলট-পালট খাওয়া ঢেউ। হাঁ হাঁ করা ঢেউগুলো জেলেনৌকাগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। নৌকার আগাকে ঢেউয়ের দিকে সোজা করে রেখে শক্ত মুঠিতে হাল ধরে পাছায় বসা পূর্ণচন্দ্র, রামনারায়ণ, উপেন্দ্ররা। মুখে তাদের ‘আঃ বদরসাহেব, আঃ বারো আউলিয়া, আঃ মা কালী, আমাদের রক্ষা করো। এই ঝড় থেকে বাঁচলে, মা গঙ্গা, তোমারে পূজা দেব।’ এই সব দৃশ্য আমার চোখের সামনে দিয়ে চলচ্চিত্রের মতো একের পর এক ভেসে যায়। জীবনের ত্রিশটি বছর আমিও পূর্ণচন্দ্র, রামনারায়ণদের সহযোদ্ধা ছিলাম। আমার সমুদ্র মানে বঙ্গোপসাগর। আমি আরব সাগর দেখিনি, প্রশান্ত বা আটলান্টিক মহাসাগর আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে। ভারত মহাসাগর বা লোহিত সাগরের গল্প শুনেছি শুধু। যার জলে আমি অবগাহন করেছি বা যার জলশস্যে আমার চৌদ্দ পুরুষ পালিত হয়েছে, সে বঙ্গোপসাগর। মানুষের শরীরের নাকি এক-তৃতীয়াংশ জল। তা যদি সত্যি হয়, তাহলে আমার শরীরের সমস্ত জলই বঙ্গোপসাগরের। আমার বেড়ে ওঠা, আমার জীবনযাপন জুড়ে আছে বঙ্গোপসাগর। আমার আনন্দ আর বেদনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই বঙ্গোপসাগর। আজ থেকে আশি বছর আগে এই বঙ্গোপসাগরই আমার দাদুকে কেড়ে নিয়েছিল। সমুদ্রের অতল নীল জলকে বড় ভালোবাসতেন চন্দ্রমণি। নীলজলের ঢেউ তাঁর ভেতরে মাথা কুরে মরত। ওই জলের টানে চন্দ্রমণি, মানে আমার দাদু, স্থায়ী সুইপারের চাকরি ছেড়ে ঠুনকো কাঠের নৌকা বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়েছিলেন। আশ্বিনের ঝড়ো বঙ্গোপসাগর ওই নৌকা খেয়েছে, চন্দ্রমণিকে খেয়েছে, চন্দ্রমণির আটজন সঙ্গীকে খেয়েছে। বাপের অপমৃত্যুতে ভড়কে যাননি চন্দ্রমণির ছেলে যুধিষ্ঠির। তরুণ যুধিষ্ঠিরও একগাছি নৌকার পাছায় শক্ত মুঠিতে হাল ধরে বসেছেন। লইট্যা মাছ, ঘোঁওড়া মাছ, রিশ্শা মাছ, করকইজ্যা ইচা, অলুয়া মাছ আর ইলিশ মাছে ভর্তি করে নৌকা কূলে ভিড়িয়েছেন। আমি, চন্দ্রমণির তৃতীয় পুরুষ, বঙ্গোপসাগরে নৌকা না ভাসিয়ে পারিনি। পরিবার-পরিজন এবং নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমিও কালবৈশাখীকে মাথায় নিয়ে, আষাঢ়-শ্রাবণের ঝড়-জলকে উপেক্ষা করে কখনো বাবার সঙ্গে, কখনো বা গাউর-কামলাদের সঙ্গে মাছ মারতে গেছি বঙ্গোপসাগরে। ঢেউয়ের বাড়ি আর জলের তোড় আমাদের প্রতিপক্ষ হয়েছে বারবার। ঝড়-জলের আঘাতে নৌকার গুঁড়ি ভেঙেছে, পাল ছিঁড়েছে, দাঁড় ভেসে গেছে। কিন্তু আমরা হার মানিনি। জানি, হার মানলে মৃত্যু অবধারিত, হার মানলে উনুনে আগুন জ্বলবে না। মা-বাবা-পরিজন না খেয়ে মরবে। এ জন্য আমরা আঘাতের বদলে প্রত্যাঘাত দিতে শিখেছি। তাই নৌকাকে ঢেউ-ঝড়ের প্রতিকূলে ঠেলে সমুদ্রে পাতানো জালের কাছে নিয়ে গেছি। জলশস্য নৌকায় তুলে বিজয়ীর বেশে বাড়ি ফিরেছি।
আমার দেখা সমুদ্র শরৎচন্দ্রের দেখা সমুদ্রের মতো নয়। তিনি শ্রীকান্ত-এ ঝড়ো সমুদ্রের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা দূর থেকে দেখা। মানে জাহাজের ডেক থেকে দেখা। জলতল থেকে জাহাজের পাটাতনের উচ্চতা কম হলেও ত্রিশ ফুট। নিরাপদ দূরত্বই বলা চলে। কিন্তু আমি যে নৌকায় সমুদ্রে যেতাম, জলের উপরতল থেকে সে নৌকার পাটাতনের উচ্চতা তিন ফুট। ওই তিন ফুট উচ্চতার নৌকা নিয়েই আমরা তুফানের সময় ঝঞ্ঝামগ্ন বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হতাম। প্রথম প্রথম ঝড়ে পড়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেও পরে অনেকটা গা-সওয়া হয়ে গিয়েছিল ওই ঝড়ো সমুদ্র। শুনেছি, জীবন ঘষে ঘষে নাকি আগুন জ্বালানো যায়। এই ত্রিশ বছরের সমুদ্রজীবনে আমার জীবন বাজি রেখে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলাম, তার একেবারেই জলাঞ্জলি হয়নি। যখন আমি লিখতে বসলাম, ওই ঝড়-জলের অভিজ্ঞতা, ওই মাছ মারার অভিজ্ঞতা, ওই রুক্ষ-রুদ্র-ভয়ংকর সমুদ্র দর্শনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগল। দহনকাল-এ সমুদ্রের ভয়াল রূপের বর্ণনা দিতে গিয়ে ওই জীবনঘষা অভিজ্ঞতার কথা কাহিনির মোড়কে উপস্থাপন করেছি। দহনকাল থেকে সামান্য উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে, ‘তখন নৌকার চারদিকে বড় বড় ঢেউয়ের তাণ্ডব। পর্বতসমান ঢেউ নৌকার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে আর শক্ত কুশলী হাতে আগাটি সেই ঢেউয়ের মাথায় চড়িয়ে দিচ্ছে ঈশান। আক্রোশে ফুঁসতে ফুঁসতে সেই ঢেউ নৌকাকে ঝাপটা দিয়ে পেছনে গলে যাচ্ছে। করাল হাঁ ব্যাদান করে বাতাস এগিয়ে আসছে হু হু করে। ঘন কালো মেঘ নেমে এসেছে অনেক নিচে। মেঘে মেঘে ঘর্ষণে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। কাছে-দূরে বজ্রপাত হচ্ছে। যেন মহাদেব মহাপ্রলয়ে নেমে রুদ্ররোষে হুংকার দিচ্ছেন।...ঢেউয়ের সঙ্গে ঢেউয়ের বাড়ি লেগে জলতল ফেনাময়। জলকণাগুলো ঘন আস্তরণ সৃষ্টি করেছে গোটা সমুদ্রজুড়ে। বাতাস, ঢেউ, জলকণা, মেঘের গর্জন, বৃষ্টির ছাঁট মিলেমিশে এক ভয়জাগানিয়া পরিবেশ তৈরি হল সমুদ্রবুকে।’
সমুদ্র শুধু আমাকে রুদ্র-ভয়ংকরের অভিজ্ঞতা দেয়নি, ধবল জ্যোৎস্না আর অতল নীল জল দেখার সুযোগও করে দিয়েছে। শীতকালে বঙ্গোপসাগর হয়ে যায় সৌম্য ঋষির মতো। ঢেউ নেই, কল্লোল নেই। তীর ছুঁইছুঁই তখন তার নীল জল। তীর ধরে ধরে নীল জলের ছলাৎছলাৎ পায়ে মৃদু অগ্রগমন। দিগন্তজুড়ে বালিয়াড়ি। জলের ধার ঘেঁষে অগণন লাল কাঁকড়ার এধার-ওধার দৌড়াদৌড়ি। কাঁকড়ার দুটো শুঁড়ে যেন মৃদু আলোর দুটো বাল্ব। কাছে গেলেই ফুরুৎ ফুরুৎ গর্তে ঢুকে পড়া। ইচ্ছে হলো তো দল বেঁধে নীল জলে অবগাহন। শীতের সময় মাছ মারতে যাওয়ার আলাদা একটা আনন্দ আছে। আষাঢ় থেকে কার্তিক পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর যেন মাছমারাদের প্রবল প্রতিপক্ষ। কোনোক্রমেই এই সময়ে সমুদ্রকে বাগে আনা যায় না। শুধু ভাঙে পালের মাস্তুল, নৌকার আগা, হালের দাঁড়। শুধু কেড়ে নেয় জাল, নৌকা, জীবন। হরবাঁশির বাপ, জয়ন্তের মেয়ের জামাই, মধুরাম, মঙ্গলচরণ—এঁদের জীবন কেড়ে নিয়েও সন্তুষ্ট হয় না সমুদ্র, আরও গ্রাস করার জন্য ফুঁসতে থাকে। অগ্রহায়ণ এলেই তার সব ফাঁসফোঁসানির অবসান ঘটে। বুকভরা নীল জল নিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে আর দক্ষিণ থেকে উত্তরে চলতে থাকা শুধু। ওই নীল জলের তলায় তখন প্রচুর মাছ—চিক্কা ইচা, লইট্যা মাছ, ছুরি মাছ, রূপচাঁদা, আর চেঁউয়া মাছ। কূল আঁধার করা দূরত্বে তখন জেলেরা তাদের বিহিন্দি জাল পাতে। সারি সারি। নানা বহদ্দার আর পাউন্যা নাইয়া ওই সারি সারি জালে ঘাইয়ে থাকে। গভীর রাতে মাছ তোলার সময় হয়। ওই সময় কূল থেকে দাঁড় বেয়ে এসে নিজের জালের হদিস পাওয়া সম্ভব নয়। তাই জেলেরা জালে লম্বা রশি বেঁধে পুরো জোয়ারের সময়টা জাললগ্ন হয়ে থাকে। একে বলে ঘাইয়ে থাকা। ওই ঘাইয়ে থাকাকালে অগ্রহায়ণের ধবল জ্যোৎস্নার সঙ্গে আমার দেখা। ফকফকা জ্যোৎস্নাও যে মানুষকে ঘোরে ফেলে দেয়, তা আমি বুঝেছি ওই সময়। শনশন করে নৌকার দুই পাশ দিয়ে জল ধাবমান। জলতল নখের পিঠের মতো সমতল। দু-চারটা অচেনা মাছ জলের ওপর একটু করে লাফিয়ে উঠে জলে ডুবে যাচ্ছে। নৌকার কাঁইকের ওপর সঙ্গের চারজন বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। আমি জেগে আছি। নৌকার পাছার দিকের ছোট্ট খোপে শরীরটা আটকে দিয়ে বিপুল জ্যোৎস্নার দিকে তাকিয়ে আছি। দক্ষিণ দিকের আকাশ ঘেঁষে পূর্ণ চাঁদ। পূর্ণিমাই হবে সে রাতে। না হলে এত জ্যোৎস্নায় আকাশ-সমুদ্র ভেসে যাবে কেন? রুপালি চাঁদের পাগল করা আলো নীল জলের রংটাই পাল্টে দিয়েছে। আমি একবার জল দেখি, আরেকবার চাঁদ। আমি হাত বাড়িয়ে জ্যোৎস্নামাখা জল ছুঁই, আর জ্যোৎস্না ছুঁয়ে থাকে আমাকে। আমার মুখ দিয়ে আমারই অজান্তে সেই সময় কোনো একটা আওয়াজ বেরিয়ে এসেছিল। না হলে কেন যুধিষ্ঠির আথালিপাথালি বিছানা ছেড়ে উঠে বসে আমাকে বলেছিলেন, ‘কী অইয়ে, অ বাছা কী অইয়ে?’ আমি একটু লজ্জা পেয়ে বলেছিলাম, ‘কিছু না বাবা।’ ‘নিচ্চয় কিছু বাছা, ভয় পাইও না? এই সময় সাগরে কত কিছু হাঁডি বেড়ায়।’ বাবা বলেছিলেন। আমি জবাব দিইনি। বাবা আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তখন আমি এমএ পাস দিয়ে ফেলেছি। অধ্যাপনাও করছি সরকারি সিটি কলেজে। সাত শ পঞ্চাশ টাকা বেতন। ওই টাকা দিয়ে এগারো জনের হাঁ বন্ধ করা যায় না। ভাইয়েরা ছোট ছোট। দু-চারজন স্কুলে পড়ছে। পরিজনের দুমুঠো অন্ন জোগাড় করার জন্য তাই আমার জ্যোৎস্নারাতে বা বজ্রনিনাদিত ঝড়ো রজনীতে মাছ মারার অভিযান।
খুব ছোটবেলা থেকে বঙ্গোপসাগরকে ভালোবাসতে শিখেছি আমি। বঙ্গোপসাগর আমাদের পরিবারের স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে, শান্তি কেড়ে নিয়েছে, বারবার। বেঁচে থাকার প্রধান উপকরণ নৌকা আর বিহিন্দি জালও গ্রাস করতে কখনো দ্বিধা করেনি। তার পরও কেন জানি সমুদ্রকেই ভালোবেসেছি। সমুদ্র আমাকে অস্তিত্ব, আমার বিকাশ-বিস্তারের উর্বর ক্ষেত্র। কবি কামাল চৌধুরীর কবিতায় আমার, জেলে সমাজের প্রকৃত নৃতত্ত্ব উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে যেন—
‘আমাদের গায়ে লেগে আছে অনার্য রোদ্দুর
পুরোনো পাথরের স্তূপ দেখে আমরা শনাক্ত করতে পারি প্রার্থনার গৃহ
অথচ অসংখ্য নদী, সমুদ্র সমতল, আমাদের মাছ-ভাতের ঐতিহ্য
সবটাই ধীবরকালের নৃতত্ত্ব।’
এই ভালোবাসাবাসি থেকেই সমুদ্রতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করার প্রবল আগ্রহ জন্মে আমার ভেতরে। আইএ পাস করার পর জানলাম, চট্টগ্রাম কলেজে বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্রতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করার কোনো সুযোগ নেই; আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু যুধিষ্ঠির জলদাসের বড় ছেলেকে ঢাকায় পড়তে পাঠানোর মতো সামর্থ্য নেই। সমুদ্রের ওপর পড়তে না পারার বেদনাকে মনে লুকিয়ে রেখে এখনো সুযোগ পেলে আমি পতেঙ্গার সমুদ্রচরে গিয়ে বসি। জেলেপাড়ার মানুষেরা আমাকে ঘিরে বেড়ে বসে। থাকে তরুণেরা, থাকে সমুদ্রে স্বামী হারানো বিধবারা, আর থাকেন বয়োবৃদ্ধরা। আমি যে অধ্যাপনা করি, অধিকাংশই তা জানে না। কোনো একটা স্কুলে-টিস্কুলে পড়াই—ওইটুকুই তারা জানে এবং মানে। আমাকে তারা সম্বোধন করে ‘মাস্টার’ বলে। ওই ডাকেই আমি সাড়া দিই। তাদের আবাল্য দেখা হরিশংকর কত বড় অধ্যাপক হয়েছে বা অন্য কিছু, তাতে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। তাদের আনন্দ হরিশংকর এখনো তাদের ভোলেনি। ওদের নিয়ে সমুদ্রপাড়ে গিয়ে বসি। বয়োবৃদ্ধরা তাঁদের সমুদ্রাভিযানের গল্প শোনান, বিধবারা তাদের স্বামী হারানোর বেদনার কথা আমার সামনে খুলেমেলে ধরে। বলে, ‘ওই হারামি দইন্যা, ওই নিষ্ঠুর মা গঙ্গা আমার সোয়ামিরে কাইড়া লইছে। যৌবন থাকতে আমারে বিধবা বানাইছে। আমাদের নৌকা ছিল, জাল ছিল। ওই লক্ষ্মীছাড়া সমুদ্র আমার স্বামী, নৌকা, হাল-জাল সব গেরাস করছে। আজ আমি মাইডারে লইয়া পাড়ায় পাড়ায় মাছ বেইচ্যা বেড়াই। হা ভগমান, আমার কপালে এ-ও লিখি রাখছিলা!’ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। বিধবাটির হাহাকার সমুদ্রকল্লোলকে বিষণ্নতায় ভরিয়ে তোলে। পরিবেশকে হালকা করার জন্য আমি প্রসঙ্গান্তরে যাই। আমি তাদের তাকাষি শিবশঙ্কর পিল্লাইয়ের চেম্মীন উপন্যাসের কাহিনি শোনাই। বলি, কী অসাধারণ দক্ষতায় তামিলনাড়ুর সমুদ্র-নির্ভর এক জেলেপল্লির জীবনচিত্র শিবশঙ্কর তাঁর উপন্যাসে এঁকেছেন। তারা অবাক হয়ে তামিলনাড়ুর মাছমারাদের সমুদ্রযুদ্ধের কথা শোনে, পালা-পার্বণের কথা শোনে। বলে, ‘কী আচার্য, ওদের সঙ্গে আমাদের এত মিল কী করে হলো?’ ওরা বিস্ময়ে আবিষ্ট হয়, যখন শোনে, শ্রীলঙ্কার কিংবদন্তি ক্রিকেটার জয়সুরিয়া সমুদ্রসন্তান, শ্রীলঙ্কারই এক ধীবরপল্লিতে তাঁর জন্ম।
আমি ধীরে ধীরে কাহিনি ঘোরাই তামিলনাড়ু থেকে কিউবার হাভানার দিকে। জয়সুরিয়াকে ছাড়িয়ে আমি হেমিংওয়ের ‘ওল্ডম্যান অ্যান্ড দি সি’ উপন্যাসের সান্তিয়াগোর গল্প পাড়ি তাদের সামনে। হাভানার উপসাগরে সান্তিয়াগো চুরাশি দিন বড়শি ফেলে একটি মাছও পায় না শুনে তারা হাসাহাসি করে। বলে, ‘সমুদ্রে মাছ ছিল না? বড়শিতে আধার ছিল না? সত্যি জলে ফেলেছিল তো বড়শিটি?’
বঙ্গোপসাগর আমাদের অনেক ব্যথার সাক্ষী। বঙ্গোপসাগরের একেবারে কোল ঘেঁষেই উত্তর পতেঙ্গার জেলেপল্লিটি। পূর্ণিমা-অমাবস্যার জোয়ারে জেলেপাড়াটি সাগরজলে গোসল করে। সমুদ্রের শোঁ শোঁ বাতাস জেলেপাড়ার শিমুলগাছ আর নারকেলগাছের মাথা এলোমেলো করতে থাকে। বঙ্গোপসাগরের গর্জন শুনতে শুনতেই আমার বেড়ে ওঠা। আমাদের রাতে ঘুমোতে যাওয়া। সমুদ্র আর জেলেপাড়ার মাঝখানে কোনো আড়াল নেই। আমরা মাছ মারতে সমুদ্রে যাই, আনন্দে সমুদ্রপাড়ে যাই, বেদনা বোঝাতে যাই সমুদ্রের কাছে। কিন্তু ১৯৭১ সালে সমুদ্র আর আমাদের সখ্যের মাঝখানে এসে দাঁড়াল পাকিস্তানি হানাদাররা। সমুদ্র আর জেলেপাড়ার মাঝখানের ভূমিটি দখল করে আস্তানা গাড়ল তারা। তারা মাছ ধরা নিষিদ্ধ করল। সমুদ্রপাড়ে যাওয়া বন্ধ করে দিল। সমুদ্র-বিচ্ছিন্ন হয়ে জেলেরা হাহাকার করে উঠল। মাছ মারতে না পেরে জলবিযুক্ত মাছের মতন খাবি খেতে লাগল। জেলেদের জলবিচ্ছিন্ন করে ক্ষান্ত হলো না হায়েনারা। তাদের দেহসুখ মেটানোর জন্য বেছে নিল আমাদের জেলেপল্লিটিকে। এরা সন্ধ্যায় আসে, রাতে আসে, পূর্বাহ্নে আসে, অপরাহ্নে আসে। ঘিরে ফেলে এক-একদিন এক-একটি বাড়ি। শরীরের চাহিদা মিটিয়ে এরা ফিরে যায়। চাপা আর্তনাদে ধর্ষিতা নারীরা চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে থাকে। জেলে পুরুষেরা সমুদ্রের দিকে ফিরে চিৎকার করে ওঠে, ‘হা মা গঙ্গা, অ বঙ্গসাগর, তুমি তোমার জল দিয়ে এই জেলেপাড়াটি ভাসিয়ে নিয়ে যাও। তোমার পবিত্র জলে আমাদের ধর্ষিতা নারীদের অপবিত্রতাকে শুচিময় করে তুলো।’ যে বিকেলে কৃষ্ণবন্ধুর চৌদ্দ বছরের বোনটিকে হানাদাররা ধর্ষণ করে, সে বিকেলেই কৃষ্ণবন্ধু আত্মাহুতি দিতে বঙ্গোপসাগরে যায়। কিন্তু বেড়িবাঁধের পাঞ্জাবি সেনারা তাকে আটক করে, সমুদ্রজল পর্যন্ত পৌঁছাতে দেয় না। দুই দিন পর প্রচণ্ড অত্যাচার শেষে মৃতপ্রায় কৃষ্ণবন্ধুকে বেড়িবাঁধ থেকে নিচে ছুড়ে ফেলে দেয়। কৃষ্ণবন্ধু এখনো হানাদারদের নির্যাতনের চিহ্ন গায়ে বহন করে বেঁচে আছে। কোমরভাঙা কৃষ্ণবন্ধু এখনো হুরিজাল কাঁধে নিয়ে সাগরে নামে। উত্তর পতেঙ্গার জেলেপাড়া থেকে বিচ্ছিন্ন কেউ নই আমি। ওদের জীবনকথা আমার জীবনকাহিনির সঙ্গে একাকার হয়ে আছে এখনো। এখনো সময় করে আমি সাগরপাড়ে গিয়ে বসি। তাদের জীবনগাথা শুনি

আপনাদের সহযোগীতা আমাদের একান্ত কাম্য। তাই যদি বইটি ভালো লেগে থাকে তাহলে দুচার লাইন লিখে আপনার অভিব্যাক্তিগুলো জানিয়ে রাখুন আমাদের কমেন্টস বক্সগুলোতে। বন্ধু-বান্ধবদের বলুন এই সাইটটির কথা। আপনাদের অনুপ্রেরণায় আমরা আরও অনেক বই নিয়ে আপনাদের সামনে আসতে পারবো। ধন্যবাদ।

Download Bangla books in pdf form mediafire.com and also read it online. Read it from iPad, iPhone. Harishankar Jaladas, Samudrer Daak, bangla ebooks, free download , mediafire , humayun ahmed , zafar iqbal , sunil gangopadhaya , suchitra , bengali ebooks, free bangla books online, ebooks bangla, bangla pdf, bangla books.
নতুন বই ইমেইলে পেতে হলে

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

হুমায়ূন আহমেদ - আমরা কেউ বাসায় নেই ধারাবাহিক উপন্যাস কিস্তি ০৯

amarboi.com

বইটি ডাউনলোড করতে হলে নিচের ডাউনলোড অপশনে ক্লিক করুন

আমরা কেউ বাসায় নেই
ধারাবাহিক উপন্যাস
কিস্তি ০৯
হুমায়ূন আহমেদ

আমার ধারণা ছিল, ‘টেলিগ্রাম’ বিষয়টা মোবাইল ফোনের কারণে দেশ থেকে উঠে গেছে। এখন কেউ আর ‘Mother serious come sharp’ জাতীয় টেলিগ্রাম করে না। ট্রেনে চলার সময় রাস্তার পাশে টেলিগ্রাফের খুঁটিও দেখি না। সংগত কারণেই মনে হয়, লোকজন টেলিগ্রাফের খুঁটি বিক্রি করে কটকটি কিনে খেয়ে ফেলেছে।
আমার সব ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। এক দুপুরবেলা বাবার কাছ থেকে টেলিগ্রাম চলে এল। টেলিগ্রামের ভাষা এমনিতেই সংক্ষিপ্ত থাকে, বাবারটা আরও সংক্ষিপ্ত। তিনি লিখেছেন, ‘Sold.’ বাড়ি বিক্রি হয়েছে বুঝতে পারছি। কত টাকায় বিক্রি হলো, কিছুই জানা গেল না। বাড়ি বিক্রি করে তিনি গ্রামে পড়ে আছেন কেন, তা-ও জানা যাচ্ছে না। আমাদের তিন মাসের ভিসা দেওয়া হয়েছে। তিন মাসের মধ্যে এক মাস চলে গেছে।
বাসার পরিস্থিতি বর্ণনা করা যাক। মায়ের শরীর আরও খারাপ করেছে। তাঁকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। ডাক্তার চোখ কপালে তুলে বলেছেন, এখনো দেশে পড়ে আছেন? ওনার না ব্যাংককে চিকিৎসা হওয়ার কথা?
আমি বললাম, আমাদের দুই ভাই ও বাবা—এই তিনজনের স্যুট বানানো হয়নি বলে যেতে পারছি না। বাবা ঢাকায় নেই, তাঁর মাপ নেওয়া যাচ্ছে না। এটাই সমস্যা। আর কোনো সমস্যা না। তবে বিকল্প ব্যবস্থা হয়েছে। বাবার পুরোনো এক স্যুট থেকে মাপ নেওয়া হয়েছে।
অনকোলজিস্ট হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মাছি ঢুকে যাওয়ার মতো বড় হাঁ। যাঁরা ক্যানসার নামক রোগের চিকিৎসক, তাঁদের বলে অনকোলজিস্ট। এই তথ্য আগে জানা ছিল না। মায়ের ক্যানসার হওয়ায় নতুন একটা শব্দ জানা গেল। ‘জ্ঞান’ নানাভাবে আসে। জ্ঞানের প্রবাহ সত্যই বিচিত্র।
স্যুট যে বানাতে দেওয়া হয়েছে, এটা সত্যি। হালকা ঘিয়া রং। এর সঙ্গে মানানসই টাই কেনা হয়ে গেছে।
মা শরীর ভয়ংকর খারাপ নিয়েও স্যুটকেসে জিনিসপত্র ভরছেন। বিশাল আকৃতির এই স্যুটকেস মায়ের দূরসম্পর্কের এক বোনের কাছ থেকে ধার হিসেবে আনা হয়েছে। এই খালার নাম ঝুনু খালা। তাঁর কাছে নানান ধরনের স্যুটকেস, হ্যান্ডব্যাগ আছে। বিদেশযাত্রীদের তিনি আগ্রহ করে স্যুটকেস ধার দেন এবং একপর্যায়ে বলেন, খালি স্যুটকেস ফেরত দিয়ো না। খালি স্যুটকেস ফেরত দিলে অমঙ্গল হয়। স্যুটকেসে কয়েকটা কসমেটিকস ভরে দিয়ো। শুধু সাবান আনবে না। ঘরে একগাদা সাবান।
ঝুনু খালার স্যুটকেসে মা অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস ভরছেন। দু-একটার উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে—
১. সুপারি কাটার সরতা। মা পান খান না। সরতা কেন যাচ্ছে বুঝতে পারছি না।
২. একটা সাতকড়ার আচারের ফ্যামিলি সাইজ বোতল। আমাদের বাড়ি সিলেটে না বলে আমরা সাতকড়া খাই না। এই আচারটা কেন যাচ্ছে কে জানে!
৩. একটা ছোট আখরোট কাঠের বাক্স। বাক্সে তালাচাবির ব্যবস্থা আছে। এ ধরনের বাক্সে মেয়েরা প্রেমপত্র লুকিয়ে রাখে। মায়ের কাছে প্রেমপত্র থাকার কোনো কারণ নেই। বাবা-মায়ের বিয়ে প্রেমের বিয়ে না। বিয়ের পর বাবা-মা কখনো আলাদা থাকেননি যে চিঠিপত্র লেখার সুযোগ হবে। বাবা এই প্রথম মাকে ছেড়ে এক মাস হলো গ্রামের বাড়িতে পড়ে আছেন।
গত এক মাসে বাসার উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, ড্রাইভার ইসমাইল গাড়ি নিয়ে পালিয়ে গেছে। পদ্মর মা থানা-পুলিশে ছোটাছুটি করছেন। তাতে লাভ কিছু হচ্ছে না। পদ্মর মা চাইছেন ইসমাইলের ছবি দিয়ে পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন ছাপাতে। তাতে লেখা থাকবে ‘একে ধরিয়ে দিন’। ইসমাইলের ছবি পাওয়া যাচ্ছে না বলে বিজ্ঞাপন দেওয়া যাচ্ছে না।
ছবি নিয়ে এক কাণ্ড হলো। রহিমার মাকে জিজ্ঞেস করা হলো তার কাছে ইসমাইলের ছবি আছে কি না।
রহিমার মা কেঁদেকেটে অস্থির। সে বলল, আপনারা আমারে কী ভাবেন? হারামজাদা চোর আমার কে? সে আমার স্বামী নাকি? তার কাছে আমি হাঙ্গা বইছি? আমি কী জন্যে তার ছবি ব্লাউজের নিচে লুকায়া ঘুরব?
পদ্মর মা বললেন, ব্লাউজের নিচে ছবি লুকিয়ে রাখবে, এমন কথা তো আমি বলিনি।
রহিমার মা বলল, আমি যে অপমান হইছি, তার জন্যে বিচার চাই। বিচার যদি না হয়, আমি গলায় ফাঁস দেব।
সামান্য কারণে তুমি গলায় ফাঁস দেবে?
আপনি যা বলছেন তা সামান্য না। গরিবের ইজ্জত নিয়া কথা তুলছেন।
পদ্মর মা তখন অ্যাটম বোমা ফাটালেন। কঠিন গলায় বললেন, তুমি যে পেটে বাচ্চা নিয়ে ঘুরঘুর করছো, এতে তোমার ইজ্জতের হানি হচ্ছে না? আমি নিশ্চিত, বাচ্চার বাবা ড্রাইভার ইসমাইল। আমি নিজে অনেক রাতে ইসমাইলের ঘর থেকে তোমাকে বের হতে দেখেছি।
রহিমার মা ছুটে গেল ভাইয়ার কাছে। তার বিচার চাই। এই মুহূর্তে বিচার না হলে সে গলায় ফাঁস নেবে। চিঠি লিখে যাবে, তার মৃত্যুর জন্য পদ্মর মা দায়ী।
ভাইয়া শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিল। বই থেকে চোখ না তুলে বলল, তুমি তো লিখতে পারো না। কাগজ-কলম নিয়ে আসো, আমি লিখে দিই। তুমি শুধু টিপসই দিয়ে দাও।
রহিমার মা কাঁদতে কাঁদতে বলল, এই আপনার বিচার?
ভাইয়া বলল, হুঁ। তবে পরামর্শ চাইলে পরামর্শ দিতে পারি।
কী পরামর্শ দেবেন?
ভাইয়া নির্বিকার গলায় বলল, তুমি ইসমাইল ড্রাইভারের কাছে চলে যাও। তাকে চেপে ধরে বিয়ের ব্যবস্থা করো। সন্তান বাপের পরিচয় জানবে না, এটা কেমন কথা!
দীর্ঘ সময় ঝিম ধরে থেকে রহিমার মা বলল, তারে আমি কই পামু?
ভাইয়া হাই তুলতে তুলতে বলল, ঠিকানা জোগাড় করা আমার কাছে কোনো ব্যাপার না। তুমি চাও কি না বলো।
রহিমার মা বলল, তারে একবার খালি আমার কাছে আইন্যা দেন। দেহেন, স্যান্ডেল দিয়া পিটায়া তারে কী করি।
ভাইয়া বলল, এনে দিচ্ছি। কান্নাকাটি বন্ধ করো। গর্ভাবস্থায় মায়ের অতিরিক্ত কান্নাকাটি সন্তানের ওপর প্রভাব ফেলে। সন্তানের হাঁপানি রোগ হয়।
রহিমার মা কান্না বন্ধ করে সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক হয়ে গেল। সে গলা নিচু করে বলল, হারামজাদাটারে কয় দিনের মধ্যে আনবেন?
ভাইয়া উদাস গলায় বলল, দেখি!

তলজগতে (Under world) ভাইয়ার প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখে আমি চমৎকৃত। ভাইয়ার অ্যান্টি-গ্রুপের প্রধান শামসু মারা গেছে। আমাদের বাসায় যে পত্রিকা আসে (দৈনিক সুপ্রভাত), তার প্রথম পাতায় ছবিসহ খবর ছাপা হয়েছে। খবরের শিরোনাম—
সাপের হাতে সাপের মৃত্যু
দলীয় কোন্দলে শীর্ষ সন্ত্রাসী শামসু নিহত
ছবিতে বিকৃত চেহারার একজনকে ফুটপাতে চিত হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। তার হাতে ছোট পানির বোতল। বোতলের মুখ খোলা হয়নি।
শামসুর মৃত্যুর পেছনে ভাইয়ার কলকাঠি আছে, তা বোঝা গেল ব্যাঙার আগমনে। সে এক বাক্স মিষ্টি নিয়ে এসেছে। আগে মিষ্টি আনা হতো হাঁড়িতে। এখন মিষ্টি আসে সুদৃশ্য কাগজের বাক্সে। রঙিন ফিতা দিয়ে সেই বাক্সে ফুল তোলা থাকে।
ব্যাঙা মিষ্টির বাক্স খুলল। সবাইকে মিষ্টি দেওয়া হলো। সবাই খেল, শুধু ভাইয়া বলল, না। রগট ধর্মের নীতিমালায় কোনো ঘটনাতেই আনন্দ প্রকাশ করা যায় না।
ভাইয়া রগট ধর্মে নতুন ধারা যুক্ত করেছে। এই ধর্মের অনুসারীদের বছরে একবার প্রাণী হত্যা করতে হবে। এমন প্রাণী, যার মাংস কোনো কাজে আসবে না। যেমন—কুকুর, বিড়াল।
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, প্রাণীদের মধ্যে মানুষ পড়ে কি না। ভাইয়া বলল, হোয়াই নট? নিম্নশ্রেণীর প্রাণী, নিজেদের হত্যা করতে হবে; তবে মানুষ প্রাণী কেউ নিজে হত্যা করতে না পারলে অন্যকে দিয়ে করালেও চলবে।
তোমার ধর্মে তীর্থস্থান বলে কিছু আছে?
ভাইয়া বলল, অবশ্যই আছে। যেসব জায়গায় একসঙ্গে অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, সেসব জায়গাই রগট ধর্মের তীর্থস্থান।
আমি বললাম, পুণ্য অর্জনের জন্য ওই সব জায়গায় যেতে হবে?
ভাইয়া বলল, রগট ধর্মে পুণ্য বলে কিছু নেই। সবই পাপ। পাপ বাড়ানোর জন্যে এসব জায়গায় রগট ধর্মের লোকজন যাবে, আনন্দ-উল্লাস করবে।
আমি বললাম, ভাইয়া, ঠিক করে বলো তো, তুমি কি অসুস্থ?
ভাইয়া হাই তুলতে তুলতে বলল, অসুস্থতা রগট ধর্মের চাবিকাঠি।
শামসুর মৃত্যুর খবর ছাপা হওয়ার তিন দিনের মাথায় ড্রাইভার সালামত এসে উপস্থিত। ভয়ে-আতঙ্কে সে অস্থির। তাকে দেখাচ্ছে মৃত মানুষের মতো। সালামত বলল, ভাইজান! আমি আপনার পায়ে ধরতে আসছি।
ভাইয়া বলল, লাইফবয় সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে এসে পায়ে ধরো। নোংরা হাতে পায়ে ধরবে না। ভালো কথা, তোমার স্ত্রীর সঙ্গে কি কথা বলবে? পদ্মকে ডেকে দেব?
সালামত কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, এমন কথা মনেও স্থান দেবেন না। পদ্ম আমার কেউ না। আপনি অর্ডার দিলে আমি তারে মা ডাকব। এখন থেকে আমি আপনার হুকুমের চাকর।

পদ্ম আমার প্রতি অত্যন্ত নারাজ। তার নারাজির কারণ সম্ভবত বনলতা। এই মেয়েটি প্রায় রোজই আসছে। কেন, তা-ও স্পষ্ট নয়। আমাকে বলেছে, আমাদের বাড়ি তার অফিসে যাওয়ার পথে পড়ে এবং আমাদের বাসার চা অসাধারণ বলেই চা খাওয়ার জন্যে থামে।
পদ্ম আমাকে বলল, ওই নাকথ্যাবড়ি রোজ আসে কেন?
আমি বললাম, রোজ তো আসে না। মাঝেমধ্যে আসে।
কেন আসে?
আমার প্রেমে পড়েছে, এই জন্যে আসে।
পদ্ম বলল, আপনার প্রেমে পড়বে কেন? কী দেখে সে আপনার প্রেমে পড়বে? কী আছে আপনার?
আমার কিছুই নেই বলে সে আমার প্রেমে পড়েছে। আমার কিছু নেই বলে আমার প্রতি তার করুণা হয়েছে। করুণা থেকে প্রেম। এই প্রেমকে বলে ক-প্রেম। ঘৃণা থেকে প্রেম হয়, তাকে বলে ঘৃ-প্রেম। আমার প্রতি তোমার প্রেমের নাম ঘৃ-প্রেম।
আপনার প্রতি আমার প্রেম?
অবশ্যই। ঘৃ-প্রেম।
আপনার এই সব ফাজলামি আমি জন্মের মতো বন্ধ করতে পারি, এটা জানেন?
আগে জানতাম না, এখন জানলাম।
পদ্ম বলল, নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে আমি আপনার বিরুদ্ধে মামলা করব। আমি বলব, গভীর রাতে দরজা ভেঙে আপনি আমার ঘরে ঢুকেছেন। রেপ করতে চেয়েছিলেন। আমার চিৎকার-চেঁচামেচিতে পালিয়ে গেছেন।
সাক্ষী কোথায় পাবে?
আমার মা সাক্ষ্য দেবেন। আমি কী করব জানেন? নিজেই নিজের শরীরে আঁচড়ে-কামড়ে দাগ করব। পুলিশকে বলব, এসব আপনি করেছেন।
পদ্ম ভয়ংকর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হয়, এই কাজ সে সত্যি সত্যি করবে। অবশ্য না-ও করতে পারে। এক ডাক্তার ছেলের সঙ্গে তার বিয়ের কথাবার্তা অনেক দূর এগিয়েছে। ছেলের নাম বদিউজ্জামান খান। ছেলে সুদর্শন। এমআরসিপি ডিগ্রি নিতে ইংল্যান্ড যাবে। যাওয়ার আগে বিয়ে করে বউ নিয়ে যাবে। পদ্মকে তার খুবই পছন্দ হয়েছে। বনলতা যেমন ঘন ঘন এ বাড়িতে আসে, ডাক্তার বদিউজ্জামান খানও আসে।
বিয়ে মোটামুটি ফাইনাল হওয়ার পর ধর্ষণজাতীয় মামলা-মোকদ্দমা হওয়ার কথা নয়। মেয়ে ধর্ষণ মামলা করছে শুনলেই পাত্রের পিছিয়ে যাওয়ার কথা।

গ্রামের বাড়ি থেকে সম্বোধনহীন একটি চিঠি এসেছে। এই চিঠি কার কাছে লেখা, বোঝা যাচ্ছে না। মনে হয়, সবার কাছেই লেখা। চিঠির সঙ্গে কাকতালীয়ভাবে জামালও এসে উপস্থিত। জামালের কথা মনে আছে তো? ওই যে বাবার মানিব্যাগ ও মোবাইল ফোন নিয়ে পালিয়ে গেল।
জামাল খালি হাতে আসেনি। এক আঁটি সজনে এবং জাটকার চেয়ে এক সাইজ বড় ইলিশ মাছ নিয়ে এসেছে। যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে সে উঠান ঝাঁট দিতে শুরু করেছে। তাকে আমরা কেউ কিছুই বললাম না। শুধু রহিমার মা বলল, পুলা, তোর সাহস দেইখা ‘চমৎকার’ হইছি।
জামাল রহিমার মায়ের কথা ভ্রুক্ষেপও করল না। উঠান ঝাঁট দিয়ে সে তেলের বাটি নিয়ে ভাইয়ার পা মালিশ করতে বসল।
বাবা তাঁর চিঠিতে লিখেছেন—
‘বিরাট ঝামেলায় আছি। বাড়ি চার লাখ বিয়াল্লিশ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। বায়নার পঞ্চাশ হাজার টাকা ছাড়া কোনো টাকা এখনো পাই নাই। যার কাছে বিক্রি করেছি সে আজ দিব, কাল দিব করছে। বড় ভুল যা করেছি তা হলো, বাড়ি বিক্রির দলিলে সই করে দিয়েছি। এখন কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’

আওয়ামী লীগের নেতা ছানাউল্লাহ সাহেব, যাঁর নামে ছানাউল্লাহ সড়ক, দুবার আমাদের বাড়িতে এসেছেন। দুবারই পদ্মর মায়ের সঙ্গে দরজা ভেজিয়ে বৈঠক করেছেন। ছানাউল্লাহ সাহেবের এক সঙ্গীকে গজ-ফিতা নিয়ে বাড়ি মাপামাপিও করতে দেখা গেল। ভাইয়াকে ঘটনা জানাতেই সে বলল, অতি চালাক মহিলা। সে এই বাড়ি বিক্রির তালে আছে। ঝামেলার বাড়ি তো, বিক্রি করে খালাস হয়ে যাবে। ঝামেলা অন্যের ঘাড়ে যাবে—‘যা যস্য প্রকৃতিঃ স্বভাব জনিতা, কেনাপি ন প্রাজ্যতে’।
আমি বললাম, এর মানে কী?
ভাইয়া বলল, মানে বলতে পারব না। খুঁজে বের কর।

আমাদের পরিবারের অনেক নিরানন্দের মধ্যে একটি আনন্দের ব্যাপার হলো, আমি চাকরি পেয়েছি। বনলতা রিসার্চ সেন্টারে ফিল্ড ওয়ার্কারের চাকরি। মাসিক বেতন তিন হাজার টাকা। টিএ ডিএ আছে। দুই ঈদে বেতনের অর্ধেক বোনাস।
বনলতা অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আমার হাতে দিয়ে বলল, আপনাকে বলেছিলাম না, আমার বসকে বললেই আপনার চাকরি হয়ে যাবে?
বনলতা শাড়ির আঁচলে চোখ মুছছে। আমি বললাম, কাঁদছ কেন?
আপনার চাকরি হয়েছে, এই আনন্দে কাঁদছি।
আমি বললাম, চাকরি হওয়ার আনন্দে আমি কাঁদব। তুমি কেন কাঁদবে?
বনলতা আগে টিপটিপ করে কাঁদছিল, এই পর্যায়ে শাড়িতে মুখ চেপে ফুঁপিয়ে উঠল। উঠানে খাম্বা ধরে পদ্ম দাঁড়িয়ে আছে। সে বনলতার দিকে তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
[চলবে]

আপনাদের সহযোগীতা আমাদের একান্ত কাম্য। তাই যদি বইটি ভালো লেগে থাকে তাহলে দুচার লাইন লিখে আপনার অভিব্যাক্তিগুলো জানিয়ে রাখুন আমাদের কমেন্টস বক্সগুলোতে। বন্ধু-বান্ধবদের বলুন এই সাইটটির কথা। আপনাদের অনুপ্রেরণায় আমরা আরও অনেক বই নিয়ে আপনাদের সামনে আসতে পারবো। ধন্যবাদ।

Download Bangla books in pdf form mediafire.com and also read it online. Read it from iPad, iPhone. Humayun Ahmed Amra Keu Basay Nei, bangla ebooks, free download , mediafire , humayun ahmed , zafar iqbal , sunil gangopadhaya , suchitra , bengali ebooks, free bangla books online, ebooks bangla, bangla pdf, bangla books.
নতুন বই ইমেইলে পেতে হলে

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Humayun Ahmed Amra Keu Basay Nei Part 05


আমরা কেউ বাসায় নেই
ধারাবাহিক উপন্যাস
কিস্তি ০৫
হুমায়ূন আহমেদ

ট্রাকড্রাইভার এবং ট্রাকচালক সমিতির পিআরও সালামত এসেছে ভাইয়ার কাছে। সালামত লম্বা, চেহারায় ইঁদুরভাব প্রবল। চোখ কোটর থেকে খানিকটা বের হয়ে আছে। লম্বা নাক, নাকের নিচে পুরুষ্ট গোঁফ। গায়ের রং কোনো একসময় হয়তো ফরসা ছিল। ময়লা জমে কিংবা রোদে পুড়ে কালচে ভাব ধরেছে। তাকে ঘিরে সস্তা সিগারেটের গন্ধের সঙ্গে মিলেছে জর্দার কড়া গন্ধ। তবে এখন সে পান খাচ্ছে না।
আমি বসেছি ভাইয়ার ঘরের বারান্দায়। ভাইয়াকে দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু সালামতকে দেখতে পাচ্ছি না। ভাইয়া বলল, আপনি ট্রাক চালান? আপনি তো ভাগ্যবান মানুষ।
এটা কেন বললেন?
বাংলাদেশের সব ট্রাকচালকের বেহেশত নসিব হবে, এই জন্যে বললাম।
কী বলেন এই সব?
ছুটন্ত ট্রাক দেখলেই আশপাশের সবাই আল্লাহর নাম নেয়। আপনাদের কারণে এত লোকজন আল্লাহর নাম নিচ্ছে, এই জন্যে আপনারা সরাসরি বেহেশতে যাবেন।
এই সব বাদ দেন। আমি আপনার কাছে কী জন্যে এসেছি সেটা শোনেন। উপায় না দেখে এসেছি।
বলুন, কী ব্যাপার।
পদ্ম মেয়েটার সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দেন। এটা আমার রিকোয়েস্ট। তার সঙ্গে আমার বিবাহ হয়েছে। একজনের বিবাহিত স্ত্রীকে আপনারা উঠায়ে নিয়ে এসেছেন, এটা কেমন কথা? আপনার স্ত্রীকে কেউ উঠায়ে নিয়ে গেলে আপনি কী করতেন?
ভাইয়া বলল, আমার স্ত্রীকে কেউ উঠায়ে নিয়ে যায় নাই, কাজেই কী করতাম বলতে পারছি না।
ভাইসাহেব, আমি ট্রাক নিয়ে এসেছি। পদ্মকে ডেকে দিন। আমি তাকে নিয়ে চলে যাব। কী ঘটেছিল তা নিয়ে মাথা ঘামাব না।
পদ্ম কি যাবে আপনার সঙ্গে?
অবশ্যই যাবে। তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন। এটা আপনার কাছে রিকোয়েস্ট। রিকোয়েস্ট না শুনলে অন্য পথ ধরব। সেটা আপনার ভালো লাগবে না।
ভাইয়া পদ্মকে ডেকে পাঠালেন। পদ্ম এসে দাঁড়াল। আমি বারান্দা থেকে পদ্মকে দেখতে পাচ্ছি না। দেয়ালে পদ্মর ছায়া পড়েছে। সেই ছায়া দেখতে পাচ্ছি।
ভাইয়া বলল, পদ্ম! ট্রাকড্রাইভার সালামত তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছে। ট্রাক নিয়ে এসেছে। তুমি কি তার সঙ্গে যাবে?
পদ্ম মিষ্টি করে বলল, যাব। কেন যাব না!
সালামত বলল, আমার স্ত্রীর নিজের মুখের কথা শুনলেন। এই কথার পর আর বিবেচনা নাই। পদ্ম, যাও, তৈয়ার হয়ে আসো। দশ মিনিট সময়।
পদ্ম বলল, এখন তো যেতে পারব না। পায়ে ব্যথা পেয়েছি। হাঁটতে পারি না। পায়ের ওপর দিয়ে রিকশা চলে গিয়েছিল। তুমি দেখো, পা ফুলে কী হয়েছে! পায়ের ফোলা কমুক। দশ দিন পরে আসো। এর মধ্যে পা ভালো হয়ে যাবে। আমি তোমার সঙ্গে চলে যাব।
সালামত বলল, পদ্ম, আমার কথা শোনো।
পদ্ম বলল, দশ দিন পরে তোমার কথা শুনব। এখন শুনব না।
পদ্ম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বের হয়ে গেল। ভাইয়া বলল, দশ দিন পর আসুন, দেখি কী হয়।
সালামত হতাশ গলায় বলল, দশ দিন পরেও কিছু হবে না। এই মেয়েকে আর মেয়ের মাকে আমি হাড়ে-গোশতে চিনি। ভাইসাহেব, শুনেন। এই মেয়ের পড়াশোনার খরচ, হাতখরচ—সব আমি দিয়েছি। মা-মেয়ের মাসখোরাকি খরচ দিয়েছি। আমার টাকায় মেয়ে বিএ পাস দিয়েছে। যখন বিয়ের কথা বলাম তখন পদ্ম বলল, ‘আপনার স্ত্রী আছে, আমি তো সতিনের ঘর করব না। স্ত্রীকে তালাক দিয়ে আসেন। তারপর বিবেচনা করব।’ জোবেদারে তালাক দিলাম। জোবেদা আমার স্ত্রী। সে দুই মেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেল। পদ্ম শুরু করল নানান ক্যাঁচাল। আজ না, সাত দিন পরে বিয়ে। সাত দিন পরে বলে, ‘বিষ্যুদবারে আমি বিয়ে করব না। বিষ্যুদবার আমার জন্যে খারাপ।’ তখন অন্য ব্যবস্থা নিলাম। বিয়ে হয়ে গেল। সন্ধ্যাবেলা তাকে নিয়ে ট্রাক চালায়ে দিনাজপুর যাব—সব ঠিকঠাক। ট্রাক নিয়ে উপস্থিত হয়ে শুনি, তাকে আপনারা জোর করে তুলে নিয়ে গেছেন।
ভাইয়া বলল, এত দিন যখন অপেক্ষা করেছেন, আরও দশটা দিন যাক। সবুরে মেওয়া ফলে। আপনার বেলায় সবুরে বউ ফলবে।
সালামত বলল, আপনার কথা মানলাম। আসব দশ দিন পরে। তখন যদি কিছু না হয়, আমি অন্য লাইন ধরব। আমি এত সহজ পাত্র না। পদ্ম এটা জানে না, পদ্মর মা জানে। সবকিছুর মূলে আছে ওই বদমাগি।
শাশুড়িকে মাগি ডাকছেন, এটা কেমন কথা!
ক্ষুব্ধ সালামত ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
সালামতের আগমন এবং প্রস্থানে পদ্মর মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। সে কলপাড়ে বসে আছে। তার এক পা প্লাস্টিকের গামলায় ডোবানো। পায়ের জলচিকিৎসা চলছে। রহিমার মা গলা নামিয়ে তার সঙ্গে গল্প করছে।
গল্পের বিষয়বস্তু ড্রাইভার ইসমাইলের জিন। এই জিন ইসমাইলের সঙ্গেই সারাক্ষণ থাকে। শুধু শনিবার আর সোমবার থাকে না। এই দুই দিন জিন তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যায়। জিনের স্ত্রীর নাম হামাছা।

আজ ছুটির দিন। বাবা বাসায় আছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি সাপ্তাহিক বাজারে যাবেন। আমাকে সঙ্গে যেতে হবে কি না বুঝতে পারছি না। বাবার সঙ্গে বাজারে যাওয়া বিড়ম্বনার ব্যাপার। কাঁচা মরিচ কেনার আগে তিনি মরিচ টিপে টিপে দেখবেন। একটা ভেঙে গন্ধ শুঁকবেন। ভাঙা মরিচ আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলবেন, ‘জিভে ছুঁইয়ে দেখ ঝাল কি না।’ মরিচ বিক্রেতা এই পর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে বলবে, ‘মরিচ ভাঙেন ক্যান?’ বাবা শান্ত গলায় বলবেন, ‘তোমার কাছ থেকে যদি মরিচ নাও কিনি, এই ভাঙা মরিচের দাম দেব। কাজেই হইচই করবে না। যে ভোক্তা, তার আইনি অধিকার আছে দেখেশুনে পণ্য কেনার। প্রয়োজনে মামলা করে দেব। বুঝেছ?’
একবার মাছ কিনতে গিয়ে মাছওয়ালার সঙ্গে তাঁর মারামারির উপক্রম হলো। মাছওয়ালা বঁটি উঁচিয়ে বলল, ‘দিমু কোপ।’ বাবা শান্ত গলায় বললেন, ‘কোপ দিতে হবে না। তুমি যে বঁটি উঁচিয়েছ, এর জন্যেই অ্যাটেম টু মার্ডারের মামলা হয়ে যাবে। সাত বছর জেলের লাপসি খেতে হবে। লাপসি চেন?’
বাবার কথা থাক। নিজের কথা বলি। আমি আগ্রহ নিয়ে পদ্ম ও রহিমার মায়ের কথা শুনছি। রহিমার মা উঠে যাওয়ার পর আমি পদ্মর কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। পদ্ম আমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, ট্রাকড্রাইভারের সঙ্গে বিয়ে আমার হয়েছে, এই কথা আপনাকে বলেছিলাম। এখন কি আমার কথা বিশ্বাস হয়েছে?
হ্যাঁ।
এ কিন্তু মানুষ খারাপ না। আমাকে পড়াশোনা করিয়েছে। যেদিন বিএ পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়েছে, সেদিন শাড়ি কিনে দিয়েছে।
প্রিয় স্বামীর সঙ্গে চলে গেলে না কেন?
পদ্ম বলল, ভাঙা পা নিয়ে যাব নাকি! পা ঠিক হোক, তারপর যাব। স্বামী ট্রাক চালাবে, আমি পাশে থাকব। বিড়ি ধরিয়ে তার ঠোঁটে দিয়ে দেব। ট্রাক চালাতে চালাতে যেন ঘুমিয়ে না পড়ে এই জন্যে সারাক্ষণ তার গায়ে চিমটি কাটব। দেখুন, আমি হাতের নখ বড় রেখেছি চিমটি কাটার সুবিধার জন্যে। আপনি হাতটা বাড়ান, আপনার হাতে একটা চিমটি কেটে দেই।
আমার হাতে চিমটি কাটবে কেন?
আপনি আমার নকল স্বামী, এই জন্যে আপনার হাতে নকল চিমটি কাটব।
পদ্ম চিমটি কাটার সুযোগ পেল না, বাবা বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন।
হাতের ইশারায় আমাকে ডাকলেন।
আমি এখন বাবার শোবার ঘরে। মা চাদর গায়ে শুয়ে আছেন। হাঁপানির টান এখনো ওঠেনি। টান উঠবে কি না তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। পরিস্থিতি যথেষ্ট ঘোলাটে বলে মনে হচ্ছে। কারণ, পদ্মর মা উপস্থিত আছেন। তিনি চেয়ারে বসে আছেন। তাঁর পাশের একটা চেয়ারে আমি বসেছি। ভদ্রমহিলা বিরক্ত চোখে আমাকে দেখছেন। বাবা বসেছেন মায়ের পাশে। বাবা প্রধান বিচারকের ভূমিকায় আছেন বলে মনে হচ্ছে। মা প্রধান বিচারকের সাহায্যকারী।
বাবা পদ্মর মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ভাবি! আমাকে বলা হয়েছিল, আপনি আপনার মেয়েকে নিয়ে ঝামেলায় পড়েছেন বলেই কিছুদিন আমার এখানে থাকতে এসেছেন। আমি বিষয়টা মেনে নিয়েছি। অনেক দিন পার হয়েছে। এখন আপনাদের চলে যেতে হবে। আপনাকে এক সপ্তাহ সময় দিচ্ছি।
পদ্মর মা চুপ করে আছেন। বাবার কথা শুনে তিনি যে ঘাবড়ে গেছেন এ রকম মনে হচ্ছে না। ভদ্রমহিলা শক্ত জিনিস। এসিড-মাতা বলে কথা!
বাবা বললেন, শেক্সপিয়ার বলেছেন, I have to be cruel only to be kind. এর অর্থ, মমতা প্রদর্শনের জন্যেই আমাকে নির্মম হতে হবে। আমি আমার ছেলেদের প্রতিও নির্মম। শুনেছেন নিশ্চয়ই, আমি আমার বড় ছেলেকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছি। শুনেননি?
শুনেছি।
আপনাকেও একটা সময় বেঁধে দিচ্ছি। এই মঙ্গলবারের পরের মঙ্গলবার।
পদ্মর মা অবাক হয়ে বললেন, যে জমির ওপর এই বাড়ি, সেই জমি তো আমার। আমি কেন বাড়ি ছাড়ব?
বাবা বললেন, তার মানে?
জমির কাগজপত্র আমার নামে।
বাবা বললেন, ভাবি, শুনুন। নানা দুশ্চিন্তায় আপনার মাথা এলোমেলো হয়ে আছে। জমি আপনার নামে, মানে কী?
আমার কাছে কাগজপত্র আছে। আপনার বড় ছেলে জোগাড় করে দিয়েছে।
বাবা বললেন, আচ্ছা, আপনি যান, পরে আপনার সঙ্গে কথা বলব। মনজু, তুই তোর ভাইকে ডেকে আন।
আমি বললাম, ভাইয়া তো এখন ঘুমাচ্ছে।
ঘুম থেকে ডেকে তুলে আন।
পদ্মর মা বলল, আপনি কি কাগজগুলো দেখবেন?
পরে দেখব। এখন আপনি যান।

দ্বিতীয় সিটিং বসেছে। ভাইয়াকে ঘুম ভাঙিয়ে আনা হয়েছে। ঘুম পুরোপুরি কাটেনি। ভাইয়া একটু পরপর হাই তুলছে। পদ্মর মা যে চেয়ারে বসেছিলেন, ভাইয়া সেখানে বসেছে। বাবা অনেকক্ষণ ভাইয়ার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। এটা বাবার পুরোনো টেকনিক। মূল বাজনায় যাওয়ার আগে তবলার ঠুকঠাক।
বাবা বললেন, শুনলাম তুমি পদ্মের মাকে কী সব কাগজপত্র দিয়েছ?
ভাইয়া বলল, ঠিকই শুনেছ। জমির দলিল আর নামজারির কাগজ।
পেয়েছ কোথায়?
সাবরেজিস্ট্রি অফিসে দুষ্ট কিছু লোকজন থাকে, যারা মিথ্যা কাগজ তৈরি করে দেয়।
তুমি ভুয়া কাগজপত্রের ব্যবস্থা করেছ?
হ্যাঁ। তবে ভুয়া হলেও কঠিন ঝামেলার কাগজ। মামলা করলে ফয়সালা হতে বিশ-পঁচিশ বছর লাগবে। তারপর দেখা যাবে, মিথ্যা কাগজ টিকে গেল।
তুমি এই কাজটা কেন করেছ জানতে পারি?
ভাইয়া বলল, টেনশন তৈরি করার জন্যে করেছি, বাবা। ছোট মা এবং তুমি—এই দুজন এখন শত্রুপক্ষ। এক ছাদের নিচে দুই কঠিন শত্রুর বাস মানে নানান কর্মকাণ্ড। এত দিন তুমি ভেজিটেবল হয়ে বাস করছিলা, এখন থেকে তোমার ভেতর থেকে ভেজিটেবল ভাব চলে যাবে। ভেজিটেবল হয়ে তো আর শত্রুর মোকাবেলা করা যায় না। তোমাকে বাধ্য হয়ে জেগে উঠতে হবে। এতে তোমার লাভ হবে একপর্যায়ে দেখা যাবে, তোমার ছাত্রছাত্রীরা তোমাকে মুরগি ডাকছে না। অনেক কথা বলে ফেললাম। নো অফেন্স, বাবা, যাই।
ভাইয়া উঠে দাঁড়াল। বাবা অধিক শোকে পাথর হয়ে বসে আছেন। একবার মায়ের দিকে তাকাচ্ছেন, একবার আমার দিকে। মায়ের হাঁপানির টান উঠে গেছে। নিঃশ্বাস নিতে গিয়ে তিনি এখন বিচিত্র শব্দও করছেন। শব্দ অনেকটা প্রেশার কুকারের মতো। কিছুক্ষণ বিজবিজ, তারপর ফোঁস—গ্যাস বের হয়ে যাওয়া।
বাবা মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, একটা পিস্তল থাকলে আমি নিজের হাতে তোমার ছেলেকে শ্যুট করতাম।
প্রবল ঝড়ের পর পরিস্থিতি অস্বাভাবিক শান্ত হয়। এখন আমাদের বাসার পরিস্থিতি শান্ত। পদ্মর মাথায় তার মা বাটা মেন্দি ঘসে ঘসে দিচ্ছেন। বাবা বাজার নিয়ে ফিরেছেন। কাঁচাবাজার হাতে নির্বোধ চেহারার এক ছেলেকে দেখা যাচ্ছে। বাবার কাছ থেকে জানা গেল, সে নিউমার্কেটে মিনতির কাজ করত। এখন থেকে এই বাড়িতে কাজ করবে। বাবার হাত-পা টিপে দেবে, ঘর ঝাঁট দেবে। ছেলের নাম জামাল। সে বাবাকে ‘আব্বা’ ডাকছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে, বাবা তার মুখে ‘আব্বা’ শুনে সন্তুষ্ট। বাবা নিজে জামালের জন্যে তোশক-বালিশ আর মশারি কিনে আনলেন। তাকে কৃমির ওষুধ খাইয়ে দেওয়া হলো। সন্ধ্যাবেলা সে লাইফবয় সাবান দিয়ে গোসল করে আমাদের পরিবারভুক্ত হলো। বাবা তার সঙ্গে মিটিংয়ে বসলেন। কঠিন মুখ করে বললেন, আমি তোর দায়িত্ব নিয়েছি। শুধু ঘরের কাজ করলে হবে না। তোকে লেখাপড়া শিখতে হবে। রোজ আধঘণ্টা করে তোকে আমি পড়াব। ঠিক আছে?
জামাল বলল, জি, আব্বা।
বাবা বললেন, আজ থেকে শুরু। এই দেখ, একে বলে স্বরে অ। বল, স্বরে অ।
স্বরে অ।
এর পাশে আকার দিলে হয় আ, বল, আ।
আ।
দুইটা অক্ষর এক দিনে শিখে ফেললি। রাতে ঘুমাতে যাবার সময় একশবার করে স্বরে অ, স্বরে আ বলবি। ঠিক আছে?
ঠিক আছে, আব্বা।
এক একটা অক্ষর শিখবি আর দুই টাকা করে বকশিশ পাবি। আজ দুইটা অক্ষর শিখেছিস, এই নে চার টাকা।
জামাল টাকা নিয়ে বাবাকে পা ছুঁয়ে সালাম করল। পরদিন সকালে জামালকে পাওয়া গেল না। সে বাবার মোবাইল ফোন আর মানিব্যাগ নিয়ে পালিয়েছে। মানিব্যাগে ছিল সাতাশ শ টাকা। উঠানে পদ্মর একটা শাড়ি শুকাতে দেওয়া ছিল। সেই শাড়িও পাওয়া গেল না।
ভাইয়ার কর্মকাণ্ডে বাবা যতটা না মর্মাহত হয়েছিলেন, জামালের কর্মকাণ্ডে তার চেয়ে বেশি মর্মাহত হলেন। ইউনিভার্সিটি বাদ দিয়ে ঘরে বসে রইলেন। হাতে Party Jokes-এর বই।

পদ্মদের নিজস্ব রান্নাঘর চালু হয়েছে। বারান্দায় বাঁশের বেড়া দিয়ে ওপেন এয়ার কিচেন টাইপ রান্নাঘর। সে রাঁধছে, বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি দুইটা কেরোসিনের চুলায় প্রথম রান্না বসল। রহিমার মা ভাইয়াকে জানাল, প্রথম দিন সরপুঁটি ভাজি আর কুমড়াফুলের ভাজি হচ্ছে।
ভাইয়া বলল, দুটাই তো শুকনা আইটেম।
রহিমার মা বলল, তরকারি আর ডাল আমাদের কাছ থেকে যাবে।
আমরা ওদের কোনো আইটেম পাব না?
মনে লয় না। একটা মাছ ভাজছে আর চাইরটা ফুল।
ভাইয়া বলল, কুমড়াফুলের ভাজি খেতে ইচ্ছা করছিল।
রহিমার মা বলল, কাইল আপনারে খিলাব। বকফুল ভাজি পছন্দ হয়? বকফুল আনব। সূত্রাপুর বাজারে পাওয়া যায়।
পদ্মদের পাশের গেস্টরুম তালাবদ্ধ ছিল। এক সকালবেলা (বুধবার আটটা চল্লিশ) পদ্মর মা তালা ভেঙে সেই ঘরের দখল নিয়ে নিলেন। বাবা হতভম্ব। আমাকে ডেকে বললেন, ঘটনা কী? পদ্মর মা আমার ঘরের তালা ভেঙেছে কী জন্যে?
আমি বললাম, ওনার কাছে চাবি ছিল না বলেই তালা ভেঙেছেন। চাবি থাকলে তালা ভাঙতেন বলে আমার মনে হয় না।
তুমি ব্যাপারটা বুঝতেই পারছ না। এরা চাচ্ছেটা কী? আমার বাড়িঘর দখল করে নিচ্ছে কেন? একটা ঘর কি তাদের জন্যে যথেষ্ট ছিল না?
আমি বললাম, না। একটা ঘরে থাকবে পদ্ম আর ওদের কাজের মেয়ে মরি। অন্য ঘরে পদ্মর মা। সবারই প্রাইভেসির দরকার।
তুমি ওদের হয়ে কথা বলছ কেন? তোমার সমস্যা কী? তোমার আচার-আচরণ, কথাবার্তা এবং চিন্তাভাবনা প্রতিবন্ধীদের মতো, এটা জানো?’
না।
সামনে থেকে যাও। পদ্মর মাকে আমার কাছে পাঠাও।
উনি বাড়িতে নেই, বাবা। ড্রাইভার ইসমাইলকে নিয়ে বের হয়েছেন।
কোথায় গেছেন?
কোথায় গেছেন শুনলে তুমি আপসেট হয়ে যাবে। তোমাকে আপসেট করতে চাচ্ছি না। উনি তোমার গাড়ি নিয়ে বের হয়েছেন।
গাড়ি নিয়ে বের হয়েছেন, মানে কী? গাড়ি তো নষ্ট।
অন্য একটা গাড়ি দড়ি দিয়ে বেঁধে তোমার গাড়ি টেনে নিয়ে গেছেন।
তুমি কিছু বললে না?
না। আমার ধারণা, উনি গাড়ি সারাতে নিয়ে গেছেন। ইসমাইল ড্রাইভার তা-ই বলল।
আমার সামনে হাবার মতো দাঁড়িয়ে থাকবে না। Get lost.
বাবার কাছ থেকে ছাড়া পাওয়ার পর মায়ের কাছে ধরা খেলাম। মা গাড়ির বিষয়ে এখনো কিছু জানেন না, তবে দ্বিতীয় গেস্টরুম দখল হয়ে গেছে এই খবর পেয়েছেন। তিনি হতাশ গলায় বললেন, এই সব কী হচ্ছে? ওরা নাকি গেস্টরুম দখল করে নিয়েছে?
হুঁ।
এখন আমরা কী করব? পুলিশে খবর দিব?
পুলিশে খবর দিয়ে লাভ হবে না। ওনার কাছে কাগজপত্র আছে, জমি তাঁর।
মা ফিসফিস করে বললেন, কাউকে দিয়ে কাগজপত্রগুলি চুরি করাতে পারবি?
আমি বললাম, এই বুদ্ধিটা খারাপ না। তুমি রহিমার মাকে লাগিয়ে দাও।
মা অনেক দিন পর উত্তেজনায় বিছানায় উঠে বসলেন। চাপা গলায় বললেন, টগরের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে আলাপ করলে কেমন হয়? এই সব বিষয় সে ভালো বুঝবে।
ভাইয়াকে ডেকে নিয়ে আসব?
না। আমি তার কাছে যাব।
মা তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নামতে গিয়ে খাট থেকে পড়ে বিকট চিৎকার করতে লাগলেন, তখনো আমরা জানি না, মা তাঁর বাঁ পা ভেঙে ফেলেছেন।
[চলবে]


নতুন বই ইমেইলে পেতে হলে

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com