সাম্প্রতিক বইসমূহ
Showing posts with label Harishankar Jaladas. Show all posts
Showing posts with label Harishankar Jaladas. Show all posts

আমি মৃণালিনী নই - হরিশংকর জলদাস

Ami Mrinalini Noi - Harishankar Jaladas
আমি মৃণালিনী নই - হরিশংকর জলদাস
ভবতারিণী থেকে মৃণালিনী হওয়া রবীন্দ্রনাথের সহধর্মিণীর অন্তরঙ্গ বয়ানে বিয়ের দিন থেকে নিজের মৃত্যুর আগ পর্যন্তকালের ঘটনার পর ঘটনা প্রায় অনুপুঙ্খ বিবরণসমেত তুলে ধরেছেন কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস, তাঁর আমি মৃণালিণী নই উপন্যাসের ভেতর দিয়ে। বাস্তব ও কল্পনার মিশেলে এ উপন্যাসের পরতে পরতে জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুরবাড়ির একটা কালপর্বের ঘটনা যে রকম অন্তরঙ্গ ভাষ্যে তুলে ধরেছেন তিনি, মনে হয়নি উপন্যাস পড়ছি। তাঁর মুখোমুখি বসে শুনছি যেন মৃণালিনীর একান্ত আপন কথা। জানা হয়ে যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের সবলতা-দুর্বলতা। মৃণালিনী নিজের সাক্ষাৎ পর্যবেক্ষণের কথা যেমন জানাচ্ছেন, তেমনি বউ হয়ে আসার পর নানাজনের মুখে ঠাকুরবাড়ির বহু আগের যেসব ঘটনা শুনেছেন, তারও বিবরণ দিচ্ছেন অকপটে। যতই এ উপন্যাসের পাঠ এগোয়, আমরা আরও বেশি একাত্ম হয়ে উঠতে থাকি মৃণালিনী চরিত্রের সঙ্গে।
আলোর নিচে আঁধার থাকার মতো জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতেও অন্ধকার ছিল। অবরোধপ্রথা ছিল। এ বাড়ির অন্দরমহলে অবরুদ্ধ নারীকুলের দশা মৃণালিনীর বয়ানে লেখক যেভাবে তুলে এনেছেন, পাশাপাশি পুরুষদের ভূমিকার কথাও, তা এক গভীর পাঠের বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে তা ইতিহাস হয়ে ওঠেনি, হয়ে উঠেছে কথাসাহিত্যের ঘরোয়া ভাষ্য। যেমন মৃণালিনী জানাচ্ছেন, ‘ঠাকুরবাড়ির কড়া নিয়ম—কোনো পরপুরুষের সঙ্গে বাড়ির মেয়ের সাক্ষাৎ চলবে না। ...অন্তঃপুরে অবরোধপ্রথা পূর্ণমাত্রায় বিরাজমান। একই প্রাঙ্গণের এ-বাড়ি থেকে ও-বাড়িতে যেতে হলে ঘেরাটোপমোড়া পালকির সঙ্গে প্রহরী ছোটে, অনেক অনুনয়ের পর গঙ্গাস্নানের অনুমতি পেলে বেহারারা পালকিসুদ্ধ মেয়েদের জলে ডুবিয়ে আনে।’
এ উপন্যাসের একটা বড় জায়গাজুড়ে আছে কাদম্বরী দেবীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কের চালচিত্র, তার টানাপোড়েন, কাদম্বরী দেবীর মৃত্যু, মৃত্যুকে ঘিরে রহস্যময়তা। আছে ভবতারিণী থেকে মৃণালিনীতে পরিণত হওয়া খোদ স্বামী রবিঠাকুরের কাছ থেকে তাঁর বঞ্চনার অকপট স্বীকারোক্তি। মৃণালিনী জানাচ্ছেন, ‘আমার অসুস্থতা সত্ত্বেও রবিবাবুর ব্যস্ততা কমে না।’ তাঁর অসুস্থতার পর যে ঘরে তাঁকে রাখা হয়, সে ঘরে ‘কোনো বৈদ্যুতিক পাখা নেই। তালপাতার পাখার বাতাসে কতটুকুই বা গায়ের যন্ত্রণা কাটে।’
উপন্যাসের শেষ হচ্ছে মৃণালিনীর মৃত্যুর ভেতর দিয়ে। মৃত্যুর আগে তাঁর সেই অকপট স্বীকারোক্তি, ‘আমার প্রাণের দেবতা রবিবাবু। আমার সন্তানের জনক হিসেবে, দেশের খ্যাতিমান সাহিত্যিক হিসেবে আমি তাকে শ্রদ্ধা করে এসেছি আজীবন। সে আমার স্বামী, কিন্তু প্রেমিক নয়। ...তার মন পড়ে ছিল অন্য নারীতে।’ অন্তিম অনুযোগ করছেন এই বলে, ‘সারাটা জীবন রবিবাবুর মনোতুষ্টিতে কাটল আমার। আমার ভালো লাগার দিকে দৃকপাত করেনি কখনো সে। এই মুহূর্তে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে, আমি মৃণালিনী নই, আমি ভবতারিণী। রবিবাবুর স্ত্রী ছাড়াও আমার নিজস্ব একটা সত্তা ছিল, সেই সত্তার প্রতি রবিবাবু কোনো দিন সুবিচার করেনি।’ নারী যে শুধু নারী নন, ব্যক্তিসত্তাও, এই অনুযোগের ভেতর দিয়ে তা প্রকাশিত।
পুরো উপন্যাসে এসব কথাই লেখেন মৃণালিনী তথা ভবতারিণী, রবিঠাকুরের স্ত্রী ডায়েরির আকারে। হরিশংকর জলদাসের লেখনী-নৈপুণ্যে সেই ডায়েরি হয়ে উঠেছে এক নারীর দলিত ব্যক্তিসত্তার হাহাকার দীর্ণতার দিনলিপি।

আমি মৃণালিনী নই
হরিশংকর জলদাস
প্রচ্ছদ: কাইয়ুম চৌধুরী
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
১৬৮ পৃষ্ঠা
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

বাঙালীত্বের আয়নায় দ্বারকানাথ - হরিশংকর জলদাস

বাঙালীত্বের আয়নায় দ্বারকানাথ - হরিশংকর জলদাস
বাঙালীত্বের আয়নায় দ্বারকানাথ
হরিশংকর জলদাস

বই নিয়ে শুধুমাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, বই নিয়ে শুধু মাত্র বই নিয়েই আমাদের এই প্রয়াস। ধ্বংস ও ধসের সামনে বই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শাণিত অস্ত্র। বইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে চারিদিকে আশঙ্কা, নতুন প্রজন্ম চকঝমকের আকর্ষণে বইয়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। আমাদের এ আয়োজন বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনিঃশেষ ও অবিচ্ছিন্ন করে রাখা। আশাকরি আপনাদের সহযোগিতায় আমাদের এই ইচ্ছা আরোও দৃঢ় হবে। দুনিয়ার পাঠক এক হও! বাংলা বই বিশ্বের বিবিধ স্থানে, সকল বাংলাভাষীর কাছে সহজলভ্য হোক!
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

জীবনানন্দ ও তাঁর কাল - হরিশংকর জলদাস

জীবনানন্দ ও তাঁর কাল - হরিশংকর জলদাস
জীবনানন্দ ও তাঁর কাল - হরিশংকর জলদাস
আজ পর্যন্ত জীবনানন্দকে নিয়ে নানা ধরনের বই লেখা হয়েছে। কেউ তার কবিতার নান্দনিকতা নিয়ে বই লিখেছেন, কেউ জীবনানন্দের ওপর পাশ্চাত্য প্রভাব কতটুকু—তা নিয়ে তাদের বইতে বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন। তার জীবনীও লিখেছেন কেউ কেউ। কিন্তু ‘জীবনানন্দ ও তার কাল'- এর মত গ্রন্থ বোধহয় এই প্রথম। উল্লেখ্য, এই বইটি তত্ত্বমূলক নয়, তথ্যবহুল। এই গ্রন্থে জীবনানন্দের ৫৫ বছরের জীবনকে সালওয়ারি বিন্যস্ত করা হয়েছে। স্বাভাবিক কারণে কেন্দ্রভূমিতে জীবনানন্দ দাড়িয়ে থাকলেও সম-সময়ের অন্যান্য সাহিত্য-কুশীলবরা এই গ্রন্থে উপেক্ষিত হননি। বইটির লেখক হরিশংকর জলদাস।




This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

হরিশংকর জলদাশের এপিকধর্মী উপন্যাস 'একলব্য'।

amarboi 'একলব্য' - হরিশংকর জলদাশ

হরিশংকর জলদাশের এপিকধর্মী উপন্যাস 'একলব্য'।
এক.
সকাল। উজ্জ্বল, আলোকিত।
‘বাবা, আপনি যতই নিষেধ করেন. আমি মানব না।’
চমকে উঠলেন হিরণ্যধনু। বললেন, মানবে না! কেন মানবে না আমার নিষেধ!’
আপনার নিষেধ আমার বাসনা পূরণের অন্তরায়।
বাসনা পূরণের অন্তরায়! আমার সাবধানবাণী তোমার বাসনা পূরণের অন্তরায়! তুমি এসব কী বলছ একলব্য? চিত্তচাঞ্চল্যে হিরণ্যধনুর কণ্ঠ বুজে এল।
পিতার কথা শুনে একটুখানিও ভড়কাল না একলব্য। কণ্ঠকে আরও দৃঢ় করে বলল, “পিতা পুত্রের উন্নতি চান, সর্বদা। এটাই মানববিধি। আপনি তার ব্যতিক্রম। পিতা হয়ে আপনি আমার উন্নতি চাইছেন না। উপরন্তু উন্নতির পথে অন্তরায় হয়ে দাড়াচ্ছেন।”
হিরণ্যধনুর পাশে দাড়িয়ে ছিলেন বিশাখা। বিশাখা একলব্যের মা। পুত্রের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা শুনে বিশাখা স্তম্ভিত। ঘোরাচ্ছন্ন চোখ বড় করে বিশাখা একলব্যের উদ্দেশে কিছু একটা বলতে চাইলেন। কিন্তু তার গলা দিয়ে গরগর আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই বের হল না।
হিরণ্যধনু বাম হাত তুলে বিশাখাকে করলেন। তারপর মিয়মাণ কষ্ঠে একলব্যকে বললেন, ভুল বুঝেছ। পুত্র। পিতা কখনো পুত্রের উন্নয়নপথের কাটা হয় না। আমিও তোমার সমৃদ্ধির অন্তরায় নই। তোমাকে সতর্ক করে পিতার কর্তব্য পালন করছি মাত্র।
"সতর্ক করছেন!" এবার একলব্যের বিস্ময়ের পালা। এমন কী বিপদের আভাস পাচ্ছেন যে, আমাকে সাবধান করতে হচ্ছে আপনাকে?"
হিরণ্যধনু বললেন, ‘তুমি ভুল করতে যাচ্ছ পুত্র। চরম ভুল করতে যাচ্ছ।
‘একজন মহান অস্ত্রগুরুর কাছে একজন তরুণ শিক্ষা গ্রহণ করতে যেতে চাইছে, এতে ভুলের কী আছে বাবা?
আছে, আছে।' বলে নিশ্চুপ হলেন হিরণ্যধনু।
পিতা আরও কিছু বলেন কি না অপেক্ষায় থাকল একলব্য।
হিরণ্যধনু তাঁর নীরবতা ভাংচ্ছেন না দেখে একলব্য নিচু স্বরে আবার আবার জিজ্ঞেস করল, কী ভুল বাবা?”
হিরণ্যধনু যেন একলব্যের কথা শুনতে পাননি। গবাক্ষ দিয়ে দূর-পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
বিশাখা স্বভ শান্তস্বরে বললেন, কিছু বলছ না যে! একলব্য তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করছিল।
সহধর্মিণীর দিকে কোমল চোখে তাকালেন হিরণ্যধনু। তারপর সেই চোখ ফেরালেন একলব্যের দিকে। বললেন, তোমার জীবনপথে অন্তরায় সৃষ্টি করার জন্য আমি তোমাকে সতর্ক করছি না। ভুলের মাশুল গোনার আগে তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি মাত্র। তুমি যেও না দ্রোণাচার্যের কাছে। তুমি ব্যর্থ হবে। তোমার মনস্কামনা পূর্ণ হবে না।’
একলব্য অস্থির গলায় দ্রুত বলে উঠল, আপনি কি আমাকে অভিশাপ দিচ্ছেন বাবা?
এবার প্রশান্ত চোখে অনেকক্ষণ একলব্যের দিকে তাকিয়ে থাকলেন হিরণ্যধনু। তারপর স্নেহময় কষ্ঠে বললেন, তুমি আমার পুত্র, জীবনের অবলম্বন। উত্তরাধিকারের মূলভূমি তুমি আমার । তোমার জন্য কি আমার অভিসম্পাত সাজে?'
তাহলে, তাহলে আমাকে বাধা দিচ্ছেন কেন বাবা?
বাধা দিচ্ছি- তোমার ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি বলে।’ ‘কী ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন? মন্দ কিছু কি?” অস্পষ্ট শ্লেষ একলব্যের কণ্ঠে একটু করে ঝিলিক দিয়ে উঠল বুঝি।
পুত্রের প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলেন না হিরণ্যধনু। সারা মুখে ইতস্তত ভাব। এক গভীর উদ্বেগ তাকে ঘিরে ধরেছে। পুত্রের প্রশ্নের উত্তর দিলে সত্যটা বেরিয়ে আসবে। এই সত্য একলব্যের হৃদয় ভেঙে চুরমার করে দেবে। তার চেয়ে মৌন থাকাই উত্তম। হিরণ্যধনু ভাবলেন- একলব্য নাছোড়। দ্রোণাচার্যের কাছে অস্ত্রচালনা শিখবার জন্য সে যাবেই। তার কথাবার্তা আর আচরণ বলছে- এ ব্যাপারে পিতার নিষেধ শুনতে সে রাজি নয়। সুতরাং বাধার প্রাচীরকে আরও সুদৃঢ় করা উচিত হবে না। হিরণ্যধনু ঠিক করলেন- একলব্যকে আর বাধা দেবেন না তিনি। একলব্য দ্রোণাচার্যের কাছে যেতে চায় যাক। একলব্য যুবক। তারুণ্যের অনুরণন তার শিরায় শিরায়। উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাকে উদ্বেল করেছে। পিতার নিষেধ যে যথার্থ কারণে, তা খুলে বললেও একলব্য বুঝবে না; বুঝতে চাইবেও না এই মুহুর্তে। তাই একলব্যকে দ্রোণাচার্যের কাছে যেতে দেওয়া উচিত। ঠেকে শিখুক সে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন হিরণ্যধনু। তারপর বললেন, তুমি পুস্তুত হতে থাক পুত্র পুরোহিত ডেকে আমি তোমার যাত্রার দিনক্ষণ নির্ধারণ করে দিচ্ছি। তুমি আচার্য দ্রোণের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে যথার্থ ধনুর্ধর হয়ে রাজধানীতে ফিরে এস। রাজপ্রাসাদ প্রস্তুত থাকবে তোমাকে স্বাগত জানাবার জন্য । আমরা তোমার ফেরার দিনের অপেক্ষায় থাকব।'
স্ত্রী বিশাখার দিকে তাকিয়ে কথা শেষ করলেন হিরণ্যধনু। পিতার কথা শুনে বিস্মিত চোখে কিছু একটা বলতে চাইল একলব্য। হিরণ্যধনু তার ডান হাতটা তুলে একলব্যকে আর কিছু বলতে নিষেধ করলেন। তার চোখেমুখে তখন বেদনা আর বাৎসল্যের মাখামাখি।

দুই
অপরাতু। রোদের গায়ে পাতলা কুয়াশার আস্তর।
নৃপাসনে বসে আছেন অনোমদশী। অনোমদশী মহারাজ হিরণ্যধনুর পিতা। দীর্ঘদেহী। বয়োভারে কিছুটা ন্যুজ, পক্ক কেশ । চামড়া সামান্য কুঁচকে গেছে। সবল পেশি এখনও অনোমদর্শীর শরীরে বর্তমান। কুচকুচে কালো শরীরে অপরাহ্লের ছেঁড়া রোদ ঝিলিক দিচ্ছে।
পুত্র হিরণ্যধনু রাজকার্যে দক্ষ হয়ে উঠলে একদিন পুত্ৰহস্তে রাজ্যভার সমর্পণ করলেন তিনি।
প্রবীণ পারিষদরা বাধা দিয়েছিলেন, “মহারাজ, এখনো আপনার শরীরে নদীর খরস্রোত, আপনাকে সামনে দেখে পশুরাজ এখনো লেজ গুটিয়ে পালায়। আপনার শাসনে এই অরণ্যরাজ্যের সকল প্রজা পরম সুখে আছে। আপনি এখনো একজন সক্ষম বিচক্ষণ বিচারক । আপনি কেন এখন রাজ্যভার যুবরাজ হিরণ্যধনুর হাতে তুলে দেবেন? আপনি আরও কিছু বছর রাজ্য শাসন করুন।'
অনোমদশী পারিষদদের কথা শুনে বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকলেন। তারপর বললেন, হিরণ্যধনু যুবক হয়ে উঠেছে। তার রাজকার্যদক্ষতা প্রশংসনীয়। কঠিন সমস্যার সহজ সমাধান দিতে শিখে গেছে হিরণ্যধনু। তাকে বিয়ে করিয়েছি। ও আমার একমাত্র পুত্র। আমার বয়স হয়ে গেছে। রাজকাৰ্য পরিচালনার জন্য যে দম আর বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন, তার কিছুটা ঘাটতি আমার মধ্যে লক্ষ করছি। তা ছাড়া ...।'
সেনাধ্যক্ষ অনোমদশীর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, ‘তা ছাড়া! তা ছাড়া কী মহারাজ?
‘বলছি। পুত্র উপযুক্ত হয়ে উঠলে মাতা-পিতার মন তৃপ্তিতে ভরে ওঠে। হিরণ্যধনু উপযুক্ত হয়ে উঠেছে। তাকে রাজ্যভার দিয়ে আমি নিশ্চিত হতে চাই যে, সে একজন সুবিবেচক, সুশাসক। আমার সকল ইন্দ্রিয় সক্রিয় থাকতে থাকতে হিরণ্যকে রাজা ঘোষণা করে তার রাজ্যশাসন প্রণালিটা আমি দেখে যেতে চাই। তোমরা আমাকে বাধা দিও না। মৃত্যুর আগে এই তৃপ্তিটুকু পেতে চাই- হিরণ্যধনু ব্যাধসমাজের একজন খ্যাতিমান রাজা।’
তার কথা শুনে সেদিনের রাজসভার সকল পারিষদ আর কথা বাড়াননি।
শুভক্ষণে অনোমদর্শী হিরণ্যধনুকে রাজসিংহাসনে বসিয়েছিলেন।
রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরের একটি কক্ষকে রাজকীয়ভাবে সজ্জিত করিয়েছেন হিরণ্যধনু। রাজসভার আদলে এই কক্ষটি নির্মাণ করা হয়েছে। পাশেই অনোমদর্শীর শয্যাকক্ষ। একা থাকেন তিনি ওই কক্ষে। বেশ ক'বছর আগে রাজমাতার মৃত্যু হয়েছে। পুত্রকে রাজ্যভার অর্পণের পর রাজপিতা এই কক্ষে বাস করা শুরু করেছেন। রাজার শয্যাকক্ষটি পুত্র হিরণ্যধনুর অনুকূলে ছেড়ে দিয়েছেন অনোমদর্শী। কারণ এখন তিনি মহারাজা নন, রাজপিতা মাত্র।
রাজপিতা হলে কী হবে, রাজকার্য পরিচালনায় অথবা পরিবারকেন্দ্রিক কোনো সংকট দেখা দিলে হিরণ্যধনু পিতার পরামর্শ গ্রহণ করেন। পিতার শয্যাকক্ষের পাশের রাজকীয় কক্ষে এসে বসেন। পিতা এসে নৃপাসনে বসেন, পুত্র সাধারণ একটা আসন গ্রহণ করে পিতার পায়ের কাছে বসেন।
আজ হিরণ্যধনুর পরিবারে সংকটকাল উপস্থিত। একলব্য হস্তিনাপুর গমনে উদ্যত। সে দ্রোণাচার্যের কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিখবার জন্য বেপরোয়া। পুত্রকে যাবার অনুমতি দিয়েছেন বটে। তারপরও মনটা বড় খচখচ করছে। পিতার পরমার্শই শিরোধার্য। তাই আজ অপরাহ্নে পিতার কাছে এসেছেন হিরণ্যধনু উপদেশের জন্য, পরামর্শের জন্য। হিরণ্যধনু এই মুহূর্তে কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
পিতা কক্ষে প্রবেশ করলে আসন ছেড়ে উঠে দাড়ালেন হিরণ্যধনু। অনোমদশী বললেন, বস, বস। নিজে আসন গ্রহণ করে পুত্রের দিকে তাকালেন। দেখলেন- ভীষণ একটা উদ্বিগ্নতা হিরণ্যধনুর চোখেমুখে। কী রকম যেন বিপর্যন্ত অবস্থা তার! কঠিন সমস্যাতেও বিচলিত হয় না যে, তাকে বিষগ্ন বিচলিত দেখে অনোমদশী নিজের মধ্যেও চঞ্চলতা অনুভব করলেন। নিজেকে সংযত করে বললেন, ‘তুমি কি কোনো সংকটে পড়েছ হিরণ্য?
হিরণ্যধনু বিব্রতমুখে বললেন, ‘হ্যা, বাবা।’
রাজ্য সংক্রান্ত কিছু কি?
না বাবা।
‘তাহলে!’ বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন অনোমদর্শী।
'পরিবার সংক্রান্ত।’ মাথা নিচু করে উত্তর দিলেন হিরণ্যধনু।
‘পরিবার সংক্রান্ত! তোমার পরিবারে আবার কী সংকট? তোমার মা নেই, মানি। বাবা তো আছি। তোমার ঘরে কোনো যুবতি কন্যা নেই। যুবতি কন্যারা পারিবারিক সংকট তৈরি করে। তা ছাড়া তোমার তো একটি মাত্র সন্তান একলব্য। কৈশোর ছাড়িয়ে তরুণ হয়ে উঠেছে সে। বিশ বছরের যুবা। বিদ্যার্জন সমাপন করেছে সে। ধীর, স্থির। তবে আবেগটা তার একটু বেশি।’ ধীরে ধীরে কথাগুলো বলে গেলেন অনোমদর্শী।





This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

হরকিশোরবাবু ও অন্যান্য ছোটগল্প - হরিশংকর জলদাস

হরকিশোরবাবু ও অন্যান্য ছোটগল্প - হরিশংকর জলদাস
হরকিশোরবাবু ও অন্যান্য ছোটগল্প
হরিশংকর জলদাস

সেদিন সকাল ৭টা ৩৫ মিনিটে হরকিশোরবাবু মারা গেলেন। বইচাপা পড়েই মারা গেলেন তিনি।
তাঁর মারা যাওয়ার কোনো কারণ ছিল না। বয়স তাঁর ৫৫ হলেও শরীরে কোনো রোগবালাই ছিল না। প্রেসার ছিল নরমাল, ডায়াবেটিস, ক্ষুধামান্দ্য, মাথা ঝিমঝিম, হাঁটতে কষ্ট – কোনোটাই ছিল না হরকিশোরবাবুর। পাঁচ ফুট আট ইঞ্চির হরকিশোরবাবুর শরীর ছিল সুঠাম, শুধু গলার চামড়াটা কুঁচকে গিয়েছিল সামান্য। সাধারণ বাঙালির মতো পেটটা শরীরের বাইরে ইঞ্চি আড়াই বাড়া ছিল। ধবধবে সাদা হয়ে যাওয়া পাতলা চুলে কলপ দিতেন। কলপ দিলে অনেকের ইনফেকশন হয়, হরকিশোরবাবুর হতো না। সপ্তাহের দু-তিনদিন সকাল বা বিকেলের দিকে কর্ণফুলীর পাড়ে হাঁটতেন তিনি। হাঁটতে হাঁটতে হাত-পা নাড়তেন, বড় বড় শ্বাস নিতেন। বলতেন – ‘শরীর ঠিক রাখার জন্যে নদীপাড়ে সপ্তাহে দু-তিনদিন হাঁটলেই যথেষ্ট। এতেই শরীর ঠিক থাকে।’ হরকিশোরবাবুর শরীর ঠিক ছিল। তারপরও তাঁকে মরতে হলো। সকালবেলায় বই আর বুকশেলফের নিচে পড়ে মরতে হলো তাঁকে।
একটা কলেজে অধ্যাপনা করেন তিনি। সংসারে স্ত্রী, এক পুত্র, দুই কন্যা। বড় মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছেন। ঘটক বলেছিল – বড় চাকরি করে ঢাকায়, এমএ পাশ। হরকিশোরবাবু ভালো করে খোঁজখবর না নিয়ে বিয়েতে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। স্ত্রী বলেছিলেন, ‘তাড়াহুড়োর দরকার নেই। খোঁজখবর নাও Ñ বাড়িঘর, মা-বাবা, চাকরি, বেতন – এসবের।’
হরকিশোরবাবু বলেছিলেন, ‘ঘটক আমার দীর্ঘদিনের চেনা। মিথ্যে বলবে না। ছেলের সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে ছেলের বাপ-মা আসবেন। দেখা হবে তাদের সঙ্গে। ঘরবাড়ির কথা বলছ? এখন গ্রামে কেউ থাকে নাকি? গ্রামের ভিটেবাড়ির খবর নিয়ে লাভ কী? শহরেই থাকবে তোমার মেয়ে।’
বড় মেয়েটির বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। পরে জানা গেছে, জামাই বড় একটি বেসরকারি অফিসের কেরানি। স্বল্প বেতন। চেহারাটা শুধু মাকাল ফল। সেই থেকে দারিদ্র্যে খাবিখাচ্ছে বড় মেয়েটি। একটি ছেলে হয়েছে, আরেক সন্তান হয় হয়। কারণে-অকারণে চলে আসে শিউলি বাপের বাড়ি। অভাবের নামতা পড়ে মায়ের সামনে। মা ঝামটা দেয় – ‘আমার সামনে ঘ্যানর-ঘ্যানর করস কেন? যাস না কেন পরফেসারের কাছে। গিয়ে বল, মাসে মাসে মাসোহারা দিতে হবে আমাকে। কেন ঠেলে দিয়েছিলে আমাকে ওরকম হা-ভাতে ঘরে?’
শিউলি বাপের সামনে যায় না। মায়ের মন নরম হয়ে আসে। যাওয়ার সময় মেয়ের হাতে দু-চার-পাঁচশো টাকা গুঁজে দেয়।
ছোট মেয়েটি এসএসসি পাশ করল এবার। কমার্স থেকে কম জিপিএ পেয়ে পাশ করেছে বেলি। হরকিশোরবাবু বলে দিয়েছেন, ‘সরকারি কলেজে ভর্তির আশা নেই। বেসরকারি কলেজেই পড়তে হবে বেলিকে।’
ফুলের প্রতি গভীর ভালোবাসা হরকিশোরবাবুর। তাই মেয়েদের নাম রেখেছেন শিউলি, বেলি। ছোট একটি বারান্দা আছে তাঁর ফ্ল্যাটে। ওখানে নানা ফুলগাছের টব। হাসনাহেনা, জবা, বেলি, অপরাজিতা, গাঁদা Ñ এসব ফুলগাছ টবে-টবে। সন্ধের দিকে কলেজ থেকে ফেরেন হরকিশোরবাবু। নিজের মুখ-হাত ধোয়ার আগে টবে-টবে পানি দেন। গোটা দিনের রোদে আধমরা পাতাগুলো সতেজ হয়ে ওঠে। পাতায়-পাতায় হাত বুলান আর বিড়বিড় করে কীসব বলেন হরকিশোরবাবু।
সুকুমারী একদিন জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘বিড়বিড় করে কী বলো তুমি?’
‘গাছের সঙ্গে কথা বলি।’
সুকুমারী হরকিশোরবাবুর কথার অর্থ বুঝতে পারেন না। গজর-গজর করতে করতে স্থানান্তরে যান।
বিয়ের পর স্ত্রী সুকুমারীর নামটাও পালটে দিতে চেয়েছিলেন হরকিশোরবাবু। কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে সুকুমারীকে টগর বলে ডেকে ফেলেছিলেন তিনি। মুখে ঝামটা দিয়ে সুকুমারী বলেছিলেন, ‘এসব কী? টগর মানে কী? আমার নাম সুকুমারী, মা-বাবার দেওয়া নাম। এটা পালটে টগর কেন? টগর কে? ও বুঝেছি, আগের প্রেমিকা! তা টগরে গন্ধ ছিল তো? গন্ধ যদি ছিল তো সুকুমারীকে বিয়ে করা কেন?’
বোকা বনে গিয়েছিলেন সেদিন হরকিশোরবাবু। ফুলকে তিনি ভালোবাসেন। এমন ভালোবাসেন যে, পারলে পৃথিবীর সবকিছুর নাম ফুলের নামে রাখতেন। কিন্তু পৃথিবী তো তাঁর আজ্ঞাধীন নয়! তাই আপনজনের নাম ফুলের নামে রেখে আনন্দ পেতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সুকুমারী কিসের সঙ্গে কী মেলাল? ব্যথায় টনটনিয়ে উঠেছিল হরকিশোরবাবুর বুকটি। গলায় জোর ঢেলে বলেছিলেন, ‘কিসের মধ্যে কী, পান্তাভাতে ঘি! তুমি বড় সন্দেহপ্রবণ সুকুমারী। সন্দেহ সবসময় তোমাকে কুরে-কুরে খায়। ভালোবেসে তোমাকে টগর ডেকেছি। সেখানে মিথ্যে প্রেমিকার খোঁচা!’
‘নাম পালটাবার ইচ্ছে কেন তোমার? সুকুমারী নামে ভালোবাসা জানানো যায় না?’ একটু থেমে সুকুমারী আবার বলেছিলেন, ‘তা, মা-বাবার দেওয়া নামে হস্তক্ষেপ কেন?’ তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন সুকুমারী, ‘এটা তো শুধু তোমার অভ্যাস নয়। তোমরা পুরুষরা তো এরকমই হও।’
‘মানে!’ অবাক হয়েছিলেন হরকিশোরবাবু।
‘তোমার রবীন্দ্রনাথ বউয়ের নাম পালটে দিয়েছিলেন, তার দেখাদেখি নজরুলও একই কাজ করেছিলেন। তাঁদেরই তো চেলা তুমি! বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক। রবীন্দ্র-নজরুল বদলালেন, তুমি বদলাবে না!’ সুকুমারী বললেন।
হরকিশোরবাবু উষ্ণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এত রহস্য করছ কেন? খুলে বলো না।’
সুকুমারী ব্যঙ্গের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘কেন রবীন্দ্রনাথ ভবতারিণীর নাম পালটে মৃণালিনী আর নজরুল আশালতার নাম পালটে প্রমীলা রাখেননি! মুখে তো অনেক বড় বড় কথা – নারী-স্বাধীনতা, নারী-স্বাধীনতা। নারী-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে তো তোমাদের বাধে না!’
‘কী আশ্চর্য! কিসের মধ্যে কিসের ব্যাখ্যা!’ হরকিশোরবাবু বলেছিলেন।
‘আশ্চর্য বলো আর যা-ই বলো, আমার সঙ্গে ওসব চুদুর-ভুদুর চলবে না। ওসব টগর গোলাপ নিয়ে অন্যের সঙ্গে পুটুর-পাটুর করো, আমার সঙ্গে না।’ বলে হনহন করে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন সুকুমারী।
পেছনে স্বগত কণ্ঠে হরকিশোরবাবু বললেন, ‘চুদুর-ভুদুর, পুটুর- পাটুর – এসব কথার মানে কী!’
স্ত্রীর দুঃখে সন্তানদের নাম রাখলেন তিনি ফুলের নামে। ছেলে হলে নাম দিলেন অম্লানকুসুম। মেয়েদের দিলেন টগর-বেলি।
সুকুমারী বাদ সেধেছিলেন। কিন্তু কেন জানি সেদিন হরকিশোরবাবু খুব পৌরুষের পরিচয় দিয়েছিলেন। তর্জনী উঁচিয়ে স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘তোমার ছেলেমেয়েদের নাম তুমি গেন্দা, চকোলেট, পেপসি, ফয়’স লেক যা ইচ্ছে রাখ, আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আমার ইচ্ছেয় হস্তক্ষেপ করবে না বলে দিলাম। তেড়িবেড়ি করলে বহুত অসুবিধা হবে।’
হরকিশোরবাবুর সেদিনের চেহারা দেখে ভড়কে গিয়েছিলেন সুকুমারী। সেদিন আর কথা বাড়াতে সাহস করেননি। হরকিশোরবাবুর ইচ্ছাতেই ছেলেমেয়েদের নাম অম্লানকুসুম, শিউলি-বেলি থেকে গিয়েছিল।
হরকিশোরবাবু একটু-আধটু লেখালেখি করেন। দু-চারটা বইও বেরিয়েছে এর মধ্যে। একটা বই কী যেন একটা পুরস্কারও পেয়েছে। পুরস্কার পাওয়ার পর বইবাজারে হরকিশোরবাবুর একটু ডিমান্ড হয়েছে। হরকিশোরবাবু যতœ করে বই লেখেন। উপন্যাসই লেখেন তিনি। উপন্যাস লেখার কথা ছিল না তাঁর। ছোটবেলা থেকে বই সংগ্রহ করতেন তিনি, মনোযোগ দিয়ে বই পড়তেন। স্কুলের হেডস্যার তাঁকে হরপোকা ডাকতেন। দফতরিকে বলতেন, ‘হরপোকাকে ডেকে আন।’
দফতরি জিজ্ঞেস করত, ‘হরপোকা কে স্যার?’
‘আরে বেটা হরকিশোর আর কি। দেখস না হরদম বইয়ের মধ্যে নাকচোখ ডুবিয়ে বসে থাকে। বইপোকা সে। হরকিশোরের হর আর বইপোকার পোকা। দুটো মিলে হরপোকা। যা যা ডেকে আন।’ বলে হা-হা করে হেসে উঠতেন হেডস্যার।
বই পড়ে পড়ে নিজের মধ্যে একটা ভাবনার জগৎ তৈরি করে ফেলেছিলেন হরকিশোরবাবু।
একদিন বাংলা বিভাগে বসে আছেন তিনি। ওই সময় ক্লাস ছিল না তাঁর। বিভাগীয় প্রধান আইয়ুব ভূঁইয়া হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, ‘হরকিশোরবাবু, মানিকের পদ্মানদীর মাঝি আপনার কেমন লাগে?’
আইয়ুব ভূঁইয়া নদীভিত্তিক বাংলা উপন্যাসের ওপর পিএইচ-ডি করেছেন। মানিক তাঁর ভালো করে পড়া। হরকিশোরবাবু শুনেছেন Ñ পদ্মানদীর মাঝি তাঁর থিসিসের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিভাগীয় প্রধানের প্রশ্নে হরকিশোরবাবু একটু থতমত খেয়ে গিয়েছিলেন সেদিন। আইয়ুব ভূঁইয়ার প্রশ্নকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আইয়ুব ভূঁইয়া নাছোড়।
হরকিশোর বলেছিলেন, ‘পদ্মানদীর মাঝি আমার পছন্দ না স্যার।’
‘কেন কেন? যে-বই নিয়ে বাঙালি অহংকার করে, আপনি বলছেন সে-বই আপনার পছন্দের না!’
‘স্যার, আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আপনাকে একটা প্রশ্ন করি?’
ভূঁইয়া সাহেব একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘করেন।’
‘মানুষ পাচার করা আজকালকার সমাজে অপরাধ কিনা? মাদকদ্রব্য চোরাচালান সমাজে আজো নিন্দনীয় আর বেআইনি কিনা?’ হরকিশোরবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
‘হ্যাঁ, এ দুটো ব্যাপার তো নিন্দনীয় এবং বেআইনি।’ আইয়ুব ভূঁইয়া বললেন।
হরকিশোরবাবু বললেন, ‘এখন যেমন নিন্দনীয় ১৯৩৫-৩৬ সালেও নিশ্চয় নিন্দনীয় ছিল।’
‘তা তো বটেই।’
‘এই দুটো বেআইনি ও নিন্দনীয় ব্যাপারকে মানিক তাঁর পদ্মানদীর মাঝিতে প্রশ্রয় দিয়েছেন। হোসেন মিয়াকে দিয়ে এ দুটো বেআইনি কাজ করিয়েছেন তিনি। এজন্যে পদ্মানদীর মাঝি আমার ভালোলাগে না স্যার।’ হরকিশোরবাবু বেশ আস্থার সঙ্গে কথাগুলো বললেন।
প্রিয় লেখক সম্পর্কে বদনাম আইয়ুব ভূঁইয়া সহ্য করলেন না। নন্দিত বইয়ের নিন্দিত ব্যাখ্যা Ñ মানতে নারাজ তিনি। উষ্ণ কণ্ঠে বললেন, ‘বাজে সমালোচনাই করলেন শুধু হরকিশোরবাবু। নিজে তো এক কলম কোনোদিন লেখেননি। নিন্দে করতে পঞ্চগলা।’
‘লিখব স্যার।’
‘কী লিখবেন? ঘোড়াড্ডিম!’ হরকিশোরবাবু না শুনে মতন করে বললেন আইয়ুব ভূঁইয়া।
‘ঘোড়াড্ডিম না স্যার। উপন্যাসই লিখব। জেলেদের নিয়ে। দেখবেন স্যার আমার বই মানুষে পড়বে।’ দৃঢ়কণ্ঠে কথাগুলো বলেছিলেন হরকিশোরবাবু।
অধিক বয়সে কলম ধরেছিলেন তিনি। লিখেছিলেন ধীবরখণ্ড নামের উপন্যাস। পাঠকরা পড়েছিলেন সে-বই।
সেই থেকে তাঁর লেখালেখি। জীবনের নানা জটিলতার মধ্যেও লিখে যাচ্ছেন তিনি। প্রকাশকরাও এগিয়ে এসেছেন। দাবি করছেন, ‘আপনার প্রথম বইয়ের মতো একটা উপন্যাস দেন স্যার।’
হরকিশোরবাবু প্রথম বইয়ের মতো উপন্যাস লেখেন না। তবে তাঁর সকল উপন্যাসের কেন্দ্রে থাকে সাধারণ প্রান্তিক মানুষজন। জেলে, মেথর, বেশ্যা, খুনি Ñ এসব।
উপন্যাস লেখার জন্যে নানা বই পড়া দরকার। বই পড়তে গেলে কিনতে হয়। হরকিশোরবাবুর পক্ষে বই কেনা সহজ, কিন্তু বই নিয়ে ঘরে ঢোকা সহজ নয়। সুকুমারীর এক কথা Ñ ‘অপচয় করা চলবে না। ছাইপাশ কিনে কিনে ঘর ভরিয়েছ। এখানে-ওখানে, বিছানার কাছে, পায়ের পাশে বইয়ের স্তূপ। তেলাপোকার আস্তানা হয়ে গেছে গোটা বাসা। পা বাড়াবার জায়গা নেই।’ একটু থেমে সুকুমারী আবার বলেছিলেন, ‘তারপর ধরেছে দেয়াল। শেলফে শেলফে ভরিয়ে তুলেছে চারদিকের দেয়াল। ছোট একটি পড়ার টেবিল। সেই টেবিলের ডানপাশে একটা জানালা ছিল। সেই জানালাঘেঁষা দেয়ালেও ভারি কাঠের শেলফ। শেলফভর্তি বই আর বই। বই দিয়ে দু-চারজন মানুষকে শ্মশানে পোড়ানো যাবে। আর না, আর কেনা যাবে না বই।’
‘বই না কিনলে লিখব কেমনে?’ হরকিশোরবাবু ম্লান কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন।
ঠোঁট উলটে সুকুমারী বলেন, ‘লিখবার জন্য কি বই কিনতে হয় নাকি? যত্তসব ন্যাকামি। আর কোনোদিন বই নিয়ে ঘরে ঢুকবে না, বলে দিলাম।’
তারপরও বই কেনেন হরকিশোরবাবু। সন্ধের দিকেই সময় পান বইদোকানে যাওয়ার। পছন্দের বই কেনেন হরকিশোরবাবু কিন্তু বই নিয়ে সরাসরি ঘরে ঢোকেন না তিনি।
যে-বাসায় তিনি থাকেন, তার সামনে ছোট একটি উঠান। উঠানে আদ্যিকালের একটি আমগাছ। জীর্ণ গাছটিতে ফল ধরে না। বৃদ্ধ বাড়িওয়ালা তারপরও আমগাছটি কাটেন না। বলেন, ‘আমার বাবার হাতের আমগাছ। নিজ হাতে লাগিয়েছিল এখানে। ক-ত আম ধরত! ফল দিয়ে দিয়ে বুড়ো হয়েছে।’
কথাপ্রসঙ্গে হরকিশোরবাবু একদিন বলেছিলেন, ‘বুড়ো গাছ, জীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। কেটে ফেলেন না দাদা। জায়গা পরিষ্কার হতো।’
ম্লানমুখে বাড়িওয়ালা নগেনবাবু কিছুক্ষণ হরকিশোরবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর বলেছিলেন, ‘অধ্যাপক বাবু, আপনার কাছে এ-গাছের কোনো মূল্য না থাকতে পারে, আমার কাছে আছে। আমার বাবার ছোঁয়া লেগে আছে এ-গাছে। কাটি কী করে? ফল না দিক ছায়া তো দিচ্ছে।’ নগেনবাবুর বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসেছিল। হরকিশোরবাবুকে লক্ষ করে আরো বলেছিলেন, ‘বুড়ো হলেই সবকিছুকে বিসর্জন দেওয়া যায় কি হরকিশোরবাবু?’
হরকিশোরবাবু কোনো জবাব না দিয়ে ইতস্তত করেছিলেন। নগেনবাবু নিজেই উত্তর দিয়েছিলেন, ‘প্রাচীন জিনিস আজকাল সমাজে মূল্য হারাচ্ছে। এই আমার মতো বুড়োদের কথাই ভাবুন না কেন? জোয়ান ছিলাম, পয়সা কামাতাম। পরিবারে কত দাম ছিল! আর আজ পুরনো টিনের মতো হয়ে গেছি।’
নগেনবাবুর দুই ছেলে। ছেলের বউরা হরদম ঝগড়া করে। ছেলেরাও প্রায় সময় ঝগড়ায় অংশ নেয়। তাঁর ঘরে পরিবেশ বলে কিছুই নেই। মাঝেমধ্যে ঝগড়ার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ান নগেনবাবু। থামাতে চান ঝগড়া। একদিন বড়ছেলে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নগেনবাবুকে বলল, ‘বুইড়্যা মানুষ, আমাদের মাঝখানে নাক গলাবে না। যাও এখান থেকে।’
হরকিশোরবাবু সেদিন অবাককণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘পুরনো টিনের সঙ্গে বুড়োদের সম্পর্ক কী?’
‘পুরনো টিন জীর্ণ হয়ে যায়। মাঝখানে মাঝখানে মরিচা ধরে। ফুটো হয়ে যায়। ফুটো দিয়ে বৃষ্টি পড়ে বলে চাল থেকে নামিয়ে ফেলা হয় পুরনো টিন। উঠানের একপাশে ফেলে রাখা হয় সেই পুরনো টিন। একদিন পরিবারের কেউ বলে Ñ এই টিনে পা কাটবে বাচ্চাদের। দূরে ফেলে দাও এগুলো। কিন্তু ফেলবে কেন? ফেলে দেওয়ার চেয়ে ওই টিন দিয়ে কাঁচা টাট্টিখানা ঘেরা ভালো। একসময়ের চকচকে নতুন টিনের জায়গা হয় দূরের পুকুরপাড়ের কাঁচা টাট্টিখানায়। আমরা বুড়োরাও পুরনো টিনের মতো। শুধু দূরে ঠেলে দেওয়া! শুধু অপাঙ্ক্তেয় হওয়া!’ দীর্ঘক্ষণ কথা বলে থেমেছিলেন নগেনবাবু।
হরকিশোরবাবু আর কথা বাড়াবার সাহস করেননি। কিসের মধ্য থেকে আবার কোন গভীর দুঃখের কথা বেরিয়ে আসে নগেনবাবুর মুখ থেকে!
সেই আমগাছটির গোড়া খুব যতœ করে বাঁধিয়ে দিয়েছেন নগেনবাবু। বিকেলবেলা সেখানে বসেন। সবার অলক্ষে আমগাছে হাত বুলান।
সেই আমগাছের গোড়ায় বইয়ের প্যাকেটটি রেখে নিস্পৃহ মুখে ঘরে ঢোকেন হরকিশোরবাবু। এদিক-ওদিক তাকান। সুকুমারী রান্নাঘর বা বাথরুমে থাকলে, হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন। আমগাছের গোড়া থেকে প্যাকেটটি নিয়ে দ্রুত ঘরে ঢোকেন তিনি। পুরনো বইয়ের সঙ্গে নতুন কেনা বইগুলো মিশিয়ে দেন।
আবার কোনো কোনো দিন কয়েকটি বই একসঙ্গে পছন্দ হয়ে যায় হরকিশোরবাবুর। সেদিন সব বইয়ের দাম চুকিয়ে একটি মাত্র বই নিয়ে ঘরে ফেরেন। হাতে বই দেখে স্ত্রী হাঁক দেন, ‘আবার বই!’
হরকিশোরবাবু কোনোদিন বলেন, ‘পুরনো বই। ফুটপাতের দোকানে সস্তায় পেলাম। মাত্র ত্রিশ টাকা।’
বইয়ের প্রতি সুকুমারীর কোনোই আগ্রহ নেই। আগ্রহ থাকলে জানতে পারতেন Ñ আড়াইশো টাকার বই ত্রিশ টাকায় চালিয়ে দিচ্ছেন হরকিশোরবাবু।
আবার কোনোদিন বলেন, ‘পথে শান্তিদার সঙ্গে দেখা। বাসায় গিয়ে এক কাপ চা খাওয়ার জন্যে চাপাচাপি করলেন। পুরনো কলিগ। রিটায়ার করেছেন। বুড়ো মানুষটির আবদার ফেলতে পারলাম না। গেলাম তার বাসায়। বইটি ওঁর কাছ থেকে দু-চারদিনের জন্যে ধার এনেছি।’ বইটা যদি সুকুমারী হাতে নিয়ে পরখ করতেন, দেখতেন বইয়ের ভেতরে কেনার রসিদ এবং আজকের তারিখ লেখা আছে সে-রসিদে।
এভাবে বছরের পর বছর ধরে নানা চালাকি আর মিথ্যে বোলচালের মধ্য দিয়ে হরকিশোরবাবু বই সংগ্রহ করে গেছেন। সবই যে পড়া হয় এমন নয়। কেনার পর এক লাইনও পড়েননি Ñ এমন বইও স্তূপীকৃত হয়েছে হরকিশোরবাবুর বাসায়। তারপরও তিনি বই কেনেন। তিনি দুঃখেও বই কেনেন, সুখেও বই কেনেন।
সেবার হরকিশোরবাবু ঠিক করলেন Ñ বেশ্যাদের নিয়ে একটা উপন্যাস লিখবেন। লেখার আগে পড়াশোনা চাই, তথ্য সংগ্রহ করা চাই। এই শহরেই সাহেবপাড়া মানে পতিতাপল্লি। ওখানকার কাস্টমারদের তিনি খুঁজে পেতে বের করেন, তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করেন। তারপর নানা প্রশ্ন। নানা তথ্য সংগ্রহ করে করে তিনি সমৃদ্ধ হন। কিন্তু সরেজমিন তত্ত্ব-তালাশ দরকার। এজন্যে পতিতাপল্লিতে যাওয়া দরকার তাঁর। কিন্তু কী করে যাবেন তিনি? অধ্যাপক মানুষ, শহরের অনেকে তাঁকে চেনে। বুদ্ধি একটা বের করলেন তিনি। কলেজ থেকে পাঁচদিনের ছুটি নিলেন। ওই পাঁচদিন দাড়ি-গোঁফ কাটলেন না। ঘর থেকে বের হলেন না এ পাঁচদিন। স্ত্রীর হাজারো প্রশ্নের জবাব দিলেন না। ষষ্ঠ দিনের দিন সন্ধেয় পুরনো কাপড়-চোপড় পরে স্ত্রীকে আসছি বলে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন হরকিশোরবাবু। টুপ করে ঢুকে গেলেন পতিতাপল্লিতে। অলিগলি ঘুরলেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কাস্টমার, বেশ্যা, দালাল, মাসি এদের দেখলেন। গভীর রাতে বোকা বোকা মুখ করে বাসায় ফিরে এলেন হরকিশোরবাবু।
সে-রাতেই বাররামা উপন্যাসের প্রথম প্যারাটি লিখে ফেললেন তিনি।
তাঁর লেখা চলতে লাগল। অধ্যায়ের পর অধ্যায় লিখে যেতে লাগলেন তিনি। এক জায়গায় এসে ঠেকে গেলেন তিনি Ñ মানুষের ভেতরে দেহকামনা জাগে কেন? আদিযুগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত এই দেহকামনার রূপ-রূপান্তর কী? পরের অধ্যায় লেখার জন্যে এসব তাঁর জানা দরকার। হঠাৎ একদিন ‘বাতিঘরে’ একটা বই পেয়ে গেলেন হরকিশোরবাবু Ñ যৌনতার রূপ ও রূপান্তর। যৌনতা বিষয়ে অসাধারণ একটি বই। বইটির দু-চারপাতা ওলটানোর পর স্বর্গীয় আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল তাঁর চোখেমুখে। আরে, এ-বইটির সন্ধান তিনি আগে পাননি কেন? বৈদিক যুগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত দেহকামনার কী অসাধারণ তথ্য ও ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন লেখক এ-বইয়ে! বাররামা লেখার জন্যে এ-বইটিকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেন তিনি। সাতশো টাকা দিয়ে বইটি কিনলেন তিনি। বইটি নিয়ে স্বচ্ছন্দে সেদিন বাসাতেও ঢুকতে পেরেছিলেন হরকিশোরবাবু। সেদিন মেয়ে আর জামাই আসবে বলে ভালোমন্দ রান্নায় ব্যস্ত ছিলেন সুকুমারী।
গণ্ডগোলটা বাধল গভীর রাতে। লেখার টেবিলে বসে বইটি গোগ্রাসে গিলছিলেন হরকিশোরবাবু। মেয়ে আর জামাইকে বিদায় করে রান্নাঘরের পাঠ চুকাতে চুকাতে সুকুমারীর বেশ দেরিই হয়ে গিয়েছিল সে-রাতে।
কখন স্ত্রী পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন টের পাননি হরকিশোরবাবু। এক ঝটকায় বইটি কেড়ে নিয়ে সুকুমারী চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘ছেঃ ছেঃ ছেঃ! কী পড়ছ তুমি? হ্যাঁ, কী পড়ছ? বুড়ো বয়সে একি পড়ছ তুমি?’ প্রচ্ছদের প্রায় নগ্ন দুজন নর-নারীর রেখাচিত্রের ওপর থুতু ছিটিয়ে সুকুমারী আরো বললেন, ‘ঝেঁটা মারি এই বইয়ে।’ তারপর ফুঁপিয়ে উঠলেন তিনি, ‘নরকে যাবে তুমি। হায় ভগবান, আমার কী হবে গো!’
স্তম্ভিত চোখে হরকিশোরবাবু সে-রাতে সুকুমারীর দিকে শুধু তাকিয়ে ছিলেন। কোনো উত্তর দেওয়ার তাগিদ বোধ করেননি তিনি। শুধু ভেবেছেন Ñ চোখের সামনে একসময়ের অসাধারণ একজন তরতাজা প্রাণবান তরুণী কীরকমভাবে ধীরে ধীরে সাধারণ পর্যায়ে নেমে এলো! একটা চকচকে সোনার হার চোখের সামনে গিল্টি হারে রূপান্তরিত হলো সময়ান্তরে!
এরকম নানা যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে হরকিশোরবাবু লিখে যান। গত কয়েক বছরে তিনি জেলেদের নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন, পতিতাদের নিয়ে লিখেছেন; লিখেছেন মেথরদের নিয়ে উপন্যাস। ব্রাত্যজনের লেখক বলে পাঠকসমাজে একটু-আধটু কদরও বেড়েছে হরকিশোরবাবুর।
সেই সুবাদে নানা সাহিত্যসভায় হরকিশোরবাবুর ডাক পড়ে।
যা ভাবেন তিনি, যা বোঝেন Ñ বলে যান সেসব সভাগুলোতে। সেবার এক সাহিত্যসভায় ডাকা হলো তাঁকে। সেদিনের আলোচনার বিষয় ছিল রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর নাটকে পাশ্চাত্য প্রভাব। এক অধ্যাপক খুব ঘেঁটেঘুঁটে প্রবন্ধ লিখেছেন। নানা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন ডাকঘর নাটকে রবীন্দ্রনাথের মৌলিক প্রতিভার কোনো চিহ্ন নেই। জার্মান কবি গ্যেটের কাছ থেকে ধার করা কাহিনি সাজিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ডাকঘরে। আলোচকরা তাইরে-নাইরে করে বক্তৃতা শেষ করলেন। তাঁরা প্রখ্যাত প্রাবন্ধিককে ঘাঁটাতে চাননি। আলোচনা থেকে শ্রোতারা কোনোভাবেই বুঝতে পারলেন না ডাকঘর মৌলিক, না কৃত্রিম।
হরকিশোরবাবুর পালা এলো। তিনি নানা উদাহরণ কোটেশনের মাধ্যমে প্রমাণ করলেন Ñ প্রাবন্ধিক যতই রবীন্দ্রনাথকে ছোট করতে চান না কেন, ডাকঘরে রবীন্দ্রনাথ অনন্য এবং মৌলিক। বক্তৃতা শেষে হাততালি পড়ল বেশ।
সভাশেষে এক মধ্যবয়সী মহিলা এগিয়ে এলেন হরকিশোরবাবুর দিকে। মায়াময় চেহারা। চোখে শান্ত øিগ্ধ সরোবরের ছায়া। কোনো ভূমিকা ছাড়া মহিলা বললেন, ‘আমি আপনার লেখা পছন্দ করি। শুধু আমি না, আমাদের পরিবারের অনেকেই আপনার উপন্যাস পড়ে। এমনকি আমার মা-ও।’
মহিলার পরিচয় হরকিশোরবাবু জানেন না। মহিলার দিকে স্মিত চোখে তাকিয়ে থাকেন।
পাশের একজন নিচুস্বরে বললেন, ‘কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের বোন স্যার, সুফিয়া খাতুন।’
হরকিশোরবাবু এবার হকচকিয়ে গেলেন। তিনি কিছু একটা বলতে চাইলেন, কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বেরোল না তাঁর। মৃদু গোঁ-গোঁ একটা আওয়াজ বেরিয়ে এলো শুধু তাঁর মুখ থেকে।
বেশ কিছুক্ষণ পর একটু আত্মস্থ হলেন হরকিশোরবাবু। বললেন, ‘আদাব।’
সুফিয়া খাতুন বললেন, ‘আদাব হরকিশোরবাবু। আমি যা বলেছি মিথ্যে বলিনি। সত্যি আপনি আমাদের পরিবারের অত্যন্ত প্রিয় লেখক। তবে আপনার বিরুদ্ধে আমার ব্যক্তিগত একটা অভিযোগ আছে।’
‘অভিযোগ!’ অবাক চোখে জিজ্ঞেস করলেন হরকিশোরবাবু।
হ্যাঁ, আপনি বৃত্তাবদ্ধ হয়ে গেছেন।’
‘মানে!’
‘মানে আপনি শুধু প্রান্তমানুষজন নিয়ে লেখেন। মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবন নিয়ে লেখেন না কেন?’
‘আমি যে দিদি ওই ব্রাত্য জনগোষ্ঠীকেই ভালো করে চিনি। অভিজ্ঞতার বাইরের লেখা যে জলো হয়, সেটা তো আপনি জানেন! আধুনিককালের মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাপন চিত্র যে আমার অভিজ্ঞতার বাইরে।’ হরকিশোরবাবু বললেন।
স্পষ্টভাষী সুফিয়া খাতুন বললেন, ‘সত্য নয় আপনার কথা। ওই শ্রেণির মধ্যেই তো আপনার বর্তমান জীবনযাপন। ওদের চেনেন না বললে আমরা মানব কেন? যা-ই হোক, মধ্যবিত্ত জীবন নিয়ে আপনার কাছে একটা উপন্যাস চাই। আপনার ধারণাটা যে ভুল, অন্তত সেটা প্রমাণ করার জন্যে হলেও আপনি একটা উপন্যাস লিখুন।’
সুফিয়া খাতুনের দাবিতেই হরকিশোরবাবু নতুন একটা উপন্যাসে হাত দিলেন। সাধারণত উপন্যাস লেখা সম্পূর্ণ করার পর তিনি উপন্যাসের নাম দেন। কিন্তু এ-উপন্যাসটি লেখার আগেই তিনি নাম ঠিক করে ফেললেন Ñ হৃদয়নদী।
সুফিয়া খাতুনের সেদিনের অভিযোগে হরকিশোরবাবুর ভেতরে একধরনের আগ্রহের সৃষ্টি হয়। এই আগ্রহ দুর্বার হলো একসময়। সেই দুর্বার আগ্রহের প্রভাবে হরকিশোরবাবু হৃদয়নদী লিখে যান। ভোরসকালে উঠে লেখা শুরু করেন। কলেজের সময় পেরিয়ে যায়, হরকিশোরবাবুর কলম থামে না। স্ত্রী তাগাদা দেন, কলেজে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেন। সন্ধেয় মুড়ি-বিস্কুট আর এক কাপ চা খেয়ে লেখা শুরু করেন। স্ত্রীর উপর্যুপরি তাগাদায় রাতের খাবার খেতে বসেন। নাকেমুখে দু-চার গ্রাস গুঁজে দিয়ে লেখার টেবিলে ফিরে আসেন। লিখতে লিখতে গভীর রাত হয়ে যায়। স্ত্রী বিছানায় শুয়ে বাতি নেভাবার তাগাদা দেন। কে শোনে কার কথা! স্ত্রীর ঘ্যানর ঘ্যানর কানের বাইরে রেখে অবিরাম লিখে যান তিনি।
সে-রাতে ‘ধুত্তুরি ছাই’ বলে হঠাৎ গর্জে উঠলেন হরকিশোরবাবু। স্ত্রী রোষকষায়িত নেত্রে এগিয়ে এলেন পড়ার টেবিলের কাছে। ‘কী হয়েছে? এরকম চেঁচিয়ে উঠলে কেন? কী দোষ করলাম যে এরকম চেঁচালে?’ সুকুমারী কর্কশ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন।
‘আরে দেখছ না, বুক শেলফ থেকে হরহর করে ঘুণ পড়ে গোটা টেবিলটা বরবাদ করে দিলো!’ তারপর আস্তে করে বললেন, ‘আমার ঘাড়ে কটা মাথা যে তোমাকে ঘাঁটাই!’
এ-কথায় সুকুমারী বড় তৃপ্তি পেলেন। হঠাৎ মোলায়েম কণ্ঠে সুকুমারী বললেন, ‘তোমাকে অনেক আগে থেকে বলছি, পড়ার টেবিলের পাশে এ-শেলফটি পালটাও। শুনছ না তুমি। গাদাগাদা বই রেখে ভারী করে তুলেছ শেলফটিকে। দেখ, কোনোদিন খুলে পড়ে কী বিষাদ না ঘটায়! এখন লেখা থামাও। রাত অনেক হলো। ঘুমাতে চলো।’
হরকিশোরবাবুর মনটাও কেন জানি হঠাৎ করে নরম হয়ে গেল। স্মিত চোখে সুকুমারীর দিকে তাকালেন তিনি। নিবিড় চোখে কিছুক্ষণ সুকুমারীর দিকে তাকিয়ে থাকার পর হরকিশোরবাবু বললেন, ‘মধ্যবিত্তের জীবন নিয়ে একটা উপন্যাস লেখা শুরু করেছি বেশ কিছুদিন আগে। আজকে শেষ পরিচ্ছেদ লিখছি। আর মিনিট বিশেক লিখলে উপন্যাসটি শেষ হবে। তুমি যাও। এই আমি আসছি বলে।’
সুকুমারীর কী হয়ে গেল কে জানে। হঠাৎ হরকিশোরবাবুর হাত চেপে ধরলেন তিনি। কোমলকণ্ঠে বললেন, ‘এখন আর লিখতে হবে না। চলো ঘুমাতে। ভোরে উঠে লিখো।’
হরকিশোরবাবুর দেহের ভেতরে কী রকম যেন একটা শিহরণ তোলপাড় করে উঠল। লেখা বন্ধ করলেন তিনি। সুকুমারীকে বললেন, ‘তুমি বিছানায় যাও, আমি বাথরুম থেকে আসছি।’
পরদিন ভোরে উঠে লিখতে বসলেন হরকিশোরবাবু। সুকুমারী তখনো নিদ্রিত। প্যারার পর প্যারা লিখে যাচ্ছেন তিনি। এতদিন তিনি শুধু প্রান্তিক মানুষদের সমাজ ও জীবন নিয়ে লিখে গেছেন। এখন লিখছেন মধ্যবিত্ত জীবনের নানা টানাপড়েন নিয়ে। হঠাৎ তাঁর ভেতরে অনুশোচনার এক আলোড়ন উঠল Ñ আরে, এতদিন মধ্যবিত্তের জীবন নিয়ে লেখেননি কেন তিনি! ভাগ্যিস, সুফিয়াদি তাঁকে সচেতন করেছিলেন, নইলে হৃদয়নদী লেখা হতো না। আর মাত্র দুটো প্যারা, তারপর মুক্তি। হৃদয়নদী লেখা সম্পন্ন হবে আর মাত্র দুটো প্যারা লিখলে। আহ্, কী শান্তি! হরকিশোরবাবু ভাবছেন আর লিখছেন।
এমন সময় হুড়মুড় করে পাশের বুকশেলফটি ভেঙে পড়ল হরকিশোরবাবুর মাথায়। বুকশেলফটি দেয়াল থেকে একা নেমে এলো না, সঙ্গে নিয়ে এলো সিলিংফ্যান আর পাশের টেবিল ল্যাম্পকে। ফ্যানের একটি পাখা দ্রুতবেগে নেমে এলো হরকিশোরবাবুর মাথা বরারব। গলগলিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো মাথা থেকে। বইয়ের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেলেন হরকিশোরবাবু।
আজ মাসিক শ্রাদ্ধ চুকে গেল হরকিশোরবাবুর।
সুকুমারী ফেরিওয়ালাকে ডেকে এনেছেন। অম্লানকুসুমকে বললেন, ‘ঘরের সমস্ত বই সের দরে বিক্রি করে দাও অম্লান।’ তারপর ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বইগুলো দেখিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে সুকুমারী আরো বললেন, ‘যত তাড়াতাড়ি পারো ঘর থেকে এসব ছাইপাশ-আবর্জনা ঝেঁটিয়ে বের করো।’
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

হৃদয়নদী - হরিশংকর জলদাস

Ridoynodi by Harisankar Jaladasহৃদয়নদী - হরিশংকর জলদাস
আমি ধীবরজীবন নিয়ে 'জলপুত্র' ও 'দহনকাল' লিখেছি। বারাঙ্গনাদের নিয়ে লেখা হয়েছে 'কসবি'। আর গেল বছর হরিজনদের নিয়ে লেখা হলো 'রামগোলাম'। এ ছাড়া আমার দুটি গল্পের বই আছে- 'জলদাসীর গল্প' আর 'লুচ্চা'। সবটাই দলিত-পতিত-অপমানিতদের নিয়ে লেখা। ভদ্রলোকরা এদের বলেন প্রান্তজন। আমি প্রান্তিক মানুষজনের জীবন-সমাজ নিয়ে লিখি। কারণ ওটাই আমার অভিজ্ঞতার এলাকা। জেলে, নাপিত, ব্যাধ, মুচি, ধোপা, মেথর, কামার, কুমোর- এদের বলা হয়েছে 'নমঃশূদ্র'। শূদ্র শব্দটির আগে 'নমঃ' লাগিয়ে বর্ণবাদীরা তাদের সম্মান জানালেও তা যে প্রকৃতপক্ষে কাগুজে, ওই শ্রেণীর মানুষরা তা ধীরে ধীরে বুঝতে শিখছে। প্রান্তজনদের অস্তিত্বের জানান দেওয়ার তাগিদে মূলত আমি ওদের নিয়ে লেখা শুরু করি। আরো একটা কারণ তো অবশ্যই আছে। আমি ও রকম নমঃশূদ্র বংশে জন্মেছি। তাই বোধ হয় নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের জীবন আমাকে আকৃষ্ট ও আবৃত করে। নগরজীবন নিয়ে উপন্যাস লেখার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না। কারণ ওই জীবনের মানুষদের অন্দরমহলের খবর আমি তেমন করে জানি না। আরো একটা কারণ আছে। দলিত মানুষদের নিয়ে উপন্যাস লেখার আরো অনেক প্রেক্ষাপট এখনো অলিখিত থেকে গেছে। এ ছাড়া নগরজীবন নিয়ে বর্তমানে অনেক কথাকার গল্প-উপন্যাস লিখে যাচ্ছেন। তাই আমি ওই প্রেক্ষাপটে উপন্যাস লিখতে আগ্রহী ছিলাম না।
শেষ পর্যন্ত কিন্তু তা হলো না। কথাকার হুমায়ূন আহমেদের ছোট বোন সুফিয়া হায়দার তা হতে দিলেন না। চট্টগ্রাম কলেজে অনুষ্ঠিত একটি সাহিত্যসভায় বক্তৃতা দেওয়ার চুক্তি ছিল আমার। দেশের নানা জেলা থেকে ভদ্রজনরা এসেছেন ওই সভায়। সভা শেষে একজন ভদ্রমহিলা এগিয়ে এসে বললেন, 'আমি আপনার উপন্যাস পড়ি। আমার পরিবারের প্রায় সবাই আপনার লেখা পছন্দ করে। সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে আমার মা।' এ কথার উত্তরে কী বলব ভেবে আমতা আমতা করছি। পাশে দাঁড়ানো এক অধ্যাপক বললেন, সুফিয়া হায়দার হুমায়ূন আহমেদের ছোট বোন। আমি সচকিত হয়ে তাঁর দিকে তাকালাম। উনি বলে চলেছেন, 'আপনি শুধু দলিত প্রান্তমানুষদের নিয়ে লেখেন। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত জীবন নিয়ে নয় কেন?' বললাম- ওই জীবন যে আমার জানা নেই। সুফিয়া হায়দার বললেন, 'আপনার উত্তরটি সঠিক নয়। আপনি তো বর্তমানে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের জীবন যাপন করছেন। আপনার চারপাশে শিক্ষিত মানুষজন ছড়িয়ে আছে। তাদের নিয়ে লিখুন।'
তো সুফিয়াদির এই কথা থেকে আমার 'হৃদয়নদী' লেখা
Download and Join our Facebook Group
Ridoynodi by Harisankar Jaladas in pdf
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

মোহনা - হরিশংকর জলদাস (বইমেলা ২০১৩)

Mohana - Harishankar Jaladasমোহনা - হরিশংকর জলদাস (বইমেলা ২০১৩)
এই উপন্যাসের কাহিনির কাল একাদশ শতাব্দী। স্থানের বৃত্ত বিশাল বরেন্দ্রভূমি। তারই দু্ই ধর্ম-সম্প্রদায়-পাল রাজা আর সাধারণ কৈবর্তরা মুখোমুখি। দ্বন্দ্ব -সংঘাতে পরস্পর সংক্ষুব্ধ। রাজ্যশাসনভার কার করতলগত হবে-শূদ্রদের, না বৌদ্ধদের? ঘটনার এই জটাজালে জড়িয়ে পড়ল কথিত ছোটজাতের কৈবর্তরা। ঘোরতর যুদ্ধে মুখোমুখি হলেন পালরাজা রামপাল আর কৈবর্তরাজ ভীম। রামপালের সহায় চৌদ্দ জন সামন্ত। আর ভীমের সহায় তার পালকপুত্র চণ্ডক। তার শরীরে বহমান বৌদ্ধ রক্ত। তার জন্মসূত্র রহস্যজালে ঘেরা। চণ্ডক গভীরভাবে মগ্ন বারবণিতা মোহনার রূপসৌন্দর্যে। তার অপার রূপ-যৌবন চণ্ডকের কাছে দুর্বার আকর্ষণের মতো। অথচ সেই মোহনার হাতেই অন্তিমে তার যে পরিণতি, পাঠককে নিঃসন্দেহে তা উদ্বেল ও উৎকণ্ঠ করবে। বস্তুত, মোহনা পাল রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কৈবর্ত-গণতন্ত্রের সংঘাতের কাহিনিমাত্র নয়, এক গভীর মানবিক আখ্যানেরও আধার। দিব্যেক, ভীম, শার্বদেব, কঙ্কণদেব, রামপাল,মথনদেব ও চণ্ডককে ঘিরে এই উপন্যাসের কাহিনী আবর্তিত হলেও এর কেন্দ্রে মোহনীয় মোহনা।
Download
Mohana - Harishankar Jaladas in pdf
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

রামগোলাম - হরিশংকর জলদাস

ramgolam by Harishankar Jaladasরামগোলাম
হরিশংকর জলদাস
বিষয় : উপন্যাস
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১২
১৯২ পৃষ্ঠা
লেখক পরিচিতি
জন্ম ১২ অক্টোবর ১৯৫৫, চট্টগ্রামে সমুদ্রপারের জেলেসমাজে। ৪৪ বছর বয়সে কলম ধরেন তিনি, লেখেন নদীভিত্তিক বাংলা উপন্যাস ও কৈবর্ত জনজীবন। জলপুত্র, দহনকাল, কসবি আর জলদাসীর গল্প তাঁকে প্রতিষ্ঠা দেয়। লোকবাদক বিনয়বাঁশী এবং জীবনানন্দ ও তাঁর কাল লেখকের অন্য রকম দুটি বই। কৈবর্তকথা ও নিজের সঙ্গে দেখা নামে দুটি আত্মজৈবনিক গ্রন্থ আছে তাঁর। দলিত সমাজের লেখক তিনি, দলিতদের নিয়েই লেখেন। লেখার ক্ষেত্রে লুকোচুরি বা রাখঢাক করেন না। তাঁর লেখায় জেলে, মেথর, বারবনিতা, ধোপা, নাপিত, ভিক্ষুক, মুচি, কামার-কুমার ফিরে ফিরে আসে। ১৪১৬ বঙ্গাব্দে হরিশংকর জলদাসের দহনকাল উপন্যাসটি ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই’ পুরস্কার লাভ করে। ২০১১ সালে ‘ড. রশীদ আল ফারুকী সম্মাননা স্মারক’ পুরস্কারে ভূষিত হন এই লেখক।

বই পরিচিতি
ব্রহ্মা নাকি শুধু বিষ্ঠা সাফ করানোর জন্য নিজের শরীরের ময়লা থেকে মহীথর সৃষ্টি করেছিলেন। সেই সৃষ্টিকাল থেকে আজ পর্যন্ত তারা অচ্ছুত্। ময়লা পরিষ্কার করার জন্য কানপুর, এলাহাবাদ প্রভৃতি জায়গা থেকে এই সম্প্রদায়কে মোগল নবাব আর ইংরেজরা এ দেশে এনেছিল। নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছিল তাদের। কিন্তু এখন তাদের কোণঠাসা অবস্থা। পর্যাপ্ত থাকার ঘর নেই, পানি নেই; কেড়ে নেওয়া হচ্ছে তাদের ঘর, বিদায় করে দেওয়া হচ্ছে চাকরি থেকে; তাদের প্রথা-সংস্কার-ধর্মবিশ্বাসকে ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে। প্রকাশ্যে তাদের স্পর্শ করতে বাধে, কিন্তু গোপনে ভোগ করতে দ্বিধা নেই। মেথরদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় মিশে দলিত, অধিকারবঞ্চিত এই সম্প্রদায়কে নিয়ে হরিশংকর এমন একটি উপন্যাস লিখেছেন, যেখানে মহাভারত, মনুসংহিতা, পুরাণকথা আর বর্তমানের মেথরজীবন একাকার হয়ে উঠেছে। বঞ্চনা, প্রেম, যৌনতা—মেথরসমাজের আদ্যোপান্ত ইতিহাস যেন রামগোলাম।
Download
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

জলদাসীর গল্প - হরিশংকর জলদাস [বইমেলা ২০১১]

Jaladasir Golpo by Harishankar Jaladas [Short Stories] Ebook

হরিশংকর দল দাস
বইয়ের ধরন: ছোটগল্প
প্রকাশনী: মাওলা ব্রাদার্স
প্রকাশকাল: ৪ঠা ফেব্রুয়ারী ২০১১
ডাউনলোডঃ এখানে ক্লিক করুন
কালিন্দীর যে-তীরে ডমরনগর, সে-তীরে বারাঙ্গনাপল্লী। এই পল্লী নগরীর বাইরে, বাজারের পাশে। ও-পাড়ের মাঝিরা যে-ঘাটে নৌকা ভিড়ায়, তার থেকে সামান্য পশ্চিমে বারাঙ্গনাপল্লীটি। জোয়ার ভাটার নদী কালিন্দী। ভাটায় জল নেমে গেলে চর ভেসে ওঠে। বারাঙ্গনাপল্লী থেকে দু’কদম হাঁটলেই নদীপাড়। ওখান থেকে ঢালু হয়েছে ভূমি। বারাঙ্গনারা সকালে একবার, সন্ধেয় আরবার গা-গতর ধুতে যায় নদীজলে। পুরুষ-বর্জ্য শরীর থেকে সাফ করতে হয় যে তাদের। রাতে দিনে অতিথি আসে বারাঙ্গনাগৃহে। শরীর-ক্ষুধার তো কোনো রাত দিন নেই। মাহুত, মশালচি, সৈন্য, চারণকবি, টিকিনাড়া ব্রাহ্মণ, বাজারিয়া, হাটুরিয়া সবাই আসে ক্ষুধা মিটাতে। আর আসে ভীমের একজন সেনানায়ক, চণ্ডক তার নাম। মোহনার কাছে আসে সে। নদী-সমুদ্রের মিলনস্থল মোহনা। মিষ্টি আর নোনা জলে মাখামাখি, লুটোপুটি। নদী সমুদ্রকে আর সমুদ্র নদীকে পেয়ে তৃপ্ত। মোহনার কাছে এলেই চণ্ডকের তৃপ্তি। মোহনা তার নদী।
বারাঙ্গনাপল্লীটি তত বড় নয়, তবে এর মাঝখানে বিশাল চত্বর। চত্বরের চতুর্দিকে সারি সারি ঘর, মাটির দেয়াল। ঘরগুলো উঁচু উঁচু, প্রশস্ত আঙিনা। সেই আঙিনায় অতিথিদের বসার ব্যবস্থা। মিলনের স্থান ভিতরে। ভিতরটা নয়নাভিরাম। একদিকে বিশাল খাট, চারদিকে অগুরু চন্দনের সুবাস। একটু দূরে তাকিয়ার ওপর গুবাক-তাম্বুলের বাটা। অতিথিকে গুবাক-তাম্বুলে আপ্যায়নের রেওয়াজ আছে।
এই বারাঙ্গনাপল্লীর প্রধানা জানকি। জানকি একদা এই পল্লীরই বারাঙ্গনা ছিল। এখন প্রৌঢ়া জানকি ত্রিশ-চল্লিশ জন যৌবনবতী বারাঙ্গনার দেখাশোনা করে। তাদের নিরাপত্তার দিকেও নজর তার। পল্লীর চারদিকে সুউচ্চ মাটির পাঁচিল। দক্ষিণ দিকে প্রবেশদ্বার। ওই দ্বার দিয়েই আসা যাওয়া। পাঁচিল ডিঙানোর উপায় নেই।
শুধু ডমরনগরে নয়, আরও বিশাল বিশাল নগরীতে বাররামাদের আবাসস্থল। গৌড়, চম্পকনগর, মগধ, বৈশালী—এসব নগরে চিরায়ুষ্মতীরা বাস করে। তারা নগরীর শোভা। গঙ্গা-করতোয়া-কালিন্দী-সংলগ্ন ভূমিতে বারাঙ্গনারা বহু বহু প্রাচীনকাল থেকে কামলোভীদের তৃপ্তি দিয়ে আসছে। সমাজে তারা আদরণীয়। বাররামারাও তা জানে। ডমরনগরের বারাঙ্গনাপল্লীর মেয়েরা জানে যে, তারা ভোগের, ভোগের পর ছুড়ে ফেলারও। মোহনা, কুন্তি, সুবর্ণা, দময়ন্তী, অঙ্গনা, মেনকারা এও জানে যে, সমাজে তাদের কদর ওইটুকু সময় পর্যন্ত, যতদিন তাদের গতরে যৌবন আছে। তাই তারা স্তনের পরিচর্যা করে, অধরের পরিচর্যা করে। শরীরের ভাঁজে ভাঁজে মহুল মদ গরম করে ডলে। উষ্ণ মদে গতরের ব্যথা সারে। দীর্ঘ সময় মদের গন্ধ লেগে থাকে শরীরে। ওই গন্ধে গ্রাহকের দেহমন আনচান করে।
বারাঙ্গনাপল্লীর দুয়ারে দুয়ারে দীপাধার হাতে দাঁড়িয়ে থাকে চিরায়ুষ্মতীরা। তাম্বুল চর্চিত অধর তাদের। বারাঙ্গনাদের সন্তান হতে নেই। তবু হয়। কন্যাসন্তানেই সুখ তাদের। বিগতযৌবনে এই কন্যাই মূলধন। ডমরনগরের বারাঙ্গনাপল্লীতে এই পেশায় প্রথম যেদিন হাতেখড়ি হয়, সেদিন সকালে নাপিতানী এসে নখ খুঁটে দিয়ে যায়। মেয়েটির মাথায় ঘষে ঘষে সুবাসিত তেল মাখানো হয়। নদীতে স্নান করানো হয়। নতুন কাপড় আলতা কাজল পরিয়ে ধানদূর্বা দেয়া হয় তার মাথায়। ওর হাত ধরে লক্ষ্মী ঢুকবে যে এই বারাঙ্গনাপল্লীতে।
মোহনার স্পষ্ট মনে আছে—এই বৃত্তিতে ব্রতী হবার প্রথম দিনের কথা। সদ্য রজস্বলা হয়েছে সে। বামুনঠাকুর এসে গোধূলি লগ্নে একটি বঁটির সঙ্গে বিয়ে দিল তার। সিঁথিতে চিকন করে সিঁদুর দিল, গলায় ঝুলাল গাঁদাফুলের মালা। রাতের অতিথি ফুলমালা ছিঁড়তে বড় ভালোবাসে। অতিথি জানে—এ মালা শুধু মালা নয়, মেয়েটির অক্ষতযোনীর প্রমাণও। অক্ষতযোনীতে যুবা প্রৌঢ় বৃদ্ধ কার না আগ্রহ!
জানকির কাছ থেকে মোহনার কুমারিত্ব কিনে নিয়েছিল চণ্ডক। উচ্চ মূল্যে। সেরাতে আধা পন কড়ি দিয়ে মোহনার ঘরে ঢুকেছিল চণ্ডক।
বঁটির সঙ্গে বিয়ের পর থেকে ভাবনায় পড়েছিল মোহনা। বিয়েই যদি, বঁটির সঙ্গে কেন? জিজ্ঞেস করেছিল জানকিকে, ‘লোহার সাথে বিয়া কেনে, মানুষের সাথে নয় কেনে?’
জানকি বলেছিল, ‘এই পাড়ার অক্ষতযোনীদের গাছ বা লোহার সাথে বিয়া দেওয়ার নিয়ম। গাছ ত অমর, লোহার ক্ষয় নাই। এক গাছ মরল ত, তার বীজ থেকে আরেক গাছ জন্মাল, গাছ চিরায়ু, লোহা অক্ষয়। বারবধূরাও চিরায়ুষ্মতী। এক মোহনা গেলে, আরেক কাঞ্চনা আসে। জায়গা খালি থাকে না। তাই অমর জিনিসের সাথে মোদের বিয়া হয়। তোহারও হয়েছে।’
সেই থেকে বঁটিটিকে কাছে কাছে রাখে মোহনা। ভাবে—ওই-ই ত মোর স্বামী।
মোহনা উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা। জালিকদের ঘরে ফর্সা রঙের নারী নেই। মোহনার চুল কোঁকড়ানো। কোঁকড়া চুল খুব বেশি লম্বা হয় না। কিন্তু বিপুল হয়। মাথাভর্তি চুল মোহনার। চিপচিপে শরীর। চোখেমুখে এখনো গ্রামজীবনের শৈশব লেপ্টে আছে। কালিন্দী এগিয়ে যেতে যেতে যেতে যেখানে বাঁক নিয়েছে, সেই বাঁকে জেলেপল্লী। সেই পল্লীর নাম গাঙ্গী। সেই গাঙ্গী থেকে তিন বছরের মোহনাকে চুরি করে এনেছিল সনকা। কিনে নিয়েছিল জানকি। তারপর লালন-পালন। তারপর চ্লকের ডুবসাঁতার, মোহনায়। মদিরারক্তিম চোখে চণ্ডক মোহনার ঘরে ঢুকেছিল সেরাতে। মোহনার গলার মালায় হাত বুলাতে বুলাতে বলেছিল, ‘এই মালা আমার, এই মোহনা আমার। এর ঘরে আর কাউরে ঢুকতে দিও না।’


This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

হরিশংকর জলদাস মহীথর (উপন্যাস ২০১১ ঈদ)

amarboi.com


হরিশংকর জলদাস
মহীথর
উপন্যাস ২০১১ ঈদ
Download Bangla books in pdf form mediafire.com and also read it online. Read it from iPad, iPhone. Put book name and author, bangla ebooks, free download , mediafire , humayun ahmed , zafar iqbal , sunil gangopadhaya , suchitra , bengali ebooks, free bangla books online, ebooks bangla, bangla pdf, bangla books, boi, bangla boi, amarboi.
নতুন বই ইমেইলে পেতে হলে

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সমুদ্রের ডাক হরিশংকর জলদাস

amarboi.com
ডাউনলোড করতে হলে নিচের ডাউনলোড অপশনে ক্লিক করুন

সমুদ্রের ডাক

হরিশংকর জলদাস

আমি যখন আমার ভেতরে চোখ রাখি, সমুদ্র দেখি—গর্জনশীল, ঢেউবহুল। তীরলগ্ন জল-কাদা মেশানো, দূরের জল নীল। জলের ওপরে ছোট-বড় ঢেউ, ঢেউয়ের মাথা ভাঙা। ঝড়ের তোড়ে মাথাভাঙা ঢেউগুলো দক্ষিণ থেকে উত্তরে ধাবমান। অজগরের মতো ওলট-পালট খাওয়া ঢেউ। হাঁ হাঁ করা ঢেউগুলো জেলেনৌকাগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। নৌকার আগাকে ঢেউয়ের দিকে সোজা করে রেখে শক্ত মুঠিতে হাল ধরে পাছায় বসা পূর্ণচন্দ্র, রামনারায়ণ, উপেন্দ্ররা। মুখে তাদের ‘আঃ বদরসাহেব, আঃ বারো আউলিয়া, আঃ মা কালী, আমাদের রক্ষা করো। এই ঝড় থেকে বাঁচলে, মা গঙ্গা, তোমারে পূজা দেব।’ এই সব দৃশ্য আমার চোখের সামনে দিয়ে চলচ্চিত্রের মতো একের পর এক ভেসে যায়। জীবনের ত্রিশটি বছর আমিও পূর্ণচন্দ্র, রামনারায়ণদের সহযোদ্ধা ছিলাম। আমার সমুদ্র মানে বঙ্গোপসাগর। আমি আরব সাগর দেখিনি, প্রশান্ত বা আটলান্টিক মহাসাগর আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে। ভারত মহাসাগর বা লোহিত সাগরের গল্প শুনেছি শুধু। যার জলে আমি অবগাহন করেছি বা যার জলশস্যে আমার চৌদ্দ পুরুষ পালিত হয়েছে, সে বঙ্গোপসাগর। মানুষের শরীরের নাকি এক-তৃতীয়াংশ জল। তা যদি সত্যি হয়, তাহলে আমার শরীরের সমস্ত জলই বঙ্গোপসাগরের। আমার বেড়ে ওঠা, আমার জীবনযাপন জুড়ে আছে বঙ্গোপসাগর। আমার আনন্দ আর বেদনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই বঙ্গোপসাগর। আজ থেকে আশি বছর আগে এই বঙ্গোপসাগরই আমার দাদুকে কেড়ে নিয়েছিল। সমুদ্রের অতল নীল জলকে বড় ভালোবাসতেন চন্দ্রমণি। নীলজলের ঢেউ তাঁর ভেতরে মাথা কুরে মরত। ওই জলের টানে চন্দ্রমণি, মানে আমার দাদু, স্থায়ী সুইপারের চাকরি ছেড়ে ঠুনকো কাঠের নৌকা বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়েছিলেন। আশ্বিনের ঝড়ো বঙ্গোপসাগর ওই নৌকা খেয়েছে, চন্দ্রমণিকে খেয়েছে, চন্দ্রমণির আটজন সঙ্গীকে খেয়েছে। বাপের অপমৃত্যুতে ভড়কে যাননি চন্দ্রমণির ছেলে যুধিষ্ঠির। তরুণ যুধিষ্ঠিরও একগাছি নৌকার পাছায় শক্ত মুঠিতে হাল ধরে বসেছেন। লইট্যা মাছ, ঘোঁওড়া মাছ, রিশ্শা মাছ, করকইজ্যা ইচা, অলুয়া মাছ আর ইলিশ মাছে ভর্তি করে নৌকা কূলে ভিড়িয়েছেন। আমি, চন্দ্রমণির তৃতীয় পুরুষ, বঙ্গোপসাগরে নৌকা না ভাসিয়ে পারিনি। পরিবার-পরিজন এবং নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমিও কালবৈশাখীকে মাথায় নিয়ে, আষাঢ়-শ্রাবণের ঝড়-জলকে উপেক্ষা করে কখনো বাবার সঙ্গে, কখনো বা গাউর-কামলাদের সঙ্গে মাছ মারতে গেছি বঙ্গোপসাগরে। ঢেউয়ের বাড়ি আর জলের তোড় আমাদের প্রতিপক্ষ হয়েছে বারবার। ঝড়-জলের আঘাতে নৌকার গুঁড়ি ভেঙেছে, পাল ছিঁড়েছে, দাঁড় ভেসে গেছে। কিন্তু আমরা হার মানিনি। জানি, হার মানলে মৃত্যু অবধারিত, হার মানলে উনুনে আগুন জ্বলবে না। মা-বাবা-পরিজন না খেয়ে মরবে। এ জন্য আমরা আঘাতের বদলে প্রত্যাঘাত দিতে শিখেছি। তাই নৌকাকে ঢেউ-ঝড়ের প্রতিকূলে ঠেলে সমুদ্রে পাতানো জালের কাছে নিয়ে গেছি। জলশস্য নৌকায় তুলে বিজয়ীর বেশে বাড়ি ফিরেছি।
আমার দেখা সমুদ্র শরৎচন্দ্রের দেখা সমুদ্রের মতো নয়। তিনি শ্রীকান্ত-এ ঝড়ো সমুদ্রের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা দূর থেকে দেখা। মানে জাহাজের ডেক থেকে দেখা। জলতল থেকে জাহাজের পাটাতনের উচ্চতা কম হলেও ত্রিশ ফুট। নিরাপদ দূরত্বই বলা চলে। কিন্তু আমি যে নৌকায় সমুদ্রে যেতাম, জলের উপরতল থেকে সে নৌকার পাটাতনের উচ্চতা তিন ফুট। ওই তিন ফুট উচ্চতার নৌকা নিয়েই আমরা তুফানের সময় ঝঞ্ঝামগ্ন বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হতাম। প্রথম প্রথম ঝড়ে পড়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেও পরে অনেকটা গা-সওয়া হয়ে গিয়েছিল ওই ঝড়ো সমুদ্র। শুনেছি, জীবন ঘষে ঘষে নাকি আগুন জ্বালানো যায়। এই ত্রিশ বছরের সমুদ্রজীবনে আমার জীবন বাজি রেখে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলাম, তার একেবারেই জলাঞ্জলি হয়নি। যখন আমি লিখতে বসলাম, ওই ঝড়-জলের অভিজ্ঞতা, ওই মাছ মারার অভিজ্ঞতা, ওই রুক্ষ-রুদ্র-ভয়ংকর সমুদ্র দর্শনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগল। দহনকাল-এ সমুদ্রের ভয়াল রূপের বর্ণনা দিতে গিয়ে ওই জীবনঘষা অভিজ্ঞতার কথা কাহিনির মোড়কে উপস্থাপন করেছি। দহনকাল থেকে সামান্য উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে, ‘তখন নৌকার চারদিকে বড় বড় ঢেউয়ের তাণ্ডব। পর্বতসমান ঢেউ নৌকার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে আর শক্ত কুশলী হাতে আগাটি সেই ঢেউয়ের মাথায় চড়িয়ে দিচ্ছে ঈশান। আক্রোশে ফুঁসতে ফুঁসতে সেই ঢেউ নৌকাকে ঝাপটা দিয়ে পেছনে গলে যাচ্ছে। করাল হাঁ ব্যাদান করে বাতাস এগিয়ে আসছে হু হু করে। ঘন কালো মেঘ নেমে এসেছে অনেক নিচে। মেঘে মেঘে ঘর্ষণে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। কাছে-দূরে বজ্রপাত হচ্ছে। যেন মহাদেব মহাপ্রলয়ে নেমে রুদ্ররোষে হুংকার দিচ্ছেন।...ঢেউয়ের সঙ্গে ঢেউয়ের বাড়ি লেগে জলতল ফেনাময়। জলকণাগুলো ঘন আস্তরণ সৃষ্টি করেছে গোটা সমুদ্রজুড়ে। বাতাস, ঢেউ, জলকণা, মেঘের গর্জন, বৃষ্টির ছাঁট মিলেমিশে এক ভয়জাগানিয়া পরিবেশ তৈরি হল সমুদ্রবুকে।’
সমুদ্র শুধু আমাকে রুদ্র-ভয়ংকরের অভিজ্ঞতা দেয়নি, ধবল জ্যোৎস্না আর অতল নীল জল দেখার সুযোগও করে দিয়েছে। শীতকালে বঙ্গোপসাগর হয়ে যায় সৌম্য ঋষির মতো। ঢেউ নেই, কল্লোল নেই। তীর ছুঁইছুঁই তখন তার নীল জল। তীর ধরে ধরে নীল জলের ছলাৎছলাৎ পায়ে মৃদু অগ্রগমন। দিগন্তজুড়ে বালিয়াড়ি। জলের ধার ঘেঁষে অগণন লাল কাঁকড়ার এধার-ওধার দৌড়াদৌড়ি। কাঁকড়ার দুটো শুঁড়ে যেন মৃদু আলোর দুটো বাল্ব। কাছে গেলেই ফুরুৎ ফুরুৎ গর্তে ঢুকে পড়া। ইচ্ছে হলো তো দল বেঁধে নীল জলে অবগাহন। শীতের সময় মাছ মারতে যাওয়ার আলাদা একটা আনন্দ আছে। আষাঢ় থেকে কার্তিক পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর যেন মাছমারাদের প্রবল প্রতিপক্ষ। কোনোক্রমেই এই সময়ে সমুদ্রকে বাগে আনা যায় না। শুধু ভাঙে পালের মাস্তুল, নৌকার আগা, হালের দাঁড়। শুধু কেড়ে নেয় জাল, নৌকা, জীবন। হরবাঁশির বাপ, জয়ন্তের মেয়ের জামাই, মধুরাম, মঙ্গলচরণ—এঁদের জীবন কেড়ে নিয়েও সন্তুষ্ট হয় না সমুদ্র, আরও গ্রাস করার জন্য ফুঁসতে থাকে। অগ্রহায়ণ এলেই তার সব ফাঁসফোঁসানির অবসান ঘটে। বুকভরা নীল জল নিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে আর দক্ষিণ থেকে উত্তরে চলতে থাকা শুধু। ওই নীল জলের তলায় তখন প্রচুর মাছ—চিক্কা ইচা, লইট্যা মাছ, ছুরি মাছ, রূপচাঁদা, আর চেঁউয়া মাছ। কূল আঁধার করা দূরত্বে তখন জেলেরা তাদের বিহিন্দি জাল পাতে। সারি সারি। নানা বহদ্দার আর পাউন্যা নাইয়া ওই সারি সারি জালে ঘাইয়ে থাকে। গভীর রাতে মাছ তোলার সময় হয়। ওই সময় কূল থেকে দাঁড় বেয়ে এসে নিজের জালের হদিস পাওয়া সম্ভব নয়। তাই জেলেরা জালে লম্বা রশি বেঁধে পুরো জোয়ারের সময়টা জাললগ্ন হয়ে থাকে। একে বলে ঘাইয়ে থাকা। ওই ঘাইয়ে থাকাকালে অগ্রহায়ণের ধবল জ্যোৎস্নার সঙ্গে আমার দেখা। ফকফকা জ্যোৎস্নাও যে মানুষকে ঘোরে ফেলে দেয়, তা আমি বুঝেছি ওই সময়। শনশন করে নৌকার দুই পাশ দিয়ে জল ধাবমান। জলতল নখের পিঠের মতো সমতল। দু-চারটা অচেনা মাছ জলের ওপর একটু করে লাফিয়ে উঠে জলে ডুবে যাচ্ছে। নৌকার কাঁইকের ওপর সঙ্গের চারজন বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। আমি জেগে আছি। নৌকার পাছার দিকের ছোট্ট খোপে শরীরটা আটকে দিয়ে বিপুল জ্যোৎস্নার দিকে তাকিয়ে আছি। দক্ষিণ দিকের আকাশ ঘেঁষে পূর্ণ চাঁদ। পূর্ণিমাই হবে সে রাতে। না হলে এত জ্যোৎস্নায় আকাশ-সমুদ্র ভেসে যাবে কেন? রুপালি চাঁদের পাগল করা আলো নীল জলের রংটাই পাল্টে দিয়েছে। আমি একবার জল দেখি, আরেকবার চাঁদ। আমি হাত বাড়িয়ে জ্যোৎস্নামাখা জল ছুঁই, আর জ্যোৎস্না ছুঁয়ে থাকে আমাকে। আমার মুখ দিয়ে আমারই অজান্তে সেই সময় কোনো একটা আওয়াজ বেরিয়ে এসেছিল। না হলে কেন যুধিষ্ঠির আথালিপাথালি বিছানা ছেড়ে উঠে বসে আমাকে বলেছিলেন, ‘কী অইয়ে, অ বাছা কী অইয়ে?’ আমি একটু লজ্জা পেয়ে বলেছিলাম, ‘কিছু না বাবা।’ ‘নিচ্চয় কিছু বাছা, ভয় পাইও না? এই সময় সাগরে কত কিছু হাঁডি বেড়ায়।’ বাবা বলেছিলেন। আমি জবাব দিইনি। বাবা আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তখন আমি এমএ পাস দিয়ে ফেলেছি। অধ্যাপনাও করছি সরকারি সিটি কলেজে। সাত শ পঞ্চাশ টাকা বেতন। ওই টাকা দিয়ে এগারো জনের হাঁ বন্ধ করা যায় না। ভাইয়েরা ছোট ছোট। দু-চারজন স্কুলে পড়ছে। পরিজনের দুমুঠো অন্ন জোগাড় করার জন্য তাই আমার জ্যোৎস্নারাতে বা বজ্রনিনাদিত ঝড়ো রজনীতে মাছ মারার অভিযান।
খুব ছোটবেলা থেকে বঙ্গোপসাগরকে ভালোবাসতে শিখেছি আমি। বঙ্গোপসাগর আমাদের পরিবারের স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে, শান্তি কেড়ে নিয়েছে, বারবার। বেঁচে থাকার প্রধান উপকরণ নৌকা আর বিহিন্দি জালও গ্রাস করতে কখনো দ্বিধা করেনি। তার পরও কেন জানি সমুদ্রকেই ভালোবেসেছি। সমুদ্র আমাকে অস্তিত্ব, আমার বিকাশ-বিস্তারের উর্বর ক্ষেত্র। কবি কামাল চৌধুরীর কবিতায় আমার, জেলে সমাজের প্রকৃত নৃতত্ত্ব উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে যেন—
‘আমাদের গায়ে লেগে আছে অনার্য রোদ্দুর
পুরোনো পাথরের স্তূপ দেখে আমরা শনাক্ত করতে পারি প্রার্থনার গৃহ
অথচ অসংখ্য নদী, সমুদ্র সমতল, আমাদের মাছ-ভাতের ঐতিহ্য
সবটাই ধীবরকালের নৃতত্ত্ব।’
এই ভালোবাসাবাসি থেকেই সমুদ্রতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করার প্রবল আগ্রহ জন্মে আমার ভেতরে। আইএ পাস করার পর জানলাম, চট্টগ্রাম কলেজে বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্রতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করার কোনো সুযোগ নেই; আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু যুধিষ্ঠির জলদাসের বড় ছেলেকে ঢাকায় পড়তে পাঠানোর মতো সামর্থ্য নেই। সমুদ্রের ওপর পড়তে না পারার বেদনাকে মনে লুকিয়ে রেখে এখনো সুযোগ পেলে আমি পতেঙ্গার সমুদ্রচরে গিয়ে বসি। জেলেপাড়ার মানুষেরা আমাকে ঘিরে বেড়ে বসে। থাকে তরুণেরা, থাকে সমুদ্রে স্বামী হারানো বিধবারা, আর থাকেন বয়োবৃদ্ধরা। আমি যে অধ্যাপনা করি, অধিকাংশই তা জানে না। কোনো একটা স্কুলে-টিস্কুলে পড়াই—ওইটুকুই তারা জানে এবং মানে। আমাকে তারা সম্বোধন করে ‘মাস্টার’ বলে। ওই ডাকেই আমি সাড়া দিই। তাদের আবাল্য দেখা হরিশংকর কত বড় অধ্যাপক হয়েছে বা অন্য কিছু, তাতে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। তাদের আনন্দ হরিশংকর এখনো তাদের ভোলেনি। ওদের নিয়ে সমুদ্রপাড়ে গিয়ে বসি। বয়োবৃদ্ধরা তাঁদের সমুদ্রাভিযানের গল্প শোনান, বিধবারা তাদের স্বামী হারানোর বেদনার কথা আমার সামনে খুলেমেলে ধরে। বলে, ‘ওই হারামি দইন্যা, ওই নিষ্ঠুর মা গঙ্গা আমার সোয়ামিরে কাইড়া লইছে। যৌবন থাকতে আমারে বিধবা বানাইছে। আমাদের নৌকা ছিল, জাল ছিল। ওই লক্ষ্মীছাড়া সমুদ্র আমার স্বামী, নৌকা, হাল-জাল সব গেরাস করছে। আজ আমি মাইডারে লইয়া পাড়ায় পাড়ায় মাছ বেইচ্যা বেড়াই। হা ভগমান, আমার কপালে এ-ও লিখি রাখছিলা!’ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। বিধবাটির হাহাকার সমুদ্রকল্লোলকে বিষণ্নতায় ভরিয়ে তোলে। পরিবেশকে হালকা করার জন্য আমি প্রসঙ্গান্তরে যাই। আমি তাদের তাকাষি শিবশঙ্কর পিল্লাইয়ের চেম্মীন উপন্যাসের কাহিনি শোনাই। বলি, কী অসাধারণ দক্ষতায় তামিলনাড়ুর সমুদ্র-নির্ভর এক জেলেপল্লির জীবনচিত্র শিবশঙ্কর তাঁর উপন্যাসে এঁকেছেন। তারা অবাক হয়ে তামিলনাড়ুর মাছমারাদের সমুদ্রযুদ্ধের কথা শোনে, পালা-পার্বণের কথা শোনে। বলে, ‘কী আচার্য, ওদের সঙ্গে আমাদের এত মিল কী করে হলো?’ ওরা বিস্ময়ে আবিষ্ট হয়, যখন শোনে, শ্রীলঙ্কার কিংবদন্তি ক্রিকেটার জয়সুরিয়া সমুদ্রসন্তান, শ্রীলঙ্কারই এক ধীবরপল্লিতে তাঁর জন্ম।
আমি ধীরে ধীরে কাহিনি ঘোরাই তামিলনাড়ু থেকে কিউবার হাভানার দিকে। জয়সুরিয়াকে ছাড়িয়ে আমি হেমিংওয়ের ‘ওল্ডম্যান অ্যান্ড দি সি’ উপন্যাসের সান্তিয়াগোর গল্প পাড়ি তাদের সামনে। হাভানার উপসাগরে সান্তিয়াগো চুরাশি দিন বড়শি ফেলে একটি মাছও পায় না শুনে তারা হাসাহাসি করে। বলে, ‘সমুদ্রে মাছ ছিল না? বড়শিতে আধার ছিল না? সত্যি জলে ফেলেছিল তো বড়শিটি?’
বঙ্গোপসাগর আমাদের অনেক ব্যথার সাক্ষী। বঙ্গোপসাগরের একেবারে কোল ঘেঁষেই উত্তর পতেঙ্গার জেলেপল্লিটি। পূর্ণিমা-অমাবস্যার জোয়ারে জেলেপাড়াটি সাগরজলে গোসল করে। সমুদ্রের শোঁ শোঁ বাতাস জেলেপাড়ার শিমুলগাছ আর নারকেলগাছের মাথা এলোমেলো করতে থাকে। বঙ্গোপসাগরের গর্জন শুনতে শুনতেই আমার বেড়ে ওঠা। আমাদের রাতে ঘুমোতে যাওয়া। সমুদ্র আর জেলেপাড়ার মাঝখানে কোনো আড়াল নেই। আমরা মাছ মারতে সমুদ্রে যাই, আনন্দে সমুদ্রপাড়ে যাই, বেদনা বোঝাতে যাই সমুদ্রের কাছে। কিন্তু ১৯৭১ সালে সমুদ্র আর আমাদের সখ্যের মাঝখানে এসে দাঁড়াল পাকিস্তানি হানাদাররা। সমুদ্র আর জেলেপাড়ার মাঝখানের ভূমিটি দখল করে আস্তানা গাড়ল তারা। তারা মাছ ধরা নিষিদ্ধ করল। সমুদ্রপাড়ে যাওয়া বন্ধ করে দিল। সমুদ্র-বিচ্ছিন্ন হয়ে জেলেরা হাহাকার করে উঠল। মাছ মারতে না পেরে জলবিযুক্ত মাছের মতন খাবি খেতে লাগল। জেলেদের জলবিচ্ছিন্ন করে ক্ষান্ত হলো না হায়েনারা। তাদের দেহসুখ মেটানোর জন্য বেছে নিল আমাদের জেলেপল্লিটিকে। এরা সন্ধ্যায় আসে, রাতে আসে, পূর্বাহ্নে আসে, অপরাহ্নে আসে। ঘিরে ফেলে এক-একদিন এক-একটি বাড়ি। শরীরের চাহিদা মিটিয়ে এরা ফিরে যায়। চাপা আর্তনাদে ধর্ষিতা নারীরা চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে থাকে। জেলে পুরুষেরা সমুদ্রের দিকে ফিরে চিৎকার করে ওঠে, ‘হা মা গঙ্গা, অ বঙ্গসাগর, তুমি তোমার জল দিয়ে এই জেলেপাড়াটি ভাসিয়ে নিয়ে যাও। তোমার পবিত্র জলে আমাদের ধর্ষিতা নারীদের অপবিত্রতাকে শুচিময় করে তুলো।’ যে বিকেলে কৃষ্ণবন্ধুর চৌদ্দ বছরের বোনটিকে হানাদাররা ধর্ষণ করে, সে বিকেলেই কৃষ্ণবন্ধু আত্মাহুতি দিতে বঙ্গোপসাগরে যায়। কিন্তু বেড়িবাঁধের পাঞ্জাবি সেনারা তাকে আটক করে, সমুদ্রজল পর্যন্ত পৌঁছাতে দেয় না। দুই দিন পর প্রচণ্ড অত্যাচার শেষে মৃতপ্রায় কৃষ্ণবন্ধুকে বেড়িবাঁধ থেকে নিচে ছুড়ে ফেলে দেয়। কৃষ্ণবন্ধু এখনো হানাদারদের নির্যাতনের চিহ্ন গায়ে বহন করে বেঁচে আছে। কোমরভাঙা কৃষ্ণবন্ধু এখনো হুরিজাল কাঁধে নিয়ে সাগরে নামে। উত্তর পতেঙ্গার জেলেপাড়া থেকে বিচ্ছিন্ন কেউ নই আমি। ওদের জীবনকথা আমার জীবনকাহিনির সঙ্গে একাকার হয়ে আছে এখনো। এখনো সময় করে আমি সাগরপাড়ে গিয়ে বসি। তাদের জীবনগাথা শুনি

আপনাদের সহযোগীতা আমাদের একান্ত কাম্য। তাই যদি বইটি ভালো লেগে থাকে তাহলে দুচার লাইন লিখে আপনার অভিব্যাক্তিগুলো জানিয়ে রাখুন আমাদের কমেন্টস বক্সগুলোতে। বন্ধু-বান্ধবদের বলুন এই সাইটটির কথা। আপনাদের অনুপ্রেরণায় আমরা আরও অনেক বই নিয়ে আপনাদের সামনে আসতে পারবো। ধন্যবাদ।

Download Bangla books in pdf form mediafire.com and also read it online. Read it from iPad, iPhone. Harishankar Jaladas, Samudrer Daak, bangla ebooks, free download , mediafire , humayun ahmed , zafar iqbal , sunil gangopadhaya , suchitra , bengali ebooks, free bangla books online, ebooks bangla, bangla pdf, bangla books.
নতুন বই ইমেইলে পেতে হলে

This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

জলপুত্র - হরিশংকর জলদাস


জলপুত্র - হরিশংকর জলদাস
যেভাবে লেখাহলো উপন্যাসটি

প্রান্ত সমাজে জন্ম আমার। একেবারে কিশোর বয়স থেকে সমুদ্র-সংগ্রামে বাবার সহযোদ্ধা। জলচর থেকে স্থলচর হওয়ার জন্য আমার কানের কাছে বাবা যুধিষ্ঠির অবিরাম মন্ত্র পড়ে যেতেন। এসএসসি পাস করে প্রাথমিক শিক্ষক হওয়ার প্রবল বাসনা মনের মধ্যে আকুলি-বিকুলি করত। ভাগ্যক্রমে এমএ পাস করা গেল, সরকারি কলেজে চাকরিও পাওয়া হলো।
ভদ্র-শিক্ষিত সমাজে চাকরি করতে এসে বিবর্ণ প্রান্তিক সমাজে জন্মগ্রহণ করার অপরাধের দায় থেকে মুক্তি ঘটেনি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্ত্রী পিতৃদত্ত নাম ধরে না ডেকে আড়ালে-আবডালে জাইল্যার পোলা বলে ডাকতেন। সহকর্মীরা সে কথা কানে পেঁৗছালে একটি প্রশ্ন আমার মধ্যে জেগে উঠল। তাহলে কি জেলেরা সত্যিই নিন্দনীয়? মাছমারাদের উৎপত্তি-বিকাশ-বিস্তার নিয়ে গবেষণা শুরু করলাম। লেখা হলো_নদীভিত্তিক বাংলা উপন্যাস ও কৈবর্ত জনজীবন। বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হলো বইটি। এ বিষয়ে কাজ করতে করতে আমার ভেতরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল 'জলপুত্র'-এর বীজ। সে সময় চট্টগ্রামের যে বাসায় থাকতাম, তার পাশেই ওই বাড়ির মালিকের চাকর-চাকরানির খোলা পায়খানা। স্থান সংকটের কারণে বদবুযুক্ত সেই খোলা পায়খানার সংলগ্ন রুমে বসেই আমাকে লিখতে হতো। থিসিস লিখতে লিখতে এক গভীর রাতে আমার মাথাটি যখন একেবারে জ্যাম হয়ে গেল, টেবিল থেকে রুলটানা একটা মোটা খাতা টেনে লেখা শুরু করলাম_'জলপুত্র'।
'জলপুত্র' লিখতে গিয়ে আমি দুটো সমস্যায় পড়লাম। একটি : মানিক-অদ্বৈত-সমরেশ-সাধনের পরে জেলেদের নিয়ে আর উপন্যাস লেখার প্রয়োজন আছে কি না? অন্যটি : চরিত্রগুলোর সংলাপের ভাষা কী হবে? মানিক-অদ্বৈত-সমরেশ প্রমুখ নদীপাড়ের জেলেকে নিয়ে নদীভিত্তিক উপন্যাস লিখেছেন। আর 'জলপুত্র' সমুদ্রপাড়ের জেলেদের নিয়ে সমুদ্রভিত্তিক উপন্যাস। জেলে জীবননির্ভর সমুদ্রভিত্তিক উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে আর নেই_এ তথ্য জানার পর আমি সাহসী হয়ে উঠলাম। এ সময় উৎসাহদাতারা আমাকে বললেন, ৫১ বছর আগে অদ্বৈত মল্লবর্মণ 'তিতাস একটি নদীর নাম' লিখেছিলেন। তিনি জলপুত্র ছিলেন, আজ আরেকজন জলদাস 'জলপুত্র' লিখলে ক্ষতি কী? আমরা আরেকজন জেলের কাছে কৈবর্ত জীবনকথা শুনতে চাই। আমি 'জলপুত্র' লেখা শেষ করলাম।
'জলপুত্র' উপন্যাসের স্থানিক পটভূমি চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গা গ্রামের জেলেপল্লীটি।
এখানকার অধিবাসীরা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। চরিত্রগুলোর মুখে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা বসালে অন্য জেলার পাঠকরা তা বুঝবেন কি না_এ প্রশ্ন আমাকে কুরে কুরে খেয়েছে।
আমার অপার আনন্দ যে 'জলপুত্র' উপন্যাসটি দেশের এবং দেশের বাইরের পাঠকরা পড়ছেন আর কেউ কেউ আমাকে জলপুত্র হরিশংকর বলে সম্বোধন করছেন।
সম্পূর্ণ উপন্যাসটি পড়বার জন্য নিচের লিংকটিতে ক্লিক করুন।
Download Now
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

দহনকাল - হরিশংকর জলদাস


১৪১৬ বাংলা সনের বাংলাদেশি প্রকাশনা থেকে সৃজনশীল শাখায় কথাশিল্পী হরিশংকর জলদাসের উপন্যাস দহনকাল ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই’-এর পুরস্কার পেয়েছিল। ১৪১০ বঙ্গাব্দ থেকে এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সভাপতিত্বে খালিকুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ আকরম হোসেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও মহীবুল আজিজের সমন্বয়ে গঠিত বিচারকমণ্ডলী পুরস্কারের জন্য বইটি চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করেন।
হরিশংকর জলদাসের জন্ম ১৯৫৫ সালের ১২ অক্টোবর, চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গা গ্রামের জেলেপল্লিতে। তিনি পতেঙ্গা উচ্চবিদ্যালয়, চট্টগ্রাম কলেজ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে তিনি ‘নদীভিত্তিক বাংলা উপন্যাস ও কৈবর্ত জনজীবন’ বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর অন্য উপন্যাস জলপুত্র (২০০৮)। 
তিনি বিখ্যাত ঢোলবাদক বিনয়বাঁশিকে নিয়ে লেখেন লোকবাদক বিনয়বাঁশি (২০০৪)। 
কৈবর্তকথা (২০০৯) নামে তাঁর একটি আত্মজৈবনিক গ্রন্থ রয়েছে। তাঁর অন্যান্য বই কবিতা ও ধীবরজীবনকথা (২০০১), ছোটগল্পে নিম্নবর্গ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (২০০২) ও কবি অদ্বৈত মল্লবর্মণ এবং (২০০২)। 
হরিশংকর জলদাস পেশাগত জীবনে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান।
আমারবই ডট কম আগেও তাঁর জলদাসীর গল্প নামের ছোটগল্পের সংকলন অনলাইনে pdf আকারে এনেছে। এবার তার এই নতুন উপন্যাসটি পাঠকদেরকে পড়বার সুযোগ করে দিল। আশাকরি বইটি ভালো লাগবে। সংগ্রহে রাখতে চাইলে ঝটপট কিনে ফেলুন।
অনলাইনে পড়বার জন্য এখানে ক্লিক করুন।
Download Now
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

একজন জলদাসীর গল্প - হরিশংকর জলদাস


একজন জলদাসীর গল্প - হরিশংকর জলদাস

আপনার কি জগৎহরির কথা মনে আছে? ওই যে জগৎহরি জলদাস। মনে পড়ছে না? আহা, ঐ যে_একাত্তরের অক্টোবরে মুক্তিযোদ্ধাদের খানসেনার ঘাঁটিতে পৌঁছে দিতে গিয়ে মারা পড়ল যে জগৎহরি। আচ্ছা, আচ্ছা, মনে পড়েছে তাহলে? ঠিক বলেছেন_গভীর রাতে, যে-রাতে আকাশে দেরিতে চাঁদ উঠেছিল, কমান্ডার সেলিম খোন্দকার জগৎহরির বাঁশের দরজায় টুকটুক শব্দ তুলে চাপাস্বরে ডেকেছিলেন, 'জগৎবাবু, ও জগৎহরিবাবু, জেগে আছো নাকি?'
জগৎহরি বিড়ালপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলে কমান্ডার সেলিম আবার বলেছিলেন, 'একবার যে আমাদের সঙ্গে যেতে হয় হরিবাবু। খানসেনাদের বড় বাড় বেড়ে গেছে। ওদের শিং গজিয়েছে। শিংগুলো যে ভেঙ্গে দিয়ে আসতে হয়। তোমার পথ দিয়েই যেতে হবে, জলপথ দিয়ে। কর্ণফুলীর ওইপাড়ে কয়লার ডিপুতে আসত্মানা গেড়েছে খানকির পোরা।' খোন্দকারের মুখ আলগা। সেই আলগামুখে প্রায় গর্জন করেই কথাগুলো বলে গিয়েছিলেন কমান্ডার।
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

সাক্ষাতকার - হরিশংকর জলদাস



সাক্ষাৎকারে হরিশংকর জলদাস

অন্ত্যজ সমাজে জন্মগ্রহণ করলেও জন্ম পরিচয় তাঁর কাছে গস্নানির কারণ হয়নি। বরং কথাসাহিত্যে ওই সমাজের ছবি
এঁকে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। পেশায় অধ্যাপক হরিশংকর জলদাস এরই মধ্যে ব্যাপক নন্দিত হয়েছেন।
পেয়েছেন অনেক পুরস্কার। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আরেক কথাশিল্পী মোহিত কামাল
মোহিত কামাল : প্রথমেই ২০১১ এর বইমেলায় প্রকাশিত আপনার নতুন উপন্যাসটি সম্পর্কে জানতে চাইব। এর পটভূমি, কাহিনী এবং অবশ্যই এটি লেখার প্রেরণা সম্পর্কে বলবেন। একই সাথে আপনি আমাদের বলবেন_'জলপুত্র' ও 'দহনকাল' উপন্যাস দুটো কীভাবে আলাদা?
হরিশংকর জলদাস : ২০১১-এর বইমেলায় আমার উপন্যাস বেরুচ্ছে একটি_'কসবি'। 
This is the largest online Bengali books reading library. In this site, you can read old Bengali books pdf. Also, Bengali ghost story books pdf free download. We have a collection of best Bengali books to read. We do provide kindle Bengali books free. We have the best Bengali books of all time. We hope you enjoy Bengali books online free reading.

Authors

 
Support : Visit our support page.
Copyright © 2021. Amarboi.com - All Rights Reserved.
Website Published by Amarboi.com
Proudly powered by Blogger.com